আমাদের জন্য এই মানুষগুলো লাশ হয়েছে

hartal

by zainuddin sani

লাশ আসতে শুরু করেছে। প্রায় প্রতিদিনই একটি দুটি করে আসছে। প্রায় পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। তবে সেই ম্যাজিক লাশের দেখা এখনও কেউ পায়নি। ডাঃ মিলন কিংবা নুর হোসেন অথবা সেই লগি বৈঠার আঘাত বা বিশ্বজিৎ। কিছু লাশ সরকারের পক্ষে যায় কিছু যায় সরকারের বিপক্ষে। কিছু লাশ বিরোধী দলের আন্দোলনকে চাঙ্গা করে দেয় কিছু লাশ বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে দেয়। আজকের কিংবা কালকের লাশটি কার পক্ষে যাবে কেউই জানি না। তবে এ ব্যাপারটি নিশ্চিত, সুযোগ পেলে সেই লাশ নিয়ে রাজনীতি করতে কেউই পিছপা হবে না।

পেট্রোল বোমার এখন ফ্যাশান চলছে। কক্টেলে এখন আর সেই বিভীষিকাময় ইফেক্ট দেয় না। এখানে সেখানে ঝলসে যায় কিছুটা, হয়তো মাংসে গেঁথে থাকে কিছু স্প্লিন্টার। তবে আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া বীভৎস লাস পেতে হলে চাই পেট্রোল বোমা আর নয়তো গান পাউডার। শিশুর লাশের ইমপ্যাক্ট সবচেয়ে ভালো। মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে যাওয়া শিরশিরে অনুভুতি, ইস, আহা, উহু— সবমিলিয়ে বাজারদর এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে এসব আগুনে পোড়া শিশুদের। এরপরে সম্ভবতঃ শিশুকে বাঁচাতে যেয়ে মায়ের মৃত্যু কিংবা অশীতিপর বৃদ্ধা নারী। পুরুষ মানুষের বাজারদর একটু কম। সঙ্গে কিছু রোমহর্ষক কিংবা করুণ গল্প থাকলেও, বাজারদর খারাপ হয়না। বরং শুরু হয় পত্রিকাগুলোর শিরোনামের খেলা।

লাশ যেমনই হোক, তা থেকে ফায়দা লুটতে দুই দলই নেমে পরে। সরকার নামে আবেগের ঝোলা নিয়ে। ‘দেখো দেখো, কি বীভৎসভাবে খুন করছে বিরোধী দল।‘ যত বীভৎস ততো প্রচারণা। টেলিভিশনে বার বার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো। স্বজনদের আহাজারি। ‘কি দোষ ছিল এই শিশুটির?’ কিংবা ‘এই বাবা এখন কি নিয়ে বাঁচবে?’ জ্বলন্ত গাড়ী কিংবা পথচারীদের মতামত। যা কিছু সরকারের পক্ষে যাবে বলে মনে করে, কাজে লাগাবেই সরকার। ব্লগ, ফেসবুক এবং সেখানে তাঁদের পেটোয়া বাহিনীতো আছেই। আলোচনাকে যতটা সম্ভব মুখরোচক করে তোলা হবে।

এই ধরনের লাশ নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যও বেশ গৎবাঁধা। ‘সরকারী দলের ষড়যন্ত্র’ কিংবা ‘এর পূর্বে যখন আপনারা বিরোধী দলে ছিলেন তখন কি করেছিলেন, তা কি ভুলে গেছেন?’ তবে তাঁদের মুখপাত্র যে ব্যাখ্যা সাংবাদিকদের সামনে পড়ে শোনাবেন সেখানে তিনি লাশের চেয়ে বেশি আগ্রহী হবেন, কেন এই হরতাল কিংবা অবরোধ ডাকতে হল, তাঁর ব্যাখ্যায়। রাজ্যের আবেগ ঢেলে দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করবেন, দেয়ালে তাঁদের পিঠ থেকে গিয়েছিল। হরতাল দেয়া ছাড়া আর তাঁদের কোন উপায় ছিল না। এরপরে আসবে সেই চিরাচরিত গণতান্ত্রিক অধিকারের গল্প, ‘হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার।‘

এই লাশগুলো বিরোধী দলের একেবারেই কাজে আসে না, এমন কিন্তু না। সাহায্য করে, তবে উল্টো পথে। লাশগুলো চিৎকার করে দেশবাসীকে বলে, বিরোধীদলের আন্দোলন, আদেশ, হুমকির পরোয়া করিনি বলে আমাদের এই দশা। তোমরা এই ভুল কর না। লাশের এই ইফেক্টটা বিরোধীদলের সত্যিকারের প্রত্যাশা, তবে তাঁরা সেকথা মুখ ফুটে বলে না। তাঁরা আবার এটাও বলে না, হে আমার দলের সমর্থকরা, তোমরা পিকেটিং কর না। আসলে এই লাশগুলো, বাহ্যিকভাবে বিরোধীদলের কিছুটা অপকার করে, ভেতরে ভেতরে উপকারই করে বেশি। আর সেকারণেই, বীভৎস এই লাশগুলোকে বাহ্যিকভাবে অপছন্দ করলেও, প্রতিটি বিরোধী দলই চায়, লাশ পড়ুক।

যে লাশগুলো বিরোধীদলকে সবচেয়ে বেশি প্রমোদ দেয়, তা হচ্ছে নুর হোসেন বা ডাঃ মিলন টাইপের লাশ। সরকারী পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে ঝড়ে পড়া কোন লাশ। আর সেটাও যদি আসে, সরকার বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময়ে, তবে তো আর কথাই নেই। সেই লাশ নিয়ে গল্প, কবিতা, কলাম সব কিছুই হবে। আঁকিয়েরা ছবি আঁকবে, কার্টুনিস্টরা ব্যঙ্গ করবে। বিরোধীদল সেই লাশ দেখিয়ে দেখিয়ে বলবে, ‘দেখো কি করছে সরকার’। আর সরকার বলবে, দেশের আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, এই কাজটা জরুরী ছিল।‘

লাশের এই রাজনীতি কি আদৌ বন্ধ হবে? কিংবা হরতাল, অবরোধের রাজনীতি? সৎ উত্তর হচ্ছে ‘না’। এই লাশ যতদিন রাজনৈতিক দলগুলোকে মুনাফার যোগান দিবে, ততোদিনতো অবশ্যই না। রাজনৈতিক দলগুলোকে একতরফা দোষও দিতে চাই না। একটি মিছিল কিংবা কিছু আহত, এমন রিপোর্ট আমরা নিজেরাই পড়ি না। লাশ না পড়লে আমরা নিজেরাও ভাবি না, বিরোধী দল সিরিয়াস। হরতালে কোন গাড়ী না পুড়লে, ভাংচুর না হলে, আমরা ধরেই নি, বিরোধী দল কোণঠাসা। আন্দোলনের ক্ষমতা নেই। টক শোতে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনাদের পিকেটিং করার লোক কৈ?’

সমস্যা সরকারী দলেরও। যদি তাঁরা বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে দেয়, আর সেখানে বিশাল লোকের সমাগম হয়, তখন প্রশ্ন শুনতে হবে, ‘সরকারের প্রতি আস্থা কি কমে গেছে?’ কিংবা ‘বিরোধীদল কি বেশি জনপ্রিয়?’ ফলে শুরু হয়, হালুয়া রুটির বিনিময়ে লোক এনে সমাবেশ ভর্তি করা। একদিন সরকারী দল সিঙ্গারা খাওয়ায় তো আরেকদিন বিরোধী দল মিষ্টি খাওয়ায়। আজ সরকারী দল গালি দেয় তো কাল বিরোধী দল গালি দেয়। আমরাও বসে থাকি, বেশি ভালো গালি দিতে পারে, তা দেখবার জন্য। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, আমরাই বাধ্য করছি এই দুই দলকে, ‘শুরু কর মুষ্টিযুদ্ধ’ ‘দখল কর এই দেশ’।

এই মুহূর্তে কোন দলের পক্ষেই পেছানো সম্ভব না। বা সম্মান নিয়ে পেছানো সম্ভব না। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, যে পেছাবে, তারই পরিনতি হবে ভয়াবহ। আমরা জনগণ, তাকেই গালি দিব, ‘ব্যাটা পারিস না তো লাগতে যাস কেন?’ নতুন কোন লাশ যেন আর তৈরি না হয়, যেন শান্তি ফিরে আসে, এই উদ্দেশ্যে যে কেউ এক পা এগোবে, আমরা ধরে নেব, সেই দলই হারল। সরকারের তত্ত্বাবধায়কের দাবী মানা, মানেই সরকার হারল। কখনই ভাবব না, এই সিদ্ধান্ত কত উপকার করল। কখনই ভাবব না, এই সিদ্ধান্তের কারণে, কত মানুষ লাশ হওয়া থেকে বেঁচে গেল। উল্টোটাও ঠিক। বর্তমান সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে রাজী হলে, ‘বিরোধী দলের মুরোদ নাই আন্দোলন করার’।

