উগ্র ধর্মপন্থার মোকাবেলায় কাকে বেশি প্রয়োজন?

এই লেখাটি পড়ার সময় মনে রাখতে হবে যে এখানে আমি একটি মাত্র প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছি – সেটা হোলো উগ্র ধর্মপন্থার মোকাবেলার প্রশ্ন। এখানে দূর্নীতি, মানবাধিকার, অর্থনীতি এসকল প্রশ্ন Ceteris Paribas  অর্থাৎ অন্য সকল ইস্যুকে ধ্রুব ধরে কথা বলা হচ্ছে। উগ্র ধর্মপন্থিদের মোকাবেলার জন্য দুটি জিনিস দরকার: এক, এর কারণসমূহ দূর করা এবং দুই, যদি উগ্রপন্থা কেউ অবলম্বন করেই ফেলে তবে তাকে নিরস্ত করা। আমি এই দুটি দিক থেকে আলোচনাটা করতে চাই।


উগ্রপন্থার কারণসমূহ দূর করতে কে বেশি পারঙ্গম?


গত দশ বছরের খতিয়ান বলছে যে আওয়ামি লীগের নেতৃত্বের মহাজোট সরকার উগ্রপন্থিদের বেড়ে ওঠার কারণ দূর করার চেয়ে বরং সেই কারণগুলোকে উস্কে দেয়ার সূতিকাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাহবাগ আন্দোলনের মূল দাবী আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ছিলো নাকি লার্জ স্কেলে ধর্মের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ছিলো সেটা নিয়ে ইসলামপন্থিদের প্রথম থেকেই ঘোর সন্দেহ ছিলো। এই সন্দেহ নিরসনে খোদ শাহবাগী মঞ্চ এবং তাদের প্রকাশ্য সমর্থন দানকারী মহাজোট সরকার কোনও ভূমিকা রাখতে পারেনি, বরঞ্চ এই সন্দেহে আরও ইন্ধন ঢেলেছে তারা। প্রধানমন্ত্রীর সংসদে দাঁড়িয়ে রাজিব ওরফে থাবাবাবাকে “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ” ঘোষণা দেয়ার ব্যাপারটি ধর্মভীরু অধিকাংশ মানুষ যে পছন্দ করেননি সেটি ক্রমান্বয়েই আরও পরিষ্কার। ৬ মে-তে ঠিক কতজন মানুষ মারা গেছেন সে ব্যাপারে কুয়াশা যত ঘনীভূতই থাকুক, সে রাতে যে সরকার একটি মিলিটারি অনস্লট চালিয়েছিলো সেটি দেশের বেশিরভাগ ধর্মপ্রাণ মানুষই বিশ্বাস করে। সরকারের সেদিনের ভূমিকা – কিছু মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া থেকে মিলিটারি ক্র্যাক ডাউন – এটিকে সমর্থন করেছে কেবল সরকার নিজে এবং ঐ শাহবাগী মঞ্চ। যা পুনরায় প্রমাণ করে যে এ দুটি সিস্টার কনসার্নের ইসলামপন্থিদের প্রতি অ্যালার্জি অসত্য নয়। এর সাথে যোগ করুন অসংখ্য ঘটনা যা সুশীল সমাজের চোখ প্রায়শয়ই এড়িয়ে গেলেও ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ক্রমাগত আহত করেছে। সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ উঠিয়ে দেয়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম সম্মেলনে অ্যামেরিকান ব্যালে ড্যান্সের আসর বসানো, বিভিন্ন স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধর্মীয় পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হওয়া এবং সরকার ও সরকার সমর্থনকারী সুশীল সমাজের এ ব্যাপারে নিরবতা, প্রধানমন্ত্রী তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়ের উস্কানিমূলক কথা মাদ্রসাগুলোর বিরুদ্ধে – এসব কিছুই ধীরে ধীরে একটি পার্সেপশন তৈরি করেছে দেশের অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে যে এই মহাজোট সরকারের একটি অ্যান্টি-ইসলামিক অ্যাজেন্ডাম রয়েছে। সেটা কতটা ভুল বা সত্য সেটা বিচারের ভার আমি পাঠকের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু এই পার্সেপশন যে এখন তুঙ্গে সেটা নির্বোধ ছাড়া কেউ অস্বীকার করবে না। এটা একটা পপ্যুলার জনমত যে বিএনপি জামাত সমর্থিত ১৮ দল যে সিটি নির্বাচনে নিরংকুশ প্রাধান্য নিয়ে জয়লাভ করল এবং এখন পর্যন্ত যে কোনও জরিপে তাদের এগিয়ে আছে – এসকলের পেছনে এই “ইসলাম প্রশ্নের” যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

