‘সেকুলার রাষ্ট্রে’র বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক আবাসিক হল কেন?

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ধর্মগুরু তৈরির প্রকল্প নিয়ে শুরু হলেও ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের রেনেসাঁসের  সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সাধারণ্যের, বিশেষত উচ্চবিত্তের কাতারে নামতে থাকে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার সূচিকাগার ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আদিতে ধর্মযাজকদের শিক্ষার কলেজ ছিল। ব্রিটিশেরও পূর্বে  ‘হোলি রোমান সাম্রাজ্যে’ ১০৮৮ সালে যাজক বানানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়। তার পূর্বে আফ্রিকার মিশরে ৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ইসলামী ধর্মচর্চার কেন্দ্র। আর  প্রাচীণ ভারতের নালন্দায় খ্রিস্টপূর্ব ১০ শতকে (সম্ভবত) প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশিলাও ছিল বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষুদের জ্ঞানচর্চার বিহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সাধারণ্যের কাতারে নামার সাথে সাথে এবং ‘এনলাইটেনমেন্টে’র প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শনও বিবর্তিত হয়ে এক বিশ্ববোধের চেতনায় উন্নীত হয়। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা তাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার এক অনিবার্য অংশ।

HJH1

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেভাবে বড় গলায় নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বাতিঘর হিসেবে দাবী করে থাকেন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূতিকাগার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিহিত করে থাকেন সেখানে ভাবতে অবাক লাগে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক (অপ)সংস্কৃতির চর্চা হয়ে থাকে। পৃথিবীর মূলধারার কোন বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বাংলাদেশের গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মুসলিম বনাম অন্যান্য সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভেদসহ আলাদা আবাসিক হলের কোন নজির নেই। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশের মত অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে এ সাম্প্রদায়িকতার চর্চা হতে পারে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠণের ব্যার্থতার দায় এ বিশ্ববিদ্যালয় এড়াতে পারে কিনা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের দায় নিয়ে। যেহেতু লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করে ফেলেছিল এবং এই ভাগ করার বিরুদ্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক জমিদার ও প্রভাবশালী হিন্দুরা তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯১১ সালে  এটিকে ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল তাই ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কে সন্তুষ্ট করতেই ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এক বাংলায় দুইটি আর্থ-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অখন্ড বাংলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাটিও খুব সহজ ছিল না। আমাদের কবিগুরুও সে দেয়ালের পিলার ছিলেন বলে অনেক কুৎসা আছে। সে যাই হোক, অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন যাত্রা শুরু করল তখন এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উত্থান ঠেকানো এড়ানো না গেলেও তখনকার সামাজিক জাত-বর্ণ প্রথার প্রেক্ষাপটে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে এর যাত্রা শুরু করতে পারেনি। এর অন্যতম নিদর্শন মুসলিম এবং অমুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আলাদা আবাসিক হলের প্রবর্তন। ব্রিটিশ উপনিবেশের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’নীতির আলোকে সাম্রাজ্য পরিচালনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন তৈরির এ দ্বৈতনীতিও স্বাভাবিকভাবেই উপনিবেশের স্বার্থেই দরকার ছিল!

আর পরবর্তীতে পাকিস্তান যেহেতু একটি ধর্মরাষ্ট্ররূপে কিংবা মুসলমানদের রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি করে রাখা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্মরাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সে বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে এই ধরণের জঘন্য সাম্প্রদায়িক একটা ব্যবস্থা কীভাবে প্রশ্নাতীতভাবে টিকে আছে সেটা এক মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই বলে থাকেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং এর সফল বাস্তবায়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই নেতৃত্ব দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্তও বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। এটা সত্য যে রাজনৈতিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারের কেন্দ্রেই অবস্থান করছে। কিন্তু এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক গড়ণ কীভাবে হচ্ছে তার খবর কি সচরাচর রাখা হয়? শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যখন তার শিক্ষার্থীদের পৃথক পৃথক গোয়ালঘরে ঢুকানো হয় তখন কি তা বিশ্ববিদ্যালয়টির মৌলিক আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে বসে না? শুধু কি তাই, মোটা দাগে এটি কি রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষকতাই করছে না?

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬ টি। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে রাখা হয়। এমনকি আমরা যদি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই সেখানেও দেখতে পাব বিশ্ববিদ্যালয়টির নামের সাথেই একটা সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের সম্পৃক্ততা থাকার পরেও সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা আবাসনের কোন ব্যবস্থা নেই।

পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও ধর্মীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা বাসস্থানের কোন ব্যবস্থা নেই। ইন্ডিয়ার যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথেই ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়া আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া, বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

উত্তর প্রদেশে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৫ সালে উত্তর ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমেদের হাত ধরে। মজার ব্যাপার হল বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন একজন হিন্দু রাজা রাজা জয় কিসান দাস।  বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে অধ্যায়ন করছেন প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। ১৯ টি আবাসিক হলের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে হিন্দু-মুসলিম সব বিখ্যাত ব্যক্তির নামেই আবাসিক হল থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন হলকে চিহ্নিত করা নেই। দিল্লীর জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া এখন ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করছে। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আলি এবং মাওলানা শওকত আলির নেতৃত্বে  মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ভাইস চ্যাঞ্চেলর ছিলেন ড.জাকির হোসেন। ৫০ শতাংশ আসন মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন ১৭ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী।  বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন আবাসন বৈষম্য নেই। বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এশিয়ার  অন্যতম বৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৬ সালে। দুইটি ক্যাম্পাসে বিস্তৃত বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়তন ১৬ বর্গকিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০ হাজার শিক্ষার্থী ছড়িয়ে আছে এর ৬০ টি আবাসিক হোস্টেলে। নামে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসনে ধর্মীয় পরিচয়ের কোন ভূমিকাই নেই।

ইন্ডিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা আবাসনের নজির নেই। আর অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তো এটা কল্পনারও বাইরে।

যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি মুখ্য এবং স্পর্শকাতরই হয়ে থাকে তাহলে লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত করাও সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক। সে প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্রে ছেলেদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও মেয়েদের জন্য আলাদা কোন হলের ব্যবস্থা নেই। এটি যেন এমন যে, ছেলেদের জাত যাওয়ার ভয় থাকলেও মেয়েদের জাত-পাতের কোন বালাই নেই! এবং একটি রাষ্ট্রের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় যখন এভাবে লিংগীয় বৈষম্যমূলক এবং পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসারে ভূমিকা রাখে তখন রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন দাবী করে।

রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে পূণর্ভাবনা কেন দরকার তার জন্য সামাজিকীকরণের বিষয়টার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। যেমন, ধর্মবিশ্বাস একটি মানসিক প্রক্রিয়া। ধর্মবিশ্বাসের রূপ যখন মানুষের আচরণে ফুটে উঠে তখনই আমরা কেবল জানতে পারি সে কোন ধর্মজাত। একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের বলয়ে যে মানসিকতা গড়ে উঠে সে মানসিকতার কাছে যখনই অন্য ধর্ম-বিশ্বাস এবং জীবনাচরণ প্রকাশ পায় তখনই তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় এবং সে তখন সে বিশ্বাসের প্রতি এক ধরণের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। এই প্রতিক্রিয়া যখন এক ধর্মের অথবা এক সম্প্রদায়ের সাথে অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে হয় তখন আমরা বলি এটা সাম্প্রদায়িক আচরণ। যেহেতু মানুষ গোত্রপ্রথা থেকে বের হয়ে এসে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে শুরু করেছে তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায় পরিচয়ের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতেই দরকার একটি অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। তা না হলে সমাজে সবল দূর্বলের উপর, সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর উপর নিপীড়ণ চালাবে। তাই একটি স্থীতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্যই দরকার অসাম্প্রদায়িক নাগরিক এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনা।

এই অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনার জন্য প্রথমেই যেটি দরকার সেটি হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে স্বাভাবিক সহাবস্থানের মানসিকতা তৈরি। এই মানসিকতা তৈরি হয় সমাজের বিভিন্নক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সক্রিয়ভাবে নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। আর এই মিথস্ক্রিয়া বাড়লে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এবং জীবনবোধের কাছাকাছি আসতে পারে। এই কাছাকাছি আসা থেকে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। আর এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যে সমাজে বিদ্যমান থাকে সে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা দানা বাঁধতে পারে না। যেকোন সমাজের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাই দায়িত্ব হচ্ছে এমন কাঠামো তৈরি করা যেটি নাগরিকদের মধ্যে এই উদার মানসিকতার সৃষ্টি করবে।

আর এই মিথস্ক্রিয়া যেখানে থাকে না সেখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়কে এলিয়েন ভাবে এবং নিজেদের অজ্ঞতা থেকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতি থেকে এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতা তৈরি হয় যা থেকে বিদ্বেষ বাড়ে যেটি অনিবার্যভাবেই সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড়ঘর ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’দের আলাদা হলের বরাদ্দ নিয়ে ভাবনাগুলোকে মোটা দাগে চারটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিমদের জন্য রয়েছে এক প্রকার হল এবং মুসলিম ভিন্ন অন্য সব ধর্মবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে একটি হল। এখানে মুসলিম বনাম অন্যান্য(সংখ্যালঘু) ধর্মের আড়ালে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ বিভিন্ন ধর্মের স্বতন্ত্র্যতা রক্ষা করা হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভিন্নমতের(ভিন্ন ধর্ম) নূন্যতম অস্তিত্ব না থাকায় তাদের মধ্যে সহাবস্থানের একটি অন্তর্নিহিত চেতনা তৈরি হয় না যেটি তাঁর গণতান্ত্রিক মানসিকতার গঠনকে বাধাগ্রস্ত করে।

তৃতিয়তঃ কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটা রটনা উঠল যে একটি জঙ্গী সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংখ্যালঘু হল’ আক্রমণ করবে। তখন হলটির শিক্ষার্থীগণ নিজেরা এটাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাতভর হলটি পাহারা দেয়। তার মানে হলটির ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়টিই তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি যেটি ১৯৭১ সালেও এই পরিচয়ের কারণেই মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল।

চতুর্থতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি এই হলটি চালিয়ে রাখার সপক্ষে  পর্যাপ্ত যুক্তি থেকেও থাকে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়ার দায়ভার নেবে কে? বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মত এখানেও পুরোপুরি লিঙ্গবৈষম্যকেই স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে।

এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৪৩ বছর বয়স হওয়া স্বত্বেও এই নীতিগত অসামঞ্জস্যটি নিয়ে কেউ শক্তভাবে কথা বলেননি কিংবা বলার সাহস পাননি! এবং এই দুই কারণের কোনটাই কম বিপদজনক নয়। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে থাকা সাম্প্রদায়িকতার এ মালগাড়ীতেই সওয়ার হয়েছে রাষ্ট্র যেটির গতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে অন্তর্দন্দ্ব। রাষ্ট্রটির কি তার এঞ্জিন নিয়ে ভাবতে শুরু করা উচিত নয়?

