ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যা, কিছু প্রশ্ন

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে কতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছিলো? সাধারন বাংলাদেশীদের মনে সম্ভবত এই সংখ্যাটি বেশ বড়ো, তবে সেটা ব্যাক্তিভেদে যে কোনো কিছু হতে পারে। অনেকেই মনে করেন এই সংখ্যা শত শত, কিংবা হাজার হাজার। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। কিছু কিছু তথ্য যা সহজে পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে,

১৯৭১ এর ডিসেম্বরে মে: জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডাইরীতে করা ২৫০ টি নামের তালিকা যাদেরকে হত্যার টার্গেট করা হয়েছিলো(1)। বাংলাপেডিয়া’র বুদ্ধিজীবি গনহত্যা পাতায় বলা হয়েছে যে ১৬ই ডিসেম্বরের তিন চারদিন আগ থেকে বুদ্ধিজীবি হত্যার কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৪ই ডিসেম্বর রাতে ২০০ জনেরও বেশী বুদ্ধিজীবিকে তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় (2)।এছাড়া আরো দেখা যায় ১৯৭১ এর ডিসেম্বর ২২ তারিখে আজাদ পত্রিকার একটি সংবাদ যেখানে ভারতের আকাশবাণীকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা, রুহুল কুদ্দুস, বলেন যে কমপক্ষে ২৮০ জন পেশাজীবি ও বুদ্ধিজীবিকে ডিসেম্বরের ১৪ ও ১৫ তারিখে হত্যা করা হয়েছে ঢাকা, সিলেট, খুলনা ও ব্রাম্মনবাড়িয়ায়(3)।  এই রকম আরো কিছু তথ্যের ভিত্তিতে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে ডিসেম্বরের ১২-১৫ তারিখের মধ্যে ঢাকায় ও সারাদেশে কয়েকশত বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে।

আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া সবচেয়ে কুখ্যাত ঘাতক হলো সেই সময়ে ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা ও আল বদর নেতা চৌধুরী মইন উদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খান।  এদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে অভিযোগ ও মামলা করা হয়ে এবং অভিযুক্তরা পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদন্ড শাস্তি পায়। এই শাস্তিটি তাদের অপরাধ অনুযায়ী কোনক্রমেই অবাক করার মতো কিছু নয়, কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো যে ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া এই দুই অপরাধীর বিরুদ্ধে যখন প্রসিকিউশন চার্জ গঠন করে তখন তাদের কে কেবল মাত্র ঢাকায় ১৮ জন বুদ্ধিজীবি হত্যায় অভিযুক্ত করা হয় (4)। প্রসিকিউশনের রিপোর্ট বলে যে এই ১৮ জন বুদ্ধিজীবির মধ্যে রয়েছেন ৯ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ৬ জন সাংবাদিক ও তিন জন চিকিৎসক।

আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি যে প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বর আসলে শত বুদ্ধিজীবি হত্যার কথা বলা হয়, রাও ফরমান আলীর শত জনের লিস্টের কথা বলা হয়, কিন্তু পত্রিকায় নাম ও ছবি আসে ১৫ থেকে ১৯ জনেরই মাত্র। নামসহ যাদের ছবিটি উপরে দেয়া হয়েছে। আমরা আরো দেখলাম যে কোর্টে মামলার জন্যে যখন সুনির্দিষ্ট তথ্যের দরকার পড়লো তখন প্রসিকিউশন মাত্র ১৮ জনেরই একটা লিস্ট হাজির করলো, যে লিস্টটি খুব সম্ভবত প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বরে পত্রিকার লিস্টটির অনুলিপি মাত্র।

 

এই থেকে আমাদের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে ১৪ ই ডিসেম্বর কতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছে? এই ১৮ জন ছাড়া আর কাকে কাকে হত্যা করা হয়েছে? তাদের নাম, ছবি আমরা ১৪ই ডিসেম্বরে কেনো দেখি না? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আজকেই পত্রিকার পাতায় (১৪/১২/১৪)। আজকের New Age পত্রিকায় বলা হয়েছে পুরো ১৯৭১ এ কতো জন বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে এ সম্পর্কে জাতির কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের কাছে কোনো পূর্নাংগ লিস্ট নেই তবে কিছু সরকারী ও ব্যক্তিগত এস্টিমেশন রয়েছে যার সংখ্যার রেন্জ ২৩২থেকে ১১১১ পর্যন্ত(5)। আজকের The Daily Star এ বলা হয়েছে যে এই বছর ৭ই ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ সরকার পার্লামেন্টে ঘোষনা করেছিলো যে ২০১৪ এর জুন মাসের মধ্যেই ১৯৭১ এ শহীদ সকল বুদ্ধিজীবির একটি পূর্নাংগ তালিকা প্রকাশ করবে (3)। জুন পেরিয়ে এখন ২০১৪শেষ হবার পথে, তবে সেরকম কোনো লিস্ট দেখা যাচ্ছে না।

 

উপরে New Age পত্রিকায় যে ১১১১জনের কথা বলা হয়েছে সেটি সম্ভবত বাংলাপেডিয়ার এস্টিমেট। এই এস্টিমেট অনুযায়ী পুরো ১৯৭১ এ নিহত বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে ২১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবি ও প্রায় ৯৫০ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাতীত বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক রয়েছেন(2)। তবে এটি একটি ব্যাক্তিগত এস্টিমেটই, কোনো নির্ভরযোগ্য তালিকা নয়। আজকের New Age পত্রিকায় স্বয়ং শাহরিয়ার কবিরই বলেছেন যে বুদ্ধিজীবি হত্যার কয়েকটি কেস ছাড়া অধিকাংশ তথ্য ও অভিযোগের উপরে কোনো রিসার্চ করা হয় নি (5)।

 

১৯৭১ এর পরে আরো তেতাল্লিশটি ১৪ই ডিসেম্বর আসলেও আমরা এখনো এই প্র্শ্নের উত্তর দিতে পারি না যে ১২-১৫ ই ডিসেম্বর কতো জন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছে? পরিচিত ১৮ জনের বাইরে আর কাদের হত্যা করা হয়েছে? তাদের নাম ছবি কেনো আমরা দেখি না কোনো ১৪ ই ডিসেম্বরে?

 

আমাদের দেশের লোকের একটু লিস্টের ব্যাপারে এলার্জি আছে এটা মেনে নিয়েও বলা যায় লক্ষ-মিলিয়নের লিস্ট না হোক, হাজার জনের লিস্ট তো করা যেতেই পারে, তাই না?

 

[ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবি হত্যা নিয়ে সমর্থিত-অসমর্থিত সকল রকম সংবাদ ও বিশ্লেষনের একটা ভালো সংগ্রহ রয়েছে চৌধরী মইনউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান এর বিচারের রায়ে। দেড়শ পাতার এই রিপোর্টের পিডিএফ কপি রয়েছে এই লিংকে। https://www.dropbox.com/s/3xckpr73pyzap4p/bangladesh_tribunal_chowdhury_mueenuddin_judgment.pdf  ]

 

Reference

(1) http://www.genocidebangladesh.org/?page_id=32

(2) http://www.banglapedia.org/HT/K_0330.htm

(3) http://www.thedailystar.net/cold-killing-design-55227

(4) http://www.dhakatribune.com/bangladesh/2013/oct/31/mueen-ashraf-verdict-sunday

(5) http://newagebd.net/76478/no-complete-list-of-martyred-intellectuals-44-years-on/#sthash.PcYoLBRk.dpbs

বিচারাধীন মামলার গনযোগাযোগ সম্পর্কিত প্যারাডক্সঃ কামারুজ্জামান প্রসঙ্গে

1

By Ariful Hossain Tuhin

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট, মামলা চলাকালীন সময়ে, কোর্টরুমে ভিডিও ক্যামেরা নিষিদ্ধ করেছে অনেকদিন আগেই। এই নিয়মের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জাস্টিস স্কালিয়া বলেন [১]

For every ten people who sat through our proceedings, gavel to gavel, there would be 10,000 who would see nothing but a 30-second take-out from one of the proceedings

প্রতিটি মামলার বিবরণ যেহেতু সকলের জন্য উন্মুক্ত, এমনকি যেকোন নাগরিক মামলা চলাকালীন সময়ে উপস্থিত থাকতে পারেন, সেহেতু সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা, ক্যামেরা নিষিদ্ধের পেছনে যে চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে সেটি অবশ্যই গোপনীয়তা নয়। বিচারপতিরা ভাবছেন কেউ যদি আউট অফ কনটেক্সট ছোট একটি ভিডিও দেখেন তাহলে সুপ্রীম কোর্টের বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে ভুল ধারনা তৈরী হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

যেকোন মামলা একটি জটিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বোধ্য প্রক্রীয়া। মামলা বোঝার জন্যে তাই শ্রম এবং একাগ্রতা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচারপতিরা তাই কোর্টরুমে কাগজ কলম ছাড়া আর কোন কিছুই এলাউ করেন না। কাগজ কলম নিয়ে মনোযোগ দিয়ে মামলা শোনা ছাড়া রিপোর্টারদের তাই আর কোন কিছু করার নেই।
সুতরাং একটি বিচারাধীন মামলা একটি জটিল প্রক্রীয়া। একে খুব সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, ভুলব্যাখ্যা কিংবা আউট অফ কনটেক্সট উদ্ধৃতি দিয়ে।

যেসকল দেশে জুরি ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, সেখানে অনেক মনোযোগ দেয়া হয় যাতে জুরিরা কোর্টে উপস্থাপিত তথ্য প্রমাণাদির বাইরে কোন তথ্য দ্বারা প্রভাবিত না হন। তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয় যাতে তারা নিজেরা এই ব্যাপারে স্বতপ্রনোদিত ভাবে কোন রিসার্চ না করে, পত্রিকা বা ইন্টারনেটে মামলা সংক্রান্ত খবর না দেখে, ইত্যাদি। কিন্তু সবসময়, বাস্তব সমস্যার জন্যেই এই ব্যবস্থা কাজ করে না।
দেখা যায় জুরিরা তাদের মামলা নিয়ে ইন্টারনেটে রিসার্চ করছেন।[২] এর ফলশ্রুতিতে অনেকসময় জুরিদের উপর কোর্ট বহির্ভূত প্রভাব পরে।
গনসংযোগ ক্যাম্পেইন(পি আর ক্যাম্পেইন) সাধারনত অভিযুক্ত আইনজীবির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। কারন জনগনের মতামতের একটি পরোক্ষ প্রভাব বিচার প্রক্রীয়ায় থেকেই যায়। অন্যদিকে সরকারী প্রসিকিউটরদের কখোনো পি আর ক্যাম্পেইন চালাতে দেখা যায় না। পৃথিবীর সকল সরকারী কর্মচারীদের একটি সাধারন প্রবণতা হচ্ছে নিজেদের কাজের কোন “মার্কেটিং” না করা।

সরকারী কর্মচারীদের যে পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়, তা “মার্কেটিং” এর জন্যে উপযোগী নয়। এছাড়াও সরকারী কর্মচারীদের আসলে “মার্কেটিং” এর কোন ইনসেন্টিভ নেই। তাদের পেশাগত সাফল্য নিজেদের কাজের মার্কেটিং এর উপর নির্ভর করে না। একারনে অনেক বিখ্যাত মামলায় দেখা যায় অভিযুক্ত পক্ষ হতে একপাক্ষিক প্রচারণা চলছে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি সত্য। প্রধানত অভিযুক্ত এবং তার সহমর্মীরাই একপাক্ষিকভাবে বিভিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারী পক্ষ থেকে পালটা প্রচারণার কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সমর্থক যারা, অনেক সময়েই তারা মামলার টেকনিক্যাল ডিটেইলগুলো বেশী চিন্তিত নন। অবশ্যই এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু যদি অভিযুক্তদের প্রচারণার
পরিধি বিচার করা হয় তাহলে আসলেই এ পর্যন্ত পালটা প্রচারণা অথবা বিভ্রান্তির অবসান করার জন্যে তেমন কিছুই করা হয়নি।

পত্রিকায় নিয়মিত মামলার প্রসিডিংস প্রকাশিত হয়। সেগুলোতে নজর রাখলে বেশ কিছু বিষয় চোখে পরে। যেমন প্রসিকিউটরদের আশ্চর্যরকম অদক্ষতা। নিয়মিতভাবে দেখা যায় সম্মানিত বিচারকরা , প্রসিকিউটরদের ভর্তসনা করছেন তাদের বিভিন্ন “ট্রিভিয়াল” ভুলের জন্যে। এত গুরুত্বপূর্ণ মামলা অবহেলায় চলছে এমনটা বললে অতিরঞ্জিত হবে কিনা সেটি নিয়ে নিশ্চিত হবার সুযোগ কমেই ক্রমে আসছে।

সুতরাং তদন্তকারী সংস্থা/প্রসিকিউটরদের বিভিন্ন দক্ষতার অভাব এর সাথে অভিযুক্তদের বিরামহীন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মিলে অনেক মানুষের মনেই বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে। এই প্রশ্নসমূহ অভিযুক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক দল/মিত্রদের দাবীর লেজিটিমেসি তৈরী হবার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করছে।

উদাহরন হিসেবে কামারুজ্জামানের রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকার পর, দোষীর পক্ষে যেসকল প্রচারণা চালানো হয়েছে সেগুলো অনেকের মনে সন্দেহ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। দোষীদের প্রচারনার প্রধান কৌশল ছিল বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন anecdot উল্লেখ করে মামলাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়া।

এটি অত্যন্ত পুরোনো প্রক্রীয়া। প্রথমে দেখা যাক দোষী পক্ষের কিছু অভিযোগের নমুনা। আপিল বিভাগে চুড়ান্ত রায় প্রকাশের পরপরই কামারুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে সোহাগপুর ঘটনার সাথে কামারুজ্জামানের কোন সম্পৃক্ততা নেই এই দাবী করে তার ছেলে হাসান ইকবাল বলেন[৩]

‘এই মামলার মুল সাক্ষীর তালিকায় ৪৬ জনের নাম ছিলো। তাদের মধ্যে ১০ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর নতুন করে তিনজন মহিলাকে অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে প্রসিকিউশন আদালতে উপস্থাপন করেন। ওই সাক্ষীরাও তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে গণহত্যার সময় আমার বাবা উপস্থিত ছিলেন এমন দাবি করেননি।’

মোটামুটি নির্দোষ দেখতে এই দাবীটির মাঝে বেশ কয়েকটি প্যাচ আছে। প্যাচগুলো একটি একটি করে আলোচনা করা যাক। প্রথমত সোহাগপুরের ঘটনার জন্যে রাষ্ট্রপক্ষ ঠিক কি ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে এনেছিল তা দেখা যাক।

 

রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির(ট্রাইবুনালের রায়) ২৯১ অনুচ্ছেদ থেকে আমরা জানি [৪]

 

Muhammad Kamaruzzaman has been charged for
participating, substantially facilitating and contributing to the commission of
offences of ‘murder as crime against humanity’ or in the alternative for
‘complicity to commit such crime’

চার্জের প্রধান গুরুত্ব ছিল “সহোযগিতার”। এই ব্যাপারটি ডিফেন্স কাউন্সিলও তাদের যুক্তিতে উল্লেখ করেছে [৫]

the accused has been
indicted for providing ‘advices’to his accomplices in launching the attack and
it does not describe that the accused accompanied the principal perpetrators

কামারুজ্জামানের সহযোগিতা প্রধানত প্রমান হয় ততকালীন সময়ের আলবদর সদস্য এবং আলবদর ক্যাম্পের গার্ড মনোয়ার মুন্সির সাক্ষ্যে [৬]

Md.
Monwar Hossain Khan @ Mohan Munshi (63), a member of Al-Badar was
attached to the camp set up at Suren Saha’s house as a guard as directed by the
accused Muhammad Kamaruzzaman and in this way he worked at the camp
for the period of 4-5 months and not exceeding 07 months. It has also been
proved that accused Muhammad Kamaruzzaman used to attend meetings on
the first floor of the Al-Badar camp and he [P.W.2] and his ‘sir’
Kamaruzzaman [accused] had fled together from the camp two days before
Sherpur was liberated. As regards the event of Sohagpur massacre P.W.2 does
not claim to have witnessed the event

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে মনোয়ার মুন্সীর কিন্তু দাবী করেনি সোহাগপুরেরে গনহত্যা প্রতক্ষ্য করার। এখন প্রশ্ন এসে যায় কেন এই সাক্ষীর গুরুত্ব বেশী, তা বোঝার আগে এই সাক্ষীর ব্যাপারে ডিফেন্স কাউন্সিল কি বলেছে একবার দেখা যাক। [৭]

the learned defence counsel has submitted that
the event of Sohagpur massacre is not disputed. But the witnesses who have
deposed in support of the charge implicating the accused are not credible.
P.W.1 and P.W.2 are hearsay witnesses

সুতরাং ডিফেন্সের প্রধান যুক্তি ছিল, মনোয়ার মুন্সি(PW2) ঘটনা (সোহাগপুরের গনহত্যা) নিজে দেখেনি(hearsay witness). মনোয়ার মুন্সির সাক্ষ্য সম্পর্কে দুই নম্বর চার্জের ক্ষেত্রে ডিফেন্স কাউন্সিলের যুক্তি ছিল [৮]

He has submitted
that P.W.3 cannot be relied upon as he stated inconsistent date of the event.
Statement made by P.W.2 and P.W.14 on some particulars is inconsistent. Due
to such inconsistencies it is immaterial to see whether the statement made by
them could be impeached by the defence through cross-examination.
Inconsistencies between statements of two witnesses by itself renders them
unreliable and tutored.

