আমায় ভাসাইলিরে, . আমায় ডুবাইলিরে

Bu Watchdog Bd

ওরা মারে, ওরা মরে…ওরা শীতলক্ষ্যার পানিতে ভাসে!

সিদ্ধিরগঞ্জ। আর দশটা জনপদের মত বাংলাদেশের আরও একটা জনপদ। পালাবদলের সাথে এখানেও বদল হয় ভগবানদের চেহারা। সাথে বদল হয় তাদের দোসর থানা পুলিশ, এসপি, ডিসি, আইন, আদালত ও বিচারক। রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পদে বসে অপরাধ ও অপরাধীদের লালন করার অভয়ারণ্য আমাদের জন্মভূমি। এখানে দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে যেমন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করা যায়, তেমনি ক্ষমতার ছত্রছায়ায় প্রতিপক্ষকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে পোক্ত করা যায় লুটে পাওয়া সে ক্ষমতা। সিদ্বিরগঞ্জও এর বাইরে নয়। এখানেও ভগবান আছেন। তারা নিরাকার। খালি চোখে দেখা যায়না। কেবল ঘাড়ের কাছে তাদের নিশ্বাস অনুভব করা যায়। শিমরাইল টেক পাড়া এলাকার মৃত হাজি বদরুদ্দিনের ছেলে নুর হোসেন। কর্মজীবন শুরু করেন সিদ্ধিরগঞ্জ ইকবাল ট্রাক গ্রুপের হেল্পার হিসাবে। ১৯৮৯ সালে একই এলাকার ট্রাক চালক ও হেল্পার ইউনিয়নের নেতা বনে যান গায়ের জোর। ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাক চালক দাইমুদ্দিনকে উচ্ছেদ করে দখল নেন ইউনিয়নের এবং ক্ষমতাসীন দল জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে পোক্ত করে নেনে অবৈধ দখল। ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে নাম লেখান বিএনপির রাজনীতিতে। ক্ষমতার সিঁড়ি টপকানোর শুরুটা হয় এখানেই। এরপর তরতর করে পদানত করেন ইউপি চেয়ারম্যানের মসনদ। ’৯৬ সালে জয়ী হন দ্বিতীয় টার্মেও। বিএনপি ছেড়ে হাত মেলান শামীম ওসমানের সাথে। বনে যান আওয়ামী নেতা। ২০০২ সাল পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় শিমরাইল মোড়ে গড়ে তোলেন চাঁদাবাজীর সিন্ডিকেট। ভগবানের চরণে নিয়মিত পূজা দিয়ে আবিস্কার করতে থাকেন সম্পদ আহরণের নতুন নতুন দিগন্ত। পরবর্তী স্টপেজ নারায়ণগঞ্জ ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদ। ক্ষমতার সিঁড়ি বাংলাদেশে কখনোই মসৃণ হয়না। নুর হোসেনের বেলায়ও ব্যতিক্রম হয়নি। নজরুল ইসলাম একই এলাকার বাসিন্দা এবং ক্ষমতার সিঁড়ি টপকানোতে নুর হোসেনের প্রবল প্রতিপক্ষ। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে গিয়ে থামতে হয় নজরুল ইসলামকে। নুর হোসেনের সাথে নজরুল ইসলামের রেশারেশি ক্ষমতার রুটি হালুয়া নিয়ে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক সিন্ডিকেট, বেশ্যালয় সহ শত শত অবৈধ ব্যবসার মালিকানা নিয়ে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী লড়াই। ১৭ বছর একনাগাড়ে চলতে থাকে এ লড়াই।

10339700_10203944204584954_4392159966178853964_n

১৯৯৭ সালের ১৭ই জুলাই। মাগরিব নামাজের পর মিজমিজি চৌধুরী পাড়া এলাকায় নজরুলের ক্যাডারদের হাতে খুন হন সাইফুদ্দিন নামের এক ভদ্রলোক। পরে বের হয় ভুল টার্গেট ছিল এই সাইফুদ্দিন। নামের গোলমালে প্রাণ দিয়ে হয় তাকে। ২০০০ সালের ১৭ই আগষ্ট। নুর হোসেনের সমর্থক জহিরুল ইসলাম নামের এক সব্জি বিক্রেতা নির্বাচনী পোস্টার লাগানোর দায়িত্ব পালন করছিলেন। নজরুলের উপস্থিতিতে তার ক্যাডাররা খুন করে জহিরুল ইসলামকে। এর প্রতিদান ফিরিয়ে দিতে দেরি করেনি নুর হোসেন। তার ক্যাডাররা ১লা অক্টোবর স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে ঢুকে খুন করে নজরুলের সমর্থক যুবলীগ নেতা আবদুল মতিনকে। তারও আগে ১৯৯৬ সালে শিমরাইল মোড়ে নিহত হন আওয়ামী লীগ কর্মী আলী হোসেন। নুর হোসেনকে আসামী করা হলেও ভগবানের হাত ধরে অব্যাহতি পান মামলা হতে। নজরুলে ক্যাডার শিপন, রনি ও ফারুখ ২০০১ সালের ৩১শে মার্চ শিল্পী নামের এক তরুনীকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। তার অপরাধ, বিয়ের প্রস্তাবে অনিচ্ছা প্রকাশ। ২০০০ সালের ৩রা মার্চ ধানমন্ডির ১৫ নং সড়কের ১৬নং বাড়িতে খুন হন এডভোকেট বাবর এলাহি। তদন্তে প্রকাশ পায় নজরুল ভাড়াটে খুনি দিয়ে খুন করায় তাকে। খুনের মূল্য ছিল ৫ লাখ টাকা। দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল ২০০৪ সালে নজরুলকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করে। পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়ে যান এই নেতা। এবং ফিরে আসেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার বছর। হাইকমান্ডের নির্দেশে হাইকোর্টের আওয়ামী বিচারকগণের হাত ধরে খালাস পান খুনের মামলা হতে। ২০০৯ সালের ১৩ই অক্টোবর মিজমিজি পূর্বপাড়ার নিজ বাড়ির সামনে খুন হন বাংলাদেশ চুন প্রস্তুতকারক সমিতির সহ-সভাপতি জনাব আবু তালেব। তদন্তে পাওয়া যায় নজরুলের সংশ্লিষ্টতা।

২০১৪ সালের ৩০শে এপ্রিল। বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকা। এলাকার বুক চিড়ে বহমান শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ভাসমান কটা লাশ দেখে উৎসুক হয়ে উঠে স্থানীয় জনগণ। খবর দেয় স্থানীয় পুলিশকে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে খবর দেয় আত্মীয়দের। লাশের মিছিলে খুঁজে পাওয়া যায় নজরুলের লাশ। সনাক্ত করেন তার স্ত্রী। অবশ্য ততদিনে নজরুলের পরিচয়ে কিছু উপাধি যুক্ত হয়ে হয়ে গেছে; যেমন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল চেয়ারম্যান। প্যানেল চেয়ারম্যান নজরুলকে একা ভাসতে দেখা যায়নি শীতলক্ষ্যা নদীর ঠান্ডা পানিতে। সাথে ছিল তার তিন সহযোগী। সাথে কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ হিসাবে প্রাণ হারায় এক এডভোকেট ও তার ড্রাইভার। তাদের অপরাধ এখনো পরিষ্কার নয়। তবে সন্দেহ করা হচ্ছে সাংবাদিক সাগর-রুনির মত তারাও স্বাক্ষী হয়েছিল ভগবানদের বড় কোন অপরাধের।

পাঠক, এবার আসুন নজরুল ও নুর হোসেনদের কাপড় খুলে উন্মোচন করি তাদের লজ্জাশীন অঙ্গ সমূহ। অনেকের মত নজরুল-নুর গংদের জন্ম ক্ষমতার ঘরজামাই, বিশ্ব বেশ্যা সমিতির আজীবন চেয়ারম্যান জনাব হোমো এরশাদের জরায়ুতে। বেশ্যা ভোগের মত বেগম জিয়ার বাহিনীও ভোগ করে গেছে তাদের সার্ভিস। লগিবৈঠা বাহিনীর প্রধান ও ক্ষমতার জারজ কন্যা শেখ হাসিনা কেবল উপভোগই করেই ক্ষান্ত হননি, বরং জাতির গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন পচনশীল মহামারী হিসাবে। দেশের উচ্চ আদালতে নিয়োগপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার কাম বিচারকরাও বাইরে থাকেননি এ সিন্ডিকেটের। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীকে বেকসুর খালাস দিয়ে প্রমান করেছেন তারাও ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট খোর। চেতনার যোনিপথে ফিল্টার লাগিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধের সাথে সহবাস করছেন তাদের হীমশীতল নীরবতা এসব দানবদের উত্থানে ফার্টিলাইজার হিসাবে কাজ করেছে মাত্র। যে দেশে সরকার তার নাগরিকদের রাতের অন্ধকারে খুন করে ক্ষমতার পথ মসৃণ করার জন্য, সে দেশে নুর হোসেন তথা শামীম ওসমানরা নজরুল গংদের শীতলক্ষ্যার গভীর পানিতে সমাহিত করবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের বাতাসে এখন লাশের গন্ধ। এ গন্ধ বিচ্ছিন্ন কোন গন্ধ নয়। বরং এ গন্ধের মাথা আছে, মগজ আছে, হাত-পা আছে। গন্ধের সূত্র চাইলে তা শীতলক্ষ্যার গভীর পানিতে নয়, বরং সন্ধান করতে হবে ভগবানদের দরবারে।
http://www.amibangladeshi.org/blog/05-01-2014/1455.html

বাম-আক্রান্ত রাজনৈতিক শ্বাসকষ্ট

by: Aman Abduhu

বাংলাদেশে ডানপন্থীদের নির্বুদ্ধিতা দেখে কষ্ট লাগে। চোখে পড়লো একজনের উদাত্ত আহবান ‘অমুক এবং অমুক মিলে তমুক টিভি চ্যানেলে ভারতকে ফাটাচ্ছে!!’। ভাবটা এমন, হে দেশপ্রেমিক ভাইয়েরা আসুন এবার উনাদের গুরু মেনে নিয়ে কোমরে বোমা বেঁধে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ি। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম।

দেখে থমকে গেলাম। আমরা এতোটা বোকা কেন? নিরুপায় হতভাগা কোন বর্গাচাষীর মতো। শরীরে শক্তি আছে, তবু কোন উপায় নেই। কিছু করার নেই। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর গ্রামের সুদী-ব্যাবসায়ী আবুল হোসেন এসে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলেই ডুকরে কেঁদে উঠি। ভিটে-বাড়ির দলিলপত্র কাবিননামা সব তার হাতে তুলে দিয়ে বলি, আমাকে বাঁচান। আমার আর কেউ নাই!

কেউ কোন কথা বললে বা কাজ করতে পারলেই হলো। তিনি আসলে কি বলছেন, কি উদ্দেশ্য নিয়ে বলতে পারেন অথবা এর ফলাফল কি হতে পারে, এসব চিন্তা করার ন্যুনতম ক্ষমতা আমাদের নেই। তারচেয়ে বড় বোকামী হলো, আমরা অতীত ভুলে যাই। বিন্দুমাত্র মনে রাখিনা। আবেগের স্রোতে অতীত বর্তমান ভবিষ্যত সব হাবুডুবু ভাসতে থাকে।

তাই ডানপন্থীদের নেতৃত্বের উপদেষ্টার কাজ করেন শফিক রেহমান। সরকারী দলের নির্যাতনের বিপক্ষে আসিফ নজরুল কথা বললে আমরা উদ্বেলিত হই। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিছু বলা মাত্র পিয়াস করিমের কোলে উঠে পড়ি। ইসলামের পক্ষে কিছু বললে হলো, শেষ করার আগে ফরহাদ মজহারকে ঘাড়ে বসিয়ে নাচতে শুরু করি। বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে যায় এমন একটা বাক্য লিখলে আবুল মকসুদকে চুমা দিয়ে ভিজিয়ে ফেলি। দেশের প্রধান পত্রিকাগুলোর সম্পাদক কে? মতিউর, মতিউর রহমান চৌধুরী, আবেদ খান।

দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্মের বর্তমান অবস্থা খেয়াল করলে এ বিষয়টা কৌতুহল জাগায়। এমনকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের বিবেক ও কণ্ঠস্বর হিসেবে ধরে নিয়ে যাদের পেছনে আমরা দৌড়াচ্ছি, তাদের প্রায় সবাই জীবনের ফর্মেটিভ বছরগুলোতে বাম রাজনৈতিক আদর্শের কর্মী ছিলেন। সব রসুনের গোড়া এক জায়গায়।

দৃঢ়ভাবে ধারণা করি, আগামী কিছু বছরের পর বামপন্থীরাই এদেশ চালাবে। বামদের মাঝে একটা বিবর্তন ঘটেছে। তারা নিজেদের মাঝে ভিন্নমতকে একোমোডেট করেছে। প্রশস্ত হয়েছে। যখন প্রশস্ত হওয়া সম্ভব হয়নি তখন আলাদা দল করেছে। তারা যখন শত শত গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চার পাঁচজন নিয়ে মিছিল মিটিং করেছে, আমরা বিদ্রুপের হেসেছি। কিন্তু নিজেদের মাঝে এ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নিজেদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি দাঁড় করানোর জন্য তাদেরকে খাটতে হয়েছে। তাদের বু্দ্ধি ও চিন্তাশক্তি শানিত হয়েছে। অন্যদিকে ডানপন্থীদের দিকে তাকালে মানুষ দেখিনা। দেখি একপাল ভেড়া ম্যা ম্যা কলরবে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে।

এ অবস্থার জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই, আমাদের পূর্বসূরীর দল। ডানপন্থীদের মাঝে ভিন্নমত কিংবা সমালোচনার পরিণতি হলো সমাজচ্যুত হওয়া। তারা বেশিরভাগ সময় ধান্দাবাজি আর পাওয়ার পলিটিক্স নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। ফলশ্রুতিতে সত্তর আশির দশকের যে তরুণ প্রজন্ম আজকে বাংলাদেশের হাল ধরেছে, তাদের মাঝে বামপন্থীরা হয়ে উঠেছে বুদ্ধিমান, ধারালো এবং যোগ্য। ডানপন্থীরা ঐসবের ধারেকাছেও যেতে পারেনি। তারা হয় ধনী হয়েছে। অথবা নির্বোধ হয়েছে। এক দঙ্গল ছাগল অনুসারীর সামনে থাকা মিথ্যাবাদী রাখাল হয়েছে।

আধুনিক রাজনীতি-শাস্ত্র অনুযায়ী, বাম রাজনীতি মানুষের অধিকার ও সম্পদ বন্টনের ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলে। পৃথিবীর অনেক দেশে তারা দেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বেরও প্রবক্তা। অন্যদিকে ডান রাজনীতি সরকারের গঠন, ধর্ম, অথবা দেশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক উন্নতি এসব নিয়ে কথা বলে। বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নরকম হয়ে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশে ডান বাম সব ধরণের ইস্যু নিয়ে ভোকাল কর্ড হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছে বামপন্থীরা। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক দিকে জাত-বামপন্থীদেরকেই নেতা বানিয়ে নিয়েছি, এ বাস্তবতা স্বীকার করি অথবা না করি। তারা ছড়িয়ে পড়েছে প্রয়োজনীয় প্রতিটি সেক্টরে। এমনকি তারা দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতা-মন্ত্রী-পলিসি মেকারও হয়ে গিয়েছে।

বামপন্থীদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তারা উদ্দেশ্যসাধনে যে কোন উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধা করেনা। সারা পৃথিবীতে এটা দেখা গেছে। রাশিয়া চীন দক্ষিণ এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, সব জায়গাতেই। বাংলাদেশের বামরা তাদের মূল যে চিন্তা, সম্পদের বন্টন বিষয়ে তাদের যে আশা, সে আশা বাস্তব করার জন্য যে কোন দল করতে পারে। র বা সিআইএ, যে কোন অর্গানাইজেশনের হয়ে কাজ করতে পারে। ঐসব দিকে তাদের নৈতিক কোন সমস্যা নাই।

বর্তমানে বাংলাদেশ ধ্বংস করছে বামেরা। হাসিনাকে ইনষ্ট্রাকশন দেয় ইনু। দেশ ধ্বংসের প্রতিবাদও করে বামেরা। র এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাহসী কথা বলেছেন ফরহাদ মজহার।

