আদর্শিক রাজনীতি ও বাস্তবতা

by Jahid Islam

দেশের একজন সাহসী চিন্তাবিদ ছিলেন আহমদ ছফা। তাঁর চিন্তায় স্বচ্ছতা ছিল। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন, লিখতেন। এতে কে খুশি হল, কে বেজার হল সেটার প্রতি খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করতেন বলে মনে হয় না। তাঁর লেখা একটা চমৎকার প্রবন্ধ হল, “বাঙ্গালী মুসলমানের মন”। এখানে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন- “বাঙ্গালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসাভাবে অনেক কিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙ্গালি মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না।”

এ প্রবন্ধের শেষ প্যারায় লিখেছেন-“বাঙ্গালি মুসলমানের মন যে এখনো আদিম অবস্থায়, তা বাঙ্গালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তার মনের ওপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে,সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু’ বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবেনা, কিন্তু বাঙ্গালী মুসলমানের মনের ধরন-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়াও যেতে পারে।”
এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সোল এজেন্ডা মুক্তিযুদ্ধ ও সেকুলারিজম। তারা নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে মনেপ্রাণে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রগতির কথা বলে শিক্ষিত মিডেল ক্লাসের কাছে আবেদন রাখতে চায়। সেকুলারিজম এবং আঞ্চলিক জঙ্গিবাদের উথানের ভয় দেখিয়ে বাইরেরর দুনিয়ার সমর্থন আদায় করতে চায়। শাহবাগে হাজার লোকের সমাগম দেখে তারা ভাবে এবার জোয়ার এসেছে, আর ঠেকায় কে ! এই বারের চোটে রাজীব হায়দার (থাবা বাবা) কেও শহীদ ঘোষণা করে দেয় শেখ হাসিনা। শাহরিয়ার কবিররা ভাবেন- “কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও যেহেতু বাহাত্তরের সংবিধানের কাছাকাছি কিছু একটা এখন আছে যাতে মূলনিতী হিসেবে ‘কম্যুনিজম’ এর কথা উল্লেখ আছে, সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম বাদ পড়েছে,শাহবাগে হাজার হাজার মানুষ এসেছে, এবারে অন্তত ধর্ম নামের আফিমের হাত থেকে মুক্তি মিলবে।”

বাস্তবতা হল এরকম যে, বাঙ্গালী মুসলমান শাহবাগে জড় হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে যদি শবে বরাত হয় (শবে বরাত পালন সহিহ কিনা সেটা অন্য তর্ক) সে তার পুরোনো পাঞ্জাবীতে শান দিয়ে, টুপি মাথায় দিয়ে হাজির। নফল ইবাদতের মাধ্যমে ভাগ্য বদলের জন্য দোয়া করে সারারাত। হয়ত পরের দিন থেকেই আবার নামাজ পড়ে না। কিন্ত আওয়ামী লীগের উগ্র সেকুলারিজমে সে বিশ্বাস করে না। নবীজিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে শুনে শাহবাগ থেকে সে হাত গুটিয়ে নেয়। সংবিধানে আল্লাহর নাম নিয়ে কাটা ছেঁড়াও তার বিশেষ পছন্দ না। কম্যুনিজম এবং উগ্র সেকুলারিজমের প্রধান মুফতি শাহরিয়ার কবির ও মুনতাসির মামুন শবে বরাতের রাতে নামাজকে আদিখ্যেতা মনে করে। মনে মনে বলে, “ শালার বাঙ্গালী। আবার মসজিদে যাও না ! এত্ত বুঝাই তাও কাম হয় না !”।

 

আবার আল্লামা শফির ডাকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় এসেছে অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে। সাধারণ পথচারীরাও প্রিয় নবীজিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে শুনে এতে শামিল হয়েছে। ইসলামপন্থীরা ভাবে এবার বাংলাদেশ ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া কেবলই সময়ের ব্যাপার। তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা হল, যেই বাঙ্গালী নিয়ে আল্লামা শফি বা জামায়াতে ইসলামি, দেশে ইসলামি শাসনের স্বপ্ন দ্যাখেন/দ্যাখে সেই বাঙ্গালী মাজারে যায়। পীরের মুরিদ হয়, মৃত ব্যক্তির কবরে সিজদা করে, গলায় তাবিজ দেয়, মিলাদ পড়ে। এছাড়াও আরও অনেক রকম শিরক করে, বিদআতি কাজ কর্ম করে।

files

আবার এটাও ঠিক যে, সে ইসলামকে ভালবাসে। শুক্রবারের জুম্মার খুতবায় হুজুরের ওয়াজ “ভাইয়েরা আমার, ইসলাম-ই একমাত্র মুক্তির পথ”, শুনে সে মাথা নাড়ায় এরপর ঘরে এসে আরাম করে বসে শুক্রবারের সিনেমা দেখে। সে যে ইসলামকে ভালবাসে, সেটা সে প্রকাশ করে মসজিদের হুজুরকে দাওয়াত দিয়ে ঘরে এনে খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে। সকালে সে তার ছেলে মেয়েকে আরবী পড়তে মক্তবে পাঠায়। শহর হলে হুজুর বাসায় এসে পড়ায়। ছেলে মেয়েরা কোরআন পড়া শিখে, নামাজের নিয়ম কানুন শিখে । সে মনে করে ব্যস-এই ত ইসলাম, আর কি ?

সে পলিটিক্যাল ইসলামে কনভিন্সড না।  মসজিদের হুজুরকে সে নামাজের মিম্বরে কিংবা ওয়াজের জায়গায় চিন্তা করতে পারে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী/এমপির সিটে না। তার কাছে রাজনীতি একটা খারাপ জায়গা। হুজুরের সেখানে কি কাজ ? জামায়াতের নেতাদের ক্ষেত্রে, যে কোন মূল্যে তাদের ফাঁসি হোক এটা সে চায় না (এটা আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীর কথা না, সাধারণ মানুষের কথা)। তবে ৭১ এ তারা ছিল দেশ বিরোধী এটাই সে বিশ্বাস করে । তাই তাদেরকেও ভোট দিতে সে খুব একটা উৎসাহি না, অন্তত জামায়েতের ব্যানারে না। সেকুলারিজম, কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামি শাসন এগুলো সব ইন্টেল্যকচুয়াল কনভিকশন। সে এত কিছু বোঝে না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি দেশের অন্তত ৫০ ভাগ লোক দেশে কয়টি সেক্টরে যুদ্ধ হয়েছে, বা স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস কবে বলতে পারবে না। ৮০ ভাগ বা তার চেয়েও বেশি লোক সহিহ উচ্চারণে কোরআন পড়তে পারে না।

সে যে ৫ বছর পর পর সুইং ভোট দিয়ে সরকারের পতন ঘটায় এটা এ জন্য না যে, ৫ বছর পর একদিন আচমকা ঘুম থেকে উঠার পর তার মাথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের খায়েশ জাগে । অথবা দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে । অথবা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ থেকে আর নামাজ ক্বাযা নয়। এবার থেকে পুরোপুরি সে ইসলামি পথই অনুসরণ করবে। সে এটা করে দুই দলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে। তার এত কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় নাই। সে ছোটে পেটের তাগিদে। এরপর যতটুকু পারে ধর্ম কর্ম করে। মূলত তার নামাজ জুম্মার নামাজ, ঈদের নামাজ আর জানাজার নামাজে সীমাবদ্ধ। আর ইসলামি জ্ঞানের একমাত্র সম্বল হল শুক্রবারের ওয়াজ।

সেকুলারিজম বা ন্যশনালিজম বা পলিটিক্যাল ইসলাম আবার কি ! এত হ্যাভিওয়েট ডেফিন্যাশন সে জানবে কোথা থেকে ? এটা হল পিউর বাস্তবতা। কোন সুগার কোটিং নাই। আপনি সেকুলারিজম, কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামি শাসন যাই কায়েম করতে চান এটা ভাল মত বুঝে এরপর শুরু করতে হবে। এটাই কাজ শুরুর প্রথম ধাপ।এরপর সে অনুযায়ী মডেল বানাতে হবে। এখানে ভারত বা ফ্রান্সের সেকুলারিজম, ব্রিটিশ ন্যশনালিজম অথবা মিশর কিংবা তুরস্কের ইসলামি মডেল চলবে না। চীন রাশিয়ার প্রেতাত্মা ত আগেই দূর হয়েছে। এদেশে স্রেফ একটাই চলবে, সেটা হল –“বাংলাদেশি মডেল”। এতে অন্যান্য মডেলের কনসেপ্ট থাকতে পারে, তবে সবশেষে হতে হবে একেবারে কাস্টমাইজ করা দেশী জিনিস । “কমরেড” বা “ইয়া আখি” টাইপ পরিভাষা এখানে চলবে না। অন্তত শুরুতে  না। পরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝে যে যত রিয়েলিস্টিক মডেল বানাতে পারে তার মডেল তত ভাল কাজ করবে। প্রথমে প্র্যাকটিক্যাল কেস থেকে শুরু করে এরপর এটাকে আস্তে আস্তে ক্যালিব্রেট করতে হবে আইডিয়াল মডেলের দিকে।

সীমান্তের এপার ওপার – পর্ব ২

 by WatchDog

ব্ল্যাক-মেইলিং’এর এমন মুখোরচক গল্পের সাথে একেবারে যে পরিচয় ছিলনা তা নয়, কিন্তূ তা সীমাবদ্ব ছিল কেবল খবরের কাগজে। কিন্তূ এ ধরনের অভিজ্ঞতা সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে আমার নিজের সামনে হাজির হবে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। একদিকে অফিসে আমার সততা, অন্যদিকে দু’টো বাসা পর ভালবাসার মানুষটার কথা মনে হতেই মনে হল আমি ঘামছি। ভারি বৃষ্টির কারণে অনেকেই আফিসে আসতে পারেনি সেদিন, আর যার কথা ভেবে বেশী চিন্তিত হচ্ছিলাম সে ছিল রাজশাহীতে, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ভর্তি পর্ব সমাধানে ব্যস্ত। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বুকে সাহষ নিয়ে মুখোমুখি হলাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক জারজ সন্তানদের। এবং এটা ছিল এ ধরনের অনেক মুখোমুখির শুরু মাত্র।

আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল রাজ্যের বিস্ময়। এক; রিং লীডার যার নেত্রীত্ত্বে স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারের ছত্রছায়ায় এ লাভজনক ব্যবসা প্রসার লাভ করছিল, সম্পর্কে সে আমার মামা, মার আপন খালাত ভাই। বহু বছর মামাবাড়ি যাওয়া হয়নি বলে এমন আজরাইল উত্থানের সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি আমার। মামা এ জন্যে হাজার আফসোস করতে লাগলেন। সাংগ পাংগদের বের করে দুপা জড়িয়ে রাজ্যের মাফ চাওয়া শুরু করল আমার মামা। কথা দিতে হল আমার জেলা শহরের কাউকে এ ঘটনার কথা জানতে দেবনা। আগামী নির্বচনে বিএনপির আশীর্বাদ নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা তার। সব ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে আমার গল্পে। তা ছাড়া আমাদের পারিবারিক প্রত্যাঘাত সামলাবার মত কোমরের জোড় আমার মামুর যে ছিলনা তা বলাই বাহুল্য।

দুই; গল্পের নায়িকার প্রসংগ আসতেই জানতে পারলাম চমকপ্রদ এক কাহিনী। বাংলাদেশের রাজপুটিন আজিজ মোহম্মদ ভাইয়ের সুন্দরী নেটওয়ার্কের সে ছিল পোষ্য সদস্য, ব্যবসার অন্যতম অংশীদার ছিল তার মা। কালের চক্রে এই টিভি সুন্দরীর সাথে ভিন্ন পরিস্থিতীতে দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল তার মার সাথে। সে কাহিনী লিখতে গেলে বিশাল এক উপন্যাসের সূত্রপাত হয়ে যাবে, যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং এর সূবিধাভোগীদের নিয়ে স্ল্যাম ডগ মিলিওনিয়ারের মত মহাকাব্যিক এক ছায়াছবি বানানো যাবে হয়ত। তুলে রাখা যাক এ কাহিনী অন্য এক সময়ের জন্যে। এ ফাকে বলে রাখা ভাল, এ ঘটনার পর অফিসে চাঁদাবাজি ভোজাবাজির মত মিলিয়ে যায়।

মন এমনিতেই তিতিয়ে ছিল ঢাকা শহরের প্রতি, মডেল কন্যার ঘটনাটা সিদ্বান্তটা এগিয়ে আনতে সাহায্য করল। আমি ঢাকা ছেড়ে নিজ শহরে চলে যাচ্ছি। কোটি মানুষের ঢাকা শহর আমার মত নগন্য একজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাবে তার কোন সম্ভাবনাই ছিলনা, বাস্তবেও হল তাই। চোরের মত পালিয়ে গেলাম এ শহর ছেড়ে। ক’টা মাস আগেও জীবন ছিল মস্কো, লন্ডন, বার্লিন এবং ইউরোপের বিভিন্ন জমকালো শহর ভিত্তিক, অথচ ঢাকায়ও আমার জায়গা হলনা আজ। যাওয়ার আগে এক বন্ধুর পরামর্শে হাজার দশেক টাকা খরচ করে স্কীল মাইগ্রেশনের জন্য গুলসানস্থ অষ্ট্রেলিয়ান দূতাবাসে একটা দরখাস্ত জমা দিয়ে গেলাম।

যে বাড়িতে আমার জন্ম, যেখানে আমি বড় হয়েছি, বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যে মেঘনা নদীর কুল ঘিরে বেড়ে উঠেছে আমার শৈশব, কৈশোর, সে মাটিতে আমি ফিরে গেলাম। মাঝ খানে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, নদীতে গড়িয়ে গেছে অনেক পানি। দু’টা মাস শুধু ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম; ইউরোপের ক্লান্তি, ঢাকা শহরের ক্লান্তি সব ধুয়ে মুছে কোন এক সুন্দর ঝলমল সকালে হাজির হলাম পারিবারিক শিল্প-প্রতিষ্ঠানে। এখানে আমাকে কাটাতে হবে পরবর্তী বেশ ক’টা বছর, মুখোমুখি হতে হবে রাজনীতির কদার্য এবং কুৎসিত চেহারার সাথে। আমরা যারা বাংলাদেশের রাজনীতিকে নেত্রী এবং দল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভেবে মূল্যয়ন করতে অভ্যস্ত, তাদের জন্যে আমার পরবর্তী লেখাগুলো হতে পারে চক্ষু উন্মোচনের শুরু হিসাবে।

চলবে..

Posted Wed, 04/22/2009 – 00:35

সীমান্তের এপার ওপার – পর্ব ১

by Watchdog Bd

সময়টা ’৯৫ সাল, অষ্ট্রেলিয়াতে সবেমাত্র মাইগ্রেট করেছি। সিডনির কেনসিংটনে ২ রুমের একটা ফ্লাটে আরও দু বাঙালীর সাথে শেয়ার করছি। ১১ বছরের ইউরোপীয় জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিলাম মা, মাটি আর মানুষের টানে। প্রথম চাকরী, প্রথম প্রেম, প্রথম ভালবাসা, প্রথম বিরহ, এমন অনেক কিছুই ছিল প্রথম, যার মাঝে মিশে গিয়ে কখন যে মাছে-ভাতের বাঙালী বনে গিয়েছিলা বুঝতেও পারিনি। আমি না বুঝলে কি হবে, আমাকে বুঝিয়ে দেয়ার মানুষের কিন্তূ অভাব হলনা। রাজনীতির পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত একটা দেশে সূস্থ হয়ে বেচে থাকতে চাই ঈশ্বরের বিশেষ আশীর্বাদ, সে আশীর্বাদ পাওয়ার যোগ্যতা আমার কোন কালেই ছিলনা, কারণ ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব নিয়েই আমি ছিলাম দ্বিধান্নিত। রোজার ঈদ সামনে, চারদিকে মহা আয়োজন। বরেন্দ্র গভীর নলকুপ বিদ্যুতায়ন প্রকল্প নিয়ে নওগা জেলার হাওর-বাওর চষে বেড়াচ্ছি। ৭/৮ জন সহকারী প্রকৌশলী সহ একটা টিম নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি গাধার মত। ঈদের সময়, সবার বেতন চাই, ভাতা চাই, বোনাস চাই, চারদিকে শুধু চাই আর খাই খাই ভাব। কাজের পারিশ্রমিক আদায়ের লক্ষ্যে রাজশাহী বিদ্যুৎ অফিসে বিল জমা দিতেই আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল অন্য এক জন্মভূমি। চাঁদপুরের অধীর সাহা নির্বাহী প্রকৌশলী, খুলনার আবু বকর সহকারী প্রকৌশলী, রহিম সাহেব প্রধান প্রকৌশলী, ইত্যাদি ইত্যাদি, সবাই আমাকে ডেকে পাঠাল আপন কুঠুরীতে, ব্যক্ত করল নিজ নিজ চাহিদা। শুভ্র দাড়িওয়ালা দুই হাতে ১১ আংগুলের আবু বকরকে সৃষ্টিকর্তা বোধহয় অতিরিক্ত একটা আংগুল দিয়েছিলেন পাপের টাকা গোনার জন্যে। সেই আঙ্গুল দিয়েই গুনলেন টাকাগুলো এবং তা ছিল শেষ তারাবির ওজু অবস্থায়। মসজিদে ওজুরত প্রকৌশলীর ঘুষ গ্রহন, এ দৃশ্যটা আমাকে সাড়া জীবন তাড়িয়ে বেড়াবে ঈশ্বরের নৈকট্য হতে।

1796695_10203414187734864_514804841_n

পত্নীতলা, বদলগাছি, মহাদেবপুর এবং ধামুইরহাটের ধানচাষীদের সাথে অন্যরকম একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এক বছরে, তাদের অনেকের আতিথেয়তা আবু বকরদের মত অসৎ মানুষদের কলুষতার নীচে চাপা পড়তে দেয়নি। আমার মুখ হতে শোনা বিদ্যুৎ আগমনী বার্তা তাদের কাছে ছিল রূপকথার কল্প-কাহিনীর মত। পৃথিবীর উত্তর দক্ষিন মেরুর অনেক প্রান্ত চষে বেড়িয়েছি, হরেক রকম মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, কিন্তূ নওগা জেলার সীমান্ত এলাকার ঐ মানুসগুলোর কথা আমার এই কাচা কলম দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। বরং তাদের কথা, এবং সে এলাকার মানুষ গুলোর বেচে থাকার লড়াইয়ের কথা জন্মভূমির ভাল কোন কিছুর প্রতীক হিসাবে তুলে রাখব হূদয়ের খুব গভীরে। ঈদ শেষে প্রমোশন পেয়ে প্রকল্প প্রকৌশলী হতে প্রকল্প পরিচালক হয়ে মুক্তি পাই অবৈধ লেনদেনের এই অস্বাস্থ্যকর চক্র হতে, কিন্তূ পাশাপাশি মিস করতে শুরু করি খুব কাছ হতে জন্মভূমিকে দেখার র্নিভেজাল সূযোগকে।

বেশীদিন টিকতে পারিনি ঢাকা শহরে, মোহম্মদপুরের ছোট অফিসটায় রাজনীতি নামের গুন্ডাদলের নিয়মিত পদধূলি জীবন অতিষ্ঠ করে তুলে। সকালে চাঁদা, বিকেলে চাদা, রাতে চাঁদা, বিএনপির চাদা, আওয়ামী চাদা, ওয়াজ মাহফিল, ব্যডমিন্টন টুর্নামেন্ট, একুশে ফেব্রুয়ারী, রাস্তায় নিহত পথচারী সৎকারের চাঁদা, চাঁদার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে গিয়ে একটা সময় এল যখন জীবন যুদ্বের এ পর্ব পূনঃমূল্যায়ন করতে বাধ্য হলাম। অনেক আগে বাংলাদেশ বিমানের একটা কমার্শিয়াল দেখতে খুব ভাল লাগত, ‘ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী‘। হঠাৎ করে আমার পৃথিবীও কেমন যেন ছোট মনে হল, শ্বাষ নিতেও কষ্ট হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে আমার অফিসে কোন এক সুন্দর সকালে হাজির হয় খোলা তরবারির মত ধারালো অনিত্য সুন্দরী এক টিভি মডেল, তার ফোন করা দরকার। এভাবেই শুরু, তারপর তাকে প্রায়ই দেখা যেত আমাদের অফিসে, না না ছুতায়, হরেক রকম বাহানায়।