 

ডিফেন্স কাউন্সিল ঐ আলবদর ক্যাম্পে কামারুজ্জামানের উপস্থিতি ছিল না সেটি কি প্রমান করতে পেরেছে? সংবাদ সম্মেলনে বারবার হাসান ইকবাল সাহেব বিভিন্ন বই/প্রবন্ধের উল্লেখ করছিলেন যার মধ্যে কামারুজ্জামানের নাম নেই। নাম থাকা আর না থাকা সমান গুরুত্বের অধিকারী নয়। একটি গবেষণামূলক বইয়ে যদি একজনের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য প্রমান উপস্থাপন করা হয় তাহলে তার অপরাধের “প্লজিবিলিটি” তৈরী হয়। কিন্তু কারও নাম উল্লেখিত না থাকা মানে এই না সে অপরাধ করেনি। কারন এটাও হতে পারে সে অপরাধ করেছে, কিন্তু “ডকুমেন্টেড” হয়নি। এই ক্ষেত্রে কামারুজ্জামানের পক্ষে এমন কোন শক্ত এলিবাই কি ডিফেন্স কাউন্সিল দাড়া করাতে পেরেছে যার ফলে প্রমান হয় কামারুজ্জামান ঐ টাইম ফ্রেইমে ঐ আল বদর ক্যাম্পে অবস্থান অসম্ভব ছিল? আমার মনে হয় না পেরেছে। তাদের প্রধান কৌশল ছিল প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের রিলায়েবিলিটি নষ্ট করা। যেমন একজন সাক্ষীর রিলায়েবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারন হিসেবে ডিফেন্স কাউন্সিল উল্লেখ করেছে,[৯]

The learned defence counsel next argued on charge no.2. He has submitted
that P.W.3 cannot be relied upon as he stated inconsistent date of the event

সমস্যা হচ্ছে আমার জীবনে খুব বড় ঘটনার তারিখ জিজ্ঞেস করলেও আমি ভুলভাল বলতে পারি। ডিফেন্স যেটি পারত তা হচ্ছে, ঐ সাক্ষীর, ঐ ঘটনা প্রত্যক্ষ দেখার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রমান উপস্থাপন করতে পারত। সেটি ডিফেন্স কাউন্সিল কি পেরেছে?

হাসান ইকবাল খুব জোর দিয়েছেন, সোহাগপুরে তার বাবার অনুপস্থিতিকে। যেহেতু কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গনহত্যার “সহোযোগিতা”র অভিযোগ আনা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড সংগঠনের সময় তার উপস্থিতি কতটুকু জরুরী? যুক্তরাষ্ট্রের স্টিফেন র‍্যাপের বিবৃতিটি অনেক জোরে শোরে বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে/প্রচার হয়েছে। বাশেরকেল্লায় সম্ভবত একাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে খবরটি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্টিভেন র‍্যাপের বিবৃতিটিতে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে।

ডেভিড বার্গম্যানের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, [৯]

He stated that international law required in such aiding and abetting offences, that the Jamaat leader, knew that the [Al Badr] group was committing atrocities, that he provided assistance to the group with that knowledge. It was not necessary that he attend, but that the assistance that he provided needed to be substantial and in fact something that caused the atrocities committed

সুতরাং হাসান ইকবালের প্রধান দাবীটি, কামারুজ্জামান সোহাগপুরে উপস্থিত ছিলেন না, অপ্রয়োজনীয় হয়ে পরে। যেহেতু সোহাগপুরের গনহত্যার পরিকল্পনা আল বদর ক্যাম্পে হয়, (ডিফেন্স এর কোন বিরোধীতা করেনি), সেহেতু কামারুজ্জামানের এই চার্জ থেকে বাচার জন্যে একমাত্র এস্কেইপ হচ্ছে , তিনি সেখানে কোনভাবেই উপস্থিত ছিলেন না, এই ধরনের কোন প্রমান দাখিল করা।

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল বহির্বিশ্বে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। এর অন্যতম কারন অবশ্যই দোষী এবং অভিযুক্ত পক্ষের প্রচারণা। কিন্তু আমার মনে হয়না অভিযুক্ত পক্ষের প্রচারণা এককভাবে দায়ী। নিজেদের বিভিন্ন লিমিটেশন গুলোকে স্বীকার করেই বলতে হয়, অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে প্রাণদণ্ড। বর্তমান পৃথিবী প্রাণদণ্ডের ব্যাপারে অনেক সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, হয় প্রাণদণ্ড আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করেছে, অথবা প্রাণদণ্ডদানে বিরত আছে।[১০] এই কারনেই বহির্বিশ্বে এই বিচার নিয়ে ঋণাত্নক মনোভাব তৈরী হচ্ছে। এই সমস্যাটি নুরেমবার্গ কিংবা আইখম্যানের বিচারের সময় ছিল না।

 

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় অনেক দোষীকে কখনই দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে না কারন তাদের প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ দেশ , প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের ফেরত দেয় না। বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী চৌধুরী মাইনউদ্দিন কিংবা আশরাফুজ্জামানকেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না তাদের প্রাণদণ্ড হয়েছে বলেই।

 

প্রাণদণ্ডের একটি “ইমোশোনাল এপিল” আছে। ৭১ সালের গনহত্যা/ধর্ষণ ইত্যাদি আমাদের সমষ্টিক স্মৃতিতে একটি দগদগে ঘা। এই ঘায়ের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও প্রলেপ দিতে পারে প্রাণদণ্ড। প্রাণদণ্ড প্রতিশোধমূলক শাস্তি। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর অনেকেই প্রতিশোধ প্রবনতাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাতারে ফেলতে চান না। রাষ্ট্রকে প্রতিশোধ প্রবণতার উর্ধে দেখতে চান। সেই কারনেই প্রাণদণ্ড ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে পৃথিবী জুড়ে।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, জামাত এবং অন্যান্য রাজাকার/আলবদর ইত্যাদির যেসকল অপরাধ করেছে তার প্রায় সমান গুরুত্বের দাবী রাখে এইসকল অপরাধের পেছনে যে মতাদর্শ কাজ করেছে। যেই ফ্যাসিবাদ প্রভাবিত রাজনৈতিক “থিওক্র্যাসি”তে জামাত এবং অন্যান্যরা আস্থা রাখত তা কোনক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিজের দেশের মানুষের উপর নেমে আসা এই মর্মান্তিক ধ্বংস, হত্যা, ধর্ষণের সময়ে যারা ঠাণ্ডা মাথায় পশ্চিম পাকিস্থানের পক্ষ নিতে পেরেছে, তাদের অপরাধের অংশীদারত্ব গ্রহন করেছে, তাদের সাইকোলজি অনেক ভয়ংকর এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকারক। সুতরাং তাদের অপরাধের শাস্তির সাথে সাথে তাদেরকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মতাদর্শিকভাবে ধ্বংস করে দেয়া আমাদের জন্যে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্যে প্রয়োজন ছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যমত্য।

আবারো বলছি বিভিন্ন রাজনৈতিক কারন এবং নেগেটিভ প্রচারণার মাঝেও আমার মনে হয়, আমরা যদি প্রাণদণ্ড অপশনটি টেবিল থেকে সরিয়ে নিতাম, তাহলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যমতে পৌছানো আমাদের জন্যে অনেক বেশী সহজ হত। কিছু বৃদ্ধ রাজাকারকে ফাসিতে ঝুলিয়ে যে তাতক্ষণিক আনন্দ পাওয়া যাবে, তার চেয়ে জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাসের সাথে শেষবারের মত বোঝাপড়া করা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা আন্তর্জাতিক ভাবে অনেক সমর্থন পেয়েছি। এর অন্যতম কারন ছিল, ন্যায় এবং ন্যায্যতা আমাদের পক্ষে ছিল।

ন্যায় এবং ন্যায্যতার দাবী এখন পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে প্রাণদণ্ড ঢেকে ফেলছে বলেই আমার মনে হয়। এ প্রসঙ্গে অকালে চলে যাওয়া অধ্যাপক জালাল আলমগীরের বছর কয়েক আগে বলা কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করছি[১১]

 

We should recognise honestly that after decades of complexities, secret deals, and depraved politics, justice, though necessary and urgent, will be limited.
Such limited justice can be morally justified only by a long-term commitment to truth.
To prioritise truth, we must de-prioritise capital punishment. In 1941, years before the Nuremberg trials, Winston Churchill planned summary executions for fifty top Nazis at war’s end. He considered this punishment a political decision, not a legal matter. But Harry Truman, the American president, wanted a tribunal. Josef Stalin cast the deciding vote. As the human rights scholar Geoffrey Robertson explained, Stalin “loved show trials as long as everyone was shot in the end.”
And so a severely flawed tribunal was held at Nuremberg. It punished crimes against humanity by using inhuman standards: twelve Nazis were hanged first and then burnt in the ovens of Dachau, one of the German concentration camps.
Nuremberg’s moment of success was not in the verdict but in the courtroom, when the Nazis were shown reels of the horrors that they had created. Some of them wept and sat stunned, as they came to grips with the truth. The punishment from exposing openly and publicly what they had done to humanity was far more compelling than what Churchill’s planned executions might have produced. It is from this public record that the world’s aversion to genocide began and Nazism, as an ideology, received its death penalty. South African apartheid also received its capital punishment through the Truth Commissions pioneered by Nelson Mandela and Bishop Desmond Tutu

 

First Published in  http://aftnix.wordpress.com/

সুত্রঃ

[১]http://www.economist.com/blogs/democracyinamerica/2014/03/cameras-supreme-court

[২]http://news.bbc.co.uk/2/hi/8519995.stm

[৩]http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/339310.html

[৪]Article 291  of the verdict , accessed at : http://www.ict-bd.org/ict2/ICT2%20judgment/MKZ.pdf

[৫]Article 81, ibid

[৬]Article 255, ibid

[৭]Article 267, ibid

[৮]Article 80, ibid

[৯]http://newagebd.net/65600/us-calls-for-halt-to-kamaruzzaman-execution/#sthash.MRsTjDaj.AM96NvMP.dpbs

[১০]http://www.amnestyusa.org/our-work/issues/death-penalty

[১১]http://archive.thedailystar.net/forum/2010/june/truth.htm

ডেভিড বার্গম্যান, আদালত অবমাননা এবং তিরিশ লাখ

লরেন্স লিফশুলজ

একজন মানুষ ও একটি বিচারের ইতিহাস: ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে মামলা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও তার সহকর্মীরা আগামী ১৩ অক্টোবর একটি একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক বিতর্কের উপর সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছেন। ইতিহাসের এই প্রশ্নটি কেন এবং কিভাবে আদালত অবমাননার ধারায় বিচারের আওতায় আসলো সেটি এক দুর্ভাগ্যজনক কাহিনী।

 

আইসিটি-২ এর বিচারকরা আইনের সাথে লতায়-পাতায় জড়িত এমন একটি বিষয়ে ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছেন অবস্থাদৃষ্টে যেটি হয়তো তারা নিজেরাও প্রশংসাযোগ্য কাজ বলে মনে করেন না।     মামলারটির বিবাদী দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশে বসবাসকারী বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। একটি বিশেষ মামলায় ট্রাইবুনালের দেয়া ঐতিহাসিক রেফারেন্স নিয়ে বার্গম্যানের অনুসন্ধানী কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে।

 

মামলাটি অবশ্য ট্রাইবুনাল স্বতপ্রনোদিতভাবে করেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ট্রাইবুনালের দেয়া রেফারেন্সকে অসম্মান করা হয়েছে উল্লেখ করে আবুল কালাম আজাদ নামে হাইকোর্টের একজন আইনজীবী তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পিটিশন আকারে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন।    আজাদ সাহেবের পিটিশন শুনানী শেষে ট্রাইবুনাল ডেভিড বার্গম্যানকে ‘কেন আদালত অবমাননাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হবে না?’ মর্মে কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করেন।

 

কিছু মানুষ আছে যারা ব্যক্তি বা গোষ্টি স্বার্থের প্রয়োজনে জাতীয়তাবাদকে কলঙ্কিত করতে দ্বিধা করে না; এই মামলার বাদী আবুল কালাম আজাদ তেমনই একজন লোক। অবশ্য স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ একটি শাখের করাতের মত বিষয় হবার কারণে এটিকে সহজেই খারাপ কাজেও ব্যবহার করা যায়।    ঔপনিবেশিক শাসন বা বিদেশী আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাবার জন্য সংগ্রামরত একটি নিপীড়িত জাতির জন্য জাতীয়তাবাদ অবশ্যই শক্তিশালী এবং প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু ভিন্ন পরিস্থিতিতে এটা কখনো কখনো ধর্মান্ধতা ও সংকীর্ণ মতাদর্শগত অন্ধবিশ্বাসের জন্ম দেবার মত উর্বর ক্ষেত্রও হতে পারে।

 

উদাহরণ হিসেবে ১৯৯০ দশকের শুরুতে বসনিয়ায় সার্ব জাতীয়তাবাদীদের গণহত্যার কথা বলা যেতে পারে। বসনিয়ার মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সে সময় সার্বরা যে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান চালিয়েছিলো তা সেখানকার বসনিয় মুসলিম এবং ক্রোয়াট ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের সাথে তাদের হাজার বছর ধরে টিকে থাকা শান্তিপূর্ণ আন্ত:সম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ছিলো।  কারাদজিক, ম্লাদিক, মিলোসেভিচরা ছিলো জাতীয়তাবাদ নামের শাখের করাতের উল্টো ধারের অংশ। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার সেব্রেনিৎসায় ৮হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যার অভিযোগে এখন হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কারাদজিক ও ম্লাদিকসহ বসনীয় সার্ব নেতাদের বিচার চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ছিলো ইউরোপের মাটিতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় একক গণহত্যাযজ্ঞ।

 

স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদের এক অনন্য উদাহরণ। পাকিস্তানের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ন ও অহিংস আন্দোলন করে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে অনুন্নত আঞ্চলিক বৈষম্যের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবার জন্য এই সংগ্রাম আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সাহসী উদাহরণ।  কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক একনায়কতন্ত্র সেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে না নিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার পথ বেছে নেয়। ফলে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মুক্তিযুদ্ধ।

 

এই ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কী সম্পর্ক? দেখা যাচ্ছে সম্পর্ক ও তাৎপর্য রয়েছে বিপুল পরিমানেই।

 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত যুদ্ধাপরাধের বিচার যেভাবে এগিয়েছে তাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্প্রদায় ‘ক্রান্তিকালীন বিচারব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘঠিত হবার কয়েক মাসের মধ্যেই একটি সমাজে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এমনটা বোঝানোর জন্য ‘ক্রান্তিকালীন বিচারব্যবস্থা’ একটি কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক শব্দ। কারণ এর দ্বারা এটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে যারা সেই সময় ভয়ানক অপরাধগুলো করেছিলো তদেরকে বিচারের আওতায় আনার জন্য কার্যকর চেষ্টা করা হয়েছিলো।

 

কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান সেই প্রচেষ্টাকে বাঁধাগ্রস্থ করে। শেখ মুজিব হত্যার পরের সরকার এবং জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত সহযোগীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিরাপদে থেকেছে। কেউ কেউ সরকারী উচ্চ পদেও আসীন হয়েছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলেও এটা কোন দৈব ঘটনা ছিলো না। দেশের এই অবস্থাটি তৈরীর জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়েছিলো।

 

১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রায় ৪০ বছর যাবৎ নিরবিচ্ছিন্যভাবে কাজ করতে হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। নি:সন্দেহে এটা একটা মহান তাত্পর্যপূর্ন পদক্ষেপ।

 

ট্রাইব্যুনালের যে সকল বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরী হয়েছে সেসব বিশদ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের উপযুক্ত স্থান বা সময় নয় এটা নয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের লজ্জাজনক সহযোগিতায় কিভাবে পাকিস্তান জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি ট্রাবুনাল গঠনে বাঁধার সৃষ্টি করেছিলো সেসব বিশ্লেষণের সময়ও এটা নয়। সেগুলো নিয়ে আমি পরে কখনো লিখবো।

 

এখন যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন, সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ডেভিড বার্গম্যানকে আদালত অবমাননার দায়ে বিচার করছে। সেই ডেভিড বার্গম্যান, যে কিনা অসাধারণ রিপোর্টিং এর মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন কিভাবে ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীরা দায়মুক্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে বসবাস করছে। ১৯৯৫ সালে ইংল্যান্ডের চ্যানেল ফোর এ প্রচারিত যে ‘দি ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ নামের গবেষণামূলক তথ্যচিত্রটি ৭১ এর যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি আবারো আলোচনায় এনেছিলো ডেভিড বার্গম্যান ছিলেন তার গবেষণা ও প্রযোজনা টিমের মূল সদস্য।  এই তথ্যচিত্রটির মাধ্যমে দেখানো হয়েছিলো কিভাবে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় সদস্যরা ১৯৭১ সালে একাধিক গনহত্যা করার পরও কোনরূপ গ্রেফতারের ভয়-ভীতি ছাড়াই বৃটেনে বসবাস করছিলো। তথ্যচিত্রটিতে তুলে আনা প্রমাণগুলো ছিলো মর্মস্পর্শী।

 

বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগটি ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের সময় দেয়া আদেশের একটি বাক্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। ঐ আদেশে বলা হয়েছিলো যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লক্ষ লোক নিহত হয়েছে।

 

বার্গম্যান তাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা গুলো সম্পর্ক বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এবং সেগুলোর উপর নানা মন্তব্য করেছেন।

 

আদালতের কার্যক্রম, যুদ্ধপরাধের ব্যপকত্ব এবং যুদ্ধের বর্তমানকালীন তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা ও মতামত দেয়ার প্রসংগেই, ১৯৭১ সালে সত্যিকার অর্থেই কতজন মানুষ নিহত হয়েছিলেন সেই বিতর্কিত বিষয়টি তুলে আনেন বার্গম্যান। এটি অবশ্যই একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়। তবে এই বিষয়টি কোনভাবেই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ কোন অংশ নয়। সাঈদীর বিরুদ্ধে দাখিলকৃত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।

 

এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণে যেতে চাইলে আমি হয়তো একদম ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট নির্বাচন করতাম, তবে ডেভিড বার্গম্যান সাঈদীর মামলার রায়ের পর্যালোচনার মধ্যে থেকেই বিষয়টিকে সামনে এনেছেন। ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর বার্গম্যান যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ঐতিহাসিক বিতর্কটি নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করেন। লেখায় তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর জাত চিনিয়েছেন। বার্গম্যানের দক্ষতায় তাঁর লেখায় এই পুরো বিতর্কের প্রায় সকল অংশ সম্পূর্ণরূপে ফুঁটে উঠেছে। লেখাটি নিশ্চিতভাবেই অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ এবং চিন্তার খোরাক যোগায়।

