তত্ত্বাবধায়ক সরকার— অ্যা পোস্ট মর্টেম

ctggby zainuddin sani  আমার মৃত্যুটাকে ঠিক আচমকা মৃত্যু বা ‘সাডেন ডেথ’ বলা যায় না। দীর্ঘ রোগ ভোগের পরের মৃত্যু বলাটাও ঠিক হবে না। খুন বলা যেতে পারে, তবে মৃত্যুটা হয়েছিল আমার ওপর আসা উপর্যুপরি আঘাতের বেশ অনেক বছর পরে। ছোট খাট ঝড় ঝাপটা গেলেও আমি মোটামুটি বহাল তবিয়তেই টিকে ছিলাম। তিন তিনটে নির্বাচনও করলাম। বিরোধী পরাজিত দল ছাড়া বাকী সবাই বলল নির্বাচন ভালোই হয়েছে। বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও ঘুরে দেখে বলেছিলেন, নির্বাচন ভালোই হয়েছে। রিপোর্ট কার্ডে একশোতে একশো না দিলেও কমবেশি সবাই নব্বইয়ের ওপরেই নম্বর দিয়েছিলেন। এরপরও আমার শেষরক্ষা হল না। বলা যায়, সেটাই আমার কাল হল।

আমার ওপর প্রথম বেশ বড়সড় আঘাত এসেছিল বিএনপি আমলে। মানে বিএনপির দ্বিতীয় আমলে। সেবার মউদুদ সাহেব সংবিধানে একটি সংশোধন করেন। সেই সংশোধনের ফলাফল যা দাঁড়াল, তাতে দেখা গেল একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি একসময় বিএনপির সদস্য ছিলেন, তিনি হয়ে যাচ্ছেন আমার প্রধান। ঠিক তাঁকে প্রধান করার জন্যই এই পরিবর্তন, না সত্যিই বিচারক সংকটের জন্য এই পরিবর্তন, তা হলফ করে কারো পক্ষে বলা সম্ভব না। আর এদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে একটি দলের দেয়া ব্যাখ্যা আরেকজন মেনে নেবে, প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। প্রায় বললাম, কারণ নিজেদের বেতন বৃদ্ধি আর শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির জন্য কেবল এরা একমত হয়।

যাই হোক, সেই সংশোধনীর পরে আওয়ামীরা ভাবল, সেই হাসান সাহেবকে প্রধান করার জন্য এই কাজ করেছে বিএনপি। তাই তাঁরা আন্দোলনে নামলো। প্রচুর হরতাল দিল। জ্বালাও পোড়াও ও কম করল না। তারপরও তেমন কিছু করতে পারল না। বহু জল ঘোলা করে অবশেষে আমার প্রধান হিসেবে আসলেন রাষ্ট্রপতি। কাজটা ঠিক হল কি না তা নিয়ে বেশ বিতর্ক হলেও আওয়ামীরা মেনে নিল। ঠিক সেই সময়টায় সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতির অধীনে থাকবার কারণে হয়তো আওয়ামীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে সাহস করেনি। এরপরে বেশ যাচ্ছেতাই ভাবে আমাকে ব্যবহার করতে লাগলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। আমার বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাও পদত্যাগ করলেন।

এর কিছুদিন পরে আসলো সেই যুগ সন্ধিক্ষণ। অনেকের মতে আমার মৃত্যুর সেটাও একটি কারণ। ১১ই জানুয়ারী, আমার পরিচালনায় হতে যাওয়া চতুর্থ নির্বাচনটির মাত্র কিছুদিন আগেই আমার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলেন বা করানো হল। নতুন প্রধান হিসেবে আসলেন, ফখরুদ্দিন সাহেব। নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ হল। তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার বাধ্য বাধকতা থাকলেও, আইনের কিছু ফাঁক গলে, নির্বাচন অনুষ্ঠান পেছানো হল। এই ফাঁকে বেশ সাহসী কিছু পদক্ষেপও নেয়া হল। দুই দলের তাবৎ বড় বড় নেতাকে আটক করা হল। কারো মতে, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে দেশের দুই বড় দলের যবনিকা পতনের চেষ্টা হল।

এরপরে অনেক ঘটনা ঘটল। দুই বড় দলের বেশ কিছু নেতা বিদ্রোহ করল। শীর্ষ পদ দখলের জন্য, কিংবা দল দুটিকে ধ্বংস করার জন্য, বেশ অনেকেই একত্রিত হল। তবে সফল হল না। আমার শীর্ষ পদে থাকা মানুষগুলো ঠিক কি চেয়েছিল, জানি না। তবে প্রথম প্রথম তাঁরা যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, কিংবা দুই বড় নেত্রীকে গ্রেফতারের পরেও যে মৌন সম্মতি তাঁরা পেয়েছিল, তা ধরে রাখতে পারল না। বাগাড়ম্বর আর দুরাভিসন্ধি তাঁদের কাল হয়ে দাঁড়াল। ‘কিংস পার্টি’ তৈরি করে ক্ষমতায় আরোহণের চেষ্টা শুরু করেছে কি না তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিল। ফলাফল যা হল, দুই দলের সঙ্গে সঙ্গে জনগণকেও ক্ষেপিয়ে তুলল আমার বিরুদ্ধে।

সেই দুই বছর পার করে অবশেষে আমি নির্বাচনের ব্যবস্থা করলাম। আগের তিনবারের মত এবারও বেশ স্বচ্ছ নির্বাচন হল। পরাজিত দল ছাড়া বাকী সবাই এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিল। মনে হচ্ছিল এই যাত্রা হয়তো বা আমি বেঁচে গেলাম। কিন্তু তা হল না। আমার কারণে অন্য আরেকটি যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, সেই কারণ দেখিয়ে আমার মৃত্যু সনদ জারী করা হল। সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে জানাল, আমি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমার কারণে বিচারালয় ধ্বংস হতে বসেছে। আওয়ামীরা সুযোগটা লুফে নিল। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁদের ছিলই। রায়ের বাহানায়, আমার মৃত্যু নিশ্চিত করতে সংবিধানে সংশোধনী আনা হল। অনেকটা আমার আদল রাখলেও, শীর্ষ পদে, নির্বাচন কালীন সময়ে, দল নিরপেক্ষ ব্যক্তির পরিবর্তে একজন দলীয় লোক রাখবার ব্যবস্থা করা হল।

আমার মৃত্যু যদিও অবস্বম্ভাবী ছিল, তারপরও এতো দ্রুত হবে, সেটা অনেকেই ভাবেনি। দুই দল যে কেবল চর দখলের জন্যই নির্বাচন করে, এই তথ্য জনগণ বুঝে গেলেও, মেনে নিয়েছিল। একের পর এক দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে হওয়া কারচুপি আর তারপরে হওয়া সহিংস কিংবা অহিংস রাজনীতি দেখতে দেখতে ক্ষুব্ধ দেশবাসী আমাকে পেয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ভেবেছিল, দুই দল তাঁদের জন্য কিছু করুক আর না করুক, নির্বাচন এবং নির্বাচন নিয়ে হওয়া সহিংসতা থেকে তো অন্ততঃ রেহাই পেলাম। তাঁদের কপালে সেই সুখ সইল না।

যদিও আমার মৃত্যুর দিন ক্ষণ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কেউ ভাবেন চতুর্দশের পরেই মৃত্যু হয়েছে, কেউ বলেন ১/১১র কারণে, আবার কারো মতে পঞ্চদশের কারণে। আসলে আমার মৃত্যুর বীজ লুকিয়ে আছে, আমার অধীনে হওয়া নির্বাচনগুলোর ফলাফলে। সেই নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে তেমন কোন প্রশ্ন না থাকলেও যে সমস্যাটা দেখা দিল তা হচ্ছে প্রত্যেকবারই তৎকালীন বিরোধী দল জয়লাভ করল। এমন একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে গেল, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন মানেই, নিশ্চিত বিরোধী দলের বিজয়। বিরোধী দলের সুনিশ্চিত বিজয়, সেই নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা আর সর্বোপরি সুষ্ঠু নির্বাচন করার এই সক্ষমতাটিই হয়ে দাঁড়াল আমার মৃত্যুর মৃত্যুর কারণ। ‘আপনা মাংসে হরিণ বৈরী’।

৯৬এ আমার অধীনে হওয়া দ্বিতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের পরই সম্ভবতঃ বিএনপি ঠিক করেছিল, আমার ওপর ‘সার্জারি’ করার। ২০০১এ ক্ষমতা পাওয়ার পরেই, খুব ভালমতোই জানতো, ২০০৭এ আমার অধীনে নির্বাচন হলে, সেখানে তাঁদের শিকে ছিঁড়বে না, আবার আওয়ামীরা আসবে। আর সেই পরিস্থিতি আটকাবার জন্য, আইনগত ভাবে তাঁদের করণীয় তেমন কিছু ছিল না। আমাকে বাতিল করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ৯৬এ তেমন কাজ করতে যেয়ে তাঁরা বেশ ভুগেছে।

বিচারবিভাগে দলীয়করণ শুরু করলেও তার সুফল পেতে এখনও ঢের দেরী। সেই মুহূর্তে তাঁদের মাথাব্যাথা ছিল ২০০৭। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবে চললে নিজেদের পছন্দের লোক আমার প্রধান হতে পারবে না। তাই আপাততঃ যে ফর্মুলার আমদানি করল তা ছিল বিচারকের বয়স বৃদ্ধি। ২০০১এ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়াতে, সুযোগটাও তাঁরা পেয়ে গেল। গলা টিপে না মারলে, বেশ মারাত্মক আঘাত আসল আমার ওপর। তবে বিএনপির শেষরক্ষা হল না। ১/১১ আসল।

১/১১এর পরে মনে হয়েছিল আমার ওপর থেকে দুর্যোগের মেঘ সরে গেছে। আমার ওপর ‘সার্জারি’ করতে গিয়ে বিএনপি যেভাবে ভুগল, তাতে মনে হয় না আমাকে আর কাঁটা ছেঁড়ার সাহস কেউ দেখাবে। কিন্তু তেমন কিছুই হল না। ১/১১এর সময় আমার দ্বায়িত্বে থাকা মানুষগুলো যেভাবে দুই নেত্রীকে শ্রীঘরের হাওয়া খাওয়ালো, তারপর আমাকে শৃঙ্খলিত কিংবা নখদন্তহীন করার একটা চেষ্টা যে হবে, বোঝাই যাচ্ছিল। তবে একেবারে মেরে ফেলা হবে, কেউই হয়তো বোঝেনি। যাই হোক, সেই সময়ের শাসনকাল কিংবা বিরোধী দলের বিজয়ের গ্যারান্টি, যেকারনেই হোক, আমাকে আমার পরিণাম ভোগ করতেই হল।

আমার মৃত্যু নিয়ে আমার তেমন কোন নালিশ নেই। আমাকে ছাড়াও পৃথিবীর অনেক দেশে নির্বাচন হচ্ছে, এবং বেশ ভালভাবেই হচ্ছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এদেশেও আমাকে ছাড়া নির্বাচন হবে। তবে সেজন্য জরুরী রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাস। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিরোধী দলের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ। দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসনের সর্বস্তরে নিজেদের লোক বসানোর মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে, পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা।