বামদের এ সফলতার কারণ হিসেবে তাদের যোগ্যতার পাশাপাশি অন্যদের অযোগ্যতাও কম না। এদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোন আদর্শিক বা স্থায়ী কোন নৈতিক অবস্থান নেই। একমাত্র জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে ভিত্তি করে ডানপন্থী একটা বাংলাদেশী আইডিওলজি দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তার মৃত্যুতে ঐটা ভেস্তে যায়। জামায়াতের নিজস্ব আদর্শ থাকলেও তারা অন্ধ। নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করতেই পারে, কিন্তু সে প্রমাণিত ভুলকে আজীবন অস্বীকার করে যাওয়ার মতো অন্ধত্ব দুনিয়াতে বিরল। পঙ্গু একজন মানুষের হাতে ডুকাটি সুপার-বাইক তুলে দেওয়ার একটা ঐতিহাসিক উদাহরণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের দিক থেকে সবচেয়ে দেউলিয়া দল হলো আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর থেকে লুটপাট দুর্নীতি আর ধর্ষণ ছাড়া আওয়ামী লীগের অন্য কোন আদর্শ নেই। বামরা ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে গিয়েছে আওয়ামী লীগকে অবলম্বন করেই বেশি। আর বাকীরা আওয়ামী বিরোধীতা করেই অবস্থান তৈরী করেছে। আমি খাড়ায়া যামু তুমি বসায়া দিবা’র ক্লাসিক নমুনা।

সুতরাং জ্ঞান-বুদ্ধির দিক থেকে এগিয়ে থাকা এই বামপন্থীরা, এককালের আদর্শবাদী যুবকের দল আর আজকের সমাজে পথিকৃৎ, এরা বাংলাদেশকে যেদিকে নিয়ে যাবে, আগামী দশ বিশ বছর পর বাংলাদেশ ঐ জায়গাতেই গিয়ে দাঁড়াবে। চল্লিশ পঞ্চাশ বছরের সাধনার ফল তারা এক দেড়শ বছর ভোগ করলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই স্বপ্নপূরণে সহায়তার প্রতিদানও ভারত নেবে।

তবে ভারতের মতো বড় একটা দেশের নাগরিক হওয়া নিয়ে সিলেট খুলনার মানুষদের খুব একটা আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। ওখানে কিছু মারামারি হলেও হতে পারে। কিন্তু আলটিমেটলি হাতে পায়ে ধরলেও ভারত সরাসরি বাংলাদেশের বোঝা নিজের কাঁধে কখনো তুলে নেবে না। আমরা ওখানে জমি রক্ষায় লাফাতে থাকবো। ফাকতালে হয়তো পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীন একটা দেশ জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। অথবা বৈদ্যবাবুদের স্বপ্নের বঙ্গভূমি কায়েম হবে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের বিশ-একুশটা জেলা নিয়ে। আর বাংলাদেশের হতভাগা নির্বোধ জনগণ ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বেকুবের মতো হা করে বসে থাকবে। এর কোন বিকল্প সম্ভবত এই জাতির কপালে নাই। সার্ভাইভাল ফর দ্য ফিটেষ্ট।

আবারও বলি, এরজন্য দায়ী ডানদের অযোগ্যতা। মেধাহীনতা। ব্যাক্তিগত ক্ষমতার লালসা। আদর্শহীনতা। আর কোথাও আদর্শ থাকলেও বন্ধ্যাত্ব এবং অন্ধত্ব।

সুতরাং যখন বারবার দেখি ডানপন্থী মানুষ নামের পোকামাকড়ের দল আকাশের দিকে তাকিয়ে এই জাতির বিবেকদের মুখ থেকে নেমে আসা দিকনির্দেশনায় আপ্লুত হচ্ছে, আসিফ নজরুল শফিক রেহমান নুরুল কবির মাহমুদুর মান্নাদের হাতে ভিটে-বাড়ির দলিলপত্র, বিশ্বাসের ঘরের চাবি তুলে দিচ্ছে, তখন মাকসুদের মতো করে গাইতে ইচ্ছা করে- কোন পথে এই বলদের দল চলছে/ হায় পরোয়ারদিগার!!

দ্য আলটিমেট হেফাজত

3

by: Aman Abduhu

হেফাজতে ইসলাম প্রসঙ্গে অনেক কথা হয়েছে। আরো কিছু কথা যোগ না করলেই হচ্ছেনা। রাজনীতি এবং অরাজনীতি; দুইটা ভিন্ন জিনিস। হেফাজত নিজেকে অরাজনৈতিক সংগঠন দাবী করে। কিন্তু তাদের আন্দোলনের পদ্ধতি রাজনৈতিক, তাদের ইস্যুগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে জড়িত। শাহবাগ একটা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট আন্দোলন ছিলো। সে আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের বড় একটা অংশ ইসলাম-বিদ্বেষী। তাদের ঘৃণ্য কাজকর্মের প্রতিবাদ জানানোটা একজন মুসলিমের দায়িত্ব। সে দায়িত্বটা অরাজনৈতিকভাবে পালন করতে হলে সিভিল পদ্ধতিতেই দেশের সরকারের কাছে জানাতে পারতো হেফাজত।

কিন্তু তা না করে তারা রাজনৈতিক দলের মতো মহাসমাবেশ, মিছিল, বিবৃতি, বিক্ষোভের পথে গিয়েছে। আবার একই সাথে নিজেদের অরাজনৈতিকতার পরিচয়ও দাবী করে গিয়েছে। এটা ভন্ডামী। এই ভন্ডামীর কারণে কিছুটা সুফল পেয়েছে রাজনৈতিক আরেকটা পক্ষ জামায়াতে ইসলামী। সুফল কিছুটা পেয়েছে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। একই সাথে তারা স্বভাবসুলভ রাজনৈতিক আচরণ করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও কৌশল বেশি। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হেফাজত।

হেফাজত যেহেতু ইসলামকে ধারণ করে, তাদের কর্তব্য ছিলো অরাজনৈতিকতার ইসলামী পন্থার দিকে তাকানো। ইসলামী উলামাদের সামাজিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টার ঐতিহ্যের দিকে তাকানো। ইসলামের সালাফ সালেহীন স্কলাররা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। কিন্তু মূলধারায় তারা থেকেছেন পুরোপুরি অরাজনৈতিক উপায়ে। এটাই ইসলামী স্কলারদের ঐতিহ্যগত পন্থা। তারা শাসকদের কাছে গিয়েছেন। প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু জনগণকে মোবিলাইজ করেন নাই। নিজেদের কাজের জায়গাতে জ্ঞানচর্চা করে গিয়েছেন। ইসলামী জ্ঞানের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও উন্নয়ন করে গিয়েছেন। ঐটা ছিলো তাদের মৌলিক কাজ।

হেফাজতের আলেমরা অন্য নামে রাজনীতিও করেন। ইসলামী ঐক্যজোট তথা শাসনতন্ত্র, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকগুলো দল উপদল। আওয়ামী লীগের সাথে স্বাক্ষর দিয়ে মৈত্রী চুক্তি করেন। কিন্তু এখন কেন তারা অরাজনৈতিকতার নামে এই ভন্ডামী করতে গেলেন? কারণ, এখন নিজেদের অরাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করলে তার কিছু না কিছু সুবিধা তারা নির্বাচনের সময় পাবেন। হয়তো ভেবেছিলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ে মাঠে নামলে যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইবুনাল ইস্যুতে জড়িয়ে যেতে হবে। হয়তো এসবের সাথে ভালো কোন উদ্দেশ্যও ছিলো। ইসলামের প্রতি আলেম উলামাদের ভালোবাসা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি, তা নিয়ে প্রশ্ন করাও বোকামী। কিন্তু এখানে হেফাজত স্বাভাবিক রাজনৈতিক নীতিহীনতাটা করে বসেছে। এবং সেই নীতিহীনতার বড় একটা প্রকাশ দেখা গেলো বৃদ্ধ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম মাওলানা শফি (আল্লাহ তাকে রহম করুন) কতৃক আওয়ামী লীগকে বন্ধু ঘোষণার কথায়।

আলেম উলামারা আমাদের সমাজেরই মানুষ। তারা খেজুর গাছ বা মিনার মার্কায় ভোট পেয়ে এমপি মন্ত্রী হতে চাইতেই পারেন। তারা তুলনামূলকভাবে সৎ ও ভালো মানুষ। সুতরাং সমাজের সেবা তারা করতেই পারেন। আর মানুষ যদি ভোট দেয় তাহলে আমার আপত্তি করার কি অধিকার আছে? কিন্তু একদিকে ভোটের সময় মিনার মার্কায় দাঁড়াবেন, অন্যদিকে রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে অরাজনৈতিক আন্দোলন করবেন, বিষয়টা একটু কেমন যেন ইয়ে হয়ে গেলো না?

তারা যদি নিজেদের অবস্থানে থেকে নিখাদ ইসলামের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রতিবাদ করতেন, তাহলে দেশের সাধারণ মুসলমান নাগরিকদের ইসলামী জ্ঞান বৃদ্ধিতেই তাদের অবদান বেশি দেখা যেতো। নাস্তিকদের বদমায়েশি প্রসঙ্গে তারা নিজ নিজ এলাকার মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতেন। প্রশাসনের কাছে যেতেন। সরকারের কাছে যেতেন। কিন্তু তা না করে তারা প্রটেস্ট করেছেন। প্রটেস্ট করার পরও হয়তো একে সোশাল মুভমেন্ট বলা যেতো, যদি না নির্বাচনের সময় একই আন্দোলনের লোকজন, মাদ্রাসার আলেমরা বিভিন্ন মার্কা নিয়ে ভোটযুদ্ধে না নামতেন। বিভিন্ন নাম নিয়ে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সাথে জোট না করতেন।

ধর্ম আর রাজনীতিও কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির বিষয়। দুইটার মাঝে যোগাযোগ প্রচুর, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গিয়ে পৃথক বিবেচনার প্রয়োজন হয়। ধর্মে নীতিহীনতার কোন স্থান নেই। আর রাজনীতিতে উদ্দেশ্যসাধনের কোন বিকল্প নাই। এ নিয়ে বিস্তারিত তর্ক করা যাবে, কিন্তু এখন না। এখন যেই জিনিসটা দেখা যাচ্ছে তা হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা. কে নিয়ে শাহবাগিদের শয়তানির প্রতিবাদে হেফাজত অরাজনৈতিকতা দাবী করে রাজনীতির মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছে। আর যখন রাজনীতির নীতিহীনতা তাদেরকে স্পর্শ করছে তখন পেছন থেকে ধর্মের শিল্ডটা বের করে এনে সামনে ধরে বসছেন। তারা কর্দমাক্ত মাঠে ফুটবল খেলতে নেমেছেন, কিন্তু সাদা পাঞ্জাবীতে একটা দাগ পড়লে গোস্বা করেন।

তাদের কেউ কেউ মাওলানা শফির বক্তব্যকে ইলহাম/সুডো-ঐশীজ্ঞান ও বানিয়ে দিচ্ছে। এখন শেষপর্যন্ত আর না পেরে জামায়াতের হেকমতে ভাগ বসিয়েছেন। একদিন তারা এও দাবী করবেন যে তাদের মিনার মার্কায় ভোট না দিলে কাফের হয়ে যেতে হবে। অথবা খেজুর গাছে না দিলে আধা কাফের। কিংবা রিক্সায় না দিয়ে কোয়ার্টার। হয়তো ঈমানও চলে যাবে। এইটা হলো একটা ইগো-ইস্যু। রাজনীতি করতে আসলে অনেক কিছু সহ্য করতে হবে। কিন্তু তাদের নিয়ে স্যাটায়ার করলে উম্মত থেকে বের করে দেবেন। ওয়ারাসাতুল আনবিয়া!! হাস্যকর।

আরেকটা ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, এই ধরণের দ্বিমুখীতা দিয়ে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতিতে এগিয়ে যেতে পারার কথা ছিলো। কিন্তু তা হেফাজত পারবে না, কারণ প্রমাণিত বাস্তবতা হলো তারা ভন্ডামীটা দক্ষভাবে করার যোগ্যতা রাখেনা। তারা তুলনামূলক ভালো মানুষ। বরং খেলার ঘুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার অন্যদিকে এইসব করতে গিয়ে তাদের নিজেদের ধর্মীয় যে পবিত্রতা তাও তারা নষ্ট করছে। উল্টা আরও বৃটিশদের বিরুদ্ধে কওমী আলেমদের এই অবদান সেই অবদান ইতিহাস টেনে টেনে নিজেদের যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন এখন। খাঁটি বাংলাদেশী পশ্চাতপদ রাজনৈতিক অভ্যাস। চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পেছনে পরে থাকা। আর তা নিয়ে বাগাড়ম্বর করে যাওয়া। বর্তমানে অবদান কি আছে তার কোন খবর নাই।

নিজেদের নীতি ও উদ্দেশ্য পরিস্কারভাবে না বুঝে এরকম চালাতে থাকলে এখন যেমন রাজনীতিতে অগুরুত্বপূর্ণ একটা ফেউমার্কা শক্তি, তেমনই থাকতে হবে। কোন উন্নতি হবে না। ইফেকটিভ ভাবে নিজেদের ভালো কোন দাবী আদায়ও সম্ভব হবে না। আবার বলা যায় না, যদিও ধর্মশিক্ষার ইনষ্টিটিউশনের মতো স্থায়ী একটা ভিত্তি আছে তারপরও রাজনৈতিক মাঠে হয়তো তাদেরকে একসময় আম ছালা দুটাই হারিয়ে উদ্দেশ্যহীন অগস্ত্যযাত্রায় রওনা দিতে হতে পারে। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় আন্দোলন অর্থহীনভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এইসব ঘটনা সাদাচোখে দেখা যায়, কিন্তু এসবের পেছনে অন্য কিছু থাকার কথা। হেফাজত এবং শাহবাগ, দুইটা আন্দোলনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু গ্রেটার পারপাস সার্ভ করছে। হেফাজত তার নিজ সত্ত্বাতে স্থায়ীভাবে এমন কোন বড় রাজনৈতিক শক্তি না যে আওয়ামী লীগের তাকে খুব একটা পাত্তা দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াত, দুই পক্ষের কাছেই হেফাজত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছে। এবং দড়ি টানাটানিতে সম্ভবত আবারও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে যাচ্ছে।

হেফাজত নিয়ে এই মাথাব্যাথার কারণ হলো, এসব ঘটনা ঘটার সময়কাল। মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির চুড়ান্ত রায় শীঘ্রই হতে যাচ্ছে। আওয়ামী সরকার যখন পরিস্থিতি সুবিধা মনে করবে, এক সপ্তাহ থেকে এক বা দুই মাসের ভেতর যে কোন সময় এ রায় হবে। সরকার যে রায় সুবিধা মনে করবে, ফাঁসি বা যাবজ্জীবন তাই হবে এ আপিলের রায়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্ল্যান বি, সি, এমনকি ডি ও প্রস্তুত রাখার কথা। প্ল্যানের অংশ হিসেবে এই বড় ঘটনাটার আগে আরো কিছু ইস্যু আসবে নিঃসন্দেহে। এইসব একটার পর একটা ইস্যু নিয়ে বিরোধীপক্ষ চরম ব্যস্ততায় দিন কাটাবে। তারপর যখন ঘটনাটা ঘটবে, তখন সারা বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসার ধর্মপরায়ণ জনগণের নেটওয়ার্কটা সরকারের সমর্থনে থাকা প্রয়োজনীয়। প্রথম রায়ের পর পুরো দেশে কি ঘটেছিলো, তা আওয়ামী লীগ কখনো ভুলে যায়নি।

যেহেতু মাওলানা সাঈদীর ইসলাম-সংশ্লিষ্ট পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড়, তাই এখন শাহবাগের বিদায়ের সময় হয়ে গেছে। সময় এসেছে হেফাজতের সাথে ঘর করার, যদি পর্দার আড়ালে হয় তবুও। হেফাজত যদি নেগোসিয়েশনে দক্ষ হতো, কিছু শাহবাগি নাস্তিকের ভালো একটা বিচারিক শাস্তি তারা এই সময়ে আদায় করে নিতে পারতো। এখন দেখার অপেক্ষা, কি হতে যাচ্ছে। এবং দোয়া করি, অনুমান ভুল হোক। ভালো কিছু হোক বাংলাদেশে।

শাহবাগঃ বখরা নিয়ে নখরা

by: Aman Abduhu

তথাকথিত গণজাগরণের শাহবাগিরা টাকার ভাগ নিয়ে মারামারি শুরু করছে। এবং এতে আমরা আনন্দ প্রকাশ করছি। কিন্তু, হাড্ডি নিয়ে কুকুরদের কামড়াকামড়ি দেখে আসলেই কি অ-শাহবাগি অথবা বাংলাদেশর সুস্থ মানুষদের খুব বেশি আনন্দিত হওয়ার কিছু আছে?