 

আবুল কালাম আজাদ, যিনি বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছেন, তাঁর মতে ত্রিশলক্ষ শহীদের এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন এখতিয়ার কারও নেই। জনাব আজাদের সংকীর্ণ ‘জাতীয়তাবাদ’ এর মাপকাঠিতে যিনি এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন তিনি অবশ্যই ‘জাতির শত্রু’, ‘দেশের শত্রু’ এবং ‘ট্রাইব্যুনালের শত্রু’।

 

এখানে আমরা অতি দুরূহ একটা বিষয়ের অবতারণা করছি। একটি ঐতিহাসিক বিতর্কের কোন অংশের ‘ঐতিহাসিক শুদ্ধতা’ নিরূপণ কি ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

 

এই বিষয়ে আরেকটু বলতে হয়। ১৯৭৪ সালে আমি ছিলাম ফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ-এর বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিবেদক। বাংলাদেশে আমার সাংবাদিকতা জীবনে আমি একজন ইন্টারেস্টিং মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিলাম।

 

যেহেতু তিনি আমার প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের খবরের উৎস হিসেবে কাজ করেছিলেন তাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি তাঁর নাম উল্লেখ করতে পারছি না। আমি জানি না তাঁর সাথে কিভাবে যোগাযোগ করা যায় কিংবা তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা।

 

আমার প্রতিবেদনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সংবাদের উৎস হিসেবে কাজ করা ছাড়াও এই লোকটি আমাকে তাঁর কাজ সম্পর্কে আরও চমৎকার সব তথ্য দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে ফিরে যাই। তিনি তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি গবেষকদলের সাথে কাজ করছিলেন যাদের উপর দায়িত্ব ছিল মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে পুরো দেশে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের ফলে যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির একটি খতিয়ান দাঁড় করানো।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানের অন্যতম প্রচেষ্টা ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের হাতে ঠিক কতজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁরা আরও জানার চেষ্টা করছিলেন কতজন মানুষ শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পথে কিংবা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানোর পর মারা গিয়েছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিল শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠ।

 

মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের দ্বারা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করেই অনুসন্ধান কাজ চালানো হয়েছিলো যেখানে গ্রামে গ্রামে গিয়ে পরিবারগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হতো যুদ্ধকালে সেই গ্রামগুলোতে ঠিক কতজন মানুষ, কিভাবে মারা গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তারা পুরো দেশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দাঁড় করাচ্ছিলেন। আমার সাথে তার পরিচয়ের সময় পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেলায় তাঁদের জরিপ কাজ সমাপ্ত করেছিলো।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আমার সেই তথ্যদাতা আমাকে জানিয়েছিলেন, তাঁদের হিসাব অনুসারে যুদ্ধকালে নিহত মানুষের মোট সংখ্যা ২,৫০,০০০। আমার যতদূর মনে পড়ে এই সংখ্যা শরণার্থী শিবির কিংবা উন্মত্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর থেকে  পালানোর সময় মৃত্যুবারণকারীদের বাদ দিয়েই হিসাব করা হয়েছিলো।

 

সশস্ত্র যুদ্ধে আড়াই লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু অবশ্যই একটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক ঘটনা। যাই হোক, আমার সেই তথ্যদাতা আমাকে জানান যে এই অনুসন্ধানকাজ আকস্মিকভাবে বন্ধ ঘোষনা করা হয়। কারণ হিসেবে জানা যায় যে এই জরিপের ফলাফল নিশ্চিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধে এবং শরণার্থী শিবিরে মৃত্যুবরণকারীদের সঠিক সংখ্যা তুলে আনতো যা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশলক্ষ মানুষের মারা যাওয়ার প্রচলিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

এর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা ত্যাগ করে নয়াদিল্লীতে ফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ-এর দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধির পদে যোগদান করায় আমি এই সংখ্যা কোনদিন প্রকাশ করতে পারিনি। সব সময় আমার একটি ইচ্ছা ছিল এই বিষয়ে কিছু লেখার কিন্তু ভারতে জরুরী অবস্থা জারি এবং আরও কিছু ঘটনা এই বিষয়টিকে সেই অল্প কয়েকটি প্রতিবেদনের একটিতে পরিণত করে যেগুলো নিয়ে আমি লিখতে চাইলেও আর লিখতে পারিনি।

 

ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আনীত আদালত অবমাননার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমার উল্লিখিত এই ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। কারণ ১৯৭৪ সালে সরকারের পরিচালিত অনুসন্ধানই ত্রিশলক্ষ শহীদের এই সংখ্যার যথার্থতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই সংখ্যাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অপরাধে একজন সাংবাদিকের বিচার করছে।

 

নিশ্চিতভাবেই এই সংখ্যা নিয়ে একটা মারাত্মক বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। যদি বিচারপতি হাসান এবং তাঁর সঙ্গীরা বার্গম্যানকে দোষী সাব্যস্ত করেন, তাহলে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা ডঃ এম এ হাসানসহ অন্যান্য গবেষক এমন কী আমাকেও আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে, কারণ মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ হয়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর একটাই, যার উত্তর এখন ট্রাইব্যুনালকেই দিতে হবে।

 

গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একটি যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রকৃত ভূমিকা অবশ্যই এমন হবার কথা নয়। সম্ভবত, এমন রুলিং এর তুলনা কেবলমাত্র উনিশ’শ ত্রিশের দশকের স্ট্যালিনীয় কোর্টগুলোর সাথেই করা যায় যেখানে বুখারিনের মত মানুষও অত্যাচারিত হয়ে আদর্শিক ত্রুটি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিলেন। আবুল কালাম আজাদের মত মানুষদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঐতিহাসিক ‘সত্যের’ রক্ষকের ভূমিকাও পালন করতে হবে, তা সেই সত্য যত বিতর্কিতই হোক না কেন।

 

ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক দায়িত্ব হচ্ছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে সকল ফ্যানাটিক সমর্থকেরা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং নৃশংস যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা; যে দায়মুক্তির চাদরে তাঁরা দিনের পর দিন বাংলাদেশ ও পৃথিবীর যাবতীয় আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বেঁচে আছেন তার অবসান ঘটানো। ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সহস্রাধিক ভুক্তভোগীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর এক বিশাল দায়িত্ব আজ ট্রাইব্যুনালগুলোর উপর অর্পণ করা হয়েছে।

 

আমার দৃষ্টিতে কেউই জানেন না কোনটি সত্য, কিংবা কারও কাছেই প্রকৃত সংখ্যাটি কত তার কোন কোন খতিয়ান নেই। আমার মতে, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১৯৭৪ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক চালানো জরিপটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত পাওয়া ২,৫০,০০০ সংখ্যার চেয়ে নিশ্চিতভাবেই বেশি।

 

২০১১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত বিভাগের পক্ষ থেকে আমাকে আমার বসনিয়ার অভিজ্ঞতা জানানোর জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

 

আমি রাবিয়া আলীর সাথে একটি বই লেখা এবং সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলাম যার নাম ছিল “Why Bosnia? Writings on the Balkan War”। আমি বসনিয়ার পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি আর সারায়েভোসহ অন্যান্য শহরের এমন বহু উদ্যান কিংবা খেলার মাঠের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছি যেগুলো মানুষের কবরে ছেয়ে গিয়েছিলো, যেখানে বেসামরিক মানুষদেরকে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের মধ্যে তড়িঘড়ি করে কবর দেয়া হয়েছিলো।

 

বইটির লেখকদের মধ্যে আমার বেশ কিছু বন্ধুও ছিল যারা বসনিয়ার গণহত্যার বিচারে গঠিত যুদ্ধাপরাধ আদালতের সাথে কাজ করেছিলেন। বসনিয়ায় যুদ্ধ শেষে প্রতিটি গণকবর চিহ্নিত করে পুনরায় খনন করা হয়েছিলো।

 

যাদের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিলো তাঁদের প্রত্যেকের ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়েছিলো। তারপর তাঁদের সেই দেহাবশেষ যথাযোগ্য সম্মানের সাথে ততদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছিলো যতদিন পর্যন্ত না তাঁদের পরিবারের কোন জীবিত সদস্য সেই মৃতদেহ শনাক্ত করে পূনরায় দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এমনটা সেব্রেনিৎসাসহ পুরো বসনিয়াতেই করা হয়েছিলো।

 

প্রশিক্ষিত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে এমন বিরাট একটি কাজ করা অনেক ব্যয়বহুল হলেও জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বসনিয়া সরকার সেই খরচ বহন করেছিলো। পুরো কাজটা সম্পন্য করতে কয়েক বছর লাগলেও এটি ছিলো গণহত্যা পরবর্তী সময়ে একটি সমাজের নৈতিক দায়বদ্ধতা। এভাবে বসনিয়রা ঐ যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা কত হতে পারে সেই সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছিলো। কিন্তু কেউই জানে না প্রকৃত সংখ্যাটা ঠিক কত। কারণ এইসব ক্ষেত্রে প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ অসম্ভব।

 

২০১১ সালে আমি যখন আমি বাংলাদেশে ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত বিভাগের মুখোমুখি হই তখন আমাকে জানানো হয়েছিলো যে, পুরো দেশে দুই শতাধিক গণকবরের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন এবং তখনও খুঁজছেন।

 

ডেভিড বার্গম্যান এই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার লেখায় ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফইন্ডিং কমিটি’র আহবায়ক ড. এম এ হাসানকে উদ্ধৃত করেছেন। উল্লেখ্য যে, এরশাদ সরকারের পতনের পর ড. এম এ হাসান একটি গবেষক দল গঠন করে তাদের নিয়ে শহীদের সঠিক সংখ্যা ও তথ্য নির্নয় করতে পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন, গ্রামে গ্রামে গিয়েছেন।

 

ড. হাসান বার্গম্যানকে বলেছেন যে, তার ধারণামতে ৩০ লক্ষ একটি অতিরঞ্জিত সংখ্যা এবং সঠিক সংখ্যাটি সম্ভবত ১২ লক্ষের কাছাকাছি হবে। তিনি বার্গ্যানকে বলেছেন, “আমরা ৯৪৮টি বধ্যভূমি বা গণকবরের সন্ধান পেয়েছি। আমাদের গবেষণা অনুসারে প্রতি একটি গণকবরের বিপরীতে আরও চারটি গণকবর রয়েছে যার উপর পরবর্তীকালে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে কিংবা যার হদিস পাওয়া যায় না।এই হিসেবে মোট গণকবরের সংখ্যা ৫০০০ বলে ধরে নেয়া যায়”।

 

ডঃ হাসান অনুমান করেন যদি প্রতিটি কবরে ১০০টি করে লাশ থাকে তবে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫,০০,০০০ যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই ১৯৭৪ সালের অনুসন্ধানের ফলাফলেরও দ্বিগুণ। অবশ্য, ডঃ হাসানের এই অনুমান মোট মৃতের সংখ্যার ৩০ শতাংশের মত, কারণ তিনি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার থেকে অনুমান করেছেন যে মোট নিহতের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষকে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিলো আর বাকীদের দেহ নদী-নালায় বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেয়ায় তা পচে গলে নষ্ট হয়ে গেছে।

 

এভাবে ডঃ হাসান, যিনি সম্ভবত এই বিষয়ে দীর্ঘসময় গবেষণাকারী একমাত্র বাংলাদেশী, অনুমান করেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ১২ লক্ষের মত হবে। অবশ্য, এই সংখ্যায় তাঁদের যোগ করা হয়নি যারা শরণার্থী শিবিরে কিংবা শিবিরে যাওয়ার পথেই মৃতুবরণ করেছিলেন।

 

সত্যি কথা বলতে কেউই জানেন না সঠিক সংখ্যাটা ঠিক কত হতে পারে, এমনকি অনুমানও করতে পারেন না। ডঃ হাসানের অনুমানই সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছে। অবশ্য সংখ্যাটি যতই হোক না কেন নিশ্চিতভাবেই তা বেশ বড়। এই সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে সহস্রাধিক পরিবারের দুঃখ ও বেদনা যারা তাঁদের আপনজনকে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন।

 

এই জটিল, দুরূহ আর আবেগময় অবস্থায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-২) এমন একটি বিষয়ে রুলিং দিতে যাচ্ছেন যেখানে তাঁদের নিজেদের কাছেই কোন সঠিক উত্তর নেই।

 

আমাদের চিন্তাধারা কেমন হবে তা বলে দেয়ার জন্যে কোন আবুল কালাম আজাদ কিংবা কোন আদালতের প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে, তিনি নিজেই চারদশক ধরে চলে আসা এই বিতর্কে কোন অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশপ্রেমের ছদ্মবেশে মূর্খতা কি কাউকে জ্ঞানের পথে চালিত করতে পারে?

 

এখন কেউ শুধু এতটুকুই আশা করতে পারেন যে ট্রাইব্যুনাল যথেষ্ট বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে যে এটি কোনভাবেই তাঁদের বিচার কার্যের আওতায় পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র আর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার এক লড়াই। মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূর্খতা, ঔদ্ধত্য আর সামরিক শাসকদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক গণযুদ্ধ।

 

অতীতের মত এখনও বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই এখন বোধোদয় জরুরী হয়ে পড়েছে।

 

আমার মতে, একটি বিজ্ঞ আদালত, অবশ্যই চিন্তা করবেন ফ্র্যাসোঁয়া-ম্যারি অ্যারোয়ে, যাকে আমরা ভলতেয়ার নামে চিনি, তিনি ভিন্নমত নিয়ে কি বলে গিয়েছিলেন। ভলতেয়ার ছিলেন ফরাসী বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ অষ্টদশ শতাব্দীর একজন দার্শনিক এবং লেখক। তিনি বলে গিয়েছেন, “তুমি যা বল তাঁর সাথে আমার দ্বিমত থাকতে পারে, তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি তোমার সেই কথাটি বলার অধিকার রক্ষায় লড়াই করে যাবো”।

 

* * *

 

২০১১ সালের ২৩ মে, বিবিসির বাংলা বিভাগের উপ-প্রধান সিরাজুর রহমান ব্রিটিশ পত্রিকা দ্যা গার্ডিয়ানে একটি চিঠি পাঠান। তিনি ইয়ান জ্যাকের লেখা একটি প্রবন্ধ যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিলো, তার উপর নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। জনাব রহমান একটি ইতিহাস তুলে ধরেন সেখানে। তিনি লেখেন,

“১৯৭২ সালের জানুয়ারীর ৮ তারিখে, আমিই ছিলাম প্রথম বাংলাদেশী যিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করি। তাঁকে হিথ্রো থেকে লন্ডনের ক্ল্যারিজেসে আনা হয়… এবং আমি প্রায় সাথে সাথে সেখানে পৌঁছাই… তিনি যখন আমার কাছ থেকে জানতে পারেন যে তার অবর্তমানেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছে, তখন তিনি বিষ্মিত হন। দৃশ্যত তিনি লন্ডনে এসেছিলেন এই ধারণা নিয়ে যে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানিদের যেই স্বায়ত্বশাসনের জন্যে লড়াই করছিলেন পাকিস্তানিরা তা মেনে নিয়েছে।”

 

“সেইদিন আমি এবং অন্যরা তাঁকে যুদ্ধের একটি বিবরণ দেই। আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম যে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কোন সঠিক হিসাব জানা যায়নি, তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে আমাদের অনুমান, কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছেন। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম যখন তিনি ডেভিড ফ্রস্টকে বললেন ত্রিশ লক্ষ মানুষকে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছে। আমি জানি না কি কারণে তিনি এই সংখ্যাটি বলেছিলেন, হয়তো তিনি মিলিয়ন শব্দটির ভুল অনুবাদ করেছিলেন কিংবা তাঁর অস্থিরচিত্ত এর জন্যে দায়ী হয়ে থাকতে পারে। তবে আজও অনেক বাংলাদেশী বিশ্বাস করেন সংখ্যাটি আসলেই অতিরঞ্জিত।”

 

শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক ভালো গুণ ছিল। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে ভারত থেকে ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধীনে ফেলোশিপ শেষ করার পর ঢাকা সফরকালে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। আমরা দুইঘন্টা ধরে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে বসে কথা বলেছিলাম। তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ আমার আবারও হয়েছিল যখন আমি বাংলাদেশে কর্মসূত্রে ফিরে আসি। ১৯৭৫ সালের পর থেকে আমি বহুবছর তাঁর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে কাজ করে গেছি।

 

জীবনে কোন ভুল করেননি এমন কোন মানুষকে আমি খুঁজে পাইনি। তেমনি শেখ মুজিবও ভুল করেছিলেন। আমি বিশ্বাস করি তিনি ফ্রস্টের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভুল বকেছিলেন। বহু আগেই বিষয়টির সুরাহা হওয়া উচিৎ ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই সংখ্যাটি কিছু অন্ধবিশ্বাসী মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

 

প্রকৃতপক্ষে ডঃ হাসানের গবেষণার আলোকে দেখলে সিরাজুর রহমানের অনুমান সঠিক হয়, কিন্তু সিরাজুর রহমান বুদ্ধিমত্তার সাথে আরও বলেছিলেন যে এখনও “কোন সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি”। আগামী বছরগুলোতে আরও গবেষণা এবং বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়েই জানা যাবে স্বাধীনতার জন্যে বাংলাদেশীদের আত্মত্যাগের মাত্রার বিশালতা।

 

এই লেখাটি আমি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থার ওয়েব সাইটে প্রকাশ করছি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী এটি প্রকাশের অধিকার আমার আছে।

 

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এটি আমি বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যম থেকে প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ কয়েকমাস আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা বিষয়টিকে ‘বিচারাধীন’ হিসেবে তাদের কর্তৃত্বাধীন বলে ঘোষনা করেছেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে সকল ধরণের আলাপ আলোচনা নিষিদ্ধ করেছেন। হয়তো এই কারণে আমার বাংলাদেশী সহকর্মীরা এটিকে তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করতে পারবেন না।

 

যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি যে, এখানে প্রাসঙ্গিক তথ্য আছে এবং এগুলো গণমাধ্যমে প্রচার করে জনগণ ও আদালতকে তা জানার সুযোগ করে দেয়া উচিত। ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কর্তৃক সমীক্ষার বিষয়টি প্রথমবারের মত এখানে প্রকাশ করা হলো। আমার উদ্দেশ্য কোর্টের আদেশের প্রতি স্পর্ধা দেখানো নয়, বরং বিষয়টি জানানো।

 

৯ অক্টোবর, ২০১৪

স্টোনি ক্রিক, সিটি, ইউএসএ।

ইমেইল: OpenDoor.Lifschultz@gmail.com

Translated from Original English by Nuraldeen

A MAN & HISTORY ON TRIAL The Case of David Bergman By Lawrence Lifschultz

1

A MAN & HISTORY ON TRIAL  The Case of David Bergman

 By Lawrence Lifschultz

Justice Obaidul Hasan and his colleagues at Bangladesh’s International Crimes Tribunal (# 2) are scheduled to rule on the question of an unusual historical dispute.  How and why this question of history has become the subject of a contempt proceeding is a troubling story. Their decision is expected on October 13th and it may have ramifications that even the justices of ICT-2 may not fully appreciate.