যে কাজগুলো করে আমি সুষ্ঠু নির্বাচন করতাম তার বেশির ভাগ কাজই নির্বাচন কমিশনকে দিয়েই করানো যায়। সেখানে প্রধান হিসেবে কে নিয়োগ পাবে, তার যদি একটি সুষ্ঠু উপায় বের করা যায়, সরকার, বিরোধী দল সহ আরও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি একটি প্যানেলের মাধ্যমে এর প্রধান নির্বাচন করা যায়, নির্বাচনকালীন সময়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাঁদের অধীনে রাখা যায়, প্রশাসনের রদবদলের কিছু ক্ষমতা তাঁদের হাতে রাখা যায়, তবে হয়তো আমাকে আর প্রয়োজনই পড়বে না।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে না, তেমন কিছু হবে। আওয়ামীরা যেভাবে আমার অবসান চাইছে, নিতান্ত বাধ্য না হলে, মনে হয় না আমাকে আর জীবিত করবে। বিএনপির যা অবস্থা, আমাকে বাঁচাবার আন্দোলন করবার তেমন কোন ক্ষমতাও ওদের নেই। সুশীল সমাজের উচ্চবাচ্য নিয়েও অনেকে সন্দেহ করছে। ভাবছে, আমার মাধ্যমে কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা পাওয়ার লোভে তাঁরা এসব চিৎকার চেঁচামেচি করছে। ফলে, স্বাভাবিকভাবে আমার জীবিত হওয়ার তেমন কোন পথ নেই। জানিনা আমার কি হবে। পুনরায় জীবন ফিরে পাব, না আমার চিরস্থায়ী মৃত্যু হয়েছে, সময়ই বলে দেবে। আমাকে নিয়ে আরও কিছু আন্দোলন, আরও কিছু মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে, আওয়ামীদের নতুন ফর্মুলায় সবাই সায় দেবে, তার অপেক্ষায় আছে দেশবাসী। এই শীতকালের মধ্যে কিছু একটা না ঘটলে, মনে হচ্ছে, ২০১৯এর আগে আমার ব্যাপারে নতুন কোন সিদ্ধান্ত হবে না। কি আছে আমার ভাগ্যে তা দেখার জন্য, আপনাদের মত আমিও অপেক্ষায় আছি।

জিয়া হায়দার ও জাফর ইকবাল

1

রেজাউল করিম রনি

জাফর ইকবালের আবেগী ফটকাবাজি ও জিয়া হায়দার রহমানের সূত্রধরে আামদের বুদ্ধিজিবিতা নিয়ে কুইক মন্তব্য:

“within any given system, there are claims, which are true but which cannot be proven to be true…
–Zia Haider Rahman, `In the light of what we know’.

“ওর কান্ডজ্ঞান আমারে মুগদ্ধ করছে। প্লেবয় সশী থারোরে জিয়া যখন ধুয়ে দিল তখনই অামি বুজেছি এই চিজ অন্য কিসিমের। রাবীন্দ্রিক বলয় ভেঙ্গে ফেলতে ওর প্যাটার্নটা কাজে লাগবে। যদিও ও একটু হট মেঝাজের পুলা।”– রেজাউল করিম রনি ( ওর সাথে দেখা করার পরে,২৩ নভেম্বর ২০১৪ তে প্রথম স্টেটাস এ কথা কইছিলাম)
বাংলাদেশের মিডিয়া বিশেষ করে প্রথম আলো যখন জিয়াকে ব্যাপক কাভারেজ দিতে শুরু করছে,তখন একটু অবাক হইছিলাম। এটা তো করার কথা না। কারণ জিয়া তো পাকিস্তানকে ঘৃণা করে না। জিয়া সেক্যুিলারিটিকে ধুয়ে ফেলছে। জিয়া পশ্চিমা আধুনিকতার তলায় হেমার দিয়া এমন এক বারি মারছে যে এর তলাটা ফুটা হয় হয় করতাছে। পশ্চিমে উপন্যাসের বাজার তৈরিতে যেসব ম্যাকানিজম কাজ করে তা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নাই। গার্ডিয়ান জিয়াকে লাইম লাইটে আনছে ( এতে মূল ভূমিকা নিছে এজেন্টরা)। প্রথম আলো ও অন্য কাগজগুলা গার্ডিয়ানকে ফলো করছে কানার মতো। যা হোক অামি জিয়ার একটা ইন্টারভিউ করেছি ঢাকাতে। তার পরে দ্রুত বইটা পড়ে একটা খসড়া লেখা লিখেছি(নিচে লেখার লিঙ্কটা দিছি), দেখলাম যারা জিয়াকে নিয়ে কথা বলছে এদের বেশির ভাগই জিয়ার বইটা পড়ে নাই। আর সবচেয়ে অবাক হইলাম এরা কেউ বলতে পারছে না জিয়া কেন জরুরী। মিডিয়া হুজুগের বাইরে জিয়া আসলে কেন গুরুত্বপূর্ণ তার কোন রিডিং আমি দেখি নাই। জিয়ার বইটা হজম করার জন্য যে ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে সুবিধা হয় তা বাংলাদেশের পাঠকদের সবার নাই্। পাঠকরা দেখলাম আহাম্মকের মতো জিয়াকে প্রশ্ন করতেছে, ‘আপনার বইয়ের চরিত্র ( যে ঘনটা বর্ণনা করছে) হেতে পাকিস্তানী কেন?
জিয়া পাঠকদের প্রশ্ন শুনে বেশ বিরক্ত হইছে। কিছু ভাল প্রশ্ন ছিল অবশ্য। বাংলাদেশের হাকাও জাতীয়তাবাদ একটা ঘৃণার সংস্কৃতির উপর প্রতিষ্ঠিত এটা জিয়া চক করে ধরে ফেলেছেন। ফলে সে বাংলাদেশের চতনাধারি লোকদের একরকম ইগনোরই করছে। বাংলাদেশ নিয়া সে যে প্রগতীশীলদের মতো গদগদ না এটা বইটার রিভিউ পড়েই টের পাইছিলাম। পরে হাতে নাতে প্রমাণ পাইলাম। যাক মূল আলাপে ফিরি।

আবুল মকসুদ একজন পেশাদার বুদ্ধিজিবি। তাঁর বুদ্ধির চেয়ে কাফনের কাপড় জড়াই হাটাচলা উনারে বেশি পরিচিতি দিছে এটা অনেকে মনে করেন। এটা হতেই পারে। প্রতিকের একটা গুরুত্ব আছে। সহজে চেনার জন্য এটা ভাল। আপনি যদি সব জায়গায় কাফনের কাপড় পড়েন, ফাইভ স্টার হোরেঠে লুঙ্গি পড়ে যান আপনাকে দ্রুত চোখে পড়বে। এটা ভাল টেকনিক। উনার কোন লেখা না পড়লে বাংলাদেশের কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতি হবে না। মানে চিন্তার ব্যাসিক কোন কনট্রিবউশন নাই। বাট, কিছু কোদালি কাজ করছেন তিনি। বেশ কিছূ গবেষণা বই আছে। যারা এসব বিষয়ে কাজ করবেন পরে এদের জন্য এগুলা ইউজফুল হবে। যাক তিনি জিয়ার একটা কথা ধরে প্রথম আলোতে একটা চিকনা কলাম লেখছেন। কলাম লিখে তিনি জিয়ার কথার সাথে গভীর অসন্তোষে সহমত পোষন করেছেন। কথাটা হলো, ‘বাংলাদেশ মৃত আইডিয়ার দেশ’

পরে গত শুত্রবার বাংলার বুদ্ধিজিবিতার জিবন্ত ‘কৌতুক’ জাফর ইকবাল একটা লেখা লিখেছেন। জাফর ইকবালের লেখা-লেখি বাংলা সিনেমার থিউরি ফলো করে আগায়। আপনি যদি ‘আবগে না কান্দেন’ -তাইলে মূল্য ফেরত টাইপের লেখক তিনি। তিনি মেইনট্রিম মানে আওয়ামী স্টিমারের যাত্রী। প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানপ্রচারক( আধুনিক কালের যাজক বরতে পারে) তিনি ড্রোন বিশেষজ্ঞ। আলোর ঠিকাদার। উনি বুদ্ধিজিবিতা বলতে বুঝেন, ‘চেতনা’ ‘কলোনিয়াল দেশ প্রেম’ ‘৭১’ তিরিশ লাখ’ মা-বোনের ইজ্জত’ তিনি বিভিন্ন এনজিও টাইপের উদ্যোগকে বিপ্লব মনে করেন এবং এগুলার খাস সৈনিক তিনি। ফলে শহরের ফার্মের মুরগি টাইপের কিছু পুলাপান জাফর ষ্যার বলতে অজ্ঞান। এইসব মিলে তিনি একজন মিষ্টি মানুষ। দুনিয়া সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর রাখার দক্ষতা তার আছে এটার কোন প্রমাণ আমি পাই নাই। মনে হয় সব কিছুতে একটা সমাধান হইল আবেগঘন একটা লেখা লিখে ফেলা-এটাই ইকবালীয় স্টাইল। কাঁদো কাঁদো আবেগে ফেটে পড়তেই উনার পাঠক রেডি থকে। তার কোন রকম ইনটেলেক বা ইনন্টারভেনশনাল রোল এই যাবৎ দেখা যায় নাই (শাহবাগে তিনি জাতীয় পতাকার দায়িত্ প্রজন্মে হাতে দিছিলেন, পরে প্রজন্ম গানজার কলকি হাতে নিছে এই দায়িত্ব ফালায়া)।
অন্য অনেকের মতো আবেগের জাহজে উঠায়া তিনি কিছু মিসকনফিডেন্ট শো করেন এটা বাংলাদেশের অক্ষম রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্রের সাথে একাকার ( মনে রাখুন রানা প্লাজা শ্রমিক উদ্ভার নিয়ে সরকারের মিথ্যা বাচালতা)। বাংলাদেশের বুদ্ধিজিবিতার মতো অসুস্থ্য কোন খাত আছে কি না খুজে দেখতে হবে। এখানে এখনও কাল্টফিগার বানানোর প্রতিযোগিতা চলে। ব্যাপক অযোগ্যতা নিয়া শিক্ষার অহংকারে ফেটে পড়ে আমাদের প্রগতী-অন্ধরা। যাক জাফর ইকবাল কি লিখল? লেখাটা মধ্যে ২ টা পয়েন্ট আছে। তিনি নিজেকে জিয়া হায়দার ও আবুল মকসুদের চেয়ে বিশ প্রগতীশীল বলে দাবি করলেন। ২. তিনিও ১৮ বছর বিদেশে ছিলেন এবং বিদেশে থেকে দেশ নিয়ে কথা বলা অনুচিত তাই তিনি দেশে এসে দেশ নিয়ে কথা বলছেন। এর বাইরে আর কোন পয়েন্ট আমি পাই নাই। এটা আমার মূর্খতা হলেও হতে পারে।

