দুটি ঘটনার সূত্র –

সায়ান তানভি

ঘটনা -১
এক নবদম্পতি গাড়ীতে করে যাচ্ছিল ।দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোজাম্মেল দলবলসহ গাড়িটি আটক করে ,ড্রাইভার আর নববধূর স্বামীকে হত্যা করে ,মেয়েটিকে সবাই মিলে ধর্ষণ করে ,অতঃপর তিনদিন পর তাঁর লাশ পাওয়া যায় টঙ্গি ব্রীজের নীচে ।
পৈশাচিক এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয় সর্বত্র ।বিশেষ অভিযানে দায়িত্বরত মেজর নাসেরের হাতে মোজাম্মেল ধরা পড়ে ,মোজাম্মেল মেজরকে বলে ,ঝামেলা না করে আমাকে ছেড়ে দিন ,আপনাকে তিন লাখ টাকা দেবো ।বিষয়টা সরকারি পর্যায়ে নেবেন না ।স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমি ছাড়া পাবো ।আপনি পড়বেন বিপদে ।আমি তুচ্ছ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে জড়াতে চাই না ।মেজর নাসের হুঙ্কার ছাড়লেন ,এটা তুচ্ছ বিষয় ?আমি অবশ্যই তোমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবার ব্যবস্থা করবো ।তোমার তিনলাখ টাকা তুমি তোমার গুহ্যদ্বারে ঢুকিয়ে রাখো ।
এরপরের কাহিনী অতি সরল ।কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোজাম্মেলের বাবা ,দুই ভাই গেল শেখ মুজিবের কাছে ,তিনি আসতেই তার পা জড়িয়ে কান্নার রোল পড়লো ।মুজিব জিজ্ঞাসিলেন ,ঘটনা কি ?টঙ্গি আলীগের সভাপতি বললেন ,আমাদের সোনার ছেলে মোজাম্মেল মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে ।মেজর নাসির তাকে ধরে নিয়ে গেছে ,বলেছে তিন লাখ টাকা দিলে ছেড়ে দিবে ।কাঁদতে কাঁদতে আরো বললো ,এই মেজর আলীগের নাম শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে ।সে প্রকাশ্যে ঘোষনা করেছে ,টঙ্গিতে আমি আলীগের কোন শূয়োর রাখবো না ।বঙ্গবন্ধু !আমি নিজেও এখন ভয়ে অস্থির !টঙ্গিতে থাকি না ।ঢাকায় চলে আসছি ।এবার হুঙ্কার ছাড়লেন বঙ্গবন্ধু ,কাঁদার মতো কিছু হয় নাই ।আমি এখনো বেঁচে আছি ,মরে যাই নাই ।এখনি ব্যবস্থা নিচ্ছি ।
অতঃপর মোজাম্মেলকে তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মেজর নাসেরকে টঙ্গি থেকে সরিয়ে দেয়া হলো ।
ঘটনা -২
নারায়নগন্জের নাগরিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতা ,সন্ত্রাস-চাদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বীর ছেলে ,স্কুল পড়ুয়া ত্বকীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ।অতঃপর তারা দায় চাপায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের উপর ।সুনির্দিষ্ট প্রমান এবং অভিযোগের পরও পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনরুপ ব্যবস্থা নেয়ার আগ্রহ দেখায় নি ,অথবা বলা যায় কোন
প্রভাবশালী উচ্চ মহল থেকে তাদের নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল ।তবে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত র্যাব একটু সাহসী কাজই করে ফেলে ,তারা হত্যাকান্ডে জড়িত একজনকে ধরে ফেলে এবং তার জবানবন্দি অনুযায়ী হত্যাকান্ডের মূল অভিযুক্ত শামীম ওসমানদের একটি টর্চার সেলে অভিযান চালায় ,উদ্ধার করে রক্তমাখা জিনস প্যান্ট ,গজারির লাঠি ,নাইলনের রশি ।দেয়ালে ও শোকেসে অসংখ্য গুলির
আলামত খুজে পায় ।অথচ প্রধানমন্ত্রী তখনো বললেন ,আইভি এবং শামীমের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী পক্ষই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে ।

