‘বিশ্বকাপ এবং বিরোধীদলের আন্দোলন’— শিরোনামে থাকবার লড়াই

world cup1

by zainuddin sani

বিএনপির জন্য সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে। না, সরকারী কঠোর মনোভাব কিংবা জ্বালানো পোড়ানো নিয়ে তৈরি নেতিবাচক প্রচারণাকে সমস্যা বলছি না। সমস্যা তৈরি করবে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। এতোদিন পর্যন্ত যেভাবেই হোক, বিরোধী দলের আন্দোলন ব্যাপারটা সংবাদের শিরোনামে ছিল। নেত্রীর গৃহবন্দী অবস্থা কিংবা পুত্রের মৃত্যু, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা না করা— কোন না কোনভাবে টিভি চ্যানেল আর পত্রিকার লীড নিউজে তাদেরকে রেখেছিল। টেলিফোন আলাপ থেকে শুরু করে সরকারী বক্তব্য কিংবা পাতি নেতাদের হুঙ্কার, সব কিছুই সাহায্য করছিল তাঁদের প্রচারণায়। শিরোনামে রাখছিল বর্তমান পরিস্থিতিকে। বোঝা যাচ্ছিল, দেশে এখন স্বাভাবিক অবস্থা চলছে না। হরতালে রাস্তায় প্রচুর বাস কিংবা প্রাইভেট গাড়ী দেখা গেলেও, শিরোনামে থাকতো ৭২ ঘণ্টা হরতাল।

খুব দ্রুত পরিস্থিতি না পাল্টালে, সেখানে অচিরেই ছেদ পড়বে। এবং বেশ ভালভাবেই পড়বে। শিরনাম হতে তখন টক্কর দিতে হবে ক্রিকেট বিশ্বকাপের সঙ্গে। ক্রিকেট পাগল এই জাতির জন্য তখন, বিরোধী দলের একঘেয়ে আন্দোলনের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বিষয় হবে, ক্রিকেট। সঙ্গে যদি যোগ হয় বাংলাদেশের জয়, তবে তো কথাই নেই। বাঙালির উন্মাদনা তখন হবে দেখার মত। আফগানিস্তানের সঙ্গে হারলেও, শিরোনাম চলে যাবে ক্রিকেটের দখলে। তখন বাঙালির গালিগালাজও হবে আকাশচুম্বী। ভারত পাকিস্তান খেলা নিয়েও যে বাজার গরম হয়ে উঠবে, তা নিয়েও সন্দেহ নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, এই উন্মাদনা চলবে পুরো দেড় মাস, মার্চের শেষ নাগাদ।

যেভাবে একটা দুটা ঝলসানোর খবরে আমরা অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি, মনে হয় না, খুব মর্মান্তিক কিছু না ঘটলে, তা তখন শিরোনামে আসবে। শুনতে খারাপ লাগলেও, এটিই অমানবিক সত্য— এই জ্বালাও পোড়াও আর বার্ন ইউনিটের দগ্ধ মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্থ হতে শুরু করেছি। এখন অনেক সহজেই আমরা পাতা উল্টিয়ে পরের খবরে চলে যাই। আর তেমনটা হতে শুরু করলে, সম্পাদক সাহেবরাও আর সেগুলোকে শিরোনামে রাখবেন না। নেতিবাচক হোক আর ইতিবাচক হোক, বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রচারণায় তখন ছেদ পড়বে।

শিরোনাম করতে আমরা কতোটা মরিয়া তাঁর জলজ্যান্ত প্রমাণ এসব ঝলসানো নিয়ে শুটিং, কিংবা খাওয়া থেকে উঠিয়ে ছবির জন্য পোজ দেয়ানো। অসভ্য আচরণ মনে হলেও, খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা এটি। যতই তিরস্কার করি, বিশ্বজিতের কোপানোর দৃশ্য যে সাংবাদিক বা ভিডিওম্যান খুব ভালভাবে ধারণ করতে পেরেছে, সে কিন্তু সেদিন তাঁর সম্পাদকের বাহাবা পেয়েছে। চ্যানেলগুলোর ভেতর সেদিন ছিল, সেই দৃশ্য দেখানোর প্রতিযোগিতা। আগুনে পোড়ানো নিয়েও আমার মনে হয় না ব্যতিক্রম হচ্ছে। পোড়ানো নিয়ে একদিকে যেমন বিরোধীদলকে সমানে ধিক্কার জানিয়ে একরাশ খবর ছাপা হচ্ছে, ঠিকই আবার সেই খবরগুলোকে শিরোনাম করা হচ্ছে। সেসব আক্রান্তদের নিয়ে হৃদয় বিদারক রিপোর্টিং যেমন হচ্ছে, আক্রমণকারীদের চোদ্দ গুষ্টি যেমন উদ্ধার হচ্ছে, তেমনি এটাও সত্য, সেই রিপোর্ট ছাপানোর সময় নৃশংস একটি ছবির খোঁজও হচ্ছে। আর যেসব ফটোগ্রাফার সেসবের ছবি যারা জোগাড় করছেন, ‘গ্রেট জব’ বলে একটা পিঠ চাপরানি কিন্তু তারাই পাচ্ছেন।

যা বলছিলাম, এই মুহূর্তে আন্দোলনের সাফল্যের মূলমন্ত্র হচ্ছে, শিরোনামে থাকা। যেভাবেই হোক, যত নৃশংস কাজ করেই হোক, শিরোনামে থাকা চাই। প্রথম খবরটাই যেন হয়, বিরোধী দলের আন্দোলন সংক্রান্ত। দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় লিড হওয়া মানেই, পিছিয়ে পড়া। আর একবার পেছনের পাতায় চলে গেলে, আন্দোলন শেষ। ফলে এখন ২৪ ঘণ্টার হরতাল আর ডাকা হচ্ছে না। কারণ এতো ছোট হরতাল আর এখন শিরোনাম না। ৭২ ঘণ্টার হরতালকেও শিরোনাম পেতে ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। বরং শিরোনাম হয়, কিংবা মনে প্রশ্ন জাগে, সপ্তাহের বাকী দিন বাদ দিল কেন? হরতালের ডাক শিরোনামে ফিরে আসে, যখন হরতাল প্রলম্বিত করে ৬ দিন করা হয়।

শান্তিপূর্ণ হরতাল, নিঃসন্দেহে বিরোধী দলকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিবে। প্রচুর গাড়ী চলছে এমন কোন হরতালের ছবি পরের দিন পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিরোধী দলের জন্য একটি অশনি সংকেত। কোন হরতালে ভাঙচুর না হলে, ‘এটা কোন হরতালই হয়নি’— ক্যাডাররা রাস্তায় নেই, জনসমর্থন নেই, বিরোধী দল আন্দোলন তৈরিতে ব্যর্থ। অবরোধ, হরতালে দেশের কি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে কেউই কিছু বলছেন না। অবরোধের কারণে চাষীরা কি মর্মান্তিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, কিভাবে সস্তায় তাদেরকে পণ্য বিক্রি করে দিতে হচ্ছে, তা নিয়ে কেউ কথা বলছেন না। কিংবা বললেও, শিরোনাম করছেন না। কারণ, সেখানে নৃশংসতা নেই বা পাবলিক খাবে না।

বিএনপির গেমপ্ল্যান ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আপাততঃ লাগাতার হরতাল আর সপ্তাহ জুড়ে হরতাল দিয়েই কাজ চালাচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এসএসসি পরীক্ষা পেছানো, এবং সেই ব্যাপারটা শিরোনাম হওয়া, আপাততঃ এটাই তাঁদের টার্গেট। পরীক্ষা হতে না পারলে, সরকারকে সবাই যত অথর্ব মনে করবে, পরীক্ষা হতে পারলে বিরোধী দলকে ততোটাই অকর্মণ্য ভাববে। সরকারী দল চাইছে, জনগণ ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বিরোধী দলের ওপর ক্ষেপে উঠুক আর বিরোধী দল চাইছে, সরকারী দলকে কিংবা রাষ্ট্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে। আর এই জেদাজেদিতে কে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা নিয়ে কারোরই মাথা ব্যাথা নেই। এদেশের সরকার এবং বিরোধী দুই দলেরই যেহেতু দূরদৃষ্টি বলে কিছু নেই, তাই ধরে নেয়া যায়, এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কেউই এগিয়ে আসবে না।

সরকার যেভাবে শুক্রবারে পরীক্ষা নিয়ে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে, মনে হচ্ছে শিরোনামে থাকবার জন্য অচিরেই হয়তো শুক্রবারেও হরতাল আসবে। জ্বালাও পোড়াও যদিও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তারপরও শিরোনামে টিকে থাকবার লোভে, সেই কাজেও বিরাম আসবে না। হয়তো নিজের নেতা কর্মীকে দিয়ে না করিয়ে, ভাড়াটে সেনার আমদানী হবে। দরদ দেখানো বুদ্ধিজীবীদের নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। তাঁদের বক্তব্য নিজেদের পক্ষে না গেলে, মনে হয় না তাঁদের সঙ্গে কোন দল সহযোগিতা করবে।

এই মুহূর্তে যে ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ গেম চলছে, সেখানে বিরোধী দলের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে আসবে, ক্রিকেট বিশ্বকাপ। আর সে কারণে শিরোনামে থাকবার সুযোগ হাতছাড়া হলে, হয়তো তখন আলোচনায় যোগ দিতে রাজী হবে বিরোধী দল। সরকারী দলও সুযোগটা নেবে বলেই ধারণা। আলোচনা আলোচনা খেলা খেলে যদি কিছু সময় পার করা যায়, তবে আন্দোলনে ভাটা পড়বে। আর একবার আন্দোলনে ভাটা পড়লে, বিরোধী দলের পক্ষে আর উঠে দাঁড়ান সম্ভব হবে না। সামনে কিছুদিনের ভেতরই বিরোধী দলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আন্দোলন কিভাবে আর কতদিন চালাবে। সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নের সমাধান করতে হবে তা হচ্ছে, বিশ্বকাপের সময় কিভাবে বিরোধীদল শিরোনামে থাকবে।

পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে সমর্থন দেয়া আসলেই কি অযৌতিক বা অনুচিত?