দিনটা ভূলে যাওয়ার মত ছিলানা, অঝোর বর্ষনে কাঁদছিল ঢাকা শহর। শ্রাবনের বর্ষনে ভরা এমন একটা দিনের কথা ইউরোপে বাস করতে গিয়ে কত শতবার যে কল্পনা করেছি তার হিসাব নেই। গভীর তন্ময়ে মোহগ্রস্থ হয়ে গিলছিলাম বৃষ্টির বিরামহীন কান্না। দলবেধে তারা এল, বয়স ১৮ হতে ৩০/ হাতে হরেক রকম অস্ত্র; ছুরি, রামদা, নানচাকু, পিস্তল। বাসা হতে পালিয়েছে টিভি কন্যা, যাওয়ার সময় বান্ধবীদের বলে গেছে মোহম্মদপুর অফিসের ঐ প্রকৌশলীর সাথে জীবন গড়তে পা বাড়াচ্ছে অচেনা পথে।

চলবে…

Posted Sun, 04/19/2009 – 15:51 by WatchDog

“ওয়ার অন টেরর”: বাংলাদেশ অধ্যায়

1

by Jahid Islam

সোভিয়েত-আফগানিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর এ সময় পর্যন্ত নির্মিত বাস্তব দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা থ্রিলিং সিনেমার নাম ‘ওয়ার অন টেরর’/ এটা সিকুয়েল মুভি,পার্ট অনেক। সিরিয়ালও বলা যেতে পারে। ‘লিও স্ট্রাউস’ নাকি ‘স্যামুয়েল হান্টিংটন’ কে এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। আবার দুই জনের থিওরি জোড়া লাগিয়েও বানানো হতে পারে। তবে মানতেই হবে মাস্টার স্ক্রিপ্ট। প্রধান চরিত্রে এ শতাব্দীতে ইতিমধ্যে অভিনয় করেছেন জর্জ বুশ,টনি ব্লেয়ার। এরপর এসেছেন বারাক ওবামা, নিকোলাস সারকোজি, এবং সর্বশেষে এসেছেন ফ্রাঙ্কয়িস হলান্ডে। কাহিনী ও সময়ের বাস্তবতায় চরিত্রগুলো পরিবর্তন হয়েছে।

wot

সিনেমার শুটিং হয়েছে আফগানিস্থান, পাকিস্থান, ইয়েমেন, কেনিয়া, তানজানিয়া, ইরাক, মালি, নাইজেরিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া সহ পৃথিবীর নানান প্রান্তে। অনেকগুলো স্পটে চিত্রায়ন এখনো চলছে।

সাধারণ দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে আলকায়েদার সাথে এ খেলায় অংশ গ্রহণকারীদেরকে তাদের ভুমিকার ভিত্তিতে চার ভাগে ভাগ করা যায় বলে আমার মনে হয়েছেঃ-

 ১/ প্লেয়ারঃ যারা সরাসরি এ খেলায় অংশগ্রহণ করে। যেমন- আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স।

২/ সহযোগীঃ যারা এই ওয়ার অন টেররে আমেরিকারকে সাহায্য করে। যেমন- পাকিস্থান।

৩/ ডাবল সাইডেড প্লেয়ারঃ যারা আলকায়েদাকে আর্থিক অনুদান এবং লোকবল সরবরাহ করে, আবার আমেরিকারকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ওয়ার অন টেররে সাহায্য করে । যেমন –সৌদি আরব।

 ৪/ খেলায় অংশগ্রহণের ভয় দেখায়ঃ কতিপয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতায় থাকার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করতে চান। তাদের মূল বক্তব্য হল, “আমি এবং আমার দল ক্ষমতায় না থাকলে দেশ আফগানিস্থান, পাকিস্থান হয়ে যাবে অথবা আল কায়েদার ঘাঁটি হয়ে যাবে”। এ প্রপোজিশন নিয়ে খেলায় অংশ গ্রহণ করেছেন লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি । তার খেলা শেষ। এখনো খেলে যাচ্ছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। তবে এ খেলা মনে হয় সহজে শেষ হবেনা। প্রফেসর ড. তারিক রমাদানের মত আমিও বিশ্বাস করি এ খেলা শেষ না হওয়ার ব্যপারে দুই পক্ষের মধ্যে (এক পক্ষে আমেরকা, অন্য পক্ষে রাশিয়া এবং চীন) ঐক্য আছে। এছাড়াও এখানে অন্য রিজিওনাল প্লেয়াররাও জড়িত আছে যারা নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় খেলছে। যেমন- ইরান, তুরস্ক, কাতার, ও সৌদি আরব।

যাই হোক, এটা হল ভূমিকা। এবার আসি আসল কথায়।  সম্প্রতি আইমান আল জাওয়াহিরি’র ভিডিও টেপ বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার প্রকাশিত হয়েছে। এটি দেখিয়ে শেখ হাসিনা চার নম্বর গ্রুপে যোগ দিবেন দিবেন করছেন। যারা এ খবরে অবাক হয়েছেন, আসলে তাদের অবাক হওয়া দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমার কাছে এর কারণ খুব পরিস্কার। যারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবে না। এর মধ্যেই এক জনের ফাঁসি হয়েছে, একজন জেলে মারা গেছে। সম্ভাবনার বিচারে বাকিদেরও ফাঁসি হওয়ার কথা, একজাক্টলি কি হবে আল্লাহই জানেন। ফাঁসি না হলেও এরা সবাই বয়স্ক। ৮/১০ বছরের মধ্যেই অনেকে স্বাভাবিকভাবেই মারা যাবেন। অতপর এ খেলা শেষ। এরপর কি হবে ?

খেলার নিয়ম অনুসারে এরপর অন্য কোন ইস্যু আসার কথা।  ইসলামিক টেররিজম কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা একটা ভাল ইস্যু।  বাজারে এর চাহিদা আছে।  তাই একে সামনে ঠেলে দিতে হবে। এ কাজ করবে কে ? উত্তর সহজ। প্রচারের প্রধান ভূমিকায় থাকবে এই দেশের ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ অর্থাৎ দেশি নিউকনিয়ান সেপাইদের প্রমোশনাল ভেহিকল ‘প্রথম আলো’ ।  ‘নিউইয়র্ক টাইমস এবং ‘প্রথম আলো’ এর মধ্যে সমন্বয় করার কাজটি করবেন মাহফুজ আনাম এবং তার মেয়ে বিশিষ্ট ‘ফিকশন লেখিকা’ তাহমিমা আনাম। ভারতের ‘আনন্দবাজার’ ও থাকবে এ দলে । এ ছাড়াও এ দেশ থেকে থিঙ্ক  ট্যাঙ্কে থাকবেন আবুল বারাকাত, শাহরিয়ার কবির,মুন্তাসির মামুন, সজীব ওয়াজেদ জয়, দীপু মনি ও গওহর রিজভী। এরা প্রমিনেন্ট প্লেয়ার, অনেকে থাকবেন পর্দার আড়ালে।

তবে এ খেলায় সরাসরি আমেরিকা নামবে না। বাংলাদেশের এ গোষ্ঠী চাইলেও না। কেননা ডেমোক্রেসি প্রতিষ্ঠা করার মত যথেষ্ট তেল সম্পদ বাংলাদেশে নেই। আমেরিকা চায় বাংলাদেশ মোটামুটি  স্থিতিশীল থাক। তাই তারা সবাইকে  রাজনীতিতে ইনক্লুড করার কথা বলে। এমনকি জামায়াতকেও। এতে সব দলকে একজিস্টিং ফ্রেমওয়ার্কে আনা যাবে যাতে অবস্থা স্থিতিশীল থাকবে।

তবে এখানে আছে লোকাল ভেন্ডর ভারত যাদের এ হিসেবে একটু আপত্তি আছে । ফলে দরকষাকষির মাধ্যমে যেটাতে মার্কেটে ইকুইলিব্রিয়াম এসেছে সেটা হল, আমেরিকা খেলাটা মনিটর করবে। কিন্তু সেটা রিজিওনাল এলাই হিসেবে গ্রেটার ইন্টারেস্টের কথা চিন্তা করে আউটসোর্স করে দিবে ভারতকে। ভারতের এখানে বহুমুখী লাভ আছে। যেমন- আসাম সহ অন্যান্য অস্থিতিশীল অংশগুলোতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, বাংলাদেশের উপর দিয়ে অবাদে বিনা খরচে পণ্য পরবিবহন, নামে মাত্র মূল্যে বন্দর ব্যবহার করা, দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা নিয়ন্ত্রন করা ইত্যাদি। সর্বোপরি, বাংলাদেশ যদি ভারতের একটি স্থিতিশীল অঙ্গরাজ্য হিসেবে কাজ করে তাহলে সবচেয়ে ভাল হয়।
এটা করতে হলে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় থাকতে হবে যে কোন মূল্যে। এর জেন্য দরকার লং এবং শর্ট টার্ম প্ল্যান। শর্ট টার্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আওয়ামীলীগ এবার ক্ষমতায় এসেছে, এতে আনপ্রেসিডেন্টেড সমর্থন দিয়েছে ভারত। ফলাফল হিসেবে ভারত প্রতিদানও পেয়েছে একেবারে হাতে নাতে। উলফা কে আর্মস সরবরাহ এর অভিযোগে অভিযুক্তদের ফাঁসি হয়েছে। এরপর, লংটার্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসেছে এ নতুন প্রপোজিশন। ৩ মাসের পুরনো ভিডিও টেপ নিয়ে মাতামাতির ব্যপারটি আমি এভাবেই দেখি।

তবে এ খেলার আরেকটি মজার দিক আছে যেটি সাধারণত চার নম্বর ক্যটাগরির লোকেরা আগে থেকে বুঝতে পারেনা, অন্তত এখনো পর্যন্ত কেউ পারে নি।  যারাই এ খেলায় অংশগ্রহন করে দেশের জনগণের সাথে “আল-কায়দা আল-কায়দা” খেলেছেন তাদের পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। উধাহরণ- গাদ্দাফি, পারভেজ মোশাররফ। এদেরকে ব্যবহার শেষে যথাস্থানে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে ঠিক যেমন মীর জাফর কে ছুঁড়ে ফেলেছিল ইংরেজরা।

ইতিহাস বলে থেকে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। শিক্ষা না নেওয়ার পেছনে যুক্তি দেখায়- দিজ টাইম ইট ইজ কোয়াইট ডিফরেন্ট। লেটস সি হোয়াট হেপেন্স দিস টাইম !

আল কায়েদা হুমকি ও ক্ষমতা সমীকরণের মধুচন্দ্রিমা..

by Watchdog BD

পাঠকদের মনে থাকতে পারে বিএনপির শেষ টার্মের শেষ দিকের কিছু ঘটনা। হঠাৎ করে ভারতীয় মিডিয়া ইনিয়ে বিনিয়ে প্রচার করতে শুরু করে আল কায়েদার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মিশরীয় ডাক্তার আইমেন আল জাওহিরি নাকি বাংলাদেশে। এবং বাংলাদেশি সরকার তাকে সব ধরণের সহযোগীতা দিয়ে লুকিয়ে রাখছে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র সফরের আসেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী জনাবা শেখ হাসিনা। তিনি পরিষ্কার ভাষায় মার্কিনিদের জানিয়ে দেন এখনই ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে পরবর্তী আফগানিস্থান। ভাষাগত দুর্গন্ধে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই মহিলার দাবির প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক মার্কিন কোন সৈন্য বাংলাদেশে হয়ত পা রাখেনি অথবা পাকিস্তানের মত ড্রোন হামলা চালিয়ে নির্বিচারে নারী,পুরুষ ও শিশু হত্যা করেনি। তবে সতর্ক বার্তাকে হেলাফেলা করেও উড়িয়ে দেয়নি মার্কিন কতৃপক্ষ। গ্রিনকার্ডধারী গোটা বাংলাদেশি সমাজকে তাৎক্ষণিকভাবে ইমিগ্রেশনে রিপোর্ট করে তাদের চলাচলের রোডম্যাপ অবহিত করতে ডিক্রি জারি করে দেশটার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়। অনেকের মত ব্যাক্তিগতভাবে আমিও বিশ্বাস করি খালেদা অধ্যায়ের করুণ পরিণতি, আহমদ গংদের উত্থান এবং শেখ ডাইনেস্টির ক্ষমতারোহনের অন্যতম ইনগ্রেডিয়েন্ট হিসাবে কাজ করেছিল ভারতীয় মিডিয়ার এ অপপ্রচার এবং পাশাপাশি নেত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর। অন্তত উদ্দিন গংদের প্রতি মার্কিন তথা পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন এ বিশ্বাসকে আরও জোরালো করে। পাঠকদের আরও মনে থাকার কথা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে শেখ হাসিনার মন্তব্য, … ‘এ আমাদের আন্দোলনের ফসল’ এবং ‘ক্ষমতায় গেলে তাদের সব কাজের বৈধতা দেব’।

jawahiri-ed

দেশীয় রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হিসাবে আবারও হাজির হয়েছেন আল জাওহিরি। মার্কিনিদের সন্ত্রাসী তালিকায় এই ব্যাক্তির নাম সবার উপরে। এবং তারা যে কোন মূল্যে আল কায়েদার কমান্ডার-ইন-চীফকে নির্মূল করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ উন্নত বিশ্বের কোন দেশই সন্তুষ্ট নয়। প্রায় প্রতিদিনই মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো এ নিয়ে লেখালেখি করছে। পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী সিনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটিতে শুনানী হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে নেত্রীর চামচারা যতই লম্ফঝম্ফ করুন না কেন অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পশ্চিমা বিশ্বের সহযোগীতা বাধ্যতামূলক। পদ্মা সেতুর অর্থায়নে সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রেকর্ড পরিমান রিজার্ভে হাত দিতে যাচ্ছে। অনিশ্চিত মানব সম্পদ রফতানি এবং তৈরী পোষাক শিল্পের উপর পশ্চিমাদের উপর্যুপরি হুমকির প্রেক্ষাপটে রিজার্ভের উপর হাত দেয়া কতটা বিপদজনক তা মাল মুহিত সহ অর্থনীতিবিদদের জানা থাকার কথা। এ অনিশ্চিত অবস্থা হতে উত্তরণে অতীতের মত আবারও আইমেন আল জাওহিরি ফ্যাক্টরকে সামনে আনা হয়েছে।

সরকারের বহুমুখী আক্রমণে জামাত সহ বাংলাদেশের সবকটা বিরোধী দল এখন বিধ্বস্ত। হামলা মামলার পাশাপাশি গুম ও বন্দুকযুদ্ধ নাটকের শিকার হয়ে দলের নেতারা হাটে মাঠে ঘাটে প্রাণ হারাচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে হেফাজত-জামাতের পক্ষে আল কায়েদার সমর্থন কার হাত শক্তিশালী করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক  নির্বাচন হতে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্যই আল কায়েদা হুমকির সূত্রপাত।

এখন বাকি থাকবে বাংলাদেশের জনবহুল কোন অংশে আল কায়েদার নামে বোমা মেরে বেশ কিছু মানুষ হত্যা করা। ৫ই জানুয়ারীর ভোট ডাকাতির ধারাবাহিকতা ও ক্ষমতা নামক সমীকরণের অংশ হিসাবে আইমেন আল জাওহিরির উপস্থিতি পশ্চিমা দুনিয়ায় কাজ করলেও খোদ বাংলাদেশে তা কাজ করবেনা। কারণ দেশের ১৫ কোটি মানুষের প্রায় সবাই জানে শেখ হাসিনা হয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় পর্যন্ত শেখ ডায়নাস্টি টিকিয়ে রাখতে এ মুহূর্তে এর কোন বিকল্প নেই।

উপাধি আর প্রশংসা – by Ayman Rahat

 

র বেলায় পাওয়ার সাথে চাওয়া সমান্তরালে বাড়ে। যতই পায় ততই চায়। যোগ্যতার বেশি কিছু পেলেও সাদরে স্বাগতম। মুখে যতই ‘আমি এর যোগ্য না বা মানুষের জন্য করি’ জাতীয় কথা বলুক না কেন উপাধি আর প্রশংসা না নেয়ার ভান করেও যত পায় তত নেয়। ঠিক অনেকটা হাসি দিয়ে ‘কি দরকার ছিল’ টাইপের। বিখ্যাত মানুষদের হঠকারিতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় এক্ষেত্রে।

আমরা জানি নোবেল দেওয়া হয় ছয় বিষয়ে। কিন্তু এটা একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার। আলফ্রেদ নোবেল ১৮৯৫ সালে তার উইলে যে নির্দেশনা দিয়ে যান তাতে অর্থনীতি উল্লেখ ছিল না। তাতে অন্য পাঁচটি বিষয় ছিল। এবং এই পাঁচটি বিষয়ে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা কারা বিজয়ী নির্বাচন করবেন তার নীতিমালা নোবেল নিজেই দিয়ে যান। ১৯০১ সাল থেকে শুরু হয় ঐ পাঁচ বিষয়ে নোবেল দেওয়া। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ৩০০ বছর পূর্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশনকে একটি বিরাট অঙ্কের অর্থ দান করে যা নতুন একটি বিষয়ে পুরষ্কার দেয়ায় ব্যবহৃত হবে। বিষয় ঠিক হল অর্থনীতি। কিন্তু জটিলতা দেখা দিল নোবেলের করা ১৮৯৫ সালের উইলে। নোবেল পুরষ্কার নামে ঐ পাঁচটি ব্যতীত অন্য নতুন কোন বিষয়ে পুরষ্কার দেয়া উইল পরিপন্থী। তারপর সিদ্ধান্ত হল নোবেল নামে নয় তবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কারের সমমানের পুরষ্কার হিসেবে এটি ভূষিত হবে। আর এর নাম দেয়া হয় The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel. পুরস্কারটি দেয়া হয় আলফ্রেদ নোবেলের স্মরণে। খেয়াল করে দেখবেন ইন মেমরি অব আলফ্রেদ নোবেল যার মানে এটা নোবেল পুরষ্কার নয়। অন্য পাঁচটির বেলায় সরাসরি নোবেল প্রাইয লেখা থাকে।

কিন্তু বিশ্ব মিডিয়া বা কর্তৃপক্ষ এটাকে মুখে মুখে সবসময় নোবেল পুরষ্কার বলে থাকেন। অবশ্য যখন অর্থনীতিতে পুরষ্কার দেয়া হয়ে থাকে তখন নোবেল প্রাইয উল্লেখ করা হয়না। অন্য পাঁচটিতে যেমন উল্লেখা করা হয়। দলিল কখনই এটাকে নোবেল পুরষ্কার বলে না। ১৯৬৯ সাল থেকে এযাবৎ কতো জনই না অর্থনীতিতে এই পুরষ্কার পেলেন কিন্তু এটা নোবেল পুরষ্কার নয় জেনেও নিজেদের টাইটেলে নিজেকে নোবেল লরিয়েট উল্লেখ করে থাকেন। আপনি অমর্ত্য সেন কিংবা পল স্যামুয়েলসনের বই হাতে নিলে দেখবেন নিজেদের নোবেল লরিয়েট দাবী করে এটা ওটা লেখা। এত বিখ্যাত মানুষ হয়েও কিন্তু তারা এই হঠকারিতা বেছে নিয়েছেন। সবই ঐ প্রথম বাক্যে সীমাবদ্ধ। উপাধি আর প্রশংসার বেলায় পাওয়ার সাথে চাওয়া সমান্তরালে বাড়ে।

 

জাফর ষাঁড় কিন্তু জানেন তিনি ড্রোন আবিষ্কারক নন। তিনি একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় তার কাছে Discovery, Invention আর Replica ‘র অর্থ খুবই পরিষ্কার।  তবুও ঐ প্রশংসার বেলায় যা পায় তাই নেয়। মিডিয়া আর কিছু চেতনাধারি তুষাররা তাকে ড্রোন আবিষ্কারক বলে সম্বোধন করায় তার বরং আরও ভাল লেগেছে। তাই এরকম একটা মিথ্যা উপাধি নিয়েও মনে মনে নৃত্য করেছেন। সব বিখ্যাত মানুষেরই এই বদ গুণটা আছে বলা যায়। জাফর ষাঁড়ের বেলায় সেটার ব্রেক ঘটুক সেটা আমিও প্রত্যাশা করিনা। কিন্তু সমস্যা হল তার মত একজন চেতনা সাপ্লাইয়ারের পক্ষে এরকম হঠকারিতা মানায় না। মানতে পারিনা। তার চেতনায়ই তো আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।

ভ্যালেন্টাইন উইশ

by Jahid Islam

শোন তুমি, তোমাকে আজ সৃষ্টি জগতের সেরা গল্পটা বলব।
ঠিকই ধরেছ তুমি, ইউসুফের গল্পটির কথাই আমি বলছি।

ইউসুফ কিন্ত ছিলেন অতি সুদর্শন, আমরা এ যুগে যাকে বলি ‘গুড লুকিং বয়’
নগরের মহিলারা ত তাকে দেখে এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে,
ভোজসভায় যখন তাকে ডাকা হল
তাকে দেখে তারা ছুরি দিয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলল।
এরপর বলল –“এ ব্যক্তি ত মানব নয়,এ তো মহান ফেরেশতা”।
আশাকরি তিনি কত সুদর্শন ছিলেন এবারে তুমি বুঝতে পেরেছ।

