আমাদের মতি মিয়া ও এক আজাইর‍্যা মন্ত্রির গল্প – By Almaruf

আমাদের মতি মিয়া ও এক আজাইর‍্যা মন্ত্রির গল্প
By – Almaruf

(১)
সুনামগন্জ জেলা সদর থেকে তাহিরপুর সড়ক ধরে ঘন্টাখানেক চললে হাতের ডানপাশে বিলের বুক চিরে কাচা রাস্তা – সেই রাস্তা ধরে আরো ঘন্টা দুয়েক চলার পর পড়বে বিখ্যাত এক গ্রাম – চোরের গ্রাম । সেই গ্রামের অধিকাংশ লোক বংশানুক্রমে চৌর্যবৃত্তির সাথে জড়িত – কাজটাকে তারা পবিত্র এক শিল্পকর্মের পর্যায়ে নিয়ে গেছে । অধিকাংশ লোক পৈত্রিক এই পেশা নিয়ে রিতিমতো গর্বিত। আর হবেইনাবা কেন- এই পেশায় তাদের মতো সুনাম এই জেলায় কেউ দেখাতে পেরেছে ?

ভাটি এলাকার আর পাচটা আজপাড়াগায়ের মত চোরের গ্রামেও বর্ষায় রিতিমতো নিদানের সময় । ভাটির দেশে অভাব কাকে বলে সেটা শহুরে মানুষকে বলে বুঝানো রিতিমতো অসম্ভব ব্যপার, কিন্তু চোরের গ্রামের লোক সেই ঘোর নিদানের দিনেও নিজেদের গ্রামে কখনও চুরি করবেনা – এ এক অলিখিত নিয়ম । কেউ করলে তাকে জুতোপেটা করিয়ে গ্রাম ছাড়া করা হয় । চোরের গ্রামের লোক এই একটা ব্যপারে বড়ই কড়া – নিদারুণ অভাবের তাড়নায় যদিও প্রতিবছরই এরকম ঘটনা দুই একটা ঘটে, কিন্তু ক্ষমা তাদের কখনই মেলেনা ।

আশপাশের গ্রামের মুটোমুটি অবস্থাসম্পন্ন গেরস্তেরা বাড়ির উপরের দিকে পাকা করুক না করুক ভিটে থেকে নিচের দিকে শক্ত গাথুনির দেয়াল দেয় । তাও সবসময় যে রক্ষা মিলে তা না, চোরের গ্রামের চোরেদের সাথে স্বগ্রামের চোরদের উৎপাতে মাঝে মাঝে অনেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসতেও বাধ্য হয় । চোরের গ্রামের মেয়েদের বাইরের কোন ভদ্রলোকের সন্তান বিয়েও করেনা – তাতে নাকি জাত যায় । চোরের বংশের মেয়েরা নাইওর যাবার বেলায় বাড়ি থেকে হাড়ি-পাতিল ঘটি বাটিসহ নানান জিনিস পত্র হাওয়া করে নিয়ে যায় । এরপর আছে ছেলেমেয়ের চিন্তা – এরাও যদি মায়ের সেই দোষ পায় তাহলে সমাজে মুখ রক্ষা হবে ? তাই বলে সবাই যে সারাজীবন চুরি করে যায় তাও ঠিক না – অনেকে পড়ালেখা করে বাপ-দাদার মুখে চুনকালি মেখে দিয়ে শহরে চলে যায় । অনেকে ভাগ্যের অন্বেষনে পাড়ি জমায় বিদেশে ।

দাওয়ায় বসে বসে মতি মিয়া তাই ভাবে – তারও এক ছেলে ছিলো, জেলা সদরে এক হুজুরের বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে কিভাবে যেন ধরা পড়ে যায়। মতি বড়ই শরমিন্দা হইছিলো সেইদিন। চোর গ্রামের সেরা চোর মতি মিয়ার ছেলে কাজে গিয়া প্রথম দিনই ধরা খায়? এইটা বড়ই বেইজ্জতইর ব্যপার। আবার সেই হুজুরে আবার কিনা তার ছেলেরে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেয় – সেইটা যে কেমনে ঘটলো মতি আজও বুঝতে পারেনা । এরপর ছেলেয় আর কোনদিন বুড়া বাপের দিকে ফিরেও তাকায় নাই । মতি মিয়া মনে মনে “হারামির পুলা” গালি দিতে দিতে তেল মাখায় মন দেয় । আজকে লষ্করপুরে একখান ক্ষেপ আছে। বেইল হয়া গেছে মেলা – আর দেরি করা যাইতো না ।

(২)

“কাজে” যাওয়ার সময় মতি সুবল সেনের বাড়ির সামনে থমকে দাড়ায় । চোরের গ্রামের নামিদামি চোর সুবল সেন । গেলোবার ইলেকশানে তার মেয়ের জামাই নাকি মিনিষ্টার হয়েছিলো , কিন্তু তখন কিছু শোনা যায় নাই, সুবল সেন জিনিষটা সভাব বসত চেপে যায় । নাইলে কি আর মানুষের ভিড় সামাল দেওয়া যেতো ?