 

The case concerns the British journalist, David Bergman, who has been a long time resident of Bangladesh.  Mr. Bergman has been accused of “contempt” of Court for exploring an issue pertaining to an historical reference that one of the Tribunals made in a particular case.

 

The Tribunal itself did not bring the accusation against Bergman. The proceedings were initiated in the form of a petition by a third party, a High Court lawyer, Abul Kalam Azad. He accused David Bergman of showing disrespect to the Tribunal by raising a question about the number of casualties that occurred during Bangladesh’s War of Liberation.

 

After hearing Azad’s petition, the Tribunal issued an Order to Show Cause seeking a response from Bergman as to why he should not be held in contempt. While there were two other relatively minor charges raised by Azad in his petition, the central accusation focused on the fact that in a review of a forty-year debate David Bergman had questioned the accuracy and indisputable character of a statistic that had been cited by the War Crimes Tribunal.

 

The petitioner in this case, Abdul Kalam Azad, is the type of man who gives nationalism a bad name. Nationalism, as a singular ideology, is a two-edged sword.   In the context of an oppressed nationality seeking to overcome colonial rule or foreign occupation, nationalism can play a powerful and progressive role.  But in other circumstances it can become the breeding ground for bigotry and narrow ideological dogmatism.

 

In the case of Bosnia in the early 1990s, for example, Serb nationalism became genocidal and lead to the brutal “ethnic cleansing” of Bosniak,—largely Muslim—and Croatian—largely Catholic—populations, of a country with a long historical tradition of multi-ethnic tolerance and peaceful co-existence among its diverse communities.

 

The history of Bangladesh’s struggle for Liberation represents an example of a “progressive” nationalism. It is one of the clearest and most courageous examples in modern history of a democratic movement pursuing every non-violent option, including winning a national election, in order to overcome the trap of underdevelopment and regional inequality that were an integral part of the very structure of Pakistan’s military dictatorship. The dictatorship would not yield to the results of a democratic vote. On 25 March 1971 the Pakistan Army opted for mass murder instead and from that moment Bangladesh’s War of Liberation began.

 

What does this historical background have to do with David Bergman’s trial for contempt? As it turns out, a great deal.

 

Bangladesh has been in search of what the human rights community calls “transitional justice” since the country won its freedom in 1971.  Transitional justice is an awkward term that is meant to reflect a sense that justice and accountability has been achieved within a society in the aftermath of war crimes and crimes against humanity.  It means that an effective effort has been made to bring those who have committed these terrible crimes to justice.

 

The coup of 1975, only four years after Liberation, interrupted that journey for Bangladesh.  Instead, during the tenure of the back-to-back regimes of General Zia and General Ershad which emerged after the murder of Sheikh Mujib, notorious collaborators of the Pakistan Army found themselves under the protection of Bangladesh’s new military dictators. Several ended up in high government positions. It was a curious turn of fate but not an accidental one.  There was a great deal of careful planning and killing involved in order to create such a state of affairs.

 

It took nearly forty years for a serious effort to be undertaken to bring the war criminals of 1971 into a system of justice that would focus on putting these men on trial. Thus Bangladesh’s first International Crimes Tribunals was established in 2009 and the second, soon after.  These were steps of great significance. This is not the place nor the time to examine in detail the many controversies that have emerged related to the work of the Tribunals. Nor is it the place to examine how Pakistan, with the shameful cooperation of the United States and France, blocked the sharing of UN expertise and assistance to Bangladesh in setting up the Tribunals. I will return to these topics in another article.

 

What is of importance today is that one of Bangladesh’s War Crimes Tribunals may decide to hold in contempt David Bergman, a reporter from whose early work we learned that war criminals from the 1971 War of Liberation were living with impunity in England.  Bergman was a key member of the team that researched and produced the excellent 1995 Channel Four documentary, “The War Crimes File”. This documentary threw a spotlight on individual members of the Jamaat-e-Islam and its student wing who were allegedly involved in multiple murders in 1971 but were living openly in Britain without fear of arrest. The evidence mustered in this documentary was impressive.

 

The contempt allegation against Bergman relates to a sentence in a 3 October 2011 Tribunal order charging Delawar Hossain Sayedee.  The order made a reference to the deaths of three million people during the War of Liberation.

 

Bergman has edited a website in which he has reported and commented on the various trials taking place before the War Crimes Tribunals.  He decided to take up the controversial topic of how many people died during 1971. Obviously, this is a difficult subject. On its own it was not central to the indictment of Sayedee, as the evidence against Sayedee was based on other factors.  But in making its ruling the Tribunal had cited a statistic that is accepted by many as an indisputable fact.

 

While I might have chosen a different context to examine this issue in detail, David Bergman decided to do it within the framework of a discussion of the Tribunal’s indictment of Sayedee. Therefore, on 11 November 2011, he wrote a detailed review of the historical debate on the issue of war casualties. Here he showed his capabilities as a ‘scholar journalist’.  Bergman’s mastery of the material covering the full spectrum of the debate on this issue was impressively clear. It is a thoughtful and insightful commentary.

 

However, Abul Kalam Azad, the attorney who called for Bergman to be held in contempt, argued that no one should question the accuracy of the statistic of three million deaths during the War of Liberation.  From the vantage point of Azad’s narrow-minded ‘nationalism’ anyone who questions this statistic must be ‘an enemy of the people’,  ‘an enemy of the state’, or an enemy of the Tribunal. Here we approach the really difficult issue. Is it the role of a Tribunal to pass judgment on the ‘historical correctness’ of a particular position in a historical debate such as this one?

 

Let me complicate the picture even further. In 1974, I was the Far Eastern Economic Review’s resident correspondent in Bangladesh. In the course of my reporting I met a very interesting man who had a very intriguing story to tell about the work he had recently been doing. He was employed by the Home Ministry and was part of a team of researchers conducting a study that was trying to assess the total number of casualties that had occurred during the nine months of 1971 as war raged across the country.

 

The Home Ministry study was trying to assess how many people had died directly from the armed violence of the Pakistan Army and their local collaborators. They were also trying to estimate how many people had died on the road or once they reached refugee camps across the border in India. Many of these deaths were among children and the elderly. The study was conducted by field workers systematically asking families in villages about those who had died from their village during the war and under what circumstances.  They were slowly building up a picture across the country. At the time we met, the Home Ministry team had completed their survey in approximately a third of the districts.

 

My Home Ministry source told me that based on their projections the number of deaths from the war was estimated at 250,000 people. As I recall, this did not include the young, the ill and the elderly, who died either in the refugee camps or as they fled the Pakistan Army. A quarter of million people dying from armed violence is by any measure a terrible and tragic number.  However, according to my source, the study was abruptly shut down and discontinued. The reason was that the survey was moving toward a statistical conclusion that differed with the prevailing orthodoxy that three million people had died from armed violence and refugee migration.

 

I never published this account because I was leaving Bangladesh within a week to take up a position as South Asia Correspondent of the Far Eastern Economic Review based in New Delhi. I had always meant to return to the issue but the Emergency in India and other events conspired to make this one of the few stories I never revisited as I intended.

 

Yet, in the context of the trial of David Bergman on contempt charges, it is has assumed great relevance. It is relevant because the government’s own study in 1974 essentially questioned the accuracy of the three-million figure and yet the ICT-2 is now considering holding a journalist in contempt for raising a question about this issue.

 

There is something wrong with this picture. If Justice Hasan and his colleagues declare Bergman in contempt, are they entering a terrain where they must hold Dr. M. A. Hasan and other researchers, such as myself, in contempt because there is only one true answer and the Court will declare what it is?

 

This is not the appropriate role of a war crimes tribunal in pursuit of justice in a democratic society. Perhaps, in one of the Stalinist courts of the 1930s where men like Bukharin were compelled to confess to ideological ‘errors’, one could expect such a ruling. In the minds of men like Abul Kalam Azad, the War Crimes Tribunals should become the ideological guardian of historical ‘facts’ whether they be disputed or not.

 

The historic task of the Tribunals is to bring to justice those responsible for the appalling war crimes and crimes against humanity that were carried out in a premeditated manner by fanatical supporters of the Pakistani state. The impunity under which they have lived for decades is a stain on the conscience of this country and the world.  The Tribunals have an immense task to accomplish justice in this regard and thereby honor the memory of the hundreds of thousands of victims. My view is that no one knows the truth or has an accurate number. In my opinion the death toll from armed violence might well have exceeded the 250,000 estimated by the 1974 Home Ministry study before it was shut down.

 

In March 2011, I was invited by the special investigations unit of Bangladesh’s War Crimes Tribunal to speak to the investigators about my knowledge and experience in Bosnia. I had co-edited a book with Rabia Ali entitled “Why Bosnia? Writings on the Balkan War”. I had also traveled widely in Bosnia and sadly I had walked through the many parks and soccer fields of Sarajevo and other towns that were filled with graves where the civilian dead were hurriedly buried in the midst of the long sieges and heavy bombardment of Bosnia’s war ravaged cities. I also had friends among the contributors to our book who had worked with the war crimes tribunals that were set up following the conflict.

 

In Bosnia, all the unmarked mass graves scattered throughout the country were excavated when the conflict ended. DNA tests were done on each person whose remains were exhumed. Their remains were respectfully kept until living family members could reclaim their relatives for burial once they had been accurately identified. This happened at Srebrenica and elsewhere.

 

The cost of deploying carefully trained forensic teams was significant and was funded by the UN, the European Union and the Bosnian government. Although it took years, this work was undertaken as a moral commitment by a society coming to grips with the aftermath of genocide. By this means, the Bosnians have built up a rough estimate of those who perished. But no one knows the precise number. Such a number is always elusive.

 

When I met the Bangladesh investigations unit in 2011, I was told by the team that they had identified over two hundred mass graves across Bangladesh, and they were still counting.

 

David Bergman in his discussion of this issue cites the study of Dr. M.A. Hasan, the Convenor of the War Crimes Fact Finding Committee, who since the fall of General Ershad had a assembled a team of researchers who “travelled around the country, village-to-village, to uncover accurate information on the numbers of dead.”

 

Dr. Hasan told Bergman that he thought the figure of 3 million was an exaggerated number and that more accurate number was closer to 1.2 million. “We have identified 948 killing fields or mass graves,” Hasan told Bergman. “Our research suggests that for every one grave that we have found there are four others which have been built upon or are not accessible. That makes a total of 5,000 graves.”

 

Dr. Hasan estimated approximately a 100 bodies in each grave, which results in an estimate of 500,000, or twice that of the projection developed by the 1974 Home Ministry study.  Yet, Dr. Hasan estimates based on his discussions with local villagers that those buried in the mass graves represent about 30 percent of the total number of deaths, with the a greater number of the dead having been disposed of by being thrown into local rivers where they were washed away.

 

Thus, Dr. Hasan, who is perhaps the only person to have researched this issue in such depth, estimates that 1.2 million people died during the Liberation War. Of course, this does not include many young, ill and elderly individuals who died in the refugee camps or on the road fleeing the violence.

 

The truth is that no one knows with any precision, or even approximately, what a real number might be. Dr. Hasan’s estimate is probably the most accurate.  Whatever the number is, the unmistakable truth remains that it is a number of horrific magnitude.  It reflects the pain and grief of thousands of families whose loved ones perished in the war.

 

Into this complex, difficult and emotional terrain, the War Crimes Tribunal (ICT-2) has decided to make a judicial ruling on a matter upon which jurists have no authority or place to declare a “right answer”.

 

No one needs someone like Abul Kalam Azad telling us, or asking a Court to tell us, what to think. Indeed, the man himself has failed to demonstrate any knowledge of the disputed facts or the debate that has taken place over four decades. Can ignorance dressed up as patriotism be anyone’s guide to knowledge?

 

One can only hope the Tribunal is wise enough to understand that this historical debate is outside their jurisdiction to rule on.  The War of Liberation was a war in the name of democracy and self-determination. It was an uprising against the ignorance, the hubris and the cruel violence of a military dictatorship determined to deny the outcome of a democratic election.

 

Bangladesh’s democracy, like others before it, is struggling. What is needed is enlightenment within its most important institutions. In my view, an enlightened Court would think hard about what Voltaire, said about opinions he didn’t agree with. Voltaire was a distinguished 18th century philosopher and writer associated with the French Enlightenment.  He once commented, “I do not agree with what you have to say, but I’ll defend to the death your right to say it.”

 

×  ×  ×

 

On May 23, 2011, Serajur Rahman, the Deputy Head of the BBC’s Bengali service, wrote a letter to the British newspaper The Guardian. He was commenting on an article written by Ian Jack in which the issue of the number of deaths during the Bangladesh war was discussed. Rahman had a story to report. He wrote the following:

 

On 8 January 1972 I was the first Bangladeshi to meet independence leader Sheikh Mujibur Rahman after his release from Pakistan. He was brought from Heathrow to Claridges [in London]. . . and I arrived there almost immediately. . .He was surprised, almost shocked, when I explained to him that Bangladesh had been liberated and he was elected president in his absence. Apparently he arrived in London under the impression that East Pakistanis had been granted the full regional autonomy for which he had been campaigning.

 

During the day, I and others, gave him the full picture of the war. I explained that no accurate figure of the casualties was available but our estimate, based on information from various sources, was that up to “three lakh” (300,000) died in the conflict.  To my surprise and horror he told David Frost later that “three millions of my people” were killed by the Pakistanis. Whether he mistranslated “lakh” as “million” or his confused state of mind was responsible I don’t know, but many Bangladeshis still believe a figure of three million is unrealistic and incredible.”

 

I met Sheikh Mujib in July 1969 when I was traveling through Dhaka after working in India for a year on a Fellowship from Yale University where I was an undergraduate. We had a long talk lasting two hours, just the two of us, over lunch and tea at his residence in Dhanmondi. I met him again after independence when I returned to Bangladesh as a young journalist and lived in Dhaka for a year. After 1975 I would spend many years unraveling the circumstances of his assassination.

 

There is not a single man or woman I’ve ever met who hasn’t made a mistake in their lives. Mujib had his own share, as do we all. I believe he misspoke in the Frost interview that Serajur Rahman has written about. The error should have been corrected but it never was. Unfortunately, in some circles this number took on the quality of rigid dogmatism.

 

Indeed, Serajur Rahman’s estimate in light of Dr. Hasan’s later research was probably an underestimate, but Rahman wisely pointed out on that cold January day in London in 1972 that there was “no accurate figure of casualties”. It would take research and analysis in the years ahead to gain a clearer understanding of the magnitude of suffering the people of Bangladesh underwent to gain their independence.

 

I am “publishing” this article on a website of a small publishing house (www.pamphleteerspress.com) based in the United States with which I am affiliated. My right to publish is protected by the First Amendment of the American Constitution.

 

Unfortunately, I am unable to publish this article in Bangladesh because the Justices of the War Crimes Tribunal some months ago declared this matter sub judice within their jurisdiction, and made clear that there should be no public discussion of this matter until they have issued their decision. Therefore, my Bangladeshi colleagues are unable to publish this article in their newspapers.

 

However, I believe there is relevant information that should be in the public domain that may inform both the Court and the public about new information.  The facts of the 1974 Home Ministry study are published here for the first time.  My purpose is not to defy the Court but to inform it.

9 October 2014,

 Stony Creek, CT. ×  USA

 

Lawrence Lifschultz was South Asia Correspondent of the Far Eastern Economic Review (Hong Kong). He has written extensively on European and Asian affairs for many publications, among them The Guardian, Le Monde Diplomatique (Paris), BBC, Economic & Political Weekly (Mumbai) and The Nation (New York). He is the author of Bangladesh: The Unfinished Revolution.

