প্রভু, ফোনে না বলে প্রকাশ্যেই বলুন

amit shah

by zainuddin sani

দুজনেই হুমকি দিয়ে রেখেছেন, বিশ্ব ইজতেমা শেষ হলে, তারপর শুরু করব। এই কথার আরেকটি অর্থ হচ্ছে, আমাদের সাধারণ মানুষকে আপাততঃ ১৯ তারিখ পর্যন্ত এই জেদাজেদি সহ্য করতে হচ্ছে। কেউই পিছিয়ে আসবে না। সরকারও ম্যাডামকে মুক্ত করবে না আর বিরোধী দলও অবরোধ তুলবে না। বিএনপিরও ক্ষমতা নেই তাঁদের নেত্রীকে মুক্ত করার আর ওদিকে সরকারেরও ক্ষমতা নেই অবরোধ বন্ধ করার। দেশবাসীর এই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা নিয়ে দুই দলের কেউই বিচলিত না। দুইজনেরই চাই বিজয়।

যুদ্ধটা কারো পক্ষেই হারা সম্ভব না। বিএনপি পিছিয়ে আসা মানে তাঁদের সমুহ পতন। আগামী চার বছর তাকিয়ে তাকিয়ে এই সরকারের দেশ পরিচালনা দেখতে হবে আর হাত কামড়াতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামীরা হারলে এই ছয় বছরের অত্যাচারের প্রতিশোধ কড়ায় গণ্ডায় উসুল করবে বিএনপি জামাত জোট। দুই দলেরই থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বসে গেছে, পরবর্তী করনীয় নিয়ে অংক কসতে। বিএনপি হিসাব কষেছে, এভাবে আরও কিছুদিন চালাতে পারলে, সরকারের পতন হবেই। আওয়ামীরা অংক কষছে, হার্ড লাইনে গিয়ে, বিএনপির মেরুদণ্ড একবার ভেঙ্গে ফেলতে পারলে, আর সমস্যা হবে না।

পাল্লা কোন দিকে ভারী, এনিয়ে কথা বলার বেশ বড়সড় বিপদ আছে। অবস্থা এমন, ‘উইথ মি ওর এগেন্সট মি’। আওয়ামীরা সঠিক পথে আছে—এমন কিছু বলেছেন মানেই আপনি অবধারিতভাবে ওদের দলে। বিএনপি ঠিক করছে বললেও বিপত্তি আছে—আপনি বিএনপি করেন। দুজনেরই দোষ, এমনটা বললে, আপনাকে কেউ ডাকবেও না, আপনার কথা কেউই শুনবেও না, বলবে ধান্ধাবাজ, এখন দুই দিকেই তাল দিচ্ছে, যে টিকবে তাঁর দিকে হেলবে। কিংবা তখন হিসেব করবে, আগে আপনি কোন দিকে ঘেঁষে ছিলেন, কবে কি লিখেছিলেন বা বলেছিলেন। কিংবা পালটি মারবার ধান্ধায় আছেন কিনা। টক শো এখন হয়ে গেছে বুদ্ধিজীবীদের দলবাজি করার মোক্ষম জায়গা। আগে পত্রিকায় কলাম লিখে বোঝাতেন, ‘আপনিই আমার হুজুর’ আর এখন দুই দলের হয়ে ঝগড়া করে বোঝাচ্ছেন, ‘আমি আপনারই পা চাটি’।

সমস্যা দেখা দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের। তাঁরা কার দিকে তাকাবে? কার কাছে প্রত্যাশা করবে? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। দুই দলের কেউই তাঁদের কথা ভাবে না, এই তথ্য তাঁরা জানে। এও জানে, ভোট এদের দুজনের একজনকেই দিতে হবে। তথ্যটা এই দুই দলও জানে। তাঁদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীরা ইদানীং এই সুরেই কথা বলা শুরু করেছেন। ‘দেখুন দুই দলই চোর। টাকা উপার্জনের জন্যই এই পেশায় আসা। ফলে যাকেই বসান আপনার বা দেশের কোন উন্নতি হবে না। এরা দুর্নীতি করবেই, টেন্ডারবাজী করবেই। এখন বেছে নিন, কাকে চান।‘ এরপরে দুই দল দুই কথা বলছে। একদল বলছে, গনতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে আর অন্য দল বলছে দেশে গনতন্ত্র দিলে দেশবাসী এমন এক দলকে বেছে নেবে যার সঙ্গে রাজাকার ফ্রি, তাই গনতন্ত্র হত্যা জরুরী।

ফলে ঘুরে ফিরে বিতর্ক মজার এক যায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে, এদেশের লোক এখনও গনতন্ত্র বুঝতে শেখেনি। তাঁরা ভালো আর মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখেনি, ভোটের মুল্য বুঝতে শেখেনি। এখানে এখনও ‘হামগের ছাওয়াল’ শুধু এই কারণে একটি দলকে ভোট দেয়া হয়, নেতার জন্মস্থানের কারণে একজন একটি এলাকার ভোট পান, কেউ বা ভোট চান এলাকার পুত্রবধু হিসেবে। তাই আপাততঃ এদেশের লোকের জন্য গনতন্ত্র না। ব্রিটিশদের কাছে স্বাধীনতা চাওয়ার সময় কমবেশি এরকমই একটি কথা তাঁরা বলেছিল, ‘ইউ কান্ট রুল দাইসেলফ’। নিজেদের শাসন করার যোগ্যতা তোমাদের এখনও হয়নি। তাই তোমাদের শাসন করার ভার আমাদের হাতেই থাক।

সরাসরি না হলেও আমরা পর্দার আড়ালে এই কথাটি মেনে নিই। বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে গিয়ে নিজেদের ইন্টারভিউ দিই। বলি, ‘আমি ওর চেয়ে ভাল, এবার আমাকে দয়া করে ক্ষমতায় বসান। আপনি যা চাইবেন, সব পাবেন। একবার সুযোগ দিয়ে দেখেন। আগেরবার কিছু ভুল করেছিলাম, তবে এবার আর হবে না‘ অন্য দল বলে, ‘একদম বিশ্বাস করবেন না ওর কথা। আর আমাকে পালটাবার দরকার কি। ও যা দিবে বলছে, আমিও তো তা দিচ্ছি। শুধু শুধু ঝুঁকি নেয়ার দরকার কি?’

বিদেশীরাও উপদেশ দেন, সার্টিফিকেট দেন আর অবশেষে চিন্তা ভাবনা করে একজনকে ক্ষমতায় বসিয়ে সবার উদ্দেশ্য বাণী দেয়, ‘এ হচ্ছে দেশবাসীর পছন্দ’। সত্যি বলতে, আমাদের এই ফর্মুলায়ও তেমন কোন আপত্তি নেই। হেসে খেলে এই বক্তব্য আমরা হজম করি। আমাদের নেতা নেত্রীরাও বেশ গর্ব করে বলেন, অমুক দেশ আমাদের সরকারকে অভিনন্দন করেছে। অন্য দল আবার জানান দেয়, মিথ্যা বলছে, আমাদের আসল প্রভু আমেরিকা এখনও অভিনন্দন দেয়নি।

সম্প্রতি প্রতিবেশি দেশের বেশ কদর বেড়েছে। শীতল যুদ্ধ শুরুর কারণেই হোক আর দক্ষিন এশিয়ায় শক্ত অবস্থান তৈরির উদ্দেশ্যেই হোক, প্রতিবেশি দেশটির স্নেহ না পেলে এদেশের ক্ষমতায় আরোহণ সম্ভব না। ফলে শুরু হয়েছে কেবলা পরিবর্তন। কে কার চেয়ে বেশি পা চাটতে পারেন, তার প্রতিযোগিতা। সম্প্রতি হওয়া ফোনালাপ, কিংবা বলা উচিৎ, ফোনালাপের গুজব নিয়ে দুই দলের কর্মী, নেতা এবং তাঁদের বশংবদ বুদ্ধিজীবীরা যেমন কাদা ছোঁড়াছুড়ি করলেন, তা দেখতে বেশ মজাই লাগল।

ফোনালাপ আদৌ হয়েছিল কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ফোনালাপের কথা ঘটা করে বলবার কি আছে? সবাইকে বোঝানো, আমার দিকে প্রভুর সুনজর আছে? আর অন্য দলের চামচা বাহিনীর উল্লাস ছিল দেখবার মত। ফেসবুক, ব্লগ, পত্রিকা, টক শোতে ছিল উল্লাসের ছড়াছড়ি। গর্বিত কণ্ঠে বেশ উল্লাস করে বলছে, ‘আরে দূর, ভয় পাওয়ার কিছু নাই, ফোন করেই নি।‘ আচ্ছা, এই উল্লাসের কারণ কি? ‘প্রভু এখনও মত পাল্টান নি?’

যদি তাইই হয়, তবে আমাদের ভোট দেয়ার দরকার কি? আপনারা ঠিক করুন, কে কে আমাদের প্রভু। বরং তাঁদের ভেতর একটি ভোট করুন। অবস্থা যদি এমনই হয়, যে আমাদের প্রভু কথিত সেই ব্যক্তি, তাঁর সিদ্ধান্তেই যে সব কিছু ঘটছে। আর সেটাও যখন ‘ওপেন সিক্রেট’ তবে আর লুকোছাপা কেন? তাঁর ভোট দানকে প্রকাশ্য করে দিতে সমস্যা কোথায়? ফোনে না বলে সর্ব সম্মুখেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে বলুন, তাঁর ভোট দানকেও প্রকাশ্য করে দিন। সবার জন্য নির্দেশনা জারী করুন, যে দলের জন্য তিনি ভোট দিবেন, সে গদিতে বসবে।

এতে দল দুটিও বাঁচে, জনগণও বাঁচে। তাঁরা তখন শুধু শুধু জনগণের কাছে বিভিন্ন উন্নয়নের মিথ্যা ওয়াদা না করে সেই প্রভুর কাছে নিজেদের সত্যি ওয়াদা পেশ করবে। যিনি বেশি মুখরোচক ওয়াদা করে প্রভুর মন জয় করতে পারবেন, তার জন্য বরাদ্দ হবে গদি। আমরাও পাব আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সরকার। আর প্রভুরাও পাবে একজন আজ্ঞাবাহী ভৃত্য।

