সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র – dark side of the moon। পর্ব-

By Watchdog BD

সাল ফাল মনে রাখার ধৈর্য্য কোন কালেই ছিলনা। জীবনের কোন পর্যায়ে এ নিয়ে লেখালেখি করব তার কোন প্ল্যান না থাকায় লিখে রাখার কথাও মনে আসেনি। যে ঘটনার কথা লিখতে যাচ্ছি তার সালটাও মনে নেই। সময়টা তখন ভাঙ্গা গড়ার সময়। ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটছে। উপর হতে নির্দেশের বাণ বইছে, আর নীচে তা বাস্তবায়ন করতে হিমসিম খাচ্ছে স্থানীয় নেত্রীবৃন্দ। খবরের জোয়ারে হঠাৎ করেই মস্কো হতে খবর এলো খোদ গর্ভাচেভ আসছেন আমাদের ইউনিভার্সিটিতে। পার্টি প্রধান হওয়ার পর মস্কোর বাইরে এটাই তার প্রথম ভ্রমণ। রবোট টেকনোলজির উপর নতুন একটা ফ্যাকালটি খোলা হবে এবং তা উদ্বোধন করবেন শক্তিশালী সোভিয়েত দেশের প্রেসিডেন্ট ও পার্টির সাধারণ সম্পাদক মিখাইল সের্গেইভিচ গর্ভাচেভ। লিওনিদ ইলিচ ব্রেজেনেভের মৃত্যুর পর সোভিয়েত সাম্রাজ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে এ নিয়ে বাইরে যতটা জল্পনা কল্পনা ছিল ভেতরের মানুষ ছিল ততটাই নির্বিকার। দিন শেষে ৩ রুবেল ১৫ কোপেকের একটা ভদকা বোতলের সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকত কোটি কোটি মানুষ। সাধারণ জনগণের জন্যে রাজনীতি শব্দটা ছিল অনেকটা কালো রাতের, কালো শব্দের, কালো বন্যার মত। দেশটার ইহুদি সম্প্রদায় এ নিয়ে কিছুটা মাথা ঘামাত নিজেদের প্রয়োজনে। শেষ ঠিকানা স্বপ্নের ইসরাইলে পালানোর কায়দা কানুন আবিস্কার করতে গিয়ে রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত অনেকটা বাধ্যবাধকতা হিসাবে। বাকি কোটি কোটি মানুষের জন্যে রাজনীতি ছিল ওয়ান ম্যান শো; যথাক্রমে ব্রেজনেভ হয়ে চেরনেঙ্কো, চেরনেঙ্কো হয়ে আন্দ্রোপভ এবং আন্দ্রোপভ হয়ে গর্ভাচেভ। জোযেফ স্টালিনের আমল হতেই চলে আসছিল এ ঐতিহ্য, যা স্বগৌরবে সমুন্নত রেখে গেছেন নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ভদ্‌কা স্টকের ওঠানামাকেই ধরা হত দেশটার রাজনৈতিক ব্যারোমিটার হিসাবে। এ ক্ষেত্রে লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ ছিলেন সর্বকালের সেরা চ্যাম্পিয়ান। তার আমলে ৪ ঘন্টা লাইন দিয়ে এক কিলো মাংস পাওয়া ছিল অনেকটা এভারেস্ট জয়ের মত। অথচ ভদকার প্রবাহ ছিল নদীর মত। খেটে খাওয়া সোভিয়েত জনগণকে কি করে খুশি রাখা যায় তা ভাল করেই জানা ছিল সর্বহারা একনায়কতন্ত্রের নায়কদের। ভদকা ছিল তার অন্যতম কার্যকরী উপাদান। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই ধারায় প্রথম ধাক্কাটা আসে গর্ভাচেভের আগমনের সাথে। পেরেস্ত্রইকা আর গ্লাসনস্তের মাধ্যমে মধ্য বয়সী এই নেতা নতুন কিছু বানী পৌছানো শুরু করেন জনগণের দুয়ারে। কলকারখানা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, হাসপাতাল জেলখানা সহ গোটা সোভিয়েত জনগণকে বলা হল পার্টি পূজায় বিরতি দিয়ে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে। ঘুণে ধরা সোভিয়েত সমাজকে ঢেলে সাজাতে জনগণের অংশগ্রহনের প্রয়োজনীয়তার কথা এই প্রথম উচ্চারিত হয়ে সোভিয়েত দেশে। কথা বলার স্বাধীনতা নামের জিনিসটা কি সোভিয়েত জনগণ প্রায় ভুলে গিয়েছিল, তাই কোত্থেকে এর শুরু হবে তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক জল্পনা কল্পনা। এমন একটা প্রেক্ষাপটে খোদ গর্বাচেভের আগমন ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে আমাদের ক্যাম্পাসে।

সেকশন অফিসার আবুল হোসেনের হাতে নারায়ণ ধরিয়ে অথবা বিভিন্ন কমরেডদের পৃষ্ঠপোষকতায় সোভিয়েত দেশের স্কলারশীপ বাগানোর ট্রাডিশন চালু হতে তখনও বেশ কবছর বাকি। সেরা ছাত্রদের অনেকেই সাড়া দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী সোভিয়েত দেশের আমন্ত্রণে এবং ছড়িয়ে পরেছিল রাশিয়া, ইউক্রেন, মোলদাভিয়া,বেলারুশ সহ দেশটার বিভিন্ন রাজ্যে। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশি ছাত্রদের জ্ঞান ও মেধার দাপট অনুভব করতে সময় নেয়নি সোভিয়েত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো। আজকের দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও বিনায়ক সেন ছিল সেই সোনালী সময়ের প্রতিনিধি। একাডেমিক ফলাফল ও সদ্য স্বাধীন হওয়া বন্ধু প্রতীম দেশের প্রতিনিধি হিসাবে মনে মনে আশা ছিল হয়ত দেখা হবে গর্বাচেভের সাথে। আমার নিজস্ব কিছু কথা ছিল সোভিয়েত সমাজ নিয়ে, অভিযোগ ছিল তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতার। হেমন্তের এ সময়টা পাতা ঝরার সময় ইউরোপে। রাতারাতি রং বদলায় প্রকৃতি। আমাদের ক্যাম্পাসের ব্যাপ্তি ছিল তিন তিনটা সাবওয়ে ষ্টেশন জুড়ে। বিশাল আয়তনের এই ক্যাম্পাসকে পাতামুক্ত করার দায়িত্ব ছিল আমাদেরই। বছরের এ সময়টায় কাজটা করতে হত অনেকটা বার্ষিক রুটিন হিসাবে। এ নিয়ে কারও কোন ক্ষোভ ছিলনা। প্রেসিডেন্টের আগমন উপলক্ষে নতুন মাত্রা যোগ হয় বাৎসরিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। হাজারও জল্পনা কল্পনা। আগমনের দিন প্রথম তুষারপাত হয় শহরে। পরিচ্ছন্নতার সব প্রচেষ্টা এক লহমায় তলিয়ে যায় বরফের নীচে। গোসল সেরে পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে প্রয়োজনের চাইতে বেশকিছুটা আগে হাজির হই পরিচিত ক্যাম্পাসে। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি। আমরা যারা বিদেশি তাদের সবাইকে বলা হল কেমেস্ট্রি বিল্ডিংয়ে জমা হতে। ৭০টা দেশের প্রায় ২৫০ জন ছাত্র ছাত্রীর অধ্যয়ন আমাদের ইউনিতে। কেমেস্ট্রি বিল্ডিংয়ে জমা হয়ে ভাবলাম হয়ত গর্বাচেভ আলাদাভাবে দেখা করবেন আমাদের সাথে। সবাই আশান্বিত, উদগ্রীব। দশটার ভেতর খবর পাওয়া গেল নির্ধারিত সময়ের এক ঘন্টা আগেই এসে গেছেন তিনি। তখনই ঘটল ঘটনাটা। দালানের মূল ফটক আটকে দেয়া হল। আমরা যে রুমটায় জমা হয়েছিলাম তার দরজায় ঝুলানো হল বিশাল এক তালা। আমাদের বন্দী করা হয়েছে। একজন এসে বলে গেল যতক্ষণ গর্বাচেভ ক্যাম্পাসে আছেন কেউ বের হওয়ার চেষ্টা করলে এক কাপড়ে ফেরৎ পাঠানো হবে স্বদেশে। থ হয়ে গেল সবাই। সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থার আসল চেহারা নেংটা হওয়ায় অনেকের মত আমি যে খুব একটা অবাক হয়েছি বলা যাবেনা।

লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভকে যেদিন দাফন করার কথা মস্কো হতে এক বড় ভাই এসেছিলেন আমাদের ডরমিটরিতে। হলের বাংলাদেশিরা মিলে আমার রুমে আড্ডা দিচ্ছি। সাথে খাওয়া দাওয়ার বাংলাদেশি আয়োজন। হঠাৎ করে দরজায় অপরিচিত নক। ইউনির যুব কম্যুনিস্ট পার্টির একটা দল ছাত্র রুমে রুমে ঘুরছে। কেন ঘুরছে কেউ জানেনা। আমার রুমে এত ছাত্র দেখে বন্য শুয়োরের মত চীৎকার করে উঠল। এন্টি সোভিয়েত একটিভিটির অভিযোগ আনল। মুখ খুলতে যাব এমন সময় এক লাথিতে ভাতের হাড়িটা উড়িয়ে দিল শূন্যে। বোবা হয়ে শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিলনা আমাদের। মস্কো হতে বেড়াতে আসা বড় ভাইকে ধরে নিয়ে গেল খাবার টেবিল হতে । একদিন একরাত ষ্টেশনে কাটিয়ে প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থায় তাকে ফিরতে হয় মস্কোতে। কাহিনীর কিছু অংশ শেয়ার করার ইচ্ছা ছিল গর্বাচেভের সাথে। তিনি নিজ হতে এসব জানতে আগ্রহী ছিলেন। নেতার প্রস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হয় সবাইকে। ততক্ষণে নেতা জেনে গেছেন একটা সুখী সমৃদ্ধ আধুনিক সোভিয়েত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের কাহিনী।

গর্বাচেভের সাথে দেখা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। তবে তা ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। নিউ ইয়র্ক শহরের ল্যা গুয়ারডিয়া এয়ারপোর্টে। বস্টন যাচ্ছেন একাকী। ততদিনে ঢাল তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দার বনে গেছেন তিনি। মার্কিন বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে লেকচার দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। না বলা কথার অনেক গুলোই বলে ফেলেছিলাম সেদিন। পালটা মন্তব্য না করে কেবল রুশ ভাষা জ্ঞানের প্রশংসা করে বস্টন গামী প্লেনের যাত্রী হয়েছিলেন এক কালের পরাক্রমশালী এই নেতা।

সত্যের অনুসন্ধান by মুহাম্মদ আব্দুল খালিক

বর্তমানকালে কোন কোন দার্শনিক মত পোষণ করেন যে, Absolute truth বা প্রকৃত সত্য বলে কিছু নেই। এখন যা সত্য বলে অনুভূত হচ্ছে কালের বিবর্তনে তা আর সত্য নাও থাকতে পারে। এখন প্রশ্নমানুষ কি এতই সীমিত জ্ঞানের অধিকারী? সৃষ্টি লগ্ন থেকে মানুষ কি প্রতিনিয়ত অনিশ্চিতভাবে জীবনযাপন করছে? প্রাকৃতিক বিধিবিধান (Natural law) কি মানুষকে কোন নির্দেশনাই দেয় না? সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্য, মানুষের উন্নতি সভ্যতার শীর্ষে আরোহণের সব লম্ফঝম্ফ কি সবই মেকি? মানুষের দ্বারা জ্ঞানের এত শাখাপ্রশাখার বিকাশ কি মানুষকে নিশ্চিত কোন জ্ঞান দিতে সক্ষম নয়?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে মানুষ তার মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করছে এবং এর বেশি ব্যবহার করতে গেলে মানুষের মানসিক অবসাদ বাড়বে, বেড়ে যাবে মানসিক রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও। প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ তার মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করার পরও কি কোন প্রকৃত সত্য খোঁজে পেল না? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজলে তাদের দেয়া Principle-এর দূর্বলতা পরিলক্ষিত হবে।

প্রকৃত সত্য অবশ্যই আছে। সৃষ্টি লগ্ন থেকে প্রাকৃতিক আইন (Natural law) একটাই আছে। আর তাই মানুষের পক্ষেও খোঁজে পাওয়া সম্ভব প্রকৃত সত্যের। তবে এজন্য প্রয়োজননিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ, সত্যানুসন্ধানের সদিচ্ছা, প্রত্যয়, আর সর্বোপরি ভোগবাদী মানসিকতা পরিহার।

একজন মানুষের চিন্তা বুদ্ধির পরিপক্বতা আসার পর প্রথম এবং তার জীবনের সবচাইতে বড় যে দায়িত্ব তার কাঁধে চাপে তা হলোসত্যের অনুসন্ধান। বিশ্বজগ কিভাবে সৃষ্টি হলো? কে এটা সৃষ্টি করেছে? নাকি আদৌ কেউ করেনি? মানুষের জীবন চলার পাথেয় কী হওয়া উচিত? কোন আদর্শ অনুসারে মানুষের জীবন পরিচালিত হবে? মানুষ কি নিছক প্রাণসর্বস্ব জীব? নাকি নৈতিক মানসম্পন্ন উন্নত জীব? মানুষের বাহিরের সত্ত্বার গুরুত্ব বেশি নাকি ভেতরের সত্ত্বার? পৃথিবীতে মানুষ কি “survival for the fittest” নীতিতে চলবে? নাকি পারস্পরিক সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব সাম্যের নীতি অনুসরণ করবে? মানুষ কি পশুদের মত অবাধে যৌনাচার করবে? নাকি নৈতিক সীমাবদ্ধতার নীতি মেনে চলবে? মানুষ কি শুধু নিজের স্বার্থ উদ্ধারেই ব্রত থেকে বৈধঅবৈধ পথে টাকাপয়সা সম্পদ উপার্জন করবে? নাকি সুষম বন্টনের নীতি অনুসরণ করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খোঁজে পাওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য আবশ্যক।

দু:খের বিষয় হলোবিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই এসব সম্পর্কে নিস্পৃহ। তারা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। সারা বিশ্বে হাতে গোনা কিছু মানুষের ইচ্ছা, চিন্তা মতবাদের কাছে তারা নিজেদের সত্ত্বাকে সপেঁ দিয়েছে। নেতাদের বক্তৃতা আলোচনা, অন্যের লেখনী এবং মিডিয়ার প্রচারণার মাধ্যমে তারা উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবন চালনা করে থাকে।

