কঠোর আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষাঃ পরস্পরবিরোধী? করণীয় কি??

hartal

by Shikin Aman

১।   দেশব্যাপী বাকশালের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার এখনই সময়। হরতাল অবরোধ কখনোই শান্তিপূর্ণ হয়না, অনিবার্যভাবেই সহিংসতা এর সাথে জড়িত। অনেকক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করলেও সরকারী বাহিনীর আক্রমনে বা প্ররোচনায় সহিংসতা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কিছু ব্যাপারে সতর্ক থাকা দল দেশের স্বার্থে প্রয়োজন অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, সেইসব দ্বিমতের ব্যাপারে আমি শ্রদ্ধাশীল। আমি শুধুই নিজের বিবেক ও জ্ঞানত যা ঠিক মনে হয় তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলামঃ

 hartal

ক।    অবরোধ কার্যকর করার জন্য এর সাথে সম্পর্কযূক্ত নয় এমন কারো প্রাইভেট গাড়ি ভাংচুর করা কতটা যুক্তিসংগত? হরতাল কার্যকর করার জন্য পিকেটিং দরকার আছে, মানলাম। সে জন্যে টায়ার জ়্বালিয়ে বা গুরুতপূর্ণ মোড়ে অবস্থান নিয়ে  রাস্তা দখল করে রাখতে পারলে এমনিতেই সব গাড়ি চলা বন্ধ করবে। এর পরও যদি কোন গাড়ি এগিয়ে আসে, হয়ত তার প্রয়োজনটা তার জানমালের নিরাপত্তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। দুই একটা গাড়ীকে মানবিক বিবেচনায় ছাড় দিলে হরতাল/অবরোধ ব্যর্থ হবেনা। বরং হরতালকারীদের মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যাবে। এর সুফল দল নির্বাচনের সময় পাবে। এর বাইরেও অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি ভাংচুর করা হয়। আমার মনে হয় ত্রাস সৃষ্টির চেয়ে এই ধরণের কাজ মানুষের মনে ঘৃণা সৃষ্টি করে বেশী, আর দল হারায় একটি পুরো পরিবারের সহানূভূতি ও ভোট। আমরা কি আর একটু সুবিবেচক হতে পারিনা?

খ।    হরতাল সফল করার অংশ হিসেবে নিরপরাধ পথচারী, নারী, বৃদ্ধ, শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কিছু করা কি ঠিক? হ্যা আমি জনসমাগম এলাকায় বোমাবাজী, মানুষসহ পাবলিক বা ব্যাক্তিগত ট্রান্সপোর্টে আগুন, বা গরিব রিকশাওয়ালা বা সিএনজিওয়ালার জীবিকার একমাত্র সম্বল জ্বালিয়ে  দেয়ার কথা বলছি। আমরা কি একটু মানবিক হতে পারি না? রিকশার হাওয়া ছাড়া আর সিএনজি পথ আটকানো পর্যন্ত মানলাম, এর উপরে যাওয়ার আগে একবার কি আমরা আমাদের মতই একজন গরীব মানূষের তিল তিল করে করে গড়া স্বপ্ন পোড়ার কথা ভেবে দেখি? জেনেশুনে মানূষ পোড়ার কথা আমি বলবনা- আমি বিষ্বাস করতে চাই এই কাজ সুস্থ মস্তিস্কের আমাদের কেউ করেনা। হয় এটা কোন অসুস্থ মস্তিস্ক লোকের কান্ড, অথবা এটা আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার অপকৌশল। এভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের স্বপ্ন ভেঙ্গে বা পূড়িয়ে কি আমরা আসলে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পারবো? ভাবার বিষয় আছে নিঃসন্দেহে!