শেহজাদ আমান 

(১)

গত কিছুদিন আগে দেশে ক্রিকেট উৎসবের মহোৎসব বসেছিল এশিয়া কাপ আরটি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সৌজন্যে।তার পাশাপাশি কিছু মানুষ দাবি তুলেছিল যেবাংলাদেশ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের অন্য কোন দলকে সমর্থন করা চলবেনা। এরপাশাপাশি স্টেডিয়ামে অন্য দেশের পতাকা বহন করার এবং তা প্রদর্শন করা তোযাবেনা-ই।

এই ব্যাপারে তারা ব্লগে এবং মিডিয়ায় অনেক লেখালেখি করেছে। প্রথম আলোতেফারুক ওয়াসিফ এই ব্যাপারে একটা পুরো প্রন্ধই রচনা করে দিয়েছেন, “খেলায়পাকিস্তানকে সমর্থন কেন?”
( http://www.prothom-alo.com/opinion/article/166350 )

আমার বক্তব্য হল, ঢালাওভাবে বিষয়টা না দেখে আরও র্যাlশনালী বা লিবারেলভাবেবিষয়টা দেখা যেতে পারে। আমাদের দেশে স্পষ্টতই আইন আছে দেশের মাটিতেঅন্যদেশের পতাকা না উড়ানোর ব্যাপারেঃ

“Except as stated in the above Rules, the flag of a Foreign State shall not be flown on any car or building in Bangladesh without the specific permission of the Government of the People’s Republic of Bangladesh.”
(People’s Republic of Bangladesh Flag Rules, article 9.IV)
(http://www.cadetcollegeblog.com/adjutant/43624)

তো, এইখানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মাটিতে অন্য দেশের পতাকা উড়ানো আসলেইএকটা বেআইনি কাজ। বাংলাশের অধিবাসী হয়ে অন্য দেশের পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামেঢোকা উচিত নয়। সেইক্ষেত্রে সংশয় বা অস্পষ্টতার কিছু নেই।

কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, কিছু মানুষ অন্য দেশকে সমর্থন দেয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভআর রাগ প্রকাশ করে ফেসবুক আর ব্লগে বিভিন্ন মতামত দিয়ে গেছেন। বিশেষ করে , বাংলাদেশের বলতে গেলে ৫০-৬০% লোক যে বাংলাদেশের পর পাকিস্তান ক্রিকেট দলকেসমর্থন করে, সেই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। পাকিস্তানকে যে কোনমতেইসমর্থন করা যায়না, সেই ব্যাপারে তারা অনেকেই অনেক অনেক যুক্তির অবতারণাকরেছেন, এমনকি পাকিস্তানকে যারা সমর্থন করে, তাদের রাজাকার, নব্য রাজাকার, রাজাকারের দোসর, ছাগু, পাকি জারজ ইত্যাদি নানান ধরণের তকমা দিয়ে ভরিয়েফেলছিলেন।

কয়েক বছর আগে রাহিন রায়হান নামের এক ব্লগার (সম্পর্কে আমার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দের ছোট ভাই) প্রথম আলো ব্লগে লিখেছিলেন, “একালের নব্য যুদ্ধাপরাধীআবার কারা?আমি আসলে আমাদের তরুণ সমাজের সেই অংশটার কথা বলছি যারা নিজ দেশেরইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে উদাসীন।দেশের তরুণসমাজের বড় একটা অংশ কিন্তু এদের অন্তর্ভুক্ত।পাকিস্তানের খেলা হলে তাদেরগ্যালারীতে দেখা যায় পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে উল্লাস করতে।তাদের গালে আঁকাথাকে পাকিস্তানের পতাকা।এবং হয়ত বুকেও। এমনকি বাংলাদেশের সাথে খেলা হলেওএরা অনেকেই প্রকাশ্যে এবং অনেকেই মনে মনে পাকিস্তানের শুভকামনা করেথাকে।বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে হারলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় “yahooooo Pakistan jitse.shabash Pakistan!!!!!!!!”. তখন বাকরুদ্ধ হয়ে যাই।অবাকহয়ে ভাবি এরা কি আসলে বাংলাদেশি?এদের যুক্তি পাকিস্তানের প্লেয়াররাতো আর১৯৭১ এর জেনোসাইডে অংশ নেয়নি।তো তাদের সমর্থন করলে দোষ কোথায়?
না । এই যুক্তি আমি খন্ডাবো না।সত্যি বলতে আমার রুচি হয়না।এই নব্য রাজাকারদের আমার বোঝানোর কিছু নেই”।
(http://prothom-aloblog.com/posts/7/145671)

আসুন, আমরা বুঝতে চেষ্টা করি, এই ধরণের তকমা দেয়া আসলেই কতটা যুক্তিযুক্ত , সেই ব্যাপারটা। আর বুঝে দেখি আসলে এইসব ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদির দাবিগুলোআসলে কতটা বাস্তবসম্মত।

(২)

একসময় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল টেস্ট বা ওয়ানডে কিছুই খেলতো না। বাংলাদেশ১৯৯৭ সালে ওয়ানডে স্ট্যাস্টাস পায়, আর ২০০০ সালে পায় টেস্ট স্ট্যাটাস। তারআগ পযন্ত দীর্ঘদিন বাংলাদেশের মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই অন্য ক্রিকেট নেশনকেসমর্থন করতে হয়েছে।

পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ বলে বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেইপাকিস্তানকে সমর্থন করে এসেছে। তবে এটি পাকিস্তানকে সমর্থন করার একমাত্রকারণ নয়। পাকিস্তান বিশ্ব ক্রিকেতের পরাশক্তিগুলোর অন্যতম অনেকদিন ধরেই।তারা ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেট এবং ২০০৯ সালে টি-তোয়েন্টি বিশ্বকাপক্রিকটের শিরোপা জেতে। এর আগে ও পরে তারা অসংখ্য টুর্নামেন্ট এবংদ্বি-পাক্ষিয় সিরিজ জয়লাভ করেছে বিশ্বের সব ক্রিকেট শক্তির বিরুদ্ধে। তবে, শুধু সাফল্য দিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেত-উতকরষতা বিচার করা যাবেনা। ক্রিকেটঅনিশ্চয়তার খেলা যাকে বলা হয়, “The Game of Gloriuos Uncertainty”. আরক্রিকেট যদি অনিশ্চয়তার খেলা হয়, তবে এর সবচেয়ে সক্ষম ও বাস্তব উদাহরণ হলপাকিস্তান ক্রিকেট দল। তারা এমন একটা দল যারা একটা হারা ম্যাচ, যেখানে জয়অসম্ভব মনে হয়, সেখান থেকেও ম্যাচ জিতে আসে। তাদের খেলায় তাই আছেঅনিশ্চয়তা, রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা।

তবে, মানুষ যেহেতু জিততে জিততে হেরে যাওয়া ম্যাচের চেয়ে, হারতে হারতে জিতেযাওয়া ম্যাচের কথাই বেশি মনে রাখে, তাই পাকিস্তানের নৈপুণ্য ভাস্বর আসাধারণসব জয়কেই মানুষ বেশি মনে রাখে। যেমনঃ ১৯৮৪৫ সালে শারজায় জাভেদ মিয়াদাদেরশেষ বলে মারা ছক্কায় অথবা ২০১৪ সালে আফ্রিদির পরপর দুই বলে ছক্কা মেরে দলকেজেতানোর স্মৃতিই মানুষের চোখে বেশি ভাসে।

আমি যে কথা এখানে স্পস্ট করে বলতে চাচ্ছি, সেটা হল বাংলাদেশের মানুষ বাসকরে ঘোরতর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাদের নিজেদের জীবনেও অনেক রকম অনিশ্চয়তারমধ্যে থাকতে হয়। হরতাল, রাজনৈতিক সংঘরষের কারণে মানুষ জানেনা যে, সে আজবাসা থেকে বের হলে সুস্থমত ঘরে ফিরে আসতে পারবে কিনা? মধ্যবিত্ত বাঙালিজানেনা সামনের মাসের বাড়িভাড়া সে ঠিকমত দিতে পারবে কিনা, যদি বাড়িওয়ালাবছরের পর বছর ভাড়া বাড়িয়েই চলেন।

তবুও তারা দিনশেষে ‘যুদ্ধজয়’ করে বাসায় ফিরে আসে। মাস শেষে সে টেনেটুনে ভাড়া ঠিকই দেয়।
অনিশ্চয়তার ঘোরাটোপে বাস করা বাংলাদেশের মানুষ, তাই পাকিস্তানেরপারফরম্যান্স বা খেলার সাথেই যেন নিজেদের জীবনের মিল খুজে পায়। পাকিস্তানতাই নিজের অজান্তেই তাদের কাছে প্রিয় ক্রিকেট দলে পরিণত হয়েছে।

