বিচার নিয়ে রাজনীতি জিতিয়ে দেবে কাদের মোল্লাকেই

1

By শাফকাত রাব্বী অনীকঃ

বিচার বিভাগে আওয়ামী লীগের সীমাহীন রাজনীতিকরণ জিতিয়ে দেবে কাদের মোল্লা সাহেবকে ইতিহাসের বিচারে। ওনার ফাঁসি হোক আর নাহোক। কি কারণে উনি জিতবেন তা বলছি নিচেঃ

১. মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন, এই ফোনটি করার আগে জন কেরির কোন একজন কর্মকর্তা কাদের মোল্লার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছেন। সিআইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন নথি ঘেটেছেন। প্রয়োজনে অন্য কোন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, যাদের কাছে বাংলাদেশের ১৯৭১ সম্পর্কিত তথ্য আছে, তাদের সাথে কথা বলেছেন। তারপরেই গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-এর পরে প্রটোকলে অনুযায়ী তিন নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে। এর পরেই জন কেরি কাদের মোল্লার ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে ফোন করছেন। ফাঁসি থামাতে বলছেন। মনে রাখতে হবে, কাদের
মোল্লা খুবই গুরুত্বহীন মানুষ আমেরিকার ফরেন পলিসিতে। তার উপর গোয়েন্দা নথিতে কি আছে তা নিশ্চিত না হয়ে, জন কেরি ফোন করতেন না। অলাভজনক, মামুলি কাজে বেইজ্জত হওয়া এসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের স্টাইল না। এই একই ধরণের প্রটোকল নিশ্চয়ই মেইন্টেন করেছেন অন্যান্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিরা যারা এই ইস্যুতে সরকারকে চাপ দিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের গোয়েন্দা নেই, কিন্তু রিসারচার আছে, যারা বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দাদের সাথে কথা বলেন। উনার স্টাইলও জন কেরির মতোই হবে। আজ হোক আর কাল হোক এই সব নথি রিলিজ হবে।

২. কাদের মোল্লা সাহেবের ফাঁসি নিয়ে অনেক প্রোপাগান্ডা এবং বস্তুনিষ্ঠ রিসার্চ হবে আগামি অনেক বছর ধরে। এই রিসার্চগুলো করতে রেফেরেন্স লাগবে। এখন পর্যন্ত যা রেফেরেন্স আছে তাকে যদি দুই কলামে পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ করে সাজানো যায়, তাহলে এক কলামে থাকবে, শাহরিয়ার কবির, মুন্তাসির মামুন, অমি রহমান পিয়াল, তুরিন আফরোজ, জনকণ্ঠ, ডেইলি স্টার, জনৈক মজাম্মেল হক প্রমুখ সহ আরও অনেক ক’জন ব্লগার। আর অন্য কলামে থাকবে জাতিসংঘ নিযুক্ত নিরপেক্ষ গবেষক, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি, ইকনমিস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, নাভিদ পিল্লাই, জন কেরি, বান কি মুন, ডেভিড বারগ্ম্যান সহ আরও অনেকে। দশবছর পরে নিরপেক্ষ
রিসার্চার হয়তো প্রশ্ন করবেন কলামের কোন পাশে আছে পক্ষপাত আর কোন পাশে অব্জেক্টিভিটি।

৩. ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরে, আরও অনেক গোলাম মাওলা রনি বেড় হতে পারেন। নতুন নতুন মজাম্মেল হক কিংবা মমেনা বেগম বেড় হবার সম্ভবনা কম, কেননা গত ৫ বছরের মতো অনুকূল পরিবেশ ভবিষ্যতে আর নাও থাকতে পারে। এদের সংগি হবেন মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহ সাহেবের মতো আরও অনেকে। হয়তো ডেভিড বারগ্ম্যান তার দেখা বিচার বিষয়ক আরও অনেক গোপন কান্ড নিয়ে একটা মেমোয়ার লিখবেন। সেখানে থাকবে এমন অনেক কথা যা উনি এতোদিন বলেননি, বিচার নিয়ে কুৎসা রটানোর ভয়ে। সেই মেমোয়ার বিশ্বব্যাপী বিক্রি হবে। বারগম্যানকে নতুন করে ঘায়েল করার মতো তেমন কিছু তখন আর নাও পাওয়া যেতে পারে।

৪. প্রধান সাক্ষী মমেনা বেগমের কণ্ঠ রোধ করা হতে পারে। অথবা তিনি সকন্ঠে বলে উঠতে পারেন যাকে সাক্ষী হিসেবে পুরো মুখ ঢেকে, অতিরিক্ত নিরাপত্তায় আদালতে নেয়া হয়েছিল, সেই ব্যাক্তি আসল মমেনা ছিলেন না। আর নতুন এভিডেন্স হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত মাত্র এক বেলায় সেরে ফেলার তাড়াহুড়ার কারণে প্রসেকিউশন থেকে যাবেন ইতিহাসের কাঠগড়ায় বাদীর আসনে।

