ইসলাম সম্বন্ধে অমুসলিম মনীষীদের মতামত

by Raseduzzaman Tahan

ভারত তথা পৃথিবীর খ্যতনামা অমুসলিম মনীষীরা ইসলাম সম্বন্ধে সুধারণা পোষণ করতেন এবং করেন। মিঃ জি. সি. ওয়েলস বলেছেন- “আরবদের ভিতর দিয়েই মানুষ জগত তার আলোক ও শক্তি সঞ্চয় করেছে।…..ল্যাটিন জাতির ভিতর দিয়ে নয়।”

মেজর আর্থার গ্লীন লিনওয়ার্ড বলেন-“আরববাসীদের উচ্চ শিক্ষা সভ্যতা ও মানসিক উৎকর্ষ এবং তাদের উচ্চ শিক্ষার প্রণালী প্রবর্তিত না হলে ইউরোপ এখনো অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমগ্ন থাকত। বিজেতার উপর সদ্ব্যবহার ও উদারতা তাঁরা যে প্রকার প্রদর্শন করেছিল তা প্রকৃতই চিত্তাকর্ষক।”

পাদ্রী আইজ্যাক টেলর বলেন-“জগতের বহু দেশ ব্যাপী ইসলাম ধর্ম খৃস্টধর্ম অপেক্ষা সাফল্য লাভ করেছে। সর্বক্ষেত্রে খৃস্টধর্মের প্রচার ক্রমশঃ ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়েছে এবং ইসলাম ধর্মালম্বী জাতিকে খৃস্টধর্মে দীক্ষিত করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পরেছে, এমনকি যে স্থানসমুহে পূর্বে খৃস্টধর্ম প্রচারিত ছিল তাও ক্রমশঃ খৃস্টধর্মের প্রচারকগণের প্রভাবমুক্ত হতে আরম্ভ করেছে। মরক্কো হতে জাভা এবং সম্প্রতি পৃথিবীর একপ্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত স্বীয়প্রভাব বিস্তার করে ইসলামধর্ম সুদীর্ঘ পদবিক্ষেপে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকা প্রভৃতি সকল মহাদেশই অধিকার করতে অভিযান আরম্ভ করেছে।”

সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেন-“আমার আশা হয় অদূর ভবিষ্যতে সমস্ত দেশের শিক্ষক প্রাজ্ঞমন্ডলীকে সমিল্লিত করে কোরআনের মতবাদের উপর ভিত্তি স্থাপন করে জগতে একতামুলক শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব। কারন একমাত্র কোরআনই সত্য এবং মানবকে সুখ ও শান্তির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম।” বলাবাহুল্য, তাঁর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পূর্বেই এ মন্তব্য।

স্যার উইলিয়াম মূর বলেন-“সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অধীন সিরিয়াবাসী খৃস্টানগণ যেভাবে বাস করেছিলেন আরব মুসলমানদের অধীনে তাঁর অপেক্ষা অধিক পরিমাণে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ভোগ করেছিলেন।”

ঐতিহাসিক শ্রীনগেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বলেন-“ইসলামের বিশ্বজনীনত্বের সৌন্দর্যে মুগ্ধ মানবগণ আজ ধরায় এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাদের ভাব ও ভাষার আদান প্রদান করতে এবং কর্মের যোগসূত্র স্থাপন করতে প্রয়াসী। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বক্ষব্যাপি এ সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপন-তাও ইসলামের উদার শিক্ষার প্রকৃষ্ট অবদান।

আজ যদি জগতের লোক সে বিশ্ববন্ধু বিশ্বনবীর পদাঙ্ক অনুসরন করে সংসার পথে বিচরণ করতে পারে, সে পূর্ণকীর্তির চরিত্রকথা যদি সর্বত্র প্রচারিত হয় তা হলেই আইন-কানুনের শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য হাজার হাজার প্রহরী নিযুক্ত করার কোন আবশ্যকতা থাকবেনা। তা হলে হিংসা, দ্বেষ, কলহ,বিষাদ ধরাপৃষ্ঠ হতে মুছে যাবে। যদি তার উদাহরণে আপনার চরিত্রকে গঠিত করতে পারে তাহলে এ ভারতে স্বাধীনতার পথে কে অন্তরায়ে হতে পারে? তা হলে কখনও অশান্তির উদয় হয়না।”