গ।    এরপর আসি সরকারী বেসরকারী যানবাহন আর সম্পত্তি ধংসের ব্যাপারে।বিআরটিসি বাস, ট্রেন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, সরকারি গাড়ি, সরকারী সম্পত্তি এগুলো পোড়ালে যে ক্ষতি হয় তা বুবুজানের সংগিদের গায়ে লাগে বলে আপনি মনে করেন?? বুকে হাত দিয়ে বলেন তো! যারা ক্ষমতায় থাকতে দেশ বিক্রি করতে পিছপা হয়না, তাদের কাছে তো সরকারী সম্পত্তি ধ্বংস নস্যি! এইসব নেতাদের ব্যাঙ্ক একাউন্ট থাকে সুইটজারল্যান্ড, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, ইউকে এইসব দেশে। সারাদেশ জ্বলে যাওয়ার পর তারা টিভিটা বন্ধ করে পরিবারকে বলবে, চলো কিছুদিন বিদেশ থেকে ঘুরে আসি। এই ট্রেন গাড়ি কিনার জন্য তারা বিদেশ থেকে আপনার আমার নামে লোন নিবে, যা আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই বিশ বছর ধরে কাটা যাবে। সুতরাং এগুলো পোড়ানো আর নিজের বাড়িতে আগুন লাগানো একই কথা।

ঘ।    আমি আপনাদের আবেগের কথা অনুভব করতে পারি, হরতাল সফলের জন্য ত্রাসের প্রয়োজনীয়তাও বুঝি। কিন্তু আমাদের সব কার্যাবলী পরিস্থিতি আর দলের প্রয়োজনের সাথে মিলিয়ে করা দরকার। এই মূহুর্তে দলের দরকার সম্পূর্ণ জনগোষ্টির সমর্থন (বালকানা ব্যাতীত) যাতে সতঃস্ফুর্তভাবে মানুষ এই জালিম বাকশাল সরকারকে প্রতিহত করে। তাছড়া এই আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা আছে নিঃসন্দেহে। সেই ক্ষেত্রে প্রতিদিন এমন হাজার হাজার লোককে খেপিয়ে তোলা কতটুকু কার্যকর হবে?

২।  অভিজ্ঞ কর্মীরা হয়ত বলবেন, এই কাজ তো আমরা একা করছিনা। এই বাল যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন তারা এর চেয়ে বেশী নৈরাজ্য করেছে। কিন্তু মনে করে দেখেন, ১৯৯৬ বা ২০০৭ সালে সাধারণ মানুষ হত্যা করে কোন ফলাফল আসেনি। সরকার তখনই আন্তর্জাতিক মহল বা সামরিক বাহিনীর চাপের মুখে পড়েছিল যখন রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি হয়ে একটা গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ আপনার আক্রমনের লক্ষ্য হতে হবে আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাধারণ মানুষ কখনোই না!  সাধারণ মানুষের জানমালে হামলা করতে থাকলে পুলিশ, বিজিবি স্বাভাবিক নিয়মেই তা রক্ষা করতে গুলি চালাবে। সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা করা তাদের মৌলিক এবং আইনি দ্বায়িত্ব। এক্ষেত্রে যদি সেনাবাহিনীও নামানো হয়, তারাও নির্দ্বিধায় গুলি চালাবে। কারণ তারা এটাকে সাধারণ মানুষের জীবন বাচানো হিসেবে দেখবে। তখন আন্দোলনের গতি যে থমকে যাবে তা বুঝতে হলে বেশী জ্ঞানী হওয়া লাগে কি? বহির্বিশ্বের কোন দেশও এই ধরণের কাজ ঠেকাতে সরকারের নেয়া কোন পদক্ষেপকে নিন্দা জানাবে না।  গুলি করে শত শত মানুষ মারলেও না। ২৫ নভেম্বরে মজিনা ভাইয়ের বক্তব্যে এর আভাস পাওয়া গেছে। এই বছরও আমেরিকা ড্রোন হামলা করে ইয়েমেনে একজন আমেরিকান নাগরিক হত্যা করেছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে! সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকী মোকাবেলায় তাদের দেশের পুলিশও গুলি করার ক্ষমতা রাখে। সুতরাং সাধারণ মানুষকে হত্যা করলে, বা সাধারণ মানুষের সম্পত্তি ধ্বংস করে সরকারকে এক চুলও নড়ানো যাবেনা। আপনারা এই কাজ করবেন আশা করেই বুবু তার বিখ্যাত ‘এক চুল না নড়ার’ ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এখনও পর্যন্ত সফলভাবে কথা রেখে যাচ্ছেন!

