খালেদা কি চাইলেই তারেক কিংবা জামাতকে ছাড়তে পারবেন?

KhaledaTariq 2

শাফকাত রাব্বী অনীকঃ

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির দুর্গম পথের একজন যাত্রী। ওনার দুই হাতে দু’টা ওভার সাইজ ব্যাগেজ আছে। ব্যাগেজ গুলো অনেক ভারী। একটার নাম তারেক রহমান। আর একটার নাম জামাত-ই-ইসলাম।  এই ব্যাগেজ সঙ্গে করেই খালেদা জিয়া হেঁটে চলেছেন। ফিজিক্স  এর সুত্র অনুযায়ী, ভারী লাগেজ গুলো সরিয়ে দিলে, ওনার হাঁটতে আরাম হবার কথা। কিন্তু নিজের বিবেচনা অনুযায়ী এই ব্যাগেজ গুলো হাতে নিয়েই খালেদা হাঁটছেন।

অনেকেই খালেদাকে বিগত বছরগুলোতে বলেছেন এই ব্যাগেজ গুলোর কোন না কোনটা হাত থেকে সরানোর জন্যে।  পৃথিবীর যে কোন বস্তুর মতো, এই ব্যাগেজ গুলোরও উপকারিতা ও অপকারিতা উভয়ই নিশ্চয়ই আছে। সেই আলোচনায় না যেয়ে, ধরে নেয়া যাক যে এই ব্যাগেজ গুলো সরিয়ে দিতে খালেদা জিয়া রাজী হবেন। এখন দেখা যাক সরানোর প্রক্রিয়াটা কি হবে?

প্রথমেই আসা যাক তারেক রহমান প্রসঙ্গে। উনি গত অনেক বছর সপরিবারে লন্ডনে আছেন। উনি  বিএনপির নীতিনির্ধারণ করার মতো কোন কাজ করেন কি না সেটা বিএনপির ভিতরের মানুষ ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু বাইরের মিডিয়া, সাধারণ সমর্থক, ও সমালোচকরা অনেকে এখনও ভাবেন যে তারেক রহমান বিএনপিতে অনেক ক্ষমতাবান। এক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে যে  যতদিন খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন থাকবেন, তারেক রহমান সম্পর্কে এই পাবলিক পারসেপশোন সরানো যাবে না।  মা ও তার বড় ছেলের সম্পর্ক ঘোষণা দিয়ে অন্তত পাবলিকের মনে দুর্বল করা যায় না ।

আরও একধাপ বাড়িয়ে বলা যেতে পারে যে, ব্যাক্তি তারেকের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত, যতদিন তার মা চেয়ারপারসন থাকবেন, ততদিন কেউ না কেউ বলতেই থাকবেন তারেক রহমান পিছনে থেকে কল-কাঠি নাড়ছেন। তারেক রহমানের জন্যে একেবারে মরে যাওয়া ছাড়া এই পারসেপশোন থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক কঠিন।

বাংলাদেশের বড় দুটো দল থেকেই পরিবারতন্ত্র একেবারে শেষ হয়ে যাবার সম্ভাবনা এখনও অনেক কম। সেক্ষেত্রে, যদি খালেদার অবর্তমানে তার পুত্রবধু জোবাইদা রহমান হাল ধরেন (সোনিয়া গান্ধী স্টাইলে), তাহলেও দেখা যাবে যে তারেক রহমানকে নিয়ে একই কথাই হচ্ছে। তারেক তখন সমালোচিত হবেন আসিফ জারদারি (প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর স্বামী) হিসেবে।

অর্থাৎ, মা , বউ, কিংবা পরিবারের অন্য কোন  সদস্য যেই বিএনপির প্রধান হোক না কেন, তারেক রহমান জীবিত থেকে কোনদিন প্রমান করতে পারবেন না যে তিনি পিছনে থেকে কল কাঠি নাড়ছেন না।  এটা ওনার জীবনের একটা বাস্তবতা। তারেক রহমানকে সরাতে হলে, হয় তাকে মরে যেতে হবে, কিংবা তার পুরো পরিবারকে বিএনপি থেকে সরে যেতে হবে। এর মাঝামাঝি কিছু নেই। উনি বিএনপি থেকে সত্যিকার অর্থেই ৪ হাজার মাইল দূরে থাকলেও, মানুষ বলতেই থাকবে উনিই বিএনপি চালান।

