ফিরে যাওয়া

আবুধাবীতে ছোটখাটো একটা যাত্রাবিরতী – মনে মনে প্রস্তুত ছিলাম – আবুধাবী ঢাকা রুটের যাত্রীরা উপচে পড়া বাক্স পেটরা নিয়ে বিমানে উঠবে এবং সাথে থাকবে ডিউটী ফ্রী শপ থেকে কেনা গোটা চারেক ব্যাগ ভরা সিগারেট কার্টুন, দুধ, পারফিউম, কম্বল ইত্যাদি। একটা বেশ কেওস এর জন্য রেডী হয়ে থাকা। ঈদ মাত্র তিনদিন পরে –

বিমানে বসে কিছুটা অবাক ই হলাম – ওভারহেড কম্পার্টমেন্ট গুলো গড়ের মাঠের মত খালি – সীট ও প্রায় অর্ধেক এর উপর খালি। তবে প্লেন ছাড়ার একেবারে আগে আগে – হুড়মুড় করে হাজির হোল শতের উপর যাত্রী। তবে এরা কিভাবে জানি কিছুটা ভিন্ন – কোথায় জানি কিছু একটা মিলছে না। প্রথম যা চোখে লাগল – এরা সবাই ঘরোয়া পোষাক পড়া – স্যান্ডেল, দু একজন তো লুঙ্গি পড়া। এদের কারো হাতেই কোন বাক্স পেটরা নেই – এমনকি একটি হাত ব্যাগ ও নেই। সবার হাতে স্ট্যেপল করা দু পাতা কাগজ। আমার পাশেই একজন, আশে পাশে এরা সবাই।

এর পর পরই প্লেন ছাড়ার সব আনুষ্ঠানিকতায় – ওদিকে আর মন দেয়া হয় নি- ক্রুইসিং লেভেল এ যাবার ঘোষনা শোনার পরই ল্যাপটপ খুলে ওদিকে মন দেবার চেষ্টা করছিলাম। আমার সারির উইন্ড সীটের তরুনের সাথে মাঝের সীটের যাত্রীটির কথা বার্তা শুনে আবার ভালো করে তাকালাম ওদের দিকে।

এই মিডল ইষ্ট ঢাকা রুটের ফ্লাইট গুল অভিভাসী বাংলাদেশীদের এক মিলন মেলায় পরিনত হয় – উইন্ডো সীটের তরুনটি লন্ডনে একটি কলজে প্রকশৌল বিষয়ে পড়াশোনা করে যুক্তরাজ্যেই কোথাও চাকুরী করছে। সে তীব্র আবেগ নিয়ে হৃদয় এর সবটুকু সহমর্মিতা নিয়ে মাঝের সিটের যাত্রীটির কথা শুনছে।

 

এই এয়ারক্রাফটে তারা ১১৭ জন আছে – ওদের সবাই মাত্র দুবাই জেল থেকে ছাড়া পেল, জেল থেকে বাসে করে বিমানবন্দরে নিয়ে এসে ওদের কে প্লেনে তুলে দেয়া হয়। সবাই ই আরব আমীরাতে বিভিন্ন শহরে আবৈধ ভাবে কাজ করছিল – কেউ ধরা পরেছে এক মাস আগে – কেউ ছয় মাস কেউ আরো বেশী সময় ধরে জেলে আছে।

একেক জনের একেক ধরনের গল্প। পাশের আইল সীটের তরুনের দিকে তাকালাম- শিশুর মত আগ্রহ নিয়ে অনভ্যস্ত হাতে সামনের এন্টারটেইনমেন্ট রিমোট নিয়ে দেখছে – এক হাতে মুখ মোছার টাওয়েল টা, মুখ না মুছে, খুব যত্ন করে ধরে আছে – আমি ই কথা শুরু করলাম –

ওর নাম কাদের – ভিসা আছে ওমানের- ওমানের ভিসা পাওয়া যায় – কিন্তু ওমানে চাকুরী নাই – আর আমিরাতে অনেক চাকুরী – কিন্তু আমীরাত ভিসা দেয় না। আগে বাংলাদেশে টঙ্গির কাছে এক বাজারে সবজী বিক্রি করত। আট মাস আগে সহায় সম্পদ সব বিক্রী করে ওমান এসেছিল – পরে টাকার বিনিময়ে অবৈধ ভাবে গভীর মরুভুমি দিয়ে দুবাই এসেছে – এবং এসে একটা কাজ ও করছিল। “ওই দিন কি যে হইল – কাম থিকা বাসায় ফিরতাছি – রাস্তার মধ্যে দেশী ভাই দাড়াইয়া আছে – আমারে ডাক দিল – গেলাম – গপ্প সপ্প শুরু করলাম – আর কোথা থিকা পুলিশ আইসা ধইরা লইয়া গেল আমাগো সবাইরে”।

এরা একেকজন একেক ভাবে এরেষ্ট হয়েছে – এক প্রৌড় ভদ্রলোক প্রায় ত্রিশ বছর আছে মধ্যপ্রাচ্যে – বললেন- “রাত তিনটার সময় যহন দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা শুনলাম – তখনই বুইঝা ফালাইলাম দেশে যাওয়ার সময় হইছে” । আমীরাত পুলিশ ইদানিং খুব এগ্রেসিভ ভাবে রাস্তা ঘাটে, বাসা, কাজে রেইড দিয়ে অবৈধ অভিভাসী শ্রমিক গ্রেফতার করছে। কেউ মাত্র দুশপ্তা হল প্রথম বারের মত বিদেশে এসেছে – এসেই ধরা পড়েছে ভুয়া ভিসার জন্য, কেউ ধরা পড়েছে তিন মাসের মাথায়, কেউ ত্রিশ বছর থাকার পর এমনিতেই পাততারি গুটাচ্ছিলেন।

 

বিমানের প্রতিটি যাত্রী গভীর সহমর্মিতার সাথে  ওদের কথা শুনছে – টুক টাক এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে – “জেলে কেমন ব্যাবহার করত” – আমি জিজ্ঞেস করি জনে জনে। কারো মাঝেই এই উত্তরের খুব একটা আগ্রহ নেই। এক জন একটু বিরক্ত ভাবেই বলে- “ আরে ওই গুলা মানুষ নি?”

 

জানা গেল – যেহেতু এরা মুসলমান দেশের ওবৈধ অভিভাসী – হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এই রোযার মাসে ওদেরকে সেহেরী আর ইফতারের সময় রুটী দেয়া হত। জিজ্ঞেশ করি জেল এর ভিতরের অবস্থা কেমন।

পাশের তরুন খুব আগ্রহ নিয়ে বলা শুরু করে – “ ভাই দুবাই জেল হইল পৃথিবীর দুই নম্বার জেল, এক নম্বার হইল অস্ট্রেলিয়ার জেল – আর দুবাই র টা দুই নাম্বার।“ ওর কথা শুনে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর দুই নম্বর জেলে থাকতে পেরে সে খুব ই গর্বিত।

 

জানতে চেষ্টা করি কেন আমিরাত পুলিশ এগুল করছে – একেক জন একেক কথা বলে- ওরা বড় পলিসি বঝে না। কেউ বলে “হাসিনা রাশিয়া রে ভোট দিছে, আমিরাত রে ভোট দেয় না- এইটা শুইনা আমিরাতীরা রাইগা গেছে”। আমি বলি ভারতীয় দের ও তো গ্রেফতার করছে – ওরা কোন ব্যাখ্যা দিতে পারে না।

একজন জানায় জেল ভরা পাকিস্তানী, ভারতীয় আর বাংলাদেশী। সে খুব সরল ভাবে ক্লাসিফাই করে – “ইন্ডিয়ান রা জেলে গেছে ব্যাঙ্ক, শেয়ার, টাকা পয়সা ঘাপলা করার লাইগ্যা, পাকিস্তানীরা জেলে গেছে চুরি, যচ্চুরী, খুন, জখম, রাহাজানী, বদমাইশী করার লাইগ্যা অ্যান্ড বাংলাদেশীয়া জেলে গেছে ভিসা না থাকার লাইগ্যা”।

 

বাংলাদেশের এম্বারকেশন ফর্ম ফিলআপ করে দিলাম অনেকের। ওদের সম্বল দুটি মাত্র কাগজ। একটা বাংলাদেশ দুতাবাসের এক কর্মকর্তার প্রত্যয়ন পত্র যে এরা বাংলাদেশী নাগরিক ( ওদের কারুর ই পাসপোর্ট নেই) – আরেকটি ছোট আরবী লিখা চিরকূট- সম্ভবত জেল কর্তৃপক্ষের রিলিজ লেটার।

 

এর মাঝে এয়ার হোস্টেস রা খাবার নিয়ে আসে- অনেকে রোযা- অনেকে বুভুক্ষের মত চেটে পুটে খেল একটু “ভাল” খাবার – অনেক দিন পর।

ওদের গিজ্ঞেস করলাম দেশে ফিরে যাবার টিকেট কিনে দিয়েছে কে। ওদের কোন ধারনাই নেই। বললাম “বাংলাদেশ সরকার নিশ্চয়?” –  দু তিন জন সমস্বরে থামিয়ে দিল “ হুর ভাই” – “বাংলাদেশ সরকার আমরার টিকেট কিনা দিত?  – আপনের মাথা খারাপ হইসে?”। “তাহলে নিশ্চয় আমিরাত সরকার” – আমি বলি। “ না না – ওগুলা তো জালীম। হেরা আমাগো টিকেট কিনা দিত না”। তাহলে কে কিনল এই টিকেট? কেউ জানে না। একজন ব্যাখ্যা দেয়- “এইদা সৌদি গো মিসকীন ফান্ড এর টাকা”। আমি বলি “ আমিরাত অবৈধ বাংলাদেশী ফেরত পাঠাচ্ছে – সৌদি আরব কেন খরচ দেবে”। কারো উত্তর নেই।

 

কেউ একজন সাথের জনকে জিজ্ঞেস করে – “ আপনারা যে দেশে ফিরছেন আজ – দেশে কেউ কি জানে”। না কেউ জানে না- ওরা জেলে ছিল – ওরাই জানত না যে ওরা আজ সকালেই প্লেনে চড়বে। আর একজন অনেক সঙ্কোচের সাথে জিজ্ঞেস করে “ আপনাদের সাথে টাকা পয়সা কি কিছু আছে?” – কারো কাছেই একটা কপর্দক ও  নেই।

“ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে কি করবেন?” – “কিভাবে বাড়ী যাবেন? “ – কারো বাড়ী নোয়াখালী, কার চট্টোগ্রাম, কেউ টাঙ্গাইল। “ব্যাবস্থা একটা হইব”। এইটাই কমন উত্তর। কাদের সাহেব বলনে – আমার টঙ্গি বাজার পর্যন্ত পৈছাইতে পারলেই হইল – তাইলে আর সমস্যা না।

 

উইন্ডো সীটে বসা যুক্ত রাজ্য প্রবাসী তরুন ভাঙ্গা গলায় জিজ্ঞেস করে –

“ দেশে গিয়ে কি করবেন” – “জানি না”।

সে খুব অপরাধীর মত – যতটা গোপনীয়তা ধরে রাখা যায় – পকেটে থাকা বাংলাদেশী সব গুলো টাকা মাঝের সীটে বসা যাত্রীর হাতে ধইয়ে দেবার চেষ্টা করেন । আমাদের তিন জনের চোখ ই জ্বলে ছল ছল।

 

“দেখি যাই দেশে , কিছু একটা ব্যাবস্থা হইব – জীবন দিসে আল্লা – রিজিক দিব আল্লা”। আবার পর মুহুর্তেই মত বদলায় – “ধার কর্জ কিছু পাইলে আবার আমু- দেশে কি করতাম? কি আছে দেশত?”