ভারতের ব্রহ্মধর্মের নেতা আচার্য কেশবচন্দ্র বলেন-“যখন কোন বিশ্বাসী স্বর্গের ঈশ্বরের সাথে সংগ্রাম করে, তার সিংহাসন বিপর্যস্ত এবং তার পৃথিবীর রাজ্য ধ্বংশ করতে যত্ন করে, ঈশ্বরের প্রত্যেক যথার্থ সৈনিক ঈশ্বরের জয় পতাকা হাতে করে যুদ্ধ করতে অগ্রসর না করে অবিশ্বাস উপহাস বিমর্দ্দিত হবে। ভারতের বহ্মবাদীগণ যেন নিরন্তর এ প্রেরিত পুরুষের সম্মান করতে পারেন এবং তিনি স্বর্গ হতে যে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদের সংবাদ আনয়ন করেছেন যে তা গ্রহণ করতে সমর্থন হন।”(মহাজন সমাচার, পৃষ্ঠা ১২৭-১২৯)

পরিব্রাজক ব্যারিস্টার চন্দ্রশেখর সেন লিখেছেন-“কেবলমাত্র ষোল বছরের বালক হযরত আলীকে ও বিবি খাদিজাকে সাথে করে যিনি সনাতন ধর্ম প্রচার করতে সাহসী ও প্রবৃত্ত হন এবং সে প্রচারের ফলে সহস্রাধিকবর্ষ পৃথিবীর অর্ধেক স্থান ব্যাপী এ ধর্ম চলতেছে। তিনি ও তার সে বিধাতা প্রেরিত তাতে তিলমাত্র সন্দেহ নাই।”(ভূ-প্রদক্ষিণ,৫২৫ পৃষ্ঠা)

শ্রীমানবেন্দ্রনাথ রায় বলেন-“Learning from the Muslim Europe became the leader of modern Civilization……”[Historical Role of Islam] অর্থাৎ মুসলিম শিক্ষার প্রভাবেই ইউরোপ আধুনিক সভ্যতার নেতা হতে পেরেছে।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেন-“জগতের বুকে ইসলাম সর্বোতকৃষ্ট গণতন্ত্রমূলক ধর্ম। প্রশান্ত মহাসাগর হতে আরম্ভ করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত সমস্ত মানবমন্ডলীকে উদার নীতির একসূত্রে আবদ্ধ করে ইসলাম পার্থিব উন্নতির চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে।”

ডক্টর তেজ বাহাদুর সাপ্রু বলেন-“হিন্দুদিগকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় ইসলাম ধর্মের কতিপয় মূলনীতি- আল্লাহর একত্ববাদ ও মানবের বিশ্বজনীনত্ব।”

শ্রীভুদেবচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলেন-“হিন্দু স্বধর্ম বিধেয়রুপ পাপের প্রাশ্চিত্তের জন্যই বিধাতা মুসলমানকে শাস্তারুপে এ দেশে পাঠিয়েছিলেন।”

গুরু নানক বলেন বলেন-“বেদ ও পুরাণের যুগ চলে গেছে; এখন দুনিয়াকে পরিচালিত করার জন্য কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ। মানুষ যে অবিরত অস্থির এবং নরকে যায় তার একমাত্র কারণ এটা যে, ইসলামের নবীর প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা নেই।”

শ্রীজওহরলাল নেহেরু বলেন-“হযরত মুহাম্মাদের প্রচারিত ধর্ম, এর সততা, সরলতা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং এর বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সমতা ও ন্যায়নীতি পাশ্ববর্তী রাজ্যের লোকেদের অনুপ্রাণিত করে। কারণ এ সমস্ত রাজ্যের জনসাধারণ দীর্ঘদিন যাবত একদিকে শাসকগোষ্ঠী কতৃক নিপীড়িত, শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছিল; অপরদিকে ধর্মীয় ব্যাপারে নির্যাতিত নিষ্পেশিত হচ্ছিল পোপদের হাতে। তাদের কাছে এ ইসলাম বা মুহাম্মদের নীতি নতুন ব্যবস্থা ছিল মুক্তির দিশারী।”

শ্রীমহাত্মা গান্ধী বলেন-“প্রতীচ্য যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত, প্রাচ্যের আকাশে তখন উদিত হল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং আর্ত পৃথিবীকে তা দিল আলো ও স্বস্তি। ইসলাম একটি মিথ্যা ধর্ম নয়। শ্রদ্ধার সাথে হিন্দুরা অধ্যয়ন করুক তাহলে আমার মতই তারা একে ভালবাসবে।”