যে কোন আন্দোলন বা সম্মিলিত কাজ করতে গেলে টাকার দরকার হয়। এটা কোন অপরাধ না। অপরাধ হলো টাকাটা যে কাজে খরচ করার কথা, তা না করে আত্মসাৎ করা। যে কাজটা খুব স্বাভাবিকভাবে করেছে গাজামঞ্চ।

তো? তাদের এই দুর্নীতি কি খুব বেশি অপ্রত্যাশিত ছিলো? বাংলাদেশে এ কাজ কি শুধু শাহবাগিরাই করেছে?

শাহবাগিরা একটা জায়গায় গিয়ে এখনো নিজেদের পরিচয় অস্পষ্ট রেখে দিয়েছে। এটা কি কোন রাজনৈতিক দল? না কি গাঁজাখোর হতাশাগ্রস্থ সুযোগসন্ধানীদের ক্লাব, এটা তারা পরিস্কার করেনি। দু’ নৌকাতে পা দিয়ে যতদিন চালানো যায়। আরেক শাহবাগি সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন যখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিতে এ প্রসঙ্গে চেপে ধরেছিলো, মঞ্চের পান্ডারা এ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছে। কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশে সব শ্রেণীতেই দুর্নীতি আছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি থেকে শুরু করে জাগপা, ন্যাপ, সিপিবি সব রাজনৈতিক দলেই এটা কম বেশি আছে। অথবা এফবিসিসিআই থেকে শুরু করে মহল্লার দুর্বার ক্লাব পর্যন্ত।

সর্বব্যাপী এ অসততা আর শয়তানি বন্ধ করার, নিদেনপক্ষে কিছুটা চেক দেয়ার, বড় একটা উপায় হলো জবাবদিহীতার ভিত্তিতে হিসাব রক্ষণ। পুরো পৃথিবীর মানুষ এটা মানে, শুধু বাংলাদেশের না। আর এখানে এসেও শাহবাগিরা তাদের চরম পশুসুলভ চরিত্র প্রকাশ করেছে। একজন সুস্থ মানুষ যদি কোন খারাপ কাজ করে, তাকে বুঝানো যায়। কিন্তু একটা পশু যদি কোন খারাপ কাজ করে, তাকে বুঝাতে গেলে উল্টা কামড় খেতে হয়।

শাহবাগিদের বড় একটা বৈশিষ্ট্য হলো, তারা যে কোন খারাপ কাজ করে পুরোপুরি নির্দ্বিধায়, খোলা গলায় সে খারাপ কাজটাকে ভালো ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বলে যেতে থাকে। এটা তারা তাদের অবৈধ জন্মদাতা আওয়ামী লীগ থেকে জেনেটিকালি পেয়েছে।

শাহবাগি এক পান্ডা, ঘৃণ্য যৌনকর্ম সম্পর্কিত লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিদ তার স্ট্যাটাসে লিখেছে “একটা সময় শেখ রেহানা আপার কাছ থেকে টাকা পয়সা নেওয়া হতো আমার ব্লগের খরচপাতি দেখায়া যে অনলাইনে এইটা আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করতেছে। এখন আর কে কে দেয় কে জানে। দিন বদলাইছে, এখন অনুদান দিলেও সেইটা আবার ফেরত চাওয়ার নিয়ম শুরু হইছে। লোকজন মালিকানার কাগজ দাখিল এবং অনুদানের হিসাব চাওয়া শুরু করলে খেলাটা কেমন হবে ভাবতেছি”।

10173192_10203726617785331_1435056657_n

কথা দীর্ঘ না করে, তিনটা অনুসিদ্ধান্ত।

১. শাহবাগ আন্দোলন প্রসব হওয়ার আগেই, গর্ভে থাকাকালীন সময় থেকে শেখ পরিবার সরাসরি এর পরিচর্যা করে আসছে।

২. হাসিনা রেহানা বোনদ্বয়ের এতোই টাকা আছে যে, কিছু লাফাঙ্গা কুকুরের সামনে হাড্ডি হিসেবে থোক থোক টাকা দেয়া কোন ব্যাপার না।

৩. শাহবাগিরা যেখানে সরাসরি বাংলাদেশের রাজপরিবারের সদস্য থেকে টাকা নিতে পেরেছে, সেখানে বিভিন্ন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা, অফিস আদালত, সংগঠন আর ব্যাক্তির কাছ থেকে টাকা আদায় করা তাদের জন্য কোন ব্যাপার না।

এ তিনটা অনুসিদ্ধান্তের পর শেষ একটা শাহবাগি মোরাল।

টাকা দিবেন, কিন্তু কোন জবাবদিহীতা আশা করলে আপনি স্বাধীনতা বিরোধী। স্বচ্ছতা ও সততা প্রত্যাশার অর্থ হলো আপনি চেতনাগুরু স্যার জাফর ইকবালের ফিল্টার পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ।

ষাঁড়ের আদর্শ আসলেই ব্যাতিক্রমী, অভূতপূর্ব। যুদ্ধ যেমন অস্ত্র দিয়ে হয়না, অমিত সাহস দিয়ে হয়। এই বাংলাদেশে চেতনার বাস্তবায়নও তেমনিভাবে সততা দিয়ে হয়না, লাল পর্দার আড়ালে পকেট ভর্তি করা দিয়ে হয়।

Omi Pial’s complete Status 4/10/2014

Omi Rahman Pial
সুশান্ত যে আমার ব্লগের মালিকানা সত্যিই বিক্রি করছে সেইটা একটু দেরিতে গিয়া বুঝতে পারছি। যদিও তার ইঙ্গিত সে অনেক আগেই দিছিলো, পোস্ট দিয়াও ঘোষণা দিছে যে সে এইটা বিক্রি করতেছে। এটিমের গ্রুপ মেইলে সে বলছিলো সে ঘটনাটা সাজাইতেছে এইটা আবঝাব ব্লা ব্লা ব্লা। কিন্তু আচমকাই আমার ব্লগের নীতিমালায় পরিবর্তন দেইখা বুঝতে পারলাম এইটা এখন তার হাতে নাই। গত চারবছর আমি আমার ব্লগে লেখছি, শুধু আমার ব্লগেই, অনেকের অনুরোধেও কোথাও স্বনামে ব্লগিং করি নাই্,বেনামে তো প্রশ্নই ওঠে না। এই একক আনুগত্যের কারণ স্রেফ একটা চুক্তিনামা: আমার ব্লগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে কোনোরকম মতবাদ কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী কোন পোস্ট প্রমোট করবে না। হঠাৎ সেইখানে দেখি ছাগুদের রমরমা, অ্যাসঅফ আইসা পোস্ট লেখে ছদ্মনামে, ঘ্যাংয়াররা সব রাতারাতি দেখি ব্লোজবার থিকা বোলোগার হ্ইয়া গেছে। 

নীতিমালার এই পরিবর্তনটা চোখে পড়ছে শাহবাগে গণজাগরণ শুরু হওয়ার পরপর।হঠাৎ আইজু খেইপা উঠলো এই জাগরণের বিরুদ্ধে। আর রাতারাতি দেখি সুশান্তের টোন চেইঞ্জ। এইটা আরো শক্ত হইলো যখন সামু ব্লগ সরকারের তোপে, সচল নেহাতই এক সুশীল ব্লগ, ছাগুদের আশাভরসার সোনার বাংলা ব্লগ বন্ধ। ওইসময় আমার ব্লগের ট্রাফিক ভালো। ব্লগের দুই কোর ব্লগার আমি আর আরিফ জেবতিক শাহবাগে। তো যেইখানে আমার একটা পোস্টের সার্বিক হিট এদের সবার (আইজু সুশান্ত আমার ব্লগের মঞ্চবিরোধী মোর্চা এবং ঘ্যাং) মোট হিটের থেকেও বেশী থাকে আমার একটা প্রিভিলেজ তো পাওয়ারই কথা এই বিষয়ে। আইজুরে বললাম এইসব বালছাল বইলা আমাদের বিব্রত না করতে। বাহ, আমার ব্লগে দেখি আমারই এক্সেস ব্যান। তখন বুঝলাম সত্যিই মালিকানা বদলাইছে।

এখন শিয়াল পন্ডিত এবং কুমীরের সাতটি ছানার গল্পটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে সবার? ছয়টারে খাইয়া সে একটারেই সাতবার দেখাইছিলো কুমীররে। আমি এইখানে তেমনই একটা গন্ধ পাইতেছি। কারণ আইজু বাকোয়াজ দেয় আমার ব্লগ এখন তার, শারুণ আমারে আগে বলছে আমার ব্লগে তার শেয়ার আছে, কয়দিন আগে শুনলাম মাসকাওয়াথ ভাইও আমার ব্লগ কিনছেন, কানাডার এক এ টিমারও শুনছি আমার ব্লগ কিনছে. আবার ব্লগারদের একটা জোটও নাকি আমার ব্লগের মালিক, শোনা যায় আওয়ামী লীগের দুইজন মন্ত্রী নাকি আমার ব্লগের মালিক। লন্ডনের নাস্তিক জোটও নাকি আমার ব্লগ কিনছে। হোয়াট দ্য ফাক ম্যান। আমার ব্লগ তুমি আসলে কার? তাইলে ওইখানে আমার লেখা পোস্টগুলা কার? আমার নাকি তাগো? যে যার খুশী মতো কোনো এক এএসপিরে বেইচা দিবো কোনো ডিলের বিনিময়ে!!!

পুনশ্চ: একটা সময় শেখ রেহানা আপার কাছ থেকে টাকা পয়সা নেওয়া হতো আমার ব্লগের খরচপাতি দেখায়া যে অনলাইনে এইটা আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করতেছে। এখন আর কে কে দেয় কে জানে। দিন বদলাইছে, এখন অনুদান দিলেও সেইটা আবার ফেরত চাওয়ার নিয়ম শুরু হইছে। লোকজন মালিকানার কাগজ দাখিল এবং অনুদানের হিসাব চাওয়া শুরু করলে খেলাটা কেমন হবে ভাবতেছি … — feelingcurious.

গণজাগরণ মঞ্চের রাজনীতি, সংঘাত ও একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প!

5
রাষ্ট্রের বিচার বিবেচনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে এভাবেই লক্ষাধিক মানুষ প্রথমে গণজাগরণ মঞ্চে যোগ দিয়েছিলো।

রাষ্ট্রের বিচার বিবেচনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে এভাবেই লক্ষাধিক মানুষ প্রথমে গণজাগরণ মঞ্চে যোগ দিয়েছিলো।

যে সাধারণ মানুষের আবেগ ও স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহনে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়েছিলো সেই মানুষদের হয়ে রাজনীতি করার যোগ্যতা যে গণজাগরণ মঞ্চের নেই এবং তারা যে মানুষের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে না, সেটা আমি প্রায় ১১ মাস আগে বলেছিলাম যখন তারা রানা প্লাজায় ‘উদ্ধার অভিযান ফটো সেশন’ করতে এসেছিলো।

রাজনীতি তো মানুষের কথা বলবে। শেয়ার বাজারে পুঁজি হারানো মানুষের কথা বলবে, গার্মেন্টস শ্রমিকের অধিকারের কথা বলবে, পাঁচ বছর পর একদিনের রাজা ভোটারের ভোটের অধিকারের কথা বলবে, বলবে দেশের তেল-গ্যাস-বন্দর লুট হওয়ার কথা, রামপাল, টিপাইমুখ, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা, ধার্মিকের ধর্ম পালনের আর অধার্মিকের ধর্ম না পালন করার অধিকারের কথা।

গণজাগরণ মঞ্চ একটি বিশাল জন সমর্থন নিয়ে এই রাজনীতির কথাগুলো বলে দেশের রাজনীতিকে পাল্টে দিতে পারতো। কিন্তু তা না করে শাহবাগে প্রতিবাদী মানুষের জমায়েতকে এই মঞ্চ স্বৈরাচারী কায়দায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি মাত্র চেতনা নাৎসী দাবীতে আটকে রেখেছিলো দিনের পর দিন। দাবী একটাই, ‘ফাঁসি’! অন্য কোন দাবী মানেই ‘ছাগু’! বাংলা পরীক্ষা দিতে হবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস; অন্য কোন পরীক্ষার দিনক্ষণ জানতে চাওয়ার মানে হচ্ছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, রাজাকারের তালিকায় নাম লেখানো!

নিজেদের চেতনা নাৎসী আদর্শের কারণে মাত্র এক বছরের মধ্যেই গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল এমন শীর্ণ হয়ে গিয়েছে।

নিজেদের চেতনা নাৎসী আদর্শের কারণে মাত্র এক বছরের মধ্যেই গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল এমন শীর্ণ হয়ে গিয়েছে।

এই মঞ্চের আড়ালে টিকফা চুক্তিতে লুট হয়ে গেছে আমাদের ভোক্তা অধিকার, রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চুক্তির মাধ্যমে চুড়ান্ত করা হয়েছে সুন্দরবন ধ্বংশের নীল নকশা। এমন কী তাজরীন আর রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায় বিচারের আর্তনাদকেও টুটি চেপে স্তব্ধ করে রেখেছিলো এই চেতনা নাৎসী মঞ্চ।

এখানেই শেষ নয়। এই গণজাগরণ মঞ্চ থেকেই বিরোধী মিডিয়া বন্ধ করে বিরোধী কন্ঠস্বরকে রূদ্ধ করার এবং বিনা বিচারে হত্যাকে সমর্থন করে একটি চেতনা নাৎসী জনমত তৈরী করে দেয়া হয়েছিলো। কাউকে ‘ছাগু’ প্রমান করতে পারলেই তাকে বিনা বিচারে হত্যা করা বৈধ, বৈধ তার কণ্ঠস্বর চেপে ধরে জেলে পাঠিয়ে দেয়া বা গুম করে দেয়া। এই চেতনা নাৎসী জনমতের কারণেই রাষ্ট্র বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রতিবাদী মিছিলে সরাসরি গুলি করে মানুষ হত্যার ম্যান্ডেট পেয়েছিলো এবং নির্বিচারে প্রতিবাদী মানুষকে হত্যা করা শুরু করেছিলো; যে ধারা এখনো বর্তমান। এই মঞ্চের ফ্যাসিবাদী দাবী রক্ষার্থেই সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ‘আমার দেশ’, ‘দিগন্ত টিভি’, ‘ইসলামী টিভি’সহ অনেক গণমাধ্যম এবং জেলে পাঠানো হয়েছে মাহামুদুর রহমানের মত সম্পাদক ও আদিলুর রহমান শুভ্রর মত মানবাধিকার কর্মীকে।

গত ৪ এপ্রিল ২০১৪, শুক্রবার গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশটির সাথে এভাবেই পুলিশের সংঘাত হয়!

গত ৪ এপ্রিল ২০১৪, শুক্রবার গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশটির সাথে এভাবেই পুলিশের সংঘাত হয়!

জনগণের দাবীকে টুটি চেপে ধরে যে গণজাগরণ মঞ্চ রাষ্ট্রের সমান্তরাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলো, চাইলেই যারা জাতীয় পতাকা উঠানো-নামানোর এবং শপথ করিয়ে মানুষকে হেদায়েত করতে পারতো, তা মাত্র এক বছরের মাথায় এখন আর নেই! এখন তাদেরকে সরকারী দলের অঙ্গ সংগঠনের কর্মী এবং একদা প্রহরী পুলিশের সংঘাতে জড়িয়ে হেনস্তা হতে হচ্ছে!