র্যাবের ঐ অভিযানের পর অভিযুক্ত শামীম ওসমান র্যাবের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার করেন ,এবং এর পরপরই ত্বকী হত্যা মামলার তদারককারী কর্মকর্তা র্যাব ১১ এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর আলমকে চট্টগ্রামে র্যাব ৭ এ বদলি করা হয় ।থমকে যায় আলোচিত এ মামলার তদন্তকাজ ।পাঠক ,প্রথম ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন ,অবিশ্বাস্যরকম মিল খুজে পাবেন ।খুন ,অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর অকুন্ঠ সমর্থন ,খুন করেও সর্বসমক্ষে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো ,তদন্তকারী সেনা কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক অপসারন ।ওহ কি আশ্চর্য মিল ।পিতার আদর্শ সন্তানই বটে ।একেবারে কার্বন কপি ।আমার এক প্রেমিকা ছিল একদা ,বাবার মতোই ,শ্যামল বর্ণের ,প্রগলভ ,বাচাল ,নির্বোধ ,রুক্ষ ,অসৎ ,অযোগ্য ,দাম্ভিক অথচ বাইরে থেকে মনে হতো দয়াদ্র ,স্নেহপ্রবন ,যদিও এ সবই ছিল বাহুল্য ,লোক দেখানো ,ছ্যাবলামি ।
আজ ১৫ নভেম্বরের প্রথম আলোর খবর ,ত্বকী হত্যাকান্ডে জড়িত আরেকজন র্যাবের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন খুনটি শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানই করেছিল ।এবার প্রধানমন্ত্রী কি বলবেন ,তবুও কি বলবেন বিরোধী দলই হত্যাকান্ডে জড়িত ?তিনি কি আরেক দফা র্যাবের কর্মকর্তাকে বদলির ব্যবস্থা করবেন ?অবশ্য তিনি যদি বঙ্গবন্ধুর (সোনার বাংলা!) গড়ার স্বপ্নই দেখে থাকেন শয়নে স্বপনে ,তাহলে প্রশ্নের উত্তর না দিলেও চলবে ।উত্তর আমাদের জানাই আছে ।

সায়ান তানভি

চেতনা বনাম গনতন্ত্র

2

গত কয়েকমাসে আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবিদের বিভিন্ন কলাম ও টকশো এর বক্তব্যগুলি থেকে একটি টকিং পয়েন্ট বার বার উঠে এসেছে। যখনই তারা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে যে এককভাবে জনগনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে আওয়ামী সরকার গনতন্ত্র ও ভোটাধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে কি না, তখনই তারা নানাভাবে ইতস্তত করে একটি বক্তব্যই বার বার বলেছে। তারা বলে থাকে যে গনতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার আগে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে যারা দেশের ‘স্বাধীনতার চেতনা’র বিরুদ্ধে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়, তাদেরকে কি আমরা আবার ক্ষমতায় আসতে দিবো কি না। তারা বলে যে নির্বাচনের আগে আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র পক্ষ বিপক্ষের ক্ষমতা নিয়ে মীমাংসা করতে হবে। এই বক্তব্যের পরে অনিবার্য প্রতিপ্রশ্ন এসে যায় যে তবে কি এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গনতন্ত্র সাংঘর্ষিক? সংগত ও বোধগম্য কারনেই এই প্রশ্নটি আমরা এতোদিন গনমাধ্যমে উপস্থাপিত হতে দেখি নি।

কিন্তু এখন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। গতকাল ইন্টারনেটে একটি টকশো এর অংশ দেখছিলাম। বুধবারে ‘বৈশাখী’ চ্যানেলের এই টকশোতে উপস্থিত দুই ব্যাক্তিত্বই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির প্রতিনিধি বলে পরিচিত। সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও কলামিস্ট অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী। অনুষ্ঠানে চলার সময়ে অধ্যাপক পাটোয়ারীর নানা বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় উপস্থাপক অবশেষে প্রশ্নটি করেই ফেললেন যে, “আজকের দিনে কি পরিস্থিতিটি কি মুক্তিযুদ্ধ বনাম গনতন্ত্রের লড়াইতে এসে দাড়িয়েছে’? খুব সংগত কারনেই রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবি দুজনেই এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু জনগনের চিন্তার মধ্যে এই প্রশ্নটি এড়ানোর কোন উপায় নেই। আজকে এই প্রশ্নটি সবার সামনে জ্বলন্ত হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে যে চেতনা ও গনতন্ত্র কি মুখোমুখি সংঘর্ষে উপস্থিত?

যেকোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত থাকে। একেবারে সামনা সামনি সবচেয়ে প্রত্যক্ষ লড়াই হলো ব্যাক্তির সাথে ব্যাক্তির (যেমন খালেদা বনাম হাসিনা)/ এর পরের স্তর বলা যেতে পারে এই লড়াই দল ও সমর্থকদের মধ্যে। আরো উচ্চস্তরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হলো চিন্তা ও আদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এই বছরে চিন্তার জগৎ এ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে অনেক রকম লেবেল দেয়া হয়েছিলো, বিচার বনাম অবিচার, ধর্মীয় মৌলবাদ বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা, এরকম আরো বেশ কিছু। কিন্তু এই সব লেবেল পরিত্যাক্ত হয়ে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের সামনে এসে এই মতবাদের লড়াই পর্যবাসিত হয়েছে চেতনা ও গনতন্ত্রের মধ্যে।

দেশজুড়ে সমর্থকেরা যেভাবেই এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে দেখুক না কেনো, দুই বৃহৎ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতারা ও কর্মীরা কিন্তু খুব ভালোভাবেই জানে এই লড়াই শুধুমাত্র পার্থিব ক্ষমতার লড়াই। বাংলাদেশে এখন ক্ষমতায় আসীন হওয়া মানে সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়া সহ আলাদীনের চেরাগ পাওয়া। আর ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে বনবাসে নির্বাসন, নির্যাতন, ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যু পর্যন্ত। সুতরাং তারা খুবভালো করেই জানে এই লড়াই আসলে কিসের জন্যে।