এই লাশের মিছিল চলবেই। আমাদের জন্যই চলবে। আমাদের এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা দেখার অভ্যাসের জন্যই চলবে। ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়, বুঝে কিংবা না বুঝে, আমরাই নিরন্তর উসকে দিচ্ছি এই লাশের উৎপাদন। পত্রিকায় কিংবা টেলিভিশানে দেখে আঁতকে ওঠার আগে আমাদের একবার ভেবে দেখা উচিৎ, এই লাশের পেছনে আমাদের নিজেদের দায় কতোটুকু।

প্রভু, ফোনে না বলে প্রকাশ্যেই বলুন

amit shah

by zainuddin sani

দুজনেই হুমকি দিয়ে রেখেছেন, বিশ্ব ইজতেমা শেষ হলে, তারপর শুরু করব। এই কথার আরেকটি অর্থ হচ্ছে, আমাদের সাধারণ মানুষকে আপাততঃ ১৯ তারিখ পর্যন্ত এই জেদাজেদি সহ্য করতে হচ্ছে। কেউই পিছিয়ে আসবে না। সরকারও ম্যাডামকে মুক্ত করবে না আর বিরোধী দলও অবরোধ তুলবে না। বিএনপিরও ক্ষমতা নেই তাঁদের নেত্রীকে মুক্ত করার আর ওদিকে সরকারেরও ক্ষমতা নেই অবরোধ বন্ধ করার। দেশবাসীর এই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা নিয়ে দুই দলের কেউই বিচলিত না। দুইজনেরই চাই বিজয়।

যুদ্ধটা কারো পক্ষেই হারা সম্ভব না। বিএনপি পিছিয়ে আসা মানে তাঁদের সমুহ পতন। আগামী চার বছর তাকিয়ে তাকিয়ে এই সরকারের দেশ পরিচালনা দেখতে হবে আর হাত কামড়াতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামীরা হারলে এই ছয় বছরের অত্যাচারের প্রতিশোধ কড়ায় গণ্ডায় উসুল করবে বিএনপি জামাত জোট। দুই দলেরই থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বসে গেছে, পরবর্তী করনীয় নিয়ে অংক কসতে। বিএনপি হিসাব কষেছে, এভাবে আরও কিছুদিন চালাতে পারলে, সরকারের পতন হবেই। আওয়ামীরা অংক কষছে, হার্ড লাইনে গিয়ে, বিএনপির মেরুদণ্ড একবার ভেঙ্গে ফেলতে পারলে, আর সমস্যা হবে না।

পাল্লা কোন দিকে ভারী, এনিয়ে কথা বলার বেশ বড়সড় বিপদ আছে। অবস্থা এমন, ‘উইথ মি ওর এগেন্সট মি’। আওয়ামীরা সঠিক পথে আছে—এমন কিছু বলেছেন মানেই আপনি অবধারিতভাবে ওদের দলে। বিএনপি ঠিক করছে বললেও বিপত্তি আছে—আপনি বিএনপি করেন। দুজনেরই দোষ, এমনটা বললে, আপনাকে কেউ ডাকবেও না, আপনার কথা কেউই শুনবেও না, বলবে ধান্ধাবাজ, এখন দুই দিকেই তাল দিচ্ছে, যে টিকবে তাঁর দিকে হেলবে। কিংবা তখন হিসেব করবে, আগে আপনি কোন দিকে ঘেঁষে ছিলেন, কবে কি লিখেছিলেন বা বলেছিলেন। কিংবা পালটি মারবার ধান্ধায় আছেন কিনা। টক শো এখন হয়ে গেছে বুদ্ধিজীবীদের দলবাজি করার মোক্ষম জায়গা। আগে পত্রিকায় কলাম লিখে বোঝাতেন, ‘আপনিই আমার হুজুর’ আর এখন দুই দলের হয়ে ঝগড়া করে বোঝাচ্ছেন, ‘আমি আপনারই পা চাটি’।

সমস্যা দেখা দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের। তাঁরা কার দিকে তাকাবে? কার কাছে প্রত্যাশা করবে? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। দুই দলের কেউই তাঁদের কথা ভাবে না, এই তথ্য তাঁরা জানে। এও জানে, ভোট এদের দুজনের একজনকেই দিতে হবে। তথ্যটা এই দুই দলও জানে। তাঁদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীরা ইদানীং এই সুরেই কথা বলা শুরু করেছেন। ‘দেখুন দুই দলই চোর। টাকা উপার্জনের জন্যই এই পেশায় আসা। ফলে যাকেই বসান আপনার বা দেশের কোন উন্নতি হবে না। এরা দুর্নীতি করবেই, টেন্ডারবাজী করবেই। এখন বেছে নিন, কাকে চান।‘ এরপরে দুই দল দুই কথা বলছে। একদল বলছে, গনতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে আর অন্য দল বলছে দেশে গনতন্ত্র দিলে দেশবাসী এমন এক দলকে বেছে নেবে যার সঙ্গে রাজাকার ফ্রি, তাই গনতন্ত্র হত্যা জরুরী।

ফলে ঘুরে ফিরে বিতর্ক মজার এক যায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে, এদেশের লোক এখনও গনতন্ত্র বুঝতে শেখেনি। তাঁরা ভালো আর মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখেনি, ভোটের মুল্য বুঝতে শেখেনি। এখানে এখনও ‘হামগের ছাওয়াল’ শুধু এই কারণে একটি দলকে ভোট দেয়া হয়, নেতার জন্মস্থানের কারণে একজন একটি এলাকার ভোট পান, কেউ বা ভোট চান এলাকার পুত্রবধু হিসেবে। তাই আপাততঃ এদেশের লোকের জন্য গনতন্ত্র না। ব্রিটিশদের কাছে স্বাধীনতা চাওয়ার সময় কমবেশি এরকমই একটি কথা তাঁরা বলেছিল, ‘ইউ কান্ট রুল দাইসেলফ’। নিজেদের শাসন করার যোগ্যতা তোমাদের এখনও হয়নি। তাই তোমাদের শাসন করার ভার আমাদের হাতেই থাক।

সরাসরি না হলেও আমরা পর্দার আড়ালে এই কথাটি মেনে নিই। বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে গিয়ে নিজেদের ইন্টারভিউ দিই। বলি, ‘আমি ওর চেয়ে ভাল, এবার আমাকে দয়া করে ক্ষমতায় বসান। আপনি যা চাইবেন, সব পাবেন। একবার সুযোগ দিয়ে দেখেন। আগেরবার কিছু ভুল করেছিলাম, তবে এবার আর হবে না‘ অন্য দল বলে, ‘একদম বিশ্বাস করবেন না ওর কথা। আর আমাকে পালটাবার দরকার কি। ও যা দিবে বলছে, আমিও তো তা দিচ্ছি। শুধু শুধু ঝুঁকি নেয়ার দরকার কি?’

বিদেশীরাও উপদেশ দেন, সার্টিফিকেট দেন আর অবশেষে চিন্তা ভাবনা করে একজনকে ক্ষমতায় বসিয়ে সবার উদ্দেশ্য বাণী দেয়, ‘এ হচ্ছে দেশবাসীর পছন্দ’। সত্যি বলতে, আমাদের এই ফর্মুলায়ও তেমন কোন আপত্তি নেই। হেসে খেলে এই বক্তব্য আমরা হজম করি। আমাদের নেতা নেত্রীরাও বেশ গর্ব করে বলেন, অমুক দেশ আমাদের সরকারকে অভিনন্দন করেছে। অন্য দল আবার জানান দেয়, মিথ্যা বলছে, আমাদের আসল প্রভু আমেরিকা এখনও অভিনন্দন দেয়নি।

সম্প্রতি প্রতিবেশি দেশের বেশ কদর বেড়েছে। শীতল যুদ্ধ শুরুর কারণেই হোক আর দক্ষিন এশিয়ায় শক্ত অবস্থান তৈরির উদ্দেশ্যেই হোক, প্রতিবেশি দেশটির স্নেহ না পেলে এদেশের ক্ষমতায় আরোহণ সম্ভব না। ফলে শুরু হয়েছে কেবলা পরিবর্তন। কে কার চেয়ে বেশি পা চাটতে পারেন, তার প্রতিযোগিতা। সম্প্রতি হওয়া ফোনালাপ, কিংবা বলা উচিৎ, ফোনালাপের গুজব নিয়ে দুই দলের কর্মী, নেতা এবং তাঁদের বশংবদ বুদ্ধিজীবীরা যেমন কাদা ছোঁড়াছুড়ি করলেন, তা দেখতে বেশ মজাই লাগল।

ফোনালাপ আদৌ হয়েছিল কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ফোনালাপের কথা ঘটা করে বলবার কি আছে? সবাইকে বোঝানো, আমার দিকে প্রভুর সুনজর আছে? আর অন্য দলের চামচা বাহিনীর উল্লাস ছিল দেখবার মত। ফেসবুক, ব্লগ, পত্রিকা, টক শোতে ছিল উল্লাসের ছড়াছড়ি। গর্বিত কণ্ঠে বেশ উল্লাস করে বলছে, ‘আরে দূর, ভয় পাওয়ার কিছু নাই, ফোন করেই নি।‘ আচ্ছা, এই উল্লাসের কারণ কি? ‘প্রভু এখনও মত পাল্টান নি?’