(৩)

আমাদের সমাজে বেশ কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে প্রতিবাদের ভাষাই হল পাকিস্তানবিরোধিতা করা। উগ্র জাতীয়তাবাদী এই সকল লোক যে কোন ইস্যুতে পাকিস্তানেরসমালোচনা, নিন্দা আর মুন্ডুপাতকেই দেশপ্রেমের উদাহরণ হিসেবে মনে করেন, সেইস্যু বাস্তবসম্মত বা যুক্তিযুক্ত হোক বা না হোক।
যেমন সচলায়তন ব্লগে ধ্রুব আলম নামে একজন কিছুদিন আগে একটা লেখা লিখেছিলেন “পাকিস্তান ভাল খেলে, তাই সমর্থন দেই। আসলেই?” নামে। সেখানে তিনি কিছুহাস্যকর স্ট্যাটিসটিকস দিয়ে প্রমাণ চেষ্টা করেছেন যে, পাকিস্তান আসলেই অতটাভাল খেলেনাঃ
( http://www.sachalayatan.com/guest_writer/51688 )

অথচ, তার দেয়া পরিসংখ্যান থেকেই এটা বোঝা যায় যে, পাকিস্তান অসাধারণ একটাক্রিকেট দল। ধ্রুব আলম নিজেই লিখেছেন, ২০০০ সালের পর থেকে পাকিস্তান ভারতেরসাথে ৪৮ টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে জয়লাভ করেছে ২৫ টিতে, হেরেছে ২৩ টিতে।

সেই লেখার শেষে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী লিখেছেন, “ছাগলামি ছাড়ুন, সাহস নিয়ে অন্তত স্বীকার করুন যে পাকিস্তান ভাল ক্রিকেট দল নয়। “

অথচ একজন পক্ষপাতহীন মানুষ তার লেখা দেখলেই বুঝতে পারবে যে এর মাধ্যমে পাকিস্তানের ভাল ক্রিকেট দলের স্বীকৃতিটাই লুকিয়ে আছে।

কাজেই পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বাংলাদেশী সমর্থকদের ছাগল প্রমাণ করতে গিয়ে লেখক নিজেই যে একটা ছাগল সেটাই কি প্রমাণ করলেননা?

সুষুপ্ত পাঠক নামের এক ব্লগার তার ব্লগে লিখেছেন যে, “আমরা মুসলমান থেকে বাঙালি হতে পারলাম না।“
(https://www.amarblog.com/index.php?q=susupto-pathok/posts/177806)

এখানে বলে রাখা ভাল যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বড় কোন টুর্নামেন্টে ভালো করতেপারে না দেখেই কিন্তু মানুষ বাংলাদেশ বাদেও পাকিস্তান বা ভারতকে অনেকটাবাধ্য হয়েই সাপোর্ট করে। কারণ, তাদের শিরোপা জয়ের সামর্থ্য আছে, যেটাবাংলাদেশ দলের নেই। আর বাংলা ভাষাভাষী অন্য ধর্মের অন্য কোন দেশও তোসেমি-ফাইনাল বা ফাইনাল ম্যাচে পাকিস্তানের সাথে সাথে খেলে না যে বাংলাদেশেরমানুষ সেই দেশকে সমর্থন করবে। তাই, এখানে মুসলমান থেকে বাঙালি হতে পারলামনা’—সেই কথা বলাটাও বোকামি। আর এখানে প্রশ্ন রাখতে হয় যে, বাঙ্গালী হলে কিএকটা মুসলিম দেশ ভাল খেললে তাকে সাপোর্ট দেয়া যাবেনা?

এরকম আরও হাজারো ছাগল আমাদের দেশে রয়েছে, পাকিস্তান তো পাকিস্তান, পাকিস্তানের মানুষজনদের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ‘মারখোর উমুক’, ‘মারখোরতুমুক’ টাইটেল লাগিয়ে দেয়, সেই লোকটা বাংলাদেশের প্রতি যতটা সজ্জনই হোকনাকেন। দেশের প্রয়জনে, দেশের ক্রান্তিলগ্নে, দেশের মানুষের জন্য কাজ করার, মাঠে নামার দরকার এরা অনুভব না করলেও মনে মনে একটা প্রশান্তি তারা লাভ করেএই ভেবে যে—“যাক, আর কিছু না হোক পাকিস্তান, পাকিস্তানী আর পাকিস্তানীক্রিকেট দলের সমর্থকদের তো অন্ততফেসবুক আর ব্লগে শোয়ায় দিছি…”

(৪)

খেলাধুলার ময়দানে মানুষ সেই সব ক্রিকেট শক্তিকেই সমর্থন দিয়ে থাকে, যারাকিনা অনেক দূর যাওয়ার, বিশেষ করে শিরোপা জয়ের ক্ষমতা রাখে। যেমন, সাফফুটবলে বাংলাদেশ শিরোপা জয়ের ক্ষমতা রাখে। তাই, সাফ ফুটবলে বাংলাদেশেরমানুষ বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন দলকে সমর্থনের প্রয়োজন মনে করেনা।

তাইতো, সাফ ফুটবল বাংলাদেশে আয়োজন করা হলেও পাকিস্তানের বা ভারতের ম্যাচের সময় পাক বা ভারতী পতাকা উড়াবার ঘটনা চোখে পড়েনা।

কিন্তু, ক্রিকেট খেলার ব্যাপারতা ভিন্ন। ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ কোনআন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফেভারি্ট থাকেনা। এশিয়া কাপ বা বিশ্বকাপে তাদেরচ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্যাতা নেই। বিশ্বের সেরা দল হিসেবে র‍্যাঙ্কিং-এর১-২-৩-এ থাকার যোগ্যতাও হয় নাই। এখানে স্বাভাবিকভাবেই তাই মানুষ চ্যাম্পিয়নহওয়ার মত দলকেই সাপোর্ট করে। তাইতো, ভারত বা পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কাকেসমর্থন দিতেই তাদের ম্যাচে বাংলাদেশের মানুষেরা ব্যানার-প্ল্যাকার্ডইত্যাদি নিয়ে আসে। এসব দলকে মানুষ সমর্থন দেয় এই জন্য যে, তারা চ্যাম্পিয়নদলের সমর্থনকারী হতে চায়। বাংলাদেশের যদি সেইসব টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নহওয়ার যোগ্যতা থাকতো, তবে সাফ ফুটবলের মত সেইসব টুর্নামেন্টে বাংলাদেশইশুধুমাত্র সমর্থন পেত। অন্য কোন দেশের সমর্থন দিতে মানুষ টিভির সামনেবসতোনা, বা স্টেডিয়ামে যেতনা।

আর এটাও মাথায় রাখতে হবে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন। বাংলাদেশটেস্ট বা ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার অনেক আগে থেকেই পাকিস্তান বা ভারত বিশ্বক্রিকেটের সফল দল এবং বাংলাদেশের মানুষ অনেক আগে থেকেই তাদের সমর্থন করেএসেছে।

এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ যতদিন না পর্যন্ত ক্রিকেটীয় সাফল্যে ভারত-পাকিস্তানবা শ্রীলঙ্কার সমপর্যায়ে যেতে না পারছে, ততদিন পর্যন্ত মানুষ অন্য দলকেসাপোর্ট করবেই।

আর একটা মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকেই দেশের বেশিরভাগ মানুষসাপোর্ট করবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, ইসলাম ধর্ম জিনিসটা বাংলাদেশেরমুসলিমদের লাইফস্টাইলের মধ্যে অনেক গভীরভাবে কাজকরে। পাকিস্তানেরচিত্তাকর্ষক, রোমাঞ্চকর খেলার ধরনের কথা না হয় আবার উল্লেখ নাই করলাম।এজন্য তাদের নব্য রাজাকার বলা শুধু ভুলই নয়, আমানুষিক। এখানে আমি ‘সবুজ’ নামে আমার এক ঢাকা কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাইয়ের কথা উল্লেখ করবো, যে কিনাপাকিস্তানের সমর্থন করে, তবে অবশ্যই বাংলাদেশের পর। এইবারের এশিয়া কাপ২০১৪-এ বাংলাদেশ-পাকিস্তান’ ম্যাচে বাংলাদেশের নিশ্চিত জেতা ম্যাচ আফ্রিদিযখন একের পর এক ছক্কা মেরে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ও আমাকে বললো, “ভাই,আফ্রিদি একটা কইরাছক্কা মারে, আর আমার মনে হইতাছে কেউ আমার বুকেএকবার কইরা ছুরি মারতেছে ভাই”।

এখন, উগ্র জাতীয়তাবাদী ছোট ভাই রাহিন রায়হানের বক্তব্য অনুযায়ী আমার আরেকছোট ভাই সবুজতো তাহলে একজন ‘নব্য রাজাকার’। একজন ‘নব্য রাজাকার’-এরবাংলাদেশের পরাজয়ে বুকে ছুরির আঘাত পাওয়ার মত ব্যাথা হয়! ভালো তো, ভালো না?

সবুজের মত মানুষকে নব্য রাজাকার ট্যাগ দিতে গেলে বিশেষ পরিমাণেনিচুমনমানসিকতার মানুষ হতে হবে। রাহিন রায়হানের মত মানুষদের নিজেকে প্রশ্ন করাউচিত, আসলে তার নিজের মনমানসিকতা কোন পর্যায়ের…!

