‘৭ দফা কি পরাজয়? না পরিকল্পনা?’

by zainuddin sani

দেশের রাজনীতিতে কি হচ্ছে বা কি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সবাই বেশ বিভ্রান্ত। বিএনপির হুমকি ধামকি দেয়া, আর আওয়ামীদের সেসবে কর্ণপাত না করা, ব্যাপারটা অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। সকালের পত্রিকার দুটি অবধারিত শিরোনাম থাকতো দুই দলের কোন না কোন নেতার শ্লেষাত্মক বক্তব্য। কেন যেন ব্যাপারগুলোকে অনেক বেশী রীতি মাফিক মনে হচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল কি হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে— ‘আওয়ামীরা ২০১৯ পর্যন্ত চাইলে নির্বিঘ্নে থাকতে পারবে’। সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণার পরে, সত্যিকারের প্রত্যাশা কারোরই তেমন ছিল না। কমবেশি সবারই ধারণা হয়েছিল, ৫ই জানুয়ারিকে ঘিরে কোন কর্মসূচি এবং সেই কর্মসূচিতে বাঁধা দিলে কি হবে, তার হুমকি সম্বলিত একটি বক্তব্য আসছে। তার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামীরা কি বলবে, তাও সবাই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। পুরোপুরি তেমনটা হল না, সেদিনের ঘটনা, এদেশের রাজনীতির টিপিক্যাল ফর্মুলার ব্যত্যয় ঘটাল।

আপাত দৃষ্টিতে বিএনপি নেত্রীর ৭ দফা তেমন নতুন কিছু না। এতোগুলো দফার ভেতর মুল দফা একটিই। বাকী দফাগুলোর বেশ অনেকগুলোই সাধারনতঃ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই করে থাকে। আর কিছু খুচরা দফা দেয়া হয়েছে, সম্ভবতঃ নেগসিয়েশানের সময় বাদ দিতে রাজী হবার জন্য, সবাইকে বলা যাবে, ‘সমঝোতার খাতিরে আমরা তিনটি দাবী ছেড়ে দিলাম।’ তবে প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হচ্ছে অন্য কারণে, এই সময়ে এসে, এমন নরম অবস্থান কেন? যে দাবী গত ছয় বছরে আওয়ামীরা মানেনি, তাদেরকে আবার নতুন করে সেই দাবীর কথা জানানো কেন?

৭দফাকে বেশ নির্বিষ মনে হলেও, কেন যেন সবাই তেমনটা ভাবছে না। সবাই বেশি করে ভাবছেন, এতো মোলায়েম স্বরে কেন কথা বলছেন বিএনপি নেত্রী? তারচেয়েও বড় কথা, আল্টিমেটাম নেই কেন? দফা না মানলে কি হবে, সে সম্পর্কেও নেই কোন ভবিষ্যৎবাণী। বড় জাতের আরও কিছু প্রশ্ন আছে। যেমন বিএনপির গেম প্ল্যান তাহলে কি? সবাই ভাবছেন এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। আর সেই উদ্দেশ্য কি, তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে চলছে কানাঘুষা। কেউ ভাবছেন, ‘নিশ্চয়ই বিএনপি কোন সিগন্যাল পেয়েছে’।

বোদ্ধা মহলকেও খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। তাঁদের এসব কথা ভাববার যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। আসলে এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পদক্ষেপগুলোকে বেশ পরাজয় বলে ভাবা হয়, তার একটি হচ্ছে দাবী জানানো। বিশেষ করে সেই দাবীর সংখ্যা যদি থাকে একাধিক। আর সেই দাবী পূরণ না হলে, সরকারের কি অবস্থা হবে, সে সম্পর্কে যদি কোন হুশিয়ারি না থাকে, তবে তো অবধারিতভাবে ধরে নেয়া হয়, এই দাবীসমূহের প্রস্তাবকারী হয় সিরিয়াস না কিংবা তাদের তেমন কোন শক্তি নেই।

অন্যদিকে সাহসী পদক্ষেপ ভাবা হয় আন্দোলন কিংবা হুমকিকে। ‘এক দফা এক দাবী’র ও আলাদা একটা দাম আছে। তবে তেমন কিছু একবার বলে ফেললে কিছু একটা করে দেখানো জরুরী। নইলে আবার শুরু হয়ে যাবে অন্য হিসাব। যেমনটা হয়েছিল আওয়ামীদের ‘স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাও আটকাতে পারবে না’ হুমকির পরে। আর ইদানীং কালে, বিএনপি সম্পর্কে।

আন্দোলন করে কোন দাবী আদায়ের রেকর্ড বিএনপির খুব একটা নেই। তবে দাবীতে অনড় থাকবার একটা রেকর্ড ছিল। ফলে আগে যখন হুমকি ধামকি দিলেও সেগুলোকে কিছুটা সিরিয়াসলি নেয়া হত। ভাবা হত, সফল না হলেও, কিছু একটা অন্তত করবে। নিজেদের তৈরি করা ‘গুড উইল’এ সম্প্রতি তাঁরা ফাটল ধরিয়েছে। হুমকির অধিক ব্যবহার এবং কিছু করতে না পারা, তাঁদের দেয়া হুমকি সম্পর্কিত এই ধারণায় কিছু পরিবর্তন এনেছে।

এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফর্মুলা অনুযায়ী ৭ দফাকে নিশ্চিতভাবেই পরাজয় কিংবা পিছু হটা ভাবা যায়। বিশেষ করে গাজীপুরে যেভাবে পিছিয়ে আসলো, তারপরে। ৫ই জানুয়ারীর মত ‘সিম্বোলিক’ দিনে সবাই যেমনটা ভেবেছিলেন, তাঁরা তেমন কিছু করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। এটাও ঠিক, তাঁদের যা সাংগঠনিক অবস্থা, তাঁদের কাছ থেকে ততোটা কেউই প্রত্যাশা করছেন না। আবার এতো নরম কর্মসূচী দিবে, এটাকেও কেউ স্বাভাবিক ঘটনা ভাবতে চাইছেন না। সবার মনে তাই একটি সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, ‘পর্দার আড়ালে কিছু ঘটছে কি না।’

বিএনপি যেভাবে একের পর বিভিন্ন জাতের হুমকি দিয়েও কিছু না করার একটা ট্র্যাডিশান তৈরি করে ফেলেছিল, তাতে কমবেশি সবাই ভাবতে শুরু করেছিল, এই সরকারকে হটাবার ক্ষমতা বিএনপির নেই। আর ইতিহাস বলে, সরকারকে বাধ্য করতে না পারলে, বিরোধী দলের দাবী মেনে নেয়ার মত ঘটনা ঘটে না। আর নরম স্বরে বললে তো নিশ্চিতভাবেই ঘটবে না। এই দাবীর তাই একটি স্বাভাবিক মানে হচ্ছে, হুমকি দিয়ে কিছু না করে নিজেদের ইমেজের যে বারটা বাজিয়েছি, তা আর কন্টিনিউ করতে চাই না। এবার স্বীকার করে নিতে চাই, আমরা অথর্ব। দল হিসেবে, সংগঠন হিসেবে আমরা বেজায় অগোছালো। আন্দোলন করে দাবী আদায়ের ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই এই অনুরোধ ফর্মুলা।

এই স্বাভাবিক ব্যাখ্যার বদলে সবাই কেন যেন অন্য কিছু ভাবছেন। হয়তো ১/১১এর উদাহরণ এর জন্য দায়ী। এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিদেশ নির্ভরতা এর জন্য দায়ী। হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকী কারো কাছ থেকে সমর্থন আদায়ে এই সরকারের ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী। আবার হতে পারে পর্দার আড়ালে এমন কিছু ঘটবার আভাস তাঁরা পেয়েছেন, যা থেকে মনে হয়েছে, এদেশ একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। আর তাই, কঠোর আন্দোলনের পথ ছেড়ে, নরম আর সমঝোতা ধাঁচের পথে হাঁটতে রাজী হয়েছেন, বিএনপি নেত্রী।

ধাঁধা আরও আছে। বিএনপির বেশ কিছু বড় নেতার বক্তব্য থেকে বোঝা গেছে, ৭ দফার এই সিদ্ধান্ত নেত্রীর একক সিদ্ধান্ত। সব দলের সাথে আলাপও করেননি। এমনকি নিজ দলের অনেককেও অন্ধকারে রেখেছিলেন। ঘাড়ের ওপর মামলা, বিভিন্ন আন্দোলনে দলীয় বড় নেতাদের পালিয়ে বেড়ানোর মানসিকতা এমন অনেক ব্যাপারকেও এর কারণ ভাবা যেতে পারে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বড় কারণ হিসেবে সবাই ভাবতে শুরু করেছেন, বিদেশী প্রভুদের ইচ্ছেকে।

৭দফা নিয়ে বোদ্ধা মহলের এই প্রতিক্রিয়া দেখে এই প্রশ্নই সবার মনে জাগছে, কি এমন ঘটল যে ম্যাডাম এরকম ‘সফট’ কর্মসূচী দিলেন। কোন আশ্বাস কি পেয়েছেন? আওয়ামীরা নরম হবে কিংবা এভাবে দাবী জানালে মেনে নেবে— এমন কোন আভাস? ১/১১ এর মত কোন ঘটনার আভাস? আওয়ামীদের ওপর থেকে বিদেশী প্রভুদের আশীর্বাদের হাত তুলে ফেলার আভাস? কিংবা প্রতিবেশী দেশের ওপর অন্য কোন বৃহৎ দেশের চাপ প্রয়োগের আভাস? সম্ভবতঃ আর কিছুদিনের ভেতরেই সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটবে। তখন স্পষ্ট হবে, ‘৭ দফা কি পরাজয়? না পরিকল্পনা?’

তত্ত্বাবধায়ক সরকার— অ্যা পোস্ট মর্টেম

ctggby zainuddin sani  আমার মৃত্যুটাকে ঠিক আচমকা মৃত্যু বা ‘সাডেন ডেথ’ বলা যায় না। দীর্ঘ রোগ ভোগের পরের মৃত্যু বলাটাও ঠিক হবে না। খুন বলা যেতে পারে, তবে মৃত্যুটা হয়েছিল আমার ওপর আসা উপর্যুপরি আঘাতের বেশ অনেক বছর পরে। ছোট খাট ঝড় ঝাপটা গেলেও আমি মোটামুটি বহাল তবিয়তেই টিকে ছিলাম। তিন তিনটে নির্বাচনও করলাম। বিরোধী পরাজিত দল ছাড়া বাকী সবাই বলল নির্বাচন ভালোই হয়েছে। বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও ঘুরে দেখে বলেছিলেন, নির্বাচন ভালোই হয়েছে। রিপোর্ট কার্ডে একশোতে একশো না দিলেও কমবেশি সবাই নব্বইয়ের ওপরেই নম্বর দিয়েছিলেন। এরপরও আমার শেষরক্ষা হল না। বলা যায়, সেটাই আমার কাল হল।

আমার ওপর প্রথম বেশ বড়সড় আঘাত এসেছিল বিএনপি আমলে। মানে বিএনপির দ্বিতীয় আমলে। সেবার মউদুদ সাহেব সংবিধানে একটি সংশোধন করেন। সেই সংশোধনের ফলাফল যা দাঁড়াল, তাতে দেখা গেল একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি একসময় বিএনপির সদস্য ছিলেন, তিনি হয়ে যাচ্ছেন আমার প্রধান। ঠিক তাঁকে প্রধান করার জন্যই এই পরিবর্তন, না সত্যিই বিচারক সংকটের জন্য এই পরিবর্তন, তা হলফ করে কারো পক্ষে বলা সম্ভব না। আর এদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে একটি দলের দেয়া ব্যাখ্যা আরেকজন মেনে নেবে, প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। প্রায় বললাম, কারণ নিজেদের বেতন বৃদ্ধি আর শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির জন্য কেবল এরা একমত হয়।

যাই হোক, সেই সংশোধনীর পরে আওয়ামীরা ভাবল, সেই হাসান সাহেবকে প্রধান করার জন্য এই কাজ করেছে বিএনপি। তাই তাঁরা আন্দোলনে নামলো। প্রচুর হরতাল দিল। জ্বালাও পোড়াও ও কম করল না। তারপরও তেমন কিছু করতে পারল না। বহু জল ঘোলা করে অবশেষে আমার প্রধান হিসেবে আসলেন রাষ্ট্রপতি। কাজটা ঠিক হল কি না তা নিয়ে বেশ বিতর্ক হলেও আওয়ামীরা মেনে নিল। ঠিক সেই সময়টায় সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতির অধীনে থাকবার কারণে হয়তো আওয়ামীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে সাহস করেনি। এরপরে বেশ যাচ্ছেতাই ভাবে আমাকে ব্যবহার করতে লাগলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। আমার বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাও পদত্যাগ করলেন।

এর কিছুদিন পরে আসলো সেই যুগ সন্ধিক্ষণ। অনেকের মতে আমার মৃত্যুর সেটাও একটি কারণ। ১১ই জানুয়ারী, আমার পরিচালনায় হতে যাওয়া চতুর্থ নির্বাচনটির মাত্র কিছুদিন আগেই আমার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলেন বা করানো হল। নতুন প্রধান হিসেবে আসলেন, ফখরুদ্দিন সাহেব। নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ হল। তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার বাধ্য বাধকতা থাকলেও, আইনের কিছু ফাঁক গলে, নির্বাচন অনুষ্ঠান পেছানো হল। এই ফাঁকে বেশ সাহসী কিছু পদক্ষেপও নেয়া হল। দুই দলের তাবৎ বড় বড় নেতাকে আটক করা হল। কারো মতে, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে দেশের দুই বড় দলের যবনিকা পতনের চেষ্টা হল।

এরপরে অনেক ঘটনা ঘটল। দুই বড় দলের বেশ কিছু নেতা বিদ্রোহ করল। শীর্ষ পদ দখলের জন্য, কিংবা দল দুটিকে ধ্বংস করার জন্য, বেশ অনেকেই একত্রিত হল। তবে সফল হল না। আমার শীর্ষ পদে থাকা মানুষগুলো ঠিক কি চেয়েছিল, জানি না। তবে প্রথম প্রথম তাঁরা যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, কিংবা দুই বড় নেত্রীকে গ্রেফতারের পরেও যে মৌন সম্মতি তাঁরা পেয়েছিল, তা ধরে রাখতে পারল না। বাগাড়ম্বর আর দুরাভিসন্ধি তাঁদের কাল হয়ে দাঁড়াল। ‘কিংস পার্টি’ তৈরি করে ক্ষমতায় আরোহণের চেষ্টা শুরু করেছে কি না তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিল। ফলাফল যা হল, দুই দলের সঙ্গে সঙ্গে জনগণকেও ক্ষেপিয়ে তুলল আমার বিরুদ্ধে।

সেই দুই বছর পার করে অবশেষে আমি নির্বাচনের ব্যবস্থা করলাম। আগের তিনবারের মত এবারও বেশ স্বচ্ছ নির্বাচন হল। পরাজিত দল ছাড়া বাকী সবাই এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিল। মনে হচ্ছিল এই যাত্রা হয়তো বা আমি বেঁচে গেলাম। কিন্তু তা হল না। আমার কারণে অন্য আরেকটি যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, সেই কারণ দেখিয়ে আমার মৃত্যু সনদ জারী করা হল। সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে জানাল, আমি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমার কারণে বিচারালয় ধ্বংস হতে বসেছে। আওয়ামীরা সুযোগটা লুফে নিল। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁদের ছিলই। রায়ের বাহানায়, আমার মৃত্যু নিশ্চিত করতে সংবিধানে সংশোধনী আনা হল। অনেকটা আমার আদল রাখলেও, শীর্ষ পদে, নির্বাচন কালীন সময়ে, দল নিরপেক্ষ ব্যক্তির পরিবর্তে একজন দলীয় লোক রাখবার ব্যবস্থা করা হল।

আমার মৃত্যু যদিও অবস্বম্ভাবী ছিল, তারপরও এতো দ্রুত হবে, সেটা অনেকেই ভাবেনি। দুই দল যে কেবল চর দখলের জন্যই নির্বাচন করে, এই তথ্য জনগণ বুঝে গেলেও, মেনে নিয়েছিল। একের পর এক দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে হওয়া কারচুপি আর তারপরে হওয়া সহিংস কিংবা অহিংস রাজনীতি দেখতে দেখতে ক্ষুব্ধ দেশবাসী আমাকে পেয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ভেবেছিল, দুই দল তাঁদের জন্য কিছু করুক আর না করুক, নির্বাচন এবং নির্বাচন নিয়ে হওয়া সহিংসতা থেকে তো অন্ততঃ রেহাই পেলাম। তাঁদের কপালে সেই সুখ সইল না।

যদিও আমার মৃত্যুর দিন ক্ষণ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কেউ ভাবেন চতুর্দশের পরেই মৃত্যু হয়েছে, কেউ বলেন ১/১১র কারণে, আবার কারো মতে পঞ্চদশের কারণে। আসলে আমার মৃত্যুর বীজ লুকিয়ে আছে, আমার অধীনে হওয়া নির্বাচনগুলোর ফলাফলে। সেই নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে তেমন কোন প্রশ্ন না থাকলেও যে সমস্যাটা দেখা দিল তা হচ্ছে প্রত্যেকবারই তৎকালীন বিরোধী দল জয়লাভ করল। এমন একটা আবহাওয়া তৈরি হয়ে গেল, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন মানেই, নিশ্চিত বিরোধী দলের বিজয়। বিরোধী দলের সুনিশ্চিত বিজয়, সেই নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা আর সর্বোপরি সুষ্ঠু নির্বাচন করার এই সক্ষমতাটিই হয়ে দাঁড়াল আমার মৃত্যুর মৃত্যুর কারণ। ‘আপনা মাংসে হরিণ বৈরী’।

৯৬এ আমার অধীনে হওয়া দ্বিতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের পরই সম্ভবতঃ বিএনপি ঠিক করেছিল, আমার ওপর ‘সার্জারি’ করার। ২০০১এ ক্ষমতা পাওয়ার পরেই, খুব ভালমতোই জানতো, ২০০৭এ আমার অধীনে নির্বাচন হলে, সেখানে তাঁদের শিকে ছিঁড়বে না, আবার আওয়ামীরা আসবে। আর সেই পরিস্থিতি আটকাবার জন্য, আইনগত ভাবে তাঁদের করণীয় তেমন কিছু ছিল না। আমাকে বাতিল করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ৯৬এ তেমন কাজ করতে যেয়ে তাঁরা বেশ ভুগেছে।

বিচারবিভাগে দলীয়করণ শুরু করলেও তার সুফল পেতে এখনও ঢের দেরী। সেই মুহূর্তে তাঁদের মাথাব্যাথা ছিল ২০০৭। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবে চললে নিজেদের পছন্দের লোক আমার প্রধান হতে পারবে না। তাই আপাততঃ যে ফর্মুলার আমদানি করল তা ছিল বিচারকের বয়স বৃদ্ধি। ২০০১এ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়াতে, সুযোগটাও তাঁরা পেয়ে গেল। গলা টিপে না মারলে, বেশ মারাত্মক আঘাত আসল আমার ওপর। তবে বিএনপির শেষরক্ষা হল না। ১/১১ আসল।

১/১১এর পরে মনে হয়েছিল আমার ওপর থেকে দুর্যোগের মেঘ সরে গেছে। আমার ওপর ‘সার্জারি’ করতে গিয়ে বিএনপি যেভাবে ভুগল, তাতে মনে হয় না আমাকে আর কাঁটা ছেঁড়ার সাহস কেউ দেখাবে। কিন্তু তেমন কিছুই হল না। ১/১১এর সময় আমার দ্বায়িত্বে থাকা মানুষগুলো যেভাবে দুই নেত্রীকে শ্রীঘরের হাওয়া খাওয়ালো, তারপর আমাকে শৃঙ্খলিত কিংবা নখদন্তহীন করার একটা চেষ্টা যে হবে, বোঝাই যাচ্ছিল। তবে একেবারে মেরে ফেলা হবে, কেউই হয়তো বোঝেনি। যাই হোক, সেই সময়ের শাসনকাল কিংবা বিরোধী দলের বিজয়ের গ্যারান্টি, যেকারনেই হোক, আমাকে আমার পরিণাম ভোগ করতেই হল।

আমার মৃত্যু নিয়ে আমার তেমন কোন নালিশ নেই। আমাকে ছাড়াও পৃথিবীর অনেক দেশে নির্বাচন হচ্ছে, এবং বেশ ভালভাবেই হচ্ছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এদেশেও আমাকে ছাড়া নির্বাচন হবে। তবে সেজন্য জরুরী রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাস। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিরোধী দলের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ। দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসনের সর্বস্তরে নিজেদের লোক বসানোর মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে, পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা।

যে কাজগুলো করে আমি সুষ্ঠু নির্বাচন করতাম তার বেশির ভাগ কাজই নির্বাচন কমিশনকে দিয়েই করানো যায়। সেখানে প্রধান হিসেবে কে নিয়োগ পাবে, তার যদি একটি সুষ্ঠু উপায় বের করা যায়, সরকার, বিরোধী দল সহ আরও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি একটি প্যানেলের মাধ্যমে এর প্রধান নির্বাচন করা যায়, নির্বাচনকালীন সময়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাঁদের অধীনে রাখা যায়, প্রশাসনের রদবদলের কিছু ক্ষমতা তাঁদের হাতে রাখা যায়, তবে হয়তো আমাকে আর প্রয়োজনই পড়বে না।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে না, তেমন কিছু হবে। আওয়ামীরা যেভাবে আমার অবসান চাইছে, নিতান্ত বাধ্য না হলে, মনে হয় না আমাকে আর জীবিত করবে। বিএনপির যা অবস্থা, আমাকে বাঁচাবার আন্দোলন করবার তেমন কোন ক্ষমতাও ওদের নেই। সুশীল সমাজের উচ্চবাচ্য নিয়েও অনেকে সন্দেহ করছে। ভাবছে, আমার মাধ্যমে কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা পাওয়ার লোভে তাঁরা এসব চিৎকার চেঁচামেচি করছে। ফলে, স্বাভাবিকভাবে আমার জীবিত হওয়ার তেমন কোন পথ নেই। জানিনা আমার কি হবে। পুনরায় জীবন ফিরে পাব, না আমার চিরস্থায়ী মৃত্যু হয়েছে, সময়ই বলে দেবে। আমাকে নিয়ে আরও কিছু আন্দোলন, আরও কিছু মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে, আওয়ামীদের নতুন ফর্মুলায় সবাই সায় দেবে, তার অপেক্ষায় আছে দেশবাসী। এই শীতকালের মধ্যে কিছু একটা না ঘটলে, মনে হচ্ছে, ২০১৯এর আগে আমার ব্যাপারে নতুন কোন সিদ্ধান্ত হবে না। কি আছে আমার ভাগ্যে তা দেখার জন্য, আপনাদের মত আমিও অপেক্ষায় আছি।

বিএনপি কি বোঝে না, সেটাই বোঝে না

bnp-final1

by zainuddin sani  বেশ একটা যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বিএনপি। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই নড়বড়ে দল নিয়ে ভাঙাচোরা একটা আন্দোলন চালাবে? না জনগণকে সম্পৃক্ত করার নতুন কোন প্রচেষ্টা নেবে। জনগণ আশার আলো দেখতে পায়, এমন কিছু করবে। এখন পর্যন্ত তাঁরা যা করেছে, তা ছিল গতবছরের সেই হরতাল আর অবরোধ দিয়ে শীতকাল পার করবার চেষ্টার একটি ব্যর্থ ফটোকপি। সবার মনে তাই প্রশ্ন, এভাবেই চালাবে? না মাথায় নতুন কোন প্ল্যানিং আছে? প্রশ্ন অবশ্য আরও একটা আছে, নতুন কিছু করবার মতো মেধা কিংবা ক্ষমতা তাঁদের আদৌ আছে কি না? ছাত্র সংগঠন কিংবা দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব বলে তাঁদের কিছু আছে কি না? কিছু উত্তর দেশবাসী পেয়ে গেছে, বাকীটা সম্ভবতঃ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

বিগত কিছুদিনের কার্যক্রমে আন্দোলনে কিছুটা গতি এসেছিল। আর সেকারণে, অনেকেই গাজীপুরের দিকে তাকিয়েছিল। তবে ২৭শে কি হবে, এই নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য উৎসাহ জাগানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারেনি বিএনপি। এভাবে পিছু হটবে, সম্ভবতঃ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও ভাবেনি। ফখরুল সাহেবের হুমকি যে সিরিয়াসলি নেয়াড় মত কোন জিনিস না, তা দেশবাসী বুঝে গেছে। যতটুকু যা আস্থা ছিল, তা ছিল বিএনপি নেত্রীর প্রতি। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি তাঁর সেই পুরনো মূর্তিতে ফিরে আসছেন। যেভাবে তিনি মাঠে নেমেছিলেন, একের পড় এক সমাবেশ করছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল, এবার আর বালির বস্তা দিয়ে আটকানো যাবে না।