 

ইতিহাদ এয়ারলাইন্সের পি এ সিস্টেমে গম গম করে ভেসে আসে ঘোষনা – পাইলটের কন্ঠে ভেসে যায় আমাদের টুক টাক কথপোকথন –

“২১, ২২, ২৩ নভেম্বর আবুধাবীতে ফর্মুলা ওয়ান ইতিহাদ আবুধাবী গ্রান্ড প্রিক্স – আমাদের সবার সাদর আমন্ত্রন –“

সেনা অভ্যুত্থানঃ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র প্রেক্ষাপট

আজ ১৯ আগস্ট । রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অগাস্টাস (যার নামে ইংরেজী অগাস্ট মাসের নামকরণ করা হয়েছে) এর ২০০০তম মৃত্যুবার্ষিকী । তিনি জুলিয়াস সিজার পরবর্তী বিশৃঙ্খল অবস্থায় প্রথমবার পাক্স রোমানা (শান্তিপূর্ণ রোম) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সম্রাট নামে নিজেকে ঘোষণা না দিয়ে প্রিন্সেপস্ সিভিতাতিস (রাষ্ট্রের প্রথম নাগরিক) হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন । ধারণা করা হয় নিজ স্ত্রী লিভিয়ার প্রয়োগ করা বিষপানে তিনি ১৪ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান । তবে অগাস্টাসের মৃত্যুবার্ষিকী স্বরণ করা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয় । আজকের দিন আরো একটি ঐতিহাসিক এবং শিক্ষণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে । ১৯৫৩ সালে ঠিক এই দিনে (১৯ আগস্ট) ইরানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন । তার এই পতনে সরাসরি জড়িত ছিলো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (অপারেশন অ্যাজাক্স) এবং বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স (অপারেশন বুট) । ব্রিটেনের একটি কোম্পানী দীর্ঘদিন ইরানের তেল সম্পদ কুক্ষিগত করে নিজেদের পকেট ভরেছে । কিন্তু মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের কর্মকান্ডের হিসাব চাইলেন তারা সহায়তা করতে অস্বীকার করলো । এরপর মোসাদ্দেগ সরকার ইরানের সকল প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রিয় মালিকানায় নিয়ে যাবার পর ব্রিটেন এবং আমেরিকা তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয় । এই অভ্যুত্থান নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে দেখা যায় কিভাবে দেশের প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি এবং পেশাজীবিরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে রাতারাতি বিদেশী শক্তিকে দেশের ভার তুলে দেয় । সেই সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় একটি সেনাবাহিনী কিভাবে ক্ষমতা কাড়াকাড়ি করার অভ্যুত্থানে হঠাৎ বীরত্ব দেখাতে থাকে এটাও পরিষ্কার হবে । এই লেখায় মুসলিম বিশ্বের সেনা অভ্যত্থান গুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা থাকবে ।

ইদানীংকালে মিশরের সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টি বেশ আলোচনায় এসেছে । পাকিস্তান, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি দেশগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছে শুধুমাত্র পর্যায়ক্রমিক সেনাশাসনের কারনে । এখন তিউনিসিয়া অথবা তুরস্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও মুসলিম বিশ্বে- বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের মাঝে ব্যাপক উৎকন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । মিশরের ২০১৩ সেনা অভ্যুত্থান না হলে হয়তো ফিলিস্তিনে ২০১৪ গণহত্যা এড়ানো যেতো । আবার তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগানের বিরুদ্ধে যেভাবে সকল শক্তি একজোট হয়েছে, তিনি কতোদিন সেনা অভ্যুত্থানের হুমকি মোকাবেলা করে টিকে থাকতে পারবেন সেটাও ক্যালকুলেশন করা দরকার আছে । এসব বিষয় বিবেচনা করেই সেনা অভ্যুত্থান পর্ব অধ্যয়ন করা প্রয়োজন মনে করেছি ।

প্রথমেই বলে নেয়া যাক সেনা অভ্যুত্থানের সংজ্ঞা কি । ফরাসি coup d’état শব্দটির অর্থ হচ্ছে কোন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত সরকার বা শুধুমাত্র সরকার প্রধানের পদচ্যুতি ঘটানোর চেষ্টা । একটি মিলিটারী ক্যু তখনই সফল বলে ধরে নেয়া যাবে যখন সাবেক সরকারপ্রধান পদত্যাগের বাধ্য হবেন বা নিহত হবেন । তবে মিলিটারীর পাশাপাশি অভিজাত সম্প্রদায় বা সুশীল সমাজেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে । পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা রয়েছে । জুলিয়াস সিজার থেকে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট পর্যন্ত অনেক প্রভাবশালী শাসক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহন করেছিলেন । তবে অধিকাংশ সময়েই সেনা অভ্যুত্থান রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়েছে । যাইহোক, আমাদের আলোচনা মুসলিম বিশ্বে সীমিত থাকবে ।

মুসলিম বিশ্বে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯০৮ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সময় । তিনি ছিলেন শেষ অটোমান সুলতান এবং ইসলামী খিলাফতের ৯৯তম শাসক । ইয়ং তুর্কি মুভমেন্ট নামে একটি অভ্যুত্থানে তিনি ১৯০৯ সালে পদত্যাগে বাধ্য হন । এরপর আরো কিছুদিন কয়েকজন নামমাত্র সুলতানের অধীনে থেকে ১৯২৪ সালে খিলাফত সমাপ্ত হয় । এরমধ্যে আতার্তুক কামাল পাশা আধুনিক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন ১৯২৩ সালে । অন্যদিকে পারস্য সাম্রাজ্যে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রেজা খান পাহলভী ক্ষমতায় আসেন ১৯২১ সালে । এই দুইজনের অধীনে শিয়া এবং সুন্নী অধ্যুষিত অঞ্চল সমূহে সেনা অভ্যুত্থানের সূচনা হয় । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে ইরাকে জেনারেল বকর সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি সেনা অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী ইয়াসিন আল হাশিমী পদচ্যুত হন । তিনি সিরিয়ায় পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন । পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে চারজন কর্ণেলের নেতৃত্বে গোল্ডেন স্কয়ার নামে ইরাকি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের একটি দল ইরাকে অভ্যুত্থান করে । এতে নাৎসি জার্মানীর অনুসারী রশিদ আলী গিলানী ক্ষমতায় আসেন এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত শাহানশাহ জর্ডানে পালিয়ে যান । রাজতন্ত্র বিলুপ্তির জন্য ১৯৪৮ সালে ইয়েমেনে একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় ।

পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থান হয় সিরিয়ায় ১৯৪৯ সালে । ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাঈল যুদ্ধে পরাজিত হয়ে জেনারেল হোসনী আল জাইম সিরিয়ায় প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন কায়েম করেন । এই অভ্যুত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট মদদ পরিলক্ষিত হয় । ক্ষমতায় এসে জেনারেল হোসনী আল জাইম মহিলাদের বোরখা নিষিদ্ধ করেন । ইসরাঈলের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন । ইসরাঈলের সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় ফিলিস্তিনি উদ্ধাস্তুদের জন্য সিরিয়ায় বসতি করে দেন । মাত্র সাড়ে চারমাস পর এই সেক্যুলার জেনারেল তারই সহকর্মী সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত এবং বন্দি হন । একমাসের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয় । পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থানের ইতিহাস আমাদের ভারতবর্ষে । ভারত পাকিস্তান পৃথক হবার পরপর কাশ্মীরে ১৯৪৭ সালে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যুদ্ধ হয় । এখানে পাকিস্তানি সৈন্যরা যুদ্ধ করে পুরো কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছিল । যুদ্ধের মাঝামাঝি অবস্থায় ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সরকার ভারতের সাথে যুদ্ধবিরতি ঘোষনা করে । এটি অনেক সেনা কর্মকর্তা মেনে নিতে পারেননি । তারা ১৯৫১ সালে জেনারেল আকবর খানের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন । কিন্তু জেনারেল আইয়ুব খান এই পরিকল্পনা সরকারকে অবহিত করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন । এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ‘রাওয়ালপিন্ডি চক্রান্ত’ নামে পরিচিত । অভিযুক্ত জেনারেলদের পক্ষে আদালতে লড়াই করেন প্রখ্যাত বাঙালী আইনজীবি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি । অনেকের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয় । পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের সাজা মওকুফ করেন ।

মিশরে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান হয় ১৯৫২ সালে । রাজা ফারুককে সরিয়ে দিতে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে চক্রান্ত করেন জেনারেল মোহাম্মদ নাগীব । তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হবার একবছরের মাথায় ১৯৫৩ সালে আরেক জেনারেল জামাল আব্দেল নাসের তাকে গৃহবন্দী করেন এবং নিজে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করেন । ১৯৫৪ সালে একটি হত্যাপ্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট জামাল নাসেরের চক্ষুশূল হয় এবং ব্রাদারহুডের উপর নেমে আসে চরম নির্যাতনের কালো অধ্যায় । পূর্বেই বলেছি ইরানে প্রথমবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ১৯৫৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন । তিনি ইরানের তেল বৃটিশ আধিপত্যে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেন বিধায় সিআইএ এবং এমআইসিক্স যৌথ উদ্যোগে সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় । এতে নেতৃত্ব দেন সাবেক সম্রাট রেজা খান পাহলভীর ছেলে রেজা শাহ পাহলভী । ক্ষমতায় এসে রেজা শাহ পাহলভী ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র বানাতে ব্যপক উদ্যোগ নেন । যার ফলশ্রুতিতে ধর্মপ্রাণ মানুষ ইসলামী বিপ্লবের পথে এগিয়ে যায় । ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন । একই বছরে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাদশাহ ফয়সল গদিচ্যুত হন এবং ইরাক রিপাবলিকের আত্মপ্রকাশ ঘটে ।

১৯৬০ সালে সেনা অভ্যুত্থানে তুরস্কের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারিস ক্ষমতাচ্যুত হন । তুরস্কের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যাকে ফাঁসি দেয়া হয় । তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে পাশ্চাত্যকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছিলেন । যে সকল সেনা কর্মকর্তা মেন্দারিসকে হত্যা করে, তারা ন্যাটোর প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করে রেডিওতে বিবৃতি দিয়েছিলো । ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে সেনা অভ্যুত্থান হয় যা প্রায় আটবছর গৃহযুদ্ধে রুপ নেয় । এখানে রাজকীয় বাহিনীকে সৌদি আরব, জর্ডান, বৃটেন সমর্থন দেয় । বিপ্লবীদেরকে সমর্থন দেয় মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন । ১৯৬৩ সালে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কমিউনিজম বিরোধী বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে । সাবেক সেনাশাসক আব্দুল করিম কাসিম (যে নিজেও ছিলো অভ্যুত্থানে ক্ষমতাপ্রাপ্ত) ব্রাশফায়ারে নিহত হয় । একই বছর সিরিয়ায় মিলিটারী ক্যু ঘটিয়ে বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে । এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছর কোন না কোন মুসলিম দেশে সেনা অভ্যুত্থান হতেই থাকে । একের পর এক সাদ্দাম- গাদ্দাফী- মোবারক- আসাদ- ইয়াহিয়া- এরশাদ- মোশাররফ দের আগমন রোধ করা কোন মুসলিম দেশেই সম্ভব হয়নি । তবে মজার ব্যপার হচ্ছে- গণতন্ত্রের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাজতন্ত্রের স্বর্গ যু্ক্তরাজ্য প্রতিটি মুসলিম দেশের সেনা অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলো । বিশেষ করে ইসরাঈল প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিম দেশগুলোতে সেনা অভ্যুত্থান পরিচালনা করে অস্থিতিশীল রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বলে মনে হয় । এক্ষেত্রে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার, আধুনিকতা ইত্যাদি বুলি শুধু মুখোশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । এই সেনা অভ্যুত্থান নামক বিষবাষ্পের সর্বশেষ সংস্করণ আজকের মিশর । জেনারেল সিসি সেখানে ইসরাঈলের জাতীয় বীর উপাধী নিয়ে নব্য ফেরাউন হয়ে বসেছে । সম্ভবত এই তালিকায় ভবিষ্যতে নাম আসতে পারে পাকিস্তানের । কারণ সেখানে নির্বাচনের মাত্র এক বছরের মাথায় নওয়াজ শরীফ সরকারের বিরুদ্ধে ইমরান খান এবং তাহিরুল কাদরী যেভাবে বিক্ষোভ শুরু করেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এতো বড় সুযোগ মিস করবে বলে মনে হয়না । অথবা আইএসআই এটা মিস করলেও সিআইএ কিছুতেই মিস করবেনা । তবে আমার আশংকা হলো তুরস্কের বিষয়ে । কারণ এরদোগান প্রায় একযুগের সাধনায় পলিটিক্যাল ইসলামের যে প্রাসাদ দাঁড় করিয়েছেন, যদি আরেকটি অভ্যুত্থানে এই প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়ে তবে মুসলিম উম্মাহর জন্য হতাশার সীমা থাকবেনা ।