Quasicrystals, মুসলিম স্থাপত্য, এবং একটি নোবেল প্রাইজ

২০০৫ সালে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট পিটার ল্যু (Peter J. Lu) উজবেকিস্তান ভ্রমণে গিয়ে বুখারায় পঞ্চদশ শতকে নির্মিত একটি মাদ্রাসার সুদৃশ্য মোজাইকে Quasicrystal নামক জটিল জ্যামিতিক প্যাটার্নের সাদৃশ্য দেখতে পান। ১৯৭০ এর দশকে আধুনিক গণিতবিদরা প্রথম এই জটিল প্যাটার্নের ধারণা দেন। পরবর্তীতে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ Paul J. Steinhardt সহ Science জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে Lu দেখান যে পাশ্চাত্যে Quasicrystal এর সঠিক গাণিতিক ধারণা আবিষ্কারের অন্তত ৫০০ বছর আগে দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে মুসলিম স্থাপত্য শিল্পে Quasicrystal প্যাটার্নের প্রায় নিখুঁত ব্যবহার ঘটে।

Quasicrystal হচ্ছে এমন একটি প্যাটার্ন যা একটি স্থানকে ভরাট করে কিন্তু True crystal এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী translational প্রতিসাম্য এতে থাকে না। দ্বিমাত্রিক ধারণায় এর অর্থ হল এই প্যাটার্নটির একটি exact copy slide করা হলে তা কখনোই exact match তৈরি করবে না, তবে প্যাটার্নটি rotate করা হলে তা exact match তৈরি করতে পারে। ১৯৭০ এর দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক Sir Roger Penrose তাঁর বিখ্যাত Penrose Tiles এর মাধ্যমে এর প্রথম গাণিতিক ব্যাখ্যা দেন। এরও প্রায় এক দশক পর ১৯৮৪ সনে ইসরায়েলের Technion University এর প্রফেসর Dan Schechtman একটি সংকর ধাতুর পরমাণুর অবস্থানে quasicrystalline কাঠামো আবিষ্কার করেন, যে কাজটির জন্য (‘For the Discovery of Quasicrystals’) ২০১১ সালে তিনি কেমিস্ট্রিতে নোবেল প্রাইজ পান। এরপর থেকে প্রকৃতিতে বিভিন্ন রকমের অসংখ্য quasicrystals আবিষ্কৃত হয়েছে।

Darb-i Imam Mosque Portal

২০০৭ সালে মার্কিন পদার্থবিদ Paul J. Steinhardt এবং Peter J. Lu তাঁদের গবেষণাপত্রে ১৪৫৩ সালে ইরানের ইস্পাহানে নির্মিত Darb-i Imam স্থাপনাটিতে Penrose টাইলস দ্বারা আচ্ছাদনের একটি ‘প্রায় নিখুঁত’ ব্যবহার তুলে ধরেন। এর আগে প্রচলিত ধারণা ছিল, মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যবিদরা সরাসরি straightedge রুলার এবং কম্পাসের সাহায্যে একটি zigzag লাইনবিশিষ্ট নেটওয়ার্ক অঙ্কনের মাধ্যমে মুসলিম স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত জ্যামিতিক তারকা ও বহুভুজ সম্বলিত Girih (Persian: گره‎, ‘knot’) প্যাটার্ন তৈরি করতেন, যে পদ্ধতি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর। এ ধারণার বিপরীতে Lu এবং Steinhardt দেখান যে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম স্থাপত্যশিল্পে একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত পদ্ধতির ব্যুৎপত্তি ঘটে যার দ্বারা কতিপয় সরল-রেখাঙ্কিত সমবাহুবিশিষ্ট বহুভুজ টাইলস বা girih tiles এর tessallation (এক বা একাধিক জ্যামিতিক আকারের টাইলস দ্বারা কোনও ফাঁক ও ওভারল্যাপ ছাড়া একটি সমতলকে আচ্ছাদন করার পদ্ধতি) এর মাধ্যমে জটিল girih প্যাটার্ন তৈরির পন্থা আবিষ্কৃত হয়েছিল। পাশ্চাত্যে এর গাণিতিক ধারণা আবিষ্কারের অন্তত ৫০০ বছর আগে পঞ্চদশ শতকের ভেতরে tessallation এর সাথে self-similar transformations এর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে প্রায় নিখুঁত quasi-crystalline Penrose প্যাটার্ন তৈরির পন্থা উদ্ভাবিত হয়। Darb-i-Imam Shrine এ ব্যবহৃত ৩৭০০ টাইলের মধ্যে শুধুমাত্র ১১টি টাইলে্র অভিযোজনে Lu এবং Steinhardt সূক্ষ্ম ত্রুটি দেখতে পান, কেবল ওরিয়েন্টেশনের সামান্য পরিবর্তনেই যা নিখুঁত quasi-crystalline Penrose প্যাটার্ন তৈরি করে, যা কাকতালীয় হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। নির্মানকালীন সময়ে অথবা পরবর্তীকালে মেরামতের সময় এই সামান্য সংখ্যক ভুল সংযোজিত হয় বলে Lu ধারণা করেন।

Gunbad-i Kabud

২০০৯ সালে physics world এ প্রকাশিত খবরে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের Texas Tech University এর স্থাপত্য বিশারদ Rima Ajlouni মুসলিম স্থাপত্যে quasicrystal প্যাটার্নের অন্ততঃ তিনটি নিখুঁত এবং নির্ভুল ব্যবহার খুঁজে পেয়েছেন। প্রথমটি সেলজুক স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত একটি প্যাটার্ন, ইস্পাহানের Darb-i-Imam shrine এ যার সুনির্দিষ্ট ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় প্যাটার্নটি মরক্কোর ফেজ(Fez) নগরীতে ১৩২৩ সালে নির্মিত Madrasa al-‘Attarin এর ভেতরে দেয়ালে, এবং তৃতীয় নিখুঁত প্যাটার্নটি ১১৯৭ সালে ইরানের Maragha তে নির্মিত Gunbad-I Kabud টাওয়ারের বাইরের দেয়ালে খুঁজে পাওয়া যায়।


হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট মিউজিয়ামের ডিরেক্টর Tom Lentz এর ভাষ্যে,”কলা বিশারদরা বহু আগে থেকেই মুসলিম স্থাপত্যে জ্যামিতিক প্যাটার্নের পেছনে গণিতের জটিল ব্যবহার রয়েছে বলে ধারণা পোষণ করেছেন, কিন্তু এর চুলচেরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এর আগে কখনও হয়নি।” সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে। মুসলিম স্থাপত্যে জটিল জ্যামিতিক নকশা ও প্যাটার্নের কম্পিউটার মডেলিং এর উপরেও কাজ করছেন অনেকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখুন –

1. Ancient Islamic architects created perfect quasicrystals – physicsworld.com
2. The Tiles of Infinity
3. Lu, Peter J.; Steinhardt, Paul J. (2007). Decagonal and Quasi-crystalline Tilings in Medieval Islamic Architecture. Science 315 (5815)
4. Quasicrystals in Medieval Islamic Architecture, Harvard Physics Colloquium Lecture

http://spacetimefactorbangla.wordpress.com/

Ssh! No Islam Please, We’re Bengali

This article investigates the seemingly Islamophobic editorial policy of the Dhaka Tribune, and relates it to the deeper question of why Bangladesh’s current ruling elite have such an aversion to the Islam and Muslim culture of their subjugated population. It is high time that this state of affairs was transformed.

man reading newspaper in bangladesh.jpg

‘The Matrix’ that is Bangladesh: Which pill will you take, the red pill or the blue pill, reality or rhetoric?

Two Worlds Apart

In late February 2014 two meetings were held on the rights of ‘indigenous’ people. One was held in Dhaka at the Cirdap auditorium, the other in London at King’s College. Both were talking about the rights of indigenous people, the threats they faced and depictions of Islam.

The Bangladesh conference talked in alarmist tones of the epidemic of indigenous children being converted shock horror, to Islam in Muslim majority Bangladesh. There was no mention of Christian missionary activity, but only Muslims propagating their faith. In the imaginary world of the organisers, Islam is not a universal and dynamic tradition, but a static religion established 1400 years ago, it became the second largest religious tradition, purely on the reproductive abilities of its original adherents.

This view runs against the everyday reality experienced by Muslims in their lives and throughout their histories. From the earliest community, lead by the Prophet (pbuh), down to the Sufi giants of the Indian subcontinent, calling people to God has been one of the essential foundations of the faith and community. Frustration at the double standards applied towards Muslim vis a vis Christian missionary work in the Chittagong Hill Tracts region was expressed in Hefazat e Islam’s tenth point in their first set of demands last year.

Stop anti-Islamic activities in Chittagong propagated by several NGOs and Christian missionaries under the guise of religious conversion.

The Dhaka gathering stood in stark contrast in attitude to the one held in London by Reprieve, a human rights organisation that works for fair trials and justice for the most vulnerable and powerless against the most powerful states. Reprieve’s intervention aimed to highlight the plight of large communities in the tribal areas of Pakistan who live under constant fear of extrajudicial killing from drone attacks by the United States with the complicity of sections of the Pakistani state and wider society. Theirs is risky work, their key speaker, journalist Kareem Khan, whose son and father had been extrajudicially killed in a drone strike in December 2009, had been kidnapped then released in Pakistan only days earlier. The 2012 report Living Under Drones is well worth digesting for more background. The key difference here was that neither the participants nor their western liberal audience viewed Islam as an anathema, but instead as a source of strength in the struggle for universal humanity and rule of law. From Kareem Saheb’s opening prayer with the prayer of the Prophet Moses before facing his Pharaonic stepfather, to the supplications of solidarity he extended to the victims of state crimes in Dhaka last May. Kareem Saheb, took the same message of shared humanity,  universal rights and pride in Islam to the European Parliament. The European Parliament showed their approval of the message by passing a resolution demanded European Union Member States not to “perpetrate unlawful targeted killings or facilitate such killings by other states” and called on them to “oppose and ban practices of extra judicial targeted killings.

Comparing both conferences, what I found incredulous were not the views expressed in Dhaka, Muktasree Chakma Sathi is entitled to her opinions, misunderstandings and key performance indicators. There is a  need for more genuine, faithful interfaith space in Bangladesh, and in the absence of justice for any majority, minorities are vulnerable to co-option, division and rule. I was dumbfounded at how these views could be produced and published in the Dhaka Tribune without any challenge or right to reply.

‘Crusading’ Churnalism from Dhaka to London

crusading knight.jpg

‘Crusading’ journalism at the Dhaka Tribune proving indeed that ‘the pen is  mightier than the sword’.

This is not the first time the newspaper has run a negative, irrational news story on Islam and Muslims. Over its short lifespan of a year, there is a recurring pattern of negative and irrational attitudes toward the belief of the Muslim community in Bangladesh. From cursory, non-scientific search of the stories run by the Dhaka Tribune using the adjective Islamic, between a third to half of the stories are related to violence, militancy and terrorism. This gives any reader, prone to believing what they read in print, the impression that Islam is a regressive and violent religion, with a large section of its adherents engaged in militant terrorist activities.

