ডোম অফ দ্য রক ও মসজিদ আল-আকসা

by শঙ্খচিলের ডানাঃ

৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা বাইজেন্টাইন অধীনস্থ জেরুজালেম নগরী জয় করে। ইসলামের প্রথম কিবলা এবং মি’রাজের সাথে সম্পর্কিত জেরুজালেম (আরবী নাম আল-কুদস القدس al-Quds – The Holy One) ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। পুরনো জেরুজালেমে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘ডোম অফ দ্য রক’ এবং ‘মসজিদ আল আকসা’ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে কিছু বিভ্রান্তি আছে যা নিয়ে এ লেখাটির অবতারণা।

ডোম অফ দ্য রক – Dome of the Rock (Arabic قبة الصخرة‎, Qubbat as-Sakhrah)

Dome of the Rock (Qubbat as-Sakhra)

উপরের স্থাপনাটি মুসলিম বিশ্বে সচরাচর আল আকসা মসজিদ হিসেবে পরিচিত হলেও এ স্থাপনাটির সুনির্দিষ্ট আরবী নাম قبة الصخرة‎ (Qubbat As-Sakhrah), ইংরেজিতে Dome of the Rock, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘পাথরের (উপর নির্মিত) গম্বুজ’। ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ববাহী বিবিধ কারণে পুরনো জেরুজালেমের পবিত্র ‘টেম্পল মাউন্ট’ (Temple Mount – আরবী الحرم الشريف al Haram ash-Sharif – The Noble Sanctuary) চত্বরের কেন্দ্রস্থলে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত অষ্টভুজাকৃতির এই স্থাপনাটির নকশা ও অলংকরণে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন স্থাপত্যশৈলী এবং উদীয়মান স্বতন্ত্র ইসলামিক ট্র্যাডিশনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় যাতে টেক্সচুয়াল ও আর্কিটেকচারাল ন্যারেটিভ একে অপরকে জোরদার করে।

এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে এই স্থাপনাটি মূলত: মসজিদ হিসেবে নির্মিত হয়নি (মূল অংশে কোন মিম্বর নেই), বরং মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী হাদিসে বিশদভাবে বর্ণিত যে পবিত্র পাথরের উপর থেকে রাসূল(সা:) মি’রাজে (Ascension to Heaven) গমন করেছিলেন বলে ধারণা, জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরের কেন্দ্রস্থিত সেই Foundation Stone বা ভিত্তিপ্রস্তরকে ঘিরে একটি shrine (মাজার) হিসেবে এই স্থাপনাটি নির্মিত। জুডিও-ক্রিস্টিয়ান ট্র্যাডিশন অনুযায়ী এই সেই স্থান যেখানে ইব্রাহীম(আঃ) তাঁর সন্তানকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন এবং যেখানে পরবর্তীতে সোলায়মান(আঃ) এর টেম্পল ছিল। স্থানটির ধর্মীয় তাৎপর্যের স্মারকচিহ্ন হিসেবে স্থাপনাটি নির্মিত যা তার আভ্যন্তরীণ নকশা দেখলে বোঝা যায় –

Dome of the Rock interior

গম্বুজের ঠিক নিচে স্থাপনার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পবিত্র পাথর (Foundation Stone) যা পারিপার্শ্বিকতার অংশ হিসেবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে ৯০ মিলিয়ন বছরের পুরনো (Upper Turonian Stage, Late Cretaceous karsted limestone) –

The Holy Rock at the center of the interior

পাথরটি পুরোপুরি নিরেট নয়, বরং এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি গর্ত আছে যা দিয়ে পাথরের নিচে অবস্থিত আংশিক প্রাকৃতিক ও আংশিক মানবসৃষ্ট একটি গুহায় (cavern) প্রবেশ করা যায়। Well of Souls (আত্মার কূপ) নামে পরিচিত এই গুহার অভ্যন্তরে রয়েছে নামাজের জায়গা –

ও

Prayer area inside the cave under the Holy Rock

বাহ্যিক নকশা (Exterior Design)

অটোমান সম্রাট সুলেমান (Suleiman the Magnificent) এর শাসনামলে ডোম অফ দ্য রকের বাইরের দেয়াল সুদৃশ্য টাইল দিয়ে আচ্ছাদিত হয়। ১৯৫৫ সালে জর্ডানের সরকার অন্যান্য আরব রাষ্ট্র ও তুরস্কের সহায়তায় প্রবল বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটির মেরামত কাজ শুরু করে। এই পুনরুদ্ধার কাজের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে এর সীসা (Lead) আচ্ছাদিত গম্বুজটি ইটালিতে তৈরি অ্যালুমিনাম-ব্রোঞ্জ সংকর ধাতু দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে জর্ডানের কিং হুসেইন প্রদত্ত ৮.২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ দিয়ে গম্বুজটি পুরোপুরি আচ্ছাদন করা হয়। জেরুজালেমের যে কোন প্রান্ত থেকে ডোম অফ দ্য রকের উজ্জ্বল সোনালী গম্বুজটি চোখে পড়ে।

Dome of the Rock: The golden dome exterior

Dome of the Rock: Mosaic, tile, and inscription on exterior walls

Dome of the Rock: Mosaic

আভ্যন্তরীণ নকশা (Interior Design)

স্থাপনাটির অভ্যন্তরে রয়েছে মোজাইক, মার্বেল, ও চীনেমাটির সুদৃশ্য অলংকরণ যা বিভিন্ন শাসনামলে নতুন করে যোগ করা হয়েছে।

Dome interior

Dome of the Rock: Interior design

Dome of the Rock: Interior decoration

Dome of the Rock: Intricate interior design

Dome of the Rock: Intricate interior decoration

স্থাপনাটির ভেতরের এবং বাইরের দেয়ালে রয়েছে এর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের সাথে সঙ্গতি ও তাৎপর্যপূর্ণ সুরা ইয়াসিন, সুরা মারিয়াম ও সুরা ইসরা সহ কুর’আনের বিভিন্ন আয়াতের কারুকার্যময় ক্যালিগ্রাফি –

Inscription, mosaic, and tile work

মসজিদ আল আকসা

Masjid al-Aqsa

জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরে উপরোল্লিখিত ‘ডোম অফ দ্য রক’ স্থাপনাটির ২০০ মিটার দক্ষিণে রয়েছে ধূসর সীসায় (lead) আচ্ছাদিত গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ যা সুনির্দিষ্টভাবে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা:) ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম বিজয়ের পর পবিত্র পাথরের দক্ষিণে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক এই মসজিদটির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন যার কাজ শেষ হয় ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ছেলে আল-ওয়ালিদের শাসনামলে। কালের পরিক্রমায় বহুবার মসজিদটি সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হয় – যোগ করা হয় গম্বুজ, মিম্বর, মিনারত।

