কেওস-কণ্টক

Image

The greatest tragedy in this world is not that the only underlying principle which is recognizable, functional and ceaseless is “chaos” – it is our predisposition to think otherwise, that there is order and harmony. Successful minority of the very few who understand this secret are busy ripping off benefits from chaos, and those who don’t – namely the majority – are busy unweaving the rainbow, leaning on to some sort of idealism.

আমাদের সমাজে কোনো আইন নেই, নেই শৃঙ্খলা – এ অভিযোগ সবার মুখে। সেই দু-তিন শ বছর আগে এ অঞ্চলের মানুষ যেমন দুর্নীতির নালিশ করতো, আজোও করে; বিস্তর বর্ণনা মিলবে আমাদের সাহিত্যে, দলিল-দস্তাবেজে। সাধারণত এ জাতীয় কথা-ভাজা শেষ হয় একটি আর্জি দিয়ে। আহ! এই দেশে যদি একটু আইন-কানুন, নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকতো, তাহলে আমরা কই উঠে যেতাম! সত্যিই কি তাই হোতো?

আমাদের সমাজে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোর মতোন নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকলে অর্থনীতিক ভাবে আজকে যে অবস্থানে আছি তার চেয়ে উপরে থাকতাম বলে মনে হয় না। বিশৃঙ্খল, দুর্নীতিগ্রস্থ, মিথ্যাবহুল সমাজে বেড়ে ওঠার কারণে এমন কিছু বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের দৌরাত্ম্য আমাদের এখানে হয়েছে যেগুলো আমাদের এখানে ভীষণ কার্যকরী ও প্রাসঙ্গিক। যেগুলো ছাড়া দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এখন এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর, অন্তত অর্থনীতি যখন প্রাসঙ্গিক।

Image

পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়ার তালিম আমরা পাওয়া শুরু করি পরিবার ও স্কুল থেকে। এই প্রশিক্ষণ আমাদেরকে এক ধরনের আদর্শ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়, যে পৃথিবীতে ন্যায় আছে, শৃঙ্খলা আছে, আছে কার্য-কারণের মাঝে সমন্বয়। আমরা আশ্বস্ত হই যে এমন একটা পৃথিবী এই মুহূর্তে না থাকলেও ভবিষ্যতে হতে পারে অবশ্যই – আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আমাদের মতো যাদের জন্ম তৃতীয় বিশ্বে, তারা স্বপ্ন দেখি যেন একটি সমৃদ্ধ ও সঙ্গত পৃথিবী উপহার দিয়ে যেতে পারি পরের প্রজন্মকে (মূলত নিজের দেশকে নিয়েই এই স্বপ্ন)। সমস্যা হোলো, সৃষ্টিকর্তার পৃথিবীতে শৃঙ্খলা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু মানুষের পৃথিবীতে নিশ্চিতভাবে আছে chaos, যা ব্যাখ্যা করা যায় শুধুমাত্র ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর। এক অতিপ্রাকৃত বিশৃঙ্খলা ঘিরে রেখেছে আমাদের সর্বব্যাপী। আমরা যে তা উপলব্ধি করি না, তা না। কিন্তু মেনে নিতে মন চায় না। এক অসম্ভম তাড়না আমাদের প্রশ্রয় দেয় – বিশৃঙ্খলার ওপর শৃঙ্খলার কর্তৃত্বেই বুঝি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব।

প্রাকৃতিক ভাবে মানুষ জন্মেছিলো এই কেওসকে মোকাবিলা করার জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অতি শিক্ষা মানুষের এই অপার সম্ভাবনাটিকে কিছুটা হলেও নষ্ট করে বলে আমার অনুমান। কেওস থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা মানুষসহ সকল প্রাণীর প্রবৃত্তি, এর মাঝে লজ্জা পাওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার কারণে সে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা বাদ নিয়ে অন্য কাজে ব্রতী হয় প্রায়ই, সে প্রথমত কেওসকে বোঝার চেষ্টা করে, দ্বিতীয়ত সে বুঝতে ব্যর্থ হয়ে এর নাম দেয় “সমস্যা” এবং তৃতীয়ত কোনো আদর্শবাদ এই সমস্যার সমাধান বলে সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই প্রস্তুতি কেবল একটি পরম সত্য থেকেই তাকে বিস্মৃত করেঃ কেওস থেকে নিস্তার মানুষের নেই। তবে হ্যাঁ, কোন ধরনের কেওস নির্বাচ্য সে উদ্দামতায় মানুষের শ্রেয়তর বিচারবোধের উপযোগিতা আছে ভীষণ।