বেশির ভাগ মানুষই প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে জীবন চালনার মূলমন্ত্র খোঁজার জন্য সত্যানুসন্ধানী হওয়ার তাগিদ অনুভব করে না। নিজেদের ঘৃণ্য স্বার্থ চিন্তায় তারা এতই মত্ত থাকে যে, হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। নিজেদের স্বার্থদ্ধোরে অন্যের অনিষ্ট সাধন করতেও পিছপা হয় না।

সত্যানুসন্ধানে এই অবহেলা নিস্পৃহতা মানুষের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানুষ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ পরাধীনতার বন্ধনে, দাসত্বের নিগড়ে। মানুষের অসচেতনতার সুযোগে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ এমন এক ভয়ানক অক্টোপাসে পরিণত হয়েছে, যা গুটিকয়েক অস স্বেচ্ছাচারী সম্পদশালী এবং ভ্রান্ত লোকদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমানকালে রাষ্ট্র এমন এক দানবীয় শক্তি যা মানুষের কন্ঠ রোধ করে থাকে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়ে। কিন্তু সকল মানুষ যদি সত্য অন্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত রাখত তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হতে পারত মানুষের প্রকৃত মঙ্গলের কাজে, কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare state) হিসেবে।

আমাদের জীবনকে সত্যিকারার্থে সুন্দর সফল করতে; আমাদের সমাজকে শান্তি, প্রগতি, আর ভ্রাতৃত্ব ভালোবাসার বন্ধনে আরো সুদৃঢ় করতে; মানবতার কাঙ্খিত বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে সত্যের সত্যিকার অনুসন্ধানই হোক সকলের ব্রতী।

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএম অধ্যয়নরত

অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর আর অতি বড় সুন্দরী না পায় বর

by আতাহার হোসাইন
দীনের অতি বিশ্লেষণ করে দীনের প্রাণশক্তি বিনষ্ট করে দেওয়ার কাজটা নতুন নয়. আমাদের পণ্ডিতরাই শুধু এ কাজ করেন নি। পূর্ববর্ত্তী দীনগুলোতেও অতি-ধার্মিকরা গজিয়েছেন ও পাণ্ডিত্য জাহির করে তাদের দীনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন তার নবী মূসার (আ) জীবনী থেকে যেখানে আল্লাহ বনী ইসরাইলদের একটি গরু কোর’বানী করতে আদেশ দিলেন। মূসা (আ) যখন এই কোর’বানীর আদেশ বনী ইসরাইলদের জানিয়ে দিলেন তখন যদি তারা মোটামুটি ভাল একটি গরু এনে কোর’বানী করে দিতো তাহলে তাতেই কাজ হয়ে যেতো। কারণ কোরবানীর গরুটা কেমন হবে সে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন শর্ত্ত দেন নি। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে বলছেন- বনী ইসরাইল তা করে নি। তারা মুসার (আ) মাধ্যমে আল্লাহকে প্রশ্ন করতে লাগলো- গরুটার বয়স কত হবে, গায়ের রং কি হবে, সেটা জমি চাষের জন্য শিক্ষিত কিনা, জমিতে পানি দেয়ার জন্য শিক্ষিত কিনা, ওটার গায়ে কোন খুঁত থাকতে পারবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা প্রশ্ন করে যেতে লাগলো আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। তারপর যখন প্রশ্ন করার মত আর কিছুই রইলো না তখন স্বভাবতঃই ঠিক অমন একটি গরু পাওয়া দূরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একটা সহজ সরল আদেশ- “একটা গরু কোরবানী কর” এটাকে খুচিয়ে খুচিয়ে এমন কঠিন করে ফেলা হলো যে, অমন গরু আর পাওয়া যায় না। এই জাতির মহা পণ্ডিতরাও বিশ্বনবীর (দ) ওফাতের ৬০/৭০ বছর পর ঠিক ঐ কাজটাই মহা ধুমধামের সাথে আরম্ভ করলেন। দু’টি মাত্র আদেশ- আমাকে ছাড়া কাউকে মানবে না আমার দেয়া জীবন-বিধান ছাড়া আর কোন বিধান মানবে না, আর এই জীবন-বিধানকে সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করবে। সহজ, সরল দু’টি আদেশ। বিশ্বনবীর (দ) উম্মাহ ইস্পাতের মত কঠিন ঐক্য নিয়ে ঐ কাজ করতে আরব থেকে বের হয়ে অবিশ্বাস্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। পূর্ববর্ত্তী দীনের পণ্ডিতদের মত এ উম্মাহর পণ্ডিতরাও একে ধ্বংস করে দিলেন।
 
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। আমি ফিকাহ বা ফকিহদের বিরুদ্ধে বলছি না। কারণ কোর’আন ও হাদীস থেকে জীবন বিধানের নির্দেশগুলি একত্র ও বিন্যাস করলে যা দাঁড়ায় তাই ফিকাহ- অর্থাৎ ফিকাহ ছাড়া কোন মুসলিমের জীবনব্যবস্থা অনুসরন অসম্ভব। আমার বক্তব্য ঐ ফিকাহর অতি বিশ্লেষণ, সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ যা আল্লাহ ও তার রসুল (দ) কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমাদের ফকিহরা যদি কোর’আন-হাদীসের মৌলিক আদেশ নিষেধগুলিকে সুন্দরভাবে শ্রেণী বিন্যাস করেই ক্ষান্ত হতেন এবং লিখতেন যে এই-ই যথেষ্ট- এরপর আর অতিরিক্ত বিশ্লেষণে যেও না, কারণ আল্লাহ বলেছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না এবং রসুলাল্লাহও (দ) নিষেধ করেছেন, তাহলে তাদের কাজ হতো অতি সুন্দর। ইসলামকে প্রকৃতভাবে সেবা করা হতো এবং আল্লাহর কাছ থেকে তারা পেতেন প্রচুর পুরস্কার। কিন্তু দুর্ভাগ্য হোচ্ছে তারা তা করেন নি। তারা আজীবন কঠিন পরিশ্রম করে আল্লাহর আদেশ নিষেধগুলি ও বিশ্বনবীর (দ) কাজ ও কথাগুলিকে সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম বিশ্লেষণ করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পূর্ণভাবে পালন করা প্রায় অসম্ভব এবং কেউ চেষ্টা করলে তার জীবনে অন্য আর কোন কাজ করা সম্ভব হবে না, এ দীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ ফকিহরা তাদের ক্ষুরধার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে হাজার হাজার মসলা-মাসয়েল সৃষ্টি করেছেন। প্রধান প্রধানগণের এক এক জনের সিদ্ধান্তের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। জাতি ঐ মসলা-মাসায়েলের মাকড়সার জালে জড়িয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেছে, স্থবির হয়ে গেছে।
 
এই পঙ্গুত্ব, স্থবিরত্ব থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ এই দীনকে করলেন অতি সহজ ও সরল, সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমা। কোন বিষয়েই আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান, কারো নিয়ম-কানুন মানি না, শুধু এইটুকুমাত্র। এ যে কত গুরুত্বপূর্ণ, কত জরুরী তা বোঝাবার জন্য বললেন, এর বেশী তো আমি তোমাদের কাছে চাইনি। এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি সেরাতুল মোস্তাকীমকে প্রতি রাকাতে অবশ্য পাঠ্য করে দিলেন, যাতে প্রতিটি মুসলিম মনে রাখে যে, আমার দীন অতি সহজ, অতি সরল, আমি যেন কখনও একে জটিল না করে ফেলি, জটিল করে ফেললে আমার দীনের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই সেরাতুল মোস্তাকীমের সহজতার, সরলতার মহা গুরুত্ব উপলব্ধি করে রসুলাল্লাহ (দ) এক হাদীসে বললেন- দীন সহজ, সরল (সেরাতুল মোস্তাকীম) একে নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করবে তারা পরাজিত হবে। অন্য হাদীসে বললেন, জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে । এই সাবধান বাণীতেও আশ্বস্থ না হোতে পেরে বিশ্বনবী (দ) আরও ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনালেন। বললেন- কোর’আনের কোন আয়াতের অর্থ নিয়ে বিতর্ক কুফর। এবং কোন অর্থ নিয়ে মতান্তর উপস্থিত হোলে আমাদেরকে কি করতে হবে তারও নির্দেশ তিনি আমাদের দিচ্ছেন। বলছেন, কোন মতান্তর উপস্থিত হোলে তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও । অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে যখনই মতান্তর উদ্ভব হবে তখনই চুপ হয়ে যাবে, কোন তর্ক-বিতর্ক করবে না। অর্থাৎ বিতর্কে যেয়ে কুফরি করবে না, এবং যে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই সেই সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমাকে আকড়ে ধোরে থাক, এখানে লক্ষ্য করার একটা বিষয় আছে, দীনের ব্যাপার নিয়ে বিতর্ককে আল্লাহর রসুল (দ) কোন পর্যায়ের গুনাহ, পাপ বোলে আখ্যায়িত করছেন। চুরি নয়, হত্যা নয়, ব্যভিচার নয়, বলছেন- কুফর। যার চেয়ে বড় আর গোনাহ নেই, শুধু তাই নয় যা একজনকে এই দীন থেকেই বহিষ্কৃত করে দেয়।
 
এতবড় শাস্তি কেন? শেষ নবীর (দ) হাদীস থেকেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। তিনি বলছেন- তোমরা কি জান, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে? এই প্রশ্ন করে তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছেন- শিক্ষিতদের ভুল, মোনাফেকদের বিতর্ক এবং নেতাদের ভুল ফতোয়া । যে কাজ ইসলামকেই ধ্বংস করে দেয় সে কাজের চেয়ে বড় গোনাহ আর কি হোতে পারে! তাই বিশ্বনবী (দ) এই কাজকে কুফ্রি বোলে সঠিক কথাই বলেছেন।
 
এই জাতির মহাদুর্ভাগ্য। আল্লাহর ও তার রসূলের (দ) এতসব কঠোর সতর্কবাণী এই উম্মাহর পণ্ডিতদের কিছুই মনে রইল না। তারা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোর’আন-হাদীসের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে এক বিরাট ফিকাহ শাস্ত্র গড়ে তুললেন। এদের মণীষার, প্রতিভার, অধ্যবসায়ের কথা চিন্তা করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, কিন্তু তাদের ঐ কাজের ফলে এই উম্মাহ ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে গেলো। শত্র“র কাছে পরাজিত হয়ে গেলো।
 
ফিকাহর যে অতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার পক্ষে একটি যুক্তি আছে এবং সে যুক্তি আমি সম্পূর্ণ স্বীকার করি। সেটা হোচ্ছে ইসলামের আইন-কানুনের বিচারালয়ে ব্যবহার। অর্থাৎ বিচারালয়ে এই আইনের সুক্ষ্ম প্রয়োগ যাতে কোন নিরপরাধ শাস্তি না পায়। অনৈসলামিক যেসব আইন বর্ত্তমানে পৃথিবীতে চালু আছে, অর্থাৎ মানুষ রচিত আইনগুলি, এগুলিও সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেই বিচরালয়গুলিতে বিচার করা হয়- উদ্দেশ্য সেই একই- সুবিচার। কিন্তু সে জন্য কোন দেশেই জ্ঞানের অন্যান্য সমস্ত শাখাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে সেই দেশের সংবিধানের এবং আইনের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় নি। শুধু যারা আইনজ্ঞ হোতে চান, আইনজীবি হোতে চান তারা স্ব-ইচ্ছায় ঐ বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেন, ডিগ্রী নেন এবং তারপর আদালতে যোগ দেন। অর্থাৎ চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা ইত্যাদির মত আইনকেও একটি বিশেষ (special) জ্ঞান হিসাবে শিক্ষা করেন। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা তা না করে জাতির মধ্যে এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করে দিলেন যে আইনজ্ঞ হওয়াই মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, জ্ঞানের অন্যান্য শাখা শিক্ষা করার কোন প্রয়োজন এ জাতির নেই। এই কাজের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যা হবার তাই হলো, জাতি জ্ঞানের অন্যান্য শাখাসমূহে যে বিস্ময়কর জ্ঞান চর্চা করে পৃথিবীর শিক্ষকের আসন লাভ করেছিলো তা ছেড়ে দিয়ে একটি মুর্খ, অশিক্ষিত জাতিতে পরিণত হলো। উদাহরণরূপে বলা যায় যে, আজকের কোন রাষ্ট্রে যদি শিক্ষা নীতি এই করা হয় যে, সেই রাষ্ট্রের সংবিধান ও ঐ সংবিধান নিসৃতঃ আইন-কানুন ও তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনই একমাত্র শিক্ষার বিষয়বস্তু হবে, বর্ত্তমানের মাদ্রাসা শিক্ষার মত, তবে কি হবে? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তাহলে বিদ্যালয়গুলিতে নিচু ও প্রাথমিক শ্রেণী থেকেই ঐ বিষয় একমাত্র পাঠ্যবিষয় করা হবে। দু’এক প্রজন্মের মধ্যেই ঐ রাষ্ট্রের লোকজন শুধু তাদের দেশের সংবিধান ও আইন-কানুনের সুক্ষাতিসুক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া আর কিছুই জানবে না, অন্যান্য সব বিষয়ে অজ্ঞ হয়ে যাবে। জাতির যা ভাগ্য হওয়া উচিত তাই হলো- অন্য জাতির কাছে পরাজিত হয়ে যে সংবিধান ও আইন-কানুন নিয়ে এত বিশ্লেষণ করা, সেই আইন-কানুন বাদ দিয়ে বিজয়ী জাতির আইন-কানুন গ্রহণ করা হলো। নিজেদের আইন-কানুন সংবিধান শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন রকমে টিকে রোইলো। যে আইন শিক্ষাকেই একমাত্র শিক্ষণীয় বোলে ঘোষণা করা হলো, মুসলিম দুনিয়াতে আজ সেই আইনে বিচার হয় না, বিচার হয় পাশ্চাত্যের মানুষের তৈরী, গায়রুল্লাহর আইনে, দণ্ড হয় পাশ্চাত্যের দণ্ডবিধি মোতাবেক অর্থনীতি পরিচালিত হয় পাশ্চাত্যের সুদভিত্তিক অর্থনীতি মোতাবেক। অথচ এ সবই ফিকাহ শাস্ত্রের আওতাধীন। তবুও এদের মাদ্রাসগুলিতে অন্ধের মত এগুলো পড়িয়ে যাওয়া হাচ্ছ, শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। যে আইনের প্রয়োগই নেই সেই আইনই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। কী নিষ্ঠুর পরিহাস। অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (দ) বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। কাউকে বাড়াবাড়ি করতে দেখলেই রাগে বিশ্বনবীর (দ) পবিত্র মুখ লাল হয়ে যেতো। কারণ তিনি জানতেন যে, অতি বড় সুন্দরী ও অতি বড় ঘরণীর মত অতি বড় মুসলিম না পায় দুনিয়া না পায় জান্নাত।
আতাহার হোসাইন, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক দেশেরপত্র।

বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যত

17

ধরা যাক ২০২০ কিংবা ২০২৫/ খালেদা- হাসিনা দুজনই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন – তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে? ইসলামিস্টরা কি তৃতীয় শক্তি হবে? জামাত কি ইসলামিস্টদের নেতৃত্ব দেবে না নতুন কোনো দল ইসলামিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করবে? ইসলামিস্টরা কি বিএনপি-লীগ থেকেও শক্তিশালী হয়ে যাবে তখন?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ডিপ্লোম্যাটরা রাজনীতিবিদদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, চিন্তিত নাগরিকরা করেন সাংবাদিকদের। বহু মানুষের সাথে আমিও বারবার আলোচনা করেছি এ প্রসঙ্গে। আমার কিছু বন্ধু আছে যারা মেধা, শিক্ষা ও পেশা – সব দিক থেকেই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; তাদের সাথে আলাপচারিতাতেও এই প্রসঙ্গটি বারবার ফিরে আসে। মনে হলো আমাদের আজকের ভাবনাগুলো লিখে রাখা খুব দরকার, ৩০ বছর পর এই সময়টাকে আমরা কীভাবে দেখছিলাম সেটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হবে।

প্রথমেই কিছু শব্দের সীমানা নির্ধারণ করি, এটা জরুরী, ভবিষ্যতে এই শব্দগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বদলে যাবে।

আমি “ইসলামিস্ট” বলতে বোঝাচ্ছি তাদের যারা পলিটিকাল ইসলামে বিশ্বাস করেন এবং সে মতে রাজনীতি ও এক্টিভিজম করেন। পাঁচ বেলা মসজিদে যাওয়ার মানে কিন্তু ইসলামিস্ট না, আবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করাই ইসলামিস্ট হওয়ার একমাত্র শর্ত না। এটা একটা আমব্রেলা টার্ম এবং আমি সেই হিসাবেই ব্যবহার করেছি। ইসলামাইজেশান বলতে আমি অন্য ধর্ম থেকে ইসলামে আসা বলছি না এই লেখায়। শুধুমাত্র এই লেখার জন্য ইসলামাইজেশান শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মুসলমানদেরই ইসলাম ধর্মের নতুন উদ্বোধন হওয়া অর্থে। এই ঘটনাটির কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নির্ণায়ক শব্দ খুঁজে পাই নি দেখে এই ধারকর্জ। “সেনট্রিস্ট” বলতে আমি বুঝিয়েছি সে সমস্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা মানুষের কথা যারা সব দলের সহাবস্থানে বিশ্বাস করেন, বাস্তবতা ও যুক্তি-তর্ককে চেতনা ও আদর্শের ওপরে স্থান দেন এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে উগ্রবাদী নন। আমার অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশে সঠিক অর্থে সেনট্রিস্ট দল না থাকলেও বিএনপি অন্য দুটি মূল থেকে চরিত্রে বেশী সেনট্রিস্ট এবং সব দলেই সেনট্রিস্ট প্রবণতার লোকজন আছে। যারাই শাহবাগে গেছে তারাই শাহবাগী – এই অর্থে আমি “শাহবাগী” বলছি না। আমার কাছে (এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত) আওয়ামী লীগের কাছে যখন টাকা থাকে তখন সেটা স্পিরিচুয়াল প্রজেক্টে পরিণত হয়, কোনো রাজনৈতিক দল থাকে না। শাহবাগী বলতে আমি বুঝি এই স্পিরিচুয়াল প্রজেক্টের ফুট সোলজারদের। লক্ষ্যনীয় হোলো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সংস্লিষ্ট না হয়েও আপনি এই স্পিরিচুয়াল প্রজেক্টের ফুট সোলজার হতে পারবেন।

সবার আগে আমার জীবনের ছোট্ট একটা পর্যবেক্ষণ।

৮৭-৯০ সালের কথা মনে করছি। আমি তখন ছোটো কিন্তু বড়দের কিছু কথা আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। আমার বাবা যেহেতু ৫০ এর দশকে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন, তার বন্ধুরা প্রায়ই কে চীফ অফ স্টাফ হবে এ বিষয়ে খুব আলোচনা করতেন (তখনও তাদের সমসাময়িকরা কেউ কেউ চাকরি করছিলেন) /  এয়ার ভাইস মার্শাল জামাল (তখনও তিনি চীফ হন নি) প্রসঙ্গে তাদের কেউ কেউ মনে করতেন যে জামাল কোনোভাবেই চীফ হতে পারবে না কারণ – সহজ বাংলায় তিনি হুজুর এবং তার স্ত্রী হেজাবী।

২৫ বছর ফাস্ট ফরওয়ার্ড।

আজকে বাংলাদেশে শুধুমাত্র “হুজুর” হওয়ার কারণে উপরের দিকে ওঠাটা মনে হয় অতোটা কঠিন না কারণ “হুজুর” ও হেজাবীদের এখন যথেষ্ট ভিজিবিলিটি আছে সমাজের সব স্তরে। আমাদের ছোটোবেলায় এর ধারে কাছেও কিছু দেখি নি।

অন্যদিকে এখন যতো স্লীভলেস কামিজ ও ব্লাউজ দেখা যায় সামাজিক অনুষ্ঠানে, তার ধারে কাছেও কিছু আমরা দেখি নি ছোটোবেলায়। মজার ব্যাপার হোলো এই বিশেষ ব্যাপারটা অর্থাৎ স্লীভলেস কামিজ ও ব্লাউজ কিংবা কোনিকাল ব্রা পরাটা আমাদের জন্মের আগে মানে ৬০ ও ৭০ এর দশকে বাংলাদেশের আপার মিডলক্লাসে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো (হলিক্রস স্কুলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা CD বানানো হয়েছিলো বেশ কিছু বছর আগে। ঐ CD ‘র ফটোগ্রাফ দেখলে এর সত্যতা খুঁজে পাবেন)।

আবার

৮০’র দশকে আমার মা’দের যে বয়স ছিলো এখন আমাদের স্ত্রীদের সেই বয়স। তখন দেখতাম তারা প্রতি বৃহস্পতিবার বিকালে মিলাদ করতেন এবং আমার খেয়াল আছে এই মিলাদে আসতেন একদম উঁচু তলার স্ত্রীরাও। এটাকে তাদের সময়ের হ্যাং আউট বলবেন কি না আপনার ইচ্ছা কিন্তু আমার মনে হয় তখনকার অহিজাবীরা এখনকার অহিজাবীদের চেয়ে বেশী ধর্মসম্মত জীবন যাপন করতেন।

আমার ধারণা যারা ঢাকায় বড় হয়েছেন তারা কম বেশী আমার এই পর্যবেক্ষণগুলোয় সায় দেবেন। আপনি যদি এই সব বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে “একটা” প্যাটার্ন বের করতে চান কিংবা সামাজিক পর্যবেক্ষণ থেকে রাজনৈতিক উপসংহারে আসতে চান, আপনি ভুল করবেন। এই সোশাল এভোলিউশানের কোনো সহজ ব্যাখ্যা নেই। তবে এরিক হবসবম ঠিক কাছাকাছি একটা প্যাটার্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন শিল্প-বিপ্লবোত্তর ব্রিটেনে – যেখানে নতুন পুঁজি সৃষ্টির সাথে সাথে বিপুল ভাবে বেড়েছিলো ধর্মীয় এক্টিভিটি। একদল “উচ্ছন্নে” যাচ্ছিলো আরেক দল ক্রিশ্চিয়ানিটির ব্যাপক প্রসারকেই মনে করেছিলো এ রোগের দাওয়াই।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে উল্লিখিত জটিলতা হোলো সমাজ পর্যায়ের। এর উপর যোগ করেন রাজনৈতিক জটিলতা – এমন কঠিন এক জিগ স পাজল তৈরী হবে যার কোনো সমাধান নেই। এবং সমস্যা হোলো এমন অবস্থায় আপনি যে দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করবেন, খুব সহজেই আপনার মতো করে একটা ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। যেমন শাহবাগীরা মনে করেন যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশ পুরা আফগানিস্তান হয়ে যাবে। আবার বিএনপির লোকেরা মনে করে যে বাংলাদেশে ঐ রকম রাডিকাল ইসলামাইজেশানের কোনো সম্ভাবনাই নেই, বরং উদ্ধ্বত সেকুলারিজমই সবচেয়ে বড় সমস্যা। মোদ্দা কথা আপনার নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই হোক না কেন, সেই অনুযায়ী এবং অনুপাতে একটি ভয়াবহ ভবিষ্যত আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে।

প্রথম প্রশ্ন হোলো বাংলাদেশে গত ২৫-৩০ বছরে বিশেষ করে শেষ ১৫ বছরে এতো দ্রুত ইসলামাইজেশান হোলো কেন?

আমার পরিচিত এক বাংলাদেশী ক্যানবেরান যিনি বাংলাদেশে ৮৪ সালে গ্রামে শিক্ষকতা করেছেন তার অভিজ্ঞতা হোলো তখন গ্রামে দশ জনের মধ্যে বড়জোর এক জন হিজাব করতো আর এখন সেই স্কুলেই দশ জনের মধ্যে আট জন হিজাব করে কিন্তু এখন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই “দুই নম্বর” কিন্তু ৮৪ সালে প্রতিটি মেয়েই সহজ সরল ছিলো। তার ধারণা এর মূল কারণ হোলো এনজিও – সহজ কথায় মিডল ইস্টের টাকা।

Image

তিনি যে ডেমোগ্রাফির কথা বলছেন সেখানে মিডল ইস্ট ও জামাতের টাকা ইসলামাইজেশানের কাজে এসেছে এ কথা সত্য (তবে বাংলাদেশের সব অঞ্চলে না) কিন্তু সমস্যা হোলো তিনি ধর্মকে একটা প্রডাক্ট হিসেবে জ্ঞান করছেন অর্থাৎ যত বেশী টাকা (= মাইলেজ = ইনভেস্টমেন্ট), ততো বেশি ইসলামাইজেশান। সোশাল এভোলিউশানের এরকম শুধু টাকা-ভিত্তিক ব্যাখ্যা একেবারেই খাটে না।

কিন্তু এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় খুঁত হোলো – যে ইসলামাইজেশানের জন্য এখন মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির উত্থান হতে চলেছে অর্থাৎ শহুরে অনূর্ধ্ব ৪০ জনগোষ্ঠির মাঝে ইসলামের প্রসার সেখানে এই অয়েল মানি প্রায় কোনো কাজেই আসে নি।

আমি দেখেছি যে অসংখ্য তরুণ-তরুণী যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্ত ঘরের সন্তান এবং শহরের নাম করা স্কুল কলেজ থেকে পাশ করে পেশার দিক থেকে খুবই সফল – এরা ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠছে যেটা ৮০’র দশকে আমার ছেলেবেলায় প্রায় কখনোই দেখা যেতো না। আমার এক বন্ধু টেলিভিশনের মডেলিং থেকে দাড়ি রাখা উঁচু বেতনের এগজিকিউটিভ হয়ে গেছে। আমাদের আরেক বন্ধু আইবিএ থেকে পাশ করে এখন আরবী শেখায়। এবং এই পরিবর্তন একটা দুটা না, হাজারে হাজারে।

এই ঘটনাটা কীভাবে ঘটলো?

প্রথমে আমার একটা অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা: আমরা স্কুল কলেজের বই পুস্তকে যা পড়ি, বিস্ময়কর হলেও সত্য যে বাস্তব জীবনে কেবল ইসলাম ধর্ম শিক্ষাই প্রাসঙ্গিক। বাংলা বইয়ে যে ভাষা শিখি সে বাংলাতে কেউই কথা বলে না, এমন কি টিভিতেও এখন আর তেমন শোনা যায় না। যে ইংরেজি বইয়ে থাকে সে ইংরেজি কোনোদিনও কোনো দেশে চর্চা হতো কি না আমার সন্দেহ, দশ বছরের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নির্ভুল বালকদের আজগুবি সব কেচ্ছা-কাহিনীতে ভরা। অঙ্ক আর বিজ্ঞানে শিখি যে দুই আর দুই চার – বাস্তব জীবনে এই যোগফল পাঁচ, ছয় এমন কি পাঁচ শও হতে পারে। বিজ্ঞানের প্রায় কোনোই ব্যবহার নেই দৈনন্দিন জীবনে (বিজ্ঞান ব্যবহার করা আর অন্যের বানানো টেকনোলজি এস্তেমাল করা এক জিনিস না)/ ইসলাম শিক্ষায় বলে সমর্পণ করো, শান্তি পাবে। বাস্তবে কী হয় এ সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুব অল্প কিন্তু যারাই ইসলামের প্রতি অনুরক্ত তারাই বলে যে ধর্ম শিক্ষা বই যা প্রমিজ করে তা ডেলিভারও করে, নিজেদেরকে সমর্পণ করে তারা শান্তির খোঁজ পেয়েছেন।

আমাদের কালে, আমি বলবো মোটামুটি মিড নাইনটিজ থেকেই বিশ্বব্যাপী একটা ঘটনা ঘটেছে আর সেটা হোলো আমাদের জীবনে এখন কোনো ফিলোসফি নেই। মানুষ এমন একটা প্রাণী যে নিজের জীবনের পরিপূর্ণতা দেখার জন্য কোনো একটা ফিলোসফির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। আমাদের দেশে ৬০ থেকে নিয়ে ৮০ এর দশক পর্যন্ত সোশালিজমের মধ্যে দিয়ে তরুণরা দর্শনের খিদেটা মিটিয়েছে। নানা কারণে নাইনটিজে এসে এই বন্দোবস্ত বদলে যায়। সভিয়েট য়ুনিয়েনের পতন, বাংলাদেশী বামদের আদর্শিক স্খলন, বিশ্বব্যাপী বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়া – সবই মনে হয় এর পেছনে কম বেশী কাজ করেছে।

অন্তত আমাদের দেশে দর্শনের অভাব কিছুটা মিটিয়েছে ইসলাম – অন্তত কিছু মানুষের জীবনে। এর একটা অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া হোলো পলিটিকাল ইসলামের প্রতি আকর্ষণ-বোধ। ইসলাম ধর্মটা একটু বিচিত্র এই বাবদে। দশ জন লোক যদি ইসলামী অনুশাসনে মনোযোগী হয়ে ওঠেন দেখা যাবে যে পাঁচজনই সামগ্রিক মুক্তির জন্য পলিটিকাল ইসলামকে আবশ্যক মনে করে – এই ব্যাপারটা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। বলাই বাহুল্য এই পাঁচজন যদি শিক্ষিত তরুণ হয় তাহলে ধীরে ধীরে দেখা যাবে যে কোনো একটা ইসলামী দলের মধ্যে দিয়েই তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হচ্ছে।