এই রাজনীতিবিদদের কাছে বিভিন্ন রকম চিন্তা-আদর্শের বুলি হলো ক্ষমতার জন্যে তাদের নগ্ন-লোভী যুদ্ধকে জনসাধারনের কাছ থেকে ঢেকেঢুকে রাখার জন্যে একটি ছদ্মাবরন মাত্র। কিন্তু রাজনীতির সমর্থকেরা, যারা একেকটি রাজনৈতিক পরিচয়ের সাথে নিজের আত্মপরিচয় এক করে ফেলেছে, তাদের কাছে এই দ্বন্দ্ব হলো চিন্তা ও আদর্শের লড়াই, যে লড়াই এর জয় পরাজয়ে নির্ধারিত হয় নিজের আত্মপরিচয়েরও স্বীকৃতি। রাজনীতিবিদদের সরাসরি লড়াই এর চেয়ে কিন্তু এই চিন্তা ও আদর্শের লড়াই কম গুরুত্বপূর্ন নয় কারন সময়ের দীর্ঘমেয়াদী স্কেলে, ব্যাক্তিত্ব ও দল ছাপিয়ে এই চিন্তার লড়াইটিই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথ দেখায়।

২০১৩ এর শেষে, এই রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও চিন্তার লড়াই কিন্তু অনেক আগে থেকেই স্পষ্ট অনিবার্য ছিলো। ২০১১ তে একক ইচ্ছায় তত্বাবধয়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দেয়ার সময়েই এই সংঘর্ষের স্ক্রীপ্ট লেখা হয়ে গিয়েছিলো। যেকোন সচেতন নাগরিকের কাছে এটাও স্পষ্ট ছিলো যে ক্ষমতা নামের আলাদীনের চেরাগকে সুসংহত করতেই ক্ষমতাসীন দল এই অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছিলো। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা এই স্পষ্ট রাহাজানিটিকে জনতার সমানে গ্রহনযোগ্য করে তোলার জন্যে নানারকম মজাদার কথাবার্তা উপস্থাপন করতো। একটি কথা এই গ্রীষ্মে প্রায়ই শোনা যেতো যে শেখ হাসিনা নাকি বাংলাদেশে গনতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্যে বদ্ধপরিকর। তিনি নাকি তত্বাবধায়ক নামের জোড়াতালি ব্যবস্থা বাদ দিয়ে পুরোপুরি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গনতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে যেতে চান এবং এটিকেই তার সবচেয়ে বড়ো লিগ্যাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চান।

কিন্তু গত কয়েকমাসে নির্বাচন কমিশনের একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপে ও সাজানো নির্বাচন থেকে বিএনপি’কে যে কোন প্রকারে থেকে দূরে রাখার চেষ্টার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে আসলে পুরোটাই ছিলো সেই পুরাতন ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে কুক্ষীগত রাখার চেষ্টামাত্র। সর্বশেষ যে খোড়া অজুহাত ছিলো সংবিধান সমুন্নত রাখার দৃঢ়তা, সেটিও জনতার সামনে হাস্যকরভাবে বাতিল হয়েছে মন্ত্রীদের পদত্যাগের অ্যাবসার্ড নাটকের মতো ঘটনায়। এখন চেতনা ছাড়া আর কোন আদর্শের তীর নেই তূনীরে।

বর্তমানের এই চেতনা এবং গনতন্ত্রের দ্বন্দ্বে দেশের জনগনের অবস্থান কোথায়? আগের দিনের মতো এই প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্যে এখন আর বুদ্ধিজীবি-বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা এখন জনমত জরীপের যুগে প্রবেশ করেছি, এটা পুরাতন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বুঝতে যত দেরীই করুক না কেন। এই বছরে প্রকাশিত চার-পাচটি জরীপে বের হয়ে আসা ফলাফল দ্ব্যর্থহীন, দেশের কমপক্ষে ৭০ -৮০% জনগন চায় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, কারন তারা মনে করে কোন রাজনৈতিক সরকার তাদের ভোটাধিকারের সুরক্ষা করবে না। আর যারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র ক্ষমতার লড়াইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে-বিপক্ষের লড়াই বলে অভিষিক্ত করেন, তাদের এই মতই জনতার মধ্যে কতটুকু প্রতিফলিত? সর্বশেষ প্রকাশিত জরীপগুলোতে দেখা গেছে এখন বিএনপি’র জনপ্রিয়তা ৫০% এর উপরে আর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা নিম্ন তিরিশ কিংবা তারও নীচে।

রাজনীতির লড়াইকে বুদ্ধিজীবি-সমর্থকেরা যে কোন আদর্শিক লেবেলই লাগাক না কেন, জনগনের কাছে এটি সেই পুরাতন ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাসীনদের সড়ানোর জন্যে একমাত্র সক্ষম প্রতিপক্ষেরই লড়াই।আওয়ামী লীগ-বিএনপি’ লড়াইতে এই জনমতের এই বিপুল পরিবর্তনের কারনটাও প্রথম পরিসংখ্যানটিই স্পষ্ট করে দেয়। কুশাসনের প্রতিযোগিতায় এই দুই দলের অতীত কেউ কারো চেয়ে কম কলংকিত না হলেও জনগন জানে এই সময়ে কোন দলটি তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রে মগ্ন। সাধারন জনতার কাছে গনতন্ত্রের একমাত্র অবশিষ্ট অধিকার, ভোটাধিকারকে নিয়ে চরম অবিবেচক পদক্ষেপই ক্ষমতাসীন দলের গনভিত্তিতে বিশাল ফাটল ধরিয়েছে।

