নিশা দেসাইকে নিয়ে হাই-ভোল্টেজ রাজনীতি

আগের লেখায় বলেছি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সকল পক্ষের ব্যর্থ রাজনীতির খেসারত হিসেবে দেশের নীতি নির্ধারণ এখন আর নাগরিকদের হাতে নেই। এমন প্রেক্ষেপটে, নিশা দেসাই ভিসাল নামের ভারতীয় বংশদ্ভুত আমেরিকান উপ-পররাস্ট্রমন্ত্রী ৩ দিনের সফরে এখন বাংলাদেশে। খুব সম্ভবত একতরফা নির্বাচন হওয়া কিংবা না হওয়ার আগে এটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিদেশী কূটনৈতিকের বাংলাদেশ সফর।

নিশা দেসাই আসার আগে থেকেই দেশি বিদেশী খেলোয়াড়রা হাই-ভোল্টেজ খেলা শুরু করেছেন। ভারত তার ভু-রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে নিশা দেসাই বাংলাদেশের মাটিতে পা দেবার আগেই, জাপানে বসে তার সাথে বাংলাদেশ বিষয়ক কথা বার্তা চালিয়েছে। ভারতের হয়তো আশংকা ছিল নিশা দেসাই বাংলাদেশে পৌঁছে কি শুনতে কি শুনবেন। তার চাইতে আগে ভাগেই তাঁর কানে বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ঢুকিয়ে দেয়া গেলে মন্দ হবে না।

বিএনপি নিশা দেসাই আসার আগে থেকেই আলোচনার আলাপ শুরু করেছে, তাও আবার নিজে থেকেই। মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর ফোন করেছেন তার কাউন্টারপারট সৈয়দ আশরাফ সাহেবকে। মুখ না-দেখা-দেখির দেশীয় রাজনীতিতে এমন ম্যাজিকাল মুহূর্ত নতুন কোন হাই-ভল্টেজ বিদেশী মেহামান না আসলে আবার দেখা যাবে না।

নিশা দেসাই যখন দেশে থাকবেন, ঠিক তখন তারেক রহমানের একটি তুচ্ছ মামলার রায়ের দিন ধার্য করেছে আওয়ামী লীগ। গত ৫ বছরে যেই মামলার কোন রায় হলো না, সরকারের মেয়াদ পার হয়ে যাবার পরে, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী মেহামানের উপস্থিতিতে, সেই মামলার রায় দেয়ার আইডিয়াটা ছেলেমানুষি মনে হতে পারে যেকোন বিদেশী কূটনীতিকের কাছে। তাছাড়া জামাতে ইসলামি ও আইসিটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তর্ক-বিতর্কের বদৌলতে বিদেশীরা কিছুটা হলেও ধারণা পেয়ে গেছে বাংলাদেশের কোর্ট কাচারিতে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পর্কে। একারণে নিশা দেসাইয়ের ঢাকায় থাকাকালীন অবস্থায় তারেক রহমানের রায় ঘোষণাকে বলা যেতে পারে হাই-ভোল্টেজ রাজনীতির হাই-স্টেক গ্যাম্বলিং।

এক্ষেত্রে আরও মনে রাখা দরকার, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২৮ হাজার কোটি টাকা চুরির অভিযোগ করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে। সেই কথা দেশে বিদেশে যেয়েও উনি বলেছিলেন–আমেরিকা সহ। তাই বুঝে হোক কিংবা না বুঝে হোক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমেরিকান উপ-পররাস্ট্রমন্ত্রীকে সচোক্ষে দেখানোর ব্যাবস্থা করে দিলেন যে তারেক রহমানের সেই ২৮ হাজার কোটি টাকা চুরির অভিযোগ এখন সময়ের বিবর্তনে “একজনের ক্রেডিট কার্ড আরেক জন ঘষার” মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে। তাও আবার এমন মামলা যার রায় ঘোষিত হয় এমন একটি সময়ে, যখন সারা পৃথিবী থেকে আলোচনা এবং আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দেয়া হচ্ছে বিবাদমান সরকার ও বিরোধী পক্ষকে। তুচ্ছ মামলার রায় আর যাই হোক, সরকার কর্তৃক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির মনোভাব প্রকাশ করবে না।

আগামী ২০ তারিখে আমেরিকান কংগ্রেসে একটা হিয়ারিং হবে বাংলাদেশ বিষয়ে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গ। হিয়ারিং এর ৩ জন পারটিসিপেন্টের মধ্যে একজন হচ্ছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াটচ এর জন সিফটোন। এই ব্যাক্তি ও তার সংগঠনের বিরুদ্ধে শাহাবাগি তরুন প্রজন্মের তরুণী আইনজীবী তুরিন আফরোজের নেতৃত্বে মাত্র কিছুদিন আগে বাংলাদেশের কোর্টে একটি হাস্যকর মামলা করা হয়েছিল, যা খুব সম্ভবত এখনও বিচারাধীন। এই জন সিফটোন লোকটি নিতান্ত মহা মানব না হলে, কংগ্রেস হিয়ারিং গিয়ে কি কি বলতে পারেন, তা বুঝতে খুব বেশি প্যাকেট বিরিয়ানির অপচয় করতে হবে না।

