বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যত

17

ধরা যাক ২০২০ কিংবা ২০২৫/ খালেদা- হাসিনা দুজনই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন – তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে? ইসলামিস্টরা কি তৃতীয় শক্তি হবে? জামাত কি ইসলামিস্টদের নেতৃত্ব দেবে না নতুন কোনো দল ইসলামিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করবে? ইসলামিস্টরা কি বিএনপি-লীগ থেকেও শক্তিশালী হয়ে যাবে তখন?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ডিপ্লোম্যাটরা রাজনীতিবিদদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, চিন্তিত নাগরিকরা করেন সাংবাদিকদের। বহু মানুষের সাথে আমিও বারবার আলোচনা করেছি এ প্রসঙ্গে। আমার কিছু বন্ধু আছে যারা মেধা, শিক্ষা ও পেশা – সব দিক থেকেই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; তাদের সাথে আলাপচারিতাতেও এই প্রসঙ্গটি বারবার ফিরে আসে। মনে হলো আমাদের আজকের ভাবনাগুলো লিখে রাখা খুব দরকার, ৩০ বছর পর এই সময়টাকে আমরা কীভাবে দেখছিলাম সেটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হবে।

প্রথমেই কিছু শব্দের সীমানা নির্ধারণ করি, এটা জরুরী, ভবিষ্যতে এই শব্দগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বদলে যাবে।

আমি “ইসলামিস্ট” বলতে বোঝাচ্ছি তাদের যারা পলিটিকাল ইসলামে বিশ্বাস করেন এবং সে মতে রাজনীতি ও এক্টিভিজম করেন। পাঁচ বেলা মসজিদে যাওয়ার মানে কিন্তু ইসলামিস্ট না, আবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করাই ইসলামিস্ট হওয়ার একমাত্র শর্ত না। এটা একটা আমব্রেলা টার্ম এবং আমি সেই হিসাবেই ব্যবহার করেছি। ইসলামাইজেশান বলতে আমি অন্য ধর্ম থেকে ইসলামে আসা বলছি না এই লেখায়। শুধুমাত্র এই লেখার জন্য ইসলামাইজেশান শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মুসলমানদেরই ইসলাম ধর্মের নতুন উদ্বোধন হওয়া অর্থে। এই ঘটনাটির কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নির্ণায়ক শব্দ খুঁজে পাই নি দেখে এই ধারকর্জ। “সেনট্রিস্ট” বলতে আমি বুঝিয়েছি সে সমস্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা মানুষের কথা যারা সব দলের সহাবস্থানে বিশ্বাস করেন, বাস্তবতা ও যুক্তি-তর্ককে চেতনা ও আদর্শের ওপরে স্থান দেন এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে উগ্রবাদী নন। আমার অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশে সঠিক অর্থে সেনট্রিস্ট দল না থাকলেও বিএনপি অন্য দুটি মূল থেকে চরিত্রে বেশী সেনট্রিস্ট এবং সব দলেই সেনট্রিস্ট প্রবণতার লোকজন আছে। যারাই শাহবাগে গেছে তারাই শাহবাগী – এই অর্থে আমি “শাহবাগী” বলছি না। আমার কাছে (এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত) আওয়ামী লীগের কাছে যখন টাকা থাকে তখন সেটা স্পিরিচুয়াল প্রজেক্টে পরিণত হয়, কোনো রাজনৈতিক দল থাকে না। শাহবাগী বলতে আমি বুঝি এই স্পিরিচুয়াল প্রজেক্টের ফুট সোলজারদের। লক্ষ্যনীয় হোলো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সংস্লিষ্ট না হয়েও আপনি এই স্পিরিচুয়াল প্রজেক্টের ফুট সোলজার হতে পারবেন।

সবার আগে আমার জীবনের ছোট্ট একটা পর্যবেক্ষণ।

৮৭-৯০ সালের কথা মনে করছি। আমি তখন ছোটো কিন্তু বড়দের কিছু কথা আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। আমার বাবা যেহেতু ৫০ এর দশকে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন, তার বন্ধুরা প্রায়ই কে চীফ অফ স্টাফ হবে এ বিষয়ে খুব আলোচনা করতেন (তখনও তাদের সমসাময়িকরা কেউ কেউ চাকরি করছিলেন) /  এয়ার ভাইস মার্শাল জামাল (তখনও তিনি চীফ হন নি) প্রসঙ্গে তাদের কেউ কেউ মনে করতেন যে জামাল কোনোভাবেই চীফ হতে পারবে না কারণ – সহজ বাংলায় তিনি হুজুর এবং তার স্ত্রী হেজাবী।

২৫ বছর ফাস্ট ফরওয়ার্ড।

আজকে বাংলাদেশে শুধুমাত্র “হুজুর” হওয়ার কারণে উপরের দিকে ওঠাটা মনে হয় অতোটা কঠিন না কারণ “হুজুর” ও হেজাবীদের এখন যথেষ্ট ভিজিবিলিটি আছে সমাজের সব স্তরে। আমাদের ছোটোবেলায় এর ধারে কাছেও কিছু দেখি নি।

অন্যদিকে এখন যতো স্লীভলেস কামিজ ও ব্লাউজ দেখা যায় সামাজিক অনুষ্ঠানে, তার ধারে কাছেও কিছু আমরা দেখি নি ছোটোবেলায়। মজার ব্যাপার হোলো এই বিশেষ ব্যাপারটা অর্থাৎ স্লীভলেস কামিজ ও ব্লাউজ কিংবা কোনিকাল ব্রা পরাটা আমাদের জন্মের আগে মানে ৬০ ও ৭০ এর দশকে বাংলাদেশের আপার মিডলক্লাসে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো (হলিক্রস স্কুলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা CD বানানো হয়েছিলো বেশ কিছু বছর আগে। ঐ CD ‘র ফটোগ্রাফ দেখলে এর সত্যতা খুঁজে পাবেন)।

আবার

৮০’র দশকে আমার মা’দের যে বয়স ছিলো এখন আমাদের স্ত্রীদের সেই বয়স। তখন দেখতাম তারা প্রতি বৃহস্পতিবার বিকালে মিলাদ করতেন এবং আমার খেয়াল আছে এই মিলাদে আসতেন একদম উঁচু তলার স্ত্রীরাও। এটাকে তাদের সময়ের হ্যাং আউট বলবেন কি না আপনার ইচ্ছা কিন্তু আমার মনে হয় তখনকার অহিজাবীরা এখনকার অহিজাবীদের চেয়ে বেশী ধর্মসম্মত জীবন যাপন করতেন।

আমার ধারণা যারা ঢাকায় বড় হয়েছেন তারা কম বেশী আমার এই পর্যবেক্ষণগুলোয় সায় দেবেন। আপনি যদি এই সব বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে “একটা” প্যাটার্ন বের করতে চান কিংবা সামাজিক পর্যবেক্ষণ থেকে রাজনৈতিক উপসংহারে আসতে চান, আপনি ভুল করবেন। এই সোশাল এভোলিউশানের কোনো সহজ ব্যাখ্যা নেই। তবে এরিক হবসবম ঠিক কাছাকাছি একটা প্যাটার্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন শিল্প-বিপ্লবোত্তর ব্রিটেনে – যেখানে নতুন পুঁজি সৃষ্টির সাথে সাথে বিপুল ভাবে বেড়েছিলো ধর্মীয় এক্টিভিটি। একদল “উচ্ছন্নে” যাচ্ছিলো আরেক দল ক্রিশ্চিয়ানিটির ব্যাপক প্রসারকেই মনে করেছিলো এ রোগের দাওয়াই।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে উল্লিখিত জটিলতা হোলো সমাজ পর্যায়ের। এর উপর যোগ করেন রাজনৈতিক জটিলতা – এমন কঠিন এক জিগ স পাজল তৈরী হবে যার কোনো সমাধান নেই। এবং সমস্যা হোলো এমন অবস্থায় আপনি যে দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করবেন, খুব সহজেই আপনার মতো করে একটা ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। যেমন শাহবাগীরা মনে করেন যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশ পুরা আফগানিস্তান হয়ে যাবে। আবার বিএনপির লোকেরা মনে করে যে বাংলাদেশে ঐ রকম রাডিকাল ইসলামাইজেশানের কোনো সম্ভাবনাই নেই, বরং উদ্ধ্বত সেকুলারিজমই সবচেয়ে বড় সমস্যা। মোদ্দা কথা আপনার নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই হোক না কেন, সেই অনুযায়ী এবং অনুপাতে একটি ভয়াবহ ভবিষ্যত আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে।

প্রথম প্রশ্ন হোলো বাংলাদেশে গত ২৫-৩০ বছরে বিশেষ করে শেষ ১৫ বছরে এতো দ্রুত ইসলামাইজেশান হোলো কেন?

আমার পরিচিত এক বাংলাদেশী ক্যানবেরান যিনি বাংলাদেশে ৮৪ সালে গ্রামে শিক্ষকতা করেছেন তার অভিজ্ঞতা হোলো তখন গ্রামে দশ জনের মধ্যে বড়জোর এক জন হিজাব করতো আর এখন সেই স্কুলেই দশ জনের মধ্যে আট জন হিজাব করে কিন্তু এখন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই “দুই নম্বর” কিন্তু ৮৪ সালে প্রতিটি মেয়েই সহজ সরল ছিলো। তার ধারণা এর মূল কারণ হোলো এনজিও – সহজ কথায় মিডল ইস্টের টাকা।

Image

তিনি যে ডেমোগ্রাফির কথা বলছেন সেখানে মিডল ইস্ট ও জামাতের টাকা ইসলামাইজেশানের কাজে এসেছে এ কথা সত্য (তবে বাংলাদেশের সব অঞ্চলে না) কিন্তু সমস্যা হোলো তিনি ধর্মকে একটা প্রডাক্ট হিসেবে জ্ঞান করছেন অর্থাৎ যত বেশী টাকা (= মাইলেজ = ইনভেস্টমেন্ট), ততো বেশি ইসলামাইজেশান। সোশাল এভোলিউশানের এরকম শুধু টাকা-ভিত্তিক ব্যাখ্যা একেবারেই খাটে না।

কিন্তু এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় খুঁত হোলো – যে ইসলামাইজেশানের জন্য এখন মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির উত্থান হতে চলেছে অর্থাৎ শহুরে অনূর্ধ্ব ৪০ জনগোষ্ঠির মাঝে ইসলামের প্রসার সেখানে এই অয়েল মানি প্রায় কোনো কাজেই আসে নি।

আমি দেখেছি যে অসংখ্য তরুণ-তরুণী যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্ত ঘরের সন্তান এবং শহরের নাম করা স্কুল কলেজ থেকে পাশ করে পেশার দিক থেকে খুবই সফল – এরা ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠছে যেটা ৮০’র দশকে আমার ছেলেবেলায় প্রায় কখনোই দেখা যেতো না। আমার এক বন্ধু টেলিভিশনের মডেলিং থেকে দাড়ি রাখা উঁচু বেতনের এগজিকিউটিভ হয়ে গেছে। আমাদের আরেক বন্ধু আইবিএ থেকে পাশ করে এখন আরবী শেখায়। এবং এই পরিবর্তন একটা দুটা না, হাজারে হাজারে।

এই ঘটনাটা কীভাবে ঘটলো?

