অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর আর অতি বড় সুন্দরী না পায় বর

by আতাহার হোসাইন
দীনের অতি বিশ্লেষণ করে দীনের প্রাণশক্তি বিনষ্ট করে দেওয়ার কাজটা নতুন নয়. আমাদের পণ্ডিতরাই শুধু এ কাজ করেন নি। পূর্ববর্ত্তী দীনগুলোতেও অতি-ধার্মিকরা গজিয়েছেন ও পাণ্ডিত্য জাহির করে তাদের দীনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন তার নবী মূসার (আ) জীবনী থেকে যেখানে আল্লাহ বনী ইসরাইলদের একটি গরু কোর’বানী করতে আদেশ দিলেন। মূসা (আ) যখন এই কোর’বানীর আদেশ বনী ইসরাইলদের জানিয়ে দিলেন তখন যদি তারা মোটামুটি ভাল একটি গরু এনে কোর’বানী করে দিতো তাহলে তাতেই কাজ হয়ে যেতো। কারণ কোরবানীর গরুটা কেমন হবে সে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন শর্ত্ত দেন নি। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে বলছেন- বনী ইসরাইল তা করে নি। তারা মুসার (আ) মাধ্যমে আল্লাহকে প্রশ্ন করতে লাগলো- গরুটার বয়স কত হবে, গায়ের রং কি হবে, সেটা জমি চাষের জন্য শিক্ষিত কিনা, জমিতে পানি দেয়ার জন্য শিক্ষিত কিনা, ওটার গায়ে কোন খুঁত থাকতে পারবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা প্রশ্ন করে যেতে লাগলো আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। তারপর যখন প্রশ্ন করার মত আর কিছুই রইলো না তখন স্বভাবতঃই ঠিক অমন একটি গরু পাওয়া দূরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একটা সহজ সরল আদেশ- “একটা গরু কোরবানী কর” এটাকে খুচিয়ে খুচিয়ে এমন কঠিন করে ফেলা হলো যে, অমন গরু আর পাওয়া যায় না। এই জাতির মহা পণ্ডিতরাও বিশ্বনবীর (দ) ওফাতের ৬০/৭০ বছর পর ঠিক ঐ কাজটাই মহা ধুমধামের সাথে আরম্ভ করলেন। দু’টি মাত্র আদেশ- আমাকে ছাড়া কাউকে মানবে না আমার দেয়া জীবন-বিধান ছাড়া আর কোন বিধান মানবে না, আর এই জীবন-বিধানকে সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করবে। সহজ, সরল দু’টি আদেশ। বিশ্বনবীর (দ) উম্মাহ ইস্পাতের মত কঠিন ঐক্য নিয়ে ঐ কাজ করতে আরব থেকে বের হয়ে অবিশ্বাস্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। পূর্ববর্ত্তী দীনের পণ্ডিতদের মত এ উম্মাহর পণ্ডিতরাও একে ধ্বংস করে দিলেন।
 
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। আমি ফিকাহ বা ফকিহদের বিরুদ্ধে বলছি না। কারণ কোর’আন ও হাদীস থেকে জীবন বিধানের নির্দেশগুলি একত্র ও বিন্যাস করলে যা দাঁড়ায় তাই ফিকাহ- অর্থাৎ ফিকাহ ছাড়া কোন মুসলিমের জীবনব্যবস্থা অনুসরন অসম্ভব। আমার বক্তব্য ঐ ফিকাহর অতি বিশ্লেষণ, সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ যা আল্লাহ ও তার রসুল (দ) কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমাদের ফকিহরা যদি কোর’আন-হাদীসের মৌলিক আদেশ নিষেধগুলিকে সুন্দরভাবে শ্রেণী বিন্যাস করেই ক্ষান্ত হতেন এবং লিখতেন যে এই-ই যথেষ্ট- এরপর আর অতিরিক্ত বিশ্লেষণে যেও না, কারণ আল্লাহ বলেছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না এবং রসুলাল্লাহও (দ) নিষেধ করেছেন, তাহলে তাদের কাজ হতো অতি সুন্দর। ইসলামকে প্রকৃতভাবে সেবা করা হতো এবং আল্লাহর কাছ থেকে তারা পেতেন প্রচুর পুরস্কার। কিন্তু দুর্ভাগ্য হোচ্ছে তারা তা করেন নি। তারা আজীবন কঠিন পরিশ্রম করে আল্লাহর আদেশ নিষেধগুলি ও বিশ্বনবীর (দ) কাজ ও কথাগুলিকে সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম বিশ্লেষণ করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পূর্ণভাবে পালন করা প্রায় অসম্ভব এবং কেউ চেষ্টা করলে তার জীবনে অন্য আর কোন কাজ করা সম্ভব হবে না, এ দীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ ফকিহরা তাদের ক্ষুরধার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে হাজার হাজার মসলা-মাসয়েল সৃষ্টি করেছেন। প্রধান প্রধানগণের এক এক জনের সিদ্ধান্তের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। জাতি ঐ মসলা-মাসায়েলের মাকড়সার জালে জড়িয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেছে, স্থবির হয়ে গেছে।
 
