আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কয়েকটি মূলনীতি প্রসঙ্গে

by মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

একতরফা প্রহসনের নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিনির্মাণে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পুনর্গঠন ও সংহত করা এখন সময়ের দাবী। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে না ওঠায় বাংলাদেশে “নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র” আরো চেপে বসেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম আপাততঃ ক্লান্ত ও অবসন্ন। তাই আন্দোলন সংগ্রামে দেখা দিয়েছে বিরতি।

সেই সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমীক্ষা। উদ্দেশ্য আন্দোলন সংগ্রামের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে যথাশীঘ্র এর পুনর্যাত্রা। ইতোমধ্যে আমরা পর্যালোচনা করতে পারি বাঙালি মুসলমানের কোন কোন মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ একটি শক্তিমান ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

 ইসলাম

প্রথম যে মৌলিক ভাবাদর্শটি নিয়ে এই ডিসকোর্সের সূচনা করা যেতে পারে সেটি হল ইসলাম। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলধারার মৌলিক উপাদান হিসেবে ইসলাম কেন অপরিহার্য? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে খুঁজতে হবে।

বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী প্রান্তিক ও ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি। প্রান্তিক  ও ক্ষয়িষ্ণু বলছি এই কারণে যে এই ভাবাদর্শগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইসলামী আত্মপরিচয়কে গৌণ করে তোলে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ইসলামের ভূমিকাকে সীমিত করে রাখতে চায়। ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন ধর্মাচার পালন ও কেবলমাত্র অল্পকিছু  ধর্মীয় সামাজিক পার্বণ পালনের মধ্যেই এই ইসলাম সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ইসলামের এই খণ্ডিত ভূমিকা ও চর্চাকে সমর্থন করে না।

তাই বাঙালি মুসলমানের মূলধারা বা মধ্যধারার (Centrist and Normatic) রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে যারা ধারণ ও লালন করতে চাইবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশে ইসলামের অধিকতর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে  তুলতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তা, শিল্প-সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও প্রচার-প্রচারণার বিপরীতে বাঙালি মুসলমানের প্রবল মধ্যধারার বাংলাদেশী এবং/অথবা ইসলামী সৃজনশীলতার চর্চা ও প্রচারযজ্ঞ বিনির্মাণ ও লালন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে এই আন্দোলন একটি দীর্ঘমেয়াদী ভাবাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যা শুধুমাত্র ইস্যুভিত্তিক বা এডহক নয় । এটা যেন শুধুমাত্র রিএকটিভ বা প্রতিক্রিয়ামূলক লড়াই না হয়ে যায়। একে হতে হবে প্রোএকটিভ বা স্বতো:প্রণোদিত, ইতিবাচক এবং সৃজনশীল।

বাঙালি মুসলমানের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে কেন ইসলামকে একটি বড় অবস্থান দিতে হবে? এর উত্তর হল — বঙ্গীয় ইসলামের সমন্বয়বাদী প্রবণতা এবং আধুনিক ও প্রগতিবাদী ইউরোপীয় এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্সের প্রভাবে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ প্রান্তিক ও অবক্ষয়ী হয়ে উঠছে। এর কারণ হল — একদিকে প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে উত্তর-উপনিবেশিক ইসলামী সর্বাত্মকবাদী (Totalitarian) আন্দোলনের প্রভাব; এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সাম্প্রতিক উত্তর-আধুনিক ডিসকোর্সের আঘাতে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ও এর বঙ্গীয় সংস্করণ রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্স দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এর উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমাগত ক্ষয় ও অবশেষে লয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এখন আমরা দেখব কেন ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে বিপরীত স্রোতের প্রভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ তার শক্তিমান অবস্থান হারাচ্ছে। আর কিভাবে সেই শূন্যস্থান পূরণে সর্বাত্মকবাদী ইসলামী সংস্কৃতি ক্রমশঃ অগ্রসর হচ্ছে।

আমরা ইদানীং দেখছি যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি প্রায়শঃই বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ায় তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন কথিত “আবহমান” বাঙালি সংস্কৃতির আচার অনুষ্ঠানে যখন এমন কিছু জীবনাচার ও চর্চাকে উপস্থাপিত করা হয়, যার ভেতরে বি’দাত ও শিরকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লক্ষণ ফুটে ওঠে, তখন বাঙালি মুসলমান তাকে আর আগের মত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না । উদাহরণ হিসেবে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আলোকমালা ও অগ্নিশিখার প্রতি সমর্পণের বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উপাচার, অবনত ভঙ্গিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, মানব আকৃতি সদৃশ ভাস্কর্যে অবনত ভঙ্গিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন, ইত্যাদি। আধুনিক, নাগরিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি মুসলমান দেশীয় সংস্কৃতির এইসব আচার আচরণকে “আবহমান” কাল থেকে প্রচলিত বলে যথেষ্ট বিচার বিবেচনা ছাড়াই অতি উৎসাহের সঙ্গে ধারণ ও লালন করে চলেছে। অথচ বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান এইসব আচার আচরণকে বিচ্যুতি বলে মনে করছে। ফলে বৃহত্তর বাঙালি মুসলমানের বিবর্তনশীল মূল বা মধ্যধারার সংস্কৃতির সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ ও সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নাগরিক শ্রেণী ও গরিষ্ঠ লোকায়ত এবং তৌহিদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা দিচ্ছে বিভক্তি ও মেরুকরণ। রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে দেখা দিচ্ছে ব্যাপক সংঘাত, সংঘর্ষ, নৈরাজ্য ও সহিংসতা। এই বয়ানের সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ও তার বিপরীতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান।

কেন এমনটি ঘটছে? বিগত শতকের ষাট ও সত্তর দশক পর্যন্তও তো আমরা দেখেছি “আবহমান” সমন্বয়বাদী বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির জয় জয়কার। তাহলে ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় কি এমন পরিবর্তন ঘটল যে আমরা একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পালাবদলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

এর উত্তর খুঁজে পাবার জন্য আসুন আমরা বঙ্গের মধ্যযুগের ইতিহাসের একটি পর্বকে পাঠ ও বয়ান করি।

মধ্যযুগের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির মত বীর ও সূর্যসৈনিক এই জনপদে ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির বীজ বপন করেছিলেন। শাহ জালালের মত সূফি সাধক এই সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক অনুসঙ্গের আবাদ করেছেন এই অঞ্চলের উত্তর পূর্বে বসবাসকারী মানব মনের গহীন প্রান্তরে। খান জাহানের মত সূফি সাধক ও বিষ্ময়কর জনপদ-নির্মাতা সেই একই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিকে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলবর্তী বঙ্গীয় বদ্বীপের গহীন অরণ্যে বসবাসকারী সভ্যতা-বঞ্চিত প্রান্তিক মানব মনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যার ভাবাদর্শিক ও সাহিত্যিক রূপায়নে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গের কবি সৈয়দ সুলতান রচনা করেছিলেন “মুসলিম জাতীয় মহাকাব্য” স্বরূপ নবী বংশ । এই মহাকাব্য রচনার মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বৈদিক, বৈষ্ণব, শৈব এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে তুলনামূলক ডিসকোর্সের অবতারণা করে ইসলামী ভাবাদর্শ ও সংস্কৃতিকে বাঙালি মুসলমানের জীবনে গ্রথিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শহীদ তিতুমীর এই ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির সুরক্ষায় স্থানীয় প্রকৃতিজাত উপাদান দিয়ে বাঁশেরকেল্লা গঠন করে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি এই রাজনীতি ও সংস্কৃতির আলোকে বাঙালি মুসলমান কৃষিজীবীদের ইংরেজ ও জমিদার বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হাজী শরীয়তউল্লাহ এবং কারামত আলী এই সংস্কৃতিকেই অবক্ষয় ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার জন্য লৌকিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গের এই দক্ষিণ পূর্ব গাঙ্গেয় বদ্বীপে। এই অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানের লৌকিক জীবন, জীবিকা, জীবনাচার ও জীবনদর্শনে এভাবে গভীরভাবে গ্রথিত হয়ে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে নিজস্ব (Owned), ভূমিজ (Organic), মর্মধারিত (Internalized), আত্মীকৃত (Assimilated) ও অকৃত্রিম।