ভুল ভাঙতে সময় লাগল না। আন্দোলন থামাতে এবার বালির বস্তাও লাগলো না। বাহ্যিকভাবে যদিও মনে হচ্ছে ১৪৪ ধারা আর ছাত্রলীগের ‘নেড়ি কুত্তা’ হুমকিই খেল দেখাল। তবে ভেতরের খবর আরও করুণ। গাজীপুরের নেতাদের ‘অসম সাহস(?)’ আর দলীয় কোন্দল এবার আওয়ামীদের কাজ সহজ করে দিয়েছে। বালির বস্তা আনবার খরচ বাঁচিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে বক্সী বাজারের ‘নেড়ি কুত্তা’র ইফেক্টও কাজে দিয়েছে। দল হিসেবে বিএনপির তেমন কোন সম্মানজনক অবস্থান না থাকলেও, বিএনপি নেত্রীর ছিল। সেই দৃঢ় ইমেজে এবার বেশ বড়সড় ধাক্কা লাগলো।

দল হিসেবে বিএনপির এই অসম্মানজনক অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি। পুরো আওয়ামী আমলটাতেই, সরকার বিরোধী আন্দোলনে, বিএনপির ‘পারফর্মেন্স’ ছিল বেজায় হতাশাজনক। প্রথম আওয়ামী আমলে তেমন কোন আন্দোলন কিংবা সাফল্য না থাকলেও তাঁদের সমস্যা এতো প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি। সেই অসফল আন্দোলন তেমনভাবে কারো চোখেও পড়েনি আর তাতে তেমন কোন সমস্যাও হয়নি, কারণ পরবর্তী নির্বাচনে জয় এসেছিল। সেই যাত্রা পার পেয়ে গেলেও দুর্বলতাটা থেকেই গিয়েছিল। এবারের আন্দোলনেও তাঁরা তেমন কোন নতুনত্ব আনতে পারেনি। যা করেছে, তা হচ্ছে আওয়ামীদের আন্দোলনের ফটোকপি। সেই হরতাল, অবরোধ, ভাংচুর আর জ্বালাও পোড়াও। হরতালের বাজারদর কমে যাওয়া আর ভাংচুর এবং পেট্রোল বোমায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু, এবার সমস্যায় ফেলেছে বিএনপিকে।

হরতালের বদলে দেয়ার মত হাতে তেমন নতুন কোন কর্মসূচিও নেই। মানব বন্ধন কিছু দিয়েছিল, তবে সেখানে তেমন কোন গ্ল্যামার নেই, ওটা অনেকটা সুশীল সমাজ সুশীল সমাজ ভাব এনে দেয়। খুব ভালো কাভারেজও জোটে না, ফলে সেই লাইনে এগিয়েও খুব বেশি সাফল্য আসেনি। সমাবেশের নাম পাল্টে, বিক্ষোভ সমাবেশ করেও তেমন কোন লাভ হয়েছি কিনা সন্দেহ। ফলে ঘুরে ফিরে সেই হরতাল আর মিছিল। আর অতি ব্যবহারে এই মহার্ঘ অস্ত্রের প্রতি জনগণ আর দলীয় কর্মীদের মধ্যে এসেছে এক বেশ দায়সারা ভাব। হরতালের এই কর্মক্ষমতা হারানো আর বিকল্প কিছু না পাওয়া, সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে বিএনপিকে।

চিন্তার দৈন্যতার চরম প্রকাশ করলেন বিএনপির জনৈক নেতা। আওয়ামীদের ‘লগি-বৈঠা’ নকল করে ‘দা-কাস্তে’ বলে বেশ বড়সড় ঝামেলা বাঁধালেন। এরপরে বেশ কিছুদিন তিনি লাপাত্তা হয়ে থাকলেন। বিএনপির নেতারা, ‘নিজস্ব মতামত’ বলে দূরত্ব তৈরি করলেন। ঢাকা মহানগরে আগে থেকেই দলীয় কোন্দল ছিল, সেখানে কিছু হাওয়া লাগলো। খোকা সাহেবকে কোণঠাসা করবার এই সুযোগ, অন্য পক্ষ হাতছাড়া করল না। পুরো ঘটনার সারাংশ যা দাঁড়াল, তা হচ্ছে, দলীয় কোন্দলের সাথে সাথে বিএনপির চিন্তার দৈন্যতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠল।

এদেশে আন্দোলন করবার সময় হচ্ছে এই শুষ্ক মৌসুমটা। হাতে আছে আর বড়জোর তিনমাস। এই সময়ের ভিতর বিএনপি কিছু করতেন না পারলে পিছিয়ে যাবে এক বছর। কারো কারো মতে পুরো চার বছর। যত সময় যাচ্ছে, ততোই প্রশ্ন জাগছে, এই শীতকালে কিছু করতে বিএনপি কি পারবে? কিছুদিন আগের ‘কতোটা সফল হবে’ থেকে আলাপ আলোচনা সেই প্রথম ধাপেই ফিরে এসেছে ‘বিএনপি আদৌ কিছু করতে পারবে কি না?’ ২৭ তারিখের পরে, এই উত্তর কমবেশি এখন সবাই জানে। টক শো আর বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় বেশ অনেক বুদ্ধিজীবীই এখন ভবিষ্যৎ করনীয় নিয়ে উপদেশ দেয়া শুরু করেছেন। আসলে বিভিন্ন ভাবে বলার চেষ্টা করেছেন, এভাবে হবে না। হয়তো বিএনপি নিজেও জানে, তাঁদের কিছু করার ক্ষমতা নাই। তবে যেটা জানে না, তা হচ্ছে, এর কারণ।

একথা ঠিক যে আওয়ামীদের এমন কোন জনপ্রিয়তা এখন নেই। ৫ই জানুয়ারী নির্বাচনকে প্রথমে বেশ কিছুদিন সফল নির্বাচন বলে চালানোর চেষ্টা করলেও সম্প্রতি তাঁরা সুর পাল্টেছে। এখন তাঁরা সেই গণতন্ত্র হত্যাকে সাংবিধানিক বাধ্য বাধকতা বলে চালানোর চেষ্টা শুরু করছেন। ভাষার এই পরিবর্তন থেকে হয়তো কিছুদিন আগেও বিএনপির মনে আশা জেগেছিল, হয়তো ভাবছিল, আন্দোলন ভালমত করতে পারলে, কপালে শীকে ছিঁড়তে পারে। এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না আর বোদ্ধা মহলও বলছেন, বিএনপির যে সাংগঠনিক অবস্থা আর দলীয় কোন্দল, তাঁদের দিয়ে তেমন কোন আন্দোলন সংগঠিত হওয়া সম্ভব না।

এর আগের বিভিন্ন সরকার বিরোধী আন্দোলনে, সাধারণ জনতা, হয় নিজেই মাঠে নেমেছিল আর নয়তো মৌন সম্মতি দিয়েছিল। এবার দুটোর কোনটাই ঘটছে না। পুরো আন্দোলনকে তাঁরা দেখছে, দুই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার কামড়াকামড়ি হিসেবে। চর দখলের এই প্রতিযোগিতায় কেউই অংশ নিতে রাজী না। আন্দোলন করে, আওয়ামীদের গদি থেকে নামাবার পরে কি? কি পাবে তাঁরা? এই উত্তরে জনগণ দেখতে পাচ্ছে সেই একই হতাশা। আরেকটি স্বৈরাচারী সরকার, শুধু নেত্রীর নাম পরিবর্তন।

জনগণকে যদি পাশে পেতে চায়, বিএনপিকে প্রথমে বুঝতে হবে, জনগণ কি চায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁদের নেতার অবস্থান মুখস্থ করানো নিয়ে জনগণ বেজায় বীতশ্রদ্ধ। প্রয়াত নেতাদের পূজা করা এবং জনগণকে সেই পূজা করতে বাধ্য করার এই প্রবণতার একটি ইতি টানবার চেষ্টা তাঁরা দেখতে চায়। ছাত্র সংগঠনের উদ্দাম অস্ত্র নৃত্য কিংবা দুর্নীতির কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি চায়। ক্ষমতায় গেলে করব, এই ফর্মুলা থেকে বেড়িয়ে এসে, এখনই কিছু করার প্রচেষ্টা দেখতে চায়। ‘ওদের আমলে কি হয়েছে?’ এই যুক্তিতে নিজেদের অন্যায় চালিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতার অবসান দেখতে চায়।

অলৌকিক কিছু না ঘটলে, এই সাংগঠনিক অবস্থানিয়ে বিএনপির পক্ষে সফল কোন আন্দোলন করা সম্ভব না। এই তথ্যটা বিএনপি বুঝে গেছে। তবে যেটা বোঝেনি, তা হচ্ছে, কেন তাঁদের এই অবস্থা। জনগণের আকাঙ্ক্ষা বোঝার যে অক্ষমতা আওয়ামীদের ভেতর এখন কাজ করছে, তা তাঁদের ভেতরেও কাজ করছে। গদি থেকে আওয়ামীদের সরিয়ে বিএনপিকে বসাতে কেউই আগ্রহী না। স্বৈরতান্ত্রিক ফরম্যাটের সরকারের শুধু নেত্রী পরিবর্তনের জন্য কোন জনগণই মাঠে নামবে না। বিএনপির কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা জনগণের এই সরল প্রত্যাশাটা এখনও বোঝেনি। বিএনপির এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তাঁরা কি বোঝেনা, সেটাই বোঝেনা।

আসুন ঘৃণা করতে শিখি…

by WatchDog Bd

মানুষ অমানুষ ভাগ করার দুঃখজনক একটা সুযোগ দিয়ে গেল শিশু জেহাদ। তার মৃত্যু আমাদের কষ্ট দিয়েছে সন্দেহ নেই, তারপরও এ মৃত্যুতে খুঁজলে এমন কিছু পাওয়া যাবে যা নিয়ে জাতি হিসাবে আমরা গর্ব করতে পারি। মানুষ মরণশীল। যারা সৃষ্টিকর্তাকে জন্ম-মৃত্যুর নিয়ন্ত্রক হিসাবে মানেন তাদের কাছে শিশু জেহাদের মৃত্যুর হিসাব খুব সহজ। হয়ত তার ভাগ্যলিপির আশু বাস্তবায়ন হিসাবে বিবেচনা করবেন তারা। কিন্তু আমার মত যাদের মগজে উপরওয়ালার অস্তিত্ব নিয়ে লাখো প্রশ্ন কিলবিল করে তাদের কাছে যে কোন শিশুর মৃত্যু ঠাণ্ডা মাথার খুন ছাড়া অন্যকিছু মেনে নিতে কষ্ট হয়। হোক তা আফগানিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায়, হোক তা পাকিস্তানের পেশোয়ারে তালেবানদের নৃশংসতায়, হোক তা শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির সরকারী মৃত্যু-কুপের কারণে। একটা শিশু জন্ম নেয় বাঁচার জন্য, চার বছর বয়সে মারা যাওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেকটা মা-বাবা তাই করার চেষ্টা করে। মা-বাবার পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব শিশুকে আগলে রাখা। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসা, শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। এসব নিশ্চিত করার জন্যই একটা দেশে সরকারের প্রয়োজন হয়। দরকার হয় রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির। এজন্যই নাগরিকরা ভোট দেয়। পছন্দের মানুষকে দায়িত্বে বসায়। শুধু জেহাদ কেন, দেশের মাটিতে জন্ম নেয়া প্রত্যেকটা শিশুর অভিভাবক কেবল তার পিতা-মাতা নয়, বরং সব বিবেচনায় রাষ্ট্র তার মূল অভিভাবক। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে মৃত্যু এ দেশে এখন গলির ধারের ফুচকার মত সহজলভ্য উপাদেয় পণ্য। প্রতিদিন জেহাদের মত শত শত শিশু মরছে। কেবল দুর্ঘটনায় নয়, মরছে অনাহারে, অবহেলায়, বিনা চিকিৎসায়, মরছে রাষ্ট্র তথা সরকারের বুটের তলায়। জেহাদের মৃত্যুর পার্থক্যটা হচ্ছে রাজনীতি তথা সরকারের নামে এ দেশে যে ভয়াবহ অরাজকতা ও অযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে তার আসল চেহারা কিছুক্ষণের জন্য হলেও নেংটা করে দেখানো। আমরা দেখেছি কতটা যোগ্যতা নিয়ে সরকারী চাকরি করছেন আজকের প্রশাসন ও তার প্রফেশনাল মেকানিজম। মুক্তিযোদ্ধার কোটা, দলীয় কোটা, পারিবারিক কোটার নামে দুদিন আগের রাস্তার সন্ত্রাসী এখন চাকরিতে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে জিহাদ উদ্বার পর্বে। ২৩ ঘণ্টা চেষ্টা করে যে কাজটা তারা করতে পারেনি তা আধা ঘণ্টায় করেছে কজন সাধারণ মানুষ। এখানেই উন্মোচিত হয় জাতি হিসাবে আমাদের আসল পরিচয়। এ পরিচয় রাজনীতির নষ্ট গলিতে পথভ্রষ্ট হলেও একেবারে যে তলিয়ে যায়নি তাই প্রমাণ করেছেন কজন সাহসী যুবক। এ বাংলাদেশকেই আমরা আবহমান কাল ধরে চিনে আসছি। এ বাংলাদেশকেই আমরা বুকে লালন করে ভালবেসে গেছি। লাখো মানুষের পতাকা রেকর্ড অথবা চেতনার বেলুনে মুক্তিযুদ্ধের ঝাণ্ডা উড়ালেই যে দেশপ্রেমিক হওয়া যায়না তার প্রমাণ রেখেছে জিহাদ উদ্ধারের শ্বাসরুদ্ধর কয়েক ঘণ্টা।

একদিকে অবৈধ মন্ত্রী, আগাগোড়া পচনশীল আমলাতন্ত্রে, সরকারের পোষ্য ও নিকট অতীতে লালিত পেটোয়া বাহিনীর সমন্বয়ে ঘটিত উদ্বার বাহিনী, অন্যদিকে এ দেশের কোটি মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা এবং সাথে ফারুক, লিটু, বকর, মজিদ, সুজনদের মত নিঃস্বার্থ কজন সাধারণ মানুষ। এ বাংলাদেশ নিয়েই আমরা গর্ব করতে পারি। আর যে বাংলাদেশের পরতে পরতে দুর্নীতির কুষ্ঠ রোগ, পিতার মাজারে লালসালুর ব্যবসা আর মজিদ, সুজন ও লিটুদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে হানিফ, হাসান মাহমুদ আর সুরঞ্জিত চোরাদের জন্য গড়া হয় স্বর্গের লীলাভূমি সে বাংলাদেশ আমার, আপনার কারও নয়। আর কিছু না পারি আসুন ঘৃণা করতে শিখি এমন রাষ্ট্রকে।

Failure of Politics?

By Ariful Hossain Tuhin

I usually don’t watch television. But my father is a passionate viewer of all kind of political talk shows, especially “ajker bangladesh” from independent tv.

Last night i was temporarily paused when some remarks from a guy in “ajker bangladesh” caught my ear.

Some lawyer i guess affiliated with AL, was saying something like this,

“Why don’t BNP create a popular movement to pressure government?”. Khaled mohiuddin, who runs the show, interrupted and told,

“How can BNP create a peaceful popular movement if the government fires live rounds even if its not a violent movement”

That guy answered along these lines

“The blame goes to BNP, if there were 200 people, police disperse them with sticks, if there were 2000 people, police fires at them, if there were 200000 people, police would not have done anything”

I was kind of shell shocked.

So the “freedom of association” clause in the constitution has condition of “head count” according to this lawyer guy. I don’t know where did he got his law degree.

This is a very dangerous way of thinking. The liberal democratic values dictates that , the state has to justify its use of force. Otherwise it has no right to suppress any kind of political protest even if it dislikes it. Yes i understand there are cases when BNP and jamat resorted to violent means where police may have the justification to use force. In all circumstances, they have to held accountable. A state can not behave in an arbitrary way, otherwise the very foundation of the state become void and illegitimate.

Liberals who are still supporting AL in this issue, that is, suppressing each and every BNP protests/rallies, have to do some soul searching. Where is exactly is their “liberal conscience “? This way the gets a kind of dangerous impunity which has a lot of side effects.

Its just a matter of time, that those police will attack preemptively in other scenarios. Just like they violently attacked primary school teachers, garment workers. It will turn against the liberal themselves if they fall out of favor just like Gonojagoron moncho.

This is not a debatable issue as our constitution guarantees “freedom of association”. And if there is no evidence of “violence”, the state has no choice to abide by it.

I once read in a article criticizing our constitution, I can’t cite it, because it was published in a print journal, where it was claimed that the the fundamental rights guaranteed in our constitution can not be enforced by a court(Like it can be enforced in USA). That means, i can’t file a writ petition to ask the court to enforce my “freedom of speech” and “freedom of association”. I’m not an expert, but if that’s the case, then constitution has little practical value as the court will not be able to check the state if the state violates fundamental rights. The argument put forwarded in that article was There are certain portion of the constitution which can not be enforced by the court. This is a serious shortcoming. (If anybody interested i can give him the copy of the journal)

Another thing is that guy subconsciously stated an obvious. Its not possible to overthrow this government by normal democratic politics. As he claimed , the state’s gun will only be silent if there were 2000000 people. So only an angry mob with pitchfork can make them behave. The government doesn’t believe in rule of law. They believe in mob justice. I should thank him for this simple honesty.

সহজিয়া বাংলার লাঠিয়াল

By Ariful Hossain Tuhin

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম থিসিস সুপারভাইজরের সাথে দেখা করতে। গিয়ে দেখি লাঠি সোটা নিয়ে ছাত্রলীগের ছাত্ররা ক্যাম্পাস দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। একে ওকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম আজ কোন একটি গ্রুপকে পেটানো হচ্ছে। হয়ত অন্য রাজনৈতিক দলের সদস্যদের অথবা নিজেদের রাজনৈতিক দলেরই অন্য কোন গ্রুপকে আজ পেটানো হয়েছিল।

আমার মধ্যবিত্ত চিন্তাভাবনা প্রধানত “আপনি বাচলে বাপের নাম” দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং আপাতত যেহেতু আজকে ছাত্রলীগ দ্বারা মার খাবার সম্ভাবনা আমার নেই তাই আমি আমার কাজে চলে গেলাম। বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে যে গভীর উদ্বেগ হবার কথা, তার কিছুই হল না। থিসিসের ক্যালকুলেশনগুলো কোনদিকে যাচ্ছে সেটাই তখনকার চিন্তার বিষয় হয়ে দাড়ালো।

কাজ শেষে অফিসে আশা পর্যন্ত জনাপঞ্চাশেক ছেলের লাঠি নিয়ে দৌড়াদৌড়ির দৃশ্যটি আর মনে ছিল না। সম্ভবত কিছুদিন আগে তারেক রহমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই মারামারির উদ্যোগ। “রোল রিভার্সাল” হলে এই পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে না। তখন হয়ত সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য কেন্দ্রকরে লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি হবে।

নিজেদের নেতার মানসম্মান রক্ষার জন্যে এধরনের উদ্যোগ আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের এই দেশে সকল বিখ্যাত এবং কুখ্যাত লোকেরই খুবই ঠুনকো ভাবমূর্তি রয়েছে। হোক সে ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক নেতা। সকল ক্ষেত্রেই তাদের মানসম্মান রক্ষার জন্যে সেই নেতার অনুসারীদের বিপুল তোড়জোড় দেখা যায়। এত নাজুক যাদের ভাবমূর্তি তাদের প্রতি করুণার উদ্রেক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এত বিপুল শক্তি এবং মনোযোগের সাথে তাদের ভাবমূর্তি ২৪ ঘন্টা ৭ দিন পাহাড়া দেয়ার প্রপঞ্চটিও আমার কাছে বেশ দুঃখজনক লাগে। তবে আমি দুঃখ পাই এইজন্যে নয় যে দেশ এবং জাতির অনেক “মানব ঘন্টা” তুচ্ছ কাজে নষ্ট হচ্ছে। প্রথমত যারা লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়ে থাকেন, তাদের কাছে বিষয়টি অবশ্যই তুচ্ছ নয়। আর এই দৌড়াদৌড়ি বাদ দিলে যে মানব ঘন্টা একাজে ব্যবহার হয় তা অন্যকোন উতপাদনশীল কাজে ব্যবহার হত সেই বিশ্বাস আমার নেই। তাছাড়া সবকিছুতে অর্থনৈতিক হিসেব কষা এবং দেশ ও জাতির উন্নতির কথা অর্থনৈতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রীয়ার মাঝে একধরনের যান্ত্রিকতা যা আমার ঠিক রোচে না। কারো লাঠি নিয়ে দৌড়াতে ইচ্ছে করলে দৌড়াবে। আমার মাথায় না মারলেই হল। আমার দুঃখবোধ হয়, এই দৌড়াদৌড়ির মত কাজে জীবন ব্যয় করে বেচারাদের একধরনের একঘেয়েমি আসার কথা। বাংলাদেশের সরকারী দলগুলো ৫ বছরে দৌড়াদৌড়ি করে হাঁপিয়ে পরে। যদিও আওয়ামী লীগ এইবার কিছুটা দীর্ঘসময় ধরে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের দৌড়ের মধ্যে অবসাদের লক্ষণ স্পষ্ট। মাঝে মাঝেই তাদের দৌড়াদৌড়ির প্রধান কারন হয় প্র্যাকটিস। কিন্তু কাঁহাতক প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলা যায়?

যাই হোক, অফিসে এসে আমার আর এস এস রিডারে বিভিন্ন জিনিসের এলার্ট ঘাটছি। একটি পেপারের দিকে নজর ফিরল[১]। পেপারের বিষয় একটি পপুলেশনে কিভাবে গোত্র তৈরী হয় তার গাণিতিক মডেল।

সামাজিক পদার্থবিজ্ঞান , পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারনা সামাজিক ক্ষেত্রে প্রয়োগের চেষ্টা করে। এই পেপারটিও সেই ধারার অন্তর্ভুক্ত।

এখানে যা প্রয়োগ করা হয়েছে তা আমাদের চিরপরিচিত পারিসাংখ্যিক বলবিজ্ঞানের ধারনা। পারিসাংখ্যিক বলবিজ্ঞানে কোন সিস্টেমে কণাগুলোর আলাদা করে গতি হিসেব না করে তাদের গতির একটি সম্ভাবনাভিত্তিক অনুমান গ্রহন করা হয়। দেখা যায় সাধারন সেই অনুমান থেকে ম্যাক্রোস্কোপিক বিভিন্ন বৈষিষ্ট্য যেমন তামমাত্রা ইত্যাদি উদয় হয়।

যেহেতু একজন ব্যক্তিমানুষের জন্যে তার ব্যবহারের কোন সুনির্দিষ্ট তত্ব দাড়া করানো কঠিন, তাই তার ব্যবহারের কিছু সাধারন অনুমান গ্রহন করে দেখা হয় পপুলেশন লেভেলে কি ধরনের বৈশিষ্ট্য emerge করে।

এই পেপারে আলোচনা করা হয়েছে মতামতের ডাইনামিক্স। দেখার চেষ্টা করা হয়েছে কিভাবে স্বতপ্রণদিতভাবে নেতা তৈরী হয়। গবেষণার ফলাফল বেশ মজার। দেখা গেছে ধীরে ধীরে পপুলেশনে একটি “সেকেণ্ড অর্ডার ফেইজ ট্রানজিশন”(সেকেণ্ড অর্ডার ফেইজ ট্রানজিশনের সহজ উদাহরন ফেরোম্যাগনেট, যেখানে ডোমেইন তৈরী হয়) হয়। এর ফলে বেশ কিছু গোত্র তৈরী হয় তারা পরস্পরের থেকে মতামতের ব্যপারে আলাদা।

যেহেতু এই প্রবণতা জেনারালাইজড পপুলেশনের জন্যে, সেহেতু গোত্র তৈরী, এবং এক গোত্রের অন্য গোত্রের প্রতি লাঠি নিয়ে দৌড়ানো দেখে অবাক হবার কিছু নেই। আমাদের মধ্যবিত্ত মন হয়ত এইসব লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি দেখে সামান্য আহত হতে পারে। কিন্তু এই আহত হওয়া অনেকটা প্রাকৃতিক বর্জ্যের মত। প্রাকৃতিক বর্জ্যের গুরুত্ব আমরা কেউই অস্বীকার করিনা। কিন্তু চোখের সামনে দেখলে আমাদের ভদ্রতা শুচিতা ইত্যাদি আহত হয়। তেমনি লাঠিসোটার ঝংকার যা ইতিহাসের শুরুথেকেই আমাদের প্রজাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সেটিকেও অস্বীকারের কোন কারন নেই। শুধু চোখের সামনে না ঘটলেই হল।

এই অঞ্চলের লোকজন প্রকৃতিবিরুদ্ধ “মানবাধিকার”, “সম অধিকার”, “বাকস্বাধীণতা” ইত্যাদিকে গ্রহন করতে প্রস্তুত নয়। প্রধান কারন অবশ্যই এইগুলো সত্যিকার অর্থে প্রাকৃতিক নিয়ম নয়। এই যায়াগায় টমাস জেফারসনের সাথে দ্বিমত করতেই হচ্ছে। এইসব অধিকার আমরা জন্মের সাথে সাথে পেয়ে যাই না। ইদুড়ের কোন অধিকার যেমন বিড়াল স্বীকার করে না, তেমনি আমাদেরও ইনট্রিনসিক কোন প্রণোদনা নেই অন্যমতের বা অপছন্দের মানুষের অধিকার স্বীকার করার মাঝে।