It is worth scratching the skin of a particularly smug example or the irrational Muslim meme. On Language Day the Dhaka Tribune published an article with the title ‘New Fatwa deems Mars Trips Haram’. It was a story that clerics in the UAE had given a legal opinion that it is prohibited for a Muslim to fly to Mars, deliberately distorting the facts by a fatwa to the Mars One mission. The actual relevance of the story to Bangladesh I am yet to figure out (answers on a postcard please), but the psychic intention is clear. The Dhaka Tribune claimed that following the fatwa, ‘Muslims banking on a holiday to Mars will have to cancel their plans on space travel.’

This particular piece came just days after the right wing anti-immigrant Daily Mail published the story in the UK. The Daily Mail is currently being investigated by the UK Press Complaints Commission after it published a racist and Islamophobic op-ed piece ‘satirising’ a private community visit to a children’s theme park. The piece, which wrote of busses, with Muslim children on, blowing themselves up, was met with right wing revelry and public revulsion. More than 25 national Muslim groups wrote a letter of complaint to the editor  with regards to the paper’s piece on Islam and Muslims, arguing that the piece has increased the risk of attack on Muslims from far right groups.

The story, printed by both the neocon Daily Mail and ‘progressive’ Dhaka Tribune for similar effect is patently untrue. A rebuttal was issued from the UAE, explaining that the answer was to a kamikaze-like, one-way trip to Mars. Given the Muslim moral abhorrence of suicide, the answer was a prohibition rather than an affirmation. The entire episode is lampooned elsewhere on the internet.

It begs the question of why the Dhaka Tribune would publish a story so clearly negative about Muslims, of no relevance to Bangladesh, echoing a right wing anti immigrant newspaper, and which was based on a cruel twisted half truth. To put the impression this gives of Dhaka Tribune’s professionalism, integrity and agenda even more clearly, the Daily Mail piece in the UK was actually much better.  They at least buried the correct context of the story in the text beneath their sensationalist Muslim-negative headline, whereas the Dhaka tribune further spun the story out of context with its own Fatwa saying it meant that flying to Mars was morally reprehensible (haraam).

The American Muslim cleric Musa Furber, argued the episode demonstrated a deliberate media distortion of facts. He stated, the type of voyage Mars One plans is not analogous to the type of voyage presented in the article. Mars One aims to establish a permanent and sustainable human colony on Mars, as is apparent from its mission goals, roadmap, and the risks and challenges involved. It is obvious that this isn’t the type of voyage addressed in article, nor is it the type deemed impermissible in UAE fatwa authorities clarification.

The Ignorance Multiplier Effect and The War on Terror Economy

Needless to say, the story underscores the ignorance, and ignorance multiplier effect of the Dhaka Tribune on Islam, as it was misleading its audience that a fatwa issued in the UAE was somehow a binding space-exploration legislation upon all Muslims over all time and space, like the equivalent of a Catholic papal bull. The exact opposite is the truth and as this is a recurring error, briefly outlined next.

A fatwa is nothing more than a personal legal opinion, optional for everyone else to follow and morally binding only upon the person who issues it. An analogy might be made to the issue of legal opinions from courts in common-law systems. Fatwās generally contain the details of the scholar’s reasoning, typically in response to a particular case, and are considered a binding precedent by those Muslims who have morally bound themselves to that scholar, including future muftis. Mere rulings can be compared to memorandum opinions. The primary difference between common-law opinions and fatwās however, is that fatwās are not universally binding. The Islamic legal traditions are not universally consistent nor are they hierarchically structured. Contrary to what some would have us know, fatwās do not carry the sort of weight that secular common-law opinions do.

A well-trodden social response to the editorial policy of the Dhaka Tribune, would be to judge that its editor, staff and proprietors are anti-Muslim. A similar accusation was raised by a staff member at the paper, arguing that the paper was promoting intellectual attacks on Islam.   Proponents of such a view might point to editor Zafar Sobhan’s facebook page where he suggests Salman Rushdie’s ‘Satanic Verses’, a book banned in Bangladesh, to be one of his favourite.

zs.jpg

Zafar Sobhan’s facebook page is a regular portal for the Dhaka flatterati to pay tribute.

Such arguments are too blunt for the challenge at hand, but have indicative value. They are dismissed, by the religiously indifferent of course, with statements like ‘but there is a prayer room in the Gencom building’, or some derivation of ‘brown people can’t be racist’, and ‘how can he have an irrational antipathy towards Islam when he was born Muslim?’ Vocal objection to this publication’s apparent approach to perhaps the majority of its reader’s, if not their parent’s din might even be met with the well worn liberal-sounding excuse of “Well if you don’t like it, nobody is asking you to read it.”

Yet it is very much in the public interest to dwell on the matter for longer.  As the War on Terror economy booms in Bangladesh, it becomes steadily more deadly and systematic as corporate media and corrupt scholarship seek more control over our intellects, bodies and relations with each other. We must penetrate deeper than observation and frustration at systematic bias, to examine the broken record that plays us for fools.

 Introducing the Three Bankruptcies of Islamophobia in Bangladesh

The irrational antipathy the paper has towards Islam and Muslims in Bangladesh, emanates from a three pronged bankruptcy: intellectual, economic and moral, which have their origins and development deep in history. It creates an anaesthetising alienation and a homebrew Southern Comfort for the powerful and the privileged.

It is a crying shame that the self proclaimed liberal elites of Bangladesh do not deem it fit to extend such values of tolerance and compassion to their less advantaged neighbours. Instead of honouring their expensive educations by partnering with fellow citizens in tough predicaments, they continue to lap up the global war on terror narrative to preserve the status quo, keeping their neighbours, and themselves, in their place.

This is in sharp contrast to the acts and works of Professor Akbar S Ahmed, who in his latest volume The Thistle and the Drone, advocates the rights of ordinary citizens on the periphery of modern states who have found themselves victimised like the Pakistani tribesman by drones, the Age of Globalisation’s most terrifying kill technology.

The Islamophobia manifesting through the Dhaka Tribune is more insidious than Bollywood, and its buzz reverberates amongst many within the current power elite and ‘polite’ circles that Mr Sobhan services. It is the result of internalisation of a racist 19th century Britisher argument which at it core says that one cannot be both a Liberal and a practicing Muslim. It is as if they are two static, mutually exclusive categories. According to such a warped development indicator, one measures progress by the distance one keeps from living Muslim traditions. It is an outdated, bankrupt ‘essentialist’ view of Islam, ignoring its diversity and dynamics, gaining inspiration from the dictum of the imperialist British poet Rudyard Kipling: ‘OH, East is East, and West is West, and never the twain shall meet…’

J S Mill.jpg

Do as I say not as I do: J S Mill was one of the founders of modern liberalism, who also worked in the British Imperial Indian Civil Service

This argument has its roots in the works of J S Mill, who made it clear in On Liberty and Representative Government that his views there could not be applied to India, because Indians were civilizationally, if not racially inferior. This powerful view continues, tacitly and explicitly, despite vivid contradictory evidence, from Reprieve’s work with Pakistanis against drones, to Hasan Suroor’s recent study with Indian Muslims.  It is an opinion that sheds more light on the insecurities of its advocates than the inadequacies of non-European civilisations.

Revis(it)ing Two Economies and The Song of Bangladesh

Indian classical festival.jpg

Indian fiddling while Dhaka burns: Bengal Classical Music Festival (BCMF) held at the Army Stadium from November 28 to December 1 2013 – during which time when opposition party members were being rounded up and killed by security services for their agitation for free and fair elections.

The Dhaka Tribune, with its combination of op-ed declamation, hypnotic kitsch history, mass choreography of facts and dramatic partisan lighting finds its model in a party street rally rather than the liberal newspaper it purports to be. A construction of a grandiose theatre rather than debate, its readership are offered images of themselves as the editorials want, with little correspondence with reality.

It would appear that Mr Sobhan is trying  to recreate a spectacle of a Bangladesh in his reader’s mind that shall forever be Calcutta, and a second-rate one at that, with a colonially capital driven and Muslim-lite metropolis extracting resources and cheap labour for global markets from a Muslim rural hinterland. A century on and  The Song Remains the Same.

In this two (cultural) economy theory, Eastern Bengal (Bangladesh) has a dependent and binary relationship with its Western half. According to the theory, the ruling elites of Bangladesh, in return for economic concessions and precious foreign exchange,  purchase kitsch manufactured cultural products, political attitudes and certainties from a Delhi directed West Bengal. This attitude is exemplified in the newspaper’s favourable attitude towards the Indian government and turning a blind eye to the increasing Indian interference in domestic politics and domination over the economy.

The paper’s metropolitan myopia barely picks up the looming environmental crisis in rural Bangladesh, amongst other factors caused by the unilateral construction of upstream dams by the Indian government. A recent classical music festival is given more coverage than barrages and rivers in a country where millions are displaced environmental refugees. Multiple environmental crises are devastating certain parts of the rural economy and society, causing rural depopulation and driving desperate throngs into the crowded slums of Dhaka, where many are compelled to accept dangerous working conditions for meager wages. It is a labour market where wages are artificially kept low by the ruthless clampdown on dissent, as witnessed by the brutal torture and murder of labour activist Aminul Islam by individuals linked to the security forces. The Rana Plaza industrial disaster and its production are not the exception to the rule, but a tip of the iceberg of the two economies of Bangladesh.

It is a familiar image, but with different technology, of the absentee landlord, his rent collector and the tenant farmer, a return to the supposed ‘cultural’ heydays of British Raj following the 1793 Permanent Settlement, where centuries-old flexible land tenures were unilaterally appropriated then handed over by the British to a select, pliant moneyed class. This fundamental, multi-generational mutilation of social and ecological relations fueled the much celebrated 19th century Bengali renaissance that rested on the back of dispossession and pauperisation in the countryside.

A reminder of the true human cost of Bengal under the British is recorded in Noam Chomsky’s, World Orders Old and New:

“A British enquiry commission in 1832 described the effect of sponsored government created through Permanent Settlement Act of British Parliament. The commission found “the settlement fashioned with great care and deliberation has to our painful knowledge subjected almost the whole of the lower classes to most grievous oppression.” In the words of Director of East India Company, “The misery hardy finds a parallel in the history of commerce. The bones of cotton weavers are bleaching the plains of India” Nevertheless Governor-General of India, Mr. Bentinck, was unmoved and observed, ” The permanent settlement, … has this great advantage, at least , of having created vast body of rich landed proprietors deeply interested in the continuance of the British Dominion and having complete command over mass of the people.”

Let them eat culture: (l) An illustration of famine victims of the Permanent Settlement Acts, and (r ) the 19th century Bengali Renaissance was result of a joint venture interaction between British Administrators and their Bengali Zamindari (feudal) colleagues.

Let them eat culture: (l) An illustration of famine victims of the Permanent Settlement Acts, and (r ) the 19th century Bengali Renaissance was result of a joint venture interaction between British Administrators and their Bengali Zamindari (feudal) colleagues.

The fear, and reality, of economic bankruptcy is an under-explored driver of human behaviour. Politically produced famines have claimed the lives and hopes of millions of our forefathers and mothers  through 1770, 1943 and most recently 1974.  In the shadow of such absence, this verse of Joan Baez’s haunting lament over our most recent military war is given new layers of meaning.