এই হেনস্তা হবার ঘটনায় বিভিন্ন জন বিভিন্ন অনুমান ও প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। যার মধ্যে একটি অনুমান হচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চ সরকারী দমন নিপীড়নের শিকার হয়ে মানুষের সহানুভূতি অর্জন করতে চাচ্ছে এবং ভারতের ‘আম আদমী পার্টি’র অনুরূপ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাচ্ছে।

গণজাগরণ মঞ্চকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভারত পন্থী মিডিয়াগুলোর যে একটি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা আছে, সেটা ৫ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে প্রকাশিক দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠা দেখলে বোঝা যায়। যে পত্রিকাটি পুলিশের নিয়মিত ট্রিগার হ্যাপী আচরণ বা ক্রস ফায়ারে সরকার বিরোধী রাজনীতিবিদদের হত্যাকাণ্ডের খবর ছাপে না, তারা সামান্য পুলিশি টানা হেঁচড়াকে তিন কলামে প্রায় সিকি পৃষ্ঠা জুড়ে কাভারেজ দিয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল ২০১৪, শনিবার দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় গণজাগরণ মঞ্চের সাথে পুলিশের সংঘাতকে এভাবেই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়!

গত ৫ এপ্রিল ২০১৪, শনিবার দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় গণজাগরণ মঞ্চের সাথে পুলিশের সংঘাতকে এভাবেই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়!

বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিলেও তারা ক্ষমতাসীন দলটির অজনপ্রিয়তায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে খুঁজছে, যারা ভারতের মিত্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পারবে। শুরু থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভারত তাই এখন আম আদমী পার্টির স্টাইলে এদেরকে রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।

লক্ষ্য করুন, গণজাগরণ মঞ্চ কিন্তু আজ পর্যন্ত টিপাইমুখ, রামপাল, সীমান্ত হত্যা, তিস্তাসহ বাংলাদেশের নদীগুলো থেকে ভারতের পানি প্রত্যাহার বিষয়ে টু শব্দটি করে নাই। আর ভারতের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থাকলে মঞ্চের অন্যতম সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসু কী ভাষায় ভারতের কাছে সাহায্য চেয়েছিলো তা মনে করার চেষ্টা করুন।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বরাবরই মানুষকে বোকা বানিয়ে সারপ্রাইজ দিতে পছন্দ করে। ৯১ সালে এরশাদকে জেলে পাঠানোর দাবী করে ৯৬ সালে এরশাদের সাথে জোট করা আর ৯৩ সালে গোলাম আযমকে জেলে পাঠানোর দাবী করে ৯৪ সালে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট করা এর অন্যতম প্রমাণ। সে কারণে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সরকারের এই সংঘাত যদি ভারতের পরিকল্পিত ছকে নতুন গৃহপালিত বিরোধী দল সৃষ্টির জন্য করা হয়ে থাকে তাহলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।

এ কারণেই শিরোনামে লিখেছি গণজাগরণ মঞ্চ ও সরকারের সংঘাতের মধ্যে একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প আছে। আর সেই গল্পটির বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রথম পক্ষ ভারতের ভালোবাসার দাবীদার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পক্ষ আওয়ামী লীগ এবং গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে সংঘাত (পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত)।

অনেকেই কৌতুহলী হয়ে আছেন জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবির, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, ড. আনোয়ার হোসেনরা এখন কোন পক্ষ নেন সেটা দেখতে। উনারা সবাই সেফ সাইডে খেলেন। যদি মিডিয়ার হাইপ তুলে আসলেই গণজাগরণ মঞ্চকে একটি রাজনৈতিক প্লাটফরম হিসেবে গড়ে তোলা যায় তাহলে উনারা মঞ্চের পক্ষ নিয়ে গৃহপালিত বিরোধী দলীয় নেতা বনে যাবেন। যদিও মিডিয়ায় হাইপ তুলে সেলিব্রেটি তৈরী করা গেলেও এখনো পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক নেতা তৈরী করতে পারার দৃষ্টান্ত নেই। সেই ক্ষেত্রে স্যার জাফররা আপাতত নিরপেক্ষ থেকে আকাশের তারা গুনবেন বলেই মনে হচ্ছে।

চেতনা-পরাবাস্তবতাঃ তুরস্ক বনাম বাংলাদেশ

2

by: Aman Abduhu

গত রবিবার তুরস্কে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে গেলো। সে নির্বাচনে ছদ্ম-ইসলামপন্থী প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের দল এগিয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া এখন বাংলাদেশেও দেখছি; ইসলামপন্থীরা প্রচুর আনন্দ প্রকাশ করছেন।

এই ইসলামপন্থীদের একটা জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার। এটা ঠিক যে কঠিন একটা সেক্যুলার পরিবেশে এরদোগান কিছু কাজ করেছেন, যা বৈশিষ্ট্যবিচারে ইসলামী। যেমন, কোন মেয়ে হিজাব করতে চাইলে পারবে, এটা তিনি অনুমোদন করিয়েছেন শেষপর্যন্ত। পাবলিক প্লেসে এলকোহল নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এসব বিষয় তুরস্কের নির্বাচনে কোন ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর ছিলোনা। ঐদেশের মানুষজন এইসব সস্তা ইসলামী জযবায় উত্তেজিত হয়ে এরদোগানকে ভোট দেয়নি। বরং তুরস্কে গেলে মেয়েদের বেশভুষা এবং আরো কিছু দেখে ইসলামপন্থীদের হার্ট এটাক হয়ে যেতে পারে। এখন অলরেডি ফেসবুকে কানে তালা লেগে যায়। আর বাংলাদেশের দৃশ্যমান অবস্থা তুরস্কের মতো হলে তো ইসলাম-রক্ষক ভাইদের চিৎকারে ফেসবুকে কানের পর্দাই ফেটে যেতো।

তুরস্কের মানুষ বাংলাদেশের মানুষজনের মতো হুজুগে না। তারা আমাদের মতো অর্থহীন ইস্যু আর অতীত নিয়ে এতোটা মেতে থাকে না। বরং ইউরোপ আর এশিয়ার মাঝে থাকার অবস্থানগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করে।

এরদোগান আমার প্রিয় একজন নেতা। বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের মাঝে তাকে অন্যতম সফল একজন নেতা মনে করি। অর্জনের দিক থেকে মাহাথিরের চেয়েও বেশি। কারণ দেশী-বিদেশী এতো বেশি ষড়যন্ত্র আর বিরোধীতার মুখোমুখি মাহাথিরকে হতে হয়নি। তুরস্কের কনটেক্সটও মালয়েশিয়ার চেয়ে ভিন্ন এবং অপেক্ষাকৃত কঠিন ছিলো। এরদোগান লোকটা সবচেয়ে বেশি প্রাগমাটিকও।

তবে ভদ্রলোক সম্প্রতি ডিকটেটরদের মতো কাজকর্ম শুরু করেছেন। সাংবাদিকদেরকে জেলে ভরা, টুুইটার ইউটিউব ব্লক করা, বিশাল বিশাল গণজমায়েতের ছবি দিয়ে পাবলিককে ইমপ্রেস করার চেষ্টা, এসব। যদি শেষপর্যন্ত এসব সামলে নিতে পারেন, হয়তো তিনি আরো বেশি উচ্চতায় পৌছে যেতে পারেন। কারণ আলটিমেটলি তিনি তার দেশের জন্য ক্ষতিকার শাসক না। শেখ হাসিনার মতো নেতিবাচক মানুষ না। কিন্তু এভাবে সামলাতে পারার সম্ভাবনা কম। তারচেয়ে বরং তাঁর অবসর নেয়া উচিত। একে পার্টির হায়ারারকিতে যোগ্য মানুষজন আরো আছে।

এইসব কাজকর্ম করার পরও কেন এরদোগানের দল বিজয় পেলো? তুরস্কের নির্বাচন কি বাংলাদেশের মতো? সোমবারের পঞ্চম দফা উপজেলা নির্বাচনে যেভাবে বাংলাদেশে আওয়ামী মাফিয়া লীগের লোকজন কেন্দ্র দখল করছে? বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিচ্ছে, সিল মেরে বাক্স ভরাচ্ছে।?

না। একে পার্টিকে এসব করে নির্বাচনে জিততে হয়নি। এবং ফাঁপা বেলুনভর্তি জযবার উপর ইসলাম মার্কাটি লাগিয়ে দিয়ে ঐদেশে জেতা যায় না, তা তো আগেই বলেছি। বরং এখনো এরদোগানের বিজয়ের কারণ দুইহাজার এগারো সালের জুনে আলজাযিরায় প্রকাশিত একটা রিপোর্টে বুঝা যায়। “ফ্রম স্ট্রিট সেলার টু গ্লোবাল স্টেটসম্যান”।

এরদোগান প্রথম জীবনে বাড়তি উপার্জনের জন্য তার এলাকা কাশিমপাশার রাস্তায় খাবার বিক্রি করতেন। এটাও একটা চিন্তা করার মতো বিষয়। ঐদেশে মৃত বাবা বা স্বামীর দড়ি ধরে মানুষজন রাজনীতিতে আসার সুযোগ তেমন একটা পায় না। নিজের যোগ্যতা দরকার হয়।

সেই রিপোর্টে এরদোগানের শাসন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইস্তাম্বুলের টেক্সি ড্রাইভার মেরাল বলছিলেন “আমার বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায়। আমার জীবনে প্রথমবারের মতো আমি ইন্সুরেন্স পেয়েছি, আমাদের প্রাইম মিনিস্টারকে ধন্যবাদ এর জন্য। আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে আমার পরিবার কোন সমস্যায় পড়বে না। আমার দশ বছর বয়সী মেয়েটা মিষ্টি বেশি খেয়ে খেয়ে দাঁত নষ্ট করে ফেলেছে। আগে হলে তার চিকিৎসার জন্য আমাকে ফতুর হয়ে যেতে হতো। আর এখন আঠারো বছর বয়সের কম সবার চিকিৎসার খরচ দেয় সরকার।”

এরদোগানের ইয়ং বয়সে তাঁর চুল কেটে দিতো যে সেলুন মালিক, তিনি আলজাযিরার রিপোর্টারকে বলেছিলেন “আমি যখন আটানব্বই সালে হজ্ব করতে সউদী আরব যাই তখন এক মিলিয়ন টার্কিশ লিরার নোটও এক্সচেঞ্জ করার জন্য কেউ নিচ্ছিলো না। আর দুইহাজার দশ সালে যখন আবার গেলাম, একশ লিরার নোট দিয়ে আমি দুইশ পঞ্চাশ রিয়াল পেলাম। ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের একটা ভবিষ্যত আছে এখন।”

মানুষ এ পৃথিবীতে খুব বেশি কিছু চায় না। একটু শান্তিতে বাঁচতে চায়। এরদোগানের মতো নেতারা যখন সে প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেন, তখন মানুষ তাদের ভালোবাসে। অথবা উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন ইনষ্টিটিউশন ও ট্রাডিশনের কারণে নেতারা এর বাইরে যেতে পারেন না। আর আমাদের মতো দেশে? রাজনীতিবিদ নেতারা ব্যস্ত আছে একজন আরেকজনের সাথে নোংরা মারামারি আর রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে খাওয়াতে।

আর তাছাড়া, নেতা তো উঠে আসে মানুষদের মধ্য থেকেই। ঐসব দেশের মানুষেরা ব্যস্ত থাকে কাজ করতে, অবসরে নিজের আনন্দ নিতে। ওদের ফেসবুকে গেলে দেখা যায় হয় নিজেরা বেড়াচ্ছে খাচ্ছে। দেশের বড় কোন সামষ্টিক ইস্যু যেমন নির্বাচন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অর্থনৈতিকভাবে বড় কোন ঘটনা, এসব নিয়ে কালেভাদ্রে মাথা ঘামাচ্ছে।

আর আমাদের দেশে আমরা সবাই তালেবর। সবাই দেশপ্রেমে টুইটুম্বুর স্থবির গর্ভবতী। যেদেশে মানুষ আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ভিক্ষা করে, চিকিৎসা পায় না, বিচার পায় না, সেদেশে এখনো আমরা পরে আছি একাত্তর নিয়ে। সম্ভব হলে বিপ্লব করতে ব্রিটিশ আমলেও চলে যাই পারলে, এমন অবস্থা। এখনো আমরা গিনেজ রেকর্ডের মতো ফালতু একটা প্রতিষ্ঠানের পেছনে পুরো দেশ মিলে দৌড়াচ্ছি। অথবা হিমালয়ে উঠার জন্য ধাক্কাধাক্কি করে যাচ্ছি।

ওদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা পত্রিকায় কলাম লেখে জমির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে, বিদেশের সাথে অর্থনৈতিক ঘাটতি নিয়ে, অন্য দেশের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে, রিফিউজিদের সমস্যা নিয়ে। আর আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা মুজিবকে সম্মান দেয়া হয়নাই, জাতীয় সঙ্গীত সবার সেরা, মুক্তিযুদ্ধ না থাকলে দেশ আগাবে না এইসব নিয়ে আবর্জনা লেখাতে ব্যস্ত।

এমন একটা অতীতমুখী দেশের কোন বর্তমান বা ভবিষ্যত কিভাবে থাকবে? আর কিভাবেই বা এইরকম ঊন-মানুষদের মাঝে এরদোগান, মাহাথির বা জিয়ার মতো স্টেটসম্যান জন্ম নেবে?

মিডিয়া ও ক্ষমতার বিকার

By রেজাউল করিম রনি

মিডিয়া নিয়া অনেক আগেই লেখা দরকার ছিল। যাক দেরিতে হলেও লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এতো বিষয় কেমনে ধরি? ফলে আমরা অনেকগুলা বিষয় কেবল ইশারায় সেরে নিব।

images
বাংলাদেশের রাজনীতিকে বুঝবার ক্ষেত্রে তথাকথিত মিডিয়া যে ভূমিকা নিয়েছে তা আমাদের ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কথা জোর দিয়ে বলতে হবে যে,  মিডিয়া পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর বাংলাদেশে এই পর্যালোচানার কাজে যে গাফিলতি রয়েছে তা পাহাড় প্রমাণ বললেও কম বলা হবে। অন্যদিকে বিশ্ব জুড়েই সন্ত্রাসের পক্ষে মিডিয়ার ভূমিকা জারি রয়েছে। বিশেষ করে গণতন্ত্র যে ব্যবস্থায় সরাসরি সন্ত্রাসবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রমোট করে, সেখানে মিডিয়া তার অর্থনীতি ও কালচারাল শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে গণবিরোধী হতে বাধ্য। মধ্যে থেকে কৌতুক হল,  এর নাম দেয়া হয়েছে ‘গণমাধ্যম’।

এটা গণমাধ্যম বটে, তবে গণবিনাশী। বাংলাদেশে গণতন্ত্র কথাটাই খোদ নির্যাতকদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর সাথে মধ্যবিত্তের কালচারাল ফ্যাসিজম যুক্ত হয়ে এটা গণহত্যার ভূমিকায় সামিল হয়েছে। তাই আমাদের আর গণতন্ত্রে চলছে না। বলতে হচ্ছে, গণক্ষমতার উত্থানের কথা। কিন্তু এই গণক্ষমতার জন্য যে মতাদর্শিক লড়াইটা জারি থাকা দরকার তা আমরা করতে পারছি না। এর জন্য সস্তা প্রচারপ্রিয় শিক্ষিত নামধারী মাস্টার,  তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও ফুর্তিবাজ প্রজন্ম মূলত দায়ী। এদের বিরুদ্ধে আমরা শুরু থেকেই লড়াকু ভূমিকায় হাজির আছি। এরা আমাদের জামাতের, বিএনপির বা জঙ্গি,  রাজাকার ইত্যাদি বলছেন। এখন বলছেন, হেফাজতের বুদ্ধিজীবি। এগুলা সমস্যা না। বিপদ হল, তারা যে প্রগতি চেতনার আফিমের ঘোরে আমাদের শত্রু জ্ঞান করছেন তার ফলে এরা নিজেরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগুনেই পেট্রোল ঢালছেন। এই দিকগুলা নিয়ে আগেই লিখেছি। এখানে মিডিয়ার পার্টটা নিয়ে কথা হবে।