বিএনপির ফ্র্যাঙ্কেন্সটাইন, বিএনপি নিজেই

bnp-final1

by zainuddin sani

হচ্ছি হচ্ছি করেও বিএনপির কিছু হচ্ছে না। আন্দোলনকে অংকুরে বিনাশের যে স্ট্র্যাটেজি আওয়ামীরা নিয়েছে, তাতে ভালোই কাজ দিচ্ছে। সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব আওয়ামীদের দেয়া ঠিক হবে না। কিছুটা কৃতিত্ব অবশ্য বিএনপিরও। নিজেদের অন্তর্কলহ থেকে শুরু করে নেতৃত্বের থাকা দুই জেনারেশানের একে অপরকে অবিশ্বাস, আওয়ামীদের কাজ আরও সহজ করে দিয়েছে। যেমনটা সাধারণতঃ হয়, অতি আত্মবিশ্বাস পতন ডেকে আনে, তেমনটা সম্ভবতঃ হতে যাচ্ছে, আওয়ামীদের। তাঁরা ভেবে বসে আছে, বিএনপি মাঠে নেই এই তথ্য যত প্রচারিত হবে, বিএনপির জন্য তা ততো ক্ষতিকর হবে। তবে ঘটনা সম্ভবতঃ তেমনটা ঘটছে না।

সহানুভূতি ব্যাপারটা বোধহয় কিছু নিয়ম মেনে চলে। তার একটা হচ্ছে অত্যাচারিতের দিকে ধাবিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বেশি যে ব্যাপারটা কাজ করছে, তা হচ্ছে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে যে তথ্য জনগণ পাচ্ছে, তা এমন একটি ছবি প্রকাশ করছে যে বিএনপি ভয়ানক অত্যাচারের শিকার। তাঁদের নেত্রী একটি সমাবেশ করতে চাইছে, তাঁকে সেটা করতে দেয়া হচ্ছে না। অফিস থেকে বেরোতে চাইছে, তাও দেয়া হচ্ছে না। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে বালু আর খোয়ার ট্রাক এর আগমন সবকিছু মিলিয়ে সহানুভূতি এই মুহূর্তে পুরো মাত্রায় চলে যাচ্ছে বিএনপির ঝুলিতে।

আওয়ামীদের বদান্যতায় কিংবা নির্বুদ্ধিতায় পাওয়া এই সুবিধাগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না বিএনপি। প্রথম সারির নেতারা বেশ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, গ্রেফতার হতে তাঁরা রাজী না। হুমকি ধামকি দিতে বলেন, আমি আছি কিন্তু রাস্তায় মিছিল বের করতে পারব না। কোন সমাবেশে ভাষণ দিতে পারবো না। হরতালের দিনে রাস্তায় থাকতে পারবো না। তাই বলে আমাকে বা আমার চামচাদের কোন কমিটিতে রাখবেন না, তাও করতে দেব না। নতুন কোন নেতাদের আমদানী করবেন, সেটাও বরদাশত করব না। ফলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বিএনপির রাজনীতি পুরোপুরি নেত্রী নির্ভর হয়ে বসে আছে।

প্রথম সারির নেতাদের এই স্বার্থপরতা দৃষ্টিকটু দেখালেও, তাঁদের এই অবস্থানের একটি নিজস্ব যুক্তি তাঁদের কাছে আছে। তাঁরা বেশ ভালো করেই জানেন, বিএনপি এই আন্দোলনে জিতলে, তাঁদের পায়ের তলায় আর কোন মাটি থাকবে না। বিএনপির ক্ষমতায় আরোহণ মানেই লন্ডন প্রবাসী নেতার প্রত্যাবর্তন। আর তিনি ফিরে দলের দ্বায়িত্ব নিলেই যাত্রা শুরু হবে তার নতুন ‘টীমে’র। আর সেই টীমে, পুরনোদের জায়গা হবে না। উপদেষ্টা জাতের কিছু আলংকরিক পদ দেয়া হতে পারে, তবে কর্তৃত্ব বলে কিছু থাকবে না। তাঁদের চোখের সামনেই তাঁদের এলাকায় নতুন আরেকজন নেতার উদয় হবে। দেখতে দেখতে তাঁদের চোখের সামনেই তাঁদের রাজনৈতিক মৃত্যু হবে। ফলে পুরনো নেতাদের এক বিশাল অংশ চাইছেন না, সেকেন্ড ইন কমান্ড দেশে ফিরুক।

এই মুহূর্তে বিএনপি দ্বিতীয় যে সমস্যায় আছে তা হচ্ছে, বিশ্ব ইজতেমা। সেকারণে অবরোধে ছাড় না দিলেও সমস্যা আবার দিলেও সমস্যা। ছাড় না দিলে, বিশাল এক জনতা অভিমান করবে। ভাববে, আমাদের কষ্টের কথা একবারও ভাবল না? আর অবরোধের কারণে যদি তাঁরা যোগ দিতে না পারে, তবে সেই অভিমান নতুন মাত্রা পাবে। দেশের অবস্থা ভেবে অনেকে মেনে নিলেও, সংখ্যায় তাঁরা হবেন বেশ কম। ওদিকে অবরোধে একবার ছাড় দিলে, আন্দোলনে আবার গতি আনা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। হয়তো অসম্ভবও। আর তেমনটা হলে, এই বছরের মত আন্দোলনের ইতি। এরপরের বছর আবার কিছু করবার চেষ্টা করলে, এই বছরের ব্যর্থতা তাঁদের পিছু ছাড়বে না।

এতোসব সমস্যার মধ্যে যুক্ত হয়েছে বিএনপির সমর্থক বুদ্ধিজীবী আর তার্কিকের আকাল। তাঁদের পক্ষ হয়ে লেখার জন্য নেই তেমন কোন কলামিস্ট, টক শো তে গিয়ে তাঁদের হয়ে ঝগড়া করবার জন্য নেই তেমন কোন তার্কিক। সঙ্গে যোগ হয়েছে, বিএনপি পন্থী চ্যানেল আর পত্রিকার অভাব। যাও দুএকটা ছিল, আপাততঃ বন্ধ আর নয়তো কেউই সেসব দেখে না বা পড়ে না। ফলে মিডিয়া ফ্রন্টে তাঁরা তাঁদের কথা, বলতেও পারছে না। আর যাদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে, তাঁদের পারফর্মেন্স বেজায় ভয়ংকর। সঙ্গে যোগ হয়েছে তারেক রহমানের বাণী। দলের কার্যক্রমকে যদিওবা কোন ভাবে ‘ডিফেন্ড’ করছে, ‘রাজাকার’ ইস্যু একেবারেই তাঁদের নাকাল করে ছেড়েছে। পুরনো নেতারা এখন আত্মগোপনে, নতুন নেতারা এখনও ভালো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেননি।

এমন একটা ফাঁকা মাঠ আওয়ামীদের জন্য মজার এক সমস্যা তৈরি করে দিয়েছে। নিশ্চিত জয় দেখতে পেয়ে তাঁরা এই মুহূর্তে খেলার বদলে উল্লাসের দিকেই মনোযোগী হয়ে উঠেছে বেশি। সারাক্ষণ শ্লেষাত্মক কথা, বিএনপি নেত্রীকে অপমান করা, বাকি নেতাদের ‘নেড়িকুত্তা’র মত পিটুনি দিতে চাওয়া, এসবের ভেতরে তাঁরা তাঁদের জয় দেখতে পাচ্ছেন। গায়ের জোরে পাওয়া বিজয়কেই তাঁরা রাজনৈতিক বিজয় ভাবছেন। ভুলে যাচ্ছেন, রাজনীতির খেলায় সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে জনগণের বিবেচনা। তাঁরা কি ভাবছে, সেই ব্যাপারটা মাথায় রাখা। আর বিরোধী দলের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হতে না দেয়া। ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে গিয়ে, তাঁরা বিরোধী দলকে অত্যাচারিত একটি দল হিসেবে জনগণের কাছে উপস্থাপন করে ফেলছে।

এতো কিছুর পরও হয়তো কিছু নাও হতে পারে। বিএনপির যে দৈন্য দশা, হয়তো তাঁরা আন্দোলনে বিফলও হতে পারে। বলা যায়, এদেশের সব আন্দোলনই বিফল। এক ৯৬ ছাড়া বাকী সব আন্দোলনই একটি কাজ করেছিল, আর তা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর কোনটিই হয়তো সফল হত না, যদি না সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলে আগ্রহী হত। তবে ১/১১এর পরে নিজেদের যেভাবে তাঁদের গুটিয়ে নিতে হয়েছে তাতে এই মুহূর্তে তাঁরা তেমনটা আর করবেন বলে মনে হচ্ছে না।

ঘুরে ফিরে বিএনপির এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় বন্ধু হচ্ছে আওয়ামীরা এবং তাঁদের অতি আত্মবিশ্বাস। বিএনপির দৈন্য দশা, বিএনপির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা তাঁদের ইনফর্মাররা, যেভাবে প্রতিনিয়ত বিএনপির আন্দোলনকে ‘স্যাবোটাজ’ করছে আর তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অচিরেই তাঁরা বিএনপির সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুতে পরিণত হতে যাচ্ছেন। আর শত্রু কিংবা বলা যায় ফ্র্যাঙ্কেন্সটাইন হচ্ছে, বিএনপি নিজে। এই নতুন শত্রুর সঙ্গে কিভাবে মোকাবেলা করবে, কিভাবে আন্দোলন এগিয়ে নেবে, সেটাই এখন দেখার ব্যাপার।

দ্যা গ্রেট বিএনপি ফ্লপ শো

bnp-final1

by zainuddin sani

শো টা যে ফ্লপ করবে, কিছুই যে করতে পারবে না, তা কমবেশি সবাই জানতো। তারপরও দলীয় নেতা কর্মীরা টিভি সেটের সামনে বসেছিল। সারকারী অঘোষিত হরতাল না হলেও, মনে হয় না তাঁরা ঢাকায় যেতেন। সাধারণ জনতার যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। অলৌকিকভাবে ‘নুর হোসেন’ জীবিত হলে, সেও নিশ্চিত যেত না। শুধু বিএনপির আন্দোলন না, ‘গনতন্ত্র উদ্ধার’ মার্কা কোন আন্দোলনেই যেত না। নব্বইয়ে একবার উদ্ধার করে শখ মিটে গেছে। তবে রাজনীতি প্রিয় বাঙালির, রাজনীতি নিয়ে কথা বলা হয়তো থামাবে না। রাস্তায় নামবার ভুল এখন আর কেউ করে না। দলবাজি এখন সবাই করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে।