প্রথমে আমার একটা অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা: আমরা স্কুল কলেজের বই পুস্তকে যা পড়ি, বিস্ময়কর হলেও সত্য যে বাস্তব জীবনে কেবল ইসলাম ধর্ম শিক্ষাই প্রাসঙ্গিক। বাংলা বইয়ে যে ভাষা শিখি সে বাংলাতে কেউই কথা বলে না, এমন কি টিভিতেও এখন আর তেমন শোনা যায় না। যে ইংরেজি বইয়ে থাকে সে ইংরেজি কোনোদিনও কোনো দেশে চর্চা হতো কি না আমার সন্দেহ, দশ বছরের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নির্ভুল বালকদের আজগুবি সব কেচ্ছা-কাহিনীতে ভরা। অঙ্ক আর বিজ্ঞানে শিখি যে দুই আর দুই চার – বাস্তব জীবনে এই যোগফল পাঁচ, ছয় এমন কি পাঁচ শও হতে পারে। বিজ্ঞানের প্রায় কোনোই ব্যবহার নেই দৈনন্দিন জীবনে (বিজ্ঞান ব্যবহার করা আর অন্যের বানানো টেকনোলজি এস্তেমাল করা এক জিনিস না)/ ইসলাম শিক্ষায় বলে সমর্পণ করো, শান্তি পাবে। বাস্তবে কী হয় এ সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুব অল্প কিন্তু যারাই ইসলামের প্রতি অনুরক্ত তারাই বলে যে ধর্ম শিক্ষা বই যা প্রমিজ করে তা ডেলিভারও করে, নিজেদেরকে সমর্পণ করে তারা শান্তির খোঁজ পেয়েছেন।

আমাদের কালে, আমি বলবো মোটামুটি মিড নাইনটিজ থেকেই বিশ্বব্যাপী একটা ঘটনা ঘটেছে আর সেটা হোলো আমাদের জীবনে এখন কোনো ফিলোসফি নেই। মানুষ এমন একটা প্রাণী যে নিজের জীবনের পরিপূর্ণতা দেখার জন্য কোনো একটা ফিলোসফির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। আমাদের দেশে ৬০ থেকে নিয়ে ৮০ এর দশক পর্যন্ত সোশালিজমের মধ্যে দিয়ে তরুণরা দর্শনের খিদেটা মিটিয়েছে। নানা কারণে নাইনটিজে এসে এই বন্দোবস্ত বদলে যায়। সভিয়েট য়ুনিয়েনের পতন, বাংলাদেশী বামদের আদর্শিক স্খলন, বিশ্বব্যাপী বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়া – সবই মনে হয় এর পেছনে কম বেশী কাজ করেছে।

অন্তত আমাদের দেশে দর্শনের অভাব কিছুটা মিটিয়েছে ইসলাম – অন্তত কিছু মানুষের জীবনে। এর একটা অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া হোলো পলিটিকাল ইসলামের প্রতি আকর্ষণ-বোধ। ইসলাম ধর্মটা একটু বিচিত্র এই বাবদে। দশ জন লোক যদি ইসলামী অনুশাসনে মনোযোগী হয়ে ওঠেন দেখা যাবে যে পাঁচজনই সামগ্রিক মুক্তির জন্য পলিটিকাল ইসলামকে আবশ্যক মনে করে – এই ব্যাপারটা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। বলাই বাহুল্য এই পাঁচজন যদি শিক্ষিত তরুণ হয় তাহলে ধীরে ধীরে দেখা যাবে যে কোনো একটা ইসলামী দলের মধ্যে দিয়েই তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হচ্ছে।

শাহবাগী এবং আওয়ামী মনোভাব সম্পন্ন মানুষেরা এই ব্যাপারটার দুটো ভুল ব্যাখ্যা করে। প্রথমটা হোলো যে তারা মনে করে যে এই তরুনেরা অধিকাংশই জামাতী। ইন ফ্যাক্ট এই যে নতুন এনলাইটেন্ড ইসলামিস্ট ক্লাস, তাদের পলিটিকাল আইডেনটিটির দুটো মূল প্রতিপাদ্য হোলো জামাতকে অপছন্দ করা এবং কওমী মাদ্রাসা তথা হিফাজতকে একটু তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা এবং এর মধ্যে দিয়ে উভয়ের থেকেই আলাদা হওয়ার চেষ্টা করা। তার মানে কিন্তু আবার এই না যে বিএনপি যেভাবে আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করে – এটা সেই পর্যায়ের রেশারেশি। বলা যেতে পারে এটা একটা ইন্টেলেকচুয়াল ফ্যাড কিন্তু পরস্পরের সাথে রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক একাত্মতা ঘোষণা না করার জন্য যথেষ্ট। ভিকারুন্নিসা স্কুল থেকে পাশ করা মেয়েরা যেমন করে ভারতেষ্মরী হোমসের মেয়েদের দেখে অনেকটা সেরকম।

কিন্তু এই ভুলটা ততোটা মারাত্মক না যতোটা দ্বিতীয়টি। শাহবাগী, আওয়ামী, সেনট্রিস্ট, বিএনপি,সুশীল, ডিজুস – মানে আরবান ক্লাসের বিশাল একটা অংশ মনে করে যে এই ইসলামিস্টরা আন্ডার এচিভার কিংবা সহজ বাংলায় ভোন্দা গাজীর দল।

বাংলাদেশে ৬০ ও ৭০ এর দশকে সবচেয়ে মেধাবীরা বাম রাজনীতি করতো, এখনকার বাংলাদেশে সবচেয়ে মেধাবীরা রাজনীতি-বিমুখ বললে কম হবে, সম্ভবত অনেকে ঘৃণাই করে এই বিষয়টি। কিন্তু যারা রাজনীতি করে (অর্থাৎ সশরীরে এক্টিভিজম করেন, দল করেন, সংগঠিত হন – ফেসবুকে না শুধু), তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও পড়াশোনা জানা ছেলে-মেয়েরা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ধারায় হয় ইসলামিস্ট, নয়তো বাম ধারার (কিন্তু বাম ধারার সংখ্যাটা খুবই কম) / ছাত্রদল কিংবা ছাত্রলীগের ছেলে-পুলেরা মেধার দিক থেকে ইসলামিস্টদের ধারে কাছেও না।

আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার হোলো সারা পৃথিবীতে যারা নিজেদের প্রগ্রেসিভ ঘরানার রাজনীতি করেন বলে দাবী করেন তারা অনেক বেশী সহনশীল হন আর ইসলামিস্টরা হয় অসহনশীল। বাংলাদেশে হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টা। এখানে যে নিজেকে লিবার্টিন বলে দাবী করে, সে আবার ফাসিও চায়। একদিকে সে নিজেকে সেকুলার বলছে অন্য দিকে “প্রয়োজনে লাখ খানেক মানুষকে হত্যা” করার পরামর্শও দিচ্ছে। এবং সব সময় সে রেগে থাকে – মানে ভয়ঙ্কর ধরনের রাগ। পরমতসহিষ্ণুতার দিক থেকে বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগ্রেসিভ ক্লাস এতোটাই প্রতিক্রিয়াশীল যে “সভ্য মত বিনিময়” মোটামুটি অসম্ভব হয়ে যায়।

আশ্চর্য ব্যাপার হোলো ইসলামিস্টরা অপেক্ষাকৃত বেশী সহনশীল (আমি বাসুদা ও মেজবাহ আহমেদ পর্যায়ের ইসলামিস্টদের কথা বলছি না)/ তাদের সাথে অন্তত কিছু সময় আপনি গালিগালাজ ছাড়া তর্ক করতে পারবেন (এটা নিতান্তই আমার পর্যবেক্ষণ)।

কথা হোলো, আসল কথা হোলো – ইসলামিস্টরা কি সংগঠিত হতে পারবে এবং হলেও তারা কোন ধরনের ইসলামিস্ট হবে?

প্রথমত একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের ইসলামিস্টরা চরিত্রে টার্কিশ ইসলামিস্টদের কাছাকাছি, তালেবানদের মতো না কারণ ইসলামিস্ট নেতা এবং নেতৃস্থানীয়দের বিরাট অংশ আদতে অন্টাপ্রেনিওর – সহজ ভাষায় তাদের কাছে টাকা আছে এবং তারা ইসলাম না বুঝলেও ব্যবসাটা ভালো বোঝেন। সুদূর ভবিষ্যতে তারা যদি কোনোদিন ক্ষমতায় যায় – যে একটি পেশার মানুষ তাদের ব্যাপারে সব চেয়ে খুশী থাকবে বলে আমার ধারণা – তারা হোলো ব্যবসায়ী শ্রেণী।

কিন্তু ক্ষমতায় যেতে হলে যে পরিমাণ সংহতি ও পরিপক্কতা দেখাতে হবে তা কি তারা পারবে?

সম্ভবত না।

বাংলাদেশের ইসলামিস্টরা বাঙালি ইসলামিস্টও বটে – অনর্থক তর্কে তাদের অনন্ত অনুরাগ। নিজেদের মধ্যে কারা শুদ্ধতম ইসলামের অনুসারী – এ আলোচনার ক্ষুধা তাদের কেয়ামতের পরেও বলবৎ থাকবে। এটাকে মুসলমানদের কুইনটাসেনশিয়াল বৈশিষ্ট্য বললেও অত্যুক্তি হবে না।

কিন্তু

শাহবাগীরা মনে করেন বিএনপির যে বিশাল জনসমর্থন আছে দেশব্যাপী তারা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে ইসলামিস্ট হয়ে উঠবে। এর কারণ হিসেবে তারা যা মনে করেন তা হোলো বিএনপি আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল পক্ষান্তরে ইসলাম একটি ১৪ শ বছরের পুরোনো আদর্শ। বিএনপি টিকে আছে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের কারণে। তার মৃত্যুর পর এন্টি-আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্টের জন্য বেটার আউটলেট হয়ে যাবে ইসলাম এবং বিএনপি ছেড়ে সবাই ইসলামপন্থীই হয়ে যাবে। অর্থাৎ সেনট্রিস্টরা ক্রমশ এক্সট্রিমিস্ট হয়ে উঠবে। মোটামুটি কাছাকাছি ধারণা আমি দেখেছি কিছু কিছু বিএনপিপন্থীদের মাঝেও।

প্রশ্নটা আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে যিনি মোটামুটি পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি দেখেছেন কাছে থেকে এবং যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর আস্থা রাখা যায়। তিনি বললেন আর সব কিছু যদি মেনেও নেই, ইসলামিস্টদের নেতৃত্বটা দেবে কে? তার মতে ইসলামিস্টদের মধ্যে জামাত ছাড়া অন্য কোনো অংশ “রাজনীতি” “বোঝে” না এবং জামাতেরও যে একজনমাত্র নেতাকে তার মনে হয়েছে যে পরিবর্তিত পৃথিবীতে ইসলাম-পন্থী দলের ভূমিকা কী হবে এটা বোঝার মতো প্রয়োজনীয় সফিস্টিকেশান ও দূরদৃষ্টি আছে – তিনিও জেলে এবং সম্ভবত তার ফাঁসি হবে (আমার অপ্রয়োজনীয় মত: এই লোকটা আমার জানামতে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী এবং তার মৃত্যুদন্ড হওয়াটা হবে সঙ্গত)

কিন্তু যদি এমন হয় –

খালেদা-হাসিনার পর বাংলাদেশে অন্তত আওয়ামী লীগ-বিএনপির কোনো নেতা কোনোদিনও এ পরিমাণ ক্ষমতা সংহত করতে পারবেন না – সেটা জানা কথা। সে ফাঁকে ইসলামিস্টরা যদি একটা ইমরান খান খুঁজে পায়। পশ্চিম-ফেরত, ইংরেজিতে বক্তৃতা দেয়, ক্লীন শেভড, জন স্টুয়ার্ট মিল কোট করে, মিল্টন ফ্রিডম্যান কোট করে আবার কোরানের আয়াতও শুদ্ধ আরবীতে উচ্চারণ করে মেঠো বক্তৃতায়। অন্তত বিএনপি-আওয়ামী লীগের চেয়ে ইসলামিস্টরা যে গভর্নেন্সের দিক থেকে সফল হবে এ ব্যাপারে বেশীরভাগ লোক একমত হবেন। বিভিন্ন দলের সেনট্রিস্টরা যদি ইসলামের পতাকাতলে চলে এসে? এরকম একটা অবস্থার নিপুন বর্ণনা দিয়েছেন শফিকুর রহমান। তখন তো ইসলামিস্টরা এগিয়ে আসতে পারে।

আমি এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিই না। কিন্তু আমার ধারণা ইসলামিস্টরা সফল হবেন না। কেন?