যদি তাইই হয়, তবে আমাদের ভোট দেয়ার দরকার কি? আপনারা ঠিক করুন, কে কে আমাদের প্রভু। বরং তাঁদের ভেতর একটি ভোট করুন। অবস্থা যদি এমনই হয়, যে আমাদের প্রভু কথিত সেই ব্যক্তি, তাঁর সিদ্ধান্তেই যে সব কিছু ঘটছে। আর সেটাও যখন ‘ওপেন সিক্রেট’ তবে আর লুকোছাপা কেন? তাঁর ভোট দানকে প্রকাশ্য করে দিতে সমস্যা কোথায়? ফোনে না বলে সর্ব সম্মুখেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে বলুন, তাঁর ভোট দানকেও প্রকাশ্য করে দিন। সবার জন্য নির্দেশনা জারী করুন, যে দলের জন্য তিনি ভোট দিবেন, সে গদিতে বসবে।

এতে দল দুটিও বাঁচে, জনগণও বাঁচে। তাঁরা তখন শুধু শুধু জনগণের কাছে বিভিন্ন উন্নয়নের মিথ্যা ওয়াদা না করে সেই প্রভুর কাছে নিজেদের সত্যি ওয়াদা পেশ করবে। যিনি বেশি মুখরোচক ওয়াদা করে প্রভুর মন জয় করতে পারবেন, তার জন্য বরাদ্দ হবে গদি। আমরাও পাব আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সরকার। আর প্রভুরাও পাবে একজন আজ্ঞাবাহী ভৃত্য।

আওয়ামীদের হাড়ে কি আবার কাঁপন লেগেছে?

lig2-300x200

by zainudin sani

বাজারে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আওয়ামীরা হঠাৎ ঘাবড়ে গেল কেন? গত একবছর তো বেশ সাহসের সাথেই চালাল। হঠাৎ এতো আগ্রাসী হয়ে ওঠার দরকার কি? কি হত একটা সমাবেশ করতে দিলে। গাজীপুরেরটাই বা আটকানোর দরকার কি ছিল। ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’এর সাথে ছন্দ মিলিয়ে ‘গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’ পয়দা করার দরকারই বা কি ছিল। নিজেদের ম্যোরাল বিজয় দেখানো? মুখে যত বড়বড় কথাই বলুক, আওয়ামীরা বুঝিয়ে দিয়েছে, তাঁরা বেশ বিচলিত। মনে মনে প্রত্যাশা করছে, ভালোয় ভালোয় এই শীতকাল যেন পার হয়ে যায়।

২০০৮এ নির্বাচিত হওয়ার পর যেভাবে আওয়ামীরা দেশ চালিয়েছিল, তাতে দুটো ব্যাপার বেশ পরিষ্কার ছিল। যে যাই বলুক, আমরা নিজেদের মত চলব, প্রয়োজনে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে। স্বৈরতান্ত্রিক তাঁরা আগেও ছিল, তবে এবার তিন চতুর্থাংশ পেয়ে সম্ভবতঃ তাঁদের মাথা আরও বেশি বিগড়াল। বিএনপির ৩২ দেখে ভাবল, ওদের আর কোন আশা নেই। দ্বিতীয়টি যে ব্যাপারটি স্পষ্ট ছিল তা হচ্ছে রাজাকার ইস্যু থেকে যতটা ফায়দা তোলা যায়, সেটা তোলা। দ্বিতীয় প্ল্যানটা খারাপ না হলেও প্রথম দিকে খুব কাজে দিচ্ছিল না। ব্যাপারটাকে অনেকটা বিএনপি জামায়াত বিভেদ তৈরির প্ল্যান হিসেবে দেখছিল সবাই। ভেতরে কি ঘটছিল তা নিয়ে মতামত দেয়া সম্ভব না, কারণ বিচারালয় নিয়ে প্রশ্ন করা সম্ভব না। তবে সবার মনেই সন্দেহ ছিল, জামায়াতের সাথে ভেতরে ভেতরে কোন আঁতাত হচ্ছে। তারপর ঘটনাটা ঘটল।

কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন আর তার বিজয় সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখানো, বিস্ফোরণ ঘটাল। এমন যে ঘটবে বা ঘটতে পারে, তা আওয়ামীরা স্বপ্নেও ভাবেনি। গণজাগরণকে প্রথমে পাত্তা না দিলেও, অচিরেই তাঁদেরকে পাত্তা দিতে বাধ্য হল। রাজাকারদের বিচার চলাকালীন রাস্তায় বিচার বিরোধী অবস্থানই দৃশ্যমান ছিল। বিচারের সমর্থনে তেমন কিছুর দেখা মিলছিল না। তাই একটি রায়ের বিরুদ্ধে এতো বড় সমাবেশ হবে, সরকার নিজেও বোঝেনি। কোন মিছিল মিটিং হরতাল ছাড়া, কেবল অবস্থান দিয়ে যে সরকারের হাড়ে কাঁপন ধরান সম্ভব, ব্যাপারটা প্রথম অনুধাবন করল আওয়ামীরা।

ব্যাপারটা বেগতিক হতে পরে দেখে তা ধ্বংসের প্ল্যান করতে হল। এমনও একটা কিছু যে আবার এই ধরনের অবস্থান তৈরি না হতে পারে। যদিও অবস্থানটি ছিল সরকারের আঁতাতের বিরুদ্ধে, তারপরও আওয়ামীরা অচিরেই বুঝে গেল, এই আন্দোলন পকেটে ঢোকান সম্ভব। আর এই সোজা কাজটা ছাত্রলীগ করে দিল। প্রথমে মঞ্চ ক্যাপচার, এরপরে সাধারণ জনতার মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং অবশেষে, হালুয়ারুটির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বিখণ্ডিত করন। পুরো ঘটনার যে সারাংশ দাঁড়াল, ‘এই ধরনের আন্দোলন তৈরিই হয় বিক্রি হওয়ার জন্য’ আন্দোলনটির এমন একটি ছবি চিত্রায়িত হল। দুটো সুবিধা হল, রাজাকার প্রশ্নে, আওয়ামীরা তাঁদের নিজ ফর্মুলায় ফিরে যেতে পারল আর এটাও নিশ্চিত করতে পারল যেন এরপরে যুব সমাজ আর কখনই এই ধরনের কোন ডাকে সাড়া না দেয়।

সরকারের হাড়ে দ্বিতীয় কাঁপনটি জাগিয়েছিল, হেফাজত। ফর্মুলা একই। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান। বেশিদিন চালাতে পারলে, সরকারের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা শুরু হয়ে যেত। এদের সামলানোর জন্য একই ফর্মুলা চলবে না, সেটা আওয়ামীরা বুঝেছিল। ধর্ম ব্যাপারটার সঙ্গে আওয়ামীদের সখ্য খুব বেশি না। ফলে ছাত্রলীগ দিয়ে এই আন্দোলন কব্জা করা যাবে না। তবে এক্ষেত্রে মুল সুবিধা ছিল অন্য জায়গায়। এই আন্দোলনে আসা জনতার অনভিজ্ঞতা। তাঁদের মনে হয়েছিল, জ্বালাও পোড়াও মানেই বিজয়। যে শিশুদের নিয়ে এই অবস্থান আন্দোলন তৈরি হয়েছিল তাঁদের সাহস ব্যাপারটাও ছিল একটি ইস্যু। আর সেই রাতের অতর্কিত আক্রমণও ছিল অপ্রত্যাশিত, বা হয়তো তাঁদের নেতাদের কাছে প্রত্যাশিত এবং প্রকাশিত। যাই হোক অপারেশান সাকসেসফুল।

এই দুই ঘটনার পর থেকে, সরকারের অবচেতনে একটি ব্যাপারই তাড়া করছিল, আর তা ছিল অবস্থান আন্দোলন। ঢাকার প্রবেশ মুখে একবার যদি বিরোধী দল অবস্থান শুরু করতে পারে, তবে কাহিনী পাল্টাতে সময় লাগবে না। আর সেই অবস্থানে যদি ম্যাডাম স্বয়ং থাকেন, তবে তো পরিণতি আরও ভয়ানক হয়ে যাবে। অন্তর্কলহ আর একরাশ মামলা দিয়ে যত সহজে বিএনপি নেতাদের কাবু করা গেছে, একবার অবস্থান আন্দোলন শুরু হয়ে গেলে, তাঁরাও পকেট থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করবে। বিএনপি নেত্রীকে মামলা দিয়ে থামানো যাবে না, জানতো। ফলে নতুন কোন প্ল্যানিং জরুরী ছিল। তবে গনতান্ত্রিকভাবে তা করা সম্ভব না, এটাও জানত। রাস্তা একটাই ছিল, তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে দেয়া। কিংবা একাকী করে দেয়া।