লাঠালাঠিই আমাদের আসল চেহারা। সেই চেহারার পরিবর্তন চাইলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে হয়। অনেক জাতি কিছুটা সেই বিরুদ্ধযাত্রার পথে যাচ্ছে। আমরা অনেক প্রকৃতির কাছে বসবাস করি। আমদের দার্শনিকরা বলেন যে আদিকালে মুসলমানরা এবং নিম্নবর্গের অচ্ছুত দলিতরা সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখত না, সে আদিকালে আমাদের সহজিয়া ভাবান্দোলন ছিল যা প্রকৃতি এবং প্রতিবেশের জন্যে একই সাথে মমতা এবং দ্রোহের প্রতীক। সুতরাং আমাদের সহজিয়া হওয়া উচিত এবং প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে এবং সহজিয়া যুগের মাঝে আমাদের আত্নপরিচয় আবিস্কারের মাধ্যমে অন্য গোত্রের মাথায় দুই বেলা লাঠির বাড়ি বসানো উচিত। নাহলে আমাদের প্রাকৃতিক উতস এবং তার সাথে সংযুক্ত দেহবাদী ভাবান্দোলনের অপমান হয়।

[১] Mosquera-Donate, G. & Boguna, M. Follow the Leader: Herding Behavior in Heterogeneous Populations. arXiv (2014)
http://arxiv.org/abs/1412.7427

নির্বাচনমুখী আন্দোলন বনাম লতিফ কার্ড!

|| এ.কে.এম ওয়াহিদুজ্জামান ||

১৭ বছর আগে নিজে হাজ্জ্ব পালন করার পরও গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকা সফরের সময় হাজ্জ্ব নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। বিএনপিসহ এবং ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো তখন তাকে মন্ত্রীসভা থেকে অপসারণ এবং বিচার করার দাবী জানিয়েছিলো। সরকার সেটা মেনেও নিয়েছে। লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়েছে, তাকে মন্ত্রীসভা এবং আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। সেই গ্রেফতারী পরোয়ানা মাথা নিয়ে দেশে ফেরা এবং গ্রেফতার এড়িয়ে এয়ারপোর্ট ত্যাগ করার পর হেফাজতে ইসলামীর হরতাল এবং ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচী বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন বিএনপিসহ গণতান্ত্রিক দলগুলো নির্বাচনমূখী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিএনপি’র সামনে এখন দুইটা পথ; লতিফ ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করা অথবা লতিফ ইস্যুকে উল্টো সরকারের কোর্টে ঠেলে দিয়ে নির্বাচনমূখী আন্দোলনটাই গড়ে তোলার চেষ্টা করা। ৯০ দশকে কম্যুনিজম বিরোধী স্বস্তা সেন্টিমেন্টের মৃত্যুর পর ইসলামী জঙ্গী বিরোধী স্বস্তা সেন্টিমেন্টের বাজার দর এখন চড়া। বিএনপি যদি এখন হেফাজতে ইসলামী এবং জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে লতিফ সিদ্দিকী ইস্যুতে আন্দোলন শুরু করে, তাহলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক বাজারকে কেবল আরেকবার দেখিয়ে দেবে যে, বিএনপি গণতন্ত্র নয় বরং জঙ্গীবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রয়োজনে ৬মে ২০১৩’র মত আরেকটা ঘটনা ঘটিয়ে প্রমানও করে দেবে যে, বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঠেকাতে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগই উপযুক্ত দল।

দ্বিতীয় পথ অনুসরণ করে বিএনপি যদি লতিফ ইস্যুকে উল্টো সরকারের কোর্টে ঠেলে দিয়ে বলে যে- সরকার তার বিচার করবে বলেছিলো এখন বিচার করুক, যদি বিচার না করে তাহলে সেটা সরকারের ব্যার্থতা। তাহলে বলটা সরকারের কোর্টে যাবে। সরকারকে তখন হয় লতিফ সিদ্দিকীর বিচার করতে হবে কিম্বা তাকে দিয়ে ভুল স্বীকার করিয়ে ক্ষমা প্রার্থনাশেষে তওবা করানোর ব্যবস্থা নিতে হবে, অথবা তাকে বিচারের আওয়তায় না এনে ইসলামিস্টদের আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে।

প্রথম ক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলামীর দাবী মেনে নিয়ে সরকার লতিফ সিদ্দিকীর বিচার করে, বা লতিফ সিদ্দিকী নিজেই হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় গিয়ে তওবা করে পুনরায় কলেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে একটা চমক সৃষ্টি করতে পারেন। যদিও এটা খুবই দুর্বল একটা সম্ভাবনা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ লতিফ সিদ্দিকী অনেক কাঠ-খড়-কেরোসিন পুড়িয়ে নিজের যাবতীয় দুর্নীতি ও অপকর্মের আলোচনা ধামাচাপা দিয়ে এখন সুশিল সমাজের মাধ্যমে দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরীনের পাশে স্থান করে নিয়েছেন। এই স্থান থেকে সরে এসে নিজের দুর্নীতি ও অপকর্মের মামলাগুলোকে নিশ্চই তিনি প্রাধান্য দিয়ে আলোচনায় আনতে চাইবেন না।

Untitled-1

এমতাবস্থায় দ্বিতীয় বিকল্প অনুযায়ী, হেফাজতে ইসলামীর দাবী না মেনে নিয়ে সরকার তাদেরকে আন্দোলন করার সুযোগ করে দিতে পারে। যার নমূনা আজ ২৪ নভেম্বর দেখা গেছে। বিএনপির কোন সংগঠন পুলিশের গ্রেফতার-পিটুনীর কারণে রাস্তায় মিছিল করতে না পারলেও হেফাজতে ইসলামী মিছিল করতে পারছে। মানে সরকার তাদেরকে মিছিল করার সুযোগ দিচ্ছে। এটাকে তারা সাফল্য ভেবে চুড়ান্তভাবে ঢাকা অবরোধের ডাক দিলেও সম্ভবত সরকার সেটা করতে দেবে। এতে দ্বিমুখী লাভ। প্রথমত: এতে করে সরকার বিরোধী আন্দোলন করার মত শক্তিকে দ্বিখণ্ডিত করা যাবে, যাতে লাভবান হবে আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয়ত: জঙ্গীবাদ তত্ত্ব প্রচার ও প্রমান এবং দমনের দক্ষতা প্রমাণের মোক্ষম সুযোগ। সরকার আগের মতই বিনাবাঁধায় হেফাজতে ইসলামী ও অন্য ইসলামিস্ট দলগুলোকে মিছিল, সমাবেশ এবং ভাংচুর করতে দিয়ে সেই দৃশ্য টিভি চ্যানেলে সম্প্রচার করে প্রথমে বর্হিবিশ্বকে জঙ্গীবাদের উত্থান দেখাবে, তারপর তা কঠোর হাতে দমন করে নিজেদের সক্ষমতা দেখাবে।

কিছুদিনের মধ্যেই নেপালে নরেন্দ্র মোদীর সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে। তারপর দেশে আসবেন নিশা দেশাই বিসওয়াল। সেই সময় মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রসঙ্গে আলোচনা এড়ানোর জন্য জঙ্গী ইস্যুর চেয়ে গরম ইস্যু আর কোনটা হতে পারে? মোদি সরকার আওয়ামী লীগের সাথে সাধারণ বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষা করলেও ভারতের পলিসিমেকার সাউথ ব্লক এখনো আওয়ামী লীগেরই কট্টোর সমর্থক। লতিফ সিদ্দিকী সেই ভারত হয়েই বাংলাদেশে ফিরেছেন। কাজেই তিনি আগুনে ঝাঁপ দিতে নয়, বরং আগুন নিয়ে খেলা করতে এসেছেন। এখন তার লেজে আগুন দিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধানো দেখার অপেক্ষা।

সেনা অভ্যুত্থানঃ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র প্রেক্ষাপট

আজ ১৯ আগস্ট । রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অগাস্টাস (যার নামে ইংরেজী অগাস্ট মাসের নামকরণ করা হয়েছে) এর ২০০০তম মৃত্যুবার্ষিকী । তিনি জুলিয়াস সিজার পরবর্তী বিশৃঙ্খল অবস্থায় প্রথমবার পাক্স রোমানা (শান্তিপূর্ণ রোম) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সম্রাট নামে নিজেকে ঘোষণা না দিয়ে প্রিন্সেপস্ সিভিতাতিস (রাষ্ট্রের প্রথম নাগরিক) হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন । ধারণা করা হয় নিজ স্ত্রী লিভিয়ার প্রয়োগ করা বিষপানে তিনি ১৪ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান । তবে অগাস্টাসের মৃত্যুবার্ষিকী স্বরণ করা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয় । আজকের দিন আরো একটি ঐতিহাসিক এবং শিক্ষণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে । ১৯৫৩ সালে ঠিক এই দিনে (১৯ আগস্ট) ইরানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন । তার এই পতনে সরাসরি জড়িত ছিলো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (অপারেশন অ্যাজাক্স) এবং বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স (অপারেশন বুট) । ব্রিটেনের একটি কোম্পানী দীর্ঘদিন ইরানের তেল সম্পদ কুক্ষিগত করে নিজেদের পকেট ভরেছে । কিন্তু মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের কর্মকান্ডের হিসাব চাইলেন তারা সহায়তা করতে অস্বীকার করলো । এরপর মোসাদ্দেগ সরকার ইরানের সকল প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রিয় মালিকানায় নিয়ে যাবার পর ব্রিটেন এবং আমেরিকা তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয় । এই অভ্যুত্থান নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে দেখা যায় কিভাবে দেশের প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি এবং পেশাজীবিরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে রাতারাতি বিদেশী শক্তিকে দেশের ভার তুলে দেয় । সেই সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় একটি সেনাবাহিনী কিভাবে ক্ষমতা কাড়াকাড়ি করার অভ্যুত্থানে হঠাৎ বীরত্ব দেখাতে থাকে এটাও পরিষ্কার হবে । এই লেখায় মুসলিম বিশ্বের সেনা অভ্যত্থান গুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা থাকবে ।

ইদানীংকালে মিশরের সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টি বেশ আলোচনায় এসেছে । পাকিস্তান, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি দেশগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছে শুধুমাত্র পর্যায়ক্রমিক সেনাশাসনের কারনে । এখন তিউনিসিয়া অথবা তুরস্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও মুসলিম বিশ্বে- বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের মাঝে ব্যাপক উৎকন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । মিশরের ২০১৩ সেনা অভ্যুত্থান না হলে হয়তো ফিলিস্তিনে ২০১৪ গণহত্যা এড়ানো যেতো । আবার তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগানের বিরুদ্ধে যেভাবে সকল শক্তি একজোট হয়েছে, তিনি কতোদিন সেনা অভ্যুত্থানের হুমকি মোকাবেলা করে টিকে থাকতে পারবেন সেটাও ক্যালকুলেশন করা দরকার আছে । এসব বিষয় বিবেচনা করেই সেনা অভ্যুত্থান পর্ব অধ্যয়ন করা প্রয়োজন মনে করেছি ।

প্রথমেই বলে নেয়া যাক সেনা অভ্যুত্থানের সংজ্ঞা কি । ফরাসি coup d’état শব্দটির অর্থ হচ্ছে কোন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত সরকার বা শুধুমাত্র সরকার প্রধানের পদচ্যুতি ঘটানোর চেষ্টা । একটি মিলিটারী ক্যু তখনই সফল বলে ধরে নেয়া যাবে যখন সাবেক সরকারপ্রধান পদত্যাগের বাধ্য হবেন বা নিহত হবেন । তবে মিলিটারীর পাশাপাশি অভিজাত সম্প্রদায় বা সুশীল সমাজেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে । পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা রয়েছে । জুলিয়াস সিজার থেকে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট পর্যন্ত অনেক প্রভাবশালী শাসক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহন করেছিলেন । তবে অধিকাংশ সময়েই সেনা অভ্যুত্থান রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়েছে । যাইহোক, আমাদের আলোচনা মুসলিম বিশ্বে সীমিত থাকবে ।

মুসলিম বিশ্বে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯০৮ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সময় । তিনি ছিলেন শেষ অটোমান সুলতান এবং ইসলামী খিলাফতের ৯৯তম শাসক । ইয়ং তুর্কি মুভমেন্ট নামে একটি অভ্যুত্থানে তিনি ১৯০৯ সালে পদত্যাগে বাধ্য হন । এরপর আরো কিছুদিন কয়েকজন নামমাত্র সুলতানের অধীনে থেকে ১৯২৪ সালে খিলাফত সমাপ্ত হয় । এরমধ্যে আতার্তুক কামাল পাশা আধুনিক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন ১৯২৩ সালে । অন্যদিকে পারস্য সাম্রাজ্যে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রেজা খান পাহলভী ক্ষমতায় আসেন ১৯২১ সালে । এই দুইজনের অধীনে শিয়া এবং সুন্নী অধ্যুষিত অঞ্চল সমূহে সেনা অভ্যুত্থানের সূচনা হয় । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে ইরাকে জেনারেল বকর সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি সেনা অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী ইয়াসিন আল হাশিমী পদচ্যুত হন । তিনি সিরিয়ায় পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন । পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে চারজন কর্ণেলের নেতৃত্বে গোল্ডেন স্কয়ার নামে ইরাকি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের একটি দল ইরাকে অভ্যুত্থান করে । এতে নাৎসি জার্মানীর অনুসারী রশিদ আলী গিলানী ক্ষমতায় আসেন এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত শাহানশাহ জর্ডানে পালিয়ে যান । রাজতন্ত্র বিলুপ্তির জন্য ১৯৪৮ সালে ইয়েমেনে একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় ।

পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থান হয় সিরিয়ায় ১৯৪৯ সালে । ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাঈল যুদ্ধে পরাজিত হয়ে জেনারেল হোসনী আল জাইম সিরিয়ায় প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন কায়েম করেন । এই অভ্যুত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট মদদ পরিলক্ষিত হয় । ক্ষমতায় এসে জেনারেল হোসনী আল জাইম মহিলাদের বোরখা নিষিদ্ধ করেন । ইসরাঈলের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন । ইসরাঈলের সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় ফিলিস্তিনি উদ্ধাস্তুদের জন্য সিরিয়ায় বসতি করে দেন । মাত্র সাড়ে চারমাস পর এই সেক্যুলার জেনারেল তারই সহকর্মী সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত এবং বন্দি হন । একমাসের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয় । পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থানের ইতিহাস আমাদের ভারতবর্ষে । ভারত পাকিস্তান পৃথক হবার পরপর কাশ্মীরে ১৯৪৭ সালে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যুদ্ধ হয় । এখানে পাকিস্তানি সৈন্যরা যুদ্ধ করে পুরো কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছিল । যুদ্ধের মাঝামাঝি অবস্থায় ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সরকার ভারতের সাথে যুদ্ধবিরতি ঘোষনা করে । এটি অনেক সেনা কর্মকর্তা মেনে নিতে পারেননি । তারা ১৯৫১ সালে জেনারেল আকবর খানের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন । কিন্তু জেনারেল আইয়ুব খান এই পরিকল্পনা সরকারকে অবহিত করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন । এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ‘রাওয়ালপিন্ডি চক্রান্ত’ নামে পরিচিত । অভিযুক্ত জেনারেলদের পক্ষে আদালতে লড়াই করেন প্রখ্যাত বাঙালী আইনজীবি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি । অনেকের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয় । পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের সাজা মওকুফ করেন ।

মিশরে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান হয় ১৯৫২ সালে । রাজা ফারুককে সরিয়ে দিতে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে চক্রান্ত করেন জেনারেল মোহাম্মদ নাগীব । তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হবার একবছরের মাথায় ১৯৫৩ সালে আরেক জেনারেল জামাল আব্দেল নাসের তাকে গৃহবন্দী করেন এবং নিজে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করেন । ১৯৫৪ সালে একটি হত্যাপ্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট জামাল নাসেরের চক্ষুশূল হয় এবং ব্রাদারহুডের উপর নেমে আসে চরম নির্যাতনের কালো অধ্যায় । পূর্বেই বলেছি ইরানে প্রথমবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ১৯৫৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন । তিনি ইরানের তেল বৃটিশ আধিপত্যে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেন বিধায় সিআইএ এবং এমআইসিক্স যৌথ উদ্যোগে সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় । এতে নেতৃত্ব দেন সাবেক সম্রাট রেজা খান পাহলভীর ছেলে রেজা শাহ পাহলভী । ক্ষমতায় এসে রেজা শাহ পাহলভী ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র বানাতে ব্যপক উদ্যোগ নেন । যার ফলশ্রুতিতে ধর্মপ্রাণ মানুষ ইসলামী বিপ্লবের পথে এগিয়ে যায় । ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন । একই বছরে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাদশাহ ফয়সল গদিচ্যুত হন এবং ইরাক রিপাবলিকের আত্মপ্রকাশ ঘটে ।

১৯৬০ সালে সেনা অভ্যুত্থানে তুরস্কের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারিস ক্ষমতাচ্যুত হন । তুরস্কের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যাকে ফাঁসি দেয়া হয় । তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে পাশ্চাত্যকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছিলেন । যে সকল সেনা কর্মকর্তা মেন্দারিসকে হত্যা করে, তারা ন্যাটোর প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করে রেডিওতে বিবৃতি দিয়েছিলো । ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে সেনা অভ্যুত্থান হয় যা প্রায় আটবছর গৃহযুদ্ধে রুপ নেয় । এখানে রাজকীয় বাহিনীকে সৌদি আরব, জর্ডান, বৃটেন সমর্থন দেয় । বিপ্লবীদেরকে সমর্থন দেয় মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন । ১৯৬৩ সালে ইরাকে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কমিউনিজম বিরোধী বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে । সাবেক সেনাশাসক আব্দুল করিম কাসিম (যে নিজেও ছিলো অভ্যুত্থানে ক্ষমতাপ্রাপ্ত) ব্রাশফায়ারে নিহত হয় । একই বছর সিরিয়ায় মিলিটারী ক্যু ঘটিয়ে বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে । এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছর কোন না কোন মুসলিম দেশে সেনা অভ্যুত্থান হতেই থাকে । একের পর এক সাদ্দাম- গাদ্দাফী- মোবারক- আসাদ- ইয়াহিয়া- এরশাদ- মোশাররফ দের আগমন রোধ করা কোন মুসলিম দেশেই সম্ভব হয়নি । তবে মজার ব্যপার হচ্ছে- গণতন্ত্রের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাজতন্ত্রের স্বর্গ যু্ক্তরাজ্য প্রতিটি মুসলিম দেশের সেনা অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলো । বিশেষ করে ইসরাঈল প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিম দেশগুলোতে সেনা অভ্যুত্থান পরিচালনা করে অস্থিতিশীল রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বলে মনে হয় । এক্ষেত্রে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার, আধুনিকতা ইত্যাদি বুলি শুধু মুখোশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । এই সেনা অভ্যুত্থান নামক বিষবাষ্পের সর্বশেষ সংস্করণ আজকের মিশর । জেনারেল সিসি সেখানে ইসরাঈলের জাতীয় বীর উপাধী নিয়ে নব্য ফেরাউন হয়ে বসেছে । সম্ভবত এই তালিকায় ভবিষ্যতে নাম আসতে পারে পাকিস্তানের । কারণ সেখানে নির্বাচনের মাত্র এক বছরের মাথায় নওয়াজ শরীফ সরকারের বিরুদ্ধে ইমরান খান এবং তাহিরুল কাদরী যেভাবে বিক্ষোভ শুরু করেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এতো বড় সুযোগ মিস করবে বলে মনে হয়না । অথবা আইএসআই এটা মিস করলেও সিআইএ কিছুতেই মিস করবেনা । তবে আমার আশংকা হলো তুরস্কের বিষয়ে । কারণ এরদোগান প্রায় একযুগের সাধনায় পলিটিক্যাল ইসলামের যে প্রাসাদ দাঁড় করিয়েছেন, যদি আরেকটি অভ্যুত্থানে এই প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়ে তবে মুসলিম উম্মাহর জন্য হতাশার সীমা থাকবেনা ।

সেনা অভ্যুত্থানে প্রথমেই নিজদেশের মানুষের সাথে সেনাবাহিনীর একটি অপূরনীয় দূরত্ব তৈরি হয় । এছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষতি, দুর্নীতি, সমাজের নৈতিক অধঃপতন তো থাকেই । তারপর গণহত্যা থেকে গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায় । মিশরে এখন পর্যন্ত প্রায় তিনহাজার মানুষ নিহত এবং বিশহাজার আহত হয়েছে । সিরিয়াতে সামরিক শাসক আসাদ দেশটিকে শেষ করে ছেড়েছে । আরো হতাহতের ঘটনা আগামী দিনেও অপেক্ষা করছে । আমরা দেখেছি, মিডিয়া কিভাবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীকে প্রতারিত করে । আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনীতে ভুল সমরনীতি কিভাবে নিজ দেশে গণহত্যার পরিবেশ তৈরি করে । অথচ মুসলিম বিশ্বের ইসলামপন্থী কোন শক্তি একটি সুদক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারেনি । এল বারাদী দের বিদেশী ডক্টরেট আর গোল্ড মেডেল যেভাবে তাদেরকে নির্লজ্জ সেক্যুলার এবং ভোগবাদী হিসেবে তৈরি করছে, একমেলেদ্দীনরা যেভাবে বহির্বিশ্বকে বন্ধু ভেবে নিজদেশের দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তেমনি মুসলিম দেশগুলোর সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত বিদেশী অনুশীলন আর মিশন তাদেরকে কতটুকু দেশপ্রেম শেখায় বা জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তা মিলিটারী ক্যু এর ইতিহাস ঘাটলেই চোখে পড়বে । এছাড়া সুষ্ঠু পররাষ্ট্রনীতির অভাবে শুধু সরকারই নতজানু হয় তাই নয়, বরঞ্চ পুরো সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি নতজানু এবং পরাশ্রয়ী হয়ে উঠে । অতএব মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যদি সত্যিকার অর্থে বিদেশী আধিপত্য নামক বিষপান করতে না চান, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সম্পূর্ণরুপে জনগণের ইচ্ছাকে বিবেচনায় নেয়া । দূতাবাসে ব্রেকফাস্ট করতে নেতাদের হুড়োহুড়ি দেখার মতো । অথচ তারা একবারও ভাবে না – দূতাবাসে রাতের আঁধারে অন্য কেউ ডিনার করছে কিনা ।

পরিশেষে বলতে চাই- বাংলাদেশ, সিরিয়া, মিশর, ইরাক, লিবিয়া, সৌদি, আমিরাত, ইয়েমেন প্রভৃতি মুসলিম দেশে গণতন্ত্র মুক্তি পাক । অবৈধ-অগণতান্ত্রিক শক্তির হাত থেকে দেশ বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক । নয়তো এই মুসলিম দেশগুলো মানচিত্রে নামমাত্র টিকে থাকলেও এখানে মনুষ্য সভ্যতার অস্তিত্ব বিলীন হতে বেশিদিন লাগবে না । পাহলভীদের ভূত মুসলিম জাতির ঘাড় থেকে চিরতরে বিদায় হোক, আজকের দিনে এটাই প্রত্যাশা ।

চির উন্নত মম শিরঃ আগষ্ট বিপ্লব প্রসঙ্গ

এমন একটি সেনাবাহিনী কল্পনা করুন, যারা সদ্য একটি যুদ্ধ শেষ করে ব্যারাকে ফিরেছে । তাদের ফায়ার আর্মস বা মিলিটারী টেকনোলজি বেশ প্রাচীন আমলের । কিন্তু সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার মতো জ্ঞান, সাহস এবং দৃঢ়তা তাদের আছে । আবার কল্পনা করুন এমন একটি সেনাবাহিনী যারা জীবনে কখনো যুদ্ধই দেখেনি । প্রতিসপ্তাহে কমপক্ষে তিনটা করে পার্টিতে অ্যাটেন্ড করে, আনুষ্ঠানিকতায় দেশের মধ্যে শীর্ষে তাদের অবস্থান, সবার কাছে স্যার-স্যার শুনতে থাকে প্রতিনিয়ত । অবশ্য তাদের প্রশিক্ষণ আছে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার বিষয়ে । আপনাকে যদি বলা হয় দুটি সেনাবাহিনীর মধ্যে দায়িত্বশীলতার তুলনা করতে, আপনি অবশ্যই প্রথম দলকে এগিয়ে রাখবেন যদি সত্যিকার অর্থে সেনাবাহিনীর মূল্যায়ন করার মতো শিক্ষা আপনার থাকে ।

১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে কারো অজানা নয় । এ বিষয়ে যথেষ্ট ইতিহাস লেখালেখি হয়েছে, কলাম পড়া হয়েছে, ডকুমেন্টারি দেখা হয়েছে, ফেসবুকে নোট/স্ট্যাটাস পড়া হয়েছে । আমিও এটা নিয়ে লিখতে যাচ্ছি না । এতোবড় ঘটনার নিখুঁত বিশ্লেষণ করার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা যেমন আমার নেই, তেমনি সস্তা মকারি করে রম্য লেখারও উদ্দেশ্য নেই । বরং আমি এখনো আগস্ট বিপ্লবের প্রকৃত তাৎপর্য এবং সাফল্যের শিক্ষণীয় দিকটি বুঝতে চেষ্টা করি । যতোবার আগস্টের গল্প শুনি বা আগস্ট মাসে শোক প্রকাশের কালো পতাকা দেখি, আমার মনে একটা অদ্ভুত রকমের ডিলেমা তৈরি হয় । সেটা শেয়ার করাই আমার লেখার মূল প্রেরণা ।