এই পঙ্গুত্ব, স্থবিরত্ব থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ এই দীনকে করলেন অতি সহজ ও সরল, সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমা। কোন বিষয়েই আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান, কারো নিয়ম-কানুন মানি না, শুধু এইটুকুমাত্র। এ যে কত গুরুত্বপূর্ণ, কত জরুরী তা বোঝাবার জন্য বললেন, এর বেশী তো আমি তোমাদের কাছে চাইনি। এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি সেরাতুল মোস্তাকীমকে প্রতি রাকাতে অবশ্য পাঠ্য করে দিলেন, যাতে প্রতিটি মুসলিম মনে রাখে যে, আমার দীন অতি সহজ, অতি সরল, আমি যেন কখনও একে জটিল না করে ফেলি, জটিল করে ফেললে আমার দীনের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই সেরাতুল মোস্তাকীমের সহজতার, সরলতার মহা গুরুত্ব উপলব্ধি করে রসুলাল্লাহ (দ) এক হাদীসে বললেন- দীন সহজ, সরল (সেরাতুল মোস্তাকীম) একে নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করবে তারা পরাজিত হবে। অন্য হাদীসে বললেন, জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে । এই সাবধান বাণীতেও আশ্বস্থ না হোতে পেরে বিশ্বনবী (দ) আরও ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনালেন। বললেন- কোর’আনের কোন আয়াতের অর্থ নিয়ে বিতর্ক কুফর। এবং কোন অর্থ নিয়ে মতান্তর উপস্থিত হোলে আমাদেরকে কি করতে হবে তারও নির্দেশ তিনি আমাদের দিচ্ছেন। বলছেন, কোন মতান্তর উপস্থিত হোলে তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও । অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে যখনই মতান্তর উদ্ভব হবে তখনই চুপ হয়ে যাবে, কোন তর্ক-বিতর্ক করবে না। অর্থাৎ বিতর্কে যেয়ে কুফরি করবে না, এবং যে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই সেই সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমাকে আকড়ে ধোরে থাক, এখানে লক্ষ্য করার একটা বিষয় আছে, দীনের ব্যাপার নিয়ে বিতর্ককে আল্লাহর রসুল (দ) কোন পর্যায়ের গুনাহ, পাপ বোলে আখ্যায়িত করছেন। চুরি নয়, হত্যা নয়, ব্যভিচার নয়, বলছেন- কুফর। যার চেয়ে বড় আর গোনাহ নেই, শুধু তাই নয় যা একজনকে এই দীন থেকেই বহিষ্কৃত করে দেয়।
 
এতবড় শাস্তি কেন? শেষ নবীর (দ) হাদীস থেকেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। তিনি বলছেন- তোমরা কি জান, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে? এই প্রশ্ন করে তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছেন- শিক্ষিতদের ভুল, মোনাফেকদের বিতর্ক এবং নেতাদের ভুল ফতোয়া । যে কাজ ইসলামকেই ধ্বংস করে দেয় সে কাজের চেয়ে বড় গোনাহ আর কি হোতে পারে! তাই বিশ্বনবী (দ) এই কাজকে কুফ্রি বোলে সঠিক কথাই বলেছেন।
 
এই জাতির মহাদুর্ভাগ্য। আল্লাহর ও তার রসূলের (দ) এতসব কঠোর সতর্কবাণী এই উম্মাহর পণ্ডিতদের কিছুই মনে রইল না। তারা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোর’আন-হাদীসের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে এক বিরাট ফিকাহ শাস্ত্র গড়ে তুললেন। এদের মণীষার, প্রতিভার, অধ্যবসায়ের কথা চিন্তা করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, কিন্তু তাদের ঐ কাজের ফলে এই উম্মাহ ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে গেলো। শত্র“র কাছে পরাজিত হয়ে গেলো।
 