চেতনার পক্ষের যারা কিছুটা বাস্তব সচেতন তারা আর এখন দেশের রাজনীতি ও জনসমর্থনের ভূপ্রকৃতির এই স্পষ্ট রূপটিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। এদের অনেকেই এখন সরাসরি বলে যে গনতন্ত্রের ভোটের মাধ্যম্যে দুই কুকুরের ক্ষমতার হাড্ডি নিয়ে চলা দশকের পর দশক লড়াই এর চেয়ে তাদের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন ও তার রায়ের পূর্ন বাস্তবায়ন হওয়া অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন। তারা বলে যে যতক্ষন না দেশের জন্মলগ্নের এই আদি কলংকের মোচন ঘটছে ততক্ষন মানুষের ভোটাধিকারের সুষ্ঠু প্রয়োগ হলো কি না এটি তাদের কাছে বড়ো বিবেচ্য নয়। কোনো সন্দেহ নেই যে এই অত্যেন্ত সচেতন নাগরিকদের এই মতটির পেছনে যুক্তি আছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে চলমান বিচার প্রক্রিয়া যে পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু পাচ বছর সময় পাওয়ার পরও বিচারের অজুহাতে গনতন্ত্রকে আপাতত পর্দার অন্তরালে সড়িয়ে রাখার এই চিন্তাটি দেশের জনগনের বৃহদংশ তো দূরের কথা, এক উল্লেখযোগ্য অংশই ধারন করে কি না সেটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। আর গনতন্ত্রে একজন উচ্চশিক্ষিত, চেতনায় ভরপুর নাগরিকের মতামত, আর নয় কোটি নিরানব্বই লক্ষ, নিরানব্বই হাজার, নয়শ নিরানব্বই জনের চেয়ে সামান্যতম বেশী দামী নয়। চেতনার অজুহাতে একটি ক্ষুদ্র অংশের মতকে জনগনের বৃহদংশের উপরে চাপিয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া অবশ্যই হবে চেতনার জন্যে অনেক বেশী প্রতিকূল।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি ফ্যাক্টর হওয়া সত্বেও এই চেতনার স্বরূপ কি কিংবা দেশের জনগনের মধ্যেই এর প্রতিফলন কতটুকু, এই সব নিয়ে নিরাবেগ আলোচনা কখনো হয় নি। এর অন্যতম কারন অবশ্যই হলো যে এই চেতনা, যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধীদের মতো অমীমাংসিত বিষয়ের কারনে আমাদের কাছে অতীতের কোন ব্যাপার নয় বরং জলজ্যান্ত বর্তমানে তীব্র আবেগের আধার। তবে আশা করা যায় যে অবশেষে ২০১৩ এই তুমুল ঘটনাপ্রবাহ যখন স্তিমিত হয়ে যাবে তখন আমরা এই অতি প্রয়োজনীয় আলোচনাটি শুরু করতে পারবো। আমি এই লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষনের মতো বিশাল কাজ নেয়ার স্পর্ধা করতে পারি না তবে লেখার মূল বক্তব্য তুলে ধরার জন্যেই চেতনা নিয়ে কিছু কথা সংক্ষেপে হলেও বলা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধের চে্তনা বলতে কি বুঝায় এই প্রশ্নের উত্তরে বহুদিন ধরে স্ট্যান্ডার্ড উত্তর ছিলো আমাদের ১৯৭২ এর সংবিধান এর চার মূলনীতি, বাংগালী জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের সাথে সাথে এক অখন্ড চেতনার সাথে এই চার মূলনীতির সামন্জস্যতা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন এলেও এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা খুব কম হয়েছে। এর কারন অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের মতো ইতিহাসে একক ঘটনার সাথে এই নীতিগুলিকে সম্পৃক্ত করে ফেলা। কিন্তু এখন আর এই অসামন্জস্যতাগুলো এড়ানোর কোনো উপায় নেই। গনতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্র সামন্জস্যপূর্ন নয়। জাতীয়তাবাদের মতো একটি রক্ষনশীল মতবাদের স্থান উদার গনতন্ত্রে কতটুকু এনিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে তো বটেই, সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়েও মুক্তিকামী সংগ্রামীদের কতজন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলো সেটি নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ আছে।

চেতনা হলো মানুষের মনের মধ্যে উৎসারিত বৃহৎ কোন অনুভূতি, কিন্তু কোন দুটি মানুষের মন যেমন এক রকম হয় না ঠিক তেমনি কোনো দুটি মানুষের চেতনা অবিকল এক হয় না। মুক্তিযুদ্ধের মত বিশাল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও প্রতিটি মুক্তিকামী যোদ্ধা, জনতা ও নেতা পুরোপুরি একই রকম চেতনায় আন্দোলিত হয় নি, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবন, অভিজ্ঞতা ও মানসিকতার পার্থক্যে চেতনার মধ্যেও কমবেশি পার্থক্য ছিলো। কিন্তু আমরা যদি চেতনাকে একটি অখন্ড বোধ হিসেবে না দেখে একটি স্তরে স্তরে বিন্যস্ত সাধারন মূল্যবোধ হিসেবে দেখি তবে আমরা বিশাল জনতার মধ্যে অনিবার্য পার্থক্যকেও চেতনার মধ্যে ধারন করতে পারবো।