Masjid al-Aqsa: al-Fakhariyya Minaret

Masjid al-Aqsa: Entrance

Al Aqsa: hypostyle prayer hall

Masjid al-Aqsa: hypostyle prayer hall

Al Aqsa: Interior

Masjid al-Aqsa: Interior

১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর মসজিদটি একটি প্যালেস এবং চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশেষে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম পুনর্দখল করেন এবং পুনরায় স্থাপনাটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। সালাহউদ্দীনের পূর্বসূরি সেলজুক আমির নূরউদ্দীন জঙ্গি ১১৬৮ সালে মসজিদটির জন্য সিরিয়া থেকে আইভরি (হাতির দাঁত) ও কাঠের কারুকাজ করা একটি সুদৃশ্য মিম্বর তৈরির নির্দেশ দেন যার কাজ শেষ হয় তাঁর মৃত্যুর পর। জেরুজালেম পুনর্দখলের পর ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দীন মিম্বরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৯ সালে একজন অস্ট্রেলীয় পর্যটকের সন্ত্রাসমূলক অগ্নিসংযোগে মসজিদের দক্ষিণপূর্ব অংশসহ দ্বাদশ শতাব্দীর কারুকার্যপূর্ণ মিম্বরটি পুড়ে যায়, তার জায়গায় এখন রয়েছে একটি Replica বা অনুকৃতি।

Masjid al-Aqsa: Original Saladin Minbar: Photo Credit: Matson collection 1914

নামের বিভ্রান্তি

মুসলিম বিশ্বে আলোচ্য স্থাপনা দুটির নাম ও উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তি ও Conspiracy Theory প্রচলিত আছে। নিচের ছবিতে জেরুজালেমের হারাম শরীফে স্থাপনা দুটির তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে যা এদের ভিন্নতা বুঝতে সহায়ক হবে।

Dome of the Rock and Masjid al Aqsa in al-Haram ash-Sharif

Dome of the Rock and Masjid al-Aqsa in al-Haram ash-Sharif

এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে কুর’আনে সুরা ইসরায় (বনী ইসরাঈল) মক্কার ‘মসজিদ আল হারাম’ থেকে ‘মসজিদ আল আকসা’ বা দূরবর্তী মসজিদে রাসূল(সা:) এর ইসরা বা রাত্রিকালীন ভ্রমণের (The Night Journey) বিষয়টি যখন নাজিল হয়, তখন তা বিশেষভাবে একটি জায়গাকে নির্দেশ করে, আজকের আল আকসা মসজিদ ভবনটিকে নয়। জেরুজালেম সেসময় রোমানদের শাসনাধীন ছিল।

“সকল মহিমা তাঁর যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম (পবিত্র মসজিদ) থেকে মসজিদে আকসা (দূরবর্তী মসজিদ) পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” আল কুর’আন – ১৭ঃ১”

“Exalted is He who took His Servant by night from al-Masjid al-Haram to al-Masjid al-Aqsa, whose surroundings We have blessed, to show him of Our signs. Indeed, He is the All-Hearing, the All-Seeing.” Al Qur’an – 17:1

রাসূলের(সা:) মৃত্যুর পর ৬৩৭/৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা উমরের(রা:) সময় মুসলিমরা জেরুজালেম জয় করে। এরপর হাদিসের বিশদ বর্ণনা অনুসারে টেম্পল মাউন্টের কেন্দ্রে অবস্থিত পবিত্র পাথরটিকে রাসূলের মি’রাজে গমনের স্থান হিসেবে নিরূপণ করা হয় এবং এর কিছু দক্ষিণে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। পরবর্তী বহু শতাব্দী পর্যন্ত পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত মসজিদ ভবন এবং ডোম অফ দ্য রক স্থাপনা সহ পারিপার্শ্বিক পুরো টেম্পল মাউন্ট এলাকাটিই মুসলিমদের কাছে কুর’আনে বর্ণিত ‘মসজিদ আল আকসা’ নামে এবং মসজিদ ভবনটি ‘আল-জামই আল-আকসা’ নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতকে অটোমান শাসনামলে মসজিদের লাগোয়া টেম্পল মাউন্ট চত্বরটির ব্যাপক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সাধন করে এলাকাটিকে আল-হারাম আশ-শরীফ (the Noble Sanctuary) নামকরণ করা হয়। অন্যদিকে মসজিদ ভবনটি তখন থেকে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত হয়। অধুনা এই পরিচয়টিই বহুল ব্যবহৃত। সামগ্রিকভাবে একই চত্বরে অবস্থিত Qubbat as-Sakhra বা ডোম অফ দ্য রক নামে পরিচিত স্থাপনাটি ঠিক মসজিদ হিসেবে নির্মিত নয়, যদিও এর ভেতরেও নামাজ পড়া হয়। শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমাম মসজিদ আল-আকসাতে দাঁড়ান, ডোম অফ দ্য রকের অভ্যন্তরে তুলনামূলক স্বল্প-পরিসর স্থানে এসময় সাধারণত মহিলারা নামাজ আদায় করেন। স্বতন্ত্র হলেও এটা জানা জরুরী যে প্রায় ১৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য সম্বলিত গুরুত্বপূর্ণ এ দু’টি স্থাপনাই মুসলিমদের তৈরি এবং পুরো এলাকাটিই তাদের জন্য পবিত্র স্থান (الحرم الشريف – the Noble Sanctuary) হিসেবে গণ্য।

Jerusalem: Old City

জেরুজালেমের হারাম শরীফের ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর উপর আরও বিশদ ভাবে জানতে চাইলে দেখুন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজের এমারিটাস প্রফেসর ও প্রখ্যাত ইসলামের ইতিহাস, স্থাপত্য ও কলা বিশারদ ডঃ ওলেগ গ্রাবারের (Dr. Oleg Grabar) ধারাবিবরণীতে একটি তথ্যবহুল ভার্চুয়াল প্যানোরামিক অডিও-ভিস্যুয়াল ট্যুর

গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে স্বৈরতন্ত্র আপাততঃ প্রবল হয়েছে, তবে লড়াই চলবে

by মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

বাংলাদেশে ‘নির্বাচিত’ গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র জেঁকে বসেছে। আর প্রতিরোধ আন্দোলনের বন্ধ্যাত্ব সামষ্টিক মানসে এনেছে হতাশা আর নির্বেদ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম বাঙালি মুসলমানের সামষ্টিক চেতনায় একটি উজ্জীবন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও তৎকালীন সার্বিক মাৎস্যন্যায় জাতির মানসে সেই উজ্জীবনকে ক্ষণস্থায়ী করে বয়ে এনেছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী অবসাদ ও ক্লেদ। জাতীয় মানসের সেই বিষণ্ণ নির্বেদ ও স্বপ্নভঙ্গজাত আত্মগ্লানি ও আত্মপ্রত্যয়রিক্ত দিকনির্দেশহীনতা থেকে বাংলাদেশকে পুনরায় জেগে উঠতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত।

কিন্তু ২০১৪ সালে এসে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে। প্রাণহীন খোলসসর্বস্ব গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। সংবিধান একটি অন্তর্বিরোধপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়ে জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিফলনে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় সংসদ অকার্যকর একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো একনায়কতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের নামে দলীয় গোষ্ঠীতন্ত্র প্রবল হয়ে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নকে সর্বব্যাপী করে তুলেছে। গণতন্ত্রের যে একটি অনুসঙ্গ এতদিন জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে অন্তত একদিনের জন্য হলেও সম্ভবপর করেছে, সেই নির্বাচনকেও যাচ্ছেতাই রাজনৈতিক ব্যভিচারের মাধ্যমে একটি প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে।