তবে আমাদের আজকের আসল গল্পটা কিন্তু এটা নয়।
গল্পের যে অংশটি আমি তোমাকে বলতে চাই সেটি হল,
যে মহিলার ঘরে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন ক্রীতদাস হিসেবে
সে মহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল
এরপর আচমকা একদিন নির্জনে ইউসুফকে তার ঘরে ডাকল,
এরপর কক্ষের দরজাসমূহ বন্ধ করতে তালা ঝুলিয়ে দিল,
একটি নয়, একে একে অনেকগুলো,
যাতে ইউসুফ কোন অবস্থাতেই বেরিয়ে যেতে না পারেন।

ইউসুফ ত তার উপর আল্লাহর রহমতকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন,
আর তাই তিনি সীমালঙ্ঘন না করার ব্যপারে আল্লাহর সাহায্য চাইলেন।

সে পাপাচারী মহিলার উদ্দ্যেশ্য বুঝতে পেরে

তিনি দরজার দিকে দৌড়ে আসলেন,
সে মহিলা তাকে চিৎকার করে পেছন থেকে বলল,
“এদিকে আস তুমি”।
এরপর তাকে কাবু করতে না পেরে

তার শার্ট টেনে ধরল পেছন থেকে
এতে গায়ের শার্ট ছিড়ে গেল তার ।
তবে আল্লাহর ইচ্ছায় সে পরিবারেরই একজন
ইউসুফের সৎ চরিত্র নিয়ে সাক্ষ্য দিল।

তোমাকে আসলে যা বলতে চাইছি সেটা হল-
ইউসুফের জ্ঞান ছিল এ কথা সত্য,
তিনি ত ছিলেন আল্লাহর নবী যার জ্ঞান থাকাই স্বাভাবিক,
তবে এখানে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হল তার দৃঢ়তা।

জেনে রাখবে তুমি, জ্ঞান দিয়ে লালসাকে অতিক্রম করা যায় ,
তবে পুরোটা যায় না, সাথে লাগে দৃঢ়তা।
আর শোন, বলছি তোমাকে – “ পাপ কাকে বলে ? ”
যেটা তোমারে অন্তরে আঘাত করে,
এবং লোকের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেলে লজ্জা পাবে তুমি।

আমার ইচ্ছা তোমার মধ্যেও দৃঢ়তা সৃষ্টি হোক,
ঠিক আল্লাহর নবী ইউসুফের মত।
তোমার অন্তঃকরণ হোক সফেদ সাদা
যাতে তুমিও প্রত্যাখান করতে পার নির্জনে কোন সুন্দরী রমণীর আহবানকে।
এরপর নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তোমাকে ভালবাসবেন
তোমার নামও থাকবে তাঁর প্রিয় বান্দাদের তালিকায়।
ফেরেশতাদের ডেকে তিনি বলবেন-
তিনি তোমাকে ভালবাসেন,
অতএব, তারাও যেন তোমাকে ভালবাসে।

তুমি সম্মানিত হবে দুনিয়া এবং আসমান বাসীদের কাছে,
এরপর তিনি কেয়ামতের তপ্ত দিনে তোমাকে ডেকে নিবেন
তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দিতে,
যেদিন মানুষের আশ্রয় নেবার মত আর কোন ছায়া থাকবে না।
তোমাকে ভালবেসে এটাই তোমার প্রতি আমার ভ্যালেন্টাইন উইশ।

বাংলাদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠার কারণগুলি

by Hussain Sumrat

৪২ বছর আগে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিপক্ষে বাংলাদেশ একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার জন্য যুদ্ধ করেছিল সেখানে এদেশের কিছু লোক সশরীরে বিরোধিতা করেছিল। তাঁদের বিচার হবে এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বিভিন্নভাবেই এই বিচারটি পেছনে পরে গিয়েছে। এবং দেশের মানুষ ও যারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁরাও ভেবে নিয়েছিল এই বিচার আর হবে না। কিন্তু পাপ যে কাউকে ছাড়ে না সেটি প্রমাণিত হল। একবার একটি পাপ করলে সেটি আমাদের পিছু লেগে থাকে বছরের পর বছর। যাইহোক অনেক পরে এই বিচারটি আবার সামনে চলে আসে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মত দেয় এটি হওয়া উচিত। কিন্তু সেখানে দেখা গেল বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী বাক্তি নেই। যারা আছে তাঁরা আসলে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। তাই আমরা মানবতা বিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এরকম লোকের বিচার শুরু করলাম। কিন্তু বিচার যতই সামনে যেতে লাগল ততই সেটি বিতর্কিত হতে লাগল। বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ল না। কিন্তু এখানে বিতর্ক থাকার কথা ছিল না। কারণ দেশের প্রায় সবাই এই বিচারে সমর্থন দিয়েছে। এখন দেখা যাক কি কি কারণে এটি এতো বিতর্কিত হল। আমি এখানে একান্তই আমার কাছে যা মনে হয়েছে সেগুলি নিয়ে আলোচনা করব। দয়া করে এখানে কেউ আমার রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করবেন না। যাইহোক, কারণগুলি – ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জামায়াতের লবিস্ত নিয়োগ, সুবিচার, রাজনৈতিক ফায়দা, জুডিশিয়ারি বিভাগে এক্সিকিউটিভ বিভাগের খবরদারী, ক্ষমা করে দাও, মন্ত্রি-পাতিমন্ত্রীদের কুকথা, আওয়ামেলীগ, মরার উপর খাড়ার ঘা।

noose

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ আমরা বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সাথে আওয়ামেলীগের সখ্যতা দেখেছি। ৮৬ তে যখন এরশাদ সরকারের অধীনে কেউ নির্বাচনে যাবেনা বলে ঠিক হল ঠিক সেই সময়ে লীগ ও জামায়াত নির্বাচনে গেল। যেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন কেউ নির্বাচনে গেলে সে জাতীয় বেঈমান। ঠিক তখন থেকেই দেখা যায় জামায়াতের সাথে লীগের একটি ভাল সম্পর্ক। ৯৬ এ তাঁরা এক সাথে বসেছে, আন্দোলন করেছে। কাজী জাফরের ভাষায় – আমরা যখন বিএনপির বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক দাবিতে আন্দোলন করছিলাম তখন আমাদের তিন দলের পক্ষ থেকে একটি লিয়াজু কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেখানে লীগের পক্ষ থেকে মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, জামায়াতের পক্ষ থেকে আলি আহসান মুজাহিদ ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে আমি লিয়াজু রক্ষা করতাম। সেখানে আমি লক্ষ্য করতাম আওয়ামেলীগ আমাদের সাথে (জাতীয় পার্টি) কথা বলার চেয়ে জামায়াতের সাথে কথা বলতে বেশী আগ্রহী। কিন্তু হঠাৎ করে এই সম্পর্ক এতো মলিন হল কিভাবে এটি আমার কাছে মিলেনা।

সে সময়ে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বিচারপতি বদরুল হাসান(লীগ সমর্থিত) গোলাম আযমের বাসায় যায় দোয়া নিতে। সেখানে তিনি তাঁর পায়ে সালাম করেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সাথে তাঁদের সখ্যতা ছিল। একসাথে দাওয়াত খাওয়া, যেখানে এখন লীগ বলে জামায়াত আসলে বিএনপির সাথে কোন আলোচনা না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের ভাষায় – জামায়াতের সাথে আওয়ামেলীগের মধুচন্দ্রিমা এতো তারাতারি শেষ হল কিভাবে!

এই ব্যাপারগুলি সাধারণ মানুষের মনোজগৎ থেকে বের হয়নি। এই বিভিন্নরকম প্রশ্নের কারণে এই বিচারের প্রতি মানুষের একটি বাঁকা দৃষ্টি স্থাপন হয়। এছাড়াও আরও কিছু ব্যাপার আছে।

জামায়াতের লবিস্ত নিয়োগঃ যেহেতু জামায়াতের টাকার আধিক্য আছে তাই তাঁরা দেশের বাইরে লবিস্ত নিয়োগ করেছে বলেও শোনা যায়। এছাড়া দেশের ভিতরে তাঁদের শিবির বাহিনী তো আছেই। যারা বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা সৃষ্টি করেছে। এই লবিস্ত নিয়োগের ফলে তাঁরা বিভিন্নভাবে এই বিচারের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে। যা দেশের কিছু লোকের মনে বিভিন্নরকম প্রশ্ন উত্থাপন করে। যা কিনা বিচারকে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে।

সুবিচার : অধিকাংশ মানুষ আশা করেছিল ৭১ সালে যারা অপরাধ করেছে তাঁদের শাস্তি হোক এবং ঐ সময় যারা এই অপরাধের স্বীকার হয়েছেন তাঁরা ন্যায়-বিচার পাক। কিন্তু এখানে একটি বিরাট প্রশ্ন দেখা দিল। কারণ ঐ সময়ে যারা অপরাধ করেনি তাঁরাও এখানে বলির পাঠা হিসেবে এসেছে। দু-একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যাক। মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরি কাঁদের মোল্লার রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এবং একসময় তাঁকে আদালত অবমাননার জন্য ডাকা হয়। বঙ্গবীর কাঁদের সিদ্দিকি বলেন – আমি আমার জীবনে কাঁদের মোল্লা নামে কোন রাজাকারের নাম শুনিনি। এছাড়া যে ভিক্তিমের সাক্ষীতে তাঁর ফাঁসি হয় তিনি আদালতের বাইরে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাঁর সাথে আদালতের বিবৃতির অনেক ভিন্নতা আছে। সাইদিকে নিয়ে বিরাট প্রশ্ন দেখা যায়। কারণ সাইদি যে এলাকার সে এলাকার মুক্তিযুদ্ধ সময়ের কম্যান্ডার বলেন সাইদি যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিজুদ্ধাও ছিলেন না এবং রাজাকারও ছিলেন না। সে কিভাবে এখন এতো বড় রাজাকার কম্যান্ডার হল। বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার বলেন – ইব্রাহীম কুদ্দির হত্যার দায়ে সাইদিকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে কিন্তু ১৯৭২ সালে তাঁর স্ত্রী একটি ইজহার করেছিলেন যেখানে অপরাধীদের তালিকায় সাইদির নাম নেই। তাহলে কার স্বার্থে এই রায় দেয়া হল। দেখুন বিচারকে কিন্তু বিচার করতে হবে নইলে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলতে হবে। দরকার হলে বিচার না করলে এদেরকে জেল থেকে বের করুন এবং পিটিয়ে মেরে ফেলুন। তাও সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচান। কারণ ইতিমধ্যে সাইদির ফাঁসির রায়ের প্রতীবাদে ৬-৮ ঘণ্টায় ১৫০ লোকের (যদি ভুলে না যাই) জীবন চলে গেছে। এই সাধারণ লোকগুলি যে কাণ্ডজ্ঞানেই হোক সাইদিকে ভালবাসে অথবা অন্য কোন দলকে সমর্থন করে তাই বলে এটির অপরাধে তাঁদেরকে গুলি করে মেরে ফেলা যাবে না।

এই রকম বিভিন্ন ঘটনার কারণে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে খুব ন্যায্য ভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন হয়।

রাজনৈতিক ফায়দাঃ দেশের কিছু লোকের মনে একটি সন্দেহ ছিল যে লীগ কি সত্যিকার অর্থেই বিচার করতে চায় নাকি এটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করতে চায়? সেটি ধিরে ধিরে আরও গভীর হতে থাকে। কারণ দেখা যায় এই বিচারকে ভালভাবে করার চেয়ে তাঁর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার দিকেই তাঁদের বেশী নজর। বিচার শুরু করে তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিলেন। এতে করে বিএনপি জামায়াতের অ্যালায়েন্সে আরও শক্ত হল তাঁদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে। তখন তাঁরা এই আন্দোলনকে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার আন্দোলন বলে অভিহত করল। তখন বিএনপির সমর্থকরা বলল আপনারা বিচার করছেন করেন কিন্তু এখানে আমাদেরকে দোষ দিচ্ছেন কেন? আমাদের দাবী মিটিয়ে দিন তারপর দেখেন আমরা কোন কথা বলি কিনা। এতে করে বিএনপির সমর্থকদের মাঝে বিরক্তিভাব প্রকাশ পায়। কারণ তাঁরা কোন আন্দোলন করলেই একে বলা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার আন্দোলন। তাই এই বিচারের প্রতি এক অংশের লোকের অনীহা প্রকাশ দেখা গেল। কারণ মনে রাখতে হবে দেশের অনেক লোক আছে যারা বিএনপিকেই ভোট দিবে। তাই তাঁদেরকে যখন অপরাধীদের তালিকায় ফেলা হল তখন তাঁরা এই বিচার নিয়ে খুব প্রফুল্ল থাকবে এটি ভাবা যায় না।

এ সম্পর্কে ডঃ আসিফ নজরুল বলেন – যখন বিচার কাজ শুরু হল তখন সবাই একে সমর্থন দিল কিন্তু পরে দেখা গেল আওয়ামেলীগ বিচার করার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করার জন্য বেশী বাস্ত।

জুডিশিয়ারি বিভাগে এক্সিকিউটিভ বিভাগের খবরদারীঃ আমাদের বিভিন্ন সরকারের আমলে দেখা যায় তাঁরা বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিত না। তাঁদের পছন্দমতো লোক নিয়োগ করে ও বিভিন্ন পদে বসিয়ে একে কলঙ্কিত করেছে। এই সন্দেহ এখানেও ছিল অনেক লোকের। এছাড়া একটি প্রশ্ন উঠে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিচার কিন্তু এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত ও খ্যাতনামা আইনবিদ নেই কেন? এখানে তো তাঁদের নাম আগে আসা উচিত ছিল। এই সাথে প্রকাশ পেল স্কাইপ কেলেঙ্কারি। যেখানে ধরা খেল ট্রাইব্যুনাল খুব ভালভাবে চলছে না। বিচারকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেয়া হচ্ছে যা সেই আলোচনায় উঠে আসে। একটি রায় দিয়ে দিলেই আপীলেড ডিভিশনে নিয়ে আসার প্রলোভন।

এ সম্পর্কে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজ বিজ্ঞানী ডঃ পিয়াস করিম বলেন – পৃথিবীর কোন স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে জুডিশিয়ারি বিভাগের উপর এক্সিকিউটিভ বিভাগের এতো প্রভাব থাকে! অনেক দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে মানবতা বিরোধী বিচারের ট্রাইব্যুনালে ধ্বস নেমে গেল। তিনি “ক্যাঙ্গারু ট্রায়াল” শব্দটিও ব্যবহার করেন।

এ সম্পর্কে বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহ বলেন – এটি লোকের কাছে উপহাসের পাত্র হয়ে গেছে।

এই সকল কারণে দেখা যায় অনেক লোকের মনে অনেক প্রশ্ন জন্ম দেয়। যা এই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ক্ষমা করে দাওঃ এর মধ্যে কিছু লোক এলো অন্যরকম বাণী নিয়ে। কিছু লোক বলল – মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান তাঁরা সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন যুদ্ধে। কিন্তু তাঁরাই এটি নিয়ে এতো মাতামাতি করেননি। নেলসন মান্দেলাকে ২৭ বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং তাঁর অনেক লোককে হত্যা করা হয়েছিল কিন্তু তিনি যখন জয় পেলেন তখন তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের বিচার না করে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। এইরকম বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে তাঁরা বলতে চাইলেন এইগুলিকে ক্ষমা করে দিয়ে দেশকে নতুনভাবে চালাতে।

এই বাপারগুলিও কারও কারও মন-মস্তিস্কে জায়গা করে নেয়।

মন্ত্রি-পাতিমন্ত্রীদের কুকথাঃ বিচার যখন চলছে তখন সেটি নিয়ে যত কম কথা বলা যায় ততো ভাল হয় অনেক সময়। কিন্তু সরকার দলীয় লোকরা এতো বেশী কথা বলেছে এটা নিয়ে তাতে কিছু মানুষজন বিরক্ত হয়ে গেছে এই বিচার নিয়ে। রায় নিয়ে যখন বিচারকরাই কথা বলছে না তখন মন্ত্রি-পাতিমন্ত্রীরা প্রত্যেকদিন এই নিয়ে বলছেন। তাঁরা বলছেন ঐ দিনে রায় বের হবে। ফাঁসি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন কিছু লোকের মনে প্রশ্ন জাগল এটিতো মন্ত্রীদের কাজ না। রায় দিবে কোর্ট কিন্তু তাঁরা তার আগেই কিভাবে জানে যে ফাঁসি হবে।

এই বেশী কথা বলাটা অনেক মানুষজন পছন্দ করেনি। বরং বিরক্ত হয়েছেন অনেকেই।

আওয়ামেলীগঃ সরকার বার বার বলছে বিচার নিয়ে বিরোধীদল ষড়যন্ত্র করছে। তাঁরা যুদ্ধাপরাধীর পক্ষের দল। কিন্তু কিছু লোকের চোখে পরল বিপরীত ঘটনা। তাঁরা দেখলেন এই বিচারকে লীগ নিজেই তর্কবিদ্ধ করেছে। ১৯৭৪ সালে যখন Bhutto (যিনি ৭১ এর খলনায়ক) ঢাকায় আসলেন তাঁর আগে অনেক মুক্তিজুদ্ধা রাস্তায় নেমেছিলেন তাঁকে না আসতে দেয়ার জন্য কিন্তু তখন লীগের লোক সেই মুক্তিজুদ্ধাদের পিটিয়েছে। আর লীগের সাপোর্টাররা ঢাকায় একটি স্লোগান দিয়েছিল Bhutto Jindabad । জামায়াত-শিবির যখন মিছিল করে তখন পুলিশ লাঠি-চার্জ ও গুলি করে। আবার সুজুগ পেলে শিবির পুলিশের উপর আক্রমণ করে। কিন্তু হঠৎ দেখা গেল সেই শিবির কর্মীরাই পুলিশকে ফুল দিচ্ছে। তখন বাজারে একটি গুঞ্জন শোনা গেল যে আড়ালে জামায়াতের সাথে লীগের কথা চলছে। বিএনপি থেকে জামায়াতকে সরে আসতে বলা হচ্ছে তাহলে এই বিচার বিলম্ব করে একসময় শেষ করে দেয়া হবে।

ফরহাদ মজহার বলেন – আমরা সবাই চাইছিলাম ৭১ যারা সত্যিকার অর্থে ভিক্তিম তাঁদের উপর ন্যায় বিচার করা হোক। কারণ এটি নিয়ে সমাজে একটি ক্ষত আছে। এই ক্ষত দূর করতে হবে। দূর না করে উপায় নেই। কিন্তু সব সরকার এটি নিয়ে আমাদের সাথে খেলা করেছে। তাই এবার সবাই আশাবাদী হতে চেয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল লীগ শুধু মাত্র কয়েকজন লোককে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য, এই বিচারকে বাঞ্চাল করার জন্য কাজ করছে।

কাজী জাফর বলেন – যুদ্ধের পর যখন বঙ্গবন্ধুকে বললাম বিচার করেন না কেন? তখন তিনি বলেছিলেন ওরে জাফর আমি কার বিচার করব! আমার চাচা (ভুল হতে পারে আমার, অন্য কোন আত্মীয় হতে পারে,অনেক আগের কথা তো) নিজেই শান্তি কমিটিতে ছিলেন। তাহলে কি আমি আমার ঘড় থেকেই মানুষ মেরে আবার একটি গৃহ যুদ্ধ বাধাব।

লীগের ভিতর এখনও রাজাকার আছে কিন্তু তাঁরা তাঁদেরকে না ধরে শুধু তাঁর বিরোধীপক্ষের লোকদের ধরছে। তাই কিছুলোকের মনে স্বাভাবিক ভাবেই একটি প্রশ্ন এলো এটি আসলে বিচার হচ্ছে না। এটিকে রাজনৈতিক উপায় হিসেবে লীগ বেছে নিয়েছে। যেখানে তাঁর দলের রাজাকারদের খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করছে আর বাকীসব রজাকার।