আমি মনে করি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন চেতনার প্রাথমিক স্তরে অর্থাৎ সকল মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে বিস্তারিত চেতনার প্রথমে রয়েছে স্বাধীনতা। সেই সময়ে মুক্তিকামী প্রত্যেকেই পাকিস্তান নামে দুই হাজর মাইল দূরের একটি বিজাতীয় দেশ কতৃক আমাদের দেশের উপরে শ্রেফ ধর্মের অজুহাতে প্রভুত্ব চালানোর বিরোধী ছিলো। বিদেশীদের থেকে স্বাধীনতার মতো মানব ইতিহাসের অত্যন্ত প্রাচীন কিন্তু মৌলিক একটি গোষ্ঠীগত চেতনাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক চেতনা। আমার মতে এর পরের স্তরে, অর্থাৎ প্রথম স্তরের চেয়ে কম হলেও পরবর্তী ব্যাপক বিস্তারিত চেতনা ছিলো গনতন্ত্র। মুক্তিকামী লোকদের অধিকাংশই মনে করতো এই দেশে, জনগনের ভাগ্য নিয়ন্তা হবে জনগনই। এই দুটি প্রাথমিক চেতনার স্তরের পরেই ছিলো অন্যান্য আকাংখা বৈষম্যহীন সমাজ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাংগালী সংষ্কৃতি এরকম অন্যান্য। এর কোনটি অন্য কোনটির আগে অথবা পরে এটি আলোচনা করা এখানে সম্ভব নয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কিছুটা বিশ্লেষন করলেই আজকে এই ‘চেতনা বনাম গনতন্ত্রে’র দ্বন্দ্বে ভয়াবহ কন্ট্রাডিকশনটি চোখে পড়ে সরাসরি। গনতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রধান অংশ। চেতনা সেই গনতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে নিজেকেই একটি চরম সেলফ কন্ট্রাডিকশনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই কন্ট্রাডিকশনটি যদি দ্রুত নিরাময় না করা হয় তবে এর পরিনতি কি হবে এটি অনুমান করা শক্ত নয়। গনতন্ত্রের মতো আধুনিক মানুষের মৌলিক এবং সার্বজনীন একটি চেতনার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে অক্ষত অবস্থায় দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, সেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো শক্তিশালী অনুভূতি হলেও।

কিন্তু আরো আশংকার কথা যে ২০১৩ এর শেষে চেতনাকে শুধুমাত্র গনতন্ত্রের মতো শক্তিশালী একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাড় করানো হয় নি, ঘটনা প্রবাহের পরিনতিতে চেতনা অবস্থান হয়ে পড়ছে আরো মৌলিকতম একটি চেতনা ও আবেগের বিরুদ্ধে। সেটি হলো বিজাতীয় শক্তির প্রভূত্বের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাংখা। চেতনা যদি স্বাধীনতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয় তবে জনগনের মধ্যে তার অবস্থান কি হতে পারে এটি তুলে ধরার কোন প্রয়োজন পড়ে না।

আমরা যদিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জনগনের কাছে স্পষ্ট করি নি তবু স্বাধীনতার পরে গত চার দশকে এই চেতনা আমাদের গনতন্ত্র ও রাজনীতিতে অনেক গুরূত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় মৌলবাদের মতো প্রচন্ড শক্তিশালী একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই চেতনাই এখনো আমাদের গনতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো অবলম্বন কারন আমাদের জাতির মধ্যে উদারনৈতিক মূল্যবোধের প্রসার এখনো ঘটে নি। একারনে গনতন্ত্রের সাথে চেতনাকে বিরোধে জড়িয়ে ফেলাতে মৌলবাদের পথই আরো সুগম হচ্ছে। যারা চেতনা রক্ষার সরব-উচ্চকন্ঠ, তাদের একটা জিনিষ বোঝা উচিৎ যে রাজনীতিতে পট পরিবর্তন ঘটে সময়ের স্কেলে খুব দ্রুততার সাথেই। কেউই কখনো একাধারে এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকে না, দ্রুত পরিবর্তনই রাজনীতির চিরায়ত বৈশিষ্ট। কিন্তু কোনো আদর্শ বা চিন্তা যদি একবার জনগনের মধ্যে বিচ্যুত, পতিত বলে গণ্য হয়, তবে তার পূর্নবাসন হতে সময় লাগে অনেক অনেক বেশী, কখনো সেটি আর হয়ে ওঠেই না।