অপরদিকে বিএনপি জামাত জোটের ইসলাম বান্ধব একটি ইমেজ রয়েছে যেটা এই লেখকের মতে অনস্বীকার্য। এটি কেবল এই জন্য না যে এই জোটে একাধিক ইসলামপন্থি দল রয়েছে, এটি একারণেও যে গত কয়েক বছরের পলেমিক্সে ১৮ দলের প্রত্যেকেই তাদের ধর্মীয় কমিটমেন্ট এবং ধর্মীয় (আপনি ইসলাম পড়তে পারেন) অনুভূতির প্রতি জোর সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ১৮ দলের পক্ষে যে বুদ্ধিজীবীরা কথা বলেছেন তাদের বেশিরভাগেরও ধর্মীয় অনুভূতির সাথে একাত্মতা পোষণ বা অন্তত তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ছিলো লক্ষ্যণীয়।

এটি অস্বীকার করা আমার মতে বোকামি হবে যে ইসলাম এদেশের রাজনীতিতে একটি বিরাট প্রশ্ন। এই দেশের রাজনীতিতে ইসলাম নিয়ে আপনার অবস্থান কোথায় এই প্রশ্ন ১৯৭১ নিয়ে আপনার অবস্থান কোথায় তার চেয়ে ছোট নয়। আমার বিশ্বাস একটি ভালো জরিপ চালালে দেখা যাবে ইসলাম প্রশ্ন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে এই মতের বিরোধিতা করেন এই বলে যে যদি তাই হতো তাহলে জামাতের সমর্থন এত কম কেন? আমার তরফ থেকে এর ধর্মীয় উত্তরটি হোলো যে জামাতের সমর্থন এদেশে খোদ ইসলামপন্থিদের মাঝেই নির্দিষ্ট। দেশের বিপুল সংখ্যক কওমী মাদ্রাসার ওপর বেস করে যে দেওবন্দি স্কুল অফ থ্যটটি রয়েছে, তারা ঐতিহাসিক ভাবে জামাতের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে না (যদিও হেফাজতের ঘটনাটি সম্ভবত কিছু আইস ব্রেকিঙের কাজ করেছে)। ইসলাম প্রশ্নের এই বিশালতা মাথায় রেখে আমার বিশ্বাস বিএনপি সমর্থিত ১৮ দলের ক্ষমতায় আসাটা ধর্মপ্রাণ মানুষদের জন্য বেশি আস্থাদায়ক। এই আস্থা উগ্রতা দমনে অনেক বেশি সক্ষম বলেই আমার মনে হয়। তবে একটি ব্যাপারে ১৮ দলকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে – সেটি হোলো তাদের ক্ষমতায় আসা যেন সংখ্যালঘু অত্যচারের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

ধর্মীয় উগ্রপন্থা দেখা দিলে সেটি দমনে কে বেশি সক্ষম

দুটি ঘটনা এখানে ব্যাপারটিকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। গত চার দলীয় বিএনপি সমর্থিত সরকার কর্তৃক জেএমবি দমন এবং এবারের মহাজোট সরকারের হেফাজত দমন।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে থাকবে বিএনপি সরকারের গত আমলে জেএমবির দৌরাত্ম্য এবং বাংলা ভাইয়ের উত্থান। প্রথমে গত সরকার এই সমস্যাটি সমাধানে অসমর্থ হয়েছিলো (একজন মন্ত্রী তো বাংলা ভাইয়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন)। কিন্তু পরবর্তীতে তারা বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানসহ উগ্রপন্থিদের মূল হোতাদের পাকড়াও করে। আমাদের যে ব্যাপারটি খেয়াল রাখতে হবে সেটি হোলো র‍্যাডিকেল ইসলামিজ্‌মের এই হোতাদের পাকড়াও করার জন্য গত সরকার প্রশংসিত যেমন হয়েছিলো একই ভাবে তাদের ইসলাম বান্ধব ইমেজও কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কারণ এই ধরণের উগ্রপন্থার সাথে দেশের আপামর ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের সাধারণ অর্থে একাত্মতা ছিলো না – যার ফলে তাদের উগ্র তৎপরতাকে ধর্মপ্রাণ মানুষরাও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