আর জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এই অধোগতির ধারাকে প্রতিরোধ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করার যে রাজনৈতিক আন্দোলন ও নেতৃত্ব আমরা বর্তমানে দেখতে পাই তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত ও দুর্বল। এক্ষেত্রে সাংগঠনিক দুর্বলতা যেমন রয়েছে, তার চাইতেও বেশী রয়েছে মতাদর্শিক, রণনৈতিক ও রণকৌশলগত অপরিপক্কতা ও অদূরদর্শিতা। মেধাবী, মননশীল ও সৃজনশীল নেতৃত্ব ও কর্মসূচির অভাবে প্রতিরোধ সংগ্রাম ও আন্দোলন গতানুগতিকতার গণ্ডিতে আবদ্ধ। জনসম্পৃক্ত মতাদর্শ, নেতৃত্ব, কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপ্রয়োগের অভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন বন্ধ্যাত্বের চোরাবালিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। শুধুমাত্র পেশিশক্তিনির্ভর ও ফায়দালোভী রাজনৈতিক পেশাদারদের দিয়ে ব্যাপক গণভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী করা যায় না। ‘নির্বাচিত’ স্বৈরতন্ত্র এই সুযোগে ক্রমাগত ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে এবং দেশী-বিদেশী সমর্থক গোষ্ঠীর সহায়তায় আরও সুসংহত হতে থাকে।

জাতীয় চেতনায় মনঃস্তাত্ত্বিক শূন্যবোধের উদ্ভব ঘটেছে

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, একটি সংঘবদ্ধ, সুসংহত, মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংগঠনের জনসম্পৃক্ত ব্যাপক প্রতিরোধ সংগ্রামের অনুপস্থিতির কারণে একটি জাতিব্যাপী রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও মনঃস্তাত্ত্বিক শূন্যবোধের উদ্ভব ঘটেছে। এই বাস্তব ও ব্যাপক নিটশীয় শূন্যবোধের প্রতিক্রিয়ায় জাতির সংবেদনশীল ও মননশীল চেতনা ও মানসে এক যন্ত্রণাকাতর, বিষণ্ণ মনোবেদনা ও ব্যর্থতাজাত অবসাদ অনুভূত হচ্ছে। ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া অথবা সাফল্য ব্যর্থতা থেকে এই সামষ্টিক বেদনা ও যন্ত্রণা পরিমাণগত ও গুণগত উভয়দিক থেকেই আলাদা। জাতি, দেশ, রাষ্ট্র প্রভৃতি নিয়ে যেসব মননশীল ও সৃজনশীল নাগরিকেরা ভাবেন ও সক্রিয় হবার চেষ্টায় ও চর্চায় ব্যাপৃত থাকেন, তাঁরা যে সামাজিক শ্রেণী ও স্তরেই অবস্থান করুন না কেন, তাঁদের চেতনায় ও মননে এই জটিল ও কুটিল সংকটজাত সংবেদনা ও সংক্ষোভ প্রতিফলিত ও প্রকাশিত হবেই। আর এই মনোবেদনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হল অসংগঠিত ও অসংবদ্ধ, বিচ্ছিন্ন ও বিযুক্ত ব্যক্তি-নাগরিকদের একান্ত অপারগতাজাত অসহায়ত্ববোধ ও তৎসংলগ্ন আত্মগ্লানি ও অপরাধবোধ।

উত্তর-ঔপনিবেশিক ও উত্তরাধুনিক জাহিলিয়া

এই বিষয়টি খোলাসা করতে মহামতি কার্ল মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উক্তির আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন যে দার্শনিকেরা এ যাবৎ ইতিহাসের শুধু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মধ্যেই নিজেদেরকে ব্যাপৃত রেখেছেন, কিন্তু যা আরো বেশী কাম্য তা হল ইতিহাসের পরিবর্তনের জন্য কাজ করা, শুধু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নয়। বুদ্ধিবৃত্তির এই মহান দায় কাঁধে নিলে যে কোন মননশীল নাগরিক একধরণের বিদগ্ধ অপারগতার মনোযন্ত্রণায় আক্রান্ত হতে বাধ্য। জাতি-দেশ-রাষ্ট্র বিবর্তনের এমন এক বন্ধ্যা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যখন সামাজিক শুভশক্তিগুলো নিঃসঙ্গ, বিযুক্ত, অসংঘবদ্ধ ও নেতৃত্বহীন আর সামাজিক অশুভশক্তিগুলো দেশী-বিদেশী প্রেক্ষাপটে অনেক বেশী একাট্টা ও সক্রিয়। সর্বব্যাপী আঁধি, নেতি ও অকল্যাণের এই কৃষ্ণপক্ষকেই বোধকরি উত্তর-ঔপনিবেশিক ও উত্তরাধুনিক জাহিলিয়া বলে বয়ান করা যেতে পারে। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বায়নের মাধ্যমে যখন পৃথিবীব্যাপী একধরণের পণ্যসম্ভোগবাদী ও আগ্রাসী বিশ্বব্যাবস্থা কায়েম করেছে, তখন নিম্নবর্গ ও প্রান্তিক ব্যক্তি, শ্রেণী, সম্প্রদায় ও জাতি হিসেবে স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশ ও আত্মবিকাশের সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো অনেকাংশেই অপসৃয়মান।

বিশ্ব মুসলিম সভ্যতার নবজাগরণ ও বাংলাদেশ

এর সঙ্গে রয়েছে মহান এক আল্লাহর প্রতি সমর্পণকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে প্রতিষ্ঠাকামী আত্মিক শ্রেয়োবোধ ভিত্তিক বিশ্ব মুসলিম সভ্যতার নবজাগরণকে নস্যাৎ করতে সদা সতর্ক ও প্রস্তুত পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতার একক অথবা যৌথ যুদ্ধাভিযান। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই আন্তর্জাতিক সমীকরণের বাইরে নয়। ‘জঙ্গিবাদ’, ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘মৌলবাদ’ দমন বা নির্মূলের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রের ন্যূনতম পূর্বশর্তগুলোকে উপেক্ষা ও বিসর্জনের বিপজ্জনক ডিসকোর্স আমরা বাংলাদেশে বেশ জোরেশোরেই শুনতে পাই। এই ডিসকোর্সের তাত্ত্বিক গুরুরা প্রকারান্তরে জুডিও-খ্রিষ্টান নব-ক্রুসেড ও ভারতীয় আধিপত্যবাদকেই প্রমোট করে চলেছেন।

চাই আত্মিক চেতনায় বলীয়ান আদর্শভিত্তিক নতুন সৃজনশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতি

কাজেই বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই চলছে এর যেমন একটি দেশী প্রেক্ষিত রয়েছে, তেমনি এর রয়েছে একটি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত। তাই ব্যক্তি, শ্রেণী, সম্প্রদায় ও জাতি হিসেবে উপনিবেশ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমাগত বিকাশ ও উত্তরণের যাত্রায় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখতে হবে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যে স্বাধীনতা ও মুক্তির অভিযাত্রা, সেখানে একটি অভিজ্ঞতা বারবার বেঠোফেনের পঞ্চম সিম্ফনির বিখ্যাত থিমের মত বেজে উঠেছে। আর সেটা হল গণতন্ত্রকে দুর্বল করে ও স্বৈরতন্ত্রকে প্রবল করে কোনও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হতে পারেনি। অন্যদিকে বন্ধ্যা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুনর্গঠিত হয়ে, অথবা পরিবর্তিত হয়ে অথবা নতুন জনসম্পৃক্ত ও আত্মিক চেতনায় বলীয়ান আদর্শভিত্তিক শক্তির আগমনের ভেতর দিয়ে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও প্রগতি বেগবান হয়েছে নানান পালাবদলের মধ্য দিয়ে।

সুতরাং ব্যক্তির একক ও জাতির সামষ্টিক চেতনায় যে সর্বগ্রাসী অবসাদ, হতাশা ও নির্বেদ ইতিহাসের পর্ব-পর্বান্তরে নেমে এসেছিল তা যেমন নতুন সৃজনশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতির অভিঘাতে কেটে গিয়েছিল, আশা করা যায় যে এখনকার বন্ধ্যা প্রতিরোধ সংগ্রামও নতুন উদ্যোগে, নতুন কৌশলে, নতুন নেতৃত্বে সফল হয়ে অচিরেই সামষ্টিক মননের তমসা ও স্থবিরতার অবসান ঘটাবে।

আলহামব্রা – ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী

2

By শঙ্খচিলের ডানা :

“Rising up above the Red Hill, the royal city of the Alhambra stands proud and eternal, one of the most important architectural structures of the Middle Ages and the finest example of Islamic art left to us in the western world.”

“একগুচ্ছ পান্নার মাঝে যেন একটি মুক্তা” – মুরিশ কবিরা এমনভাবেই বর্ণনা করেছেন আলহামব্রার সৌন্দর্য! স্পেনের মুসলিম সভ্যতা ও স্থাপত্যের শীর্ষ আকর্ষণ গ্রানাডার আলহামব্রা প্রাসাদ ও দুর্গ। নবম শতকে দক্ষিণ স্পেনের সাবিকা পাহাড়ের (Assabika hills) ওপর নির্মিত একটি দুর্গের ভিত্তির ওপর একাদশ শতাব্দীতে আলহামব্রা দুর্গ-প্রাসাদের পত্তন ঘটান স্পেনের শেষ মুসলিম শাসকগোষ্ঠী নাসরিদ বংশের মোহাম্মদ বিন আল আহমার এবং এর পরিবর্তন-পরিবর্ধন চলে পরবর্তী দেড়শ বছর। সমসাময়িক বাইজেন্টাইন এবং আব্বাসীয় মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের প্রভাব ছাড়াও আইবেরিয়ান পেনিনসুলায় সুদীর্ঘ আটশ বছরের মুসলিম স্থাপত্যের পরম্পরা এবং নিজস্ব শৈল্পিক উদ্ভাবনার মিশেল ঘটিয়ে তৈরি হয় স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত বিশেষ ধরণের লাল মাটিতে নির্মিত দুর্গ-প্রাসাদ ‘আলহামব্রা’ যার নামের আক্ষরিক অর্থ The Red.

আলহামব্রার স্থাপত্যশৈলী ও অলঙ্করণে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে অশ্বখুরাকৃতির খিলান (Calliphal horseshoe arch), জটিল রম্বস আকৃতির আলমোহাদ সেবকা (the Almohad sebka – a grid of rhombuses), আলমোরাভিদ পাম (the Almoravid palm), এবং ত্রিমাত্রিক মুকারনাস ( Muqarnas – stalactite ceiling decorations).

Portico and Pool

The Court of the Lions

Decoration of the Court of the Lions

The Hall of the Ambassadors – a mirador with elaborately ornate walls and ceiling

ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যস্বরূপ আলহামব্রাতে খুঁজে পাওয়া যায় জান্নাতের বর্ণনা অনুযায়ী সৌন্দর্য ও শান্তিবর্ধক রূপে চলমান পানি ও ফোয়ারা, আলো-ছায়া, এবং পত্রপুষ্প-শোভিত বাগানের নয়নাভিরাম ব্যবহার –

The Court of the Water Channel

Sultana’s Garden

আলহামব্রার স্থাপত্যশৈলীতে অলংকার হিসেবে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ত্রিমাত্রিক মুকারনাস (Muqarnas – honeycombed stalactite ceiling decorations) যা দশম শতাব্দীতে পারস্য এবং নর্থ আফ্রিকায় প্রায় একইসাথে উদ্ভাবিত মুসলিম স্থাপত্যকলার অনন্য সংযোজন –

Use of Muqarnus in the Hall of the Abencerrajes

Use of Muqarnus in the Alhambra

Arabesque around the windows

ইসলামি স্থাপত্যের অনবদ্য নিদর্শনস্বরূপ আলহামব্রায় খুঁজে পাওয়া যায় জ্যামিতিক নকশা ও ক্যালিগ্রাফির জটিল ব্যবহার। কেবল একটি বিশেষ স্তবকই আলহামব্রার স্থাপত্যে উৎকীর্ণ হয়েছে ৯০০০ বার – لا غالبَ إلا الله (La ghaliba illa Allah – ‘There is no Conquerer but Allah’)

Wa la ghaliba illa Allah – calligraphy on the walls of Alhambra

কেবল নয়নাভিরাম অলঙ্করণই নয়, দুর্গ-প্রাসাদের নিরাপত্তা রক্ষায় ১৩টি ওয়াচ টাওয়ারসহ শক্ত প্রাচীরে ঘেরা আলহামব্রায় গড়ে তোলা হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাহাড়ের উপরে নির্মিত আলহামব্রা কমপ্লেক্সে পার্শ্ববর্তী ডারো নদীর (the river Darro) পানি কি ভাবে নদীর উৎসে বাঁধ দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে সুড়ঙ্গ কেটে কৃত্রিম প্রণালী ও জলাধার নির্মাণ ও জলশোধন-ব্যবস্থা সহযোগে বহুদুর টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা আজও বিস্ময় জাগায়!