The story of Bangladesh

Is an ancient one again made fresh

By blind men who carry out commands

Which flow out of the laws upon which nations stand

Which is to sacrifice a people for a land

Morality and The ‘New’ Anandabazar School of Journalism

Intellectual, economic and moral factors intermingle in the messiness of real life, but the moral sphere is our next zone of interest. For those who can remember as far back as 2007, Mr Sobhan once reimagined the theatre of Bangladesh using the Christian Biblical story of Original Sin. Exhibiting symptoms of the Clark Kent ‘Ubermensch’ syndrome, Sobhan urged his countrymen to, ‘cleanse the poison from our bloodstream’. Since taking power in 2008 the Awami League government has obliged, we continue to see a rising number of political disappearances and deaths, not to mention mass incarceration and criminalisation of opposition activists.

This concept of Original Sin is opposed by the Qur’anic narrative and Muslim world view of Adam (ah) and his progeny – us – of original innocence, forgiveness, spiritual equality and personal responsibility. Original Sin is a fatalistic doctrine of Western Christianity, which is an anathema to and challenged by the egalitarian spirit of Islam.

A more apt Qur’anic and Judaic narrative that speaks to the reality of Bangladesh would be that of Cain and Abel.  Cain, who killed his brother Abel the herdsman, and built a city, prefigured the modern call one hears from the polite circles of Dhaka, of the necessary cost of ‘progress’. The story gives us a framework to  understand how ‘civilised’ people like Zafar Sobhan can dehumanise and applaud brutality against their fellow citizens, as we saw from the Dhaka Tribune’s production and coverup of the 6th of May Massacre.

zsliveblog.jpg

In an interview for the University of Liberal Arts Bangladesh, Dhaka Tribune Editor Zafar Sobhan extols the virtues of media ethics and modern technology, stumbling ( choking? ) over a reference to his paper’s live blogging of  “May 5th, 6th… the Hefazot in Dhaka”.

This attitude reenacts the tragic history of the bloody fields of Plassey in 1757 in modern day Bangladesh. At the heart of the tragedy lies the betrayal by Mir Jafar of Siraj Ud Daulah, a tragedy we replay time and again, one betrayal after another, of brother against brother, all in the name of  a misconceived notion of ‘progress and development’.

marchofprogress

The onward march of ‘progress’ in the history of the Bangladeshi people: (l) From the fratricide of Cain and Abel, to the (c) 1757 betrayal at Plassey and  a (r)  scene from the May Massacre in Dhaka .

Following in the footsteps of Zafar Sobhan in the use of Christian Biblical terms, the best summation of the Dhaka Tribune and its editor is:

And the LORD said unto Cain, Where is Abel thy brother? And he said, I know not: Am I my brother’s keeper?

(King James Bible, Genesis 4:9)

or as Sher e Bangla Fazlul Haq is reported to have said:

‘I worry the day when I see that the Anandabazar* has printed something positive about me, because that is the day I understand that I have done something against the interest of the Bengali Muslims’.

sher e bangla.jpg

The Lion of Bengal ‘Sher e Bangla’, A K Fazlul Haq, founder of the Krishak Praja Party (Farmer’s People’s Party) and the first elected premier of Bengal

* Anandabazar Patrika is a Kolkata based Bangla daily newspaper, founded in 1922, it was then seen as representing the interests of absentee landlords against their mainly Muslim tenant farmers.

আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কয়েকটি মূলনীতি প্রসঙ্গে

by মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

একতরফা প্রহসনের নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিনির্মাণে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পুনর্গঠন ও সংহত করা এখন সময়ের দাবী। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে না ওঠায় বাংলাদেশে “নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র” আরো চেপে বসেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম আপাততঃ ক্লান্ত ও অবসন্ন। তাই আন্দোলন সংগ্রামে দেখা দিয়েছে বিরতি।

সেই সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমীক্ষা। উদ্দেশ্য আন্দোলন সংগ্রামের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে যথাশীঘ্র এর পুনর্যাত্রা। ইতোমধ্যে আমরা পর্যালোচনা করতে পারি বাঙালি মুসলমানের কোন কোন মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ একটি শক্তিমান ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

 ইসলাম

প্রথম যে মৌলিক ভাবাদর্শটি নিয়ে এই ডিসকোর্সের সূচনা করা যেতে পারে সেটি হল ইসলাম। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলধারার মৌলিক উপাদান হিসেবে ইসলাম কেন অপরিহার্য? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে খুঁজতে হবে।

বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী প্রান্তিক ও ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি। প্রান্তিক  ও ক্ষয়িষ্ণু বলছি এই কারণে যে এই ভাবাদর্শগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইসলামী আত্মপরিচয়কে গৌণ করে তোলে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ইসলামের ভূমিকাকে সীমিত করে রাখতে চায়। ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন ধর্মাচার পালন ও কেবলমাত্র অল্পকিছু  ধর্মীয় সামাজিক পার্বণ পালনের মধ্যেই এই ইসলাম সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ইসলামের এই খণ্ডিত ভূমিকা ও চর্চাকে সমর্থন করে না।

তাই বাঙালি মুসলমানের মূলধারা বা মধ্যধারার (Centrist and Normatic) রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে যারা ধারণ ও লালন করতে চাইবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশে ইসলামের অধিকতর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে  তুলতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তা, শিল্প-সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও প্রচার-প্রচারণার বিপরীতে বাঙালি মুসলমানের প্রবল মধ্যধারার বাংলাদেশী এবং/অথবা ইসলামী সৃজনশীলতার চর্চা ও প্রচারযজ্ঞ বিনির্মাণ ও লালন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে এই আন্দোলন একটি দীর্ঘমেয়াদী ভাবাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যা শুধুমাত্র ইস্যুভিত্তিক বা এডহক নয় । এটা যেন শুধুমাত্র রিএকটিভ বা প্রতিক্রিয়ামূলক লড়াই না হয়ে যায়। একে হতে হবে প্রোএকটিভ বা স্বতো:প্রণোদিত, ইতিবাচক এবং সৃজনশীল।

বাঙালি মুসলমানের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে কেন ইসলামকে একটি বড় অবস্থান দিতে হবে? এর উত্তর হল — বঙ্গীয় ইসলামের সমন্বয়বাদী প্রবণতা এবং আধুনিক ও প্রগতিবাদী ইউরোপীয় এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্সের প্রভাবে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ প্রান্তিক ও অবক্ষয়ী হয়ে উঠছে। এর কারণ হল — একদিকে প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে উত্তর-উপনিবেশিক ইসলামী সর্বাত্মকবাদী (Totalitarian) আন্দোলনের প্রভাব; এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সাম্প্রতিক উত্তর-আধুনিক ডিসকোর্সের আঘাতে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ও এর বঙ্গীয় সংস্করণ রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্স দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এর উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমাগত ক্ষয় ও অবশেষে লয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এখন আমরা দেখব কেন ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে বিপরীত স্রোতের প্রভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ তার শক্তিমান অবস্থান হারাচ্ছে। আর কিভাবে সেই শূন্যস্থান পূরণে সর্বাত্মকবাদী ইসলামী সংস্কৃতি ক্রমশঃ অগ্রসর হচ্ছে।

আমরা ইদানীং দেখছি যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি প্রায়শঃই বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ায় তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন কথিত “আবহমান” বাঙালি সংস্কৃতির আচার অনুষ্ঠানে যখন এমন কিছু জীবনাচার ও চর্চাকে উপস্থাপিত করা হয়, যার ভেতরে বি’দাত ও শিরকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লক্ষণ ফুটে ওঠে, তখন বাঙালি মুসলমান তাকে আর আগের মত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না । উদাহরণ হিসেবে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আলোকমালা ও অগ্নিশিখার প্রতি সমর্পণের বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উপাচার, অবনত ভঙ্গিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, মানব আকৃতি সদৃশ ভাস্কর্যে অবনত ভঙ্গিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন, ইত্যাদি। আধুনিক, নাগরিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি মুসলমান দেশীয় সংস্কৃতির এইসব আচার আচরণকে “আবহমান” কাল থেকে প্রচলিত বলে যথেষ্ট বিচার বিবেচনা ছাড়াই অতি উৎসাহের সঙ্গে ধারণ ও লালন করে চলেছে। অথচ বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান এইসব আচার আচরণকে বিচ্যুতি বলে মনে করছে। ফলে বৃহত্তর বাঙালি মুসলমানের বিবর্তনশীল মূল বা মধ্যধারার সংস্কৃতির সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ ও সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নাগরিক শ্রেণী ও গরিষ্ঠ লোকায়ত এবং তৌহিদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা দিচ্ছে বিভক্তি ও মেরুকরণ। রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে দেখা দিচ্ছে ব্যাপক সংঘাত, সংঘর্ষ, নৈরাজ্য ও সহিংসতা। এই বয়ানের সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ও তার বিপরীতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান।

কেন এমনটি ঘটছে? বিগত শতকের ষাট ও সত্তর দশক পর্যন্তও তো আমরা দেখেছি “আবহমান” সমন্বয়বাদী বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির জয় জয়কার। তাহলে ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় কি এমন পরিবর্তন ঘটল যে আমরা একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পালাবদলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

এর উত্তর খুঁজে পাবার জন্য আসুন আমরা বঙ্গের মধ্যযুগের ইতিহাসের একটি পর্বকে পাঠ ও বয়ান করি।

মধ্যযুগের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির মত বীর ও সূর্যসৈনিক এই জনপদে ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির বীজ বপন করেছিলেন। শাহ জালালের মত সূফি সাধক এই সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক অনুসঙ্গের আবাদ করেছেন এই অঞ্চলের উত্তর পূর্বে বসবাসকারী মানব মনের গহীন প্রান্তরে। খান জাহানের মত সূফি সাধক ও বিষ্ময়কর জনপদ-নির্মাতা সেই একই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিকে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলবর্তী বঙ্গীয় বদ্বীপের গহীন অরণ্যে বসবাসকারী সভ্যতা-বঞ্চিত প্রান্তিক মানব মনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যার ভাবাদর্শিক ও সাহিত্যিক রূপায়নে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গের কবি সৈয়দ সুলতান রচনা করেছিলেন “মুসলিম জাতীয় মহাকাব্য” স্বরূপ নবী বংশ । এই মহাকাব্য রচনার মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বৈদিক, বৈষ্ণব, শৈব এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে তুলনামূলক ডিসকোর্সের অবতারণা করে ইসলামী ভাবাদর্শ ও সংস্কৃতিকে বাঙালি মুসলমানের জীবনে গ্রথিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শহীদ তিতুমীর এই ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির সুরক্ষায় স্থানীয় প্রকৃতিজাত উপাদান দিয়ে বাঁশেরকেল্লা গঠন করে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি এই রাজনীতি ও সংস্কৃতির আলোকে বাঙালি মুসলমান কৃষিজীবীদের ইংরেজ ও জমিদার বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হাজী শরীয়তউল্লাহ এবং কারামত আলী এই সংস্কৃতিকেই অবক্ষয় ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার জন্য লৌকিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গের এই দক্ষিণ পূর্ব গাঙ্গেয় বদ্বীপে। এই অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানের লৌকিক জীবন, জীবিকা, জীবনাচার ও জীবনদর্শনে এভাবে গভীরভাবে গ্রথিত হয়ে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে নিজস্ব (Owned), ভূমিজ (Organic), মর্মধারিত (Internalized), আত্মীকৃত (Assimilated) ও অকৃত্রিম।

