জর্জ সেল – এর কোরান

George Sale

Thomas Jefferson

২০০৭ এর জানুয়ারিতে আমেরিকান কংগ্রেসের প্রথম নির্বাচিত মুসলিম সদস্য কীথ এলিসন (Rep. Keith Ellison, D-Minn) লাইব্রেরী অফ কংগ্রেস থেকে সংগৃহীত কুর’আনের যে কপিটির উপর হাত রেখে কংগ্রেসে শপথ নেন, তার মূল স্বত্বাধিকারী ছিলেন আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, টমাস জেফারসন (Thomas Jefferson). জেফারসন বিবিধ কারণে ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন যা ডেনিস স্পেলবার্গ (Denise A. Spellberg) তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বই ‘Thomas Jefferson’s Qur’an’ এ তুলে ধরেছেন। ১৭৬৫ সালে আইনের ছাত্র থাকা অবস্থায় তরুণ জেফারসন যে কুর’আনটি কেনেন, তা ছিল সরাসরি আরবি থেকে ইংরেজি ভাষায় কুর’আনের প্রথম অনুবাদ। জর্জ সেল নামক একজন তরুণ ইংরেজ ল’ইয়ারের করা এ অনুবাদটি ছিল প্রায় দুইশ বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্যে কুর’আন বিষয়ক গবেষণা ও ধারণার অন্যতম প্রধান উৎস।

প্রেক্ষাপট: ইউরোপীয়দের ইসলাম বিষয়ক আগ্রহ

মধ্যযুগ থেকেই ইউরোপে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় (এ বিষয়ে আমার আগের লেখাতে কিছুটা আলোচনা করেছি)। ইউরোপে যখন ‘অন্ধকার যুগ’ চলছিল, তখন এশিয়া, ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকার বড় অংশ জুড়ে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। আনাতোলিয়া, আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যে সাফাভিদ সাম্রাজ্য, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো সভ্যতাগুলো কেবল প্রবল পরাক্রমশালী হিসেবেই নয়, বরং তাঁদের সঙ্গীত, কবিতা, বাগান, মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্প-সহ পরিশীলিত শিল্প-সংস্কৃতির কারণেও বিশ্বজুড়ে সুবিদিত ছিল। একই সাথে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার সেই সময় আরবি ভাষায় সংরক্ষিত ছিল। শুধু বিজ্ঞান বা দর্শন বা বাণিজ্যই নয়, আরবি সাহিত্যও ইউরোপীয় অনুবাদকদের উৎসাহিত করেছে। ১৭০৪ সালে একজন ফরাসী আরবি থেকে ‘সহস্র রজনীর গল্প’ প্রথম অনুবাদ করেন যা সেই থেকে আজ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের কাছে রোমাঞ্চকর ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।

তবে সব কিছুর উপরে ইসলাম ধর্ম বিষয়ক অনুসন্ধান ও গবেষণা বিবিধ কারণে অনেক ইউরোপীয় পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের আগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে। সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ থেকে আসা স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম কি করে এত দ্রুত সময়ের মধ্যে জানা বিশ্বের এত বড় অংশ জয় করে নিয়েছিল, ইউরোপীয়দের জন্য তা একই সাথে ছিল গভীর বিস্ময়, অনেকটা অস্বস্তিরও কারণ। ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ার (Voltaire) এবং ইংরেজ ইতিহাসবেত্তা এডওয়ার্ড গিবন (Edward Gibbon) একে বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রশ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও, অনেক ইউরোপীয় দার্শনিক এবং মুক্তচিন্তার অধিকারী খ্রিস্টান ইসলামে স্রষ্টার একত্ববাদ সম্পর্কিত মূলনীতি বা মতবাদকে খ্রিস্টধর্মের জটিল ত্রিত্ববাদ (Trinity) অপেক্ষা যুক্তিপূর্ণ মনে করেছেন। এসব বিবিধ কারণে ইউরোপে ইসলাম এবং তার মূল আরবি ভাষার উপরে আগ্রহ তৈরি হয়।

ইংরেজি অনুবাদ

ইউরোপে কুর’আনের প্রথম অনুবাদটি হয় লাতিন ভাষায়। ১১৪৩ সনে ইংরেজ রবার্ট অফ কেটন (Latin: Robertus Ketenensis) কর্তৃক ধর্মীয় মোহান্ত (abbot) পিটার দ্য ভেনারেবল (Peter the Venerable) এর নির্দেশে করা Lex Mahumet pseudoprophete (‘The law of Mahomet the false prophet’) শীর্ষক অনুবাদটি ছিল অতিরঞ্জিত এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অপ্রীতিকর অর্থ বা মন্তব্য সম্বলিত, যার মূল উদ্দেশ্য এর শিরোনামেই প্রতিফলিত। খ্রিস্টান চার্চে বহুল প্রচলিত লাতিন ভাষার এ অনুবাদটি দুঃখজনকভাবে পরবর্তী কয়েকশ বছর ধরে পাশ্চাত্যে কুর’আনের অর্থ এবং সে হিসেবে ইসলামের মর্মার্থ অনুধাবনের একমাত্র উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূল আরবিতে না গিয়ে বরং লাতিন ভাষার এই কাজটিকে এর ভুল বা বিকৃতিসহ পরবর্তীতে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৬৪৯ সালে রাজা প্রথম চার্লস এর চ্যাপলেইন Alexander Ross ফরাসী Sieur du Ryer এর অনুবাদ L’Alcoran de Mahomet কে প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘The Alcoran, Translated out of Arabic into French. By the Sieur du Ryer, Lord of Malezair, and Resident for the French King, at ALEXANDRIA. And Newly Englished, for the satisfaction of all that desire to look into the Turkish Vanities’। শিরোনামের শেষাংশটি লক্ষণীয়।