মধ্যযুগে বা প্রাক-উপনিবেশিক যুগে বঙ্গে সূচিত বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ও সংস্কৃতির এই মিথষ্ক্রিয়া ও রূপান্তর নিয়ে মেলফোর্ড স্পাইরো (Melford Spiro), জে ডি ওয়াই পীল (J D Y Peel), ইগর কপিটফ (Igor Kopitoff) প্রমুখ নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার ওপরে ভিত্তি করে পূর্ব বঙ্গের গহীন গাঙ্গেয় বদ্বীপে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ইসলামীকরণ সম্পর্কে মার্কিন ইতিহাস গবেষক রিচার্ড ঈটন (Richard M Eaton) একটি যুগান্তকারী ও ইতিহাসের গতি নির্ণায়ক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মান্তরের প্রচলিত ধ্রুপদী ডিসকোর্সকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বঙ্গের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া সম্পর্কে একটি তিন-পর্ব বিশিষ্ট প্রক্রিয়া, যা সুদীর্ঘ কাল ধরে ক্রিয়াশীল ও চলিষ্ণু থাকে, সেটি প্রতিপাদন করেছেন তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থে। আসুন আমরা এবারে দেখি যে এই তত্ত্বটি আমাদেরকে কিভাবে বুঝতে সাহায্য করে যে বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলাম বিবর্তিত হয়ে ক্রমাগত একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পরিণতির ফল হল সমন্বয়ী প্রবণতা ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী প্রবণতা ক্রমাগত মুখ্য হয়ে উঠছে।

ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বকে রিচার্ড ঈটন বলেছেন ইনক্লুশন (Inclusion) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত  ধর্ম ও ভাবাদর্শ  পাশাপাশি অবস্থান করে নিজেদের অবিকল অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই পর্বে দেশী ও বিদেশী অনুসঙ্গগুলো পরস্পর কোনোরূপ বিনিময়ে অংশ নেয় না। দ্বিতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন আইডেন্টিফিকেশন (Identification) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ পারস্পরিক বিনিময়ে অংশ নিয়ে একে অপরের ভেতরে সদৃশ অনুসঙ্গগুলোকে চিহ্নিত করে। আর তৃতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ডিসপ্লেসমেন্ট (Displacement) — যখন বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ স্থানীয় ধর্ম ও ভাবাদর্শের অবশেষগুলোকে ক্রমাগত অপসারণ করতে থাকে। এই তত্ত্বটি স্পষ্ট করার জন্য রিচার্ড ঈটনের লেখা গ্রন্থ থেকে এই উদ্ধৃতি ও ডায়াগ্রামটি এখানে উপস্থাপন করছিঃ

The term conversion is perhaps misleading when applied to this process, since it ordinarily connotes a sudden and total transformation in which a prior religious identity is wholly rejected and replaced by a new one. In reality, in Bengal, … … …, the process of Islamization as a social phenomenon proceeded so gradually as to be nearly imperceptible.

… … …, one may discern three analytically distinct aspects to the process, each referring to a different relationship between Islamic and Indian superhuman agencies. One of these I’m calling inclusion; a second, identification; and a third, displacement. By inclusion is meant the process by which Islamic superhuman agencies became accepted in local Bengali cosmologies alongside local divinities already embedded therein. By identification is meant the process by which Islamic superhuman agencies ceased merely to coexist alongside Bengali agencies, but actually merged with them, as when the Arabic name Allah was used interchangeably with the Sanskrit Niranjan. And finally, by displacement is meant the process by which the names of Islamic superhuman agencies replaced those of other divinities in local cosmologies. The three terms inclusion, identification, and displacement are of course only heuristic categories, proposed in an attempt to organize and grasp intellectually what was on the ground a very complex and fluid process. (Richard M Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier 1204 – 1760, University of California, Berkeley, 1993)

মধ্যযুগ থেকে সূচিত হয়ে ইসলামের এই বিবর্তন প্রক্রিয়া আজ অবধি ক্রিয়াশীল ও চলমান। ইতিহাসের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী চলমান এই মিথষ্ক্রিয়া বর্তমান সময়ে এর তৃতীয় পর্যায় অতিক্রম করছে।এই পর্যায়ে এসে উনিশ ও বিশ শতকের ইসলামী সংস্কারবাদী (Reformist), পুনরুজ্জীবনবাদী (Revivalist) ও পবিত্রকরণবাদী (Puritanical) বিভিন্ন আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশে এযাবৎ  প্রবল সমন্বয়বাদী (Syncretistic) বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে শুদ্ধতাবাদী (Orthodox) ও কিতাবসম্মত (Scriptural) বা টেক্সটসম্মত (Textual) রূপ পরিগ্রহ করছে। একুশ শতকের সূচনাকে আমরা এই বিবর্তনের একটি টিপিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। কাগজ, স্বাক্ষরতা ও শিক্ষার ব্যাপ্তি, মুদ্রণযন্ত্রের কল্যাণে বই পত্রের ব্যাপক সহজলভ্যতা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আর্থিক উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে বাঙালি মুসলমান প্রবাসী সম্প্রদায়ের উদ্ভব, উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অথবা ভ্রমণ ও পর্যটন উদ্দেশ্যে দেশ বিদেশে গমন; রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ইত্যাদি বাঙালি মুসলমানের গাঙ্গেয় বদ্বীপে গন্ডীবদ্ধ কৃষিনির্ভর জীবনাচারে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই সার্বিক পরিবর্তনের ফলে বাঙালি মুসলমানের ইসলামী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন আজ এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে গতিময় ও সর্বাত্মকবাদী হয়ে একটি বৈশ্বিক মাত্রায় পৌঁছেছে। কাজেই বাঙালি মুসলমান তার বাংলা ভাষা ও ইসলাম ধর্ম দিয়ে গড়া বাংলাদেশী রাজনীতি ও সংস্কৃতি দিয়ে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে যে তুরীয় (Transcendental) উচ্চতায় স্থাপন করবে এতে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

২। গণতন্ত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারাকে শক্তিমান করে গড়ে তোলার জন্য যে মুলনীতিটি অপরিহার্য সেটি হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি পাশ্চাত্য ধারণা। আধুনিক ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ডিসকোর্সের একটি অনুসঙ্গ এই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও পথচলার সূচনা এই অঞ্চলে ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার অনুসঙ্গ হিসেবে। উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হবার পর এই অঞ্চলের জনগণ গণতন্ত্রের আদর্শকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবেও অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল গণতন্ত্রের আকাঙ্খা। কিন্তু লিবারেল গণতন্ত্র বিনির্মাণে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি।

প্রাতিষ্ঠানিক, কার্যকর ও অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। তবে গণতন্ত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমষ্টির আস্থা অটুট রয়েছে। বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে একদিকে যেমন ইসলামের প্রতিফলন দেখতে চায়, তেমনি অন্যদিকে তারা গণতন্ত্রকেও একটি শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায়।