সত্যিকারের নির্বাচন হলে যে হারবে, আওয়ামীরা সেটা জানতো। আবার এও জানতো, আন্দোলন করে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী তাঁরা মানাতে পারবে না। হোলও তাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার জবাই করবার পর থেকে বিএনপি কোন আন্দোলনই দানা বাঁধাতে পারেনি। হরতাল আর অবরোধ, সেই অর্থে আর রাজনৈতিক হাতিয়ার নেই। আর দুইএকদিনের এমন কর্মসূচীতে আজকাল আর সরকার কর্ণপাতও করেনা। আর তাই গতবছরের ৫ই জানুয়ারির পর থেকে সরকার বেশ আরামেই ছিল। আওয়ামীদের জন্য ভয়ের সময় বলতে এই শীতকাল। এটা পার হলেই, পরিস্থিতি আবার নিয়ন্ত্রণে। আর বিএনপির জন্যও আশার সময় এই শীতকাল। যা করার এই সময়েই করতে হবে। মামলা আর অন্তুর্কলহের কারণে বিএনপি এখন পর্যুদস্ত। টিমটিম করে আশার যে বাতিটি জ্বলছে, তা জ্বালিয়ে রেখেছেন বিএনপি নেত্রী।

আওয়ামীরা ঠিক করল, নেত্রীর ওপরও আঘাত হানবে। মামলার দিন পড়তে লাগল। মামলায় কাজ হবে না, আওয়ামীরা জানে। তবে কিসে কাজ হবে, সেটা জানে না। এদিকে হরতালও যে কাজে দেবে না, সেকথা বিএনপিও জানে। কিসে কাজ হবে, সেব্যাপারেও তাঁরা বেশ অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক ইতিহাস বলে, আওয়ামী সরকারের হাড়ে কাঁপন ধরাতে পেরেছিল কেবল অবস্থান আন্দোলন। আর সেটা যদি হয়, ঢাকার প্রবেশ মুখে। আওয়ামীদের ভেতর সেই জুজুর ভয় ছিলই। তাই সম্ভবতঃ তাঁরা ঠিক করে রেখেছিল, ঢাকার প্রবেশ মুখে সমাবেশের কোন সুযোগ দেয়া হবে না। প্রয়োজনে ‘নেড়িকুত্তা’ ইফেক্ট দিতেও তাঁরা রাজী ছিল। নেত্রীকে ঢাকার বাইরে সমাবেশ করতে দিলেও, ঢাকার প্রবেশ মুখের আশে পাশে করতে দেয়ার ঝুঁকি নিতে রাজী ছিল না আওয়ামীরা। সেই ফর্মুলার প্রথম প্রকাশ দেখা গেল গাজীপুরে।

সমাবেশের পরবর্তী প্ল্যান বিএনপি করেছিল ৫ই জানুয়ারী। সেটা আটকাবার ফর্মুলা হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করল, ‘মার্চ ফর ডেমক্রেসি’র পুরনো ফর্মুলা। ম্যাডামকে অন্তরীন রাখা। আর সেটা করবার জন্য সেই বালুর বস্তা। হয়তো প্রত্যাশা ছিল, আবার রেগে গিয়ে ‘গোপালি’ বলবেন। টুই তোকারি করবেন। তবে এবার তিনি শান্ত ছিলেন। তবে বরাবরের মত সমালোচনা হল, বিএনপির অন্য নেতাদের মেরুদণ্ডহীনতার। মামলার ভোয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার। প্রথম দিকে সরকারকে বিজয়ী মনে হলেও, পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করেছে মনে হচ্ছে।

আসলে ৫ই জানুয়ারী নিয়ে আওয়ামীদের প্ল্যানিং বেশ অগোছাল মনে হয়েছে। বালি, খোয়ার ট্রাকের মত হাস্যকর ফর্মুলা, ইচ্ছে করে নেয়া, না ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ আটকাবার ফর্মুলার রিপিট টেলিকাস্ট, বোঝা যাচ্ছে না। কারণ যেটাই হোক, আগেরবার ফর্মুলাটা কাজে দিয়েছিল। তবে এবার কাজটা যেভাবে বিদেশী মিডিয়ায় এসেছে, আর তালার যে দৃষ্টিকটু ব্যবহার হয়েছে, তা সরকারের জন্য খুব সুখকর হয়নি। এই মুহূর্তে ব্যাপারটা বেশ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। না পারছে তালা খুলে দিতে, না পারছে তালা লাগিয়ে রাখতে। তারচেয়েও বড় সমস্যা, খুব যুক্তিযুক্ত কোন ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না এই ‘তালা’র। সবার সামনে স্বীকার করতে পারছে না, ম্যাডামকে ছাড়লে, আর তিনি একটি সমাবেশকে অবস্থান আন্দোলনে পরিণত করতে পারলে, আমাদের গদি নড়ে উঠবে। গণজাগরণ আর হেফাজতের পরে সম্ভবতঃ প্রথমবারের মত আবার আওয়ামীদের হাড়ে কাঁপন লেগেছে। দেখা যাক এবার কি হয়।

বিএনপির ফ্র্যাঙ্কেন্সটাইন, বিএনপি নিজেই

bnp-final1

by zainuddin sani

হচ্ছি হচ্ছি করেও বিএনপির কিছু হচ্ছে না। আন্দোলনকে অংকুরে বিনাশের যে স্ট্র্যাটেজি আওয়ামীরা নিয়েছে, তাতে ভালোই কাজ দিচ্ছে। সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব আওয়ামীদের দেয়া ঠিক হবে না। কিছুটা কৃতিত্ব অবশ্য বিএনপিরও। নিজেদের অন্তর্কলহ থেকে শুরু করে নেতৃত্বের থাকা দুই জেনারেশানের একে অপরকে অবিশ্বাস, আওয়ামীদের কাজ আরও সহজ করে দিয়েছে। যেমনটা সাধারণতঃ হয়, অতি আত্মবিশ্বাস পতন ডেকে আনে, তেমনটা সম্ভবতঃ হতে যাচ্ছে, আওয়ামীদের। তাঁরা ভেবে বসে আছে, বিএনপি মাঠে নেই এই তথ্য যত প্রচারিত হবে, বিএনপির জন্য তা ততো ক্ষতিকর হবে। তবে ঘটনা সম্ভবতঃ তেমনটা ঘটছে না।

সহানুভূতি ব্যাপারটা বোধহয় কিছু নিয়ম মেনে চলে। তার একটা হচ্ছে অত্যাচারিতের দিকে ধাবিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বেশি যে ব্যাপারটা কাজ করছে, তা হচ্ছে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে যে তথ্য জনগণ পাচ্ছে, তা এমন একটি ছবি প্রকাশ করছে যে বিএনপি ভয়ানক অত্যাচারের শিকার। তাঁদের নেত্রী একটি সমাবেশ করতে চাইছে, তাঁকে সেটা করতে দেয়া হচ্ছে না। অফিস থেকে বেরোতে চাইছে, তাও দেয়া হচ্ছে না। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে বালু আর খোয়ার ট্রাক এর আগমন সবকিছু মিলিয়ে সহানুভূতি এই মুহূর্তে পুরো মাত্রায় চলে যাচ্ছে বিএনপির ঝুলিতে।

আওয়ামীদের বদান্যতায় কিংবা নির্বুদ্ধিতায় পাওয়া এই সুবিধাগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না বিএনপি। প্রথম সারির নেতারা বেশ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, গ্রেফতার হতে তাঁরা রাজী না। হুমকি ধামকি দিতে বলেন, আমি আছি কিন্তু রাস্তায় মিছিল বের করতে পারব না। কোন সমাবেশে ভাষণ দিতে পারবো না। হরতালের দিনে রাস্তায় থাকতে পারবো না। তাই বলে আমাকে বা আমার চামচাদের কোন কমিটিতে রাখবেন না, তাও করতে দেব না। নতুন কোন নেতাদের আমদানী করবেন, সেটাও বরদাশত করব না। ফলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বিএনপির রাজনীতি পুরোপুরি নেত্রী নির্ভর হয়ে বসে আছে।

প্রথম সারির নেতাদের এই স্বার্থপরতা দৃষ্টিকটু দেখালেও, তাঁদের এই অবস্থানের একটি নিজস্ব যুক্তি তাঁদের কাছে আছে। তাঁরা বেশ ভালো করেই জানেন, বিএনপি এই আন্দোলনে জিতলে, তাঁদের পায়ের তলায় আর কোন মাটি থাকবে না। বিএনপির ক্ষমতায় আরোহণ মানেই লন্ডন প্রবাসী নেতার প্রত্যাবর্তন। আর তিনি ফিরে দলের দ্বায়িত্ব নিলেই যাত্রা শুরু হবে তার নতুন ‘টীমে’র। আর সেই টীমে, পুরনোদের জায়গা হবে না। উপদেষ্টা জাতের কিছু আলংকরিক পদ দেয়া হতে পারে, তবে কর্তৃত্ব বলে কিছু থাকবে না। তাঁদের চোখের সামনেই তাঁদের এলাকায় নতুন আরেকজন নেতার উদয় হবে। দেখতে দেখতে তাঁদের চোখের সামনেই তাঁদের রাজনৈতিক মৃত্যু হবে। ফলে পুরনো নেতাদের এক বিশাল অংশ চাইছেন না, সেকেন্ড ইন কমান্ড দেশে ফিরুক।