গেল মাসে সুবল সেনের সেই জামাই নাকি টাকার বস্তাসহ ধরা খেয়ে যায়- সেই থেকে সুবল সেন আর তার জামাইর বড় নামডাক চোরের গ্রামে । প্রতিদিন গ্রামের অকর্ম মুরব্বিরা সুবল সেনের উঠানে বসে দিনের বেলা আড্ডা জমায় । সুবল সেনের নাতি নাত্নি তাদের চা-পান হুক্কা-তামুক এগিয়ে দেয় । সুবল ঘরের ভেতর বসে বসে বিড়ি টানে – বেশি একটা দাওয়ায় আসেনা – ইদানিং সে তার সদ্য পাওয়া ইজ্জতের ব্যাপারে খুবই সচেতন। এই জামাই যখন ছোটখাটো চুরি করতো তখন তো তারে সবাই অনেক কথা শুনাইছে । “কি সুবল তোমার জামাই হুনি টাউনে পকেট মারে, এইটা তুমি কি করলা!” এহন বুঝ শুমুন্দির পুলারা ।

জামাই গর্বে সুবলের ছাতি এখন অনেকখানি উচু। সবার কথার উত্তর দেয়না – তিন কথা জিগ্গ্যেস করলে এক কথা কয়। গ্রামের লোকেরাও মেনে নেয়। যতই হোক এই সম্মান সুবলের পাওনা, থানার কনষ্টেবল পর্যন্ত এখন বাজারে সুবলের সাথে বসে চা খায় । চোরের গ্রামের জন্য এইটাও কি কম পাওনা।

মতি মিয়া ভাবে – খইসলত যায়না ধুলে আর ইজ্জত যায়না মলে। এত্তোবড় মেনেষ্টারের শশুর হইয়াও গেলো হাপ্তায় রমেশেরে নিয়া জামতলিতে চুরি করতে গিয়া খাইলো ধরা। আচানক কারবার, পরের দিনই আবার পুলিশের হাত থেকে ছাড়াও পায়া যায়, সাথের রমেশ আইজ পর্যন্ত থানায় আটক । মতি মিয়া বুঝতে পারে এখন – জামাই মেনেষ্টার হলি কতো লাভ । কিন্তুক সুবল কি কয়া সয়া রমেশেরে ছাড়ায়া নিয়া আসতি পারতোনা ? ষাটোর্ধ মতি মিয়া বিড়বিড় কইরা কারে যানি গালি দেয়- বোঝা যায়না ।

(৩)

ইদানিং চোরের গ্রামের মেয়েদেরও বিয়ের বাজারে ভাও বাড়ছে – অনেক বড় বড় ঘরের লোকেরা চোরের গ্রামে আত্মিয়তা করতে আসতেছে । রিতিমতো ডাকে তোলে মেয়ে বিয়ে দিচ্ছে চোর বংশের লোকেরা । চোরের গ্রামের ইজ্জত তরতর করে বাড়ে । মতি বুঝতে পারে – সবই সুবল সেনের জামাইয়ের কল্যাণে । হবিনা কেন, যেই চোরের গ্রামের মাইয়্যাগুলা বছরের পর বছর আবিয়াত্তা বইসা থাকতো ঘরে – তাগো মধ্যে সুবলের ঘরেই যে এরকম একটা মাইয়া ছিলো কে জানতো । সুবলের কপাল দেইখ্যা মতি মিয়ার হিংসা হয় – বিড়বিড় কইরা এবার মেনেষ্টারেরে গালি দেয় , সেইতো মেনেষ্টার হলি – দশটা বছর আগে হলি তো আমার ময়নার একখান জব্বর সম্মুন্ধ করতাম । আহারে মাইয়াটারে আমার মাইর‍্যাই ফালাইলো । ময়নার লাশটাও পর্যন্ত জামাই শাশুরি গুম কইরা দিছিলো । বয়সের ভারে কুজো মতি মিয়া সুবলের দাওয়ায় বসে ।

জামাই থাকেন ঢাকায় – তিনি তো আর তাদের মতো ছোটলোক না, গ্রাম গন্জের বাতাস তার শরিরের জন্য নাকি ভালো না। তার খবর সব পাওয়া যায় কালু শেখের কাছে । এই গ্রামে কালু শেখ একমাত্র শিক্ষিত লোক- পাচ কেলাস পাশ । বাজার দিনে কালু শেখ পোষ্টাপিশের বেন্চে বসে পেপার পড়ে । সবাই তারে খুবই মান্যগণ্য করে এই জন্য ।