গণতন্ত্র ও ইসলামের মধ্যে কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে বলে তারা মনে করে না। ইসলামের যে প্রান্তিক ডিসকোর্সটি ইসলামী রাষ্ট্র বিনির্মাণে গণতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে, বা গৌণ করে, বা প্রতিবন্ধক বলে মনে করে, বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর অংশ তা সমর্থন করে বলে মনে হয় না। সুতরাং ইসলামী ও গণতান্ত্রিক — উভয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের মেলবন্ধনেই রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার চাবিকাঠি।

গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র হয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের কিছু সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্ঠার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যে অপচেষ্টা বারবার দেখা দিয়েছে তা বর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। নেতৃত্ব নির্বাচনেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও রীতি-নীতি মেনে চলতে হবে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে।

৩। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব গণতন্ত্রের মৌল ধারণার দুটি অনুসঙ্গ। অন্যকথায় গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যেই অনিবার্যভাবে এই দুটি প্রত্যয় উপস্থিত রয়েছে। তবুও এই দুটি রাজনৈতিক প্রত্যয়কে এখানে তৃতীয় মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত দ্বারা তিনদিক থেকে বেষ্টিত, সেহেতু এই দুটি প্রত্যয় বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য রক্ষাকবচ। ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতরে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনাকে সদা প্রবহমান রাখতে হবে।

বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বিভিন্ন মাত্রার অসমতা ও বিরোধ রয়েছে। সেগুলোতে ভারসাম্য ও পারস্পরিক মর্যাদা স্থাপন করার জন্য চীন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নানামাত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করতে হবে। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও ইরান – মুসলিম বিশ্বের এই কয়েকটি প্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিনিময়ের ব্যাপক কর্মসূচি নিয়মিতভাবে আয়োজন ও পালন করতে হবে। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও প্রভাব এভাবে মোকাবেলা করে বাংলাদেশে শক্তিমান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাতে হবে।

৪। ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী

চতুর্থ মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আরো দুটি প্রত্যয় – ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা জরুরী। সমাজে শ্রেণী বৈষম্য আছে ও থাকবে। কিন্তু ইনসাফ কায়েম করতে পারলে এই শ্রেণী বৈষম্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্ভব হবে। সমাজে অন্যায় মেরুকরণ প্রশমিত হবে এবং সংঘাত ও সহিংসতা থেকে সমাজ মুক্ত থাকতে পারবে। সমাজে এই ইনসাফ কায়েম করতে হলে মজলুম শ্রেণীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য ও মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে ব্যাপক জনসমর্থন পেতে হলে কেবলমাত্র উপরিতলের ইস্যু থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মজলুম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে সমাজে ও রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল ও নেতৃত্ব দিতে হবে।

এই লেখায় আগামী দিনের বাংলাদেশে মূলধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভাবাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কয়েকটি মূলনীতি উপস্থাপন করা হয়েছে। সবগুলো মূলনীতির বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হয়নি সময় ও স্থান স্বল্পতার কারণে। পাঠকের মনোযোগ ও ধৈর্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে। প্রথম মূলনীতিটিকে অনুপুঙ্খ আলোচনার মাধ্যমে অনেকটা মূর্ত ও খোলাসা করা হয়েছে। প্রথম মূলনীতির শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী পাঠ ও ভাষ্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের যে ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা তাই প্রকৃতপক্ষে এই রচনার মৌলিক অবদান বলে আমাদের বিশ্বাস। অন্যান্য মূলনীতিগুলোকে সংক্ষিপ্তাকারে ও বিমূর্তভাবে এখানে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। এটি সত্য যে এই প্রচলিত প্রত্যয়গুলির এইসময় উপযোগী বয়ান অনেক প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে অবশিষ্ট প্রতিটি প্রত্যয় নিয়ে আলাদাভাবে বিস্তারিত দিকনির্দেশনামূলক লেখার ইচ্ছে আছে। তবে ইতোমধ্যে এই মূর্ত ও বিমূর্ত প্রত্যয়গুলি থেকে মূর্ত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিগঠন করা সম্ভব হতে পারে বলে আমাদের অকুণ্ঠ বিশ্বাস।

The dark anarchy rises … Bakshal returns with its hallmark anarchy …

police 1

The abuse of the judiciary and law enforcement agencies have been persistent, since the birth of Bangladesh, very true. Almost all regimes have abused their power in persecuting the opponents in varying degrees (And I guess this practice isn’t endemic to Bangladesh only, many countries with similar socio-political stature face the same phenomena)

However, some interesting and noteworthy aberrations during the past (and present thanks to a farcical election) government’s regime include the arrest and continued incarceration of high profile opposition leaders. At least 25 leaders of the topmost leadership of the opposition party is currently in jail. Starting from the secretary general to the common ward committee members of the main opposition parties have been constantly being subjected to police harassment and sentences. Cases against them include farces like burning of garbage trucks, stealing trivial things from anonymous people etc. Despite the High court rulings that set very strict standards for obtaining remand, police and the lower judiciary are seen abusing those standards and are granted remands. More and more opposition leaders are denied bails. For unknown reasons, eminent people are being kept in prison without granting bails. The list includes newspaper editors, human rights activists, online activists and people from the academia as well.

04_Khaleda%20Zia's%20House_291213

Many opposition leaders are getting arrested just as they voice their demand in public, being shown arrested in previous cases, which are in most cases of absolutely no merit . As a result an atmosphere of fear has been created, an all out police state is being implemented. Many leaders are afraid of coming out in public. Let alone the grass roots level activists who are seldom spending the nights at their own places. And not only that, police are arresting other family members of the leaders family too, including female members. The houses are being ransacked, in some cases bulldozed. There are also reports of the combined forces looting valuables from the households form the opposition activists. In some cases mass arrests are leading upto bribes, and people are being freed based on the amount of bribe being given to police. The already overcapacity prisons are getting are even more crowded by thsese wholesale arrests. There was an instance of arresting 200 topmost leaders of the opposition en mass from their party office, over a case of cocktails been found in their party office premises.

All this harsh treatment meted out to the opposition has an even more harsher underlying subtext . It is true that the prisons have been over capacity for years. But, how are these new prisoners being accommodated ? There lies the more shocking tale. Many convicts are let go by the government. The list includes top terror crime bosses, sentenced ruling party thugs, known drug peddlers, known petty criminals. Some of these criminals are let go on the promise of staying in the field alongside ruling party activists to thwart any political movement of the opposition. Many newspaper reports an increase in the supply of guns in the recent months. Before every other election, their was a strong drive to recover illegal weapons by the previous election time caretaker governments. This time the political government totally shied away from that drive. And a servile Election Commission didn’t push for it either. They even published a farcical decree to not even submit the weapons, insisting only not to carry it !!.

So, spreading the blame equally across the board seems to do injustice to the prominent role this quasi fascist regime, elected through pseudo-elections, is playing in completely decimating the rule of law. The abuse of power to persecute opposition coupled with a flagrant disregard for the rule of law under the current regime is simply shocking and is plainly reminding of the anarchy of the mid seventies.