সেনা অভ্যুত্থানে প্রথমেই নিজদেশের মানুষের সাথে সেনাবাহিনীর একটি অপূরনীয় দূরত্ব তৈরি হয় । এছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষতি, দুর্নীতি, সমাজের নৈতিক অধঃপতন তো থাকেই । তারপর গণহত্যা থেকে গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায় । মিশরে এখন পর্যন্ত প্রায় তিনহাজার মানুষ নিহত এবং বিশহাজার আহত হয়েছে । সিরিয়াতে সামরিক শাসক আসাদ দেশটিকে শেষ করে ছেড়েছে । আরো হতাহতের ঘটনা আগামী দিনেও অপেক্ষা করছে । আমরা দেখেছি, মিডিয়া কিভাবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীকে প্রতারিত করে । আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনীতে ভুল সমরনীতি কিভাবে নিজ দেশে গণহত্যার পরিবেশ তৈরি করে । অথচ মুসলিম বিশ্বের ইসলামপন্থী কোন শক্তি একটি সুদক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারেনি । এল বারাদী দের বিদেশী ডক্টরেট আর গোল্ড মেডেল যেভাবে তাদেরকে নির্লজ্জ সেক্যুলার এবং ভোগবাদী হিসেবে তৈরি করছে, একমেলেদ্দীনরা যেভাবে বহির্বিশ্বকে বন্ধু ভেবে নিজদেশের দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তেমনি মুসলিম দেশগুলোর সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত বিদেশী অনুশীলন আর মিশন তাদেরকে কতটুকু দেশপ্রেম শেখায় বা জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তা মিলিটারী ক্যু এর ইতিহাস ঘাটলেই চোখে পড়বে । এছাড়া সুষ্ঠু পররাষ্ট্রনীতির অভাবে শুধু সরকারই নতজানু হয় তাই নয়, বরঞ্চ পুরো সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি নতজানু এবং পরাশ্রয়ী হয়ে উঠে । অতএব মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যদি সত্যিকার অর্থে বিদেশী আধিপত্য নামক বিষপান করতে না চান, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সম্পূর্ণরুপে জনগণের ইচ্ছাকে বিবেচনায় নেয়া । দূতাবাসে ব্রেকফাস্ট করতে নেতাদের হুড়োহুড়ি দেখার মতো । অথচ তারা একবারও ভাবে না – দূতাবাসে রাতের আঁধারে অন্য কেউ ডিনার করছে কিনা ।

পরিশেষে বলতে চাই- বাংলাদেশ, সিরিয়া, মিশর, ইরাক, লিবিয়া, সৌদি, আমিরাত, ইয়েমেন প্রভৃতি মুসলিম দেশে গণতন্ত্র মুক্তি পাক । অবৈধ-অগণতান্ত্রিক শক্তির হাত থেকে দেশ বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক । নয়তো এই মুসলিম দেশগুলো মানচিত্রে নামমাত্র টিকে থাকলেও এখানে মনুষ্য সভ্যতার অস্তিত্ব বিলীন হতে বেশিদিন লাগবে না । পাহলভীদের ভূত মুসলিম জাতির ঘাড় থেকে চিরতরে বিদায় হোক, আজকের দিনে এটাই প্রত্যাশা ।

প্যালেষ্টাইনী রক্ত আমার আপনার হাতে!

1

By Watchdog BD

আরব রাজা বাদশাহদের কথা না হয় বুঝা গেল। সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে এমনটা করা ছাড়া তাদের কোন বিকল্প ছিলনা। কারণ প্যালেষ্টাইনিদের সমর্থন করা হবে গণতন্ত্রকে সমর্থন করা। দুঃখজনক হলেও সত্য গোটা মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইসরাইল এবং প্যালেস্টাইন ছাড়া বাকি সব দেশে রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র সহ অলৌকিক সব তন্ত্র বিদ্যমান। ক্ষমতার সমীকরণ মেলাতে গিয়ে কোন আরব রাষ্ট্রই ইসরাইলি পশুত্বের বিরুদ্ধে টু শব্দটুকু করেনি। এমনকি আল্লাহর ঘরের কথিত রক্ষকরাও না। তাদের ভূমিকা পাশে রেখে আমরা যদি বাকি বিশ্বের দিকে চোখ ফেরাই সেখানেও সুনসান নীরবতা। অথচ নিকট অতীতে আফ্রিকান খরা, হাইতির ভূমিকম্প, রুয়ান্ডার গণহত্যা নিয়ে বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিখ্যাত ব্যক্তিরা সচেতনা সৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্থিক তথা মানবিক সাহায্যের হাত বাড়াতে কার্পণ্য করেন নি। কি এমন ঘটল যার ফলে শত শত প্যালেষ্টাইনি শিশুর ছিন্নভিন্ন মৃতদেহও তাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছেনা? ঘটনার গভীরে যাওয়ার প্রায় তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার দিকে পাঠকদের নিয়ে যেতে চাই। হলিউড সুপার স্টার মেল গিবসনের বিরুদ্ধে শারীরিক অত্যাচারের অভিযোগ আনেন তার রুশ বান্ধবী অকসানা গ্রিগেরয়েভনা। অনেকদিন ধরেই তাদের ভেতর সমস্যা চলছিল। সূক্ষ্ম হিসাবে পারদর্শী অকসানা কায়দা করে মাতাল অবস্থায় গিবসনের কিছু মন্তব্য প্রকাশ করে দেয়। আর তাতেই টলে উঠে হলিউড। ভিডিওতে দেখা যায় অস্ট্রেলিয়ান সুপারস্টার মাতাল অবস্থায় গোটা বিশ্বের দুরবস্থার জন্য ইহুদিদের দায়ী করছেন এবং এর প্রতিকার ও প্রতিশোধের আহ্বান জানাচ্ছেন। হলিউড মানে ইহুদি বিনিয়োগ। এদের সমালোচনা মানে সুশৃঙ্খল একটা ইনিস্টিটিউশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। গিবসন তাই করলেন এবং এর জবাব পেলেন খুব দ্রুত। প্রযোজকরা রাতারাতি মুখ ফিরিয়ে নিলেন গিবসন অভিনীত ছবি হতে। হুমকি দিলেন আজীবনের জন্য কালো তালিকভক্ত করতে। গিবসনকে ভাতে ও পানিতে মারার আয়োজন সম্পূর্ণ করতে জোটবদ্ধ হলেন বিনিয়োগকারীরা। ব্যাপারটা সুরাহা করতে এই হলিউড তারকা কতটা নীচে নেমে ছিলনে তার কোন প্রমাণ কারও হাতে নেই। কিন্তু এরপর গিবসনের মুখ হতে ইহুদিদের নিয়ে কোন মন্তব্য কেউ শুনেছে বলে দাবি করতে পারবেনা।

ইসরায়েলি বর্বরতার শুরুতে গায়িকা রিহানা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ জানিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কঠিন ম্যাসেজ পৌঁছে দেয় গায়িকার দুয়ারে। পৌঁছে দেয় ফলাফলের আগাম বার্তা। আবারও ভাতে মারার হুশিয়ারি। প্রতিবাদ শিকেয় তুলে নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পরেন এই গায়িকা। ফলশ্রুতিতে সোশ্যাল মিডিয়া হতে রাতারাতি উঠিয়ে নেন নিজের মন্তব্য। বিশ্ব বিবেককে ওরা এভাবেই জিম্মি করে রেখেছে নিজেদের ধন-সম্পদের কাছে। চলচ্চিত্র, মিউজিক, পারফর্মি আর্ট, স্পোর্টস হতে শুরু করে এমন কোন ব্যবসা-বাণিজ্য নেই যার চালকের আসনে ইহুদিরা বসে নেই। খালি চোখে ওদের উপস্থিতি বুঝা যায়না। কারণ অভিনয়ের জন্য ওরা শুটিং’এ যায়না অথবা খেলার জন্য মাঠে নামেনা। এসবে অনেক পরিশ্রম। কিন্তু যে টাকায় একটা সফল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যাদের অর্থে ফুটবল অথবা বেসবল টিম মাঠে সচল থাকে তার অনেকটাই আসে তাদের পকেট হতে। সে বিনিয়োগ লাভ হয়ে চক্রবৃদ্ধি হারে ফিরে যায় তাদের পকেটে। এবং সে পকেট সদা-সর্বদা উন্মুক্ত থাকে মধ্যপ্রাচ্যের ইসরায়েলে জন্য। আমরা যারা হলিউডের ব্লকবাষ্টার দেখার জন্য সিনেমাহলে উপচে পরি তাদের অনুরোধ করবো ছবি শেষে প্রদর্শিত নাম গুলো ধৈর্য ধরে পড়ে নেয়ার জন্য। বার্গ, ষ্টেইন, হফফ আর ভিচ দিয়ে যাদের নাম শেষ হয় ওরাই তারা। মেল গিবসন, রিয়ানা আর ইউ-টু’র বনো তাদেরই খেলোয়াড়। আমরা যারা গাঁটের পয়সা খরচ করে তাদের তৈরি ছায়াছবি, স্পনসরড্‌ সংগীত অথবা মালিকানাধীন দলের খেলা দেখতে হলে অথবা মাঠে যাই এক অর্থে সহযোগিতা করি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে। এক বোতলে কোক কিনলে তার একটা অংশ চলে যায় কথিত প্রমিজ ল্যান্ডে। এবং সে অংশ বিন্দু হতে সিন্ধু হয়ে আঘাত হানে প্যালেষ্টাইনি শিশুদের। আমরা যারা সোশ্যাল মিডিয়াতে ইসরায়েলি বর্বরতা নিয়ে চীৎকার করছি তারাও ইসিরায়েলি অপরাধের সহযোগী।

মালয়েশিয়ান ফ্লাইট ১৭ এবং কতিপয় স্বৈরশাসকের ইতিবৃত্ত…

By Watchdog BD

সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ। ইউরোপের এ দিকটায় গ্রীষ্মের শেষ এবং শরতের শুরু। আমাদেরও শিক্ষা বর্ষেরও শুরু কেবল। এদিন ক্লাসে হাজির থাকা অনেকটা বাধ্যতামূলক। অন্যথা হলে মাসিক স্কলারশিপ সহ অনেক কিছুতে কর্তৃপক্ষের কুনজর পরার সম্ভাবনা থাকে। তাই টর্কি ও পেয়িংটনের দুমাসের শৃংখলবিহীন জীবনকে বিদায় জানিয়ে ফিরে আসতে হল।ইংল্যান্ডের সাউদ ভেভনের এ অংশের সাথে প্রেম সেই ৭০ দশক হতে। গ্রীষ্মকালীন ছুটির একটা বড় অংশ ইংলিশ রিভিয়েরায় কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এ যাত্রায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বলাটা সহজ হলেও পূর্ব ইউরোপ হতে ট্রেনে চড়ে পশ্চিম ইউরোপের এ দিকটায় পা রাখা তত সহজ ছিলনা। এ পথে মুল বাধা ছিল বার্লিন দেয়াল। পূর্ব জার্মানির বার্লিন শহরকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনী কেন দুভাগ করেছিল এ নিয়ে অনেক তর্ক আছে। কিন্তু ঠাণ্ডা যুদ্ধের ফ্রন্টের শুরুটা যে বার্লিন দেয়াল দিয়ে তা নিয়ে কোন তর্ক ছিলনা। পায়ে হেঁটে যারা বার্লিন দেয়াল অতিক্রম করেনি তাদের বুঝানো মুস্কিল হবে ঠাণ্ডা যুদ্ধের কঠিন শীতল চেহারা। সেমিস্টারের প্রথম দিনটা যেভাবে কাটার কথা সেভাবেই কাটল। কোর্স পরিচিতি, ক্লাস রুটিন এবং ক্লাসমেটদের সাথে ভেকেশন অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। শরতের শুরু হলেও শীত ঝাঁকিয়ে বসতে সময় নেয়নি। বিশেষ করে রাতের বেলা। পৃথবীর এ দিকটায় তাই হয়, গরমকালটা চোখের পলকে বিদায় নেয়। লম্বা, বিরক্তিকর এবং ভয়াবহ শীতের প্রস্তুতি নিতে হয় পেপ্টেম্বরের শুরু হতে। অক্টোবরের শুরুতে তাপমাত্রা হিমাংকের নীচে নামতে শুরু করে এবং মধ্য শীতে তা -৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। আমাদের জীবনও থেমে যায়। মানিয়ে নিতে হয় প্রকৃতির এই নির্মমতার সাথে। ক্লাস শেষে রুমে ফিরে শুনলাম খবরটা।

 

সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র শেখা ছিল আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। এর তাত্ত্বিক সংজ্ঞা ক্লাসে ঘটা করে শেখানো হলেও তার বাস্তব গোলাপি চিত্রের সম্যক ধারণা পেতে এ রকম একটা সমাজে বাস করাই ছিল যথেষ্ট। খবর শোনা এবং তা বিশ্বাস করার একমাত্র সোর্স ছিল সরকারী মাধ্যম। এর বাইরে সবকিছু ছিল বুর্জুয়া প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র। সোভিয়েত সমাজে বাস করে বুর্জুয়া প্রোপাগান্ডা যারা বিশ্বাস করতো তারা ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হত কথিত এসব শত্রুদের বিরুদ্ধে। খবরটার কোন প্রধান্য ছিলনা। পশ্চিমা মিডিয়ার ব্রেকিং নিউজের মত কোন নিউজ মিডিয়াতে ঠাঁই পেতনা যদিনা তাতে ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টি ও তার সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য জড়িত না থাকতো। খুব অনিশ্চিত সময় পাড় করছিল সোভিয়েত শাসকরা। লৌহমানব লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভের সময় শেষ হয়েছে কেবল। চেরনেনকো আন্দ্রোপভদের মত কট্টর নেতাদের আনাগোনা শুরু হয়েছে ক্ষমতার পাদদেশে। দেশটার মানুষ এসব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিল তাও নয়। আসলে একদল-একজনের (সাধারণ সম্পাদক) দাসত্ব করতে গিয়ে গোটা জাতি পরিণত হয়েছিল যান্ত্রিক পুতুলে। যার চাবি ছিল শতকরা ৪০ ভাগ এলকোহলের ভদকায়। ৩ রুবেল ৭৫ কোপেকের পৌনে এক লিটার ভদকার বোতলকে ঘিরে আবর্তিত হোত সোভিয়েত জীবন। হোক তা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী অথবা শ্রমজীবীর দল। তবে এর মাঝে ব্যতিক্রম ছিল রুশ ইহুদিরা। অভূতপূর্ব মেধার অধিকারী এসব নাগরিকদের প্রায় সবাই ব্যস্ত থাকত পশ্চিম ইউরোপে মাইগ্রেট করার মিশনে। দেশ অথবা সমাজের ভালমন্দ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা ছিলনা। তাদের শয়নে স্বপনে থাকত পশ্চিম ইউরোপ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা দুরের দেশ ইসরাইলে পাড়ি দেয়ার লালিত ইচ্ছা। কেবল তাদের সাথে আলাপ করলে বুঝা যেত পার্থক্য গুলো। সান্ধ্য খবরে জানা গেল ঘটনাটা। সাখালিনের উপর একটি মার্কিন গোয়েন্দা বিমানকে গুলি করে নামিয়ে ফেলেছে সোভিয়েত বিমান বাহিনীর একটি ফাইটার জেট। আমার মত খবর সন্ধানী তৃতীয় বিশ্বের আদমদের জন্য এ ছিল সেনসেশনাল নিউজ। কিন্তু সোভিয়েত সমাজের কোন স্তরেই এর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলনা।

 

গোয়েন্দা বিমান যে আসলে কোরিয়ার এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমান ছিল খবরটা প্রথম এক বছর জনগণকে জানতে দেয়া হয়নি। পশ্চিমা চাপে তারা বলতে বাধ্য হয়েছিল গোয়েন্দা বিমানে বেশ কজন মার্কিন ও কোরিয়ান গোয়েন্দা ছিল। রোববারের টিভিতে যুদ্ধ বিষয়ক এনালিস্টদের মুখ হতে শোনা গেল মার্কিন ’অপরাধের’ ম্যাগনিটিউড। তাদের অনেকের মতে কোরিয়ান বিমানের মাধ্যমে রুশ আকাশ সীমা লঙ্ঘন করে মার্কিনীরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত করতে চেয়েছিল। গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল চাঁদের অন্য-পীঠে কি আছে তা জানার জন্য। মাধ্যম রেডিও। কিন্তু হায়, হতাশ হতে হল। ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি, ডয়েচে বেল্লা সহ পশ্চিমা সবগুলো রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে জ্যাম করে দেয়া হয়েছে। ইংরেজি অথবা রুশ ভাষা সহ কোন ভাষাকেই রেহাই দেয়া হয়নি। গোটা রুশ জাতিকে মিথ্যার সাগরে ভাসানো হল। কিন্তু খবর লিক হতে সময় লাগল না। গোয়েন্দা বিমান নয়, বরং কোরিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমানকে মিসাইল মেরে ঘায়েল করেছে সোভিয়েত বিমান বাহিনী। নিউ ইয়র্ক হতে আলাস্কার এংকোরেজ হয়ে বিমানটির শেষ গন্তব্য ছিল সিউল। পাইলট ও কো-পাইলট অটো-পাইলট মুডে দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। বুঝে উঠার আগে ফ্লাইট সোভিয়েত নিষিদ্ধ ফ্লাইং জোনের ১২ কিলোমিটারের মধ্য ঢুকে পরে। সেকেন্ডের মধ্যে সোভিয়েত বিমান বাহিনীর একটি জেট আকাশে উঠে যায় এবং মিসাইল নিক্ষেপের মাধ্যমে ভূপাতিত করে ফেলে কোরিয়ান বিমান। ২৬৯ জন যাত্রী ও ক্রুদের সবার সলিল সমাধি হয় জাপান সাগরে। যাত্রীদের একজন ছিল জর্জিয়া হতে নির্বাচিত মার্কিন কংগ্রেসম্যান লরেনস ম্যাকডোনাল্ড। সিআইএ’র রিপোর্ট হতে জানা যায় প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের থাকার কথা ছিল একই ফ্লাইটে। কোরিয়ান যুদ্ধে অংশ নেয়া মার্কিন সৈন্যদের একটা গেট-টুগেদারে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান এবং আরও অনেকে। সাগর হতে উদ্বার করা ব্ল্যাক বক্স পর্যন্ত গায়েব করে দেয় সর্বহারাদের একনায়করা। তবে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের ঊষালগ্নে প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়লৎসিন জাতিসংঘের কাছে হস্তান্তর করেন গুম করা ব্ল্যাক বক্স। এবং কেবল তখনই উন্মোচিত হয় ৩ রুবেল ৭৫ কোপেক মূল্যের ভদকা সভ্যতায় বেড়ে উঠা সোভিয়েত শাসকদের কালো ইতিহাস।

 

এ যাত্রায় কোরিয়ান নয়, নামানো হয়েছে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমান। তবে সাগরে নয়, নামানো হয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দনেস্ক শহরের বিতর্কিত একটি অঞ্চলে। এলাকা নিয়ে বিতর্কটাও খুব অদ্ভুত। সোভিয়েত সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শক্তিশালী প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের অনেক অঞ্চলে রুশ জাতির প্রাধান্য বাস্তব সত্য। ঐতিহাসিক ভাবে এ বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সোভিয়েত দেশের ১৫টি প্রজাতন্ত্রে। ঢাল-তলোয়ার বিহীন রুশ সাম্রাজ্যের অধিপতি ভ্লাদিমির পুতিন অস্ত্র দিয়ে এসব অঞ্চলের জনগণকে বলছেন তোমরা বিদ্রোহ কর এবং বলতে শুরু কর ইউক্রেনে নয়, আমরা রুশ দেশে থাকতে আগ্রহী। পুতিনকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিম ইউরোপের সাথে সম্পর্ক করার কারণে ইউক্রেনকে শাস্তি দিতেই এ নাটক। ইতিমধ্যে রক্তের নদী বয়ে গেছে দেশটার পূর্বাঞ্চলে। এ ক্ষেত্রে পুতিন বাহিনী ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর রেড আর্মি কর্তৃক মধ্য এশিয়া দখলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে। পশুত্ব রুশদের শিরা উপশিরায়। অন্তত ইতিহাস তাই বলে। সমসাময়িক চেচেন ম্যাসাকার এবং তার দখল তারই ধারাবাহিকতার ফসল। মালয়েশিয়ান বিমান ভূপাতিত করার দায়িত্ব নিয়ে রুশ এবং ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। বাস্তবতা হচ্ছে, ওরা একই বাক্সের দুই জিন। পশুত্ব ও নির্মমতায় একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যেতে সামান্যতম সময় নেয়না।

 

৩০শে জুন ন্যাটোর ইউরোপীয় কমান্ডার জেনারেল এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন তাদের কাছে প্রমাণ আছে রুশ সৈন্যরা পূর্ব ইউক্রেনের বিদ্রোহীদের সার্ফেস-টু-এয়ার মিসাইল লঞ্চ করার ট্রেনিং দিচ্ছে। খবরের সমীকরণ মেলাতে গেলে সহজেই বের করা যাবে কাদের হাতে ভূপাতিত হয়েছে মালয়েশিয়ান ফ্লাইট ১৭ এবং প্রাণ হারিয়েছে ১৫জন ক্রু সহ ২৮৩ জন যাত্রী। কথিত বিদ্রোহীদের হাতে শুরু হতে shoulder-to-air রকেট ছিল, যার উড্ডয়ন ক্ষমতা ১০,০০০ ফুটের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু ট্রাক হতে ছোড়া যায় এমন সার্ফেস-টু-এয়ার মিসাইলের রেঞ্জ ৩০ হাজার ফুটের অনেক উপরে। নিশ্চিত ভাবে বলা যায় এমন একটা মিসাইল দিয়েই ধরাশায়ী করা হয়েছে মালয়েশিয়ান বিমানকে। এ পশুত্বের আসল আর্কিটেক্ট রুশ সেনাবাহিনী যার পেছনে শক্ত অবস্থায় দাড়িয়ে আছে পুতিনের একনায়কতান্ত্রিক অসুস্থ রাজনীতি।

 

কথায় বলে ভ্রমরে ভ্রমর চেনে। সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা মূল্যের অস্ত্র সদাই করতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী (অ-অবৈধ) গিয়েছিলেন রাশিয়ায়। দেখা করেছেন স্বৈরশাসক পুতিনের সাথে। চুক্তি করেছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের উপর। এসব খবর শুনতে খুব ভাল শোনায়। মনে হয় উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে যাচ্ছে আমাদের দেশ। কিন্তু রুশ চরিত্রের উপর যাদের সামান্যতম জ্ঞান আছে তাদের ধারণা করতে কষ্ট হয়না লিখিত চুক্তির পেছনে নিশ্চয় রয়ে গেছে অলখিত চুক্তি। এ চুক্তি দুই অবৈধ ও অসৎ স্বৈরশাসকের বুঝাপড়ার চুক্তি। চারিত্রিক দিক বিবেচনায় এই দুই নেতার উদ্দেশ্য ও বিধেয় এক ও অভিন্ন, যেনতেন ভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী (অ) এখন বন্ধুহীন। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যার উপর ভরসা করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে পারবেন। সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিবেশী ভারতের উপরও বিশ্বাসে রাখতে পারছেন না। এ বিবেচনায় পুতিনের ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা। ক্ষমতায় বসে অর্থ-সম্পদ ভাগ-বটোয়ারা করার অনন্য নায়ক এই রুশ একনায়ক।

 

ল অব সাবষ্ট্রাকশনের ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাসে সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গুলোকে শোয়ালে কতগুলো অদ্ভুত সাদৃশ্য চোখে পরতে বাধ্য। এই যেমন, দুই ব্যবস্থায়ই একজন স্বৈরশাসকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। দুই সমাজ ব্যবস্থার ভীত প্রতিষ্ঠিত একই ফিলসফির উপর। সমাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের সমালোচক অথবা বিরোধীদের আখ্যায়িত করা হয় বুর্জুয়ায় হিসাবে এবং তাদের বিনাশের মাধ্যমে উড়ানো হয় ভবিষ্যৎ সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার ঝাণ্ডা। পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক কট্টর রাষ্ট্র গুলোর সমালোচকদের সবাইকে বলা হয় কাফের। কাফেরদের হত্যার জন্য নাকি পুরস্কারেরও ব্যবস্থা আছে পরজন্মে। এসব অসুস্থ এবং তামাদি সূত্রের উপর টিকে আছে আজকের সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মভিত্তিক সমাজ গুলো। যার একমাত্র কাজ একজন স্বৈরশাসক ও তার পারিবারিক ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করায় দাসত্ব করা। আজকের পুতিন ও সৌদি বাদশাহদের সাথে সাদৃশ্য এখানেই। অবশ্য এ পথের নতুন পথিক হয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী (অ)… নাকে গণতন্ত্রের মুলা ঝুলিয়ে জাতিকে গাধা বানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গন্তব্য পথে। এ যাত্রায় কৌশল হিসাবে ব্যবহার করছেন জাতির মুক্তিযুদ্ধ। বুর্জুয়া এবং কাফের তত্ত্বের মত ব্যবহার করছেন জাতির এই মহান অর্জনকে। ফতোয়া দিচ্ছেন যারা শেখ পরিবারের আজীবন শাসনে বিশ্বাস করেনা তারা দেশদ্রোহী, রাজাকার এবং এ দেশের তাদের বাস করার অধিকার নেই। অত্যন্ত চৌকস কায়দায় প্রতিপক্ষকে নির্মূল করছেন। গোটা জাতিকে অসততার দৌড়ে নামিয়ে সপরিবারে মজা লুটছেন। এবং ধরে নিয়েছেন হাজার বছর ধরে চালিয়ে যাবেন পারিবারিক শাসন। এ মুহূর্তে এমন একটা শাসন অসম্ভব কিছু মনে হচ্ছেনা। কারণ অসৎ দৌড়ে বিরতি নেয়ার মত অবস্থানেই নেই জাতি। বিরতি মানেই ধ্বংস, বিপর্যয়। যা হতে উঠে দাঁড়ানোর মত শক্ত মেরুদন্ড নেই জাতির পীঠে।