সমর্থক যে নেই, তা কিন্তু না। তবে তাঁরা সব কিছু দেখে, খেলা দেখার মেজাজ নিয়ে। টিভি সেটের সামনে বসে, নিজ নিজ দলের হয়ে উল্লাস করার জন্য। আর সাধারণ জনগণ বসেছিল গত বছরের স্মৃতি রোমন্থন আর ‘যে কোন মুল্যে’র মানে কি তা বোঝার জন্য। মানেটা গাজীপুরের দিনও বুঝেছিল, তবে ভেবেছিল, সেখানকার দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে, একটি লোকাল কারণে, শো ফ্লপ হয়েছিল। এবার ঘটনা ঢাকায়, নেতা কর্মীরাও আছে, বড় বড় হুশিয়ারি আসছে, অতএব এবার কিছু একটা হবে।

বিনোদন দেয়ার আওয়ামীদের ক্ষমতা নিয়ে কারোরই তেমন কোন সন্দেহ ছিল না। শ্লেষ মেশানো কথা বলায় কেউই কম যায় না। তবে বর্তমানে এবিষয়ে আওয়ামীরা একধাপ এগিয়ে আছে। সেসব শোনার পরের দৃশ্য ছিল রাজপথ। পুলিশ আর ছাত্রলীগের ‘ডেডলি কম্বিনেশান’ গাজিপুরের মত এখানেও খেল দেখাবে, তা সবারই জানা ছিল। একেবারে ‘কপি ক্যাট’ হলে দর্শক কমে যাবে দেখে মনোরঞ্জনের নতুন কিছু রসদও রাখা হয়েছিল। মায়া সাহেবের লুঙ্গি কিংবা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ এর সংযোজন হল। সবাই না হলেও অনেকেই এই নিয়ে আশাবাদী ছিল— কিছু নতুন মনোরঞ্জন আসছে।

সেই আশার গুড়ে অচিরেই বালি পড়ল। আওয়ামী নেত্রীর সেই পুরনো ঘ্যানঘ্যান আবার শোনালেন। সঙ্গে নতুন যা ছিল, তা হচ্ছে বিএনপি নেত্রীর নাটকের পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনালেন। এছাড়া আওয়ামীদের তরফ থেকে বড় ধরনের তেমন কোন নতুনত্বের দেখা পাওয়া যায়নি। হয়তোবা তাঁরা দেখাতে চায়ও নি। এক বালুর বস্তা দিয়েই যদি কুপোকাত করা যায়, তবে আর উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখাবার দরকার কি? তারপরও, কিছুটা ছিল।

আগেরবার ছিল বালুর বস্তা, এবার আর বস্তায় বালু ঢোকাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। বালুর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছিল খোয়া, মাটি এসবের ট্রাক আর তাদের ড্রাইভারের মুখে মজার সব গল্প। দরজার তালাটিকেও নতুন সংযোজন বলা যেতে পারে। এবারের সত্যিকারের নতুনত্ব ছিল ‘স্পাই থ্রিলার’। আওয়ামীদের প্ল্যান আগে থেকে জেনে যাচ্ছিল বিএনপি আর বিএনপির প্ল্যান তৈরির সাথে সাথে চলে যাচ্ছিল আওয়ামী নেত্রীর কানে। এই প্লট আর কাউন্টার প্লটের খেলাটা এবার সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য হয়েছে।

বিএনপির তরফ থেকে নতুনত্বের অভাব থাকলেও সময়টা খারাপ কাটেনি। পিকাপ ভ্যানে করে কয়টা কম্বল, কয়টা ম্যাট্রেস আসল, কোন ঘরকে ম্যাডামের বেডরুম বানানো হল, এসব খবর একেবারেই আনকোরা। আসলে সবাই গতবছরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ র সঙ্গে ঘটনা মেলাচ্ছিলেন। ‘ডায়ালগ বাই ডায়ালগ’, ‘সিন বাই সিন’। ম্যাডাম এবার একেবারে হুবহু নকল করেননি। সেবারের তুলনায় এবার একটু মুডে ছিলেন। রাগে গড়গড় করতে করতে সেই ‘গোপালি’ আর ‘তুই তোকারি’ ছেড়ে এবার ‘ক্যান রে ভাই’ এ এসেছেন। কিছুটা হলেও নতুনত্ব।

খেলায় কে জিতল তা নিয়ে আপাতত কিছুদিন ‘টক শো জীবীরা’ গলা ফাটাবেন। দলের নেতারা আসলে দুই ম্যাডামের গুণগানে কিছুদিন কান পাতা দায় হবে। একে অপরকে গালিগালাজও হয়তো করবেন। ‘গনতন্ত্র হত্যা’ ‘রাজাকারদের দোসর’ ‘ট্রেন মিস’ ‘২০১৯’ ‘সংবিধান রক্ষার নির্বাচন’— মোটামুটি এই থাকবে আগামী কিছুদিনের আলোচনার বিষয়। সাংবাদিকরা আসলে সবাই লক্ষ্য রাখবে, কে কোন দিকে ঘেঁসে কথা বলছেন। যদিও সাংবাদিকরাও দল বেছে ফেলেছেন এবং কি কি বলবেন, তাও সবাই জানে। তারপরও হয়তো দেখবেন। দুই দলকেই গালি দিলে আমরাই হয়তো বলব, ‘এই ব্যাটা কিন্তু ধান্ধাবাজ, দুই দিকেই তাল দিচ্ছে’। এরপর হয়তো চ্যানেল পাল্টাবো আর নয়তো ‘জলসা’ না দিলে স্বামীকে খুন করব।

খেলা আরও চলতো কি না, সত্যিকার অর্থে বোঝার উপায় নেই। মিছিলের নাম পাল্টে বিক্ষোভ মিছিল করলেও সেই মিছিল করবার জন্য কেউ আসবে না, তা সবাই জানে। নেতারা টাকা খেয়ে যেভাবে প্ল্যান উগড়ে দিচ্ছেন তাতে মনে হয় না ঢাকা শহরে আর কোন সমাবেশ করতে দিবে। বাকী থাকে হরতাল আর অবরোধ। ভোঁতা এই দুই অস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া তাদের আর তেমন কিছু করারও নেই। সেটাও হয়তো আর দুইদিন ডাকতে পারবে কারণ বিশ্ব ইজতেমার জন্য সেটাও স্থগিত করতে হবে। আর দিন দশেকের গ্যাপ পড়লে, নতুন করে আন্দোলন (এটাকে আন্দোলন না বলতে চাইলে, আমি আপত্তি করবো না) চাঙ্গাও করতে পারবে না। দলের নেতাদেরও সুবিধা। সম্ভবতঃ তাঁরা এটাই চাইছেন। শুধু শুধু আত্মগোপন করতে হবে না, এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।

এই শীতের আন্দোলন সম্ভবতঃ শেষ। কিছু খুচরা চেষ্টা হয়তো হবে। যদি কিছু লাশ পড়ে, তবে হয়তো কিছু মিছিল হবে। বিশ্ব ইজতেমা শেষ হওয়ার পরে হয়তো আবার কিছু অবরোধ আসবে। এবং যথারীতি মার্চের পরে সব কিছু ইতি। বিএনপির নেতারাও হয়তো অপেক্ষায় আছেন, কবে আসবে এপ্রিল। তাদের আর আত্মগোপনে থাকতে হবে না, মাঠে নামতে হবে না। তবে আওয়ামীদের কাছ থেকে পাওয়া মাসোহারায় হয়তো টান পড়তে পারে। আন্দোলনের প্ল্যান জানিয়ে যে আয় তাঁরা করছিলেন, সেই আয় হয়তো আপাততঃ বন্ধ হয়ে যাবে।

‘৭ দফা কি পরাজয়? না পরিকল্পনা?’

by zainuddin sani

দেশের রাজনীতিতে কি হচ্ছে বা কি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সবাই বেশ বিভ্রান্ত। বিএনপির হুমকি ধামকি দেয়া, আর আওয়ামীদের সেসবে কর্ণপাত না করা, ব্যাপারটা অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। সকালের পত্রিকার দুটি অবধারিত শিরোনাম থাকতো দুই দলের কোন না কোন নেতার শ্লেষাত্মক বক্তব্য। কেন যেন ব্যাপারগুলোকে অনেক বেশী রীতি মাফিক মনে হচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল কি হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে— ‘আওয়ামীরা ২০১৯ পর্যন্ত চাইলে নির্বিঘ্নে থাকতে পারবে’। সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণার পরে, সত্যিকারের প্রত্যাশা কারোরই তেমন ছিল না। কমবেশি সবারই ধারণা হয়েছিল, ৫ই জানুয়ারিকে ঘিরে কোন কর্মসূচি এবং সেই কর্মসূচিতে বাঁধা দিলে কি হবে, তার হুমকি সম্বলিত একটি বক্তব্য আসছে। তার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামীরা কি বলবে, তাও সবাই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। পুরোপুরি তেমনটা হল না, সেদিনের ঘটনা, এদেশের রাজনীতির টিপিক্যাল ফর্মুলার ব্যত্যয় ঘটাল।

আপাত দৃষ্টিতে বিএনপি নেত্রীর ৭ দফা তেমন নতুন কিছু না। এতোগুলো দফার ভেতর মুল দফা একটিই। বাকী দফাগুলোর বেশ অনেকগুলোই সাধারনতঃ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই করে থাকে। আর কিছু খুচরা দফা দেয়া হয়েছে, সম্ভবতঃ নেগসিয়েশানের সময় বাদ দিতে রাজী হবার জন্য, সবাইকে বলা যাবে, ‘সমঝোতার খাতিরে আমরা তিনটি দাবী ছেড়ে দিলাম।’ তবে প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হচ্ছে অন্য কারণে, এই সময়ে এসে, এমন নরম অবস্থান কেন? যে দাবী গত ছয় বছরে আওয়ামীরা মানেনি, তাদেরকে আবার নতুন করে সেই দাবীর কথা জানানো কেন?