চেতনার বড়ি by Emrul Mahmud

Capacity আর achievement যে এক জিনিস না, তাও আবার বুজাইতে হয় চেতনাজীবীদের। দূর মিয়া, আপনাগো এই এক সমস্যা সবকিছুতেই বাম হাত না ডুকাইলে আপনাদের হয়না; বি পজিটিভ। অন্যের অর্জনকে সাধুবাদ জানাইতে শেখেন। হ ভাই লাইনে আইছেন। আমরা তো সাধুবাদ জানাতে চাই; কিন্তু ভণ্ডামি করার দরকারটা কি? আমাদের তো প্রশ্ন ওই ভণ্ডামিতে। আপনি হাফ সেঞ্চুরি করছেন ভালো কথা, বাহবা আপনার প্রাপ্যই। খেলা যেহেতু শেষ হয়নি, ওভার ও আছে; দেখেশুনে খেলতে পারলে সেঞ্চুরিও করা যাবে। হাফ সেঞ্চুরি করছেন দর্শক হাততালি দিবে; এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি হাফ সেঞ্চুরি করে যদি সেঞ্চুরি উদযাপনের ভঙ্গি করেন; তখন দর্শকরা তো ভড়কাবেই। হাফ সেঞ্চুরি কইরা যদি কোন ব্যাটসম্যান হেলমেট খুলে দুইহাতে ব্যাট আর হেলমেট উপরে উঠান আর দর্শকদের উদ্দেশ্যে ব্যাট নাচাতে নাচাতে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করেন; তখন দর্শক হিসেবে আপনি কি হতভম্ব হবেননা। হতভম্ব হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। না আপনি যেহেতু চেতনার ট্যাবলেট খেয়েছেন তাই হতভম্ব না হওয়ার ভান করছেন। অস্বাভাবিকতাই আপনার কাছে স্বাভাবিকতা। যিনি স্বাভাবিকভাবেই হতভম্ব হয়েছেন, তাকে নিয়েও আপনার তেনা প্যাঁচানো – তিনি কেন হতভম্ব হয়েছেন? চেতনার ট্যাবলেট খেয়ে এতই বিবেক হারিয়েছেন যে, প্রতিনিয়ত সরকারের অস্বাভাবিক আচরণ আপনার দৃষ্টিগত হয়না। যারা কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেয়, তারাই সুস্পষ্ট সংবিধান লঙ্গন করলেও আপনারা যুক্তি খুঁজে পান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, চেতনা পরিপন্থি কাজ করলেও আপনাদের দৃষ্টিগোচর হয়না। মজার ব্যাপার হোল অধিকাংশ চেতনাজীবী চেতনাটা কি তাই জানেনা। একবার এক চেতনাজীবীকে জিজ্ঞেস করলাম, সবসময় যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলস, সেই চেতনাটা কি? সে আমাকে সদউত্তর দিতে পারেনি। আমি তাকে বললাম আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত’ ভাবে কায়েম করবার জন্য। ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে’ সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র কায়েম এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ১৯৭১ সালের ১০ ই এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়েছিল। ঘোষণা করা হয়েছিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’/সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ‘সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র’ রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হচ্ছে ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে’/পাকিস্তান আমাদের ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার থেকে বঞ্চিত করেছিল বলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম। তুই আমাকে বল, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুলি আওড়ান তারাই চেতনা পরিপন্থী কাজে বেশি লিপ্ত। সমাজের একটি অংশকে সামাজিক সুবিচার থেকে কি বঞ্চিত রাখা হচ্ছে না? সে আমাকে জবাব দিল, স্বাধীনতার পর থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আওয়ামীলীগই একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লালন করছে এবং বাস্তবায়ন করেছে। আমি আর কথা বাড়ালাম না, শুধু বললাম গরু-ছাগলের দল যেমন জানে না তাদের যারা হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা তাদের চারণক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, না কসাইখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তারা কেবল চোখ বন্ধ করে যারা হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের ইশারায় চলতেই থাকে। তোদের অবস্থা গরু-ছাগলের মতই, চেতনার বড়ি খেয়ে তোরা বুজতেই পারছিসনা চেতনা পরিপন্থি কাজ কি?

“কালীদা, বাঙালী হওয়া কাকে বলে?”

Image

সময় কাল, ১৯৭১/  বিহান তার ব্যাগটা গুছিয়ে নিচ্ছে । সীমান্তে যাবে, training নিতে, যুদ্ধে যাবে বিহান। পশ্চিম পাকিস্তানীদের অবিচারের বিরুদ্ধে একটি ন্যায়যুদ্ধে । ১৬ বছরের দিহান অস্থির হয়ে ছুটে আসে বিহানের ঘরে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ভাইয়া তুমি রফিকে বাঁচাও। মোহাম্মদ রফি দিহানের বন্ধু, সমবয়সী। বাইরে গোলাগুলি শোনা যাচ্ছে। বিহান শুধু বলল, রফিকে বাসায় এনে উপরের ঘরে লুকিয়ে রাখ।  কিছু হবে না ওর। আমি আছি না। হেসে বেরিয়ে গেল বিহান। দিহান ছুটে গেল  রফির সন্ধানে।