মেজাজের দিক থেকে মানুষ যুক্তিপ্রবণ না, শিক্ষা তাকে যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়। শিক্ষার এই প্রক্রিয়াটা ভীষণ গোলমেলে এবং দ্বান্দ্বিক। প্রবৃত্তি বলছে প্রয়োজনে ছিনিয়ে নাও, ধর্ম বলছে প্রয়োজনে বিলিয়ে দাও। আবার ধর্ম জোড় দিচ্ছে বিশ্বাসের ওপর, বিজ্ঞান বলছে যুক্তির স্থান সবার ওপর। হিচেন্স বলছেন ইরাকের ওপর আমেরিকার আক্রমণ উচিৎ হয়েছে, চমস্কি বলছেন সেটা ছিলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। শেখ হাসিনা বলছেন তারাই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী, খালেদা জিয়া বলছেন মুক্তিযুদ্ধে যারা ছিলেন অনুপস্থিত(শারীরিকভাবে) তারা নেতৃত্ব দেয় কী করে? এতোসব পরস্পরবিরোধী তথ্য ও মতের অনিবার্য প্রকাশ হলো মানুষের আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। তার যুক্তি, আবেগ, মানবতাবোধ সবকিছুই হয়ে যায় বিশেষায়িত, একই মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করে, যা কোনো যুক্তি দিয়ে বিচার করা সম্ভব না। যে মানুষটি পরম বিশ্বাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে, সে মানুষটিই অফিসে গিয়ে ঘুষ খাচ্ছে। যে মানুষটি ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসার জন্যে দিনরাত ব্যয় করে গবেষণা করছে, সেই দুঘণ্টা পরপর ল্যাবের বাইরে গিয়ে ধোঁয়া ফুঁকে। যে মানুষটি বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস গুপ্তহত্যা নিয়ে বিচলিত ও চরম ক্রোধান্বিত, সে একই মানুষ ঘটমান বর্তমানের একই দিনে সংঘটিত গুপ্তহত্যা নিয়ে সামান্যতমও চিন্তিত না। বিষয়টি সমালোচনার না, বলতে চাইছি যে এটিই মানুষের প্রকৃতি, ক্ষমাহীন স্বভাব।

ব্যক্তি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের উত্তরণে পরিস্থিতি আরোও বহু পাকে মনোহর হয়ে ওঠে। কেননা তখন মানুষের স্বভাবের সাথে যোগ হয় এমন সব এলোপাথাড়ি দৈব প্রভাবকের যার ওপর মানুষের বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বভাবতই সে ভীষণ বিচলিত হয়ে ওঠে। কেননা তার চারপাশের পৃথিবী, এমন কি হয়তো নিজের আচরণও কোনো সেন্স-মেক করে না। এই উপলব্ধি একেকজনের মাঝে একেক ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কেউ ভাবে যুক্তি, কেউ ভাবে বিশ্বাস – পৌছে দেবে গন্তব্যে। কারোও আস্থা অর্জিত জ্ঞানে, কারোও আস্থা দৈব হস্তক্ষেপে – আদর্শবাদই পারে কেওস থেকে উত্তরণে, শক্তি আর নৈতিকতার শুভত্ব দিয়ে।

যাদেরকে আমরা বলি ভবিষ্যতদ্রষ্টা আর কেবল “স্ট্রীট-স্মার্ট” বলে যারা পান না যথাযথ কৃতিত্ব (কম বয়সে যাদের অনেককেই “চাল্লু-ম্যান” বলে ডেকেছি স্কুলে) তারা কিন্তু কেওসের মুখোমুখি হন সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এরা কেওসের ডায়নামিক্স নিয়ে চিন্তিত নন, সমাধানেও নেই কোনো আগ্রহ। এদের চিন্তা কেবল একটিইঃ এই গ্যাঞ্জামে আমার জন্য কী আছে?