মরার উপর খাড়ার ঘাঃ যখন শাহবাগে কিছু তরুণ সমাবেশ করল তখন অনেক লোক এতে যুক্ত হল এবং যারা যায়নি তাঁরাও ঘড় থেকেই সমর্থন করল। কিন্তু কয়েকদিন পর দেখা গেল এটিকে লীগ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বিএনপি যখন নির্দলীয় সরকারের জন্য হরতাল ডাকে তখন শাহবাগ বলল তাঁরা এটিকে প্রতিহত করবে। তখন কিছু লোক বলল তোমরা বিএনপির এই হরতালকে প্রতিহত করবে কেন? এটি করলে লীগ করবে। বিএনপি তো তোমাদের বিপক্ষে হরতাল করছে না। তোমরা তোমাদের আন্দোলন কর, বিএনপি বিএনপির আন্দোলন করুক। এভাবে অধিকাংশ লোক শাহবাগের প্রতি আগের অবস্থায় থাকলেন না। পরে দেখা গেল লক্ষ-লক্ষ লোকের জায়গায় শ খানেক লোক দেখা যায়। তখন এই শাহবাগ হয়ে দাঁড়াল লীগের গলার কাঁটা। আবার বিভিন্ন কারণে যখন হেফাজতে ইসলাম রাস্তায় নামল তখন সেটি হয়ে গেল মরার উপর খাড়ার ঘা। কারণ এদের পক্ষেও অনেক লোকের সমর্থন ছিল। বিভিন্নভাবে প্রেক্ষাপট বদলে গেল। সাধারণ লোকজনের মনোজগতে বাসা বাঁধতে থাকল বিভিন্ন রকম প্রেক্ষাপট। বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে লোকজনের যে উচ্ছ্বাস ছিল বিচারকে কেন্দ্র করে তাতে আগের মতো উচ্ছ্বাস থাকল না। অনেকটা কিছু লোকের জন্য দাঁড়াল এইরকম – ধুর বিচার হলেই কি আর না হলেই কি। এই ঝামেলার মধ্যে নেই। এবং যখন সবদিক থেকে লীগের প্রতি মানুষের বিরক্তি আসল তখন আগের মতো আর প্রেক্ষাপট থাকল না। সবাই বুঝল লীগ এই বিচারকে দিরঘায়িত করছে ক্ষমতাকে প্রলম্ভিত করার জন্য।

 

পরিশেষে একটি কথা – কোন সৎ কর্ম অসৎভাবে করা যায় না।

বাঙালি মধ্যবিত্তের মন ও মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ

1

by Alauddin Mohammad

 

বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জের নিম্নবিত্ত মুসলমানরা এখনো ১০০ টাকা আয় করলে পরম ভক্তিভরে ১০ টাকা রেখে দেয় এলাকার মসজিদ ও মাদ্রাসায় দানের জন্য। অনেক অঞ্চলে নতুন ফসল ঘরে তোলার আগেই স্থানীয় মাদ্রাসায় চলে যায় একটা অংশ। আর এভাবেই টিকে আছে দেশের মোট শিক্ষার্থীর প্রতি ৩ জনের ১ জনের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অংশ। আর এই মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেদের দৃষ্টিভঙ্গি আবার খুব একটা সুবিধার নয়।

Madrassa

তাদের অনেকেরই এই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর শুভ্র জোব্বায় ভীষণ ভয়। আর ’৭১ এর একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দোহাই দিয়ে তাঁদের গল্প-উপন্যাস-সিনেমায় মাদ্রাসা শিক্ষিত মোল্লা-মুন্সীদের খলনায়ক বানানোর চিরস্থায়ী প্রকল্প তো চলছেই। ইদানিংকালে আবার যুক্ত হয়েছে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁদের ঠেকানোর জিহাদ। এ অবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নীরব থাকাটাও একটা নাগরিক ব্যাধি।

 

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ কোন মাত্রায় আছে কিংবা আদৌতেই আছে কিনা এখানে সে তর্কে যাব না। তবে বর্তমান সরকারের কর্মপরিধির একটা বিরাট অংশজুড়ে যে রয়েছে ‘জঙ্গিবাদের উত্থান’ ঠেকানো এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের মূলেও যে রয়েছে এই জঙ্গিবাদ ফ্যাক্টর সেটা নিয়ে অবশ্য তর্কের অবকাশ নেই। বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইসলামী জঙ্গিবাদকেই বুঝিয়ে থাকেন। এই ইসলামী জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামী শিক্ষার রয়েছে এক শক্তিশালী সম্পর্ক।

 

উপমহাদেশের মুসলমানদের শিক্ষার সূচিকাগার মাদ্রাসা শিক্ষা এভাবেই জড়িয়ে যায় জঙ্গিবাদের আমলনামায়। মাদ্রাসা শিক্ষা বললেই আমাদের মাথায় ইসলামী শিক্ষার একটা চিত্র ভেসে উঠলেও এই মাদ্রাসা শিক্ষাও কিন্তু একমুখী নয়। শিশুশিক্ষণ মক্তবের বাইরে বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের মাদ্রাসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রথম প্রকারে আছে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত আলীয়া মাদ্রাসা এবং দ্বিতীয় প্রকারে আছে ওয়াহাবী দর্শনের মাদ্রাসা যেটি কওমী নামেই বেশি পরিচিত।

 

ঐতিহাসিকভাবেই এই দুই ধরনের মাদ্রাসা আলাদা আঙ্গিকে গড়া। ব্রিটিশ ভারতে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ সালে প্রথম আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। গোঁড়া থেকেই এই মাদ্রাসার সাথে রয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক। অন্যদিকে কওমী মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা ওয়াহাবী দর্শনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। উপমহাদেশে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের শুরুটাই হয়েছে ওয়াহাবীদের দ্বারা যারা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেওবন্দ দারুল ওলুম মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসার পথিকৃৎ হল শহীদ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর আদর্শ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কংগ্রেসের প্রথম সারির মুসলিম নেতারা দেওবন্দ মাদ্রাসার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং মাদ্রাসার স্কলারগণ শায়খুল হাদিস হোসাইন আহমদ মাদানির নেতৃত্বে পাকিস্তান ধারণার সক্রিয় বিরোধিতাও করেন।

deoband

মাদ্রাসাটি আজো দেওবন্দ অঞ্চলের মুসলিমদের অনুদান বিশেষত এলাকাবাসীর ফসলের একটা অংশের দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোও দেওবন্দের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সরকারবহির্ভূত খাতের সাহায্যেই টিকে আছে।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২০১১ সালের তথ্যমতে, আলিয়া মাদ্রাসার মোট সংখ্যা ৭০০০ এবং তাহমিমা আনামের গার্ডিয়ানে প্রদত্ত তথ্যমতে, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কলা এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকদের শতকরা ৩২ শতাংশই এই আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষালাভ করেছেন।

 

অন্যদিকে দেশে কওমী মাদ্রাসা রয়েছে প্রায় ৬৫০০টি এবং এর মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষের মতো। এই সংখ্যা তাহমিমা আনামসহ বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় পাঠ করছেন ভয়ার্তভাবে! কারণ এই মাদ্রাসা শিক্ষিতরা সমাজের যে তলানি থেকে উঠে আসছেন তাদের বিশ্বাস করা যায় না। যেকোনো সময় এরা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে! অথচ এই তলানিতে যে তলে তলে একটা নূন্যতম শিক্ষার ছোঁয়া পৌঁছে গিয়েছে সেদিকে তাঁহাদের নজর পড়বে না।

 

মসজিদে মাদ্রাসা শিক্ষিত মৌলভীদের পেছনে নামাজ আদায় আর বাবার জানাজার জন্য মহল্লার সবচেয়ে বুজুর্গ মাওলানাটির খোঁজ করা হলেও সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি কোন শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টি নেই। মাদ্রাসা শিক্ষিত দাঁড়ি-টুপিওয়ালাদের কথা মাথায় আসলেই একটা অবজ্ঞার ভঙ্গি ফুটে উঠে তাদের মানস-চরিত্রে। তারা মাদ্রাসাশিক্ষিতদের দেখতেও চান সিনেমা-নাটকে রাজাকার-দেশদ্রোহী কিংবা দুষ্ট চরিত্রের অবয়ব হিসেবে। অথচ প্রকৃত বিচারে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষিতদের সামাজিক অপরাধে সংশ্লিষ্টতার হার সিকি ভাগও নয়। ইদানিংকালে এই মাদ্রাসা শিক্ষিতদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা মধ্যবিত্তের অবজ্ঞা ও উন্নাসিক মনোভাবকে আরো উস্কে দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের কল্পিত প্রতিপক্ষ হিসেবেই দাঁড় করিয়েছে।

 

এ অবস্থায় আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতদের কাছ থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিও একটি রাজনৈতিক দাবি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এর অংশ হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ এই মাদ্রাসার সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।

 

মাদ্রাসা শিক্ষার কিছু কিছু দিক হয়তো বর্তমান বাস্তবতায় সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনেকখানি সত্য। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাটা মূলত ধর্মশিক্ষা কিংবা পরকালীন বিশ্বাসকেন্দ্রিক জীবন চেতনা থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বহুদূরে অবস্থিত। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা টিকেই আছে এক দ্বৈত চেতনার সম্মিলন হিসেবে। এ কথা বলা হয়তো অন্যায় হবে না যে, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ইহলৌকিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ইহলৌকিকতা স্বীকারপূর্বক পরলৌকিক মুক্তির আলোকে প্রতিষ্ঠিত।

 

মাদ্রাসা শিক্ষার এই ইহলৌকিক জায়গাটা নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের পুনর্বিবেচনা সময়ের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতরা যখন নিজেদের একটা ঊর্ধ্বতন স্থানে ভেবে নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের দাবি তোলেন তখন মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ তাদের দাবিকে লেজ কাটা বানরের পরামর্শতুল্যই ভেবে থাকেন। আর এভাবে তারা হয়ে উঠেন একে অপরের প্রতিপক্ষ।

 

এই মুখোমুখি অবস্থানের পরোক্ষ ফল হচ্ছে গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রান্তিকীকরণ। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়ে থাকে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যারা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ তার জন্যই অবধারিত হওয়ার কথা। কার্যত সে রকম একটা ব্যবস্থাই ঐতিহাসিকভাবে চলে এসেছে। সে ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গই জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছেন। ঢাকার দুই প্রান্ত যাত্রাবাড়ী এবং টঙ্গীকেন্দ্রীক উন্নতমানের আলীয়া ও ক্যাডেট মাদ্রাসার উত্থান মাদ্রাসা ছাত্রদের এ সুযোগকে আরো প্রসারিত করেছে। সে সুবাদে গত দুই দশক ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদ্রাসা ছাত্রদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে এই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের সহাবস্থান দিয়েছে আধুনিক শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের এক সমন্বয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় আসতে শুরু করে গুণগত পরিবর্তন যেখানে একই শ্রেণীকক্ষে ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের চিন্তার সংশ্লেষণ বাড়তে থাকে। এক কথায় মাদ্রাসা শিক্ষিতদের আধুনিক শিক্ষায় স্বাগতম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ওয়ালারা এ পরিবর্তনকে যেন মেনে নিতে পারলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকগণ এক এক করে প্রথম পছন্দের বিভাগগুলোকে মাদ্রাসা ছাত্রদের জন্য অবাঞ্চিত ঘোষণা শুরু করলেন। যে নীতিনির্ধারকেরা মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার ও আধুনিকীকরণে সদা ব্যতিব্যস্ত তাঁরাই মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবাঞ্চিত করলেন। রাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এ দ্বৈত ভূমিকা যেকোন বিচারেই অবৈধ এবং এটি শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে গভীরতর করেছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রান্তিকীকরণ মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণের প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতদের বহু বছর ধরে চলে আসা দাদাগিরিকে ভণ্ডামির পৈতা পরিয়ে দিয়েছে। এমনকি সরকারি ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাতে ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ব্রতচারী কিংবা মানবতাবাদী শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে উচ্চকণ্ঠদের প্রতি মাদ্রাসা শিক্ষকদের অনাস্থা, ঘৃণা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। সে প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসা শিক্ষা কীরূপে আধুনিক হবে ও কতটুকু আধুনিক হওয়া দরকার তার অনুধাবন ও দাবি মাদ্রাসা শিক্ষিতদের মধ্য থেকেই আসতে হবে। অন্যদিকে সংস্কারের দাবিদারদের এটাও মাথায় রাখতে হবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা ‘আধুনিকতা’কে যেভাবে ইহলৌকিকতা অর্থে গ্রহণ করে থাকেন মাদ্রাসা শিক্ষার মূলনীতির সাথে এর কোন তফাৎ আছে কিনা।

 

একদল অসভ্য বর্বর শ্রেণীকে সভ্য করতে হবে এই রকম ‘হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন’ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে তাকানো বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও নীতিনির্ধারকদের এক ধরনের মানসিক হীনমন্যতা। মাদ্রাসা শিক্ষার সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্বীকারপূর্বকই কেবল এই ব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা কালোপযোগীকরণ নিয়ে কথা বলা যায় এবং সেটা আসতে হবে মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকেই। সে পরিবেশ কীভাবে তৈরি করা যায় সেটা নিয়েই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাবনা-চিন্তা করা উচিত।

 

সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিকগণ বাংলাদেশের প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী হওয়ার অবস্থাকে ভয়ানক বলে দাবি করছেন। পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই ভয়ানক কিনা এটা বলা মুশকিল। তবে এ তথ্যকে আমরা একটু অন্যভাবে পাঠ করতে পারি। যেহেতু বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাদ্রাসার চেয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা অধিক সে হিসাবে প্রতি ছয় জন শিক্ষিতের একজন ব্যক্তি অনুদানের মাদ্রাসার উদ্যোগে ন্যূনতম শিক্ষার আলো লাভ করছে। আর সে বিচারে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সামাজিকভাবে মানুষ হিসেবে তুলে ধরায় ও শিক্ষার বিস্তারে এই মাদ্রাসাগুলোর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে যে কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেন্দ্রে উঠে আসার সংগ্রাম।

 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত নীতিনির্ধারকগণ যদি এইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দিতে সক্ষম হন কেবল তখনই তারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাস আশ্রিত শিক্ষাব্যবস্থাটির নৈর্বক্তিক মূল্যায়নে সক্ষম হবেন। আর এ কাজটি করতে পারলে মাদ্রাসা শিক্ষিত এবং মাদ্রাসা শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্য দিকটির প্রতি আকৃষ্ট করা যাবে। তাতে দুইটি ভিন্ন ধারায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে।

 

তখন হয়তো একটি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকেও অধিকতর বিজ্ঞানমুখী এবং আধুনিক করে গড়ে তোলা যাবে। এটা না করে জঙ্গিবাদের ধোঁয়া তুলে স্বল্পকালীন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য যেভাবে একটি প্রান্তিক শ্রেণিকে নির্মূলের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে তা আখেরে রাষ্ট্রের ভিতকেই নাড়িয়ে তুলতে পারে।

Tahmima Anam and the New York Times: Where fiction and reality collide

8

By Surma:

Meet Tahmima Anam, budding novelist and daughter of the Daily Star editor Mahfuz Anam. Self described anthropologist and writer. Ms Anam has left the world of literary fiction to comment on current affairs in Bangladesh, writing for the Guardian  of London and the New York Times. She recently seen at an event hosted by the Mayor of Hackney, a north London Borough, together with Tulip Siddiq, the Labour Party candidate for Hampstead and Kilburn, the daughter of  Sheikh Rehana and niece of Sheikh Hasina, the Prime Minister of Bangladesh via a controversial election.

Meet Joe Carroll, fictional character in the Fox TV series, ‘The Following’. A former professor of English literature at Winslow University. Carroll’s teaching emphasizes the romantic period. He initially began to make “art” by disemboweling his female students. He ultimately killed fourteen of them before he was caught. While serving out his sentence at prison, Carroll gathers a cult-like collection of followers, who are willing to murder, kidnap, and even sacrifice themselves in order to execute his plan of revenge. Carroll’s only published novel, The Gothic Sea, was inspired by Poe’s The Light-House, but was a commercial and critical failure.

Once upon a time from New York….

Both Tahmima Anam and Joe Carroll collided into my reality the other evening. After a long day at the office I decided to wind down by watching the latest episode of the ‘The Following’. As I was watching Joe Carroll confess to a priest (his next victim) about how he was suffering from self pity as a failed author, husband and father, I received an alert on a posting of Anam’s latest article in the New York Times.

In her article Ms Anam seems to have extended her historical fiction writing to the present day. She carries on with the make believe story of bearded and skull cap wearing men burning the homes of Hindus, with all the perpetrators being members of Jamaat. This conveniently ignores the facts that members of the ruling Awami League have been involved in such attacks around the recent ‘elections’, as well as during the tenure of the Awami League government

Ms Anam rounds off her recent piece with a fairy tale ending of happily ever after, stating:

There has been no major public outcry yet over this lopsided election. Children are going back to school. The roads in the capital are reassuringly clogged with traffic again. Butter has returned to the supermarket shelves.

She shamefully neglects the massive crackdown of state security forces on political opposition, and the dead bodies of political activists turning up all over the country. While Anam is free to express her opinions in the foreign press, journalists in Bangladesh have been imprisoned for publishing stories critical of the government.

Do as I say not as I do: Life and Death Matters

The similarities between Anam and Carroll extend beyond their confluence that evening to their largely self-centred notions of humanity. Carroll’s victim appealed to him to reciprocate the humanity they had shown to him, yet Carroll ignored such pleading and proceeded by stabbing the priest in the heart. The scene reminded me of a promotional interview given by Anam where she relates the inspiration for her book with an anecdote of how an appeal to humanity can cut across political ideologies and fraught circumstances. It was August 1971 and her grandmother’s home, a known safe house for (then) rebel fighters was visited and searched by the Pakistan’s Army, the day after her uncle blew up a power plant. At the end of this encounter, the army officer left her grandmother along with her children. As Anam puts it,

“I suppose it’s one of those things that happens between two humans…. and maybe he ..um… just took pity on her… or she became real to him… she wasn’t just the enemy”

Like Carroll, Anam is happy to benefit from the humanity of her opponents, but is unwilling to reciprocate it towards people who politically differ from her. This is evident from the sugar-coating of the current political crisis in the New York Times, to making libellous, and baseless accusations in the London based Guardian newspaper earlier last year. In her article in the Guardian, Anam culturally ‘translated’ the case for a retrospective death sentence of Abdul Quader Mollah. Thus Anam became a chief spokesperson for a growing, intolerant hypernationalism unknown in Bangladesh, since its creation in 1971.

Mollah was executed in December on the basis of the hearsay of a single testimony (inadmissible as evidence in a normal court of law), during controversial and highly politicised war crimes trials which have garnered international and national criticism. Anam supported the government sponsored crowds in the street, marketed as The Shahbag Movement, demanding the enactment of retrospective legislation to raise his life sentence to death. Just this December, Mollah’s hanging was hurried through without applying the jail code procedures, but in time for the national Victory Day, thus providing the ruling Awami League with a pyrrhic victory and a blood sacrifice, before the one sided elections on the 5th of January.

In order to explain and justify the bloodlust at Shahbag square to her western liberal audience in the Guardian, Anam has once again collapsed the boundary between fact and fiction. She regurgitated the unproven accusations that Mollah was the ‘Butcher of Mirpur’, and had personally slit the throat of a poet.

Fortunately for Anam, the dead cannot sue for libel in the English courts.

Resurrection of the Ubermensch

And yet Tahmima Anam and Joe Carroll have another thing in common, their self-image. Both authors provide a priest-like legitimacy, and intellectual fig leaves for the cult-like violence of their respective followers. Just like the law enforcement agencies held Joe Carroll responsible for the actions of his fellow ideological bedfellows, so should Anam and her fellow ‘Shahbag Stormtroopers’ be held to account for covering up and giving succour to an oppressive regime in Bangladesh.

While Joe Carroll followers stabbed and killed commuters in the New York subway, shouting, ‘Resurrection! Resurrection! Joe Carroll lives!’ Anam’s fellow travellers, the Joy Bangla Brigade of the Awami League, are attacking and murdering those who politically differ from them, inviting their audiences, and investors, to a retro 1975 themed one party state.

Resurrection! Resurrection! BAKSAL lives!!