টেলিভিশনের সাম্প্রতিক টক শো গুলোতে উপস্থাপিত বিভিন্ন চিন্তাধারা বা ডিসকোর্স

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

images

গত প্রায় এক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো গুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র উত্থানের সময় থেকে এর শুরু। আর গত ৫ জানুয়ারীর সংসদ নির্বাচনের পটভূমিতে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক আন্দোলন চলেছে তার বিভিন্ন রকমের বয়ানের মধ্য দিয়ে এই টক শো গুলো দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে সম্প্রতি ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সামাজিক মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তারের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে।

সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স বা চিন্তাধারাগুলো এই টক শো গুলোতে নানা ভাবে উঠে এসেছে। সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয়

আইন-কানুনের বিভিন্নমুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও ভাষ্যে এই টক শো গুলো মুখর হয়ে উঠেছে। সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন চিন্তা-প্রণালী বা ডিসকোর্সের প্রতিফলন ঘটিয়ে নানান তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই টক শো গুলো।

টক অব দ্য টাউন এই টক শো গুলো এভাবে আমাদের জনমানসের চেতন ও অবচেতনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কাজেই আমরা এই টক শো গুলোকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখতে পারি না। এগুলো কীভাবে আমাদের সামষ্টিক মনঃস্তত্ত্বে এর নানাবিধ ছায়া-প্রচ্ছায়া ফেলছে তার একটি অনুসন্ধান আমাদের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

প্রথম পর্যায়ে আমরা এই টক শো গুলোতে উপস্থাপিত ডিসকোর্স বা চিন্তাধারা গুলোকে আমাদের বোঝার সুবিধার্থে বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় শ্রেণীবিন্যাস করতে পারি। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি শাখা প্রশাখার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ উন্মোচন করতে পারি। তৃতীয় পর্যায়ে শাখা প্রশাখা গুলোর পারস্পরিক মিল ও অমিল গুলো তুলনা করতে পারি। চতুর্থ পর্যায়ে শাখা প্রশাখা গুলোকে বিভিন্ন মানদন্ডে মূল্যায়ন ও বিচার করে কোনগুলো বেশি যৌক্তিক, সঙ্গতিপূর্ন এবং কল্যাণকর তা নির্ধারণ করতে পারি।

টক শো গুলোর এই চিন্তাধারা গুলোকে প্রথমে আমরা মোটা দাগে দু’টি শাখায় ভাগ করতে পারি। এটা আমরা করতে পারি কেবলমাত্র এগুলোকে বোঝার সুবিধার জন্য। মনে রাখতে হবে যে এই শ্রেণীবিভাগ যেন কোনোভাবে অতিসরলীকরণ হয়ে না যায়। কারণ অতিসরলীকরণ বিষয়ের বহুত্ব ও জটিলতাকে অনেক ক্ষেত্রে তরল করে পানসে করে ফেলে। তো সেই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থেকে টক শো গুলোর চিন্তাধারা গুলোকে আমরা মোটা দাগে আওয়ামী-লীগ-সরকার-সমর্থক ও আওয়ামী-লীগ-সরকার-বিরোধী – এই দু’ভাগে ভাগ করে দেখতে পারি।

আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থক ডিসকোর্স বা চিন্তাধারা – এই শাখা ডিসকোর্সটির দু’টি প্রশাখা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি।

  • প্রথম প্রশাখা ডিসকোর্সটি অনেকটা এরকম – বাংলাদেশকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র আলোকে বিনির্মাণ করতে হবে। এজন্য ১৯৭২ এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। ১৯৭১ সালে জামায়াত যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল; গণহত্যা, মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতা করেছিল; সেহেতু এদের বিচার এই মুহূর্তে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে এটাই প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এই পর্যায়ে গৌণ হয়ে গেছে।

হাসানুল হক ইনু, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, মোহাম্মদ আরাফাত থেকে শুরু করে আবেদ খান, শ্যামল দত্ত, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল প্রমুখ এই ডিসকোর্সের ধারক ও বাহক। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র এই বয়ানকারীরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ’ শক্তির দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখান। এমনকি পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধে পরিণত হতে পারে বলে প্রায়ই তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। আসলে একথা বলে তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশেষ করে জামায়াতকে ‘নির্মূল’ করতে চান। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ বিএনপির সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতায় এঁরা বিশ্বাসী নন। সংলাপের পূর্বশর্ত হিসেবে এঁরা বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতায় এঁরা আসলে ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকতে চান। তাই এঁরা আসলে চরমপন্থী ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী’ বা ফ্যাসিবাদী।

  • আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থক ডিসকোর্সের দ্বিতীয় প্রশাখাটি হল এরকম – ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’য় বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। এ কারণে ১৯৭২ এর সংবিধানে ফেরত যেতে হবে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে কোনো আপোষ হবে না। জামায়াতের বিচার, শাস্তি ও নিষিদ্ধকরণে সোচ্চার ও আপোষহীন থাকতে হবে। তবে গণতন্ত্রের স্বার্থে সুষ্ঠ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নে কোনোরকম পূর্বশর্ত ছাড়াই সংলাপ ও সমঝোতা করা যেতে পারে। আর এখানেই এই নরমপন্থী বা মধ্যপন্থী ডিসকোর্সটি প্রথম চরমপন্থী ডিসকোর্স থেকে আলাদা। ড. আকবর আলী খান, সুলতানা কামাল, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ এই চিন্তা প্রশাখার প্রবল প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

যারা বাংলাদেশের ‘সুশীল সমাজে’র নেতৃস্থানীয় মুখপাত্র – যেমন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, মাহফুজ আনাম প্রমুখেরাও মূলত এই দ্বিতীয় নরমপন্থী বা মধ্যপন্থী চিন্তা প্রশাখার অনুসারী। যদিও তাঁরা নিজেদেরকে একধরণের উন্নাসিক ‘নিরপেক্ষতা’র আবরণে আবৃত রাখতে পছন্দ করেন।

আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ডিসকোর্স বা চিন্তাধারা – এই শাখা ডিসকোর্সটির তিনটি প্রশাখা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হল।

  • আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ডিসকোর্স বা চিন্তাধারার দ্বিতীয় প্রশাখাটি লক্ষ করা যায় ড. পিয়াস করিম, ড. আসিফ নজরুল, সাদেক খান, মাহফুজউল্লাহ প্রপ্রথম প্রশাখা ডিসকোর্সটি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র প্রচলিত বয়ানকে অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বলে বিবেচনা করে থাকে। যেমন ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ – এই দু’টি জাতীয় মূলনীতি সম্পর্কে এই ডিসকোর্সের রয়েছে দার্শনিক ও আদর্শিক মতভেদ। এই জাতীয় মূলনীতি দুটিকে প্রতিস্থাপন করার জন্য এঁদের রয়েছে নিজস্ব উচ্চায়ত ও শ্রেয়তর চেতনা।

এঁরা বলে থাকেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মধ্যযুগের ধর্মান্তরের ইতিহাস, সেইসঙ্গে এদেশের ভৌগোলিক সীমানা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাকে নগণ্য করে যে অসম্পূর্ণ ও একপাক্ষিক বাঙালি জাতীয়তার চেতনা উপস্থাপন করেছে তা সর্বজনগ্রাহ্য ‘জাতীয়’ চেতনা হতে পারেনি। এঁরা মনে করেন যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয় চেতনা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে এঁরা মনে করেন যে দীর্ঘ ধর্মান্তরকরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইসলাম এই জনপদে এসেছে ও এখানে এর মূল প্রোথিত করেছে। সেই ইসলামের জাতি ও রাষ্ট্র গঠনমূলক চেতনা ধারণ করলে তা সর্বগ্রাহী হয়ে অসাম্প্রদায়িক ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চেতনায় পরিণতি পেতে পারে।

এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধারণা একটি ফিরিঙ্গি ধারণা বলে এঁরা মনে করেন। জাতীয় মনঃস্তত্ত্বে উপনিবেশ যুগের যেসব অবশেষ চেতন ও অবচেতনে রয়ে গেছে তার একটি হল এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’।

মুসলিম ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা এই জনপদে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে ধর্মের নৈতিক ও আদর্শিক ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক হওয়ায় এখানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ একটি বৈরী মতাদর্শ।