সমস্যাটা ইসলাম নিজে। লিবারেল আইডিয়োলজির একটা সুবিধা আছে যেটা ইসলামের নেই। ব্যক্তিগত প্রশ্ন আসলেই লিবারেল আইডিয়োলজি বলতে পারে – এটা বাপু তোমার সমস্যা, ডু ওয়াটএভার য়ু লাইক। আপনি মদ খাবেন না স্লীভলেস কামিজ পরবেন এটা আপনার নিজের ব্যাপার – এখানে আমার কিছু করার নেই। বাই ডেফিনিশন ইসলাম একটা ধর্ম, তাকে রিএক্ট করতে হয়, দর্শকের ভুমিকা নিতে পারে না। ইসলাম বলতে পারে না গো ফাক য়োরসেল্ফ, এটা আমার সমস্যা না। রাষ্ট্র চালাতে গেলে “এটা আমার সমস্যা না” বলাটা খুব জরুরী, যেটা ইসলাম পারে না। ইসলাম একটা ধর্ম কিন্তু রাষ্ট্র একটা পলিটিকাল কনস্ট্রাক্ট। দিন শেষে বাস্তবতা হোলো য়োরোপিয়ান এনলাইটেনমেন্টের ফলাফল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিক-নির্দেশনা কারী মতবাদ হিসেবে পলিটিকাল ইসলাম কমপ্যাটিবল না। রাষ্ট্রের দার্শনিক গন্তব্য হোলো ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ইসলামের দার্শনিক গন্তব্য হোলো সমর্পনের মাধ্যমে অর্জিত শান্তি। প্রশ্নটা ইসলাম ভালো না লিবারেল ডেমোক্রাসি ভালো – তা না; বরং এটা কমপ্যাটিবিলিটির ইসু – “রাষ্ট্রব্যবস্থার” সাথে ইসলাম যায় কি না?

Image

আমাদের দেশে পলিটিকাল ইসলামের প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করতে হলেও কয়েকটা মৌলিক প্রশ্নের সুরাহা করতে হবে। সারা পৃথিবীর ইসলামিস্টদেরই বোধ করি করতে হবে।

এগুলো কী?

পলিটিকাল ইসলামের দিক নির্দেশনা প্রত্যক্ষভাবে কোরানে নেই (যেমন আপনার নেতাকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করা হবে কি না)/  কিন্তু মুসলমানের ব্যক্তিজীবন কেমন হবে – এর অতি খুটিনাটি ব্যাখ্যাও কোরানে আছে। পলিটিকাল ইসলামকে রাষ্ট্র-পরিচালনাকারী মতবাদ হিসেবে যারা দেখতে চান তাদের এমন কিছু বিষয়ে আপোষ করতে হবে যার নির্দেশনা কোরানে আছে। যেমন ধরুন ইসলামিস্টদের বাংলাদেশে হিন্দু প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি না কিংবা পোষাক পরিধানে ইসলামের কিছু বাধ্য-বাধকতা আছে, এর মাঝে কোনো যদি কিন্তু নেই। কিন্তু অনেক মুসলমান ছেলেমেয়েই আছে যারা এই বাধ্য-বাধকতা মানেন না কিংবা মানতে চান না। এখন ইসলামিস্টরা চোখ বুজে থাকতে পারেন কেননা তারা বলতে পারেন যে ভাই এটা তো আমাদের মাথা-ব্যথা না কারণ আমাদের কাছে ক্ষমতা নেই। যখন ক্ষমতা আসবে তখন কিন্তু তারা দর্শক থাকতে পারবেন না, পক্ষ নিতে হবে। রাষ্ট্র পর্যায়ে ইসলামের বাস্তবায়ন করার জন্য (যার সরাসরি নির্দেশনা নেই কোরানে), তারা কি ব্যক্তি পর্যায়ের ইসলামের সাথে আপোষ করার মতো (যার সরাসরি নির্দেশনা নেই কোরানে) সাহস দেখাতে পারবেন?

আমার ধারণা বিশ্বব্যাপী এ ধরনের সাহসী পদক্ষেপের জন্য যে ধরনের কনসেনসাস প্রয়োজন, ইসলামিস্টরা তার ধারে কাছেও আসতে পারে নি। বাঙালি তর্কপ্রিয় এবং শিশুতোষ তর্কে তার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি (অর্থনীতির নোবেল প্রাইজ যে আসলে নোবেল প্রাইজ না এবং অর্থনীতির নোবেল লরিয়েটদের নোবেল লরিয়েট বলা হলে বিশাল অপরাধ হয়ে যাবে – এ নিয়ে বাংলার দামাল বুদ্ধিজীবী ন্যশনাল মিডিয়ায় দীর্ঘ সময় আলাপ করেন)।

এটা আমাদের মাথাব্যথা না – আপনি যেভাবে খুশী করেন, এ বিষয়ে আমার কোনো মতামত নেই – এ ধরনের চিন্তা করাও বাঙালির পক্ষে অসম্ভব।

বাংলাদেশের মানুষ চরিত্রে সেনট্রিস্ট – সে ওয়াজে গিয়ে চোখের পানি ফেলে আবার যাত্রা দেখেও আদ্র করে মন। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে সফল হওয়ার চাবিকাঠি এই ব্যালেন্সিং এক্টের মধ্যে। যে একদিকে বেশী ঝুঁকে পড়বে তারই বিপদ। এই জিনিসটা বোঝে বিএনপি এবং এককালে আওয়ামী লীগও বুঝেছিলো। কাজটা করার জন্য সামষ্টিকভাবে যে পরিপক্কতা প্রয়োজন, ইসলামিস্টদের তা তাদের নেই। ভবিষ্যতে হবে কি না জানি না তবে ইসলামিস্টদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হোলো আওয়ামী লীগ। যে একমাত্র যুদ্ধে ধর্মের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তা হোলো ধর্মযুদ্ধ এবং আওয়ামীবাদ ইসলামিস্টদের একটা ধর্মযুদ্ধই উপহার দিয়েছে। যে পোলারাইজেশান প্রজেক্ট আওয়ামী লীগ হাতে নিয়েছে তার একমাত্র ফলাফল হোলো দুটো ধর্মীয় উন্মাদনা: শাহবাগী চেতনা বনাম ইসলামী জজবা। এই ধর্মীয় উন্মাদনা চেতনাবাদকে কয়েকবার ধ্বংস করার জন্য যে যথেষ্ট – এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই, পুরো দেশটাই না ধংসাত্মক উন্মাদনায় মশগুল হয় – সেটাই দেখার বিষয়।

সারভাইভাল এক্টে চিন্তা ভাবনার কোনো সুযোগ থাকে না। সমস্যা হোলো সারভাইভাল এক্টের বিজয়ীদের চিন্তা ভাবনা করতে না দেয়ার খেসারত দেয় পুরো জাতি – ইতিহাসে এর শত শত উদাহরন আছে।

সত্য হোলো; শুধুমাত্র যে একটি পথে ইসলামিস্টরা সফল হতে পারে, ঠিক ওই পথেই তাদের ধাওয়া করছে লীগ।

ফোটো ক্রেডিট:

David Lazar (Girl with green eyes and red headscarf)

পাভেল রহমান/AP

কেওস-কণ্টক

Image

The greatest tragedy in this world is not that the only underlying principle which is recognizable, functional and ceaseless is “chaos” – it is our predisposition to think otherwise, that there is order and harmony. Successful minority of the very few who understand this secret are busy ripping off benefits from chaos, and those who don’t – namely the majority – are busy unweaving the rainbow, leaning on to some sort of idealism.

আমাদের সমাজে কোনো আইন নেই, নেই শৃঙ্খলা – এ অভিযোগ সবার মুখে। সেই দু-তিন শ বছর আগে এ অঞ্চলের মানুষ যেমন দুর্নীতির নালিশ করতো, আজোও করে; বিস্তর বর্ণনা মিলবে আমাদের সাহিত্যে, দলিল-দস্তাবেজে। সাধারণত এ জাতীয় কথা-ভাজা শেষ হয় একটি আর্জি দিয়ে। আহ! এই দেশে যদি একটু আইন-কানুন, নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকতো, তাহলে আমরা কই উঠে যেতাম! সত্যিই কি তাই হোতো?

আমাদের সমাজে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোর মতোন নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকলে অর্থনীতিক ভাবে আজকে যে অবস্থানে আছি তার চেয়ে উপরে থাকতাম বলে মনে হয় না। বিশৃঙ্খল, দুর্নীতিগ্রস্থ, মিথ্যাবহুল সমাজে বেড়ে ওঠার কারণে এমন কিছু বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের দৌরাত্ম্য আমাদের এখানে হয়েছে যেগুলো আমাদের এখানে ভীষণ কার্যকরী ও প্রাসঙ্গিক। যেগুলো ছাড়া দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এখন এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর, অন্তত অর্থনীতি যখন প্রাসঙ্গিক।

Image

পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়ার তালিম আমরা পাওয়া শুরু করি পরিবার ও স্কুল থেকে। এই প্রশিক্ষণ আমাদেরকে এক ধরনের আদর্শ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়, যে পৃথিবীতে ন্যায় আছে, শৃঙ্খলা আছে, আছে কার্য-কারণের মাঝে সমন্বয়। আমরা আশ্বস্ত হই যে এমন একটা পৃথিবী এই মুহূর্তে না থাকলেও ভবিষ্যতে হতে পারে অবশ্যই – আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আমাদের মতো যাদের জন্ম তৃতীয় বিশ্বে, তারা স্বপ্ন দেখি যেন একটি সমৃদ্ধ ও সঙ্গত পৃথিবী উপহার দিয়ে যেতে পারি পরের প্রজন্মকে (মূলত নিজের দেশকে নিয়েই এই স্বপ্ন)। সমস্যা হোলো, সৃষ্টিকর্তার পৃথিবীতে শৃঙ্খলা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু মানুষের পৃথিবীতে নিশ্চিতভাবে আছে chaos, যা ব্যাখ্যা করা যায় শুধুমাত্র ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর। এক অতিপ্রাকৃত বিশৃঙ্খলা ঘিরে রেখেছে আমাদের সর্বব্যাপী। আমরা যে তা উপলব্ধি করি না, তা না। কিন্তু মেনে নিতে মন চায় না। এক অসম্ভম তাড়না আমাদের প্রশ্রয় দেয় – বিশৃঙ্খলার ওপর শৃঙ্খলার কর্তৃত্বেই বুঝি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব।

প্রাকৃতিক ভাবে মানুষ জন্মেছিলো এই কেওসকে মোকাবিলা করার জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অতি শিক্ষা মানুষের এই অপার সম্ভাবনাটিকে কিছুটা হলেও নষ্ট করে বলে আমার অনুমান। কেওস থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা মানুষসহ সকল প্রাণীর প্রবৃত্তি, এর মাঝে লজ্জা পাওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার কারণে সে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা বাদ নিয়ে অন্য কাজে ব্রতী হয় প্রায়ই, সে প্রথমত কেওসকে বোঝার চেষ্টা করে, দ্বিতীয়ত সে বুঝতে ব্যর্থ হয়ে এর নাম দেয় “সমস্যা” এবং তৃতীয়ত কোনো আদর্শবাদ এই সমস্যার সমাধান বলে সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই প্রস্তুতি কেবল একটি পরম সত্য থেকেই তাকে বিস্মৃত করেঃ কেওস থেকে নিস্তার মানুষের নেই। তবে হ্যাঁ, কোন ধরনের কেওস নির্বাচ্য সে উদ্দামতায় মানুষের শ্রেয়তর বিচারবোধের উপযোগিতা আছে ভীষণ।

মেজাজের দিক থেকে মানুষ যুক্তিপ্রবণ না, শিক্ষা তাকে যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়। শিক্ষার এই প্রক্রিয়াটা ভীষণ গোলমেলে এবং দ্বান্দ্বিক। প্রবৃত্তি বলছে প্রয়োজনে ছিনিয়ে নাও, ধর্ম বলছে প্রয়োজনে বিলিয়ে দাও। আবার ধর্ম জোড় দিচ্ছে বিশ্বাসের ওপর, বিজ্ঞান বলছে যুক্তির স্থান সবার ওপর। হিচেন্স বলছেন ইরাকের ওপর আমেরিকার আক্রমণ উচিৎ হয়েছে, চমস্কি বলছেন সেটা ছিলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। শেখ হাসিনা বলছেন তারাই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী, খালেদা জিয়া বলছেন মুক্তিযুদ্ধে যারা ছিলেন অনুপস্থিত(শারীরিকভাবে) তারা নেতৃত্ব দেয় কী করে? এতোসব পরস্পরবিরোধী তথ্য ও মতের অনিবার্য প্রকাশ হলো মানুষের আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। তার যুক্তি, আবেগ, মানবতাবোধ সবকিছুই হয়ে যায় বিশেষায়িত, একই মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করে, যা কোনো যুক্তি দিয়ে বিচার করা সম্ভব না। যে মানুষটি পরম বিশ্বাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে, সে মানুষটিই অফিসে গিয়ে ঘুষ খাচ্ছে। যে মানুষটি ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসার জন্যে দিনরাত ব্যয় করে গবেষণা করছে, সেই দুঘণ্টা পরপর ল্যাবের বাইরে গিয়ে ধোঁয়া ফুঁকে। যে মানুষটি বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস গুপ্তহত্যা নিয়ে বিচলিত ও চরম ক্রোধান্বিত, সে একই মানুষ ঘটমান বর্তমানের একই দিনে সংঘটিত গুপ্তহত্যা নিয়ে সামান্যতমও চিন্তিত না। বিষয়টি সমালোচনার না, বলতে চাইছি যে এটিই মানুষের প্রকৃতি, ক্ষমাহীন স্বভাব।