মধ্যযুগে বা প্রাক-উপনিবেশিক যুগে বঙ্গে সূচিত বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ও সংস্কৃতির এই মিথষ্ক্রিয়া ও রূপান্তর নিয়ে মেলফোর্ড স্পাইরো (Melford Spiro), জে ডি ওয়াই পীল (J D Y Peel), ইগর কপিটফ (Igor Kopitoff) প্রমুখ নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার ওপরে ভিত্তি করে পূর্ব বঙ্গের গহীন গাঙ্গেয় বদ্বীপে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ইসলামীকরণ সম্পর্কে মার্কিন ইতিহাস গবেষক রিচার্ড ঈটন (Richard M Eaton) একটি যুগান্তকারী ও ইতিহাসের গতি নির্ণায়ক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মান্তরের প্রচলিত ধ্রুপদী ডিসকোর্সকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বঙ্গের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া সম্পর্কে একটি তিন-পর্ব বিশিষ্ট প্রক্রিয়া, যা সুদীর্ঘ কাল ধরে ক্রিয়াশীল ও চলিষ্ণু থাকে, সেটি প্রতিপাদন করেছেন তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থে। আসুন আমরা এবারে দেখি যে এই তত্ত্বটি আমাদেরকে কিভাবে বুঝতে সাহায্য করে যে বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলাম বিবর্তিত হয়ে ক্রমাগত একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পরিণতির ফল হল সমন্বয়ী প্রবণতা ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী প্রবণতা ক্রমাগত মুখ্য হয়ে উঠছে।

ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বকে রিচার্ড ঈটন বলেছেন ইনক্লুশন (Inclusion) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত  ধর্ম ও ভাবাদর্শ  পাশাপাশি অবস্থান করে নিজেদের অবিকল অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই পর্বে দেশী ও বিদেশী অনুসঙ্গগুলো পরস্পর কোনোরূপ বিনিময়ে অংশ নেয় না। দ্বিতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন আইডেন্টিফিকেশন (Identification) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ পারস্পরিক বিনিময়ে অংশ নিয়ে একে অপরের ভেতরে সদৃশ অনুসঙ্গগুলোকে চিহ্নিত করে। আর তৃতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ডিসপ্লেসমেন্ট (Displacement) — যখন বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ স্থানীয় ধর্ম ও ভাবাদর্শের অবশেষগুলোকে ক্রমাগত অপসারণ করতে থাকে। এই তত্ত্বটি স্পষ্ট করার জন্য রিচার্ড ঈটনের লেখা গ্রন্থ থেকে এই উদ্ধৃতি ও ডায়াগ্রামটি এখানে উপস্থাপন করছিঃ

The term conversion is perhaps misleading when applied to this process, since it ordinarily connotes a sudden and total transformation in which a prior religious identity is wholly rejected and replaced by a new one. In reality, in Bengal, … … …, the process of Islamization as a social phenomenon proceeded so gradually as to be nearly imperceptible.

… … …, one may discern three analytically distinct aspects to the process, each referring to a different relationship between Islamic and Indian superhuman agencies. One of these I’m calling inclusion; a second, identification; and a third, displacement. By inclusion is meant the process by which Islamic superhuman agencies became accepted in local Bengali cosmologies alongside local divinities already embedded therein. By identification is meant the process by which Islamic superhuman agencies ceased merely to coexist alongside Bengali agencies, but actually merged with them, as when the Arabic name Allah was used interchangeably with the Sanskrit Niranjan. And finally, by displacement is meant the process by which the names of Islamic superhuman agencies replaced those of other divinities in local cosmologies. The three terms inclusion, identification, and displacement are of course only heuristic categories, proposed in an attempt to organize and grasp intellectually what was on the ground a very complex and fluid process. (Richard M Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier 1204 – 1760, University of California, Berkeley, 1993)

মধ্যযুগ থেকে সূচিত হয়ে ইসলামের এই বিবর্তন প্রক্রিয়া আজ অবধি ক্রিয়াশীল ও চলমান। ইতিহাসের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী চলমান এই মিথষ্ক্রিয়া বর্তমান সময়ে এর তৃতীয় পর্যায় অতিক্রম করছে।এই পর্যায়ে এসে উনিশ ও বিশ শতকের ইসলামী সংস্কারবাদী (Reformist), পুনরুজ্জীবনবাদী (Revivalist) ও পবিত্রকরণবাদী (Puritanical) বিভিন্ন আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশে এযাবৎ  প্রবল সমন্বয়বাদী (Syncretistic) বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে শুদ্ধতাবাদী (Orthodox) ও কিতাবসম্মত (Scriptural) বা টেক্সটসম্মত (Textual) রূপ পরিগ্রহ করছে। একুশ শতকের সূচনাকে আমরা এই বিবর্তনের একটি টিপিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। কাগজ, স্বাক্ষরতা ও শিক্ষার ব্যাপ্তি, মুদ্রণযন্ত্রের কল্যাণে বই পত্রের ব্যাপক সহজলভ্যতা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আর্থিক উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে বাঙালি মুসলমান প্রবাসী সম্প্রদায়ের উদ্ভব, উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অথবা ভ্রমণ ও পর্যটন উদ্দেশ্যে দেশ বিদেশে গমন; রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ইত্যাদি বাঙালি মুসলমানের গাঙ্গেয় বদ্বীপে গন্ডীবদ্ধ কৃষিনির্ভর জীবনাচারে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই সার্বিক পরিবর্তনের ফলে বাঙালি মুসলমানের ইসলামী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন আজ এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে গতিময় ও সর্বাত্মকবাদী হয়ে একটি বৈশ্বিক মাত্রায় পৌঁছেছে। কাজেই বাঙালি মুসলমান তার বাংলা ভাষা ও ইসলাম ধর্ম দিয়ে গড়া বাংলাদেশী রাজনীতি ও সংস্কৃতি দিয়ে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে যে তুরীয় (Transcendental) উচ্চতায় স্থাপন করবে এতে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

২। গণতন্ত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারাকে শক্তিমান করে গড়ে তোলার জন্য যে মুলনীতিটি অপরিহার্য সেটি হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি পাশ্চাত্য ধারণা। আধুনিক ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ডিসকোর্সের একটি অনুসঙ্গ এই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও পথচলার সূচনা এই অঞ্চলে ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার অনুসঙ্গ হিসেবে। উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হবার পর এই অঞ্চলের জনগণ গণতন্ত্রের আদর্শকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবেও অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল গণতন্ত্রের আকাঙ্খা। কিন্তু লিবারেল গণতন্ত্র বিনির্মাণে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি।

প্রাতিষ্ঠানিক, কার্যকর ও অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। তবে গণতন্ত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমষ্টির আস্থা অটুট রয়েছে। বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে একদিকে যেমন ইসলামের প্রতিফলন দেখতে চায়, তেমনি অন্যদিকে তারা গণতন্ত্রকেও একটি শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায়।

গণতন্ত্র ও ইসলামের মধ্যে কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে বলে তারা মনে করে না। ইসলামের যে প্রান্তিক ডিসকোর্সটি ইসলামী রাষ্ট্র বিনির্মাণে গণতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে, বা গৌণ করে, বা প্রতিবন্ধক বলে মনে করে, বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর অংশ তা সমর্থন করে বলে মনে হয় না। সুতরাং ইসলামী ও গণতান্ত্রিক — উভয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের মেলবন্ধনেই রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার চাবিকাঠি।

গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র হয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের কিছু সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্ঠার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যে অপচেষ্টা বারবার দেখা দিয়েছে তা বর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। নেতৃত্ব নির্বাচনেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও রীতি-নীতি মেনে চলতে হবে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে।

৩। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব গণতন্ত্রের মৌল ধারণার দুটি অনুসঙ্গ। অন্যকথায় গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যেই অনিবার্যভাবে এই দুটি প্রত্যয় উপস্থিত রয়েছে। তবুও এই দুটি রাজনৈতিক প্রত্যয়কে এখানে তৃতীয় মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত দ্বারা তিনদিক থেকে বেষ্টিত, সেহেতু এই দুটি প্রত্যয় বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য রক্ষাকবচ। ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতরে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনাকে সদা প্রবহমান রাখতে হবে।

বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বিভিন্ন মাত্রার অসমতা ও বিরোধ রয়েছে। সেগুলোতে ভারসাম্য ও পারস্পরিক মর্যাদা স্থাপন করার জন্য চীন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নানামাত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করতে হবে। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও ইরান – মুসলিম বিশ্বের এই কয়েকটি প্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিনিময়ের ব্যাপক কর্মসূচি নিয়মিতভাবে আয়োজন ও পালন করতে হবে। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও প্রভাব এভাবে মোকাবেলা করে বাংলাদেশে শক্তিমান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাতে হবে।

৪। ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী

চতুর্থ মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আরো দুটি প্রত্যয় – ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা জরুরী। সমাজে শ্রেণী বৈষম্য আছে ও থাকবে। কিন্তু ইনসাফ কায়েম করতে পারলে এই শ্রেণী বৈষম্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্ভব হবে। সমাজে অন্যায় মেরুকরণ প্রশমিত হবে এবং সংঘাত ও সহিংসতা থেকে সমাজ মুক্ত থাকতে পারবে। সমাজে এই ইনসাফ কায়েম করতে হলে মজলুম শ্রেণীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য ও মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে ব্যাপক জনসমর্থন পেতে হলে কেবলমাত্র উপরিতলের ইস্যু থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মজলুম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে সমাজে ও রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল ও নেতৃত্ব দিতে হবে।

এই লেখায় আগামী দিনের বাংলাদেশে মূলধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভাবাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কয়েকটি মূলনীতি উপস্থাপন করা হয়েছে। সবগুলো মূলনীতির বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হয়নি সময় ও স্থান স্বল্পতার কারণে। পাঠকের মনোযোগ ও ধৈর্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে। প্রথম মূলনীতিটিকে অনুপুঙ্খ আলোচনার মাধ্যমে অনেকটা মূর্ত ও খোলাসা করা হয়েছে। প্রথম মূলনীতির শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী পাঠ ও ভাষ্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের যে ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা তাই প্রকৃতপক্ষে এই রচনার মৌলিক অবদান বলে আমাদের বিশ্বাস। অন্যান্য মূলনীতিগুলোকে সংক্ষিপ্তাকারে ও বিমূর্তভাবে এখানে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। এটি সত্য যে এই প্রচলিত প্রত্যয়গুলির এইসময় উপযোগী বয়ান অনেক প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে অবশিষ্ট প্রতিটি প্রত্যয় নিয়ে আলাদাভাবে বিস্তারিত দিকনির্দেশনামূলক লেখার ইচ্ছে আছে। তবে ইতোমধ্যে এই মূর্ত ও বিমূর্ত প্রত্যয়গুলি থেকে মূর্ত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিগঠন করা সম্ভব হতে পারে বলে আমাদের অকুণ্ঠ বিশ্বাস।