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একধরণের অচলাবস্থা চলছে এটা সত্য । সম্ভবত ৭৫ সালেও প্রায় একই অচলাবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছিলো । যেহেতু বাংলাদেশের কোন নিরপেক্ষ ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি, আমরা কোন এক বা একাধিক লেখকের বই পড়ে বা কয়েকটা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখে অথবা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়ে ৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সত্যিকার তাৎপর্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবো- এটা ভাবাই বাতুলতা । তাহলে আমরা যারা এই প্রজন্মে বড় হয়েছি, তাদের সামনে একটিমাত্র পথ খোলা থাকে । সেটা হলো নিজেদের স্বশিক্ষিত বিচারবোধ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রিম্যাচিউর বার্থ থেকে শুরু করে ৭৫ সালের দিনগুলো পর্যন্ত বুঝে বুঝে ১৫ আগস্টের মূল্যায়ন করা । আপাতত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সময় নষ্ট না করে প্রথমেই দেখে নেয়া যাক আগস্ট বিপ্লবের চারটি লক্ষ্য মূলত কি ছিলোঃ

১। রুশ-ভারতের নাগপাশ থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করা ।

২। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ।

৩। ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ নামে বাকশাল ও মুজিব সরকারের প্রতারণামূলক কার্যক্রমের প্রকৃত উদ্দেশ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা ।

৪। কৌশলগত কারণে স্বল্প সময়ের জন্য সংসদকে বলবৎ রেখে সাংবিধানিকভাবে একটি দেশপ্রেমিক (সর্বদলীয়/র্নিদলীয়) অস্থায়ী সরকার গঠন করা ।

চলুন দেখে নিই অস্থায়ী সরকারের কাজগুলো কেমন হবার কথা ছিলোঃ

১। বাকশাল প্রণোদিত শাসনতন্ত্রের ৪র্থ সংশোধনী, সংবাদপত্র ও প্রকাশনা আইন, রক্ষীবাহিনী আইন, আর্ন্তজাতিক শ্রমিক আইনের পরিপন্থী শ্রমিক আইন ও অন্যান্য কালা-কানুন বাতিল করা ।

২। রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দিয়ে দেশে অবিলম্বে প্রকাশ্য রাজনীতি ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ।

৩। সকল রাজবন্দীদের বিনাশর্তে মুক্তি দেয়া ।

৪। সাধারণ নির্বাচনের দিন ধার্য করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা ।

৫। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি যে কোন হুমকি মোকাবেলা করার জন্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করা এবং জরুরী ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক সক্ষম ছেলে-মেয়েদের সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অবকাঠামো গড়ে তোলা ।

৬। সমাজতন্ত্রের নামে বিদেশী নিয়ন্ত্রণ, স্বেচ্ছাচারী একনায়কত্ব ও সরকারি সহযোগিতায় জাতীয় সম্পদ লুন্ঠন, কালোবাজারী, মুনাফাখোরী, চোরাচালান ও অবাধ দুর্নীতির ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে যে অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছে তার সমাপ্তি ঘটিয়ে বিপর্যস্ত দেউলিয়া অর্থনীতির পূর্ণবিন্যাসের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা ।

৭। জাতীয় জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিচার বিভাগের পুর্ণ স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেশে আইনের শাসন প্রবর্তন করা ।

৮। প্রশাসন কাঠামোকে দুর্নীতিমুক্ত করা ।

৯। রাষ্ট্রীয় নীতিসমূহে বাংলাদেশী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জীবনাদর্শের প্রতিফলন নিশ্চিত করার সাথে সাথে সংখ্যালঘু নাগরিকদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা ।

১০। ভারতের সাথে পঁচিশ বছরের মৈত্রী চুক্তি বাতিল করা ।

আরেকবার এক থেকে দশ পর্যন্ত পড়ে দেখুন । বর্তমানকালের সাথে প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার এই নির্দেশিকায় কি খুব একটা পার্থক্য ধরা পড়ছে ? বর্তমান আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে যেসকল শক্তি আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, তারা কি ঠিক একই অভিযোগ এবং অভিপ্রায় প্রদর্শন করছে না ? তাহলে দীর্ঘ চল্লিশ বছর পার করে আগষ্ট বিপ্লবের ফায়দা কি দাঁড়ালো ! তখনকার আওয়ামী গডফাদার গাজী গোলাম মোস্তফা যেভাবে লেডিস ক্লাব থেকে মেজর ডালিম এবং তার স্ত্রী নিম্মীকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করতে পারতো, এখনকার জয়নাল হাজারী, শামীম ওসমানরা কি এমন দুঃসাহস দেখাচ্ছেনা ? ১৯৭৩ সালে যেভাবে শেখ কামাল পুলিশের গুলি খেয়েছিলো ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে, এখনকার ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করার জন্য কি একই গ্রুপ কাজ করছেনা ? তাহলে বিপ্লব কিভাবে বলি ১৫ আগস্ট কে ! এটাই আমার কাছে প্যারাডক্স ।

শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমরা প্রথমেই যে ভুলটা করি তা হলো- এটাকে নিছক একটা রাজনৈতিক হত্যাকান্ড হিসেবে চিন্তা করি । যা সম্পূর্ণরুপে একটা সিভিলিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি । অথচ সম্পূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্তে, সেনাকর্মকর্তাদের দ্বারা এই ফেইট আকমপ্লি সংঘটিত হয়েছে । আমরা আওয়ামী বিরোধী মহল কথায় কথায় শেখ মুজিবকে ফেরাউনের সাথে তুলনা করি- যেনো হত্যাকান্ডের পক্ষে একটা ধর্মীয় আবহ তৈরী হয় । তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যারা মুজিব হত্যার পর রাতারাতি চেহারা পাল্টে জানরক্ষায় নিয়োজিত হয়েছিলো- তাদের কর্মকান্ডকে বার্ডেন অব প্রুফ ধরে আমরা ১৫ আগস্টের আলোচনা করি । একারণে বিষয়টির গভীরে আমরা যেতে পারিনা এবং প্রতিবছর শোক দিবসের একপেশে বিরোধিতা করতে থাকি ।

আরেকটি সমস্যা হলো দেশের অধিকাংশ জনগণ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে দেবজ্ঞান করে এড়িয়ে চলা । একারণে টকশোতে যেমন বুদ্ধিজীবিরা সেনাসদর/আইএসপিআর নিয়ে কোন সমালোচনা করতে বিব্রতবোধ করেন, আমজনতাও সেনাবাহিনীর কর্মকান্ডকে স্বর্গীয় নজরে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে । ফলস্বরুপ সেনাবাহিনী একটা পুতুল নাচের মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে । তারা রাজনীতির মাঠে নিষ্কৃয়তার প্রমাণ দিতে গিয়ে বিদেশী আগ্রাসনের মুখেও মুখ খুলতে পারেনা । ভারতের সেনাপ্রধান দলবীর সিং যতোটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে পাকিস্তানী সেনাপ্রধান রাহিল শরীফ কে হুমকি দিতে পারেন, ইরানী কমান্ডো চীফ কাসেম সোলায়মানি যেভাবে প্রকাশ্যে গাজা হত্যাকান্ডের জন্য ইসরাঈলের নিন্দা জানাতে পারেন, বাংলাদেশী সেনাপ্রধান ততোটা  জোর গলায় নিজদেশের পাহাড়ি জঙ্গিগোষ্ঠি জেএসএস বা ইউপিডিএফ কেও ধমক পর্যন্ত দিতে পারেন না । বিজিপি বা বিএসএফের বিরুদ্ধে মুখ খোলা তো অলীক কল্পনা !

অথচ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিলো অনেক বেশি স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ । মানুষের হৃদয়ে সেনাবাহিনীর প্রতি একটা গভীর সহানুভূতি কাজ করতো । তাদের সাহসিকতা এবং প্রতিশোধ পরায়নতার ওপর মানুষ এতোটাই আস্থা রাখতো যে, রক্ষীবাহিনীর সমস্ত অপরাধের খবারখবর সাধারণ মানুষ নিজ থেকেই সেনাবাহিনীকে অবহিত করতো । কোন সেনাকর্মকর্তার সাথে বা সেনা পরিবারের সাথে সংঘটিত অপরাধের জন্য স্বয়ং রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে ক্ষমা চাইতে হতো । আর এযুগে পিলখানা হত্যাকান্ড নিয়েও প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন বলে কখনো শুনিনি । আমাদের যুগে এমনও ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের কথা শোনা যায় যিনি তার মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন । শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজের লম্পট শিক্ষক যখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বসে ছাত্রীদের পর্ণো ভিডিও বের করে তখনো পুলিশের আশায় বসে থাকা ছাড়া সেনাবাহিনীর করার কিছু থাকেনা । অপরদিকে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাড়াটে খুনী হওয়ার বিষয়টি না হয় এড়িয়েই গেলাম । অথচ যে সেনাবাহিনী আগস্ট বিপ্লবের সিদ্ধান্ত নেবার মতো দৃঢ়তা এবং সাহস দেখিয়ে ইতিহাস রচনা করেছে তাদের এমন অসহায়ত্ব শুধুুমাত্র শোক দিবসকে তাচ্ছিল্য করেই বোঝা সম্ভব নয় ।

আমাদের দেশে যখনই সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা সম্পৃক্তি নিয়ে কথা হয়, বড় বড় দলগুলো সবসময় এটিকে টালবাহানা করে এড়িয়ে যায় । ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, রাজনৈতিক নেতারা যতোবার ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, ততোই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্ররাজনীতি জেঁকে বসেছে । দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য যতোবার ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান গুলোকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার বুলি সম্প্রচার হয়েছে, ততোই যেনো ব্যাবসা-বাণিজ্যে রাজনৈতিক মেরুকরন তীব্রতর হয়েছে । তেমনিভাবে সেনাবাহিনীর ব্যাপারে যতোই মধুর বাণী বর্ষন করা হোক না কেনো, বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক কাঠামোর উত্থান-পতনে (একাত্তর থেকে এক-এগারো পর্যন্ত) সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা । এমনকি পিলখানা হত্যাকান্ডের পর যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাকুঞ্জে গেলেন স্বান্তনা সভায়, তখনো সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক মেরুকরণের ভয়াবহতা উঠে এসেছে । অথচ সম্পূর্ণ বিষয়টিকে স্পর্শকাতরতার চাদর পড়িয়ে বদহজম বাড়ানোর নীতি কোন পক্ষই ছাড়তে পারেনি ।

মোটাদাগে যদি আগষ্ট বিপ্লবের দুটি পক্ষ ধরা হয়, একটি হবে আওয়ামী লীগ- যারা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দ্বারা সর্বদা নিয়ন্ত্রিত, আরেকটি হবে সেনাবাহিনী- যাদের প্রতি মানুষ বরাবরই বিশ্বাস রাখতে পছন্দ করে । বর্তমানে দুটি পক্ষের কার্যক্রম তুলনা করলেই বিগত চল্লিশ বছরে আগষ্ট বিপ্লবের সাফল্য/ব্যর্থতা বোঝা সহজ হয়ে যায় । এক মুজিবের লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে তৈরি না হলেও প্রতিটি পাড়ায়/মহল্লায় অন্তত একটি করে মুজিবের অনুসারী গডফাদার তৈরি হয়ে গিয়েছে এতোদিনে । মানুষজন বিপদে পড়লে যেমন তাদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়, ইফতার মাহফিলে যেমন তাদেরকে প্রধান অতিথি রাখতে হয়, মসজিদ কমিটিতে পর্যন্ত তাদের আইনে মানুষ চলে । শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার বলেই দায় এড়াবেন কিভাবে ! দেশের রাষ্ট্রপতি কে বিদায় করেও আগষ্ট বিপ্লবের নায়কেরা দেশের একনায়কতান্ত্রিক অনাচার এবং ভারতমাতার দাসত্ব রুখতে পারেনি । এদিক থেকে দেখলে সহজেই বোঝা যায়- রাষ্ট্রপতি মুজিব শেষপর্যন্ত মরণোত্তর বিজয়ী হয়েছেন । আমরা যতোই ভাঁড়ামো/চটুলতার আশ্রয় নিই, বাস্তবতা এড়াতে পারবোনা । অপরদিকে সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখুন । জেনারেল জিয়ার মতো এমন সেনাপ্রধান আর পায়নি বাংলাদেশ । আ ল ম ফজলুর রহমানের মতো বিডিআর প্রধানও পায়নি । সেনাবাহিনীর মান নিয়েও তৈরি হয়েছে যথেষ্ট প্রশ্ন । রেশমা নাটকের হোতা সারওয়ার্দিরা উঠে যায় আকাশে । আব্দুল্লাহ আযমীদের বরখাস্ত হতে হয় অযথা । গুলজারদের মৃত্যু হয় প্রতিশোধবিহীন । একটা উদাহরণ দেই- দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে যদি সার্ভে করা হয়, ক্লোজ আপ ওয়ান তারকা এবং লাক্স সুপার স্টারদের মাস কিভাবে চলে, দেখা যাবে প্রতিদিন ক্যান্টনমেন্টগুলোতে কোন না কোন উপলক্ষে গানের কনসার্ট চলছেই, দেশের প্রায় সবগুলো এলিট ক্লাবে সেনাকর্মকর্তা দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা চালানো হয়, ইসরাঈলী আইডিএফ কেও এতোটা আনন্দঘন পরিবেশে রাখা হয় কিনা জানিনা । শেখ হাসিনার দলীয় অনুষ্ঠানেও অনেক সময় বাহিনী প্রধানদের হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । কারা আমাদের সেনাবাহিনীর বন্ধু, কারা তাদের শত্রু, এটা নির্ণয় করা যেনো গোলকধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । অথচ পৃথিবীর অন্য কোন সেনাবাহিনীর সমরনীতি এতোটা অস্পষ্ট এবং ঘোলাটে থাকে বলে মনে হয়না ।  ডিওএইচএস এর মালিকানা নিয়ে দরদাম চলছেই, বৈষয়িক হিসাব নিকাশে ভীষণ অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে ডিফেন্স ফোর্স । তাহলে সেভেনটি ফাইভ এর সেনাবাহিনী আজকের যুগে কিভাবে আশা করেন ! ‘তৃতীয় শক্তি’ নামের কাগুজে বাঘ হিসেবে শুধু পত্রিকার কলাম আর টিভি টকশোতেই সেনাবাহিনীর ক্ষমতার আভাস দেয়া হয় । একজন সামান্য প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কোন চাপ অনুভব করেন বলে মনে হয়না । ‘চির উন্নত মম শির’ চেতনার পরিস্ফুটন ইদানিংকালের সেনাবাহিনী খুব একটা দেখাতে পেরেছে বলেও প্রমাণ নেই । অর্থাৎ আগস্ট বিপ্লবের দ্বিতীয় পক্ষ, অথবা বিজয়ী পক্ষ বলেও যাদেরকে ধরা হয়- তাদের নৈতিক অস্তিত্ব আজ ভীষণ সংকটে ।

আমি বলছিনা যে, সেনাবাহিনীতে ভোটাভুটি চালু করাই এ সংকটের সমাধান । সেনাবাহিনীকে দলীয় ভাগাভাগির ব্যালেন্স অব পাওয়ার বানানোর কথাও বলছিনা আমি । বরং গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত সামরিক বাহিনীর সমরনৈতিক অবস্থানটি সুস্পষ্ট এবং প্রকাশিত রাখার পক্ষেই আমি অভিমত দিচ্ছি । আপনারা কি বলতে পারেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিলেবাসে এখন কি কি বিষয় পড়ানো হয় ? যে সেনাবাহিনী আফ্রিকার মাটিতে ভয়ংকর অপরাধীদের সাথেও শান্তিরক্ষীর আচরণ করতে পারে, তারা দেশীয় জনগণকে ‘ব্লাডি সিভিলিয়ান’ হিসেবে পরিত্যাজ্য মনে করার সাইকোলজি কেনো ধারণ করে এটা নিয়ে কি কোন গবেষণা হয়েছে ? বিএমএ কমিশন্ড অফিসার হিসেবে আগামী লং কোর্স থেকে দুই বছরের স্থলে চার বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ চালু হচ্ছে এই কথা কি সবাই জানতেন ? এখন থেকে সেকেন্ড ল্যাফটেন্যান্ট নয়, সরাসরি ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োগ দেয়ার নিয়ম হচ্ছে, এটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে কি আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করেছে কেউ ? এমনিতেই সেনাবাহিনী অনেকটা যুদ্ধবিমুখ হয়ে পড়েছে, তার উপরে যদি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতোই তাদেরকে বই-পুস্তক গিলিয়ে বিদ্যাবাগীশ করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়, তবে সেটা আমাদের ভূরাজনৈতিক প্রক্ষাপটকে কিভাবে প্রভাবিত করবে তার রিপোর্ট কি দেশের নেতানেত্রীদের কাছে আছে ? গত দশ বছরের মধ্যে লেঃ কর্ণেল বা মেজর পদবি ধারণ করেই বিপুল সংখ্যক প্রতিভাবান সেনাকর্মকর্তা স্বেচ্ছা অবসরে চলে গিয়েছে কেনো, তা নিয়ে কোন গবেষণাপত্র কি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে ? হাসান সারোয়ার্দিরাই কেনো জেনারেল হয় সেটা বুঝতে হলে কি এ ব্যাপারে আরো তীক্ষ্ন নজর রাখার প্রয়োজন ছিলো না ? আমাদের ছেলেমেয়েরা অষ্টম শ্রেণির বইয়ে “নিজেকে জানো” শিরোনামে মূলত কি শিখছে সেটা জানা এবং লক্ষ্য রাখার অধিকার যেমন জনগণের আছে, তেমনি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর ভাইবোনেরা সমরনীতি চর্চায় কোন কোন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান পাচ্ছে সেটা লক্ষ্য রাখার অধিকার কি জনগণের নেই ? আমার মনে হয় ১৫ আগস্টকে বোঝার জন্য সেনাবাহিনীর তখনকার অবস্থান এবং এখনকার অবস্থানের তুলনাটাই মুখ্য বিষয় । তাহলেই আমরা বুঝতে পারবো- একনায়ক শেখ মুজিব নিহত হওয়াতে যতটুকু বিজয় আমরা অনুভব করেছি, তলে তলে আরো বেশি হেরে গিয়েছি ।

অনেকে ধারণা করতে পারেন- আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারলেই এ সংকটের সমাধান হয়ে যাবে । সততার সাথে একবার ভেবে দেখুনতো- বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল গুলো কি জন্মদিন পালন করা ছাড়া ১৫ আগষ্টের আর কোন মূল্যায়ন করেছে কখনো ? যদি আবারো বিশ দলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় আসে তবে হয়তো দিবসটিকে তাচ্ছিল্য করার জন্যে হিসাব করে ১৫ আগষ্টের দিন এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করতে পারে যেনো সেদিনের শিরোনামটি উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা দখল করে নেয় । কিন্তু এর বেশি কিছুই তারা করতে পারবেনা । কারণ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের চাইতে- ক্ষমতার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ যে আরো ক্ষতিকর এবং ভয়ংকর এটা সেনাবাহিনী যেমন জানে, বিরোধী দলগুলোও জানে । অতএব আগস্ট বিপ্লব নিয়ে অতো আয়োজন করে বিভ্রান্ত হবার প্রয়োজন নেই ।

তাহলে করণীয় কি হতে পারে ! হ্যাঁ, করণীয় অত্যন্ত স্পষ্ট । প্রথমেই আমাদেরকে স্বীকার করে নিতে হবে ১৫ আগস্ট ছিলো বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের পক্ষে একটি যথার্থ বিপ্লব । ঝড়ে বক মরবে আর রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করবো আমরা, এমন মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে । সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য আমাদের পক্ষে সুবিধা করে দেবে আর আমরা সবটুকু সুখভোগের পর তাদেরকে বিপথগামী নাগরিক খেতাব দিয়ে নিজেদের খোলসে আবার হারিয়ে যাবো, এমন লুকোচুরি বন্ধ করতে হবে । নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে ঢেকে সামরিক অভ্যুত্থানের আশায় ঈদের পর ঈদ গুনতে থাকার প্রবৃত্তিও বাদ দিতে হবে । আগস্ট বিপ্লবের যথাযথ স্বীকার্য প্রদানের পর দেখতে হবে আগস্ট বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজগুলো কি কি ! বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি যে কোন হুমকি মোকাবেলা করার জন্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করা এবং জরুরী ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক সক্ষম ছেলে-মেয়েদের সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অবকাঠামো গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার ছিলো তা পূরণ করার ব্যবস্থা করতে হবে । এক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে ব্যাপক ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে । রাজনৈতিক বিরোধিতার খাতিরে “র‌্যাব বিলুপ্তির আহবান”, “উপজেলা ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি”, “নাগরিক অধিকার আদায় কমিটি”, “সম্প্রচার নীতিমালা স্থগিত করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার কমিটি”, “একতরফা নির্বাচন প্রতিরোধ কমিটি” এসব হাজারটা শিশুসুলভ আন্দোলন-আন্দোলন খেলা বাদ দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠনই সময়ের দাবি । সম্ভবত হুমায়ুন আহমেদের ‘দেয়াল’ এমন একটি নিরাপত্তা সূচক দেয়ালের অভাব অনুভব করেই লেখা । সম্ভবত কারারুদ্ধ মাহমুদুর রহমান এটা চিন্তা করেই ‘আমার দেশ’ অফিসে পাঠচক্রের আয়োজন করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন । যদি এতোদিনে একটি সত্যিকার নিরাপত্তা পরিষদ আমাদের থাকতো- হয়তো ফেলানীদেরকে মরতে হতোনা, পিলখানা ট্রাজেডী এড়ানো যেতো, একতরফা নির্বাচন কেন্দ্রিক কোটি কোটি টাকার লুটপাট থেকে জাতি রক্ষা পেতো । রানা প্লাজা ধ্বস, পিনাক লঞ্চডুবি, ডেসটিনির অর্থচুরির বিষয়ে অভিযোগ করার মতো মানুষের আরো একটি আশার জায়গা থাকতো ।

অনেক কথা বলা হলো । তবু কিছুই হবেনা এটা প্রায় নিশ্চিত । তারপরেও দিন বদলায়- মানুষ বদলায় । আশা ধরে রাখতেই হয় । শাপলা চত্বর থেকে শাহবাগ চত্বর পর্যন্ত দেখার অভিজ্ঞতা এ প্রজন্মের তরুণদের হয়েছে । সাগর-রুনি হত্যাকান্ড দেখার অভিজ্ঞতা এ প্রজন্মের সাংবাদিকদের হয়েছে । আমিনুল হত্যা থেকে দেলোয়ার খালাস পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দেখা হয়েছে এ প্রজন্মের শ্রমিক ভাইবোনদের । আমাদের প্রজন্মের মাঝে এতোদিনে ঘটনার গভীরে গিয়ে সত্য উদঘাটনের একটা দৃঢ় প্রত্যয় এসেছে বলেও মনে হয় । হপ-স্টেপ নেবার পর এখন শুধুই জাম্প দেবার অপেক্ষা । যদি সে দীর্ঘ অপেক্ষার পালা নিকট ভবিষ্যতে সমাপ্ত হয়, তবেই আগষ্ট বিপ্লবের সাফল্য তার চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছাবে বলে বিশ্বাস করি ।

‘দক্ষিন তালপট্টি’ এবং ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ নিয়ে সজিব ওয়াজেদ জয়ের মিথ্যা বক্তব্য

5

আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূত্র এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় গত ১১ জুলাই গুলশানের একটি হোটেলে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি ভারতে দিয়ে দেয়া এবং বাংলাদেশের দীর্ঘজীবীতা কামনাসূচক জাতীয়তাবাদী শ্লোগান ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ নিয়ে কিছু অশালীন মিথ্যা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “তালপট্টি ভারতকে দিয়েছেন জিয়া” এবং “জিন্দাবাদ উর্দু, পাকিস্তানি শব্দ। যারা ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন তারা পাকিস্তানি এজেন্ট। তাদের পাকিস্তানে বসবাস করা দরকার।”

তার প্রথম মিথ্যাচারটি ১৯৮১ সালের দেশি-বিদেশী পত্রপত্রিকা এবং সার্ভে অব বাংলাদেশের তৈরী ১৯৮১ সালের টপোমানচিত্র দিয়েই প্রমান করা সম্ভব। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটির অস্তিত্ব ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী টপোমানচিত্র থেকে শুরু করে বর্তমান গুগল আর্থ স্যাটেলাইট ইমেজেও রয়েছে। এটি একটি আংশিক দ্বীপ। জোয়ারের সময় ডুবে যায় এবং ভাটার সময় সামান্য জেগে ওঠে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনার অদূরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি জোয়ারের সময়ও জেগে থাকতে দেখা যায়। ১৯৭৪ সালের আমেরিকান স্যাটেলাইট ইমেজ অনুযায়ী এর আয়তন ছিলো আড়াই হাজার বর্গমিটার। ধীরে ধীরে দ্বীপটির আয়তন ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে এর আয়তন ১০ হাজার বর্গমিটারে দাঁড়ায়। খেয়াল করুন ১৯৭৪ সালে ক্ষমতায় ছিলেন শেখ মুজিব; কিন্তু তিনি দক্ষিণ তালপট্টি বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্ত করা কোন ব্যবস্থা করেন নাই। সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশের ছিটমহল রেরুবাড়ী ভারতকে দিয়ে দেবার মতই এই দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটিও তিনি হয়তো ভারতের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন।

১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্টের টপোমানচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টি

১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্টের টপোমানচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টি

গুগল আর্থ এ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ

গুগল আর্থ এ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ

সার্ভে অব বাংলাদেশের ১৯৮১ সালের টপোশিটে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ

সার্ভে অব বাংলাদেশের ১৯৮১ সালের টপোশিটে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ

১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে রেডক্লিফের দেশভাগ অনুযায়ী হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যস্রোত দক্ষিন তালপট্টির পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দ্বীপটির মালিকানা বাংলাদেশ দাবি করে। কিন্তু ভারত ১৯৮১ সালের মে মাসে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পতাকা ওড়ায়। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড ঐ দ্বীপটি রক্ষার জন্য রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের নেতৃত্বে তিনটি নৌ জাহাজ পাঠান। দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে ভারতের সামরিক আগ্রাসনের মোকাবেলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপের বিষয়টি ১৯৮১ সালের ১৭ মে তৎকালিন সবগুলো বাংলা দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কাছাকাছি সময়ে বিদেশী পত্রিকাগুলোতেও এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়, প্রকাশিত হয় এই আগ্রাসনের প্রতিবাদে ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদ মিছিলের ছবি।

১৯৮১ সালের ১৭ মে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং এর প্রতিবাদে ভারতীয় দূতাবাস অভিমূখে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক প্রতিবাদ মিছিল

১৯৮১ সালের ১৭ মে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং এর প্রতিবাদে ভারতীয় দূতাবাস অভিমূখে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক প্রতিবাদ মিছিল

১৯৮১ সালে ২০ মে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকা ‘A little pile of mud could start a war’ শিরোনামে লেখে, “১৯৭৪ সালে প্রায় ১২বর্গ কিলোমিটারের এই দ্বীপটি সনাক্ত করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সেখানে গানবোট প্রেরণ করলে বাংলাদেশও গানবোট প্রেরণ করে। ফলে দু’টি দেশ যুদ্ধের মুখোমুখি।” সেই একই সংবাদে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবরও আছে এবং সেখানে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সাথে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের দ্বীপ দখল করার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনা ও সজিব ওয়াজেদ জয় কর্তৃক দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব অস্বীকার করা এবং শহীদ জিয়াকে জড়িয়ে এই বিষয়ে মিথ্যাচারের কারণে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, শেখ হাসিনা কী তবে ভারতে সরকারী অশ্রয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করার ঋণ শোধ করতে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি তাদের উপহার দিয়েছিলেন?