১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলার হাতে গ্রানাডার পতনের সাথে সমাপ্তি ঘটে আইবেরিয়ান পেনিনসুলায় সুদীর্ঘ আটশ বছরের মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের। আগ্রাসী রিকনকিস্তার (Reconquista) জন্য গ্রানাডা ছিল একটি অনন্য বিজয় – বিপুল ধন-সম্পদ ছাড়াও পুরো ইউরোপে মুসলিম স্থাপত্যের শিরোমণি হিসেবে বিবেচিত আলহামব্রা প্রাসাদ তাদের কুক্ষিগত হয়। পরবর্তীকালে আলহামব্রা প্রাসাদ বারবার লুন্ঠিত, ধ্বংসপ্রাপ্ত, এবং কালক্রমে পরিত্যক্ত হয়। দুর্গ-প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ধ্বংস করে অপরিকল্পিত ও বেমানানভাবে গড়ে তোলা হয় অন্যান্য স্থাপত্যকর্ম – যেমন ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত পঞ্চম চার্লস (Charles V) এর প্রাসাদ। রেনেসাঁযুগীয় স্থাপত্যশৈলীসহ শক্তিশালী উপস্থিতি প্রমাণ করলেও লাস্যময়ী আলহামব্রা প্রাসাদের তুলনায় তা প্রাণহীন, শীতল, জগদ্দল পাথরসম। অবশেষে উনবিংশ শতকে ইউরোপীয় পরিব্রাজক এবং পন্ডিত ব্যক্তিদের উৎসাহে আলহামব্রা দুর্গ-প্রাসাদের পুনরুদ্ধারকাজ শুরু হয়। অধুনা আলহামব্রা স্পেনের সবচাইতে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশন গুলোর একটি। তিলোত্তমা আলহামব্রা এখন একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট – যুগেযুগে অসংখ্য গল্প, কবিতা, ও গানের অনুপ্রেরণা!

The Palace of Charles V in the Alhambra

আলহামব্রার ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে আরও বিশদ ভাবে জানতে চাইলে দেখুন –

মাদ্রাসা শিক্ষাঃ সাব-অল্টার্নের ক্ষমতা

খন্দকার রাক্বীব, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Madrassa

ক্ষমতার প্রশ্নে খুব বড় দু’জন তাত্ত্বিক হলেন গ্রামসি আর ফুকো। গ্রামসির বক্তব্য ছিল হেজেমনিক লোকরা দলিত শ্রেনির লোকদের উপর ক্ষমতাবান। ফুকো এই মতবাদ খারিজ করে দিয়ে বলেন ‘সাব-অল্টার্ন’রাও ক্ষমতাবান হইতে পারে। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল ‘পাওয়ার ইজ ইভরিহোয়ার’।

ফুকোর এই বক্তব্য আমার চিন্তার নতুন ধার খুললো। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে বসে ওরিয়েন্টাল ডিসকোর্স খারিজ করে পশ্চিমা কিছু তাত্ত্বিকের তত্ত্ব নির্ভর করে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করি তা যথার্থ না। আমাদের জানা কথা যে উপমহাদেশে ‘মেইনস্ট্রিম’ শিক্ষাধারার বাইরে মাদ্রাসা শিক্ষার ‘ইন্সটিটিউশনালাইজেশন’ শুরু হয় মূলত ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পরে, এক ধরনের উপনিবেশবিরোধি আন্দোলনের মোড়কে। ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুসলিম শিক্ষাবিদরা এবং ফারায়েজিরা একটা বিশাল ধাক্কা খায়। পরবর্তিতে ১৮৫৭সালে সিপাহি বিপ্লবে ফারায়েজি মুসলিমরা উপনিবেশবাদবিরোধী সিপাহি আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে আবার পরাজিত হয়। যে পরাজয়ের মাশুলও তাদের দিতে হয় চরমভাবে। শেরশাহ’র ‘সড়ক-ই-আজম’ এর পাশে এমন কোন গাছ ছিলনা যার পাশে মুসলিম উলামাদের লাশ ঝুলানো ছিলনা।

উপনিবেশবাদি শক্তির বিরুদ্ধে মুসলিম উলামারা যখন এভাবে টিকতে ব্যর্থ হচ্ছিল তখন তারা উপনিবেশবিরোধি আন্দোলনের চিহ্ন আর নিজস্ব স্বকিয়তা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে সমাজের মূল স্রোতধারার বাইরে চলে যায়। ফারায়েজিদের সহায়তায় নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। অসংখ্য মাদ্রাসা-মক্তব তৈরি করে। মাওলানা নানুতবি এসময়ে তৈরি করেন দেওবন্দ মাদ্রাসা।

 

তারা উপনিবেশবাদবিরোধি সংগ্রামে পর্যদুস্ত হয়ে এক ধরণের রেসিস্ট্যান্স মনোভাব নিয়ে ‘প্রান্তিক’ পর্যায়ে চলে যায়। আজো তারা ফিরে আসেনি। আমরাও তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছি, কখনো কাছে টানার চেষ্টা করিনি, সংকীর্ন রাজনৈতিক কারণ আর একান্ত প্রয়োজন ছাড়া। তাদের সুযোগ-সুবিধা, সুখ-দুঃখ তাদের ভাষায় না বুঝে আমাদের ভাষায় বুঝতে চেয়েছি। আমরা নিজেদের ‘কেন্দ্র’ ভেবে ওদের ভাবলাম ‘প্রান্তিক’ হিসেবে। প্রান্তের ক্ষমতায়ন অস্বীকার করলাম, যেমন করি প্রান্তে যেতেও।  যেটা ছিল আমাদের মারাত্মক ভুল।

 

পবিত্র কুরআনে ‘সূরা ইয়াছিনে’ পড়েছিলাম  ‘‘জনপদের প্রান্ত থেকে এক লোক শহরবাসির কাছে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল ‘হে আমার জনপদের লোকেরা তোমরা দয়াময় আল্লাহ্‌র এ রসুলদের অনুসরণ কর। এরা এমন রসুল যারা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চায় না।’ যারাই তার অনুসরণ করবে তারাই হবে হেদায়াত প্রাপ্ত। ……আফসোস যদি আমার জাতি এটা জানতে পারত(আয়াত-২০-২৬)’’

 

উপরের এই আয়াত সমূহ আমাকে খুব ভাবিয়েছে এই যুক্তিতে যে, এখানে পষ্টভাবে প্রান্তিক শক্তির কথা বলা হয়েছে। আমরা যারা নিজেদের কেন্দ্রের মানুষ ভাবি, আমাদের জানার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি থাকে, যা আল্লাহ’র ভাষায় ‘আফসোস যদি কেন্দ্রের লোকরা এটা জানত’/ এটাও পষ্ট যে, প্রান্তিকরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রের থেকেও ভালো যানে, এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও বেশী। যা আমরা বুঝতে পারি না, অনেক ক্ষেত্রে অস্বীকার করি। আজ আমাদের মাঝে কেন্দ্রে যাবার প্রবনতা বেশী, কেউ প্রান্তিক হতে চায় না। অথচ আরাফাতের ভাষণের পর ইসলাম ধর্মের প্রচারকরা সবাই প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে। উপনিবেশবাদি আর সাম্রাজ্যবাদীদের দেখি তারাও প্রান্তে প্রান্তে ছড়ানো। মার্কিন গবেষকদের একটা বিশাল অংশ আছে যারা কখনো তাদের নিজ দেশের রাজধানী শহরেও যায়নি, কিন্তু ঠিক-ই মধপ্রাচ্যের কোন একটা অঞ্চলে এসে আরবি ভাষা শিখে নিজের থিসিস দেশে গিয়ে জমা দিচ্ছে। আমাদেরও প্রান্তে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আমেরিকা না, আফ্রিকাতেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা যায় সে চেতনা লালন করা দরকার।

 