ব্যক্তি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের উত্তরণে পরিস্থিতি আরোও বহু পাকে মনোহর হয়ে ওঠে। কেননা তখন মানুষের স্বভাবের সাথে যোগ হয় এমন সব এলোপাথাড়ি দৈব প্রভাবকের যার ওপর মানুষের বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বভাবতই সে ভীষণ বিচলিত হয়ে ওঠে। কেননা তার চারপাশের পৃথিবী, এমন কি হয়তো নিজের আচরণও কোনো সেন্স-মেক করে না। এই উপলব্ধি একেকজনের মাঝে একেক ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কেউ ভাবে যুক্তি, কেউ ভাবে বিশ্বাস – পৌছে দেবে গন্তব্যে। কারোও আস্থা অর্জিত জ্ঞানে, কারোও আস্থা দৈব হস্তক্ষেপে – আদর্শবাদই পারে কেওস থেকে উত্তরণে, শক্তি আর নৈতিকতার শুভত্ব দিয়ে।

যাদেরকে আমরা বলি ভবিষ্যতদ্রষ্টা আর কেবল “স্ট্রীট-স্মার্ট” বলে যারা পান না যথাযথ কৃতিত্ব (কম বয়সে যাদের অনেককেই “চাল্লু-ম্যান” বলে ডেকেছি স্কুলে) তারা কিন্তু কেওসের মুখোমুখি হন সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এরা কেওসের ডায়নামিক্স নিয়ে চিন্তিত নন, সমাধানেও নেই কোনো আগ্রহ। এদের চিন্তা কেবল একটিইঃ এই গ্যাঞ্জামে আমার জন্য কী আছে?

আলতো নজরে মনে হয় যে সব নষ্টের গোড়াই হোলো এ স্বার্থপর দৃষ্টিভঙ্গি; অতর্কিতে এ দৃষ্টিভঙ্গি সামনে চলে এলে আমাদের রুচিবোধ রুষ্ট হয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আমরা বেসামাল হয়ে পড়ি। কিন্তু বাস্তবতা হোলো এই “স্বার্থপরতা” ছাড়া সভ্যতা এগোয় না (তবে এটা অর্ধসত্য; সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার জন্য স্বার্থপরতার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি প্রয়োজন আছে মহানুভবতার)।

প্রকৃতির দিকে চোখ ফেরালে ধারণাটা কব্জা হয় অনায়াসে। বিবর্তনের একটা প্রবণতা হোলো সহজ থেকে জটিলতর অস্তিত্বের দিকে যাত্রা। প্রথমে এসেছে এককোষী প্রাণী; সেখান থেকে বহুকোষী জটিলতর প্রাণের উন্মেষ। এবার আমরা ফিরে যাই একটু পিছে, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে। প্রায় হিমালয়ের সমান একটা উল্কা প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীতে এসে আঘাত হানে মেহিকোর য়ুকাতান পেনিনসুলায়। আঘাতের বিভীষিকাঃ সম্মিলিতভাবে মোট ১০ কোটি এটম বম্বের সমান। ফলাফলঃ ১৬ কোটি বছর ধরে যে ডায়নোসর চড়ে বেড়িয়েছিলো এই পৃথিবীতে দাপটের সাথে তারা হয়ে গেলো বিলুপ্ত। শুধু ডায়নোসর কেন, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক স্পিসিস শেষ হয়ে গেলো কেবল ঐ একটি আঘাতে। ডিলেমাটি লক্ষ করুন, খুব মজার। যে লক্ষ-কোটি বছরের পোক্ত শৃঙ্খলা “বিবর্তন” চাইছে শক্তিবহুল, সমর্থ প্রাণীর টিকে থাকা, এই উল্কার কারণে মারা পড়লো তারাই সবার প্রথমে। কেবল একটি দুর্ঘটনা বদলে দিলো পুরো “জীবনের” ইতিহাস, যেটা না হলে মানুষের উদ্ভব হোতো কি না কে জানে? যে কেওসের কথা আমি বলছিলাম তার একটা মহাজাগতিক চরিত্রও আছে। তো শেষমেশ টিকলো কারা? সবচেয়ে শক্তিশালী কিংবা বুদ্ধিমান প্রাণীটি টেকে নি, টিকেছিলো তারাই যারা এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে নেয়ার মতো সক্ষম ছিলো।

বিবর্তনের এই ধারার সাথে মানুষের সমাজের তফাৎ আছে বিস্তর, সত্য। কিন্তু একটা মূলসুর আমাদের সমাজেও একইভাবে কার্যকর। পরিবেশ যেখানে বিশৃঙ্খলাময় এবং আনপ্রেডিক্টেবল, সেখানে প্রয়োজনীয় নয় যে আমাদের পছন্দের, আয়ত্তের কিংবা কোনো পুস্তক-সত্যায়িত দক্ষতাই রক্ষাকবচ হবে।

আসুন এ ছাঁচে একবার বাংলাদেশকে ফেলি। পৃথিবীর ইতিহাসে কখনোই বাংলাদেশের মতো এতো ছোটো ভূ-খণ্ডে এক প্রজাতির এতো বিপুল সংখ্যক অগ্রসর স্তন্যপায়ী প্রাণী একসাথে হয়তো বাস করে নি। এমন অভূতপূর্ব ঘটনার অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া না হওয়ার কোনো কারণ নেই। বলাই বাহুল্য, আমাদের এখানে পুষ্টি, সম্পদ, সুযোগ প্রভৃতির জন্য কাড়াকাড়ি অচিন্তনীয় রকমের উদগ্র। জীবনের বিবর্তনে যেমন, সমাজের বিবর্তনেও এমন গলা-কাটা প্রতিযোগিতায় সাড়া না দেয়ার উপায় নেই। জন্ম হচ্ছে এমন সব সক্ষমতার যেগুলোকে বর্ণনা করার মতো যুতসই শব্দ নেই আমার তহবিলে।

আমার স্কুলবেলার এক বন্ধুর পারিবারিক ব্যবসা খুব বড়। বন্ধুটি কথায় কথায় একদিন জানালো বাংলাদেশে একটি ব্যবসায় তার আগ্রহের কথা। অংক করে দেখলাম যে ডলারের হিসাবে তার বিনিয়োগের পরিকল্পনা হোলো প্রায় আশি মিলিয়নের। আশ্চর্যের ব্যাপার হোলো এই প্রকল্পের কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয় নি তখনও, শুধুমাত্র ইন্সটিঙ্কট থেকে তার এই আগ্রহ। পশ্চিমে আশি মিলিওন ডলারের বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে কোনো ধরনের মার্কেট রিসার্চ ছাড়া (পণ্যটি অভিনব কিংবা যুগান্তকারী না, রোজই কোটি মানুষ ব্যবহার করে), এটা শুনলে বলবে মাথার ডাক্তার দেখাও। কিন্তু ব্যবসাটা শুরু করলে দেখা যাবে যে সবাই ভুল ছিলো, সেই ঠিক ছিলো; লাভ হচ্ছে তরতর করে। গত বিশ বছরে বাংলাদেশী অন্টাপ্রেনিওরদের সাফল্যের মূলে যে এমন বিচিত্র বিচারবুদ্ধিরহিত উচ্ছ্বাস ও লোভ রয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশ্ন হোলো কোনো আইন ও শৃঙ্খলার দেশে এমন যুক্তিহীন প্রাণোচ্ছলতাকে ধারণ ও লালন করার উপায় আছে কি?

এই বন্ধুটিকেই প্রশ্ন করেছিলাম তারা পশ্চিমে ব্র্যান্ড শুরু করে না কেন (তাদের মূল ব্যবসা চামড়াজাত পণ্য)? অস্ট্রেলিয়ার মতো ছোটো মার্কেটে আশি মিলিওন ডলারের এক শতাংশের চেয়েও কম বিনিয়োগ করে বহু সফল ব্র্যান্ড বেরুচ্ছে হরহামেশা। এখানে আইন-কানুন আছে, বিশাল অঙ্কের লাভ আছে, নেই চাঁদাবাজি-রাজনৈতিক উপদ্রব, নেই লোডশেডিং। এখানে তো ব্যবসা করা অনেক সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু না, পশ্চিমে আমার বন্ধুর বা বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের স্টার্ট-আপ ব্যবসায়ে কোনো আগ্রহ নেই। ঐ যে বলছিলাম, বিশৃঙ্খলার মাঝে একটা স্ট্র্যাটেজিক এডভান্টেজ আছে, এটা কেউ খোয়াতে রাজী নয়।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হোলো বিশৃঙ্খলা যদি কারো স্ট্র্যাটেজিক এডভান্টেজ হয় রাষ্ট্রের সেখানে কী করার আছে? এর উত্তর আমার জানা নেই। জানা নেই এজন্য যে এমন প্রশ্নের উত্তরে চোখা-চিন্তার সুযোগ কম। যে সমস্যায় এক-দুজন না, পুরো সমাজটা জড়িত, সে সমস্যায় আমরা কার্যকারিতার চেয়ে নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রাধান্য দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আর নৈতিকতা এমনই এক ব্যাখ্যাক্রান্ত বিষয় যে এ নিয়ে ভাবাবেগবর্জিত আলোচনা করা এক কথায় অসম্ভব।

তাহলে এই কেওস-কন্টক পৃথিবীতে আমার আপনার জন্য কী করার আছে?

প্রথমে একটা কথা আবারো স্মরণ করিয়ে দেবো যে কেওস থেকে মানুষের নিস্তার নেই, তা আপনি যেখানে যে দেশেই থাকুন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা এমন কেওসের ব্যবস্থা করেছি যেটা খুব আদিম ও বন্য। এমন বিশৃঙ্খলায় লাভবান হতে চাইলে প্রায়ই ইতরামির শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু মনে রাখবেন কোনো আইন, কোনো মতবাদ কিংবা কোনো আদর্শই এই বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় রূপান্তরিত করতে পারবে না, এটা ধ্রুব সত্য। আমরা কেবল এক ধরনের বিশৃঙ্খলার চেয়ে অন্য ধরনের বিশৃঙ্খলাই বেছে নিতে পারি।

এছাড়া কেবল একটিই কথা বলার আছে আমার। ইনটুয়িশানকে (শব্দটির কোনো যুতসই বাংলা জানা নেই আমার। সহজ ভাবে বলা যেতে পারে “মন যা বলে”) প্রাধান্য দিন সবার আগে, এমন কি নৈতিকতারও আগে।

এই কথাটির তাৎপর্য আছে। একটু ব্যাখ্যা করি। আমরা মানুষেরা, নৈতিকতার প্রশ্নকে কীভাবে মোকাবেলা করি বলুন তো? আমার ধারণা, বেশীরভাগ পাঠক উত্তর করবেন যে আমরা ভেবে-চিন্তে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হলে সিদ্ধান্ত দেই যে ব্যাপারটি অনৈতিক। দুঃখের বিষয়ঃ মানুষের মস্তিষ্ক এভাবে কাজ করে না। সে প্রথমে চিন্তা করে না, হুট করে সিদ্ধান্তে আসে, তারপরে নিজের মতোন করে যুক্তি খাড়া করে। এই যুক্তিগুলোও খুব মজার। সে যদি মনে করে কোনো একটি বিষয় অনৈতিক, তাহলে সে কল্পনায় কাউকে না কাউকে ভিক্টিম বানাবেই, বাস্তব যাই হোক না কেন (মানুষের মোরাল সাইকোলজি এক অনবদ্য বিষয় যা নিয়ে আলাদা একটা আলোচনার প্রয়োজন, সেটা ভবিষ্যতের খাতায় তোলা থাক)। অর্থাৎ সূক্ষ্ম বিচারে নৈতিকতার ব্যাপারটি ইনটুয়িটিভ, র্যাশনাল না। সমস্যা হোলো ঐ যে হুট করে সিদ্ধান্তে আসা – এই প্রক্রিয়াটাকে মানুষ স্বীকার করতে চায় না, মনুষ্যত্বের অবমাননা হবে বলে। আমি বলছি, হুট করেই যদি সিদ্ধান্তে আসি, না ভেবে-চিন্তে, তাহলে ঐ একটি সিদ্ধান্তের প্রতিই এতো আস্থা কেন?