বিহান একটু চিন্তিত। খবর পেয়েছে , বিহারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাঙালীরা। যুদ্ধে এটা হয়ই বোধ হয়। কিছু বাঙালী মনে করছে, এই উর্দু বলা বিহারীগুলোকে ধরলেই  বোধ হয় পাকিস্তানীদের নির্মম অত্যাচারের শোধ নেওয়া হবে। বিহান ভাবে, বন্ধু পবনদা, মিহিরদা, আজিজ, তাজু ,মানস এদের নিয়ে  কিছু একটা করবে, সীমান্তে যাবার আগেই। এই নিশ্চিন্তপুরে এটা হতে দেয়া যায় না।

রফি লুকিয়ে আছে, দোতলার ঘরে, ঠিক বারান্দার পাশেই। দিহানও আছে তার সাথে। বুক ফুলিয়ে বার বার বলছে, রফি, ভাবিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। বিহান ভাইয়া তো মুক্তিযোদ্ধা, ওরা কেউ এখানে তোকে খুঁজতে আসবে না।  রফি শুধু বলে, “আব্বা, আম্মা, ভাইয়া এদের তো কোনো খবরই পেলাম না। ওদের যদি তোর এখানে নিয়ে আসতে পারতাম!” হঠাৎ বাইরের রাস্তায় আওয়াজ, রফির মায়ের কন্ঠ, “ও বেটা, আমার রফি কোথায়?”; রফির বড় ভাই, হাসান এর গলা শোনা যায়,“ও আম্মা, ও বাঁচুক”! চিৎকার শোনা যায়, “চুপ”/ রফি ছুটে যায় রাস্তায়। দিহান ওকে আটকাতে পারে না।  রফি যোগ দেয় বিহারীদের কাফেলায়, ওরা তাদের বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, শোধ নিতে!

আচমকা কালিভূষণ! কালিভূষণ নাটক শেখায় ছোট্ট শহরটিতে, দিহান, বিহান, রফি, হাসান সকলেই  নাটক শিখেছে  কালিদার কাছে। যে বছর রফি, “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” আবৃত্তি করে প্রথম পুরস্কারটা পেল, সে বছরই কালিদা তাকে টেনে নিয়ে গেল তার নাটকের দলে, তখন থেকেই রফি কালিদার প্রিয় ছাত্র!

কালিভূষণ কাফেলার সামনে এসে দাড়ায়। রফি, কালিদাকে দেখে হাসে, বলে উঠে চমৎকার শুদ্ধ বাংলায়-

“কালিদা, বাংলা আবৃত্তি শেখালে, বাংলা নাটক শেখালে, শেখালে না কি করে বাঙালী হতে হয়”।

মুহুর্তের জন্য থমকে গেলেও পরমুহুর্তেই কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি খায় কালিভূষণ, ধুলো ভরা রাস্তার উপরে। “বাবাগো আমার, তোরা ছেড়ে দে ওকে। ওতো বাচ্চা ছেলে আমার!”

বীর পুরুষের দল, ধমকে উঠে কালিভূষণকে, “আহ, কালিদা, কাজের সময় জ্বালাতে এসো নাতো, সরে যাও,” একরকম ধাক্কা দিয়েই সরিয়ে দেয় তাকে। কালিভূষণ কাঁদতে থাকে, বীর পুরুষের দল এগিয়ে যায়, এগিয়ে যায় রফি, আমানত, হাসানদের কাফেলা।

Image

তারপর, অনেক দিন পার হয়ে যায়,লাখো বাঙালীর  আত্মত্যাগ, হাজারো নারীর সম্ভ্রম, আর একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পরে বাঙালী পায় নতুন একটা দেশ, বাংলাদেশ। বাংলাদেশীরা যুগ যুগ ধরে গর্ব করতে থাকে এই দেশ নিয়ে, তর্ক করতে থাকে স্বাধীনতার পক্ষের এবং বিপক্ষের শক্তি নিয়ে, স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছিল, এনিয়ে চায়ের কাপে উঠে ঝড়।

এভাবে ৪০ বছর কেটে যায়। এরি মাঝে একদিন হজরত শাহজালাল এয়ারপোর্ট এ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এর একটি বিমান এসে নামে। মোহাম্মদ রফির আরেক ভাই, মোহাম্মদ নায়ীম, এসে পৌছায় ঢাকায়।  ৭১ এ সে এবং তার আরেক ভাই  লন্ডনে পড়ছিল। ঢাকায় পৌঁছেই সোজা চলে যায় বাসের উদ্দেশ্যে। বাস এসে থামে ঠাকুরগাঁয় । চৌরাস্তায় এসে অবাক হয়ে চারদিকে তাকায় নায়ীম । কত্ত বদলে গেছে শহরটা । কি যেন খুঁজে সে, নিজেও বোঝে না কি তা ! হঠাৎ চোখে পড়ে খুব চেনা একটা মুখ। একটু ইতস্তত করে এগিয়ে যায় সে।

“পবনদা; চিনতে পারছ?” শুদ্ধ বাংলায় প্রশ্ন নায়ীম।

পবন চমকে উঠে। “নায়ীম না”!

“হুম”।

দুজন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। অপলক। কত্ত ভাবনা, কত্ত স্মৃতি ভেসে উঠে।  জড়িয়ে ধরে পবন নায়ীমকে।

“কবে এলি নায়ীম ?”