এই মুহূর্তে বিএনপি দ্বিতীয় যে সমস্যায় আছে তা হচ্ছে, বিশ্ব ইজতেমা। সেকারণে অবরোধে ছাড় না দিলেও সমস্যা আবার দিলেও সমস্যা। ছাড় না দিলে, বিশাল এক জনতা অভিমান করবে। ভাববে, আমাদের কষ্টের কথা একবারও ভাবল না? আর অবরোধের কারণে যদি তাঁরা যোগ দিতে না পারে, তবে সেই অভিমান নতুন মাত্রা পাবে। দেশের অবস্থা ভেবে অনেকে মেনে নিলেও, সংখ্যায় তাঁরা হবেন বেশ কম। ওদিকে অবরোধে একবার ছাড় দিলে, আন্দোলনে আবার গতি আনা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। হয়তো অসম্ভবও। আর তেমনটা হলে, এই বছরের মত আন্দোলনের ইতি। এরপরের বছর আবার কিছু করবার চেষ্টা করলে, এই বছরের ব্যর্থতা তাঁদের পিছু ছাড়বে না।

এতোসব সমস্যার মধ্যে যুক্ত হয়েছে বিএনপির সমর্থক বুদ্ধিজীবী আর তার্কিকের আকাল। তাঁদের পক্ষ হয়ে লেখার জন্য নেই তেমন কোন কলামিস্ট, টক শো তে গিয়ে তাঁদের হয়ে ঝগড়া করবার জন্য নেই তেমন কোন তার্কিক। সঙ্গে যোগ হয়েছে, বিএনপি পন্থী চ্যানেল আর পত্রিকার অভাব। যাও দুএকটা ছিল, আপাততঃ বন্ধ আর নয়তো কেউই সেসব দেখে না বা পড়ে না। ফলে মিডিয়া ফ্রন্টে তাঁরা তাঁদের কথা, বলতেও পারছে না। আর যাদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে, তাঁদের পারফর্মেন্স বেজায় ভয়ংকর। সঙ্গে যোগ হয়েছে তারেক রহমানের বাণী। দলের কার্যক্রমকে যদিওবা কোন ভাবে ‘ডিফেন্ড’ করছে, ‘রাজাকার’ ইস্যু একেবারেই তাঁদের নাকাল করে ছেড়েছে। পুরনো নেতারা এখন আত্মগোপনে, নতুন নেতারা এখনও ভালো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেননি।

এমন একটা ফাঁকা মাঠ আওয়ামীদের জন্য মজার এক সমস্যা তৈরি করে দিয়েছে। নিশ্চিত জয় দেখতে পেয়ে তাঁরা এই মুহূর্তে খেলার বদলে উল্লাসের দিকেই মনোযোগী হয়ে উঠেছে বেশি। সারাক্ষণ শ্লেষাত্মক কথা, বিএনপি নেত্রীকে অপমান করা, বাকি নেতাদের ‘নেড়িকুত্তা’র মত পিটুনি দিতে চাওয়া, এসবের ভেতরে তাঁরা তাঁদের জয় দেখতে পাচ্ছেন। গায়ের জোরে পাওয়া বিজয়কেই তাঁরা রাজনৈতিক বিজয় ভাবছেন। ভুলে যাচ্ছেন, রাজনীতির খেলায় সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে জনগণের বিবেচনা। তাঁরা কি ভাবছে, সেই ব্যাপারটা মাথায় রাখা। আর বিরোধী দলের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হতে না দেয়া। ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে গিয়ে, তাঁরা বিরোধী দলকে অত্যাচারিত একটি দল হিসেবে জনগণের কাছে উপস্থাপন করে ফেলছে।

এতো কিছুর পরও হয়তো কিছু নাও হতে পারে। বিএনপির যে দৈন্য দশা, হয়তো তাঁরা আন্দোলনে বিফলও হতে পারে। বলা যায়, এদেশের সব আন্দোলনই বিফল। এক ৯৬ ছাড়া বাকী সব আন্দোলনই একটি কাজ করেছিল, আর তা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর কোনটিই হয়তো সফল হত না, যদি না সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলে আগ্রহী হত। তবে ১/১১এর পরে নিজেদের যেভাবে তাঁদের গুটিয়ে নিতে হয়েছে তাতে এই মুহূর্তে তাঁরা তেমনটা আর করবেন বলে মনে হচ্ছে না।

ঘুরে ফিরে বিএনপির এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় বন্ধু হচ্ছে আওয়ামীরা এবং তাঁদের অতি আত্মবিশ্বাস। বিএনপির দৈন্য দশা, বিএনপির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা তাঁদের ইনফর্মাররা, যেভাবে প্রতিনিয়ত বিএনপির আন্দোলনকে ‘স্যাবোটাজ’ করছে আর তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অচিরেই তাঁরা বিএনপির সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুতে পরিণত হতে যাচ্ছেন। আর শত্রু কিংবা বলা যায় ফ্র্যাঙ্কেন্সটাইন হচ্ছে, বিএনপি নিজে। এই নতুন শত্রুর সঙ্গে কিভাবে মোকাবেলা করবে, কিভাবে আন্দোলন এগিয়ে নেবে, সেটাই এখন দেখার ব্যাপার।

দ্যা গ্রেট বিএনপি ফ্লপ শো

bnp-final1

by zainuddin sani

শো টা যে ফ্লপ করবে, কিছুই যে করতে পারবে না, তা কমবেশি সবাই জানতো। তারপরও দলীয় নেতা কর্মীরা টিভি সেটের সামনে বসেছিল। সারকারী অঘোষিত হরতাল না হলেও, মনে হয় না তাঁরা ঢাকায় যেতেন। সাধারণ জনতার যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। অলৌকিকভাবে ‘নুর হোসেন’ জীবিত হলে, সেও নিশ্চিত যেত না। শুধু বিএনপির আন্দোলন না, ‘গনতন্ত্র উদ্ধার’ মার্কা কোন আন্দোলনেই যেত না। নব্বইয়ে একবার উদ্ধার করে শখ মিটে গেছে। তবে রাজনীতি প্রিয় বাঙালির, রাজনীতি নিয়ে কথা বলা হয়তো থামাবে না। রাস্তায় নামবার ভুল এখন আর কেউ করে না। দলবাজি এখন সবাই করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে।

সমর্থক যে নেই, তা কিন্তু না। তবে তাঁরা সব কিছু দেখে, খেলা দেখার মেজাজ নিয়ে। টিভি সেটের সামনে বসে, নিজ নিজ দলের হয়ে উল্লাস করার জন্য। আর সাধারণ জনগণ বসেছিল গত বছরের স্মৃতি রোমন্থন আর ‘যে কোন মুল্যে’র মানে কি তা বোঝার জন্য। মানেটা গাজীপুরের দিনও বুঝেছিল, তবে ভেবেছিল, সেখানকার দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে, একটি লোকাল কারণে, শো ফ্লপ হয়েছিল। এবার ঘটনা ঢাকায়, নেতা কর্মীরাও আছে, বড় বড় হুশিয়ারি আসছে, অতএব এবার কিছু একটা হবে।

বিনোদন দেয়ার আওয়ামীদের ক্ষমতা নিয়ে কারোরই তেমন কোন সন্দেহ ছিল না। শ্লেষ মেশানো কথা বলায় কেউই কম যায় না। তবে বর্তমানে এবিষয়ে আওয়ামীরা একধাপ এগিয়ে আছে। সেসব শোনার পরের দৃশ্য ছিল রাজপথ। পুলিশ আর ছাত্রলীগের ‘ডেডলি কম্বিনেশান’ গাজিপুরের মত এখানেও খেল দেখাবে, তা সবারই জানা ছিল। একেবারে ‘কপি ক্যাট’ হলে দর্শক কমে যাবে দেখে মনোরঞ্জনের নতুন কিছু রসদও রাখা হয়েছিল। মায়া সাহেবের লুঙ্গি কিংবা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ এর সংযোজন হল। সবাই না হলেও অনেকেই এই নিয়ে আশাবাদী ছিল— কিছু নতুন মনোরঞ্জন আসছে।

সেই আশার গুড়ে অচিরেই বালি পড়ল। আওয়ামী নেত্রীর সেই পুরনো ঘ্যানঘ্যান আবার শোনালেন। সঙ্গে নতুন যা ছিল, তা হচ্ছে বিএনপি নেত্রীর নাটকের পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনালেন। এছাড়া আওয়ামীদের তরফ থেকে বড় ধরনের তেমন কোন নতুনত্বের দেখা পাওয়া যায়নি। হয়তোবা তাঁরা দেখাতে চায়ও নি। এক বালুর বস্তা দিয়েই যদি কুপোকাত করা যায়, তবে আর উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখাবার দরকার কি? তারপরও, কিছুটা ছিল।

আগেরবার ছিল বালুর বস্তা, এবার আর বস্তায় বালু ঢোকাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। বালুর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছিল খোয়া, মাটি এসবের ট্রাক আর তাদের ড্রাইভারের মুখে মজার সব গল্প। দরজার তালাটিকেও নতুন সংযোজন বলা যেতে পারে। এবারের সত্যিকারের নতুনত্ব ছিল ‘স্পাই থ্রিলার’। আওয়ামীদের প্ল্যান আগে থেকে জেনে যাচ্ছিল বিএনপি আর বিএনপির প্ল্যান তৈরির সাথে সাথে চলে যাচ্ছিল আওয়ামী নেত্রীর কানে। এই প্লট আর কাউন্টার প্লটের খেলাটা এবার সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য হয়েছে।