শ্রীস্বামী বিবেকানন্দ বলেন-“ইউরোপের সর্বপ্রধান মনীষীগণ-ইউরোপের ভলটেয়ার, দারউইনি, বুকনার ফ্লনারিয়, ভিক্টর হুগো- কুল বর্তমানকালে ক্রিশ্চানী দ্বারা কটুভাষিত এবং অভিশপ্ত; অপরদিকে এ সকল পুরুষকে ইসলাম বিবেচনা করেন যে, এ সকল পুরুষ আস্তিক, কেবল এদের নবীর-বিশ্বাসের অভাব। ধর্ম সকলের উন্নতির বাধকত্ব বা সহায়কত্ব বিশেষ রুপে পরীক্ষিত হোক, দেখা যাবে ইসলাম যেথায় গিয়েছে, সেথাই আদিম নিবাসীদের রক্ষা করেছে। সেসব জাত সেথায় বর্তমান। তাদের ভাষা, জাতীয়ত্ব আজও বর্তমান।

ইউরোপে যা কিছু উন্নতি হয়েছে, তার প্রত্যেকটি খৃষ্টান ধর্মের বিপক্ষে বিদ্রোহ দ্বারা। আজ যদি ক্রীশ্চানীর শক্তি থাকত তাহলে ‘পাস্তের’ (Pasteur) এবং ‘ককে’র (Koch) ন্যায় সকলকে জীবন্ত পোড়াত এবং ডারউইন-কল্পদের শূলে দিত। এর সাথে ইসলামের তুলনা কর। মুসলমান দেশে যাবতীয় পদ্ধতি ইসলাম ধর্মের উপরে সংস্থাপিত এবং ইসলামের ধর্মশিক্ষকরা সমস্ত রাজকর্মচারীদের বহুপূজিত এবং অন্য ধর্মের শিক্ষকেরাও(তাদের নিকট) সম্মানীত।” (দ্রঃ স্বামী বিবেকানন্দের লেখা ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ পুস্তকের ১১৭, ১১৮ ও ১১৯ পৃষ্ঠা)

 

Raseduzzaman Tahan ewutahanbba@gmail.com

চেতনা-পরাবাস্তবতাঃ তুরস্ক বনাম বাংলাদেশ

2

by: Aman Abduhu

গত রবিবার তুরস্কে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে গেলো। সে নির্বাচনে ছদ্ম-ইসলামপন্থী প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের দল এগিয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া এখন বাংলাদেশেও দেখছি; ইসলামপন্থীরা প্রচুর আনন্দ প্রকাশ করছেন।

এই ইসলামপন্থীদের একটা জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার। এটা ঠিক যে কঠিন একটা সেক্যুলার পরিবেশে এরদোগান কিছু কাজ করেছেন, যা বৈশিষ্ট্যবিচারে ইসলামী। যেমন, কোন মেয়ে হিজাব করতে চাইলে পারবে, এটা তিনি অনুমোদন করিয়েছেন শেষপর্যন্ত। পাবলিক প্লেসে এলকোহল নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এসব বিষয় তুরস্কের নির্বাচনে কোন ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর ছিলোনা। ঐদেশের মানুষজন এইসব সস্তা ইসলামী জযবায় উত্তেজিত হয়ে এরদোগানকে ভোট দেয়নি। বরং তুরস্কে গেলে মেয়েদের বেশভুষা এবং আরো কিছু দেখে ইসলামপন্থীদের হার্ট এটাক হয়ে যেতে পারে। এখন অলরেডি ফেসবুকে কানে তালা লেগে যায়। আর বাংলাদেশের দৃশ্যমান অবস্থা তুরস্কের মতো হলে তো ইসলাম-রক্ষক ভাইদের চিৎকারে ফেসবুকে কানের পর্দাই ফেটে যেতো।

তুরস্কের মানুষ বাংলাদেশের মানুষজনের মতো হুজুগে না। তারা আমাদের মতো অর্থহীন ইস্যু আর অতীত নিয়ে এতোটা মেতে থাকে না। বরং ইউরোপ আর এশিয়ার মাঝে থাকার অবস্থানগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করে।