শহীদ জিয়া সামরিক শক্তিতে মোকাবেলার পাশাপাশি কুটনৈতিক সমাধানের পথেও অগ্রসর হয়েছিলেন এবং ভারত কর্তৃপক্ষ একটি যৌথ জরিপের মাধ্যমে দ্বীপটির মালিকানা নিষ্পত্তিতে রাজী হয়েছিলো। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। তবে নিহত হবার আগেই তার আমলে সার্ভে অব বংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত টপোশিটে তিনি দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি অন্তর্ভূক্ত করার ব্যবস্থা করেছিলেন, যার প্রমান তৎকালীন টপোশিটে তালপট্টির অবস্থান। কাজেই শহীদ জিয়া তালপট্টিকে মানচিত্রে অন্তর্ভূক্ত করার ব্যবস্থা করেন নাই, এটি একটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার।

শহীদ জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে আগস্ট মাসে যৌথ জরিপ না করেই আবারো ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তালপট্টিতে তাদের সৈন্য এবং ফ্রিগেট প্রেরণ করলে তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান মরহুম রিয়ার এডমিরাল এম এইচ খান আবারো সেখানে গানবোট প্রেরণ করেন। এই বিষয়ে ১৯৮১ সালের ২০ আগস্ট বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার তাঁর উদৃতি দিয়ে “South Talpatti Island is Ours : M H Khan” শিরোনামে প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছিলো। একইভাবে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিলো বিদেশী পত্রিকাতেও। ১৯৮১ সালের ১৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াসিংটন থেকে প্রকাশিত আবজারভার-রিপোর্টার পত্রিকায় ‘India, Bangladesh Quarrel Over Island’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছিলো, “ভারতের ফ্রিগেট ও বাংলাদেশের গানবোটগুলো নিউমুর বা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের কাছে পরষ্পেরর মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে আছে। ভারত কর্তৃক যৌথ জরিপের বিষয়টি অস্বীকার করার প্রেক্ষিতে এই অবস্থার উদ্ভব হয়েছে।”

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ তালপট্টির মালিকানা বিষয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার এবং তাঁর মৃত্যুর পর তৎকালিন বিএনপি সরকার যথেষ্ট সাহসিকতার সাথে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করেছে। বরং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সমূদ্রসীমা মামলা হবার পর থেকেই এই সরকার দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে চলেছে। এই মামলার শুরু থেকেই ভারত তার প্রাথমিক সমূদ্রসীমা দাবী থেকে শুরু করে প্রতিটি রিজয়েন্ডারের মানচিত্রেই বাংলাদেশের সাথে তার সীমান্তবর্তী দক্ষিণ তালপট্টি (নিউমুর) দ্বীপটি উল্লেখ করেছে অথচ বাংলাদেশ তার দাবী উত্থাপন থেকে শুরু করে কোন যুক্তিতর্কেই তালপট্টি দ্বীপটির অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেনি। তার মানে মামলার আগেই তারা গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে দক্ষিণ তালপট্টিকে ভারতে হাতে তুলে দিয়েছিলো। এখন জনগণের প্রশ্নের মুখে তারা এই দায়ভার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর চাপানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

সজিব ওয়াজেদ জয় তার বক্তব্যে সবচেয়ে হাস্যকর মন্তব্যটি করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগান প্রসঙ্গে। তিনি দাবী করেছেন ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি উর্দু। প্রায় সারা জীবন বিদেশে থেকে বিদেশী ভাষায় পরাশোনা করে ও বিদেশিনী স্ত্রী বিবাহ করার কারণে তিনি বাংলা ভাষায় হয়তো দূর্বল হয়ে থাকবেন। তাই তার জানা নেই যে বাংলা ভাষায় অনেক বিদেশী শব্দ আছে। উনি যদি একটু কষ্ট করে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলা – ইংরেজী অভিধান’ (২১ তম সংস্করণ – ২০০৫) এর ২৩৩ নম্বর পৃষ্ঠার ১ম কলামের শেষ থেকে ২য় কলামের শুরু পর্যন্ত খেয়াল করেন তাহলে ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি পাবেন। অভিধানে এটিকে বাংলা শব্দ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অভিধানের প্রতি উনার অনাস্থা থাকলে ভারত থেকে প্রকাশিত সংসদ বাঙ্গালা অভিধান (শৈলেন্দ্র বিশ্বাস-সঙ্কলিত, চতুর্থ সংস্করণ – ১৯৮৪, অষ্টাদশ মুদ্রণ জুন – ১৯৯৫, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা) এর ২৬৪ নম্বর পৃষ্ঠার প্রথম কলামের মাঝামাঝি স্থানে ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি পাবেন। সেখানেও এটিকে বাংলা শব্দ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। উনার হয়তো জানা নেই যে উনার নানা শেখ মুজিব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িত থাকা অবস্থায় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এবং পাকিস্তান হবার পর এমন কী ৭ মার্চের ভাষন পর্যন্ত ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগানটাই দিয়েছেন। এমন কী ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে মিরপুরে বিহারীদের ভোট পেতে আওয়ামী লীগ উর্দুতে লিফলেটও ছেপেছিলো।

বামে- ১৯৭০ এর নির্বাচনে কুষ্টিয়ার জনসভায় ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান লেখা ব্যানার টানিয়ে বক্তব্য রাখছেন শেখ মুজিব, ডানে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিহারীদের জন্য উর্দুতে লিফলেট ছেপেছে আওয়ামী লীগ।

বামে- ১৯৭০ এর নির্বাচনে কুষ্টিয়ার জনসভায় ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান লেখা ব্যানার টানিয়ে বক্তব্য রাখছেন শেখ মুজিব, ডানে- ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিহারীদের জন্য উর্দুতে লিফলেট ছেপেছে আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্ম বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর হয়েছে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে এই দেশে অন্য নৃগোষ্টীকে অগ্রাহ্য করার যে বিভক্তিমূলক নীতি আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন বাকশাল নিয়েছিলো সেটা থেকে মুক্ত হয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে একটি অভিন্ন জাতিস্বত্তা হিসেবে পরিচিত করতেই ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগানের উদ্ভব। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যুদ্ধ বিজয়ের জন্য রণহুংকার হিসেবে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা, প্রথম প্রসিডেন্ট এবং স্বাধীনতা ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজেও দিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের পর সেই শ্লোগানের পরিবর্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনাসূচক শ্লোগানই রাষ্টীয় শ্লোগান হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত। সেই প্রেক্ষিতে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগানটি বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনায় বাংলাদেশীদের হৃদয় নিংড়ানো শুভ কামনা। যারা নিজেকে বাংলাদেশী মনে করে না কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগানকে পাকিস্তানী বলা সম্ভব।

উর্দু নিয়ে যদি জনাব সজিব ওয়াজেদ জয়ের এতই মাথা ব্যাথা থাকে তাহলে উনাদের দলটির নাম কেন পরিবর্তন করছেন না। উনাদের দলটির নাম ‘আওয়ামী লীগ’ এর ‘আওয়ামী’ শব্দটি একটি খাটি উর্দু শব্দ, যার অর্থ জনগণ। উনি কী তাহলে উনার দলের নাম পরিবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন? না কী উনার দলটিকেও পাকিস্তান পাঠিয়ে দেবেন? পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদারদের অত্যাচার এই দেশে অবস্থান করা প্রতিটি মানুষ মনে রেখেছে। তারা এটাও মনে রেখেছে যে, স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র দুই বছরের মাথায় জনাব সজিব ওয়াজেদ জয়ের নানা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান গিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার নায়ক ভুট্টোর সাথে কী ভাবে গলাগলি করেছিলেন এবং বাংলাদেশে ২৫ মার্চ রাত্রে অপারেশন সার্চ লাইটসহ লক্ষ মানুষের রক্তে রাঙ্গা টিক্কা খানের সাথে কী ভাবে হাত মিলিয়েছিলেন। অন্যদের বিষয়ে মিথ্যা অভিযোগ করার আগে জনাব সজিব ওয়াজেদ জয়ের উচিত হবে নিজেদের অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখা। নিজে কাঁচের ঘরে বাস করে অন্যের বাড়িতে ঢিল ছোঁড়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

বামে- ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের লাহোরে ভুট্টোর সাথে গলাগলি করছেন শেখ মুজিব, ডানে- ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী করাচী এয়ারপোর্টে টিক্কা খানের সাথে করমর্দন করছেন মুজিব।

বামে- ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের লাহোরে ভুট্টোর সাথে গলাগলি করছেন শেখ মুজিব, ডানে- ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী করাচী এয়ারপোর্টে টিক্কা খানের সাথে করমর্দন করছেন মুজিব।

অবহেলিত জনপদের দগ্ধ ওরা বিহারী? না কি মানুষ?

by Elora Zaman

একদিন গিয়েছিলাম বেনারসী পল্লীতে শাড়ি কিনতে। ঝলমলে দোকান পাট! রঙীন সব শাড়ি। কত নারী তার বাসর সাজিয়েছে ঐসব লাখ টাকা দামী শাড়ি দিয়ে। জীবন শুরু করেছে ওখান থেকে। বিত্তশালী সব নারীরা, সুনীলের চৌধুরীদের সূবর্ণ কঙ্কন পড়া রমণীদের মতো। দোকানী বললো, আপা! কারিগর শাড়ি দিতে দেরী করতেছে। দেইখ্যা আসি, কি অবস্থা।

আমার অতিউৎসাহী মন দোকানীর সাথে যেতে চাইলো। বললাম, আমায় নিয়ে চলেন। পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে দোকানী হেসে বললো, যাইবেন? আচ্ছা চলেন। কিন্তু সহ্য করতে পারবেন তো? আমিও একগাল মিষ্টি হেসে বললাম, সহ্য করতে পারবো। আমি গরীবের মেয়ে, সব সহ্য করতে পারি। অসুবিধা নাই। চলেন।

কিছুদূর হেঁটেই দেখলাম ঝুপড়ির মতো ছোট ছোট ঘর। সোজা হয়ে হাঁটা যাচ্ছিলো না, নিচু হয়ে পাশ কেটে হাঁটতে হচ্ছিলো। এতোসব চিপা গলি, নোংরা, দুর্গন্ধ। কারিগরের রুমে ঢুকে খেলাম এক বিশাল ধাক্কা। দেখলাম ঘামে ভেজা কিছু উদোম শরীর। দরদর করে ঘাম পড়ছে সেইসব বারো-তেরো বছরের বিহারী কিশোর ছেলেদের শরীর থেকে। ওরা কাজ করে যাচ্ছে। সুতো টেনে টেনে, খটখট। অগ্নিকুন্ডের মত অবস্থা, তেল চিটচিটে লুঙ্গি গামছা! আমি বাহানা করে বেরিয়ে এলাম, সহ্য করতে পারছিলাম না। বাইরে এসে ভাবলাম, এরাও কি মানুষ?

পৃথিবীর সবচাইতে অবহেলিত একটি জনপদকে দেখে কষ্ট লেগেছিলো। কিন্তু ভুলে গেলাম অতি দ্রুত তার পাশেই ঝলমলে ডাউনটাউন দেখে। আজকে আবার মনে পড়লো সেই বিহারী পল্লীর কথা।

মীরপুরে এগারোজন মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে আর গুলি করে মেরে ফেলার খবর পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি। তারচেয়ে বেশি হতবাক হয়েছি এ ঘটনার পর বাংলাদেশের মানুষদের বিশাল একটা অংশের প্রতিক্রিয়ায়। আমরা কি সভ্য মানুষ? অথবা ‘মানুষ’ শব্দটা দিয়ে পরিচিত হওয়ার যোগ্য? এটা কি দুইহাজার চৌদ্দ সাল?

আজকের সময়ে এমন নৃশংস একটা ঘটনায় কেউ জংলী ক্যানিবাল ট্রাইবের মতো আনন্দ প্রকাশ করে কিভাবে? যারা এমন করছে, এরা তো আমাদেরই আশেপাশের মানুষ, ভাই-বোন-বন্ধু-আত্মীয়। আমরা কি ধরণের মানুষদের সাথে বসবাস করছি! পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে নিরব সমর্থন দিয়েছে। কেন দেবেনা? যুবলীগ ছাত্রলীগের ছেলেদের কাজে বাঁধা দেবে, এমন সাহস আর ক্ষমতা কি পুলিশের আছে না কি?

কতটা অসহিষ্ণু এবং উন্মাদ হয়ে গিয়েছি আমরা? শিশু সহ যে মানুষগুলো পুড়ে মারা গেলো, তাদের জায়গায় আমরা নিজেরা অথবা আমাদের কোন আত্মীয়-স্বজন থাকলে তখন কেমন লাগতো? বাচ্চাগুলো আর বড় হওয়ার সুযোগ পেলোনা। নিরপরাধ নারীরা অভাব-অনটনের সংসারের ভেতরেও বেঁচে থাকার অধিকারটুকু পেলো না।

দেশে যেহেতু কোন অন্যায়ের বিচার নেই, সরকারী দলের লোক হলে তাদের যা ইচ্ছা তাই করার ক্ষমতা আছে, তারা তাদের এলাকার স্থানীয় মারামারিতে ক্ষমতার প্রকাশ দেখালো। সেই ক্ষমতায় দেয়া আগুনে কার্বন মনোঅক্সাইড বিষে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে, একটু একটু করে শরীর পুড়ে গিয়ে, বিকৃত হয়ে মারা গেলো দশজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ।

এরপর শুরু হলো এরচেয়ে বড় উন্মাদনা, পাশবিক উন্মত্ততা। শিক্ষিত ও রুচিশীল মানুষেরা এ ঘটনাকে সমর্থন করা শুরু করেছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নাম দিয়ে যে পাগলামি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সারা দেশে, এর শেষ কোথায়? সত্যিই কি এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?

আসলেই কি একটা জাতির মুক্তির সংগ্রাম এরকম ঘৃণা আর অমানবিকতার ভিত্তিতে ঘটতে পারে? বিশ্বাস করিনা। বরং এ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো আওয়ামী-শাহবাগিদের চাষাবাদ করা ঘৃণার জমিন। এ ঘৃণা আর বিভেদের আগুন বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের বর্তমান আর ভবিষ্যতকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে।

সব ছাড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছে, নিরপরাধ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে পারিনা কেন আমরা? কেন পারিনা ঘৃণিত সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠতে? আমাদের চেয়ে বেশি রেইসিষ্ট জাতি কি আর কোনটা আছে? ধিক আমাদের! বাংলাদেশী পরিচয় দিতে লজ্জা হয় আজ!

জনাব তারেক রহমান কে খোলা চিঠি! 

1

 

by
ফয়েজ তৈয়্যব
জনাব রহমান,
সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে বসে কিছু কিংবা অনেক কথা বলছেন। আজ মানুষ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের (!) মুখে শুধুমাত্র এমন কিছু শুনতে চায় যা তাঁদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। তা না করে পুরানো ইতিহাস নিয়ে এইসব কি বলছেন আপনি? কেন বলছেন? জিয়া কে পচাতে শেখ হাসিনার নেয়া অনুরূপ পথে হেঁটে মুজিব কে পচিয়ে আপনি কি পাবেন?
জীবন যেখানে দায়ের ভারে নূজ্য সেখানে অতীতের কাসুন্দি ঘাটা আজ বড়ই বেমানান, বড়ই হতাশার, বড়ই গ্লানির। বুঝে নিন, এই সব সত্য বা মিথ্যা সেটা নিয়ে জীবন যন্ত্রনায় পিষ্ট মানুষ ভাবিত নয়। এইসব কাদা ছোঁড়াছুড়ি দেখতে আর শুনতে নাগরিক ত্যাক্ত বিরক্ত, কারন তাঁর জীবন আজ সামাজিক সম্মান, দারিদ্র আর নিরাপত্তার কাছে বড়ই অরক্ষিত।
৪২ টি বছর পার হবার পর মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে শিখতে শুরু করেছে তাঁদের সাবেক ও বর্তমান সকল নেতাই তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তন না করে নিজের ভাগ্যই পরিবর্তন করেছে। নাগরিক তাঁর নেতাদের প্রতারক, চোর, লূন্ঠন কারী, উদ্ধত আর অসভ্য ভাবতে শুরু করেছে। এই বোধ আপনাদের মধ্যে যত দ্রুত আসে ততই সার্বিক মঙ্গল। ব্যক্তি আপনার, আপনার দলের এবং এই অভাগা দেশের। সুতরাং এইসব অর্থহীন আলোচনা (সত্য বা মিথ্যা) আজ প্রাসঙ্গিক।
বরং এইসব বাদ দিয়ে নাগরিক স্বার্থের কথা বলুন, নাগরিক আশা করে তা বুঝার বয়স আপনার হয়েছে। সেই সাথে নাগরিক এটাও কামনা করে নাগরিক স্বার্থ ভিত্তিক রাজনীতি করার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আপনার মধ্যে এখনই আসা উচিত।
দেশের তরুন প্রজন্ম আপনার প্যারালাল প্রশাসন, নিয়মতান্ত্রিকতার উপর অনিয়মের দায় দেখেছে। সেইসব কলঙ্ক থেকে কিভাবে বের হবেন তা নিয়ে নিজে ভাবুন, আপনার ফোলয়ার দের ভাবতে দিন, নাগরিকের কাছে সৎ কমিটমেন্ট দিন, সেই কমিটমেন্ট যে সৎ সেটার প্রমান রাখুন।
ক্ষমতায় আসলে ভঙ্গুর এই সমাজ ব্যবস্থায় কিভাবে নাগরিক এর নিরাপত্তা দিবেন, সামাজিক নিরাপত্তা দিবেন, আর্থিক নিরাপত্তা দিবেন তা নিয়ে ভাবেন, আমাদের কে সেটা জানান।
মানুষের জীবন মান উন্নয়নে আপনার প্ল্যান আছে কি? থাকলে সেসব কি? সেসবের চ্যালেঞ্জ কি? সেই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার উপায় কি সেই ভাবনা নাগরিককে জানান।
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি রোধ করে কিভাবে অভ্যন্তরীণ ইনভেস্টর দের উৎসাহিত করবেন সেসব নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। নিজেরা, দল কিভাবে এই ভন্ডামী আর অনাচার থেকে বের হয়ে নাগরিক কে আর্থিক নিরাপত্তা দিবে সেটা নিয়ে ভাবেন, সেইসব নাগরিক কে জানান।
হাজার হাজার তরুন চাঁদাবাজির ভয়ে, ঘুষ আর হয়রানির ভয়ে কোম্পানী খুলতে পারছেন না, আইডিয়াকে প্রোডাকশনে নিয়ে যেতে পারছেন না, সেসব নিয়ে ভাবেন না বোধ করি, দয়া করে ভাবুন। আপনারা যে ভাবছেন, অন্তত সেটা নাগরিককে জানান।
পরিবর্তিত জলবায়ু/আবহাওয়ার এই সময়ে কৃষি আর কৃষকের ফলনের নিরাপত্তার বিধান কিভাবে ঘটবে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা কিভাবে আসবে, কৃষি অবকাঠমোর বিকাশ কিভাবে হবে তা নিয়ে ভাবুন দল, দেশ আর দেশের গন্ডির বাইরে। নাগরিক এইসব জানতে চায় কান পেতে।
আগামীর বাংলাদেশে অবকাঠমো উন্নয়ন কিভাবে হবে তার সততা ভিত্তিক রোডম্যাপ বানান। সড়ক রেল নৌ বিমান ব্যবস্থা, পন্য পরিবহন ব্যবস্থা, নগর পরিবহন ব্যবস্থা, জ্বালানী উতপাদন এবং ব্যবস্থা কি ভাবে জনকল্যাণ এর প্রযুক্তি নির্ভর হয় সেইসব মহৎ কাজ নিয়ে রাইট এক্সপার্ট দের সাথে বসেন। সেইসব ভাবনা নাগরিককে জানান। একটা অসৎ এবং দায়সারা নির্বাচনী ইশতেহার এর গল্প ভুলে মানুষকে সত্যিকারের পরিকল্পনার সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দিন।
দুর্নীতির অভিযোগ মুক্ত হয়ে কিভাবে বিদেশী বিনিয়োগ আর সহজ শর্তে অবকাঠামো ফান্ডিং (ঋন) আনবেন সেটা নিয়ে এক্সপার্ট দের সাথে যুক্তি পরামর্শ করুন। রোডম্যাপ বানান। নাগরিককে কিভাবে বৈদেশিক ঋন এর বোঝা থেকে মুক্তি দিবেন সেতা নিয়ে ভাবেন। নাগরিককে তা জানান।
প্রতিবেশীর সাথে আর্থিক লাভের ভিত্তিতে কিভাবে কৌশলগত সম্পর্ক করবেন তা নিয়ে দেশী বিদেশী এক্সপার্ট দের সাথে কাজ করুন। নাগরিককে তা সৎ ভাবে জানান।
দুর্বিনীত দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রভাবে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠান গুলোতে ঘুষ, অনিয়ম আর দুর্নীতি কে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে কলঙ্কের দায়, তা একটা উল্লেখযোগ্য সময় দেশ শাসনকারী হিসেবে আপনার দলের রয়েছে সেটা মেনে নিন, সেখান থেকে বেরিয়ে কিভাবে মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে নিবেদিত একটি সরকার কাঠামো বানানো যায় সেসব নিয়ে ভাবেন, সেই ভাবনা ছড়িয়ে দিন দেশের আনাচে কানাচে এমন কায়দায় যাতে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে।
মানুষ বুঝতে শিখেছে, দেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ ই নিয়ম। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শিষ্টাচার এবং নিয়মতন্ত্রের চর্চা নেই। দলের কোন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। রাজনীতি মানেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বলপ্রয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ ক্ষমতার প্রয়োগ।
মানুষ বুঝতে শুরু করেছে সকল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী দফতরে কেন্দ্রীভূত। সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এর স্তর সমুহ্‌, আদালত এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভুমিকা নিতান্তই সাংবিধানিক, কার্যত আজ্ঞাবাহী। নাগরিক বুঝতে শুরু করেছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বৃত্তায়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছে। সেই রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চূরমার হয়ে গেসে তাঁর স্বপ্ন এবং সম্ভাবনা।
নাগরিক চায় আপনি আপনারা এইসব স্বীকার করুন, এইসবের দায় নিন। এইসব অসভ্যতা থেকে দেশকে বের করে আনার শপথ নিন, পরিকল্পনা করুন এবং তা নাগরিক কে জানান ওয়াদা করে।
নাগরিক অনেক কিছু জানতে চায়, শুনতে চায়। নাগরিক যা শুনতে চায়, তা ই শুধু বলেন, নাগরিক এর ব্যক্ত অব্যক্ত ভাব বুঝে নিন।অপ্রয়োজনীয় যা, তা বর্জন করুন। পিতার পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পরিচয় তৈরি করুন।
যদি না পারেন, দয়া করে যোগ্যকে পথ করে দিয়ে আপনি/আপনারা বাংলাদেশকে মুক্তি দিন।
নিবেদনে,
বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক।

 

 

Des(h)i progressives’ nightmare

“But see, I don’t want to vote for AL. I do not think AL should return to power. We need checks and balances. BNP should come. But how can I vote for BNP when they are in an alliance with JI.”