আমরা শুধু পাকিস্তান পাকিস্তান বলি, অন্য দেশগুলোর কথা বলি না কেন, ভারতেরকথা বলি না কেন? পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যদি দেশকে ভালোবেসে হয়, তাহলেভালো কথা। কিন্তু ইসলাম বিরোধীতাঁর কারণে যদি হয় তাহলে সেটা দুঃখের বিষয়।

কই, ভারতকেতো দেশের ১০-১৫% লোক সাপোর্ট করে। ভারতকে সাপোর্ট করা ঠিকহবেনা, এমন কোন লেখা তো চোখে পড়ে নাই। ৭১’ সালের পর ভারত কি আমাদের সাথে কমকরেছে? গতকালই তো বিজেপির এক প্রভাবশালী নেতা দাবি করলেন, “বাংলাদেশেরখুলনা থেকে সিলেট, এক তৃতীয়াংশ নাকি ইন্ডিয়ার দখলে নেয়া দরকার”।

আর এটাওতো সত্য যে, পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের প্রতি যতটা সহমরমী, অন্য কোন দেশের ক্রিকেটাররা তা কমই আছেন।

৭১’ সালে পাকিস্তানের বর্বর ভূমিকার কথা সবাই জানে। পাকিস্তান বাংলাদেশেরকাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সেজন্য ক্ষমা চায়নি, এটাও সত্য। কিন্তু, বাংলাদেশেসরকার তো অনেক আগেই পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিয় সম্পর্ক বজায়রেখেছে। সেটা যদি করা যায়, তাহলে ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানকে সমর্থন করাঅনৈতিক বা অনুচিত হবে কেন?

পরিশিষ্টঃ যারা পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে সমর্থনের বিরোধিতা করছেন, তারা আশাকরি পাকিস্তানের সাথে সবরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিরোধিতাও করবেন ।সার্কের সদস্য হিসেবে পাকিস্তান যদি আঞ্চলিক উন্নয়নে একটা ভাল পরামর্শদেয়, আর বাংলাদেশ তাকে সমর্থন করে, তাহলেওতো (কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদীরচোখে) একাত্তরের চেতনার অবমাননা হবে, তাই নয় কি…?

যাই হোক, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যদি ক্রিকেট-বিশ্বে সত্যিই পরাশক্তি হিসেবেআবির্ভূত হতে পারে, তবে আশা করা যায় পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলোকে সমর্থনদেয়ার প্রবণতা অনেক কমবে। ‘জেতা ম্যাচ হেরে যাওয়া’র বর্তমান ধারা বদলে তারা ‘নিশ্চিত হারা’ ম্যাচেও দেশকে জয় উপহার দেবে, নাটকীয় ও রোমাঞ্চকরভাবে।বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নিকট ভবিষ্যতে সেই সুখের দিন আমাদের উপহার দেবে বলেবিশ্বাস রাখি।

সমূদ্র স্নান বিশেষ করে সেন্ট মার্টিনে যাবার আগে জেনে নিন

3

সরকারী কলেজে চাকরী করার সময় পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবেই শিক্ষার্থীদের ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা সফরে নিয়ে যেতে হতো। মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা সব সময়ই কক্স বাজার, সেন্ট মার্টিন যেতে চাইতো। সেই সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকেই কিছু কথা বলছি। হয়তো এই কথাগুলো কেউ পড়লে এবং মেনে চললে আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মত অনাকাঙ্খিত প্রাণহানি আর ঘটবে না।

১/ আপনি সাঁতার জানেন তো? সাঁতার না জানলে সমূদ্রে আপনার নিরাপদ এলাকা হচ্ছে, ভাটার সময় গোড়ালি পর্যন্ত আর জোয়ারের সময় হাঁটু পর্যন্ত (তাও যদি আশেপাশে সাঁতার জানা লোক থাকে)

২/ সমূদ্রে নামার আগে জেনে নিন জোয়ার চলছে, না ভাটা চলছে। ভাটার সময় সমূদ্রে নামা ভয়ঙ্কর বিপদজনক! খুব বেশি নিরুপায় হলে ভাটার সময় বড়জোর পায়ের গোড়ালি ভেজাতে পারেন, এর বেশি নয়।

৩/ জোয়ারের সময় যদি সাতার কাঁটতে বা গোসল করতে পানিতে নামতে চান, তাহলে প্রথমে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জেনে নিয়ে নিশ্চিত হোন কোন জায়গাটা সাতার/গোসলের জন্য নিরাপদ। সাধারণত বেশিরভাগ মানুষ কক্সবাজারের বিশাল সৈকতে সাতারের অভিজ্ঞতা নিয়ে টেকনাফ বা সেন্ট মার্টিনের সৈকতে সাতার/গোসল করতে নেমে বিপদে পরে। এই বিষয়টা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নিন যে, কক্সবাজারের মত এত ধীর ঢালের এবং দীর্ঘ সৈকত পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই আছে। তাই হাটু পানি থেকে কোমর পানিতে যাবার আগে অবশ্যই দশবার চিন্তা করুন। ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন ওখানে কোন বিপরীত তলদেশীয় স্রোত বা ডুবো গর্ত আছে কী না।

৪/ আপনি নিশ্চিত সাঁতার জানেন। কিন্তু এটা খেয়াল আছে কী কতদিন আগে আপনি শেষবারের মত সাঁতার কেটেছেন? এ কথা সত্যি যে সাঁতার শিখলে তা ভোলা সম্ভব না। কিন্তু সাঁতার হচ্ছে একটি কঠিন ব্যায়াম যাতে শরিরের প্রায় প্রতিটি পেশি কাজ করে। যে কারণে দীর্ঘদিন পর সাঁতার কাটতে গেলে অনেক সময় পায়ের পেশি সংকোচন সমস্যা (কাফ মাসল বা থাই মাসল পুল) দেখা দেয়। পেশি সংকোচন হলে যে যন্ত্রণা হয় তাতে সাঁতার অব্যাহত রাখা মুশকিল হয়ে পরে। এই কারণে সমূদ্রের গভীর এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে অনেকে সাতার জানা থাকার পরও ডুবে যান।

৫/ সেন্ট মার্টিনে গিয়ে কখনো জেটি থেকে নেমেই ডান দিকের (দ্বীপের পূর্ব দিক) সৈকত ধরে আগাবেন না (ম্যাপে নীল চিহ্নিত দাগ)। তা না করে বরং মূল রাস্তা ধরে দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম অংশে চলে যান। সেখানে গিয়ে সমূদ্রে নামুন। তারপরও জোয়ার-ভাটার বিষয়ের সাথে সাথে খেয়াল রাখুন সেন্ট মার্টিন একটি প্রবাল দ্বীপ। এর সৈকত খুবই সংকীর্ণ এবং এখানে হাটু-পানির চেয়ে বেশি দূরত্বে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয় (তা আপনি যত বড় সাঁতারুই হোন)।

সেন্ট মার্টিনের বিপদজনক সৈকতের মানচিত্র

৬/ জেটি থেকে নামার পর নিতান্তই যদি আপনি সৈকতে হাটার লোভ সামলাতে না পারেন, তাহলে নীল দাগ ধরে হাটতে চাইলে হাটুন। তবে সাবধান! কোন ক্রমেই পানিতে নামবেন না। একবার পানিতে নামলে আপনার আর উঠতে ইচ্ছে করবে না এবং হাটতে হাটতে আপনি সেন্টমার্টিনের মৃত্যু অন্তরীপ উত্তর-পূর্ব সৈকতে চলে যাবেন। দ্বীপের এই সৈকতে পরষ্পর বিপরীতমূখী পৃষ্ঠ ও তলদেশীয় স্রোতের কারণে অনেকগুলো ডুবো গর্ত তৈরী হয়েছে। তাছাড়া তলদেশীয় বিপরীত স্রোত (বটম কারেন্ট) আপনাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং অবশ্যই এই লাল চিহ্নিত বিপদজনক এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

শিক্ষার্থীদের নিয়ে সফরে যাবার বাজে অভিজ্ঞতার দিক হচ্ছে, ওখানে গেলে ওরা কেউ আর আমাদের কথা শুনতে চায় না, নিষেধ মানতে চায় না। ওরা স্বাধীনভাবে সব কিছু করতে চায়; সাহস দেখাতে চায়। অভিজ্ঞদের পরামর্শ না শুনে এবং অতিরিক্ত সাহস দেখিয়ে আর কোন জীবন যেন ঝরে না যায় সে বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে বোঝানোর প্রয়োজন অনুভব করছি।

রাষ্ট্রের প্রতি আমার কোন দাবী নেই। টানা পনেরো বছর পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা বিধানের অনুরোধ করে উপেক্ষিত হবার পর এটা বুঝেছি যে, রাষ্ট্র শুধু আমাদের মত আম জনতার কাছ থেকে নিতেই জানে। তারা দেয় কেবলমাত্র উঁচু তলার মানুষকে। তাই আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের নিজেদেরই দেখতে হবে।

পরিশেষে ওয়ার্ল্ডভিউ-২ উপগ্রহ থেকে তোলা ছেঁড়া দ্বীপসহ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একটি ফলস কালার ইনফ্রারেড কম্পোজিট ইমেজ।

সেন্ট মার্টিনের উপগ্রহ চিত্র

শীতকালীন অলিম্পিক গেমস ও সন্ত্রাসী ঘটনা। আড়ালে কি আছে??? -Husasain Sumrat

 