ইনটুয়িশান যদি বলে কাউকে খুন করতে তাহলে কি তাকে খুন করতে হবে? না, অবশ্যই তা না কিন্তু মানুষের বাস্তব সমস্যায় “সঠিকত্ব” বা “ন্যায়বিচারই” একমাত্র বিচার্য না, আরোও বহু দিক আছে। নৈতিকতার বাধন অনেক সময়ই এই দিকগুলো দেখতে দেয় না (এ প্রবণতাটা খুব সহজেই মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করে প্রমাণ করা যায়)। আমার প্রস্তাব শুধু এতোটুকু যে ইনটুয়িশানকে অগ্রাধিকার দিলে এমন বহু সুযোগ, বহু সমস্যার সমাধান আপনি দেখতে পাবেন যেটা নৈতিকতার চশমা পরে থাকলে নাও দেখতে পারেন।

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হোলো ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান যার পেছনে সবচেয়ে বড় দুটো প্রভাবকের একটি ছিলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (মামলাটির সরকারী নাম ছিলো ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের বিচার’)। আমরা জানি যে রাষ্ট্রদ্রোহের এই মামলাটি ছিলো মিথ্যা ও নিবর্তনমূলক। কিন্তু এই মামলার একজন আসামী (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা) সহ একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে মামলাটি মিথ্যা ছিলো না। সবকিছু বাদ দিয়ে নৈতিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একবার নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করুন তো, মামলাটি সত্য হলে এবং কোনো রাষ্ট্রের আওতায় থেকে এর অখণ্ডতাকে ভাঙতে চাইলে প্রচলিত আইনে একে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি না? কিন্তু আমরা সে প্রয়াসকে এভাবে দেখি না, কারণ নৈতিকতার ওপরে আমরা স্থান দেই সময়ের প্রয়োজন, কার্যকারিতা – এসবকে।

আমার বক্তব্য ছিলো এটাই; কেওস-কন্টক পৃথিবীতে সাফল্যের জন্য সবার আগে প্রয়োজন সক্ষমতার। যে নৈতিকতা সক্ষমতাকে নিস্তেজ করে সে নৈতিকতাকে মহিমান্বিত করার আগে দুবার প্রশ্ন করুন, হয়তো কাজে দেবে।

(ছবি ইন্টার নেট থেকে মাইকেল ফ্ল্যাম এর তোলা ও Imagevat থেকে নেয়া ছবি)

আপনি কি চেষ্টা করেছিলেন তাকে থামাতে?

6

ক্লাস টেনের এক ক্লাস রুম। প্রতিদিন সকালে কেউ এসে ক্লাসের সবার চোখে পড়ে এমন একটা জায়গায় মেথামফেটামিন (য়াবা) রেখে যায়। প্রথম কিছুদিন কেউ ছুঁয়ে না দেখলেও শেষ পর্যন্ত কয়েকজন ধরেই ফেলে ড্রাগটা। মনে রাখবেন – সবাই না, কয়েকজন।

এই এডিকশানের জন্য দোষী কে?

এই প্রশ্নের উত্তর একেকজন একেকভাবে দেবে। যে সব ছাত্র য়াবা খাওয়া শুরু করলো না তারা বলবে কৈ আমরা তো খাই নি; যারা খেয়েছে তারাই দোষী। যারা খাওয়া শুরু করলো তারা বলবে এখানে না রাখা হলে আমরা য়াবা খেতাম না। আওয়ামী লীগ বলবে এটা এইট পাশ খালেদার কাজ আর বিএনপি বলবে আওয়ামী লীগের আমলে সামান্য ক্লাসরুমও য়াবার থাবা থেকে রক্ষা পায় নাই। বাম-পন্থীরা সারা পৃথিবীর দোষ খুঁজে পাবে শুধুমাত্র ক্লাসরুমের ছেলেপুলে ছাড়া। সুশীলরা বলবে কি এক সময় আসলো যে বাচ্চারা রবীন্দ্রনাথ না পড়ে য়াবায় পড়ে থাকে – এজন্যেই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আর ইসলামিস্টদের ব্যাখ্যা বরাবরই খুব সহজ – মুসলমানের ঈমান কমজোড় হয়ে গেলেই সব আপদ।

আমি আইডিয়ালিস্ট নই, হার্ডকোর রিয়ালিস্ট। আমার ব্যাখ্যা সাদাসিধা । যারা য়াবা খাওয়া শুরু করলো, তারা ক্লাসে য়াবা না পেলেও কোনো না কোনো দিন হয় তো শুরু করতো কিন্তু “আমি যদি পাখি হতাম” লাইনের যুক্তিতর্কে আমার রুচি নেই। বাস্তবতা হোলো বাচ্চা বাচ্চা দশটা ছেলের হাতের নাগালে ড্রাগ রাখলে সবাই হয়তো খাবে না কিন্তু কয়েকজন খাবেই খাবে – এর অন্যথা হবে না। এটা আপনি আটকাতে পারবেন না। কাজেই দোষী সে যে ড্রাগটা ওখানে রাখে প্রতিদিন। পাগলকে সাঁকোর মাঝখানে যে মনে করিয়ে দেয় পাগল ভালো হয়ে গেছে – দোষটা তার, পাগলের না।

আমি বলছি না যে আমার দৃষ্টিভঙ্গিই একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। আপনি যদি এ সমস্যা নিয়ে কবিতা লিখতে চান তাহলে, হয়তো বামপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি কাজে দেবে। যদি ফেসবুকে লাইক চান, সম্ভবত সুশীলদের দৃষ্টিভঙ্গি কাজে দেবে। কিন্তু আপনি যদি সমস্যার সমাধান করতে চান তাহলে একমাত্র আমার দৃষ্টিভঙ্গিই কাজে দেবে। হ্যা, কেবলমাত্র রিয়ালিস্টরাই যে কোনো সামাজিক সমস্যার টেকসই সমাধান দিতে পারে। আইডিয়ালিস্টরা সমস্যাকে ঘনীভূত করে।

আজকে বাংলাদেশের সমস্যা জটিল। আপনি নানানভাবে আপনার সুবিধামতোন এর ব্যাখ্যা করতে পারেন। বিজ্ঞানীদের এর চেয়েও জটিলতর সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় হর-হামেশা (তবে সে সব সমস্যার কারণে মানুষ মরে না)। তারা সফল হন খুব বেশি কারণ তারা অসম্ভব জটিল সমস্যার সরলতম ন্যারেটিভ বের করতে পারেন – মানে ঐ “মোদ্দা কথায়” যেতে পারেন তাড়াতাড়ি। ছোটো মানুষেরা ফালতু আলাপে দিনভর থাকেন পেরেশান। মতিকন্ঠ করে, অপছন্দের মানুষটিকে খুবই ক্রিয়েটিভ, মনপসন্দ গালি দিয়ে আপনার পিংপং বল সাইজের ইগোটা একটু ফুলে টেনিস বল হয়ে উঠতে পারে বৈকি কিন্তু তাতে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

আজকের বাংলাদেশী রাজনীতির স্টেল মেটের “মোদ্দা কথাটা” তাহলে কী?

বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে খুব ভালোবাসে এবং এই কাজটার মাঝেই তাদের নাগরিক কর্তব্য সম্পন্ন করতে চায়। গণতন্ত্রের একমাত্র বিষয় ভোট না, কিন্তু প্রথম বিষয় ভোট। কাজেই জনগণের এই স্বপ্নটা ন্যায্য (তাদের আরোও অনেক স্বপ্ন দেখার কথা ছিলো, যেটা তারা দেখে না)। সমস্যা হোলো খালেদা কিংবা হাসিনা কিংবা তাদের দল ভোটগ্রহণের কাজটা নিরপেক্ষভাবে করবে এটা কেউ বিশ্বাস করে না – এবং ন্যায্য কারণেই করে না। কিন্তু হাসিনার খুব সাধ ২০২১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার। এই সাধ হওয়াটা দোষের না কিন্তু তিনি চান খালি মাঠে গোল দিতে। মানে হয় একাই নির্বাচন করে জিতবেন, নয়তো ভোটে ইয়ে করে জিতবেন। সেজন্য তিনি সংবিধানটাকে দেবব্রত চাকীর অঙ্কের নোটবই বানিয়েছেন (এই নোটবই নাকি ছয়ের দশক থেকে আছে, আমাদের সময়েও ছিলো, চাকী সাহেব মরে ভূত, সিলেবাস বদলেছে সতেরবার কিন্তু “দেবব্রত চাকী নোটবই” টিকে ছিলো – আছে হয়তো এখনো)।

বাস্তবতা হোলো আপনি যখনই বাংলাদেশে এলেকশান নিয়ে চাতুরীর আশ্রয় নেবেন, টালবাহানা করবেন; আন্দোলন হবে, মানুষ মরবে। এটা রিয়ালিটি। শেখ হাসিনা ঠিক এই কাজটা করেছেন এবং করছেন। এটা সত্য এবং তা অস্বীকারের উপায় নেই। দায়ের কথা বলার, বিচার করার সময় পড়ে আছে। এখন দরকার এই মানুষ মারার রাজনীতি বন্ধ করা।

এখান থেকে বেরিয়ে আসার কেবল একটিই উপায় আছে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। কারণ হাসিনা বা খালেদার আন্ডারে কোনো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব না। তার চেয়েও সত্য কথা: হাসিনা পদত্যাগ না করলে হত্যার রাজনীতি বন্ধ তো হবেই না – সম্ভবত আমরা এমন একটা phase এ ঢুকে যাবো যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে এক প্রজন্ম ব্যয় হয়ে যেতে পারে – য়েস ইট ইজ দ্যাট সিরিয়াস।

                              ………………………………….

বাংলাদেশের এক নাম করা ইংরেজি কলামিস্টের সাথে আলোচনায় টিপিকাল সুশীল মানসিকতার পরিচয় পেলাম – এটা আলোচনা করা দরকার। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তার মত হোলো Why doesn’t the two hire a place and fight it out and leave us alone. এটা কোনো ছাগু বা চেতনাইজড লো লাইফের কথা না, সার্টিফায়েড এল্ডার সুশীলের কথা। ফেসবুকেও এই লাইনের হাজার হাজার মানুষ আছে। তোমারা লীগ, বিএনপি মারপিট করো – আমাদেরকে দু দণ্ড শান্তি দাও।

এই খোকাবাবুরা মনে করেন যে বিএনপি-লীগ তাদের থেকে আলাদা কোনো এক স্ফেয়ারে ফাংশান করে। তারা নিজেরা মারপিট করলে করুক – আমাদের বাউন্ডারীর মধ্যে না ঢুকলেই হোলো। এই ভদ্রলোকের ইতিহাসের ওপর যথেষ্ট কাজ থাকা সত্ত্বেও এতোটুকু জানেন না যে পীস টাইম কোনো “রিয়ালিটি” না, কন্ডিশান। শান্তি ওহী মারফৎ নাজিল হয় না। এর জন্য নাগরিকদের তার দায় শোধ করতে হয়। যখন হাসিনার মাঝে বাংলাদেশের সংবিধান, জুডিশিয়ারি, নির্বাহী বিভাগ সব ফানা ফি হাসিনা হয়ে যাচ্ছিলো তখন “ইয়া হাসিনা ইয় লীগ” বলে জিকির করে এখন যদি আশা করেন হুট করে সব সুন্দর হয়ে যাবে তাহলে দুঃখিত: জিকিরের আগে একটু ভালো মন্দ কিছু খেতেও হবে।

Image

এই দেশটা শেখ হাসিনা কিংবা খালেদা জিয়ার কোনো সম্পত্তি না – এই কথাটা সবাই বিশ্বাস করে কিন্তু যা বিশ্বাস করে না তা হলো – এই দেশটা আমার, আমি ওন করি এবং আমার দায় আছে পরবর্তী প্রজন্মকে একটা বাসযোগ্য দেশ উপহার দেয়ার। তাই আমাদের সবার দায় আছে এটা নিশ্চিত করার যে কোনো মানুষই যেন এই দেশটাকে তার ইচ্ছার পুতুল বানিয়ে না ফেলে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রিয়ালিটি – আপনার কাজ শুধু ভোট দেয়া না, এই দুটো দলে যেন কখনোই কোনো হাসিনা কেউ হয়ে উঠতে না পারে, সেদিকে নিশ্চিত না করলে নিশ্চিত থাকুন: আপনি আপনার নিজের শান্তিটুকু খোয়াবেন। আপনি জিজ্ঞেস করুন নিজেকে সততার সাথে – আপনার সন্তান যদি কখনো প্রশ্ন করে, সে উত্তর দিতে যতোটুকু সততা লাগে ততোটুকু সততার সাথে, দেশটাকে যখন হাসিনা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তার খেলনা ঘর বানিয়ে ফেলছিলেন আপনি কি আপনার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন তাকে থামাতে?