 

He can be reached at: OpenDoor.Lifschultz@gmail.com

 

বাংলাদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠার কারণগুলি

by Hussain Sumrat

৪২ বছর আগে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিপক্ষে বাংলাদেশ একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার জন্য যুদ্ধ করেছিল সেখানে এদেশের কিছু লোক সশরীরে বিরোধিতা করেছিল। তাঁদের বিচার হবে এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বিভিন্নভাবেই এই বিচারটি পেছনে পরে গিয়েছে। এবং দেশের মানুষ ও যারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁরাও ভেবে নিয়েছিল এই বিচার আর হবে না। কিন্তু পাপ যে কাউকে ছাড়ে না সেটি প্রমাণিত হল। একবার একটি পাপ করলে সেটি আমাদের পিছু লেগে থাকে বছরের পর বছর। যাইহোক অনেক পরে এই বিচারটি আবার সামনে চলে আসে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মত দেয় এটি হওয়া উচিত। কিন্তু সেখানে দেখা গেল বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী বাক্তি নেই। যারা আছে তাঁরা আসলে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। তাই আমরা মানবতা বিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এরকম লোকের বিচার শুরু করলাম। কিন্তু বিচার যতই সামনে যেতে লাগল ততই সেটি বিতর্কিত হতে লাগল। বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ল না। কিন্তু এখানে বিতর্ক থাকার কথা ছিল না। কারণ দেশের প্রায় সবাই এই বিচারে সমর্থন দিয়েছে। এখন দেখা যাক কি কি কারণে এটি এতো বিতর্কিত হল। আমি এখানে একান্তই আমার কাছে যা মনে হয়েছে সেগুলি নিয়ে আলোচনা করব। দয়া করে এখানে কেউ আমার রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করবেন না। যাইহোক, কারণগুলি – ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জামায়াতের লবিস্ত নিয়োগ, সুবিচার, রাজনৈতিক ফায়দা, জুডিশিয়ারি বিভাগে এক্সিকিউটিভ বিভাগের খবরদারী, ক্ষমা করে দাও, মন্ত্রি-পাতিমন্ত্রীদের কুকথা, আওয়ামেলীগ, মরার উপর খাড়ার ঘা।

noose

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ আমরা বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সাথে আওয়ামেলীগের সখ্যতা দেখেছি। ৮৬ তে যখন এরশাদ সরকারের অধীনে কেউ নির্বাচনে যাবেনা বলে ঠিক হল ঠিক সেই সময়ে লীগ ও জামায়াত নির্বাচনে গেল। যেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন কেউ নির্বাচনে গেলে সে জাতীয় বেঈমান। ঠিক তখন থেকেই দেখা যায় জামায়াতের সাথে লীগের একটি ভাল সম্পর্ক। ৯৬ এ তাঁরা এক সাথে বসেছে, আন্দোলন করেছে। কাজী জাফরের ভাষায় – আমরা যখন বিএনপির বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক দাবিতে আন্দোলন করছিলাম তখন আমাদের তিন দলের পক্ষ থেকে একটি লিয়াজু কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেখানে লীগের পক্ষ থেকে মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, জামায়াতের পক্ষ থেকে আলি আহসান মুজাহিদ ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে আমি লিয়াজু রক্ষা করতাম। সেখানে আমি লক্ষ্য করতাম আওয়ামেলীগ আমাদের সাথে (জাতীয় পার্টি) কথা বলার চেয়ে জামায়াতের সাথে কথা বলতে বেশী আগ্রহী। কিন্তু হঠাৎ করে এই সম্পর্ক এতো মলিন হল কিভাবে এটি আমার কাছে মিলেনা।

সে সময়ে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বিচারপতি বদরুল হাসান(লীগ সমর্থিত) গোলাম আযমের বাসায় যায় দোয়া নিতে। সেখানে তিনি তাঁর পায়ে সালাম করেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সাথে তাঁদের সখ্যতা ছিল। একসাথে দাওয়াত খাওয়া, যেখানে এখন লীগ বলে জামায়াত আসলে বিএনপির সাথে কোন আলোচনা না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের ভাষায় – জামায়াতের সাথে আওয়ামেলীগের মধুচন্দ্রিমা এতো তারাতারি শেষ হল কিভাবে!

এই ব্যাপারগুলি সাধারণ মানুষের মনোজগৎ থেকে বের হয়নি। এই বিভিন্নরকম প্রশ্নের কারণে এই বিচারের প্রতি মানুষের একটি বাঁকা দৃষ্টি স্থাপন হয়। এছাড়াও আরও কিছু ব্যাপার আছে।

জামায়াতের লবিস্ত নিয়োগঃ যেহেতু জামায়াতের টাকার আধিক্য আছে তাই তাঁরা দেশের বাইরে লবিস্ত নিয়োগ করেছে বলেও শোনা যায়। এছাড়া দেশের ভিতরে তাঁদের শিবির বাহিনী তো আছেই। যারা বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা সৃষ্টি করেছে। এই লবিস্ত নিয়োগের ফলে তাঁরা বিভিন্নভাবে এই বিচারের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে। যা দেশের কিছু লোকের মনে বিভিন্নরকম প্রশ্ন উত্থাপন করে। যা কিনা বিচারকে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে।

সুবিচার : অধিকাংশ মানুষ আশা করেছিল ৭১ সালে যারা অপরাধ করেছে তাঁদের শাস্তি হোক এবং ঐ সময় যারা এই অপরাধের স্বীকার হয়েছেন তাঁরা ন্যায়-বিচার পাক। কিন্তু এখানে একটি বিরাট প্রশ্ন দেখা দিল। কারণ ঐ সময়ে যারা অপরাধ করেনি তাঁরাও এখানে বলির পাঠা হিসেবে এসেছে। দু-একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যাক। মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরি কাঁদের মোল্লার রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এবং একসময় তাঁকে আদালত অবমাননার জন্য ডাকা হয়। বঙ্গবীর কাঁদের সিদ্দিকি বলেন – আমি আমার জীবনে কাঁদের মোল্লা নামে কোন রাজাকারের নাম শুনিনি। এছাড়া যে ভিক্তিমের সাক্ষীতে তাঁর ফাঁসি হয় তিনি আদালতের বাইরে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাঁর সাথে আদালতের বিবৃতির অনেক ভিন্নতা আছে। সাইদিকে নিয়ে বিরাট প্রশ্ন দেখা যায়। কারণ সাইদি যে এলাকার সে এলাকার মুক্তিযুদ্ধ সময়ের কম্যান্ডার বলেন সাইদি যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিজুদ্ধাও ছিলেন না এবং রাজাকারও ছিলেন না। সে কিভাবে এখন এতো বড় রাজাকার কম্যান্ডার হল। বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার বলেন – ইব্রাহীম কুদ্দির হত্যার দায়ে সাইদিকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে কিন্তু ১৯৭২ সালে তাঁর স্ত্রী একটি ইজহার করেছিলেন যেখানে অপরাধীদের তালিকায় সাইদির নাম নেই। তাহলে কার স্বার্থে এই রায় দেয়া হল। দেখুন বিচারকে কিন্তু বিচার করতে হবে নইলে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলতে হবে। দরকার হলে বিচার না করলে এদেরকে জেল থেকে বের করুন এবং পিটিয়ে মেরে ফেলুন। তাও সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচান। কারণ ইতিমধ্যে সাইদির ফাঁসির রায়ের প্রতীবাদে ৬-৮ ঘণ্টায় ১৫০ লোকের (যদি ভুলে না যাই) জীবন চলে গেছে। এই সাধারণ লোকগুলি যে কাণ্ডজ্ঞানেই হোক সাইদিকে ভালবাসে অথবা অন্য কোন দলকে সমর্থন করে তাই বলে এটির অপরাধে তাঁদেরকে গুলি করে মেরে ফেলা যাবে না।

এই রকম বিভিন্ন ঘটনার কারণে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে খুব ন্যায্য ভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন হয়।

রাজনৈতিক ফায়দাঃ দেশের কিছু লোকের মনে একটি সন্দেহ ছিল যে লীগ কি সত্যিকার অর্থেই বিচার করতে চায় নাকি এটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করতে চায়? সেটি ধিরে ধিরে আরও গভীর হতে থাকে। কারণ দেখা যায় এই বিচারকে ভালভাবে করার চেয়ে তাঁর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার দিকেই তাঁদের বেশী নজর। বিচার শুরু করে তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিলেন। এতে করে বিএনপি জামায়াতের অ্যালায়েন্সে আরও শক্ত হল তাঁদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে। তখন তাঁরা এই আন্দোলনকে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার আন্দোলন বলে অভিহত করল। তখন বিএনপির সমর্থকরা বলল আপনারা বিচার করছেন করেন কিন্তু এখানে আমাদেরকে দোষ দিচ্ছেন কেন? আমাদের দাবী মিটিয়ে দিন তারপর দেখেন আমরা কোন কথা বলি কিনা। এতে করে বিএনপির সমর্থকদের মাঝে বিরক্তিভাব প্রকাশ পায়। কারণ তাঁরা কোন আন্দোলন করলেই একে বলা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার আন্দোলন। তাই এই বিচারের প্রতি এক অংশের লোকের অনীহা প্রকাশ দেখা গেল। কারণ মনে রাখতে হবে দেশের অনেক লোক আছে যারা বিএনপিকেই ভোট দিবে। তাই তাঁদেরকে যখন অপরাধীদের তালিকায় ফেলা হল তখন তাঁরা এই বিচার নিয়ে খুব প্রফুল্ল থাকবে এটি ভাবা যায় না।

এ সম্পর্কে ডঃ আসিফ নজরুল বলেন – যখন বিচার কাজ শুরু হল তখন সবাই একে সমর্থন দিল কিন্তু পরে দেখা গেল আওয়ামেলীগ বিচার করার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করার জন্য বেশী বাস্ত।

জুডিশিয়ারি বিভাগে এক্সিকিউটিভ বিভাগের খবরদারীঃ আমাদের বিভিন্ন সরকারের আমলে দেখা যায় তাঁরা বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিত না। তাঁদের পছন্দমতো লোক নিয়োগ করে ও বিভিন্ন পদে বসিয়ে একে কলঙ্কিত করেছে। এই সন্দেহ এখানেও ছিল অনেক লোকের। এছাড়া একটি প্রশ্ন উঠে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিচার কিন্তু এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত ও খ্যাতনামা আইনবিদ নেই কেন? এখানে তো তাঁদের নাম আগে আসা উচিত ছিল। এই সাথে প্রকাশ পেল স্কাইপ কেলেঙ্কারি। যেখানে ধরা খেল ট্রাইব্যুনাল খুব ভালভাবে চলছে না। বিচারকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেয়া হচ্ছে যা সেই আলোচনায় উঠে আসে। একটি রায় দিয়ে দিলেই আপীলেড ডিভিশনে নিয়ে আসার প্রলোভন।

এ সম্পর্কে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজ বিজ্ঞানী ডঃ পিয়াস করিম বলেন – পৃথিবীর কোন স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে জুডিশিয়ারি বিভাগের উপর এক্সিকিউটিভ বিভাগের এতো প্রভাব থাকে! অনেক দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে মানবতা বিরোধী বিচারের ট্রাইব্যুনালে ধ্বস নেমে গেল। তিনি “ক্যাঙ্গারু ট্রায়াল” শব্দটিও ব্যবহার করেন।

এ সম্পর্কে বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহ বলেন – এটি লোকের কাছে উপহাসের পাত্র হয়ে গেছে।

এই সকল কারণে দেখা যায় অনেক লোকের মনে অনেক প্রশ্ন জন্ম দেয়। যা এই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ক্ষমা করে দাওঃ এর মধ্যে কিছু লোক এলো অন্যরকম বাণী নিয়ে। কিছু লোক বলল – মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান তাঁরা সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন যুদ্ধে। কিন্তু তাঁরাই এটি নিয়ে এতো মাতামাতি করেননি। নেলসন মান্দেলাকে ২৭ বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং তাঁর অনেক লোককে হত্যা করা হয়েছিল কিন্তু তিনি যখন জয় পেলেন তখন তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের বিচার না করে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। এইরকম বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে তাঁরা বলতে চাইলেন এইগুলিকে ক্ষমা করে দিয়ে দেশকে নতুনভাবে চালাতে।

এই বাপারগুলিও কারও কারও মন-মস্তিস্কে জায়গা করে নেয়।

মন্ত্রি-পাতিমন্ত্রীদের কুকথাঃ বিচার যখন চলছে তখন সেটি নিয়ে যত কম কথা বলা যায় ততো ভাল হয় অনেক সময়। কিন্তু সরকার দলীয় লোকরা এতো বেশী কথা বলেছে এটা নিয়ে তাতে কিছু মানুষজন বিরক্ত হয়ে গেছে এই বিচার নিয়ে। রায় নিয়ে যখন বিচারকরাই কথা বলছে না তখন মন্ত্রি-পাতিমন্ত্রীরা প্রত্যেকদিন এই নিয়ে বলছেন। তাঁরা বলছেন ঐ দিনে রায় বের হবে। ফাঁসি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন কিছু লোকের মনে প্রশ্ন জাগল এটিতো মন্ত্রীদের কাজ না। রায় দিবে কোর্ট কিন্তু তাঁরা তার আগেই কিভাবে জানে যে ফাঁসি হবে।

এই বেশী কথা বলাটা অনেক মানুষজন পছন্দ করেনি। বরং বিরক্ত হয়েছেন অনেকেই।

আওয়ামেলীগঃ সরকার বার বার বলছে বিচার নিয়ে বিরোধীদল ষড়যন্ত্র করছে। তাঁরা যুদ্ধাপরাধীর পক্ষের দল। কিন্তু কিছু লোকের চোখে পরল বিপরীত ঘটনা। তাঁরা দেখলেন এই বিচারকে লীগ নিজেই তর্কবিদ্ধ করেছে। ১৯৭৪ সালে যখন Bhutto (যিনি ৭১ এর খলনায়ক) ঢাকায় আসলেন তাঁর আগে অনেক মুক্তিজুদ্ধা রাস্তায় নেমেছিলেন তাঁকে না আসতে দেয়ার জন্য কিন্তু তখন লীগের লোক সেই মুক্তিজুদ্ধাদের পিটিয়েছে। আর লীগের সাপোর্টাররা ঢাকায় একটি স্লোগান দিয়েছিল Bhutto Jindabad । জামায়াত-শিবির যখন মিছিল করে তখন পুলিশ লাঠি-চার্জ ও গুলি করে। আবার সুজুগ পেলে শিবির পুলিশের উপর আক্রমণ করে। কিন্তু হঠৎ দেখা গেল সেই শিবির কর্মীরাই পুলিশকে ফুল দিচ্ছে। তখন বাজারে একটি গুঞ্জন শোনা গেল যে আড়ালে জামায়াতের সাথে লীগের কথা চলছে। বিএনপি থেকে জামায়াতকে সরে আসতে বলা হচ্ছে তাহলে এই বিচার বিলম্ব করে একসময় শেষ করে দেয়া হবে।

ফরহাদ মজহার বলেন – আমরা সবাই চাইছিলাম ৭১ যারা সত্যিকার অর্থে ভিক্তিম তাঁদের উপর ন্যায় বিচার করা হোক। কারণ এটি নিয়ে সমাজে একটি ক্ষত আছে। এই ক্ষত দূর করতে হবে। দূর না করে উপায় নেই। কিন্তু সব সরকার এটি নিয়ে আমাদের সাথে খেলা করেছে। তাই এবার সবাই আশাবাদী হতে চেয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল লীগ শুধু মাত্র কয়েকজন লোককে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য, এই বিচারকে বাঞ্চাল করার জন্য কাজ করছে।

কাজী জাফর বলেন – যুদ্ধের পর যখন বঙ্গবন্ধুকে বললাম বিচার করেন না কেন? তখন তিনি বলেছিলেন ওরে জাফর আমি কার বিচার করব! আমার চাচা (ভুল হতে পারে আমার, অন্য কোন আত্মীয় হতে পারে,অনেক আগের কথা তো) নিজেই শান্তি কমিটিতে ছিলেন। তাহলে কি আমি আমার ঘড় থেকেই মানুষ মেরে আবার একটি গৃহ যুদ্ধ বাধাব।

লীগের ভিতর এখনও রাজাকার আছে কিন্তু তাঁরা তাঁদেরকে না ধরে শুধু তাঁর বিরোধীপক্ষের লোকদের ধরছে। তাই কিছুলোকের মনে স্বাভাবিক ভাবেই একটি প্রশ্ন এলো এটি আসলে বিচার হচ্ছে না। এটিকে রাজনৈতিক উপায় হিসেবে লীগ বেছে নিয়েছে। যেখানে তাঁর দলের রাজাকারদের খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করছে আর বাকীসব রজাকার।

মরার উপর খাড়ার ঘাঃ যখন শাহবাগে কিছু তরুণ সমাবেশ করল তখন অনেক লোক এতে যুক্ত হল এবং যারা যায়নি তাঁরাও ঘড় থেকেই সমর্থন করল। কিন্তু কয়েকদিন পর দেখা গেল এটিকে লীগ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বিএনপি যখন নির্দলীয় সরকারের জন্য হরতাল ডাকে তখন শাহবাগ বলল তাঁরা এটিকে প্রতিহত করবে। তখন কিছু লোক বলল তোমরা বিএনপির এই হরতালকে প্রতিহত করবে কেন? এটি করলে লীগ করবে। বিএনপি তো তোমাদের বিপক্ষে হরতাল করছে না। তোমরা তোমাদের আন্দোলন কর, বিএনপি বিএনপির আন্দোলন করুক। এভাবে অধিকাংশ লোক শাহবাগের প্রতি আগের অবস্থায় থাকলেন না। পরে দেখা গেল লক্ষ-লক্ষ লোকের জায়গায় শ খানেক লোক দেখা যায়। তখন এই শাহবাগ হয়ে দাঁড়াল লীগের গলার কাঁটা। আবার বিভিন্ন কারণে যখন হেফাজতে ইসলাম রাস্তায় নামল তখন সেটি হয়ে গেল মরার উপর খাড়ার ঘা। কারণ এদের পক্ষেও অনেক লোকের সমর্থন ছিল। বিভিন্নভাবে প্রেক্ষাপট বদলে গেল। সাধারণ লোকজনের মনোজগতে বাসা বাঁধতে থাকল বিভিন্ন রকম প্রেক্ষাপট। বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে লোকজনের যে উচ্ছ্বাস ছিল বিচারকে কেন্দ্র করে তাতে আগের মতো উচ্ছ্বাস থাকল না। অনেকটা কিছু লোকের জন্য দাঁড়াল এইরকম – ধুর বিচার হলেই কি আর না হলেই কি। এই ঝামেলার মধ্যে নেই। এবং যখন সবদিক থেকে লীগের প্রতি মানুষের বিরক্তি আসল তখন আগের মতো আর প্রেক্ষাপট থাকল না। সবাই বুঝল লীগ এই বিচারকে দিরঘায়িত করছে ক্ষমতাকে প্রলম্ভিত করার জন্য।

 

পরিশেষে একটি কথা – কোন সৎ কর্ম অসৎভাবে করা যায় না।

ফাঁসি,পাকিস্তানফোবিয়া ও বাংলাদেশের সঙ্কট

2

রেজাউল করিম রনি

It is crucial to address the issue on these three distinctive levels, which are the exploitation, politicization and institutionalization of Islamophobia at various levels. In the present globalized world, peaceful and harmonious coexistence among diverse religions and cultures is not an option but the only means to enduring human cohabitation. The objective of the protagonists of Islamophobia is none other than to create division between the West and theMuslim World.