১. জিয়া ও মকসুদ সাহেব দুজনেই বলেছেন, ২ মহিলা দেশকে মৃতদের লাশের উপর ভর করে শাসন করছে(রিপোর্টসূত্রে)। এরা দু জন যে ‘প্রধানমন্ত্রি’ এটা না বলে ‘মহিলা’ বলাটা পশ্চাৎপদতা। জাফর ইকবাল এখানে নারীবাদি পজিশন নিয়ে নিজেকে এই দুজনের চেয়ে বেশি প্রগতীশীল প্রমাণ করলেন। আশা করি আপনারা একমত হবেন, এটা নিয়ে কথা বলার কোন মানে হয় না। এই ২ জন নারী-পুরুষ বা বনমানুষ যাই হোক না কেন তাতে জিয়ার কথার মেরিট নষ্ট হয় না। আর ক্ষমতার কোন জেন্ডার নাই। ফলে নারীকে নারী নামে ডাকার মধ্যে কোন সমস্যা নাই। জাফর ইকবাল এখনও গ্রাম্যতা ত্যাগ করে পুরাপুরি আধুনিক হওয়ার লড়াইয়ে আছেন ফলে এটা তাঁর কাছে একটা কঠিন চিন্তার বিষয় হইছে।

২. বাংলাদেশের যারা বিদেশে পড়ে দেশে ফিরে এরা কিছু টার্ম মুখস্ত করে নিজেরে পন্ডিত ভাবতে শুরু করে। এটা আমারে কইছিল আজফার ভাই। আমার কাছে এদের অবস্থা হলো, এমন একটা গরুর মতো যে তার গোয়াল চিনতে পারতেছে না। গোয়াল ঘর না চিনতে পেরে আবুল তাবুল ছুটাছুটি করতে করতে গোবরের নালায় এসে উস্টা খায়, এবং তখন শুরু করে সাগরের গপ্প।

এই হলো বিদেশ ফেরত বুদ্ধিজিবির হালত।

এরা কেউ অরগানিক হইতে পারে না হীনমন্যতার কারনে। পশ্চিম নিয়ে একটা অবসেশন থেকে যায়। এরা নিজেরে ব্রক্ষণ মনে করে। বাট কেউ এদের পুছে না। কারণ এরা যে চিন্তায় আটকা পড়ে আছে তা পশ্চিমে ২০০ বছর আগেই বাদ হয়ে গেছে। এটাই দেশে এসে অণুবাদ করতে যায়া তালগোল পাকায় ফেলে। গ্লোবাল এপরোচটা ধরতে পারে না। খালি সুযোগ দিতে চায়। বাংলাদেশের দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বুদ্ধিজিবিরা আামদের দেশে যাতা আমদানি করেছে এতোদিন। এখন এই অবস্থাটার অবসান হতে চলেছে। কারণ গ্লোব ইজ এভরি হয়ার। ফলে জাফর ইকবাল যখন বলেন, আমিও ১৮ বছর বিদেশে থেকেছি। পড়েছি। তিনি উম্মাদের মতো জিয়াকে পশ্চিমা দলের লোক বলে নিজে জাতীয়তাবাদি বীর সাজতে চান। অথচ বাস্তবতা হলো জিয়া পশ্চিমকে যে থাপ্পরটা দিয়েছেন, এটা কল্পনা করলেই জাফরদের দম শুকায়া যাবে। তার লেখা পড়ে বুঝা যায় জিয়ার এই সফলতা তারে প্যারা/পিড়া দিতেছে। ১৮ বছর কেন ১৮ হাজার বছর বিদেশ থাকলেও যার কান্ডজ্ঞানই থাকে না তার ডেলিভারি জাফরইকবাল টাইপেরই হবে। বিদেশে পড়াটা বা যাওয়াটা যারা জাতীয় ঘটনা মনে করে এরা যাস্ট কুশিক্ষার প্রোডাক্ট। জিয়া আইডিয়া ও চিন্তাশীলতার যে জায়গায় গিয়ে পশ্চিমকে ধোলাই দিছে এটা করতে হলে যে পরিশ্রম ও অভিনিবেশ লাগে তা কোন ভাড় বুদ্ধিজিবিতা দিয়ে এচিভ করা যাবে না। জিয়ার বইটা নিয়ে জাফরের কোন কথা চোখে পড়েনি, তার কি কথা নিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট করেছে এতে বাংলাদেশের ইজ্জত গেছে –তাই নিয়ে উনি চিন্তিত। জাফর ইকবাল টাইপের লোকজন যতদিন তথাকথিত মূল ধারা থাকবে ততদিন বাংলাদেশের কোন ইনটেলেকচুয়াল ইজ্জত তৈরি হবে না আমি বাজি ধরে বলতে পারি এটা। বাংলাদেশের লোকজন (শিক্ষিতরা) কি পরিমান ফাটকা তা জিয়াকে নিয়ে মিডিয়াবাজি ও জাফর ইকবালের অক্ষম আউটবাস্ট দেখে বুঝা গেল। বাংলাদেশে চিন্তাশীলতার নামে কিছু লোক জাতীয়তাবাদি জিকির তুলছে, কিছু লোক তাত্বিক কেলেঙ্কারি করছে… আর কিছু লোক নিজের অশিক্ষা-কুশিক্ষাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জোড়ে জ্ঞান বলে চালিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের অরগানিক ইনটেলেকচুয়াল কই? আর একটা দল আছে এরা অরগানিক ধান্ধাবাজ। কোন ইনডেপ্থ ক্যাপাসিটি নাই খালি রেটরিক্যাল কথা বলে বাজার গরম করতে মরিয়া হয়। ইস্যু দেকলে আলোর পতঙ্গের মতো ঝাপাই পরে। এদের নষ্টামিকে আমি থিওরিটিক্যাল স্কেন্ডাল বলি, এরা সবচেয়ে বেশি বিভ্রন্ত করতে সক্ষম। এর বাইরে কিছু পার্টিজান লোক আছে বুদ্ধিজিবি নামে। আর ব্যাপক ভাবে আছে নিজেকে কাল্ট ফিগার বানানোর প্রতিযোগিতা। আমি থিওরিটিক্যাল ভায়োলেন্স করে এই সব কাল্টফিগার ও মিসকনফিডেন্ট কেরেকটার ভেঙ্গে দিতে আপনাদের দাওয়াত দিতে চাইতাছি আপদত।

জিয়াকে নিয়ে আমার লেখা থেকে কয়েক প্যারা…
“সাম্প্রতিক এক আলাপে বলেছেন, বাংলাদেশ মৃত্য আইডিয়ার উপত্যকা। কী অর্থে, এখানে আইডিয়া দ্বারা আলোড়িত হওয়ার চেয়ে মৃতদের ছায়ার দ্বারা আমরা বেশি আলোড়িত। তিনি মনে করেন, এখানকার ক্ষমতাসীনরা মৃতদের ছায়ার ওপর দাঁড়িয়ে একটা পারিবারিক শাসন কাঠানো তৈরি করেছে।
তিনি বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন টেরিটরির বা ভাষার অর্থে বোঝেন না। তিনি বোঝেন বিশ্ব বা গ্লোবের মধ্যে অন্য সব বিষয় আশয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। বাংলাদেশের হূদয় হতে এ যেন একটা প্রকৃত বিশ্ব আওয়াজ। কথাটা ঠিক হল না সিলেটি হূদয় হতে বিশ্ব আওয়াজ। বাংলাদেশে বা এ ধরনের সাংস্কৃতিক-কলোনিয়াল এলাকার জন্য জিয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ লেখক এজন্য না যে তিনি গ্রামে বা রুরালের জন্ম নিয়ে বিশ্ব ফেনোমেনা হয়েছেন।
তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তিনি মানবসত্তার লড়াইটা ধরতে পারেন। তিনি বোঝেন আইডিয়া বা চিন্তার লড়াই দিয়ে কেন্দ্র-প্রান্ত একাকার করে দেওয়া যায়। তিনি পশ্চিমকে ডিসেন্টারিং যেমন করতে চেয়েছেন তেমনি প্রান্তের টেনশনকে লোকাল সংস্কার থেকে মুক্তি দিয়েছেন। বিদ্রোহের এমন ধারালো, ক্ষ্যাপাটে ধরন পৃথিবীর জন্য অতি জরুরি ছিল। ২১ শতক যেন জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। জিয়ার আওয়াজ শুনছে বিশ্ব।”

(জিয়া হায়দার রহমান: এক বিস্ময়কর বিশ্ব-আওয়াজ–রেজাউল করিম রনি, দৈনিক সকালের খবরে প্রথম প্রকাশিত)

“জিয়া হায়দার রহমান এখন একটা ফেনোমেনা/ঘটনা। আর বাংলাদেশের মিডিয়াতে জিয়াকে নিয়ে যা চলছে তা ফ্যাশনের পর্যায়ে চলে গেছে। শুরু থেকে জিয়া হায়দার রহমানকে যে কারণে বাংলাদেশে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা হল, তিনি ‘বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত’ বলে। মজার ব্যাপার হল, আপনি যদি জিয়ার লেখা পড়েন বা জিয়ার প্রকৃত কাজের জায়গাটা ধরতে পারেন দেখবেন তাঁকে বাংলাদেশের ব্যাপারে খুব আবেগাপ্লুত দেখা যাবে না।
জিয়ার কথাতেও আপনি হতাশ হতে পারেন। ফলে মিডিয়া যে অতিরিক্ত দরদ তৈরি করছে তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। এবং এই দরদি কাভারেজ জিয়ার কাজের গুরুত্ব বুঝতে ও ‘পাঠ’ তৈরিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। সেদিকে মনোযোগ রেখে আমরা সংক্ষেপে জিয়ার কাজের জায়গাটা বুঝতে চেষ্টা করব।
বিশ্বসাহিত্য ও জিয়া : জিয়া যেই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে লেখালেখিকে এগিয়ে নিয়ে যান এর জন্য তাঁকে কোনো রকম কেন্দ্র-প্রান্ত ধারণার আশ্রয় নিতে হয় না। তারপরেও বাস্তবতা থাকে, তিনি প্রান্তদেশীয় লোক হিসেবে কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক করতে গিয়ে যে ধরনের মুশকিলের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তা জিয়াকে কিছুটা ক্ষ্যাপা করে তুলেছে।
এটাকে বলতে পারেন, সাংস্কৃতিক শ্রেণি সংগ্রাম। জিয়া বারবার শ্রেণির কথা বলে। এই সংগ্রামটা জিয়াকে করতে হয়েছে। এটা করতে করতে তিনি নিজেকে ব্যাপকভাবে ভেঙেছেন। কেন্দ্র-প্রান্তের টেনশন কাটিয়ে নিজের কাজের পদ্ধতিটা ধরতে পেরেছেন। এটা খুব নতুন প্রবণতা, এমনটা বলা যাবে না।
২০০৫ সালে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একটা বই লিখেছেন, ‘ডেথ অব অ্যা ডিসিপ্লিন’। তিনি এর মধ্য দিয়ে তিনি তুলনামূলক সাহিত্যের মৃত্যু ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, তুলনামূলক সাহিত্য বলে কোনো সাহিত্য নেই এই কালে, যা রচিত হচ্ছে তা ‘সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া সাহিত্য’, যা প্রকৃত অর্থে বিশ্বসাহিত্য।
এটা যেখানে বসেই রচিত হোক না, এটা এখন বিশ্বসাহিত্য হয়ে উঠতে পারে। এই ধারণাটা পরিষ্কার করতে গায়ত্রী ‘প্ল্যানেটরি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। জিয়াও সীমানা ছড়িয়ে গেলেন। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া তরুণ এই লেখক কীভাবে সীমানা ছাড়িয়ে গেলেন? ইংরেজিতে তো অনেকেই লিখে। কিন্তু জিয়া কেন এত গুরুত্ব পাবেন?
প্রথম কথা হল, পশ্চিমে বা ইংরেজি ভাষাভাষি লেখালেখির জগতে বিশেষ করে উপন্যাসের বাজার তৈরিতে এজেন্টদের ভূমিকা লেখকদের চেয়ে বেশি। লেখক লিখেন। বাকি কাজটা খুব ঝমকালোভাবে করা হয়। নানা লেখককে নিয়ে বাজার গরম করার জন্য পেশাদার এজেন্ট খুব শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। এরা মিডিয়াতে গিমিক তৈরি করতে বেশ পারদর্শী।
এর ফলে অনেক সময় মিডিয়ার হুজুগ দেখে কোনো লেখককে পাঠ করতে গিয়ে হতাশ হচ্ছেন ঘন ঘন। তেমনি জিয়াকে নিয়ে বিশ্বমিডিয়ার কাভারেজেও এই হাইপ বা ওভারটোনটা ছিল। কিন্তু এই হাইপ কাটিয়ে জিয়া ধীরে ধীরে আপন গুরুত্বে ফিরতে শুরু করেছেন।
জিয়ার কাজের গুরুত্ব আঁচ করে সবচেয়ে কার্যকর ২০০১৪ সালের ১৯ মে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড এজ উই নো ইট’ নামে নিউইয়র্কারে লিখেন জেমস উড। উডের লেখাটা জিয়ার গুরুত্বকে বুঝতে প্রাধমিকভাবে বেশ সাহায্য করে। জিয়া ইংরেজি ভাষা লিখে সীমানা অতিক্রম করেননি। বিশ্বের লেখকে পরিণত হননি। তিনি সীমানা অতিক্রম করেছেন ‘আইডিয়া’ ডিল করে। তাঁর উপন্যাসের ভূগোলও ব্যাপক।”

ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যা, কিছু প্রশ্ন

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে কতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছিলো? সাধারন বাংলাদেশীদের মনে সম্ভবত এই সংখ্যাটি বেশ বড়ো, তবে সেটা ব্যাক্তিভেদে যে কোনো কিছু হতে পারে। অনেকেই মনে করেন এই সংখ্যা শত শত, কিংবা হাজার হাজার। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। কিছু কিছু তথ্য যা সহজে পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে,

১৯৭১ এর ডিসেম্বরে মে: জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডাইরীতে করা ২৫০ টি নামের তালিকা যাদেরকে হত্যার টার্গেট করা হয়েছিলো(1)। বাংলাপেডিয়া’র বুদ্ধিজীবি গনহত্যা পাতায় বলা হয়েছে যে ১৬ই ডিসেম্বরের তিন চারদিন আগ থেকে বুদ্ধিজীবি হত্যার কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৪ই ডিসেম্বর রাতে ২০০ জনেরও বেশী বুদ্ধিজীবিকে তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় (2)।এছাড়া আরো দেখা যায় ১৯৭১ এর ডিসেম্বর ২২ তারিখে আজাদ পত্রিকার একটি সংবাদ যেখানে ভারতের আকাশবাণীকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা, রুহুল কুদ্দুস, বলেন যে কমপক্ষে ২৮০ জন পেশাজীবি ও বুদ্ধিজীবিকে ডিসেম্বরের ১৪ ও ১৫ তারিখে হত্যা করা হয়েছে ঢাকা, সিলেট, খুলনা ও ব্রাম্মনবাড়িয়ায়(3)।  এই রকম আরো কিছু তথ্যের ভিত্তিতে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে ডিসেম্বরের ১২-১৫ তারিখের মধ্যে ঢাকায় ও সারাদেশে কয়েকশত বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে।

আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া সবচেয়ে কুখ্যাত ঘাতক হলো সেই সময়ে ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা ও আল বদর নেতা চৌধুরী মইন উদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খান।  এদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে অভিযোগ ও মামলা করা হয়ে এবং অভিযুক্তরা পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদন্ড শাস্তি পায়। এই শাস্তিটি তাদের অপরাধ অনুযায়ী কোনক্রমেই অবাক করার মতো কিছু নয়, কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো যে ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া এই দুই অপরাধীর বিরুদ্ধে যখন প্রসিকিউশন চার্জ গঠন করে তখন তাদের কে কেবল মাত্র ঢাকায় ১৮ জন বুদ্ধিজীবি হত্যায় অভিযুক্ত করা হয় (4)। প্রসিকিউশনের রিপোর্ট বলে যে এই ১৮ জন বুদ্ধিজীবির মধ্যে রয়েছেন ৯ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ৬ জন সাংবাদিক ও তিন জন চিকিৎসক।

আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি যে প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বর আসলে শত বুদ্ধিজীবি হত্যার কথা বলা হয়, রাও ফরমান আলীর শত জনের লিস্টের কথা বলা হয়, কিন্তু পত্রিকায় নাম ও ছবি আসে ১৫ থেকে ১৯ জনেরই মাত্র। নামসহ যাদের ছবিটি উপরে দেয়া হয়েছে। আমরা আরো দেখলাম যে কোর্টে মামলার জন্যে যখন সুনির্দিষ্ট তথ্যের দরকার পড়লো তখন প্রসিকিউশন মাত্র ১৮ জনেরই একটা লিস্ট হাজির করলো, যে লিস্টটি খুব সম্ভবত প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বরে পত্রিকার লিস্টটির অনুলিপি মাত্র।

 

এই থেকে আমাদের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে ১৪ ই ডিসেম্বর কতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছে? এই ১৮ জন ছাড়া আর কাকে কাকে হত্যা করা হয়েছে? তাদের নাম, ছবি আমরা ১৪ই ডিসেম্বরে কেনো দেখি না? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আজকেই পত্রিকার পাতায় (১৪/১২/১৪)। আজকের New Age পত্রিকায় বলা হয়েছে পুরো ১৯৭১ এ কতো জন বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে এ সম্পর্কে জাতির কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের কাছে কোনো পূর্নাংগ লিস্ট নেই তবে কিছু সরকারী ও ব্যক্তিগত এস্টিমেশন রয়েছে যার সংখ্যার রেন্জ ২৩২থেকে ১১১১ পর্যন্ত(5)। আজকের The Daily Star এ বলা হয়েছে যে এই বছর ৭ই ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ সরকার পার্লামেন্টে ঘোষনা করেছিলো যে ২০১৪ এর জুন মাসের মধ্যেই ১৯৭১ এ শহীদ সকল বুদ্ধিজীবির একটি পূর্নাংগ তালিকা প্রকাশ করবে (3)। জুন পেরিয়ে এখন ২০১৪শেষ হবার পথে, তবে সেরকম কোনো লিস্ট দেখা যাচ্ছে না।

 

উপরে New Age পত্রিকায় যে ১১১১জনের কথা বলা হয়েছে সেটি সম্ভবত বাংলাপেডিয়ার এস্টিমেট। এই এস্টিমেট অনুযায়ী পুরো ১৯৭১ এ নিহত বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে ২১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবি ও প্রায় ৯৫০ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাতীত বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক রয়েছেন(2)। তবে এটি একটি ব্যাক্তিগত এস্টিমেটই, কোনো নির্ভরযোগ্য তালিকা নয়। আজকের New Age পত্রিকায় স্বয়ং শাহরিয়ার কবিরই বলেছেন যে বুদ্ধিজীবি হত্যার কয়েকটি কেস ছাড়া অধিকাংশ তথ্য ও অভিযোগের উপরে কোনো রিসার্চ করা হয় নি (5)।

 

১৯৭১ এর পরে আরো তেতাল্লিশটি ১৪ই ডিসেম্বর আসলেও আমরা এখনো এই প্র্শ্নের উত্তর দিতে পারি না যে ১২-১৫ ই ডিসেম্বর কতো জন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছে? পরিচিত ১৮ জনের বাইরে আর কাদের হত্যা করা হয়েছে? তাদের নাম ছবি কেনো আমরা দেখি না কোনো ১৪ ই ডিসেম্বরে?

 

আমাদের দেশের লোকের একটু লিস্টের ব্যাপারে এলার্জি আছে এটা মেনে নিয়েও বলা যায় লক্ষ-মিলিয়নের লিস্ট না হোক, হাজার জনের লিস্ট তো করা যেতেই পারে, তাই না?

 

[ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবি হত্যা নিয়ে সমর্থিত-অসমর্থিত সকল রকম সংবাদ ও বিশ্লেষনের একটা ভালো সংগ্রহ রয়েছে চৌধরী মইনউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান এর বিচারের রায়ে। দেড়শ পাতার এই রিপোর্টের পিডিএফ কপি রয়েছে এই লিংকে। https://www.dropbox.com/s/3xckpr73pyzap4p/bangladesh_tribunal_chowdhury_mueenuddin_judgment.pdf  ]

 

Reference

(1) http://www.genocidebangladesh.org/?page_id=32

(2) http://www.banglapedia.org/HT/K_0330.htm

(3) http://www.thedailystar.net/cold-killing-design-55227

(4) http://www.dhakatribune.com/bangladesh/2013/oct/31/mueen-ashraf-verdict-sunday

(5) http://newagebd.net/76478/no-complete-list-of-martyred-intellectuals-44-years-on/#sthash.PcYoLBRk.dpbs

দিয়েন বিয়েন ফু হতে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একদল হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রুগী..