শাহবাগীদের দেশপ্রেম

19

এই শিরোনামের জন্য আমি লজ্জিত এবং দুটো ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করি। প্রথমত: শাহবাগী বলতে হালকাভাবে যাদের বোঝানো হয় তারা অনেকেই এই নামে ডাকাটাকে অপমানজনক মনে করেন। তবে এই বিশেষ গোষ্ঠীকে এছাড়া অন্য যেসব শব্দে বিশেষায়িত করা হয় যেমন চেতনা-ব্রিগেড, চেতনাইজড – সেগুলো আরো আপত্তিকর মনে হয়েছে। তাই এ লেখায় অপেক্ষাকৃত কম আপত্তিকর বিশেষ্যটায় আস্থা রাখা হোলো – আশা করি আপনারা ব্যাপারটা স্পোর্টিংলি নেবেন।

দ্বিতীয়ত: অনেকেই আশা করেন যে কারো দেশপ্রেম নিয়ে ক্রিটিক করতে হলে নিজের দেশপ্রেম স্পষ্ট করাটা জরুরী। এই প্রসঙ্গে ভণ্ডামীর  কোনো অবকাশ যেন না থাকে সেজন্য প্রথমেই বলে রাখি, আমি নিজেকে দেশপ্রেমিক বলে দাবী করি না। আধুনিক কালে যেই বিশেষায়িত আবেগকে “দেশপ্রেম” হিসাবে হাজির করা হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, আমি তার ঘোরতর বিরোধী – কিন্তু সেটা ভিন্ন আলাপ। যারা দেশপ্রেমের সাগর কেচে ফেলেন অনুদিন, তারা যে স্ট্যান্ডার্ডকে দেশপ্রেম বলেন – কথা দিচ্ছি আমি কেবল সেই স্ট্যান্ডার্ড নিয়েই কথা বলবো। নিজের বিশ্বাস টেনে এনে ঘোট পাকাবো না – এটা আমার প্রতিশ্রুতি।

প্রথম নোক্তা: কারা শাহবাগী?

অনেকগুলো মেয়ের মজলিশে সুন্দরীতমাটি কে – এটি সনাক্ত করা খুব সহজ – সবাই ঠিক জেনে যায় পলকেই – কিন্তু ব্যাখ্যা করাটা কঠিন। শাহবাগী কে, এটাও ব্যাখ্যা করা সহজ না – you just know it। কিন্তু প্রয়োজন আছে ব্যাখ্যা করার। আমি একটা এসিড টেস্ট বের করেছি – শাহবাগী শনাক্ত করবার। অনেকটা সাইকোলজিকাল টেস্টের মতোন একটা প্রশ্ন।

ধরা যাক (আবারও বলছি – ধরা যাক। বাস্তবে এই অবস্থা তৈরী হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই) সৌদী আরব বললো যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে হবে। যদি না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের সব শ্রমিকদের দেশে ফেরৎ পাঠানো হবে। কথার কথা হিসাবে ধরে নিচ্ছি যে বাংলাদেশের রেমিটেন্সের ৮০ ভাগ আসছে সৌদি আরব থেকে এবং রেমিটেন্স বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়ের খাত – অঙ্কের হিসাবে জিডিপির ৫০ শতাংশ। এমন অবস্থা হলে আপনি কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার পক্ষে থাকবেন?

আমার পরিচিত যে কজন শাহবাগীকে জিজ্ঞেস করেছি সবাই বলেছেন যে না, বিচার বন্ধ করা যাবে না। বাকীরা স্বাভাবিক অবস্থায় যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইলেও এমন অবস্থায় পিছু হটবেন। (দয়া করে এটাকে আক্ষরিক অর্থে এসিড টেস্ট মনে করবেন না – এটি আমার পর্যবেক্ষণ মাত্র)

অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচারকে শাহবাগীরা স্থান, কাল, পাত্র, বাস্তবতা এসবের ঘেরাটোপে বাঁধতে রাজী নন, এই দাবী এবং এই প্রসঙ্গটি তাদের কাছে একটি আইনী প্রসঙ্গ যতোটুকু তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী একটি “পবিত্র” বিষয়, “চেতনার” বিষয়। স্পষ্টতই যে অপরাধ তারা নিজেরা করেন নি (অর্থাৎ চল্লিশ বছর ধরে বিচার না হওয়াটা) সে অপরাধের দায়ভার নিজেদের ওপর চাপিয়ে তারা উচ্চ নৈতিকতায় আক্রান্ত হন (তারা প্রায়ই মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন) এবং সেই অপরাধের শাস্তি চাওয়ার মাধ্যমে নিজেদের পরিশুদ্ধ/পবিত্র করে তুলতে চান। পুরো ব্যাপারটাকে তারা প্রচুর ও প্রচুর সিম্বলিজম এবং শক্তিশালী সংস্কার সহযোগে ধর্মাচারের খুব কাছাকাছি নিয়ে যান।

Image

আমি এই মানুষগুলোকে খুব গুরুত্বসহকারে ও কৌতুকভরে পর্যবেক্ষণ করি, বোঝার চেষ্টা করি। যে বিশেষত্ত্ব আমি সবসময় লক্ষ্য করি তা হলো – দেশ, ৭১, গণতন্ত্র, জামাত, পাকিস্তান, বঙ্গবন্ধু এবং ছাগু – এসব শব্দের উপূর্যপুরি ব্যবহার, অবিরাম ব্যবহার। যেকোনো সচেতন পাঠকের মনে হতে বাধ্য যে তারা গণতন্ত্র, পশ্চিমা “উদারনৈতিক” মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমকে খুবই উচ্চ আদর্শ মানেন এবং সে মতে অনুশীলনও করেন।

কিন্তু বাস্তবটা ভিন্ন। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলে তাদের প্রায় সবার প্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে যে শেখ হাসিনা একটি এক ব্যক্তির আজ্ঞাবহ গোত্রে পরিণত করেছেন তার বিরুদ্ধে অন্তত একটা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান নেয়ার কথা ছিলো। আওয়ামী লীগের হয়ে এলেকশান করা এক রাজনীতিবিদ আমাকে বলেছেন যে শেখ হাসিনার চেয়ে বড় একনায়ক ভারতবর্ষের ইতিহাসে কখনো আসে নি। যতোবড় একনায়কই হোক, অন্তত পার্টি-মেন কিংবা জেনারেলদের সাথে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত দেন। সিনিয়র মেম্বারদের মতামত আপনি নেবেন কি না সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ কিন্তু একনায়করা অন্তত আলোচনা করেন। শেখ হাসিনা এ প্রয়োজনটুকুও বোধ করেন না। দলের মহাসচিবও জানেন না তিনি কী করবেন।

তাদের প্রিয় দলের নেত্রী যে শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পুরো দেশটাকে বিস্ফোরণমুখ করে ফেলেছেন এবং এর দায়ভার যে প্রায় এককভাবে তার (আওয়ামী লীগের বহু দায়িত্বশীল নেতা পার্টির ভেতরে তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের বিরোধিতা করেছেন বলে তাদের দায়ভার কম) – এই কথা কোনো সুস্থ মানুষ অস্বীকার করতে পারবেন বলে মনে হয় না, কিন্তু বিস্ময়করভাবে নন-রেসিডেন্ট শাহবাগী, যাদের অনেকেই খুব ভালো পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় বড় ডিগ্রী করছেন তারাও কোনো উচ্চ-বাচ্য করেন না। এমন কি অনেকে এখনো এই বিষয়ে হাসিনাকে সমর্থনও করেন। এত মানুষ মারা যাচ্ছে এক ব্যক্তির এরকম গোয়ার্তুমির কারণে – দেশপ্রেমিক হলে এই অবস্থা জাস্টিফাই করার কথা ছিলো না।

এ পর্যবেক্ষণ থেকে আমি প্রথমত এই সিদ্ধান্তে আসি। আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন কোনো ভুলই করা সম্ভব না যার কারণে শাহবাগীরা তাদের সমর্থন তুলে ফেলবেন এবং বিএনপির পক্ষে এমন কোনোই ভালো কাজ করা সম্ভব না যার কারণে তাদের সমর্থন করা যায়। চল্লিশ বছর আগে যে যা করেছেন সেটিই চূড়ান্ত ও পরম। অনুভব করি যে অন্তত রাজনৈতিক সমর্থনের ব্যাপারে তারা ধার্মিকদের মতোন আচরণ করতে সচ্ছন্দ।

Image

কিন্তু এটা কোনো অভিনব বিষয় না। বিএনপির সমর্থকদের মধ্যেও আমি এ ধরনের মানুষ দেখেছি। আমার কাছে অভিনব লেগেছে দেশ ও দেশপ্রেম – এই বিষয়গুলোকে তারা কীভাবে দেখেন – এই ব্যাপারগুলো। শ্রদ্ধেয় এবং আমার দেখা মেধাবীতম বাঙালিদের একজন আবেদ চৌধুরীর ভাষা ধার করে বলি – যারা MIT’র ল্যাবে বসে পৃথিবী বদলে দেয়ার বদলে ৭১ এর জুলাই মাসে মেহেরপুরে কতো রাউন্ড গুলি করা হয়েছিলো – এই চিন্তায় দিনগুজার করেন তারা আর যাই হোক, সুতীব্র অনুভুতি যে পোষণ করেন – এ কথা অস্বীকার করা যাবে না।
তা এই অনুভূতিকে কি আমরা দেশপ্রেম বলবো?

কোনমতেই না। কারণ এই একই মানুষ ঘটমান বর্তমানে নিজের দেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর পুলিশ বাহিনীর গুলি চালানোকে মনে করেন কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ, এই একই মানুষ ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী পালন করেন অথচ সেই দিনেই বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ গুম হলে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করেন না। শুধুমাত্র বিএনপি কিংবা জামাত করার কারণে রাষ্ট্র এখন বহু সাধারণ কর্মীদের ওপর যে অত্যাচার চালাচ্ছে তা ক্ষেত্র বিশেষে ৭১ এর চেয়েও ভয়াবহ কিন্তু এসব ব্যাপারে তারা মতিকন্ঠ করেন।

দেশের অর্ধেক মানুষকে বাদ দিয়ে “দেশপ্রেম” করা যায় কি?

তাহলে তারা যা করেন সেটা কি?

আমার ধারণা শাহবাগীরা তাদের পছন্দের একটা মেক-বিলিভ ওয়ার্ল্ডে থাকেন। এই “থাকার” একটা বিশেষত্ত্ব আছে। বাংলাদেশ সম্বন্ধে তাদের কিছু আইডিয়া, কিছু টোটেম, কিছু মাসকট, কিছু ইভেন্ট আছে যেগুলোকেই তারা বাংলাদেশ বলে মনে করেন। ব্যাপারটা বোঝানো একটু কঠিন – তবু চেষ্টা করি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন – এতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু শাহবাগীদের সাইকোএনালিসিস করলে আমার ধারণা দেখা যাবে যে দাড়িপাল্লার এক পাশে বাংলাদেশ, আরেক পাশে মুক্তিযুদ্ধ রাখলে তারা মুক্তিযুদ্ধ নামক “ইভেন্ট”টিকে বাংলাদেশের চাইতেও বড় মনে করবেন। আরো গহীনে গেলে আমার মনে হয় দেখা যাবে যে ৭১ এর আসল ঘটনা না, মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভটাই তাদের কাছে সবচেয়ে প্রেশাস। কারণ মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাস কি তার চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হোলো এই ন্যারেটিভটাকে আঁকড়ে ধরে থাকলে তারা নিজেদের পবিত্র, নৈতিক, মহান – এসব মনে করতে পারেন। তারা তাদের “দেশের” এমন “আলাদা বিষয়গুলোকে” প্রবলভাবে ভালোবাসতে সক্ষম কিন্তু বিষয়গুলো এক করতে পারেন না – সেজন্যই সেটা মেক-বিলিভ ওয়ার্ল্ড।

কেন এমন হয়?