আলতো নজরে মনে হয় যে সব নষ্টের গোড়াই হোলো এ স্বার্থপর দৃষ্টিভঙ্গি; অতর্কিতে এ দৃষ্টিভঙ্গি সামনে চলে এলে আমাদের রুচিবোধ রুষ্ট হয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আমরা বেসামাল হয়ে পড়ি। কিন্তু বাস্তবতা হোলো এই “স্বার্থপরতা” ছাড়া সভ্যতা এগোয় না (তবে এটা অর্ধসত্য; সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার জন্য স্বার্থপরতার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি প্রয়োজন আছে মহানুভবতার)।

প্রকৃতির দিকে চোখ ফেরালে ধারণাটা কব্জা হয় অনায়াসে। বিবর্তনের একটা প্রবণতা হোলো সহজ থেকে জটিলতর অস্তিত্বের দিকে যাত্রা। প্রথমে এসেছে এককোষী প্রাণী; সেখান থেকে বহুকোষী জটিলতর প্রাণের উন্মেষ। এবার আমরা ফিরে যাই একটু পিছে, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে। প্রায় হিমালয়ের সমান একটা উল্কা প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীতে এসে আঘাত হানে মেহিকোর য়ুকাতান পেনিনসুলায়। আঘাতের বিভীষিকাঃ সম্মিলিতভাবে মোট ১০ কোটি এটম বম্বের সমান। ফলাফলঃ ১৬ কোটি বছর ধরে যে ডায়নোসর চড়ে বেড়িয়েছিলো এই পৃথিবীতে দাপটের সাথে তারা হয়ে গেলো বিলুপ্ত। শুধু ডায়নোসর কেন, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক স্পিসিস শেষ হয়ে গেলো কেবল ঐ একটি আঘাতে। ডিলেমাটি লক্ষ করুন, খুব মজার। যে লক্ষ-কোটি বছরের পোক্ত শৃঙ্খলা “বিবর্তন” চাইছে শক্তিবহুল, সমর্থ প্রাণীর টিকে থাকা, এই উল্কার কারণে মারা পড়লো তারাই সবার প্রথমে। কেবল একটি দুর্ঘটনা বদলে দিলো পুরো “জীবনের” ইতিহাস, যেটা না হলে মানুষের উদ্ভব হোতো কি না কে জানে? যে কেওসের কথা আমি বলছিলাম তার একটা মহাজাগতিক চরিত্রও আছে। তো শেষমেশ টিকলো কারা? সবচেয়ে শক্তিশালী কিংবা বুদ্ধিমান প্রাণীটি টেকে নি, টিকেছিলো তারাই যারা এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে নেয়ার মতো সক্ষম ছিলো।

বিবর্তনের এই ধারার সাথে মানুষের সমাজের তফাৎ আছে বিস্তর, সত্য। কিন্তু একটা মূলসুর আমাদের সমাজেও একইভাবে কার্যকর। পরিবেশ যেখানে বিশৃঙ্খলাময় এবং আনপ্রেডিক্টেবল, সেখানে প্রয়োজনীয় নয় যে আমাদের পছন্দের, আয়ত্তের কিংবা কোনো পুস্তক-সত্যায়িত দক্ষতাই রক্ষাকবচ হবে।

আসুন এ ছাঁচে একবার বাংলাদেশকে ফেলি। পৃথিবীর ইতিহাসে কখনোই বাংলাদেশের মতো এতো ছোটো ভূ-খণ্ডে এক প্রজাতির এতো বিপুল সংখ্যক অগ্রসর স্তন্যপায়ী প্রাণী একসাথে হয়তো বাস করে নি। এমন অভূতপূর্ব ঘটনার অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া না হওয়ার কোনো কারণ নেই। বলাই বাহুল্য, আমাদের এখানে পুষ্টি, সম্পদ, সুযোগ প্রভৃতির জন্য কাড়াকাড়ি অচিন্তনীয় রকমের উদগ্র। জীবনের বিবর্তনে যেমন, সমাজের বিবর্তনেও এমন গলা-কাটা প্রতিযোগিতায় সাড়া না দেয়ার উপায় নেই। জন্ম হচ্ছে এমন সব সক্ষমতার যেগুলোকে বর্ণনা করার মতো যুতসই শব্দ নেই আমার তহবিলে।