শাহবাগী এবং আওয়ামী মনোভাব সম্পন্ন মানুষেরা এই ব্যাপারটার দুটো ভুল ব্যাখ্যা করে। প্রথমটা হোলো যে তারা মনে করে যে এই তরুনেরা অধিকাংশই জামাতী। ইন ফ্যাক্ট এই যে নতুন এনলাইটেন্ড ইসলামিস্ট ক্লাস, তাদের পলিটিকাল আইডেনটিটির দুটো মূল প্রতিপাদ্য হোলো জামাতকে অপছন্দ করা এবং কওমী মাদ্রাসা তথা হিফাজতকে একটু তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা এবং এর মধ্যে দিয়ে উভয়ের থেকেই আলাদা হওয়ার চেষ্টা করা। তার মানে কিন্তু আবার এই না যে বিএনপি যেভাবে আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করে – এটা সেই পর্যায়ের রেশারেশি। বলা যেতে পারে এটা একটা ইন্টেলেকচুয়াল ফ্যাড কিন্তু পরস্পরের সাথে রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক একাত্মতা ঘোষণা না করার জন্য যথেষ্ট। ভিকারুন্নিসা স্কুল থেকে পাশ করা মেয়েরা যেমন করে ভারতেষ্মরী হোমসের মেয়েদের দেখে অনেকটা সেরকম।

কিন্তু এই ভুলটা ততোটা মারাত্মক না যতোটা দ্বিতীয়টি। শাহবাগী, আওয়ামী, সেনট্রিস্ট, বিএনপি,সুশীল, ডিজুস – মানে আরবান ক্লাসের বিশাল একটা অংশ মনে করে যে এই ইসলামিস্টরা আন্ডার এচিভার কিংবা সহজ বাংলায় ভোন্দা গাজীর দল।

বাংলাদেশে ৬০ ও ৭০ এর দশকে সবচেয়ে মেধাবীরা বাম রাজনীতি করতো, এখনকার বাংলাদেশে সবচেয়ে মেধাবীরা রাজনীতি-বিমুখ বললে কম হবে, সম্ভবত অনেকে ঘৃণাই করে এই বিষয়টি। কিন্তু যারা রাজনীতি করে (অর্থাৎ সশরীরে এক্টিভিজম করেন, দল করেন, সংগঠিত হন – ফেসবুকে না শুধু), তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও পড়াশোনা জানা ছেলে-মেয়েরা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ধারায় হয় ইসলামিস্ট, নয়তো বাম ধারার (কিন্তু বাম ধারার সংখ্যাটা খুবই কম) / ছাত্রদল কিংবা ছাত্রলীগের ছেলে-পুলেরা মেধার দিক থেকে ইসলামিস্টদের ধারে কাছেও না।

আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার হোলো সারা পৃথিবীতে যারা নিজেদের প্রগ্রেসিভ ঘরানার রাজনীতি করেন বলে দাবী করেন তারা অনেক বেশী সহনশীল হন আর ইসলামিস্টরা হয় অসহনশীল। বাংলাদেশে হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টা। এখানে যে নিজেকে লিবার্টিন বলে দাবী করে, সে আবার ফাসিও চায়। একদিকে সে নিজেকে সেকুলার বলছে অন্য দিকে “প্রয়োজনে লাখ খানেক মানুষকে হত্যা” করার পরামর্শও দিচ্ছে। এবং সব সময় সে রেগে থাকে – মানে ভয়ঙ্কর ধরনের রাগ। পরমতসহিষ্ণুতার দিক থেকে বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগ্রেসিভ ক্লাস এতোটাই প্রতিক্রিয়াশীল যে “সভ্য মত বিনিময়” মোটামুটি অসম্ভব হয়ে যায়।

আশ্চর্য ব্যাপার হোলো ইসলামিস্টরা অপেক্ষাকৃত বেশী সহনশীল (আমি বাসুদা ও মেজবাহ আহমেদ পর্যায়ের ইসলামিস্টদের কথা বলছি না)/ তাদের সাথে অন্তত কিছু সময় আপনি গালিগালাজ ছাড়া তর্ক করতে পারবেন (এটা নিতান্তই আমার পর্যবেক্ষণ)।

কথা হোলো, আসল কথা হোলো – ইসলামিস্টরা কি সংগঠিত হতে পারবে এবং হলেও তারা কোন ধরনের ইসলামিস্ট হবে?

প্রথমত একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের ইসলামিস্টরা চরিত্রে টার্কিশ ইসলামিস্টদের কাছাকাছি, তালেবানদের মতো না কারণ ইসলামিস্ট নেতা এবং নেতৃস্থানীয়দের বিরাট অংশ আদতে অন্টাপ্রেনিওর – সহজ ভাষায় তাদের কাছে টাকা আছে এবং তারা ইসলাম না বুঝলেও ব্যবসাটা ভালো বোঝেন। সুদূর ভবিষ্যতে তারা যদি কোনোদিন ক্ষমতায় যায় – যে একটি পেশার মানুষ তাদের ব্যাপারে সব চেয়ে খুশী থাকবে বলে আমার ধারণা – তারা হোলো ব্যবসায়ী শ্রেণী।

কিন্তু ক্ষমতায় যেতে হলে যে পরিমাণ সংহতি ও পরিপক্কতা দেখাতে হবে তা কি তারা পারবে?

সম্ভবত না।

বাংলাদেশের ইসলামিস্টরা বাঙালি ইসলামিস্টও বটে – অনর্থক তর্কে তাদের অনন্ত অনুরাগ। নিজেদের মধ্যে কারা শুদ্ধতম ইসলামের অনুসারী – এ আলোচনার ক্ষুধা তাদের কেয়ামতের পরেও বলবৎ থাকবে। এটাকে মুসলমানদের কুইনটাসেনশিয়াল বৈশিষ্ট্য বললেও অত্যুক্তি হবে না।

কিন্তু

শাহবাগীরা মনে করেন বিএনপির যে বিশাল জনসমর্থন আছে দেশব্যাপী তারা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে ইসলামিস্ট হয়ে উঠবে। এর কারণ হিসেবে তারা যা মনে করেন তা হোলো বিএনপি আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল পক্ষান্তরে ইসলাম একটি ১৪ শ বছরের পুরোনো আদর্শ। বিএনপি টিকে আছে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের কারণে। তার মৃত্যুর পর এন্টি-আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্টের জন্য বেটার আউটলেট হয়ে যাবে ইসলাম এবং বিএনপি ছেড়ে সবাই ইসলামপন্থীই হয়ে যাবে। অর্থাৎ সেনট্রিস্টরা ক্রমশ এক্সট্রিমিস্ট হয়ে উঠবে। মোটামুটি কাছাকাছি ধারণা আমি দেখেছি কিছু কিছু বিএনপিপন্থীদের মাঝেও।

প্রশ্নটা আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে যিনি মোটামুটি পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি দেখেছেন কাছে থেকে এবং যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর আস্থা রাখা যায়। তিনি বললেন আর সব কিছু যদি মেনেও নেই, ইসলামিস্টদের নেতৃত্বটা দেবে কে? তার মতে ইসলামিস্টদের মধ্যে জামাত ছাড়া অন্য কোনো অংশ “রাজনীতি” “বোঝে” না এবং জামাতেরও যে একজনমাত্র নেতাকে তার মনে হয়েছে যে পরিবর্তিত পৃথিবীতে ইসলাম-পন্থী দলের ভূমিকা কী হবে এটা বোঝার মতো প্রয়োজনীয় সফিস্টিকেশান ও দূরদৃষ্টি আছে – তিনিও জেলে এবং সম্ভবত তার ফাঁসি হবে (আমার অপ্রয়োজনীয় মত: এই লোকটা আমার জানামতে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী এবং তার মৃত্যুদন্ড হওয়াটা হবে সঙ্গত)

কিন্তু যদি এমন হয় –

খালেদা-হাসিনার পর বাংলাদেশে অন্তত আওয়ামী লীগ-বিএনপির কোনো নেতা কোনোদিনও এ পরিমাণ ক্ষমতা সংহত করতে পারবেন না – সেটা জানা কথা। সে ফাঁকে ইসলামিস্টরা যদি একটা ইমরান খান খুঁজে পায়। পশ্চিম-ফেরত, ইংরেজিতে বক্তৃতা দেয়, ক্লীন শেভড, জন স্টুয়ার্ট মিল কোট করে, মিল্টন ফ্রিডম্যান কোট করে আবার কোরানের আয়াতও শুদ্ধ আরবীতে উচ্চারণ করে মেঠো বক্তৃতায়। অন্তত বিএনপি-আওয়ামী লীগের চেয়ে ইসলামিস্টরা যে গভর্নেন্সের দিক থেকে সফল হবে এ ব্যাপারে বেশীরভাগ লোক একমত হবেন। বিভিন্ন দলের সেনট্রিস্টরা যদি ইসলামের পতাকাতলে চলে এসে? এরকম একটা অবস্থার নিপুন বর্ণনা দিয়েছেন শফিকুর রহমান। তখন তো ইসলামিস্টরা এগিয়ে আসতে পারে।

আমি এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিই না। কিন্তু আমার ধারণা ইসলামিস্টরা সফল হবেন না। কেন?

সমস্যাটা ইসলাম নিজে। লিবারেল আইডিয়োলজির একটা সুবিধা আছে যেটা ইসলামের নেই। ব্যক্তিগত প্রশ্ন আসলেই লিবারেল আইডিয়োলজি বলতে পারে – এটা বাপু তোমার সমস্যা, ডু ওয়াটএভার য়ু লাইক। আপনি মদ খাবেন না স্লীভলেস কামিজ পরবেন এটা আপনার নিজের ব্যাপার – এখানে আমার কিছু করার নেই। বাই ডেফিনিশন ইসলাম একটা ধর্ম, তাকে রিএক্ট করতে হয়, দর্শকের ভুমিকা নিতে পারে না। ইসলাম বলতে পারে না গো ফাক য়োরসেল্ফ, এটা আমার সমস্যা না। রাষ্ট্র চালাতে গেলে “এটা আমার সমস্যা না” বলাটা খুব জরুরী, যেটা ইসলাম পারে না। ইসলাম একটা ধর্ম কিন্তু রাষ্ট্র একটা পলিটিকাল কনস্ট্রাক্ট। দিন শেষে বাস্তবতা হোলো য়োরোপিয়ান এনলাইটেনমেন্টের ফলাফল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিক-নির্দেশনা কারী মতবাদ হিসেবে পলিটিকাল ইসলাম কমপ্যাটিবল না। রাষ্ট্রের দার্শনিক গন্তব্য হোলো ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ইসলামের দার্শনিক গন্তব্য হোলো সমর্পনের মাধ্যমে অর্জিত শান্তি। প্রশ্নটা ইসলাম ভালো না লিবারেল ডেমোক্রাসি ভালো – তা না; বরং এটা কমপ্যাটিবিলিটির ইসু – “রাষ্ট্রব্যবস্থার” সাথে ইসলাম যায় কি না?

Image

আমাদের দেশে পলিটিকাল ইসলামের প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করতে হলেও কয়েকটা মৌলিক প্রশ্নের সুরাহা করতে হবে। সারা পৃথিবীর ইসলামিস্টদেরই বোধ করি করতে হবে।

এগুলো কী?

পলিটিকাল ইসলামের দিক নির্দেশনা প্রত্যক্ষভাবে কোরানে নেই (যেমন আপনার নেতাকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করা হবে কি না)/  কিন্তু মুসলমানের ব্যক্তিজীবন কেমন হবে – এর অতি খুটিনাটি ব্যাখ্যাও কোরানে আছে। পলিটিকাল ইসলামকে রাষ্ট্র-পরিচালনাকারী মতবাদ হিসেবে যারা দেখতে চান তাদের এমন কিছু বিষয়ে আপোষ করতে হবে যার নির্দেশনা কোরানে আছে। যেমন ধরুন ইসলামিস্টদের বাংলাদেশে হিন্দু প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি না কিংবা পোষাক পরিধানে ইসলামের কিছু বাধ্য-বাধকতা আছে, এর মাঝে কোনো যদি কিন্তু নেই। কিন্তু অনেক মুসলমান ছেলেমেয়েই আছে যারা এই বাধ্য-বাধকতা মানেন না কিংবা মানতে চান না। এখন ইসলামিস্টরা চোখ বুজে থাকতে পারেন কেননা তারা বলতে পারেন যে ভাই এটা তো আমাদের মাথা-ব্যথা না কারণ আমাদের কাছে ক্ষমতা নেই। যখন ক্ষমতা আসবে তখন কিন্তু তারা দর্শক থাকতে পারবেন না, পক্ষ নিতে হবে। রাষ্ট্র পর্যায়ে ইসলামের বাস্তবায়ন করার জন্য (যার সরাসরি নির্দেশনা নেই কোরানে), তারা কি ব্যক্তি পর্যায়ের ইসলামের সাথে আপোষ করার মতো (যার সরাসরি নির্দেশনা নেই কোরানে) সাহস দেখাতে পারবেন?