আমার ধারণা “বাংলাদেশ” নামক রাষ্ট্রটিকে দীর্ঘদিন ধরে গভীরভাবে ভালোবাসা খুব কঠিন – বিশেষ করে এখন যাদের বয়স ৩০ এর কম তাদের জন্য। কোনো অসুন্দর জিনিস দীর্ঘদিন ভালোবাসা যায় না। যারা আগ্রহী তারা ষাট, এমন কি আশির দশকের ঢাকার স্টিল ফটোগ্রাফ দেখতে পারেন। অপূর্ব সুন্দর, ছিমছাম এক নগরী। মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বইয়ে (প্রকাশকাল জুন ‘৭১ – সম্ভবত) কাজী আনোয়ার হোসেন ঢাকাকে উল্লেখ করছেন “রমনীয়” ঢাকা বলে। সুন্দরকে ভালোবাসা যায়, ভালোবাসতেই হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না আমাদের বাবাদের প্রজন্ম যে যুদ্ধ করেছিলেন তার মূল কারণ ছিলো তারা তাদের মেমোরীকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, যে মেমোরী হোলো তাদের শৈশব ও কৈশোরের “সুন্দর” একটা দেশ, যাকে রক্ষা করা যায়, করতে হয়। কিন্তু আজকের ঢাকা কুৎসিত, পুরো দেশে শুধু মানুষ আর মানুষ, চারদিকে শুধু কংক্রিট। মানুষগুলোও বদলে গেছে – মুদির দোকানী থেকে প্রধানমন্ত্রী, সবাই অকারণে যখন-তখন মিথ্যা বলছেন। টিভি খুলবেন – বাজে খবর, পত্রিকা খুলবেন তো ভয়ঙ্কর খবর। শহরটাকে যে একটু অন্য চোখে তাকাবেন, সেই সময়টুকুও নেই।

কার্যকারণের সমন্বয় খুঁজতে গেলে এই দেশকে ভালোবাসা, রীতিমতোন এক এইচএসসি পরীক্ষা।

কিন্তু স্কুলে আপনাকে প্রাইম করা হয়েছে দেশকে ভালোবাসার জন্য। ইসলাম শিক্ষায় পড়েছেন “দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ”, বাংলা বইয়ে পড়েছেন “ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা”/ নিজের ভাইকে যদি আপনি ভালো না বাসেন আপনি বড়জোর হৃদয়হীন মানুষ, কিন্তু খারাপ নন। অন্য দিকে নিজের দেশটাকে যদি ভালো না বাসেন, আপনি “অনৈতিক” মানুষ। “দেশপ্রেম না থাকা” আর “বিশ্বাসঘাতকতা” বিপজ্জনক রকমের কাছাকাছি বিষয়।

আপনার মনের শিক্ষিত অংশ বলছে দেশকে ভালোবাসতে হবে কিন্তু ইনসটিংটিভ অংশ প্রশ্ন করছে এই দেশকে কি ভালবাসা যায়?

তা এই টানাপোড়েনের প্রতিক্রিয়া কী? আপনি পেছনে তাকাবেন এবং এমন কিছু ব্যক্তি, ইভেন্ট ও ধারণা বেছে নেবেন যার একটা অতি সরল ন্যারেটিভ আছে এবং এই ইন্ডিভিজুয়াল বিষয়গুলোকেই বাংলাদেশ বলে ভাবতে শুরু করবেন (সেহেতু তা “রক্ষা” করা যায়) / এটাই দেশপ্রেম, এটাই চেতনা।

আমার ধারণা শাহবাগীরা এই ভাবেই দেশটাকে দেখেন।

এর একটা খুব বড় সুবিধা আছে। যেহেতু আপনার “দেশ” আসলে আলাদা আলাদা কিছু ইভেন্ট এবং যেহেতু এই ইভেন্টগুলো বাস্তবতার উর্ধ্বে (আপনার কাছে) সেহেতু এই ইভেন্টগুলো নিজেরা খুবই ফ্লুয়িড। যেকোনো ব্যাখ্যা, যে কোনো নির্দেশ যতোক্ষন আপনার পক্ষে যায়, মনে হবে যে এটাই সত্যি। আগ্রহীরা হয়তো দেখেছেন যে দেওয়ানবাগী পীর ওয়াজে বলছেন যে তার স্ত্রী আসলে বিবি ফাতিমা এবং যেহেতু বিবি ফাতিমা তার “ভেতরে” আছেন সেহেতু তার সাথে রাসুলের একটা “যোগাযোগ” তৈরী হয়েছে এবং এই যোগাযোগের কারণেই তার মুরীদেরা তাকে রাসুল হিসাবে স্বপ্নে দেখেন। মজার ব্যাপার হোলো এই কথাগুলো যখন তিনি বলেন তখন তার ভক্তরা তাকে তীব্রভাবে সায় দেয়। ধার্মিকেরা যখন এই ভিডিও দেখেন তখন অগ্নিশর্মা হয়ে যান এবংসহজ প্রশ্নটি করতে ভুলে যান যে ভক্তদের কাছে কেন এটা রিয়ালিটি বলে মনে হয়?

কারণ দেওয়ানবাগীর ভক্তদের কাছে দেওয়ানবাগী একটা “প্রটেকটেড ইভেন্ট” – তাকে বাস্তবতার ধার ধরতে হয় না। আর যখন কোনো ইভেন্টকে আপনি বাস্তবতার উর্ধ্বে উঠিয়ে ফেলতে পারেন তখন এই ইভেন্ট “ইতিহাস” থাকে না, একটা অর্গানিজমে পরিণত হয় – সেল্ফ সার্ভিং অর্গানিজম। আমি একবার একটা সামান্য পরীক্ষা করেছিলাম, ঘটনাটা খুবই ইন্টারেস্টিং। আমার এক তীব্র আওয়ামী সমর্থক বন্ধুকে একটা গল্প বলেছিলাম, দেওয়ানবাগীর গল্প থেকে খুব আলাদা না। আমি খুব সিরিয়াসলি তাকে বলা শুরু করলাম যে মাত্র নয় মাসে যে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে এর আসল কারণ বঙ্গবন্ধু। তিনি যে লায়ালপুর কারাগারে ছিলেন এটা পুরোপুরি সত্য না। প্রথমে বন্দী থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ সময় তিনি মস্কোতে ছিলেন এবং মস্কোতে তিনি ইস্টার্ন ব্লকের হয়ে দর কষাকষি করছিলেন আমেরিকার সাথে। গল্পটা বিশ্বাস করানোর জন্য প্রচুর নথিপত্রের উল্লেখ করলাম, বললাম যে – পুরোপুরি স্বীকার না করলেও প্রাভদা এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস এর অমুক তারিখের এডিটরিয়ালে এর উল্লেখ আছে।

আমার এই বন্ধুটি সম্ভবত বাসুদা এবং মেজবাহ আহমেদের পর্যায়ের শাহবাগী নন কিন্তু মজার সাথে লক্ষ্য করলাম যে একটিবারের জন্যেও জিজ্ঞেস করলেন না যে পাকিস্তান কেন বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দেবে মস্কোতে যাওয়ার জন্য এবং মস্কো থেকে তিনি পাকিস্তানে ফেরতই বা আসলেন কী করে?

এটাকেই আমি বলেছি “ফ্লুয়িড” এবং ফ্লুয়িড বলেই পুরো ঘটনা আর কোনো ঐতিহাসিক ইভেন্ট থাকে না – হয়ে যায় একটা অর্গানিজম। এখানে একজন লাকীর প্রয়োজন হবে স্লোগান দেয়ার জন্য, একজন মাহবুব রশীদ দেবেন ফেসবুক স্টেটাস, মেসবাহ আহমেদ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চার ফাঁকে এসে আমাদের জানাবেন এক দেশে দুই আইন থাকার বিপদ এবং বাসুদা অনুরোধ করবেন সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য। ইতিহাস আর কোনো ঘটনা থাকে না, হয়ে যায় একটা প্রাণী – যে বদলে যায়, সরে যায়। যে অরক্ষিত হতে পারে এবং যার সম্ভ্রমহানিও হতে পারে।

Image

শুধুমাত্র – আবারও বলছি – শুধুমাত্র “চেতনা”ই পারে এই প্রাণীটিকে বাঁচিয়ে রাখতে। কেন?

কারণ চেতনা হোলো এক গোছা বিশ্বাস যাকে আপনি যুক্তি-তর্কের উর্ধ্বে প্রায়োরিটি দেন। আপনি নিজেকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে এই বিশ্বাসগুলোই আপনার অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানেই শেষ না – আপনার সামনের মানুষটিকেও চেতনা করতে হবে – কেননা আপনি তাকে বিচার করবেন আপনরা চেতনা দিয়ে। ওইজা বোর্ডে যেমন আপনার অবচেতনের শক্তি আঙ্গুল নাড়িয়ে ডেকে আনে আত্মা, ঠিক তেমনি চেতনার সমস্মর, নিয়ন্ত্রণ করে ইতিহাস নামক প্রাণীটিকে। বর্তমানে বসে আপনি বদলে দেন অতীত। পারেন না বদলাতে শুধু বর্তমান।

এই যে আপনার ধর্মের মতো বিশ্বাস যাকে আমি ধর্মই বলি, শাহবাগীরা ভালোবেসে তার নাম দিয়েছে দেশপ্রেম।

photo credit: Maciej Dakowicz, Zakir Hossain Chowdhury    

শেষ হোলো আমার শৈশব

Image

টেন্ডুলকার আমার কাছে শুধু শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানই নন, আমার কৈশোরের সাথে শেষ যোগসূত্রও – যতোবার তাকে দেখি, মনে হয় কোনো এক অদ্ভূত কারণে, সোনার দিনগুলো আমার আছে মোহাফিজ। এই লোকটার ব্যাট দিয়েই আমি যেকোনো সময়ে চলে যাবো সেই নব্বুই এ – ইচ্ছে হলেই। ব্যাট হাতে টেন্ডুলকার মানেই আমার কৈশোরের সেই নানান রঙের দিনগুলো।

আজকে যারা কিশোর তাদের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন হবে ৮০’র দশকে কী বোরিং ক্রিকেট খেলতো ভারত। শ্রীকান্ত আর আজহার ছাড়া ধুন্ধুমার কোনো ব্যাটসম্যান নেই। কপিল মাঝে মাঝে পেটাতে পারে এবং ওই একটি মাত্র বোলার – বাকী সব কে কার থেকে স্লো বল করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা। ৮৮ সালে এশিয়া কাপ ক্রিকেট হয়েছিলো ঢাকায়, প্রথম বড় ধরনের আয়োজন। টিভিতে কমেন্টেটর ছিলো আলী জাকের, আজকের হিসাবে খুবই গরিবী আয়োজন কিন্তু ক্লাস ফাইভের এই ছেলেটার কাছে পৃথিবী বদলে যাওয়া ঘটনা (আজকের কিশোরদের কাছে কল্পনা করা হয়তো সম্ভবই না যে ৮৯ সালে ঢাকায় একটা আন্তর্জাতিক কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়েছিলো এবং সেটা লাইভ দেখানো হয়েছিলো টিভিতে। সেই বিজ্ঞ কমেন্ট্রি থেকেই জানতে পারি যে প্যাচ যেটাই হোক কমেন্টেটর সেটাকে বোস্টন ক্র্যাবই বলবেন। আমার কাছে সেটাও ওয়ার্ল্ড চেঞ্জিং ইভেন্ট) । মনে আছে আরশাদ আইয়ুব নামের এক অখ্যাত অফ স্পিনার (রাজেশ চৌহানের ঠিক আগে খেলতো ভারতের হয়ে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৫ উইকেট নিয়ে বসে ২০ না ২১ রানে। কিন্তু গ্যালারিতে ভারতের একেবারেই সাপোর্ট নেই। মানে একটাও তালি পড়ে না, কিন্তু পাকিস্তানের জন্য দর্শকরা হাত ফাটিয়ে ফেলছে। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিলো এটা মুসলমানির কারবার। কিন্তু এই একই মাঠে ১০ বছর পরে যখন পাকিস্তান ইন্ডিয়া ম্যাচ হোলো তখন বলা যায় সাপোর্ট ৬০-৪০ (পাকিস্তানের পক্ষে)। কারণটা আসলে ধর্ম ছিলো না, ছিলো টেন্ডুলকার। দশ বছর আগের এক বোরিং টিম শচিনের হাত ধরে হয়ে গেছে ফাইটিং আউটফিট।