ফিকাহর যে অতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার পক্ষে একটি যুক্তি আছে এবং সে যুক্তি আমি সম্পূর্ণ স্বীকার করি। সেটা হোচ্ছে ইসলামের আইন-কানুনের বিচারালয়ে ব্যবহার। অর্থাৎ বিচারালয়ে এই আইনের সুক্ষ্ম প্রয়োগ যাতে কোন নিরপরাধ শাস্তি না পায়। অনৈসলামিক যেসব আইন বর্ত্তমানে পৃথিবীতে চালু আছে, অর্থাৎ মানুষ রচিত আইনগুলি, এগুলিও সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেই বিচরালয়গুলিতে বিচার করা হয়- উদ্দেশ্য সেই একই- সুবিচার। কিন্তু সে জন্য কোন দেশেই জ্ঞানের অন্যান্য সমস্ত শাখাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে সেই দেশের সংবিধানের এবং আইনের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় নি। শুধু যারা আইনজ্ঞ হোতে চান, আইনজীবি হোতে চান তারা স্ব-ইচ্ছায় ঐ বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেন, ডিগ্রী নেন এবং তারপর আদালতে যোগ দেন। অর্থাৎ চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা ইত্যাদির মত আইনকেও একটি বিশেষ (special) জ্ঞান হিসাবে শিক্ষা করেন। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা তা না করে জাতির মধ্যে এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করে দিলেন যে আইনজ্ঞ হওয়াই মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, জ্ঞানের অন্যান্য শাখা শিক্ষা করার কোন প্রয়োজন এ জাতির নেই। এই কাজের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যা হবার তাই হলো, জাতি জ্ঞানের অন্যান্য শাখাসমূহে যে বিস্ময়কর জ্ঞান চর্চা করে পৃথিবীর শিক্ষকের আসন লাভ করেছিলো তা ছেড়ে দিয়ে একটি মুর্খ, অশিক্ষিত জাতিতে পরিণত হলো। উদাহরণরূপে বলা যায় যে, আজকের কোন রাষ্ট্রে যদি শিক্ষা নীতি এই করা হয় যে, সেই রাষ্ট্রের সংবিধান ও ঐ সংবিধান নিসৃতঃ আইন-কানুন ও তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনই একমাত্র শিক্ষার বিষয়বস্তু হবে, বর্ত্তমানের মাদ্রাসা শিক্ষার মত, তবে কি হবে? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তাহলে বিদ্যালয়গুলিতে নিচু ও প্রাথমিক শ্রেণী থেকেই ঐ বিষয় একমাত্র পাঠ্যবিষয় করা হবে। দু’এক প্রজন্মের মধ্যেই ঐ রাষ্ট্রের লোকজন শুধু তাদের দেশের সংবিধান ও আইন-কানুনের সুক্ষাতিসুক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া আর কিছুই জানবে না, অন্যান্য সব বিষয়ে অজ্ঞ হয়ে যাবে। জাতির যা ভাগ্য হওয়া উচিত তাই হলো- অন্য জাতির কাছে পরাজিত হয়ে যে সংবিধান ও আইন-কানুন নিয়ে এত বিশ্লেষণ করা, সেই আইন-কানুন বাদ দিয়ে বিজয়ী জাতির আইন-কানুন গ্রহণ করা হলো। নিজেদের আইন-কানুন সংবিধান শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন রকমে টিকে রোইলো। যে আইন শিক্ষাকেই একমাত্র শিক্ষণীয় বোলে ঘোষণা করা হলো, মুসলিম দুনিয়াতে আজ সেই আইনে বিচার হয় না, বিচার হয় পাশ্চাত্যের মানুষের তৈরী, গায়রুল্লাহর আইনে, দণ্ড হয় পাশ্চাত্যের দণ্ডবিধি মোতাবেক অর্থনীতি পরিচালিত হয় পাশ্চাত্যের সুদভিত্তিক অর্থনীতি মোতাবেক। অথচ এ সবই ফিকাহ শাস্ত্রের আওতাধীন। তবুও এদের মাদ্রাসগুলিতে অন্ধের মত এগুলো পড়িয়ে যাওয়া হাচ্ছ, শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। যে আইনের প্রয়োগই নেই সেই আইনই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। কী নিষ্ঠুর পরিহাস। অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (দ) বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। কাউকে বাড়াবাড়ি করতে দেখলেই রাগে বিশ্বনবীর (দ) পবিত্র মুখ লাল হয়ে যেতো। কারণ তিনি জানতেন যে, অতি বড় সুন্দরী ও অতি বড় ঘরণীর মত অতি বড় মুসলিম না পায় দুনিয়া না পায় জান্নাত।
আতাহার হোসাইন, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক দেশেরপত্র।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s