মাদ্রাসা শিক্ষিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাই বলা চলে নিজেদের অবস্থান থেকেও ক্ষমতাবান। মনে রাখা দরকার, একরোখা চিন্তা অনুকরণে আমরা যখন এগ্রিকালচারকে  এগ্রিবিজনেসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, তখন তারা আজও আমাদের সে আবহমান ‘গ্রামীণ’ সংস্কৃতি আর এগ্রিকালচারকে টিকিয়ে রেখেছে।

 

রেনেসাঁ যুগে অসংখ্য পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের অনেকের লেখায় দেখেছি, আমাদের ভারতীয় মুসলিমদের লেখার উদ্ধৃতি দিতে। আমাদের মনে রাখা দরকার ১৮৩৫সালের আগে এখানকার মুসলিমদের ভাষা ছিল ফার্সি আর উর্দু। মুসলিমরা ঐ সময়ে সাহিত্য-কলা-সমাজ-বিজ্ঞান-আইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসংখ্য বই লিখেছে আরবি-ফার্সি-উর্দু ভাষায়। যেগুলো আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সম্পদ, আমাদের গর্ব। এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, যা সংরক্ষন করা জরুরী। রাজা রামমোহনের পরে এগুলো নিয়ে খুব কম লেখালেখি হয়েছে। আমাদের জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক একসময় আফসোস করেছিলেন আমাদের মাঝে ‘আরবি-ফার্সি-উর্দু’ ভাষা চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে বলে। মাদ্রাসা শিক্ষিতরা এখনো এগুলো ধারণ করে-লালন করে, কিন্তু প্রকাশ খুব কম-ই করে।

সম্প্রতি তাদের সরকারি স্বীকৃতির কথা উঠেছে, কিন্তু আমরা আবার আগের ভুল করছি। আমাদের মত করে তাদের সমস্যা ব্যাখ্যা করছি, তাদের উপর আমাদের চিন্তা চাপিয়ে দিচ্ছি। তাদের সুযোগ-সমস্যা তাদের মত বুঝতে চাই নি। তাদের সমস্যা তাদের মুখে শুনতে হবে, তাদের মত করে তাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদের মত করে ‘মেইনস্ট্রিম’ না ভেবে তারা কিভাবে তাদের ‘মেইনস্ট্রিম’ ভাবছে সেটা বিবেচনা করতে হবে। তবেই প্রান্তিকতার বয়ান একটা সুনির্দিষ্ট যথার্থ জায়গায় নিজেকে সমাসীন করতে পারবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আর ‘মিথ অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’ এর পুনর্পাঠ

খন্দকার রাক্বীব, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের ‘ওয়ার অন টেরর’ প্রকল্পের আওতায় গত বছর যে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন’ পাস করেছে তার ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী স্বরূপ দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। ৭৪এর বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতো এই কালো আইনকে রুখে দেওয়া রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে জুলফিকার আলি ভুট্টো প্রবর্তিত ‘মিথ অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’ আর সলিমুল্লাহ খান প্রবর্তিত সন্ত্রাসবাদ কেন্দ্রিক ‘ত্রাসনীতিঃ বিচার না বারোয়ারী’ এর পুনর্পাঠ জরুরী। জানার কথা যে, সন্ত্রাসবাদের এংরাজি প্রতিশব্দ ‘টেররিজম’এর উৎপত্তি মূলত ফরাসি দেশে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে। সেকালে জনগণের বড় বড় আন্দোলন রোধ করার মতলবে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্র বা সরকার সমাজে ভয়ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করতেন। এই ধরণের চেষ্টার নাম-ই এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছিল ‘টেররিজম। জগতখ্যাত ফরাসি বিপ্লবের বিশেষ এক বছরে ১৭৯৩-৯৪তে ডাক্তার গিয়োটিন প্রবর্তিত যন্ত্র তলোয়ারে যখন আনুমানিক বিশ হাজার লোকের মাথা কাটা হয়, তখনকার সময়কেই প্রথম বিবেচনা করা হয় ‘রেইন অব টেরর’ হিসেবে। যার বাঙ্গালায় সহজ বয়ান এখন ত্রাসের রাজত্ব।

সন্ত্রাসবাদের এই বয়ান জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার মূল দোসর জোসেফ কনরাডোর মত ঔপোন্যাসিকরা আর নীৎসেদের মত নৈরাজ্যবাদী দার্শনিকরা। যার নজির আমরা বিংশ শতাব্দীতে আমাদের এই দেশে দেখেছি। যখন এখনকার মানুষদের অসহযোগ, অহিংস, খেলাফত আর সত্যাগ্রহের মত স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াইগুলোকে ত্রাস হিসেবে হাজির করা হয়েছে। যেমন এখন করা হচ্ছে জায়নিস্ট কর্তৃক ফিলিস্তিনি মুসলমানদের আর সিসি কর্তৃক মিসরীয় মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিতকরণ। দেশে দেশে সংঘঠিত জনগণের আন্দোলনকে এভাবেই সাম্রাজ্যবাদীদের ‘ওয়ার অন টেরর’এর আওতায় আনা হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্প্রতি নিজেকে এই প্রকল্পে জড়িয়ে ফেলছে, যার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ।

জানা কথা যে, টেররের সাথে টেরিটরি তথা ভূখণ্ডের এক ধরণের সম্পর্ক থাকে। দুনিয়া তাবত বর্তমান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যুদ্ধরত একমাত্র গোষ্ঠী আল-কায়েদা যখন ৯/১১এর ঘটনায় অভিযুক্ত হল, তখন-ই এই সন্ত্রাস আর টেররের সংজ্ঞা নিয়ে গবেষক আর ভাষাতাত্ত্বিকরা বিপাকে পড়ে গেলেন। এক কালের নাস্তিক দেরিদা যখন থেকেই তাঁর অবিনির্মাণ তত্ত্ব নিয়ে জ্ঞানরাজ্যে হাজির হন, তখন থেকেই এই ‘টেররিজম’ ধারণার সমালোচনা করে আসছেন। কিন্তু এই জ্ঞানরাজ্যে আল কায়েদা প্রশ্ন হাজির হওনের সাথে সাথে তিনি নিজ অবস্থান থেকে কেমন করে উল্টে গেলেন।

এশিয় মুসলিমদের খেলাফতি পতনের পর হেজেমনিক পশ্চিমা কর্তৃক তৈয়ার করা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে সাফাই গাওয়া ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘ইন্ড অব দ্যা হিস্ট্রি’র মত দেরিদা তাঁর ‘philosophy in the time of violence’এ পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনদুই দলের এক দলকে যদি আমার বেছে নিতেই হয় তো আমি আমেরিকা আর ইউরোপকেই বেছে নিব। আমেরিকা আর ইউরোপের বিরুদ্ধে, তাদের রাজনীতির চেহারা আর ‘সন্ত্রাসবিরোধি জোট’ নিয়ে আমার অনেক নালিশ। তবু আমি শত দোষ সত্ত্বেও আইন যাদের পক্ষে আর যারা শত সত্য সত্য বেঈমানি আর ওয়াদাভাঙ্গার বৈফল্য সত্ত্বেও গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থার পক্ষে একজোট শেষবিচারে সেই দলেরই পক্ষ নেব।”