. যোগাযোগ, প্রচারযন্ত্র গণমাধ্যম মিথ

আমাদের যোগাযোগ :  ইতিহাসের খোঁজে

যোগাযোগের আদি ইতিহাস নিয়া কথা বললে অনেক কথা বলতে হবে। মানুষ প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের প্রয়োজনে কী তরিকায় যোগাযোগ ব্যাপারটা রপ্ত করেছিল, তার কোনো একরৈখিক ইতিহাস নাই। ইতিহাস বলে আবার একাট্টা কোনো কিছুও নাই। এর নানা অর্থ। বিভিন্ন প্রকরণ। এর মধ্যে যে ধারাটি ইতিহাস বলে হাজির হয়েছে, তা হল ন্যারেটিং হিস্ট্রি। মনে রাখতে হবে, ডিসকার্সিভ ট্রেডিশনই এখকার ইতিহাসকে সম্ভব করে তুলেছে। এবং আধুনিক-উত্তর কালে সব মতাদর্শকেই ডিসকার্সিভ ট্রেডিশন আকারে দেখবার কায়দা তৈয়ার হয়েছে। এবং এই ডিসকার্সিভ বা বয়ানযোগ্যতাই ন্যারেটিং হিস্ট্রিকে সম্ভব করে তুলেছে। ডিসকার্সিভের যুতসই বাংলা করা মুশকিল। ডিসকার্সিভ মানে হলো কোনোকিছুকে রিজনিং করে তোলা। একটা বয়ানকাঠামোর ভেতরে বিষয় বিন্যস্ত করাই হল ডিসকারসিভনেসের বৈশিষ্ট্য। এর আলোকে ইতিহাস বা কোনো ধারণাকে ব্যাখ্যার জন্য নানা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। সাধারণত যারা চলতি ইতিহাসের বয়ানের বাইরে অবস্থান করে তারা কিংবা নতুন করে কোনোকিছু হাজির করার জন্য আধুনিক-উত্তর কালে এই তরিকা প্রয়োগ করা হয়।

আমাদের মতো দেশে ইতিহাস মানে ন্যারেটিং হিস্ট্রি না। কেননা, বাংলার ধারাটা হলো ওরাল ধারা। এন্টি পেটেন্টিক বা কিতাববিরোধী ধারা। উনিশ শতকের বেঙ্গল ইতিহাসের ন্যারেশনটাই বাংলাদেশে হাইব্রিডের মতো চাষ করা হয়েছে। এইটা একদিকে যেমন ইউরোসেন্ট্রিক, অন্যদিকে উপনিবেশের খাসগোলামির ভাষ্যই বহন করে। এই ধারাকে তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশকে এরা কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারেনি। বুঝতে চায়নি। পরে এইটাকে বুঝবার জন্য ‘ওরাল’ ট্রেডিশন বলে ক্যাটাগরি করল। বলাই বাহুল্য,  পুরা ক্যাটাগরি বা বিষয় বিন্যাস পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার আলোকে গড়ে উঠেছে। একইভাবে যোগাযোগ নিয়া আমাদের অধ্যয়নও নিদারুণভাবে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের বিকাশের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে বুঝবার এযাবৎ যে ধরণ জারি হয়েছে আমরা তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই। আমরা কি আমাদের ইতিহাসের ধারার মধ্যে যোগাযোগের পর্যালোচনার কথা চিন্তা করেছি?  আরও গোড়ায় প্রশ্ন করি, আমরা কি আমাদের ইতিহাস নিয়া চিন্তা করি?  নাকি লিনিয়ার হিস্ট্রি বলে যা জারি আছে তাকেই নিজেদের ইতিহাস বলে বা বিশেষ কতগুলা ‘ইভেন্ট’ এর ওপর ভর করে ইতিহাসের কাজটা ফয়সালা করে ফেলেছি? তারপরে ফাঁকা জাতীয়তাবাদের জুলুমবাজি শাসনের শিকার হয়ে চলেছি। ফলে গোড়ার অনেকগুলা কাজ আমাদের সেরে তারপরে এই জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ নিয়া চিন্তা বা পর্যালোচনার অভিমূখ পরিষ্কারের জন্য মেহনত করতে হবে।

আমাদের ‘ওরাল’ ধারার মধ্যে যোগাযোগের প্রাথমিক পর্যায় ছিল গল্প কথক। এই গল্প গদ্য বা পদ্যের বিভাজন রেখা মানতো না। ধারণা করা যায়, গদ্য বা পদ্য বিভাজনটা বর্ণনা ভঙ্গিকে আকর্ষনীয় করতে যেয়েই তৈরি হয়েছে। এই গল্প কথকের ভূমিকা রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরপরে এদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে তথ্য সরবরাহকারী। এদেরকে আপনি আদি গোয়েন্দা বলতে পারেন। এরা রাজার কাছে তথ্য সরবরাহ করতো। আর গল্প কথক জনজমায়েতগুলোতে গল্পের ডালি নিয়ে বসত। এই ছিল এখানকার যোগাযোগ প্রক্রিয়া। এটা গেল আমাদের আদি সমাজিক দিক থেকে যোগাযোগের ধরন। অন্যদিকে এখানকার মানুষের কাছে জীবন ও মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তা ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পশ্চিম থেকে আলাদা। কাজেই পশ্চিমা তরিকার মধ্যে যোগাযোগ বলে যে অধ্যয়ন প্রক্রিয়া জারি হয়েছে তার নিরিখে যোগাযোগ বিদ্যা দিয়া এইখানে কাজ হবে না এটাই স্বাভাবিক।

পশ্চিমে যোগাযোগ অধ্যয়ন বেশ পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। যোগাযোগ ও মিডিয়া অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বাইবেলতুল্য বই মার্শাল ম্যাকলুহানের প্রস্তাবনার নাম,  ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া : এক্সটেনশন অব ম্যান’। মিডিয়াকে পশ্চিমা সমাজ মানুষের ক্রমবিকাশের ধারার আলোকে বুঝতে চাইছে,  বুঝেছে। আমাদের এখানেও কি এই তরিকাই চলবে? হুবহু চলবে না। কিন্তু কিছু বিষয় তো আমরা গ্লোবাল অবস্থায় থাকার কারণে নিতেই পারব। কিন্তু যা নেয়া যাবে না তার বিচার করবার জন্য যে গোড়ার কাজগুলো দরকার তা আামদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায় করেছে বলে খবর পাইনি। যোগাযোগ ও মিডিয়া নিয়ে দুনিয়াব্যাপি চিন্তার যে বিকাশ ঘটেছে তার সাথে আমাদের জানা-শোনার পরিধি খুবই হতাশাজনক। কেননা এই বোঝাবুঝির মধ্যে নিজের জন্য আমরা কোনো পর্যালোচনার সংস্কৃতি তৈয়ার করতে পারিনি। এই বিষয়ে ব্যর্থতার প্রথম দায় নিতে হবে একাডেমিক পরিমণ্ডলে যারা এইগুলা নিয়ে করে-কেটে খান তাদের।

আমাদের ওরাল ধারা এখনও বজায় আছে। অক্ষর বা প্রিন্ট প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তেও বিশাল জনগোষ্ঠি স্বতন্ত্র জীবনযাপন বজায় রেখেছে। আপনি এমন একজন কৃষকও পাবেন না যার সকাল বেলার আরামদায়ক টয়লেটের সাথে পত্রিকার কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু শহরের অনেক লোকের এই সমস্যা দেখবেন। পত্রিকা ছাড়া টয়লেটে সমস্যা হয়। যেসকল লোক এই সব যোগাযোগ প্রক্রিয়ার ধার না ধরেও জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে মিডিয়া কোনো বাই এক্সটেনশন অব ম্যান না। এইটা তার কাছে কোএো বিষয়ই না। কিন্তু আপনি তো গোটা সমাজকে এই সিভিলাইজেশনের মধ্যে আনতে চান। এর বাইরে অন্য কোনো কন্ডিশন আপনার কাছে সিভিলাইজেশনের আওতার বাইরে। কিন্তু আপনার যে যোগাযোগের ধারণা-চর্চা, তার কোনো কিছুরই সে ধার-ধারে না। প্রকৃতি ও মানুষের সাথে তার সম্পর্কের এমন এক ধারা এখানে জারি আছে যার সম্পর্কে আপনি ধারণা করতে পারবেন না। কোনো খবর না দেখেই কৃষক বুঝতে পারে আবহাওয়ার কী অবস্থা হবে। সেই মোতাবেক সে চাষাবাদ করে। খনার জ্ঞানতত্ত্ব তো এই সভ্যতার যুক্তিবাদি জ্ঞান দিয়া আপনি বুঝতে পারবেন না। তখন আপনি তারে বলেন,  ও হইলো সাবল্টার্ন। ও ‘ছোটলোক’। ওর ভাষা নাই। তখন আপনি গায়ত্রী স্পিভাক পড়েন! ‘ক্যান সাবল্টার্ন স্পিক?’।

ছোটলোক কি কথা কইতে পারে? ওর এপিস্টোমলজি/জ্ঞানতত্ত্ব যে আপনার বুঝবার মুরোদ নাই, সেদিকে আপনে মনযোগ দেন না। কারণ আপনার কাছে জীবনের অর্থ যা, ওর কাছে তা না। ফলে কমিউনিকেশন ক্যামনে হবে? যোগাযোগ ক্যামনে সম্ভব?
খুব হাল্কা চালে কথাটা তুললাম। জানি এখনই পরিস্কার হবে না,  তবে প্রশ্নটা  তোলা থাকলো।

ফলে পশ্চিমের সভ্যতার যে ইতিহাস তার আলোকে মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তার ভিত্তিতে সেই সমাজে যোগাযোগের তর্কটা হাজির হয়েছে। তাদের দেকার্তীয় যে রেনেসাঁবাহিত ইতিহাস ও যোগাযোগ প্রক্রিয়া বুঝবার ধরণ তা আমাদের সমাজে প্রয়োগ করে যোগাযোগ অধ্যয়নের যে প্রচেষ্টা তা দেড় ইঞ্চি মুরগির পেটে তিন ইঞ্চি বাচ্চা জন্ম দেয়ার মতো ভয়াবহতায় নিপতিত করেছে আমাদের। সেটা আমরা পরে আলোচনা করে পরিস্কার করতে পারব আশা করি। আমাদের সমাজের বিকাশ ধারা তো আলাদা। এইটা মার্কসও স্বীকার করেছেন। আপনি যদি ধরেন, বৈদিক যুগ থেকে তো আমরা একটা সিভিলাইজেশনের মধ্যে ছিলাম। ফলে আমরাও বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যেই হাজির ছিলাম শুরু থেকে। অবশ্যই শাসিত ছিলাম। উপনিবেশের ভেতরে ছিলাম। ফলে আজকের সভ্যতা তো কায়মনোবাক্যে কলোনিয়াল (ধরণ পাল্টেছে এই যা)। ফলে আমরাও সেই জ্ঞানকাণ্ডের নিরিখে নিজেদের পাঠ করতে পারব। তাইলে আমি বলব আপনেরে ভূতে পাইছে। এর আগেও এখানে লোকজন ছিল। জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল। মানুষ সম্পর্কে ধারণার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থা গড়ে ওঠার এই জনগোষ্ঠির নিজস্ব ইশারা ছিল। এইটা নানা কারণে নানা সময়ে ব্রেক হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি এদেরকে একটা জনগোষ্ঠী আকারে গড়ে তুলতে চান। বা তা না চাইলেও যদি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চান, তাইলে আপনার এই ডিসকন্টিনিউটির হদিস করতে হবে। আপনার ইতিহাস খাড়া করা লাগবে।

আপনার বয়ান লাগবে। এরপরই যোগাযোগ সম্ভব হবে। নইলে আপনি পশ্চিমা যোগাযোগ বিদ্যায় হাফেজ হয়েও এই জনগোষ্ঠীর কোনো কাজে আসতে পারবেন না। আপনি শ্রেণী মাধ্যমের কাছে ধরা খেয়ে আটকে থাকবেন। এই অতি প্রাথমিক হুঁশটুকু মাথায় রাখা খুব জরুরি। পশ্চিমে মতাদর্শ,  কালচার ও মানুষ সম্পর্কের ধারণার যে এনলাইটেন ক্রিটিক আছে তা গভীর অভিনিবেশ সহকারে পাঠের দরকার আছে। এর সাথে যোগাযোগের ধারণার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসের দিকে মনযোগ ফেরাবার কাজটা অতি প্রাথমিক কাজ আকারেই হাজির হয়েছে।

মিডিয়ার কথা নয়া মিডিয়া :

প্রিন্টিং প্রক্রিয়া শুধু মিডিয়ার সম্ভাবনাই পরিষ্কারভাবে হাজির করেনি, হাজির করেছে জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনাও। আপনার দেশের ক্রিকেট টিম জিতে গেলে লাল টকটকা কালিতে পত্রিকার হেডিং হয় ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব’। এর সাইকোলজিক্যাল  ইমাজিনেশন ও ইমপেক্ট ভয়াবহ। যাহোক প্রিন্টিং টেকনলোজিই হাজির করেছে রাষ্ট্রের আধুনিক পরিগঠনের পসিবিলিটি। প্রিন্ট মিডিয়াম/মাধ্যমকে বলা হয় জাতীয়তাবাদের আর্কাইভ।

গল্প কথকের জায়গায় হাজির হলো সাংবাদিক। এতো দিনে যেহেতু লিবারেল ভেলুজ পশ্চিমা সভ্যতার জোরে চাউর হয়েছে। তাই কিছু নীতি নৈতিকতাও তৈরি হয়ে গেল। লম্বা ফিরিস্তি না দিয়ে কোট করি।

‘নিরপেক্ষভাবে কাজ করার বৈশিষ্ট্য সাংবাকিদেরকে গুপ্তচর,  প্রচারক ও প্রপাগান্ডিস্টদের থেকে পৃথক করেছে। অসহনীয় বা অপ্রিয় সত্য বলতে পারার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে বিনোদনকর্মী থেকে। নিজস্ব বিশ্বাসকে চাপা দিয়ে কোনো ঘটনা বা ইস্যুর বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে ধর্মবেত্তা বা রাজনীতিকদের থেকে। আর যথার্থতা ও জবাবদিহিতার গুণটি সাংবাদিকদের পৃথক করেছে গল্পকথকদের কাছ থেকে’ [সাংবাদিকতা, দ্বিতীয় পাঠ: আর রাজী]

সাধারণত মিডিয়ার কাছে আমরা যে নৈতিকতা আশা করি তা লিবারেল নৈতিকতা। এখন প্রশ্ন করতে হবে। পুঁজিবাদের এক নম্বর পেয়ারা জিনিস হলো লিবারেলিজম। এবং পুঁজি নিজেকে আধুনিককালের ঈশ্বরে পরিণত করেছে। এখন এই ঈশ্বরও এই সব খেলনা নৈতিকতা মানতে যাবে কোন দুঃখে? ফলে আমাদের যেসকল বুদ্ধিজীবী একই সাথে পুঁজিবাদ বিরোধিতার বিপ্লবী ভূমিকাও দেখান, আবার লিবারেল নসিহতও পেশ করেন, তাদেরকে আপনি কিভাবে পাঠ করবেন? এইটা মিডিয়া থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে লিবারেল নসিহত কী জিনিস তা আর বিস্তারিত না বলি। তারা হয়তো বলবেন, ফ্যাসিবাদের কালে এতটুকু লিবারেল আচরণই করুণ মরুতে একবদনা জলের মতো। তাদেরকে বলতে হবে, বাংলাদেশে লিবারেল বাড়াবাড়িই এই ফ্যাসিজম টাইপের অবস্থা তৈরি করেছে। এখানে ঐ অর্থে ফ্যাসিজম নাই যদিও। এইটাকে আমরা বলি, কালচারাল ফ্যাসিজম। যাক সেইটা অন্য তর্ক। লিবারেলিজমই যেখানে খোদ পাপের মধ্যে নিমজ্জিত, তাইলে স্বাধীন মিডিয়ার কথা চিন্তা করা ক্যামনে সম্ভব? এইটা অতি গুরুতর প্রশ্ন।

ঠিক এইখানেই এসে মার্ক্সিস্টদের ভূমিকার কথা বলতে হবে। ফাঁকে বলে নিই মিডিয়া আলোচনায় মার্ক্সিস্ট বুদ্ধিজীবিরা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মেহনত করেছেন। তিনারা যেহেতু এই লিবারেল ফাঁকি বোঝেন, তাই মিডিয়াকে সব আধিপত্য কায়েমের যন্ত্র আকারে হাজির হতে দেখে ঝাপায়া পড়েন। শ্রেণী,  কর্পোরেট,  সংস্কৃতি,  হেজিমনি -নানা বিষয় যুক্ত করে মিডিয়ার তর্কটা হাজির করেন। তারা আমাদের জানান দেন, একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি যে, মিডিয়া হল ‘মাধ্যম’,  মানে প্রচার যন্ত্র। এইটা কোনোভাবেই গণমাধ্যম না। ‘গণ’ নিয়া গণবিতর্ক আছে। সেখানে নানা জনগোষ্ঠীর ‘গণ’ হয়ে হয়ে ওঠার রাজনীতি ও সংস্কৃতির যে পাঠ তা খুব নিষ্ঠার সাথে না করলে ‘গণ’ ব্যাপারটা রেটরিক বা মুখের কথাই থেকে যাবে। ফলে মিডিয়ার সরল বাংলা হল প্রচারযন্ত্র।