৭দফাকে বেশ নির্বিষ মনে হলেও, কেন যেন সবাই তেমনটা ভাবছে না। সবাই বেশি করে ভাবছেন, এতো মোলায়েম স্বরে কেন কথা বলছেন বিএনপি নেত্রী? তারচেয়েও বড় কথা, আল্টিমেটাম নেই কেন? দফা না মানলে কি হবে, সে সম্পর্কেও নেই কোন ভবিষ্যৎবাণী। বড় জাতের আরও কিছু প্রশ্ন আছে। যেমন বিএনপির গেম প্ল্যান তাহলে কি? সবাই ভাবছেন এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। আর সেই উদ্দেশ্য কি, তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে চলছে কানাঘুষা। কেউ ভাবছেন, ‘নিশ্চয়ই বিএনপি কোন সিগন্যাল পেয়েছে’।

বোদ্ধা মহলকেও খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। তাঁদের এসব কথা ভাববার যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। আসলে এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পদক্ষেপগুলোকে বেশ পরাজয় বলে ভাবা হয়, তার একটি হচ্ছে দাবী জানানো। বিশেষ করে সেই দাবীর সংখ্যা যদি থাকে একাধিক। আর সেই দাবী পূরণ না হলে, সরকারের কি অবস্থা হবে, সে সম্পর্কে যদি কোন হুশিয়ারি না থাকে, তবে তো অবধারিতভাবে ধরে নেয়া হয়, এই দাবীসমূহের প্রস্তাবকারী হয় সিরিয়াস না কিংবা তাদের তেমন কোন শক্তি নেই।

অন্যদিকে সাহসী পদক্ষেপ ভাবা হয় আন্দোলন কিংবা হুমকিকে। ‘এক দফা এক দাবী’র ও আলাদা একটা দাম আছে। তবে তেমন কিছু একবার বলে ফেললে কিছু একটা করে দেখানো জরুরী। নইলে আবার শুরু হয়ে যাবে অন্য হিসাব। যেমনটা হয়েছিল আওয়ামীদের ‘স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাও আটকাতে পারবে না’ হুমকির পরে। আর ইদানীং কালে, বিএনপি সম্পর্কে।

আন্দোলন করে কোন দাবী আদায়ের রেকর্ড বিএনপির খুব একটা নেই। তবে দাবীতে অনড় থাকবার একটা রেকর্ড ছিল। ফলে আগে যখন হুমকি ধামকি দিলেও সেগুলোকে কিছুটা সিরিয়াসলি নেয়া হত। ভাবা হত, সফল না হলেও, কিছু একটা অন্তত করবে। নিজেদের তৈরি করা ‘গুড উইল’এ সম্প্রতি তাঁরা ফাটল ধরিয়েছে। হুমকির অধিক ব্যবহার এবং কিছু করতে না পারা, তাঁদের দেয়া হুমকি সম্পর্কিত এই ধারণায় কিছু পরিবর্তন এনেছে।

এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফর্মুলা অনুযায়ী ৭ দফাকে নিশ্চিতভাবেই পরাজয় কিংবা পিছু হটা ভাবা যায়। বিশেষ করে গাজীপুরে যেভাবে পিছিয়ে আসলো, তারপরে। ৫ই জানুয়ারীর মত ‘সিম্বোলিক’ দিনে সবাই যেমনটা ভেবেছিলেন, তাঁরা তেমন কিছু করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। এটাও ঠিক, তাঁদের যা সাংগঠনিক অবস্থা, তাঁদের কাছ থেকে ততোটা কেউই প্রত্যাশা করছেন না। আবার এতো নরম কর্মসূচী দিবে, এটাকেও কেউ স্বাভাবিক ঘটনা ভাবতে চাইছেন না। সবার মনে তাই একটি সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, ‘পর্দার আড়ালে কিছু ঘটছে কি না।’

বিএনপি যেভাবে একের পর বিভিন্ন জাতের হুমকি দিয়েও কিছু না করার একটা ট্র্যাডিশান তৈরি করে ফেলেছিল, তাতে কমবেশি সবাই ভাবতে শুরু করেছিল, এই সরকারকে হটাবার ক্ষমতা বিএনপির নেই। আর ইতিহাস বলে, সরকারকে বাধ্য করতে না পারলে, বিরোধী দলের দাবী মেনে নেয়ার মত ঘটনা ঘটে না। আর নরম স্বরে বললে তো নিশ্চিতভাবেই ঘটবে না। এই দাবীর তাই একটি স্বাভাবিক মানে হচ্ছে, হুমকি দিয়ে কিছু না করে নিজেদের ইমেজের যে বারটা বাজিয়েছি, তা আর কন্টিনিউ করতে চাই না। এবার স্বীকার করে নিতে চাই, আমরা অথর্ব। দল হিসেবে, সংগঠন হিসেবে আমরা বেজায় অগোছালো। আন্দোলন করে দাবী আদায়ের ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই এই অনুরোধ ফর্মুলা।

এই স্বাভাবিক ব্যাখ্যার বদলে সবাই কেন যেন অন্য কিছু ভাবছেন। হয়তো ১/১১এর উদাহরণ এর জন্য দায়ী। এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিদেশ নির্ভরতা এর জন্য দায়ী। হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকী কারো কাছ থেকে সমর্থন আদায়ে এই সরকারের ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী। আবার হতে পারে পর্দার আড়ালে এমন কিছু ঘটবার আভাস তাঁরা পেয়েছেন, যা থেকে মনে হয়েছে, এদেশ একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। আর তাই, কঠোর আন্দোলনের পথ ছেড়ে, নরম আর সমঝোতা ধাঁচের পথে হাঁটতে রাজী হয়েছেন, বিএনপি নেত্রী।

ধাঁধা আরও আছে। বিএনপির বেশ কিছু বড় নেতার বক্তব্য থেকে বোঝা গেছে, ৭ দফার এই সিদ্ধান্ত নেত্রীর একক সিদ্ধান্ত। সব দলের সাথে আলাপও করেননি। এমনকি নিজ দলের অনেককেও অন্ধকারে রেখেছিলেন। ঘাড়ের ওপর মামলা, বিভিন্ন আন্দোলনে দলীয় বড় নেতাদের পালিয়ে বেড়ানোর মানসিকতা এমন অনেক ব্যাপারকেও এর কারণ ভাবা যেতে পারে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বড় কারণ হিসেবে সবাই ভাবতে শুরু করেছেন, বিদেশী প্রভুদের ইচ্ছেকে।

৭দফা নিয়ে বোদ্ধা মহলের এই প্রতিক্রিয়া দেখে এই প্রশ্নই সবার মনে জাগছে, কি এমন ঘটল যে ম্যাডাম এরকম ‘সফট’ কর্মসূচী দিলেন। কোন আশ্বাস কি পেয়েছেন? আওয়ামীরা নরম হবে কিংবা এভাবে দাবী জানালে মেনে নেবে— এমন কোন আভাস? ১/১১ এর মত কোন ঘটনার আভাস? আওয়ামীদের ওপর থেকে বিদেশী প্রভুদের আশীর্বাদের হাত তুলে ফেলার আভাস? কিংবা প্রতিবেশী দেশের ওপর অন্য কোন বৃহৎ দেশের চাপ প্রয়োগের আভাস? সম্ভবতঃ আর কিছুদিনের ভেতরেই সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটবে। তখন স্পষ্ট হবে, ‘৭ দফা কি পরাজয়? না পরিকল্পনা?’

বিএনপি কি বোঝে না, সেটাই বোঝে না

bnp-final1

by zainuddin sani  বেশ একটা যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বিএনপি। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই নড়বড়ে দল নিয়ে ভাঙাচোরা একটা আন্দোলন চালাবে? না জনগণকে সম্পৃক্ত করার নতুন কোন প্রচেষ্টা নেবে। জনগণ আশার আলো দেখতে পায়, এমন কিছু করবে। এখন পর্যন্ত তাঁরা যা করেছে, তা ছিল গতবছরের সেই হরতাল আর অবরোধ দিয়ে শীতকাল পার করবার চেষ্টার একটি ব্যর্থ ফটোকপি। সবার মনে তাই প্রশ্ন, এভাবেই চালাবে? না মাথায় নতুন কোন প্ল্যানিং আছে? প্রশ্ন অবশ্য আরও একটা আছে, নতুন কিছু করবার মতো মেধা কিংবা ক্ষমতা তাঁদের আদৌ আছে কি না? ছাত্র সংগঠন কিংবা দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব বলে তাঁদের কিছু আছে কি না? কিছু উত্তর দেশবাসী পেয়ে গেছে, বাকীটা সম্ভবতঃ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

বিগত কিছুদিনের কার্যক্রমে আন্দোলনে কিছুটা গতি এসেছিল। আর সেকারণে, অনেকেই গাজীপুরের দিকে তাকিয়েছিল। তবে ২৭শে কি হবে, এই নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য উৎসাহ জাগানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারেনি বিএনপি। এভাবে পিছু হটবে, সম্ভবতঃ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও ভাবেনি। ফখরুল সাহেবের হুমকি যে সিরিয়াসলি নেয়াড় মত কোন জিনিস না, তা দেশবাসী বুঝে গেছে। যতটুকু যা আস্থা ছিল, তা ছিল বিএনপি নেত্রীর প্রতি। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি তাঁর সেই পুরনো মূর্তিতে ফিরে আসছেন। যেভাবে তিনি মাঠে নেমেছিলেন, একের পড় এক সমাবেশ করছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল, এবার আর বালির বস্তা দিয়ে আটকানো যাবে না।

ভুল ভাঙতে সময় লাগল না। আন্দোলন থামাতে এবার বালির বস্তাও লাগলো না। বাহ্যিকভাবে যদিও মনে হচ্ছে ১৪৪ ধারা আর ছাত্রলীগের ‘নেড়ি কুত্তা’ হুমকিই খেল দেখাল। তবে ভেতরের খবর আরও করুণ। গাজীপুরের নেতাদের ‘অসম সাহস(?)’ আর দলীয় কোন্দল এবার আওয়ামীদের কাজ সহজ করে দিয়েছে। বালির বস্তা আনবার খরচ বাঁচিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে বক্সী বাজারের ‘নেড়ি কুত্তা’র ইফেক্টও কাজে দিয়েছে। দল হিসেবে বিএনপির তেমন কোন সম্মানজনক অবস্থান না থাকলেও, বিএনপি নেত্রীর ছিল। সেই দৃঢ় ইমেজে এবার বেশ বড়সড় ধাক্কা লাগলো।