সলিমুল্লাহ খানরাও এরকম ২০০৫সালে লেখা ত্রাসনীতির প্রশ্নে মজলুমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের জন্য কলম ধরেছিলেন, কিন্তু আজ শেষ বিচারের সময়গুলোতে আর মজলুমের পক্ষে রইলেননা, তাদের বিরুদ্ধেই নব নব তত্ত্ব হাজির শুরু করলেন।

জীবনের সায়াহ্ন বেলায় দেরিদার গুরু লাকা নিজেদের অবস্থান ভুল বুঝতে পেরে স্বীকার করেছিলেন, পশ্চিমা সভ্যতার কথিত অনুন্নত দুনিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ার অন টেরর বর্ণঘৃণা আকারে হাজির হবে। তাঁর বক্তব্য যথার্থতার দিকেই আগাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে সলিমুল্লাহ খানদের ‘মিথ অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’ আর নব সন্ত্রাসবাদের বয়ান জনগণের সামনে ঘৃণা আকারে সেরকম হাজির হতে পারে। যদি না তারা ওয়ার অন টেররের তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে না পারেন, বুঝতে না পারেন জনগণের মনের কথা, হাজির না করতে পারেন ‘মিথ অব ইন্ডিফ্যান্ডেন্স’এর বদলে ‘ফ্যাক্ট অব ইন্ডিফেন্ডেন্স’এর বয়ান।

 

পাদটীকাঃ রাষ্ট্র মানেই সন্ত্রাস, তবে সন্ত্রাস মানেই রাষ্ট্র না (হেবারমাস, ২০০৩)।

সমকালীন বাঙালি মুসলমান তরুণ প্রজন্মের ইসলাম-বিমুখতা প্রসঙ্গে একটি বিশ্লেষণ

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

সমকালীন বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাধারণ-শিক্ষায়-শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘প্রগতিশীলতা’ ও ‘আধুনিকতা’র নামে একধরনের ইসলাম-বিমুখতা (এমনকি বিদ্বেষ) লক্ষ করা যায়। এই শ্রেণীর তরুণেরা পাশ্চাত্য এনলাইটেনমেন্ট চিন্তার প্রভাবে ইউরোপীয় ইহজাগতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবাদর্শের প্রতি সাধারণত আকৃষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তুতারা ভুলে যায় যে ইউরোপীয় ইহজাগতিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিকাশ ঘটেছিল সেখানকার ইতিহাসের একটি বিশেষ প্রেক্ষিতে। সেটা আসলে ঘটেছিল মধ্যযুগের খ্রিষ্টীয় চার্চের নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া উত্থানের বিশেষ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে।

অথচ বাংলার ইতিহাসে ইসলামের আবির্ভাব ও ভূমিকা মধ্যযুগের খ্রিষ্টান ধর্মের মত নয়। একটি তীব্র সামাজিক নিপীড়নমূলক হিন্দু বর্ণভেদ প্রথার বিপরীতে মুক্তিদায়ী চেতনা হিসেবে মধ্যযুগের বাংলায় ইসলামের আগমন। এই জনপদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গ কৃষিজীবী শ্রেণী যাঁরা আর্য বর্ণভেদ সমাজব্যবস্থার অধীনে কোনও যথার্থ স্থান পাননি, তাঁরা প্রথমে বৌদ্ধ ধর্মের সমতাভিত্তিক ব্যবস্থায় আশ্রয় খুঁজেছেন এবং পরবর্তী্কালে সুমহান ইসলামের আওতায় এসে সমতার মর্যাদা অর্জনে প্রয়াসী হয়েছেন।

পরবর্তীকালে ইংরেজ আমলে এই বাঙালি মুসলিম কৃষক শ্রেণীই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথার অধীনে পুনরায় শোষণ বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বর্ণ হিন্দু জমিদার শ্রেণীর দ্বারা। এই বর্ণ হিন্দু জমিদার শ্রেণীর জুলুম থেকে ও ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেতে বাংলার মুসলিম কৃষক শ্রেণী ধারাবাহিকভাবে শহীদ তিতুমীর, হাজী শরীয়তউল্লাহ ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংগ্রাম করেছেন। এক্ষেত্রেও ইসলাম একটি প্রগতিশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল। কাজেই মধ্যযুগের ইওরোপে খ্রিস্টান ধর্মের ভূমিকা নেতিবাচক হলেও বঙ্গদেশে ইসলামের ভূমিকা মধ্যযুগ থেকে আজ অবধি অত্যন্ত ইতিবাচক।

বাঙালি মুসলমান কৃষক শ্রেণী পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন ইসলামের এই ধারাবাহিক মুক্তিদায়ী চেতনা ও ভূমিকার আলোকেই। পাকিস্তান আমলে যখন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য অব্যাহত রইল এবং গণতন্ত্রের চর্চায় ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠলো, তখন এই বাঙালি মুসলমানেরা ভাষা ও স্বাধীকারের সংগ্রাম থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির দিকে এগিয়ে গেলেন। বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে বটে, কিন্তু তাই বলে কি বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ও জাতীয় বিকাশে ইসলামের মুক্তিদায়ী ভূমিকা শেষ হয়ে গেছে? এর উত্তর হল – না, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণে ও বাঙালি মুসলমানের জাতীয় বিকাশে ও অগ্রযাত্রায় ইসলামের সমষ্টিগত ভূমিকা এখনো অপরিসীম। বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য, রাজনৈতিক ও সামাজিক ইসলামের গণ্ডি থেকে খারিজ হবার জন্য নয়। হ্যাঁ, ইসলামের যে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তিদায়ী ভূমিকা আমরা এই অঞ্চলে দেখে আসছি, মধ্যযুগে এর আগমন কাল থেকে, তা আজও বাংলাদেশে অতীব প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য।

তাই ‘আধুনিকতা’ ও ‘প্রগতিশীলতা’র নামে ইসলামের সমষ্টিগত মুক্তিদায়ী চেতনা থেকে বাঙালি মুসলমান তরুণ প্রজন্ম বিযুক্ত থাকতে পারে না। আর ইসলাম যেহেতু একাধারে ইহজাগতিক এবং পারলৌকিক, আবার ইসলাম যেহেতু অন্তর্নিহিতভাবে অসাম্প্রদায়িক ও সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাই আলাদাভাবে ইউরোপীয় আদলে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চাও এখানে অপ্রয়োজনীয়।

বাঙালি মুসলমান তরুণ প্রজন্মকে আজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সৃষ্টিশীল ও উদ্যোগী হয়ে উঠতে হবে। এটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য খুবই দরকার। তাঁদেরকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে হবে। আর সেই সঙ্গে তাঁদের আত্মসম্মানবোধ, আত্মবিশ্বাস ও চারিত্র্য সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য ইসলামী সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও আদর্শের অনুশীলন ও অনুসরণ করতে হবে। পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার সঙ্গেসঙ্গে একই মাত্রায় ইসলামী আদর্শ, জ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। মনে রাখতে হবে মধ্যযুগে ও ইংরেজ উপনিবেশ থেকে মুক্তির কালে ইসলাম যেমন বাঙালি মুসলমানের দিকনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করেছে, ঠিক তেমনি আজও বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইসলাম বাঙালি মুসলমানের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উৎস ও পথনির্দেশিকা হতে পারে।