“গতকাল, পবনদা। কেমন আছো তুমি, তোমরা ??”

“আছি ভালই”।

পবন নায়ীমকে নিয়ে যায় বিহানের বাসায়। বৈঠকখানায় বসে পেপার পড়ছিল বিহান। নায়ীমকে দেখে বুঝে উঠতে পারে না বিহান কি বলবে । নায়ীম এগিয়ে যায় বিহানের দিকে। বাঁধ ভেঙ্গে যায় বিহানের। বলে ওঠে, “আমাকে মাফ করে দিস নায়ীম, পারিনি আমি ওদের বাঁচাতে, আমায় মাফ করে দিস”।

“বাদ দাওনা বিহান ভাই, Nothing is unfair in love and war.  তোমরা ভালো আছো তো? এতো প্রাণ, এতো রক্তের বিনিময়ে এই মায়াভরা দেশটাতে তোমরা সুখে আছো তো?”

কাঁদতে থাকে নায়ীম, কাঁদতে থাকে পবন। ৪০ বছরের পুরনো কান্না।

তারপরে আরো কিছু দিন কেটে যায়। আড়িয়াল বিলের মানুষগুলো ফুঁসে উঠে, বাপদাদার ভিটা রক্ষার সত্য আন্দোলনে, একটা বোকা নিরুপায় পুলিশ মরে যায় এর মধ্যে, শেয়ারবাজারের ভরাডুবিতে লাখ লাখ মানুষ নেমে পড়ে পথে, সংবিধান মুদ্রণ, পুনর্মুদ্রণ এর খেলা চলে, মেহেরজান নিয়ে ব্লগে, ব্লগে চলে বিশাল উত্তেজিত আলোচনা, ধর্ষিত হেনার মৃতদেহের শুকিয়ে যাওয়া দোররার দাগ নিয়ে চলে গবেষণা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তথাকথিত শিক্ষিত আলেমেরা পায় ফতোয়া দেবার সরকারী অনুমতি, ওদিকে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলতে থাকে ফেলানি।

আগের প্রজন্মের গর্বের বাংলাদেশ রয়ে যায় আমাদের ভালোবাসার হয়ে, কর্পোরেট নারীপুরুষ লাল-সবুজ জামা পরে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে উঠে নীরব সংসদ ভবনের সামনে। আর আমি, সারাজীবন বিজ্ঞান পড়া মানুষটা,  প্রাপ্ত বয়স্কের মাথা নিয়ে খুঁজি একটি জরুরী প্রশ্নের উত্তর; “ বাঙালী হওয়া মানে কি?”

(চরিত্রগুলোর নাম বদলে দেওয়া হয়েছে)

Tinker, tailor, soldier, coup-maker

1

The country of Bengal is a land where, owing to the climate’s favouring the base, the dust of dissension is always rising – so said the Mughal court chronicler Abul Fazl in the 16th century. Four hundred years later, the People’s Republic of Bangladesh has been a country where the dust of dissension has repeatedly risen among the men armed to guard the republic.

The country’s founder Sheikh Mujibur Rahman was killed with most of his family in a brutal coup in 1975. Within a decade of the country’s 1971 Liberation War against Pakistan, much of the political and military leadership of the war were either killed or politically delegitimized by successive coups. And the coups of the 1970s reverberate even today, as Humayun Ahmed found out shortly before his death — his last novel, set in 1975, has been effectively banned because his depiction of history doesn’t suit the version favoured by Bangladesh’s current political dispensation. The politicised quest for what Naeem Mohaiemen calls shothik itihash stifles the freedom of speech and thought, and sets back academia and creativity.

Of course, what actually happened in the 1970s, and beyond, should be subject to serious debate. History isn’t, after all, mere recount of dates and facts. History should be about understanding what happened and why they happened. Needless to say, one’s understanding depends on one’s own political biases.

Over the folder, I summarise major mutinies/coups/rebellions of the past four decades, and the narrative reflects my own biases and ideological prisms – just as one’s terrorist is another’s freedom fighter, so is one’s mutiny someone else’s revolution. For the interested reader, a reading list is provided at the end.

Continue Reading

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীণতা ও আমাদের ভবিষ্যত

By Shikin Aman 

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। আড়াইশত বছর পরাধীনতার পরে আমরা একটা স্বাধীণ দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাড়াই এই মহান যুদ্ধের মাধ্যমে। এই যুদ্ধে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তারা আমাদের জাতীয় বীর।দেশের একটা ক্রান্তিলগ্নে তারা আমাদের মুক্তির পথের দিশারী ছিলেন। তাদের সেই মহান আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন কি আমরা করতে পেরেছি, নাকি আমরা তাদের অর্জনকে শুধু ক্ষুদ্রস্বার্থে ব্যাবসার কাজে লাগাচ্ছি? আমাদের দেশের উন্নতির জন্য কি এই মহান স্মৃতি পথিকৃত এর ভুমিকা রাখছে, নাকি এর অপব্যাবহারে আমাদের উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে? দেশের উন্নতির জন্য ভবিষ্যত সরকারের কাছে আমাদের কি চাওয়া থাকতে পারে?

Continue Reading