মেরুদণ্ড!!! ভারত ও বাংলাদেশ-আম্লীগ, জঙ্গি ও মৌলবাদ তর্ক

hasina-manmohan 1

তারেক মোর্তাজা” 

 

বাংলাদেশে ‘র’র স্টেশন থাকা এবং ‘র’ এত সহমর্মি ও সহযোদ্ধা থাকার পরেও তারা সম্ভবত ইচ্ছেকৃতভাবে কিছু ভুল ধারণা লালন করে থাকে। যেমন বাংলাদেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান এতটাই বেড়েছে যে, এটা দমন করা এবং দিল্লিতে নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমানোর সুবিধার্থে আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে। সে জন্য যা যা করার দরকার, দিল্লি তাই করবে এবং সেটিই করা উচিৎ বলে সাবেক ইনডিয়ান কূটনীতিকরা খোলাসা করেই বলছেন!

অথচ বিএনপিই প্রথম বাংলাভাই , শায়খ রহমানকে গ্রেপ্তার ও বিচার শুরু করেছিল, মইন-ফখর সরকারের সময় তাদের ফাঁসি হয়। অনেকে বলবেন, এদের উত্থানও বিএনপি জামায়াতের হাত ধরে- সেটি স্বীকার করেই বলছি, বিম্পি-জমাতের ৫ বছর, মইন ফখরের ৩ বছর এবং আম্লীগের ৫ বছর মিলিয়ে এদের সংখ্যা কত হতে পারে? ৫০, ১০০, ৫০০, ১০০০?

এর বেশি কি হতে পারে! আমি নিশ্চিত এর বেশি হওয়ার সুযোগ নাই। আমি জানি এবং বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মাটি, সংস্কৃতি, মানুষের মন এ সবকে সমর্থন করেনা। এখানে ধর্মী আচার-রীতি অনুসর করা হয় মানবতার জন্য, প্রতিহিংসার আগুনে পোড়ার জন্য নয়।

২০০৫ সালে নয়া দিল্লির সায়েন্স সেন্টারে অনুসন্ধানী সম্বাদিকতার ওপর ট্রেনিং নিতে গেছিলাম। সেইখানে একজন সিনিয়র নারী সাংবাদিক বলিছলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রসার নিয়ে। তার আলামত হিসাবে জানালেন, তিনি ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। পথে চট্টগ্রামে দেখলেন টুটি আর টুপি, পাঞ্জাবী আর পাঞ্জাবী পরা লোক। ভয়ে তার আত্ম শুকিয়ে যায়। এ লোকগুলো কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, সেটি ভেবেই তিনি আঁতকে উঠেছেন।

আমার দেখা গ্রামীন জনপদের এ সহজ সরল মানুষগুলোর টুপি, পাঞ্জাবী পরলেও এরা আদতে মৌলবাদী নন। আমরা যারা নগরে অনেক কথার খই ফোটাই তারা তাদের পরিবারের দিকে তাকান, অন্তত এক জেনারেশন আগেও আমাদের পরিবারে দাঁড়ি , টুপি ও পাঞ্জাবী পরা লোক ছিল, এখনো আছে। এদের সামনে রেখে বাংলাদেশের ‘জঙ্গি’ পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সঠিক বিচার হবে না।

আমরা কিন্তু ভারতে গেলে ধুতি, পাঞ্জাবী দেখে ভয় পাই না। স্থানীয় আচারকে সম্মান করার একটা বড় শিক্ষা আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে পাওয়া। এটাকে অজুহাত করে আসলে ফায়দা তোলা যায়, সেটি পারে ইনডিয়া।

‘জঙ্গি’র মূল কারখানা মনে করা হয়, কাওমি মাদ্রসাকে। আমি যদি ভুল না করি- এ পদ্ধতির শিক্ষাটা ইনডিয়ার দেওবন্দে চালু হয়েছিল। সেখানে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীও পড়েছিলেন। জঙ্গি, উগ্র বা অন্য যে সব অভিধা দিয়ে বিবেচনা করা হয় মুসলমানদের সে সব কিন্তু ইনডিয়া থেকে উৎপত্তি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে দেওবন্দ বড় ভূমিকা রেখেছিল, এটা জানার সুযোগ হয়েছির দিল্লির বন্ধুদের কাছে।

ইনডিয়া থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে কাওমি শিক্ষার প্রসার। এখনো কাওমি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ইনডিয়া। মজার ব্যাপার হলো ইনডিয়া তার স্বার্থে এদের কখনো জঙ্গি বলে, কখনো সাম্প্রদায়িক বলে , কখনো মৌলবাদের উত্থানে আতঙ্কিত হয়।