By Watchdog BD

সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও দেশটার প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ যেদিন মারা যান সেদিন আমি সোভিয়েত দেশে। সময়টা বোধহয় ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসের কোন একদিন হবে। ১৯৬৪ সালে সেই যে ক্ষমতায় বসেছিলেন নড়াচড়ার নামগন্ধ কোনদিন উচ্চারিত হয়নি। জনগণ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল মহাপরাক্রমশালী সোভিয়েত দেশের প্রধানও কোনদিন মরতে পারেন।

তাই এই নেতার মৃত্যু বড় একটা ধাক্কা হয়ে আঘাত হেনেছিল সোভিয়েত সমাজে। একজন বিদেশী হিসাবে দেশটার ক্ষমতায় কে বসবে আর কে বিদায় নেবে তা একান্তই সে দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসাবে গন্য করেছি। তাই এ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখানোর প্রয়োজন বোধ করিনি। তবে সেমিস্টারের মাঝপথে এ ধরণের রাষ্ট্রীয় মৃত্যু দু’একদিনের জন্য হলেও যে আমাদের জন্য ছুটি নিয়ে আসবে এ ব্যাপারে আশার অন্ত ছিলনা। সময়টা ভয়াবহ শীতের সময়। তাপমাত্রা হিমাংকের নীচে চল্লিশ ডিগ্রির আশপাশে উঠানামা করছে। অতিষ্ঠ ছাত্রজীবনে অতিরিক্ত ছুটি অপ্রত্যাশিত বিশ্রাম ও স্বস্তি নিয়ে আসবে এমন একটা প্রত্যাশায় উন্মুখ থাকতাম ঘোষনার। কিন্তু হায়, দিন গড়িয়ে যায় ঘোষনা আর আসে না। ক্রেমলিনের সামনে রেড স্কয়ারে লাখো মানুষের লাইন, বিদেশ হতে শোক বার্তার মিছিল, পাশাপাশি স্থানীয় ও আর্ন্তজাতিক মিডিয়া তোলপাড় কোনকিছুই আমাদের আন্দোলিত করতে পারেনি। আমরা শুধু প্রহর গুনতাম ছুটি নামক মহেন্দ্র ক্ষণের। শেষপর্যন্ত কাঙ্খিত ছুটির দেখা পেলাম, তবে তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র দু মিনিট। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করতে সপ্তাহ খানেক চলে যায়। তারপর শুরু হয় শেষ বিদায়। যে মুহূর্তে লাশ কবরে নামানো হয় থেমে যায় গোটা দেশ। দু মিনিটের জন্য যে যেখানে ছিল দাঁড়িয়ে যায়। থেমে যায় গাড়ি, ট্রেন, বিমান সহ সব ধরণের যানবাহনের চাকা। কারখানা গুলো হতে দু মিনিটের জন্য বিরামহীন ভাবে বাজাতে থাকে সাইরেন। এভাবেই বিদায় নেন সোভিয়েত লৌহমানব লেনিন, স্তালিন ও ক্রুশেভের উত্তরাধিকারী লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ। ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভুত হন নতুন নায়ক কনসটানটিন উস্তিনভিচ চেরনেন্‌কো।

ছুটি বিহীন এ ধরণের মৃত্যু কিছুটা হলেও হতাশ ও অবাক করেছিল আমাদের। এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে আমাদের বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ বিষয়ের শিক্ষক ছোটখাট একটা লেকচার দিয়ে জানালেন জাতিকে ছুটিতে পাঠিয়ে মৃতকে সন্মান দেখানোর রেওয়াজ দেশটায় চালু নেই। বরং অতিরিক্ত উৎপাদনই হতে পারে নেতার প্রতি যথাযোগ্য সন্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন। তর্ক বিতর্কের দেশ ছিলনা সোভিয়েত সাম্রাজ্য, তাই এ নিয়ে ত্যনা পেঁচানোর সুযোগ ছিল সীমিত। সপ্তাহ না ঘুরতে ব্রেজনেভ পর্ব পিছনে ফেলে জাতি এগিয়ে গেল নতুন উদ্যমে। ১৮ বছর যে মানুষটার মুখের কথায় সাইবেরিয়া হতে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত উঠাবসা করত, ১৮ দিনের মাথায় সে মানুষ ঠাঁই নিল ইতিহাসে। আমরাও ভুলে গেলাম ছুটি না পাওয়ার কষ্ট। তবে এ নিয়ে আমার শিক্ষকের করা মন্তব্যটা কেন জানি মগজে গেথে রইল, এবং সারা জীবনের জন্য। ছুটি, সভা, সেমিনার, বোমা ফাটানো কলম ঝড়, মুখ ফাটানো স্তুতি বন্দনা বাইরে গিয়েও মানুষকে সন্মান, শ্রদ্ধা জানানো যায়, সোভিয়েত দেশে ব্রেজনেভের বিদায় ক্ষণ হয়ত তারই মাইলস্টোন।

প্রতিটা জাতির কিছুনা কিছু ঘটনা থাকে যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় তার বর্তমান ও ভবিষৎ। বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সাল ছিল তেমনি একটা বছর। স্বাধীনতার জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে সংগ্রাম হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে। দখলদার শত্রুকে পরাজিত করে বিজয়ী জাতি মাথা উঁচু করে পৃথিবীর বুকে পা ফেলেছে, ঝাঁপিয়ে পড়ে উন্নতির দৌঁড়ে সামিল হয়েছে। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, মাথার উপর ছাদ এবং স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর লড়াই করতে গিয়ে শত্রু-মিত্রের সমীকরণ নতুন করে কষতে হয়েছে। সভ্যতা এভাবেই এগিয়ে গেছে এবং সামনে হয়ত এভাবেই এগুতে থাকবে হাজার বছর ধরে। আমার বন্ধু নগুয়েন চি থানকে দিয়েন বিয়েন ফু হতে শুরু হওয়া যুদ্ধের দাবানল হতে সরাসরি পাঠানো হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। তাদের জানা ছিল যুদ্ধ চিরস্থায়ী নয় এবং স্বাধীনতার আসল ফসল ভোগ করতে প্রয়োজন হয়ে যোগ্য মানুষের। কেবল গোটা পরিবারই নয়, নগুয়েনের নিজের শরীরের অনেকাংশ পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিল মার্কিন নাপাম বোমার আঘাতে। এতগুলো বছর পর সে নগুয়েনের নাতিকে আসতে হচ্ছে মার্কিন মুলুকে। পোষাক শিল্পের বাজারের সন্ধানে ঘুরতে হচ্ছে ম্যানহাটনের ৫নং স্ট্রীটে। জানিনা নগুয়েনের শরীর হতে নাপাম বোমার ক্ষত গুলো ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে কিনা। হয়ত ক্ষত নিয়েই ওদের ঘুরতে হচ্ছে, এবং এমন একটা দেশে যে দেশের বি-৫২ বোমারু বিমানের কার্পেটিং বোমায় জ্বলে, পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছিল ভিয়েতনামের জনপদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ৭১ সালে শেষ হয়নি। যুদ্ধ চলছে এবং চলতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। আমরা যারা যুদ্ধকে কাছ হতে দেখেছি, যুদ্ধের ভাল-মন্দের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী হয়েছি তাদের কথা ও কাজে যতটা না যুদ্ধের প্রভাব তার চাইতে হাজার গুন প্রভাবে টইটম্বুর জাতির নতুন প্রজন্ম। অনেকটা হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মত মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনার বায়বীয় বেলুনে ভেসে বেড়াচ্ছে এ প্রজন্ম। নতুন এ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানেই পাকি ও রাজাকার ’পুন্দানী’, যুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তি নিয়ে রাজনীতির মাঠ তথা সোস্যাল মিডিয়ায় লাখ লাখ কর্মঘণ্টা ব্যায়। অথচ চেতনার অপর পীঠে এ দেশে রাজত্ব করছে ভয়াবহ দুর্নীতি, হত্যা, গুম সহ লুটের সুনামী। স্ববিরোধী এসব দেশপ্রেম জাতির অসুস্থতারই বহিঃপ্রকাশ।

স্বাধীনতা তথা দেশপ্রেম কেবল জামাত, পাকিস্তান, রাজাকার অধ্যায় নিয়ে তোলপাড় আর যুদ্ধাপরাধী বিচার দাবির মধ্যেই সীমিত থাকার কথা নয়, এর বাইরেও জাতির কিছু চাওয়া পাওয়া আছে। এসব চাওয়া পাওয়া চেতনার বেলুন হতে মাটির ধরণীতে নামিয়ে আনার জন্যই আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। চাপাবাজি ও ফাঁকা স্টেটাসের বাইরে গিয়েও মুক্তিযুদ্ধকে সন্মান করা যায়। একটা সুস্থ, সবল, ঐক্যবদ্ধ জাতি ও স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর নিশ্চয়তার সমাজ হতে পারে এর মাইলস্টোন।

বিচারাধীন মামলার গনযোগাযোগ সম্পর্কিত প্যারাডক্সঃ কামারুজ্জামান প্রসঙ্গে

1

By Ariful Hossain Tuhin

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট, মামলা চলাকালীন সময়ে, কোর্টরুমে ভিডিও ক্যামেরা নিষিদ্ধ করেছে অনেকদিন আগেই। এই নিয়মের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জাস্টিস স্কালিয়া বলেন [১]

For every ten people who sat through our proceedings, gavel to gavel, there would be 10,000 who would see nothing but a 30-second take-out from one of the proceedings

প্রতিটি মামলার বিবরণ যেহেতু সকলের জন্য উন্মুক্ত, এমনকি যেকোন নাগরিক মামলা চলাকালীন সময়ে উপস্থিত থাকতে পারেন, সেহেতু সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা, ক্যামেরা নিষিদ্ধের পেছনে যে চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে সেটি অবশ্যই গোপনীয়তা নয়। বিচারপতিরা ভাবছেন কেউ যদি আউট অফ কনটেক্সট ছোট একটি ভিডিও দেখেন তাহলে সুপ্রীম কোর্টের বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে ভুল ধারনা তৈরী হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

যেকোন মামলা একটি জটিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বোধ্য প্রক্রীয়া। মামলা বোঝার জন্যে তাই শ্রম এবং একাগ্রতা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচারপতিরা তাই কোর্টরুমে কাগজ কলম ছাড়া আর কোন কিছুই এলাউ করেন না। কাগজ কলম নিয়ে মনোযোগ দিয়ে মামলা শোনা ছাড়া রিপোর্টারদের তাই আর কোন কিছু করার নেই।
সুতরাং একটি বিচারাধীন মামলা একটি জটিল প্রক্রীয়া। একে খুব সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, ভুলব্যাখ্যা কিংবা আউট অফ কনটেক্সট উদ্ধৃতি দিয়ে।

যেসকল দেশে জুরি ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, সেখানে অনেক মনোযোগ দেয়া হয় যাতে জুরিরা কোর্টে উপস্থাপিত তথ্য প্রমাণাদির বাইরে কোন তথ্য দ্বারা প্রভাবিত না হন। তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয় যাতে তারা নিজেরা এই ব্যাপারে স্বতপ্রনোদিত ভাবে কোন রিসার্চ না করে, পত্রিকা বা ইন্টারনেটে মামলা সংক্রান্ত খবর না দেখে, ইত্যাদি। কিন্তু সবসময়, বাস্তব সমস্যার জন্যেই এই ব্যবস্থা কাজ করে না।
দেখা যায় জুরিরা তাদের মামলা নিয়ে ইন্টারনেটে রিসার্চ করছেন।[২] এর ফলশ্রুতিতে অনেকসময় জুরিদের উপর কোর্ট বহির্ভূত প্রভাব পরে।
গনসংযোগ ক্যাম্পেইন(পি আর ক্যাম্পেইন) সাধারনত অভিযুক্ত আইনজীবির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। কারন জনগনের মতামতের একটি পরোক্ষ প্রভাব বিচার প্রক্রীয়ায় থেকেই যায়। অন্যদিকে সরকারী প্রসিকিউটরদের কখোনো পি আর ক্যাম্পেইন চালাতে দেখা যায় না। পৃথিবীর সকল সরকারী কর্মচারীদের একটি সাধারন প্রবণতা হচ্ছে নিজেদের কাজের কোন “মার্কেটিং” না করা।