জর্জ সেল – এর কোরান

Thomas Jefferson

২০০৭ এর জানুয়ারিতে আমেরিকান কংগ্রেসের প্রথম নির্বাচিত মুসলিম সদস্য কীথ এলিসন (Rep. Keith Ellison, D-Minn) লাইব্রেরী অফ কংগ্রেস থেকে সংগৃহীত কুর’আনের যে কপিটির উপর হাত রেখে কংগ্রেসে শপথ নেন, তার মূল স্বত্বাধিকারী ছিলেন আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, টমাস জেফারসন (Thomas Jefferson). জেফারসন বিবিধ কারণে ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন যা ডেনিস স্পেলবার্গ (Denise A. Spellberg) তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বই ‘Thomas Jefferson’s Qur’an’ এ তুলে ধরেছেন। ১৭৬৫ সালে আইনের ছাত্র থাকা অবস্থায় তরুণ জেফারসন যে কুর’আনটি কেনেন, তা ছিল সরাসরি আরবি থেকে ইংরেজি ভাষায় কুর’আনের প্রথম অনুবাদ। জর্জ সেল নামক একজন তরুণ ইংরেজ ল’ইয়ারের করা এ অনুবাদটি ছিল প্রায় দুইশ বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্যে কুর’আন বিষয়ক গবেষণা ও ধারণার অন্যতম প্রধান উৎস।

প্রেক্ষাপট: ইউরোপীয়দের ইসলাম বিষয়ক আগ্রহ

মধ্যযুগ থেকেই ইউরোপে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় (এ বিষয়ে আমার আগের লেখাতে কিছুটা আলোচনা করেছি)। ইউরোপে যখন ‘অন্ধকার যুগ’ চলছিল, তখন এশিয়া, ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকার বড় অংশ জুড়ে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। আনাতোলিয়া, আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যে সাফাভিদ সাম্রাজ্য, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো সভ্যতাগুলো কেবল প্রবল পরাক্রমশালী হিসেবেই নয়, বরং তাঁদের সঙ্গীত, কবিতা, বাগান, মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্প-সহ পরিশীলিত শিল্প-সংস্কৃতির কারণেও বিশ্বজুড়ে সুবিদিত ছিল। একই সাথে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার সেই সময় আরবি ভাষায় সংরক্ষিত ছিল। শুধু বিজ্ঞান বা দর্শন বা বাণিজ্যই নয়, আরবি সাহিত্যও ইউরোপীয় অনুবাদকদের উৎসাহিত করেছে। ১৭০৪ সালে একজন ফরাসী আরবি থেকে ‘সহস্র রজনীর গল্প’ প্রথম অনুবাদ করেন যা সেই থেকে আজ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের কাছে রোমাঞ্চকর ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।

তবে সব কিছুর উপরে ইসলাম ধর্ম বিষয়ক অনুসন্ধান ও গবেষণা বিবিধ কারণে অনেক ইউরোপীয় পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের আগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে। সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ থেকে আসা স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম কি করে এত দ্রুত সময়ের মধ্যে জানা বিশ্বের এত বড় অংশ জয় করে নিয়েছিল, ইউরোপীয়দের জন্য তা একই সাথে ছিল গভীর বিস্ময়, অনেকটা অস্বস্তিরও কারণ। ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ার (Voltaire) এবং ইংরেজ ইতিহাসবেত্তা এডওয়ার্ড গিবন (Edward Gibbon) একে বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রশ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও, অনেক ইউরোপীয় দার্শনিক এবং মুক্তচিন্তার অধিকারী খ্রিস্টান ইসলামে স্রষ্টার একত্ববাদ সম্পর্কিত মূলনীতি বা মতবাদকে খ্রিস্টধর্মের জটিল ত্রিত্ববাদ (Trinity) অপেক্ষা যুক্তিপূর্ণ মনে করেছেন। এসব বিবিধ কারণে ইউরোপে ইসলাম এবং তার মূল আরবি ভাষার উপরে আগ্রহ তৈরি হয়।

ইংরেজি অনুবাদ

ইউরোপে কুর’আনের প্রথম অনুবাদটি হয় লাতিন ভাষায়। ১১৪৩ সনে ইংরেজ রবার্ট অফ কেটন (Latin: Robertus Ketenensis) কর্তৃক ধর্মীয় মোহান্ত (abbot) পিটার দ্য ভেনারেবল (Peter the Venerable) এর নির্দেশে করা Lex Mahumet pseudoprophete (‘The law of Mahomet the false prophet’) শীর্ষক অনুবাদটি ছিল অতিরঞ্জিত এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অপ্রীতিকর অর্থ বা মন্তব্য সম্বলিত, যার মূল উদ্দেশ্য এর শিরোনামেই প্রতিফলিত। খ্রিস্টান চার্চে বহুল প্রচলিত লাতিন ভাষার এ অনুবাদটি দুঃখজনকভাবে পরবর্তী কয়েকশ বছর ধরে পাশ্চাত্যে কুর’আনের অর্থ এবং সে হিসেবে ইসলামের মর্মার্থ অনুধাবনের একমাত্র উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূল আরবিতে না গিয়ে বরং লাতিন ভাষার এই কাজটিকে এর ভুল বা বিকৃতিসহ পরবর্তীতে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৬৪৯ সালে রাজা প্রথম চার্লস এর চ্যাপলেইন Alexander Ross ফরাসী Sieur du Ryer এর অনুবাদ L’Alcoran de Mahomet কে প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘The Alcoran, Translated out of Arabic into French. By the Sieur du Ryer, Lord of Malezair, and Resident for the French King, at ALEXANDRIA. And Newly Englished, for the satisfaction of all that desire to look into the Turkish Vanities’। শিরোনামের শেষাংশটি লক্ষণীয়।

প্রায় একশ বছর পর ১৭৩৪ সালে জর্জ সেল (George Sale 1697-1736) নামক জনৈক ইংরেজ আইনজীবী ও ওরিয়েন্টালিস্ট মূল আরবি থেকে সরাসরি ইংরেজি ভাষায় কুর’আন অনুবাদ করেন। কাজটির শিরোনাম ছিল ‘Koran, commonly called the Alcoran of Mohammed, tr. into English immediately from the original Arabic; with explanatory notes, taken from the most approved commentators. To which is prefixed a preliminary discourse’. বলা হয়, সেল তাঁর অবসর সময়ে আরবি ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং কোনও মুসলিম দেশে তিনি ভ্রমণ করেননি, যদিও অনেকে বলে থাকেন তিনি ২৫ বছর আরবে ছিলেন। সেল নিজেই তা অস্বীকার করে লিখেছেন, “I am but too sensible of the disadvantages, one who is neither a native, nor ever was in the country must lie under, in playing the critic in so difficult a language as the Arabick.” Society for the Promotion of Christian Knowledge in London এর পৃষ্ঠপোষকতায় সিরিয়ান খ্রিস্টানদের জন্য নিউ টেস্টামেন্ট-এর একটি আরবি অনুবাদ তৈরির উদ্দেশ্যে জর্জ সেল আরবি ভাষা শিখেছিলেন বলে ধারণা।

কুর’আন অনুবাদের কারণ হিসেবে জর্জ সেল লেখেন,

“If the religious and civil Institutions of foreign nations are worth our knowledge, those of Mohammed, the lawgiver of Arabians, and founder of an empire which in less than a century spread itself over a greater part of the world than the Romans were ever masters of, must need to be so.”

An Ottoman Qur’an manuscript

অনুবাদ কাজে সেল ১৬৯৮ সালে কাউন্টার-রিফর্মেশন রোমে প্রকাশিত Louis Maracci এর করা লাতিন অনুবাদের সাহায্য নেন। এছাড়াও লন্ডনের ডাচ চার্চে সংরক্ষিত কুর’আনের একটি হস্তলিখিত কপিও তিনি সংগ্রহ করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে তৈরি এই manuscript টি ১৬৩৩ সালে একজন ডাচ বণিক লন্ডন চার্চকে দান করেন। চার্চের লাইব্রেরিতে পড়ে থাকা কুর’আনের এই হস্তলিখিত কপিটি প্রায় একশ বছর পর সেল তাঁর অনুবাদ কাজে ব্যবহার করেন। কুর’আনের হস্তলিখিত কপিটি ঠিক কি কারণে সংগ্রহ করা হয়েছিল বা লন্ডনে আনা হয়েছিল, তা জানা যায় না। তবে, ইসলামের ধর্মগ্রন্থকে সে সময়ে আরবি ভাষার একটি কালেক্টেবল হিসেবে ধরা হতো এবং পড়তে না পারলেও অনেকে তা কেবল মূল্যবান বস্তু হিসেবে সংগ্রহ করতেন। সেল সরাসরি না বললেও ধারণা করা হয় যে তিনি কুর’আনের এই বিশেষ কপিটিকেই তাঁর অনুবাদ কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইস্তাম্বুলের কুর’আনটিতে কিছু শব্দের যে বিশেষ রূপ এবং মেইনস্ট্রীম অটোমান সাম্রাজ্যে সুপ্রচলিত কমেন্টারি দেখা যায়, সেল এর অনুবাদ এবং নোট এ তার রেশ পাওয়া যায়।

জর্জ সেল এর পূর্বে ১৬৪৯ সালে ফরাসী থেকে ইংরেজিতে যে অনুবাদটি করা হয়, তাতে মূল অনুবাদের ভুলের বাইরেও নতুন কিছু ভুল যোগ হয় বলে সেল মন্তব্য করেন। সে তুলনায় সেল এর অনুবাদটি ছিল লক্ষণীয়ভাবে পাঠযোগ্য, পরিশীলিত, এবং তুলনামূলকভাবে শুদ্ধ। কুর’আনের ভাষার সৌন্দর্য এবং তাঁর অনুবাদের সীমাবদ্ধতা বিনম্রভাবে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, ‘it must not be supposed the translation comes up to the dignity of the original’. এর পরেও তাঁর অনুবাদ কুর’আনের যে কোনও আধুনিক অনুবাদের সাথে তুলনীয়, যেমন আয়াতুল কুরসীর প্রথমাংশের অনুবাদ –

“GOD! there is no GOD but he; the living, the self-subsisting: neither slumber nor sleep seizeth him; to him belongeth whatsoever is in heaven, and on earth.”

একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐশ্বর্য

George Sale

জর্জ সেল এর অনুবাদটি কেবল একটি উচ্চমানের সাহিত্য কর্মই নয়, একইসাথে তা পাশ্চাত্যে ইসলাম বিষয়ক জ্ঞানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটি সুদীর্ঘ ভূমিকায় তিনি ইসলামের ইতিহাস, তাত্ত্বিক, ও ধর্মীয় বহু বিষয়ের ধারণা উল্লেখ করেন। তাঁর অনুবাদ কাজটির আগে যেকোনো ইংরেজি ভাষীর কাছে ইসলাম সম্পর্কিত তথ্যের একমাত্র উৎস ছিল লাতিন ভাষায়। সেল এর অনুবাদ ইসলাম বা কুর’আন সম্পর্কে পূর্বাপর কুসংস্কার বা উদ্দেশ্যপূর্ণ মিথ্যাচারের লাগাম টেনে ধরে। যেমন, মুহাম্মদ(সা:) এর জীবনী বর্ণনায় তিনি মধ্যযুগ থেকে চলে আসা কাল্পনিক ও বিতর্কিত গালগল্পের আশ্রয় নেন নি। বরং তিনি লেখেন,

“Mohammed was richly furnished with personal endowments, beautiful in person, of a subtle wit, agreeable behaviour, shewing liberality to the poor, courtesy to everone, fortitude against his enemies, and, above all a high reverence for the name of God.”