এরদোগান আমার প্রিয় একজন নেতা। বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের মাঝে তাকে অন্যতম সফল একজন নেতা মনে করি। অর্জনের দিক থেকে মাহাথিরের চেয়েও বেশি। কারণ দেশী-বিদেশী এতো বেশি ষড়যন্ত্র আর বিরোধীতার মুখোমুখি মাহাথিরকে হতে হয়নি। তুরস্কের কনটেক্সটও মালয়েশিয়ার চেয়ে ভিন্ন এবং অপেক্ষাকৃত কঠিন ছিলো। এরদোগান লোকটা সবচেয়ে বেশি প্রাগমাটিকও।

তবে ভদ্রলোক সম্প্রতি ডিকটেটরদের মতো কাজকর্ম শুরু করেছেন। সাংবাদিকদেরকে জেলে ভরা, টুুইটার ইউটিউব ব্লক করা, বিশাল বিশাল গণজমায়েতের ছবি দিয়ে পাবলিককে ইমপ্রেস করার চেষ্টা, এসব। যদি শেষপর্যন্ত এসব সামলে নিতে পারেন, হয়তো তিনি আরো বেশি উচ্চতায় পৌছে যেতে পারেন। কারণ আলটিমেটলি তিনি তার দেশের জন্য ক্ষতিকার শাসক না। শেখ হাসিনার মতো নেতিবাচক মানুষ না। কিন্তু এভাবে সামলাতে পারার সম্ভাবনা কম। তারচেয়ে বরং তাঁর অবসর নেয়া উচিত। একে পার্টির হায়ারারকিতে যোগ্য মানুষজন আরো আছে।

এইসব কাজকর্ম করার পরও কেন এরদোগানের দল বিজয় পেলো? তুরস্কের নির্বাচন কি বাংলাদেশের মতো? সোমবারের পঞ্চম দফা উপজেলা নির্বাচনে যেভাবে বাংলাদেশে আওয়ামী মাফিয়া লীগের লোকজন কেন্দ্র দখল করছে? বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিচ্ছে, সিল মেরে বাক্স ভরাচ্ছে।?

না। একে পার্টিকে এসব করে নির্বাচনে জিততে হয়নি। এবং ফাঁপা বেলুনভর্তি জযবার উপর ইসলাম মার্কাটি লাগিয়ে দিয়ে ঐদেশে জেতা যায় না, তা তো আগেই বলেছি। বরং এখনো এরদোগানের বিজয়ের কারণ দুইহাজার এগারো সালের জুনে আলজাযিরায় প্রকাশিত একটা রিপোর্টে বুঝা যায়। “ফ্রম স্ট্রিট সেলার টু গ্লোবাল স্টেটসম্যান”।

এরদোগান প্রথম জীবনে বাড়তি উপার্জনের জন্য তার এলাকা কাশিমপাশার রাস্তায় খাবার বিক্রি করতেন। এটাও একটা চিন্তা করার মতো বিষয়। ঐদেশে মৃত বাবা বা স্বামীর দড়ি ধরে মানুষজন রাজনীতিতে আসার সুযোগ তেমন একটা পায় না। নিজের যোগ্যতা দরকার হয়।

সেই রিপোর্টে এরদোগানের শাসন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইস্তাম্বুলের টেক্সি ড্রাইভার মেরাল বলছিলেন “আমার বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায়। আমার জীবনে প্রথমবারের মতো আমি ইন্সুরেন্স পেয়েছি, আমাদের প্রাইম মিনিস্টারকে ধন্যবাদ এর জন্য। আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে আমার পরিবার কোন সমস্যায় পড়বে না। আমার দশ বছর বয়সী মেয়েটা মিষ্টি বেশি খেয়ে খেয়ে দাঁত নষ্ট করে ফেলেছে। আগে হলে তার চিকিৎসার জন্য আমাকে ফতুর হয়ে যেতে হতো। আর এখন আঠারো বছর বয়সের কম সবার চিকিৎসার খরচ দেয় সরকার।”

এরদোগানের ইয়ং বয়সে তাঁর চুল কেটে দিতো যে সেলুন মালিক, তিনি আলজাযিরার রিপোর্টারকে বলেছিলেন “আমি যখন আটানব্বই সালে হজ্ব করতে সউদী আরব যাই তখন এক মিলিয়ন টার্কিশ লিরার নোটও এক্সচেঞ্জ করার জন্য কেউ নিচ্ছিলো না। আর দুইহাজার দশ সালে যখন আবার গেলাম, একশ লিরার নোট দিয়ে আমি দুইশ পঞ্চাশ রিয়াল পেলাম। ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের একটা ভবিষ্যত আছে এখন।”

