গনতন্ত্রে অবিশ্বাসীদের চিনে রাখুন

গত কয়েকমাসে একটি জিনিষ চৈত্রের দুপুরের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশের কাছে। আওয়ামী লীগ জনগনের রায়কে ছিনতাই করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্যে বদ্ধপরিকর। এমন একটি দিন যায় নি যেদিন তাদের কোন না কোন একটি পদক্ষেপ পরিষ্কার ইংগিত দেয় নি যে তারা কি চায় এবং কি করতে যাচ্ছে। প্রতিদিন একটি একটি নাটবল্টু জোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত করছে স্মরনাতীতকালের সবচেয়ে নগ্ন ও লজ্জাহীন প্রকাশ্যে ভোট চুরির ষড়যন্ত্র। শুধুমাত্র আজকের পত্রিকা থেকে কয়েকটি নিউজ

“সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন (আরপিও) সংশোধন করে কোনো দলে যোগ দিয়েই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
বিএনপির নেতারা বলেছেন, বিএনএফ নামে নতুন দল দাঁড় করিয়ে বিএনপিকে ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে নতুন ষড়যন্ত্র হিসেবে আরপিও সংশোধন করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তিনজন নেতাও প্রথম আলোকে বলেছেন, বিএনপির বেশিসংখ্যক নেতা নির্বাচনে এলে তখন আর নির্বাচনকে একতরফা বলা যাবে না। বিভিন্ন আসনে বিএনপির নেতারা অন্য দল বা স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে ভোটের হারও বাড়বে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনুপস্থিতিতে নির্বাচন হবে এটা ধরে নিয়েই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য দেখাতে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।”                                                                                                      (প্রথম আলো ১/১১/২০১৩)

EC backtracks on roadmap

the EC will not send the draft of the amended electoral code of conduct to political parties for their opinion. Rather, the draft will be uploaded on the EC’s website seeking public opinion.
The commission is avoiding the dialogue sensing that it might get negative response from some political parties.                                                                                        (ডেইলী স্টার ১/১১/২০১৩)

এটি শুধু আজকের দিনে দুটি সংবাদ। গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন এরকম সংবাদ অজস্র বের হয়েছে যেখানে ধাপে ধাপে আওয়ামী সরকার কিভাবে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে পুরোপুরি তাদের বংশবদ ও আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছে সামনের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্যে। আর কমিশন নিজেই গত কয়েকমাসে এমন সব সংবাদের জন্ম দিয়েছে যে আজকে যেকোনো স্বাভাবিক বিবেচনার নাগরিক স্বীকার করবেন যে লজ্জাষ্কর সরকার অনুগামীতায় এই নির্বাচন কমিশন, ২০০৬ এর সেই আজিজ কমিশনকে ছাড়িয়ে না গেলেও কমপক্ষে একই পর্যায়ে তো গিয়েছে বটেই।

ভোট ডাকাতির জন্যে সরকারের এই ভূমিকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বাংলাদেশে ক্ষমতা এখন এতোটাই আরোধ্য হয়ে উঠেছে এবং রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রনের সকল রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এতোটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে ক্ষমতার জন্যে লড়াই সোজাসুজি ঠান্ডা ও উষ্ণ যুদ্ধের মাঝামাঝি একটি পর্যায়ে চলে গেছে। যুদ্ধরত যেকোন পক্ষের মতো প্রধান দলগুলি জানে যুদ্ধে বিজয়ই আসল কথা, বিজয় কেমন করে আসলো সেটা গৌন।

কিন্তু আশ্চর্য হবার কারন রয়েছে বছরের পর বছর যারা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় নিয়ে আক্ষেপ করে অজস্র শব্দ খরচ করে তাদের কিছু অংশের ভূমিকায়। আজকে আমাদের পরিচিত সামাজিক পরিমন্ডলের বেশ কিছু লোক, চোখের সামনে এই ভোট ডাকাতির আয়োজন চোখে দেখেও না দেখার ভান করছেন। তাদের অনেকেই এখন নির্বাচন ও গনরায় এর মূল ইস্যুকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়, লতা-পাতা-ফুল-ফল নিয়ে কথা বার্তায় ব্যস্ত রয়েছেন। এদের অনেকেই মিন মিন করে আড়ালে আবডালে বলে যে নিরপেক্ষ ও ন্যায্য নির্বাচনের জন্যে তাদের সমর্থন রয়েছে তবে কোন এক গোপন লজ্জার কারনে সেই সমর্থন তারা প্রকাশ্য বলতে অক্ষম। এদের মধ্যে আরো লজ্জাহীনেরা আলোচনা করছেন ন্যায়-অন্যায় প্রসংগ সম্পূর্ন বাদ দিয়ে, ক্ষমতার লড়াই এ কে কখন এগিয়ে যাচ্ছে এই হর্সরেস বিশ্লেষনে। পুরো ব্যাপারটি এমন যে ঢাকঢোল পিটিয়ে একদল ডাকাত যাচ্ছে সারিবেধে জনপদে ডাকাতির জন্যে আর একদল লোক রাস্তার পাশে দাড়িয়ে সেই শোভাযাত্রা দেখছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আনন্দ-উত্তেজনার আশায় হাততালিও দিচ্ছে।