[SIXTH OIC OBSERVATORY REPORT ON ISLAMOPHOBIA October 2012 – September 2013]

noose

আমার ঘরের চাবি পরের হাতে

সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক ঝগড়া এমনভাবে উদাম হয়েছে যে, রাজনীতির ব্যাপারে একদম উদাসীন গৃহবধূরাও জানেন, আমাদের কোনো সংকটের সমাধান দেশের রাজনীতিবিদদের মর্জির ওপর নির্ভর করে না। মার্কিন ও ভারতের পররাষ্ট্র-লড়াই এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, একে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ প্রশ্নে এক দিকে ভারত অন্যদিকে গোটা পশ্চিমা বিশ্ব। আর এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বা লক্ষ্য করবার বিষয় হল, এই প্রথম পাকিস্তান সরব ভূমিকায় হাজির হয়েছে। পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় এখন পর্যন্ত মার্কিন নীতির সবচেয়ে অনুগত বন্ধু। এই আনুগত্যই ধর্মযুদ্ধের সম্ভাবনাকে পাঁকিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। কিভাবে সেটা ঘটবে আমরা জানি না। আমরা কেবল কয়েকটি লক্ষণ পর্যালোচনা করতে পারি।

ফাঁসির ব্যাপারটা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা চাপা অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। অপরাধীর বিচার হবে-এটা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ কোনো আপত্তি কখনও করেনি। আপত্তিটা উঠেছে মূলত গণআকাঙ্খার সাথে সরকারের কৌশলী আচরণকে কেন্দ্র করে। বিচারের প্রক্রিয়ার মধ্যে শুরু থেকে একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আন্দাজ করা যাচ্ছিল। নির্বাচনের সব রকম প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তথাকথিত সাংবিধানিক নিয়মে আওয়ামী লীগ যেভাবে ক্ষমতালিপ্সার নজিরবিহীন রাজনীতি শুরু করেছে, তাতে বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কালিমা এড়াতে পারেনি।

জামায়াত স্বাভাবিকভাবেই এটাকে জুডিশিয়াল কিলিং আখ্যায়িত করে ব্যাপক সহিংসতার পথ ধরে। ফাঁসির পরে সারা দেশে যেন লাশের উৎসব শুরু হয়। সরকারী বাহিনী দেশের বিভিন্ন অংশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে নির্মূলের রাজনীতি বাস্তবায়ন করতে নেমে পড়েছে তা দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। পাল্টা আক্রমণের কৌশল দেখে স্পষ্টতই মানুষ বুঝে গেছে দেশে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। এই অবস্থায় কোনোকিছু নির্বিকারভাবে পর্যালোচনার স্থিতিশীলতাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যথারীতি শাহবাগ আগের ভূমিকায় আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু এবারের ফিরে আসাটা আরও ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে আমাদের নিয়ে যাবে। এই দিকটি নিয়ে আমরা কিছু কথা বলব আজকে।

বাংলাদেশ কিম্বা বর্তমান বিশ্বের কেউ আর ‘৭১ সালের বাস্তবতায় নেই। কিন্তু তাই বলে ‘৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা যাবে না তা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিচার আমরা চাই। বিচার হতে হবে। কিন্তু সেটা বিচারই হতে হবে। কোনো প্রেশার গ্রুপকে সংযুক্ত করে বিচার নিয়ে রাজনীতি হলে সেটা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বেইমানি। এতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সীমাহীন সম্ভাবনা চিরতরে বিনষ্ট হয়। জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে চলমান রাজনৈতিক ক্ষমতার হিংসার আলোকে। ফলে জাতীয় চেতনার নামে একতরফা জবরদস্তি বা যেটাকে আমরা ফ্যাসিবাদ বলে জানি তা হাজির হয়। এর মধ্যে কোনো ইসলামী দলের নেতাকে ফাঁসি দিয়ে চেতনার জোয়ার তুলে ক্ষমতার রাজনীতি যে বিভাজন তৈরি করে তা ধর্মযুদ্ধের পরিবেশ প্রস্তুত করে দেয়। তখন মুখোমুখি দাঁড়ায় ইসলাম ও জাতীয় চেতনা।

কিন্তু এটা এত সরলভাবে ঘটলে আতংকিত হওয়ার মহান কোনো কারণ ছিল না! ব্যাপারটা আমদের নিজেদের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। মার্কিন রাজনীতির ছক অনুযায়ী আমরা যদি ব্যাপারটা খেয়াল করি তাইলে পরস্থিতি যা ইঙ্গিত করে তাতে আঁতকে না উঠে উপায় নাই।

আমরা দেখেছি, ওয়ার অন টেররের প্রজেক্টে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ইন্টারভেনশন হয় ইসলামপন্থি জাতীয়তাবাদীদের কাজে লাগিয়ে। সরকারের ফ্যাসিবাদি আচরণের কারণে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার রাজনীতি করা একটি দলকে নির্মূল করবার কারণে সমাজে একটা বদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলকে তুরুপের তাসের মত উড়িয়ে দিচ্ছে লীগ সরকার। এই জবরদস্তিতে কৌশলে সেনাবাহিনীকেও যুক্ত করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সৈনিক মর্যাদার ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই সতর্ক। কিন্তু এখকার সেনাবাহিনীর পুলিশি ভুমিকা সেনার ইজ্জতের দিক থেকে যেমন হুমকি, তেমনি জনমানুষ এই সেনাকে সরকারের খেয়ালখুশির পুতুল বলে মনে করবে। দেশের মানুষ সেনাবাহিনীর এই ভূমিকায় আহত বোধ করবে সন্দেহ নাই।

এই অবস্থায় পাল্টা প্রতিরোধ যেটা গড়ে উঠবে বা যারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াইয়ে শামিল হবে সেটা কোনো না কোনো ভাবে ইসলামী শক্তি। তার নাম যাই হোক তার সাথে ইসলামের কোনো না কোনো যোগ আছে। এই ধারার ইসলামী আন্দোলন যেন মার্কিন আধিপত্যকে কোনোভাবেই হাল্কা করতে না পারে তার জন্য ৯/১১-এর পরে আমেরিকা একটা প্রকল্প চালু করে এর নাম ‘র‍্যান্ড’ প্রজেক্ট। এতে সালাফিস্ট ধারাকে উৎসাহিত করা হলেও মূলত প্রাধান্য দেয়া হয় পশ্চিমা ধাচের গণতন্ত্র মেনে যেন মুসলিম দেশগুলো একটা আধুনিকতাবাদি পুঁজিবাদের অনুকূলে রাষ্ট্রকাঠামো দাঁড় করাতে পারে।

সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন এনজিওগুলোকে ব্যাপক তহবিল সবারহ করা হয়। এর টেস্ট কেইস আকারে ঘটানো হয় আরব স্প্রিং। বলাই বাহুল্য এই  ‘র‍্যান্ড’ প্রকল্প ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। আরব স্প্রিং আধুনিকতাবাদি পথ ধরে মুসলিম দেশগুলোকে পরিচালনার কাজে হাত না নিয়ে সেখানে বরং বিভিন্ন জেহাদি গ্রুপ শক্তিশালী ভিত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এটা উল্টা ফল ফলেছে।

শুরুতে অনেকে শাহবাগকে ‘র‍্যান্ড’ প্রজেক্টের সাথে যুক্ত বলে অনুমান করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতেই পরিষ্কার হল, এই অনুমানের কোন ভিত্তি নাই। বরং গেইমটা উল্টা দিক থেকে দেখা যেতে পারে। শাহবাগ না এখন বিবেচনায় চলে আসবে শাপলা। অবশ্যই অগ্রভাগে থাকবে জামায়াত। যদিও আমরা জানি, জামায়াত আর হেফাজত এক না। কিন্তু আদর্শের দ্বন্দ্ব আর লড়াইয়ের মাঠ এক না -এটাও আমরা জানি। কিন্তু কোনো মার্কিন ছক হুবহু কাজে আসবে না তা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি। কারণ অলরেডি জিহাদি সংগঠন তালেবান গণজাগরণকে থ্রেট করে বসেছে। সাম্প্রতিক এক ভিডিও ভাষণে আলকায়েদা প্রধান আইমান আল জাওয়াহিরী বাংলাদেশ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এই ঘটনা অবশ্যই অতি গুরুত্বের সাথে আমাদের আমলে নিতে হবে। তিনি সেখানে বলছেন, “বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেখানে সরকার আলেমদের শহীদ করছে, তাদেরকে জেলে বন্দী করে রাখছে, নবী করিমকে (সা.) নিয়ে কটুক্তিকারীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, হাজার হাজার সাধারণ মুসলমানদেরকে শহীদ করা হচ্ছে।’’ [http://www.youtube.com/watch?v=2CryRD4OTb8]

ফলে  ‘র‍্যান্ড’ প্রজেক্ট এর মতো কোনোকিছু বাংলাদেশে করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তবে এই বিষয়ে আগাম কথা বলার কিছু নাই। মাঠের লড়াই তো আর সবসময় বইয়ে ত্তত্ব মেনে হয় না। গ্র্যান্ড ডিজাইনের সাথে পরিচয় থাকাটাই আমাদের জন্য প্রাথমিক কাজ। এই প্রজেক্ট যে কোনো কাজে আসবে না তা আল-জাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে ইউসুফ আল কারযাভী পরিষ্কারভাবে বলে দেন, “আমেরিকা তার সুবিধার জন্য একটা ইসলাম চায়। কিন্তু সেটা আর ইসলাম হবে না। সেটা হবে আমেরিকান ইসলাম।”

তিনি আরও বলেন, চরমপন্থা ৯/১১-র ঘটনার আগে থেকেই ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। চরমপন্থীরা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। শুধু মুসলমানদের মধ্যে চরমপন্থা আছে, এটা মোটেও ঠিক নয়। চরমপন্থীরা ইহুদীদের মধ্যেও আছে। চরমপন্থীরা রবিনকে হত্যা করেছে। চরমপন্থার আরো বড় বড় উদাহরণ রয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা দুর্ঘটনা। ব্রিটেন, জাপান, ভারতসহ দেশে দেশে চরমপন্থীরা রয়েছে। তাহলে কেন মূলত ইসলামের সাথে চরমপন্থা ও সহিংসতার অপবাদ জুড়ে দেয়া হচ্ছে? এটি ভয়াবহ অবিচার” [আল-কারযাভী: আল-জাজিরা,বিন কিন্নাহ-এর সাথে আলাপ]

সেই দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের ব্যাপারে একটা নীতিগত অবস্থান আমেরিকার আছে। এটা বোঝা যায়, জামায়াতের সাথে তাঁদের সম্পর্কের ধরণ দেখলে। সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজতের উত্থান এই সম্পর্কের ধরণে নতুন ডাইমেনশান তৈরি করেছে। ফলে বাংলাদেশের ইসলাম যখন রাজনৈতিক ময়দানে হাজির এবং গৃহযুদ্ধের অবস্থা বিরাজ করছে, এই অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের নীতি আমাদের ছেড়ে দিবে না তা হলফ করে বলতে পারি।

ইতিমধ্যে ২৫ নভেম্বরে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১১৫ জন নিহত হয়েছে। এদের বেশিরভাগ জামায়াত-বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। অন্যদিকে বাংলাদেশে ইসলামের কোনো ধরণের জাগরণ হলে এর প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্ব-ব্যবস্থায়। সবচেয়ে হুমকিতে পড়বে ভারত। আমেরিকা ৯/১১ এর পরে মুসলমানদের ব্যাপারে কোনো একতরফা বিবেচনা আর বজায় রাখেনি। ইসলামের সেকুলার ধারাকে ক্ষমতার রাজনীতে সে বরাবরই উৎসাহিত করে আসছে। এখন কী ভুমিকা নেবে তা দেখবার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে, বলা যায় দুইটা অপশন সামনে আছে, এক.হাসিনাকে যে কোন মূল্যে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা এবং বিএনপি-জামায়াত জোটকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। ২. শেখ হাসিনা যদি নির্মূলের পথ থেকে সরে না আসে তাহলে যে ইসলামী জাগরণের সৃষ্টি হবে তার সুযোগে ওয়ার আন টেররের প্রকল্পের আদলে বাংলাদেশে মার্কিন খবরদারি বৈধ করা। প্রথম সমাধানের দিকে এখনও পশ্চিমা দেশগুলো বেশি মনযোগী।

আর দ্বিতীয় ধাপটি চূড়ান্ত অ্যাকশন হিসেবে বিবেচনায় আসবে। কিন্তু কোনোভাবেই ভারতের হাতে দক্ষিণ এশিয়ার খবরদারি দেয়া যাবে না। ভারতের ব্যাপারে কঠোর মার্কিন মনোভাব পরিষ্কার হয়ে গেছে। দেবযানীকে উলঙ্গ (স্টিভ সার্চ) করা নিয়ে ভারতের প্রতিবাদের প্রতি ভ্রক্ষেপ করেনি আমেরিকা। ভারতের সব আপত্তি উড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিনীদের এই কঠোর অবস্থান অনেককে অবাক করেছে। কিন্তু তাঁদের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকালে বিষয়টাকে আর অস্বাভাবিক মনে হবে না। বিখ্যাত মার্কিন পররাষ্ট্র ব্যাক্তিত্ব হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর সুবিদিত ডিপ্লোমেসি বইতে বলেন, “Almost as if according to some natural law, in every centuty there seems to emerge a country with the power, the will, and the intellectual and moral impetus to shape the entire international sestem in accordance with its own values.”

[The New world Order, DIPLOMACY; Henry Kissinger: SIMON&SCHUSTER PAPERBACKS, NEWYORK edition]

এই শতাব্দী মার্কিন আধিপত্যের শতাব্দী এটা তাঁরা প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই মনে করে। বলাই বাহুল্য এই শিক্ষা ইউরোসেন্ট্রিক শিক্ষা। পরে কিসিঞ্জার ইউরোপের অন্য দেশগুলোর আধিপত্যের ফিরিস্তি হাজির করে এখনকার মার্কিন আধিপত্য যে গোটা বিশ্বব্যবস্থার জন্য খুব স্বাভাবিক -এই আলোচনা করেন। এই সাম্রাজ্যিক বাসনার দিকে যদি আমরা খেয়াল রাখি তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারব আগামী দিনে আমাদের সামনে যে লড়াই হাজির হচ্ছে তাতে মার্কিন হস্তক্ষেপ অবধারিত। এই লড়াইয়ে আমরা কী করব তাই দেখবার বিষয়। আরামপ্রিয় দ্বি-দলীয় ক্ষমতা বৃত্তের বাইরে এই প্রথম বাংলাদেশে নয়া বাস্তবতা বড়ই অসময়ে হাজির হচ্ছে।

ফলে এই জাতীয় প্রতিরোধ ইসলামের চেহারা যেমন নিবে, এর সাথে দুনিয়ার অন্য ইসলামী লড়াকু শক্তিও শামিল হবে। এটাকে থামাতে এবার পরাশক্তির হস্তক্ষেপের পথে আর কোনো বাঁধা থাকবে না। ফলে যতই মনে হোক জামায়াতের পক্ষে আমেরিকা আছে, বিএনপির পক্ষেও আছে। খোলা চোখে যতই মনে হোক এক ভারত ছাড়া আর সবাই তাদের পক্ষে আছে, ব্যাপারটা তেমন সরল না। মার্কিন আধিপত্য কোনো সুযোগকে হাতছাড়া করবে -এমনটা মনে করার কোন কারণ নাই। এটা আমি বলছি ইতিহাসের শিক্ষা থেকে। বাংলাদেশে হুবহু একই ঘটনা ঘটবে তা বলছি না। প্রত্যেক ঘটনার কিছু সৃষ্টিশীল ডাইমেনশান থাকে, যা আগাম বলে দেবার কিছু নাই। তারপরেও এখনকার ঘটনাসমূহ পর্যালোচনা করলে আমরা বিষয়গুলো পরিষ্কার ধরতে পারব।

ফাঁসি ও জাতীয় চেতনার ফাঁদ

একটা ছোট চায়ের দোকান। ১২.১২.১৩ ইং, রাত ১১টায় টিভিতে ইমরান এইচ সরকার কথা বলছিলেন নিউজ বাইটে। ফাঁসির খবরে তখন শাহবাগ আনন্দে ভাসছে। সেই আনন্দে দোকানের কিছু লোকও দেখলাম হাসতেছে। হঠাৎ দোকানদার বলতেছে- ‘হালারা কেমুন, জিন্দা একটা মানুষ মইরা গেল আর হালারা নিটকাইতেছে কেলাই দিয়া খবর দেখতাচে’ একটু আগেও মানুষটা জীবীত ছিল।‘ অবাক হইলাম, সে যে রাজাকার ছিল তা তো দোকানদার একবার বলতেছে না । এটা তো তার মনে আইল না। কেন? সমস্যা কী?

আর রাতে ফেসবুক-ব্লগে আনন্দ আর বেদনার পাল্টাপাল্টি জোয়ার ছিল। আর যারা একাত্তরকে ক্রিটিক্যালি দেখেন সেই সব মানুষের মধ্যে এক চাপা অস্বস্তি বিরাজ করছিল। জামায়াত কাদের মোল্লাকে সাইয়েদ কুতব অব বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে ফাঁসির সাথে সাথে। তাঁরে ইসলামের জন্য শহীদ ঘোষণা করেছে। সেই মোতাবেক পরদিন জুমার নামাজের পর ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক সহিংসতা ঘটায় দলটির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মিরা। এই আগুন ছড়িয়ে পরে সারা দেশে, শুরু হয় পাল্টাপাল্টি খুনাখুনি। খবরের কাগজ লাশের খবরে ভরে ওঠে।

অবাক হয়ে খেয়াল করি, কাদের মোল্লার ফাঁসি জনসমাজে একটা ভুতুড়ে অবস্থা তৈরি করেছে। সাধারণ পাবলিক প্রশ্ন করছে, আচ্ছা লোকটা না অপরাধী ছিল তাইলে তাঁর জন্য যে আবার আন্দোলন হচ্ছে? সে নাকি চিঠি দিয়ে কইছে কসাই কাদের আর সে এক না। মরার আগে মানুষ তো আর মশকারি করে না?