 

খরার তাপ-দাহে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কোন এক পড়ন্ত বিকেলে ঈশান কোনে জমা হয় একখণ্ড মেঘ। এক সময় তা রূপ নেয় সর্বগ্রাসী কালবৈশাখীতে। তারপর ধেয়ে আসে। লন্ডভন্ড করে দেয় জনপদ। উড়িয়ে আছড়ে ফেলে পুরাতন অনেক কিছু। জাতির ঘাড়ে চেপে বসা শেখ নামের ভুত উপড়ে ফেলতেও আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে আকাশের দিকে। এক সময় না এক সময় মেঘ জমবে। এবং সে মেঘ প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে উড়িয়ে নেবে শাসক নামক এসব দানবদের। সভ্যতা বিবর্তনের এ অমেঘো ধারা হতে স্বৈরশাসক পুতিন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশা আর শেখ হাসিনার মত বেহায়া শাসকরা রক্ষা পাবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই।
http://www.amibangladeshi.org/blog/07-20-2014/1468.html

মধ্যপ্রাচ্য, যুদ্ধ ও শান্তি…

by WatchdogBD

জানুয়ারি ৩, ২০০১ সাল। হোয়াইট হাউস হতে ঘোষণা এলো মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সমাধান পাওয়া গেছে। ঘোষণার সমর্থনে ইসরায়েলই কর্তৃপক্ষও ঘোষণা দিল সতর্ক আশাবাদের। অন্য ক্যাম্প হতেও স্বীকার করা হল ত্রি-পক্ষীয় বুঝাপড়ার। এর আগে ২৩ সে ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন চারদিনের সময় দিয়ে দরকষাকষি করা যাবেনা এমন একটা প্রস্তাব উত্থাপন করেন শান্তি আলোচনায়। প্রস্তাবের সারমর্ম ছিলঃ প্যালেষ্টাইনিরা পশ্চিম তীরের শতকার ৯৬ ভাগের দখল পাবে, বাকি চার ভাগ যাবে ইসরায়েলদের দখলে। পূর্ব জেরুজালেমে বসতি-স্থাপনকারী ইহুদিদের শতকরা ৮০ ভাগ এলাকা পাবে ইসরাইল, বাকিটার দখল পাবে প্যালেস্টাইনই কর্তৃপক্ষ। জর্ডান ভ্যালিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে অস্থায়ী ভাবে অবস্থান করবে ইসিরায়েলি বাহিনী এবং প্যালেস্টাইনই গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনটা আর্লি ওয়ার্নিং ক্যাম্প গড়ার অধিকার থাকবে ইসরাইলের। বিনিময়ে প্যালেষ্টাইনিদের হাতে পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকবে তাদের আকাশ সীমার। উদ্বাস্তুরা ইসরাইলে ফিরে যাওয়ার অধিকার হারাবে। তবে প্যালেস্টাইনে ফিরতে তাদের কোন বাধা দেয়া হবেনা। প্রস্তাবে গাজা উপত্যকার ভাগ্য নিয়ে কোন কিছু উল্লেখ না থাকায় প্যালেষ্টাইনিরা তা প্রত্যাখ্যান করে। জানুয়ারির ৭ তারিখ ক্লিনটন অফিস হতে ঘোষণা দেয়া হয় গাজা হবে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাউন্টার প্রস্তাবে ইসরাইল গাজা ভ্যালিতে তার অবস্থান স্থায়ী করার প্রস্তাব করে। স্বাক্ষর করার জন্য কলম হাতে নিয়েও পিছিয়ে যান পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত। অজুহাত হিসাবে প্যালেস্টাইনই জনগণকে সামনে আনেন এবং দাবি করেন এ ধরনের প্রস্তাব মেনে নিলে তার নিজের জনগণই তাকে হত্যা করবে। পিছিয়ে যান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইয়াহুদ বারাক। কারণ এক মাস পরেই ছিল দেশটার সাধারণ নির্বাচন এবং সব ইঙ্গিত বলছিল ব্যাপক ব্যবধানে পরাজিত হবে ক্ষমতাসীন দল। ফলে যা হবার তাই হল, ভেস্তে গেল শান্তি আলোচনা। এক মাস পর ইসরাইলে ক্ষমতাসীন হল কট্টর রক্ষণশীল দল লিকুদ পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভূত হন বৈরুত ম্যাসাকারের অন্যতম জল্লাদ আরিয়েল শ্যারন। ওদিকে গাজায় শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে জঙ্গি হামাস ও ইসলামিক জিহাদ।

এর আগে ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার গ্রীষ্মকালীন অবকাশ ভবন ক্যাম্প ডেভিডে আমন্ত্রণ জানান মধ্যপ্রাচ্যের বৈরী দুই পক্ষকে। ঐ আলোচনায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইয়াহুদ বারাক পশ্চিম তীরের ৫-১০% দাবি করে অবৈধ সেটেলারদের শতকরা ৮৫ ভাগ নিজেদের দখলে রাখার প্রস্তাব করেন। সমস্যা দেখা দেয় পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে। শহরের ঘন ইহুদি বসতি সম্পন্ন এলাকা ইসরাইলের এবং আরব বসতি এলাকা প্যালেস্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রস্তাব করেন। উদ্বাস্তুদের ইসরাইল ফিরে যাওয়ার অধিকার স্থায়ীভাবে বাতিল করার পরিবর্তে ইয়াহুদ বারাক ক্ষতিপূরণ হিসাবে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু আবারও থেমে যান ইয়াসির আরাফাত। পালটা কোন প্রস্তবা দিতে ব্যর্থ হন। ভেস্তে যায় ক্যাম্প ডেভিড আলোচনা। অনেকের ধারণা ইয়াসির আরাফাতের নিষ্ক্রিয়তার মূলে ছিল গাজায় হামাসের সশস্ত্র শক্তি মহড়া। পৃথিবীর মানচিত্র হতে ইসরাইলকে মুছে ফেলার অলৌকিক ও জেহাদি দাবি নিয়ে গাজা-বাসীকে নিজেদের ছায়াতলে সমবেত করতে সক্ষম হয় হামাস। এ ধরনের বায়বীয় প্রস্তাবে গোপন সমর্থন যোগায় মোল্লাদের ইরান ও লেবাননের তাদের সমর্থক হিজবুল্লাহ।

এভাবে যুগের পর যুগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে প্যালেস্টাইন সমস্যা। নিজদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মাঝে মধ্যে অকার্যকর রকেট ছুড়তে বাধ্য হয় হামাস। ১২ হতে বিশ বছরের তরুণ তরুণীদের বুকে বোমা বেধে পাঠিয়ে দেয় ইসরাইলের অভ্যন্তরে। ঘন লোকালয় অথবা যানবাহনে নিজদের উড়িয়ে দেয়। সাথে নিয়ে কিছু সাধারণ ইসরাইলিদের জীবন। জেগে উঠে ইসরাইলী দানব। স্থল ও আকাশ পথে শুরু হয় তাদের নির্মম ও পৈশাচিক আনাগোনা। শিশু, কিশোর ও মহিলা নির্বিশেষে পশুর মত হত্যা করতে শুরু করে প্যালেষ্টাইনিদের। এসব হামলার পেছনে নীরব সমর্থন থাকে প্রতিবেশী দেশ মিশর ও জর্ডানের। কারণ প্যালেস্টাইনী উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিতে গিয়ে তারা নিজেরাও ক্ষতবিক্ষত। ইসলামের ধ্বজাধারী মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশার দল পৃথিবীর দেশে দেশে ইহুদিদের সাথে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে সূরা ও সাকির তৃষ্ণা মেটাতে প্রকারান্তে সহযোগিতা করে থাকেন ইহুদি রাষ্ট্রের অর্থনীতির ভীতকে। যার ফলাফল দেখা যায় ইসরাইলীদের সমরশক্তিতে।

হিটলারের পাপের ফসল আজকের ইসরাইল। ইউরোপের এই ক্যান্সার মধ্যপ্রাচ্যে রফতানির মাধ্যমে নিজদের ‘রোগমুক্ত’ করার কাজে মূল অবদান ছিল ব্রিটিশদের। অস্ত্র হিসাবে তারা ব্যবহার করেছে জাতিসংঘকে। ইসরাইলী নারকীয় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়রা বরাবরই সোচ্চার ছিল। কিন্তু আল কায়েদার নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও মাদ্রিদ হামলার পর বদলে যায় নন-মুসলিম বিশ্বের মন-মানসিকতা। আজকের দুনিয়ায় মুসলমানদের অন্যতম পরিচয় তারা জঙ্গি, দাঙ্গাবাজ এবং আলোচনার টেবিলে সমস্যা সমাধানে অনিচ্ছুক একটা ধর্ম। বলাই বাহুল্য দেশে দেশে আল-কায়েদার মত জঙ্গি সংগঠনের অপ-তৎপরতার আসল ফসল ঘরে তুলছে ইসরাইল। টেবিল হতে আর্কাইভে স্থান পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা। ২০০০ সালে প্যালেস্টাইনই নেতা ইয়াসির আরাফাতকে যে মানচিত্র অফার করা হয়েছিল তার চার ভাগের একভাগও অফার করতে রাজী নয় আজকের ইসরাইল। পাশাপাশি গাজা উপত্যকায় ক্ষমতাসীন রয়েছে ইসরাইলকে পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মিশনে ব্যস্ত হামাস।

ইহুদি তাণ্ডবের দায়-দায়িত্বের একটা বিরাট অংশ নিতে হবে প্যালেস্টাইনই নেত্রীবৃন্দকে। সুযোগ পেয়েও তারা শান্তিকে প্রধান্য দেয়নি। বরং সমস্যা জিয়িয়ে রেখে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার ব্যবস্থা করে গেছেন মাত্র। খোদ ইয়াসির আরাফাতও এ হতে মুক্ত ছিলেন না। মৃত্যুর পর তার স্ত্রীর ধন-সম্পদ তাই প্রমাণ করে। প্যালেস্টাইনি শিশু কিশোরদের বিকৃত ও বিভীৎস মৃতদেহ গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে আমরা হয়ত নিজেদের রাগ, ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করতে কার্পণ্য করছিনা। কিন্তু তাতে প্যালেস্টাইনই সমস্যার প্রতি কতটা আন্তরিকতা প্রকাশ করা হচ্ছে এ নিয়ে তর্ক হতে পারে। ইসরাইলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এ অঞ্চলে শান্তির কথা বলা একান্তই বাচালতা। ইহুদি মেধা ও সম্পদের কাছে গোটা বিশ্ব এখন পদানত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে শিক্ষা নিয়ে ওরা নিজেদের তৈরি করেছে কি করে বৈরী পৃথিবীতে বাস করা যায়। একবিংশ শতাব্দীর জটিল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে টিকে থাকতে চাইলে প্যালেষ্টাইনীদেরও খুঁজে বের করতে হবে সহাবস্থানের নতুন ফর্মুলা।

China and India: Leadership in Contrast

1

by Shafiqur Rahman

The Indian Election results are astounding, and that is a euphemism. All the wishful thinking and self-justifying commentaries from secular intellectuals proved to be just that, self-deluding. Even as the exit polls carried on the tradition of failing to capture the complexity of electoral preference of Indian voters, they failed not in predicting the BJP victory but failing to gauge the magnitude of the victory. In terms of representative democracy, this is truly an epochal election in India. There is virtually no main opposition party in the Parliament. Sansad Bhaban, the house of Parliament of India, is really the house of Mr Modi now.