আধুনিক ইউরোপে চার্চ ও রাষ্ট্রকে আলাদা করতে হয়েছিল চার্চের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাবার জন্যে। এছাড়া খ্রিস্টান ধর্মে সিজারের জগত ও ক্ষমতাকে ঈশ্বরের জগত ও ক্ষমতা থেকে যিশু নিজেই আলাদা করে দিয়েছিলেন। ফলে খ্রিষ্টধর্ম প্রধান ইউরোপে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র জন্য একটি সহায়ক ও উপযোগী পরিবেশ বিরাজমান ছিল। অন্যদিকে মুসলিম ঐতিহ্যে ইসলামের ভূমিকা প্রথম থেকেই সর্বব্যাপী ও অখন্ডনীয়। এই কারণে ইসলামকে ইউরোপের আদলে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রেখে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হলে তা জাতীয় চেতনায় সর্বনাশা শূন্যতার সৃষ্টি করে। জাতি ও রাষ্ট্রের নৈতিক পতন ও স্খলন ডেকে আনে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের নৈতিক উৎকর্ষের উৎস ও প্রেরণা হিসেবে ইসলাম ধর্মের সর্বোচ্চ অবস্থান ও ভূমিকা মুসলিম ঐতিহ্যে স্বর্ণালী অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি অনন্য সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় চেতনায় ইসলামের সেই একই গৌরবজনক ভূমিকা আবারো সম্ভব ও অতীব কাম্য। এছাড়া ইসলাম অন্তর্নিহিতভাবে অসাম্প্রদায়িক হওয়ায় অন্যান্য ধর্ম ও জাতিসত্ত্বার অনুসারীদের অধিকার এখানে সমমর্যাদায় স্বীকৃত।

এসব বিবেচনায় ১৯৭২ এর সংবিধান মূল্যায়নে এই চিন্তাধারা একে গণ-আকাঙ্খা পরিপন্থী বলে মনে করে থাকে। চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার এই চিন্তাধারা বা ডিসকোর্সের প্রধান প্রবক্তা হয়ে উঠেছেন। টেলিভিশন টক শো গুলোতে এই ডিসকোর্সটিই প্রধান প্রতিষ্ঠান বিরোধী ও বিপ্লবী ডিসকোর্স। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষমতা ও চেতনা কাঠামোকে আমূল রূপান্তরে বিশ্বাসী এই বিপ্লবী ডিসকোর্সটিকে টেলিভিশন টক শো প্রথম পর্যায়ে কিছুটা সহ্য করলেও বর্তমানে তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ। কেননা এই চিন্তাধারায় জামায়াতের যুদ্ধবিরোধীতার সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ বিচার যেমন প্রত্যাশিত, তেমনি বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইসলামপন্থী রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক ভূমিকা ও গুরুত্ব-ও যথাযথভাবে স্বীকৃত।

বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি সমাবেশের পটভূমিতে এই ডিসকোর্স বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে অনেক বেশী কার্যকর ও ফলপ্রসু হতে পারে বলে উপস্থাপিত হয়। ড. শাহীদুজ্জামান-ও ইদানীং এই ডিসকোর্সের একজন শক্তিমান মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। তিনিও ইসলামপন্থী দল ও মত নিয়ে কোনো শুচিবাই পোষন করেন না। বাস্তবতার নিরিখে ইসলামপন্থীদের অবস্থান ও ভূমিকাকে বিবেচনা ও মূল্যায়নে তিনি মুক্তমনা ও উদার।

  • আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ডিসকোর্স বা চিন্তাধারার দ্বিতীয় প্রশাখাটি লক্ষ করা যায় ড. পিয়াস করিম, ড. আসিফ নজরুল, সাদেক খান, মাহফুজউল্লাহ প্রমুখের বিশ্লেষণ ও বয়ানে। ফরহাদ মজহারের চিন্তাধারার অনেক উপাদান এঁদের মধ্যে দেখা গেলেও, এঁরা উদার গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ও ভূমিকায় অনেক বেশী আস্থাবান। নিয়মতান্ত্রিক, সাংবিধানিক আইনী কাঠামোর মধ্যেই এঁরা ভবিষ্যত বাংলাদেশকে প্রধানত দেখতে চান। তাই এঁদেরকে শেষ বিচারে সংস্কারপন্থী বা মধ্যপন্থী বলা যায়। বিপ্লবী বা আমূল পরিবর্তনপন্থী এঁরা নন। সেই বিচারে এঁরা হয়তোবা মূলধারার মুখপাত্র। তাই এঁরা বৃহত্তর সমাজে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য ও সহনীয়। এবং এই কারণে উপরোক্ত বিপ্লবী ডিসকোর্সের চাইতে এঁদের নরমপন্থী বা মধ্যপন্থী ডিসকোর্স টেলিভিশন টক শো গুলোতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী স্থান পায়।

  • এবার আলোচনা করবো এই ধারার তৃতীয় প্রশাখাটি নিয়ে। এই প্রশাখার ধারক ও বাহক নূরুল কবির টেলিভিশন টক শো-র একজন অনন্য তারকা হয়ে উঠেছেন। তাঁকে উপরে উল্লেখিত কোনো শাখা প্রশাখাতেই সম্পূর্ণভাবে বিরাজ করতে দেখা যায় না। তিনি এবং আনু মুহাম্মদ হয়তোবা এখনো ক্লাসিকাল কমিউনিস্ট। তবে এঁরা সিপিবি বা বাসদ মার্কা বামপন্থী, যেমন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বা খালেকুজ্জামান ভূইয়া-দের চেয়ে অনেকাংশে ভিন্ন প্রকৃতির। সেলিম বা ভূইয়া-রা শেষ পর্যন্ত জামায়াত বিরোধীতার জোশে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে যান। জামায়াত বিরোধীতায় নূরুল কবির ও আনু মুহাম্মদ-ও সোচ্চার ও আপোষহীন। তবে এটা করতে গিয়ে তাঁরা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মিশে যান না। এখানেই তাঁরা অন্য সবার চাইতে আলাদা। এছাড়া নূরুল কবির ‘সুশীল সমাজ’ ও সেনা-সমর্থিত এক এগারো সরকারের-ও ঘোর সমালোচক ছিলেন। আর আনু মুহাম্মদ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তাঁর চিন্তা ও মতাদর্শের প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। এই দিক দিয়ে তাঁর চিন্তা ও কাজের মধ্যে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। তবে নূরুল কবিরের সর্বব্যাপী সমালোচনা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সর্বদা স্পষ্ট নয়। তাঁর সর্বব্যাপী প্রতিষ্ঠান বিরোধী সমালোচনার পাশাপাশি তিনি যদি তাঁর ইতিবাচক চিন্তার রূপরেখাটি উপস্থাপন করেন তাহলে তাঁর ভক্তেরা আরও ভালো করে তাঁকে বুঝতে ও অনুসরণ করতে পারবে।

টেলিভিশনের টক শো গুলোতে যেসব ডিসকোর্স সম্প্রতি আমরা লক্ষ করছি সেগুলোর শ্রেণীবিন্যাস ও অনুধাবনে এই প্রাথমিক প্রচেষ্টাটি নিবেদিত হল। এটি সম্পূর্ণভাবে করা গেছে, বা সকল চিন্তাধারা বা ডিসকোর্স গুলোকে এখানে চিহ্নিত করা গেছে – সেই দাবী নিশ্চয়ই করা ঠিক হবে না। তবে এই পদ্ধতিগত শ্রেণীকরণ ও মূল্যায়নের ধারাটি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। আরো অনেকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। কারণ আমাদের জনমানস ও সামষ্টিক মনঃস্তত্ত্ব গঠনে ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সামাজিক মিডিয়ার এই ডিসকোর্স গুলোর রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ও অপরিসীম ভূমিকা।