৭৫’এর হত্যা যদি অবৈধ হয় এ হত্যাও অবৈধ…

by Watchdog Bd
নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। ভুতুরে কায়দায় হাওয়া হয়ে যাচ্ছে ওরা। নগর, বন্দর, হাট-মাঠ-ঘাট হতে কোন এক অলৌকিক শক্তিবলে উধাও হচ্ছে দু’হাত দু’পা ওয়ালা আদম। ১৯৩৯ হতে ৪৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপে অহরহই ঘটতো এ ঘটনা। ১৯৭৩-৭৫ সালে সদ্য জন্ম নেয়া বাংলাদেশও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল নিখোঁজ হওয়ার ভৌতিক অধ্যায়। হিটলারের গেস্টাপো আর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীর রক্ষীবাহিনী নীরবে, নিঃশব্দে, অনেকটা ’ইনভিজিবল ম্যান’ কায়দায় হানা দিত দুয়ারে। এ যেন মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে খোদ আজরাইলের আগমন। এ ধরণের শাহী আগমনের শেষ গন্তব্য কোন বন্দর তা জানতে আমাদের হয়ত কবর হতে উঠিয়ে আনতে হবে ৫০ হতে ৭০ মিলিয়ন ইউরোপীয়, এশিয় আর আফ্রিকান জীবন। বাংলাদেশের বেলায় এর সঠিক পরিসংখ্যান আমরা কোনোদিনই জানতে পারবো না মেরুকরণ নামক রাষ্ট্রীয় কলেরার কারণে। পরিসংখ্যান ব্যুরো কেন, কবরেও আমাদের মেরুকরণের ভুত। এ ভুত যেনতেন ভুত নয়, খোদ আজরাইল নিযুক্ত যান্ত্রিক ভুত, যা দম দেয়া পুতুলের মত খোঁড়াক যোগায় রাষ্ট্রীয় ’তামাশার’… হিটলার ও তার গেস্টাপো বাহিনী এখন ইতিহাস। মানব সভ্যতার এ কলংকিত অধ্যায় সভ্যতা মূল্যায়নের উপকরণ হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং সামনেও করে যাবে আরও হাজার বছর। কিন্তু হায়! বিনা বিচারে নাগরিক হত্যা ঠাই নিতে পারেনি আমাদের ইতিহাসে। বরং এ অবৈধ সাংস্কৃতি স্থায়ী আসন করে নিয়েছে শাসন ব্যবস্থার কাঠামোতে। শেখ মুজিব হতে শুরু করে জিয়া, এরশাদ, খালেদা এবং হাসিনা চক্রের কোন চক্রই বেরিয়ে আসতে পারেনি দেশ শাসনের এই আজরায়েলি ভুত হতে। খালেদা জিয়া সরকার RAB নামের যে গেস্টাপো বাহিনীর জন্ম দিয়েছিল হাসিনা সরকারের ছায়াতলে পল্লবিত হয়ে তা পরিণত হয়েছে বিশাল মহীরুহে। ম্যান্ডেট নিয়ে দেশ শাসনের গণতান্ত্রিক রেওয়াজে অলিখিত আইন হয়ে গেছে বিনা বিচারে হত্যা নামের পশুত্ব। এবং তা বৈধতা পাচ্ছে সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় হতে। ক্রসফায়ার নামক হুমায়ুন আহম্মদিয় নাটক শুরুতে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল শাসন ব্যবস্থার অক্ষমতা ও নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আকুতি হতে। শত শত হত্যাকান্ডের পর কতটা সফল হয়েছে এ আয়োজন? স্বাভাবিক জন্মমৃত্যু সহ একটা সহজ সরল জীবনের কতটা কাছে যেতে পেরেছি আমরা? দুর্নীতি, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ধর্ষণ সহ সমাজের অবক্ষয় গুলো কতটা কমানো গেছে হত্যাকান্ডের মাধ্যমে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের এখন ঘরের বাইরে যেতে হয়না, বরং দুয়ারে এসে জানিয়ে দেয় দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নামক রাষ্ট্রীয় অলংকারের শক্তিমত্তা। দুর্নীতিতে উপর্যুপরি চ্যাম্পিয়নশীপ জাতি হিসাবে আমাদের এনে দিয়েছিল বিশ্বখ্যাতি। এ অধ্যায়ের সফলতম সংযোজন হিসাবে কাজ করছে আজকের বিনাবিচারে হত্যাকান্ড। বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে মানবতাবিবর্জিত বাংলাদেশি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। স্বভাবতই সরকারকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে আর্ন্তজাতিক চাপ। এবং এখানেই হয়ত অন্যের সাথে নিজের পার্থক্য ও বুদ্ধিমত্তা তুলে ধরতে পেরেছেন দেশপ্রেমের ১নং দাবিদার আমাদের প্রধানমন্ত্রী। হয়ত প্রতিপক্ষের সৃষ্টি হত্যাযন্ত্র ভোতা হয়ে আসছিল ডিজিটাল যুগে। তাই আবিস্কার করতে বাধ্য হন এর ডিজিটাল সংস্করণ। রাতের আধারে ক্রসফায়ার নাটক সাজানোর বাংলাদেশি মিথ্যাচার সহজে গেলানো যাচ্ছিল না আর্ন্তজাতিক মহলে। স্বভাবতই হুমকির মুখে পরছিল দেশটার বৈদশিক সম্পর্ক। সমস্যার এমন সহজ ও কার্যকর সমাধানের জন্যে চাইলে হাসিনা সরকারকে নোবেল দেয়া যেতে পারে। আসলেই তো, প্রয়োজন কি রাতের আধারে ক্রসফায়ার নামক মঞ্চনাটকের! বরং ’শক্তিধর’ শত্রুকে ভুত বানিয়ে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অথবা দেশটার হাওর-বাওর, বিলে ফেলে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়! কেউ জানবে না কে হত্যা করেছে, কেন করেছে, এবং এ নিয়ে জবাবদিহিতারও প্রয়োজন হবেনা আর্ন্তজাতিক মহলে। আইন-আদালত সহ দেশিয় বিচার ব্যবস্থার প্রায় সবটাই তুলে দেয়া হয়েছে দলীয় কর্মীদের হাতে। দলীয় ক্যাডার হতে সদ্য প্রমোশন পাওয়া আদালতের বিচারকগণও টগবগ করছেন সরকার প্রধানের প্রতিদান ফিরিয়ে দিতে। আইনী ঝামেলার দেশীয় ফ্রন্ট সরকারের জন্য ঝামেলামুক্ত।

6a00e0097e4e6888330120a67ddcd2970c-500wi

রাষ্ট্র ও সমাজের শক্র হিসাবে জুয়েল, মিজান, রাজিব ও ইসমাইলদের কতটা কুপ্রভাব ছিল যা দুর করতে তাদের লাশ ডোবা নালায় পুত্‌তে হল? স্থানীয় এসব পেটি-দুষ্কৃতিকারীদের জন্ম ও উত্থানের পেছনে কাদের হাত থাকে নাগরিক হিসাবে আমাদের সবার জানা। বিচার দুরে থাক এ নিয়ে কথা বলাও রাষ্ট্রীয় অপরাধ। এবং এ অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে এক পায়ে দাড়িয়ে থাকে দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা। একজন আবুল মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয় নয়, বরং সমসাময়িক বিশ্বের অর্থনৈতিক মোড়ল খোদ বিশ্বব্যাংকের। তাদের অভিযোগ, মন্ত্রীর ক্ষমতাবলে এই বাংলাদেশি বিশ্বব্যাংকের মত আর্ন্তজাতিক সংস্থায় ক্যাডার পাঠিয়েছিল অবৈধ লেনাদেনার তাগাদা দিতে। ক্ষমতা না থাকায় চাইলেও তারা পারেনি আবুল হোসেনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাতে। কিন্তু তারা যা করেছে তা ১৫ কোটি মানুষের পেটে লাথি মারার শামিল। অথচ বিচারের দায়িত্বটা ছিল সরকারের। একই সরকার যারা শাস্তির নামে জুয়েল, ইসমাইলদের বিনাবিচারে জীবন্ত কবর দেয়, পাশাপাশি পুরস্কৃত করে আবুল মন্ত্রীর মত মেগা লুটেরাদের। রাজনীতির অন্দরমহলে কথাটা নিয়ে ফিসফাস চলে, অনেক সময় হাসি-ঠাট্টা পর্যন্ত গড়ায়। বলা হয়, আবুল মন্ত্রী নগদ ৬০ কোটি টাকায় মন্ত্রিত্ব ক্রয় করে নিয়েছেন । তাই বিচার দুরে থাক, মন্ত্রীসভা হতে বিদায়ের রাস্তাও নাকি তার জন্যে ছিল বন্ধ। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বিশাল এক প্রকল্প এই আবুল হোসেনের জন্যে থমকে গেছে। অথচ সরকার প্রধান আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করাচ্ছেন বিশ্বব্যাংকের মত আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানকে। সংসদ ভবনের রাজকীয় আসনে বসে দেশের আইন-আদালত আর ন্যায় অন্যায় নিয়ে যারা কথা বলেন তাদের শতকরা ৯৯ জনের ব্যাকগ্রাউন্ড ঘাঁটলে কি বেরিয়ে আসবে তা অনুমান করার জন্যে মনোবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এসব আউলিয়াদের কাহিনী কি একজন জুয়েল অথবা ইসমাইলের চাইতেও ভয়াবহ নয়?

প্রধানমন্ত্রী হয়ত ভুলে গেছেন অথবা জেনেও না জানার ভান করেন, ১৯৭৫ সালে উনার পিতাকে হত্যা করার প্রেক্ষাপটও কিন্তু তৈরী করা হয়েছিল অপ্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে। এসব অভিযোগ আদালতে উঠানোর সুযোগ না দিয়ে রাতের আধারে তাকে হত্যা করা হয়েছিল কাপুরুষের মত। প্রধানমন্ত্রী নিজেও কি একই কাজ করছেন না? RAB দিয়ে গুম করিয়ে গোপনে যাদের হত্যা করছেন তারাও কি কারো পিতা, সন্তান অথবা ভাই নন? পার্থক্যটা কোথায়? জাতির পিতার সন্তানদের শোক কি তাহলে বাকি শোকের চাইতে ভিন্ন? জানতে চাইলে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে মিজান অথবা রাজীব পরিবারের কাউকে। ৭১’এর আত্মস্বীকৃত খুনি আর ধর্ষকদের বিচারের জন্যে আয়োজন করা হয়েছে কোটি টাকার আদালত। অথচ ক্রসফায়ার নাটকে কাউকে বলি করতে চাইলে তা হওয়া উচিৎ ছিল গোলাম আযম, নিজামী, আমিনী আর সাকা চৌধুরীর দল। একজন ইসমাইলের অপরাধ কি তাহলে নিজামীর অপরাধের চাইতে বেশি?

মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম অধিকার তার স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর নিশ্চয়তা। ব্যর্থ রাজনীতি আর অপশাসন-কুশাসনের কুটজালে আটকে মানুষ আজ নাম লেখাতে বাধ্য হচ্ছে অন্যায় আর অবৈধ পথে বেচে থাকার মিছিলে। এ মিছিলের হোতা আর নেত্রীত্বে যারা আছে তাদের গায়ে হাত না দিয়ে যদু, মধু, রাম, শ্যামদের মতো বাই-স্ট্যান্ডার্ডদের গায়ে হাত দিয়ে আর যাই হোক সুশাসন কায়েম যে সম্ভব নয় তা অনুধাবন করার সময় এসেছে। ১৯৭৫ সালে যেমন সম্ভব হয়নি ২০১১ সালেও তা সম্ভব হবেনা।

জননী জন্মভূমি…

by Watchdog Bd

বিএনপির দ্বিতীয় টার্মের সময় তখন। প্রবাস জীবনে ব্রেক নিয়ে দেশে অবস্থান করছি। বাবার মৃত্যুর পর অর্ধশতাব্দি পুরানো আমাদের পারিবারিক শিল্পকারখানার চরম দুরবস্থা। জীবন প্রদীপ নিভু নিভু করছে প্রায়। এ অবস্থা হতে বেরিয়ে আসতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত…এমন একটা দায়িত্ব নিতে মার জরুরি তলবের কারণে অস্ট্রেলিয়া হতে ফিরে আসতে হল। বছর দেড়েক লাগল নড়বড়ে অবস্থা গুছিয়ে নিতে। এবং দুই বছরের মাথায় শুরু হল নতুন যাত্রা। কর্তন বর্ধনের পর প্রায় তিন শতাধিক শ্রমিক কর্মচারী নিয়ে শিল্পের ভিত্তিটা শক্ত পায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেল।

চারদিকের বাণিজ্য বাতাস তখন অস্বাভাবিক ভারী। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কাছ হতে দেখলে গোটা শহরকে মনে হবে চাঁদাবাজীর লাস ভেগাস। সহজ আয়ের এসব বীর সৈনিকদের সংখ্যা হাতে গুনে মুখস্ত রাখা সমস্যা হয়ে দেখা দিল। শেষপর্যন্ত মাছের ভাগার মত ভাগ করতে বাধ্য হলাম। এক ভাগা বিএনপির, এক ভাগা ছাত্রদলের, এক ভাগা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোদ্ধাদের, এক ভাগা মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ, মিলাদ, জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, খৎনা, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ও একভাগা মাননীয় সরকার মহোদয়ের বেতনভুক কর্মচারীদের। ডিসি সাহেব চাঁদার ইংরেজী তরজমা করে এর গায়ে কন্ট্রিবিউশন তকমা লাগিয়ে ঘন ঘন এলান ফরমানো শুরু করলেন। ওসি সাহেবের কেবল টাকা নয়, সুন্দর এক সকালে এত্তেলা পাঠালেন স্ত্রী ঢাকা যাবেন মার্কেটিংয়ে, আমাদের গাড়িটা দরকার। সাথে থাকতে হবে ট্যাংকভর্তি তেল। বাংলাদেশ নামক দেশটার জন্মের উষালগ্ন হতে দেশের বাইরে। তাই অনেক কিছুর উপর নূন্যতম ধারণা ছিলনা। একটা জাতি সন্মিলিতভাবে এভাবে নোংরামির কোমর পানিতে নামতে পারে আমার জন্য তা ছিল অভাবনীয়, বিস্ময়কর।

দুপুরের খাবারের জন্য বাসায় ফিরছি। কড়া রোদ। রিক্সা নেই কোথাও, তাই হেঁটেই রওয়না দিলাম। কয়েক শ গজ যাওয়া হয়নি, ঘ্যাচ করে হুড খোলা একটা জীপ পথরোধ করে ফেলল। পুলিশ। থ্রি নট থ্রি রাইফেল তাক করে মাটিতে শুয়ে পরার তাগাদা দিল। আমি মূর্তির মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। অন্য একজন ওকিটকিতে কথা বলতে শুরু করল।
-স্যার একজনরে ধরছি। মসজিদের সামনে। বাকিরা পলাইছে। ঠিক আছে, জলদি আসেন।
একটু পর পালের গোদা থানার ওসি এসে হাজির। এসেই মা-বাবার নামে কুৎসিত একটা গালি দিল এবং সহকারীকে নির্দেশ দিল পাশের সেলুন হতে কাঁচি এনে আমার চুল গুলো কেটে দিতে। প্রমাদ গুনলাম। হিসাব কষে দেখলাম নিজকে প্রকাশের এটাই উত্তম সময়। অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক হিসাবে সাময়িক ভিসা নিয়ে বাস করছি বাংলাদেশে। নিজের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। বাংলা নয়, ইংরেজিতেই শুরু করলাম চোর-পুলিশ খেলা।
হু দ্যা ফাক ইউ আর টু কাট মাই হেয়ার?
স্তম্ভিত হয়ে গেল কথিত একজন সন্ত্রাষীর মুখে ইংরেজি শুনে।
তুই বড় চুলের মাস্তান। তোর কাছে এতকিছুর জবাব দিতে বাধ্য নই।
ডাজ কনষ্টিটিউশন অব বাংলাদেশ লিমিটস ইটস সিটিজেনস রাইট টু হেভ লং হেয়ার? ইফ সো, প্রভাইড মি এভিডেন্স।
এবার থেমে গেল ওসির মুখ। হয়ত আশা করেনি তর্কের সবটা ইংরেজিতে চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ।
– ইউ আর আন্ডার এরেষ্ট।
– নো প্রবলেম। লেট মি টক টু মাই এম্বাসি এন্ড গেট সাম হেল্প।
সংখ্যায় ওরা ছিল ৭/৮ জন। পিনপতনের নীরবতা নেমে এল ঘটনাস্থলে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের ড্রাইভিং লাইসেন্সটা পকেটেই ছিল। নিজের পরিচয় যেচেই প্রকাশ করলাম। দমে গেল পুলিশ বাহিনী। এ ফাঁকে খবর চলে গেলে আমাদের কারখানায়। শিফট বন্ধ করে প্রায় ১০০ শ্রমিক ঘেরাও করে ফেললো গোটা এলাকা। চারদিকে টান টান উত্তেজনা। পুলিশ দল নিজেদের ভেতর ফিসফাস শুরু করে দিল। একজন এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি রহমান সাহেবের ভাই?
– নট রিয়েলি, আই এম নট, রাদার হি ইজ মাই ব্রাদার। ইংগার ব্রদার।
– আমরা কি আপনাদের কারখানায় গিয়ে কথা বলতে পারি? অতি বিনয়ের সাথে পালের গোদা অনুরোধ জানালেন।
– অভার মাই ডেড বডি। উই উইল স্কয়্যার আওয়ার ইস্যু রাইট হেয়ার।
এবার পুলিশের ঘাড়ে চেপে বসলাম আমি। শুধু শুধু নাম ধাম জিজ্ঞেস করতে থাকলাম। শুরু হল ক্ষমা পর্ব। ভাষ্য মতে কত গুলো মাস্তানকে ধাওয়া করছিল ওরা। তাদের সবার মাথায় লম্বা চুল। দেখতে আমিও নাকি তাদের মত। ততক্ষণে জনতার স্রোত বাড়তে শুরু করল। ঘটনাস্থলে আমাদের পারিবারিক বন্ধু পৌরসভার চেয়ারম্যানকে দেখতে পেলাম। সাথে আমার ছোট ভাই। ওরা শহরের হোমরা চোমরা, মুরুব্বি। জোর করে সরিয়ে আনল আমাকে। রক্তের দাপাদাপি থামাতে ডাক্তার ডাকা হল। তিনদিনের মাথায় সবকিছু থিতু হয়ে এল।

corrupt-police
মাস না গড়াতেই মার সাথে বুঝাপড়ায় বসতে হল। স্বপ্ন আর বাস্তবতার লড়াইয়ে বাস্তবতাই জয়ী হল। ফিরে গেলাম দত্ত্বক নেয়া দেশ অস্ট্রেলিয়ায়।…

ক্ষমতার পালাবদল কি বদলাতে পারবে এসব অসূস্থ সংস্কৃতি? নাকি নতুন বোতলে পুরানো মদ ঢালার মত জাতীয়তাবাদিরাও ঢালতে শুরু করবে চরিত্র সংকটের নতুন সিফিলিস? তাহলে আর কিসের জন্য এ হা হুতাস…কারণ আমার জন্য স্বাধীনতা মানে চুলেরও স্বাধীনতা, গণতন্ত্র মানে মুক্ত বাতাসে চলাফেরার স্বাধীনতা…

আধুনিকতা নাকি নগ্নতা …by Husasain Sumrat

সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরতে যেয়ে একটি লিঙ্কে যেয়ে একটি লেখা পড়লাম ও এর কমেন্টে দেখালাম যারা হিজাব পরে তাঁদেরকে খুব অবজ্ঞার চোখে দেখে অনেকে।ঠিক তখনই লেখাটি লেখি।লেখাটির মূল লিঙ্ক

(https://www.facebook.com/HussainSumrat/notes) ।

আধুনিকতা বলতে কি বুঝাই?কোথাও আমি এর সংজ্ঞার্থ পড়িনি।তবে নিজে নিজে একটি সংজ্ঞা তৈরি করে নিয়েছিলাম এবং সেটাই ছিল আমার কাছে যথেষ্ট।তাই কখনও কোথাও খুঁজতে যাইনি।কিন্তু আজ আমি যখন ভাবলাম আমার চারপাশের মানুষরা কি বলছে বা কি করছে এই আধুনিকতা নিয়ে।তখন আমি কিছুটা চুপ হয়ে যাই।যদিও আমি আমার তৈরি করা সেই সংজ্ঞার্থ থেকে সরে আসিনি।কারণ আমি আমার সংজ্ঞার্থ বিশ্বাস করি।এটা আমার কোন ধারণা না এটা আমার বিশ্বাস।যাইহোক,আমি খুবই ভীত হয়ে যাই যখন শুনি মেয়েদের পরাধীন করে রাখা যাবেনা।ভীত হবার কারণ একটাই স্বাধীনতা বলতে তাঁদের কি করা হচ্ছে।আমিও চাই মেয়েরা চার-দেয়ালের মাঝে নিজেদের বন্দী করে না রাখুক।কিন্তু চাই না তাঁরা কোন ডিস্ক বারের ডিস্ক গার্ল হোক।যদি এটাই হয় স্বাধীনতা তাহলে আমি চাইব মেয়েদের স্বাধীনতা দরকার নাই।আমাদের দাদি-নানিদের মতো তাঁরা শুধু রান্নার কাজই করুক।আধুনিক হওয়ার দরকার নেই।আমাদের মতো গরীব দেশে অনেকেই লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার বানানোর নোংরামি কাজে টাকা খরচ করবে কিন্তু কোন ছেলে বা মিয়ে টাকার অভাবে ভাল ভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারছেনা সেটার দিকে নজর দিবেনা।অবশ্য কাউকে সুপারস্টার বানানো গেলে তারা তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাবহার করতে পারবে। সেদিক থেকে ভাবলেতো মন্দ হয়না টাকা খরচ করলে।আমাদের আপুমনিরা অবশ্য তাদেরকে আধুনিক বানাইতে খুবই ততপর।এই আধুনিক হওয়াটা যদি তারা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে হতেন তাইলে কোন কিছু বলার ছিলনা।কিন্তু না…তারা ঐশ্বরিয়া, ক্যাটরিনাদের অ্যাড দেখে লাক্স সাবান ব্যাবহার করবে আর সুপারস্টার হওয়ার চিন্তাই বিভর থাকবে।তাতে যদি আই বি এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে বিতারিত হতেও হয় তারা রাজি।তারা কি একটুও ভেবে দেখেনা যে তাদের দেহের এপাশ ওপাশ সবপাশ দেখিয়ে সুপারস্টার কি নাহলেই না।এতে আসলে অনেকেই আমাকে বলবেন ধুর তুমি খুব সেকেলে।আমি তাদের বলব আমি আপনার স্ত্রী আপনার মেয়ের সাথে একরাত বারে ডিস্ক নাচ নাচতে চাই।তখন তারা আবার বলবেন এ যুগের ছেলে-পেলেরা খুব বেয়াদব হয়ে গেছে।আরে ভাই আপনি একজন মেয়ের এপাশ ওপাশ দেখছেন আর সুপারস্টার বানাচ্ছেন আর আমি একরাত আপনার মেয়ের সাথে ডিস্ক করতে গেলেই বেয়াদব আর আপনি এইসব করেও সমাজের আধুনিক মানুষ।আমাদের আফামুনিরা কি একটুও ভেবে দেখেনা – ঐশ্বরিয়া বা ক্যাটরিনা কখনই এই লাক্স সাবান ব্যাবহার করেনা এবং করবেও না।মেয়েদের শালীনতা নিয়ে কথা বলতে গেলে আবার অনেকেই আমাকে বলবেন আমি জঙ্গিবাদী।আবার অনেকেই বলবেন গোরা মুসলমান।আমি তাদের বলব চিপাচাপা জিন্স আর টিশার্ট পরলেই আধুনিক হওয়া যাইনা।আপনি এই পৃথিবীকে কতটা ভাল কিছু দিতে পারছেন সেটাই আপনার মাপকাঠি।