দল হিসেবে বিএনপির এই অসম্মানজনক অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি। পুরো আওয়ামী আমলটাতেই, সরকার বিরোধী আন্দোলনে, বিএনপির ‘পারফর্মেন্স’ ছিল বেজায় হতাশাজনক। প্রথম আওয়ামী আমলে তেমন কোন আন্দোলন কিংবা সাফল্য না থাকলেও তাঁদের সমস্যা এতো প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি। সেই অসফল আন্দোলন তেমনভাবে কারো চোখেও পড়েনি আর তাতে তেমন কোন সমস্যাও হয়নি, কারণ পরবর্তী নির্বাচনে জয় এসেছিল। সেই যাত্রা পার পেয়ে গেলেও দুর্বলতাটা থেকেই গিয়েছিল। এবারের আন্দোলনেও তাঁরা তেমন কোন নতুনত্ব আনতে পারেনি। যা করেছে, তা হচ্ছে আওয়ামীদের আন্দোলনের ফটোকপি। সেই হরতাল, অবরোধ, ভাংচুর আর জ্বালাও পোড়াও। হরতালের বাজারদর কমে যাওয়া আর ভাংচুর এবং পেট্রোল বোমায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু, এবার সমস্যায় ফেলেছে বিএনপিকে।

হরতালের বদলে দেয়ার মত হাতে তেমন নতুন কোন কর্মসূচিও নেই। মানব বন্ধন কিছু দিয়েছিল, তবে সেখানে তেমন কোন গ্ল্যামার নেই, ওটা অনেকটা সুশীল সমাজ সুশীল সমাজ ভাব এনে দেয়। খুব ভালো কাভারেজও জোটে না, ফলে সেই লাইনে এগিয়েও খুব বেশি সাফল্য আসেনি। সমাবেশের নাম পাল্টে, বিক্ষোভ সমাবেশ করেও তেমন কোন লাভ হয়েছি কিনা সন্দেহ। ফলে ঘুরে ফিরে সেই হরতাল আর মিছিল। আর অতি ব্যবহারে এই মহার্ঘ অস্ত্রের প্রতি জনগণ আর দলীয় কর্মীদের মধ্যে এসেছে এক বেশ দায়সারা ভাব। হরতালের এই কর্মক্ষমতা হারানো আর বিকল্প কিছু না পাওয়া, সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে বিএনপিকে।

চিন্তার দৈন্যতার চরম প্রকাশ করলেন বিএনপির জনৈক নেতা। আওয়ামীদের ‘লগি-বৈঠা’ নকল করে ‘দা-কাস্তে’ বলে বেশ বড়সড় ঝামেলা বাঁধালেন। এরপরে বেশ কিছুদিন তিনি লাপাত্তা হয়ে থাকলেন। বিএনপির নেতারা, ‘নিজস্ব মতামত’ বলে দূরত্ব তৈরি করলেন। ঢাকা মহানগরে আগে থেকেই দলীয় কোন্দল ছিল, সেখানে কিছু হাওয়া লাগলো। খোকা সাহেবকে কোণঠাসা করবার এই সুযোগ, অন্য পক্ষ হাতছাড়া করল না। পুরো ঘটনার সারাংশ যা দাঁড়াল, তা হচ্ছে, দলীয় কোন্দলের সাথে সাথে বিএনপির চিন্তার দৈন্যতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠল।

এদেশে আন্দোলন করবার সময় হচ্ছে এই শুষ্ক মৌসুমটা। হাতে আছে আর বড়জোর তিনমাস। এই সময়ের ভিতর বিএনপি কিছু করতেন না পারলে পিছিয়ে যাবে এক বছর। কারো কারো মতে পুরো চার বছর। যত সময় যাচ্ছে, ততোই প্রশ্ন জাগছে, এই শীতকালে কিছু করতে বিএনপি কি পারবে? কিছুদিন আগের ‘কতোটা সফল হবে’ থেকে আলাপ আলোচনা সেই প্রথম ধাপেই ফিরে এসেছে ‘বিএনপি আদৌ কিছু করতে পারবে কি না?’ ২৭ তারিখের পরে, এই উত্তর কমবেশি এখন সবাই জানে। টক শো আর বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় বেশ অনেক বুদ্ধিজীবীই এখন ভবিষ্যৎ করনীয় নিয়ে উপদেশ দেয়া শুরু করেছেন। আসলে বিভিন্ন ভাবে বলার চেষ্টা করেছেন, এভাবে হবে না। হয়তো বিএনপি নিজেও জানে, তাঁদের কিছু করার ক্ষমতা নাই। তবে যেটা জানে না, তা হচ্ছে, এর কারণ।

একথা ঠিক যে আওয়ামীদের এমন কোন জনপ্রিয়তা এখন নেই। ৫ই জানুয়ারী নির্বাচনকে প্রথমে বেশ কিছুদিন সফল নির্বাচন বলে চালানোর চেষ্টা করলেও সম্প্রতি তাঁরা সুর পাল্টেছে। এখন তাঁরা সেই গণতন্ত্র হত্যাকে সাংবিধানিক বাধ্য বাধকতা বলে চালানোর চেষ্টা শুরু করছেন। ভাষার এই পরিবর্তন থেকে হয়তো কিছুদিন আগেও বিএনপির মনে আশা জেগেছিল, হয়তো ভাবছিল, আন্দোলন ভালমত করতে পারলে, কপালে শীকে ছিঁড়তে পারে। এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না আর বোদ্ধা মহলও বলছেন, বিএনপির যে সাংগঠনিক অবস্থা আর দলীয় কোন্দল, তাঁদের দিয়ে তেমন কোন আন্দোলন সংগঠিত হওয়া সম্ভব না।

এর আগের বিভিন্ন সরকার বিরোধী আন্দোলনে, সাধারণ জনতা, হয় নিজেই মাঠে নেমেছিল আর নয়তো মৌন সম্মতি দিয়েছিল। এবার দুটোর কোনটাই ঘটছে না। পুরো আন্দোলনকে তাঁরা দেখছে, দুই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার কামড়াকামড়ি হিসেবে। চর দখলের এই প্রতিযোগিতায় কেউই অংশ নিতে রাজী না। আন্দোলন করে, আওয়ামীদের গদি থেকে নামাবার পরে কি? কি পাবে তাঁরা? এই উত্তরে জনগণ দেখতে পাচ্ছে সেই একই হতাশা। আরেকটি স্বৈরাচারী সরকার, শুধু নেত্রীর নাম পরিবর্তন।

জনগণকে যদি পাশে পেতে চায়, বিএনপিকে প্রথমে বুঝতে হবে, জনগণ কি চায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁদের নেতার অবস্থান মুখস্থ করানো নিয়ে জনগণ বেজায় বীতশ্রদ্ধ। প্রয়াত নেতাদের পূজা করা এবং জনগণকে সেই পূজা করতে বাধ্য করার এই প্রবণতার একটি ইতি টানবার চেষ্টা তাঁরা দেখতে চায়। ছাত্র সংগঠনের উদ্দাম অস্ত্র নৃত্য কিংবা দুর্নীতির কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি চায়। ক্ষমতায় গেলে করব, এই ফর্মুলা থেকে বেড়িয়ে এসে, এখনই কিছু করার প্রচেষ্টা দেখতে চায়। ‘ওদের আমলে কি হয়েছে?’ এই যুক্তিতে নিজেদের অন্যায় চালিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতার অবসান দেখতে চায়।

অলৌকিক কিছু না ঘটলে, এই সাংগঠনিক অবস্থানিয়ে বিএনপির পক্ষে সফল কোন আন্দোলন করা সম্ভব না। এই তথ্যটা বিএনপি বুঝে গেছে। তবে যেটা বোঝেনি, তা হচ্ছে, কেন তাঁদের এই অবস্থা। জনগণের আকাঙ্ক্ষা বোঝার যে অক্ষমতা আওয়ামীদের ভেতর এখন কাজ করছে, তা তাঁদের ভেতরেও কাজ করছে। গদি থেকে আওয়ামীদের সরিয়ে বিএনপিকে বসাতে কেউই আগ্রহী না। স্বৈরতান্ত্রিক ফরম্যাটের সরকারের শুধু নেত্রী পরিবর্তনের জন্য কোন জনগণই মাঠে নামবে না। বিএনপির কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা জনগণের এই সরল প্রত্যাশাটা এখনও বোঝেনি। বিএনপির এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তাঁরা কি বোঝেনা, সেটাই বোঝেনা।

বাঙলা ভাষার দুর্বলতা ?

By Shibly Azad

এক,

বাংলা ভাষা দুর্বল, তার চিন্তাশক্তি নেই, তার শব্দসম্ভার কম, তার ফ্ল্যেক্সিবিলিটি নেই, বাংলাতে লিখতে গেলে টেকনিক্যাল বা পরিভাষা পাওয়া যায়না, এমনতর অভিযোগ বহু পুরনো, এবং ক্ষেত্র বিশেষে, এ ধরণের আক্ষেপ সঠিক ও বাস্তব হলেও সামগ্রিক বিচারে এসব অভিযোগ ঠুনকো অজুহাত মাত্র। এসকল অভিযোগ বা বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে, বাংলা ভাষাটাই দায়ী; এর অর্থ হল, বর্তমান সময়ে বরং এই ভাষা ব্যাবহারকারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষার প্রায়োগিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কিছু সমস্যা রয়েছে, ভাষার নয়, যে সমস্যা আবার জনগোষ্ঠী হিশেব তাদের সাম্প্রতিক ম্যাটেরিয়াল জীবনের দৈন্য নির্দেশ করে। বাংলা ভাষা নিজে কোন সমস্যা নয়, যদি এমন হত যে বাংলাভাষীরা খুবই প্রতিভাবান, ফুটন্ত মেধার কারণে ছটফট করছে, কিন্ত দুর্বল বাংলা ভাষার জন্য তারা ভাব প্রকাশ করতে পারছে না, সেক্ষেত্রে বাংলাভাষীরা অন্তত ইংরেজিতে লেখে দুনিয়া কাঁপাতে পারতো, যেহেতু, শিক্ষিত সকল বাংলাভাষী কমবেশী ইংরেজি জানেন। কিন্ত, সেটাওতো হচ্ছে না। এ কথা সতঃসিদ্ধ যে, উন্নত জনগোষ্ঠীর ভাষা উন্নত হতে বাধ্য, মানব ইতিহাসের কোন কালপর্বে এমন ঘটনা ঘটেনি যে, ভীষণ উন্নত একটি জাতির ভাষা অনুন্নত ছিল, বা আছে। ইতিহাসের সকল কালপর্বে, বিশ্বকে নেতৃত্বদানকারী সকল জাতির ভাষা ছিল তার সময়ের সবচেয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধতম ভাষা; যে জাতি যখন যত উন্নত, তার ভাষাও তখন তত উন্নত। এর কোন ব্যাত্যয় নেই।