সরকারী কর্মচারীদের যে পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়, তা “মার্কেটিং” এর জন্যে উপযোগী নয়। এছাড়াও সরকারী কর্মচারীদের আসলে “মার্কেটিং” এর কোন ইনসেন্টিভ নেই। তাদের পেশাগত সাফল্য নিজেদের কাজের মার্কেটিং এর উপর নির্ভর করে না। একারনে অনেক বিখ্যাত মামলায় দেখা যায় অভিযুক্ত পক্ষ হতে একপাক্ষিক প্রচারণা চলছে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি সত্য। প্রধানত অভিযুক্ত এবং তার সহমর্মীরাই একপাক্ষিকভাবে বিভিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারী পক্ষ থেকে পালটা প্রচারণার কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সমর্থক যারা, অনেক সময়েই তারা মামলার টেকনিক্যাল ডিটেইলগুলো বেশী চিন্তিত নন। অবশ্যই এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু যদি অভিযুক্তদের প্রচারণার
পরিধি বিচার করা হয় তাহলে আসলেই এ পর্যন্ত পালটা প্রচারণা অথবা বিভ্রান্তির অবসান করার জন্যে তেমন কিছুই করা হয়নি।

পত্রিকায় নিয়মিত মামলার প্রসিডিংস প্রকাশিত হয়। সেগুলোতে নজর রাখলে বেশ কিছু বিষয় চোখে পরে। যেমন প্রসিকিউটরদের আশ্চর্যরকম অদক্ষতা। নিয়মিতভাবে দেখা যায় সম্মানিত বিচারকরা , প্রসিকিউটরদের ভর্তসনা করছেন তাদের বিভিন্ন “ট্রিভিয়াল” ভুলের জন্যে। এত গুরুত্বপূর্ণ মামলা অবহেলায় চলছে এমনটা বললে অতিরঞ্জিত হবে কিনা সেটি নিয়ে নিশ্চিত হবার সুযোগ কমেই ক্রমে আসছে।

সুতরাং তদন্তকারী সংস্থা/প্রসিকিউটরদের বিভিন্ন দক্ষতার অভাব এর সাথে অভিযুক্তদের বিরামহীন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মিলে অনেক মানুষের মনেই বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে। এই প্রশ্নসমূহ অভিযুক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক দল/মিত্রদের দাবীর লেজিটিমেসি তৈরী হবার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করছে।

উদাহরন হিসেবে কামারুজ্জামানের রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকার পর, দোষীর পক্ষে যেসকল প্রচারণা চালানো হয়েছে সেগুলো অনেকের মনে সন্দেহ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। দোষীদের প্রচারনার প্রধান কৌশল ছিল বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন anecdot উল্লেখ করে মামলাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়া।

এটি অত্যন্ত পুরোনো প্রক্রীয়া। প্রথমে দেখা যাক দোষী পক্ষের কিছু অভিযোগের নমুনা। আপিল বিভাগে চুড়ান্ত রায় প্রকাশের পরপরই কামারুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে সোহাগপুর ঘটনার সাথে কামারুজ্জামানের কোন সম্পৃক্ততা নেই এই দাবী করে তার ছেলে হাসান ইকবাল বলেন[৩]

‘এই মামলার মুল সাক্ষীর তালিকায় ৪৬ জনের নাম ছিলো। তাদের মধ্যে ১০ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর নতুন করে তিনজন মহিলাকে অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে প্রসিকিউশন আদালতে উপস্থাপন করেন। ওই সাক্ষীরাও তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে গণহত্যার সময় আমার বাবা উপস্থিত ছিলেন এমন দাবি করেননি।’

মোটামুটি নির্দোষ দেখতে এই দাবীটির মাঝে বেশ কয়েকটি প্যাচ আছে। প্যাচগুলো একটি একটি করে আলোচনা করা যাক। প্রথমত সোহাগপুরের ঘটনার জন্যে রাষ্ট্রপক্ষ ঠিক কি ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে এনেছিল তা দেখা যাক।

 

রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির(ট্রাইবুনালের রায়) ২৯১ অনুচ্ছেদ থেকে আমরা জানি [৪]

 

Muhammad Kamaruzzaman has been charged for
participating, substantially facilitating and contributing to the commission of
offences of ‘murder as crime against humanity’ or in the alternative for
‘complicity to commit such crime’

চার্জের প্রধান গুরুত্ব ছিল “সহোযগিতার”। এই ব্যাপারটি ডিফেন্স কাউন্সিলও তাদের যুক্তিতে উল্লেখ করেছে [৫]

the accused has been
indicted for providing ‘advices’to his accomplices in launching the attack and
it does not describe that the accused accompanied the principal perpetrators

কামারুজ্জামানের সহযোগিতা প্রধানত প্রমান হয় ততকালীন সময়ের আলবদর সদস্য এবং আলবদর ক্যাম্পের গার্ড মনোয়ার মুন্সির সাক্ষ্যে [৬]

Md.
Monwar Hossain Khan @ Mohan Munshi (63), a member of Al-Badar was
attached to the camp set up at Suren Saha’s house as a guard as directed by the
accused Muhammad Kamaruzzaman and in this way he worked at the camp
for the period of 4-5 months and not exceeding 07 months. It has also been
proved that accused Muhammad Kamaruzzaman used to attend meetings on
the first floor of the Al-Badar camp and he [P.W.2] and his ‘sir’
Kamaruzzaman [accused] had fled together from the camp two days before
Sherpur was liberated. As regards the event of Sohagpur massacre P.W.2 does
not claim to have witnessed the event

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে মনোয়ার মুন্সীর কিন্তু দাবী করেনি সোহাগপুরেরে গনহত্যা প্রতক্ষ্য করার। এখন প্রশ্ন এসে যায় কেন এই সাক্ষীর গুরুত্ব বেশী, তা বোঝার আগে এই সাক্ষীর ব্যাপারে ডিফেন্স কাউন্সিল কি বলেছে একবার দেখা যাক। [৭]

the learned defence counsel has submitted that
the event of Sohagpur massacre is not disputed. But the witnesses who have
deposed in support of the charge implicating the accused are not credible.
P.W.1 and P.W.2 are hearsay witnesses

সুতরাং ডিফেন্সের প্রধান যুক্তি ছিল, মনোয়ার মুন্সি(PW2) ঘটনা (সোহাগপুরের গনহত্যা) নিজে দেখেনি(hearsay witness). মনোয়ার মুন্সির সাক্ষ্য সম্পর্কে দুই নম্বর চার্জের ক্ষেত্রে ডিফেন্স কাউন্সিলের যুক্তি ছিল [৮]

He has submitted
that P.W.3 cannot be relied upon as he stated inconsistent date of the event.
Statement made by P.W.2 and P.W.14 on some particulars is inconsistent. Due
to such inconsistencies it is immaterial to see whether the statement made by
them could be impeached by the defence through cross-examination.
Inconsistencies between statements of two witnesses by itself renders them
unreliable and tutored.

 

ডিফেন্স কাউন্সিল ঐ আলবদর ক্যাম্পে কামারুজ্জামানের উপস্থিতি ছিল না সেটি কি প্রমান করতে পেরেছে? সংবাদ সম্মেলনে বারবার হাসান ইকবাল সাহেব বিভিন্ন বই/প্রবন্ধের উল্লেখ করছিলেন যার মধ্যে কামারুজ্জামানের নাম নেই। নাম থাকা আর না থাকা সমান গুরুত্বের অধিকারী নয়। একটি গবেষণামূলক বইয়ে যদি একজনের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য প্রমান উপস্থাপন করা হয় তাহলে তার অপরাধের “প্লজিবিলিটি” তৈরী হয়। কিন্তু কারও নাম উল্লেখিত না থাকা মানে এই না সে অপরাধ করেনি। কারন এটাও হতে পারে সে অপরাধ করেছে, কিন্তু “ডকুমেন্টেড” হয়নি। এই ক্ষেত্রে কামারুজ্জামানের পক্ষে এমন কোন শক্ত এলিবাই কি ডিফেন্স কাউন্সিল দাড়া করাতে পেরেছে যার ফলে প্রমান হয় কামারুজ্জামান ঐ টাইম ফ্রেইমে ঐ আল বদর ক্যাম্পে অবস্থান অসম্ভব ছিল? আমার মনে হয় না পেরেছে। তাদের প্রধান কৌশল ছিল প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের রিলায়েবিলিটি নষ্ট করা। যেমন একজন সাক্ষীর রিলায়েবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারন হিসেবে ডিফেন্স কাউন্সিল উল্লেখ করেছে,[৯]

The learned defence counsel next argued on charge no.2. He has submitted
that P.W.3 cannot be relied upon as he stated inconsistent date of the event

সমস্যা হচ্ছে আমার জীবনে খুব বড় ঘটনার তারিখ জিজ্ঞেস করলেও আমি ভুলভাল বলতে পারি। ডিফেন্স যেটি পারত তা হচ্ছে, ঐ সাক্ষীর, ঐ ঘটনা প্রত্যক্ষ দেখার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রমান উপস্থাপন করতে পারত। সেটি ডিফেন্স কাউন্সিল কি পেরেছে?

হাসান ইকবাল খুব জোর দিয়েছেন, সোহাগপুরে তার বাবার অনুপস্থিতিকে। যেহেতু কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গনহত্যার “সহোযোগিতা”র অভিযোগ আনা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড সংগঠনের সময় তার উপস্থিতি কতটুকু জরুরী? যুক্তরাষ্ট্রের স্টিফেন র‍্যাপের বিবৃতিটি অনেক জোরে শোরে বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে/প্রচার হয়েছে। বাশেরকেল্লায় সম্ভবত একাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে খবরটি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্টিভেন র‍্যাপের বিবৃতিটিতে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে।

ডেভিড বার্গম্যানের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, [৯]

He stated that international law required in such aiding and abetting offences, that the Jamaat leader, knew that the [Al Badr] group was committing atrocities, that he provided assistance to the group with that knowledge. It was not necessary that he attend, but that the assistance that he provided needed to be substantial and in fact something that caused the atrocities committed

সুতরাং হাসান ইকবালের প্রধান দাবীটি, কামারুজ্জামান সোহাগপুরে উপস্থিত ছিলেন না, অপ্রয়োজনীয় হয়ে পরে। যেহেতু সোহাগপুরের গনহত্যার পরিকল্পনা আল বদর ক্যাম্পে হয়, (ডিফেন্স এর কোন বিরোধীতা করেনি), সেহেতু কামারুজ্জামানের এই চার্জ থেকে বাচার জন্যে একমাত্র এস্কেইপ হচ্ছে , তিনি সেখানে কোনভাবেই উপস্থিত ছিলেন না, এই ধরনের কোন প্রমান দাখিল করা।

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল বহির্বিশ্বে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। এর অন্যতম কারন অবশ্যই দোষী এবং অভিযুক্ত পক্ষের প্রচারণা। কিন্তু আমার মনে হয়না অভিযুক্ত পক্ষের প্রচারণা এককভাবে দায়ী। নিজেদের বিভিন্ন লিমিটেশন গুলোকে স্বীকার করেই বলতে হয়, অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে প্রাণদণ্ড। বর্তমান পৃথিবী প্রাণদণ্ডের ব্যাপারে অনেক সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, হয় প্রাণদণ্ড আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করেছে, অথবা প্রাণদণ্ডদানে বিরত আছে।[১০] এই কারনেই বহির্বিশ্বে এই বিচার নিয়ে ঋণাত্নক মনোভাব তৈরী হচ্ছে। এই সমস্যাটি নুরেমবার্গ কিংবা আইখম্যানের বিচারের সময় ছিল না।