প্রায় একশ বছর পর ১৭৩৪ সালে জর্জ সেল (George Sale 1697-1736) নামক জনৈক ইংরেজ আইনজীবী ও ওরিয়েন্টালিস্ট মূল আরবি থেকে সরাসরি ইংরেজি ভাষায় কুর’আন অনুবাদ করেন। কাজটির শিরোনাম ছিল ‘Koran, commonly called the Alcoran of Mohammed, tr. into English immediately from the original Arabic; with explanatory notes, taken from the most approved commentators. To which is prefixed a preliminary discourse’. বলা হয়, সেল তাঁর অবসর সময়ে আরবি ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং কোনও মুসলিম দেশে তিনি ভ্রমণ করেননি, যদিও অনেকে বলে থাকেন তিনি ২৫ বছর আরবে ছিলেন। সেল নিজেই তা অস্বীকার করে লিখেছেন, “I am but too sensible of the disadvantages, one who is neither a native, nor ever was in the country must lie under, in playing the critic in so difficult a language as the Arabick.” Society for the Promotion of Christian Knowledge in London এর পৃষ্ঠপোষকতায় সিরিয়ান খ্রিস্টানদের জন্য নিউ টেস্টামেন্ট-এর একটি আরবি অনুবাদ তৈরির উদ্দেশ্যে জর্জ সেল আরবি ভাষা শিখেছিলেন বলে ধারণা।

কুর’আন অনুবাদের কারণ হিসেবে জর্জ সেল লেখেন,

“If the religious and civil Institutions of foreign nations are worth our knowledge, those of Mohammed, the lawgiver of Arabians, and founder of an empire which in less than a century spread itself over a greater part of the world than the Romans were ever masters of, must need to be so.”

An Ottoman Qur’an manuscript

অনুবাদ কাজে সেল ১৬৯৮ সালে কাউন্টার-রিফর্মেশন রোমে প্রকাশিত Louis Maracci এর করা লাতিন অনুবাদের সাহায্য নেন। এছাড়াও লন্ডনের ডাচ চার্চে সংরক্ষিত কুর’আনের একটি হস্তলিখিত কপিও তিনি সংগ্রহ করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে তৈরি এই manuscript টি ১৬৩৩ সালে একজন ডাচ বণিক লন্ডন চার্চকে দান করেন। চার্চের লাইব্রেরিতে পড়ে থাকা কুর’আনের এই হস্তলিখিত কপিটি প্রায় একশ বছর পর সেল তাঁর অনুবাদ কাজে ব্যবহার করেন। কুর’আনের হস্তলিখিত কপিটি ঠিক কি কারণে সংগ্রহ করা হয়েছিল বা লন্ডনে আনা হয়েছিল, তা জানা যায় না। তবে, ইসলামের ধর্মগ্রন্থকে সে সময়ে আরবি ভাষার একটি কালেক্টেবল হিসেবে ধরা হতো এবং পড়তে না পারলেও অনেকে তা কেবল মূল্যবান বস্তু হিসেবে সংগ্রহ করতেন। সেল সরাসরি না বললেও ধারণা করা হয় যে তিনি কুর’আনের এই বিশেষ কপিটিকেই তাঁর অনুবাদ কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইস্তাম্বুলের কুর’আনটিতে কিছু শব্দের যে বিশেষ রূপ এবং মেইনস্ট্রীম অটোমান সাম্রাজ্যে সুপ্রচলিত কমেন্টারি দেখা যায়, সেল এর অনুবাদ এবং নোট এ তার রেশ পাওয়া যায়।

জর্জ সেল এর পূর্বে ১৬৪৯ সালে ফরাসী থেকে ইংরেজিতে যে অনুবাদটি করা হয়, তাতে মূল অনুবাদের ভুলের বাইরেও নতুন কিছু ভুল যোগ হয় বলে সেল মন্তব্য করেন। সে তুলনায় সেল এর অনুবাদটি ছিল লক্ষণীয়ভাবে পাঠযোগ্য, পরিশীলিত, এবং তুলনামূলকভাবে শুদ্ধ। কুর’আনের ভাষার সৌন্দর্য এবং তাঁর অনুবাদের সীমাবদ্ধতা বিনম্রভাবে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, ‘it must not be supposed the translation comes up to the dignity of the original’. এর পরেও তাঁর অনুবাদ কুর’আনের যে কোনও আধুনিক অনুবাদের সাথে তুলনীয়, যেমন আয়াতুল কুরসীর প্রথমাংশের অনুবাদ –

“GOD! there is no GOD but he; the living, the self-subsisting: neither slumber nor sleep seizeth him; to him belongeth whatsoever is in heaven, and on earth.”

একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐশ্বর্য

George Sale

জর্জ সেল এর অনুবাদটি কেবল একটি উচ্চমানের সাহিত্য কর্মই নয়, একইসাথে তা পাশ্চাত্যে ইসলাম বিষয়ক জ্ঞানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটি সুদীর্ঘ ভূমিকায় তিনি ইসলামের ইতিহাস, তাত্ত্বিক, ও ধর্মীয় বহু বিষয়ের ধারণা উল্লেখ করেন। তাঁর অনুবাদ কাজটির আগে যেকোনো ইংরেজি ভাষীর কাছে ইসলাম সম্পর্কিত তথ্যের একমাত্র উৎস ছিল লাতিন ভাষায়। সেল এর অনুবাদ ইসলাম বা কুর’আন সম্পর্কে পূর্বাপর কুসংস্কার বা উদ্দেশ্যপূর্ণ মিথ্যাচারের লাগাম টেনে ধরে। যেমন, মুহাম্মদ(সা:) এর জীবনী বর্ণনায় তিনি মধ্যযুগ থেকে চলে আসা কাল্পনিক ও বিতর্কিত গালগল্পের আশ্রয় নেন নি। বরং তিনি লেখেন,

“Mohammed was richly furnished with personal endowments, beautiful in person, of a subtle wit, agreeable behaviour, shewing liberality to the poor, courtesy to everone, fortitude against his enemies, and, above all a high reverence for the name of God.”

জর্জ সেল এমন একটি সময়ে অনুবাদ কাজটি করেন যখন ইউরোপে নতুন করে আরবি শেখা এবং ইসলামকে জানার একটি চল শুরু হয়েছিল। সে হিসেবে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের কাজ থেকে উপকৃত হয়েছেন। আবার, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যোগ করেছেন। তুলনামূলকভাবে সঠিক ধ্যান-ধারণা এবং একটি বিজাতীয় ধর্মকে জানার ও বোঝার আন্তরিক অভিপ্রায়ের সমন্বয়ে জর্জ সেল এর ‘Koran’ একটি সুদূরপ্রসারী এবং অসাধারণ কাজ যা বিংশ শতকের প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত কুর’আনের স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি অনুবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। কেবল সেল এর সমসাময়িকরাই নয়, বরং পরবর্তী প্রায় দুইশ বছর ধরে ব্রিটেন ও আমেরিকায় প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে কুর’আন ও ইসলাম বিষয়ক ধ্যান-ধারণার উৎস হিসেবে তা পরিগণিত হয়। বিশদ নোট সম্বলিত হবার কারণে আজও ইতিহাসবেত্তারা জর্জ সেল এর ‘কোরান’ ব্যবহার করেন। ঐতিহাসিক Michael Cook এর ভাষ্যে, “an old translation which has worn very well.”

অধুনা কুর’আনের বহু অনুবাদ হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজিতে কেবল একটি, উনবিংশ শতকে দুইটি, বিংশ শতাব্দীতে এসে অন্তত ১৬টি অনুবাদ পাওয়া যায়। এর পরেও একজন গড়পড়তা পাশ্চাত্যবাসী ইসলাম সম্পর্কে খুব কমই ধারণা রাখেন, যদিও অভিবাসন, বাণিজ্য, বা পর্যটনের কারণে এখন অহরহই মুসলিম-অমুসলিমের দেখাসাক্ষাৎ হয়। এয়ার ট্র্যাভেল, স্যাটেলাইট টিভি, বা ইন্টারনেটের এই যুগেও পৃথিবীর বিভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠীর মানুষদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও সহানুভূতি গড়ে ওঠেনি।

হয়তো জর্জ সেল এবং অসংখ্য প্রতিকূলতার মাঝে করা তাঁর অনুবাদ কাজটি সবার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। অসংখ্য ভুল ধারণা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য কয়েকশ বছর ধরে ইসলাম ও তার সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করছে। ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির অনুবাদ কাজ সামগ্রিকভাবে ইসলামের ধর্মীয়, সাহিত্যিক, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের স্বাদ আস্বাদন করার প্রচেষ্টারই অংশ।

[এই লেখাটি মূলত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত Alexander Bevilacqua এর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধের ভাবানুবাদ এবং সম্প্রসারণ। বোঝার সুবিধার্থে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং মন্তব্য এতে যোগ করা হয়েছে। মূল লেখাটির লিঙ্ক এখানে।]

http://shankhachilerdana.wordpress.com/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s