দুই,

মনে রাখতে হবে, ভাষা আপনা আপনি তৈরি হয় না, উন্নত ভাব প্রকাশের বাহন হয় না; একটি ভাষা উন্নত হয় ঐ ভাষা ব্যাবহারকারীদের জন্যে। ইংরেজি বা অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষা আজ উন্নত (যেমন অতীতে ছিল গ্রীক, ল্যাটিন, সংস্কৃত, ম্যান্ডারিন, বা নিকট অতীতে আরবী, ফার্সি, কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে উর্দু), যেহেতু হাজার বছর ধরে এই ভাষাগুলোর ব্যাবহারকারীরা, এবং এসব জনগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানেরা এসকল ভাষাকে তাদের ভাব প্রকাশের বাহন হিশেবে ব্যাবহার করেছেন এবং এখনো করছেন। ফলে, বিচিত্র লঘুগুরু ভাব প্রকাশের জন্য এসকল ভাষা যথার্থভাবে বিকশিত হয়েছে। নিজস্ব সামাজিক বিকাশের দুর্বলতার জন্য, বাংলার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই ইংরেজি নির্ভর; সবচে বড় কথা, অন্যান্য জাতির মত নিজ জনগোষ্ঠীর এই দুর্বলতাকে ওভরকাম করার কোন সচেতন প্রয়াসও তারমধ্যে নেই; এই প্রচেষ্টাহীনতা, আমার মতে, এই জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য; যা হবার হবে, যেভাবে চলছে চলুক, আমার কী আসে যায়, এমনতর মানসিকতার জনগোষ্ঠী বাঙ্গালীর মত আর দুটি নেই এই দুনিয়াতে।

তিন,

বাংলা দুর্বল ভাষা, এ ধারণা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে বোধশক্তিহীন অর্বাচীনের বক্তব্য; সমস্য হল, গত পঞ্চাশ বছর ধরে বাঙলাভাষী এলিটরা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকে ভাষার দোষ বলে বিশ্বাস করা শুরু করেছে। যদি বাঙলা গদ্যের খবর নেই, বিশেষ করে এর বুদ্ধিবৃত্তিক ও তাত্ত্বিক লেখাজোখার, তবে মনে রাখতে হবে, এই ভাষায়, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরকালে, গত কয়েক দশকে সুকুমারী ভট্টাচার্য, অশীন দাশগুপ্ত, রণজিৎ গুহ, সুমিত সরকার, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, দীপেশ চক্রবর্তী, আদিত্য মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম চক্রবর্তী, পল্লব দাশগুপ্ত, অমল বন্দোপাধ্যায়, অমিয় বাগচী, কৌশিক বসু, প্রমুখ গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন এবং করছেন; এরা সকলেই বিশ্ববিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, সেসকল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন, কিংবা এখনো পড়ান; এবং ইংরেজিতে লিখেই তাত্ত্বিক হিশবেই প্রথমে তারা জগতবিখ্যাত হয়েছেন।

একই কথা বলা চলে এঁদের পূর্বসূরিদের সম্পর্কে; অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে, উনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও বাংলায় প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র লিখেছেন এমন অনেক প্রতিভা ছিলেন বিশ্বমাপের। অনেক অনেক নামের ভিড়ের মধ্যে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, ব্রজেন শীল, বিনয়কুমার সরকার, ক্ষিতিমোহন সেন, হরিদাস ভট্টাচার্য, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন সরকার, শঙ্করী প্রসাদ বসু, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, হুমায়ন কবির, বিমল কৃষ্ণমতিলালের মত আরও কয়েক ডজন নাম নেয়া যায়, যারা সবাই তাদের তীক্ষ্ণ মেধার জন্যে এবং নিজ নিজ বিষয়ে মৌলিক গবেষণামুলক অবদান রাখার জন্যে আন্তরজাতিক ভাবে খ্যাত। অর্থাৎ, ভাষার সমস্যা নেই, বাঙলাতে যেকোনো জটিল তাত্ত্বিক আলোচনা সম্ভব। এখন শুধু প্রয়োজন নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক ডিসক্যার্সিভ বাংলা গদ্য লেখার ধারাক্রম তৈরি করা ও সেই ধারাকে বলবান করার জন্য বাংলায় বিষয়ভিত্তিক প্রফেশনাল জার্নাল বের করা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা লিখবেন নিজেদের তাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের জন্য। যত বেশি বেশি লেখা হবে, ভাষা তত বেশি বিকশিত হবে।

চার,

পরিভাষার সমস্য? প্রশ্ন হল, পরিভাষা তৈরির প্রয়োজনীয়তা কী ? আর সেটা করবেই বা কে? তার সার্বজনীন গ্রহনযোগ্যতা দেবে কে ? ফ্রান্সের একাদেমি ঐতিহাসিক ভাবে একাজ করে এসেছে, ফরাসি ভাষার জন্য; ফরাসি ইতিহাসের জগতবিখ্যাত ব্যাক্তিরা এই কাজে ব্যাপৃত ছিলেন বলে ওই অ্যাকাদেমির গ্র্যাহ্যতা ছিল এবং ফরাসি ভাষা রেগুলেট করতে তারা সফল হয়েছিল। অর্থাৎ, যোগ্যতা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ের কারনে ওই আকাদেমি সফল হলেও, বাংলায় তা ব্যর্থ হয়েছে ঠিক এই দুই গুনের অনুপস্থিথির কারনে। অপদার্থ আর মূর্খের আস্তানা বাংলাদেশের বাংলা একাদেমি। পশ্চিম বঙ্গের বাংলা একাদেমি বিখ্যাত তার রাবীন্দ্রিক গদাইলস্করী চালের জন্য; আর বাংলাদেশেরটা তাদের আকাশচারী গণ্ডমূর্খতার জন্য। এতএব, এদের কাজের কোন সার্বজনীন গ্রহনযোগ্যতা আগে যেমন ছিলনা, আজও তেমনি নেই, এবং ভবিষ্যতেও যে থাকবে না, তা হলফ করে বলা যায়; কেননা, সুশিক্ষিত লোকেরা এসকল সরকারী নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে আসবে না, আসতে পারবে না, বা সহজ করে বললে, তাদের আসতে দেয়া হবে না। সেটাই ভাল, এতে বাংলা ভাষা রেগুলেশনের জঞ্জাল আর আপদ মুক্ত থাকলো।

তো কী করবে বাংলা ভাষা? উত্তর খুবই সোজা—সে চলবে তার আপন স্বভাবে। ইংরেজি ভাষার বৈশিস্ট্য হোল অন্য ভাষার শব্দ দ্রুত আত্তীকরন করা, বাংলা ভাষাও তা করে থাকে, তবে ইংরেজির মত অতো দ্রুত নয়; বেচারার হজম শক্তি একটু দুর্বল, তাই একটু সময় নেয়, তবে সবই হজম করে ফেলে, সর্বভুক এই ভাষা। কে আজ খবর রাখে যে, স্বয়ং “খবর” শব্দের উৎপত্তি আরবী, বা “কলম” কিংবা “বই” আদতে আরবী শব্দ? “দাদা-নানা” তুর্কী ? গরমের দিনে ফালুদা খান? আর শীতে গরম গরম ফিরনী ? তবে জেনে রাখুন, “ফালুদা” ফার্সি আর “ফিরনী” তুর্কী শব্দ; খানাপিনার (কী সুন্দর উর্দু–ফার্সির যুগলবন্দী) কথাই যখন এলো, তখন যেনে নেয়া ভাল যে, আজকাল অনেকই প্রগতির আশায় কিংবা নিরেট আমোদ করার জন্যে ইংরেজির আশ্রয় নিয়ে একটু-আধটু “ড্রিঙ্ক” করে থাকেন, হোক সে দেশী ধেন্যু কিংবা বিলাতী হুইস্কী। আবার দেখুন, ছোট ভাইয়ের সাথে মারামারীতে পারছেন না, আব্বাকে ডাকবেন ? আরে বাবা, “আব্বা” শব্দটাতো হিব্রু!

বলাবাহুল্য, বাংলা ভাষার দশ শতাংশ শব্দ এভাবেই বিদেশী ভাষা থেকে এসেছে, তো আরো আসতে অসুবিধা কী? আসলে সমস্যাটা আমাদের, যে সমস্যাটা আসলে কৃত্তিমঃ দৈনন্দিন জীবনে মুখের কথায় আমরা প্রচুর সমসাময়িক ইংরেজি শব্দ ব্যাবহার করলেও, লেখার সময় থাকি কুণ্ঠিত; যদিও, অনেক পুরনো আত্তীকৃত শব্দ না জেনে ব্যবহারে আমাদের কোনই আপত্তি নেই। ভাষার ছুঁচিবায়ুগ্রস্ততা মুলত গণ্ডমূর্খতা, এটা কুপমন্ডুকতার আরেক নাম। যা করণীয়, তা হোল কাণ্ডজ্ঞান বজায় রাখা, এবং যে শব্দই প্রয়োজন, তা চোখ-কান বুঝে বাংলাতে ব্যাবহার করা, হোক সে যেকোনো ভাষার শব্দ। উচ্চশিক্ষায় এক্ষেত্রে ইংরেজি টেকনিক্যাল টার্ম বা শব্দগুলো যথা সম্ভব আত্তীকরণ করে বাংলা হরফে লিখে নিলেই চলবে; বহুল ব্যবহারে, ধীরে ধীরে সেসকল শব্দের পরিচিতি লাভ ঘটবে; একটু সময় লাগবে, কিন্তু, হবে। আরেকটা কথা, উচ্চশিক্ষার টেকনিক্যাল শব্দ শুধু ঐ বিষয়ের ছাত্রশিক্ষক আর পেশাজীবীদের প্রয়োজন, আমজনতার সেসব শব্দ বোঝার প্রয়োজন নেই (যদি না সে সে বিষয় শিখতে চায়) বলে উচ্চশিক্ষার টেকনিক্যাল শব্দের অতিসরলীকরণ অপ্রয়োজনীয়।