আমাদের চেয়ে যারা দশ বারো বছরের বড় তাদের থেকে নিয়ে আমরাই শেষ – এ পর্যন্ত যে প্রজন্ম – তাদের কাছে ইমরান খান যে ড্যাশিং ফাইটার, আমাদের পর থেকে আজকের ছানাপোনা এই দীর্ঘ প্রজন্মের কাছে টেন্ডুলকার ঠিক তাই। ইমরান খানের সাপোর্টার থেকে আমাদের প্রজন্ম হয়েছিলো পাকিস্তানের সাপোর্টার, আর টেন্ডুলকারের সাপোর্টার থেকে আমাদের পরের প্রজন্ম হয়েছে ভারতের সাপোর্টার।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে ওল্ড ডিওএইচএসে – সেখানে ৮৯ সালেও প্রায় পুরো বছর ক্রিকেট খেলা হতো। কায়সার হামিদের ভাই সোহেল হামিদ সেখানে তখন ষ্টার ক্রিকেটার। জাতীয় দলের হয়ে খেলা পেস বোলার হাসিবুল হোসেন তখন উঠতি তারকা মাত্র ক্লাস সেভেন-এইটেই। ওখানেই মনে হয় প্রথম শুনি যে ইন্ডিয়ার একটা বাচ্চা ছেলে খুব ভালো খেলে। ৯০ এ চলে যাই ক্যাডেট কলেজ। ক্যাডেট কলেজগুলো এখন কী রকম জানি না তখন কিন্তু পুরোপুরি ফুটবল প্রধান ছিলো। তবে বহু ক্যাডেট খেলার খবর রাখার দিক থেকে প্রাণান্ত ছিলো। আশ্চর্যের বিষয়: প্রায় কেউই ইন্ডিয়ার ডাই হার্ড ফ্যান ছিলো না (আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র ফাইয়াদ ভাই ছাড়া)। কিন্তু টেন্ডুলকার বিষয়ে সবারই খুব আগ্রহ ছিলো। ভিনোদ কাম্বলির সাথে ৬শ রানের পার্টনারশিপের কথা সবার মুখে মুখে।

অবস্থা বদলে যায় ৯২ এর বিশ্বকাপের পরে। ক্রিকেট দেখাটা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং খেলার পরিমাণও বাড়তে থাকে। মনে আছে পাকিস্তানের সাথে খেলায় কাম্বলি আর টেন্ডুলকার ব্যাটিং করছিলো (এই দিনটায় আমরা কলেজ থেকে ছুটিতে বাড়ি আসছিলাম) আর বল করছিলো ইমরান খান। দুজনের মিলিত বয়স ইমরানের সমান না। কিন্তু কী দারুন ছিলো টেন্ডুলকার।

ওই বয়সের একটা বিশেষত্ব ছিলো কীভাবে প্রমাণ করা যায় আমি যে টিম সাপোর্ট করি সেটাই বেস্ট এবং অন্য টিম কেন ধর্তব্যই না সেটাও প্রমাণ করা। ইন্ডিয়া যে বাজে টিম পরিসংখ্যানের দিক থেকে প্রমাণ করা খুব সহজ ছিলো। ইন ফ্যাক্ট ইন্ডিয়া উইনিং টিম হয়েছে এই তো সেদিন – ২০০৩ এর দিকে এসে। কিন্তু একজন ব্যাটসম্যানকে প্রায় সবাইই সমীহ করতো- সেটা ছিলো টেন্ডুলকার।

কোনো swagger নেই এমন একটা স্পোর্টসম্যানকে সবাই ভালোবাসে তার বিনয়ের জন্য, বিষয়টা কল্পনা করা খুব কঠিন – শচীন সেটা করে দেখিয়েছে। সত্যিই আশ্চর্য এই মানুষটা। কোনো একটা কাজ ২৪ বছর ধরে সমান উদ্যমে মানুষ ভালোবাসে কী করে এটাই আমি বুঝে পাই না।

টেন্ডুলকারকে আর দেখা যাবে না এটা ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমার শৈশবের এই মানুষটাকে আর দেখা যাবে না খেলার মাঠে, ভাবতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। বড় আমি হয়েই গেলাম তাহলে, শেষমেষ।

আপনি ঘুমান কী করে, প্রধানমন্ত্রী?

28

কর্নেল এরশাদের দীর্ঘ চাকরিজীবনের বাকি ছিল মাত্র এক সপ্তাহ। ‘সেদিন’ ছিল তার জন্মদিন। কথা ছিল সে রাতে তারা যাবেন আইসক্রিম খেতে, সবাই মিলে। কর্নেল এনশাদের জীবনে ‘সে রাত’ আর আসেনি।

কর্নেল গুলজারের পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সময় দল বেধে পালাচ্ছিলেন। পানির প্রয়োজন হলে খোঁজে বের হন গুলজারের পিতা ও অন্য আরেকজন। দ্বিতীয়জন ফিরে আসেন। প্রথমজন আসেননি। গুলজারের মা চিরজীবন এই আশায় ছিলেন যে তার স্বামী একদিন ফিরবেনই। কর্নেল গুলজারের লাশ এখনো মেলেনি সম্ভবত। এমন দুঃসহ অপেক্ষার প্রহর আরো কতগুলো জীবনকে অসহনীয় করে তুলবে কে জানে?

পমি ভাইয়ের (মেজর গাজ্জালী) সঙ্গে ছেলেবেলায় তাদের ড্রাম ফ্যাক্টরির অফিসার্স কোয়ার্টারে কতই না খেলেছি ‘সোলজার সেট’ নিয়ে। খেলার নাম হলো ‘গানস অব নাভারন’/ গুলি হবে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে। একপক্ষ যদি মনে করে অন্যপক্ষের অমুক সোলজার তার মুখের গুলিতে মারা গেছে, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে শুইয়ে দিতে হবে। এ নিয়ে ঝগড়াও হতো। ঝগড়ায় জিতলে শুইয়ে দেয়া সোলজারকেও দাঁড় করানো যাবে। পমি ভাই, আজ বড্ড কষ্ট হচ্ছে, ভিজে আসছে চোখ। আপনাকে যদি দাঁড় করানো যেত, আর একটি বার।

হায়দার (ক্যাপ্টেন তানভীর) ছিল আমার চেয়ে এক ব্যাচ জুনিয়রয়র। খাড়া খাড়া চুলের শান্ত, লিকলিকে লম্বা এই ছেলেটাকে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে কোনোদিন হার্ডলস রেসে হারাতে পারেনি কেউ।

আমি কেবল জানতে পারিনি আমার এ ছোট ভাইটি ঠিক তার নামের মতোই সুপুরুষ বীর। হায়দার সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটিতেও কেড়ে নিয়েছিল অস্ত্র, পাশের সৈনিক থেকে। কিন্তু গুলি করেনি। ভাই কেন ভাইকে গুলি করবে। সরল ভাইটি বুঝতে পারেনি যাকে সে ভাই মনে করছে, ওরা ছিল দানব।

আমার আরেক ছোট ভাই ক্যাপ্টেন মাজহার প্রাণভিক্ষা চায়নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোঝাতে চেয়েছিল শান্ত হতে। আর অপেক্ষা করেছিল সাহায্যের। মেজর জেনারেল শাকিলও অপেক্ষা করেছিলেন সাহায্যের। কিন্তু সে সাহায্য পৌঁছেনি।

Image

প্রধানমন্ত্রী, এ সৈনিকেরা আশা করেছিল সাহায্য আসবে। শেষ নিঃশ্বাসটুকু তারা ফেলেছিল হয়তো এই আশা নিয়ে যে এক্ষুণি সাহায্য আসবে। আপনার জীবনে গৌরব ও সম্মানের মূল্য কতটুকু জানি না। কিন্তু ওদের জীবনে ও দুটোই সব। ওরা প্রতিজ্ঞা করেছিল এ দেশের সঙ্গে, টিল ডেথ ডু আস পার্ট। ওরা ওদের প্রতিজ্ঞার মূল্য দিয়েছে, আপনি দেননি। আপনি সাহায্য পাঠাননি। সৈনিক কখনো হতাহতের সম্ভাবনা বুঝে লড়াই করে না। করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে।

অন্যায় ও অনিষ্টের দমন করার জন্যই যে শক্তির প্রয়োজন। আপনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেছেন, লড়াই করেননি। আমি দুঃখিত। আপনি এদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, কিন্তু আপনি আমার নেতা হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। আপনি কৌশলী হতে পারেন, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার আত্মিক শক্তি আপনার নেই। অসুন্দর আর অন্যায়ের সঙ্গে চিরকাল সমঝোতা করতে করতে আজ বিপদের মুহূর্তে কেবল আপসের কথাই আপনাদের মাথায় আসে।

আপনার কারণে আমার মাথা হেট হয়ে আসে। আমরা সেই অযোগ্য জাতি যারা তাদের বীরদের সাহায্য করার চেষ্টাটুকু করেনি। রাগে আমার শরীর অসার হয়ে আসে, যখন দেখি পরদিন আপনার গুণকীর্তনে ভরে যায় পত্রিকার পাতা। আপনি নাকি জীবন বাঁচিয়েছেন। এমনসব কাপুরুষের জন্য কলম হাতে নেয়াটাই শ্রেয়। ‘এগুলোর’ অন্য কিছু বহন করবার শক্তি নেই।

আপনার অনন্য ‘বিচক্ষণতার’ সুযোগে হত্যাকারীরা হত্যা, লুণ্ঠন ও নির্যাতনের যথেষ্ট সময় পায় এবং তারপর পালিয়েও যায়। একবার ভাবুন তো, আজ যদি আপনার ওপর কেউ গুলি চালায় এই সৈনিকেরা কি প্রবাবিলিটির গণিত কষে এগিয়ে আসবে? আক্রমণকারীকে পাল্টা গুলি চালাতে গিয়ে যদি মারা যায় কোনো নিরপরাধ সাধারণ মানুষ – একবার প্রশ্নও করা হবে না তার জন্য। এই বাচ্চা ছেলেগুলো তাদের বুক পেতে দেবে আপনার জন্য। হিসাব করবে না তারা নিজের জীবনের। ওদেরও প্রয়োজন হয়েছিল- একবার আপনার সাহায্যের। মনে রাখবেন, সেদিন আপনি হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

হায়দার, মাজহার আর পমি ভাইয়ের চেহারা মনে এলে আজ আমি চোখের পানি আটকে রাখতে পারি না। তবু আমার গর্ব হয়, এমনসব বীরের সঙ্গে আমি কাটিয়েছি অনেকগুলো বছর, চিনেছিলাম তাদের, কাছ থেকে। আর আমার লজ্জা হয়, আমি আপনাকেও চিনেছি।

সুধী সমাজ

সুধী সমাজ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চান সত্যি কিন্তু সেটা এজন্য না যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীটা ন্যায্য কিংবা এ পথে খুন-জখম কম হবে বরং এজন্যে “নিরপেক্ষতা” সুধী সমাজে খুব ফ্যাশনেবল জিনিস। তারা চান বিএনপি প্রয়োজনে কেয়ামত পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী করুক কিন্তু সেটা করতে হবে টেলিভিশনে, সংসদে। যে দাবী দেশের অন্তত ৮২ ভাগ মানুষের দাবী (প্রথম আলো জরিপ, সেপ্টেম্বর ২০১৩) এবং যে ন্যায্য দাবীর কারণেই এতো হানাহানি সে দাবী লীগ না মানলে কী হবে – এ প্রশ্ন করলে তারা মাথা চুলকে দার্শনিক ভাবে উত্তর দেন, “কী জানি ভাই আর ভাল্লাগে না এতো হানাহানি; আর পারছি না নিতে।”

তারা আবার বিস্মৃতিকে প্রশ্রয় দিতে ভালোবাসেন – খুব। খালেদা জিয়া যে মাসের পর মাস ধরে সরকার দলকে আলোচনা করার আহবান করেছেন সে সত্যটা ভুলে যাওয়াটাও দেশে খুব ফ্যাশনেবল।

তিনি আলোচনার দাবী জানালে বলা হয় যে বিএনপির আন্দোলনের মুরোদ নেই আবার আন্দোলন করলে বলা হয় আমরা তো বিএনপির কাছে এমন কিছু আশা করি না।Continue Reading