খাদের কিনারে বাংলাদেশ

image credit-http://thisisourbangladesh.blogspot.com/

image credit-http://thisisourbangladesh.blogspot.com/

মো. আদনান আরিফ সালিম

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে টক-শোজীবি শুশীল আর আমরা আমজনতা সবার ধুকপুক করতে থাকা হৃদয় ও চঞ্চল মনে ঐ একই প্রশ্ন কী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে? ২৪ অক্টোবরের পর সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আর তিন মাস বাকি ছিলো। হিসেব অনুযায়ী নিয়ম মাফিক নির্বাচন দিতে হলে ঐ দিনই সংসদ ভেঙে দেয়াটা উচিত ছিলো। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণ অস্বীকার করে সরকার সেটি না করে পুরো দেশকে একটি অনিবার্য সংঘাত ও রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নির্লজ্জতার শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে এও ঘোষণা দেয়া হয়েছে সংসদ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হবে যা নজিরবিহীন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি কলংকস্বরূপ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী (যিনি এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন) বি.এন.পি সভানেত্রীকে আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য ফোন করেছিলেন। পুরো জাতি আর কিছু না হোক অন্তত সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটু আশার আলোর ঝলকানি দেখতে পায়। কিন্তু ফলাফল আখেরে হয়েছে শূন্য। তিনি তার কটুবাক্য আর একগুঁয়ে অবস্থানের মাধ্যমে বি.এন.পি কে সংলাপে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে সৃষ্ট জটিলতা যে আরো বাড়বে বৈ কমবে না এই ঘটনার মধ্য দিয়েই তিনি তা সুস্পষ্ট করেছেন।

বিশেষ করে সদ্য বিগত হওয়া সরকারের আমলের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে একটা সমঝোতার কথা খোদ জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হলেছিলো। কিন্তু তাঁর নিতান্ত একরোখা আচরণের কারণে সেই সম্ভাবনার পুরোপুরি ‘মৃত্যু’ ঘটেছে বলেই ধরে নেয়া যায়। সবথেকে বড় কথা বর্তমান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সদ্য বিগত সরকারের মানণীয় প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে বিশ্বের সবার সামনে বলে এসেছিলেন, তিনি বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু যে যাই বলুক বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব নয়। অনেক দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বয়ং আওযামী লীগ সভানেত্রী এটি উপলব্ধি করছেন না। সেই সাথে তাঁর চারপাশে বেষ্টনি তৈরি করে থাকা মানুষগুলোও সমঝোতায় তেমন আগ্রহী হন। তাঁরা এর বদলে অত্যন্ত কঠোর রূঢ় ও অশ্লীল ভাষায় বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি সহকারে বি.এন.পির সমালোচনা করে চলেছেন যা কখনোই একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাঙ্খিত বিষয় হতে পারে না।

শেখ হাসিনাকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেখে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু সংগত কারণেই মহাজোট সরকারের শরিকদের একাংশসহ বি.এন.পি কখনোই এই নির্বাচন মেনে নিতে পারবে না। অন্যদিকে দুদ্ধপোষ্য আওয়ামী লবি বাদ দিলে দেশের সুশীল সমাজের একটা বড় অংশও চাচ্ছেন নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ একটি সরকার। বিশেষ করে ঐ সরকারকে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য নির্দলীয় হতে হবে। বেগম জিয়ার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষণে যৌক্তিক ভাবে এই ধরণের চিন্তারই প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে। তিনি বিগত সময়ে সরকারের নানা ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরার পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে তার একটি ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি আলোচনার আশা রেখে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কার্যক্রমও একদিন পিছিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সহজ বিষয়টিকে তালগোল পাকিয়ে দেয় টেলিফোন আর সংলাপ নাটক। প্রখমত একটি ডেড টেলিফোনে ফোন দিয়ে রিসিভ না করার কথা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারে মঞ্চস্থ হয় নাটকের প্রথম অঙ্ক। দুই নেত্রীর মধ্যে যখন কথা হলো জনগণ ভাবছিলো নাটকের আরো বাকি আছে। পরবর্তীকালে এই সংলাপ সরাসরি ফাঁস করে বেফাঁস অবস্থার মধ্যে পড়ে সরকারি দুধভাতে পালিত টেলিভিশন চ্যানেল ৭১ টিভি।