আমার স্কুলবেলার এক বন্ধুর পারিবারিক ব্যবসা খুব বড়। বন্ধুটি কথায় কথায় একদিন জানালো বাংলাদেশে একটি ব্যবসায় তার আগ্রহের কথা। অংক করে দেখলাম যে ডলারের হিসাবে তার বিনিয়োগের পরিকল্পনা হোলো প্রায় আশি মিলিয়নের। আশ্চর্যের ব্যাপার হোলো এই প্রকল্পের কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয় নি তখনও, শুধুমাত্র ইন্সটিঙ্কট থেকে তার এই আগ্রহ। পশ্চিমে আশি মিলিওন ডলারের বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে কোনো ধরনের মার্কেট রিসার্চ ছাড়া (পণ্যটি অভিনব কিংবা যুগান্তকারী না, রোজই কোটি মানুষ ব্যবহার করে), এটা শুনলে বলবে মাথার ডাক্তার দেখাও। কিন্তু ব্যবসাটা শুরু করলে দেখা যাবে যে সবাই ভুল ছিলো, সেই ঠিক ছিলো; লাভ হচ্ছে তরতর করে। গত বিশ বছরে বাংলাদেশী অন্টাপ্রেনিওরদের সাফল্যের মূলে যে এমন বিচিত্র বিচারবুদ্ধিরহিত উচ্ছ্বাস ও লোভ রয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশ্ন হোলো কোনো আইন ও শৃঙ্খলার দেশে এমন যুক্তিহীন প্রাণোচ্ছলতাকে ধারণ ও লালন করার উপায় আছে কি?

এই বন্ধুটিকেই প্রশ্ন করেছিলাম তারা পশ্চিমে ব্র্যান্ড শুরু করে না কেন (তাদের মূল ব্যবসা চামড়াজাত পণ্য)? অস্ট্রেলিয়ার মতো ছোটো মার্কেটে আশি মিলিওন ডলারের এক শতাংশের চেয়েও কম বিনিয়োগ করে বহু সফল ব্র্যান্ড বেরুচ্ছে হরহামেশা। এখানে আইন-কানুন আছে, বিশাল অঙ্কের লাভ আছে, নেই চাঁদাবাজি-রাজনৈতিক উপদ্রব, নেই লোডশেডিং। এখানে তো ব্যবসা করা অনেক সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু না, পশ্চিমে আমার বন্ধুর বা বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের স্টার্ট-আপ ব্যবসায়ে কোনো আগ্রহ নেই। ঐ যে বলছিলাম, বিশৃঙ্খলার মাঝে একটা স্ট্র্যাটেজিক এডভান্টেজ আছে, এটা কেউ খোয়াতে রাজী নয়।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হোলো বিশৃঙ্খলা যদি কারো স্ট্র্যাটেজিক এডভান্টেজ হয় রাষ্ট্রের সেখানে কী করার আছে? এর উত্তর আমার জানা নেই। জানা নেই এজন্য যে এমন প্রশ্নের উত্তরে চোখা-চিন্তার সুযোগ কম। যে সমস্যায় এক-দুজন না, পুরো সমাজটা জড়িত, সে সমস্যায় আমরা কার্যকারিতার চেয়ে নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রাধান্য দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আর নৈতিকতা এমনই এক ব্যাখ্যাক্রান্ত বিষয় যে এ নিয়ে ভাবাবেগবর্জিত আলোচনা করা এক কথায় অসম্ভব।

তাহলে এই কেওস-কন্টক পৃথিবীতে আমার আপনার জন্য কী করার আছে?

প্রথমে একটা কথা আবারো স্মরণ করিয়ে দেবো যে কেওস থেকে মানুষের নিস্তার নেই, তা আপনি যেখানে যে দেশেই থাকুন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা এমন কেওসের ব্যবস্থা করেছি যেটা খুব আদিম ও বন্য। এমন বিশৃঙ্খলায় লাভবান হতে চাইলে প্রায়ই ইতরামির শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু মনে রাখবেন কোনো আইন, কোনো মতবাদ কিংবা কোনো আদর্শই এই বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় রূপান্তরিত করতে পারবে না, এটা ধ্রুব সত্য। আমরা কেবল এক ধরনের বিশৃঙ্খলার চেয়ে অন্য ধরনের বিশৃঙ্খলাই বেছে নিতে পারি।

এছাড়া কেবল একটিই কথা বলার আছে আমার। ইনটুয়িশানকে (শব্দটির কোনো যুতসই বাংলা জানা নেই আমার। সহজ ভাবে বলা যেতে পারে “মন যা বলে”) প্রাধান্য দিন সবার আগে, এমন কি নৈতিকতারও আগে।