কালু শেখে বলে যায় – জামাই নাকি ম্যানেজার রাখছে, বস্তা ভইরা লোকে টেকা দিয়া যায় – হিসাব রাখতি হয়না ? কালু শেখের সাথে সবাই মাথা ঝাকায়, তাতো ঠিকই, মেনেষ্টারি কি সোজা কথা নাকি? বড়ই মুশকিল কাম।

সাও পেয়ে কালুর গলা উচু হয় । হেনতেন কথা না মিয়া, জামাইর ফটো দেখছি পেপারে। পেতাকা লাগাইন্যা গাড়ি নিয়া জামাই পেরেধানমন্তির সাথে দেহা করতি যায় । কি জানি বড় একখান দাও মারছে জামাই, তাইনরে নাকি মেডেল দিছে সরকার । হেনতেন কতা না বুঝলা, হেনতেন কতা না । কালুর সাথে সাথে বাকি সবাই জামাইর কর্মতৎপরতায় অতিব সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়ে।

পেছন থাইক্যা জমির পাগলা জিগায় – পেরেধানমন্তি কি গো কালু মিয়া ? কালু খুব বিরক্ত হয়া জমিরের দিকে চায় – তুই হেইডা দিয়া কি করবিরে হারামির পুলা ? তোর কি হেই শিক্ষা আছে নি ? সবাই গোগ্রাসে কালু শেখের কথা শুনছিলো – আচানক বাধায় অত্যান্ত বিরক্ত হয় ।

কালু শেখ খুব ভাব নিয়া লুন্গির খুট থকে বিড়ি বের করে সময় নিয়া ধরায়, সে বুঝতে পারে সবাই তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এই সভার কেন্দ্রবিন্দুটা এখন সেই – সময়টা সে খুব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে । বিড়িতে একটা সুখ টান দিয়া আস্তে আস্তে আবার কথা শুরু করে ।

সব কামেই উস্তাদ লাগে মিয়ারা – বিদ্যা বড় ধন – উস্তাদ ছাড়া কি আর কাম শেখন যায় ? আমাগো জামাইর উস্তাদ হইলনে গিয়া এই পেরেধানমন্তি । উনি আবার জামাইরে খুবই পেয়ার করেন, কাইলকা দেখলাম উনারে নাকি উস্তাদে আজাইর‍্যা মনতিরি বানাইছে, কোন কাম না, খালি এসুর নিচে বয়া বয়া পেরেধানমন্তির হিসাব নিকাষ করার কাম, হেই এসু নাকি কারেন্টে চলে, খালি ঠান্ডা বাতাস দেয় । বড়ই আরামের কামরে মিয়ারা – বড়ই আরামের কাম ।

এসুর বাতাস খাইতে কিরম লাগবে চিন্তা করতে করতে নিঃস্ব মতি মিয়া দিবাস্বপ্ন দেখে – ছেলে তার পেরেধানমনতিরির গদ্দির উরপে বইসা বইসা পয়সা গুনে – একশ টাহার একটা বান্ডিল দেহায়া কয়, নেও বাজান, আইজকা বাজার থন গোস্ত আনবা আর মায়েরে কইয়ো টাহাগুলা যেন সামলাই রাহে । আমি নিমতলি যাই – ইলেকশনের টাইম- ইসপিশাল একখান কাম আছে । মতি মিয়া বড় খুশি হয়, ছেলে তার অনেক বড় কামলা হইছে। মেনেষ্টার মানে কি না বুঝলেও বুঝতে পারে হেই কামের লগে তার বাপ দাদার কামের মিল আছে, আশা করে তার ছেলেও মেনেষ্টার হবে । স্বপ্নে ছেলের মুখটা বড় সুন্দর লাগে, খালি চুউখ দুইটা তার বাপের লাহান। চোর বংশের নাকি চউক্কে পরিচয় ।

হটাৎ কালু শেখের জোর গলায় তার দিবাস্বপ্ন ভাংগে । আড়মোড়া ভেংগে মতি মিয়া উঠে দাড়ায় – মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করে। আমার পোলাটারে অনেক বড় মেনেষ্টার কইরা দে আল্লা, পোলায় যেন বাপ দাদার কামটার ইজ্জত রাখতি পারে।

>> পুনশ্চঃ  গল্পের পটভুমি নিতান্তই কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে মিল পাওয়া গেলে তার দ্বায়-দ্বায়িত্ব লেখকের নয়। সুনামগন্জ বা তাহিরপুর এলাকায় এইরকম কোন গ্রামের সন্ধানও লেখকের জানা নাই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s