মানুষ এ পৃথিবীতে খুব বেশি কিছু চায় না। একটু শান্তিতে বাঁচতে চায়। এরদোগানের মতো নেতারা যখন সে প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেন, তখন মানুষ তাদের ভালোবাসে। অথবা উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন ইনষ্টিটিউশন ও ট্রাডিশনের কারণে নেতারা এর বাইরে যেতে পারেন না। আর আমাদের মতো দেশে? রাজনীতিবিদ নেতারা ব্যস্ত আছে একজন আরেকজনের সাথে নোংরা মারামারি আর রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে খাওয়াতে।

আর তাছাড়া, নেতা তো উঠে আসে মানুষদের মধ্য থেকেই। ঐসব দেশের মানুষেরা ব্যস্ত থাকে কাজ করতে, অবসরে নিজের আনন্দ নিতে। ওদের ফেসবুকে গেলে দেখা যায় হয় নিজেরা বেড়াচ্ছে খাচ্ছে। দেশের বড় কোন সামষ্টিক ইস্যু যেমন নির্বাচন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অর্থনৈতিকভাবে বড় কোন ঘটনা, এসব নিয়ে কালেভাদ্রে মাথা ঘামাচ্ছে।

আর আমাদের দেশে আমরা সবাই তালেবর। সবাই দেশপ্রেমে টুইটুম্বুর স্থবির গর্ভবতী। যেদেশে মানুষ আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ভিক্ষা করে, চিকিৎসা পায় না, বিচার পায় না, সেদেশে এখনো আমরা পরে আছি একাত্তর নিয়ে। সম্ভব হলে বিপ্লব করতে ব্রিটিশ আমলেও চলে যাই পারলে, এমন অবস্থা। এখনো আমরা গিনেজ রেকর্ডের মতো ফালতু একটা প্রতিষ্ঠানের পেছনে পুরো দেশ মিলে দৌড়াচ্ছি। অথবা হিমালয়ে উঠার জন্য ধাক্কাধাক্কি করে যাচ্ছি।

ওদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা পত্রিকায় কলাম লেখে জমির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে, বিদেশের সাথে অর্থনৈতিক ঘাটতি নিয়ে, অন্য দেশের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে, রিফিউজিদের সমস্যা নিয়ে। আর আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা মুজিবকে সম্মান দেয়া হয়নাই, জাতীয় সঙ্গীত সবার সেরা, মুক্তিযুদ্ধ না থাকলে দেশ আগাবে না এইসব নিয়ে আবর্জনা লেখাতে ব্যস্ত।

এমন একটা অতীতমুখী দেশের কোন বর্তমান বা ভবিষ্যত কিভাবে থাকবে? আর কিভাবেই বা এইরকম ঊন-মানুষদের মাঝে এরদোগান, মাহাথির বা জিয়ার মতো স্টেটসম্যান জন্ম নেবে?

‘সেকুলার রাষ্ট্রে’র বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক আবাসিক হল কেন?

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ধর্মগুরু তৈরির প্রকল্প নিয়ে শুরু হলেও ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের রেনেসাঁসের  সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সাধারণ্যের, বিশেষত উচ্চবিত্তের কাতারে নামতে থাকে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার সূচিকাগার ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আদিতে ধর্মযাজকদের শিক্ষার কলেজ ছিল। ব্রিটিশেরও পূর্বে  ‘হোলি রোমান সাম্রাজ্যে’ ১০৮৮ সালে যাজক বানানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়। তার পূর্বে আফ্রিকার মিশরে ৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ইসলামী ধর্মচর্চার কেন্দ্র। আর  প্রাচীণ ভারতের নালন্দায় খ্রিস্টপূর্ব ১০ শতকে (সম্ভবত) প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশিলাও ছিল বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষুদের জ্ঞানচর্চার বিহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সাধারণ্যের কাতারে নামার সাথে সাথে এবং ‘এনলাইটেনমেন্টে’র প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শনও বিবর্তিত হয়ে এক বিশ্ববোধের চেতনায় উন্নীত হয়। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা তাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার এক অনিবার্য অংশ।