পাশ্চাত্য মিডিয়াতে সন্ত্রাসবাদ ও সচি অলিম্পিক নিয়ে বেশ লেখালেখি হচ্ছে। ২৭ জানুয়ারি’১৪ তে বিবিসি তে ব্রিটিশ সরকারের একটি সতর্কসূচক বক্তব্যও ছাপানো হয়। সচিতে অলিম্পিক মশাল আসার সাথে সাথে সিএনএন ১০০০ জন লোকের উপর জরিপ করে। যেখানে ৫৭% আমেরিকান মনে করে সেখানে সন্ত্রাস হবার সম্ভাবনা আছে। তার আগের খবরে বলা হয় রাশিয়ার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের জন্য হটস্পট হল চেচনিয়া। যেখানে একে তাঁরা “Black Window” নামে আখ্যায়িত করেছেন। ড. গডন উও বলেছেন সেখানে সন্ত্রাসী হামলা ঘটার সমূহ সম্ভবনা রয়েছে।

““Because of the history between the Russians and the Chechen people who splintered to form the Caucasus Emirate, Sochi is a prime target for terrorism,” said Woo, who has advanced insurance modelling of catastrophes, including designing a model for terrorism risk.” (http://www.ibtimes.co.uk/sochi-winter-olympics-terrorist-attack-very-likely-happen-1435265)

এই খেলাটি যখন চলছে তখন পৃথিবীতে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে চলছে সর্বচ্চ দন্দ (on the basis of geopolitical chessboard)। সব বিখ্যাত পত্রিকা ও সাময়িকী চোখ ঘুরিয়েছে “Black Widow” এর দিকে। তাঁরা লেখে যাচ্ছে মনের মাধুরী মিশিয়ে। টিভিও বসে নেই। এইসব স্লানটেড মিডিয়ার উদ্দেশ্য হল রাশিয়ার কতৃপক্ষকে বিব্রত করা।

কোন মিডিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। সেটি হল এই ককেসিয়ান  সন্ত্রাসের পেছনে কে আছে???!!! যা কিনা এই সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি নিরূপণে সহায়তা করবে।

আমরা যদি আল-কায়েদার ইতিহাস দেখি এবং বর্তমানে লিবিয়া ও সিরিয়াতে যদি দেখি তাহলে স্পষ্ট বুঝতে পারি তাঁদের পেছনে ছিল পাশ্চাত্য শক্তি।

একটু ইতিহাসের দিকে যাওয়া যাক –

এই চেচনিয়ান জিহাদিদের পেছনের কথা কি বলে? যাদেরকে প্রমাণ না করা গেলেও বলা হচ্ছে যে এরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করবে।

১৯৯০ সালের দিকে যখন সোভিয়েত উনিয়ন ভেঙ্গে যায় তখন থেকেই রাশিয়ার সাথে একটি শীতল যুদ্ধ চলছে চেচনিয়াকে রাশিয়া থেকে আলাদা করার জন্য যা কিনা তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের জন্য Strategic rout হবে। এটি একটি Intelligence অপারেশন (গোপন)। চেচেন বিদ্রোহীদের প্রধান দুই নেতা শামিল বাচাজেভ ও আল খাত্তাব সিআইএ সহায়তাপুষ্ট পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। They were indoctrinated there. তাঁরা আল-কায়েদাদের সাথেও যুক্ত হয় যা কিনা আইএসআই সহায়তাপুষ্ট। যার পেছনে আছে সিআইএ। চেচনিয়াতে এদেরকে ফান্ডিং করে সৌদি ওহাবি মিসন।

The ISI played a key role in organizing and training the Chechnya rebel army:

“[In 1994] the Pakistani Inter Services Intelligence arranged for Basayev and his trusted lieutenants to undergo intensive Islamic indoctrination and training in guerrilla warfare in the Khost province of Afghanistan at Amir Muawia camp, set up in the early 1980s by the CIA and ISI and run by famous Afghani warlord Gulbuddin Hekmatyar. In July 1994, upon graduating from Amir Muawia, Basayev was transferred to Markaz-i-Dawar camp in Pakistan to undergo training in advanced guerrilla tactics. In Pakistan, Basayev met the highest ranking Pakistani military and intelligence officers (Levon Sevunts, “Who’s Calling The Shots? Chechen conflict finds Islamic roots in Afghanistan and Pakistan”, The Gazette, Montreal, 26 October 1999.)

Following his training and indoctrination stint, Basayev was assigned to lead the assault against Russian federal troops in the first Chechen war in 1995. (Vitaly Romanov and Viktor Yadukha, “Chechen Front Moves To Kosovo”, Segodnia, Moscow, 23 Feb 2000)

সচি অলিম্পিক রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনের কেন্দ্রে অবস্থিত (ব্ল্যাক সি)। ১৯৯০ এর দিকে রাশিয়ান ফোরসের সাথে চেচনিয়ান বিদ্রোহী (US sponsored) ও আল কায়েদার মতো আরও দল পরাজিত হয়।

রাশিয়া ভিত্তিক আল-কায়েদা ও মিডিল ইস্টের বড় নেটওয়ার্ক, মধ্য এশিয়া ও বাল্কানের আল-কায়েদাদেরা এই অলিম্পিকের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিন্নিত করা হচ্ছে। যা কিনা ‘সিআইএ’ এর বড় অ্যাসেট।

বলার প্রয়োজন পরেনা যে মস্কো এটি খুব ভাল করেই জানে – আল-কায়েদা সিআইএ এর বড় অস্ত্র এবং তাঁরা গোপনে তাঁদেরকে সহায়তা করছে এই অলিম্পিক আসরে ভীতি ছড়ানোর জন্য।

Within the Russian military and intelligence establishment, this is known, documented and discussed behind closed doors. Yet at the same time, it is a “forbidden truth”. It is taboo to talk about it in public or to raise it at the diplomatic level. Washington knows that Moscow knows: “I know you know I know”.

The more fundamental questions which both the Russian and Western media are not addressing for obvious reasons:

  • Who is behind the Caucasus terrorists?
  • What geopolitical interests would be served, were the US and its allies to decide to trigger a “False Flag” terror event before or during the Sochi Olympic Games?

আমাদের মনে রাখা দরকার চেচনিয়া জিহাদিদের সাথে ন্যাটোর একটি যোগসূত্র আছে। ন্যাটো আমেরিকার সঙ্গী। নিম্নোক্ত লিঙ্কটি দেখে নিতে ভুলবেন না।

http://www.boilingfrogspost.com/2011/11/22/bfp-exclusive-us-nato-chechen-militia-joint-operations-base/

 

একজন আকরাম খান, ক্রিকেট এবং আমাদের নব্য রাজাকারি

 বিসিসিবি যখন ভারতীয় আনুগত্য স্বীকার করে বাংলাদেশের ক্রিকেট কে ধ্বংস করার প্রস্তাব নিল, সেই প্রস্তাবে যেই সব  ডিরেক্টর সমর্থন জানাইছে তাদের মধ্যে আকরাম খান এর নাম দেখে অনেকেই অবাক হইছে।সুইট, কাডলি, পছন্দনীয় ব্যক্তিত্ব আকরাম খান যার হাত ধরে আইসিসি  সহযোগী দেশ থেকে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করলো এবং সেই পথ ধরে টেস্ট স্ট্যাটাস পেলো –সেই আকরাম খান বাকি ২০ জন ডাইরেক্টর এর সাথে দেশের পেটে ছুরি মারবে সেইটা অবিশ্বাস্য লাগছে অনেকের কাছে।

download (6)

আমার  শহরের প্রোডিগাল সান হিসেবে আকরাম ভাই এর আকরাম খান হয়ে ওঠা নিজের চোখে দেখেছি।

উনার মত এত মিষ্টি-ভাসি এবং এত  চমৎকার মানুষ হয় না। শুধু উনি না, উনার পুরো ফ্যামিলিটারই ব্যবহার, চলন, বলন অনুসরণ করার মত । মৃদু ভাষী, খেলা ধুলার ব্যাপারে অসম্ভব প্যাশনেট  এই এই পরিবার থেকে বাংলাদেশের সেরা সেরা  প্রতিভা উঠে আসছে এবং দেশ এই পুরো পরিবারটার কাছ থেকে অনেক পেয়েছে । এবং খেলা পাগল এই মানুষটা দেশের ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দেয়ার একটা প্রস্তাবে বিনা বাধায় সম্মতি দিছে সেইটা মানতে উনাকে যারা চিনে তাদের অনেকেরই অবিশ্বাস্য লাগবে।

তার প্রজন্মের অনেকের মতই আকরাম খান  উঠে এসেছে চিটাগাং এর স্টার যুব ক্রিকেট থেকে।

এক সময় জাতীয় দলে ১১ জনের মধ্যে ৭ জন ছিল চিটাগাং এর। সেইটা বলতে গেলে স্টার যুব ক্রিকেটের অবদান।

আমাদের যখন কৈশোর তখন শীত আসলে হই হই রই রই পরে যেত। তখন ক্রিকেট খেলা হত শীত কালে। এবং এই টুর্নামেন্টের এক একটা খেলায় কি পরিমাণ প্যাশন থাকত সেইটা বলে কেও বোঝাতে পারবেনা। তখন অনেক গুলো লেয়ারে খেলা হতো।