৫. দশ বছর পরে, নিরপেক্ষ গবেষকরা যখন কাদের মোল্লা সাহেবের ফাঁসি নিয়ে গবেষণা করতে যাবেন, তখন ফাঁসির প্রেক্ষাপট ঘাটাঘাটি হবে। মাত্র ২৫ দিন পরের নির্বাচন, আসন্ন ১৬ই ডিসেম্বর, সরকারের নিরবাচনী প্রতিশ্রুতি, রাস্তার লিঞ্ছ মব, তারানকো সাহেবের সাথে দরকষাকষি, সেই দরকষাকষি ভেস্তে যাওয়া, বিচার কারজে চরম সমন্বয়হীনতা, ইত্যাদি বিচারবিভাগের রাজনীতিকরনকে প্রকোটভাবে তুলে ধরবে। কোন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন গবেষক যদি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভাষ্য কিংবা প্রসেকিউশনের প্রমানাদি সঠিক হিসেবে মেনেও নেন, তারপরেও তিনি একটা জিনিস কোন ভাবেই ডিফেন্ড করতে পারবেন না। সেটা হলো ফাঁসি নিয়ে সীমাহীন তাড়াহুড়া। মধ্য রাতের রিভিউ, সকালেই শেষ হয়ে যাওয়া, তাও আবার বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি ও সংস্থার আহবান উপেক্ষা করে। এই তাড়াহুড়ার বিষয়টি ইতিহাসের কাঠ গড়ায় দাড়িয়ে থাকবে চিরদিন।

সকল প্রমান মেনে নিলেও ইতিহাস প্রশ্ন করতেই থাকবে যে কাদের মোল্লা সাহেবের ক্ষেত্রে “জাস্টিস হারিড, ইজ জাস্টিস বারিড” হয়ে গিয়েছে কিনা।

উপরের এক বা একাধিক পয়েন্টগুলোর সমন্বিত এফেক্টে ইতিহাসের কাঠ গড়ায় প্রশ্ন বিদ্ধ হতেই থাকবে কাদের মোল্লা সাহেবের ফাঁসি। আর এটাই হবে তার ও তার দলের জয়। আর হেরে যাবেন তারা যারা আসলেই ইতিহাসের একটা ক্লোজার চেয়েছিলেন। এই পরাজয়ের দায় এককভাবে নিতে হবে একটি দলকেই।

ডিসেম্বর ১২, ২০১৩

One thought on “বিচার নিয়ে রাজনীতি জিতিয়ে দেবে কাদের মোল্লাকেই

  1. কারো মাথায় যদি মাত্র এক ছটাক বুদ্ধিও থাকে একথা বুঝবে _ মরহুম আবদুল কাদের মোল্লা যুদ্ধাপরাধী ছিলেন কি ছিলেন না, অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে কি হয়নি _ সেটি আদৌ এখন আর মুখ্য নয়। সিচুয়েশন এবং টাইমিং এর কারণেই এটা বুমেরাং হবে অবধারিতভাবে। মারাত্মক ভুল টাইমিং এর কারণে এখন আর একজন যুদ্ধাপরাধি হিসেবে নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। ঘৃণার বদলে পাবেন সহানুভূতি। পাশাপাশি জামাতপন্থিদের সাথে অন্য ইসলামপন্থিদের যে দূরত্ব ছিল তা অনেকখানিই ঘুচিয়ে দিয়ে ‘মুসলিম ঐক্য’ জোরদার হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। একজন যুদ্ধাপরাধীকে(আদৌ যদি হয়ে থাকে) জিরো থেকে হিরো বানিয়ে দেয়ার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অতি চালাকি করতে যাওয়া কিছু অর্বাচীন বেকুবের, যারা অচিরেই এর বিপরীতে হিত ফলাফল ভয়ার্ত দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করবে।

    আনন্দ করা উচিত শাহবাগিদের। প্রতিটি মূহুর্তই এখন খুব দামি। মধুমাস ফুরিয়ে এলো বলে। তারপর দীর্ঘ চন্দ্রভূক অমাবস্যায় ভীরু আমুদে হরিণের পালকে শ্মশ্মান থেকে শ্মশ্মানে মরচে ধরা ত্রিশুল হাতে তাড়া করে ফিরবে নন্দীভৃঙ্গীর দল, নরমুন্ডের মালা গাঁথা হবে কাপালিক মহাকালের গলায় সাড়ম্বরে পরানোর জন্যে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s