বিএনপির তরফ থেকে নতুনত্বের অভাব থাকলেও সময়টা খারাপ কাটেনি। পিকাপ ভ্যানে করে কয়টা কম্বল, কয়টা ম্যাট্রেস আসল, কোন ঘরকে ম্যাডামের বেডরুম বানানো হল, এসব খবর একেবারেই আনকোরা। আসলে সবাই গতবছরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ র সঙ্গে ঘটনা মেলাচ্ছিলেন। ‘ডায়ালগ বাই ডায়ালগ’, ‘সিন বাই সিন’। ম্যাডাম এবার একেবারে হুবহু নকল করেননি। সেবারের তুলনায় এবার একটু মুডে ছিলেন। রাগে গড়গড় করতে করতে সেই ‘গোপালি’ আর ‘তুই তোকারি’ ছেড়ে এবার ‘ক্যান রে ভাই’ এ এসেছেন। কিছুটা হলেও নতুনত্ব।

খেলায় কে জিতল তা নিয়ে আপাতত কিছুদিন ‘টক শো জীবীরা’ গলা ফাটাবেন। দলের নেতারা আসলে দুই ম্যাডামের গুণগানে কিছুদিন কান পাতা দায় হবে। একে অপরকে গালিগালাজও হয়তো করবেন। ‘গনতন্ত্র হত্যা’ ‘রাজাকারদের দোসর’ ‘ট্রেন মিস’ ‘২০১৯’ ‘সংবিধান রক্ষার নির্বাচন’— মোটামুটি এই থাকবে আগামী কিছুদিনের আলোচনার বিষয়। সাংবাদিকরা আসলে সবাই লক্ষ্য রাখবে, কে কোন দিকে ঘেঁসে কথা বলছেন। যদিও সাংবাদিকরাও দল বেছে ফেলেছেন এবং কি কি বলবেন, তাও সবাই জানে। তারপরও হয়তো দেখবেন। দুই দলকেই গালি দিলে আমরাই হয়তো বলব, ‘এই ব্যাটা কিন্তু ধান্ধাবাজ, দুই দিকেই তাল দিচ্ছে’। এরপর হয়তো চ্যানেল পাল্টাবো আর নয়তো ‘জলসা’ না দিলে স্বামীকে খুন করব।

খেলা আরও চলতো কি না, সত্যিকার অর্থে বোঝার উপায় নেই। মিছিলের নাম পাল্টে বিক্ষোভ মিছিল করলেও সেই মিছিল করবার জন্য কেউ আসবে না, তা সবাই জানে। নেতারা টাকা খেয়ে যেভাবে প্ল্যান উগড়ে দিচ্ছেন তাতে মনে হয় না ঢাকা শহরে আর কোন সমাবেশ করতে দিবে। বাকী থাকে হরতাল আর অবরোধ। ভোঁতা এই দুই অস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া তাদের আর তেমন কিছু করারও নেই। সেটাও হয়তো আর দুইদিন ডাকতে পারবে কারণ বিশ্ব ইজতেমার জন্য সেটাও স্থগিত করতে হবে। আর দিন দশেকের গ্যাপ পড়লে, নতুন করে আন্দোলন (এটাকে আন্দোলন না বলতে চাইলে, আমি আপত্তি করবো না) চাঙ্গাও করতে পারবে না। দলের নেতাদেরও সুবিধা। সম্ভবতঃ তাঁরা এটাই চাইছেন। শুধু শুধু আত্মগোপন করতে হবে না, এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।

এই শীতের আন্দোলন সম্ভবতঃ শেষ। কিছু খুচরা চেষ্টা হয়তো হবে। যদি কিছু লাশ পড়ে, তবে হয়তো কিছু মিছিল হবে। বিশ্ব ইজতেমা শেষ হওয়ার পরে হয়তো আবার কিছু অবরোধ আসবে। এবং যথারীতি মার্চের পরে সব কিছু ইতি। বিএনপির নেতারাও হয়তো অপেক্ষায় আছেন, কবে আসবে এপ্রিল। তাদের আর আত্মগোপনে থাকতে হবে না, মাঠে নামতে হবে না। তবে আওয়ামীদের কাছ থেকে পাওয়া মাসোহারায় হয়তো টান পড়তে পারে। আন্দোলনের প্ল্যান জানিয়ে যে আয় তাঁরা করছিলেন, সেই আয় হয়তো আপাততঃ বন্ধ হয়ে যাবে।

‘৭ দফা কি পরাজয়? না পরিকল্পনা?’

by zainuddin sani

দেশের রাজনীতিতে কি হচ্ছে বা কি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সবাই বেশ বিভ্রান্ত। বিএনপির হুমকি ধামকি দেয়া, আর আওয়ামীদের সেসবে কর্ণপাত না করা, ব্যাপারটা অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। সকালের পত্রিকার দুটি অবধারিত শিরোনাম থাকতো দুই দলের কোন না কোন নেতার শ্লেষাত্মক বক্তব্য। কেন যেন ব্যাপারগুলোকে অনেক বেশী রীতি মাফিক মনে হচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল কি হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে— ‘আওয়ামীরা ২০১৯ পর্যন্ত চাইলে নির্বিঘ্নে থাকতে পারবে’। সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণার পরে, সত্যিকারের প্রত্যাশা কারোরই তেমন ছিল না। কমবেশি সবারই ধারণা হয়েছিল, ৫ই জানুয়ারিকে ঘিরে কোন কর্মসূচি এবং সেই কর্মসূচিতে বাঁধা দিলে কি হবে, তার হুমকি সম্বলিত একটি বক্তব্য আসছে। তার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামীরা কি বলবে, তাও সবাই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। পুরোপুরি তেমনটা হল না, সেদিনের ঘটনা, এদেশের রাজনীতির টিপিক্যাল ফর্মুলার ব্যত্যয় ঘটাল।

আপাত দৃষ্টিতে বিএনপি নেত্রীর ৭ দফা তেমন নতুন কিছু না। এতোগুলো দফার ভেতর মুল দফা একটিই। বাকী দফাগুলোর বেশ অনেকগুলোই সাধারনতঃ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই করে থাকে। আর কিছু খুচরা দফা দেয়া হয়েছে, সম্ভবতঃ নেগসিয়েশানের সময় বাদ দিতে রাজী হবার জন্য, সবাইকে বলা যাবে, ‘সমঝোতার খাতিরে আমরা তিনটি দাবী ছেড়ে দিলাম।’ তবে প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হচ্ছে অন্য কারণে, এই সময়ে এসে, এমন নরম অবস্থান কেন? যে দাবী গত ছয় বছরে আওয়ামীরা মানেনি, তাদেরকে আবার নতুন করে সেই দাবীর কথা জানানো কেন?

৭দফাকে বেশ নির্বিষ মনে হলেও, কেন যেন সবাই তেমনটা ভাবছে না। সবাই বেশি করে ভাবছেন, এতো মোলায়েম স্বরে কেন কথা বলছেন বিএনপি নেত্রী? তারচেয়েও বড় কথা, আল্টিমেটাম নেই কেন? দফা না মানলে কি হবে, সে সম্পর্কেও নেই কোন ভবিষ্যৎবাণী। বড় জাতের আরও কিছু প্রশ্ন আছে। যেমন বিএনপির গেম প্ল্যান তাহলে কি? সবাই ভাবছেন এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। আর সেই উদ্দেশ্য কি, তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে চলছে কানাঘুষা। কেউ ভাবছেন, ‘নিশ্চয়ই বিএনপি কোন সিগন্যাল পেয়েছে’।

বোদ্ধা মহলকেও খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। তাঁদের এসব কথা ভাববার যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। আসলে এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পদক্ষেপগুলোকে বেশ পরাজয় বলে ভাবা হয়, তার একটি হচ্ছে দাবী জানানো। বিশেষ করে সেই দাবীর সংখ্যা যদি থাকে একাধিক। আর সেই দাবী পূরণ না হলে, সরকারের কি অবস্থা হবে, সে সম্পর্কে যদি কোন হুশিয়ারি না থাকে, তবে তো অবধারিতভাবে ধরে নেয়া হয়, এই দাবীসমূহের প্রস্তাবকারী হয় সিরিয়াস না কিংবা তাদের তেমন কোন শক্তি নেই।

অন্যদিকে সাহসী পদক্ষেপ ভাবা হয় আন্দোলন কিংবা হুমকিকে। ‘এক দফা এক দাবী’র ও আলাদা একটা দাম আছে। তবে তেমন কিছু একবার বলে ফেললে কিছু একটা করে দেখানো জরুরী। নইলে আবার শুরু হয়ে যাবে অন্য হিসাব। যেমনটা হয়েছিল আওয়ামীদের ‘স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাও আটকাতে পারবে না’ হুমকির পরে। আর ইদানীং কালে, বিএনপি সম্পর্কে।

আন্দোলন করে কোন দাবী আদায়ের রেকর্ড বিএনপির খুব একটা নেই। তবে দাবীতে অনড় থাকবার একটা রেকর্ড ছিল। ফলে আগে যখন হুমকি ধামকি দিলেও সেগুলোকে কিছুটা সিরিয়াসলি নেয়া হত। ভাবা হত, সফল না হলেও, কিছু একটা অন্তত করবে। নিজেদের তৈরি করা ‘গুড উইল’এ সম্প্রতি তাঁরা ফাটল ধরিয়েছে। হুমকির অধিক ব্যবহার এবং কিছু করতে না পারা, তাঁদের দেয়া হুমকি সম্পর্কিত এই ধারণায় কিছু পরিবর্তন এনেছে।

এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফর্মুলা অনুযায়ী ৭ দফাকে নিশ্চিতভাবেই পরাজয় কিংবা পিছু হটা ভাবা যায়। বিশেষ করে গাজীপুরে যেভাবে পিছিয়ে আসলো, তারপরে। ৫ই জানুয়ারীর মত ‘সিম্বোলিক’ দিনে সবাই যেমনটা ভেবেছিলেন, তাঁরা তেমন কিছু করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। এটাও ঠিক, তাঁদের যা সাংগঠনিক অবস্থা, তাঁদের কাছ থেকে ততোটা কেউই প্রত্যাশা করছেন না। আবার এতো নরম কর্মসূচী দিবে, এটাকেও কেউ স্বাভাবিক ঘটনা ভাবতে চাইছেন না। সবার মনে তাই একটি সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, ‘পর্দার আড়ালে কিছু ঘটছে কি না।’

বিএনপি যেভাবে একের পর বিভিন্ন জাতের হুমকি দিয়েও কিছু না করার একটা ট্র্যাডিশান তৈরি করে ফেলেছিল, তাতে কমবেশি সবাই ভাবতে শুরু করেছিল, এই সরকারকে হটাবার ক্ষমতা বিএনপির নেই। আর ইতিহাস বলে, সরকারকে বাধ্য করতে না পারলে, বিরোধী দলের দাবী মেনে নেয়ার মত ঘটনা ঘটে না। আর নরম স্বরে বললে তো নিশ্চিতভাবেই ঘটবে না। এই দাবীর তাই একটি স্বাভাবিক মানে হচ্ছে, হুমকি দিয়ে কিছু না করে নিজেদের ইমেজের যে বারটা বাজিয়েছি, তা আর কন্টিনিউ করতে চাই না। এবার স্বীকার করে নিতে চাই, আমরা অথর্ব। দল হিসেবে, সংগঠন হিসেবে আমরা বেজায় অগোছালো। আন্দোলন করে দাবী আদায়ের ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই এই অনুরোধ ফর্মুলা।

এই স্বাভাবিক ব্যাখ্যার বদলে সবাই কেন যেন অন্য কিছু ভাবছেন। হয়তো ১/১১এর উদাহরণ এর জন্য দায়ী। এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিদেশ নির্ভরতা এর জন্য দায়ী। হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকী কারো কাছ থেকে সমর্থন আদায়ে এই সরকারের ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী। আবার হতে পারে পর্দার আড়ালে এমন কিছু ঘটবার আভাস তাঁরা পেয়েছেন, যা থেকে মনে হয়েছে, এদেশ একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। আর তাই, কঠোর আন্দোলনের পথ ছেড়ে, নরম আর সমঝোতা ধাঁচের পথে হাঁটতে রাজী হয়েছেন, বিএনপি নেত্রী।

ধাঁধা আরও আছে। বিএনপির বেশ কিছু বড় নেতার বক্তব্য থেকে বোঝা গেছে, ৭ দফার এই সিদ্ধান্ত নেত্রীর একক সিদ্ধান্ত। সব দলের সাথে আলাপও করেননি। এমনকি নিজ দলের অনেককেও অন্ধকারে রেখেছিলেন। ঘাড়ের ওপর মামলা, বিভিন্ন আন্দোলনে দলীয় বড় নেতাদের পালিয়ে বেড়ানোর মানসিকতা এমন অনেক ব্যাপারকেও এর কারণ ভাবা যেতে পারে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বড় কারণ হিসেবে সবাই ভাবতে শুরু করেছেন, বিদেশী প্রভুদের ইচ্ছেকে।

৭দফা নিয়ে বোদ্ধা মহলের এই প্রতিক্রিয়া দেখে এই প্রশ্নই সবার মনে জাগছে, কি এমন ঘটল যে ম্যাডাম এরকম ‘সফট’ কর্মসূচী দিলেন। কোন আশ্বাস কি পেয়েছেন? আওয়ামীরা নরম হবে কিংবা এভাবে দাবী জানালে মেনে নেবে— এমন কোন আভাস? ১/১১ এর মত কোন ঘটনার আভাস? আওয়ামীদের ওপর থেকে বিদেশী প্রভুদের আশীর্বাদের হাত তুলে ফেলার আভাস? কিংবা প্রতিবেশী দেশের ওপর অন্য কোন বৃহৎ দেশের চাপ প্রয়োগের আভাস? সম্ভবতঃ আর কিছুদিনের ভেতরেই সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটবে। তখন স্পষ্ট হবে, ‘৭ দফা কি পরাজয়? না পরিকল্পনা?’

তত্ত্বাবধায়ক সরকার— অ্যা পোস্ট মর্টেম

ctggby zainuddin sani  আমার মৃত্যুটাকে ঠিক আচমকা মৃত্যু বা ‘সাডেন ডেথ’ বলা যায় না। দীর্ঘ রোগ ভোগের পরের মৃত্যু বলাটাও ঠিক হবে না। খুন বলা যেতে পারে, তবে মৃত্যুটা হয়েছিল আমার ওপর আসা উপর্যুপরি আঘাতের বেশ অনেক বছর পরে। ছোট খাট ঝড় ঝাপটা গেলেও আমি মোটামুটি বহাল তবিয়তেই টিকে ছিলাম। তিন তিনটে নির্বাচনও করলাম। বিরোধী পরাজিত দল ছাড়া বাকী সবাই বলল নির্বাচন ভালোই হয়েছে। বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও ঘুরে দেখে বলেছিলেন, নির্বাচন ভালোই হয়েছে। রিপোর্ট কার্ডে একশোতে একশো না দিলেও কমবেশি সবাই নব্বইয়ের ওপরেই নম্বর দিয়েছিলেন। এরপরও আমার শেষরক্ষা হল না। বলা যায়, সেটাই আমার কাল হল।

আমার ওপর প্রথম বেশ বড়সড় আঘাত এসেছিল বিএনপি আমলে। মানে বিএনপির দ্বিতীয় আমলে। সেবার মউদুদ সাহেব সংবিধানে একটি সংশোধন করেন। সেই সংশোধনের ফলাফল যা দাঁড়াল, তাতে দেখা গেল একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি একসময় বিএনপির সদস্য ছিলেন, তিনি হয়ে যাচ্ছেন আমার প্রধান। ঠিক তাঁকে প্রধান করার জন্যই এই পরিবর্তন, না সত্যিই বিচারক সংকটের জন্য এই পরিবর্তন, তা হলফ করে কারো পক্ষে বলা সম্ভব না। আর এদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে একটি দলের দেয়া ব্যাখ্যা আরেকজন মেনে নেবে, প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। প্রায় বললাম, কারণ নিজেদের বেতন বৃদ্ধি আর শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির জন্য কেবল এরা একমত হয়।

যাই হোক, সেই সংশোধনীর পরে আওয়ামীরা ভাবল, সেই হাসান সাহেবকে প্রধান করার জন্য এই কাজ করেছে বিএনপি। তাই তাঁরা আন্দোলনে নামলো। প্রচুর হরতাল দিল। জ্বালাও পোড়াও ও কম করল না। তারপরও তেমন কিছু করতে পারল না। বহু জল ঘোলা করে অবশেষে আমার প্রধান হিসেবে আসলেন রাষ্ট্রপতি। কাজটা ঠিক হল কি না তা নিয়ে বেশ বিতর্ক হলেও আওয়ামীরা মেনে নিল। ঠিক সেই সময়টায় সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতির অধীনে থাকবার কারণে হয়তো আওয়ামীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে সাহস করেনি। এরপরে বেশ যাচ্ছেতাই ভাবে আমাকে ব্যবহার করতে লাগলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। আমার বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাও পদত্যাগ করলেন।

এর কিছুদিন পরে আসলো সেই যুগ সন্ধিক্ষণ। অনেকের মতে আমার মৃত্যুর সেটাও একটি কারণ। ১১ই জানুয়ারী, আমার পরিচালনায় হতে যাওয়া চতুর্থ নির্বাচনটির মাত্র কিছুদিন আগেই আমার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলেন বা করানো হল। নতুন প্রধান হিসেবে আসলেন, ফখরুদ্দিন সাহেব। নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ হল। তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার বাধ্য বাধকতা থাকলেও, আইনের কিছু ফাঁক গলে, নির্বাচন অনুষ্ঠান পেছানো হল। এই ফাঁকে বেশ সাহসী কিছু পদক্ষেপও নেয়া হল। দুই দলের তাবৎ বড় বড় নেতাকে আটক করা হল। কারো মতে, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে দেশের দুই বড় দলের যবনিকা পতনের চেষ্টা হল।