হিন্দু মৌলবাদের উত্থানে আমরা আতঙ্কিত হই না। কারণ হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় আমাদের দেখবার বিষয় নয়। আমাদের উদ্বেগেরও কারণ নয়। আমরা অতি অল্পতে তড়িতাহত হই না। তবে আমরা তাদের দেশের সংখ্যায় কম যে সব সম্প্রদায় তাদের নিরাপত্তার কথা বলি। মুসলমানদের নিরাপত্তার কথা বলি। তাও বলি তখন যখন দেখি অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছেন তারা, ধর্ষিতা হচ্ছেন।

তবে আমি এই ওকালতি কখনোই করবোনা যে বাংলদেশে উগ্র, চরমপন্থী লোক নেই। অবশ্যই আছে। বিশ্বেবর সব দেশেই কম বেশি ‘জঙ্গি’ আছে। বরং বাংলাদেশের উগ্রপন্থীদের ‘ম্যানেজ’ করা সহজ। ক্ষমতার কাছে তারা হার মানে। খুব সহজেই মানে। যে রাজনৈতিক দলটি নিয়ে ভারতরে সবচেয়ে বেশি ভয়, সে দলটি সবার আগে মানে!

তবে খোলাসা করেই বলি- গুটি কতক জনবিচ্ছিন্ন হুজি, বাংলা ভাই টাইপের লোকের জন্য বাংলদেশের আপামর সহজ সরল মানুষকে জঙ্গি, উগ্রপন্থী, মৌলবাদী হিসাবে অভিহিত করার যে কাজটি ইনডিয়া করছে, সেটাকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সহযোগি ইনডিয়ার ইদানিংকালের আচরণে সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত যে, বাংলাদেশ তার চাওয়া অনুযায়ী চলবে। মানে প্রভুভক্ত প্রাণীর মত। হচ্ছেও তাই। বিএনপি, জামায়াত সরকারের সময়ও কিন্তু ভারত তার স্বার্থ হাসিল করেছিল। তাতে কোনো সমস্যা হয়নি। তবুও আওয়ামী লীগে তাদের ভরসা, বিশেষ দূর্বলথা এখানে কাজ করতেই পারে। কিন্তু সেটি বাংরাদেশের জনগণের চাওয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে হাসিল করা কতটা শোভন এবং শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে সেটি বিবেচনার সময় কারো নেই। সবাই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের ছায়ার সাথে লড়ছি।

সেভেন সেস্টার নিয়ে ভারতের একটা উদ্বেগের কথা আমাদের দেশের জ্ঞানী বিশ্লেষখরা বলে থাকেন, সেটি এখন নেই। ভারত এটাকে কব্জা করতে পেরেছে। আমরা দেখেছি দশকের পর দশক ধরে ভারত আমাদের দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে কীভাবে মদত দিয়েছে। এটা নিশ্চয় কেউ ভুলে যাননি বা যাবার মত ঘটনাও তা নয়। সীমান্তে হত্যা কিম্বা বাংলাদেশের ভূমিতে তাদের অবাধ বিচরণ আমাদের উদ্বেগ নিয়ে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট রকমের সচেতন নই। তাদের দোষ দিয়ে লাভ কি।

কথা না বাড়িয়ে শেষ করি, ভারত আওয়ামীলেগের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পরও আওয়ামী লীগের পামশ থাকবে বলে বিবিসি বাংলায় যে খবর প্রকাশ করেছে সেটি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কেবল বাড়াচ্ছে না, সেই সাথে এ দেশের মানুষের অস্তিত্বকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

বলি- মাওবাদ, গেরিলা দমনে ভারত যে কঠোর নীতি অবলম্বন করছে, কাশ্মীরে যে নিপীড়ন, গুন হত্যার সমরনীতি অনুসরণ করছে, সেখানে বাংলাদেশে তাদের প্রকাশ্য ভূমিকা স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতের আর আট দশটা রাজ্যের মত এখানকার বিষয় নিয়ে তাদের নিয়মিত ফাইল ওয়ার্ক হয়, এখন মাঠ পর্যায়ে ওয়ার্ক হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য উদ্বেগের হলেও করার কিছু নেই। কারণ আমাদের মেরুদণ্ড নেই।

One thought on “মেরুদণ্ড!!! ভারত ও বাংলাদেশ-আম্লীগ, জঙ্গি ও মৌলবাদ তর্ক

  1. একটি তথ্য ভুল আছে. জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী কখনো দেওবন্দে পড়েননি.সংশোধন করে নিলে ভালো হয়.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s