অপরদিকে আওয়ামি সরকার হেফাজতের ওপর ৬ তারিখে যে অনস্লট চালিয়েছে তা কেবল সরকার সমর্থিত মহলই সমর্থন করেছে। দেশের আপামত জনসাধারণ মোটেই একে ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে আওয়ামি অ্যাকশন মনে করেনি, বরং বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম ইসলামি চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আওয়ামি জিহাদ হিসেবেই দেখেছে। আপনারা দেখেছেন যে ৯৪ বছর বয়সী আল্লামা শফী যাকে এধরণের রাজনীতির ময়দানে তার ৯৪তম বছরের আগে কথা বলতে দেখা যায়নি তিনিও কদিন আগেই হুমকি দিয়েছেন যে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হলে তিনি সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেবেন।

অর্থাৎ, গত বিএনপি সরকার যেখানে একটি বিক্ষিপ্ত জননিন্দিত র‍্যাডিক্‌ল ইসলামিস্ট মুভমেন্টকে উৎখাত করেও তার ইসলাম বান্ধব ইমেজ ধরে রেখেছে, সেখানে বর্তমান আওয়ামি সরকার মেইনস্ট্রিম ইসলামিক চিন্তাকেই র‍্যাডিক্‌ল স্রোতে প্রবাহিত করে দিয়েছে। অন্য ভাষায় বলতে গেলে যে দেশে ইসলাম প্রশ্ন বা ধর্ম প্রশ্ন একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সেখানে আওয়ামী জোট সরকারে থাকার প্রধান সমস্যাই হচ্ছে তারা নিজেরাই র‍্যাডিক্যালিস্‌ম উসকে দিচ্ছে। ফলে তারা যে দাবীটি প্রায়ই করে থাকে যে তারা সরকারে না থাকলে ইসলামিক র‍্যাডিক্যালিস্‌ম দেখা দেবে সেটা আমার মতে মোটেই সত্য নয়। বরং তাদের থাকাটাই ইসলামিক র‍্যাডিক্যালিস্‌মের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার প্রধান উপকরণ। পাঠক এই মতের সাথে একমত নাও হতে পারেন। আপনাকে একটি সহজ হোমটাস্ক দিতে পারি আমি। দেশে রাস্তায় নেমে যত ইসলামপ্রাণ মানুষ পান তাদের ওপর একটা জরিপ চালিয়ে দেখতে পারেন আওয়ামি সরকারের ব্যাপারে “ইসলাম প্রশ্নে” তাদের কী মত।

 

পরিশেষে আমি ভালো করেই জানি যে নির্বাচনে ইসলাম প্রশ্ন একটি বড় প্রশ্ন হলেও এটি একমাত্র প্রশ্ন নয়। আমি সেগুলোকে Ceteris Paribas ধরে এই লেখাটি লিখেছি। সেসব প্রশ্নকে সামনে আনলে আল্টিমেটলি ভোট কার পাতে উঠবে সেটা যাচাই করার ভার আমি অন্যান্য গবেষকদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু যদি “ইসলাম প্রশ্ন” একমাত্র প্রশ্ন হতো তাহলে বিএনপি-জামাত সরকার বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে বলেই আমার ধারণা। কারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের উগ্রতার দিকে না ঠেলে দিতে এবং বিচ্ছিন্ন উগ্রতা দমনে এই জোটের ভূমিকা ও ক্ষমতা মহাজোটের চেয়ে বেশি। ইতিহাস যদি এটি এখনও নাও বলে থাকে, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স তাই বলছে।

2 thoughts on “উগ্র ধর্মপন্থার মোকাবেলায় কাকে বেশি প্রয়োজন?

  1. it seems bnp/jamaat would be a better proponent for the “war on terror” project of imperialism, at least according to your statement, aint it? Why don’t you question the process of trial of Bangla vai and Shayakh Abdur Rahman? Were they given the best chances or equal chances or is it ok what your masters from the north gave to saddam/laden? shame!

  2. উগ্রপন্থীদেরকে দমন করতে হয় না, সংশোধন করতে হয়
    আর আওয়ামী লীগ, বিএনপি এদেরকে দমন করতে হয়

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s