স্কুল পর্যায়ে নির্মাণ স্কুল, নবীনদের জন্যে স্টার যুব, তারপর ফার্স্ট ডিভিশন। ফার্স্ট ডিভিশনের  বেশির ভাগ দলের একটা জুনিয়র টিম থাকত যারা স্টার যুবতে খেলত। এবং স্টার যুবতে ভালো খেললে সিনিয়ার টিমের সাথে প্রাকটিসে এর সুযোগ। এবং সেইখানে পারফর্ম করতে পারলে ফার্স্ট ডিভিশন।

একদম অতিরিক্ত ন্যাকা গুডিবয়  স্বভাবের ছেলেরা বাদে মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতিটা ছেলে তখন বিকেলে খেলতে বেরোত।

নাম বেটে বা  ইট দিয়ে  নাম্বার লিখে  ব্যাট দিয়ে ঢেকে লটারি করে। কেও যদি ভালো খেলতো তো সে চাইলে স্টার যুব টিমের নেটের পাশে  গিয়ে রিকুয়েস্ট টিকুয়েস্ট করে, একটু বোলিং বা ব্যাটিং করার সুযোগ পেত।   এবং ভালো দেখলেই কোচেরা তাকে সুযোগ দিত।  তারপর আরো ভালো খেললে ফার্স্ট টীমে সুযোগ। এবং এইটা ছিল বিশাল কুল ব্যাপার।

আমার কৈশোরের  বড় একটা সময় গ্যাছে, স্টার যুবতে পাড়ার দলে চান্স পাওয়ার আশায় বাসার সামনের মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত ঘুরিয়ে লেগ ব্রেক আর গুগলি প্রাকটিস করতে গিয়ে। কিন্তু গুগলিটারে  কখনোই কন্ট্রোল করতে পারি নাই। ফলে আমার শিকে ছিড়ে নি। কিন্তু বড় ভাইরা সবাই স্টার যুবতে খেলেছিল। আমি ন্যাচারাল স্পোর্টস-ম্যান না। আর  ভাল না খেললে চান্স পাওয়া অসম্ভব ছিল।

কিন্তু, আবেগের অভাব ছিলনা।  স্কুল শেষে ভাত খেয়েই বিছানায়, লেপ এর মধ্যে লম্বা বালিশ ঢুকিয়ে একটা মানুষের অবয়ব সৃষ্টি করে পেছনের দরজা দিয়ে আউটার স্টেডিয়ামে দৌড়। কি সব দারুন খেলা হত ? এনভায়রনমেন্টটা ছিল নেশার মত। দুইটাকার সি বিখ্যাত ওভালটিন আইসক্রিম  যেটায়  একটা কিসমিস থাকতো। আর আব্বাসের বিখ্যাত  গালি ? হায়রে কি সব স্মৃতি। “কোক খাই নাইম্মোস  না ?”  । ফ্রেন্ডস ক্লাবের সাথে মোহামাডান ব্লুজের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব।

আকরাম খান  সেই ভাবেই উঠে আসে। উনি চিটাগাং এর প্রোডিগাল সান ।

উনি নামলে ছক্কা নিশ্চিত।  “আকরাম!! বাংলা হোটেল পঞ্চাশ “ ।  মানে ছক্কা যদি বাংলা হোটেলে গিয়ে লাগে, তাইলে ৫০ টাকা। আউটার স্টেডিয়াম প্রস্থে ছোট। উনি খুব কমই মিস করেছেন। উনাকে দেখতাম সারা দিন টুকটুক করে একটা রশিতে বল ঝুলিয়ে নক করত, বারান্দায়। চিটাগাং  এর ভাল প্লেয়ারদের ঢাকায় নিয়ে যেত রেলওয়ে টিমে খেলার জন্যে । পেপারে দেখতাম রেলওয়ে টিম কেমন করছে, আকরাম ভাই কত রান করেছে।  উনি এই শহরবাসীকে নিরাশ করেন নি। উনি আকরাম খান  হয়েছেন। আইসিসি ট্রফি জিতে বাংলাদেশকে ওয়ার্ল্ড কাপে এনেছেন।

সেই স্টার যুব ক্রিকেট বন্ধ হয়ে গেল কেন জানিনা।

শুনেছিলাম, আজগর ফ্যামিলির, ইস্পাহানী, আর আবেদিন ফ্যামিলির গ্যাঞ্জামে  – আমি এত ডিটেল জানিনা। শুধু জানি হটাত  বন্ধ হয়ে গেল। তারপর দেখলাম, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা শুরু  হলো। ডিসেম্বর এর ১ তারিখ থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে খুড়ে বারোয়ারী মেলা। মাঠ নষ্ট করে দিল, পিচ নষ্ট করে দিল, অসংখ্য মানুষের পদতলে আউটার স্টেডিয়াম এর চমৎকার সবুজ ঘাস নষ্ট হয়ে গেল – চট্টগ্রাম এর অসাধারণ সুন্দর ক্রিকেট কালচার নষ্ট হয়ে গেল, কিশোর আর তরুণদের খেলা বন্ধ হয়ে গেল, পরিচিত অনেকেই ফেন্সি আর গাঞ্জায় ঢুকে গেল। আউটার  স্টেডিয়ামকে আর ভাঙ্গা   হোল ইনার সটেডিয়ামকে দুই তলা করার জন্যে। অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। শুধু বছরে এক কি দুইবার ইন্টারনাশ্নাল  খেলায় একটু বেশি দর্শকের জন্যে, শহরের তরুনদের খেলার মাঠ ধ্বংস করা হোল। বিশাল বিশাল ফ্লাড  লাইট দিয়ে মাঠের বসার জায়গা নষ্ট করা হোল। চট্টগ্রাম এর ক্রিকেট থেকে   সত্যিকার এর প্রতিভা আসা বন্ধ হয়ে গেল। অথচ  এই চট্টগ্রাম এক সময় জাতীয়  দলে এক সাথে ৭ জন ক্রিকেটার ফার্স্ট টিমে খেলতো।

2012-05-08__sp04

আমি বিশ্বাস করি, শুধু  মাত্র স্টার যুব ক্রিকেট যদি ঠিক মত চালু থাকত বাংলাদেশের ক্রিকেট  এখন  ভারত পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার লেভেলে থাকতো।

কিন্তু, সেই ক্রিকেট এখন চেঞ্জ হয়ে গ্যেছে। এখন পুরো দেশের ক্রিকেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার জাতীয় দলের ১১ জন খেলোয়াড় তৈরী করার জন্যে ডিজাইন করা। এইটা আমার অদ্ভুত লাগে।

কারণ আমি সব সময় মনে করছি, একটা স্পোর্টস হচ্ছে পাবলিক আর পোলাপানের খেলার জিনিস। মাস  পিপল  স্পোর্টসে পার্টিসিপেট করবে,সেই খান থেকে ফিজিক্যাল ফিটনেস হবে, কম্পিটিটিভনেস শিখবে, হারতে শিখবে। এবং সেই মাস পার্টিসিপেশানে যারা ভালো করবে তারা  কম্পিটিটিভ লিগ খেলবে। এবং লেয়ারে লেয়ারে এগিয়ে এক সময় দেশের প্রধান  লিগে সারা দেশের সব চেয়ে প্রতিভাবানরা খেলবে। এবং তাদের মধ্যে সেরা ১১ জন ন্যাশনাল টীমে   খেলবে।

এইটা একটা বটম আপ ইস্যু। টপ ডাউন না।

এবং এই জন্যে আবার ক্রিকেটকে  অনেকে সমালোচনা করত এই বলে,  এই খেলায় যেহেতু ব্যাট প্যাড এত কিছু লাগে, তাই

এইটা কখনই দেশের প্রধান খেলা হইতে পারবেনা। শুধু মিডল ক্লাস বা আপার মিডল ক্লাস এর খেলা হবে। কারণ, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের সেই সামর্থ্য নাই।

সারা পৃথিবীতে সব স্পোর্টস এর মোজেজা এই। আমাদের দেশেও  এই রকম ছিল । আসল ইস্যু হইলো, দেশের ম্যাক্সিমাম মানুষের পার্টিসিপেশান । জাতীয় দলের জন্যে খেলা না, খেলার জন্যে জাতীয় দল।

কিন্তু এখন বিসিসিবি আর তার ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন  ভাবে সাজানো হইছে তাতে এখন আছে কিছু ট্রেনিং ইন্সটিটিউশন আর ক্লাব।  সেই খানে বড় লোকের পোলা পাইন মাঞ্জা মেরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পার্ট দেখাইতে দেখাইতে গিয়ে নেট প্রাকটিস করবে, এবং সেই প্রাকটিসে করে তারা এক সময় বিসিসিবির এলিট প্রোগ্রাম, এই প্রোগ্রাম সেই প্রোগামে আরো প্রাকটিসে করে জাতীয় দলে যাবে। কিন্তু দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর খেলার দরকার নাই।