আমরা যদি এই জনমনোভাবকে বুঝবার চেষ্টা করি, তাইলে অনেকগুলো বিষয় বুঝতে সুবিধা হবে। এক. ৭১ এর ন্যারেশন কি আদতেই একটা মধ্যবিত্ত ন্যারেশনে পরিণত হয় নাই এত দিনে? কারণ কসাই ইমেজ তো মধ্যবিত্তের বাইরে খুব বেশি কমিউনিকেটিভ হচ্ছে না। দুই. এই চেতনার প্রতি তো সরকারের অবস্থানের কারণেই মানুষের আর আস্থা নাই। এই অবস্থায় শাহবাগ যদি প্রবল প্রতাপ গড়ে তুলতে না পারে তাইলে তো সরকার বিপদে পড়ে যাবে। তাই শাহবাগ আছে সরব ভুমিকায়।

স্কাইপে কেলেংকারি আর বিচারপতিদের খামখেয়ালি তো মানুষ জানে। আদালতের প্রতি কোন সুস্থ মানুষের তো আস্থা নাই। ফলে দুর্বল জাতীয়তাবাদী চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে এই ধরণের একটা ফাঁসি আওয়ামী লীগের জন্য অনেক ঝুঁকির হয়েছে সন্দেহ নাই। এখন একাত্তরের ন্যারেশনকে খুব শক্তিশালীভাবে হাজির করতে হবে। কোনো গাফিলতি করা চলবে না।

এই হাজিরা বলাই বাহুল্য, একাত্তরের আকাঙ্খা মেটাতে পারবে না। এটা কাজ করবে সাংবিধানিক ফ্যাসিজম কায়েম করতে। এইটা বিনা মুশকিলে হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ঝামেলা হয়ে গেছে, জামায়াত কাদের মোল্লাকে ইসলামের জন্য শহীদ ঘোষণা করে ফেলেছে। মোল্লাও বলে গেছেন তাঁর রক্তের বিনিময়ে যেন ইসলাম কায়েম করা হয়। ফলে ইসলামের ন্যারেশনের সাথে ‘৭১ এর আওয়ামী ন্যারেশনের লড়াই শুরু হয়ে গেল। জামায়াতের ইসলাম একমাত্র ইসলাম না, এটা আমরা সবাই জানি। জামায়াতের বাইরেই আছে ইসলামের মূল ধারা। কিন্তু জামায়াত ইসলামের নামে রাস্তায় যখন মার খাবে, তখন ধর্মযুদ্ধ শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

লীগের বা বামদের ইসলামকে পশ্চাৎপদ মনে করার যে কালচারাল এটিচুড তা মানুষ এতদিনে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে ফেলেছে। ফলে এই অবস্থার মধ্যে লড়াইয়ে কালচারাল শক্তিটা যে প্রতিরোধের মুখে পড়বে তা এখনও আমরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। যারা এখনও রাজাকারী ডিসকোর্স নিয়ে আছে, এটা তাদের বুঝবার কথাও না। রাজনীতি বহু আগেই রাজাকারের পরিমণ্ডল পার করে ফেলেছে।

ক্ষমতার ব্যবহারিক বা এখনকার বাস্তব প্রশ্নটাই মানুষ আগে বিচার করছে। শুধু বুদ্ধিজীবিরা স্মৃতি কাতর হয়ে আছেন এখনও। ফলে মানুষের মনে ফাঁসিকে কেন্দ্র করে ‘৭১-এর মতোই অস্বস্তি আবার ফিরে আসল। এতে সরকারের পক্ষে লোক থাকবে না বা সরকার ভ্যানিশ হয়ে যাবে -এটা মনে করার কোন কারণ নাই। আমি শুধু বলছি, এই গুমট মনোভাবের মধ্যে ভায়োলেন্সের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়ে আছে তা নতুন রাজনীতি দিতে না পারলেও (নতুন রাজনীতির তো এজেন্সি হাজির নাই -এটাই সঙ্কট) এই প্রথম, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে বাংলাদেশে রক্তারক্তি হতে যাচ্ছে।

আর এতে নানা কারণে ইসলাম ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ মুখোমুখি দাঁড়ানো। এই অবস্থায় কূটনৈতিক বুঝের সমাধান যে কোন কাজে আসছে না তা আমরা ধারাবাহিক ভাবে দেখছি। পিল্লাই সতর্ক করেছেন, তারানকো ব্যার্থ হয়ে ফিরে গেছেন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সবাই চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছে বাংলাদেশের ব্যাপারে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বাংলাদেশ এখন গৃহযুদ্ধ কবলিত এমন খবরই ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এই অবস্থা আমাদের কোনো শুভ পরিণতির দিকে যে নিয়ে যাচ্ছে না তা পরিষ্কার বুঝা যায়।

এর কারণ হল, ৭১ এর চেতনাকে আমরা গণবিচ্ছিন্ন ক্ষমতার কাজে ব্যবহার করেছি। এই চেতনার প্রকৃত অর্থে কোন সামাজিকীকরণ করিনি। বরং উপনিবেশি সাংস্কৃতিক ও জীবনদৃষ্টি উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে এমন একটা ভাব পয়দা করেছে যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে ভোগবাদী জীবনচর্চা মিশে একাকার হয়ে গেছে। এর সাথে আধুনিকতার উগ্র ইসলাম বিদ্বেষ যুক্ত হয়ে প্রগতিশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে ইসলামকে। এই একরোখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন মরণ ফাঁদ হয়ে নেমে আসছে। মোহনায় দাঁড়িয়ে উৎসের দিকে ফিরে তাকাতে হয়-এটা আমরা স্বাধীনতার বেয়াল্লিশ বছরেও করিনি।

ইতিহাসকে দলীয় ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করে বিভাজন জিয়িয়ে রেখেছি। বিভাজনটা সমাজে পরিষ্কার হয়ে গেছে। শাহবাগ আর শাপলা। শাপলার ভাগে আছে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ যারা সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তথাকথিত মূলধারার চেতনার চেয়ে পিছিয়ে আছে। তাদের আমরা সমাজের বাইরে আলাদা রেখে নিজেরা একতরফা চেতনার অনুসারী হয়ে আধুনিকতার জীবনদৃষ্টিকে কবুল করে নিয়েছি। ওদের বলেছি মধ্যযুগীয়, বর্বর পশ্চাৎপদ। কারণ তিনারা আজও ধর্মতত্বের আদর্শকে জীবনের মূল আদর্শ মনে করে। আমরা ইসলামের সাথে বাংলার সামজিক বিকাশের সম্পর্কের আলোকে নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী আকারে গড়ে উঠিনি। অতি ক্ষুদ্র শ্রেণীস্বার্থে ব্যবহার করেছি ‘৭১-এর চেতনাকে। মুক্তিযুদ্ধের তাবত অবদানকে স্বাধীনতার পরপরই কুক্ষিগত করেছি নিজ নিজ স্বার্থে। স্বাধীনতার সামাজিকীকরণ হয় নাই বাংলাদেশে। তাই সবার অংশ গ্রহণে ‘৭১ হলেও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা হয়ে উঠেছে এলিটিস্ট মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধকে আমরা গণচেতনা করে তুলতে পারিনি। কেন পারিনি তার হদিস খুব কঠিন কিছু না। নানা কারণের একটা হল সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছি শুরু থেকেই।


পাকিস্তানফোবিয়া

পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে আর্ন্তজাতিক মনযোগের কেন্দ্রে আছে গত কয়েক দশক ধরেই। সেনাবাহিনীর সাথে পাকিস্তানের জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে অনেক বড় বড় গবেষণা হয়েছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন গোত্র ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে আলাদা আলাদা ডাইমেনশান নিয়ে হাজির আছে। পশতুন জাতীয়তাবাদের প্রভাবের কারণে আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক শুধুমাত্র কৌশলগত নয়। আমরা দেখেছি, পাকিস্তান একই সাথে আলকায়েদা, তালেবান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের তৎপরতা জারি রেখেছে ওয়ার অন টেরর প্রকল্পে। বিশ্বরাজনীতিতে পাকিস্তানের এখনকার ভূমিকা গ্লোবাল রাজনীতিতে অতি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।

আমরা একাত্তরে যে ঘাতক সামরিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। সেই পাকিস্তান আর আগের জায়গায় স্থির নেই। কিন্তু আমরা পাকিস্তানের জান্তা নিপীড়নের প্রতি যে ঘৃণা ধরে রেখেছি তা গোটা পাকিস্তান সম্পর্কে আমাদের চিন্তাকে বর্ণবাদি ক্ষুদ্র জায়গায় আটকে রেখেছে। চলমান বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তান এর ভূমিকাকে র্নিমোহভাবে দেখবার কোনো গরজ আমরা অনুভব করি না। এটা আমাদের জন্য খুবই অনুতাপের বিষয়।

এবারের ওআইসি সম্মেলনে ইসলামোফোবিয়া নিয়ে একটা রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামোফোবিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিকভাবে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যে, পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইসলামের বিভক্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আর এই কাজের জন্য যে ভুমিকে পশ্চিমারা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে তার নাম ‘পাকিস্তান’ / ফলে আামাদের এখানে পাকিস্তানফোবিয়া আর ইসালোমোফোবিয়া একই অর্থ বহন করে। আর এটাকে উস্কে দেবার জন্য আছে অতীত পৈশাচিক শাসকদের প্রতি ঘৃণাকে পাকিস্তানের নামে ছড়িয়ে দেয়ার কূট-রাজনীতি। পাকিস্তান নিয়া এখানে আলাপের অবসর নাই। আমি কয়েকটা পয়েন্টে বাংলাদেশে পাকিস্তান -সম্পর্কে দৃষ্টি ভঙ্গি ও সাম্প্রতিক পারিপার্শিকতা তুলে ধরব মাত্র।

এক. পাকিস্তান সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল শ্রেণী ঘৃণার। ৯/১১ -এর পরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইসলামোফোবিয়া। এখন পাকিস্তানফোবিয়ার দুই মৌল উপাদান হল : ১. একাত্তরের শাসকদের প্রতি ঘৃণা থেকে উৎসারিত ঘৃণা। পাকিস্তান মানেই বর্বর, অসভ্য, ধর্ষক ইত্যাদি রটনার রাজনীতি। ২. পাকিস্তান আধুনিক গণতন্ত্রের পথে কোনো সফলতা হাসিল করতে পারেনি। এটা তালেবানের ঘাঁটি। এরা আলকায়দার মদদদাতা। লাদেনকে এরা পালে। এরা জঙ্গি। এদের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। ওরা নিকৃষ্ট।

এই দুইটা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে প্রচারণার প্রভাব ছাড়া আর কিছু নাই। একাট্টা পাকিস্তান বলে কিছু নাই। সেখানে নানা শ্রেণীর মধ্যে সংঘাত আছে। ইসলাম প্রশ্নেও সমাজিক ও রাজনৈতিক নানা ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু সমাজে ইসলামের একটা প্রভাব সেখানে বরাবরই ছিল। এবং এখনও আছে। যা হোক শাসক শ্রেণী আর পাকিস্তানের জনগণ এক না। এটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। একাত্তরে পাকিস্তান সরকারের ভুমিকা আজকের সরকারের মতই ছিল। পাকিস্তান কী করেছে তা বুঝার জন্য একাত্তরে জন্ম নেবার দরকার নাই। লীগ ও যৌথবাহিনী এখন যা করছে পাকিস্তান ও তাদের অনুসারীরা একই কাজ করেছে। তবে তখন কিছু কিছু কাজের লক্ষ্য ছিল মানুষকে বাঁচানো। এখন একমাত্র লক্ষ্য হল মারা। হিংসার আগুনে জ্বলছে জনপদ।

দুই. ‘৭১-এ যাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই ছিল সেই পাকিস্তানি শাসক আর এখনকার পাকিস্তান রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। এখনকার পাকিস্তান বিশ্ব-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমি বলি, আমেরিকা যদি হয় সন্ত্রাসের আব্বা, তাহলে পাকিস্তান তার পালক পিতা। ওয়ার অন টেরর প্রজেক্টে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এবং এই অংশীদারি গোলামীর মত নয়। সে মাঝে মাঝেই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড শো করছে। যেটা আমলে নেবার মত বিষয়। ( এই প্রজেক্টে- র, সিআইএ, আইএসআই, গলায় গলায় ভাব বজায় রেখে বাংলাদেশে ফাংশন করেছে, এখন এজেন্সিগুলা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ভারতের একতরফা জবরদস্তির কারণে এটা ঘটছে। অলরেডি ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিকভাবে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। নারী কূটনীতিক দেবযানিকে স্ট্রিপ সার্চ করে আমেরিকাই প্রচার করিয়েছে যে, ন্যাংটা করে তল্লাশি করা হয়েছে। আর ইন্ডিয়া তো আত্নপীড়ায় ভুগছে। পাল্টা পদক্ষেপও নেয়ার হুমকি দিয়েছে। আমাদের মিডিয়াও বেশ রসিয়ে এই খবর প্রচার করছে। এতে কূটনেতিকভাবে আমরিকা যে মেসেজ দিছে তার সরল মানে হল, ‘তুমি মাতবরি করলে ন্যাংটা কইরা ছাইড়া দিব’ যাহোক কূটনৈতিক লড়াইয়ে অনেক প্রতীকী ব্যাপার থাকে যার গুরুত্ব অপরিসীম। এখানেও তাই হইছে। আর দেবযানী আজ যে প্রতীকী অপমানের শিকার হয়েছেন তার জন্য বাংলাদেশ নিয়ে আমরিকার সাথে সুজাতার বেয়াদবী দায়ি -এটা ভারতের কূটনীতি বিশ্লেষকরা স্বীকার করেছেন। সূত্র: বিডিনিউজ)

তিন. মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বেহুদা পাকিস্তানফোবিয়া ছড়ানো হয়েছে। পাকিস্তানের মুক্তিকামী মানুষের সাথে আমাদের শত্রুতা থাকতে পারে না। হাসিনাও শাসক, ইয়াহিয়াও শাসক। ‘৭১ কইরা আমরা কী করলাম? বিদেশি লোক বাদ দিয়া দেশি বোনের অত্যাচার মেনে নিচ্ছি -এখন এই তো অবস্থা।

চার. যে প্রজন্ম আজ লীগের কূটনৈতিক গেইম না বুঝে পাকিস্তান বিদ্বেষ ছড়ানোকে চেতনার দায়িত্ব আকারে নিয়েছে, তাদের বলি পাকিস্তান কি চিজ তা যদি বুঝতা তাইলে আর এই আরামের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ করতা না। পাকিস্তানকে জড়ানোর কূটনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। তার পুরোটা এখনই আমরা বলতে পারব না। তবে যে লক্ষণ হাজির হয়েছে তা ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে কাজে লাগে। এর মধ্য দিয়ে তালেবানের ইন্টারভেনশন নিশ্চিত হয়ে পড়ল। তালেবান হুমকি দিয়েছে গণজাগরণ বন্ধ না করলে পাকিস্তানে বাংলাদেশের দূতাবাস উড়িয়ে দেয়া হবে [সূত্র: পরির্বতন ডটকম]

যুদ্ধটা জাতীয় চেতনা বনাম ইসলামী চেতনার দিকে যাচ্ছে। এর সাথে বিদেশি অস্ত্রধারী সংগঠন যোগ হলে ঘটনা কোথায় যাবে তা আপনাদের অনুমান করতে পারার কথা। তালেবান যখন একে-৪৭ ধরে বলবে, ”গাওতো চেতনার গান”/ রবীন্দ্র সঙ্গীত কি আমাদের রক্ষা করতে পারবে? ফলে সাংস্কৃতিক ঘৃণার পার্ট আকারে যারা পাকিস্তান মানেই বর্বর আর খারাপ এই রকম রেসিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি পালন করেন তাদের বলব, পশ্চিমা একাডেমিতে গিয়ে একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন। পাকিস্তান একবাল আহমেদের মত দুনিয়া কাঁপানো তাত্ত্বিকদের জন্ম দিতে পারে, ইংরেজি সাহিত্যে হাল আমলের অনেক শক্তিশালী লেখক পাকিস্তানের জঙ্গিদশার মধ্যেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সেখানে বাংলাদেশ তো এখনও অনেক নবিশ।

আমি তুলনামূলক আলোচনার জন্য কথাটা বলিনি। বা এইগুলো করতে পারলেই জাতি মহান হয়ে যাবে, আমি তাও মনে করি না। যাস্ট অমূলক ঘৃণার চেতনাটা দেখাতে কথাটা বলা। এবং যারা পাকিস্তানকে ঘৃণা করেন, কিন্তু নিজেরা আবার পশ্চিমা দুনিয়ায় আসন পেতে চান, পাকিস্তান তাদের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে আছে। এটা কেমনে সম্ভব হল বিবেচনা করবার বিষয় বটে।

পাঁচ. ক্ষমতার রাজনীতির দিক থেকে এখনকার এই কূটনীতিক গেইমের মর্ম হল, ইউএস লবিকে বুঝানো যে, যেই পাকিস্তান এত দিন র, সিআইএ’র সাথে একইতালে বাংলাদেশে কাজ করেছে তাকে তো আমি কিছু বলি নাই। এখন দেশে চেতনার জোয়ার চলছে। জনগণ ক্ষ্যাপা। আমি অসহায়। প্রতিদিন গণজাগরণের সমাবেশে ক্রমাগত লাঠিপেটা করেও তো থামানো যাচ্ছে না। দেশে তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জোয়ার। আমি কী করব?