That’s what a friend told me in December.  I have the deepest respect for this person’s sincerity.  She is a genuine progressive.  She wants a democratic Bangladesh — of this I have no doubt.  And I understand her reasons for aversion to Jamaat — never mind 1971, Jamaat categorically rejects some liberal-progressive tenets such as equal citizenship rights.  Had she said “I will not vote for Jamaat”, I would have accepted it.

But that’s not what she said.  She implicitly rejected BNP for its electoral alliance with Jamaat.

I didn’t engage in a prolonged conversation with her.  She is hardly the only person I know who made that leap about conflating Jamaat and BNP.  Bangladesh is full of self-proclaimed progressives who choose to reject democracy,never mind the facts.  I just don’t have the mental energy to engage in fruitless debates these days.  At least my friend had the decency to not engage in that kind of sophistry.

I didn’t engage in a political discussion with her, but was reminded of her comment after the Indian election.  You see, I had heard similar stuff from my Indian progressive friends.  Way back in the early 2000s, I heard people say “don’t want to vote for Congress, don’t like the sycophancy/dynasty, and the Vajpayee government isn’t so bad, but you know, how can BJP be supported when they have someone like Modi”.

And now Modi is the prime minister.

My Indian friends could have supported Vajpayee or other moderates in BJP/NDA government.  They could have provided the left flank of a genuinely centrist alternative to Congress.  But their self-inflicted intellectual blind spot meant that they couldn’t even contemplate such a course — never mind that such an alternative would have served India well.

A lot of things contributed to Mr Modi’s rise to power.  The progressives’ blind spot is just one factor, and probably not even an important one.  But to the extent that he represents a lot of things progressives loath, they have no one but themselves to blame.

I fear whether someday my Bangladeshi progressive friend will wake up to her political nightmare.  Jamaat’s importance in Bangladesh is constantly over-rated, and BNP’s strength under-rated, by everyone.  Of course, Jamaat benefits from the inflated power projection.  And the Jamaat bogey suits the Awamis fine.  The thing is, as the centrist opposition is systematically denied any political space, and as the ruling party degenerates into an orgy of violence (google Narayanganj / Feni murders), Islamists (Jamaat or otherwise) may well emerge as the only alternative.

My friend is genuine progressive, not a closet Awami fascist.  Will people like her act to prevent their own worst nightmare?

http://jrahman.wordpress.com/

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: জিয়াউর রহমান থেকে তারেক রহমান

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান

Zia-01

স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চার দশক পার হয়ে আরো দুই বছর অতিক্রম করেছে। কর্মঠ জনশক্তি আর উর্বর মাটিসহ অফুরান প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে এই সময়ে আমাদের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো একটি মধ্যম উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত হতে পারত। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে সুগভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বংস করে বা সরিয়ে দিয়ে বারবার বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের উৎস দেশের বাইরে হলেও কুশীলবরা দেশের ভেতরেরই মানুষ। তারা জানে, একটি দেশের অগ্রগতিকে থামাতে হলে তাকে নেতৃত্বশূন্য করতে হয়। সে কারণে বারবারই তারা দেশপ্রেমিক ও জনপ্রিয় গতিশীল নেতৃত্বকে সরাতে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভেদ তৈরি করেছে, নেতাদের চরিত্রে কালিমা লেপন করেছে, তারপর নেতাদের হয় হত্যা, নয় পঙ্গু করে নির্বাসনে পাঠানোর ষড়যন্ত্র করেছে।

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতি খুব খারাপ সময় অতিক্রম করছে। সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনকে বাদ দেবার পর দশেরে ৮০% জনগনের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে গত ৫ জানুয়ারী একটি প্রহসনের জাতীয় নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ অবধৈভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। আর সেই ক্ষমতা নিরংকুশ করতে একের পর এক বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গুম-খুন করে বাংলাদেশকে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের উপর দমন নির্যাতনের মাত্রা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পর্যন্ত বাংলাদেশেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে। প্রশাসন হতে শুরু করে শিক্ষা, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে পরীক্ষিত সরকারি দলের লোক না হলে তাকে নিষ্কৃয় করে রাখা হয়েছে। একটি দেশের অর্ধেকের ও বেশি মানুষকে নিষ্কৃয় করে রেখে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব হয় না।

এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে দুর্নীতিবাজ আমলা, রক্তচোষা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অসাধু ব্যবসায়ী আর দাগী অপরাধীরা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। শেয়ারবাজারে  গিয়ে  সর্বস্ব হারিয়ে পথের ফকির হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ, এমএলএম ব্যবসার ফাঁদে পড়ে পথের ফকির হয়েছেন আরো কয়েক লক্ষ বিনিয়োগকারী। সামান্য মুদী দোকানদারও ব্যাংক জালিয়াতী করে লুট করেছে জনগণের চার হাজার কোটি টাকা। কুইক রেন্টালের নামে জনগণের সম্পদ লুট করার কারণে বিদ্যুতের মূল্য ছয়গুণ বৃদ্ধি করে মানুষের জীবনযাত্রাকে করে তোলা হয়েছে কঠিন থেকে কঠিনতর। তেল-গ্যাসের দাম বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে গেছে বাসভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। দেশের মূল্যবান জ্বালানী সম্পদ লুণ্ঠনের ওপর প্রতিবেদন তৈরী করতে গিয়ে খুন হয়েছে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী আর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গুম হয়েছেন জননেতা ইলিয়াস আলী। এমন গুম আর খুনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে; নদী-খাল-বিলে এখন পঁচা লাশের মিছিল।

এইসব সমস্যা নিরসনে দেশে একজন গতিশীল জাতিয়তাবাদী নেতার প্রয়োজন। যুগে যুগে কোন দেশের রাজনৈতিক সংকট হতে উত্তরণের জন্য গতিশীল জাতীয়তাবাদী নেতারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমন উদাহরণ বাংলাদেশেও রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক নেতাদের অনুপস্থিতিতে তৎকালীন মেজর জিয়া থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলো, সেই স্বপ্নকে ভেংগে ধুলিষ্যাৎ করে দেয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার। তারা স্বাধীন দেশে আবারো নিপীড়ন নিষ্পেষনের স্টিম রোলার চালাতে শুরু করে। মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি, বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্বিচারে হত্যা এবং গনতন্ত্রকে হত্যা করে এক দলীয় শাসন কায়েম করে দেশের মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তোলে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ক্ষমতাসীন দলের উপদলীয় কোন্দলে সেনাবাহিনীর মধ্যমসারীর কর্মকর্তাদের অভুত্থানে শেখ মুজিব নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালিন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ।

পরবর্তী তিন মাসে একাধিক অভুত্থান ও পাল্টা অভুত্থানের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনী হতে জোর করে অবসরে পাঠানো মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সিপাহী-জনতার সম্মিলিত শক্তি দেশ বাঁচানোর জন্য নেতা হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি চাইলে তখনই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে থাকেন। রাষ্ট্রপতি সায়েম বার্ধক্যজনিত কারণে অবসরে গেলে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জেড-ফোর্স ও এক নম্বর সেক্টরের বীর নেতা আবারো নিজ দেশের নেতৃত্ব দিলেন এক দুর্দান্ত ও চৌকষ গতিতে। রাষ্ট্রপতি হবার পর জেনারেল জিয়া বাংলাদেশের মানুষের জন্য সর্ব প্রথমে একটি অভিন্ন জাতীয়তা নির্ধারণের প্রয়োজন অনুভব করেন। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মতের ও ধর্মের নানা জাতিগোষ্ঠি বাস করে। তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরণ একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই শহীদ জিয়া মনে করতেন যে, ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, বরং ভূখণ্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ঐক্য ও সংহতির পথ তৈরী করেন। এই পদক্ষেপই ছিল দেশের সকল মানুষকে একসাথে ঐক্যবদ্ধ করার প্রথম পদক্ষেপ।

শহীদ জিয়া বাংলাদেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করেন এবং দেশের গুণীজনদের সম্মাননা প্রদানের জন্য ‘একুশে পদক’ প্রবর্তন করেন। অত্যন্ত্র দ্রুত গতিতে তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং পুলিশ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসেন। মানুষের মত প্রকাশের সুবিধার্থে ফিরিয়ে দিতে তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন।

মাত্র চার বছরের ক্ষমতাকালে তিনি দেশে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসেন; পূর্বে আলোচিত পদক্ষেপের বাইরে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া; দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুন:খনন; গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; প্রায় ৩ হাজার মাইল রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার করা; ২৭ হাজার ৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার প্রভূত উন্নতির পাশাপাশি জন্ম নিয়ন্ত্রণে অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন; নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ এবং সরকারি কল-কারখানায় তিনটি শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করা; সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে খাদ্য রপ্তানীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়  সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জিত সাফল্যের মধ্যে রয়েছে- জাপানের মত শক্তিশালী দেশকে নির্বাচনে পরাজিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে সদস্যপদ লাভ; দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে সার্ক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক উন্নতির মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানীর পথ উন্মুক্ত করা। অনবদ্য ভাষায় নিজের দেশের স্বার্থকে যৌক্তিকভাবে বিদেশে উপস্থাপনের উদাহরণ হিসেবে সৌদি বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ এর সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।
বাদশাহর সাথে কুশল বিনিময়ের পরপরই জিয়াউর রহমান বললেন,
–    তোমার দেশে যা নেই, আমার দেশে তা আছে, আবার আমার দেশে যা নেই, তা তোমার দেশে আছে।
সউদি বাদশাহ থতমত খেলেন। গরীব একটা দেশের এই কালো নাতিদীর্ঘ প্রেসিডেন্ট বলে কি!
জিয়াউর রহমান আবারো বললেন,
–    আমার দেশে অনেক পরিশ্রমী মানুষ আছে, তারা অনেক কাজ করতে পারে। আর তোমার দেশে যেমন কাজ আছে, তেমনি টাকাও আছে।

একইভাবে আর্জি নিয়ে গেলেন মরুভূমির প্রায় সবগুলো দেশে। বাংলাদেশের মূল্যবান জনশক্তি প্রথমবারের মত রাষ্ট্রীয়ভাবে বিদেশে রপ্তানী শুরু হলো। বিদেশে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের বেতন বেশি হওয়ার কারণে তিনি দেশ্যব্যাপী কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে বাংলাদেশের বেকার যুবকদের দ্রুত  প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা করলেন। প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে আজ সউদি আরবে তিরিশ লাখ বাংলাদেশী, সংযুক্ত আরব-আমিরাতে এগারো লাখ, কুয়েতে আড়াই লাখ, ওমানে সোয়া দুই লাখ, কাতারে প্রায় পৌনে দুই লাখ আর বাহরাইনে প্রায় এক লাখ মানুষ বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মূদ্রা উপার্জন করছেন। আজ সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমিকদের যে শ্রম বাজার তৈরী হয়েছে তার একক কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেবে ছাব্বিশ হাজার এবং বেসরকারি হিসেবে দশ লক্ষ মানুষের জীবনহানী হয়েছিলো যখন দেশের জনসংখ্যা ছিলো মাত্র সাড়ে সাত কোটি। সেই সময় কেউ কি ভেবেছিলেন যে, এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মধ্যেই ষোল কোটি মানুষ খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারবেন? শহীদ জিয়ার সবুজ বিপ্লবের কারণেই আজ বাংলাদেশের মানুষ কোনরূপ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি না হয়ে বেঁচে আছেন।

বলা বাহুল্য, যে গতিতে তিনি বাংলাদেশে উন্নয়নের জোয়ার এনেছিলেন তা বাংলাদেশের শত্রুদের পছন্দ হয়নি। সাবেক ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা অশোক রায়নার লেখা ‘ইনসাইড র’ বই এবং কোলকাতা হতে প্রকাশিত ‘উইকলি সানডে’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ‘র’ প্রধান কাও এর নেতৃত্বে জেনারেল জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোরারাজি দেশাই এই পরিকল্পনা স্থগিত করার আদেশ দেন, যদিও ততদিনে পরিকল্পনা অনেক এগিয়ে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় আসলে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা করা হয়।

শহীদ জিয়ার সেই সকল কর্মসূচী এবং জাতীয় ঐক্য এর পরের সরকারগুলো মোটামুটি রক্ষা করে চললেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সর্ব প্রথম বিরোধী দল ও বিরোধী দলের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী বা বিরোধীদলের সমর্থক সন্দেহে দেশের একটি বিশাল জনশক্তিকে দেশ গঠনের কাজ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে জাতি বিভক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় দেশ শাসনের সূত্রপাত করে। বলা বাহুল্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ/বিপক্ষ হিসেবে এই বিভাজন করা হলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চিহ্নিত যুদ্ধপরাধী ফায়জুল হককে তারা মন্ত্রী করে। সুতরাং একথা নিশ্চিত যে, এই বিভাজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে/বিপক্ষে করার অযুহাত দেয়া হলেও মূলত: এই বিভেদ তৈরী করা হয়েছিলো আওয়ামী লীগ ও তার বিরোধীদের মধ্যে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর এই বিভেদ এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

একটি দেশের নাগরিকরা এভাবে রাজনৈতিক বিভক্তির শিকার হলে কখনোই সেই দেশে উন্নয়ন আসতে পারে না বরং দেশি-বিদেশি অপশক্তি এই সুযোগে দেশের ক্ষতি করার কাজে লিপ্ত হয়। বিগত দুই যুগের রাজনৈতিক চর্চা এবং জাতীয় নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহনের ধরণ দেখে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বাংলাদেশের জনগণ এখনো প্রধান দুই দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই থাকতে আগ্রহী। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে এই দুই দলের বাইরে নতুন বিকল্প শক্তি হিসেবে জনগণের মন জয় করার মত কোন ক্যারিশমেটিক নেতাও নেই।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের একটি বিরাট অংশের সমর্থন থাকলেও অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক সত্যি হচ্ছে, এই দলের নেতার নেতৃত্বে গতিশীলতা এবং প্রাজ্ঞতার কোনটাই নেই। রাজনৈতিক পরিবেশে উনার অরাজনৈতিক বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে যেমন নষ্ট করেছে ঠিক তেমনি কুটনৈতিক পর্যায়ে অকুটনৈতিক আচরণের কারণে বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতার কারণে দেশের জনগণ যেমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তেমনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মূল্যবান শ্রমবাজার হাতছাড়া হচ্ছে। পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে অপ্রীতিকর বাক্য ও পত্র বিনিময় তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আওয়ামী লীগের মধ্যে পরবর্তী নেতৃত্বেও তেমন কোন প্রাজ্ঞ ও গতিশীল নেতা দেখা যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন এবং কোন কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংযুক্ত ছিলেন। দলের কোন পর্যায়ে সদস্যপদ না থাকা অবস্থায় উনার এই কর্মকাণ্ড খোদ দলের নেতাদের মধ্যেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর পূত্র জনাব সজিব ওয়াজেদ জয় এবং কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আওয়ামী লীগের কোন পর্যায়ের সদস্য নন। তবে তাঁদেরকে বিভিন্ন বিদেশী অতিথির আগমনে এবং বিদেশে সরকারি সফরের সময় রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে অবস্থান করতে দেখা যায়। এমনকি ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে এই দুই ভাই-বোনকে প্রধানমন্ত্রী ও কুটনীতিকদের আসনে বসে থাকতে দেখা যায়, যা সমগ্র বিশ্বে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য যে এই তিন সম্ভাব্য নেতার কেউই বাংলাদেশে অবস্থান করেন না এবং বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সাথে তাঁদের কোন যোগাযোগও নেই।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য পুত্র জনাব তারেক রহমান উত্তরাধিসূত্রে নয় বরং পরিবারে বিদ্যমান রাজনীতির পরিবেশের কারণেই নিজের ব্রত হিসেবে রাজনীতিকে বেছে নিয়েছেন। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি বগুড়া জেলায় বিএনপির নির্বাচন প্রচারনা অভিযানে সংযুক্তির মাধ্যমে দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি সংযুক্ত হন। এরপর তিনি বগুড়া বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বগুড়া জেলায় সংগঠনের ভিত্তি দৃঢ় করেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০২ সালে জনাব তারেক রহমানকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। দলের উর্দ্ধতন পর্যায়ে নিয়োগ লাভের পর পরই তিনি দেশব্যাপী দলের মাঠপর্যায়ের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের সাথে ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেন। মূল সংগঠনসহ সহযোগী সংগঠন যেমন জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কর্তৃক আয়োজিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে জনাব তারেক রহমান কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও মতামত গ্রহণ করেন।

এই সভাগুলোতে তিনি মূলত দলের গঠনতন্ত্র, উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নেতাকর্মীদের সাথে দীর্ঘ মতবিনিময় করতেন। বিস্তারিত মতবিনিময়ের বিষয়বস্তুর মাঝে আরও থাকতো দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ বাস্তবায়নে দলের করণীয় ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন- অগ্রগতি নিশ্চিতকরণে সরকারী দল হিসেবে বিএনপির করণীয় প্রসঙ্গে আলোচনা। পরবর্তীতে দেখা গেছে যে এই জনসংযোগ কার্যক্রমের ফলে দলের নেতাকর্মীদের তরুণ অংশটির মনোবল অসামান্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই কারণেই জনাব তারেক রহমান শুধুমাত্র দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তানের পরিচিতি থেকে মুক্ত হয়ে দলের একজন দক্ষ সংগঠক ও সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বাবা-মার পরিচয়ে পরিচিত না হয়ে নিজের স্বতন্ত্র ইমেজ তৈরীর জন্য ২০০২ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, “আমি তারেক জিয়া হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমি তারেক রহমান হিসেবে পরিচিত হতে চাই।”

Zia griculture

কৃষি প্রধান অর্থনীতি এবং গ্রামপ্রধান দেশে যে কোন বিপ্লবের সূচনা করতে হয় গ্রাম থেকে। ১৯৪১ সালে চেয়ারম্যান মাও সেতুং চীনে এভাবেই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন যা বিশাল লংমার্চ এ রূপ নিয়ে শেষ হয়েছিলো ১৯৪৯ সালে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও গ্রাম থেকেই তাঁর রাজনীতি শুরু করেছিলেন। খাল খনন ও সবুজ বিপ্লবের কাজে তিনি প্রায় প্রতিদিনই ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রামেগঞ্জে। তারই সুযোগ্য সন্তান হিসেবে তারেক রহমানও একই পথ বেছে নিয়েছিলেন। নব্বই এর গণ অভ্যুত্থানের পর থেকে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিলো যে সরকার রক্ষা করতে হলে ঢাকা দখল করতে হবে। তাই তখন বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকা- ঢাকাকেন্দ্রীক ছিল।

তারেক রহমান যেন হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে দিয়ে জোয়ারের সৃষ্টি করলেন। ‘গ্রাম মার্চ’ কর্মসূচীর মাধ্যমে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগঠনের কাজ করতে শুরু করলেন। দরিদ্র কৃষকের জন্য বিনামূল্যে ‘কমল বীজ’ আর দরীদ্র নারীদের জন্য হাঁস-মুরগী বিতরণ করে গ্রামের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অবস্থান তৈরী করলেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এর পক্ষ হতে মেধাবৃত্তি এবং কম্পিউটার ও ল্যাপটপ প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। শীতের তীব্রতায় কষ্ট পাওয়া গরীব মানুষের পশে তিনি প্রতিবছর শীতবস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। সেই সময় থেকেই বিএনপির অসংখ্য কর্মী তারেক রহমানের মধ্যে দেখেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি।

Zia-02

বর্তমান সরকারি দল আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের সমূদ্রসীমা নির্ধারণের রায়কে ‘সমূদ্র বিজয়’ বর্ণনা করে নিজেদের কৃতিত্ব দাবী করছে। অথচ এই সমূদ্র সীমা হতে দেশের জনগণের উপকারের জন্য এখনো পর্যন্ত তারা কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ২০০৩ সালেই এক টিভি সাক্ষাৎকারে জনাব তারেক রহমান বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বাঁধ দিয়ে পলি সংগ্রহ করে দেশের আয়তন বৃদ্ধির চিন্তা করেছেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের বনানীস্থ কার্যালয় থেকে ২০০৪ সালের শুরুর দিকে জনাব তারেক রহমান দলীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ইন্টারনেট এবং ফোনের মাধ্যমে প্রায় ২ ঘণ্টা যাবৎ তিনি প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। যদিও সে সময় বাংলাদেশে তথাকথিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামে কোনো শ্লোগান ছিল না; তবে তথ্য-প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে একটি আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কার্যকর পদক্ষেপ ছিল সেটাই প্রথম; সেটাই ছিল বাংলাদেশকে ই-গভর্নেন্সের আওতায় আনার বাস্তবমুখী উদ্যোগ। তিনি রাজনৈতিক উদারতার অকপট উদাহরণ তৈরী করেছেন টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে গিয়ে এবং সজিব ওয়াজেদ জয়কে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়ে।

জনাব তারেক রহমান বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়কে দলের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপির নির্বাচনী কর্মকাণ্ড, কৌশল নির্ধারণ, প্রচার-প্রচারণা সব কিছুই এই কার্যালয়ে বসে করা হয়েছে। দলীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে এই কার্যালয়ে গড়ে তোলা হয়েছিলো দেশের প্রথম কোন রাজনৈতিক দলের কম্পিউটারাইজড ডাটাবেজ। দলীয় নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড মনিটর করা এবং দেশব্যাপী দলের কার্যক্রমের বিস্তারিত এ্যাকশন প্ল্যান করা হতো এই কার্যালয় থেকেই।

এসব কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের উন্নয়ন বিরোধী শক্তিগুলো উদীয়মান গতিশীল নেতা তারেক রহমান এবং তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কার্যালয়কে জনসমক্ষে হেয় করার জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা এটা বুঝতে পেরেছিলো যে, তারেক রহমান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিএনপির ভবিষ্যত নেতা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন অথচ তাঁর বিপরীতে দাঁড় করানোর মত কোন বিকল্প নেতা নেই। এই কারণেই জনাব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে তারা পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মিথ্যা বিষেদগার করে গেছে। কক্সবাজারে তিনি যে হোটেলে কর্মী সম্মেলন করেছেন, সেই হোটেলকে তাঁর হোটেল বলে প্রচার করা হয়েছে, অন্যের মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তার মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে ২০০৮ সালে দৈনিক আমাদের সময়ের সম্পাদক নাইমুল ইসলাম লিখেছিলেন, “হাওয়া ভবনকে দুর্নীতির কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা এবং সেটা প্রতিষ্ঠিত করার একটি চেষ্টা ২০০১ সালের নির্বাচনের কিছুকাল পর থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্টদের ২০০১ সালের নির্বাচনে ভূমিকা এবং বিপুল সফলতা হাওয়া ভবনকে টার্গেট হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।”

২০০৭ সালের অবৈধ মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের আমলে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে জেলে পাঠানো হয় এবং পরিকল্পিত উপায়ে তাঁর উপর নির্যাতন করে তাঁকে পঙ্গু করে দেয়া হয়। কোন মামলাতেই তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির প্রমাণ না পাওয়ায় তিনি সবগুলো মামলায় জামিন লাভ করে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মূক্ত হন। জরুরী অবস্থা চলাকালীন সময়েও তাঁর মুক্তির দিনটিতে ঢাকা শহর কার্যত অচল হয়ে যায়। ঢাকা শহরের সকল মানুষের গন্তব্য সেদিন বিকেলে এক হয়ে গিয়েছিলো শাহবাগের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে; যেখানে তিনি তখন চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘ অপপ্রচার, নির্যাতন এবং মামলার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা সামান্যতম হ্রাস না পাওয়ায়, আতঙ্কিত স্বৈরাচারীরা তাঁকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য এমনিতেও তার বিদেশে যাবার প্রয়োজন ছিলো। বাংলাদেশের রাজনীতি সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই নেতার অপেক্ষায় আছে।