Two things stand out to me in the post-quake landscape of Indian politics. First, with barely 38% of the votes the BJP led coalition now commands 62% of the total seats. With support from one or two smaller regional parties, the NDA coalition can comfortably cross over the hallowed 67% or two third Special Majority mark. And with Special Majority, Emergency Proclamation, Amendment of the Constitution via article 368, Removal of Supreme Court Judges, Removal of President etc. are all within the grasp of an NDA government led by Mr Modi.

This election has been all about Mr Modi and India is now his oyster. Rarely in recent Indian history have hopes and fears of billions of people in and around India been centered on a single personality like now. For his detractors, coronation of Mr Modi raises the spectre of the most notorious human cliché from 1930’s Germany. To his devotees, Mr Modi carries the ambition for an Indian Lee Kwan Yew; who will firmly taking charge of India Incorporated and unleash the dynamism to make the country a world economic and political superpower, not just in theory and potentially but in reality. What Mr Modi will think and do is ‘known unknowns’; to quote from the famous saying of Mr Rumsfeld. In short, dramatic change for better or worse is in the cards and with it entails huge uncertainty. Those who dismiss the potential for disruptive change in an established democracy like India do not pay sufficient heed to the confluence of charismatic and ambitious leadership, large and enthusiastic support from people and resourceful interests and power of mass media in shaping mass psychology; a conjunction that has shown its potency in recent history time and time again. And that brings us to the main thesis of this article, a high level glimpse on the stability and uncertainty of political leadership in democracy and other systems.

Rightly, in this purported Asian Century, all developments in India is compared and contrasted with China, currently the third and the second biggest economies by PPP. Throughout the last two decades, when China has been growing at unprecedented breakneck speed and India was developing at solid, respectable rate but was increasingly falling behind, both Indian and western political commentators comforted the worldwide adherents of plural politics by rationalizing that, while China’s growth is spectacular, it’s economy and society is increasingly in precarious position because of a forced marriage of an autocratic political system with a free-capitalistic economy. India on the other hand was regularly complimented because of the stability and robustness of its plural political system and diverse society. As we can see now that even established and healthy democracies can throw up great uncertainty in the form of unknowns focalized in a singular leadership, it is a good time as any to evaluate the Chinese political leadership during the transformational recent decades.

Chinese economic growth in the last three decades is an unprecedented macro event in recorded human history.  In 1980, real per-capita income of China was one fortieth of an US citizen and now it is almost one-fourth. Analysts say that China will overtake USA as the largest economy in within the next few years. The social change is no less outstanding; in 1980 only a fifth of Chinese people lived in cities, now more than a half does. These dizzying statistics of change often mask another remarkable thing, despite high and regular turnover of people at the apex, Chinese political leadership remained uniquely stable, continuous and focused during these years of tumultuous change. This stability is mainly due to the hierarchical and grouped structure of Chinese leadership and decision-making.

China’s political system is divided into three major institutions: the government, the Chinese Communist Party (CCP), and the military. The Party sits at the apex, subordinating all others. The Communist Party has 80 million members (5% of Chinese Population) and people only become member after a selective process that can take several years. The Party is organized into three major bodies: the Central Committee, the Politburo, and the Politburo Standing Committee. The Central Committee is comprised of 200 members who are elected in the Party National Congress which is held every five years. Committee members include senior party and government officials, different agency heads, military generals, provincial governors, head of State-owned companies etc. The Central Committee appoints the 25-man Politburo, which is then narrowed even further into a 5 to 9-man Politburo Standing Committee (PSC) that really runs the Party and the country.  Each PSC member generally in is in charge of a portfolio covering a major area such as the economy, legislation, internal security, or propaganda. Although most of the important policy decisions are often dictated from top down in this hierarchy, Central Committee does wield real power through the five years; it sets the direction of policy and leadership changes and ratifies them. There is intense politics and lobbying in the committee between different groups.

Top leader

The seven members of the Politburo Standing Committee (PSC) are ranked in order of primacy, from one to seven. The rankings do not exactly refer to the official post of the members, sometimes members do not hold any official post but still is ranked high and wields huge influence. Usually though, the President and the Prime Minister holds the first and second rank. The most important point of the PSC is that the person at the top is not the leader of the group but the first among equals. It is a consultative and collective decision making body, no one can impose a view upon others; a decision must garner substantial support from the members. The second important feature of the PSC is its regular turnover. There is an enforced retirement age of 68 which effectively limit the term of members, including the top ranked leader. Also leaders who fail to perform are often dropped after the first term or even within term.

The age limit not only curbs unchecked ambition of charismatic leaders but also initiates a long grooming process. The small number of promising people who can rise to the top must be given ministerial or provincial leadership positions in their early and mid-50s so that they can be ready for PSC when they are 60. Many Politburo members in China have been involved in business, corruption or other profit-seeking activities and became fabulously wealthy. But no matter how influential they become, no one can stay beyond the term limit. Also China is notoriously nepotistic; children and family of political leaders enjoy huge perks in all aspects of society. But no one can place their children in top political positions, everyone has to go the long and process of membership, committee, appointments and prove themselves consistently as leader and manager. Interestingly, Engineers and Technical people heavily dominated the previous Chinese top leadership; all members of the 16th PSC (2002-07) were engineers. But six out of the seven members of the current PSC (2012-17) are trained in social sciences. This reflects a more awareness of politics and society than just economic growth.

20-politburo-standing-committee

The gradual evolution to collective leadership has engendered several broad trends in Chinese statecraft. The most visible is the stability and continuity; Chinese policy direction does not make radical changes on whims of new leader but reflects deliberative and broad-based decision-making. This stability is highly prized by international and domestic businesses who regard uncertainty as a principal impediment to long-term business and economic planning.

Secondly, although China is a one-party state where the party seeks to maintain a tight control over the population, current Chinese leadership also recognizes that control can only be achieved by a careful balancing of freedoms and restrictions. The Chinese government pays very close attention to public opinion while trying to control it; the government prioritizes wealth accumulating economic growth but at the same time try to ensure wide distribution of the spoils from growth. There is no magic formula for these kind balances and it is continuously changing. A single-apex leadership system would have been very inadequate for such careful fine tuning; collective decision-making enable a robust leadership mode with sufficient flexibility and rigidity to chart the huge country through tumultuous changes. Chinese leaders clearly see that even among their senior leaders there is divide between those who are more inclined to reforms and liberalization and those who are more conservative. The Chinese leadership institutionalized robustness in leadership by ensuring that both camps are adequately represented in the highest bodies but no camp gains an overwhelming advantage.

This collective leadership arose a lot due to the three-decade long all-powerful and capricious rule of Mao Zedong. During Mao’s rule the PSC was a totally ineffectual body and there were no mechanism or institution to check Mao’s disastrous policy decisions like the Great Leap Forward in the 1950s or the Cultural Revolution in the 1960s. After Mao’s death Deng Xiaoping started to develop rules to govern decision-making at the top level and manage power succession. From 12th Party Congress gradually the new rules were introduced and by the Congress in 2002 most of the current implicit and explicit rules have become established.

A similar reaction also took place in the Soviet leadership during the Communist Party rule. Stalin’s rule (1922-53) was the archetype of godlike, dictatorial regime. After Stalin there was strong demand for collective leadership at the top. Nikita Khrushchev was largely ousted from leadership because of his failure to institute collective leadership. After him, the regimes of Brezhnev, Andropov, Chernenko all had strong collective leadership. Perestroika; the policy that opened up the Soviet Union and initiate its eventual demise, did not spring out of the head of Mikhail Gorbachev alone; there were lot of institution support for far-reaching change from various quarter of the Soviet Central Committee. Even then Gorbachev had to do continuous to-and-from with politburo members to get majority approval for his policy changes. Many historians would contend that the group-leadership of the Soviet Politburo during the Cold War was no more irrational or arbitrary than the elected Presidential leaders of America. Soviet Union failed because of failure of economic system not political leadership; a lesson the Chinese leaders internalized assiduously.

Political scientists construct the spectrum of leadership by democratic and autocratic leadership at two extremes. Democratic leadership style supposedly emphasize group participation, discussion, and group decisions while an autocratic leader keeps tight control over group decisions and determines all policies only through own consent. Curiously there are often mismatch between leadership and politics. Democratic system throws up autocratic leaders quite often and sometimes autocratic systems have remarkable democratic decision-making process. We in Bangladesh need no lesson in how democratic elections can produce the most autocratic leaders. Interestingly, most established and mature democracies have a democratic system of electing leaders but give remarkably autocratic and arbitrary decision making power to the top. Most often, democratically elected leaders are moderate and reasonable men but occasionally we also see leaders like man-on-a-mission George W Bush, who religiously believed he has divine mandate.

Democracy is not just a system of selecting leaders democratically but also checking bad decisions of elected leaders and getting rid of them easily when they fail dismally. The Chinese collective leadership with its institutionalized development of leaders, group decision making and regular turnover at the top seem to have integrated many of the best features of democratic leadership. This is not an advocacy for Chinese Political system; China is after all a one-party state where people have very little say about the course of their destiny. But we should not overlook the attractive features of the Chinese leadership. Democracy is not a formula but a participatory argument. Democracy should evolve with the need and circumstances of the time and place.

Leadership function arose in the biological world to solve coordination and collective action problem of large groups of social animals. Anthropologists say that pre-civilization human societies had more group decision making than hierarchical leadership. The vast increase of social complexity due to founding of cities and states produced need for powerful, centralized and formal leadership structures. But as the communication and knowledge revolution vastly changed the coordination problem of big societies, the formal-singular leadership system is now increasingly questionable. The paradox of leadership is that versatility, the ability to do multiple, even competing roles is greatly correlated with leadership effectiveness but individuals who can do that are very rare indeed. Democracy is the best method of selecting leaders but even it often fails to find those rare individuals, particularly in countries where the choice is very limited.

Whether one believes in the End of History thesis of Francis Fukuyama or not, one cannot deny that most of the world citizenry now do not hunger for revolutionary change but for improvement and problem-solving. In this day and age, where there is huge pool of expert and informed leaders in every society, entrusting fate of hundreds of millions or even billions upon hit or miss charismatic leaders seem to be risky proposition indeed. Collective leadership as a mechanism of power-sharing through checks and balances among competing political camps, but also incorporating more dynamic and pluralistic decision-making process seem to be more suited for the age we live in.

I believe that single leaders as messiah or savior is out of place in today’s world. We need real time participatory democracy. We need checks against uncertainty of democratically elected dictators and we need mechanisms for diversity and robustness at the top of decision making. How to develop such mechanisms is an argument that we must join vigorously.