অবশ্যই প্রশ্ন করা যেতে পারে যে বিএনপি কি ২০০৬ সালে একই রকম ইলেকশন চুরির চেষ্টা করে নি? বিএনপি অবশ্যই প্রেসিডেন্ট ইয়াজুদ্দীনের মাধ্যমে ইলেকশন ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করেছিলো। এর অবশ্যাম্ভী প্রতিক্রিয়ার ১/১১ এসেছিলো। সেই সময়ে যে সব সমর্থক বিএনপি’র সেই নগ্ন প্রচেষ্টাকে নীরবে অথবা প্রকাশ্য সমর্থন করেছিলো তারাও চিন্হিত হয়েছিলো গনতন্ত্রের শত্রু হিসেবে। তবে কথা হলো আমি ব্যাক্তিগতভাবে নাগরিকসমাজে খুব কম বিএনপি সমর্থক দেখেছি যারা সেই গনতন্ত্র-বিরোধী পদক্ষেপগুলিকে সমর্থন করেছিলো। তারাও বিএনপি’র অপকর্মে ছিলো লজ্জিত। বিএনপি ২০০৬ সালে ও তার পরবর্তীতে মধ্যমপন্থী নাগরিক সমাজে বিপুল জনসমর্থন হারিয়েছিলো যার ফলাফল দেখা যায় ২০০৮ এর নির্বাচনে।

কিন্তু আমরা দেখছি যে আওয়ামী লীগে মধ্যমপন্থী সমর্থক এর একান্ত অভাব ভদ্রসমাজে। এরা নিজদলের অন্যায়কে অন্যায় স্বীকার করতে তীব্র মানসিক বাধার মধ্যে পড়েন। এটি এইকথাকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে আওয়ামী লীগে সমর্থক নেই, অনুসারী আছে। এই অনুসারীদের পক্ষে নিজ দলের বিরুদ্ধে যেয়ে গনতন্ত্র ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়া সম্ভব নয়।

পাচ-ছয় বছরের আগের দুনিয়া থেকে আজকের দুনিয়া অনেক পাল্টে গেছে। ছোট বড়ো অনেক পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন সম্ভবত সোশ্যাল মিডিয়া। কয়েক বছর আগেও মানুষের চিন্তা চেতনার পরিধি সীমাবদ্ধ থাকতো আশে পাশের পরিচিত জনদের মধ্যে এবং মিডিয়া পরিবেশিত স্যাংশনকৃত মতমতের মধ্যে। কিন্তু আজকে সমর্থবান সবাই কয়েক ক্লিকের মধ্যেই দুনিয়ার সবধরনের মতামত ও চিন্তার পরিচয় পাচ্ছে এবং ভার্চুয়াল জগৎ এর মাধ্যমে বিশাল ও ডাইভার্স সামাজিক পরিমন্ডলে প্রবেশ করছে। এই সবরকমের তথ্য ও মতামতের সুযোগ নিয়েও যদি কেউ স্পষ্ট কোন ন্যায়ের পক্ষে না থাকে তবে তাকে কোনভাবেই ন্যায়ানুগ বলা যাবে না।

একবার স্বেচ্ছায় নিবিড়িত শারীরিক মিলনের পরে কেউ যেমন নিজেকে আর কুমার/কুমারী দাবী করতে পারে না, তেমনি এভাবে প্রকাশ্য জনগনের ভোটাধিকার ডাকাতি করাকে নীরব সম্মতি দেবার পরে কেউ আর কোনদিন নিজেকে গনতন্ত্রী বলে দাবী করতে পারে না। আজকে কারা কারা গনতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তাদের চিনে রাখুন। ভবিষৎ এ কাজে দিবে। কে কোন অবস্থান থেকে আদর্শের কথা বলে এটি অন্তত মনে থাকবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s