 

আপনি কি জানেন – গত মাইক্রোসফট ইমাজিন কাপে সেরাদের সেরা একটি দল হয়েছিল কাতারের এক দল।যাদের সবাই ছিল মেয়ে এবং হিজাব পরিহিত।তোমরা যারা সুপারস্টার তারা ওদের কাছে কিছুই না।তোমরা আসলে ওইসব পারবানা দেখেই শরীর দেখিয়ে বেরাও।আপনারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন কয়দিন পর রমনা পার্কের ১০০ টাকার এক মেয়ে আর আপনাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবেনা।ওরা হল কম টাকার Prostitute আর আপনারা চড়া দামের।আপনি এখনও জানেননা মজিলা আর গুগল এর মধ্যে পার্থক্য আর হাইহিল পরে নিজেকে আধুনিক মনে করেন।আগের যুগে মেয়েদেরকে জোর করে এইরকম করা হত আর এখন মেয়েরা নিজের ইচ্ছাতেই এইরকম হয়ে যাচ্ছে।এতে আপনারা আধুনিক হতে পারছেন না বরং হয়ে যাচ্ছেন পণ্য।আমাদের উপর তালার লোকেরা মধ্য-রাতে স্কছ-হুইছকির সাথে সাথে আপনাদের রুপের সুধা নিয়ে যাচ্ছে।কর্পোরেট বেনিয়াদের কাছে নিজেকে তুলে দিয়ে আধুনিক হওয়ার দরকার নেই।আপনি যখন একটি পর্যায়ে পৌছবেন তখন আপনার নাম এমনিতেই প্রচার হবে।অর্ধনগ্ন হওয়ার দরকার পরবেনা।শালীনতা মানে পিছিয়ে পরা না।বরং এভাবে নাম কামানো মানেই পিছিয়ে পরা।চামড়াকে ডলে ডলে সাদা করার দরকার নেই।আপনি কি জানেন আপনার স্বপ্নের দেশ আমেরিকার অনেক কালো চামড়ার লোকেরাই মার্সিডিজে চড়ে, আর অনেক সাদা চামড়া ভিক্ষা করে।আমরা যদি এইভাবে চলতে থাকি তাহলে আমাদের অবস্থা খুব একটা ভাল হবেনা।আমরা আসলে ততদিন পর্যন্ত আধুনিক হতে পারবনা যতদিন পর্যন্ত শুধু বাইরের রুপ দেখব।৩৬-২৪-৩৬ ফিগার না করে জ্ঞানী-মেধাবী-বুদ্ধিমান হন।নইলে সবাই একদিন বলবে ওই শালী বেশ্যা…

চেতনাৎসী ড্রোন এবং তুষারের আদর্শিক পদস্খলন প্রসঙ্গেঃ

1

by Aman Abduhu

ফ্যাসিজমের বড় একটা সুবিধা হলো, এখানে বৃহত্তর ডিসকোর্সের স্রোতে গা ভাসিয়ে আরামের সাথে ভেসে যাওয়া যায়। এবং ফ্যাসিজমের বড় একটা বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ঐ স্রোতে গা ভাসানো বাধ্যতামূলক।

back-Drone_photo0497

 
মজার বিষয় হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আগে ফ্যাসিষ্ট শব্দটা গর্ববোধক ছিলো, তাদের কাছে ইতিবাচক অর্থবোধক ছিলো। আদর্শের পরিচয়বোধক ছিলো। ইটালীতে মুসোলিনির পার্টি সদস্য ওঅনুসারীরা বুক ফুলিয়ে স্লোগান দিতো “লিবরো আ ম্যাসেটো/ ফ্যাসিষ্টা পারফেটো”, অর্থ্যাৎ “বই এবং রাইফেল/ একজন যথার্থ ফ্যাসিষ্ট”।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরাজয় এবং সারা পৃথিবীজুড়ে ইন্ড্রাষ্টিয়ালাইজেশনের সাথে সাথে ইনডিভিজুয়ালিষ্টিক চিন্তাভাবনার উত্থানে এখন ফ্যাসিজম শব্দটা একটা গালি হয়ে গেছে। বিষয়টা অনেকটা বাংলাদেশে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” ও “শাহবাগি” শব্দদ্বয়ের মতো।

ফ্যাসিজম নিন্দিত, কিন্তু ফ্যাসিজমের জয়জয়কার এখনো পৃথিবীর অনেক দেশে। বাংলাদেশ তার ইতিহাসে ফ্যাসিজমের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে এখন। আদর্শ যখন বলবে লাল সবুজ পতাকা পড়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে, এবং তা না করলে তখন আপনে দেশদ্রোহী। চেতনার ইয়াবাখোর কমান্ডাররা যদি বলে জয় বাংলা স্লোগান না দিলে মুক্তিযোদ্ধা না, তাহলে জীবনের মায়া বাদ দিয়ে পরিবার পরিজন ফেলে পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ করা লোকটা হয়ে যায় রাজাকার।

ব্যাক্তিগতভাবে ফ্যাসিজম নিয়ে আমি ফ্যাসিনেটেড। মানুষের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মানুষ কিভাবে মানুষের মৌলিক একটা বৈশিষ্ট্য- স্বাধীন মত প্রকাশের আজন্ম বেদনাময় চিৎকার ও আকাংখা- কে বারবার দমাতে চেয়েছে এসব পড়তে গিয়ে বারবার আশ্চর্য হই। এখন অবশ্য আর পড়তে হয়না, চোখের সামনে দেখছি সবসময়। যখন পড়তাম, তখন একটা বিষয় আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিলো।

ফ্যাসিজমের ভেতর থেকেই কোন না কোন সময় দ্বিমতের জন্মচিৎকার শুরু হয়। সে চিৎকারের মুখে লবণ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টাও চিরন্তন। আপনি জামায়াত করেন, মধু মাখিয়ে যান কোন অসুবিধা নাই। যখন দ্বিমত করবেন তখন দেখবেন দ্বিনি ভাই চমৎকার। যশোরের দলত্যাগী এমপি শাখাওয়াতের ছেলে যখন প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলো তখন জামায়াতের লোকজন বলতে শুরু করলো, এইটা আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তি!! এতোটাই ব্যাক্তিগত প্রতিহিংসার জন্ম দেয় ফ্যাসিজম।

ট্রটস্কি ছিলো রাশিয়াতে পার্টির অনেক উপরের পর্যায়ের লোক। রেড আর্মির কমান্ডার, যুদ্ধমন্ত্রী। ষ্টালিনের সাথে যখন তার নীতিগত মতপার্থক্য হলো, দেখা গেলো দ্বিনী ভাই চমৎকার।

নাৎসী নেতা এবং গণহত্যার হোতা হিমলার ছিলো হিটলারের ডানহাত, শেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে যখন সে এলাইড ফোর্সের সাথে ডিলিংস প্রসঙ্গে হিটলারের সাথে দ্বিমত করলো, জারি হয়ে গেলো গ্রেফতার করে হত্যার নির্দেশ। সারাজীবন ধরে নাৎসি আদর্শের খেদমত তুচ্ছ হয়ে গেলো।

এসবকিছু কারণ ঐ একটাই, ফ্যাসিজম কখনো দ্বিমত সহ্য করেনা। স্রোতের সাথে ভাসতে হয়, স্রোতের সাথেই ডুবতে হয়। জীবনে মরণে আমি তোমার তুমি আমার।

সুতরাং চেতনাগুরু বিশিষ্ট কল্পগল্প নকলবাজ আইজাক জাফরের চোরামি ধরিয়ে দিলে এই বাংলাদেশে হতে হয় স্বাধীনতার শত্রু। আর ততদূর না গিয়েও, ড্রোন প্রসঙ্গে তার দাবীর সাথে দ্বিমত করে যুক্তিতর্ক খুঁজলেই দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নোংরা আক্রমণের টার্গেট হয়ে যেতে হয়।

তরুণ প্রজন্মকে একাত্তরের চেতনাৎসী আদর্শে দীক্ষিত করার আগে বিষয়টা ভাবা দরকার ছিলো, এখন ভেবে লাভ নাই। চেতনাগুরুরা যদি আদেশ জারি করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য আপনার বউকে উলঙ্গ হয়ে একহাতে মোম্বাত্তি আরেকহাতে লালসবুজ বেলুন নিয়ে ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রোড মার্চ করতে হবে, তাহলে তাই করতে হবে তুষার। আপনি এখানে যুক্তি ব্যাখ্যা খুঁজতে গেসেন? স্বাধীনতার শত্রু!! চেতনাশত্রুর জাটকা/ ফিলটারে খাইসে আটকা!

এইটা ফ্যাসিজমের চিরকালীন ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। সুতরাং জেনেবুঝে আগুনে লাফ দেবেননা। জাফর ইকবাল ষাড়কে ড্রোনের আবিস্কারক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ধন্য ধন্য রবে মেতে উঠুন; স্বাধনিতার চেতনা বাস্তবায়ন করুন। উনি যদি ভবিষ্যতে দাবী করেন উনি চেতনার বলে বলীয়ান হয়ে নতুন ধরণের স্মার্ট ফোন আবিস্কার করছেন, যেখানে রিংটোন হিসেবে জয়বাংলা স্লোগান দেয়, তাহলে তাকে স্মার্টফোনের আবিস্কারক হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে ধন্য ধন্য রবে ফেটে পড়ুন। স্রোতে গা ভাসিয়ে দিন। নিরাপদে থাকুন।

জয় বাংলা।

ডোম অফ দ্য রক ও মসজিদ আল-আকসা

by শঙ্খচিলের ডানাঃ

৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা বাইজেন্টাইন অধীনস্থ জেরুজালেম নগরী জয় করে। ইসলামের প্রথম কিবলা এবং মি’রাজের সাথে সম্পর্কিত জেরুজালেম (আরবী নাম আল-কুদস القدس al-Quds – The Holy One) ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। পুরনো জেরুজালেমে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘ডোম অফ দ্য রক’ এবং ‘মসজিদ আল আকসা’ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে কিছু বিভ্রান্তি আছে যা নিয়ে এ লেখাটির অবতারণা।

ডোম অফ দ্য রক – Dome of the Rock (Arabic قبة الصخرة‎, Qubbat as-Sakhrah)

Dome of the Rock (Qubbat as-Sakhra)

উপরের স্থাপনাটি মুসলিম বিশ্বে সচরাচর আল আকসা মসজিদ হিসেবে পরিচিত হলেও এ স্থাপনাটির সুনির্দিষ্ট আরবী নাম قبة الصخرة‎ (Qubbat As-Sakhrah), ইংরেজিতে Dome of the Rock, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘পাথরের (উপর নির্মিত) গম্বুজ’। ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ববাহী বিবিধ কারণে পুরনো জেরুজালেমের পবিত্র ‘টেম্পল মাউন্ট’ (Temple Mount – আরবী الحرم الشريف al Haram ash-Sharif – The Noble Sanctuary) চত্বরের কেন্দ্রস্থলে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত অষ্টভুজাকৃতির এই স্থাপনাটির নকশা ও অলংকরণে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন স্থাপত্যশৈলী এবং উদীয়মান স্বতন্ত্র ইসলামিক ট্র্যাডিশনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় যাতে টেক্সচুয়াল ও আর্কিটেকচারাল ন্যারেটিভ একে অপরকে জোরদার করে।

এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে এই স্থাপনাটি মূলত: মসজিদ হিসেবে নির্মিত হয়নি (মূল অংশে কোন মিম্বর নেই), বরং মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী হাদিসে বিশদভাবে বর্ণিত যে পবিত্র পাথরের উপর থেকে রাসূল(সা:) মি’রাজে (Ascension to Heaven) গমন করেছিলেন বলে ধারণা, জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরের কেন্দ্রস্থিত সেই Foundation Stone বা ভিত্তিপ্রস্তরকে ঘিরে একটি shrine (মাজার) হিসেবে এই স্থাপনাটি নির্মিত। জুডিও-ক্রিস্টিয়ান ট্র্যাডিশন অনুযায়ী এই সেই স্থান যেখানে ইব্রাহীম(আঃ) তাঁর সন্তানকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন এবং যেখানে পরবর্তীতে সোলায়মান(আঃ) এর টেম্পল ছিল। স্থানটির ধর্মীয় তাৎপর্যের স্মারকচিহ্ন হিসেবে স্থাপনাটি নির্মিত যা তার আভ্যন্তরীণ নকশা দেখলে বোঝা যায় –

Dome of the Rock interior

গম্বুজের ঠিক নিচে স্থাপনার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পবিত্র পাথর (Foundation Stone) যা পারিপার্শ্বিকতার অংশ হিসেবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে ৯০ মিলিয়ন বছরের পুরনো (Upper Turonian Stage, Late Cretaceous karsted limestone) –

The Holy Rock at the center of the interior

পাথরটি পুরোপুরি নিরেট নয়, বরং এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি গর্ত আছে যা দিয়ে পাথরের নিচে অবস্থিত আংশিক প্রাকৃতিক ও আংশিক মানবসৃষ্ট একটি গুহায় (cavern) প্রবেশ করা যায়। Well of Souls (আত্মার কূপ) নামে পরিচিত এই গুহার অভ্যন্তরে রয়েছে নামাজের জায়গা –

ও

Prayer area inside the cave under the Holy Rock

বাহ্যিক নকশা (Exterior Design)

অটোমান সম্রাট সুলেমান (Suleiman the Magnificent) এর শাসনামলে ডোম অফ দ্য রকের বাইরের দেয়াল সুদৃশ্য টাইল দিয়ে আচ্ছাদিত হয়। ১৯৫৫ সালে জর্ডানের সরকার অন্যান্য আরব রাষ্ট্র ও তুরস্কের সহায়তায় প্রবল বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটির মেরামত কাজ শুরু করে। এই পুনরুদ্ধার কাজের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে এর সীসা (Lead) আচ্ছাদিত গম্বুজটি ইটালিতে তৈরি অ্যালুমিনাম-ব্রোঞ্জ সংকর ধাতু দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে জর্ডানের কিং হুসেইন প্রদত্ত ৮.২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ দিয়ে গম্বুজটি পুরোপুরি আচ্ছাদন করা হয়। জেরুজালেমের যে কোন প্রান্ত থেকে ডোম অফ দ্য রকের উজ্জ্বল সোনালী গম্বুজটি চোখে পড়ে।

Dome of the Rock: The golden dome exterior

Dome of the Rock: Mosaic, tile, and inscription on exterior walls

Dome of the Rock: Mosaic

আভ্যন্তরীণ নকশা (Interior Design)

স্থাপনাটির অভ্যন্তরে রয়েছে মোজাইক, মার্বেল, ও চীনেমাটির সুদৃশ্য অলংকরণ যা বিভিন্ন শাসনামলে নতুন করে যোগ করা হয়েছে।

Dome interior

Dome of the Rock: Interior design

Dome of the Rock: Interior decoration

Dome of the Rock: Intricate interior design

Dome of the Rock: Intricate interior decoration

স্থাপনাটির ভেতরের এবং বাইরের দেয়ালে রয়েছে এর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের সাথে সঙ্গতি ও তাৎপর্যপূর্ণ সুরা ইয়াসিন, সুরা মারিয়াম ও সুরা ইসরা সহ কুর’আনের বিভিন্ন আয়াতের কারুকার্যময় ক্যালিগ্রাফি –

Inscription, mosaic, and tile work

মসজিদ আল আকসা

Masjid al-Aqsa

জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরে উপরোল্লিখিত ‘ডোম অফ দ্য রক’ স্থাপনাটির ২০০ মিটার দক্ষিণে রয়েছে ধূসর সীসায় (lead) আচ্ছাদিত গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ যা সুনির্দিষ্টভাবে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা:) ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম বিজয়ের পর পবিত্র পাথরের দক্ষিণে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক এই মসজিদটির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন যার কাজ শেষ হয় ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ছেলে আল-ওয়ালিদের শাসনামলে। কালের পরিক্রমায় বহুবার মসজিদটি সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হয় – যোগ করা হয় গম্বুজ, মিম্বর, মিনারত।

Masjid al-Aqsa: al-Fakhariyya Minaret

Masjid al-Aqsa: Entrance

Al Aqsa: hypostyle prayer hall

Masjid al-Aqsa: hypostyle prayer hall

Al Aqsa: Interior

Masjid al-Aqsa: Interior

১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর মসজিদটি একটি প্যালেস এবং চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশেষে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম পুনর্দখল করেন এবং পুনরায় স্থাপনাটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। সালাহউদ্দীনের পূর্বসূরি সেলজুক আমির নূরউদ্দীন জঙ্গি ১১৬৮ সালে মসজিদটির জন্য সিরিয়া থেকে আইভরি (হাতির দাঁত) ও কাঠের কারুকাজ করা একটি সুদৃশ্য মিম্বর তৈরির নির্দেশ দেন যার কাজ শেষ হয় তাঁর মৃত্যুর পর। জেরুজালেম পুনর্দখলের পর ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দীন মিম্বরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৯ সালে একজন অস্ট্রেলীয় পর্যটকের সন্ত্রাসমূলক অগ্নিসংযোগে মসজিদের দক্ষিণপূর্ব অংশসহ দ্বাদশ শতাব্দীর কারুকার্যপূর্ণ মিম্বরটি পুড়ে যায়, তার জায়গায় এখন রয়েছে একটি Replica বা অনুকৃতি।

Masjid al-Aqsa: Original Saladin Minbar: Photo Credit: Matson collection 1914

নামের বিভ্রান্তি

মুসলিম বিশ্বে আলোচ্য স্থাপনা দুটির নাম ও উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তি ও Conspiracy Theory প্রচলিত আছে। নিচের ছবিতে জেরুজালেমের হারাম শরীফে স্থাপনা দুটির তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে যা এদের ভিন্নতা বুঝতে সহায়ক হবে।

Dome of the Rock and Masjid al Aqsa in al-Haram ash-Sharif

Dome of the Rock and Masjid al-Aqsa in al-Haram ash-Sharif

এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে কুর’আনে সুরা ইসরায় (বনী ইসরাঈল) মক্কার ‘মসজিদ আল হারাম’ থেকে ‘মসজিদ আল আকসা’ বা দূরবর্তী মসজিদে রাসূল(সা:) এর ইসরা বা রাত্রিকালীন ভ্রমণের (The Night Journey) বিষয়টি যখন নাজিল হয়, তখন তা বিশেষভাবে একটি জায়গাকে নির্দেশ করে, আজকের আল আকসা মসজিদ ভবনটিকে নয়। জেরুজালেম সেসময় রোমানদের শাসনাধীন ছিল।

“সকল মহিমা তাঁর যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম (পবিত্র মসজিদ) থেকে মসজিদে আকসা (দূরবর্তী মসজিদ) পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” আল কুর’আন – ১৭ঃ১”

“Exalted is He who took His Servant by night from al-Masjid al-Haram to al-Masjid al-Aqsa, whose surroundings We have blessed, to show him of Our signs. Indeed, He is the All-Hearing, the All-Seeing.” Al Qur’an – 17:1