বস্তুত সবথেকে গুরুতর বিষয়টির এখনও ফয়সালা হয়নি। অন্যদিকে মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, মন্ত্রীরা ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন যা নজিরবিহীন ও হটকারী একটি সিদ্ধান্ত হলেও একটি পক্ষে তাদের অবস্থানে অনড়। কিন্তু তারা কিভাবে নিশ্চিত হলেন এতে করে সাংসদ ও মন্ত্রীরা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করবেন না? একজন মন্ত্রী যখন ‘মন্ত্রী’ থাকবেন, তিনি প্রটোকল পাবেন যখন তিনি নির্বাচনী এলাকায় যাবেন। তখন স্থানীয় প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকবে কীভাবে? মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চাকে ব্যাহত করবে তা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া গেলেও টালবাহানার শেষ নেই যা আরো প্রলম্বিত করছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের কালো মেঘ। মানুষ সহজেই বুঝে গেছে মন্ত্রীদের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার জন্যই মূলত এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যা অবাস্তব, অবৈধ ও গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসার সম্ভবনা থাকলেও সেখানকার সদস্যরা অজ্ঞাত কারণে এ বিষয়ে নীরব থেকেছেন। সঙ্গত কারণেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে ভ্রমণ করে প্রধানমন্ত্রীর এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করায় নিরপেক্ষতার বিষয়টি পুরোপুরি উবে গেছে। মানুষ সহজেই বুঝে গেছে তিনি যখন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকবেন, তখনও পুরো ‘প্রটোকল’ তিনি পাবেন এবং সরকারী খরচেই দুর্নিবারভাবে নির্বাচনী প্রচারণা অব্যাহত রাখবেন। এর মধ্য দিয়ে দিয়ে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যখন শবাগারে ঠিক তখনি কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার দায়িত্ব পালন করলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। তিনি হুমকি দিলেন সরকারি কর্মকর্তাদের ‘আপনারা যদি ঠিক মতো কাজ না করেন সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে’।\ এর মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের স্বপ্ন কতটা অসম্ভব এক দিবাস্বপ্ন সেটা নিশ্চিত হয়ে গেছে।

সবার আগে প্রশ্নবিদ্ধ সেই টেকসই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা। যেখানে মহাজোট সরকারের অন্যতম মিত্র জাতীয় পার্টি পর্যন্ত বলছে তারা একদলীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। সেখানে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন কীভাবে? ইতিহাস থেকে সবাই শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে কিন্তু আমরা বরাবরই চলি উল্টেরথে-উল্টোপথে। শেখ হাসিনা কিভাবে ভুলে গেলেন তিনিই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন দেশে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এখন কথায় কথায় যাদের বচসার বাণী বিক্রি করে তিনি ও তাঁর রাজসভাসদবর্গ মানুষের কৃপাদৃষ্টি লাভের চেষ্টা করেন সেই জামায়াতের সঙ্গেই একাত্ম হয়ে ১৯৯৫-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সেদিনের জানের জান পরাণের পরাণ বন্ধু জামায়াত আজ তাদের বড় শত্রু। বলা যায় ‘তখন আশা ছিলো, ভালোবাসা ছিলো, জামাত আওয়ামী লীগ একসাথেই মাঠে ছিলো। হায় !!আজ আশা নেই জামাতের প্রতি তাঁর ভালবাসা নেই, সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও নেই।

কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে খারিজ করার একটি প্রবণতা সবথেকে বেশি লক্ষ করা গেছে। কিন্তু ঐ সংবিধানের ক্ষেত্রেই তো একটি সুযোগ ছিল আরও দুই টার্ম এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার। কিন্তু কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই তিনি তা রাখেননি যা হচ্ছে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। তবুও তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেন ভালো কথা। কিন্তু এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠা তিনি বন্ধ করবেন কিভাবে ? খোদ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীসহ তাঁর অনান্য নেতাকর্মী যে ভাষায় কথা বলেন সেখানে জোয়ারের পানির মতো গণতন্ত্র উপচে পড়ে। সংবাদপত্রে পড়েছিলাম বনমন্ত্রী বলেছেন, বেগম জিয়া তালেবানদের নেতা!/ কিন্তু উনি বেমালুম ভুলে গেছেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত তিন-তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এ ধরনের বক্তব্য রাখা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বরখেলাপ। একই ঔদ্ধত্বপূর্ণ গীবতধর্মী বক্তব্য শোনা যায় মোহাম্মদ নাসিমের কন্ঠে। তিনি বলেন ‘খালেদা জিয়ার বুলেট তাড়া করে বেড়াচ্ছে শেখ হাসিনাকে’ তিনি পাশাপাশি আরো বলেন রোজ কেয়ামত হলেও দেশে নির্বাচন হবে যা এখন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উপহাসের জন্ম দিয়েছে জনমনে।
এই ধরণের নানা বাদানুবাদ আর কিছু না হোক বাংলাদেশের জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি পুরো দেশকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর নির্বাচন সম্পর্কিত জটিলতায় পুরো জাতি আর শাঁখের করাতের মধ্যে পড়েছে। মুক্তমত প্রকাশে বাধা দিতে দিতে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে আজ বাংলাদেশে কোন বিরোধী মত প্রকাশের মত মিডিয়ার অস্তিত্ব নাই। তাই সরকারের নানা আচরণে ক্রুদ্ধ পুরো দেশের নিরুপায় মানুষ তথাকথিত কিছু শুশীল ব্যক্তিবর্গের মাঝরাতের টকশো দেখাতেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন সরকার বিরোধী আকাংখা। হয়তো তখনকার দু’একটি বিরোধী কথাবার্তা শুনে কিছুটা মানসিক প্রশান্তি মেলে যেমনটি মিলেছে দুই নেত্রীর ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর। টকশো এলিট শ্রেণির মনের আকুতি প্রকাশ করতে পারে কিন্তু দেশের সকল শ্রেণি মতাদর্শের মানুষ নিজেদের আবিষ্কার করতে চান ভোটের রাজনীতিতে। তাদের হিসেবে এখানে দুটি প্রবল প্রতিপক্ষ হবে যাঁরা কিনা পরস্পর মোকাবিলা করবেন একটি সাম্যাবস্থান থেকে। কেউ যদি এখানে রাষ্ট্রযন্ত্রকে হাতের পুতুলের মতো ব্যবহার করার পরেও পুরোদস্তুর নিরপেক্ষ অবস্থান দাবি করে সেটা হসির খোরাক জোগানে, অন্য কিছু নয়। এদিক থেকে বিচার করলে বর্তমানে দেশের যে পতনোন্মুখ অবস্থায় তার দায় সিংহভাগই সরকারের উপর বর্তায়। দেশের গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষর আকাংখা এই সংকটের দ্রুত সমাধান ঘটুক। ধ্বংসযজ্ঞ আর হরাতালের রাজনীতির উপর মানুষ কখনোই আস্থা রাখেনি কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেলে গেলে মানুষের জন্য একটিমাত্র পথ খোলা থাকে তা হচ্ছে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে নেয়ার পর স্বাভাবিক নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে সরকার একদিকে যেমন দেশকে নিয়ে গেছে এক ক্রান্তিকালে, রাষ্ট্রযন্ত্রের জুলুম, নিপীড়ন, ধড়পাকড় আর গুমে বিরোধী দলেরও এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এই সংকট থেকে কবে কিভাবে মুক্তি মিলবে সেটা বর্তমানে জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা সরকার প্রধানই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখন অশান্তি থকে মুক্তি চায়, তারা মুক্ত স্বাধীনভাবে অন্তত দুবেলা দুমুঠো খেয়ে পরে বাঁচতে চায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s