তাই আমাদের প্রত্যাশা এই যে, এই সময়ের বাঙালি মুসলমান তরুণ পাশ্চাত্যের জন লক্, টমাস হব্স, এডাম স্মিথ, জন স্টুয়ার্ট মিল, কার্ল মার্ক্স, জন কেইন্স, নোয়াম চমস্কি, মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদ্যা, এডওয়ার্ড সায়ীদ প্রমুখের লেখা ও চিন্তা চর্চার পাশাপাশি প্রাচ্যের মওলানা রুমি, আল গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়া, শাহ ওয়ালীউল্লাহ, আল্লামা ইকবাল, মওলানা মওদুদী, আকবর এস আহমেদ, মুহম্মদ আবদুহু, সাইয়িদ কুতুব, এল এফফেন্দি প্রমুখের রচনা ও চিন্তার প্রতিও সমান অভিনিবেশ নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে। শুধুমাত্র পশ্চিমা ধ্যান ধারণায় নিমগ্ন থেকে একধরনের উন্নাসিক আত্মশ্লাঘায় না ভুগে তাঁদের উচিত হবে নিজেদের মুক্তিদায়ী ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকেও প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন উৎস ও উপাদান আহরণ করে সময়োপযোগী গতিশীল শ্রেয়তর ইসলামী চেতনা ও সংস্কৃতির সৃষ্টি ও বিকাশ সাধন করা।


লেখক পরিচিতিঃ মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত। ঢাকার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল স্কলাসটিকায় কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তাঁর ইংরেজী ভাষায় রচিত ‘ডিসকভারিং বাংলাদেশ’ নামক একটি বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়ক গ্রন্থমালা  বিভিন্ন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে প্রচলিত। তিনি সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতির একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক।

ই-মেইলঃ  manwar.shamsi@gmail.com

উম্মতে মোহাম্মদীর একাল সেকাল by Atahar Hossayen

প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী এবং পরবর্তীদের অবস্থার মধ্যে কি বিরাট একটি তফাত এসে যায়। দুটি ঘটনার মাধ্যমে আমি সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। একটি খলিফা ওমরের (রাঃ) সময়ে অন্যটা একজন উমাইয়া খলিফার সময়ে। ওমরের (রাঃ) সময়ে মিশরের শাসনকর্তা হাইয়ান ইবনে শারিহ খলিফাকে লিখলেন- আমীরুল মোমেনীন! অমুসলিমরা স্বেচ্ছায় এত সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করছে যে, জিজিয়া আদায় অনেক কমে গেছে। এখন কি করা? ওমর (রাঃ) রাগান্বিত হয়ে জবাব দিলেন- জিজিয়া আদায় কমে যাচ্ছে বোলে অভিযোগ কোরতে তোমার একজন মুসলিম হিসাবে লজ্জা করলো না? তোমার মনে রাখা উচিৎ যে, রসুলুল্লাহ (দঃ) কর আদায় করার জন্য প্রেরিত হননি (সয়ুতি, ইদ্রীস আহমদ এবং decisive moments in the History of Islam- Inan)। ঠিক এমনি অভিযোগ এসেছিল একজন গভর্নরের কাছ থেকে এক উমাইয়া খলিফার কাছে। অমুসলিমরা মুসলিম হয়ে যাচ্ছে, জিজিয়া দেয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বোলে রাজকোষে সম্পদ কমে গেছে। ঐ খলিফা আদেশ দিলেন অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণ বন্ধ করে দাও। একই অভিযোগের দু’টি বিপরীতমুখী উত্তর। অভিযোগ শুনে ওমর (রাঃ) খুশী হয়ে ছিলেন, যদি জিজিয়া আদায় একেবারে বন্ধ হয়ে যেতো তাহলে তিনি সবচেয়ে বেশী খুশী হোতেন, কারণ তার মানে ঐ অঞ্চলের সমস্ত অমুসলিম মুসলিম হয়ে গেছে, মুসলিম উম্মাহ উদ্দেশ্য পূরণে তাদের প্রিয় নবীর (দঃ) আরদ্ধ কাজে আরও একটু অগ্রসর হয়েছে। আর ঐ উমাইয়া খলিফার সম্মুখে তখন আর সে উদ্দেশ্য নেই। তার জাতিরও সে উদ্দেশ্য নেই। উদ্দেশ্য বদলে গিয়ে হয়ে গেছে রাজত্ব ও আনুসঙ্গিক শান-শওকত। কাজেই তখন আর ঐ জাতি উম্মতে মোহাম্মদী নেই। কারণ উম্মতে মোহাম্মদীর উদ্দেশ্য ও তার পরের ঐ জাতির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইতিহাস দেখুন, পরিষ্কার দেখতে পাবেন যে, ঐ উদ্দেশ্যচ্যুতি বা পরিবর্তন ঘটেছে ভবিষ্যতদ্রষ্টা বিশ্বনবীর (দঃ) ৬০ থেকে ৭০ বছর পর। লক্ষ্য করলে আরও একটি ব্যাপার দেখতে পাবেন। সেটা হলো রসুলাল্লাহর (দঃ) কাছ থেকে যারা সরাসরি ইসলাম শিক্ষা করেছিলেন অর্থাৎ আসহাব তারা কখনই ঐ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। বিচ্যুতি এলো তারা সবাই পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর। যেহেতু উদ্দেশ্যের পরিবর্তন বা চ্যুতি হলো কাজেই ঐ জাতি আর উম্মতে মোহাম্মদী রোইলনা এবং আজ পর্য্যন্তও উম্মতে মোহাম্মদী নয়। তবে একথা মনের রাখতে হবে যে, আমি জাতি হিসাবে উম্মতে মোহাম্মদী বলছি। ৬০/৭০ বছর পর থেকে এই উম্মাহ জাতি হিসাবে উম্মতে মোহাম্মদী রইলো না কিন্তু ব্যক্তি ও দলগতভাবে অনেক লোকই রইলেন যারা ইসলামের সর্বপ্রধান লক্ষ্য ও রসুলাল্লাহর (দঃ) সুন্নাহ ভুলে গেলেন না। সাধারণ মুজাহিদ ও কিছু কিছু সেনাপতির আকীদা ঠিকই ছিলো যারা উর্দ্ধতন নেতৃত্বের আকীদা বিকৃতি সত্ত্বেও নিজেদের আকীদা ঠিক রেখে জেহাদ চালিয়ে গেলেন, যার ফলে ঐ বিকৃত আকীদার খলিফাদের সময়েও ইসলাম আরো বিস্তৃত হয়েছ। সিন্ধু বিজয়, স্পেন বিজয় ইত্যাদি অনেক বিজয়ের ঘটনা অনেক পরেও ঘটেছে। কিন্তু তা আর জাতিগতভাবে নয়। সেটা ব্যাক্তি উদ্যোগে কিংবা বড় জোর কোন নিষ্ঠাবান গভর্নরের মাধ্যমে। জাতিগতভাবে বাদশাহী শুরু হওয়ার পর থেকেই জাতিগত জেহাদ বর্জন করা হয়েছিল।