জর্জ সেল এমন একটি সময়ে অনুবাদ কাজটি করেন যখন ইউরোপে নতুন করে আরবি শেখা এবং ইসলামকে জানার একটি চল শুরু হয়েছিল। সে হিসেবে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের কাজ থেকে উপকৃত হয়েছেন। আবার, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যোগ করেছেন। তুলনামূলকভাবে সঠিক ধ্যান-ধারণা এবং একটি বিজাতীয় ধর্মকে জানার ও বোঝার আন্তরিক অভিপ্রায়ের সমন্বয়ে জর্জ সেল এর ‘Koran’ একটি সুদূরপ্রসারী এবং অসাধারণ কাজ যা বিংশ শতকের প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত কুর’আনের স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি অনুবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। কেবল সেল এর সমসাময়িকরাই নয়, বরং পরবর্তী প্রায় দুইশ বছর ধরে ব্রিটেন ও আমেরিকায় প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে কুর’আন ও ইসলাম বিষয়ক ধ্যান-ধারণার উৎস হিসেবে তা পরিগণিত হয়। বিশদ নোট সম্বলিত হবার কারণে আজও ইতিহাসবেত্তারা জর্জ সেল এর ‘কোরান’ ব্যবহার করেন। ঐতিহাসিক Michael Cook এর ভাষ্যে, “an old translation which has worn very well.”

অধুনা কুর’আনের বহু অনুবাদ হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজিতে কেবল একটি, উনবিংশ শতকে দুইটি, বিংশ শতাব্দীতে এসে অন্তত ১৬টি অনুবাদ পাওয়া যায়। এর পরেও একজন গড়পড়তা পাশ্চাত্যবাসী ইসলাম সম্পর্কে খুব কমই ধারণা রাখেন, যদিও অভিবাসন, বাণিজ্য, বা পর্যটনের কারণে এখন অহরহই মুসলিম-অমুসলিমের দেখাসাক্ষাৎ হয়। এয়ার ট্র্যাভেল, স্যাটেলাইট টিভি, বা ইন্টারনেটের এই যুগেও পৃথিবীর বিভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠীর মানুষদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও সহানুভূতি গড়ে ওঠেনি।

হয়তো জর্জ সেল এবং অসংখ্য প্রতিকূলতার মাঝে করা তাঁর অনুবাদ কাজটি সবার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। অসংখ্য ভুল ধারণা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য কয়েকশ বছর ধরে ইসলাম ও তার সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করছে। ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির অনুবাদ কাজ সামগ্রিকভাবে ইসলামের ধর্মীয়, সাহিত্যিক, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের স্বাদ আস্বাদন করার প্রচেষ্টারই অংশ।

[এই লেখাটি মূলত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত Alexander Bevilacqua এর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধের ভাবানুবাদ এবং সম্প্রসারণ। বোঝার সুবিধার্থে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং মন্তব্য এতে যোগ করা হয়েছে। মূল লেখাটির লিঙ্ক এখানে।]

http://shankhachilerdana.wordpress.com/

প্রেক্ষিত হিজাবঃ এ কেস স্টাডি ফর দ্য গ্রোথ অব লিবারেল ফ্যনাটিসিজম

1

by Jahid Islam

বাংলাদেশের একটা শ্রেণী নিজেরদেরকে লিবারেল দাবি করে। বাস্তবে এরা ফ্যানাটিক। শুধু ফ্যানাটিক বললে কম বলা হবে। ফ্যনাটিসিজমের ১০ এর স্কেলে এদের স্কোর ৯.৯। এমাজান জঙ্গলের ‘মানুষ আকৃতির’ যেসব প্রাণী অন্য মানুষের মাংস খায় কেবল তারাই এ স্কেলে এদের চেয়ে উপরে আছে।

গড আছে নাকি নাই এটা কিন্তু নতুন কোন বিতর্ক না। এ বিতর্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো। যারা এ তর্ক করেন আমার কাছে তাদেরকে খারাপ লাগে না। তাদের অনেকেই নিজেদের যুক্তি এবং আন্ডারস্ট্যান্ডিং ব্যবহার করে কনভিন্সড হতে চান। এতে দোষের কিছু নাই। বাস্তবে এটাই আদর্শ পদ্ধতি হওয়া উচিত। যারা গডে বিশ্বাস করেন না কিন্তু রেশনালি চিন্তা করার চেষ্টা করেন এবং সে থেকে তাদের এ কনভিকশন আমি তাদেরকে রেসপেক্টও করি। এদের বেশিরভাগই নিজে গড বিশ্বাস করেন না, কিন্ত অন্যের বিশ্বাস এবং আচরণকে শ্রদ্ধা করেন। ‘গড’ বিশ্বাস করেন এমন কারও সাথে আলোচনা বা তর্ক হলে তারা নিজেদের যুক্তি দিয়ে তাদের বিশ্বাসের পেছনে কারণকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন। সমাজের ভিন্ন মতের মানুষের সাথে কোএগজিসটেন্স এ বিশ্বাস করেন। এরা আসলেই লিবারেলিজমে (প্লুরালিজম) বিশ্বাস করেন।

7bbae7bd7f30fc7e74a47780ac8bce0d

আমি যে ফ্যনাটিকদের কথা বলছি তারা অন্যের জীবন থেকে ‘গড ডিলিউশন’ দূর করতে গিয়ে নিজেরাই একটা ধর্মের জন্ম দিয়েছেন। যে ধর্মের প্রধান ডকট্রিন হল সবার জীবন থেকে গডের ধারনা দূর করা এবং সেটা যে কোন মূল্যে। প্রয়োজন হলে জোর করে। বলাই বাহুল্য, আমাদের দেশে তাদের প্রধান টার্গেট হল ইসলাম। বাস্তবে সমাজে যারা বিভিন্ন ধর্মে ধার্মিক হিসেবে পরিচিত এ শ্রেণী এর চেয়েও অনেক ডেডিকেটেডলি তাদের এ “গডলেস ডিলিউশন” ধর্ম পালন করেন। তারা হিজাব পরা বা পরানোকে খুব একটা পজিটিভলি দেখেন না। মনে করেন যে, হিজাব পরলে নারীদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়। এখানে আন্ডারলায়িং এসাম্পশান হল একটা বিরাট অংশকে জোর করে হিজাব পরানো হয়। যারা স্বেচ্ছায় হিজাব পরে তারাও আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর লোক এবং হিজাব পরাই তাদের ইন্টেল্যাকচুয়াল ইনফেরিওরিটির প্রমাণ। তারা কেউ কেউ প্রচার করে বেড়ান যে, আরবের ১৪০০ বছর আগের গরম ‘লু হাওয়া’ থেকে বাঁচার জন্য মহিলারা হিজাব পরত। তাদের এ এসাম্পশান এবং আর্গুমেন্ট ঐতিহাসিক এবং তত্ত্বগত দিক থেকে ভুল। ইতিহাস এবং ধর্ম বিষয়ে সামান্য জ্ঞান থাকলেই এ যুক্তির অসাড়তা বোঝা যায়।

যেহেতু তারা মনে করেন যে অনেককেই জোর করে হিজাব পরানো হয় বা তারা নিজেরা কেবল হিজাব না পরার কারণেই হিজাব ব্যবহারকারীদের চেয়ে ইন্টেল্যাকচুয়ালি সুপিরিয়র, অতএব তাদের অধিকার আছে জোর করে সবার মাথা থেকে হিজাব খুলার।
জোর করে হিজাব পরানোর ঘটনা যে অল্প কিছু ঘটতে পারে সেটা মানছি। এ শ্রেণী কিন্তু তাদেরকে bullying করে না। তাদের ফিল্ড অফ ইন্টারেস্ট হল স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষিত শ্রেণীর মেয়েরা যাদের প্রায় সবাই স্বেচ্ছায়,কনশাসলি হিজাব পরে এবং এটাকে ধর্মীয় অনুশাসন মনে করে। জোর করে কাউকে হিজাব পরানো যদি ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়, জোর করে হিজাব খোলানো বা bullying যে সেটারই মিরর ইমেজ এ বাস্তবতা তাদের স্থূল মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আরও মজার ব্যপার হল, এদের কেউ কেউ টিভি টকশোতে এসে ইসলামকে এ দেশে মাইনরিটির ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে। অথচ এ দেশের বেশির ভাগ লোক যে মুসলিম এ ফ্যাক্ট ক্লাস ৪ এর একটা বাচ্চাও জানে। দেখলে মনে হয় যেন কোন একটা ধর্ম মাইনরিটির ধর্ম হলে সে ধর্মের উপর মেজরিটির রিলিজিয়াস ডকট্রিন চাপিয়ে দেয়া বিশেষ পুণ্যের কাজ। মাইনরিটি হিসেবে মনে করার এ কাজটা যদি আসলেই তারা তাদের কনভিকশন থেকে করে থাকেন সে ক্ষেত্রে অবশ্য এদেরকে মানসিক রোগী হিসেবে ট্রিট করতে হবে।

এদের আরেকটি প্রধান ট্রেড মার্ক হল কিছু দিন পর পর তারা ‘বাঙ্গালী না মুসলমান’ এ অর্থহীন বিতর্ক উসকে দেয়। ভাবটা এমন যে কেবল তাদের কাছেই এর একটি অবজেক্টিভ উত্তর আছে। এ মিনিংলেস বিতর্ক চাঙ্গা করাকেই তারা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির সবচেয়ে বড় উৎকর্ষতা মনে করে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এটা অবশ্য জীবিকা। সে ক্ষেত্রে এটা বোধগম্য। প্রকৃতপক্ষে, অল্প কিছু Schizophrenia আক্রান্ত লোক যারা মাথায় বড় লাল টিপ দেয়া, স্লিভলেস ব্লাউজ পড়া এবং শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারাকেই বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার অন্যতম প্যারামিটার হিসেবে মনে করেন এবং আসমানি গ্রন্থের বয়ানের মত বিশ্বাস সহকারে ’৭১ টিভি’ দেখেন তারা ছাড়া এ শ্রেণীর কার্যকলাপ অন্যদের কাছে মনে হয় অর্থহীন ফ্যনাটিসিজম। এ শ্রেণীর সুডো লিবারেলদের প্রগলভতা অল্প সময়ের সাময়িক উন্মাদনার জন্ম দেয় মাত্র। আদতে এরা লিবারেল আদর্শ প্রতিষ্ঠা ত দূরের কথা, লিবারেলিজম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে।