রাসূলের(সা:) মৃত্যুর পর ৬৩৭/৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা উমরের(রা:) সময় মুসলিমরা জেরুজালেম জয় করে। এরপর হাদিসের বিশদ বর্ণনা অনুসারে টেম্পল মাউন্টের কেন্দ্রে অবস্থিত পবিত্র পাথরটিকে রাসূলের মি’রাজে গমনের স্থান হিসেবে নিরূপণ করা হয় এবং এর কিছু দক্ষিণে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। পরবর্তী বহু শতাব্দী পর্যন্ত পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত মসজিদ ভবন এবং ডোম অফ দ্য রক স্থাপনা সহ পারিপার্শ্বিক পুরো টেম্পল মাউন্ট এলাকাটিই মুসলিমদের কাছে কুর’আনে বর্ণিত ‘মসজিদ আল আকসা’ নামে এবং মসজিদ ভবনটি ‘আল-জামই আল-আকসা’ নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতকে অটোমান শাসনামলে মসজিদের লাগোয়া টেম্পল মাউন্ট চত্বরটির ব্যাপক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সাধন করে এলাকাটিকে আল-হারাম আশ-শরীফ (the Noble Sanctuary) নামকরণ করা হয়। অন্যদিকে মসজিদ ভবনটি তখন থেকে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত হয়। অধুনা এই পরিচয়টিই বহুল ব্যবহৃত। সামগ্রিকভাবে একই চত্বরে অবস্থিত Qubbat as-Sakhra বা ডোম অফ দ্য রক নামে পরিচিত স্থাপনাটি ঠিক মসজিদ হিসেবে নির্মিত নয়, যদিও এর ভেতরেও নামাজ পড়া হয়। শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমাম মসজিদ আল-আকসাতে দাঁড়ান, ডোম অফ দ্য রকের অভ্যন্তরে তুলনামূলক স্বল্প-পরিসর স্থানে এসময় সাধারণত মহিলারা নামাজ আদায় করেন। স্বতন্ত্র হলেও এটা জানা জরুরী যে প্রায় ১৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য সম্বলিত গুরুত্বপূর্ণ এ দু’টি স্থাপনাই মুসলিমদের তৈরি এবং পুরো এলাকাটিই তাদের জন্য পবিত্র স্থান (الحرم الشريف – the Noble Sanctuary) হিসেবে গণ্য।

Jerusalem: Old City

জেরুজালেমের হারাম শরীফের ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর উপর আরও বিশদ ভাবে জানতে চাইলে দেখুন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজের এমারিটাস প্রফেসর ও প্রখ্যাত ইসলামের ইতিহাস, স্থাপত্য ও কলা বিশারদ ডঃ ওলেগ গ্রাবারের (Dr. Oleg Grabar) ধারাবিবরণীতে একটি তথ্যবহুল ভার্চুয়াল প্যানোরামিক অডিও-ভিস্যুয়াল ট্যুর

শীতকালীন অলিম্পিক গেমস ও সন্ত্রাসী ঘটনা। আড়ালে কি আছে??? -Husasain Sumrat

 

পাশ্চাত্য মিডিয়াতে সন্ত্রাসবাদ ও সচি অলিম্পিক নিয়ে বেশ লেখালেখি হচ্ছে। ২৭ জানুয়ারি’১৪ তে বিবিসি তে ব্রিটিশ সরকারের একটি সতর্কসূচক বক্তব্যও ছাপানো হয়। সচিতে অলিম্পিক মশাল আসার সাথে সাথে সিএনএন ১০০০ জন লোকের উপর জরিপ করে। যেখানে ৫৭% আমেরিকান মনে করে সেখানে সন্ত্রাস হবার সম্ভাবনা আছে। তার আগের খবরে বলা হয় রাশিয়ার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের জন্য হটস্পট হল চেচনিয়া। যেখানে একে তাঁরা “Black Window” নামে আখ্যায়িত করেছেন। ড. গডন উও বলেছেন সেখানে সন্ত্রাসী হামলা ঘটার সমূহ সম্ভবনা রয়েছে।

““Because of the history between the Russians and the Chechen people who splintered to form the Caucasus Emirate, Sochi is a prime target for terrorism,” said Woo, who has advanced insurance modelling of catastrophes, including designing a model for terrorism risk.” (http://www.ibtimes.co.uk/sochi-winter-olympics-terrorist-attack-very-likely-happen-1435265)

এই খেলাটি যখন চলছে তখন পৃথিবীতে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে চলছে সর্বচ্চ দন্দ (on the basis of geopolitical chessboard)। সব বিখ্যাত পত্রিকা ও সাময়িকী চোখ ঘুরিয়েছে “Black Widow” এর দিকে। তাঁরা লেখে যাচ্ছে মনের মাধুরী মিশিয়ে। টিভিও বসে নেই। এইসব স্লানটেড মিডিয়ার উদ্দেশ্য হল রাশিয়ার কতৃপক্ষকে বিব্রত করা।

কোন মিডিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। সেটি হল এই ককেসিয়ান  সন্ত্রাসের পেছনে কে আছে???!!! যা কিনা এই সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি নিরূপণে সহায়তা করবে।

আমরা যদি আল-কায়েদার ইতিহাস দেখি এবং বর্তমানে লিবিয়া ও সিরিয়াতে যদি দেখি তাহলে স্পষ্ট বুঝতে পারি তাঁদের পেছনে ছিল পাশ্চাত্য শক্তি।

একটু ইতিহাসের দিকে যাওয়া যাক –

এই চেচনিয়ান জিহাদিদের পেছনের কথা কি বলে? যাদেরকে প্রমাণ না করা গেলেও বলা হচ্ছে যে এরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করবে।

১৯৯০ সালের দিকে যখন সোভিয়েত উনিয়ন ভেঙ্গে যায় তখন থেকেই রাশিয়ার সাথে একটি শীতল যুদ্ধ চলছে চেচনিয়াকে রাশিয়া থেকে আলাদা করার জন্য যা কিনা তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের জন্য Strategic rout হবে। এটি একটি Intelligence অপারেশন (গোপন)। চেচেন বিদ্রোহীদের প্রধান দুই নেতা শামিল বাচাজেভ ও আল খাত্তাব সিআইএ সহায়তাপুষ্ট পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। They were indoctrinated there. তাঁরা আল-কায়েদাদের সাথেও যুক্ত হয় যা কিনা আইএসআই সহায়তাপুষ্ট। যার পেছনে আছে সিআইএ। চেচনিয়াতে এদেরকে ফান্ডিং করে সৌদি ওহাবি মিসন।

The ISI played a key role in organizing and training the Chechnya rebel army:

“[In 1994] the Pakistani Inter Services Intelligence arranged for Basayev and his trusted lieutenants to undergo intensive Islamic indoctrination and training in guerrilla warfare in the Khost province of Afghanistan at Amir Muawia camp, set up in the early 1980s by the CIA and ISI and run by famous Afghani warlord Gulbuddin Hekmatyar. In July 1994, upon graduating from Amir Muawia, Basayev was transferred to Markaz-i-Dawar camp in Pakistan to undergo training in advanced guerrilla tactics. In Pakistan, Basayev met the highest ranking Pakistani military and intelligence officers (Levon Sevunts, “Who’s Calling The Shots? Chechen conflict finds Islamic roots in Afghanistan and Pakistan”, The Gazette, Montreal, 26 October 1999.)

Following his training and indoctrination stint, Basayev was assigned to lead the assault against Russian federal troops in the first Chechen war in 1995. (Vitaly Romanov and Viktor Yadukha, “Chechen Front Moves To Kosovo”, Segodnia, Moscow, 23 Feb 2000)

সচি অলিম্পিক রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনের কেন্দ্রে অবস্থিত (ব্ল্যাক সি)। ১৯৯০ এর দিকে রাশিয়ান ফোরসের সাথে চেচনিয়ান বিদ্রোহী (US sponsored) ও আল কায়েদার মতো আরও দল পরাজিত হয়।

রাশিয়া ভিত্তিক আল-কায়েদা ও মিডিল ইস্টের বড় নেটওয়ার্ক, মধ্য এশিয়া ও বাল্কানের আল-কায়েদাদেরা এই অলিম্পিকের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিন্নিত করা হচ্ছে। যা কিনা ‘সিআইএ’ এর বড় অ্যাসেট।

বলার প্রয়োজন পরেনা যে মস্কো এটি খুব ভাল করেই জানে – আল-কায়েদা সিআইএ এর বড় অস্ত্র এবং তাঁরা গোপনে তাঁদেরকে সহায়তা করছে এই অলিম্পিক আসরে ভীতি ছড়ানোর জন্য।

Within the Russian military and intelligence establishment, this is known, documented and discussed behind closed doors. Yet at the same time, it is a “forbidden truth”. It is taboo to talk about it in public or to raise it at the diplomatic level. Washington knows that Moscow knows: “I know you know I know”.

The more fundamental questions which both the Russian and Western media are not addressing for obvious reasons:

  • Who is behind the Caucasus terrorists?
  • What geopolitical interests would be served, were the US and its allies to decide to trigger a “False Flag” terror event before or during the Sochi Olympic Games?

আমাদের মনে রাখা দরকার চেচনিয়া জিহাদিদের সাথে ন্যাটোর একটি যোগসূত্র আছে। ন্যাটো আমেরিকার সঙ্গী। নিম্নোক্ত লিঙ্কটি দেখে নিতে ভুলবেন না।

http://www.boilingfrogspost.com/2011/11/22/bfp-exclusive-us-nato-chechen-militia-joint-operations-base/

 

পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দী মানবতা

by মুহাম্মদ আব্দুল খালিক

মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন, তবে (বেড়ে ওঠার পর থেকে) সে সর্বত্র (বিভিন্নভাবে) পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকে আবদ্ধ।’ যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে-সম্প্রদায়ে, রাজ্যে-রাষ্ট্রে, সভ্যতায়-মতাদর্শে এর প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি।

image

 

সমাজে আমরা কোনো না কোনোভাবে শৃঙ্খলে আবদ্ধ হই। বাল্যকালে আমরা আমাদের পিতা-মাতা শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকি। আমাদের পিতা-মাতা ভুল মতবাদ বা প্রথা শিক্ষা দিয়ে সহজেই আমাদেরকে বিপথগামী করতে পারেন, শিক্ষকমন্ডলী ভুল আদর্শ বা জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ককে ভারী করে তুলতে পারেন। আর আমাদেরকে তাই করতে হয় যা তারা বলেন বা যে নির্দেশনা তারা দেন। বড় হলে জীবিকার তাগিদে আমাদের বেছে নিতে হয় কোনো পেশা বা কর্মকে। সেখানে আমাদেরকে হুকুম মেনে চলতে হয় আমাদের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের। এমনকি চাকুরি বাঁচাতে তাদের অন্যায় আদেশও মানতে থাকি আমরা বাধ্য। রাষ্ট্রে বসবাস করতে যেয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত মেনে চলতে হয় হাজারো আইন-কানুন। রাষ্ট্রের কর্তারা তাদের ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করার জন্য কিংবা তাদের স্বার্থ আদায়ের জন্য এসব আইনে রেখে দেন প্রয়োজনীয় ফাঁক-ফোঁকর। আমাদের এতে বলার থাকে না কিছুই। তাদের স্বার্থের কাছে আমাদের স্বাধীনতার জলাঞ্জলি দিয়ে আমাদের সাজতে হয় সুনাগরিক। নইলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর হাত তো রয়েছেই।

মানব ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’ বা ‘মানব সভ্যতার ইতিহাস হচ্ছে সত্য-মিথ্যার মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস’, যাই বলি না কেন; যুগে যুগে মানুষ যে শক্তিমানদের দ্বারা নির্যাতন, নিষ্পেষণ, বঞ্চনা গঞ্জনার শিকার হয়েছে কথা বলা যায় অনায়াসেই। ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাই আমরা খুঁজে পাই ভয়ানক যুদ্ধ, রক্ত নিয়ে হুলি-খেলা, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, ধর্ষণ আর পেশী শক্তির আধিপত্য।

আমাদের জানা-শুনা সভ্যতাগুলোর মধ্যে মেসোপটেমিয়া, সুমেরিয়, মিশরীয়, গ্রীক, রোমান, পারস্য, ইনকা, আজটেক মুসলিম সভ্যতা উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি সভ্যতার মধ্যে ছিল ক্ষমতা দখলের অসুস্থ লড়াই। পর রাষ্ট্র আক্রমণে প্রতিটি সভ্যতাতেই ছিল সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের উপস্থিতি। মানবাধিকার লঙ্ঘনে কোনো কোনো সভ্যতা এতই নীচে নেমে গিয়েছিল যে, সময়টাকে ইতিহাসে অভিহিত করা হয়েছে ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে।

গ্রীক সভ্যতায় জ্ঞানচর্চা সত্য প্রচারের জন্য ইতিহাসশ্রেষ্ঠ মনীষী সক্রেটিসকে শিকার হতে হয় মৃত্যুদন্ডের, প্লেটোকে জীবন বাঁচানোর জন্য এথেন্স থেকে রাতের আঁধারে পাড়ি জমাতে হয় স্পার্টায়।  রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন লোকদের দ্বারা জ্ঞান সত্য প্রচারকারী লোকজন এভাবে বিভিন্ন রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নারীদের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। পতিতাবৃত্তি পুরুষের সেবা দাসে পরিণত করা হয়েছিল নারীদের। প্রচলন ছিল জঘন্য দাস প্রথার। শক্তিমান মানুষরা (?) আবির্ভূত হয়েছিল দুর্বল মানুষদের প্রভু হিসেবে।

রোমান সভ্যতাও নির্যাতনে পিছিয়ে ছিল না কোনোদিকেই। শহরকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছিল অভিজাত শ্রেণী যাদের দ্বারা পরিচালিত হতো সাম্রাজ্যের শাসনকার্য। প্রচলন ছিল ঘৃণ্য দাস প্রথারও।  তারা এতটাই নীচে নেমে গিয়েছিল যে, ঐসব দাসদের দ্বারা আয়োজন করতো ‘গ্লাডিয়েটর’ নামক বর্বরোচিত ক্রীড়ার, যেখানে তাদেরকে পরস্পর অবতীর্ণ হতে হতো মৃত্যু পর্যন্ত জীবন সংহারী লড়াইয়ে। আর রক্তের হুলি-খেলা দেখে আনন্দ পেত অভিজাত (?) নামীয় ক্ষমতাবানরা।  সম্পদ ক্ষমতার লোভে তারা আক্রমন করতো বিভিন্ন রাজ্য সম্প্রদায়ের উপর। সাম্রাজ্য সম্প্রসারণবাদী উন্মাদতা তাদের মধ্যে এতটাই শিকড় গেড়েছিল যে, বিনা অপরাধে বিনা প্ররোচনায় দুর্বল সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর তারা হামলা করতো। রোমানরা এতটাই যুদ্ধবাজ ছিল যে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সকল পুরুষকেই সামরিক বাহিনীতে সেবা দিতে হতো। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তখন রাষ্ট্রের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছিল। নিরীহ জনপদের ওপর আক্রমনে ব্যবহৃত হতো ধর্ম প্রচারের ছুঁতো। অশ্লীলতা বেহায়াপনার বিস্তার ঘটেছিল ব্যাপকভাবে। নারীকে পরিণত করা হয়েছিল পুরুষের মনোরঞ্জনের উপকরণ হিসেবে। বেশ্যাবৃত্তি, বহুমাগামিতা, অবাধ যৌনাচার তখন অভিজাত শ্রেণীর সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল

পারস্য সভ্যতায় ক্ষমতাসীন শ্রেণী জনগণের ভাগ্য নির্ধারকের আসনে সমাসীন হয়েছিল। তাদের নির্দেশ বিধিই ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। তারা ছিল অগ্নি উপাসক। অন্য কোনো ধর্ম বা আদর্শ মেনে চলার কোনো এখতিয়ার জনগণের ছিল না। নারীদের অবস্থাও ছিল নাজুক। তাদেরকে পরিণত করা হয়েছিল পুরুষের ভোগের পণ্যে। প্রচলন ছিল দাসত্বপ্রথারও। যেখানে শক্তিমানরাই ছিল প্রভু, আর দুর্বলরা পরিণত হতো তাদের দাসে। যুদ্ধের নামে ক্ষমতা সাম্রাজ্য বিস্তারের ঘৃণ্য প্রতিযোগিতায় মত্ত ছিল তারাও

মুসলিম সভ্যতাও সবদিক বিবেচনায় সে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। মুসলিমরা যে সময়কে ‘সোনালী যুগ’ হিসেবে অভিহিত করে সে সময়টা ছাড়া পরবর্তী সময়গুলোতে ক্ষমতা দখলের নেক্কারজনক প্রতিযোগিতা মুসলিম শাসক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে বিরাজমান ছিল। উসমানীয়, আব্বাসীয় প্রভৃতি সম্প্রদায়ে তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এদের মধ্যে এতো বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব ছিল যে, মৃত ব্যক্তির কবরে গিয়েও তারা প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা চালাত। তবে সোনালী যুগের শাসকসহ বিভিন্ন সময়ে অনেক শাসকের উপস্থিতিও আমরা মুসলিম সভ্যতায় লক্ষ্য করি যারা মানবতার জন্য, জ্ঞানের বিকাশের জন্য কাজ করে গেছেন। মুসলিম সভ্যতর সবচেয়ে বড় অবদান হলো- তারা চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে মানব জাতির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মানুষের মধ্যে সত্যিকারের মূল্যবোধ জাগ্রত করেছিল। বিশ্বে প্রথমবারের মত প্রতিষ্ঠা করেছিল নারী অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার; দাসত্ব প্রথা রোধে গ্রহণ করেছিল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা

পাশ্চাত্য সভ্যতায় জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটেছে কথা স্বীকার করতেই হবে। তবে পাশ্চাত্য সভ্যতার সম্পর্কে প্রাচ্যে সবচেয়ে প্রচলিত কথাটি হলো- ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা দিয়েছে বেগ, আর কেড়ে নিয়েছে আবেগ। বস্তুবাদ আর ভোগবাদী মানসিকতার জোয়ারে পাশ্চাত্যে আজ মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা বিলুপ্তির পথে। অর্থ উপার্জন, সম্পদ আহরণে নিচুতর পদক্ষেপ নিতেও তারা পিছপা হয় না। কিছু সংখ্যক কর্পোরেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছে সাধারণ মানুষ। সরকারও কাজ করছে কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষায়। আর বিশ্বব্যাপী পাশ্চাত্য আধিপত্য বিস্তারের নিকৃষ্ট  জঘন্য প্রতিযোগিতা তো রয়েছেই। ১ম ২য় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে এই পাশ্চাত্য সভ্যতাই। ঔপনিবেশিক যুগে উপনিবেশ স্থাপন করতে যেয়ে হত্যা করেছে লাখো লাখো মানুষকে। আর এসবই করা হয়েছে তাদের আধিপত্য বিস্তার অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য। বর্তমানেও পৃথিবীব্যাপী এক ত্রাসের রাজ্য তারা প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে যেখানে তাদের স্বার্থের বাইরে যাওয়া মানেই নির্যাতন নিষ্পেষণের তীব্র আঘাত। নারীদের উন্নয়নে প্রশংসনীয় বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও নারীকে পুরুষের ভোগের পণ্যে পরিণত করার বৃত্ত থেকে এখনো বের করে আনা সম্ভব হয়নি। মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার মত গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রেখেছে বর্তমান সভ্যতা। তবে বৃহশক্তি কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে শাসন শোষণ করার মনোভাব তা ব্যাহত করছে প্রতিনিয়ত

বলা হয়, মানবজাতি বর্তমানে আধুনিক-উত্তর যুগে বাস করছে। মানুষ প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায়। কলা, দর্শন, বিজ্ঞান, আইন, মহাকাশ, তথ্য-প্রযুক্তি, ধর্মশিক্ষা কোন ক্ষেত্র বাকী আছে যে সম্পর্কে মানুষ গবেষণা করেনি? মানুষের পথচলার জন্য এসব জ্ঞান, তথ্য তত্ত্ব দিতে পারে সঠিক পথের দিশা। তবে এজন্য সাধারণ মানুষকে কায়েমী স্বার্থান্বেষী পুঁজিপতি ক্ষমতাশালীদের চক্রান্ত সম্পর্কে থাকতে হবে সচেতন। নিজেদেরকে জ্ঞানে, দক্ষতায় আরো উন্নত করে পারস্পরিক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে রুখে দিতে হবে এসব তথাকথিত স্বার্থান্বেষী মহলকে। তাহলেই হয়তো মানবজাতি একটি কল্যাণপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা  করতে পারবে

আলহামব্রা – ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী

2

By শঙ্খচিলের ডানা :

“Rising up above the Red Hill, the royal city of the Alhambra stands proud and eternal, one of the most important architectural structures of the Middle Ages and the finest example of Islamic art left to us in the western world.”