প্রসঙ্গ অ্যামেরিকার ‘সোফা’ চুক্তি এবং জাতীয় মেরুদণ্ড প্রশ্নে বাংলাদেশ

 

 Banda Reza ul Kabir

খুবই জনগুরুত্বপুর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সুকৌশলে জনসাধারণের চোখের আড়ালে রেখে দেয়া একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অনেকদিন থেকেই প্রসঙ্গটা আমার বোর্ডের টু-ডু লিস্টে স্টিক করা ছিলো। সময় সুযোগের অভাবে লেখা হয়ে উঠছিল না।

Status of Forces Agreement সংক্ষেপে SOFA হল আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির এক গুরুত্বপূর্ন একটি অধ্যায়; যার ব্যাপারে আমেরিকা এবং চুক্তিতে আবদ্ধ দেশটির জনসাধারণকে পরিকল্পিতভাবে অন্ধকারে রাখা হয়। সাধারনত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা ছাড়া এই চুক্তির ব্যাপারে অন্য কেউ কিছু জানে না, আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে কাউকে এ ব্যাপারে জানতে দেয়া হয় না।

আমেরিকান কংগ্রেশনাল রিসার্চ সেন্টারের ভাষ্যমতে (Chuck Masson নামক একজন আমেরিকান আইন বিশেষজ্ঞ ও এটর্নী কর্তৃক লিখিত সোফা চুক্তির উপর বিস্তৃত গবেষনাপত্র) সোফা চুক্তি হলো এমন কতগুলো ধারা, যার মাধ্যমে অন্য একটি দেশের সাথে আমেরিকার সামরিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারে। এই চুক্তির ধারাগুলোই নির্ধারন করে চুক্তিবদ্ধ দেশের অভ্যন্তরে একজন আমেরিকান সামরিক অফিসার বা রিপ্রেজেন্টেটিভ কী কী বিশেষ সুবিধা লাভ করবে। মূলত এই চুক্তিবলেই তারা অন্য দেশের মধ্যে দাপ্তরিক কাজকর্ম থেকে শুরু করে সামরিক অপারেশন পর্যন্ত যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পারে। এসব কাজ করার সময় আমেরিকান প্রতিনিধির উপর চুক্তিবদ্ধ দেশের আইন কানুনের সাধারন প্রয়োগ হবে না। চুক্তির শর্ত ও ধারাগুলোই নির্ধারন করে দিবে যে আইনের কোন কোন অংশ আমেরিকানদের জন্যে শিথিল বা অপ্রযোজ্য হবে।

সোফা চুক্তির কোন আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক দলিল দস্তাবেজ থাকে না। এতে কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা আওতাধীন বিষয়বস্তর তালিকাও থাকে না। এমনকি এই চুক্তিকে কোন সুনির্দিষ্ট শিরোনামের মাঝেও ফেলা যায় না। এর পেছনে কারন হল আমেরিকার স্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তা বাস্তবায়নের জন্যে চুক্তিবদ্ধ দেশের উপর সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সোফা চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলোর একটা হল, আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তাদের উপর চুক্তিবদ্ধ দেশের কোন আইনী নিয়ন্ত্রন থাকবে না। বিনা বাধায় আমেরিকান সামরিক প্রতিনিধিদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ন কার্যালয় সমূহে প্রবেশাধিকার থাকবে। এসময় তাদের উপর সামরিক ইউনিফর্ম পরিধানের জন্যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না। তারা সকল কর ও শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে। কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তারা আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করতে পারবে। বেতার তরংগ ব্যবহারের সুবিধা পাবে। লাইসেন্স ও অন্যান্য নীতিমালার ব্যপারে তাদের উপর ততটুকুই নিয়ন্ত্রন আরোপ করা যাবে যতটুকুর ব্যাপারে তারা নিজেরা সম্মতি দেবে।

উল্লেখ্য যে এখানে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলতে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীতে কর্মরত লোকদেরকেই বুঝানো হয়নি; বরং স্বশস্ত্র বাহিনীগুলোর সবগুলোই এর আওতাভুক্ত। উপরন্ত প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মকর্তা বা প্রতিরক্ষা বিভাগ কর্তৃক নিযুক্ত চুক্তিবদ্ধ বেসামরিক কন্ট্রাকটাররাও এই চুক্তির আওতায় পড়বে।

ন্যাটোর সাথে সোফা চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা ন্যাটোভুক্ত প্রতিটি দেশের কাছ থেকেই এই কাজের জন্যে সমর্থন আদায় করে নিয়েছে। যেহেতু সামরিক দিক থেকে ন্যাটো ও মার্কিন স্বশস্ত্র বাহিনীগুলো একে অপরের সহযোগী তাই ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর জন্যে সোফা চুক্তিকে আবদ্ধ না হয়ে কোনো উপায় নেই।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সোফা চুক্তিকে কোন ধরনের সীমারেখার গন্ডিতে ফেলা যায় না। কোন ধরনের আইনের কাছে এটি মুখাপেক্ষী নয়। ক্ষেত্রবিশেষে এই চুক্তির ধারাগুলো এত সংক্ষিপ্ত হতে পারে যে এক পৃষ্ঠাতেই পুরো চুক্তিনামা লিপিবদ্ধ করা যায়। উদাহরণস্বরুপ ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার চুক্তির কথা উল্লেখ করা যায়। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার একটি যৌথ সামরিক মহড়া করা। চুক্তিটিতে মাত্র ৫টি ধারা ছিল। তবে মূল উদ্দেশ্য একটাই ছিল, যা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে বতসোয়ানার সাথে আমেরিকার চুক্তির কথাটিও উল্লেখ করা যায়, যার মাধ্যমে আমেরিকা বতসোয়ানার সরকারের দ্বারা আইনানুগ ভাবে সেদেশের মাটিতে মানবিক সাহায্যের নামে কার্যক্রম শুরু করলেও বেসামরিক দাপ্তরিক কাজকর্ম থেকে শুরু করে সামরিক মহড়া ও ট্রেনিং এর সুযোগ পায়। বস্তত এসকল ধারাগুলোর অন্তরালে আমেরিকার উদ্দেশ্য একটিই, আর তা হল একটি দেশে ঔপনিবেশিকতার সূচনা করা ও ধীরে ধীরে বিভিন্নভাবে দেশটির আভ্যন্তরীন ও প্রতিরক্ষা কাঠামোকে দূর্বল করে দেশটির উপর সার্বিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা।

এ চুক্তির মাধ্যমে তারা দেশটির আইন শৃংখলা বাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠাপূর্বক নিজস্ব মানদন্ডে প্রনীত “ন্যায়নীতি” ও “শান্তি-শৃংখলা” রক্ষা করতে চায়। মূলত এর পেছনে থাকে তথাকথিত সন্ত্রাস দমন, জঙ্গীবাদ নির্মূল সহ এধরনের অন্যান্য উদ্দেশ্য; যদিও অধিকাংশ থেকে এটা করা হয়ে থাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন বা মানবাধিকার নিশ্চিতকরনের মত বাহ্যয় মহৎ কার্যক্রমের ছদ্মাবরনে।

 

উল্লেখযোগ্য কিছু দেশে সোফা চুক্তিঃ

 

আফগানিস্তানঃ

সেপ্টেম্বর ১১ এর হামলার পর আল ক্বায়েদা ও তালেবানের মূলোতপাটনের লক্ষে আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা চালায়। এরই সূত্র ধরে ২০০২ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত আফগান পুতুল সরকারের সাথে আমেরিকা কতগুলো পত্রবিনিময়ের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে নিজ কর্তৃত্ব বজায় রাখার যাবতীয় বন্দোবস্ত সেরে ফেলে। আমেরিকান ভিন্ন দেশকে সাহায্য প্রদান আইন ১৯৬১ মোতাবেক আফগানিস্তানে আর্থিক সাহায্য দেয়ার শর্তসাপেক্ষে উক্ত চুক্তি আফগানিস্তানে সামরিক প্রশিক্ষন থেকে শুরু করে অপারেশন, এমনকি ঘাটি স্থাপনের সুযোগ করে দেয়। একারণে খুব সহজেই আফগানিস্তানকে তারা সামরিকভাবে কব্জা করে নিতে পারে। এই চুক্তির ধারামতে আমেরিকার সকল প্রতিনিধি আফগানিস্তানের সকল ফৌজদারী আইনের আওতার বাইরে থাকবে। অর্থাৎ আমেরিকার মনোনীত কোন ব্যক্তি যদি আফগানিস্তানে খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধও করে তবুও আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় আইনে তার বিচার করা যাবে না। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ন ধারা হল যে, অন্য কোন দেশ থেকে কোন আমেরিকান নাগরিক যদি কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয় তাহলে আফগানিস্তান সরকার সেই অপরাধীকে সেই দেশের কাছে তুলে দিতে পারবে না। আফগান সরকার সরাসরি ও প্রকাশ্যে আমেরিকার এই চুক্তিকে মেনে নেয়।

২০০৫ সালের ২৩মে তে হামিদ কারজাই ও বুশের মধ্যকার একটি যৌথ ঘোষনাপত্রের মাধ্যমে আফগানিস্তান ও আমেরিকার পারস্পরিক ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়, যার মাধ্যমে আমেরিকান সেনারা আফগানিস্তানে পূর্ন নিয়ন্ত্রনাধিকার তো পাবেই উপরন্ত এই চুক্তির মাধ্যমে তারা আফগান সৈন্যদেরকেও নিজস্ব কর্মকান্ডে ব্যবহার করতে পারবে। সরকারের কাছে এরুপ প্রস্তাব করা হয় যে আফগানিস্তানের জনগনকে বুঝাতে হবে যে তারা এখনো নিজ দায়িত্ব নিতে সক্ষম হয়ে উঠেনি; তাই নিজেদের স্বার্থেই তাদের উচিত হবে আমেরিকান সৈন্যদের কাছ থেকে প্রশিক্ষন গ্রহন করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে তালেবান থেকে ‘নিরাপদ’ থাকতে পারে।

 

জার্মানিঃ

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে জার্মানির মত ক্ষমতাবান একটি দেশ আমেরিকার সাথে এমন লজ্জাস্কর একটা চুক্তিতে আবদ্ধ! জার্মানির ন্যাটোতে যোগদানের চার বছর পর আমেরিকার সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যা ন্যাটো সোফা চুক্তি ১৯৫৩ নামে খ্যাত। এই চুক্তির আওতায় আমেরিকা-জার্মানির মধ্যে একটি সামরিক সম্পর্কের সেতু স্থাপিত হয়। চুক্তির ধারাসমূহ বেশ বিস্তৃত এবং প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার সুবিশাল পরিসরের। এর মাধ্যমে জার্মানির অভ্যন্তরে আমেরিকা অপারেশান চালানোর সুযোগ পায়।

জাপানঃ

জাপানের সাথে আমেরিকার এই চুক্তির মাধ্যমে জাপানের অভ্যন্তরে কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আমেরিকান বিনা বাধায় পার পেয়ে যেতে পারবে। ১৯৫৭ সালে একজন আমেরিকান সেনা কর্মকর্তা একজন জাপানি নাগরিককে হত্যা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। তবে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকার কারনে আমেরিকা তার সৈন্যের পক্ষে জোর দাবি জানিয়ে বলতে সক্ষম হয় যে, এই হত্যাকান্ড ছিল তাদের সামরিক কার্যক্রমেরই একটা অংশমাত্র। জাপান সরকার এটিকে ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে প্রমান করার জন্য সকল জোড়ালো প্রমান উপস্থাপনের কারণে আমেরিকা এটি মানতে বাধ্য হয় এবং তাকে জাপানের হাতে তুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্ত ঐ সেনা কর্মকর্তা নিজের পক্ষে আমেরিকার ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব কলম্বিয়াতে রীট করে। ঐ রীটটি খারিজ হয়ে গেলেও ঐ সামরিক কর্মকর্তার পক্ষে আমেরিকান সরকার জাপান সরকারকে বিচার কাজ না চালাবার জন্যে চাপ প্রয়োগ করে। পরবর্তীতে ঘটনাটি আমেরিকান সুপ্রীম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

ইরাকঃ

২০০৩ এর মার্চ থেকে শুরু করে ২০১০ এর আগস্ট মাস পর্যন্ত ইরাকের অভ্যন্তরে আমেরিকা বহু সামরিক অপারেশন পরিচালনা করে। প্রথমত এর উদ্দেশ্য ছিল সাদ্দাম হুসেনের অপসারন, যদিও পরবর্তীতে তাদের আরো অনেক উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়। ইরাকের সাথে আমেরিকার চুক্তির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলঃ

এই চুক্তির আওয়াতায় আমেরিকা ইরাকী সরকারকে ‘সহায়তা’ করবে; ইরাকী নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষন দিতে পারবে; তাদেরকে প্রয়োজনীয় সাজ সরঞ্জাম ও আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করতে পারবে। ইরাকী সরকারকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে যাতে তারা আল কায়েদা ও এর মত ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। পাশাপাশি পূর্বেকার অপরাধী সরকারগুলোর অবশিষ্ট কোন বাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ চালাতে পারে। সর্বোপরি ইরাকে বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা হবে এবং ইরাকের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হবে।

উল্লেখ্য যে ইরাকের সাথে আমেরিকার এই চুক্তি আইনী দিক থেকে সকল বিধি-নিষেধের উর্ধ্বে এবং এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে ইরাকের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এমনকি আইন প্রয়োগ সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির উপরও আমেরিকা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে।

এসবের সাথে আরো যুক্ত ছিল যে, ইরাকের অভ্যন্তরে আমেরিকার যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইরাক সরকারকে অবশ্যই সম্মত হতে হবে এবং তার নিজ বাহিনী দ্বারা আমেরিকাকে পূর্ন সহযোগিতা করতে হবে। চুক্তির প্রতিটি ধারাই নগ্নভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও অনেক গোড়া আমেরিকান সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, এটি আমেরিকার স্বার্থ আদায়ের জন্য যথেষ্ট নয়।

এছাড়াও আর যেসব দেশের সাথে আমেরিকার এই চুক্তি রয়েছে তার মধ্যে ফিলাপাইন্স ও দক্ষিন কোরিয়ার নাম প্রনিধানযোগ্য।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সোফা চুক্তিঃ