 

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় অনেক দোষীকে কখনই দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে না কারন তাদের প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ দেশ , প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের ফেরত দেয় না। বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী চৌধুরী মাইনউদ্দিন কিংবা আশরাফুজ্জামানকেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না তাদের প্রাণদণ্ড হয়েছে বলেই।

 

প্রাণদণ্ডের একটি “ইমোশোনাল এপিল” আছে। ৭১ সালের গনহত্যা/ধর্ষণ ইত্যাদি আমাদের সমষ্টিক স্মৃতিতে একটি দগদগে ঘা। এই ঘায়ের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও প্রলেপ দিতে পারে প্রাণদণ্ড। প্রাণদণ্ড প্রতিশোধমূলক শাস্তি। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর অনেকেই প্রতিশোধ প্রবনতাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাতারে ফেলতে চান না। রাষ্ট্রকে প্রতিশোধ প্রবণতার উর্ধে দেখতে চান। সেই কারনেই প্রাণদণ্ড ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে পৃথিবী জুড়ে।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, জামাত এবং অন্যান্য রাজাকার/আলবদর ইত্যাদির যেসকল অপরাধ করেছে তার প্রায় সমান গুরুত্বের দাবী রাখে এইসকল অপরাধের পেছনে যে মতাদর্শ কাজ করেছে। যেই ফ্যাসিবাদ প্রভাবিত রাজনৈতিক “থিওক্র্যাসি”তে জামাত এবং অন্যান্যরা আস্থা রাখত তা কোনক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিজের দেশের মানুষের উপর নেমে আসা এই মর্মান্তিক ধ্বংস, হত্যা, ধর্ষণের সময়ে যারা ঠাণ্ডা মাথায় পশ্চিম পাকিস্থানের পক্ষ নিতে পেরেছে, তাদের অপরাধের অংশীদারত্ব গ্রহন করেছে, তাদের সাইকোলজি অনেক ভয়ংকর এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকারক। সুতরাং তাদের অপরাধের শাস্তির সাথে সাথে তাদেরকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মতাদর্শিকভাবে ধ্বংস করে দেয়া আমাদের জন্যে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্যে প্রয়োজন ছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যমত্য।

আবারো বলছি বিভিন্ন রাজনৈতিক কারন এবং নেগেটিভ প্রচারণার মাঝেও আমার মনে হয়, আমরা যদি প্রাণদণ্ড অপশনটি টেবিল থেকে সরিয়ে নিতাম, তাহলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যমতে পৌছানো আমাদের জন্যে অনেক বেশী সহজ হত। কিছু বৃদ্ধ রাজাকারকে ফাসিতে ঝুলিয়ে যে তাতক্ষণিক আনন্দ পাওয়া যাবে, তার চেয়ে জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাসের সাথে শেষবারের মত বোঝাপড়া করা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা আন্তর্জাতিক ভাবে অনেক সমর্থন পেয়েছি। এর অন্যতম কারন ছিল, ন্যায় এবং ন্যায্যতা আমাদের পক্ষে ছিল।

ন্যায় এবং ন্যায্যতার দাবী এখন পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে প্রাণদণ্ড ঢেকে ফেলছে বলেই আমার মনে হয়। এ প্রসঙ্গে অকালে চলে যাওয়া অধ্যাপক জালাল আলমগীরের বছর কয়েক আগে বলা কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করছি[১১]

 

We should recognise honestly that after decades of complexities, secret deals, and depraved politics, justice, though necessary and urgent, will be limited.
Such limited justice can be morally justified only by a long-term commitment to truth.
To prioritise truth, we must de-prioritise capital punishment. In 1941, years before the Nuremberg trials, Winston Churchill planned summary executions for fifty top Nazis at war’s end. He considered this punishment a political decision, not a legal matter. But Harry Truman, the American president, wanted a tribunal. Josef Stalin cast the deciding vote. As the human rights scholar Geoffrey Robertson explained, Stalin “loved show trials as long as everyone was shot in the end.”
And so a severely flawed tribunal was held at Nuremberg. It punished crimes against humanity by using inhuman standards: twelve Nazis were hanged first and then burnt in the ovens of Dachau, one of the German concentration camps.
Nuremberg’s moment of success was not in the verdict but in the courtroom, when the Nazis were shown reels of the horrors that they had created. Some of them wept and sat stunned, as they came to grips with the truth. The punishment from exposing openly and publicly what they had done to humanity was far more compelling than what Churchill’s planned executions might have produced. It is from this public record that the world’s aversion to genocide began and Nazism, as an ideology, received its death penalty. South African apartheid also received its capital punishment through the Truth Commissions pioneered by Nelson Mandela and Bishop Desmond Tutu

 

First Published in  http://aftnix.wordpress.com/

সুত্রঃ

[১]http://www.economist.com/blogs/democracyinamerica/2014/03/cameras-supreme-court

[২]http://news.bbc.co.uk/2/hi/8519995.stm

[৩]http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/339310.html

[৪]Article 291  of the verdict , accessed at : http://www.ict-bd.org/ict2/ICT2%20judgment/MKZ.pdf

[৫]Article 81, ibid

[৬]Article 255, ibid

[৭]Article 267, ibid

[৮]Article 80, ibid

[৯]http://newagebd.net/65600/us-calls-for-halt-to-kamaruzzaman-execution/#sthash.MRsTjDaj.AM96NvMP.dpbs

[১০]http://www.amnestyusa.org/our-work/issues/death-penalty

[১১]http://archive.thedailystar.net/forum/2010/june/truth.htm

A Sentimental (mis) Education.

By  Seema Amin

 

As the country broke out into camps protecting sentiments, religious and nationalist, the last few weeks, two words stole into my orifices like some perfumed incense, flavored femme fatale, and I followed it, to this public domain where one is still able to speak or squeak. The two words constitute a single idea.  Sentimental education— something I rather arbitrarily associate with the garden-inscribed, Manor-library sensibilities of characters in Jane Austen novels, although it originates in French literature, in Gustave Flaubert’s book of the same name. So what is a sentimental education, a mere education in literature? Ah, less than that, an education that arouses an inactive passion, one that remains suspended in that image-world of dreams. At times when I discuss the never mirthless politics of Bangladesh with my art critic colleagues, I often get a feeling they think politics is a sentimental vocation, a creature of ‘abeg.’ None of these alternative words to sentiments—passion and ‘abeg’– adequately describe the distance between a trigger-happy sentimentality, swift to offer others as lambs to the slaughter, and the wild, white terrain of dispassionate justice (think Anna Akmatova) that I associate with conscience: a kind of antithesis of the lynch mob justice of the kind that took place on October 6th, when Sundarban villagers and police beat robbers mercilessly until they could not walk in what was reported later as shootouts and gunfights…But let me describe the distance through the window of an event that has almost disappeared from collective memory.

The day the police locked the gates of the worker-occupied Tuba factory in Hossain market (August 6th), many of the female workers had been on hunger strike for a week, many were lying beside Sramik Oikya Forum leader Moshrefa Mishu while others were sitting on the table tops where clothes are made. The day they broke in, August 7th, these men in blue found the girls protecting Mishu and others in an unbreakable outer circle. One particular officer, demanding the leaders of the movement come forward, threatened to ‘Rape all of them’, and hurled other names…police literacy in such slang seems remarkably high. The girls, they refused to budge. Finally, as they pushed into the inner circle, the girls and their male co-workers were forced forward, moving in ripples, some falling down the stairs…taking beatings, but never quite giving up the protective space. Outside loitered what remained of the mixed bag of League goons, police women and dalal workers (as we called them) who had already fought skirmishes with workers, injuring solidarity activists, the day before. Not much remained in the form of a human chain outside…Buses were ready to pick up the workers and take them to receive diminished pay and benefits months late.

In my piece in New Age that came out the day before the police broke into the factory, I heralded superlative new worlds, a ‘paradigm shift.’  On hindsight, it appears to me as perfectly obtuse, but, I knew it was some kind of delirious hope that was working in the midst of things.  But I’ve never had the misgiving– even after Delwar Hossian got his way, using workers’ salaries and bonus as a bargaining chip for his bail, and we walked not blindly but rather wide-eyed into his trap—that what we or they were doing was ‘sentimental’. Everyone present at was moved by something more akin to ‘following a truth to its logical conclusion.’ They would not be blackmailed. Yes, some vanguardism, but again, hardly sentimental.

And it is this distance between venturing a notion of justice and approximating it—that journey between a principle and its actualization in struggle (admittedly a fetishized word of the left) — that distinguishes this ‘un-sentimental’ world from the world where sentiments are protected by law, the mob or by the self-proclaimed guardians of the sentiments or the ideology of the language movement and liberation war, a world where there is not a split-second between a trigger and its target.  The ‘students’ of a sentimental education did not stop to consider the pages of history books, nor offer a reason why suddenly nine others were also blacklisted from Shahid Minar without having any association whatsoever with a dangerously ubiquitous term, ‘Razakar.’   And yet, it is hard to tell off these madmen pursuing the injury to ‘sentiments.’ Not too long ago much more historically literate students and activists were running here and there, their sentiments also hurt, almost before a thought could be formulated…Thus this tendency is not limited to these few young men, to mobs in villages or to guardians of the faith. Some run to embassies, some to mosques, some, now, unfortunately, to the Minar.  I venture the liberation war was not fought over sentiments but deep structural issues and a profound sense of injustice.  The Shabagh movement certainly had more than sentiments to begin with; it had a profound sense of injustice. And the equations were not quite so arbitrary, generalized and simple, in the beginning. But the distance from there to here…warrants some introspection regarding the limitations of a sentimental education, which is all they seemed to have to rely on once the blacklisting began.

If tomorrow, the police who screamed ‘Rape to all of you’ sat on the TV screen and grinned unrepentant, I have a feeling in my gut that sentiments would not run very deep.

We would forgive him, as though he had said a faux-pas as children do.  After all, he too got his sentimental education and it taught him nothing about the dignity of women, much the less workers. One need only read the headlines in the back pages…

Our passions are like our reasons for our actions: not principled, humane or deep, but sentimental, superficial and within our comfort zone.  No white nights charting the immense, dark seas of human action with a moral compass… who cares about ethics when there are Sentiments. And when good and bad are pre-determined, in moral equations that do not even need a child’s exegesis of the assumed Word, a conscience– active, alive, non sentimental– is a luxury.