যে, দেশে গুণীজনের কদর নেই, সে দেশে গুণীজন জন্মায় না। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর এই বাণীকে অবহেলা করে আমরা বারবার আমাদের দেশপ্রেমিক নেতাদের হত্যা করতে দিয়েছি, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে তাঁদের মরনোত্তর চরিত্রহানি করেছি এমন কি পাঠ্য পুস্তকে মিথ্যা ইতিহাস পর্যন্ত সংযোজন করেছি। আমরা আমাদের জাতীয় বীরদের অপমান করে নিজেরাই পশ্চাৎপদ ও পরমুখাপেক্ষী হয়ে আছি। মুক্তিকামী চেচেনদের নেতা যোখার দুদায়েভ এর মৃত্যুর পর চেচনিয়ার স্বাধীনতা অধরাই রয়ে গেছে। একজন ভাল নেতার অভাবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা তাঁদের ওপর চলা অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞকে বিশ্বের কাছে পৌছে দিতে পারছে না। আমরা সৌভাগ্যবান যে জিয়াউর রহমানের মত নেতা আমাদের দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে এসেছিলেন এবং তারেক রহমানের মত নেতা আমাদের দেশকে ‘ইমার্জিং টাইগার’ পরিচিতি দিয়ে উন্নয়নের রানওয়েতে নিয়ে এসেছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে আমাদের উন্নয়নের বিমান উড্ডীন হয়নি। এখন আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এইসব ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্রের হোতাদের মোকাবেলা করে দেশে ও দশের উন্নয়নের জন্য তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণাকারীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

সেনাপতি মেক্সিমাস ও “ঢাকা ইজ দ্য লাইট”

 

ইনতেখাব আলম চৌধুরী
জাতীয় পত্রিকা বলে একটা ধারণা আমাদের মধ্যে চালু আছে। বস্তুত যেসব পত্রিকা ঢাকা থেকে সারা দেশে যায় সেগুলোকেই জাতীয় পত্রিকা ধরা হয়। পত্রিকাগুলোর ফিচার মোটামুটি একইরকম। সাথে থাকবে কিছু সাপ্তাহিক অংশ, যেগুলোর কাজ ফ্যাশন, পড়ালেখা, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষকে নিত্যদিনের জ্ঞান দেয়া। তবে জাতীয় পত্রিকা বলা হলেও এখানে পুরো জাতির খবর খুব একটা আসে না। যা আসে তা হল ঢাকার খবর। সারাদেশের মানুষ ঢাকায় কী হল না হল সেখবর গিলতে থাকে আর নিজেদের এলাকার অবস্থার কথা ভুলতে থাকে। অন্যান্য অঞ্চলেও পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সেগুলো মানুষ পড়েও। কিন্তু জাতীয় পত্রিকাগুলোর দৌরাত্মের দিনে আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোর খবর মানুষের মধ্যে তোলপাড় তুললেও তা দিন শেষে ভাটার দিকেই যায়। 

হালের টিভি চ্যানেলগুলোর অবস্থাও তাই। তবে সেক্ষেত্রে কোনো “জাতীয়” টাইপ ধারণা গড়ে উঠে নাই। তাই দেশীয় চ্যানেলের সংখ্যা প্রচুর হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জাতীয় চ্যানেলের নাম শোনা যায় না। তবে সুবিধার জন্য সেগুলোকে জাতীয় চ্যানেল হিসেবে ধরলাম। আরেকটি বিষয় হল এখন পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক চ্যানেলও গড়ে উঠে নাই। চট্টগ্রামে আগে সন্ধ্যার দিকে ঘন্টাখানেক সময় বিটিভির চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রোগ্রাম প্রচার করা হত, এখন চালু আছে কিনা জানি না। তবে সেটাকে চ্যানেলের পর্যায়ে ধরা যায় না। 

যাই হোক, তারা ঢাকার খবরগুলোকেই প্রচার করে সেটাই আসল কথা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের খবর নিয়ে তাদের বিশেষ পাতা থাকলেও সেগুলোতে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের খবর আটানো দুঃসাধ্য কর্ম। ফলশ্রুতিতে যা হয় তাহল দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের চিন্তাভাবনাও ঐ একটা শহর কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। নিজেদের সমস্যা যতই বড় হোক না কেন ঐ শহরের কাছে তা পাত্তা পায় না। তাই উত্তরবঙ্গের মঙ্গার খবর কয়েকদিন যাবত হেডলাইন হয় না, দক্ষিণাঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের খবর প্রতি বছর পাওয়া গেলেও সেটা জাতীয় সমস্যা না। ফলে এগুলোর স্থায়ী সমাধান নিয়ে চিন্তার দরকার নাই – এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। তার চেয়ে বরং পুরো ঢাকাকে কিভাবে ফ্লাইওভার দিয়ে মুড়ে ফেলা যায়, ঢাকার পার্লামেন্টের ক্ষমতা কিভাবে কে দখলে রাখতে পারে – সে চিন্তাই বেশি দরকারি। 

এর একটা দীর্ঘমেয়াদি খারাপ ফল আছে। Gladiator মুভিটিতে রোমান সম্রাট মার্কা‌স অরেলিয়াস ও তার সেনাপতি মেক্সিমাসের মধ্যে সংলাপের একটি দৃশ্য ছিল। সম্রাট সেনাপতি মেক্সিমাসকে জিজ্ঞাসা করে, “What is Rome?” মেক্সিমাসের উত্তর ছিল, “I’ve seen much of the rest of the world. It is brutal and cruel and dark. Rome is the light.” এরপর সম্রাটের বক্তব্য হল এরূপ, “Yet you have never been there. You have not seen what it has become.” মানে কী? সেনাপতি মেক্সিমাস তখন পর্যন্ত রোম শহরে যায়নি। এরপরও রোম তার কাছে লাইট এবং এই লাইটের রক্ষার জন্য সেনাপতি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছিল এবং আমৃত্যু সম্রাটের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। তৎকালীন সময়ে এমনভাবে শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে রোমের দাসত্ববরণ করতে হত। উল্লেখ করা দীর্ঘমেয়াদি খারাপ ফলটা তাই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এমন অনেক মানুষ আছে যারা ঢাকার বাসিন্দা না হলেও জীবনের একটা অংশ ঢাকায় কাটিয়েছে আর তাতেই তাদের মধ্যে একটা এলিট শ্রেণীর মানসিকতা তৈরী হয় যার ফলে দেশের অন্যান্য অংশে গেলে সেটার প্রতি তুচ্ছভাব পোষণ করতে সেকেন্ড দেরী হয় না। যদিও তাদের আদি বাসস্থানও ঐ একইরূপ। এবং এধরনের মানুষের বর্ধমান হার দিয়ে ভবিষ্যত সুন্দর হওয়া অসম্ভব। তারা খালি ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা করবে কিন্তু বাকি দেশ থেকে যাবে “brutal and cruel and dark”।

এই মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ আমরা, আমাদের সমাজের সিস্টেম নিত্যদিন তৈরী করে চলেছি। তাই ভালো থাকার জন্য ঢাকায় মানুষের স্রোত বাড়তেই থাকে, সেই মানুষগুলোকে ভালো রাখতে গেলে যেসব অবকাঠামো তৈরী করা দরকার তা বলতে গেলে শুধু ঢাকাতেই তৈরী হয়, ঢাকা হয়ে পড়ে বুদ্ধিজীবীদের ভাষায় মানুষের “প্রাণের শহর”। ঢাকা রাজধানী হওয়ার চারশত বছর নিয়ে গবেষণা সেমিনার হয়, উৎসবের আয়োজন হয়। অথচ সমুদ্রতীরবর্তী চট্টগ্রামের হাজার বছর পুরনো বাণিজ্য নিয়ে টু শব্দ হবে না, উত্তরবঙ্গের সুপ্রাচীন বাংলার ইতিহাস অপাংতেয় হয়ে পড়বে, সিলেটের নিজস্ব নাগরী লিপি হারিয়ে গেলেও “শিক্ষিতজনদের” কারো মাথাব্যথা নেই, উল্টো সিলেট, চট্টগ্রাম এসব এলাকার ভাষাকে খেত প্রমাণে সবাই ব্যস্ত। এসবের মূল কারণ এগুলো কেন্দ্র করে তারা ব্যবসা করতে পারে না। তাই শেষকালে সেনাপতি মেক্সিমাসের মত সবার মনে বাজে, “Dhaka is the light”।
 
Written By:
– ইনতেখাব আলম চৌধুরী

 

 

China and India: Leadership in Contrast

1

by Shafiqur Rahman

The Indian Election results are astounding, and that is a euphemism. All the wishful thinking and self-justifying commentaries from secular intellectuals proved to be just that, self-deluding. Even as the exit polls carried on the tradition of failing to capture the complexity of electoral preference of Indian voters, they failed not in predicting the BJP victory but failing to gauge the magnitude of the victory. In terms of representative democracy, this is truly an epochal election in India. There is virtually no main opposition party in the Parliament. Sansad Bhaban, the house of Parliament of India, is really the house of Mr Modi now.

Two things stand out to me in the post-quake landscape of Indian politics. First, with barely 38% of the votes the BJP led coalition now commands 62% of the total seats. With support from one or two smaller regional parties, the NDA coalition can comfortably cross over the hallowed 67% or two third Special Majority mark. And with Special Majority, Emergency Proclamation, Amendment of the Constitution via article 368, Removal of Supreme Court Judges, Removal of President etc. are all within the grasp of an NDA government led by Mr Modi.

This election has been all about Mr Modi and India is now his oyster. Rarely in recent Indian history have hopes and fears of billions of people in and around India been centered on a single personality like now. For his detractors, coronation of Mr Modi raises the spectre of the most notorious human cliché from 1930’s Germany. To his devotees, Mr Modi carries the ambition for an Indian Lee Kwan Yew; who will firmly taking charge of India Incorporated and unleash the dynamism to make the country a world economic and political superpower, not just in theory and potentially but in reality. What Mr Modi will think and do is ‘known unknowns’; to quote from the famous saying of Mr Rumsfeld. In short, dramatic change for better or worse is in the cards and with it entails huge uncertainty. Those who dismiss the potential for disruptive change in an established democracy like India do not pay sufficient heed to the confluence of charismatic and ambitious leadership, large and enthusiastic support from people and resourceful interests and power of mass media in shaping mass psychology; a conjunction that has shown its potency in recent history time and time again. And that brings us to the main thesis of this article, a high level glimpse on the stability and uncertainty of political leadership in democracy and other systems.

Rightly, in this purported Asian Century, all developments in India is compared and contrasted with China, currently the third and the second biggest economies by PPP. Throughout the last two decades, when China has been growing at unprecedented breakneck speed and India was developing at solid, respectable rate but was increasingly falling behind, both Indian and western political commentators comforted the worldwide adherents of plural politics by rationalizing that, while China’s growth is spectacular, it’s economy and society is increasingly in precarious position because of a forced marriage of an autocratic political system with a free-capitalistic economy. India on the other hand was regularly complimented because of the stability and robustness of its plural political system and diverse society. As we can see now that even established and healthy democracies can throw up great uncertainty in the form of unknowns focalized in a singular leadership, it is a good time as any to evaluate the Chinese political leadership during the transformational recent decades.

Chinese economic growth in the last three decades is an unprecedented macro event in recorded human history.  In 1980, real per-capita income of China was one fortieth of an US citizen and now it is almost one-fourth. Analysts say that China will overtake USA as the largest economy in within the next few years. The social change is no less outstanding; in 1980 only a fifth of Chinese people lived in cities, now more than a half does. These dizzying statistics of change often mask another remarkable thing, despite high and regular turnover of people at the apex, Chinese political leadership remained uniquely stable, continuous and focused during these years of tumultuous change. This stability is mainly due to the hierarchical and grouped structure of Chinese leadership and decision-making.

China’s political system is divided into three major institutions: the government, the Chinese Communist Party (CCP), and the military. The Party sits at the apex, subordinating all others. The Communist Party has 80 million members (5% of Chinese Population) and people only become member after a selective process that can take several years. The Party is organized into three major bodies: the Central Committee, the Politburo, and the Politburo Standing Committee. The Central Committee is comprised of 200 members who are elected in the Party National Congress which is held every five years. Committee members include senior party and government officials, different agency heads, military generals, provincial governors, head of State-owned companies etc. The Central Committee appoints the 25-man Politburo, which is then narrowed even further into a 5 to 9-man Politburo Standing Committee (PSC) that really runs the Party and the country.  Each PSC member generally in is in charge of a portfolio covering a major area such as the economy, legislation, internal security, or propaganda. Although most of the important policy decisions are often dictated from top down in this hierarchy, Central Committee does wield real power through the five years; it sets the direction of policy and leadership changes and ratifies them. There is intense politics and lobbying in the committee between different groups.

Top leader

The seven members of the Politburo Standing Committee (PSC) are ranked in order of primacy, from one to seven. The rankings do not exactly refer to the official post of the members, sometimes members do not hold any official post but still is ranked high and wields huge influence. Usually though, the President and the Prime Minister holds the first and second rank. The most important point of the PSC is that the person at the top is not the leader of the group but the first among equals. It is a consultative and collective decision making body, no one can impose a view upon others; a decision must garner substantial support from the members. The second important feature of the PSC is its regular turnover. There is an enforced retirement age of 68 which effectively limit the term of members, including the top ranked leader. Also leaders who fail to perform are often dropped after the first term or even within term.

The age limit not only curbs unchecked ambition of charismatic leaders but also initiates a long grooming process. The small number of promising people who can rise to the top must be given ministerial or provincial leadership positions in their early and mid-50s so that they can be ready for PSC when they are 60. Many Politburo members in China have been involved in business, corruption or other profit-seeking activities and became fabulously wealthy. But no matter how influential they become, no one can stay beyond the term limit. Also China is notoriously nepotistic; children and family of political leaders enjoy huge perks in all aspects of society. But no one can place their children in top political positions, everyone has to go the long and process of membership, committee, appointments and prove themselves consistently as leader and manager. Interestingly, Engineers and Technical people heavily dominated the previous Chinese top leadership; all members of the 16th PSC (2002-07) were engineers. But six out of the seven members of the current PSC (2012-17) are trained in social sciences. This reflects a more awareness of politics and society than just economic growth.

20-politburo-standing-committee

The gradual evolution to collective leadership has engendered several broad trends in Chinese statecraft. The most visible is the stability and continuity; Chinese policy direction does not make radical changes on whims of new leader but reflects deliberative and broad-based decision-making. This stability is highly prized by international and domestic businesses who regard uncertainty as a principal impediment to long-term business and economic planning.

Secondly, although China is a one-party state where the party seeks to maintain a tight control over the population, current Chinese leadership also recognizes that control can only be achieved by a careful balancing of freedoms and restrictions. The Chinese government pays very close attention to public opinion while trying to control it; the government prioritizes wealth accumulating economic growth but at the same time try to ensure wide distribution of the spoils from growth. There is no magic formula for these kind balances and it is continuously changing. A single-apex leadership system would have been very inadequate for such careful fine tuning; collective decision-making enable a robust leadership mode with sufficient flexibility and rigidity to chart the huge country through tumultuous changes. Chinese leaders clearly see that even among their senior leaders there is divide between those who are more inclined to reforms and liberalization and those who are more conservative. The Chinese leadership institutionalized robustness in leadership by ensuring that both camps are adequately represented in the highest bodies but no camp gains an overwhelming advantage.

This collective leadership arose a lot due to the three-decade long all-powerful and capricious rule of Mao Zedong. During Mao’s rule the PSC was a totally ineffectual body and there were no mechanism or institution to check Mao’s disastrous policy decisions like the Great Leap Forward in the 1950s or the Cultural Revolution in the 1960s. After Mao’s death Deng Xiaoping started to develop rules to govern decision-making at the top level and manage power succession. From 12th Party Congress gradually the new rules were introduced and by the Congress in 2002 most of the current implicit and explicit rules have become established.

A similar reaction also took place in the Soviet leadership during the Communist Party rule. Stalin’s rule (1922-53) was the archetype of godlike, dictatorial regime. After Stalin there was strong demand for collective leadership at the top. Nikita Khrushchev was largely ousted from leadership because of his failure to institute collective leadership. After him, the regimes of Brezhnev, Andropov, Chernenko all had strong collective leadership. Perestroika; the policy that opened up the Soviet Union and initiate its eventual demise, did not spring out of the head of Mikhail Gorbachev alone; there were lot of institution support for far-reaching change from various quarter of the Soviet Central Committee. Even then Gorbachev had to do continuous to-and-from with politburo members to get majority approval for his policy changes. Many historians would contend that the group-leadership of the Soviet Politburo during the Cold War was no more irrational or arbitrary than the elected Presidential leaders of America. Soviet Union failed because of failure of economic system not political leadership; a lesson the Chinese leaders internalized assiduously.

Political scientists construct the spectrum of leadership by democratic and autocratic leadership at two extremes. Democratic leadership style supposedly emphasize group participation, discussion, and group decisions while an autocratic leader keeps tight control over group decisions and determines all policies only through own consent. Curiously there are often mismatch between leadership and politics. Democratic system throws up autocratic leaders quite often and sometimes autocratic systems have remarkable democratic decision-making process. We in Bangladesh need no lesson in how democratic elections can produce the most autocratic leaders. Interestingly, most established and mature democracies have a democratic system of electing leaders but give remarkably autocratic and arbitrary decision making power to the top. Most often, democratically elected leaders are moderate and reasonable men but occasionally we also see leaders like man-on-a-mission George W Bush, who religiously believed he has divine mandate.

Democracy is not just a system of selecting leaders democratically but also checking bad decisions of elected leaders and getting rid of them easily when they fail dismally. The Chinese collective leadership with its institutionalized development of leaders, group decision making and regular turnover at the top seem to have integrated many of the best features of democratic leadership. This is not an advocacy for Chinese Political system; China is after all a one-party state where people have very little say about the course of their destiny. But we should not overlook the attractive features of the Chinese leadership. Democracy is not a formula but a participatory argument. Democracy should evolve with the need and circumstances of the time and place.

Leadership function arose in the biological world to solve coordination and collective action problem of large groups of social animals. Anthropologists say that pre-civilization human societies had more group decision making than hierarchical leadership. The vast increase of social complexity due to founding of cities and states produced need for powerful, centralized and formal leadership structures. But as the communication and knowledge revolution vastly changed the coordination problem of big societies, the formal-singular leadership system is now increasingly questionable. The paradox of leadership is that versatility, the ability to do multiple, even competing roles is greatly correlated with leadership effectiveness but individuals who can do that are very rare indeed. Democracy is the best method of selecting leaders but even it often fails to find those rare individuals, particularly in countries where the choice is very limited.

Whether one believes in the End of History thesis of Francis Fukuyama or not, one cannot deny that most of the world citizenry now do not hunger for revolutionary change but for improvement and problem-solving. In this day and age, where there is huge pool of expert and informed leaders in every society, entrusting fate of hundreds of millions or even billions upon hit or miss charismatic leaders seem to be risky proposition indeed. Collective leadership as a mechanism of power-sharing through checks and balances among competing political camps, but also incorporating more dynamic and pluralistic decision-making process seem to be more suited for the age we live in.

I believe that single leaders as messiah or savior is out of place in today’s world. We need real time participatory democracy. We need checks against uncertainty of democratically elected dictators and we need mechanisms for diversity and robustness at the top of decision making. How to develop such mechanisms is an argument that we must join vigorously.

জনাবা হাসিনা; অনির্বাচিত ও অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দ্যেশ্যে

by Watchdog Bd

জনাবা হাসিনা,

মাননীয়া সম্বোধন করে আপনাকে সন্মান দেখাতে পারছিনা বলে দুঃখিত। প্রথমত, বিশ্ব হতে উপনিবেশবাদ অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। বৃটিশ প্রভুদের কায়দায় কথায় কথায় মাননীয়া জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে নিজকে দুইশত বছর আগের দাস যুগে ফিরিয়ে নিতে চাইনা। খোদ বৃটিশরাও এখন আর এ জাতীয় শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। বারাক ওবামা আমার দত্তক নেয়া দেশের প্রেসিডেন্ট। পৃথিবীর সবাচাইতে শক্তিধর প্রেসিডেন্টকে আমি জনাব প্রেসিডেন্ট বলতেই অভ্যস্ত। এ নিয়ে খোদ ওবামা যেমন অভিযোগ করেননি, তেমনি তার দল ডেমোক্রাটরাও আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানোর চেষ্টা করেনি। আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি হাজার ব্যস্ততার মাঝেও প্রেসিডেন্ট ওবামা আমার মত একজন সাধারণ সমর্থক ও নির্বাচনী কর্মীর সাথে নির্বাচন উত্তর যোগাযোগ রাখতে ভুল করেন না। দ্বিতীয়ত, আপনি বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার প্রধান নন। আপনি দলীয় প্রশাসন ও বন্দুকের নলের মুখে অনির্বাচিত সরকারের প্রধান। তাই আমাদের সংস্কৃতিতে স্বীকৃত ও প্রাপ্য সন্মান দেখাতে পারছিনা বলেও দুঃখিত। আইনগতভাবে আপনি কোনটারই দাবিদার হতে পারেন না। আপনি জারজ সরকারের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী। চাইলে দলীয় চামচা ও প্রশাসনের ভাড়াটিয়া বাহিনী পাঠিয়ে আমাকে শায়েস্তা করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি আমি যা বলতে যাচ্ছি তার সবটুকু বলা সম্ভব না হলেও কেউ না কেউ একদিন এসব কথা মুখ ফুটে বলতে শুরু করবে। বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের সবাইকে ভয়, সন্ত্রাস ও পেশী শক্তির কাছে জিম্মি রেখে, গায়ের জোরে ক্ষমতার সিংহাসন আলোকিত করার নিশ্চয়তা কেউ আপনাকে দিতে পারবেনা। সময় আসবে এবং আপনার প্রতি সেকেন্ড কর্মকান্ডের জবাবদিহিতার দাবি উঠবে। এবং তা হবে সভ্যতার দাবি। সময়ের চাহিদা।

জনাবা হাসিনা,

ঘটনা হাজার রজনীর আরব্য উপন্যাস হতে নেয়া নয়। ৬০-৭০’এর দশক এখনো ইতিহাসের পাতায় সমাহিত হয়নি। আমরা যারা বেঁচে আছি তারা ভুলে যাইনি কেন এবং কোন প্রেক্ষপটে এ দেশের মানুষ সংযুক্ত পাকিস্তানকে লা-কুম দিনু-কুম জানিয়েছিল। স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা ও তাদের পোষ্য ২২ পরিবারের শোষন, পিষন ও সন্ত্রাসের নাগপাশ হতে মুক্তি পাওয়ার ভ্রুণেই জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ নামক দেশের স্বপ্ন। সে স্বপ্ন অংকুরিত হয়ে পল্লবিত হয়েছিল ৭০’এর দশকে। ফলশ্রুতিতে মানুষ অস্ত্র হাতে নিয়েছিল এবং ইতিহাসের অমেঘো পরিনতিতে সংযুক্ত পাকিস্তান ঠাঁই নিয়েছিল আস্তাকুঁড়ে। আজ আমরা নিজেদের স্বাধীন এবং সার্বভৌম বলে দাবি করি। আসলেই কি তাই? আপনার অভিধানে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কি আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের অভিধানে এ সংজ্ঞা কেবল আপনার বাবাকে দেবতার আসনে বসিয়ে পুজা অর্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতা ২২ পরিবারের খপ্পর হতে বেরিয়ে ১ পরিবারের রাজতন্ত্র কায়েম করাও নয়। স্বাধীনতা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভৌগলিক দিয়ে শুরু হলেও এর শেষ ঠিকানা অর্থনৈতিক মুক্তি তথা সামাজিক নিরাপত্তায়। জাতিকে আপনি অথবা আপনারা কি দিয়েছেন ভেবে দেখেছেন কি? গোটা দেশ পরিনত হয়েছে মাফিয়া স্বর্গরাজ্যে। লুটপাটতন্ত্র রাজত্ব করছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র। খুন, লাশ, গুম পরিনত হয়েছে দৈনিক ডাল ভাতে। মানুষ মরছে জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, শয়ণকক্ষে। লাশ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবায়। আতংকের কালো ছায়া গ্রাস করে নিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। বলতে বাধ্য হচ্ছি জনাবা, সবকিছু হচ্ছে আপনার নেত্রীত্বে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আপনাদের পারিবারিক সম্পত্তি। এর অংগ সংগঠন সমূহ আপনার পেশিশক্তি। এদের যৌথ প্রযোজনায় যে পশুশক্তি জন্ম নিয়েছে তার কাছে অসহায় হয়ে পরেছে গোটা জাতি। গোটা দেশের মালিকানা চীরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেয়ার লালসায় দেশের সবকটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আপনি তচনচ করেছেন। কেড়ে নিয়েছেন নাগরিকদের ভোট দেয়ার অধিকার। দুমড়ে মুচড়ে তক্তা বানিয়েছেন কথা বলার স্বাধীনতা।

মুক্তিযুদ্ধ আপনার বাবা অথবা পরিবারের পৈত্রিক সম্পত্তি নয় যা দিয়ে আজীবন ব্যবসা করে যাবেন। যুদ্ধের কোন ফ্রন্টেই আপনাদের কারও কোন অবদান ছিলনা। আপনারা কেউ যুদ্ধে যাননি। দখলদার বাহিনীর নিরাপদ আশ্রয়ে নিজেদের চামড়া বাচিয়েছিলেন কেবল। চাপাবাজি আর পেশি শক্তির উপর ভর করে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতাকে বানিয়েছেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লাভজনক পণ্য, প্রতিপক্ষ নির্মূল করার ধারালো হাতিয়ার। শেখ পরিবারে আজীবন দাসত্ব করার জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। এ দেশের জন্ম হয়েছিল বুক ভরে নিশ্বাস নেয়ার জন্য, স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্য, অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা সহ মৌলিক অধিকার সমূহের নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য। আজ কোথায় এসব? স্বাধীনতাকে আপনি কবর দিয়েছেন শীতলক্ষ্যার পানিতে। বর্গা দিয়েছেন র‌্যাব, পুলিশ ও ছাত্রলীগের পদতলে। ওরা জাতির গলা চিপে শ্বাস বের করে আনছে এবং পৈশাচিক উল্লাসে আনন্দ করছে। আপনি গণভবনের চার দেয়ালে বসে মুচকি হাসছেন এবং মিথ্যাচারের গর্ভে জন্ম দিচ্ছেন নতুন এক দশ। অচল ও বিকলাঙ্গ বাংলাদেশ।