Cold war পরবর্তী সময়ে দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ যেন হঠাত করেই বেড়ে যায়। এই অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লাগে। এখানকার কোন দেশে পারমানবিক শক্তিকেন্দ্র স্থাপিত হবে, কোন দেশের সাথে কোন দেশের কী ধরণের ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদিত হবে ইত্যাদি সকল কাজেই আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপস্থিতি লক্ষনীয়। কৌশলগত ভৌগলিক গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার এই আগ্রহ যেন একটু বেশিই।

প্রথমত সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের যা অবস্থা, তাতে এদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে শেষ শস্যদানাটুকুও যদি আমেরিকা হাইড্রলিক পাম্প লাগিয়ে নিয়ে নিতে চায় সেক্ষেত্রে চুপচাপ তাকিয়ে দেখা ছাড়া আমাদের হয়তো কিছুই করার থাকবে না।

SOFA-05

দ্বিতীয়ত, এই দেশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দক্ষিন এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের উপর প্রভাব বিস্তার করা সহজ হয়। বাংলাদেশে আমেরিকার “প্রফিট” এর সম্ভাবনা যথেষ্ঠ। এটা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমেরিকার ইতিহাস থেকে এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে বৃহৎ কোন স্বার্থ ছাড়া আমেরিকা কোন দেশের পেছনে এভাবে সময় বা সম্পদ কখনোই ব্যয় করে না।

বাংলাদেশে সোফা চুক্তির সূচনা হয় ১৯৯৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের সময়; যদিও বিএনপি-জামাত সরকার পরবর্তিতে মোটেই এর বিরোধিতা করেনি; যা এ চুক্তির প্রতি তাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনই প্রমাণ করে। আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট বিল রিচার্ডসন এর সূচনা করেন এবং পরবর্তীতে ততকালীন আমেরিকান সেনাপ্রধান বাংলাদেশ সফরে এসে চুক্তিটি কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যান।

১৯৯৮ সালে যখন প্রথম এই চুক্তিটি সূচনা করা হয় তখন এর ধারাগুলো এত সুবিস্তৃত ও গভীর ছিল না; তখন এটা শুধু আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাথে যৌথ সামরিক মহরার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে চুক্তির ধারাগুলো যখন স্পষ্ট করা হয় তখন দেখা যায় যে তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক সুস্পষ্ট হুমকি। চুক্তির ধারাগুলো নিম্নরুপঃ

১. ‘জরুরী প্রয়োজনে’ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর বিনা বাধায় প্রবেশ পারবে
২. আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তারা এদেশের পাসপোর্ট ও ভিসা-নীতির উর্ধ্বে থাকবে
৩. বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেকোন ধরনের সরঞ্জাম (যুদ্ধাস্ত্র বা সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহার্য যন্ত্রাদি) কাস্টমস ছাড়াই বিনা বাধায় প্রবেশ এবং পরিবহনের পূর্ন অধিকার থাকবে।
৪. প্রশিক্ষন ও মহড়ার জন্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমেরিকান সৈন্যদের স্বশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশের অধিকার থাকবে।
৫. প্রশিক্ষন ও মহড়া চলাকালীন সময়ে তাদের দ্বারা রাষ্ট্রের কোন ক্ষতি হলে তার কোনো দায়ভার তারা বহনে বাধ্য থাকবে না।
৬. বাংলাদেশে অবস্থানরত সামরিক সদস্যদেরকে দেশের আইন ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে রাখা।
৭. অন্য কোন দেশে কোন অপরাধ সংঘটন করে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর কেউ যদি বাংলাদেশে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চায় তাহলে তা দিতে হবে এবং তাকে সে দেশের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না।
৮. দেশের যে কোন স্থাপনাসমূহে আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তাদের বিনা বাধায় প্রবেশাধিকার থাকতে হবে।
৯. এদেশের যে কোন নাগরিকের পেছনে গোয়েন্দাগিরী,  তাকে গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ, এমনকি তাকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার অধিকার থাকবে আমেরিকার সামরিক কর্মকর্তাদের।

এই চুক্তির আওতায় আমেরিকান সৈন্যরা বাংলাদেশে যখন খুশী তখন বিনা বাধায় আসতে পারবে এবং বাংলাদেশী সৈন্যরা শর্ত সাপেক্ষে প্রশিক্ষনের জন্যে আমেরিকায় যেতে পারবে, তবে কোনভাবেই বাংলাদেশী সৈন্যদের জন্যে সেসব সুবিধার কিছুই প্রযোজ্য হবে না যে সুবিধাগুলো আমেরিকা সৈন্যরা এদেশে ভোগ করতে পারবে।

এদেশের সাধারণ মানুষ এসব বিষয়ের কেবল ততটুকুই জানে যতটুকু সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে জানতে দেয়া হয়। এই কথাটি আমেরিকার জনগণের ক্ষেত্রে আরো বেশি বাস্তব। এজন্যে উভয় দেশের নাগরিকরাই নিজ সরকারের এমন হীন পদক্ষেপগুলোর ব্যপারে অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে, ফলে প্রতিবাদ তো দূরে থাকুক, এসব বিষয়ে জনমতও গড়ে উঠছে না। টিকফা বা অন্যান্য চুক্তি নিয়ে কিছু কথা-বার্তা কেউ কেউ বললেও তার চেয়ে হাজারো গুন মারাত্মক ভয়াবহ চুক্তি সোফা নিয়ে তেমন কারো মাথাব্যথাই দেখা যায় না। অন্যদিকে এমন কিছু প্রো আমেরিকান সংগঠনের অস্তিত্বও এদেশে আছে যারা এই চুক্তিকে সমর্থন জানায় এবং একে দেশের জন্য কল্যাণকর হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে। তাদের বক্তব্যমতে আমেরিকা বাংলাদেশের বন্ধু এবং দুই দেশের পারস্পারিক সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের উন্নতি সম্ভব। শাহারিয়ার কবির নামক তথাকথিত এক দেশপ্রেমিক তো বলেই দিয়েছে “জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন।” গত ২০১৩ এর ৬ই জানুয়ারির ভয়েজ অফ আমেরিকার বাংলা অনলাইন সংস্করণে তা প্রকাশও হয়েছে। (লিঙ্কঃ http://www.voabangla.com/content/interview-with-shahriar-kabir-on-his-film-against-jihad-06-january-2013/1578761.html)

Shahariar-Kabir-VOABangla

উল্লেখ্য যে সোফা চুক্তির এই ভয়াবহ ধারাগুলো ২০০৯ পরবর্তী শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই যুক্ত হয়েছিল। ২০১২ তে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের পর এই চুক্তি নবায়ন হয়। আওয়ামীলীগের সাথে হাজারো বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও এক্ষেত্রে বিএনপি-জামাত কিন্তু নিজেদের মুখে কুলুপ এটে রেখেছিলো।

দেশ ও জাতি তথা বিশ্বের কাছে আত্মমর্যাদাহীন ও পরাজিত ব্যর্থ সরকার হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আশঙ্কা ছাড়াও এই চুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকার আরও কিছু জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

১. বাংলাদেশে অন্য কোন দেশের সৈন্য প্রবেশের নিরঙ্কুশ অধিকার অনুমোদন করার বিষয়টি শুধু আইনী বা রাজনৈতিক দিক থেকেই অসমীচীন নয় বরং এদেশের সংবিধানেরও সুস্পষ্ট পরিপন্থী একটা ব্যাপার।

২. “সার্ক” ভুক্ত দেশ হবার কারণে বাংলাদেশ সার্ক এর কিছু নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য, যার মধ্যে অন্যতম হল স্থানীয় সীমারেখায় বহিরাগতদের প্রবেশাধিকারের উপর নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রন আরোপ করা। সোফা চুক্তির আড়ালে আমেরিকাকে এই অবৈধ সুবিধা প্রদান করা মানেই সার্কের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা।

এসমস্ত ভয়াবহ পরিনতির কথা বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে এই চুক্তির বিষয়টি শুধুমাত্র নীতিনির্ধারক মহল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার আড়ালে বিষয়টি জনগনের কাছে গোপন করা হচ্ছে।

আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক ১৯৮০ সালের পর থেকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পেয়েছে। সেসময় ৩০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশী সামরিক কর্মকর্তা আমেরিকায় প্রশিক্ষন নিয়েছেন এবং তখন থেকেই আমেরিকা-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে অনেক অপারেশান ও মহড়া হয়ে আসছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের সাইক্লোনকে কেন্দ্র করে অপারেশন সী এঞ্জেল।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দুটি প্রধান আন্তর্জাতিক দ্বন্ধে আমেরিকাকে সামরিকভাবে সমর্থন দিয়েছে।

ক) ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, যাতে বাংলাদেশ প্রায় ২৩০০ সৈন্য পাঠায়

খ) ১৯৯৪ সালের হাইতি মিশন, যাতে বাংলাদেশের কন্টিনজেন্ট প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত ছিল

আমেরিকান নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তারা সোফা চুক্তির পেছনে তাদের যেসব প্রধান উদ্দেশ্যের কথা প্রকাশ করেছেন তা নিম্নরূপ-

১. মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে কার্যক্রম জোরদার করা

২. প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে ত্রানসাহায্য সরবরাহ করা

৩. জল ও আকাশ পথে উদ্ধারকাজ চালনা ও অপারেশন পরিচালনা করা

৪. স্কুল স্থাপন ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন

৫. চিকিৎসা সুবিধার ব্যবস্থা করা ও প্রশিক্ষন

প্রকাশ্যে এধরণের মানবিক সাহায্যের কথা বলে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ বরাবর বুঝাতে চেয়েছে যে সোফা কোন সামরিক চুক্তি নয় এবং এর পেছনে আমেরিকার ও মানবিক সাহায্য প্রদান ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যই নেই। তারা কখনই সোফা চুক্তির পেছনে লুকায়িত স্বার্থের কথা প্রকাশ করে না। উপরন্ত তারা এমন প্রস্তাবও করেছে যে এধরনের “লাভজনক” একটি চুক্তি করা থেকে বিরত থাকা মানে বাংলাদেশের নিজেরই ক্ষতি করা। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিয়েগো গার্সিয়ার পর বাংলাদেশের মত একটা সুইট স্পটে সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপন করার ব্যাপারে তারা সত্য-মিথ্যা যেকোন কিছুরই আশ্রয় নিবে এটাই স্বাভাবিক।

Hillary Rodham Clinton with Bangladeshi Prime Minister Sheikh Hasina and Foreign Minister Dipu Moni

হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের অব্যবহিত পরেই ডেইলি স্টার পত্রিকা সোফা চুক্তির ব্যাপারে স্বল্প পরিসরে কিছুটা আলোকপাত করেছিলো। একথা স্পষ্ট যে সোফা চুক্তিতে আবদ্ধ হবার মানেই হচ্ছে আমেরিকার কাছে জাতীয় সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেওয়া। কারন এই চুক্তির ধারা মোতাবেক দেশের মধ্যেও কোন আমেরিকানের উপর দেশের আইন বলবত থাকছে না। তাছাড়া এই চুক্তির মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ন তথ্যাদির উপরও সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।

US Secretary of State Hillary Rodham Cllinton

সোফা চুক্তির ব্যাপারে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নীরবতা সত্যিই অদ্ভূত। এমনকি হিলারি ক্লিনটনের সরাসরি টিভি সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সাংবাদিকদের সোফা চুক্তির বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নিরবতা বিস্ময়কর। আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নীতির সাথে যারা একটু হলেও পরিচিত তারা খুব ভালভাবেই জানেন যে, কিভাবে একটি দেশকে আমেরিকা ধীরে ধীরে তার হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। অতীতে এর অসংখ্য উদাহরন রয়েছে এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারে রাজনৈতিক মহলের অবাক করা নীরবতা রাজনীতিবিদদের স্বার্থান্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকাকে সন্তষ্ট করতে নিজ দেশের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে দিনশেষে বাংলাদেশের লাভের খাতায় যে কিছুই থাকবে না, বরং যা ছিল তার সবই যাবে—এই সহজ সমীকরনটা বুঝতে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা যত দেরী করবেন দেশ ও দেশের জনগণ ততই নিরাপত্তা হারাবে।

 

 
 

Wassalam,
Banda Reza ul Kabir
…until I taste what Hamza bin Abdul Muttalib (RA) tasted

Read me @ www.bandareza.com

Subscribe my videos on www.youtube.com/bandareza313