“একগুচ্ছ পান্নার মাঝে যেন একটি মুক্তা” – মুরিশ কবিরা এমনভাবেই বর্ণনা করেছেন আলহামব্রার সৌন্দর্য! স্পেনের মুসলিম সভ্যতা ও স্থাপত্যের শীর্ষ আকর্ষণ গ্রানাডার আলহামব্রা প্রাসাদ ও দুর্গ। নবম শতকে দক্ষিণ স্পেনের সাবিকা পাহাড়ের (Assabika hills) ওপর নির্মিত একটি দুর্গের ভিত্তির ওপর একাদশ শতাব্দীতে আলহামব্রা দুর্গ-প্রাসাদের পত্তন ঘটান স্পেনের শেষ মুসলিম শাসকগোষ্ঠী নাসরিদ বংশের মোহাম্মদ বিন আল আহমার এবং এর পরিবর্তন-পরিবর্ধন চলে পরবর্তী দেড়শ বছর। সমসাময়িক বাইজেন্টাইন এবং আব্বাসীয় মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের প্রভাব ছাড়াও আইবেরিয়ান পেনিনসুলায় সুদীর্ঘ আটশ বছরের মুসলিম স্থাপত্যের পরম্পরা এবং নিজস্ব শৈল্পিক উদ্ভাবনার মিশেল ঘটিয়ে তৈরি হয় স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত বিশেষ ধরণের লাল মাটিতে নির্মিত দুর্গ-প্রাসাদ ‘আলহামব্রা’ যার নামের আক্ষরিক অর্থ The Red.

আলহামব্রার স্থাপত্যশৈলী ও অলঙ্করণে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে অশ্বখুরাকৃতির খিলান (Calliphal horseshoe arch), জটিল রম্বস আকৃতির আলমোহাদ সেবকা (the Almohad sebka – a grid of rhombuses), আলমোরাভিদ পাম (the Almoravid palm), এবং ত্রিমাত্রিক মুকারনাস ( Muqarnas – stalactite ceiling decorations).

Portico and Pool

The Court of the Lions

Decoration of the Court of the Lions

The Hall of the Ambassadors – a mirador with elaborately ornate walls and ceiling

ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যস্বরূপ আলহামব্রাতে খুঁজে পাওয়া যায় জান্নাতের বর্ণনা অনুযায়ী সৌন্দর্য ও শান্তিবর্ধক রূপে চলমান পানি ও ফোয়ারা, আলো-ছায়া, এবং পত্রপুষ্প-শোভিত বাগানের নয়নাভিরাম ব্যবহার –

The Court of the Water Channel

Sultana’s Garden

আলহামব্রার স্থাপত্যশৈলীতে অলংকার হিসেবে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ত্রিমাত্রিক মুকারনাস (Muqarnas – honeycombed stalactite ceiling decorations) যা দশম শতাব্দীতে পারস্য এবং নর্থ আফ্রিকায় প্রায় একইসাথে উদ্ভাবিত মুসলিম স্থাপত্যকলার অনন্য সংযোজন –

Use of Muqarnus in the Hall of the Abencerrajes

Use of Muqarnus in the Alhambra

Arabesque around the windows

ইসলামি স্থাপত্যের অনবদ্য নিদর্শনস্বরূপ আলহামব্রায় খুঁজে পাওয়া যায় জ্যামিতিক নকশা ও ক্যালিগ্রাফির জটিল ব্যবহার। কেবল একটি বিশেষ স্তবকই আলহামব্রার স্থাপত্যে উৎকীর্ণ হয়েছে ৯০০০ বার – لا غالبَ إلا الله (La ghaliba illa Allah – ‘There is no Conquerer but Allah’)

Wa la ghaliba illa Allah – calligraphy on the walls of Alhambra

কেবল নয়নাভিরাম অলঙ্করণই নয়, দুর্গ-প্রাসাদের নিরাপত্তা রক্ষায় ১৩টি ওয়াচ টাওয়ারসহ শক্ত প্রাচীরে ঘেরা আলহামব্রায় গড়ে তোলা হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাহাড়ের উপরে নির্মিত আলহামব্রা কমপ্লেক্সে পার্শ্ববর্তী ডারো নদীর (the river Darro) পানি কি ভাবে নদীর উৎসে বাঁধ দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে সুড়ঙ্গ কেটে কৃত্রিম প্রণালী ও জলাধার নির্মাণ ও জলশোধন-ব্যবস্থা সহযোগে বহুদুর টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা আজও বিস্ময় জাগায়!

১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলার হাতে গ্রানাডার পতনের সাথে সমাপ্তি ঘটে আইবেরিয়ান পেনিনসুলায় সুদীর্ঘ আটশ বছরের মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের। আগ্রাসী রিকনকিস্তার (Reconquista) জন্য গ্রানাডা ছিল একটি অনন্য বিজয় – বিপুল ধন-সম্পদ ছাড়াও পুরো ইউরোপে মুসলিম স্থাপত্যের শিরোমণি হিসেবে বিবেচিত আলহামব্রা প্রাসাদ তাদের কুক্ষিগত হয়। পরবর্তীকালে আলহামব্রা প্রাসাদ বারবার লুন্ঠিত, ধ্বংসপ্রাপ্ত, এবং কালক্রমে পরিত্যক্ত হয়। দুর্গ-প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ধ্বংস করে অপরিকল্পিত ও বেমানানভাবে গড়ে তোলা হয় অন্যান্য স্থাপত্যকর্ম – যেমন ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত পঞ্চম চার্লস (Charles V) এর প্রাসাদ। রেনেসাঁযুগীয় স্থাপত্যশৈলীসহ শক্তিশালী উপস্থিতি প্রমাণ করলেও লাস্যময়ী আলহামব্রা প্রাসাদের তুলনায় তা প্রাণহীন, শীতল, জগদ্দল পাথরসম। অবশেষে উনবিংশ শতকে ইউরোপীয় পরিব্রাজক এবং পন্ডিত ব্যক্তিদের উৎসাহে আলহামব্রা দুর্গ-প্রাসাদের পুনরুদ্ধারকাজ শুরু হয়। অধুনা আলহামব্রা স্পেনের সবচাইতে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশন গুলোর একটি। তিলোত্তমা আলহামব্রা এখন একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট – যুগেযুগে অসংখ্য গল্প, কবিতা, ও গানের অনুপ্রেরণা!

The Palace of Charles V in the Alhambra

আলহামব্রার ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে আরও বিশদ ভাবে জানতে চাইলে দেখুন –

মাদ্রাসা শিক্ষাঃ সাব-অল্টার্নের ক্ষমতা

খন্দকার রাক্বীব, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Madrassa

ক্ষমতার প্রশ্নে খুব বড় দু’জন তাত্ত্বিক হলেন গ্রামসি আর ফুকো। গ্রামসির বক্তব্য ছিল হেজেমনিক লোকরা দলিত শ্রেনির লোকদের উপর ক্ষমতাবান। ফুকো এই মতবাদ খারিজ করে দিয়ে বলেন ‘সাব-অল্টার্ন’রাও ক্ষমতাবান হইতে পারে। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল ‘পাওয়ার ইজ ইভরিহোয়ার’।

ফুকোর এই বক্তব্য আমার চিন্তার নতুন ধার খুললো। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে বসে ওরিয়েন্টাল ডিসকোর্স খারিজ করে পশ্চিমা কিছু তাত্ত্বিকের তত্ত্ব নির্ভর করে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করি তা যথার্থ না। আমাদের জানা কথা যে উপমহাদেশে ‘মেইনস্ট্রিম’ শিক্ষাধারার বাইরে মাদ্রাসা শিক্ষার ‘ইন্সটিটিউশনালাইজেশন’ শুরু হয় মূলত ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পরে, এক ধরনের উপনিবেশবিরোধি আন্দোলনের মোড়কে। ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুসলিম শিক্ষাবিদরা এবং ফারায়েজিরা একটা বিশাল ধাক্কা খায়। পরবর্তিতে ১৮৫৭সালে সিপাহি বিপ্লবে ফারায়েজি মুসলিমরা উপনিবেশবাদবিরোধী সিপাহি আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে আবার পরাজিত হয়। যে পরাজয়ের মাশুলও তাদের দিতে হয় চরমভাবে। শেরশাহ’র ‘সড়ক-ই-আজম’ এর পাশে এমন কোন গাছ ছিলনা যার পাশে মুসলিম উলামাদের লাশ ঝুলানো ছিলনা।

উপনিবেশবাদি শক্তির বিরুদ্ধে মুসলিম উলামারা যখন এভাবে টিকতে ব্যর্থ হচ্ছিল তখন তারা উপনিবেশবিরোধি আন্দোলনের চিহ্ন আর নিজস্ব স্বকিয়তা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে সমাজের মূল স্রোতধারার বাইরে চলে যায়। ফারায়েজিদের সহায়তায় নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। অসংখ্য মাদ্রাসা-মক্তব তৈরি করে। মাওলানা নানুতবি এসময়ে তৈরি করেন দেওবন্দ মাদ্রাসা।

 

তারা উপনিবেশবাদবিরোধি সংগ্রামে পর্যদুস্ত হয়ে এক ধরণের রেসিস্ট্যান্স মনোভাব নিয়ে ‘প্রান্তিক’ পর্যায়ে চলে যায়। আজো তারা ফিরে আসেনি। আমরাও তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছি, কখনো কাছে টানার চেষ্টা করিনি, সংকীর্ন রাজনৈতিক কারণ আর একান্ত প্রয়োজন ছাড়া। তাদের সুযোগ-সুবিধা, সুখ-দুঃখ তাদের ভাষায় না বুঝে আমাদের ভাষায় বুঝতে চেয়েছি। আমরা নিজেদের ‘কেন্দ্র’ ভেবে ওদের ভাবলাম ‘প্রান্তিক’ হিসেবে। প্রান্তের ক্ষমতায়ন অস্বীকার করলাম, যেমন করি প্রান্তে যেতেও।  যেটা ছিল আমাদের মারাত্মক ভুল।

 

পবিত্র কুরআনে ‘সূরা ইয়াছিনে’ পড়েছিলাম  ‘‘জনপদের প্রান্ত থেকে এক লোক শহরবাসির কাছে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল ‘হে আমার জনপদের লোকেরা তোমরা দয়াময় আল্লাহ্‌র এ রসুলদের অনুসরণ কর। এরা এমন রসুল যারা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চায় না।’ যারাই তার অনুসরণ করবে তারাই হবে হেদায়াত প্রাপ্ত। ……আফসোস যদি আমার জাতি এটা জানতে পারত(আয়াত-২০-২৬)’’

 

উপরের এই আয়াত সমূহ আমাকে খুব ভাবিয়েছে এই যুক্তিতে যে, এখানে পষ্টভাবে প্রান্তিক শক্তির কথা বলা হয়েছে। আমরা যারা নিজেদের কেন্দ্রের মানুষ ভাবি, আমাদের জানার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি থাকে, যা আল্লাহ’র ভাষায় ‘আফসোস যদি কেন্দ্রের লোকরা এটা জানত’/ এটাও পষ্ট যে, প্রান্তিকরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রের থেকেও ভালো যানে, এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও বেশী। যা আমরা বুঝতে পারি না, অনেক ক্ষেত্রে অস্বীকার করি। আজ আমাদের মাঝে কেন্দ্রে যাবার প্রবনতা বেশী, কেউ প্রান্তিক হতে চায় না। অথচ আরাফাতের ভাষণের পর ইসলাম ধর্মের প্রচারকরা সবাই প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে। উপনিবেশবাদি আর সাম্রাজ্যবাদীদের দেখি তারাও প্রান্তে প্রান্তে ছড়ানো। মার্কিন গবেষকদের একটা বিশাল অংশ আছে যারা কখনো তাদের নিজ দেশের রাজধানী শহরেও যায়নি, কিন্তু ঠিক-ই মধপ্রাচ্যের কোন একটা অঞ্চলে এসে আরবি ভাষা শিখে নিজের থিসিস দেশে গিয়ে জমা দিচ্ছে। আমাদেরও প্রান্তে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আমেরিকা না, আফ্রিকাতেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা যায় সে চেতনা লালন করা দরকার।

 

মাদ্রাসা শিক্ষিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাই বলা চলে নিজেদের অবস্থান থেকেও ক্ষমতাবান। মনে রাখা দরকার, একরোখা চিন্তা অনুকরণে আমরা যখন এগ্রিকালচারকে  এগ্রিবিজনেসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, তখন তারা আজও আমাদের সে আবহমান ‘গ্রামীণ’ সংস্কৃতি আর এগ্রিকালচারকে টিকিয়ে রেখেছে।

 

রেনেসাঁ যুগে অসংখ্য পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের অনেকের লেখায় দেখেছি, আমাদের ভারতীয় মুসলিমদের লেখার উদ্ধৃতি দিতে। আমাদের মনে রাখা দরকার ১৮৩৫সালের আগে এখানকার মুসলিমদের ভাষা ছিল ফার্সি আর উর্দু। মুসলিমরা ঐ সময়ে সাহিত্য-কলা-সমাজ-বিজ্ঞান-আইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসংখ্য বই লিখেছে আরবি-ফার্সি-উর্দু ভাষায়। যেগুলো আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সম্পদ, আমাদের গর্ব। এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, যা সংরক্ষন করা জরুরী। রাজা রামমোহনের পরে এগুলো নিয়ে খুব কম লেখালেখি হয়েছে। আমাদের জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক একসময় আফসোস করেছিলেন আমাদের মাঝে ‘আরবি-ফার্সি-উর্দু’ ভাষা চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে বলে। মাদ্রাসা শিক্ষিতরা এখনো এগুলো ধারণ করে-লালন করে, কিন্তু প্রকাশ খুব কম-ই করে।

সম্প্রতি তাদের সরকারি স্বীকৃতির কথা উঠেছে, কিন্তু আমরা আবার আগের ভুল করছি। আমাদের মত করে তাদের সমস্যা ব্যাখ্যা করছি, তাদের উপর আমাদের চিন্তা চাপিয়ে দিচ্ছি। তাদের সুযোগ-সমস্যা তাদের মত বুঝতে চাই নি। তাদের সমস্যা তাদের মুখে শুনতে হবে, তাদের মত করে তাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদের মত করে ‘মেইনস্ট্রিম’ না ভেবে তারা কিভাবে তাদের ‘মেইনস্ট্রিম’ ভাবছে সেটা বিবেচনা করতে হবে। তবেই প্রান্তিকতার বয়ান একটা সুনির্দিষ্ট যথার্থ জায়গায় নিজেকে সমাসীন করতে পারবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আর ‘মিথ অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’ এর পুনর্পাঠ

খন্দকার রাক্বীব, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের ‘ওয়ার অন টেরর’ প্রকল্পের আওতায় গত বছর যে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন’ পাস করেছে তার ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী স্বরূপ দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। ৭৪এর বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতো এই কালো আইনকে রুখে দেওয়া রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে জুলফিকার আলি ভুট্টো প্রবর্তিত ‘মিথ অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’ আর সলিমুল্লাহ খান প্রবর্তিত সন্ত্রাসবাদ কেন্দ্রিক ‘ত্রাসনীতিঃ বিচার না বারোয়ারী’ এর পুনর্পাঠ জরুরী। জানার কথা যে, সন্ত্রাসবাদের এংরাজি প্রতিশব্দ ‘টেররিজম’এর উৎপত্তি মূলত ফরাসি দেশে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে। সেকালে জনগণের বড় বড় আন্দোলন রোধ করার মতলবে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্র বা সরকার সমাজে ভয়ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করতেন। এই ধরণের চেষ্টার নাম-ই এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছিল ‘টেররিজম। জগতখ্যাত ফরাসি বিপ্লবের বিশেষ এক বছরে ১৭৯৩-৯৪তে ডাক্তার গিয়োটিন প্রবর্তিত যন্ত্র তলোয়ারে যখন আনুমানিক বিশ হাজার লোকের মাথা কাটা হয়, তখনকার সময়কেই প্রথম বিবেচনা করা হয় ‘রেইন অব টেরর’ হিসেবে। যার বাঙ্গালায় সহজ বয়ান এখন ত্রাসের রাজত্ব।

সন্ত্রাসবাদের এই বয়ান জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার মূল দোসর জোসেফ কনরাডোর মত ঔপোন্যাসিকরা আর নীৎসেদের মত নৈরাজ্যবাদী দার্শনিকরা। যার নজির আমরা বিংশ শতাব্দীতে আমাদের এই দেশে দেখেছি। যখন এখনকার মানুষদের অসহযোগ, অহিংস, খেলাফত আর সত্যাগ্রহের মত স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াইগুলোকে ত্রাস হিসেবে হাজির করা হয়েছে। যেমন এখন করা হচ্ছে জায়নিস্ট কর্তৃক ফিলিস্তিনি মুসলমানদের আর সিসি কর্তৃক মিসরীয় মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিতকরণ। দেশে দেশে সংঘঠিত জনগণের আন্দোলনকে এভাবেই সাম্রাজ্যবাদীদের ‘ওয়ার অন টেরর’এর আওতায় আনা হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্প্রতি নিজেকে এই প্রকল্পে জড়িয়ে ফেলছে, যার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ।

জানা কথা যে, টেররের সাথে টেরিটরি তথা ভূখণ্ডের এক ধরণের সম্পর্ক থাকে। দুনিয়া তাবত বর্তমান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যুদ্ধরত একমাত্র গোষ্ঠী আল-কায়েদা যখন ৯/১১এর ঘটনায় অভিযুক্ত হল, তখন-ই এই সন্ত্রাস আর টেররের সংজ্ঞা নিয়ে গবেষক আর ভাষাতাত্ত্বিকরা বিপাকে পড়ে গেলেন। এক কালের নাস্তিক দেরিদা যখন থেকেই তাঁর অবিনির্মাণ তত্ত্ব নিয়ে জ্ঞানরাজ্যে হাজির হন, তখন থেকেই এই ‘টেররিজম’ ধারণার সমালোচনা করে আসছেন। কিন্তু এই জ্ঞানরাজ্যে আল কায়েদা প্রশ্ন হাজির হওনের সাথে সাথে তিনি নিজ অবস্থান থেকে কেমন করে উল্টে গেলেন।

এশিয় মুসলিমদের খেলাফতি পতনের পর হেজেমনিক পশ্চিমা কর্তৃক তৈয়ার করা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে সাফাই গাওয়া ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘ইন্ড অব দ্যা হিস্ট্রি’র মত দেরিদা তাঁর ‘philosophy in the time of violence’এ পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনদুই দলের এক দলকে যদি আমার বেছে নিতেই হয় তো আমি আমেরিকা আর ইউরোপকেই বেছে নিব। আমেরিকা আর ইউরোপের বিরুদ্ধে, তাদের রাজনীতির চেহারা আর ‘সন্ত্রাসবিরোধি জোট’ নিয়ে আমার অনেক নালিশ। তবু আমি শত দোষ সত্ত্বেও আইন যাদের পক্ষে আর যারা শত সত্য সত্য বেঈমানি আর ওয়াদাভাঙ্গার বৈফল্য সত্ত্বেও গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থার পক্ষে একজোট শেষবিচারে সেই দলেরই পক্ষ নেব।”

সলিমুল্লাহ খানরাও এরকম ২০০৫সালে লেখা ত্রাসনীতির প্রশ্নে মজলুমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের জন্য কলম ধরেছিলেন, কিন্তু আজ শেষ বিচারের সময়গুলোতে আর মজলুমের পক্ষে রইলেননা, তাদের বিরুদ্ধেই নব নব তত্ত্ব হাজির শুরু করলেন।

জীবনের সায়াহ্ন বেলায় দেরিদার গুরু লাকা নিজেদের অবস্থান ভুল বুঝতে পেরে স্বীকার করেছিলেন, পশ্চিমা সভ্যতার কথিত অনুন্নত দুনিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ার অন টেরর বর্ণঘৃণা আকারে হাজির হবে। তাঁর বক্তব্য যথার্থতার দিকেই আগাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে সলিমুল্লাহ খানদের ‘মিথ অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’ আর নব সন্ত্রাসবাদের বয়ান জনগণের সামনে ঘৃণা আকারে সেরকম হাজির হতে পারে। যদি না তারা ওয়ার অন টেররের তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে না পারেন, বুঝতে না পারেন জনগণের মনের কথা, হাজির না করতে পারেন ‘মিথ অব ইন্ডিফ্যান্ডেন্স’এর বদলে ‘ফ্যাক্ট অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’এর বয়ান।

 

পাদটীকাঃ রাষ্ট্র মানেই সন্ত্রাস, তবে সন্ত্রাস মানেই রাষ্ট্র না (হেবারমাস, ২০০৩)।