আধুনিকতার বা মোটাদাগে বললে গ্রিকো-খ্রিস্টান সিভিলাইজেশনের ক্রিটিক না থাকায় তারা মিডিয়াকে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য তত্ত্ব বাতলাতে থাকে। একের পর এক প্যারাডাইম নিয়া ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। শেষে মনে করে তাইলে ফেসবুক গণমাধ্যম। পরে যখন দেখে দুই দলের সাইবার যুদ্ধ কমিউনালিটি আরও বাড়ায়া তোলে। একদিকে শাহবাগ অন্য দিকে বাঁশের কেল্লা। মাঝে শুরু হয়ে গেল হত্যার রাজনীতি।

ফাঁকে নিউ মিডিয়া নিয়ে একটু বলে নেই। বিজ্ঞানের সাথে টেকনোলজির সম্পর্কটা আবার খতিয়ে দেখা দরকার। পশ্চিমা বিজ্ঞানের ভূমিকাটা ছিল মেসিয়ানিক বা ত্রাণকর্তার। এর সাথে টেকনোলজির যোগটা একটা বিবাদ আকারে দাঁড়াল। বিশেষ করে টেকনোলজি যখন শুধুই ক্ষমতা ও পুঁজির অনুগামী হলো। এই টেকনোলজি সারা দুনিয়ায় বিজ্ঞানের আশির্বাদের মুখোশ নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু এর মুখটা হল ক্ষমতা ও পুঁজির দিকেই। ফলে সে অন্য দেশ ও জনগোষ্ঠির কালচারাল অবস্থানের সংকট তৈয়ার করল। পশ্চিম,  সমাজের অবস্থানের দিকে না তাকিয়ে টেকনোলজির আমোদে মেতে উঠল।[ আশিষ নন্দী: ট্রেডিশন অব টেকনোলজি]

নিউ মিডিয়ার মধ্যে ভাষা একটা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো। কম্পিউটারাইজড নয়া মিডিয়ার মধ্যদিয়ে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ হাজির হয় তা ভাষিক বিদ্রোহের বাইরে অন্য দেউড়ি পার হতে পারে না। চরম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই এর সাফল্য আটকে থাকে। মাঝে মাঝে এর যোগাযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক আন্দোলন টাইপের কোনো কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলেও তা বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের বাইরে যেতে পারে না। একমাত্র আরব বিক্ষোভে আমরা দেখলাম মার্কিন আধিপত্যবাদীরা কিভাবে ফেসবুক/টুইট জেনারেশনকে দিয়ে গৃহপালিত একটা বিপ্লব করিয়ে নিতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এর ফল হলো উল্টা। আলকায়েদা আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে নিলো আরব বিশ্বে। নিউ মিডিয়া বা কম্পিটারাইজড মিডিয়া খুব স্বাভাবিক কারণেই গ্লোবাল পণ্য ব্যবস্থাপনার অনুকূল কালচারই ধারণ করে। এর মৌল চৈতন্যে আছে নব্য উদারনীতিবাদের হাত ধরে যে পুঁজিতান্ত্রিক চরম অবস্থার বিস্তার লাভ করেছে তারই মতাদর্শিক রুপায়ন। এখন নব্য উদারতাবাদ লোক দেখানো যে মানবতাবাদ,  সম্পত্তির অধিকার ও ব্যাক্তি স্বাধীনতার কথা বলে তার পুরা সুবিধা আসলে পুঁজি ব্যবস্থাপনার হাতেই আটকা পড়ে। কারণ পুঁজি একটা গ্লোবাল ফেনোমেনা। এটা জেনেও আমাদের এখানে উদারনীতিবাদের কথা মন্দের ভাল হিসেবে বলা হয়। এবং নাগরিক বোধ ও তারুণ্যকে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু এই নিউ মিডিয়ার ফাঁপরে পড়ে জন্ম হয়েছে নার্সিসাস বা আত্মমগ্ন প্রজন্ম। এরা ফেসবুক বা টুইটের মতো মাধ্যমকে আত্মপ্রচার বা দ্রুত নিজেকে জনপ্রিয় করার জন্য এমন সব কাজ করে বসে, যার জন্য রক্তারক্তি পর্যন্ত ঘটে যায়। পণ্যবাদী উদারনীতিবাদ যেহেতু জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন বাদ দিতে পারে না। ফলে এই কনজ্যুমার জাতীয় চেতনার আন্ডারেই হাজির হয় ফেসবুক/টুইটার/ব্লগ ব্যবহারকারীরা। জনগণের এথিক্যাল ঐক্যের প্রতি কোনো বিবেচনা না রেখে দ্রুত জনপ্রিয় ও নিজেকে নিয়ে বিতর্ক উপভোগ করবার মানসিকতার অসুখে পেয়ে বসে নয়া মিডিয়া ব্যাবহারকারী ভোক্তা প্রজন্মকে। জন্ম হয় ‘থাবা বাবা’র মতো ক্যারেক্টারের। ফলে যারা নিউ মিডিয়া নিয়া আশাবাদী তাদের আশার দৌঁড় শেষ হয় পুঁজির চরম মুনাফার খাতায়।

তাছাড়া টেকনোলজি নিয়া ইনডেপ্থ আলোচনা দরকার আছে। টেকনোলজি ও মানুষের জীবন, সম্পর্ক, যোগাযোগ ইত্যাদির যথেষ্ট পর্যালোচনা আমরা করিনি। সতর্কতার জন্য বলি,  আমার এই লিবারেল সমালোচনা যার লেটেস্ট পশ্চিমা সংস্করণ নিউ লিবারেল বা নয়া উদারনীতিবাদ সমালোচনাকে কেউ যেন বাড়াবাড়ি মনে না করেন। আমাদের জন্য পশ্চিমা সব বিকাশ বা আবিষ্কার হোলসেল মন্দ নয়। কিন্তু এই সব বিষয়কে আমরা যেহেতু যথেষ্ট বুঝবার আগেই ফ্যাসিবাদি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকারে পরিণত হয়েছি, তাই কৌশলগতভাবে লিবারেল অবস্থার কথা অনেকে বলে থাকেন। আমি তার সাথে দ্বিমত করি না। আমি দেখাইলাম যে, এইটার মধ্যে যে সমস্যাটা মূলশাঁস সমেত রয়ে গেছে তার দিকেও নজর রাখাটা জরুরি। তাইলেই আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর জন্য যুতসই তরিকা বা মতাদর্শ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নৈতিক অর্ডার নির্মাণ করতে পারব। এর জন্য নানা মতাদর্শকে বিচার করার উদাম পরিবেশটাকে অবশ্যই আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। আপনি নিজে যদি রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপারে কনভিন্স হন তাইলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই আপনি এই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন। এটাই স্পিরিট। এটাই জীবকে মানুষে উন্নীত করেছে। তখন আপনি এই সব ভোগবাদি ব্যবস্থার ফাঁক গলে নিজের কাজটা জারি রাখতে পারেন। তখন আপনি এই সব উম্মুক্ত মিডিয়াকে বৈপ্লবিক পরির্বতনের হাতিয়ার করে তুলতে পারেন। তার জন্য রাজনৈতিক-নৈতিক স্পিরিটটা থাকা চাই। এই সভ্যতার দাশ হলে ধংসের হাত থেকে রেহাই নাই।

যা হোক, নয়া উদারনীতিবাদ নিউ মিডিয়ার সম্ভাবনা এতো বেশি উৎসাহিত করার পরেও এগুলা গণচরিত্র পায় না। সাংস্কৃতিক,  শিক্ষা ও সর্বোপরি মতাদর্শিক ভিন্নতা প্রকট আকারেই থেকে যায়। তখন মিডিয়া চিন্তকরা অসহায় হয়ে পড়েন। গণমাধ্যম তৈরি হয় একটা মিথে। কোনো মিডিয়া আর গণমাধ্যম হয়া ওঠে না। এরা খালি জনগণের নামে নিজেদের প্রচারই জারি রাখে। প্রচারব্যবসার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু গনমাধ্যমসুলভ আচরণ তারা প্রায়ই করেন। সেটা পলিসিগতভাবে করেন, নীতিগতভাবে নয়। তার পরেও মিডিয়া পাঠে মার্ক্সিস্টদের কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি। মোটাদাগে পশ্চিমে আমরা যে মিডিয়া স্টাডিজ জারি দেখি তার বড় অংশই মার্ক্সিস্ট জ্ঞানকাণ্ডের সিলসিলা ধরে বিকশিত। আমি মার্ক্সিস্ট বলে হোলসেল কোনো ধারার কথা বলছি না। এর মধ্যে নানা ভিন্নতা সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন। এর বাইরেও অনেকে মিডিয়া বিদ্যায় যথেষ্ট কামালিয়াত দেখাইছেন। চমস্কির কথা তো সবাই জানেন।

মার্ক্সীয় ধারার মধ্যে দুইটা ধারা ছিল। বিস্তারিত বলব না। ষাট দশকের দিকে যে ধারাটা গড়ে উঠেছিল তাকে খুব শক্তিশালী ধারা বলা যায়। এরা সনাতনী নানা বিবেচনায় ব্যাপক পরির্বতন আনেন। এবং অবশ্যই এই চিন্তাধারার একক কোনো ঘরানা নাই। আমাদের দেশেও যারা মিডিয়া নিয়া আলোচনা করেন তারাও এই ঘরানার আলোকেই করেন। মোটা দাগে এইটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এতে নানা নয়া ডিসকোর্স হাজির করা হয়। নানা ডাইমেনশন তৈয়ার হয়,  এই যা।

এই ধারা গণমাধ্যমকে উৎপাদন, পুণরুৎপাদন আরও একটু যারা এডভান্স তারা হেজিমনির কথা বলেন। এদের বিশ্লেষণ পলিটিক্যাল ইকোনমির জায়গা থেকে আমাদের খুব কাজে লাগে। এদের মধ্যে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও বহুত্ববাদী ধারার তাত্ত্বিকরা  মনে করেন,  প্রতিনিধিত্ত্বমূলক ব্যবস্থায় মিডিয়ার পেশাজীবিরা প্রভাবশালী সংস্কৃতি ও রীতিনীতি আত্মস্থ করেন ও সেই সমাজের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। কথা অতি খাঁটি সন্দেহ নাই।  তাইলে এদের কাছেই যখন আপনি গণমাধ্যমের নৈতিকতা আশা করবেন, তাইলে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে যায় না? বাদ দিলাম পুঁজির আলোচনা। মিডিয়া কালচার বলে যে ব্যাপারটা আছে তা তো মিডিয়াকে কোন ভাবেই গণমাধ্যম হয়ে উঠতে দিবে না।

যাহোক,  মার্ক্সিস্টদের মিডিয়া আলোচনার মূল পয়েন্টটা সরাসরি মার্ক্স থেকেই নেয়া। আর আমাদের এখানে বুদ্ধিজীবি মানে মার্ক্সিস্ট। ফেকাহ শাস্ত্র ভাল বুঝলে তারে বুদ্ধিমান তো দূরের কথা,  এইটা যে একটা শিক্ষা তাও স্বীকার করা হয় না। ফলে আমাদের আসলে মার্ক্সিস্ট না হয়ে উপায় নাই। নইলে যে প্রগতিশীলতার ধর্মচ্যুতি ঘটে! আমাদের বিকাশের ক্ষেত্রে এইটা একটা বড় সমস্যা। মার্ক্স বলতেছেন,

‘যে শ্রেণী বস্তুগত উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে,  সেই শ্রেণী একই কারণে মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে,  এই কারণেই সাধারণত যাদের মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপর দখল নাই,  তাদের ধ্যান-ধারণা শাসক শ্র্যেণীর ধ্যান-ধারণার অধীন হয়ে থাকে।’   [মার্কস ও এঙ্গেলস: জার্মান ইডিওলজি]

এইটা মার্ক্সের অল্প বয়সের লেখা। দেখেন এইখানে একটা দ্বান্দিক ফ্যালাসি আছে। যে বস্তুগত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে সেই মনোজগতের ওপর প্রভাব রাখে। আবার যে শ্রেণীর মনোজগতের ওপর দখল নাই, তারা উৎপাদনের মালিক বা শাসক শ্রেণীর অধীন থাকে।

তার মানে মার্ক্স বলতেছেন, দুইটাই লাগবে। ধরে নিতেছেন বা প্রায়রিটিতে রাখছেন, বস্তুর ওপর দখলই চৈতন্য বা মনোজগতের ওপর দখল কায়েমে ভূমিকা নেবে। ফলে বস্তু-নিরপেক্ষ ডিভাইন পসিবিলিটিও যে মানুষের মনোজগতকে প্রভাবিত করতে পারে, শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে পারে সেই আলাপ মার্ক্সে নাই। ফলে এই নিখিল বস্তুময় বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করা ও পরির্বতনের কাজে মার্ক্স অনেক দূর এগিয়েও মূক হয়ে গেছেন। নতুন সিভিলাইজেশনের পসিবিলিটি দিন দিন মার্কসিজমের জন্য কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছে। যখন ডিভাইনটি রাজনৈতিক রুপে হাজির হয় তখন মার্ক্স কাজ করতে পারেন না। অন্য দিকে ইউরোসেন্ট্র্রিক আধুনিকতার সমস্যা মার্ক্সিজম (মার্ক্স না) শেষ পর্যন্ত ওরিয়েন্টালিস্টই করে রেখেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা বুঝবার ক্ষেত্রে মার্ক্সের চিন্তা ভিন্ন উপায় নাই। তথাপি এর নির্মোহ ক্রিটিক তো করতেই হবে।

ফলে গোড়ার গদলগুলা না মিটিয়ে মার্ক্সিজমের টেবলেট দিয়ে আমাদের অসুখ সারানোর চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছে। এই দেশের বামপন্থিরা হয়েছে সবচেয়ে জনবিচ্ছিন্ন। এইটা হল সাংস্কৃতিক উৎপাদনের গোড়ার সমস্যাটা না বুঝার কারণে। এইটা মিডিয়ার দিকে তাকালে বুঝবেন। এই দেশের সবচেয়ে বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হল বামপন্থিদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। সে সারাক্ষণ চর্চা করে ক্ষমতাশীল শ্রেণীর সংস্কৃতি আর শ্লোগান দেয় ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

গণমাধ্যম মিথ :

এই কালচারাইজেশন অব পলিটিক্সে মিডিয়া কিভাবে রাজনীতিকে খেয়ে ফেলে তার নজির হল বাংলাদেশের বামপন্থা। মিডিয়াকে গণমাধ্যম মনে করার যে মিথ তা বাড়ানোর জন্য কিছু রিপোর্টিং করে মিডিয়া বা এই সব প্রচার যন্ত্র টিকে থাকে। গণতন্ত্র যেমন ভোটের নামে টিকে থাকে। আর শোষনের দাঁতে শান দেয়। মিডিয়াও তেমনি গণমাধ্যম ও নিরপেক্ষতার মিথ জারি রেখে মিডিয়ার ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে যেন কোনো বিপ্লবী শক্তির উদয় না ঘটে তার এক মধুর খেলা জারি রাখে। এর জন্য গড়ে তোলে কিছু সিভিল বুদ্ধিজীবি। এইটাকে ‘হমি কে’ ভাবা বলছেন সিলি সিভিলিটি। এই সিলি সিভিলরা মিডিয়ায় ইস্যুভিত্তিক আলাপে ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন ইস্যুর টেনশন মিনিমাইজ করাই হল এদের কাজ। এরা তাই জন্মগতভাবেই গণবিরোধী। আর সাংবাদিক ভাইরা এতো স্মার্ট হওয়ার পরেও যা ধরতে পারেন না তা হল,

‘মিডিয়ায় যে এলিট-আধিপত্য গড়ে ওঠে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের এমনভাবে কোনঠাসা করে দেয়া হয়,  আর তা এতো স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে,  মিডিয়ার সাংবাদিকেরা (যারা প্রায়শ পূর্ণ সংহতি ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করেন) কতগুলো পেশাগত সংবাদমূল্যের ভিত্তিতে ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ কাজ করেন বলে নিজেদের বোঝাতে সক্ষম হন। কিন্তু বাধাগুলা এতটা শক্তিশালী,  এমন মৌলিকভাবে সিস্টেমের মধ্য থেকে গড়ে-ওঠা যে, সংবাদ-পছন্দের বিকল্প ভিত্তির কথা কল্পনা করাও কঠিন।’ [হারমেন ও চমস্কি: সেলিম রেজা নিউটনের অনুবাদ: মিডিয়া পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তক; বাংলা একাডেমী]