বাংলাদেশ বিষয়ে আমেরিকান ফাইনাল নীতিনির্ধারণ করবেন কয়েকটি সংস্থার লোকেরা একে অপরের সাথে আলোচনা করে। এই সংস্থাগুলো হলো আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট, হোয়াইট হাউসের এশিয়া বিষয়ক উপদেষ্টা, কংগ্রেস-সিনেটের দক্ষিন এশিয়া বিষয়ক সাব-কমিটি, সিআইএ, এবং পেন্টাগনের দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড। একারণে নিশ্চিত থাকতে পারেন, নিশা দেসাই কোন বিষয়েই কোন ফাইনাল কথা বলে যাবেন না। এটা আমেরিকান ডিপ্লমেসির স্টাইল না। তবে উনি বেশ কিছু ইংগিত দিয়ে যাবেন, যেগুলোকে বলে ডিপ্লোম্যাটিক নুয়ান্স। এগুলো বুঝতে হলে আপনার মাথায় চেতনার উন্মাদনার পরিবর্তে সুচারু বুদ্ধি থাকতে হবে। নিশা দেসাই ইতমধ্যেই এরূপ কিছু ইংগিত দিয়ে ফেলেছেন বলে আমার ধারণা।

উনার প্রথম দিনের কথাবার্তায় “ইঙ্কলুসিভ বা সবার অংশ গ্রহনে ইলেকশনের” কথা রয়েছে। এটা বাংলাদেশ বিষয়ে আমেরিকানদের একটা কোড ওয়ার্ড। এর মানে তারা বড় দলগুলোর সবাইকে ইলেকশনে দেখতে চায়, অর্থাৎ বিএনপি সহ। নিশা আবারও বলেছেন, বাংলাদেশে কোন দল নিয়ে আমেরিকার বিশেষ কোন মাথা ব্যাথা নেই। এই কোডটির মানে হলো “আমি না থাকলে তোমাদের ঘেউ ধরবে” — প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই মহান বানী ভারত খেলেও, আমেরিকা এখনও খায়নি। নিশার কোডের আর একটা মানে হতে পারে, যে নির্বাচনে জামাত নিয়েও আমেরিকার কোন মাথা ব্যাথা নেই।

যতদূর জানা যায়, নিশা দেসাই খুব সম্ভবত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আগে দেখা করবেন, আর বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে সব শেষে দেখা করবেন। গানের কন্সার্টে যেমন সবচাইতে জনপ্রিয় ব্যান্ড সাধারণত সবার শেষে স্টেজে উঠে, ডিপ্লমেসিতেও অনেক সময় সবার শেষে যার সাথে কথা বলা হয় আলোচনার ক্ষেত্রে তার একটা বিশেষ গুরুত্ব থাকে। এর মধ্যে দিয়ে অনেক সময় “who has the last word” এর আমেজ বুঝা যায়। এই কিছুদিন আগেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ড্যান মজেনা যখন বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন আমেরিকার উদ্দেশ্যে , তখন উনি আগে বিএনপি, তারপরে আওয়ামী নেতৃত্বের সাথে দেখা করে গিয়েছিলেন। নিশা দেসাই এর ক্ষেত্রে এবার তার উল্টাটা ঘটছে। এটা অবশ্য শিডিউলিং জটিলতার কারনেও হতে পারে। তবে আমার ধারণা এটা শিডিউলিং এর কারণে হচ্ছে না।

নিশা দেসাইয়ের দেয়া সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল ছিল মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের আদিলুর রহমানের সাথে বাংলাদেশের মাটিতে নেমেই সাক্ষাত করার বিষয়টি। অধিকারের আদিলুর রহমান কিনতু শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যাচারের স্বীকার নন। উনি শুধু হেফাজতের লাশের গণনাকারি নন। উনি ভারতের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকদের সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে সব চাইতে পরিচিত মুখ। এটা এখন আর কারও জানতে বাকী নেই যে বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটা সংকট চলছে। একারণে বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত-আমেরিকার একটি সংকটময় পরিস্থিতে, ভারতীয় সীমান্ত আগ্রাসনের সবচাইতে বড় প্রতিবাদকারী বাংলাদেশী ব্যাক্তির সাথে সবার আগে সাক্ষাত দিয়ে নিশা দেসাই বিশেষ কোন মহলকে কোন বিশেষ সিগন্যাল দিয়ে দিলেন কিনা তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বলা বাহুল্য সেই সিগন্যাল ধরার মতো ঘিলু সবার থাকার কথা না।

তবে হাই-ভোল্টেজ খেলা যতই হোকনা কেন, শেষ পর্যন্ত স্বাধীনচেতা বাংলাদেশী মানুষের সংখ্যাগরিস্ট জনসমর্থন যাদের হাতে থাকবে, তাদেরই জয় হবে। ইনশা আল্লাহ।

নভেম্বর ১৭, ২০১৩

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s