আমার ধারণা বিশ্বব্যাপী এ ধরনের সাহসী পদক্ষেপের জন্য যে ধরনের কনসেনসাস প্রয়োজন, ইসলামিস্টরা তার ধারে কাছেও আসতে পারে নি। বাঙালি তর্কপ্রিয় এবং শিশুতোষ তর্কে তার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি (অর্থনীতির নোবেল প্রাইজ যে আসলে নোবেল প্রাইজ না এবং অর্থনীতির নোবেল লরিয়েটদের নোবেল লরিয়েট বলা হলে বিশাল অপরাধ হয়ে যাবে – এ নিয়ে বাংলার দামাল বুদ্ধিজীবী ন্যশনাল মিডিয়ায় দীর্ঘ সময় আলাপ করেন)।

এটা আমাদের মাথাব্যথা না – আপনি যেভাবে খুশী করেন, এ বিষয়ে আমার কোনো মতামত নেই – এ ধরনের চিন্তা করাও বাঙালির পক্ষে অসম্ভব।

বাংলাদেশের মানুষ চরিত্রে সেনট্রিস্ট – সে ওয়াজে গিয়ে চোখের পানি ফেলে আবার যাত্রা দেখেও আদ্র করে মন। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে সফল হওয়ার চাবিকাঠি এই ব্যালেন্সিং এক্টের মধ্যে। যে একদিকে বেশী ঝুঁকে পড়বে তারই বিপদ। এই জিনিসটা বোঝে বিএনপি এবং এককালে আওয়ামী লীগও বুঝেছিলো। কাজটা করার জন্য সামষ্টিকভাবে যে পরিপক্কতা প্রয়োজন, ইসলামিস্টদের তা তাদের নেই। ভবিষ্যতে হবে কি না জানি না তবে ইসলামিস্টদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হোলো আওয়ামী লীগ। যে একমাত্র যুদ্ধে ধর্মের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তা হোলো ধর্মযুদ্ধ এবং আওয়ামীবাদ ইসলামিস্টদের একটা ধর্মযুদ্ধই উপহার দিয়েছে। যে পোলারাইজেশান প্রজেক্ট আওয়ামী লীগ হাতে নিয়েছে তার একমাত্র ফলাফল হোলো দুটো ধর্মীয় উন্মাদনা: শাহবাগী চেতনা বনাম ইসলামী জজবা। এই ধর্মীয় উন্মাদনা চেতনাবাদকে কয়েকবার ধ্বংস করার জন্য যে যথেষ্ট – এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই, পুরো দেশটাই না ধংসাত্মক উন্মাদনায় মশগুল হয় – সেটাই দেখার বিষয়।

সারভাইভাল এক্টে চিন্তা ভাবনার কোনো সুযোগ থাকে না। সমস্যা হোলো সারভাইভাল এক্টের বিজয়ীদের চিন্তা ভাবনা করতে না দেয়ার খেসারত দেয় পুরো জাতি – ইতিহাসে এর শত শত উদাহরন আছে।

সত্য হোলো; শুধুমাত্র যে একটি পথে ইসলামিস্টরা সফল হতে পারে, ঠিক ওই পথেই তাদের ধাওয়া করছে লীগ।

ফোটো ক্রেডিট:

David Lazar (Girl with green eyes and red headscarf)

পাভেল রহমান/AP

Flying with broken wings

Jyoti Rahman

Pakistani voters queue outside a polling

A magical realist masterpiece, Salman Rushdie’s Midnight’s Children has weird and improbable events and people juxtaposed against the history of the 20th century South Asia up to the late 1970s. One such improbable fact was that at the time of writing, and thus the story’s culmination, military rulers of the erstwhile two wings of Pakistan had the same first name.

This is not the only parallel between the political history of Bangladesh and post-1971 Pakistan.

Both successor states of United Pakistan started with larger-than-life charismatic leaders, whose rules ended in tragic denouement inconceivable in 1972.  Both giants found governance to be much harder than populist rhetoric, both resorted to un-democracy, and both ended up meeting cruel ends at the hand of their trusted guards.  Both countries succumbed to dictatorships in the 1980s, although the extent and mechanism varied.  In both countries democratic opposition developed.  In both countries, some form of democratic politics came into practice by the 1990s.

But democracy has failed to take root in either, with military interventions or threats thereof, remaining a constant feature.  In both countries, electoral democracy has meant two mutually antagonistic parties/coalitions who differ little on policy, but much on personality and the thirst for power over patronage and privilege.  Both countries have experienced increasing religious extremism. More recently, in both countries, judiciary and media are experimenting with new found powers, not always to the best effect.

Throw in the political economy of NGO-led development in Bangladesh, or the misfortune of being next to a theatre of the Great Game for Pakistan, and it’s easier to see why democracy may have had such a hard time in these countries. Indeed, with increasing NGO activities in Pakistan and the Great Game coming to Myanmar — a theatre closer to Bangladesh — both countries have much to learn from each other’s misfortunes.

2014-01-05T144958Z_01_DHA056_RTRIDSP_3_BANGLADESH-ELECTION-8825

Of course, in Bangladesh, the discourse around Pakistan is so full of vitriolic jingoism that any suggestion of learning something from the Pakistani experience is likely to be met with scorn.  But even outside Bangladesh, there is not much by way of comparative studies of Bangladesh and Pakistan.

William B Milam’s Bangladesh and Pakistan: flirting with failure in South Asia is a rare exception.  This slender —276 pages including reference and index —volume begins with a brief history of the erstwhile united Pakistan, and then tracks the military-civilian back-and-forth in the two countries up to 2008.  The author, a former American Ambassador to both countries, can bring unique perspective to the subject matter.  And the book’s conclusion —the tipping points between real democracy and more of the same in Bangladesh and Pakistan are yet to be reached—is something one can hardly quibble with.

One does not read a retired career diplomat for facts and figures.  And this book is not full of facts and figures.  However, one might expect a lot of interesting anecdotes from someone who served in Bangladesh as the Ershad regime ended and in Pakistan when the Musharraf regime started.  Sadly, Milam does not give us such tidbits.

Instead, he opens up a range of questions that could be, ought to be, explored in depth.  Truth be told, it’s a tad disappointing that Milam does not push any of these issues further.  But then again, at least Milam has written a book.  Surely there are others who can add to the literature.

What are these questions?  One is about the role of India in the two country’s politics.  Another is Islam.  I am going to skirt over these two, not because they are unimportant, but because these are fairly well trodden grounds.

Instead, let me pick up the issue of military involvement, and withdrawal, from politics in the two countries.

From the vantage point of December 1971, one might have expected some form of military involvement in Bangladeshi politics.  The nucleus of the Bangladesh army was the victorious Mukti Bahini, and its commanders like Ziaur Rahman might have expected some say in the new country’s affairs — historically, states founded by guns tend to give armed men some (if not all) power.

However, it should have been a different matter in what was left of Pakistan.  If there was a state where the army rule, directly or otherwise, should have been thoroughly repudiated, it should have been Pakistan after December 1971.  Army rule had lost half the country.  A quarter of the army itself was taken prisoner-of-war by the ‘hated enemy’.  The country was bankrupt, with its major port severely damaged.  The idea that generals could save Pakistan should have died in the swamps of Bengal.

Of course, it didn’t.

ZA Bhutto used the army to silence legitimate dissent in Balochistan. And then, in 1977, he tried to rig an election that he might have won anyway, resulting in months of street violence and political gridlock, which paved the way for Gen Zia-ul-Huq’s grim rule.

That’s the most straightforward reading of things.  Writers as diverse as Tariq Ali or Anatol Lieven agree that Mr Bhutto deserves to be blamed, if not solely or in whole measure, then at least substantially, for the remilitarisation in Pakistan.  So, the question then is, was Pakistan just unlucky to have Bhutto, or was there something about Pakistan that made his power grabs more likely?

Let’s look at the issue from a different perspective.  Milam ends his book with the observation that the prospect of democracy, indeed the very survival of the state, was bleaker in Pakistan than Bangladesh.

As of 2008, Bangladesh army —not formally in charge in the first place — was in the process of handing over power to a democratically elected government.  In Pakistan, on the other hand, there was a shaky coalition facing jihadi violence, with everyone assuming that it was the clean-shaved general and not the mustached civilian who had the ultimate power.

As of 2008, hardly anyone doubted that the incoming Awami League government would finish its five year term.  After all, three previous elected governments had finished their full terms, something no elected government (with possible exception of Mr Bhutto, depends on how one sees things) in Pakistan had done until then.  In Pakistan, at the time, hardly anyone expected Asif Ali Zardari to finish his term peacefully and hold an election in five years’ time.

As it happens, the Awami League did finish its five year term, and has just elected itself —not sure how else to put it politely —for another five years.  But surprising everyone, Mr Zardari also lasted five years in office, as did the Pakistani parliament that was elected in 2008.  For the first time in Pakistan’s history, a democratically elected civilian government handed over power to another such government last year.

So, did Pakistan get lucky with Zardari (or Nawaz Sharif, or Gen Ashfaq Kayani)?  Or did something about Pakistan change between the 1970s, or even the 1990s, to now?

Bangladesh army has shown little interest in running the country in recent years.  Had it wanted to, there were many occasions in the past year where the army could have toppled the government, with a large section of the civil society and opinionmaking class fully cheering on any coup.  But by all accounts, the army has chosen to remain out of politics.  Even its 2007 not-quite-formally-a-coup was at best a half-hearted affair, with full insistence of constitutional fig leaves, no matter how muslin-thin the leaves might have been.

What had changed about Bangladesh army from its coup-prone past?

Why do armies intervene, or not intervene?  Let’s go through a few conjectures.

At the simplest level, perhaps it’s all about the base, corporate interest.  Pay them well, and the armies will be happily in the barracks?  This may well be a major story in Bangladesh.  After all, dal-bhaat grievances were a major (though by no means the only) factor in soldiers’ mutinies of 1975 and 2009.  However, considering the lavishes spent on the forces by the current government, money should not matter for any would be Bangladeshi coupmaker.  And to the extent that no one —not even Bhutto le pere—tried to clip the army’s economic interests in Pakistan, it’s hard to argue that this has been a deciding factor there.

Perhaps the story is a bit more highbrow?

As is widely accepted, Pakistan army sees itself as the ultimate arbiter of that country’s foreign and defense policies, particularly when it comes to relations with India. As long as these domains are untouched, perhaps the generals are content to let the civilians govern.  In that respect, perhaps Pakistan army is similar to the ‘guardian’ armies of Turkey or various Arab republics or Thailand, where the army decides, for whatever historical reasons, that certain areas are no-go for civilian politicians, and they enforce the no‑go-zones through coups if necessary.

Does Bangladesh army see itself in such a guardian role?  When a crisis hits, does it see its role as the national saviour?  In the blood-soaked 1970s, individual officers saw themselves as potential national heroes—call it the curse of the majors.  But from the 1980s onwards, as a collective, perhaps Bangladesh army waits for orders rather than marching to their own bit?  After all, in February 2009, the entire brass held fire and waited for orders that never came.

Of course, this is exactly how it should be.  Armies are meant to be guards, not guardians.  On balance, it’s a good thing that the army has not intervened during Bangladesh’s latest political drama.

But can that remain the case indefinitely?  After all, it was Bhutto’s hubris that allowed Zia’s power grab in 1977.  Could something like that happen yet again?

Even if it doesn’t, it’s important to understand that military rule is not the only obstacle to democracy in Bangladesh and Pakistan —a theme that runs through Milam’s book, and one that needs to be explored further.  After all, it was Mr Bhutto who opened the door for the generals to march back in.  So, the question again, was Pakistan unlucky with Mr Bhutto, or was there something about Pakistan?  And more recently, did it get lucky with Messrs Zardari and Sharif, or has something changed there?

Here is another conjecture —for all their personal genius, foibles and shortcomings, it wasn’t the individuals, rather, something did change in Pakistan between the time of Bhutto and Zardari.  In the intervening years, multiple centres of power —not just the army-bureaucracy and a towering politician, but also political parties representing different provinces and ethnicities and constituencies, as well as media, judiciary and other civil society organisations —developed in Pakistan.  While this fragmentation of authority may hamper its policy deliberations, it probably has driven home to Pakistani politicians the need to coexist and tolerate each other.  Papa Bhutto stood above everyone, and couldn’t countenance anyone else’s existence.  Sharif brothers had learnt to live with others.  Perhaps that’s what has saved Pakistan, at least for now.

What about Bangladesh?

This is what Milam says in the penultimate page: Perhaps there is more hope that a real, sustainable democratic culture can develop in Bangladesh, but old habits die hard.

And thus we come to today’s Bangladesh, on which, Milam observes:

…a government which, because of the perverted institutions of the state, is in a position to eliminate the opposition as a force to be reckoned with, and move towards a one-party state. This election, instead of deja vu all over again, could be the tipping point to something entirely new on the subcontinent.

Bangladesh may well have come a full circle in the past four and half decades.  At the beginning of the 1970s, with the left fractious and the right discredited for its role in the country’s freedom struggle, Awami League was the only major organised political force in Bangladesh.  Whatever we have, it’s not democracy.

And, Sheikh la fille may well prove to be more successful than her father.  Again, over to Milam:

But politics aside, it is 2014 in Bangladesh. The chronic instability and near-anarchy, as well as the abject poverty that prevailed in 1975, have long since disappeared. Bangladesh, while still poor and in the stage of economic development where gains can easily be reversed, is now wired into the global economy with its vibrant garment and other export industries. Growth has been strong for most of the past two decades, and the country as a whole is much more prosperous. More importantly, it has a much more literate and healthy population because of the strides that have been made in mass education and in reducing gender disparity.

In Shame, his novel on not-quite-Pakistan, Rushdie calls the country Peccavistan. Peccavi in Latin means I have sinned.  This is the message Sind’s English conqueror sent back to the John Company after he took the country by deception and ‘rascality’.  Pakistan used to be governed by deception and rascality, hence the name Peccavistan.

When the results of Pakistan’s first general election became known 37 years ago, a western journalist quipped that Pakistan would soon be replaced by Mujibdesh and Bhuttostan.  As things stand, we should rename our country East Peccavistan.

And things will remain as they are unless we choose democratic politics.  Make no mistake, that’s hard work.  But that’s what it comes down to.  A bird cannot fly with broken wings.  Our democracy is broken.  People governing the country are doing so not with democratic mandate.  Choosing democracy means opposing this deception and rascality.  Only by joining and fixing the opposition, so that when the table turns it lives and lets live, can we end East Peccavistan.

Dear reader, the choice is yours, will you choose Bangladesh?