লেখক পরিচিতিঃ মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত। ঢাকার ইংরেজী মাধ্যম স্কুল স্কলাসটিকায় কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তাঁর ইংরেজী ভাষায় রচিত ‘ডিসকভারিং বাংলাদেশ’ নামক একটি বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়ক গ্রন্থমালা বিভিন্ন ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে প্রচলিত। তিনি সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতির একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক।

ই-মেইলঃ manwar.shamsi@gmail.com

অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর আর অতি বড় সুন্দরী না পায় বর

by আতাহার হোসাইন
দীনের অতি বিশ্লেষণ করে দীনের প্রাণশক্তি বিনষ্ট করে দেওয়ার কাজটা নতুন নয়. আমাদের পণ্ডিতরাই শুধু এ কাজ করেন নি। পূর্ববর্ত্তী দীনগুলোতেও অতি-ধার্মিকরা গজিয়েছেন ও পাণ্ডিত্য জাহির করে তাদের দীনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন তার নবী মূসার (আ) জীবনী থেকে যেখানে আল্লাহ বনী ইসরাইলদের একটি গরু কোর’বানী করতে আদেশ দিলেন। মূসা (আ) যখন এই কোর’বানীর আদেশ বনী ইসরাইলদের জানিয়ে দিলেন তখন যদি তারা মোটামুটি ভাল একটি গরু এনে কোর’বানী করে দিতো তাহলে তাতেই কাজ হয়ে যেতো। কারণ কোরবানীর গরুটা কেমন হবে সে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন শর্ত্ত দেন নি। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে বলছেন- বনী ইসরাইল তা করে নি। তারা মুসার (আ) মাধ্যমে আল্লাহকে প্রশ্ন করতে লাগলো- গরুটার বয়স কত হবে, গায়ের রং কি হবে, সেটা জমি চাষের জন্য শিক্ষিত কিনা, জমিতে পানি দেয়ার জন্য শিক্ষিত কিনা, ওটার গায়ে কোন খুঁত থাকতে পারবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা প্রশ্ন করে যেতে লাগলো আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। তারপর যখন প্রশ্ন করার মত আর কিছুই রইলো না তখন স্বভাবতঃই ঠিক অমন একটি গরু পাওয়া দূরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একটা সহজ সরল আদেশ- “একটা গরু কোরবানী কর” এটাকে খুচিয়ে খুচিয়ে এমন কঠিন করে ফেলা হলো যে, অমন গরু আর পাওয়া যায় না। এই জাতির মহা পণ্ডিতরাও বিশ্বনবীর (দ) ওফাতের ৬০/৭০ বছর পর ঠিক ঐ কাজটাই মহা ধুমধামের সাথে আরম্ভ করলেন। দু’টি মাত্র আদেশ- আমাকে ছাড়া কাউকে মানবে না আমার দেয়া জীবন-বিধান ছাড়া আর কোন বিধান মানবে না, আর এই জীবন-বিধানকে সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করবে। সহজ, সরল দু’টি আদেশ। বিশ্বনবীর (দ) উম্মাহ ইস্পাতের মত কঠিন ঐক্য নিয়ে ঐ কাজ করতে আরব থেকে বের হয়ে অবিশ্বাস্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। পূর্ববর্ত্তী দীনের পণ্ডিতদের মত এ উম্মাহর পণ্ডিতরাও একে ধ্বংস করে দিলেন।
 
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। আমি ফিকাহ বা ফকিহদের বিরুদ্ধে বলছি না। কারণ কোর’আন ও হাদীস থেকে জীবন বিধানের নির্দেশগুলি একত্র ও বিন্যাস করলে যা দাঁড়ায় তাই ফিকাহ- অর্থাৎ ফিকাহ ছাড়া কোন মুসলিমের জীবনব্যবস্থা অনুসরন অসম্ভব। আমার বক্তব্য ঐ ফিকাহর অতি বিশ্লেষণ, সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ যা আল্লাহ ও তার রসুল (দ) কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমাদের ফকিহরা যদি কোর’আন-হাদীসের মৌলিক আদেশ নিষেধগুলিকে সুন্দরভাবে শ্রেণী বিন্যাস করেই ক্ষান্ত হতেন এবং লিখতেন যে এই-ই যথেষ্ট- এরপর আর অতিরিক্ত বিশ্লেষণে যেও না, কারণ আল্লাহ বলেছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না এবং রসুলাল্লাহও (দ) নিষেধ করেছেন, তাহলে তাদের কাজ হতো অতি সুন্দর। ইসলামকে প্রকৃতভাবে সেবা করা হতো এবং আল্লাহর কাছ থেকে তারা পেতেন প্রচুর পুরস্কার। কিন্তু দুর্ভাগ্য হোচ্ছে তারা তা করেন নি। তারা আজীবন কঠিন পরিশ্রম করে আল্লাহর আদেশ নিষেধগুলি ও বিশ্বনবীর (দ) কাজ ও কথাগুলিকে সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম বিশ্লেষণ করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পূর্ণভাবে পালন করা প্রায় অসম্ভব এবং কেউ চেষ্টা করলে তার জীবনে অন্য আর কোন কাজ করা সম্ভব হবে না, এ দীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ ফকিহরা তাদের ক্ষুরধার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে হাজার হাজার মসলা-মাসয়েল সৃষ্টি করেছেন। প্রধান প্রধানগণের এক এক জনের সিদ্ধান্তের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। জাতি ঐ মসলা-মাসায়েলের মাকড়সার জালে জড়িয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেছে, স্থবির হয়ে গেছে।
 
এই পঙ্গুত্ব, স্থবিরত্ব থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ এই দীনকে করলেন অতি সহজ ও সরল, সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমা। কোন বিষয়েই আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান, কারো নিয়ম-কানুন মানি না, শুধু এইটুকুমাত্র। এ যে কত গুরুত্বপূর্ণ, কত জরুরী তা বোঝাবার জন্য বললেন, এর বেশী তো আমি তোমাদের কাছে চাইনি। এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি সেরাতুল মোস্তাকীমকে প্রতি রাকাতে অবশ্য পাঠ্য করে দিলেন, যাতে প্রতিটি মুসলিম মনে রাখে যে, আমার দীন অতি সহজ, অতি সরল, আমি যেন কখনও একে জটিল না করে ফেলি, জটিল করে ফেললে আমার দীনের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই সেরাতুল মোস্তাকীমের সহজতার, সরলতার মহা গুরুত্ব উপলব্ধি করে রসুলাল্লাহ (দ) এক হাদীসে বললেন- দীন সহজ, সরল (সেরাতুল মোস্তাকীম) একে নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করবে তারা পরাজিত হবে। অন্য হাদীসে বললেন, জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে । এই সাবধান বাণীতেও আশ্বস্থ না হোতে পেরে বিশ্বনবী (দ) আরও ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনালেন। বললেন- কোর’আনের কোন আয়াতের অর্থ নিয়ে বিতর্ক কুফর। এবং কোন অর্থ নিয়ে মতান্তর উপস্থিত হোলে আমাদেরকে কি করতে হবে তারও নির্দেশ তিনি আমাদের দিচ্ছেন। বলছেন, কোন মতান্তর উপস্থিত হোলে তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও । অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে যখনই মতান্তর উদ্ভব হবে তখনই চুপ হয়ে যাবে, কোন তর্ক-বিতর্ক করবে না। অর্থাৎ বিতর্কে যেয়ে কুফরি করবে না, এবং যে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই সেই সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমাকে আকড়ে ধোরে থাক, এখানে লক্ষ্য করার একটা বিষয় আছে, দীনের ব্যাপার নিয়ে বিতর্ককে আল্লাহর রসুল (দ) কোন পর্যায়ের গুনাহ, পাপ বোলে আখ্যায়িত করছেন। চুরি নয়, হত্যা নয়, ব্যভিচার নয়, বলছেন- কুফর। যার চেয়ে বড় আর গোনাহ নেই, শুধু তাই নয় যা একজনকে এই দীন থেকেই বহিষ্কৃত করে দেয়।
 