মিডিয়া পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহান ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া’ বইয়ে মিডিয়ার নানা খুটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম অধ্যয়েই তিনি বলছেন, ‘মিডিয়াম ইজ দ্যা মেসেজ’। এইখানে আমি একাডেমিক কোন আলোচনা করব না। মাধ্যমই সংবাদ। কথাটা বুঝলে অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে যাব। আমরা সাধরণত মনে করি মিডিয়া হবে সত্য প্রকাশের হাতিয়ার। ন্যায় আর বিবেকের পরাকাষ্ঠা হবে মিডিয়া। নির্মম হলেও সত্য নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মিডিয়া বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নাই। মিডিয়াম নিজেই একটা চরিত্র ধারণ করে বসে। তার পরে সে তাঁর চরিত্রের বাজারজাত করে। কালচারাইজ করে তার চরিত্রকে। এটা বাজারের স্বার্থে না করে রাজনীতি সংষ্কৃতি ও অন্য নানা কারণে করতে পারে। ফলে মিডিয়াকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাববার আর কোন সুযোগ নাই। ঘটনা সংবাদ হতে যে কারণে পৃথক ঠিক একই কারণে প্রচারযন্ত্র সার্বজনীন সত্য থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য। মিডিয়ার কাছে ডিজিটাল মিথটা সত্য বা মিথ্যাও নয় কিন্তু মিডিয়া এইটা এসেনসিয়ালাইজ করে এটার ভ্যালু কে সে এমন ভাবে হাজির করে, সমাজে নয়া কালচারাল মেরুকরণ তৈয়ার হয়।

কাজেই এরা একটা প্রপাগান্ডা মেশিনারির চাকুরে কিন্তু নিজেদের মনে করেন জাতির বিবেক। এইটা গোটা মিডিয়া বিদ্যার দিক থেকে বলা হল। বাংলাদেশে ব্যাপারটা কি রকম। বাংলাদেশে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ ব্যাপারটা কিভাবে হাজির আছে তার আলোচনা না করে মিডিয়াকে বোঝা যাবে না। বাংলাদেশে তথাকথিত সেকুলার আধুনিক যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য জারি রয়েছে। আর আওয়ামী জবরদস্তির যে রাজনীতি তা এই সাংস্কৃতিক আদর্শের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। ফলে খুব সহজেই মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার এর একটা যোগসূত্র তৈয়ার হয়েছে। সমাজের এই দিকটি বিশদ ভাবে না বুঝলে আমরা এখনকার মিডিয়া কিভাবে গোলামির গুন্ডায় পরিণত হলো তা ধরতে পারব না।

আমাদের প্রতিটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বহুপক্ষীয় ব্যাবসার স্বার্থে জড়িত। সাধারণত বড় বড় ব্যাবসায়ীর কাছে মিডিয়া হল অন্য ব্যাবসা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারে কিছুটা নিজের ব্যাবসার অনুকূলে রাখতে একটা মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার চাঁদা সেভ করে দিতে পারে। সরকারও সহজেই এদের বাধ্য করে ফেলতে পারে নগ্ন প্রপাগান্ডায় নেমে যেতে। আর বাড়াবাড়ি করলে সহজেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এর জন্য কিছু আইন রেডিমেট তৈয়ার করে রাখা আছে। আমাদের প্রতিটি সম্পাদক বা মিডিয়াকর্তা আসলে মালিক পক্ষের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করে। ফলে খুব সহজেই সাংবাদিকতা এখানে পরিণত হয় কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি নির্মাণ ও কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি বিনাশের একটা উলঙ্গ খেলায়। এর মধ্যে যাদেরকে আপনারা মনে করেন ‘মানসম্পন্ন’ মিডিয়া। এরা বাংলাদেশে দাতা সংস্থাদের গোলাম ছাড়া আর কিছুই না। এরা মূলত ডেভলপমেন্ট ডেমক্রেসি বা ভিক্ষার গণতন্ত্র পয়দার আতুড় ঘরের ভূমিকা পালন করে। এটা করতে যায়া তারা যে কালচারাল রাজনীতি প্রমোট করে তার কর্পোরেট জাতীয়তাবাদী চেহারার সাথে আপনারা পরিচিত। এর আবেগী প্রপাগান্ডা ফ্যাসিবাদি সংস্কৃতির দোসর। তাঁর চরিত্র হলো উপনিবেশী সংস্কৃতির কিন্তু দায়িত্ব হলো পশ্চিমা দাতা সংস্থার বা কতিপয় এম্বাসির বক্তব্যকে সাংবাদিকতার মোড়কে হাজির করা। এটা ডিজিটাল, প্রযুক্তি, প্রগতি, চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদির এমন এক মনমাতানো প্রচারণা ও আবেগঘন কন্ঠস্বর নিয়ে হাজির হয় মধ্যবিত্ত এর সাথে দ্রুত নিজের নাড়ির যোগ ঘটিয়ে ফেলে ‘জাতে’ উঠে যায়। যে মধ্যবিত্ত বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের গণহত্যাকে রাজনৈতিক বিজয় মনে করে।  কিছু শিশুতোষ লোক হাজির হয় বুদ্ধিজীবি হিসেবে। কিছু লেখক, চলচ্চিত্র কর্মী, অভিনয় তারকা, শিল্পীকে এরা শামিল করে নিজেদের প্রপাগান্ডা মেশিনে। এইটা হয়ে ওঠে মেইনইস্ট্রিম। অন্য মিডিয়াগুলাও এর ব্যাবসায়িক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে গণমাধ্যমের শক্তি ঠাওরে এই দিকেই যাত্রা শুরু করে।

আধুনিকতার মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে মিডিয়া তারই মুরুব্বি হিসেবে নিজেরে হাজির করে। সে ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে চলতি মতাদর্শের নিয়মতান্ত্রিক মত-দ্বিমতের ভিতরে থেকে অভিভাবকের মতো আচরণ করে। ফলে রাজনৈতিক পসিবিলিটি বলে যেটা বিরাজ করে তা সবসময়ই মিডিয়া পরিমন্ডলের বাইরে থাকে। যখন কোন কমিউনিটি হাজির হয় (হেফাজতের আগমনে সময় আমরা যা দেখেছি) তখন প্রচারযন্ত্র কেবল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাদেরকে কেন্দ্র করে সমাজে যে উত্তেজক অবস্থার সৃষ্টি হয় মিডিয়া তখন তার চরিত্রের সীমাব্ধতা সত্ত্বেও নিরপেক্ষতার ভনিতা করে। এইটা সংবাদ ব্যাবসার মধ্যে থাকলে করতে হয়। কিন্তু পারসেপশনের বেলায় প্রচার যন্ত্রের গোমরটা ফাঁস হয়ে যায়। মিডিয়ার পারসেপশন আর জনসমাজের পারসেপশনের মধ্যে যে ফারাক তা অতিগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতা প্রায়ই শিক্ষিত বা বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিত্তকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক বিকাশ হয় খুব নিম্নশ্রেণীর।

অন্যদিকে এর বাইরেও যে বিশাল জনগোষ্ঠী তাঁরা আধুনিকতার এই যোগাযোগ জালের বাইরেও নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম। এর কারণ হল মতাদর্শিক বিকাশ প্রচার যন্ত্রের প্রপাগান্ডা দিয়া প্রভাবিত করা যায় না। ফলে সমাজের বিভাজন সামাজিক স্তরে থেকেই যায়। খেয়াল করে দেখুন, কাভারিং শাহবাগ আর কাভারিং হেফাজতের মধ্যে মিডিয়ার ভূমিকাটা কি ছিল। শাহবাগের কাভারেজে মিডিয়া যে মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে মনে হয়েছে এটা যেন ঠিক তাঁদের নিজেদের যুদ্ধ। অন্য দিকে হেফাজত কাভারিং বুঝতে হলে এতো কথার দরকার নাই। এডওয়ার্ড সাইদ কাভারিং ইসলাম নিয়ে যে পারসেপশন দিয়েছেন তা দিয়েই বুঝা যাবে। ইসলামকে পশ্চিমের মতো আমাদের মিডিয়াও একটা ওরিয়েন্টাল ব্যাপার মনে করে। ফলে মেইনস্ট্রিম প্রপাগান্ডা মেশিনারি সাংস্কৃতিক ভাবে, মতাদর্শিক ভাবে এন্টি ইসলামী। হেফাজতকে কোন ভাবেই তাঁরা নাগরিক আন্দোলনের মর্যাদা দিতে পারে না। এই কমিউনিটি মিডিয়ার কাছে ‘অপর’ হিসেবে ধরা দেয়। তাঁর কাছে নাগরিক আন্দোলন হলো এনজিও বুদ্ধিজীবিতা। ফলে ধর্মযুদ্ধের কালে মিডিয়ার ভূমিকা কি হবে তা আর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

কাজে কাজেই বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জন্য একনম্বর কৃতিত্ব হল মিডিয়া বা এইসব প্রচারযন্ত্রের। এখন এগুলোকে সহজেই বাগে এনে ক্ষমতার রাজনীতির যে গণবিচ্ছিন্নতা তা আড়াল করে জবরদস্তির শাসন টিকিয়ে রাখাটা খুবই সহজ কাজ। ফলে মিডিয়ার সহযোগে এই ক্ষমতার বিকার হয়ে উঠবে পাগলা কুত্তার মতো।

. ক্ষমতার বিকার :

ÔThe representative nineteenth century discourse of liberal individualism loses its power of speech and its politics of individual choice when it is confronted with an aporia. In a figure of repetition, there emerges the uncanny double of democracy itself: `to govern one country under responsibility to the people of another ….is despotism. [Bhabha: Sly civility, p: 137 The Location of Culture]
এতক্ষণের আলোচনা আমাদের অনেক ভাবনার খোরাক জোগাল। এইবার আমরা ক্ষমতা প্রশ্নটি বোঝার চেষ্টা করব। মিডিয়া তাত্ত্বিদের অগ্রসর অংশ মনে করেন। হেজিমনি তৈরি করতে মিডিয়া শাসক শ্রেণীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। হেজিমনি নিয়া দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান তাত্ত্বিক গ্রামসির লাই ধরেই এই সব আলোচনা হয়ে থাকে। গ্রামসির সাথে দ্বিমতের লোকের অভাব নাই। তথাপি হেজিমনির কথাটা একটা লেবেলে সত্য বলে কম বেশি সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু হেজিমনি বললেই সব ব্যাপার পরিষ্কার বুঝা যায় না। কারণ গ্রামসি শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন না। এই আধিপত্য কোথায় অবস্থান করে? রাষ্ট্রে না সিভিল সমাজে ? কারণ গ্রামসি পুরানা ক্লাসের জায়গা থেকে ব্যাপারটাকে দেখেছেন। যা এখন কর্পোরেট জমানায় গ্লোবাল ফেনোমেনা আকারে পুঁজির চরম অবস্থার মধ্যে ক্লাসের আলোচনাও আগের জায়গায় নাই। তবে গ্রামসি উত্তর চিন্তকরা মনে করেন এই হেজিমনি বা আধিপত্য অবস্থান করে সিভিল সমাজেই।

মোট কথা গ্রামসির লেখায় আধিপত্য ধারণার আমদানি হলেও এটা নিয়ে বিস্তারিত কোন আলোচনা গ্রামসিতে নাই। ফলে পরবর্তী সময়ে এই ধারায় নানা বিষয়ের আলোচনা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। সাবল্টার্ন বিদ্যার ধারাও গড়ে উঠেছে এই পথ ধরেই। এটা নিয়ে এখানে কথা বলব না। ক্ষমতা প্রসঙ্গেই সীমিত থাকব।

‘ক্ষমতার বিকার’ কথাটা অনেক সময় রেটরিক অর্থে ব্যাবহার করা হয়। কথাটা নিয়ে অনেক অস্বচ্ছতাও আছে। যেখানে রাজনীতি কথাটা ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া কোন অর্থই তৈয়ার করে না সেখানে ক্ষমতার বিকার কথাটা যে অস্বচ্ছতা তৈয়ার করে তা আগেই পরিষ্কার করা জরুরি।

ক্ষমতার দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য -এই দুই রুপই আছে। সব ক্ষমতাকে আমরা দৃশ্যমান ভাবে বিরাজ করতে দেখি না। যেমন জ্ঞান যে ক্ষমতা, এইটা আমরা কি সব সময় দৃশ্যমান ভাবে দেখি? না দেখি না। মার্ক্সের পরে এই জ্ঞানের একটা ব্যাবহারিক বা বলা যায় চর্চার জায়গা পরিষ্কার হয়েছে। ফলে জ্ঞানের ভূমিকায় একটা চর্চা বা প্রাকসিসমূলক ব্যাপার হাজির হয়েছে। এর সাথে সাথে আমরা ক্ষমতার বিকার কথাটা কিভাবে বুঝব তাইলে? মুশকিল কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

ক্ষমতার সর্বব্যাপী বিস্তারের দিশাটা সহজে বুঝা যায়। এই সর্বত্রবিচারী ক্ষমতার সাথে শাসনপদ্ধতির যে যোগ তার নিরিখে ক্ষমতার বিকার কথাটা ভাল ভাবে বুঝা সম্ভব হবে মনে হয়। এর সাথে জীবন যাপন, অর্থব্যবস্থা, সংষ্কৃতি, উৎপাদন ও ইতিহাসের আলোচনাও চলতে পারে। ফলে ক্ষমতার বিকার কথাটা একটা নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে আলোচনা করা হয়। তারপরেও শুধুমাত্র তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিচ্যুতির মধ্যে ক্ষমতার বিকার আবিষ্কার করার পপুলার ফ্যাশন সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। খোদ ক্ষমতা কি জিনিস তার আলোচনা বহু বিস্তৃত। কিন্তু বিকারটা আমরা নানা কিছুর সাপেক্ষে দ্রুতই ধরে ফেলতে পারি। রাষ্ট্র, আইন, আদালত এমনকি ইতিহাসের বয়ানের মধ্যেও এই বিকার বিরাজ করতে পারে। এইটা খুইজা পাওয়া খুব কঠিন কিছু না। কিন্তু ক্ষমতা কি কারণে ক্ষমতা? -এই আলোচনা অনেক পরিসর দাবি করে। এইটা অন্যখানে হবে।

ক্ষমতার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মিশেল ফুকো। ফুকো আমাদের দেখান ক্ষমতা কিভাবে সর্বত্রগামী হয়। পাগলা গারদ থেকে যৌন বিধান সবজায়গায় ক্ষমতা কিভাবে হাজির থাকে। খুব মাইক্রো লেভেলে ফুকো এগুলা নিয়ে কথা বলেন। আধুনিক-উত্তর কালে ক্ষমতা কেবল আর রাষ্ট্র বা কতিপয় শ্রেণীর আধিপত্য ধারনার মধ্যে সীমাব্ধ নয়। ক্ষমতা সামাজিক, ব্যাক্তিগত এমনকি দৈনন্দিন নানা খুটিনাটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। পরিবার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এই  সবের ভেতর দিয়েও ক্ষমতা জনগনের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। ফুকোর কথাটা হচ্ছে আধুনিক ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা বা সার্বভোমত্বেও সনাতনী ছকে চলে না। তা চলে অনুসাশন বা ডিসিপ্লিনের ছকে। ফুকো মজার একটি শব্দ হাজির করেছেন। তিনি বলছেন ‘গভর্নমেন্টালিটি’। আমি এতো কথা বলছি এইখানটায় আসার জন্যই। এই গর্ভমেন্টালিটির সাথে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ফ্যাসিজমের শিকারে পরিণত হওয়ার বিষয়টি মিলিয়ে নিতে চাই।