যে কোন আদর্শের অনুসারিদের মনের খায়েশ থাকতেই পারে যে তাদের অনুসৃত আদর্শ বিজয়ী হবে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের আদর্শ প্রচারের জন্য তাদের প্রথম কাজ হবে তারা যে সমাজে এ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে সমাজের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করা এবং পটেনশিয়াল ফলোয়ারদের মন-মগজ ও রুচির বাস্তবতা অনুধাবন করা। এরপর নিজেদের মডেলকে সে সমাজের বাস্তবতা অনুসারে এডজাস্ট করা। এছাড়া অন্য কিছু করে যারা কেবলি নিজেদের কনভিকশন অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায় (সেটা তাদের কাছে যত শুদ্ধই হোক) তারা সে আদর্শ সম্পর্কে একটা পাবলিক ফোবিয়া তৈরি করে মাত্র। এতে সে আদর্শের ক্ষতি ছাড়া উপকার হয় না। সম্ভবত, বাংলাদেশের এ ‘সুডো লিবারেল’ ফ্যনাটিক শ্রেণী দেশের সমাজ বাস্তবতা জানেন কিন্ত, মানতে চান না। তারা ভিন্ন মতের মানুষকে ইনক্লুশানে না বরং নিত্য নতুন কারণ দেখিয়ে এক্সক্লুশানের মাধ্যমে নিজেরদের এক্সক্লুসিভনেস প্রমাণ করতে চান। যারা নিজেদেরকে লিবারেলিজমের অনুসারি মনে করেন এবং নিজেদের আদর্শ ( liberty and equality, civil rights, freedom of the press, freedom of religion) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা রাখেন তাদের উচিত হবে এগিয়ে এসে এ ফ্যনাটিক শ্রেণীর আদর্শিক এবং মানসিক সু চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

“ওয়ার অন টেরর”: বাংলাদেশ অধ্যায়

1

by Jahid Islam

সোভিয়েত-আফগানিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর এ সময় পর্যন্ত নির্মিত বাস্তব দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা থ্রিলিং সিনেমার নাম ‘ওয়ার অন টেরর’/ এটা সিকুয়েল মুভি,পার্ট অনেক। সিরিয়ালও বলা যেতে পারে। ‘লিও স্ট্রাউস’ নাকি ‘স্যামুয়েল হান্টিংটন’ কে এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। আবার দুই জনের থিওরি জোড়া লাগিয়েও বানানো হতে পারে। তবে মানতেই হবে মাস্টার স্ক্রিপ্ট। প্রধান চরিত্রে এ শতাব্দীতে ইতিমধ্যে অভিনয় করেছেন জর্জ বুশ,টনি ব্লেয়ার। এরপর এসেছেন বারাক ওবামা, নিকোলাস সারকোজি, এবং সর্বশেষে এসেছেন ফ্রাঙ্কয়িস হলান্ডে। কাহিনী ও সময়ের বাস্তবতায় চরিত্রগুলো পরিবর্তন হয়েছে।

wot

সিনেমার শুটিং হয়েছে আফগানিস্থান, পাকিস্থান, ইয়েমেন, কেনিয়া, তানজানিয়া, ইরাক, মালি, নাইজেরিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া সহ পৃথিবীর নানান প্রান্তে। অনেকগুলো স্পটে চিত্রায়ন এখনো চলছে।

সাধারণ দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে আলকায়েদার সাথে এ খেলায় অংশ গ্রহণকারীদেরকে তাদের ভুমিকার ভিত্তিতে চার ভাগে ভাগ করা যায় বলে আমার মনে হয়েছেঃ-

 ১/ প্লেয়ারঃ যারা সরাসরি এ খেলায় অংশগ্রহণ করে। যেমন- আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স।

২/ সহযোগীঃ যারা এই ওয়ার অন টেররে আমেরিকারকে সাহায্য করে। যেমন- পাকিস্থান।

৩/ ডাবল সাইডেড প্লেয়ারঃ যারা আলকায়েদাকে আর্থিক অনুদান এবং লোকবল সরবরাহ করে, আবার আমেরিকারকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ওয়ার অন টেররে সাহায্য করে । যেমন –সৌদি আরব।

 ৪/ খেলায় অংশগ্রহণের ভয় দেখায়ঃ কতিপয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতায় থাকার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করতে চান। তাদের মূল বক্তব্য হল, “আমি এবং আমার দল ক্ষমতায় না থাকলে দেশ আফগানিস্থান, পাকিস্থান হয়ে যাবে অথবা আল কায়েদার ঘাঁটি হয়ে যাবে”। এ প্রপোজিশন নিয়ে খেলায় অংশ গ্রহণ করেছেন লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি । তার খেলা শেষ। এখনো খেলে যাচ্ছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। তবে এ খেলা মনে হয় সহজে শেষ হবেনা। প্রফেসর ড. তারিক রমাদানের মত আমিও বিশ্বাস করি এ খেলা শেষ না হওয়ার ব্যপারে দুই পক্ষের মধ্যে (এক পক্ষে আমেরকা, অন্য পক্ষে রাশিয়া এবং চীন) ঐক্য আছে। এছাড়াও এখানে অন্য রিজিওনাল প্লেয়াররাও জড়িত আছে যারা নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় খেলছে। যেমন- ইরান, তুরস্ক, কাতার, ও সৌদি আরব।

যাই হোক, এটা হল ভূমিকা। এবার আসি আসল কথায়।  সম্প্রতি আইমান আল জাওয়াহিরি’র ভিডিও টেপ বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার প্রকাশিত হয়েছে। এটি দেখিয়ে শেখ হাসিনা চার নম্বর গ্রুপে যোগ দিবেন দিবেন করছেন। যারা এ খবরে অবাক হয়েছেন, আসলে তাদের অবাক হওয়া দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমার কাছে এর কারণ খুব পরিস্কার। যারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবে না। এর মধ্যেই এক জনের ফাঁসি হয়েছে, একজন জেলে মারা গেছে। সম্ভাবনার বিচারে বাকিদেরও ফাঁসি হওয়ার কথা, একজাক্টলি কি হবে আল্লাহই জানেন। ফাঁসি না হলেও এরা সবাই বয়স্ক। ৮/১০ বছরের মধ্যেই অনেকে স্বাভাবিকভাবেই মারা যাবেন। অতপর এ খেলা শেষ। এরপর কি হবে ?

খেলার নিয়ম অনুসারে এরপর অন্য কোন ইস্যু আসার কথা।  ইসলামিক টেররিজম কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা একটা ভাল ইস্যু।  বাজারে এর চাহিদা আছে।  তাই একে সামনে ঠেলে দিতে হবে। এ কাজ করবে কে ? উত্তর সহজ। প্রচারের প্রধান ভূমিকায় থাকবে এই দেশের ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ অর্থাৎ দেশি নিউকনিয়ান সেপাইদের প্রমোশনাল ভেহিকল ‘প্রথম আলো’ ।  ‘নিউইয়র্ক টাইমস এবং ‘প্রথম আলো’ এর মধ্যে সমন্বয় করার কাজটি করবেন মাহফুজ আনাম এবং তার মেয়ে বিশিষ্ট ‘ফিকশন লেখিকা’ তাহমিমা আনাম। ভারতের ‘আনন্দবাজার’ ও থাকবে এ দলে । এ ছাড়াও এ দেশ থেকে থিঙ্ক  ট্যাঙ্কে থাকবেন আবুল বারাকাত, শাহরিয়ার কবির,মুন্তাসির মামুন, সজীব ওয়াজেদ জয়, দীপু মনি ও গওহর রিজভী। এরা প্রমিনেন্ট প্লেয়ার, অনেকে থাকবেন পর্দার আড়ালে।

তবে এ খেলায় সরাসরি আমেরিকা নামবে না। বাংলাদেশের এ গোষ্ঠী চাইলেও না। কেননা ডেমোক্রেসি প্রতিষ্ঠা করার মত যথেষ্ট তেল সম্পদ বাংলাদেশে নেই। আমেরিকা চায় বাংলাদেশ মোটামুটি  স্থিতিশীল থাক। তাই তারা সবাইকে  রাজনীতিতে ইনক্লুড করার কথা বলে। এমনকি জামায়াতকেও। এতে সব দলকে একজিস্টিং ফ্রেমওয়ার্কে আনা যাবে যাতে অবস্থা স্থিতিশীল থাকবে।

তবে এখানে আছে লোকাল ভেন্ডর ভারত যাদের এ হিসেবে একটু আপত্তি আছে । ফলে দরকষাকষির মাধ্যমে যেটাতে মার্কেটে ইকুইলিব্রিয়াম এসেছে সেটা হল, আমেরিকা খেলাটা মনিটর করবে। কিন্তু সেটা রিজিওনাল এলাই হিসেবে গ্রেটার ইন্টারেস্টের কথা চিন্তা করে আউটসোর্স করে দিবে ভারতকে। ভারতের এখানে বহুমুখী লাভ আছে। যেমন- আসাম সহ অন্যান্য অস্থিতিশীল অংশগুলোতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, বাংলাদেশের উপর দিয়ে অবাদে বিনা খরচে পণ্য পরবিবহন, নামে মাত্র মূল্যে বন্দর ব্যবহার করা, দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা নিয়ন্ত্রন করা ইত্যাদি। সর্বোপরি, বাংলাদেশ যদি ভারতের একটি স্থিতিশীল অঙ্গরাজ্য হিসেবে কাজ করে তাহলে সবচেয়ে ভাল হয়।
এটা করতে হলে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় থাকতে হবে যে কোন মূল্যে। এর জেন্য দরকার লং এবং শর্ট টার্ম প্ল্যান। শর্ট টার্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আওয়ামীলীগ এবার ক্ষমতায় এসেছে, এতে আনপ্রেসিডেন্টেড সমর্থন দিয়েছে ভারত। ফলাফল হিসেবে ভারত প্রতিদানও পেয়েছে একেবারে হাতে নাতে। উলফা কে আর্মস সরবরাহ এর অভিযোগে অভিযুক্তদের ফাঁসি হয়েছে। এরপর, লংটার্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসেছে এ নতুন প্রপোজিশন। ৩ মাসের পুরনো ভিডিও টেপ নিয়ে মাতামাতির ব্যপারটি আমি এভাবেই দেখি।

তবে এ খেলার আরেকটি মজার দিক আছে যেটি সাধারণত চার নম্বর ক্যটাগরির লোকেরা আগে থেকে বুঝতে পারেনা, অন্তত এখনো পর্যন্ত কেউ পারে নি।  যারাই এ খেলায় অংশগ্রহন করে দেশের জনগণের সাথে “আল-কায়দা আল-কায়দা” খেলেছেন তাদের পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। উধাহরণ- গাদ্দাফি, পারভেজ মোশাররফ। এদেরকে ব্যবহার শেষে যথাস্থানে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে ঠিক যেমন মীর জাফর কে ছুঁড়ে ফেলেছিল ইংরেজরা।

ইতিহাস বলে থেকে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। শিক্ষা না নেওয়ার পেছনে যুক্তি দেখায়- দিজ টাইম ইট ইজ কোয়াইট ডিফরেন্ট। লেটস সি হোয়াট হেপেন্স দিস টাইম !