এতবড় শাস্তি কেন? শেষ নবীর (দ) হাদীস থেকেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। তিনি বলছেন- তোমরা কি জান, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে? এই প্রশ্ন করে তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছেন- শিক্ষিতদের ভুল, মোনাফেকদের বিতর্ক এবং নেতাদের ভুল ফতোয়া । যে কাজ ইসলামকেই ধ্বংস করে দেয় সে কাজের চেয়ে বড় গোনাহ আর কি হোতে পারে! তাই বিশ্বনবী (দ) এই কাজকে কুফ্রি বোলে সঠিক কথাই বলেছেন।
 
এই জাতির মহাদুর্ভাগ্য। আল্লাহর ও তার রসূলের (দ) এতসব কঠোর সতর্কবাণী এই উম্মাহর পণ্ডিতদের কিছুই মনে রইল না। তারা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোর’আন-হাদীসের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে এক বিরাট ফিকাহ শাস্ত্র গড়ে তুললেন। এদের মণীষার, প্রতিভার, অধ্যবসায়ের কথা চিন্তা করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, কিন্তু তাদের ঐ কাজের ফলে এই উম্মাহ ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে গেলো। শত্র“র কাছে পরাজিত হয়ে গেলো।
 
ফিকাহর যে অতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার পক্ষে একটি যুক্তি আছে এবং সে যুক্তি আমি সম্পূর্ণ স্বীকার করি। সেটা হোচ্ছে ইসলামের আইন-কানুনের বিচারালয়ে ব্যবহার। অর্থাৎ বিচারালয়ে এই আইনের সুক্ষ্ম প্রয়োগ যাতে কোন নিরপরাধ শাস্তি না পায়। অনৈসলামিক যেসব আইন বর্ত্তমানে পৃথিবীতে চালু আছে, অর্থাৎ মানুষ রচিত আইনগুলি, এগুলিও সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেই বিচরালয়গুলিতে বিচার করা হয়- উদ্দেশ্য সেই একই- সুবিচার। কিন্তু সে জন্য কোন দেশেই জ্ঞানের অন্যান্য সমস্ত শাখাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে সেই দেশের সংবিধানের এবং আইনের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় নি। শুধু যারা আইনজ্ঞ হোতে চান, আইনজীবি হোতে চান তারা স্ব-ইচ্ছায় ঐ বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেন, ডিগ্রী নেন এবং তারপর আদালতে যোগ দেন। অর্থাৎ চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা ইত্যাদির মত আইনকেও একটি বিশেষ (special) জ্ঞান হিসাবে শিক্ষা করেন। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা তা না করে জাতির মধ্যে এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করে দিলেন যে আইনজ্ঞ হওয়াই মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, জ্ঞানের অন্যান্য শাখা শিক্ষা করার কোন প্রয়োজন এ জাতির নেই। এই কাজের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যা হবার তাই হলো, জাতি জ্ঞানের অন্যান্য শাখাসমূহে যে বিস্ময়কর জ্ঞান চর্চা করে পৃথিবীর শিক্ষকের আসন লাভ করেছিলো তা ছেড়ে দিয়ে একটি মুর্খ, অশিক্ষিত জাতিতে পরিণত হলো। উদাহরণরূপে বলা যায় যে, আজকের কোন রাষ্ট্রে যদি শিক্ষা নীতি এই করা হয় যে, সেই রাষ্ট্রের সংবিধান ও ঐ সংবিধান নিসৃতঃ আইন-কানুন ও তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনই একমাত্র শিক্ষার বিষয়বস্তু হবে, বর্ত্তমানের মাদ্রাসা শিক্ষার মত, তবে কি হবে? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তাহলে বিদ্যালয়গুলিতে নিচু ও প্রাথমিক শ্রেণী থেকেই ঐ বিষয় একমাত্র পাঠ্যবিষয় করা হবে। দু’এক প্রজন্মের মধ্যেই ঐ রাষ্ট্রের লোকজন শুধু তাদের দেশের সংবিধান ও আইন-কানুনের সুক্ষাতিসুক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া আর কিছুই জানবে না, অন্যান্য সব বিষয়ে অজ্ঞ হয়ে যাবে। জাতির যা ভাগ্য হওয়া উচিত তাই হলো- অন্য জাতির কাছে পরাজিত হয়ে যে সংবিধান ও আইন-কানুন নিয়ে এত বিশ্লেষণ করা, সেই আইন-কানুন বাদ দিয়ে বিজয়ী জাতির আইন-কানুন গ্রহণ করা হলো। নিজেদের আইন-কানুন সংবিধান শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন রকমে টিকে রোইলো। যে আইন শিক্ষাকেই একমাত্র শিক্ষণীয় বোলে ঘোষণা করা হলো, মুসলিম দুনিয়াতে আজ সেই আইনে বিচার হয় না, বিচার হয় পাশ্চাত্যের মানুষের তৈরী, গায়রুল্লাহর আইনে, দণ্ড হয় পাশ্চাত্যের দণ্ডবিধি মোতাবেক অর্থনীতি পরিচালিত হয় পাশ্চাত্যের সুদভিত্তিক অর্থনীতি মোতাবেক। অথচ এ সবই ফিকাহ শাস্ত্রের আওতাধীন। তবুও এদের মাদ্রাসগুলিতে অন্ধের মত এগুলো পড়িয়ে যাওয়া হাচ্ছ, শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। যে আইনের প্রয়োগই নেই সেই আইনই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। কী নিষ্ঠুর পরিহাস। অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (দ) বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। কাউকে বাড়াবাড়ি করতে দেখলেই রাগে বিশ্বনবীর (দ) পবিত্র মুখ লাল হয়ে যেতো। কারণ তিনি জানতেন যে, অতি বড় সুন্দরী ও অতি বড় ঘরণীর মত অতি বড় মুসলিম না পায় দুনিয়া না পায় জান্নাত।
আতাহার হোসাইন, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক দেশেরপত্র।

Parliament is not for discussion, but for decision

by Sainul Hossain

I often found myself clueless to see that our leading commentators, political analysts are blaming the opposition alliance (and to some extent, the ruling coalition) not to bring up the urgent issues of Bangladesh in parliament and discuss there. I think we need to make a distinction between discussion and decision.

I understand ordinary people are so much habituated to political discussion that they would feel tempted to see “lively” debate in parliament and thereby, feed their own subsequent chat with friends. Some topics-hungry editors may also find tempted to serve a palatable editorial by blaming the politicians for worthless (and in some cases, harmful) discussion.

However, my pain is why our intellectual class would harp on the same tune and hide the gruesome unpleasant truth that Parliament is more a place of formal decision and is far from a place of discussion. And this is true both in theory and of course, in practice.

Article 70 of our constitution disproves any debate on any important issue to decide. Why should I listen to the argument of my opposition when it won’t change my vote on that topic if my party-chief has already made clear the position about the issue? What is the discussion for other than entertaining people engaged in living-room conversation or live talk-show in TV?