মুক্তিযুদ্ধ ও গেসু-সাদু উপাখ্যান..

by Watchdog BD

ডঃ পিয়াস করিমক নিয়ে অবৈধ সরকারের ততোধিক অবৈধ আইনমন্ত্রী জনাব আনিসুল হক স্মৃতিচারণমূলক একটা লেখা লিখেছেন। স্বভাবতই পছন্দ হয়নি আওয়ামী প্রোপাগান্ডা মেশিনারিজের। এ আর খন্দকারের মত এই মন্ত্রীকেও রাজাকার উপাধি দেওয়া এখন সময়ে ব্যাপার। নিয়মিত গঞ্জিকা সেবক একদল তরুণ যাদের সাথে এ দেশের জন্মের কোন সম্পর্ক নেই তারা মুক্তিযুদ্ধের নবম ফ্রন্ট খুলে সার্টিফিকেট দিচ্ছে। আর এসব সার্টিফিকেট যোগান দিচ্ছে গঞ্জিকা যোগানোর খরচাপাতি। ড্রাসাসক্ত যুবা তরুণের দল আজকাল মা-বাবাকেও খুন করছে ড্রাগ মানির জন্য। নবম ফ্রন্টের এসব জেনারেলদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ খুবই শক্তিশালী একটা ড্রাগ, যার ব্যবহার শরীর, মন ও মস্তিষ্ককে নেশা ছড়িয়ে দেয় অনেকটা পাগলা ঘোড়ার কায়দায়। বিশেষত্ব হচ্ছে এই ড্রাগ কেবল নেশাখোরদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনা বরং তার আমেজ গ্রাস করে নেয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একদল কিশোর, তরুণ ও যুবকদের। ইবোলা কায়দায় এই ড্রাগ দেশপ্রেম নামক সিফিলিস রোগের জন্ম দেয় যার জরায়ুতে জন্ম নেয় নতুন এক ভাইরাস, আওয়ামী জারজতন্ত্র। জনাব আনিসুলে হকের লেখাটা হঠাৎ করেই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল ৭১ সালে। স্কুল পড়ুয়া তরুণ হলেও সমাজ, সংসারের অনেক জটিল সমীকরণ বুঝে নিয়েছি ইতিমধ্যে। স্মৃতিচারণ এক ধরণের ছোঁয়াচে রোগ। এ মুহূর্তে আমিও আক্রান্ত এ রোগে। তাই পাঠকদের কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিয়ে যেতে চাই আগুন ঝরা ৭১’এর দিন গুলোতে। চলুন…

ঘটনা ১:

এপ্রিলের শুরুতে আকাশ পথে শুরু হল তাদের আনাগোনা। স্থলপথ ছিল ইপিআরদের দখলে। সকাল ১০টা হবে হয়ত। বাজার বন্দরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে কেবল। বাজ পাখির মত ছুটে এলো দুটো ফাইটার। বিকট শব্দে শুরু হল বোমা বর্ষণ। আমরা তখন ২০ মাইল দুরে দাদাবাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ে। দুদিন আগে একদল বিহারীকে নদীর হাঁটু জলে নামিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করার পর অনেক আন্দাজ করেছিল ওরা আসবে। পেশায় চামার, মুচি ও নাপিত এসব নিরপরাধ বিহারীদের হত্যা করে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতারা কি ম্যাসেজ দিতে চেয়েছিল তা বুঝা গিয়েছিল একদিন পরে। একে এক ১০টা ব্যাংক লুট করে সীমান্তের ওপারে পালিয়ে যায় ওরা। সাথে নিয়ে যায় বস্তা ভর্তি টাকা। যুদ্ধের নয় মাস তাদের কারও মুখ দেখা যায়নি ক্ষতবিক্ষত শহর-গঞ্জের জনপদে। শোনা যায় কোলকাতার বেহালায় বাইজী সহ বাসা ভাড়া করে বাদশাহ আওরাঙ্গেজেবের জীবন কাটিয়েছে অনেকে। সপরিবারে পলাতক আমরা। এর কিছুদিন পর গোলন্দাজ বাহিনীর গোলার আঘাতে উড়ে যায় আমাদের বাড়ির কিয়দংশ। মে মাসের শুরুতে পাকি বাহিনীর পদভারে প্রকম্পিত হয়ে যায় আমাদের শহর। বাড়ি ফাঁকা হলেও বাড়ির একজনকে পলাতক বানানো যায়নি। সে আমাদের কাজের ছেলে গিয়াস উদ্দিন। ১৬ বছর বয়সী সদা চঞ্চল এই যুবক কাজের লোক হলেও পরিবারের স্থায়ী সদস্য ভাবতেই অভ্যস্ত ছিলাম আমরা। তার হাতেই গচ্ছিত ছিল বাড়ির দায়িত্ব। আগস্টের মাঝামাঝি এক সময় নদীর গা ঘেঁষে অনেকটা গেরিলা কায়দায় হাজির হই ফেলে আসা বাড়িতে। উদ্দেশ্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে যাওয়া। বাড়িতে পা রেখে হতবাক। লুটের চিহ্ন¡ চারদিক। মূল্যবান সবকিছুই খোয়া গেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে প্রায়। শুয়ে আছি প্রিয় বিছানাটায়। সদর দরজা তালা দেয়া। শুয়ে শুয়ে লক্ষ্য করলাম মূল দরজার কড়া নড়ে উঠছে। উপরে দিকে তাকাতে আত্মা শুকিয়ে গেল, রাইফেলের লম্বা বেয়নেট। পালানোর সবকটা রাস্তা ছিল বন্ধ। ধীরে ধীরে খুলে গেল ফটকের তালা। কেউ একজন ৩০৩ রাইফেল নিয়ে প্রবেশ করলো বাড়িতে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম এ আমাদের গিয়াস উদ্দিন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আলাপ করলাম তার সাথে। জানা গেল বাড়ি লুটের সাথে সেও জড়িত। তবে মূল উদ্যোক্তা স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার ও মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জনাব আক্কাস আলী দেওয়ান। তার প্ররোচনায়ই নাকি সে রাজাকার বাহিনীতে নাম লিখিয়েছে। আসল কাজ চুরি ডাকাতি এবং ইতিমধ্যে বেশকিছু টাকাকড়ি জমাতে সমর্থ হয়েছে সে। ইচ্ছা যুদ্ধ শেষে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে একজোড়া হালের গরু কিনে তা ভাড়া খাটানো। দুপা ঝাপটে ধরে রইলো অনেকক্ষণ এবং অনুনয় করে জানালো গ্রামে গিয়ে কাউকে যেন না জানাই তার বর্তমান পরিচয়। সুযোগ পেলেই নাকি ফিরে যাবে লোকালয়ে এবং সাথে নিয়ে যাবে তার ৩০৩ রাইফেল ও প্রিন্সিপালের কল্লা।

১৬ই ডিসেম্বরের আগেই সে ফিরে গিয়েছিল। প্রিন্সিপালের কল্লা আর নিতে পারেনি তবে রাইফেল নিতে ভুল করেনি। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বরের পর ব্যাংক লুটেরা একদল আওয়ামী জেনারেল গিয়াস উদ্দিনকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখে চৌরাস্তার মুখে।

ঘটনা ২:

স্থান দাদাবাড়ি। শহর হতে পালিয়ে আমাদের মত আরও অনেক পরিবার লুকিয়ে আছে। গ্রামটায় আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া লাগতে তখনো একশ বছর বাকি। বাকি দুনিয়ার সাথে রাস্তাঘাটের সম্পর্ক নেই। কাছের রাস্তা হতে হেঁটে যেতে হয় প্রায় দশ মাইল। এমন একটা গ্রামে পাকি বাহিনীর আগমনের আশংকা ছিল খুবই কম। জুন মাসের মাঝামাঝি সময় তার উদয়। হাতে সেমি অটোমেটিক রাইফেল। পায়ে জলপাই রংয়ের কেডস। গ্রামের বেকার যুবক সাইদুল হোসেন সাদু এখন মুক্তিযোদ্ধা। কবে এবং কোথায় ট্রেনিং নিয়েছে তার কোন সদুত্তর তার কাছে ছিলনা। অবশ্য এ নিয়ে প্রশ্ন করার মতও কেউ ছিলনা। যুদ্ধের শুরুতে গ্রামের মুরুব্বিদের প্রায় সবাই ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক। এ নিয়ে মসজিদে মসজিদে দোয়াও করানো হত। বিশেষ করে জুমা নামাজের পর। এ ধরণের সমর্থনের কিছু ঐতিহাসিক কারণও ছিল। অবিভক্ত ভারতে এ এলাকায় হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিল মুসলিম প্রজারা। জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে হেটে গেলে জুতা হাতে নেয়া ছিল বাধ্যতামূলক। তা করতে ব্যর্থ হলে নেমে আসতো নির্মম অত্যাচার। কৃষি ও তাঁত ব্যবসার সাথে জড়িত জনগণকে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করা হত। মুসলমানদের শিক্ষা নিয়ে জমিদার তথা স্থানীয় হিন্দু বাসিন্দাদের মাঝে ঠাট্টা তামাশার অন্ত ছিলনা। অপমান হতে মুক্তি পেতে স্থানীয় অনেকেই সক্রিয় অংশ নেয় পাকিস্তান আন্দোলনে। তবে বর্ষার শুরুতে গঞ্জের বাজারে পাকিস্তানিদের গানবোটের আগমন বদলে দেয় অবস্থা। গ্রামের জনগণ শক্ত অবস্থান নেয় পাকিদের ঘৃণ্য তৎপরতার বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সাদুর সাথে যোগ দেয় আরও কজন। সবার হাতে অস্ত্র। সকাল বিকাল গ্রামের এ মাথা হতে ও মাথা মার্চ করে বেড়ায়। তবে রাত হলেই বদলে যায় তাদের চেহারা। গৃহস্থের দুয়ারে হানা দেয়। হাঁস, মুরগী, ছাগল সহ যা পায় তা ধরে নিয়ে আসে। প্রতি রাতে চলে তাদের বনভোজন। কদিন না যেতে তাদের চাহিদার আঙ্গিনা পা রাখে গ্রামের সোমত্ত মেয়েদের দিকে। পাকিস্তান সমর্থক হওয়ার কারণে মা-বাবাকে হত্যা করার ভয় দেখিয়ে তাদের ভোগের পণ্য বানানো শুরু করে। যেদিন গঞ্জের বাজারে পাকিস্তানীরা হানা দেয় সেদিন সাদু ও তার দলবলকে একশ মাইলের কাছাকাছি কোথাও দেখা যায়নি।

যুদ্ধ শেষে সাদু ও তার বাহিনী জমিদার বাড়ি দখল সহ শত শত বিঘা ধানী জমি দখল করে কায়েম করেছিল অনাচার ও অবিচারের রাজত্ব। সাদু আজ বেচে নেই, কিন্তু তার কাজের ধারাবাহিকতায় আজও এলাকা চষে বেড়াচ্ছে একদল হায়েনা। ওরা খুন করছে, মা-বোনদের ঘর হতে উঠিয়ে নিচ্ছে, জমি দখল নিচ্ছে এবং গর্বভরে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক হিসাবে।

সব রাজাকারই যেমন খুনি রাজাকার ছিলনা তেমনি সব মুক্তিযোদ্ধাই স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেনি। সবাইকে এক কাতারের ফেলে দেশকে বিভক্ত করে মুক্তিযুদ্ধকে বানানো হয়েছে গঞ্জিকা সেবনের উপকরণ। মৃত পিয়াস করিম উপাখ্যানও এ অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।