মানুষ আমারে চায়… দেখ দেখ দূতাবাস পর্যন্ত পাবলিক খায়া ফেলতে চাইতেছে। আমি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। -সরকারের ওপর ক্রমাগত বিদেশি চাপকে পাশকাটানোর জন্য এই গেইম সরকারের দিকে থেকে ভাল। আমি এর প্রশংসা করি। এতে লাভ দুইটা। ১. পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণাটা উস্কে দেয়া চেতনার ফ্যান্টাসিটা আবার ছড়ানো। ২.আন্তর্জাতিক মহলকে নিজের পিপল বেইস যে মজবুত তা জানান দেয়া।

বলাই বাহুল্য, এই দুইটাই ফ্যাসিবাদের দামি কৌশল। ক্লাসিক কৌশল। কিন্তু ফ্যাসিবাদের জন্য যে ন্যাশনাল ভিত লাগে তা বাংলাদেশের নাই। বাংলাদেশের এই ফেনোমেনাকে আমি বরাবরই কালচারাল ফ্যাসিজম বলেছি। এই কালচারাল ফ্যাসিজম সাম্রাজ্যবাদি রাজনীতির কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অক্ষম। ফলে এই একরোখা গণবিচ্ছিন্ন ক্ষমতার জেদ শেষ পর্যন্ত বুশের ধর্মযুদ্ধকে দেশে ডেকে আনবে, এতে কোন সন্দেহ নাই। মজার ব্যাপার হল, গণজাগরণের কর্মিদের সরকারী এসাইনমেন্টে হেনস্থা করা হচ্ছে। গণজাগরণের কর্মি জাগরণকন্যা লাকী বলছিলেন, পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে নাস্তিকের বাচ্চা, মালাউনের বাচ্চা বলে গালি দিতে দিতে। এই ঘৃণার আগুণ এখন সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। হাসিনা কোনোভাবেই এই অবস্থায় জনগণের কাম্য নেতা হতে পারেন না।

ছয়. পাকিস্তানের প্রতি বর্ণবাদি আচরণের কোন মানে হয় না। আমাদের বুদ্ধিজীবিরা পাকিস্তানকে একটা দানব আকারে হাজির করছেন তাদের বলা দরকার, এটা ‘৭১ সাল না। এখন পাকিস্তান অনেক কমপ্লেক্স গেইমে নিজেরে শামিল রাখছে। রিজিওনাল গেইমে পাকিস্তানরে কোনোদিন হম্বিতম্বি করতে দেখবেন না। কিন্তু সে আছে, তার ভুমিকা সমেত আছে। আইএসআই আর সিআইএর দোস্তি তো সুবিদিত। এখন কাদের মোল্লার ব্যাপারে অন্য দেশগুলা যা করছে, পাকিস্তান তাঁর চেয়ে বেশি কিছু করেছে বলে মনে হয় না।

তুরষ্ক বাংলাদেশের সরকারকে দ্বিতীয় ইসরায়েল বলেছে। কেরিও ক্ষেপছেন। তাহলে পাকিস্তানের দোষটা এত বেশি কেন হইছে? কারণ এই তথাকথিত প্রজন্মকে তো পাকিস্তান আক্রমণের স্বাদ দেয়া যাবে না। তাই দূতাবাসমুখি ক্ষিপ্র গমনের মধ্যে একটা যুদ্ধের স্বাদ দেয়া। এটা নগদ লাভ। কিন্তু সাম্রজ্যবাদী চাল তো নগদ লাভে চলে না। তার পরিকল্পনা সুদূর প্রসারী। ‘১৪ সাল এর পরে আফগানিস্তান মিশন শেষ করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন উপস্থিতির জন্য বাংলাদেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিন আগে খবরে প্রকাশ হাতিয়া দ্বীপ এলাকায় যৌথ সামরিক উপস্থিতির জন্য বিশাল ভূমি নির্বাচন করা হয়েছে। এটা নিয়ে পরে আর কোনো ফলোআপ দেখিনি।

সাত. আমরা বলতে চাই, খামাখা পাকিস্তানঘৃণার কোনো কারণ দেখি না। বরং পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শামিল হবার জন্য আমাদের প্রস্তুতি দরকার। জালেম শাসক তা যত মহান চেতনারই হোক, তার বিরুদ্ধে আমি মজলুম জনগোষ্ঠির ঐক্যের পক্ষে। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার।

শ্রেণী ঘৃণা..জাতি ঘৃণা আমাদের অমানুষে পরিণত করে ফেলবে। মানবিক সত্তার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে জাত-পাত শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে নিজেদের চৈতন্যকে বিকশিত করতে না পারলে আগামী দিনের বিপ্লবী লড়াইয়ে বাংলাদেশ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। নিজেদের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক উত্থানের সাথে এই উদার মানসিকতার চর্চাও অতিজরুরি।

ভারতের এনডিটিভি খবরে জানিয়েছে, ২০১৪ সালের টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বাংলাদেশে আসা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান উদ্বোধনী ম্যাচ বাংলাদেশে না হলে ২৫ ভাগ আয় থেকে বঞ্চিত হবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। খেলাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব পুঁজির যে প্রসার, তাতে বাঁধ সাধল রাজনৈতিক কারণে উস্কে দেয়া পাকিস্তান বিদ্বেষ। এর ফলে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক ভাবে জঙ্গি অবস্থায় নিপতিত হয়েছে, বিশ্ব মিডিয়ায় সেই খবর ঘটা করে প্রচার করা হবে। এটা আমাদের ইমেজের জন্য ভয়াবহ সংঙ্কট সন্দেহ নাই।

এখনকার সংকট

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে এতদিন যারা হাসিনা খালেদার ক্ষমতার লড়াই আকারে দেখেছেন, তাদের গণধিক্কার দিতে হবে। এই ধারা বিচার-বিশ্লেষণের ঐতিহ্য আমাদের রাজনৈতিক পর্যালোচনার পরিমণ্ডলকে যথেষ্ট সংকীর্ণ করে রেখেছে। আমরা গ্লোবালাইজড কথাটা মুখে বলি বটে কিন্তু এর সাথে আমাদের সম্পর্কের ধরণ ও নিজেদের অবস্থানকে কখনও বিচার করে দেখি না। ফলে বাংলাদেশ কিভাবে বিশ্বরাজনীতির সাথে সম্পর্কিত তার সমগ্র পরিচয়টি আমাদের সামনে ধরা পড়ে না। কিছু মুখস্ত কথাবার্তা শুনেই আমরা কাজ চালিয়ে নেই।

যা হোক সেনাবাহিনী নামবে এই রব অনেক আগেই জারি হয়েছে। সেনা নেমেছে ঘোষণা দিয়েই। খবরে প্রকাশ, ‘নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এবার সশস্ত্র বাহিনীর ৫০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হবে। এরা ভোটগ্রহণের পরও বেশ কয়েক দিন মাঠে থাকবেন। এ কারণে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত বাজেটও দ্বিগুণ করা হচ্ছে। [প্রথম আলো ২১-১২-২০১৩]

সেনাবাহিনী এখন পুলিশি ভুমিকায় নামল। এতে যে আমাদের দেশের মানুষের কাছে সৈনিকের মর্যাদা আর আগের জায়গায় থাকল না তা আমাদের জন্য অনুতাপের বিষয়। আমাদের সেনাদের সৈনিক মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এ ব্যাপারে গণসচেতনতার খামতি অপরীসীম। এটা নিয়ে আলাদা লিখব।

বাংলাদেশের এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার রিপোর্টিংয়ের ধরণ খুব মনযোগ দিয়ে খেয়াল করবার বিষয়। ফাঁকে বলে নিই, এর আগে এক লেখায় (বিচার নিয়ে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আর্বিভাব : আমার দেশ) বলেছিলাম, মার্কিন দেশের সাথে জামায়াতের মিত্রতার কৌশলগত দিক খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁরা একদিকে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায়, আর অন্যদিকে মানবাধিকারের দাবি তুলে জামায়াতকে উস্কে দিচ্ছে। জে র‍্যাপের সফরের সময়ই ব্যাপারটা আঁচ করা গিয়েছে। এখন এই সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিমা মিডিয়া যে স্টাইলে বাংলাদেশ নিয়ে রিপোর্টিং করছে তা দেখলে পরিষ্কার হবে যে আমি কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা বলছি না।

শাহবাগ উত্থানের পরে প্রথম যে লেখাটি লেখি তার শিরোনাম ছিল-গণহত্যার রাজনীতি ধর্মযুদ্ধে প্রবেশ (চিন্তা ডটকম, ৬ মার্চ ২০১৩)/  তাতে জামায়াতের রাজনীতিকে জঙ্গিবাদি রাজনীতি আকারে হাজির করে নির্মূলের তাৎপর্য ব্যাখ্য করার চেষ্টা করেছিলাম। পরে ঘটনাটা সেই দিকে ধিরে ধিরে বাঁক নিলে বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। ক্ষমতাধর সাময়িকী ইকোনোমিস্ট সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে লিখেছে,

“আওয়ামী লীগ জিতবে, তবে বাংলাদেশ হেরে যাবে। ইকোনোমিস্টের অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নিজের শাসনকাল বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেগুলোকে একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক ‘ধাপে ধাপে চলা অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রধান বিরোধী দল ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। এ সুযোগে নিশ্চিত জয়ের পথে চলছে শেখ হাসিনার দল। বৈধতার প্রশ্ন এখানে বাহুল্যমাত্র।”

[www.economist.com/news/asia/21591887-ruling-party-will-win-bangladeshs-election-country-will-los]

এই অভ্যুত্থান কে করছে? সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের লাইনে বিএনপি তো নাই। বিএনপি টেবিল রাজনীতির সমাধানে অনেক বেশি আগ্রহী। সাথে চাপ প্রয়োগের জন্য ধারাবাহিক অবরোধ চলছে। গণঅভ্যুত্থান তাইলে কে ঘটাবে? বলাই বাহুল্য, জামায়াত জীবন-মরণ লড়াইয়ে নিপতিত হয়েছে। গ্রামে গ্রামে যেভাবে লীগ-যৌথবাহিনী ও জামায়াত যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে তাতে ‘মর না হয় মারো’ এমন পরিস্থিতি তৈয়ার হয়েছে। দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে। সামনে এটা আরও বেগবান হবে নানা ডাইমেনশান তৈয়ার হবে তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। অভ্যুত্থান হবে সেটা গণ না কী তা বলা যাচ্ছে না।

গণঅভ্যুত্থান কল্পনার জিনিস না। তার জন্য সমাজে গণরাজনীতির ভিত মজবুত করতে হয়। এন্টি ইম্পেরিয়াল ও ভারতের আধিপত্যকে যারা সশস্ত্র পদ্ধতিতে মোকাবেলা করতে ভূমিকা রাখতে পারতো সেই সব বিপ্লবী রাজনীতির নেতাকর্মীদের গত বিএনপির সময় ক্রসফায়ার নাটকের মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সমূলে তাদের অস্তিত্ব বিনাশ করে দেয়া হয়েছে। এই কাজটি করার ফলে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদের নকশার বাইরে লড়াকু আর কোনো শক্তি সমাজে হাজির রইল না।

অন্যদিকে ইসলামের নামে যারা লড়াই করবে তাদের কারণে ধর্মযুদ্ধ দেশি পরিমন্ডল ছাড়িছে দ্রুতই এটা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হবে।

একই প্রতিবেদনে ইকোনোমিস্ট বলছে, “সংঘাতময় পরিস্থিতি যত খারাপ হচ্ছে, ভারতের মিত্র আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে দেখানোর সম্ভাবনাও তত বাড়ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা কুক্ষিগত করাকে সমর্থন করলে তা ভারতের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। তা হবে ‘অপেক্ষাকৃত উগ্র ও কম সেক্যুলার বাংলাদেশ।” (প্রাগুক্ত; ইকোনোমিস্ট)

এই অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা কোন কাগুজে আশার বালী শোনাতে পারছি না। বাস্তবত এটা সম্ভব না। আমরা দেখেছি, হেফাজতের উত্থানের সময় এখানকার তথাকথিত সুশীলরা বাংলাদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপ কামনা করে বড় বড় সেমিনার সিম্পেজিয়াম করেছেন। বিশাল প্রবন্ধ লিখেছেন, ন্যাটোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

এই অবস্থায় বাংলাদেশের সংকট ত্রিমূখী রূপ নিয়েছে। একদিকে হাসিনা সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য হাস্যকর সব আয়োজন, ২. চেতনার ডামাডোলে বিচারিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে ফাঁসির রাজনীতি। ৩. চলতি গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিযোগিতার গ্রাউন্ড তৈরি করে সব দল মিলে নির্বাচন করে আবার কোন দলকে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আনা।

কিন্তু জনঅসন্তোষ যে চরম রূপ নিয়েছে তাতে শান্তিপ্রিয় সমাধানের পথ কঠিন হয়ে গেছে। সরকারী দলের নেতারা ঢাকার বাইরে যেতে পারছেন না। তাদের আচমকা আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। সহিংস অবস্থার চরম বিস্তার ঘটেছে। এর মধ্যে সরকারের তরফে বিরোধীদের দমনের মাত্রাও নানাভাবে বাড়ানোর ঘোষণা আসছে ক্রমাগত। এই অবস্থায়ও শেষের পয়েন্টেই সুশীল প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু । কিন্তু এই পরিস্থিতির মধ্যে এমটি হওয়া কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বড় কথা হল এটা বাংলাদেশের জন্য কোন সমাধানও নয়। আমাদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী আকারে গড়ে উঠবার জন্য ধর্ম, বিশ্বাস, জাত, শ্রেণী -নির্বিশেষে যে জনঐক্য ত্বরান্বিত করা দরকার সেটাই এখনকার রাজনৈতিক কাজ। পুরানা চালের সাংবিধানিক রাজনীতি বারবার সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রই বয়ে আনছে। জনগণের মুক্তির আকাঙ্খা কাগজের পৃষ্ঠায় বন্দি করে গণতন্ত্রের নামে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের লুটপাটের রাজনৈতিক বিধান উচ্ছেদ করেই বাংলাদেশ নতুন জন্মের গৌরব নিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে। তার জন্য চাই জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের আপসহীন ঐক্য। আমরা যদি সর্বময় ঐক্য গড়ে তুলতে না পারি তাইলে জাতীয় আন্দোলনে ইসলামকে সামনে রেখে যারা লড়বেন তাদের ধর্মযুদ্ধের সৈনিক বা জঙ্গি যাই বলুন তাতে কিচ্ছু হেরফের হবে না। নতুন ক্ষমতা কাঠামো তৈরি হবে ধর্মের আশ্রয়েই। ফলে সাংস্কৃতিক ও শ্রেণী ঘৃণার ঘেরাটোপ পার হয়ে আমাদের দ্রুত ঐক্যের পথ খোঁজা ছাড়া উপায় নাই। দেশি-বিদেশী নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য মজলুমর ঐক্যের বিকল্প নাই।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

হিংসার দৌড় জিঘাংসা পর্যন্ত

by Fakaruddin Ahmed:

আমার মতোই অনেকেই আছেন, যারা কাদের মোল্লার নামই হয়ত শুনি নাই বা শুনলেও মনে রাখি নাই । আজকে তাদেরও পরিস্থিতির কারনে এই ব্যাক্তির নাম শুনতে হইছে, জানতে হইছে। চেতনার কেরামতিতে আরও কতকাল যে এই ব্যাক্তির নাম শুনতে হবে , আল্লাহ তায়ালা ভাল জানেন ।

এইতো সেদিন ঢাকা মানুষে মানুষে ভরে উঠল। পুরো মিরপুরে কয় ঘর লোক ছিল, আমি তো সেই ছোট থেকেই যাই। সেইখানে ২২-২৪ বছরের এক শিক্ষিত তরুণ অমন অস্থির দিন গুলাতে বলা নাই কয়া নাই, একেবারে সব চিনে ফেলবে, তারপর পাড়ার- গ্রামের- এলাকার সবচেয়ে বড় রংবাজ হয়ে উঠবে, তারপর সেই সব মানুষকে এমন কেয়ামত দেখায়া ছাড়বে ! বুঝি না কেমনে সম্ভব ! তামিল ছবির স্টোরি শুনতেছি না , তো।

আবার কেরানীগঞ্জ ! মিশন ইমপসিবল – ২ !

জামায়াত ইসলামির পলিটিকাল চেইন দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যাওয়ার পর তৈরি হইছে এক ভয়াবহ সমস্যা। এই সমস্যা কেবল জামাতের না এইটা সবার সমস্যা । তৃনমূলের জামাতিদের কনটেঈন করা যাইতেছে না। এইটা যে একটা এক-কালিন সমস্যাই কেবল না এর ভবিষ্যৎ মুখি ডায়নামিক্স আছে ।

সমাধানের পথ , একটা হইতেছে – শান্তিপূর্ণ , মেধাবি সবার জন্য উইন-উইন  এবং দীর্ঘ মেয়াদে ফলপ্রশু। এই পথ ধরে হেঁটেছে সব সফল জাতি। আর সেই পথ ধরে সাঊথ আফৃকায় গড়ে উঠে রেইনবো নেশন । একেই বলে নেশন বিল্ডিং।

সমাধানের পথ আরেকটা হচ্ছে- ক্লিনসিং -যেইটা আওয়ামি লীগ করতেছে। নির্মূল তাত্ত্বিকদের নির্মূল তত্ত্ব একজিকিউট করাই এমন  সমাধআনের পথ , সেই পটহের শেষ আছে কিনা কেউ জানি না, দেখছিও না , কিন্তু যে উন্মাদনা দেখছি তা ভয়ের।

হিংসা , অবিশ্বাসের , অশ্রদ্ধা , প্রবঞ্চনার, ফ্যসিজমের, ভুল ত্তত্বের আর তার বিপরীতে প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়ে গেছে সমাজে ।
কেমন করে আগাব আগামির দিনগুলাতে সেই ভয় তো সবাই পাচ্ছি।
আর এই ক্লিন্সিং ডকট্রিন কাজ করে না , যেইটা ইসরাইলী(ফিলিস্থিনি) , হিন্দুস্থানি(কাস্মিরি), রাশান (চেচেন), চিন(উইঘ্র) উদাহরণ থেকে শিখে নিতে পারলে সবচে ভাল হয়।
কাদের মোল্লা, সাইদির মত লেসার , স্ট্যাটিক, ভুলে যাবার মত পলিটিকাল ফিগার দের কিভাবে এনলার্জ আর ডায়নামিজম দেয়া হইল , সেইটা সাধারণ মানুষ জানে , কিন্তু জাতির ঘাড়ে চেপে বসা অসাধারণ মানুষগুলা জানে না, বুঝবেও না। কারন  হিংসার দৌড় জিঘাংসা পর্যন্ত , সত্য আর সুন্দর পর্যন্ত পৌছায় না।
আমার আপনার নিজের চেতনার, রাগের, প্রতিশোধের না হয় বিজয় হবে
কিন্তু আমার পরেও আমি থাকব, আমাদের সন্তানেরা , ছোট ভাইরা থাকবে;
তাদেরও কি এক বৃত্তে আটকে থাকতে হবে।