আমি ঢাকায় বিকেলে ঘুরতে গিয়ে শুধু আনমনেই  খুঁজি  খোলা মাঠ। কেও  ক্রিকেট খেলছে কিনা । কেও বোলিং করতে দেখলে, একটু থমকে দেখি বলটা কেমন করলো। তার ডেলিভারি টা কেমন, ব্যাটসম্যান এর স্টান্স টা কেমন। প্রায়ই হতাশ হই, দেখি টোক্কা বোলিং করতে। এবং কষ্ট লাগে যখন দেখি,  সারা শহরে হাতে গোনা কিছু জায়গা ছাড়া – তেমন কেও খেলছে। সারা শহরে ১ হাজার ছেলেও বোধ হয় খেলার  সুযোগ পায় না।    অথচ এই শহরে ১ কোটি মানুষ। দুঃখ তার  মধ্যে ১ হাজার কিশোর ক্রিকেট খেলার মাঠ পায় না। তাহলে কিসের জন্যে জাতীয় দল ? আর সেই জাতীয় দল কেমনে  ভালো খেলবে ? মানুষ যদি খেলার সুযোগ না পায় তো জাতীয়  দল দিয়ে কি হবে ?  সেই দল ভালো খেলবে কেমনে ? নেট প্রাকটিসে করে করে ? ফুহ। খেলা শুরু করতে হয় , নাম বেটে। ইট দিয়ে, দাগ দিয়ে। হারতে শিখে, জিততে শিখে, বাপের টাকায় ট্রেনিং একাডেমীর পিচে নেট প্রাকটিস করে কখনোই খেলা শিখা  যায় না- টেকনিক শিখা যায়। খেলা আর টেকনিক একই জিনিস না।

এইটা আমরা মেনে নিছি। ক্রিকেট এখন হয়ে গ্যাছে, বিসিসিবি সিজেকেপি এবং অন্যান্য সংস্থা গুলোর টাকা বানানোর মেশিন।

বিভিন্ন জেলার ধান্দাবাজ টপ রাজনীতিবিদেরা এখন সেই জেলা ক্রীড়া সংস্থার  চেয়ারম্যান। তারা চিন্তা করে, স্টেডিয়াম এর মাঠে কেমনে একটা মার্কেট করা যায়। কেমনে খোলা মাঠের পাসে দুইটা চেয়ার বসায় দিয়ে চটপটি-ওয়ালাদেরকে দিয়ে ধান্দা করা যায়। বিসিসিবি এখন আইসিসি থেকে টাকা পায়, বিভিন্ন টুর্নামেন্ট করলে, স্পন্সর এবং টিকেট বেচা থেকে টাকা পায়। এবং বিভিন্ন ভাবে বিশাল টাকা  কামানোর মামলা আজকে  বিসিসিবি।  সেই মেশিন চালু রাখতে তাদের জাতীয় দল লাগে।

আজকে বিসিসিবির চেয়ারম্যান যখন সরকারী পলিসি হিসেবে ভারতের দাস থাকার ধারাবাহিকতায় দেশের ক্রিকেটের পেটে ছুরি মারার সিধান্ত নিল তখন আকরাম খানের প্রতিবাদ করতে পারেনা। কারণ, এইযে আকরাম খান – উনি যে ওই খানকার ডাইরেক্টর উনি এই টাকা বানানোর মেশিনের একটা পার্ট।

এই বিসিসিবি ভিত্তিক যে টাকা কামানোর ধান্দা এইটা অনেক বড় ধান্দা। এবং বিসিসিবির সব ডাইরেক্টর এবং আকরাম খানের সেই ভিত্তিক অনেক স্টেক আছে। আমি বলছিনা দুর্নীতি। কিন্তু হয়ত দেখেন, উনার যে ব্যবসা আছে সেইটা তে উনার এর ওর হেল্প লাগে। বাংলাদেশের আজকে কানেকশনের দেশ। আকরাম খান যে বিসিসিবির একজন ডাইরেক্টর সেইটার ভিত্তিতে উনার আজকে এদিক ওদিকে  প্রবলেমে পড়লে মুস্কিল আসান সহজ হয়ে যায়। বা ব্যবসা বাণিজ্যে সুবিধা হয়। প্রধান মন্ত্রীর সাথেও প্রয়োজনে কথা বলা যাবে।

সুইট কাডলি আকরাম খান এখনো সুইট কাডলি আছে। কিন্তু উনি এই নষ্ট যন্ত্রের একটা খুঁটিতে পরিনত হইছেন ।

একজন বিসিসিবির ডিরেক্টর হিসেবে উনার যে ইনফ্লুয়েন্স সেইটা ব্যবহার করে উনার চলতে হয়। বাকি অনেকের মতই। তাই এই পজিশন উনি ছাড়তে পারবেনা।

আমি নিশ্চিত কেউ যদি এই বিষয়ে যদি কেউ উনার সাথে কথা বলেন, আমি নিশ্চিত উনি বলবেন  – দেখো  আমার হাত পা বাধা । আমাদেরকে প্রেশার দিছে। বোর্ড চেয়ারম্যান এর সাথে লাগতে যাবে কে ? আপনিও চিন্তা করে দেখবেন। আসলেই তো কি আর করা ? ভারতের দালাল আওয়ামী লিগ সব দখল করে নিয়ে যাচ্ছে। চেয়ারম্যান যা বলে সেইটা না শুনে কি  টিকতে পারবে কেউ ?আসলেই কিছু করার নাই।

কিন্তু একজেকটলি এই খানেই আসে একজন বিশ্বাস ঘাতকের সাথে দেশ প্রেমিকের পার্থক্য।

আমি বোর্ড এর ইনার মেকানিজম জানিনা। কিন্তু, এইটা জানি। তিনটা মানুষ কিন্তু ছাড় দেয় নাই। প্রতিবাদ করছে। প্রেশার অবশ্যই ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই তিনটা ডিরেক্টর কিন্তু সেই প্রেশার উপেক্ষা করছে। বাকি ২০ জন ডিরেক্টর এবং আকরাম খান প্রতিবাদ করতে পারে নাই। দালাল হইছে। যে সন্তানকে উনারা জন্ম দিছেন, নিজের ব্যক্তি স্বার্থ এবং সুবিধাবাদের কারণে সেই সন্তানের পেটে চুরি মারতে উনারা দ্বিধা করেন নাই। যেই তিন জন ডিরেক্টর বোর্ড চেয়ারম্যান এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাড়াইছে আমি তাদেরকে চিনিনা। তারা হইল এই দেশের ট্রু হিরো। আমি নিশ্চিত তারাও বিসিসিবি  কেন্দ্রিক ধান্দাবাজি করে। কিন্তু দেশের স্বার্থ যখন বিঘ্নিত হইছে তখন তারা প্রতিবাদ করছে, নিজের ধান্দার দিকে তাকায় নাই।

শুধু আকরাম খান বা বাকি ২২ জন ডাইরেক্টর নয় দেশ মাতা না ব্যক্তি স্বার্থ এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি আপনি আমি সবাই নিয়ত মুখোমুখি হই। এবং এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে  কে সুবিধাবাদের পথ ধরি এবং কে দেশের পক্ষ নেই, তাতেই  নিয়ত নির্ধারিত হয় কে ২০১৪ সালে এসে কে  নব্য রাজাকার কে নব্য মুক্তিযোদ্ধা।

দুঃখ জনক ভাবে আমাদের দেশে এখনো প্রতি ২৩টা মানুষের মধ্যে ২০ টা মানুষ দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

এবং আমরা সবাই মিলে  এই ছোট একশন গুলোতে সম্মিলিত ভাবে দেশকে বাঁশ দেই । কিন্তু মুখে আমাদের পিরিতির অভাব থাকেনা। আমরা সবাই, নিজের জায়গা থেকে এই সব যুক্তি দেই। আমাদের তো অসুবিধা আছে, আমার তো পরিবার আছে, আমি যদি ছাড় না দেই তাইলে ক্ষতি হয়ে যাবে এই সব বলে – দেশের পেছন দিয়ে যখন আমরা ঢুকায় দেই তখন যেই ভাঙ্গা দেশটা দাড়ায় সেই দেশটাই হয় বাংলাদেশ।

শেষ হোলো আমার শৈশব

Image

টেন্ডুলকার আমার কাছে শুধু শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানই নন, আমার কৈশোরের সাথে শেষ যোগসূত্রও – যতোবার তাকে দেখি, মনে হয় কোনো এক অদ্ভূত কারণে, সোনার দিনগুলো আমার আছে মোহাফিজ। এই লোকটার ব্যাট দিয়েই আমি যেকোনো সময়ে চলে যাবো সেই নব্বুই এ – ইচ্ছে হলেই। ব্যাট হাতে টেন্ডুলকার মানেই আমার কৈশোরের সেই নানান রঙের দিনগুলো।

আজকে যারা কিশোর তাদের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন হবে ৮০’র দশকে কী বোরিং ক্রিকেট খেলতো ভারত। শ্রীকান্ত আর আজহার ছাড়া ধুন্ধুমার কোনো ব্যাটসম্যান নেই। কপিল মাঝে মাঝে পেটাতে পারে এবং ওই একটি মাত্র বোলার – বাকী সব কে কার থেকে স্লো বল করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা। ৮৮ সালে এশিয়া কাপ ক্রিকেট হয়েছিলো ঢাকায়, প্রথম বড় ধরনের আয়োজন। টিভিতে কমেন্টেটর ছিলো আলী জাকের, আজকের হিসাবে খুবই গরিবী আয়োজন কিন্তু ক্লাস ফাইভের এই ছেলেটার কাছে পৃথিবী বদলে যাওয়া ঘটনা (আজকের কিশোরদের কাছে কল্পনা করা হয়তো সম্ভবই না যে ৮৯ সালে ঢাকায় একটা আন্তর্জাতিক কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়েছিলো এবং সেটা লাইভ দেখানো হয়েছিলো টিভিতে। সেই বিজ্ঞ কমেন্ট্রি থেকেই জানতে পারি যে প্যাচ যেটাই হোক কমেন্টেটর সেটাকে বোস্টন ক্র্যাবই বলবেন। আমার কাছে সেটাও ওয়ার্ল্ড চেঞ্জিং ইভেন্ট) । মনে আছে আরশাদ আইয়ুব নামের এক অখ্যাত অফ স্পিনার (রাজেশ চৌহানের ঠিক আগে খেলতো ভারতের হয়ে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৫ উইকেট নিয়ে বসে ২০ না ২১ রানে। কিন্তু গ্যালারিতে ভারতের একেবারেই সাপোর্ট নেই। মানে একটাও তালি পড়ে না, কিন্তু পাকিস্তানের জন্য দর্শকরা হাত ফাটিয়ে ফেলছে। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিলো এটা মুসলমানির কারবার। কিন্তু এই একই মাঠে ১০ বছর পরে যখন পাকিস্তান ইন্ডিয়া ম্যাচ হোলো তখন বলা যায় সাপোর্ট ৬০-৪০ (পাকিস্তানের পক্ষে)। কারণটা আসলে ধর্ম ছিলো না, ছিলো টেন্ডুলকার। দশ বছর আগের এক বোরিং টিম শচিনের হাত ধরে হয়ে গেছে ফাইটিং আউটফিট।