এই কথাটির তাৎপর্য আছে। একটু ব্যাখ্যা করি। আমরা মানুষেরা, নৈতিকতার প্রশ্নকে কীভাবে মোকাবেলা করি বলুন তো? আমার ধারণা, বেশীরভাগ পাঠক উত্তর করবেন যে আমরা ভেবে-চিন্তে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হলে সিদ্ধান্ত দেই যে ব্যাপারটি অনৈতিক। দুঃখের বিষয়ঃ মানুষের মস্তিষ্ক এভাবে কাজ করে না। সে প্রথমে চিন্তা করে না, হুট করে সিদ্ধান্তে আসে, তারপরে নিজের মতোন করে যুক্তি খাড়া করে। এই যুক্তিগুলোও খুব মজার। সে যদি মনে করে কোনো একটি বিষয় অনৈতিক, তাহলে সে কল্পনায় কাউকে না কাউকে ভিক্টিম বানাবেই, বাস্তব যাই হোক না কেন (মানুষের মোরাল সাইকোলজি এক অনবদ্য বিষয় যা নিয়ে আলাদা একটা আলোচনার প্রয়োজন, সেটা ভবিষ্যতের খাতায় তোলা থাক)। অর্থাৎ সূক্ষ্ম বিচারে নৈতিকতার ব্যাপারটি ইনটুয়িটিভ, র্যাশনাল না। সমস্যা হোলো ঐ যে হুট করে সিদ্ধান্তে আসা – এই প্রক্রিয়াটাকে মানুষ স্বীকার করতে চায় না, মনুষ্যত্বের অবমাননা হবে বলে। আমি বলছি, হুট করেই যদি সিদ্ধান্তে আসি, না ভেবে-চিন্তে, তাহলে ঐ একটি সিদ্ধান্তের প্রতিই এতো আস্থা কেন?

ইনটুয়িশান যদি বলে কাউকে খুন করতে তাহলে কি তাকে খুন করতে হবে? না, অবশ্যই তা না কিন্তু মানুষের বাস্তব সমস্যায় “সঠিকত্ব” বা “ন্যায়বিচারই” একমাত্র বিচার্য না, আরোও বহু দিক আছে। নৈতিকতার বাধন অনেক সময়ই এই দিকগুলো দেখতে দেয় না (এ প্রবণতাটা খুব সহজেই মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করে প্রমাণ করা যায়)। আমার প্রস্তাব শুধু এতোটুকু যে ইনটুয়িশানকে অগ্রাধিকার দিলে এমন বহু সুযোগ, বহু সমস্যার সমাধান আপনি দেখতে পাবেন যেটা নৈতিকতার চশমা পরে থাকলে নাও দেখতে পারেন।

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হোলো ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান যার পেছনে সবচেয়ে বড় দুটো প্রভাবকের একটি ছিলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (মামলাটির সরকারী নাম ছিলো ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের বিচার’)। আমরা জানি যে রাষ্ট্রদ্রোহের এই মামলাটি ছিলো মিথ্যা ও নিবর্তনমূলক। কিন্তু এই মামলার একজন আসামী (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা) সহ একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে মামলাটি মিথ্যা ছিলো না। সবকিছু বাদ দিয়ে নৈতিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একবার নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করুন তো, মামলাটি সত্য হলে এবং কোনো রাষ্ট্রের আওতায় থেকে এর অখণ্ডতাকে ভাঙতে চাইলে প্রচলিত আইনে একে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি না? কিন্তু আমরা সে প্রয়াসকে এভাবে দেখি না, কারণ নৈতিকতার ওপরে আমরা স্থান দেই সময়ের প্রয়োজন, কার্যকারিতা – এসবকে।

আমার বক্তব্য ছিলো এটাই; কেওস-কন্টক পৃথিবীতে সাফল্যের জন্য সবার আগে প্রয়োজন সক্ষমতার। যে নৈতিকতা সক্ষমতাকে নিস্তেজ করে সে নৈতিকতাকে মহিমান্বিত করার আগে দুবার প্রশ্ন করুন, হয়তো কাজে দেবে।

(ছবি ইন্টার নেট থেকে মাইকেল ফ্ল্যাম এর তোলা ও Imagevat থেকে নেয়া ছবি)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s