এরবার আসা  যাক জামাত প্রসঙ্গে। ইদানীং শোনা যায় যে কে-বা-কাহারা খালেদা জিয়াকে জামাত ছাড়তে বলেছেন। এধরনের কথা এই মুহূর্তে উনাকে  কেউ  বলছেন কিনা জানি না। কিন্তু একটি প্রতাপশালী দেশ একসময় খালেদা জিয়াকে জামাত ছাড়তে বলেছিল বলে শুনেছি। কিন্তু সে অবস্থান থেকে প্রতাপশালী দেশটি আপাতত সরে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।

তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হোক যে খালেদা জামাত পরিত্যাগের কথা জানিয়ে আসলেই প্রকাশ্য একটা ঘোষণা দেবেন।  এখন দেখা যাক ঘোষণা দেবার পরে, কিভাবে জামাত ত্যাগ করার ব্যাপারটি বাস্তবায়ন করা হবে।

জামাত ভবিষ্যতে ইলেকশন করতে পারবে না। কেননা ওদের রেজিষ্ট্রেশন নেই। এছাড়া ভবিষ্যতে  জামাতের উপর আরও নানা ধরণের আইনি ঝামেলাও আসতে পারে। জামাতের সমর্থন ৫% থেকে ১০% বলে ধারণা করা হয়। একারণে ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৮০ লক্ষ থেকে দেড় কোটি  জামাত সমর্থক আছে বলে ধারণা করা যেতে পারে।

জামাতের রেজিষ্ট্রেশন যদি  না থাকে, ইলেকশন করার উপায় না থাকে, সরকারের অশেষ করুনায় যদি এতগুলো মানুষকে গণহত্যা করে মেরে না ফেলা হয়, কিংবা তাদের ভোটাধিকার কেড়ে না নেয়া হয়, তাহলে এই মানুষরা কাউকে না কাউকে ভোট দিবেন। এই মানুষগুলো কারও না কারও রাজনীতিক সভায় যোগ দিবেন। কারও না কারও ডাকা হরতালে পিকেটিং করবেন।

বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ যদি অটুট থাকে এবং জামাতের রেজিস্ট্রেশন যদি না থাকে, তাহলে জামাতের সমর্থকরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন কোন জোটকে সমর্থন দেবার সম্ভাবনা বেশি, যতদিন তারা নতুন কোন পার্টি না বানাচ্ছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে, যেটা খুব কম মানুষ করছেন। সরকার নিজে জামাতকে নিষিদ্ধ না করে, কেন খালেদা জিয়াকে জামাত ছাড়তে বলছেন? সরকার নিষিদ্ধ করে দিলে তো আর খালেদা জিয়ার জামাত ছাড়া না ছাড়ার ব্যাপার থাকে না !!

খালেদার দু’হাতের দুটো ব্যাগেজ নিয়ে কথা বলে শুরু করেছিলাম।  সেই ব্যাগেজ গুলো ছাড়া উচিত কি উচিত না সেটা আজকের আলাপ ছিল না। আজকের আলাপ হলো, তারেক কিংবা জামাতকে ছেড়ে দেবার মতো কোন ফুল-প্রুফ উপায় খালেদার আছে কিনা।

দুই ব্যাগেজ যদি কনক্রিট কোন উপায়ে সরিয়ে দেবার উপায় না থাকে, তাহলে এই প্রস্তাবের চটকদারী মুল্য থাকলেও, বাস্তবিক কোন মুল্য থাকার কথা না।  দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বলতে হচ্ছে যে, চটকদারী বিষয়েই মানুষের আগ্রহ সবচাইতে বেশি।

2 thoughts on “খালেদা কি চাইলেই তারেক কিংবা জামাতকে ছাড়তে পারবেন?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s