আমাদের চেয়ে যারা দশ বারো বছরের বড় তাদের থেকে নিয়ে আমরাই শেষ – এ পর্যন্ত যে প্রজন্ম – তাদের কাছে ইমরান খান যে ড্যাশিং ফাইটার, আমাদের পর থেকে আজকের ছানাপোনা এই দীর্ঘ প্রজন্মের কাছে টেন্ডুলকার ঠিক তাই। ইমরান খানের সাপোর্টার থেকে আমাদের প্রজন্ম হয়েছিলো পাকিস্তানের সাপোর্টার, আর টেন্ডুলকারের সাপোর্টার থেকে আমাদের পরের প্রজন্ম হয়েছে ভারতের সাপোর্টার।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে ওল্ড ডিওএইচএসে – সেখানে ৮৯ সালেও প্রায় পুরো বছর ক্রিকেট খেলা হতো। কায়সার হামিদের ভাই সোহেল হামিদ সেখানে তখন ষ্টার ক্রিকেটার। জাতীয় দলের হয়ে খেলা পেস বোলার হাসিবুল হোসেন তখন উঠতি তারকা মাত্র ক্লাস সেভেন-এইটেই। ওখানেই মনে হয় প্রথম শুনি যে ইন্ডিয়ার একটা বাচ্চা ছেলে খুব ভালো খেলে। ৯০ এ চলে যাই ক্যাডেট কলেজ। ক্যাডেট কলেজগুলো এখন কী রকম জানি না তখন কিন্তু পুরোপুরি ফুটবল প্রধান ছিলো। তবে বহু ক্যাডেট খেলার খবর রাখার দিক থেকে প্রাণান্ত ছিলো। আশ্চর্যের বিষয়: প্রায় কেউই ইন্ডিয়ার ডাই হার্ড ফ্যান ছিলো না (আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র ফাইয়াদ ভাই ছাড়া)। কিন্তু টেন্ডুলকার বিষয়ে সবারই খুব আগ্রহ ছিলো। ভিনোদ কাম্বলির সাথে ৬শ রানের পার্টনারশিপের কথা সবার মুখে মুখে।

অবস্থা বদলে যায় ৯২ এর বিশ্বকাপের পরে। ক্রিকেট দেখাটা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং খেলার পরিমাণও বাড়তে থাকে। মনে আছে পাকিস্তানের সাথে খেলায় কাম্বলি আর টেন্ডুলকার ব্যাটিং করছিলো (এই দিনটায় আমরা কলেজ থেকে ছুটিতে বাড়ি আসছিলাম) আর বল করছিলো ইমরান খান। দুজনের মিলিত বয়স ইমরানের সমান না। কিন্তু কী দারুন ছিলো টেন্ডুলকার।

ওই বয়সের একটা বিশেষত্ব ছিলো কীভাবে প্রমাণ করা যায় আমি যে টিম সাপোর্ট করি সেটাই বেস্ট এবং অন্য টিম কেন ধর্তব্যই না সেটাও প্রমাণ করা। ইন্ডিয়া যে বাজে টিম পরিসংখ্যানের দিক থেকে প্রমাণ করা খুব সহজ ছিলো। ইন ফ্যাক্ট ইন্ডিয়া উইনিং টিম হয়েছে এই তো সেদিন – ২০০৩ এর দিকে এসে। কিন্তু একজন ব্যাটসম্যানকে প্রায় সবাইই সমীহ করতো- সেটা ছিলো টেন্ডুলকার।

কোনো swagger নেই এমন একটা স্পোর্টসম্যানকে সবাই ভালোবাসে তার বিনয়ের জন্য, বিষয়টা কল্পনা করা খুব কঠিন – শচীন সেটা করে দেখিয়েছে। সত্যিই আশ্চর্য এই মানুষটা। কোনো একটা কাজ ২৪ বছর ধরে সমান উদ্যমে মানুষ ভালোবাসে কী করে এটাই আমি বুঝে পাই না।

টেন্ডুলকারকে আর দেখা যাবে না এটা ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমার শৈশবের এই মানুষটাকে আর দেখা যাবে না খেলার মাঠে, ভাবতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। বড় আমি হয়েই গেলাম তাহলে, শেষমেষ।

স্বপ্ন পুরন – Monsur Rashed

খুবই মিস করি, ফারুক মামার সাথে খেলা দেখতে যাওয়া, পুরা একটা রিলিজিয়াস প্রসেসের মতো ব্যাপার-সেপার, গুলিস্থানে গিয়ে ভোরবেলা, “বেঁকো” রেস্টুরেন্টে অসম্ভব মজার চা খাওয়া, তারপর আর একটা স্পেসিফিক “নাম ভুলে যাওয়া” রেস্টুরেন্টে গিয়ে খিচুরি খেয়ে খেলা দেখতে ঢুকা, পুরা খেলা চলাকালে যত কিছু আছে সব খাওয়া (চা, কফি, সোডা, ঘুগনী, ঝালমুড়ি, হট পেটিস, ছোলা, আইসক্রিম, শসা, আমড়া, কাঁচা আম ভর্তা, বাদাম ইত্যাদি), খেলার মাঝপথে প্রিন্স বা নবান্নর কাচ্চি বিরিয়ানি, খেলা চলাকালে এক অন্ধ ফকির আসতো, এই ফকিরটা এত্ত জনপ্রিয় ছিল যে ওর সিগনেচার টাকা চাওয়ার ডাকটা আমরা নিয়মিত দর্শকরাই ডেকে দিতাম, “আমি আইছিইইইইইই”, ঢাকাইয়া দর্শকদের লুঙ্গি ঝারা দিয়ে ‘কুফা’ ছুটানো, খেলা শেষে ঠাটারি বাজারের ‘স্টার’ অথবা জয়কালী মন্দিরের ‘সুপার’ রেস্টুরেন্টে সেরাম মামা-ভাইগ্না খাওয়া-দাওয়া করে বাসায় যাওয়া! আর অনেক এক্সসাইটেড থাকতাম খেলা দেখে আসলে, রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম, ইন শা আল্লাহ আমরা একদিন ‘এ’ দল না, টেস্ট প্লেয়িং দেশ গুলোর জাতীয় দলের সাথে নিয়মিত খেলব আর জিতব! আজকে সেই দিনগুলোর একটি বিশেষ দিনে ফিরে যেতে চাই। ঢাকা স্টেডিয়ামে বসে দেখা শত শত খেলার মাঝে সেরা খেলা ছিল এটাই। ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৯৪, সার্ক ক্রিকেটের ফাইনাল, বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠল! খেলা ইন্ডিয়া ‘এ’ দলের সাথে, শেষ দুই বলে ইন্ডিয়া ‘এ’ দলের দরকার ছিল দুই রান, বাংলাদেশের দরকার ছিল একটা উইকেট, আমরা কনফিডেনট ছিলাম না, কিন্তু রফিক স্ট্যাম্পড করে দিলো ভেনকাটেঁস প্রসাদকে! আউট হওয়া মাত্র লাফানো আর চিৎকার শুরু করলাম, কি সেই অদ্ভুত অনুভূতি! সেদিন টের পেলাম জাতীয়তাবাদ কতো বড় ড্রাগ, বুঝতে পারলাম ব্রিটিশ ফুটবল ফ্যানদের স্পোর্টস ফানাটিসিসম! খেলা শেষে আমি আর ফারুক মামা বের হয়ে দিলকুশায় আসতেই দেখা হল বড় খালুর সাথে, উনি একজন বিখ্যাত জাতীয় হকি খেলোয়াড়! উনি আমাদের কাসে শুনে কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলেননা ইন্ডিয়া ‘এ’ দল বাংলাদেশের কাছে হেরেছে। উনি ভাবছিলেন উনার শ্যালক ফাইযলামি করছে! উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কতো গুলি এল বি ডব্লিউ দেয়া হইসে!!! সেই বাংলাদেশ ক্রিকেট টীম এখন হোম সিরিজে পর পর দুইবার, হেডলি আর মারটিন ক্রোর নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াস করে! কয়টা মানুষ বলতে পারবে তার ছোটবেলার একটা অসম্ভব স্বপ্ন পুরা হয়েছে! আল্লাহ এই পোলাপাইন গুলারে ভালো রাইখ! আমীন!