স্যারের ফোনকলঃ সরকারী ধর্ষণ ট্রিলজি পার্ট ওয়ান

by – আমান আবদুহু

 

সিলেটে পড়ার সময় আরিফ ছিলো ভার্সিটির পরিচিত মুখ। গণিত অলিম্পিয়াড, বিতর্ক, বই পাঠ প্রতিযোগিতা সব কিছুতে প্রথম সারির অংশগ্রহণকারী, পরে সে হয়ে গেলো আয়োজনকারীদের একজন। জাফর ইকবাল স্যারের ক্লোজ সার্কেলটার অল্প কয়েকজন ছাত্রের একজন। স্যারের এক ভক্তের সুবাদেইতো গ্রামীণফোনে মোটা বেতনের চাকরীটা হয়ে গেলো, মাষ্টার্সের থিসিস সাবমিট করার আগেই।

এখন আরিফ সারাদিন অপেক্ষা করে কখন অফিস শেষ হবে। সারাদিনই নাদিয়ার কথা ভাবে সে। রুপনগরে নতুন উঠা এপার্টমেন্টের বাসাটা তাকে সারাদিন চুম্বকের মতো টানে। অফিসের গাড়ি যখন তাকে বাসার সামনে নামিয়ে দেয় তখন লিফটের জন্য অপেক্ষা করতেও তর সয় না। অসহ্য মনে হয়। অবশ্য সপ্তাহের কোন কোন দিন তার বউ নাদিয়া দেরী করে অফিস থেকে ফেরে, ঐসব দিনে সে বাইরের কাপড় না খুলেই বসে বসে টিভি দেখে।

টিভিটা তার খুব প্রিয়। আটচল্লিশ ইঞ্চি প্লাজমা টিভিতে একাত্তর টিভি এতো পরিস্কার দেখায়, জীবন্ত হাই ডেফিনিশন! পরদিন শনিবার ছুটি, তাই অনেক রাত হয়ে গেলেও ওরা দুজনে টিভি দেখছিলা। জামাত শিবিরের তান্ডব, বাসে বিএনপির লোকজনের দেয়া আগুন।

এমন সময় দরজায় জোরে জোরে নক করার শব্দ শুনে আরিফ একটু অবাক হয়, সিকিউরিটি তো ফোন করে কিছু জানায়নি। দরজা খুলে দেখে এমদাদ সাহেব এবং তার সাথে দুইজন মোটাসোটা পুলিশ অফিসার দাড়ানো। একজনের দিকে প্রথমেই চোখ চলে যায়, জঘন্য রকমের হোতকা ও কালো। চেহারাটা ভাবলেশহীন, কিন্তু নোংরা ভাব চোখেমুখে। ভয় লাগে, ঘৃণাও লাগে।

এমদাদ সাহেব একই এপার্টমেন্টের আটতলায় থাকেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যাবসায়ী। মাঝে মাঝে লিফটে অথবা নিচের পার্কিং এ দেখা হয়। আরিফ খেয়াল করেছে লোকটা সুযোগ পেলেই নাদিয়ার শরীরে চোখ বুলিয়ে নেয়।

ভেতরে ঢুকে এমদাদ সাহেব আর একজন পুলিশ অফিসার সোফায় বসে, মোটকা অফিসারটা বুকশেলফের বইগুলো দেখতে থাকে। এমদাদ সাহেব পরিচয় করিয়ে দেন, ইনি সালাউদ্দিন সাহেব আমাদের মীরপুর থানার ওসি। আর উনি ফখরুল ভাই, সেকেন্ড অফিসার।

ভোটকা সেকেন্ড অফিসার ফখরুল ততক্ষণে বুকশেলফ থেকে কোরআন, মকসুদুল মোমেনীন আর বেহেশতি জেওর তিনচারটা বই নামিয়ে টেবিলের উপর রাখে। মোটা ভুড়ির জন্য ঝুঁকতে তার একটু কষ্ট হয়। ওসি সাহেব একবার নাদিয়া আরেকবার আরিফের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন। পুরুষ্ট গোঁফে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞাসা করেন, তো আরিফ সাহেব কতদিন থেকে জামাত করেন?

আরিফ জোর প্রতিবাদ করতে যায়, অনেক কথা বলে উঠে। এমদাদ সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, বুঝতেই পারছেন আরিফ সাহেব এইসব জিহাদী বই আপনার বাসায়, কি ডেঞ্জারাস সিচুয়েশনে পড়েছেন আপনি। এখন থানায় নিয়ে আপনাকে বিস্ফোরক আর ভাংচুর মামলায় আসামী করা হবে। রিমান্ড হবে জেল হবে, আপনার চাকরিও চলে যাবে। আপনার জন্য পুলিশ আদালত বিভিন্ন অফিসে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে ভাবীর অবস্থা কি হবে ভেবে দেখেন। আপনাদের দুজনের পুরো জীবনটা তছনছ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যদি কোঅপারেশন করেন তাহলে কোন সমস্যা হবে না। কেউ কিছু জানবেও না। ডিসিশন আপনার।

বলতে বলতে এমদাদ সাহেব আবারও নাদিয়ার উপর চোখ বুলান।

পরের ঘটনাগুলো যেন সিনেমার পর্দার মতো একেরপর এক ঘটে যায়। আরিফ সোফায় স্থবির দর্শক হয়ে বসে থাকে। কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে সে ডাচ-বাংলার চেকে সাইন করে দেয়। এবং তারপর পুরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে যায়। একটা কথা বলার শক্তিও সে জোগাড় করে উঠতে পারেনা। কয়েকবার তার বুঝে আসে না এসব কি বাস্তব, না স্বপ্ন দেখছে সে। নাদিয়ার হাত ধরে ওসি সালাউদ্দিন সাহেব বেডরুমে চলে যান। নাদিয়া যেতে চায়নি, কিন্তু ওসি সাহেব গাট্টাগোট্টা শক্তপোক্ত মানুষ। একহাত নাদিয়ার পেছনে রেখে তিনি অনেকটা ঠেলেই নিয়ে যান তাকে।

পরে ওসি সাহেব বেরিয়ে এলে এমদাদ সাহেব ও সেকেন্ড অফিসার ভোটকা ফখরুলও বেডরুমে যায় আর পরে বেরিয়ে আসে। আরিফ ও অন্যরা সবাই মিলে আটচল্লিশ ইঞ্চি এলসিডি স্ক্রীণে একাত্তর টিভি দেখতে থাকে। সেকেন্ড অফিসার ফখরুল ফ্রিজ থেকে একটা ঠান্ডা পানির বোতল এনে ওসি সাহেবের গ্লাসে পানি ঢেলে দেয়।

পরদিন অফিসে আরিফ অসহ্য রাগে দুঃখে ভেঙ্গে যেতে থাকে। এমন এক ঘটনা, কাউকে কিছু বলাও যায় না। দুপুরে সে জাফর ইকবাল স্যারকে ফোন করে। স্যার পুরো ঘটনা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বলেন, এই দেশে এটা অসম্ভব। যারা একাজ করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের দলটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুযোগসন্ধানী শত্রু। আরিফ তুমি বিন্দুমাত্র চিন্তা করবে না আমি এখনই প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলছি। কালকের ভেতরে তুমি দেখবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

স্যার আরিফকে অনেক সান্তনা দেন।

নাদিয়া সেদিন অফিসে যায়নি। পরদিন থেকে অবশ্য আবার অফিস করা শুরু করে। তবে আরিফের দিকে তাকায় না, আরিফের সাথে কথা বলে না। একসপ্তাহ চলে যায় এভাবে, আরিফ কি করবে বুঝতে পারেনা। শেষপর্যন্ত শুক্রবার রাতে আরিফ চেষ্টা করে নাদিয়া কে বুঝাতে। নাদিয়াকে সে বলে, স্যার বিষয়টা দেখছেন। দেখবে ওদের কঠিন শাস্তি হবে। স্যার বলেছেন এরা জামাত শিবিরের গুপ্তচর। এসময় দরজায় জোরে জোরে ধাক্কার শব্দ!

আরিফের হার্টবিট যেন এক মুহুর্তের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সে জাফর ইকবাল স্যারকে কল করতে থাকে। স্যারের ফোন কেউ রিসিভ করেনা। আরিফ চিন্তায় পড়ে যায়, স্যার তো রাত জেগে পড়ালেখা করেন। কি হলো, স্যার ফোন ধরছেন না কেন? এদিকে দরজায় ধাক্বা বেড়ে যায়, দেরী হলে আশেপাশের ফ্লাটের মানুষজনও জেনে যাবে। কতক্ষণ আর দরজা বন্ধ করে রাখবে!!

পিপহোল দিয়ে সে দেখে আগের তিনজনই আন্তরিক বন্ধুর মতো দাড়িয়ে আছে। দরজা খোলার পর ওসি সালাহউদ্দিন সাহেব হেসে বলেন, কি খবর আরিফ সাহেব? কোথায় কোথায় ফোন করেছিলেন বলে হাহাহাহাহাহা শব্দে একটা আমুদে অট্টহাসি দেন। এরপর এমদাদ সাহেব আর সেকেন্ড অফিসার ফখরুল আরিফের সাথে বসে টিভি দেখে।

ভোটকা ফখরুল চ্যানেল বদলে এমটিভি চালিয়ে দেয়, ঐশ্বরিয়ার নাচ দেখাচ্ছে। নাচ দেখতে দেখতে আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদ সাহেব উরুসন্ধিতে হাত দিয়ে অন্ডকোষের নিচের দিকটা চুলকান। ভোটকা ফখরুল সোফায় হেলান দিয়ে বসে নিজের ভুড়ির উপর হাত বুলায়। আরিফ ভাবতে থাকে, জাফর ইকবাল স্যারকে ফোন করতে হবে।

গণতন্ত্র কতটা গণতান্ত্রিক

মুহাম্মদ আব্দুল খালিক

সামাজিক বৈষম্য নিরসন, জনগণের ক্ষমতায়ন, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্র রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার পালাবদলের আধুনিক সংস্করণ। বিভিন্ন মনীষী একে সংজ্ঞায়িত করেছেন ভিন্ন ভিন্নভাবে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো একে আখ্যায়িত করেছেন মুর্খের শাসন হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার’ হিসেবে। এছাড়াও গণতন্ত্রের পক্ষে বিপক্ষে নানা রকম বক্তব্য পেশ করেছেন মনীষীরা।

২.
এখন আমাদের সামনে যে মৌলিক প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে সেটা হলো, গণতন্ত্র নিজে কতটা গণতান্ত্রিক? এটা কি অধিকাংশ মানুষের মতের বহিঃপ্রকাশ? এর মধ্য দিয়ে কি জনগণের ক্ষমতায়ন ঘটে? কিংবা এটা জনগণের জীবন-মান উন্নয়ন, সাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখে?
বাস্তব চিত্র হলো গণতন্ত্র স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। কখনো পায় পরিবার তন্ত্রের আদল, কখনো কতিপয়তন্ত্রের, আবার কখনো বা একনায়কতন্ত্রের। কতিপয় কর্পোরেট শক্তির স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় গোটা ব্যবস্থাটি। এরা বিশেষত প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করে জনমত গঠন করে থাকে। এছাড়া এরা লালন করে ক্যাডার বাহিনী, যারা শক্তির জোরে স্বার্থোদ্ধারের পাশাপাশি সমাজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখে।

৩.
আমরা একটি উদাহরণের মাধ্যমে নির্বাচনে জনগণের মতামতের বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটে তা বোঝার চেষ্টা করবো। ধরি, কোনো এক দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১০টি (এছাড়াও সতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে)/  যদি নির্বাচনে কাস্টিং ভোটের সংখ্যা ৭০% হয়, তাহলে ভোট প্রদানকারী মোট ভোটারের সংখ্যা হবে ৭০ লাখ। এখন, প্রধান ৪টি দলের প্রাপ্ত ভোটের পার্সেন্টেজ যথাক্রমে ৪০%, ৩০%, ১২% ও ১০%/ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সতন্ত্রপ্রার্থী মিলে প্রাপ্ত ভোটের পার্সেন্টেজ ৮%। সুতরাং ১ম দল পেল ৪০% = ২৮ লক্ষ ভোট, ২য় দল পেল ৩০% = ২১ লক্ষ ভোট, ৩য় দল পেল ১২% = ৮ লক্ষ ৪০ হাজার, ১০% = ৭ লাখ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সতন্ত্রপ্রার্থীরা পেল ৮% = ৫ লক্ষ ৬০ হাজার।
লক্ষণীয় যে, ১ম দল ২৮ লক্ষ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে। আর আমরা জানি যে, মোট ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি। যার মধ্যে ১ম দল পায় ২৮ লক্ষ, আর তাদের না পাওয়া ভোটের পরিমাণ ৭২ লক্ষ। মাত্র ৪ ভাগের ১ ভাগ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে তারা সকল প্রকার ক্ষমতা ভোগ করে থাকে এবং তাদের বৈধ-অবৈধ সকল কাজের জবাব দেয় এ কথা বলে যে, তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করছে জনগণের স্বার্থে। মাত্র ১ ভাগ লোকের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকারকে কি আমরা জনগণের সরকার বলতে পারি? কিংবা গণতন্ত্রের পরিভাষায় তাদেরকে বলতে পারি বৈধ সরকার? আইন প্রণয়নসহ সার্বিক ব্যাপারে তাদের হাতে কি ন্যস্ত করা যায় রাষ্ট্রের সব রকম ক্ষমতা?

৪.
গণতন্ত্র বলতে যদি অধিকাংশ লোকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা বোঝানো হয়ে থাকে তাহলে আমাদের দেশে নির্বাচিত এমপিদের ক্ষেত্রে সে মতামত কতটা প্রযোজ্য হয়ে থাকে। যেখানে আমাদের দেশের ২৪ শতাংশেরও বেশি লোক দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে, যেখানে আরও কমপক্ষে ২৬ শতাংশ লোক নিম্ন মধ্যবিত্তের অন্তর্ভুক্ত; সেখানে আমাদের দেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৬৯ জন ব্যবসার সাথে এবং আরো ৪৪ জন আইন পেশার সাথে জড়িত (রিপোর্ট, প্রথম আলো)/  বলার অপেক্ষা থাকে না যে, এদের সবাই কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির অধিকারী। যদি সত্যিকার গণতন্ত্রই হত তাহলে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে কিন্তু আমরা দেখতে পাই এখানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয় উচ্চবিত্ত থেকে। তাই গণতন্ত্র না বলে একে কি আমরা ধনিকতন্ত্র বলতে পারি না?

৫.
নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার আমাদের দেশের সর্বজনবিদিত একটি বিষয়। এখানে যার যত কালো টাকা রয়েছে সেই তত নির্বাচনী দৌরাত্ম দেখিয়ে ভোটযুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে। সামান্য একশ’ দু’শ টাকা দিয়ে এখানে ভোট কেনা যায়। সুতরাং যার টাকা রয়েছে সে-ই না নির্বাচিত হবে? তবে শুধু টাকা থাকলেই হবে না, প্রধান কোনো দলের মনোনয়নও পেতে হবে। আর সেজন্য আপনাকে ইনভেস্ট করতে হবে লাখ লাখ (ক্ষেত্র বিশেষে কোটি কোটি) টাকা। কারণ নেত্রীর সুনজর পাওয়া তো আর সহজ কথা নয়!

৬.
কোনো দলই এখানে কারো ওপর আস্থাশীল নয়। কারণ, সবাই এখানে ক্ষমতার মোহে হয়ে পড়েছে হিংস্র পশুর ন্যায়। ক্ষমতাকে কিভাবে পাকাপোক্ত করা যায়- এই হলো তাদের নিত্য দিনকার ভাবনা। যদিও তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ কথা জানে যে, তাদের বিবিধ কুকর্মের কারণে পরবর্তী টার্মে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না তারপরও কিভাবে, কোন পেছনের দরজা ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসা যাবে তা নিয়েই থাকে ব্যতিব্যস্ত। কারণ, গণতান্ত্রিক (?) এই সিস্টেমে ক্ষমতায় থাকলেই কেবল লাভ। ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল কালো টাকার অধিকারী হওয়া যায়, খোলা যায় সুইস ব্যাংকের লোভনীয় এ্যাকাউন্ট। ক্ষমতায় থাকলে চাঁদাবাজি করা যায়, করা যায় খুন-হত্যা-গুম; যার জন্য দিতে হবে না কারো কাছে জবাবদিহি। ক্ষমতায় থাকলে করা যায় ধর্ষণ, ব্যভিচার; কারণ এছাড়া কি আর এলিট ক্লাবে ঢোকা যাবে?