৩।  আমার মনে হয় এতক্ষনে আমার উপরে অনেকেই ক্ষেপে গেছেনঃ গালি দিচ্ছেন ভাদা বলে। একটু ধৈর্য ধরে লেখাটা পড়ে শেষ করেন। কিন্ত আমি আসলে নিজেকে বাংলাদেশের দালাল ভাবতে গর্ববোধ করি। আমার চিন্তাচেতনার লক্ষ্য আমার দেশের সামগ্রিক উন্নতি। আমার কাছে দলের চেয়ে দেশ বড়। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। বাকশাল সরকারকে হটানো দরকার কারণ তারা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে এবং আরো দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা, শেষ সম্বল ধ্বংস করে দলকে ক্ষমতায় নেয়ার চেষ্টা আমার বিবেকের পরিপন্থী। সেটা আসলে কোন পথও না। কারণটা উপরের প্যারায় বলেছি। এটা এই বাকশাল সরকার জানে, এইজন্যেই তারা এতো আত্মবিশ্বাসী! তাহলে এই জালিম সরকার হটানোর উপায় কি?

৪।  আমাদের এই যুদ্ধকে বিশ্বের দরবারে রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক দন্দ্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হলে তা আন্দোলনকে শুধুই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে! রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠে নামানোর ব্যবস্থা করে তাদের টার্গেট করতে হবে। বেশিদিন তারা ঘরে থাকবেনা, তাদের ইগো তাদের এটা করতে দিবেনা। তখন এই যুদ্ধকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার মোক্ষম সময়। অনেক সময় মিছিলে পুলিশ অকারণে (সাধারণ মানুষের জানমাল বাচাতে নয়) গুলি চালায়। এমন কার্যকলাপকারী সদস্যরা অনেকেই কিছুদিন আগেও ছিল বালের ক্যাডার। এখন উর্দি পরে তারা বেআইনি কাজ করছে। এমন সদস্যদের উপযুক্ত প্রমাণসহ (ভিডিও) চিনহিত করতে হবে এবং পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। সাধারণ/ নিরিহ পুলিশসদস্য যারা নিতান্তই কর্মকর্তার আদেশে দ্বায়িত্ব পালনে এসেছে, তাদের হঠাত বাগে পেয়ে হেনস্তা করাটা আসলে নিতান্তই অমানবিক। সঠিক লোককে ধরতে হবে। এই ট্রেন্ড যদি শুরু করা যায় খুব শীঘ্রই সাধারণ পুলিশ সদস্যদের সহানুভূতি আপনারা পেতে শুরু করবেন। এটা খুবই গুরূত্বপূর্ণ- বিলিভ মি। হরতাল সফলের জন্য পাড়ায় পাড়ায় জনগণের কাছে দল বেধে যেতে হবে, বুঝাতে হবে। তাদের সাহায্যে রাস্তা দখল করে হরতাল সফল করতে হবে, সেক্ষেত্রে বাধা আসলে উপরে ফেলতে হবে।

৫।  আমি যেগুলো বললাম এটা সাধারণ কর্মীরা হয়তো পুরোপুরি অনুধাবণ করতে পারবে না। এগুলোর সাথে স্বাধীণ দেশের সরকারের কার্যক্রমে (বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ) যেকোন শক্তির হস্তক্ষেপ রোধকারী আন্তর্জাতিক আইন জড়িত।  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর শানুভূতি অর্জনের সাথে সম্পর্কিত মানসিক ও মানবিক বিষয়গুলিও জড়িত। তাই নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় মোটিভেশন করতে হবে। কেন্দ্র থেকে এই ব্যাপারে নির্দেশনা আসতে হবে। তবেই এই আন্দোলনের কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে। যখনই আপনার মনে হবে বালও তো মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, নিজেকে মনে করিয়ে দিবেনঃ মানুষ মানুষের জন্য। আমরা বাল না আমরা মানুষ!!!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s