পাচ,

বাঙালীর বাংলা ভাষা ব্যবহার করার প্রবণতার তুলানায় মার্কিনীদের ইংরেজি ভাষার ভাংচুর করার প্রবণতা তফাত করতে গিয়ে বিবেকানন্দ বলেছিলেন যে, জ্যান্ত মানুষের ভাষা হয় জ্যান্ত; বিবেকানন্দের মতে, মার্কিনীরা জ্যান্ত, বাঙালীরা মরা। বিবেকানন্দকে ধার করে আমিও বলি, আজকের দিনে অনেকের আধুনিক গদ্যের বাংলা মৃতবৎ এ জন্য যে, বাংলাভাষী অধিকাংশই আসলে মনের জগতে এক একজন মৃত সত্ত্বা; মড়ার ভাষা তো আড়ষ্ট হবেই।

ছয়,

বাংলা ভাষায় চিন্তাচর্চার বাধ তখনই ভাঙ্গবে যখন ইংরেজি, ফরাসি, বা জার্মানের মত এই ভাষায় চিন্তাচর্চার বানিজ্যিকরন হবে। ঘাবড়াবেন না। চিন্তার বানিজ্যিকরন মানে নোটবইয়ের বন্যা বা কোচিং সেন্টারের প্রাদুর্ভাব না, এর মানে লেখাপড়ায় প্রফেশনালিসমের বিকাশ—ব্যাপক পড়াশোনা, গবেষণা, চিন্তাভাবনা, জর্নলে গবেষণা প্রবন্ধ ছাপানো, আর বই লেখা, যার ইনকাম দিয়ে একজন লেখক জীবন ধারন করে থাকে এবং পাঠক সে লেখা পড়ে জানে, বুঝে, শিখে। ভাবুক, কবি, বা লেখক না খেয়ে কষ্ট করবে, বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে, তার সংসার উচ্ছনে যাবে, তার স্ত্রী-সন্তানরা পথে বসবে, আর আমরা উহু আহা করব, আর আলু-ফালুরা সমাজ চালাবে, এই চিন্তাটা অস্বাভাবিক, অপ্রাকৃতিক, ও মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ। সব উন্নত দেশেই ভাল লেখকরা বই লিখে প্রচুর ইনকাম করেন; প্রকাশক আগাম টাকা দেন, ছয়-সাত ডিজিটে, যা সারা জীবনের জন্য জীবন ধারণের পক্ষে যথেষ্ট; এজন্য, এরা কয়েক বছর ধরে গবেষণা করে তারপর লেখেন এবং এজন্য এদের প্রতিটা লেখাই অসাধারণ । বছরে ১৪/১৫ টি বই লিখতে হলে, আর যাই হোক, মান রক্ষা হয় না, বরং দাউদকান্দীর মলমের মত একটা কিছু হয়, সাময়িক তৃপ্তি হলেও তাতে চূড়ান্ত তৃষ্ণা মেটে না, বা কাজও উদ্ধার হয় না। তেমনি, সকল, বিশেষ করে, বেশী সফল অধ্যাপকেরাও, বই লিখে বিপুল উপার্জন করতে সক্ষম বলেই নিবিষ্টমনে গভীর ও ব্যাপক গবেষণায় তারা জীবন পার করতে পারেন।

এ ব্যাপারে একটু ব্যাক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সকল শিক্ষকই ইউনিভারসিটির বেতন ছাড়াও যে টাকা রয়্যালটি থেকে পেতেন, তার পরিমাণ শুনলে আক্ষরিক অর্থেই চোখ গাছে উঠবে। আমার সরাসরি দুই শিক্ষক নোবেল প্রাইজ পাবার আগেই বছরে ৫/৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী করে কামাতেন; এদের একজন, জোসেফ স্টিগল্টীযকে ২০০১ সালে বিশ্বখ্যাত পাবলিশার নর্টন কয়েক মিলিয়ন ডলার আগাম দেয়, গ্লোবালাইজেশন নিয়ে তিন খণ্ডে বই লেখার জন্য। তার তিন খণ্ডের সেই বই (Globalization and Its Discontent, The Roaring Nineties, and Making Globalization Work) আজ ক্ল্যাসিক বলে গন্য। টাকা যেখানে আছে, সেখানে ধীরে হলেও, কোয়ালিটি আসতে বাধ্য; পয়সা দিয়ে কেউ বাজে জিনিষ নেয় না; আর বারবারতো ভুষিমাল দিয়ে সবাইকে বোকা বানানো সম্ভব না। অর্থাৎ, লেখাটাও হতে হবে পুজির নিয়ম মেনে, পুঁজিবাদের নিয়মই হোল প্রতিযোগিতা, শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা, কেননা শ্রেষ্ঠরাই টিকে থাকে বাজারে; অতএব, সেটাই কাম্য বাঙলার ক্ষেত্রেও। বাঙলীরা মানবরীতির বাইরে নয়, বাংলাভাষাকেন্দ্রিক সাহিত্য, ফিকশন কী নন-ফিকশন, লঘু কী গুরু, তাই পুজির বাইরে থাকতে পারে না।

সাত,

আবারও বিবেকানন্দঃ জ্যান্ত মানুষের ভাষা হয় জ্যান্ত; বাঙলাভাষী, তুমি কী জ্যান্ত ?

সেনা অভ্যুত্থানঃ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র প্রেক্ষাপট

আজ ১৯ আগস্ট । রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অগাস্টাস (যার নামে ইংরেজী অগাস্ট মাসের নামকরণ করা হয়েছে) এর ২০০০তম মৃত্যুবার্ষিকী । তিনি জুলিয়াস সিজার পরবর্তী বিশৃঙ্খল অবস্থায় প্রথমবার পাক্স রোমানা (শান্তিপূর্ণ রোম) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সম্রাট নামে নিজেকে ঘোষণা না দিয়ে প্রিন্সেপস্ সিভিতাতিস (রাষ্ট্রের প্রথম নাগরিক) হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন । ধারণা করা হয় নিজ স্ত্রী লিভিয়ার প্রয়োগ করা বিষপানে তিনি ১৪ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান । তবে অগাস্টাসের মৃত্যুবার্ষিকী স্বরণ করা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয় । আজকের দিন আরো একটি ঐতিহাসিক এবং শিক্ষণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে । ১৯৫৩ সালে ঠিক এই দিনে (১৯ আগস্ট) ইরানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন । তার এই পতনে সরাসরি জড়িত ছিলো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (অপারেশন অ্যাজাক্স) এবং বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স (অপারেশন বুট) । ব্রিটেনের একটি কোম্পানী দীর্ঘদিন ইরানের তেল সম্পদ কুক্ষিগত করে নিজেদের পকেট ভরেছে । কিন্তু মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের কর্মকান্ডের হিসাব চাইলেন তারা সহায়তা করতে অস্বীকার করলো । এরপর মোসাদ্দেগ সরকার ইরানের সকল প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রিয় মালিকানায় নিয়ে যাবার পর ব্রিটেন এবং আমেরিকা তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয় । এই অভ্যুত্থান নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে দেখা যায় কিভাবে দেশের প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি এবং পেশাজীবিরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে রাতারাতি বিদেশী শক্তিকে দেশের ভার তুলে দেয় । সেই সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় একটি সেনাবাহিনী কিভাবে ক্ষমতা কাড়াকাড়ি করার অভ্যুত্থানে হঠাৎ বীরত্ব দেখাতে থাকে এটাও পরিষ্কার হবে । এই লেখায় মুসলিম বিশ্বের সেনা অভ্যত্থান গুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা থাকবে ।

ইদানীংকালে মিশরের সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টি বেশ আলোচনায় এসেছে । পাকিস্তান, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি দেশগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছে শুধুমাত্র পর্যায়ক্রমিক সেনাশাসনের কারনে । এখন তিউনিসিয়া অথবা তুরস্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও মুসলিম বিশ্বে- বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের মাঝে ব্যাপক উৎকন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । মিশরের ২০১৩ সেনা অভ্যুত্থান না হলে হয়তো ফিলিস্তিনে ২০১৪ গণহত্যা এড়ানো যেতো । আবার তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগানের বিরুদ্ধে যেভাবে সকল শক্তি একজোট হয়েছে, তিনি কতোদিন সেনা অভ্যুত্থানের হুমকি মোকাবেলা করে টিকে থাকতে পারবেন সেটাও ক্যালকুলেশন করা দরকার আছে । এসব বিষয় বিবেচনা করেই সেনা অভ্যুত্থান পর্ব অধ্যয়ন করা প্রয়োজন মনে করেছি ।

প্রথমেই বলে নেয়া যাক সেনা অভ্যুত্থানের সংজ্ঞা কি । ফরাসি coup d’état শব্দটির অর্থ হচ্ছে কোন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত সরকার বা শুধুমাত্র সরকার প্রধানের পদচ্যুতি ঘটানোর চেষ্টা । একটি মিলিটারী ক্যু তখনই সফল বলে ধরে নেয়া যাবে যখন সাবেক সরকারপ্রধান পদত্যাগের বাধ্য হবেন বা নিহত হবেন । তবে মিলিটারীর পাশাপাশি অভিজাত সম্প্রদায় বা সুশীল সমাজেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে । পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা রয়েছে । জুলিয়াস সিজার থেকে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট পর্যন্ত অনেক প্রভাবশালী শাসক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহন করেছিলেন । তবে অধিকাংশ সময়েই সেনা অভ্যুত্থান রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়েছে । যাইহোক, আমাদের আলোচনা মুসলিম বিশ্বে সীমিত থাকবে ।

মুসলিম বিশ্বে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯০৮ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সময় । তিনি ছিলেন শেষ অটোমান সুলতান এবং ইসলামী খিলাফতের ৯৯তম শাসক । ইয়ং তুর্কি মুভমেন্ট নামে একটি অভ্যুত্থানে তিনি ১৯০৯ সালে পদত্যাগে বাধ্য হন । এরপর আরো কিছুদিন কয়েকজন নামমাত্র সুলতানের অধীনে থেকে ১৯২৪ সালে খিলাফত সমাপ্ত হয় । এরমধ্যে আতার্তুক কামাল পাশা আধুনিক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন ১৯২৩ সালে । অন্যদিকে পারস্য সাম্রাজ্যে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রেজা খান পাহলভী ক্ষমতায় আসেন ১৯২১ সালে । এই দুইজনের অধীনে শিয়া এবং সুন্নী অধ্যুষিত অঞ্চল সমূহে সেনা অভ্যুত্থানের সূচনা হয় । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে ইরাকে জেনারেল বকর সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি সেনা অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী ইয়াসিন আল হাশিমী পদচ্যুত হন । তিনি সিরিয়ায় পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন । পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে চারজন কর্ণেলের নেতৃত্বে গোল্ডেন স্কয়ার নামে ইরাকি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের একটি দল ইরাকে অভ্যুত্থান করে । এতে নাৎসি জার্মানীর অনুসারী রশিদ আলী গিলানী ক্ষমতায় আসেন এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত শাহানশাহ জর্ডানে পালিয়ে যান । রাজতন্ত্র বিলুপ্তির জন্য ১৯৪৮ সালে ইয়েমেনে একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় ।

পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থান হয় সিরিয়ায় ১৯৪৯ সালে । ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাঈল যুদ্ধে পরাজিত হয়ে জেনারেল হোসনী আল জাইম সিরিয়ায় প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন কায়েম করেন । এই অভ্যুত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট মদদ পরিলক্ষিত হয় । ক্ষমতায় এসে জেনারেল হোসনী আল জাইম মহিলাদের বোরখা নিষিদ্ধ করেন । ইসরাঈলের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন । ইসরাঈলের সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় ফিলিস্তিনি উদ্ধাস্তুদের জন্য সিরিয়ায় বসতি করে দেন । মাত্র সাড়ে চারমাস পর এই সেক্যুলার জেনারেল তারই সহকর্মী সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত এবং বন্দি হন । একমাসের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয় । পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থানের ইতিহাস আমাদের ভারতবর্ষে । ভারত পাকিস্তান পৃথক হবার পরপর কাশ্মীরে ১৯৪৭ সালে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যুদ্ধ হয় । এখানে পাকিস্তানি সৈন্যরা যুদ্ধ করে পুরো কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছিল । যুদ্ধের মাঝামাঝি অবস্থায় ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সরকার ভারতের সাথে যুদ্ধবিরতি ঘোষনা করে । এটি অনেক সেনা কর্মকর্তা মেনে নিতে পারেননি । তারা ১৯৫১ সালে জেনারেল আকবর খানের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন । কিন্তু জেনারেল আইয়ুব খান এই পরিকল্পনা সরকারকে অবহিত করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন । এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ‘রাওয়ালপিন্ডি চক্রান্ত’ নামে পরিচিত । অভিযুক্ত জেনারেলদের পক্ষে আদালতে লড়াই করেন প্রখ্যাত বাঙালী আইনজীবি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি । অনেকের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয় । পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের সাজা মওকুফ করেন ।

মিশরে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান হয় ১৯৫২ সালে । রাজা ফারুককে সরিয়ে দিতে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে চক্রান্ত করেন জেনারেল মোহাম্মদ নাগীব । তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হবার একবছরের মাথায় ১৯৫৩ সালে আরেক জেনারেল জামাল আব্দেল নাসের তাকে গৃহবন্দী করেন এবং নিজে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করেন । ১৯৫৪ সালে একটি হত্যাপ্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট জামাল নাসেরের চক্ষুশূল হয় এবং ব্রাদারহুডের উপর নেমে আসে চরম নির্যাতনের কালো অধ্যায় । পূর্বেই বলেছি ইরানে প্রথমবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ১৯৫৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন । তিনি ইরানের তেল বৃটিশ আধিপত্যে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেন বিধায় সিআইএ এবং এমআইসিক্স যৌথ উদ্যোগে সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় । এতে নেতৃত্ব দেন সাবেক সম্রাট রেজা খান পাহলভীর ছেলে রেজা শাহ পাহলভী । ক্ষমতায় এসে রেজা শাহ পাহলভী ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র বানাতে ব্যপক উদ্যোগ নেন । যার ফলশ্রুতিতে ধর্মপ্রাণ মানুষ ইসলামী বিপ্লবের পথে এগিয়ে যায় । ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন । একই বছরে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাদশাহ ফয়সল গদিচ্যুত হন এবং ইরাক রিপাবলিকের আত্মপ্রকাশ ঘটে ।

১৯৬০ সালে সেনা অভ্যুত্থানে তুরস্কের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারিস ক্ষমতাচ্যুত হন । তুরস্কের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যাকে ফাঁসি দেয়া হয় । তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে পাশ্চাত্যকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছিলেন । যে সকল সেনা কর্মকর্তা মেন্দারিসকে হত্যা করে, তারা ন্যাটোর প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করে রেডিওতে বিবৃতি দিয়েছিলো । ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে সেনা অভ্যুত্থান হয় যা প্রায় আটবছর গৃহযুদ্ধে রুপ নেয় । এখানে রাজকীয় বাহিনীকে সৌদি আরব, জর্ডান, বৃটেন সমর্থন দেয় । বিপ্লবীদেরকে সমর্থন দেয় মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন । ১৯৬৩ সালে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কমিউনিজম বিরোধী বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে । সাবেক সেনাশাসক আব্দুল করিম কাসিম (যে নিজেও ছিলো অভ্যুত্থানে ক্ষমতাপ্রাপ্ত) ব্রাশফায়ারে নিহত হয় । একই বছর সিরিয়ায় মিলিটারী ক্যু ঘটিয়ে বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে । এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছর কোন না কোন মুসলিম দেশে সেনা অভ্যুত্থান হতেই থাকে । একের পর এক সাদ্দাম- গাদ্দাফী- মোবারক- আসাদ- ইয়াহিয়া- এরশাদ- মোশাররফ দের আগমন রোধ করা কোন মুসলিম দেশেই সম্ভব হয়নি । তবে মজার ব্যপার হচ্ছে- গণতন্ত্রের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাজতন্ত্রের স্বর্গ যু্ক্তরাজ্য প্রতিটি মুসলিম দেশের সেনা অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলো । বিশেষ করে ইসরাঈল প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিম দেশগুলোতে সেনা অভ্যুত্থান পরিচালনা করে অস্থিতিশীল রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বলে মনে হয় । এক্ষেত্রে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার, আধুনিকতা ইত্যাদি বুলি শুধু মুখোশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । এই সেনা অভ্যুত্থান নামক বিষবাষ্পের সর্বশেষ সংস্করণ আজকের মিশর । জেনারেল সিসি সেখানে ইসরাঈলের জাতীয় বীর উপাধী নিয়ে নব্য ফেরাউন হয়ে বসেছে । সম্ভবত এই তালিকায় ভবিষ্যতে নাম আসতে পারে পাকিস্তানের । কারণ সেখানে নির্বাচনের মাত্র এক বছরের মাথায় নওয়াজ শরীফ সরকারের বিরুদ্ধে ইমরান খান এবং তাহিরুল কাদরী যেভাবে বিক্ষোভ শুরু করেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এতো বড় সুযোগ মিস করবে বলে মনে হয়না । অথবা আইএসআই এটা মিস করলেও সিআইএ কিছুতেই মিস করবেনা । তবে আমার আশংকা হলো তুরস্কের বিষয়ে । কারণ এরদোগান প্রায় একযুগের সাধনায় পলিটিক্যাল ইসলামের যে প্রাসাদ দাঁড় করিয়েছেন, যদি আরেকটি অভ্যুত্থানে এই প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়ে তবে মুসলিম উম্মাহর জন্য হতাশার সীমা থাকবেনা ।

সেনা অভ্যুত্থানে প্রথমেই নিজদেশের মানুষের সাথে সেনাবাহিনীর একটি অপূরনীয় দূরত্ব তৈরি হয় । এছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষতি, দুর্নীতি, সমাজের নৈতিক অধঃপতন তো থাকেই । তারপর গণহত্যা থেকে গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায় । মিশরে এখন পর্যন্ত প্রায় তিনহাজার মানুষ নিহত এবং বিশহাজার আহত হয়েছে । সিরিয়াতে সামরিক শাসক আসাদ দেশটিকে শেষ করে ছেড়েছে । আরো হতাহতের ঘটনা আগামী দিনেও অপেক্ষা করছে । আমরা দেখেছি, মিডিয়া কিভাবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীকে প্রতারিত করে । আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনীতে ভুল সমরনীতি কিভাবে নিজ দেশে গণহত্যার পরিবেশ তৈরি করে । অথচ মুসলিম বিশ্বের ইসলামপন্থী কোন শক্তি একটি সুদক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারেনি । এল বারাদী দের বিদেশী ডক্টরেট আর গোল্ড মেডেল যেভাবে তাদেরকে নির্লজ্জ সেক্যুলার এবং ভোগবাদী হিসেবে তৈরি করছে, একমেলেদ্দীনরা যেভাবে বহির্বিশ্বকে বন্ধু ভেবে নিজদেশের দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তেমনি মুসলিম দেশগুলোর সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত বিদেশী অনুশীলন আর মিশন তাদেরকে কতটুকু দেশপ্রেম শেখায় বা জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তা মিলিটারী ক্যু এর ইতিহাস ঘাটলেই চোখে পড়বে । এছাড়া সুষ্ঠু পররাষ্ট্রনীতির অভাবে শুধু সরকারই নতজানু হয় তাই নয়, বরঞ্চ পুরো সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি নতজানু এবং পরাশ্রয়ী হয়ে উঠে । অতএব মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যদি সত্যিকার অর্থে বিদেশী আধিপত্য নামক বিষপান করতে না চান, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সম্পূর্ণরুপে জনগণের ইচ্ছাকে বিবেচনায় নেয়া । দূতাবাসে ব্রেকফাস্ট করতে নেতাদের হুড়োহুড়ি দেখার মতো । অথচ তারা একবারও ভাবে না – দূতাবাসে রাতের আঁধারে অন্য কেউ ডিনার করছে কিনা ।

পরিশেষে বলতে চাই- বাংলাদেশ, সিরিয়া, মিশর, ইরাক, লিবিয়া, সৌদি, আমিরাত, ইয়েমেন প্রভৃতি মুসলিম দেশে গণতন্ত্র মুক্তি পাক । অবৈধ-অগণতান্ত্রিক শক্তির হাত থেকে দেশ বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক । নয়তো এই মুসলিম দেশগুলো মানচিত্রে নামমাত্র টিকে থাকলেও এখানে মনুষ্য সভ্যতার অস্তিত্ব বিলীন হতে বেশিদিন লাগবে না । পাহলভীদের ভূত মুসলিম জাতির ঘাড় থেকে চিরতরে বিদায় হোক, আজকের দিনে এটাই প্রত্যাশা ।