৭.
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য অনেকগুলো শর্ত পূরণ করা জরুরী। যেমন, শিক্ষার আলো প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, জনগণকে মানবিক প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা ও সমাজের প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি যে, দেশে শিক্ষার হার এখনো অনেক কম এবং সরকারীভাবে মানবিক শিক্ষা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু তাই নয়, জনগণ যাতে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারে সেজন্যই যেন সব আয়োজন। কারণ, জনগণকে অজ্ঞতার মধ্যে রাখতে পারলেই রাজনীতিবিদদের স্বার্থদ্ধোর হতে পারে! তাছাড়া যেখানে দলীয় কর্মকাণ্ডেই গণতন্ত্রের কোনো ছোঁয়া নেই, সেখানে তারা কীভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে?

৮.
গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা নিছক প্রহসনের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যদি বিদেশি আধিপত্যবাদীদের চাহিদা পূরণ করতে পারেন, যদি পারেন তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। আপনি যদি বৈধ-অবৈধ উপায়ে কালো টাকার অধিকারী হতে পারেন, কিংবা পারেন দেশের প্রখ্যাত কোনো নেতার সন্তান হতে তাহলেই আপনি পারবেন জনপ্রতিনিধি হতে। আপনার মেধা বা সৃজশীলতা কখনোই এখানে নেতৃত্বের মাপকাঠি নয়।
কেউ কেউ বলে থাকেন পাশ্চাত্যেই একমাত্র গণতন্ত্র আছে। গণতন্ত্রের জন্য পাশ্চাত্যই হচ্ছে উত্তম মডেল। কিন্তু আপনি তো আর পাশ্চাত্য হতে পারবেন না। কারণ, আপনার নেই বিপুল ও অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রের অধিকারী সামরিক বাহিনী। আপনি পারবেন না গরিব কোনো দেশকে শোষণ করে তাদের সকল সম্পদ আপনার দেশে নিয়ে আসতে। আপনি পারবেন না তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করতে। আর সেজন্যই আপনি পারবেন না আদর্শ গণতন্ত্রের মডেল হতে। কারণ শোষণ আপনাকে করতেই হবে। হয়তো নিজ দেশের লোককে, নয়তো ভিনদেশীদেরকে। এটাই গণতন্ত্রের অন্তরালের কথা!

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএম অধ্যয়নরত।

 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বৈরতন্ত্রের নকশা এবং আপনার মানসিক সুস্থতার পরীক্ষা

1

A police officer on a street in Dhaka1031100_472316

By Nur Hossain

ছবিগুলো  ভালো করে দেখুন। স্বাধীন দেশটির এরকম রূপ দেখতে কেমন লাগছে? বুকের মধ্যে একটুও কি কষ্ট হচ্ছেনা?যদি না হয় তাহলে এই লেখা আপনের জন্যই লিখছি।

দিন বদলের কথা দিয়েছিলো আওয়ামিলীগ। ঢাকায় বসে যখন একথা লিখছি, তখন উপলব্ধি করলাম আসলেই তো। দিন বদলে দিয়েছে আওয়ামিলীগ। এতো মৃত্যু, এতো কান্না,এতো রক্ত, এতো আগুন আমার ২৫ বছরের জীবনদশায় আগে কখনো দেখিনি। আজকাল ঘর থেকে বের হবার সময় মনে হয় আর কি ফিরে আসতে পারব? আর কি দেখতে পাবো আমার মায়ের এবং বাবার প্রিয় মুখটা?এখন চারিদিকে মানুষের মধ্যে একটা শংকা,তাদের দু-চোখে ধিকিধিকি জ্বলছে চাপা ক্রোধের আগুন। প্রিয় দেশটাকে হারানোরক্রোধ। আসলে দেশটা তো হারিয়েই গিয়েছে।

কিন্তু কিভাবে আমার দেশটা হারালো? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্মাদনায়। এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আওয়ামীলিগ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে স্বৈরতন্ত্র চালু করার জন্য। এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আওয়ামীলিগ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে লুটতরাজ করার জন্য। এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আওয়ামীলিগ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে গণমাধ্যমের কন্ঠকে বন্ধ করার জন্য। এই চেতনাকে ঢাল হিসেবে আওয়ামিলিগ ব্যবহার করেছে বিচার-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণ এবং পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় অঙ্গসংগঠনে রূপান্তর করার যুক্তি হিসেবে।

চেতনার কথা বলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে প্রতিবাদী মানবাধিকার সংঘটনগুলোর মুখ। এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এখন মহা সমারোহে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালে তালে চলছে একদলিয় সরকার গঠনের পায়তারা। হয়ত, দেশের ৯০% মানুষের মতকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে, সারি সারি লাশের উপর হেটে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঢাল এবং ঢাক জোরেশোর বাজিয়ে গায়ের জোরে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করেই ফেলবে। কিন্তু বাংলাদেশটা হারিয়েই যাচ্ছে। এই হারানো আর কেউ ঠেকাতে পারবেনা। যারা সবচেয়ে দরকারী ভূমিকা রাখতে পারতো সেই সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষিত তরুণরা ও আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্মাদনায় পাগলপ্রায় হয়ে পরেছে। স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি লোপ পাওয়ার যোগাড়। এদের মধ্যে কিছু আছে অবস্য পেইড এজেন্ট। এদের কাজ হচ্ছে ‘নিরপেক্ষ’ থাকা। এবং এই নিরপেক্ষতার তকমা এটে দিনের পর দিন সংবাদপত্রে, ব্লগে, টিভিতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম আওয়ামীলীগের অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারকে সাপোর্ট করা। সাধারণ ছেলে-পেলে যারা চেতনার উন্মাদনায় পাগল এরা এইসব পেইড এজেন্টদের বিষাক্ত বাণীতে দুষিত হতে হতে স্বৈরাচারের আন-পেইড এজেন্ট -এ রুপান্তরিত হয়েছে।

এখন স্বাধীনতার চেতনা মানে শুধুই বিরোধীদল দমন করা ও গুলি করে হত্যা করা । এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন পলিটিক্যাল এসাসিনেশনের আরেক নাম। আওয়ামীলিগ জানে যে দলীয় সরকারের অধীনে বিরোধী দল নির্বাচন মেনে নিবেনা। জেনে শুনে দলটি দেশকে ঠেলে দিলো আগুনের মধ্যে। শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রানী শেখহাসিনার গদি আগলে রাখার জন্য। মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আর আওয়ামীলিগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবহার করছে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঢাল হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের  চেতনাকে দলটি ব্যবহার করেছে মুক্তিযুদ্ধের সাথে বেইমানি করার জন্য।

দেশটা স্বাধীন হয়েছিলো কি এইজন্য? ইতিহাস পড়লে জানা যাবে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির আশায়। আসুন গত পাঁচ বছরে স্বাধীনতায় উজ্জেবিত সরকার আমাদের দেশে কি করেছে তা দেখে নেই।

স্বাধীন রাষ্ট্রে গত পাচ বছরের সমাজ,রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকজীবনের বাস্তব চিত্র:

ইচ্ছেমত যখন খুশি গুম করা হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকদের। একটা স্বাধীন দেশে ট্রেন সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম, প্রতিদিন দূর-দুরান্তের হাঠে-মাঠে এবং ঘাটে মরছে দেশের তরুনরা। মারছে ও তরুনরা। বাসে আগুন দেয়া হচ্ছে, পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেয়া হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় চাকুরীদানকারী ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত -গার্মেন্ট শিল্পে আজ নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা। প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় নেমে আসে শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরির দায়ে। গার্মেন্ট মালিকেরা রাস্তায় নেমে আসছেন নিরাপদে ব্যবসার সুযোগ চাইতে। একরাতের নোটিসে দেশের সবচেয়ে বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলো।মধ্যবিত্ত বিনিয়োগ কারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হলো শেয়ার বাজার থেকে। রাতের অন্ধকারে দূর-দুরান্ত থেকে আগত রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুবিধা-বঞ্চিত, নিম্নবিত্ত লক্ষ লক্ষ ধর্ম প্রাণ তরুনদের কুকুরের মতো মেরে ধরে রাজধানী থেকে খেদিয়ে দেয়া হলো। রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক গুলো থেকে কোটি কোটি টাকা চুরি করা হলো। কোটি লোকের জীবনের এবং ব্যবসার সুবিধা হতো যে সেতুটি হলে, নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে সে পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করে দেয়া হলো। একটা স্বাধীন দেশের গর্ব হচ্ছে তার সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীর ৫২ জন সেনাকর্মকর্তাকে নির্মমভাবে এবং অত্যন্ত অপমানজনক ভাবে খুন করা হলো। তাদের হত্যার বিচারের নামে করা হলো নাটক।

শেষ কথা
একটা দেশের সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব থাকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা দেয়া। আর সরকার ম্যানেজ করার দায়িত্বে থাকে একটি দল। গত পাঁচ বছর ধরে আওয়ামীলিগ সরকারের প্রতেকটি সংস্থা ব্যবহার করেছে বিরোধী দল দমনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। এর ফলে এখন শুরু হয়েছে চোরা-গুপ্তা হামলা। এ হামলা কে করছে তা কেউই বলতে পারছেনা। এটা বিরোধীদল ও করতে পারে, সরকারী দলও করতে পারে বিরোধীদলকে স্যাবোটাজ করার জন্য। মাঝখানে পুড়ছে মানুষ, বাড়ি-ঘর আর কোটি মানুষের মন। একটু খেয়াল করেন, আপনেরও কি এতে ইন্ধন ছিলোনা? আপনি ও কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্মাদনায় পাগল হননি? পাগলের মতো আওয়ামীলীগের প্রত্যেকটি অনৈতিক কাজকে সাপোর্ট করেননি? এখন যখন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি তার সন্তানদের রক্তে লাল হচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশের বাতাসে শুধু শোনা যায় স্বজন হারার আর্তনাদ, আপনার কেমন লাগছে? আপনি কি এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেছিলেন? যদি করে থাকেন তাহলে জেনে নিন আপনি একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ, আপনের পছন্দের দলটির নেতৃত্বের মতই। যিনি সারা বাংলাদেশে আগুন জ্বালিয়ে, ইতিহাসের জঘন্যতম সংবিধান ক্যু করে প্রতিদিন গণতন্ত্রের এবং সংবিধানের জিকির তুলতে তুলতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অশ্লীল চিন্তায় পাগল হয়ে গিয়েছেন।

চেতনা বনাম গনতন্ত্র

2

গত কয়েকমাসে আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবিদের বিভিন্ন কলাম ও টকশো এর বক্তব্যগুলি থেকে একটি টকিং পয়েন্ট বার বার উঠে এসেছে। যখনই তারা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে যে এককভাবে জনগনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে আওয়ামী সরকার গনতন্ত্র ও ভোটাধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে কি না, তখনই তারা নানাভাবে ইতস্তত করে একটি বক্তব্যই বার বার বলেছে। তারা বলে থাকে যে গনতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার আগে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে যারা দেশের ‘স্বাধীনতার চেতনা’র বিরুদ্ধে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়, তাদেরকে কি আমরা আবার ক্ষমতায় আসতে দিবো কি না। তারা বলে যে নির্বাচনের আগে আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র পক্ষ বিপক্ষের ক্ষমতা নিয়ে মীমাংসা করতে হবে। এই বক্তব্যের পরে অনিবার্য প্রতিপ্রশ্ন এসে যায় যে তবে কি এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গনতন্ত্র সাংঘর্ষিক? সংগত ও বোধগম্য কারনেই এই প্রশ্নটি আমরা এতোদিন গনমাধ্যমে উপস্থাপিত হতে দেখি নি।

কিন্তু এখন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। গতকাল ইন্টারনেটে একটি টকশো এর অংশ দেখছিলাম। বুধবারে ‘বৈশাখী’ চ্যানেলের এই টকশোতে উপস্থিত দুই ব্যাক্তিত্বই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির প্রতিনিধি বলে পরিচিত। সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও কলামিস্ট অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী। অনুষ্ঠানে চলার সময়ে অধ্যাপক পাটোয়ারীর নানা বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় উপস্থাপক অবশেষে প্রশ্নটি করেই ফেললেন যে, “আজকের দিনে কি পরিস্থিতিটি কি মুক্তিযুদ্ধ বনাম গনতন্ত্রের লড়াইতে এসে দাড়িয়েছে’? খুব সংগত কারনেই রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবি দুজনেই এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু জনগনের চিন্তার মধ্যে এই প্রশ্নটি এড়ানোর কোন উপায় নেই। আজকে এই প্রশ্নটি সবার সামনে জ্বলন্ত হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে যে চেতনা ও গনতন্ত্র কি মুখোমুখি সংঘর্ষে উপস্থিত?

যেকোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত থাকে। একেবারে সামনা সামনি সবচেয়ে প্রত্যক্ষ লড়াই হলো ব্যাক্তির সাথে ব্যাক্তির (যেমন খালেদা বনাম হাসিনা)/ এর পরের স্তর বলা যেতে পারে এই লড়াই দল ও সমর্থকদের মধ্যে। আরো উচ্চস্তরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হলো চিন্তা ও আদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এই বছরে চিন্তার জগৎ এ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে অনেক রকম লেবেল দেয়া হয়েছিলো, বিচার বনাম অবিচার, ধর্মীয় মৌলবাদ বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা, এরকম আরো বেশ কিছু। কিন্তু এই সব লেবেল পরিত্যাক্ত হয়ে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের সামনে এসে এই মতবাদের লড়াই পর্যবাসিত হয়েছে চেতনা ও গনতন্ত্রের মধ্যে।

দেশজুড়ে সমর্থকেরা যেভাবেই এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে দেখুক না কেনো, দুই বৃহৎ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতারা ও কর্মীরা কিন্তু খুব ভালোভাবেই জানে এই লড়াই শুধুমাত্র পার্থিব ক্ষমতার লড়াই। বাংলাদেশে এখন ক্ষমতায় আসীন হওয়া মানে সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়া সহ আলাদীনের চেরাগ পাওয়া। আর ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে বনবাসে নির্বাসন, নির্যাতন, ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যু পর্যন্ত। সুতরাং তারা খুবভালো করেই জানে এই লড়াই আসলে কিসের জন্যে।

এই রাজনীতিবিদদের কাছে বিভিন্ন রকম চিন্তা-আদর্শের বুলি হলো ক্ষমতার জন্যে তাদের নগ্ন-লোভী যুদ্ধকে জনসাধারনের কাছ থেকে ঢেকেঢুকে রাখার জন্যে একটি ছদ্মাবরন মাত্র। কিন্তু রাজনীতির সমর্থকেরা, যারা একেকটি রাজনৈতিক পরিচয়ের সাথে নিজের আত্মপরিচয় এক করে ফেলেছে, তাদের কাছে এই দ্বন্দ্ব হলো চিন্তা ও আদর্শের লড়াই, যে লড়াই এর জয় পরাজয়ে নির্ধারিত হয় নিজের আত্মপরিচয়েরও স্বীকৃতি। রাজনীতিবিদদের সরাসরি লড়াই এর চেয়ে কিন্তু এই চিন্তা ও আদর্শের লড়াই কম গুরুত্বপূর্ন নয় কারন সময়ের দীর্ঘমেয়াদী স্কেলে, ব্যাক্তিত্ব ও দল ছাপিয়ে এই চিন্তার লড়াইটিই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথ দেখায়।

২০১৩ এর শেষে, এই রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও চিন্তার লড়াই কিন্তু অনেক আগে থেকেই স্পষ্ট অনিবার্য ছিলো। ২০১১ তে একক ইচ্ছায় তত্বাবধয়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দেয়ার সময়েই এই সংঘর্ষের স্ক্রীপ্ট লেখা হয়ে গিয়েছিলো। যেকোন সচেতন নাগরিকের কাছে এটাও স্পষ্ট ছিলো যে ক্ষমতা নামের আলাদীনের চেরাগকে সুসংহত করতেই ক্ষমতাসীন দল এই অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছিলো। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা এই স্পষ্ট রাহাজানিটিকে জনতার সমানে গ্রহনযোগ্য করে তোলার জন্যে নানারকম মজাদার কথাবার্তা উপস্থাপন করতো। একটি কথা এই গ্রীষ্মে প্রায়ই শোনা যেতো যে শেখ হাসিনা নাকি বাংলাদেশে গনতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্যে বদ্ধপরিকর। তিনি নাকি তত্বাবধায়ক নামের জোড়াতালি ব্যবস্থা বাদ দিয়ে পুরোপুরি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গনতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে যেতে চান এবং এটিকেই তার সবচেয়ে বড়ো লিগ্যাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চান।

কিন্তু গত কয়েকমাসে নির্বাচন কমিশনের একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপে ও সাজানো নির্বাচন থেকে বিএনপি’কে যে কোন প্রকারে থেকে দূরে রাখার চেষ্টার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে আসলে পুরোটাই ছিলো সেই পুরাতন ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে কুক্ষীগত রাখার চেষ্টামাত্র। সর্বশেষ যে খোড়া অজুহাত ছিলো সংবিধান সমুন্নত রাখার দৃঢ়তা, সেটিও জনতার সামনে হাস্যকরভাবে বাতিল হয়েছে মন্ত্রীদের পদত্যাগের অ্যাবসার্ড নাটকের মতো ঘটনায়। এখন চেতনা ছাড়া আর কোন আদর্শের তীর নেই তূনীরে।

বর্তমানের এই চেতনা এবং গনতন্ত্রের দ্বন্দ্বে দেশের জনগনের অবস্থান কোথায়? আগের দিনের মতো এই প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্যে এখন আর বুদ্ধিজীবি-বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা এখন জনমত জরীপের যুগে প্রবেশ করেছি, এটা পুরাতন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বুঝতে যত দেরীই করুক না কেন। এই বছরে প্রকাশিত চার-পাচটি জরীপে বের হয়ে আসা ফলাফল দ্ব্যর্থহীন, দেশের কমপক্ষে ৭০ -৮০% জনগন চায় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, কারন তারা মনে করে কোন রাজনৈতিক সরকার তাদের ভোটাধিকারের সুরক্ষা করবে না। আর যারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র ক্ষমতার লড়াইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে-বিপক্ষের লড়াই বলে অভিষিক্ত করেন, তাদের এই মতই জনতার মধ্যে কতটুকু প্রতিফলিত? সর্বশেষ প্রকাশিত জরীপগুলোতে দেখা গেছে এখন বিএনপি’র জনপ্রিয়তা ৫০% এর উপরে আর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা নিম্ন তিরিশ কিংবা তারও নীচে।

রাজনীতির লড়াইকে বুদ্ধিজীবি-সমর্থকেরা যে কোন আদর্শিক লেবেলই লাগাক না কেন, জনগনের কাছে এটি সেই পুরাতন ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাসীনদের সড়ানোর জন্যে একমাত্র সক্ষম প্রতিপক্ষেরই লড়াই।আওয়ামী লীগ-বিএনপি’ লড়াইতে এই জনমতের এই বিপুল পরিবর্তনের কারনটাও প্রথম পরিসংখ্যানটিই স্পষ্ট করে দেয়। কুশাসনের প্রতিযোগিতায় এই দুই দলের অতীত কেউ কারো চেয়ে কম কলংকিত না হলেও জনগন জানে এই সময়ে কোন দলটি তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রে মগ্ন। সাধারন জনতার কাছে গনতন্ত্রের একমাত্র অবশিষ্ট অধিকার, ভোটাধিকারকে নিয়ে চরম অবিবেচক পদক্ষেপই ক্ষমতাসীন দলের গনভিত্তিতে বিশাল ফাটল ধরিয়েছে।

চেতনার পক্ষের যারা কিছুটা বাস্তব সচেতন তারা আর এখন দেশের রাজনীতি ও জনসমর্থনের ভূপ্রকৃতির এই স্পষ্ট রূপটিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। এদের অনেকেই এখন সরাসরি বলে যে গনতন্ত্রের ভোটের মাধ্যম্যে দুই কুকুরের ক্ষমতার হাড্ডি নিয়ে চলা দশকের পর দশক লড়াই এর চেয়ে তাদের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন ও তার রায়ের পূর্ন বাস্তবায়ন হওয়া অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন। তারা বলে যে যতক্ষন না দেশের জন্মলগ্নের এই আদি কলংকের মোচন ঘটছে ততক্ষন মানুষের ভোটাধিকারের সুষ্ঠু প্রয়োগ হলো কি না এটি তাদের কাছে বড়ো বিবেচ্য নয়। কোনো সন্দেহ নেই যে এই অত্যেন্ত সচেতন নাগরিকদের এই মতটির পেছনে যুক্তি আছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে চলমান বিচার প্রক্রিয়া যে পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু পাচ বছর সময় পাওয়ার পরও বিচারের অজুহাতে গনতন্ত্রকে আপাতত পর্দার অন্তরালে সড়িয়ে রাখার এই চিন্তাটি দেশের জনগনের বৃহদংশ তো দূরের কথা, এক উল্লেখযোগ্য অংশই ধারন করে কি না সেটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। আর গনতন্ত্রে একজন উচ্চশিক্ষিত, চেতনায় ভরপুর নাগরিকের মতামত, আর নয় কোটি নিরানব্বই লক্ষ, নিরানব্বই হাজার, নয়শ নিরানব্বই জনের চেয়ে সামান্যতম বেশী দামী নয়। চেতনার অজুহাতে একটি ক্ষুদ্র অংশের মতকে জনগনের বৃহদংশের উপরে চাপিয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া অবশ্যই হবে চেতনার জন্যে অনেক বেশী প্রতিকূল।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি ফ্যাক্টর হওয়া সত্বেও এই চেতনার স্বরূপ কি কিংবা দেশের জনগনের মধ্যেই এর প্রতিফলন কতটুকু, এই সব নিয়ে নিরাবেগ আলোচনা কখনো হয় নি। এর অন্যতম কারন অবশ্যই হলো যে এই চেতনা, যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধীদের মতো অমীমাংসিত বিষয়ের কারনে আমাদের কাছে অতীতের কোন ব্যাপার নয় বরং জলজ্যান্ত বর্তমানে তীব্র আবেগের আধার। তবে আশা করা যায় যে অবশেষে ২০১৩ এই তুমুল ঘটনাপ্রবাহ যখন স্তিমিত হয়ে যাবে তখন আমরা এই অতি প্রয়োজনীয় আলোচনাটি শুরু করতে পারবো। আমি এই লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষনের মতো বিশাল কাজ নেয়ার স্পর্ধা করতে পারি না তবে লেখার মূল বক্তব্য তুলে ধরার জন্যেই চেতনা নিয়ে কিছু কথা সংক্ষেপে হলেও বলা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধের চে্তনা বলতে কি বুঝায় এই প্রশ্নের উত্তরে বহুদিন ধরে স্ট্যান্ডার্ড উত্তর ছিলো আমাদের ১৯৭২ এর সংবিধান এর চার মূলনীতি, বাংগালী জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের সাথে সাথে এক অখন্ড চেতনার সাথে এই চার মূলনীতির সামন্জস্যতা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন এলেও এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা খুব কম হয়েছে। এর কারন অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের মতো ইতিহাসে একক ঘটনার সাথে এই নীতিগুলিকে সম্পৃক্ত করে ফেলা। কিন্তু এখন আর এই অসামন্জস্যতাগুলো এড়ানোর কোনো উপায় নেই। গনতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্র সামন্জস্যপূর্ন নয়। জাতীয়তাবাদের মতো একটি রক্ষনশীল মতবাদের স্থান উদার গনতন্ত্রে কতটুকু এনিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে তো বটেই, সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়েও মুক্তিকামী সংগ্রামীদের কতজন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলো সেটি নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ আছে।

চেতনা হলো মানুষের মনের মধ্যে উৎসারিত বৃহৎ কোন অনুভূতি, কিন্তু কোন দুটি মানুষের মন যেমন এক রকম হয় না ঠিক তেমনি কোনো দুটি মানুষের চেতনা অবিকল এক হয় না। মুক্তিযুদ্ধের মত বিশাল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও প্রতিটি মুক্তিকামী যোদ্ধা, জনতা ও নেতা পুরোপুরি একই রকম চেতনায় আন্দোলিত হয় নি, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবন, অভিজ্ঞতা ও মানসিকতার পার্থক্যে চেতনার মধ্যেও কমবেশি পার্থক্য ছিলো। কিন্তু আমরা যদি চেতনাকে একটি অখন্ড বোধ হিসেবে না দেখে একটি স্তরে স্তরে বিন্যস্ত সাধারন মূল্যবোধ হিসেবে দেখি তবে আমরা বিশাল জনতার মধ্যে অনিবার্য পার্থক্যকেও চেতনার মধ্যে ধারন করতে পারবো।

আমি মনে করি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন চেতনার প্রাথমিক স্তরে অর্থাৎ সকল মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে বিস্তারিত চেতনার প্রথমে রয়েছে স্বাধীনতা। সেই সময়ে মুক্তিকামী প্রত্যেকেই পাকিস্তান নামে দুই হাজর মাইল দূরের একটি বিজাতীয় দেশ কতৃক আমাদের দেশের উপরে শ্রেফ ধর্মের অজুহাতে প্রভুত্ব চালানোর বিরোধী ছিলো। বিদেশীদের থেকে স্বাধীনতার মতো মানব ইতিহাসের অত্যন্ত প্রাচীন কিন্তু মৌলিক একটি গোষ্ঠীগত চেতনাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক চেতনা। আমার মতে এর পরের স্তরে, অর্থাৎ প্রথম স্তরের চেয়ে কম হলেও পরবর্তী ব্যাপক বিস্তারিত চেতনা ছিলো গনতন্ত্র। মুক্তিকামী লোকদের অধিকাংশই মনে করতো এই দেশে, জনগনের ভাগ্য নিয়ন্তা হবে জনগনই। এই দুটি প্রাথমিক চেতনার স্তরের পরেই ছিলো অন্যান্য আকাংখা বৈষম্যহীন সমাজ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাংগালী সংষ্কৃতি এরকম অন্যান্য। এর কোনটি অন্য কোনটির আগে অথবা পরে এটি আলোচনা করা এখানে সম্ভব নয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কিছুটা বিশ্লেষন করলেই আজকে এই ‘চেতনা বনাম গনতন্ত্রে’র দ্বন্দ্বে ভয়াবহ কন্ট্রাডিকশনটি চোখে পড়ে সরাসরি। গনতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রধান অংশ। চেতনা সেই গনতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে নিজেকেই একটি চরম সেলফ কন্ট্রাডিকশনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই কন্ট্রাডিকশনটি যদি দ্রুত নিরাময় না করা হয় তবে এর পরিনতি কি হবে এটি অনুমান করা শক্ত নয়। গনতন্ত্রের মতো আধুনিক মানুষের মৌলিক এবং সার্বজনীন একটি চেতনার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে অক্ষত অবস্থায় দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, সেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো শক্তিশালী অনুভূতি হলেও।

কিন্তু আরো আশংকার কথা যে ২০১৩ এর শেষে চেতনাকে শুধুমাত্র গনতন্ত্রের মতো শক্তিশালী একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাড় করানো হয় নি, ঘটনা প্রবাহের পরিনতিতে চেতনা অবস্থান হয়ে পড়ছে আরো মৌলিকতম একটি চেতনা ও আবেগের বিরুদ্ধে। সেটি হলো বিজাতীয় শক্তির প্রভূত্বের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাংখা। চেতনা যদি স্বাধীনতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয় তবে জনগনের মধ্যে তার অবস্থান কি হতে পারে এটি তুলে ধরার কোন প্রয়োজন পড়ে না।

আমরা যদিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জনগনের কাছে স্পষ্ট করি নি তবু স্বাধীনতার পরে গত চার দশকে এই চেতনা আমাদের গনতন্ত্র ও রাজনীতিতে অনেক গুরূত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় মৌলবাদের মতো প্রচন্ড শক্তিশালী একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই চেতনাই এখনো আমাদের গনতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো অবলম্বন কারন আমাদের জাতির মধ্যে উদারনৈতিক মূল্যবোধের প্রসার এখনো ঘটে নি। একারনে গনতন্ত্রের সাথে চেতনাকে বিরোধে জড়িয়ে ফেলাতে মৌলবাদের পথই আরো সুগম হচ্ছে। যারা চেতনা রক্ষার সরব-উচ্চকন্ঠ, তাদের একটা জিনিষ বোঝা উচিৎ যে রাজনীতিতে পট পরিবর্তন ঘটে সময়ের স্কেলে খুব দ্রুততার সাথেই। কেউই কখনো একাধারে এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকে না, দ্রুত পরিবর্তনই রাজনীতির চিরায়ত বৈশিষ্ট। কিন্তু কোনো আদর্শ বা চিন্তা যদি একবার জনগনের মধ্যে বিচ্যুত, পতিত বলে গণ্য হয়, তবে তার পূর্নবাসন হতে সময় লাগে অনেক অনেক বেশী, কখনো সেটি আর হয়ে ওঠেই না।