এই অনুশাসন প্রীতি বা গভর্নমেন্টালিটিই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রকে সম্ভব করে তুলেছে। আমরা আর খুঁজতে যাই না আদৌ ক্ষমতায় কেউ আছে কি না? আমরা বুঝতে পারি না ক্ষমতা কোথায়? স্বার্বভৌম ক্ষমতা খুব মূর্ত বিষয়। কিন্তু গভর্নমেন্টালিটি আর কোন মূর্ত বিষয়ের ধার ধারে না। সে এতোই নিয়মের দাসে পরিণত হয় যে ক্ষমতায় কে আছে সে ভুলে যায়। ভারতীয় বাহিনী নামল না বাংলাদেশের র‌্যাব গুলি করে মারল তাতে কিছু আসে যায় না। সে নিয়মের গোলামে পরিণত হয়। এই নিয়মই গণজম আকারে হাজির হয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেয় আধুনিকতার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধে। আমাদের এখানে ব্যাপারটা পশ্চিমের মতো করে ঘটে না। আমাদের শাসন কাঠোমো পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত উপনিবেশী। শুরুতে হমি কে. ভাবা থেকে একটা কোট করেছি।

ইম্পায়ার এর সাথে ন্যাশনের সম্পর্কটা বোঝা দরকার। আমাদের মতো দেশ যে কারণে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে না তার হদিস করাটা অতি জরুরী।  আমাদের এখানে থাকে রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট। এর কিছু পোষ্য সিভিল ক্যাডার থাকে। এরা করে কি, এই পরগাছা সরকারের স্বাধীনতাকে পরিগঠন করে ইম্পায়ারের নীতির আলোকে। ফলে এই সব সরকার যত বেশি জাতীয় চেতনার কথা বলে ততই গণবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই অবস্থাকে বলা যায় কলোনিয়ালিস্ট গভর্নমেন্টালিটি। আর এটাই আমাদের মাঝে গেড়ে বসেছে। হমি কে. ভাবা বলছেন,

‘উনিশ শতকের প্রতিনিধিত্বকারী (উপনিবেশী) লিবারেল ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রবাদী বয়ান যখন চিন্তার সংঙ্কটে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই এটা তার রাজনৈতিক ভাষ্যের যোগ্যতা হারায় এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের রাজনৈতিকতাকেও বিনাশ করে। তখন সে ভৌতিক গণতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি করে। খোদগণতন্ত্রই যখন রহস্যময়, তখন একটি দেশ শাসিত হয় অন্য আর একটি দেশের স্বার্থের আলোকে। গণতন্ত্রের পোশাকে আসে স্বৈরতন্ত্র।’

ভয়াবহ ব্যাপার হলো এই কলোনিয়াল মেন্টালিটির সামজীকিকরণ করা হয় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের নামে। আর এর প্রধান হাতিয়ার হলো মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র। এই সামাজীকিকরণই ফ্যাসিজমকে সম্ভব করে তোলে। এই ফ্যাসিজম ইম্পায়ারের সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নিজ দেশে শুরু করে দেয় ধর্মযুদ্ধ। বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ওয়ার অন টেররের প্রকল্পের পথে। ফলে ক্ষমতার বিকার এর সাথে মিডিয়া বা প্রচার যন্ত্রের সম্পর্কটা বুঝতে পারা খুব কাজের কাজ হবে বলে মনে করি। এই প্রসঙ্গে ফিরে লেখা শেষ করব।

বুদ্ধিজীবীতা মিডিয়ার ভূমিকা :

মিডিয়ার বর্তমান ভূমিকাটা নিয়া জনমনে ক্ষোভ আছে। সেটা অন্যায় কিছু না। কিন্তু সমাজের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হল মিডিয়া কেন এই ভূমিকায় উপনীত হল। বাংলাদেশের মিডিয়ার চরিত্র এমন কেন? মিডিয়া কিভাবে বাধ্য হলো এই অবস্থায় হাজির হতে তা খুলে খুলে দেখিয়ে দেয়া। কিভাবে তার প্রজেক্টের মধ্যেই গণবিরোধিতা হাজির থাকে তা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখানো। এই কাজও নিদারুণ ভাবে অনুপস্থিত। মিডিয়া যে লাইনে সংবাদ প্রচার করে তার সাথে আমাদের এই মূহুর্তেও সঙ্কটের ফারাকটা আকাশ আর পাতাল। কথাটা খুলে বলি।

অনেক মানুষের জন্য অবস্থাটা এ রকম যে, কোন ইস্যু মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত সেটা আর ইস্যুই মনে করছে না। আমরা দেখছি মিডিয়া মিথ্যা বলছে তার পরেও আমরা সেই খবরই পড়ছি। এর মধ্যেই রাজনীতির কর্তব্য কর্ম খুঁজছি। চমস্কি যেমন বলেন, যেসব দেশে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট আমলাতন্ত্র থাকে সেই সব দেশে মিডিয়া আধিপত্যশীল এলিটদের হয়ে কাজ করে। মানে মিডিয়া প্রচারযন্ত্র হিসেবে উলঙ্গ প্রতিযোগিতায় নামে। বিনোদন ও কিছু ব্যালেন্সিং রিপোর্ট করে গণমাধ্যম মিথটাও জারি রাখে। যাতে জনগনের সাথে প্রতারণাটা ধারাবাহিক ভাবে করা যায় এবং লসপ্রজেক্ট না হয়। পাবলিক মুখ ফিরিয়ে নিলে তো আমছালা সবই যাবে। ফলে প্রচারযন্ত্র গুলা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারের দায়িত্ব পালন করে। আর সত্য প্রচারের ধুয়া তুলে ব্যবসা করে যায়। মিডিয়া হল প্রতারণামূলক সত্যের ব্যাবসা। এখানে গণতন্ত্রের সাথে মিডিয়ার মিল শতভাগ।

এই সত্যের ব্যবসায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সঙ এর মতো। কিছু প্রচারযন্ত্র নির্দিষ্ট কিছু লোকদের জাতির বিবেক হিসেবে হাজির করে। এই বিবেক আবার দুই পক্ষের একটা আওয়ামী বিবেক আর একটা বিএনপি বিবেক। এই দুই দলের মধ্যে আবার ঝগড়াও লাগে। সেটা আবার মিডিয়া ব্যাপক কাভারেজ দেয়। সরকার সব মিডিয়া নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। যেগুলা দখলে মানে অনুগত্যের বাইরে চলে গেল সেগুলা সব বন্ধ করে দেয়া হলো। বিরোধী দলের লোক জন চিৎকার করে বললেন, সরকার গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করছে।

সরকার আসলে যা করছে তা হলো নিজেদের প্রচার যন্ত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আইন, সংবিধান শুধু নয় ইতিহাস, চেতনা সব আপনি নিজের স্বার্থ আর দেশের স্বার্থকে একাকার করে সাজালেন। সেখানে কিছু বিরোধী মিডিয়া রাখার তো আর দরকার নাই। ছদ্মবেশী গণতন্ত্রের মোড়কটা খুলে ফেললে এখন আর সমস্যা নেই। উপরের আলোচনা থেকে দেখছি মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার কতো গভীর ঐক্যের মধ্যে বিরাজ করে। বিএনপি তো উপরে উপরে মিডিয়া করেছে। নিজেদের জন্য দরকারি সাংবাদিকও তৈরি করেছে। কিন্তু মিডিয়া কালচারটা আওয়ামীই রয়ে গেছে। এটা এখন ন্যাশনাল কালচার! ফলে এখন মিডিয়ার দ্বারা ফ্যাসিবাদের বয়ানটা পাকাপোক্ত করা সবচেয়ে মামুলি কাজ। সাংবাদিকরা কাগুজে বাঘের মতো কিছুদিন তড়পাবে পরে চাকুরি ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, সব মিলে মানিয়ে নেবে।

একজন বললেন, গণমাধ্যমে তো বোমা মারা উচিৎ! কারণ কী? কারণ, আপনারা বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধের সময় প্রতিবাদ করেননি। সরকার পক্ষের বুদ্ধিজীবী বললেন, যিনি বোমা মারার কথা বলেছেন তিনি পাগলও নন শিশুও নন। এই বক্তব্যকে তিনি বিপদজনক মনে করে সরকারকে ডাক দেন ব্যবস্থা নিতে।

মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতার সাথে বিশাল জনগোষ্ঠী যখন কোনো মিল খুজে পায় না এবং সে জনগোষ্ঠী যদি আন্দোলনের মাঠে থাকে তাইলে মিডিয়াকে তারা নিরপেক্ষ বলে মাফ করে দেয় না। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার ঘটনা তখন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি-জামাত কি সেই গণশক্তি? উত্তর হলো না। এরা কি গণস্বার্থের শাসন কায়েম করতে আন্দোলন করছে? দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন গণমাধ্যমে বোমা মারা উচিৎ তখন একটা মুশকিল তৈয়ার হয়। প্রথম কথা হল কে কাকে বোমা মারছে? গণমাধ্যম তো গণশর্ত পূরণ করে নাই। আমাদের দেশের দুই দলের রাজনৈতিক এজেন্ডার মধ্যে প্রচার যন্ত্রের স্বাধীনতার তর্কটা তো শুরুই হয় নাই। তাইলে বোমার কথা কেমনে বলব? সরকার তার বিরুদ্ধের মিডিয়া বন্ধ করে দিছে। সব মিডিয়ায় বিটিভির চরিত্র আছর করে বসেছে। এই অবস্থা তো নতুন কিছু না।

বিএনপি কী করেছে? তাদের দলীয় লোকদের মিডিয়া মোগল বানিয়ে দিয়েছে। প্রচারের রাজনীতির একচ্ছত্র দখলদারি যে কোনো কাজে আসে না তা কোনো দলই আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য নিদেনপক্ষে মিডিয়ার জন্য একটা নীতিগত জায়গা আমদের লাগবে। প্রচারযন্ত্রের আওয়ামী ভূমিকা আর বিএনপি ভূমিকার মধ্যে কোন ফারাক নাই। আমাদের তর্ক তুলতে হবে মিডিয়াকে কেমনে সম্ভব করে তোলায় যায় সেই দিকগুলা নিয়া। বাংলাদেশ গণমাধ্যমের সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে। প্রচারযন্ত্রের সন্ত্রাস গণমাধ্যমের সম্ভাবনাকে মিথে পরিণত করেছে। আমার দেশ যেমন একটা প্রচারযন্ত্র একাত্তর টিভি বা জনকন্ঠও প্রচারযন্ত্র। এখন আপনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে একজন দাঁড়ালেন আমার দেশের ছায়াতলে অন্যজন্য ৭১ এর পতাকাতলে! আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা গণমাধ্যম মিথের শিকার হয়ে গণবিরোধী রাজনৈতিক দলের মেরুকরণে পড়ে গেছেন।

বাংলাদেশে বিদ্যমান দলগুলো গণতন্ত্রের রহস্যময়তার জন্য টিকে আছে। কিন্তু জনগণের কাছে গণতন্ত্র, জাতীয় চেতনা এগুলার আবেদন ফুরিয়েছে। মিডিয়ার সংবাদও আর মানুষকে প্রভাবিত করে না। তবুও খবর দেখা অভ্যাস বসত জারি থাকবে। নতুন নতুন বিতর্ক ও মোড় উপভোগ করবে মানুষ। বিরোধী প্রচারযন্ত্র সবই বন্ধ করা হয়েছে। দেরিতে হলেও ইনকিলাব বন্ধ করা হয়েছে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক সৌজন্যতাও আর থাকছে না। দ্বিদলীয় প্রচারণার পরিবর্তে একদলীয় প্রচারণাই ন্যায় আকারে জারি করা হলো। সমাজে এর প্রতিক্রিয়া এতো ক্ষুদ্র হয়েছে যে নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্রের ফাঁপা রুপটি মধ্যবিত্ত আর লুকাতে পারলো না। ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন, ঐতিহাসিক নির্বাচন এই সবই মিডিয়ার অবদানে সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনকার ক্ষমতার বিকারটা বহন করছে মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র।

গণমাধ্যম গণক্ষমতা :

লেখা শেষ করি, ক্ষমতার বিকার কথাটা বুঝলে ক্ষমতার আকার বা পাল্টা ক্ষমতাও বুঝতে পারব। উদাহরণ দিয়ে বলি, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক নির্বাচন হয়েছে। শুধু মিডিয়াতে এই নির্বাচনের প্রপাগান্ডা জারি ছিল। পাবলিক (আ. লীগের বাইরে) রেসপন্স করে নাই। কিন্তু ২৪ জানুয়ারি প্রথম আলো ‘গণতন্ত্র কোন খেলা নয়’ নামে হাসান ফেরদৌসের একটা সম্পদকীয় নিবন্ধ ছেপেছে।

এতে বলা হচ্ছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে নাকি গণতন্ত্র রক্ষা হয়েছে। বলা হয়েছে, শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার কৃতিত্ব সরকারকে দিতে হবে। বোঝেন অবস্থা! এই হল ভোটবাদি গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকার। মিডিয়া এটা পোক্ত করছে। এখন পাল্টা গণক্ষমতার কথা তো আমরা বলি সেটা কোন জায়গা থেকে বলি?

আমরা বলি, গণক্ষমতা হলো সেই ক্ষমতা যা বাংলাদেশের জনগনের নৈতিক মূল্যবোধের ভেতর থেকে উঠে আসবে। এবং এই নৈতিক এজেন্সিই ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সে যেই নৈতিকতার কারণে ‘গণ’ সেই ন্যায়কে ক্ষমতা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্যেও ধরে রাখবে। বলাই বাহুল্য, এটাই বিপ্লবী রাজনীতির কর্তব্য। এখন এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের নামে না ইসলামের নামে হবে সেটা আগাম বলার কিছু নাই। যে নামেই হোক গণক্ষমতাকে নৈতিক এজেন্ট আকারেই হাজির হতে হবে। কাজেই পাবলিক এথিকস কে ধারণ করে ক্ষমতা যখন ইনসাফের প্রতীক আকারে দাঁড়াবে তখনই তা গণক্ষমতা হয়ে উঠবে। এভাবেই আমরা রুখে দিতে পারি ক্ষমতার বিকার।

আর গণক্ষমতার উত্থান ছাড়া গণমাধ্যম কথাটা মিথ ছাড়া আর কিছু না। প্রথম আলো যেমন এই ফ্যাসিবাদি জুলুমবাজি ক্ষমতার বিকারকে গণতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার মহান অর্জন বলে সাফাই গাইছে। তেমনি মুষ্টিমেয় কিছু লোকের স্বার্থের দিক থেকে পরিচালিত প্রচার যন্ত্রকে গণমাধ্যম বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার বিকারকে রক্ষা করছে এই সব প্রচারযন্ত্র। কাজেই গণক্ষমতার কাজ হলো পাবলিক মোরালিটিকে মাথায় রেখে পাল্টা ন্যায় বা ইনসাফ ভিত্তিক ক্ষমতা তৈয়ার করে ক্ষমতার বিকারকে বিনাশ করা ও গণমাধ্যমের সম্ভাবনার পথকে পরিষ্কার করা।

মনে রাখতে হবে, সরকার যখন নিজেকে মিথ্যা প্রচারণার প্রতিযোগিতায় সামিল করবে, তখনই সে বিপদগ্রস্ত হবে। শাসক যখন মনে করে সে বিরোধী প্রচারণা বন্ধ করে নিজেদের পক্ষে বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য যে কোন ধরণের প্রচারণা চালাতে পারে। তখন বেপরোয়া অবস্থার সৃষ্টি হয়।

আনন্দের কথা হলো, এই প্রচারণা কোনো দিনও বিপ্লবী কোনো সংঘ বা মতাদর্শকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। ফলে এই সব ‘ফসকা গেরো’ আমরা দ্রুত খুলে ফেলতে পারব, যদি মিডিয়ামুগ্ধতা বা প্রচারমুগ্ধতা কাটিয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রামে নিজেদের শামিল করতে পারি। এই কাজগুলো দ্রুত করতে পারলেই দেখব মিডিয়া নিজেই দিন দিন ক্ষমতার বিকারকে এতো প্রকট ভাবে মানুষের সামনে হাজির করছে যে, মানুষের আলস্য ভেঙ্গে যাচ্ছে। একতরফা প্রচারসন্ত্রাস ধৈর্য্যের বাধটা আলগা করে দেয়। এভাবেই ফ্যাসিবাদ ও ক্ষমতার বিকার নিজের ধ্বংস তরান্বিত করে গণক্ষমতার সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রয়োজন আকারে হাজির হতে বাধ্য করে।

(প্রকাশিতব্য বই ‘গণহত্যার রজনীতি : ধর্মযুদ্ধে প্রবেশ’থেকে)

রেজাউল করিম রনি
কবি ও রাজনৈতিক চিন্তক