By theory (i.e., if we want our member of parliaments to follow the constitution), an MP can’t vote against that MP’s party’s decision. So, what is the use of having that MP try to initiate a “reasoned” debate with his peers, be they in position or opposition. No MP is allowed to change their mind after the argument or debate or whatever we name the discussion. For whose sake, should I, a humble tax-payer, spend money for useless discussion on a forlorn conclusion? There is a theoretical limit here. This can’t be (or at least, should not be) crossed how much sincere our public representatives are.  Period.

Now, the less said about the practice, the better. History tells us that discussion in our parliament is something where reasoning is the number one absentee. People tend to resort to the past, side away the topic, make the conversation at best as irrelevant and at worst as chaotic and so on. Again, this practice simply happens not because our public representatives are not educated. Most of them are highly educated, talented and rich. They just do not have any other alternatives. They have the theoretical limit.

So, there is no use of lamenting on why our opposition do not attend the parliament and talk for the people or why our governments MPs are not making the parliament “effective”. What I would expect from the media is to take a one-step back and inform the people how the government or opposition party is making their decision outside the parliament. Journalists should ask these questions to the respective party chiefs to make open their internal decision-making process within their party. Public deserves that as public has trusted with the article 70 on them (as of today, officially). If our media-intellectuals can demand such transparency more and more, this will help to establish and grow our democracy.

Some may argue that we already know how this decision is made within the party (or to be specific, who is actually makes the decision unilaterally within the party). But lets not go for assumption. For the sake of democracy, let us unearth it, establish the transparency and provide oxygen to our own public representatives to grow. Parliament is a place of decision for official record and as such only some cosmetic attendance by the public representatives would suffice. For discussion, our media really need to chase the internal decision process within a party. If that process is in shambles (and many believe, indeed they are), let us go after it, rather than asking for happy pastime in the parliament under the disguise of discussion.

One final word, just in extension or as an example. The debate on caretaker government must happen anywhere outside the parliament. I have already explained before why. Only, in that way, we can provide meaning to the opposition for coming to the parliament for the “formal” decision and consequent legislation. Otherwise, we may see the funny game of “kontho-bhote” followed by funnier discussion.

 

The author is a post-liberation-war generation and is currently working in an International Telecommunication company. This article reflects author’s personal opinion. Comments/criticisms are welcomed tohossain_sainul@yahoo.co.jp

রফিউর রাব্বি – যিনি হাঁটছেন আপনার বিপরীতে

by Fakaruddin Ahmed

টর্চারসেল পরিচালনাকারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে।  এটা কোন বি এন পি জামাতির কথা না , এটা রফিউর রাব্বি আজ ফেসবুকে লিখেছেন ।

রফিউর রাব্বি নারায়ন গঞ্জ আওমি লীগের একজন নিবেদিত প্রান কর্মি, তার বাইরে উনি মুলতঃ একজন শিল্প সাহিত্যর মানুষ । আজ আমাদের চোখ এমন পট্টি দিয়ে আবৃত , আমরা তার কান্না দেখছি না ,  আমাদের কান ভরা তুলা আমরা তার কান্না শুনতে পারছি না ।
একটা যুদ্ধে মানুষের মৃতুকে আপনি জাসটিফাই না করেন, তবু মেনে নেন। তার বিচার হতে পারে; তা আমরা দেখেছি।
কিন্তু তকির মৃতুকে কিভাবে মেনে নিব আমরা ?
ত্বকি হত্যার বিচারের জন্য কি আমরা ৪২ বছর অপেক্ষা করতে চাই ?
আর ত্বকি হত্যার আসামি মাফিয়া গোস্টি-কে আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে যাব ?
একটা প্রতিবাদ হবে না ?
আমাদের মিডিয়া , আমাদের মধ্যবিত্ত সুশিলতা, আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল হতে চাওয়া চোখ ব্যস্ত পাকিস্থানি ইমরানের পাছায় লাঠির ঘা বসাতে কিংবা দশিটার পাছায় মলমের মালিশ দিতে ।

কিন্তু একজন মানুষ, একজন রফিউর রাব্বি নিজের ত্বকিকে

হারিয়ে ভাবছেন বাংলাদেশের সব ত্বকিদের কথা।
এভাবেই কী একজন রফিউর রাব্বি-ই কি আমার প্রত্যেকের ঘরের ত্বকির কথা ভাববে ?

রেকর্ড-বিজয়-পরাজয়

মোহছেন উল আলম

কারো কাছে গুগলে বাংলাদেশকে চিনে ফেলছে বিয়াল্লিশ বছর পর, এইটা বড় আশ্চর্যজনক ঘটনা!(গুগল ডোডল বেশীরভাগ দিন দেখি, ব্যক্তিগত অজ্ঞতার কারনে বেশীরভাগকে চিনি না। একটা স্বাধীন রাষ্ট্রকে সম্মানিত করতে পেরে যেখানে কোম্পানীর কৃতজ্ঞ হওয়ার করতে পারে, সেখানে জাতিগত অজ্ঞতার কারনে পুরো রাষ্ট্র নিজেরে জাতে উঠছে মনে করে, সমস্যা নাই!) বাইশ-তেইশহাজার মানুষ পতাকা সাজাইছে তাই বিশ্ব-রেকর্ড হইল, কত্ত খুশি প্রানে!

এইসব রেকর্ড দেখে খুশি হইতে আমি দোষের কিছু দেখি না! কারন, যেই রাষ্ট্রের প্রায় সব নাগরিক খুনের দায়ে দায়ী, অর্থাত খুনী, এবং খুনের দায় মাথায় নিয়ে আজন্ম জেলখানাতে বসবাস করে, তাদের একটু খুশি-হাসি-তামাশাকে ভালো চোখে দেখার নিয়ম আছে; কয়েদীর মানবাধিকার তো আর অস্বীকার করা যায় না!

যাদের মনে দ্বন্দ্ব আছে নিজের কয়েদ-দশার ব্যাপারে, তাদের প্রতি ক্ষমাপ্রার্থী।
যারা কয়েদে-দশা নিয়ে সচেতন, লেট’স চিয়ার্স!

কথা হল যখন আমি-আপনি হাসতেছি ঠিক সেই মুহূর্তে কোনো একটা ঘর থেকে কেউ একজন নাই হয়ে গেল। কোনো এক ঘরের কোনো একজন মানুষ আর ফিরে এল না, লাশ হয়েও না। অথবা, কোনো এক নদীর তীরে কোনো একটি লাশ ভেসে উঠল, কারন লাশ খাওয়ার মত পাঙ্গাস-মাগুর-কুমির আমাদের আর নাই। অথবা, সাভারের সেই গ্রাম যেখানে মানুষের হাড় টোকাইয়ের বস্তায় ঢুকে গরুর হাড় হিসেবে, সেখানে কালকে সকালে আরেকটি টোকাই হেসে উঠবে গরুর হাড়ের প্রাচুর্যে।
আমি-আপনি-আমরা  এইসব ভালো করেই জানি, তারচেয়েও ভালো করে জানি কিভাবে জানা জিনিস ভুলে যেতে হয়। জানা-অজানা জিনিসে দুঃখ পেতেই হবে এমন কোনো শর্তে আবদ্ধ হয়ে আমরা নাগরিকত্ব পাই নাই। আমার দুঃখ সবার, তার দুঃখ তার; আমরা ভালো করেই জানি। সুতরাং দুঃখিত হওয়ার কোনো দরকার নাই।

একদিন, কোনো একদিন, একজন স্কুলশিক্ষক আজিজকে হত্যার দায়ে যদি কোনো একটি রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ভাঙ্গার প্রয়োজন হয় সেইদিন আপনাদের চেতনা ফুলে উঠবে, ফুলে-ফেপে উঠুক।