জনাবা হাসিনা,

ক্ষমতার স্বাদ খুবই সুস্বাদু। সহজে কেউ ভুলতে পারেনা। আপনি পারবেন না। কিন্তু সময় আসবে এবং আপনার স্বপ্নের তখত তাউসে আগুন লাগবে। সে আগুনে আর কেউ জ্বলবেনা,জ্বলবেন আপনি এবং আপনার পরিবার। অযোগ্যতাই হবে আপনার পতনের মুল কারণ। বাংলাদেশের মত জটিল আর্থ-সামাজিক দেশ পরিচালনা করার নূন্যতম যোগ্যতা নেই আপনার। তাই জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিন। ইতিহাসকে আপন গতিতে চলতে দিন। এ দেশের মানুষ গোলাম হয়ে জন্ম নিয়ে গোলাম হয়ে মরতে অভ্যস্ত নয়। তারা ঘুরে দাড়াতে জানে।
http://www.amibangladeshi.org/blog/05-14-2014/1458.html

মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ

 

By Faiz Taiyeb

কুকুরের লেজ যেমন সোজা হয় না, তেমন অত্যাচারী শাসক ও ভালো কাজ করতে পারে না। স্বৈরাচারী শাসক এবং নাগরিক স্বার্থে ভালো কাজ করা, এই দুই আসলে “মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ”।
৫ জানুয়ারির অবৈধ নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগ পন্থী বুদ্ধিজীবিরা ইনিয়ে বিনিয়ে উপর্যপুরি বলার চেষ্টা করেছেন, অবৈধ কিন্তু সাংবিধানিক (!) নির্বাচনের পর হাসিনা ভালো কিছু কাজ করে মানুষের মন জয় করবেন। আমারও সেরকম অনেক আশা ছিল। কারন এই মহিলা ৩ বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনি দলে একনায়ক, দেশের সেনাবাহিনী কে আর্থিক প্রাচুর্যের বিহ্বলতায় চড়িয়েছেন, আদালতকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছেন, নির্বাচন কমিশন কে হুকুমের চাকর বানিয়েছেন, রাজনৈতিক চালে বিরোধীদের কুপোকাত করেছেন। মোটকথা দেশের নিরুঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী প্রধান নির্বাহী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অধুনা একনায়করাও সম্ভভত এইধরনের একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করেন না। কিন্তু অতীতে যাই করুক না কেন, প্রান্তিক নাগরিক হিসেবে অধিকাংশই চায় এই দুর্নীতিবাজ প্রতারক নেতা গুলান ভালো হয়ে যাক। সবাই আসলে একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায়। ভালো কাজ করতে শুরু করলেই এই বঞ্চিত নির্যাতিত লোক গুলো অতীতের সব গ্লানি ভুলে এদের মাফ করে দিবে। আমরা বড়ই ইমোশনাল এক জাতি।
সুতরাং রক্তক্ষয়ী হিংস্র ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ী হয়ে ষাটোর্ধ একজন লেডির সেলফ সেটেস্ফিকশন আসবে এটা ভাবা খুব কঠিন ছিল না। কিন্তু বিধি বাম। তাই ওইসব বুদ্ধিজীবী আর সেইসব আশার কথা শুনাচ্ছেন না। বরং পুরা রাজনৈতিক কালচার কে দোষারোপ করছেন। ইন্টারপোল লিস্ট এ থাকা মস্তান কর্তিক একজন ফাঁসির আসামির খুন হয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার মৃদু বিবৃতি দিয়ে সমর্থনের লেজ আকড়ে ধরে উছিস্ট ভোগের সাময়িক ফন্দি ঠিক রেখছেন ।
এইদিকে, আওয়ামীলীগের নেতা কর্মী রা আছেন ভিন্ন হিসেব নিয়ে, ইউএস, ই ইঊ র নীরব সমর্থন বেশি টিকবে না ভেবে সবাই আগের গোছাতে ব্যস্ত, সবাই বেসামাল বেপারয়া লুটপাটে লিপ্ত। এতই বেপরোয়া যে, দলের ভিতর বাহির যেখান থেকেই বাধা আসুক সবাইকে কচুকাটা করা হচ্ছে। সমানে ভিতর বাইরের বিরোধীদের ধরে নিয়ে গলাটিপে নদীতে বস্তাবন্দী করে ফেলা দেবার কি হিংস্র এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সবাই। এমন উৎসাহ যে এলিট ফোর্স র‍্যাব ও বসে থাকতে পারছেনা। কিছু কন্ট্রিবিউট করছে।
তাই পদ্মা সেতুর অর্থায়নও আর শুরু হয় না, বরং এই সল্প সময়ে কিভাবে ভারত কে স্থল ট্রানজিট গছিয়ে দেয়া যায় সেটা নিয়ে কিছুটা তোড়ঝোড় দেখা যাচ্ছে। যাতে এটা বেচে আবার কিছু একটা করা যায়।
অবৈধ বেপরোয়া ক্ষমতা আর ভালো কাজ একসাথে চলে না, পৃথিবীর কোথায়ও চলে নি কোন কালে। সতরাং এইসব জনবিচ্ছিন্ন অত্যাচারী শাসকের বিদায় দরকার, অন্তত সমস্যার সাময়িক সমাধান এর নিমিত্তে। এর পর দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান পেতে সমাজ, নাগরিক ও নাগরিক সংঘঠন সমূহকে ঠিক করতে হবে, তারা কি গণতান্ত্রিক সিস্টেমের মধ্যেই কয়েকজন চোর এর মধ্যে ছোট চোরকে বেছে নিবে, নাকি তাদের সৎ পথে আনার সাহস দেখাবে আর বাধ্য করবে, নাকি এই চোরদের চুরি প্রতিহত করার সিস্টেম দাঁড়া করাবে।
কৈফিয়ত
সবসময় চেষ্টা করি প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধি করন নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করতে। নেতাদের সমালোচনা না করতে। কারন আমরা সব পেশার লোকেরাই রাষ্ট্রকে সমানে বলাৎকার করছি নিয়ত। সমস্যা হলো সব জায়গাতেই রাজনৈতিক দুরব্রিত্ত্বায়নের ছোবল এতটা গভীর যে এই অযোগ্য অপদার্থ লোক গুলারে (জাতে মাতাল কিন্তু টাকা মারার তালে ঠিক) আলোচনায় না এনে পারা যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সুশাসন, লোভ মুক্ত নেতৃত্ব, নৈতিকতার ও নিয়মতান্ত্রিকতার কিংবা দূরদর্শিতার যে বেইজ এডুকেশন এটা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেই, সব গুলো দলই ভন্ডে ভরা। সবার উদ্দেশ্যই দেশের আর দেশের মানুষের টাকা মারা, যখন পারে, যেভাবে পারে। এটা করতে গিয়ে দেশের সব কিছু তারা অনিয়ম আর দুর্নীতিতে ভরে ফেলেছে। অথচ দেশকে এগিয়ে নিতে হলে ভাল নেতৃত্ব লাগবেই লাগবে। এর দ্বিতীয় কোন বিকল্প জানা নাই।
২ বার, ৩ বার এক একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, দেশের লক্ষ কোটি শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত আর অশিক্ষিত জনতা তাদের ভয় বা সম্মান করেন (মন থেকে কিংবা বাধ্য হয়ে)। আর কি কি পেলে উনাদের আত্ব তৃপ্তি আসবে? ওনারা পৃথিবীর কত কত জনপদ দেখেন, কত কত দেশ ঘুরেন, একটি বারও কি উনাদের ইচ্ছে করে না, এই দেশটাকে ঠিক করে দেয়ার চেষ্টা করবেন। আজ রাজনৈতিক ইস্যু সমাধান বা ধামাচাপা দেয়ার জন্যে যে তোড়ঝোড়, এত এত ফোরস ডিপ্লয়ম্নেট, এত চিন্তা, এত কালক্ষেপণ, এর সামান্য যদি আমরা ঘুষ, দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যয় করি তাহলে দেশটা ঠিক হয়ে যায়। ২ টা মাত্র দল। ক্ষমতাসীন হলেই অসীম শক্তি আর প্রতিপত্তি, মানুষ কে নির্দেশনা দেয়া ও সহজ তাদের জন্য।
ব্যাপারটা তো এরকম নয় যে, দেশ উন্নত হয়ে গেলে হাসিনা বা খালেদা (মুজিব আর জিয়া পরিবার) গরীব হয়ে যাবে, তাদের সম্মান কমবে। ব্যাপারটা তো উল্টো। যে দেশ যত উন্নত তার নেতৃত্ব তত বেশি সম্মানিত, দেশে আর দেশের বাইরে।
আল্লাহ্‌ পাক আমাদের নেতৃত্ব কে বুঝ দিন। আমাদেরকেও বুঝ দিন। হতে পারে ব্যাপারটা এমন যে, ব্যক্তি জীবনমান আর সামাজিক উন্নয়ন আমাদেরকে সামাজিক আন্দোলন করেই আদায় করে নিতে হবে। অধিকার এমনি এমনি আসে না গরীব আর অভাগাদের কপালে।

 

রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডে ‘নিখোঁজ’ ঘোষিত ১৪৬ জনকে ‘নিহত’ ঘোষনা করুন প্লিজ

২৩ এপ্রিল ২০১৩ যখন রানা প্লাজায় ফাঁটল দেখা দেয় তখনই ঐ ফাটলগুলো পর্যবেক্ষণের পর বিপদজনক ঘোষনা করে একজন প্রকৌশলী একুশে টিভিতে সাক্ষাৎকার দেন। কিন্তু সন্ধায় ভবনের মালিক সোহেল রানা সাভারের তৎকালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে বৈঠক শেষে ঐ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সোহেল রানা দুই জনই একুশে টিভিতে ভবনটি সম্পূর্ন নিরাপদ ঘোষনা করেন। (উল্লেখিত দিনে একুশে টিভির সন্ধা সাতটার খবরটির ফুটেজ আর্কাইভ থেকে যোগাড় করলেই এটা পাওয়া যাবে)।

 

২৪ এপ্রিল ২০১৩ সকালে হরতাল বিরোধী মিছিল করার জন্য যুবলীগের কর্মী সমর্থকরা রানা প্লাজার নীচে সোহেল রানার অফিসে জড়ো হয়। অন্যদিকে গার্মেন্টসের শ্রমিকরা রানা প্লাজার বাইরে জড়ো হয়ে ঝুঁকিপূর্ন ভবনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতে থাকে। গার্মেন্টস এর কর্মকর্তারা বিষয়টি সোহেল রানাকে জানালে সে তার দলীয় কর্মীদের দিয়ে জোর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে শ্রমিকদের ভবনটিতে গিয়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করে।

 

শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবার কিছুক্ষণ পরেই লোড শেডিং শুরু হয় এবং ভবনটির বিভিন্ন তলায় থাকা জেনারেটরগুলো একসাথে চালু হয়। এর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই রানা প্লাজা ধ্বসে যেতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, জেনারেটরগুলোর সম্মিলিত কম্পন ফাঁটল ধরা রানা প্লাজার দুর্বল স্তম্ভগুলো সহ্য করতে পারে নাই।

 

একটি ঝুঁকিপূর্ন ভবনকে নিরাপদ ঘোষনা কারা করেছিলো, তার প্রমান টিভি ফুটেজে রয়েছে। কারা জোর করে শ্রমিকদের ঐ ভবনে পাঠিয়েছিলো তার প্রমানও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায়। তাহলে কী কারণে এখনো এই এক বছর পরও তদন্ত শেষ হলো না? রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঝুঁকিপূর্ন ভবনকে নিরাপদ ঘোষনা করার পর সেখানে শ্রমিকদের জোর করে কাজ করানোর কারনে এই ঘটনাকে আর ‘দুর্ঘটনা’বলার উপায় নেই; বরং এটি একটি ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’!

 

রানা প্লাজার হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক রূপ দিতে গিয়ে দেয়া দুইজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তির দেয়া নির্মম বক্তব্য আজো সবাইকে পীড়া দেয়। সেগুলো হচ্ছে-

“যারা মারা গেছে তারা মূল্যবান সামগ্রী সরাতে গিয়েছিলো”

“পিলার ধরে হরতালকারীরা নাড়া দেয়ায় ভবন ধস”

 

একজন মানুষ নিহত হলে তার পরিবার ও উত্তরাধীকারীরা তার সম্পদের বন্টন করতে পারে, তার জন্য বরাদ্দ ক্ষতিপূরণ পেয়ে ঐ কর্মক্ষম লোকটির ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু নিখোঁজ ঘোষনা করলে পরিবার ও উত্তরাধীকারীরা এই ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হবার পাশাপাশি স্বজনদের ফিরে পাবার এক দুরাশা নিয়ে দিন কাটায়। বিষয়টা যে কী পরিমান কষ্টকর তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না।

 

নিখোঁজ ঘোষিতদের স্বজনদের অপেক্ষা

নিখোঁজ ঘোষিতদের স্বজনদের অপেক্ষা

হে আমার রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষ, আপনারা যদি মানবিক যুক্তি না বুঝতে চান তাহলে পাশবিক যুক্তি দিয়েই বোঝাই। ধরে নিন একটি বাক্সে ১০টি গিনিপিগ আছে। বাক্সটিকে যদি একটি ল্যান্ড রোলারের নীচে চাপা দেন তাহলে কী কয়েকটি গিনিপিগ নিখোঁজ হয়ে যাবে?

 

রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের কাছে কড়জোরে অনুরোধ করছি, রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডে ‘নিখোঁজ’ ঘোষিত ১৪৬ জনকে ‘নিহত’ ঘোষনা করুন প্লিজ।

 

এমন নির্মম অপেক্ষার ছবি আর দেখতে চাই না।

 

(ছবির উৎস:  ইন্টারনেট)

বাম-আক্রান্ত রাজনৈতিক শ্বাসকষ্ট

by: Aman Abduhu

বাংলাদেশে ডানপন্থীদের নির্বুদ্ধিতা দেখে কষ্ট লাগে। চোখে পড়লো একজনের উদাত্ত আহবান ‘অমুক এবং অমুক মিলে তমুক টিভি চ্যানেলে ভারতকে ফাটাচ্ছে!!’। ভাবটা এমন, হে দেশপ্রেমিক ভাইয়েরা আসুন এবার উনাদের গুরু মেনে নিয়ে কোমরে বোমা বেঁধে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ি। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম।

দেখে থমকে গেলাম। আমরা এতোটা বোকা কেন? নিরুপায় হতভাগা কোন বর্গাচাষীর মতো। শরীরে শক্তি আছে, তবু কোন উপায় নেই। কিছু করার নেই। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর গ্রামের সুদী-ব্যাবসায়ী আবুল হোসেন এসে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলেই ডুকরে কেঁদে উঠি। ভিটে-বাড়ির দলিলপত্র কাবিননামা সব তার হাতে তুলে দিয়ে বলি, আমাকে বাঁচান। আমার আর কেউ নাই!

কেউ কোন কথা বললে বা কাজ করতে পারলেই হলো। তিনি আসলে কি বলছেন, কি উদ্দেশ্য নিয়ে বলতে পারেন অথবা এর ফলাফল কি হতে পারে, এসব চিন্তা করার ন্যুনতম ক্ষমতা আমাদের নেই। তারচেয়ে বড় বোকামী হলো, আমরা অতীত ভুলে যাই। বিন্দুমাত্র মনে রাখিনা। আবেগের স্রোতে অতীত বর্তমান ভবিষ্যত সব হাবুডুবু ভাসতে থাকে।

তাই ডানপন্থীদের নেতৃত্বের উপদেষ্টার কাজ করেন শফিক রেহমান। সরকারী দলের নির্যাতনের বিপক্ষে আসিফ নজরুল কথা বললে আমরা উদ্বেলিত হই। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিছু বলা মাত্র পিয়াস করিমের কোলে উঠে পড়ি। ইসলামের পক্ষে কিছু বললে হলো, শেষ করার আগে ফরহাদ মজহারকে ঘাড়ে বসিয়ে নাচতে শুরু করি। বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে যায় এমন একটা বাক্য লিখলে আবুল মকসুদকে চুমা দিয়ে ভিজিয়ে ফেলি। দেশের প্রধান পত্রিকাগুলোর সম্পাদক কে? মতিউর, মতিউর রহমান চৌধুরী, আবেদ খান।

দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্মের বর্তমান অবস্থা খেয়াল করলে এ বিষয়টা কৌতুহল জাগায়। এমনকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের বিবেক ও কণ্ঠস্বর হিসেবে ধরে নিয়ে যাদের পেছনে আমরা দৌড়াচ্ছি, তাদের প্রায় সবাই জীবনের ফর্মেটিভ বছরগুলোতে বাম রাজনৈতিক আদর্শের কর্মী ছিলেন। সব রসুনের গোড়া এক জায়গায়।

দৃঢ়ভাবে ধারণা করি, আগামী কিছু বছরের পর বামপন্থীরাই এদেশ চালাবে। বামদের মাঝে একটা বিবর্তন ঘটেছে। তারা নিজেদের মাঝে ভিন্নমতকে একোমোডেট করেছে। প্রশস্ত হয়েছে। যখন প্রশস্ত হওয়া সম্ভব হয়নি তখন আলাদা দল করেছে। তারা যখন শত শত গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চার পাঁচজন নিয়ে মিছিল মিটিং করেছে, আমরা বিদ্রুপের হেসেছি। কিন্তু নিজেদের মাঝে এ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নিজেদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি দাঁড় করানোর জন্য তাদেরকে খাটতে হয়েছে। তাদের বু্দ্ধি ও চিন্তাশক্তি শানিত হয়েছে। অন্যদিকে ডানপন্থীদের দিকে তাকালে মানুষ দেখিনা। দেখি একপাল ভেড়া ম্যা ম্যা কলরবে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে।

এ অবস্থার জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই, আমাদের পূর্বসূরীর দল। ডানপন্থীদের মাঝে ভিন্নমত কিংবা সমালোচনার পরিণতি হলো সমাজচ্যুত হওয়া। তারা বেশিরভাগ সময় ধান্দাবাজি আর পাওয়ার পলিটিক্স নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। ফলশ্রুতিতে সত্তর আশির দশকের যে তরুণ প্রজন্ম আজকে বাংলাদেশের হাল ধরেছে, তাদের মাঝে বামপন্থীরা হয়ে উঠেছে বুদ্ধিমান, ধারালো এবং যোগ্য। ডানপন্থীরা ঐসবের ধারেকাছেও যেতে পারেনি। তারা হয় ধনী হয়েছে। অথবা নির্বোধ হয়েছে। এক দঙ্গল ছাগল অনুসারীর সামনে থাকা মিথ্যাবাদী রাখাল হয়েছে।

আধুনিক রাজনীতি-শাস্ত্র অনুযায়ী, বাম রাজনীতি মানুষের অধিকার ও সম্পদ বন্টনের ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলে। পৃথিবীর অনেক দেশে তারা দেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বেরও প্রবক্তা। অন্যদিকে ডান রাজনীতি সরকারের গঠন, ধর্ম, অথবা দেশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক উন্নতি এসব নিয়ে কথা বলে। বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নরকম হয়ে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশে ডান বাম সব ধরণের ইস্যু নিয়ে ভোকাল কর্ড হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছে বামপন্থীরা। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক দিকে জাত-বামপন্থীদেরকেই নেতা বানিয়ে নিয়েছি, এ বাস্তবতা স্বীকার করি অথবা না করি। তারা ছড়িয়ে পড়েছে প্রয়োজনীয় প্রতিটি সেক্টরে। এমনকি তারা দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতা-মন্ত্রী-পলিসি মেকারও হয়ে গিয়েছে।

বামপন্থীদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তারা উদ্দেশ্যসাধনে যে কোন উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধা করেনা। সারা পৃথিবীতে এটা দেখা গেছে। রাশিয়া চীন দক্ষিণ এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, সব জায়গাতেই। বাংলাদেশের বামরা তাদের মূল যে চিন্তা, সম্পদের বন্টন বিষয়ে তাদের যে আশা, সে আশা বাস্তব করার জন্য যে কোন দল করতে পারে। র বা সিআইএ, যে কোন অর্গানাইজেশনের হয়ে কাজ করতে পারে। ঐসব দিকে তাদের নৈতিক কোন সমস্যা নাই।

বর্তমানে বাংলাদেশ ধ্বংস করছে বামেরা। হাসিনাকে ইনষ্ট্রাকশন দেয় ইনু। দেশ ধ্বংসের প্রতিবাদও করে বামেরা। র এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাহসী কথা বলেছেন ফরহাদ মজহার।

বামদের এ সফলতার কারণ হিসেবে তাদের যোগ্যতার পাশাপাশি অন্যদের অযোগ্যতাও কম না। এদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোন আদর্শিক বা স্থায়ী কোন নৈতিক অবস্থান নেই। একমাত্র জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে ভিত্তি করে ডানপন্থী একটা বাংলাদেশী আইডিওলজি দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তার মৃত্যুতে ঐটা ভেস্তে যায়। জামায়াতের নিজস্ব আদর্শ থাকলেও তারা অন্ধ। নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করতেই পারে, কিন্তু সে প্রমাণিত ভুলকে আজীবন অস্বীকার করে যাওয়ার মতো অন্ধত্ব দুনিয়াতে বিরল। পঙ্গু একজন মানুষের হাতে ডুকাটি সুপার-বাইক তুলে দেওয়ার একটা ঐতিহাসিক উদাহরণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের দিক থেকে সবচেয়ে দেউলিয়া দল হলো আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর থেকে লুটপাট দুর্নীতি আর ধর্ষণ ছাড়া আওয়ামী লীগের অন্য কোন আদর্শ নেই। বামরা ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে গিয়েছে আওয়ামী লীগকে অবলম্বন করেই বেশি। আর বাকীরা আওয়ামী বিরোধীতা করেই অবস্থান তৈরী করেছে। আমি খাড়ায়া যামু তুমি বসায়া দিবা’র ক্লাসিক নমুনা।

সুতরাং জ্ঞান-বুদ্ধির দিক থেকে এগিয়ে থাকা এই বামপন্থীরা, এককালের আদর্শবাদী যুবকের দল আর আজকের সমাজে পথিকৃৎ, এরা বাংলাদেশকে যেদিকে নিয়ে যাবে, আগামী দশ বিশ বছর পর বাংলাদেশ ঐ জায়গাতেই গিয়ে দাঁড়াবে। চল্লিশ পঞ্চাশ বছরের সাধনার ফল তারা এক দেড়শ বছর ভোগ করলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই স্বপ্নপূরণে সহায়তার প্রতিদানও ভারত নেবে।

তবে ভারতের মতো বড় একটা দেশের নাগরিক হওয়া নিয়ে সিলেট খুলনার মানুষদের খুব একটা আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। ওখানে কিছু মারামারি হলেও হতে পারে। কিন্তু আলটিমেটলি হাতে পায়ে ধরলেও ভারত সরাসরি বাংলাদেশের বোঝা নিজের কাঁধে কখনো তুলে নেবে না। আমরা ওখানে জমি রক্ষায় লাফাতে থাকবো। ফাকতালে হয়তো পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীন একটা দেশ জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। অথবা বৈদ্যবাবুদের স্বপ্নের বঙ্গভূমি কায়েম হবে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের বিশ-একুশটা জেলা নিয়ে। আর বাংলাদেশের হতভাগা নির্বোধ জনগণ ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বেকুবের মতো হা করে বসে থাকবে। এর কোন বিকল্প সম্ভবত এই জাতির কপালে নাই। সার্ভাইভাল ফর দ্য ফিটেষ্ট।

আবারও বলি, এরজন্য দায়ী ডানদের অযোগ্যতা। মেধাহীনতা। ব্যাক্তিগত ক্ষমতার লালসা। আদর্শহীনতা। আর কোথাও আদর্শ থাকলেও বন্ধ্যাত্ব এবং অন্ধত্ব।

সুতরাং যখন বারবার দেখি ডানপন্থী মানুষ নামের পোকামাকড়ের দল আকাশের দিকে তাকিয়ে এই জাতির বিবেকদের মুখ থেকে নেমে আসা দিকনির্দেশনায় আপ্লুত হচ্ছে, আসিফ নজরুল শফিক রেহমান নুরুল কবির মাহমুদুর মান্নাদের হাতে ভিটে-বাড়ির দলিলপত্র, বিশ্বাসের ঘরের চাবি তুলে দিচ্ছে, তখন মাকসুদের মতো করে গাইতে ইচ্ছা করে- কোন পথে এই বলদের দল চলছে/ হায় পরোয়ারদিগার!!