এরপরে অনেক ঘটনা ঘটল। দুই বড় দলের বেশ কিছু নেতা বিদ্রোহ করল। শীর্ষ পদ দখলের জন্য, কিংবা দল দুটিকে ধ্বংস করার জন্য, বেশ অনেকেই একত্রিত হল। তবে সফল হল না। আমার শীর্ষ পদে থাকা মানুষগুলো ঠিক কি চেয়েছিল, জানি না। তবে প্রথম প্রথম তাঁরা যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, কিংবা দুই বড় নেত্রীকে গ্রেফতারের পরেও যে মৌন সম্মতি তাঁরা পেয়েছিল, তা ধরে রাখতে পারল না। বাগাড়ম্বর আর দুরাভিসন্ধি তাঁদের কাল হয়ে দাঁড়াল। ‘কিংস পার্টি’ তৈরি করে ক্ষমতায় আরোহণের চেষ্টা শুরু করেছে কি না তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিল। ফলাফল যা হল, দুই দলের সঙ্গে সঙ্গে জনগণকেও ক্ষেপিয়ে তুলল আমার বিরুদ্ধে।

সেই দুই বছর পার করে অবশেষে আমি নির্বাচনের ব্যবস্থা করলাম। আগের তিনবারের মত এবারও বেশ স্বচ্ছ নির্বাচন হল। পরাজিত দল ছাড়া বাকী সবাই এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিল। মনে হচ্ছিল এই যাত্রা হয়তো বা আমি বেঁচে গেলাম। কিন্তু তা হল না। আমার কারণে অন্য আরেকটি যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, সেই কারণ দেখিয়ে আমার মৃত্যু সনদ জারী করা হল। সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে জানাল, আমি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমার কারণে বিচারালয় ধ্বংস হতে বসেছে। আওয়ামীরা সুযোগটা লুফে নিল। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁদের ছিলই। রায়ের বাহানায়, আমার মৃত্যু নিশ্চিত করতে সংবিধানে সংশোধনী আনা হল। অনেকটা আমার আদল রাখলেও, শীর্ষ পদে, নির্বাচন কালীন সময়ে, দল নিরপেক্ষ ব্যক্তির পরিবর্তে একজন দলীয় লোক রাখবার ব্যবস্থা করা হল।

আমার মৃত্যু যদিও অবস্বম্ভাবী ছিল, তারপরও এতো দ্রুত হবে, সেটা অনেকেই ভাবেনি। দুই দল যে কেবল চর দখলের জন্যই নির্বাচন করে, এই তথ্য জনগণ বুঝে গেলেও, মেনে নিয়েছিল। একের পর এক দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে হওয়া কারচুপি আর তারপরে হওয়া সহিংস কিংবা অহিংস রাজনীতি দেখতে দেখতে ক্ষুব্ধ দেশবাসী আমাকে পেয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ভেবেছিল, দুই দল তাঁদের জন্য কিছু করুক আর না করুক, নির্বাচন এবং নির্বাচন নিয়ে হওয়া সহিংসতা থেকে তো অন্ততঃ রেহাই পেলাম। তাঁদের কপালে সেই সুখ সইল না।

যদিও আমার মৃত্যুর দিন ক্ষণ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কেউ ভাবেন চতুর্দশের পরেই মৃত্যু হয়েছে, কেউ বলেন ১/১১র কারণে, আবার কারো মতে পঞ্চদশের কারণে। আসলে আমার মৃত্যুর বীজ লুকিয়ে আছে, আমার অধীনে হওয়া নির্বাচনগুলোর ফলাফলে। সেই নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে তেমন কোন প্রশ্ন না থাকলেও যে সমস্যাটা দেখা দিল তা হচ্ছে প্রত্যেকবারই তৎকালীন বিরোধী দল জয়লাভ করল। এমন একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে গেল, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন মানেই, নিশ্চিত বিরোধী দলের বিজয়। বিরোধী দলের সুনিশ্চিত বিজয়, সেই নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা আর সর্বোপরি সুষ্ঠু নির্বাচন করার এই সক্ষমতাটিই হয়ে দাঁড়াল আমার মৃত্যুর মৃত্যুর কারণ। ‘আপনা মাংসে হরিণ বৈরী’।

৯৬এ আমার অধীনে হওয়া দ্বিতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের পরই সম্ভবতঃ বিএনপি ঠিক করেছিল, আমার ওপর ‘সার্জারি’ করার। ২০০১এ ক্ষমতা পাওয়ার পরেই, খুব ভালমতোই জানতো, ২০০৭এ আমার অধীনে নির্বাচন হলে, সেখানে তাঁদের শিকে ছিঁড়বে না, আবার আওয়ামীরা আসবে। আর সেই পরিস্থিতি আটকাবার জন্য, আইনগত ভাবে তাঁদের করণীয় তেমন কিছু ছিল না। আমাকে বাতিল করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ৯৬এ তেমন কাজ করতে যেয়ে তাঁরা বেশ ভুগেছে।

বিচারবিভাগে দলীয়করণ শুরু করলেও তার সুফল পেতে এখনও ঢের দেরী। সেই মুহূর্তে তাঁদের মাথাব্যাথা ছিল ২০০৭। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবে চললে নিজেদের পছন্দের লোক আমার প্রধান হতে পারবে না। তাই আপাততঃ যে ফর্মুলার আমদানি করল তা ছিল বিচারকের বয়স বৃদ্ধি। ২০০১এ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়াতে, সুযোগটাও তাঁরা পেয়ে গেল। গলা টিপে না মারলে, বেশ মারাত্মক আঘাত আসল আমার ওপর। তবে বিএনপির শেষরক্ষা হল না। ১/১১ আসল।

১/১১এর পরে মনে হয়েছিল আমার ওপর থেকে দুর্যোগের মেঘ সরে গেছে। আমার ওপর ‘সার্জারি’ করতে গিয়ে বিএনপি যেভাবে ভুগল, তাতে মনে হয় না আমাকে আর কাঁটা ছেঁড়ার সাহস কেউ দেখাবে। কিন্তু তেমন কিছুই হল না। ১/১১এর সময় আমার দ্বায়িত্বে থাকা মানুষগুলো যেভাবে দুই নেত্রীকে শ্রীঘরের হাওয়া খাওয়ালো, তারপর আমাকে শৃঙ্খলিত কিংবা নখদন্তহীন করার একটা চেষ্টা যে হবে, বোঝাই যাচ্ছিল। তবে একেবারে মেরে ফেলা হবে, কেউই হয়তো বোঝেনি। যাই হোক, সেই সময়ের শাসনকাল কিংবা বিরোধী দলের বিজয়ের গ্যারান্টি, যেকারনেই হোক, আমাকে আমার পরিণাম ভোগ করতেই হল।

আমার মৃত্যু নিয়ে আমার তেমন কোন নালিশ নেই। আমাকে ছাড়াও পৃথিবীর অনেক দেশে নির্বাচন হচ্ছে, এবং বেশ ভালভাবেই হচ্ছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এদেশেও আমাকে ছাড়া নির্বাচন হবে। তবে সেজন্য জরুরী রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাস। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিরোধী দলের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ। দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসনের সর্বস্তরে নিজেদের লোক বসানোর মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে, পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা।

যে কাজগুলো করে আমি সুষ্ঠু নির্বাচন করতাম তার বেশির ভাগ কাজই নির্বাচন কমিশনকে দিয়েই করানো যায়। সেখানে প্রধান হিসেবে কে নিয়োগ পাবে, তার যদি একটি সুষ্ঠু উপায় বের করা যায়, সরকার, বিরোধী দল সহ আরও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি একটি প্যানেলের মাধ্যমে এর প্রধান নির্বাচন করা যায়, নির্বাচনকালীন সময়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাঁদের অধীনে রাখা যায়, প্রশাসনের রদবদলের কিছু ক্ষমতা তাঁদের হাতে রাখা যায়, তবে হয়তো আমাকে আর প্রয়োজনই পড়বে না।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে না, তেমন কিছু হবে। আওয়ামীরা যেভাবে আমার অবসান চাইছে, নিতান্ত বাধ্য না হলে, মনে হয় না আমাকে আর জীবিত করবে। বিএনপির যা অবস্থা, আমাকে বাঁচাবার আন্দোলন করবার তেমন কোন ক্ষমতাও ওদের নেই। সুশীল সমাজের উচ্চবাচ্য নিয়েও অনেকে সন্দেহ করছে। ভাবছে, আমার মাধ্যমে কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা পাওয়ার লোভে তাঁরা এসব চিৎকার চেঁচামেচি করছে। ফলে, স্বাভাবিকভাবে আমার জীবিত হওয়ার তেমন কোন পথ নেই। জানিনা আমার কি হবে। পুনরায় জীবন ফিরে পাব, না আমার চিরস্থায়ী মৃত্যু হয়েছে, সময়ই বলে দেবে। আমাকে নিয়ে আরও কিছু আন্দোলন, আরও কিছু মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে, আওয়ামীদের নতুন ফর্মুলায় সবাই সায় দেবে, তার অপেক্ষায় আছে দেশবাসী। এই শীতকালের মধ্যে কিছু একটা না ঘটলে, মনে হচ্ছে, ২০১৯এর আগে আমার ব্যাপারে নতুন কোন সিদ্ধান্ত হবে না। কি আছে আমার ভাগ্যে তা দেখার জন্য, আপনাদের মত আমিও অপেক্ষায় আছি।