HJH1

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেভাবে বড় গলায় নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বাতিঘর হিসেবে দাবী করে থাকেন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূতিকাগার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিহিত করে থাকেন সেখানে ভাবতে অবাক লাগে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক (অপ)সংস্কৃতির চর্চা হয়ে থাকে। পৃথিবীর মূলধারার কোন বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বাংলাদেশের গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মুসলিম বনাম অন্যান্য সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভেদসহ আলাদা আবাসিক হলের কোন নজির নেই। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশের মত অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে এ সাম্প্রদায়িকতার চর্চা হতে পারে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠণের ব্যার্থতার দায় এ বিশ্ববিদ্যালয় এড়াতে পারে কিনা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের দায় নিয়ে। যেহেতু লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করে ফেলেছিল এবং এই ভাগ করার বিরুদ্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক জমিদার ও প্রভাবশালী হিন্দুরা তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯১১ সালে  এটিকে ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল তাই ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কে সন্তুষ্ট করতেই ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এক বাংলায় দুইটি আর্থ-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অখন্ড বাংলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাটিও খুব সহজ ছিল না। আমাদের কবিগুরুও সে দেয়ালের পিলার ছিলেন বলে অনেক কুৎসা আছে। সে যাই হোক, অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন যাত্রা শুরু করল তখন এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উত্থান ঠেকানো এড়ানো না গেলেও তখনকার সামাজিক জাত-বর্ণ প্রথার প্রেক্ষাপটে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে এর যাত্রা শুরু করতে পারেনি। এর অন্যতম নিদর্শন মুসলিম এবং অমুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আলাদা আবাসিক হলের প্রবর্তন। ব্রিটিশ উপনিবেশের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’নীতির আলোকে সাম্রাজ্য পরিচালনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন তৈরির এ দ্বৈতনীতিও স্বাভাবিকভাবেই উপনিবেশের স্বার্থেই দরকার ছিল!

আর পরবর্তীতে পাকিস্তান যেহেতু একটি ধর্মরাষ্ট্ররূপে কিংবা মুসলমানদের রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি করে রাখা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্মরাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সে বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে এই ধরণের জঘন্য সাম্প্রদায়িক একটা ব্যবস্থা কীভাবে প্রশ্নাতীতভাবে টিকে আছে সেটা এক মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই বলে থাকেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং এর সফল বাস্তবায়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই নেতৃত্ব দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্তও বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। এটা সত্য যে রাজনৈতিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারের কেন্দ্রেই অবস্থান করছে। কিন্তু এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক গড়ণ কীভাবে হচ্ছে তার খবর কি সচরাচর রাখা হয়? শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যখন তার শিক্ষার্থীদের পৃথক পৃথক গোয়ালঘরে ঢুকানো হয় তখন কি তা বিশ্ববিদ্যালয়টির মৌলিক আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে বসে না? শুধু কি তাই, মোটা দাগে এটি কি রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষকতাই করছে না?

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬ টি। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে রাখা হয়। এমনকি আমরা যদি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই সেখানেও দেখতে পাব বিশ্ববিদ্যালয়টির নামের সাথেই একটা সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের সম্পৃক্ততা থাকার পরেও সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা আবাসনের কোন ব্যবস্থা নেই।

পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও ধর্মীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা বাসস্থানের কোন ব্যবস্থা নেই। ইন্ডিয়ার যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথেই ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়া আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া, বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

উত্তর প্রদেশে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৫ সালে উত্তর ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমেদের হাত ধরে। মজার ব্যাপার হল বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন একজন হিন্দু রাজা রাজা জয় কিসান দাস।  বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে অধ্যায়ন করছেন প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। ১৯ টি আবাসিক হলের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে হিন্দু-মুসলিম সব বিখ্যাত ব্যক্তির নামেই আবাসিক হল থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন হলকে চিহ্নিত করা নেই। দিল্লীর জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া এখন ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করছে। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আলি এবং মাওলানা শওকত আলির নেতৃত্বে  মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ভাইস চ্যাঞ্চেলর ছিলেন ড.জাকির হোসেন। ৫০ শতাংশ আসন মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন ১৭ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী।  বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন আবাসন বৈষম্য নেই। বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এশিয়ার  অন্যতম বৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৬ সালে। দুইটি ক্যাম্পাসে বিস্তৃত বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়তন ১৬ বর্গকিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০ হাজার শিক্ষার্থী ছড়িয়ে আছে এর ৬০ টি আবাসিক হোস্টেলে। নামে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসনে ধর্মীয় পরিচয়ের কোন ভূমিকাই নেই।

ইন্ডিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা আবাসনের নজির নেই। আর অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তো এটা কল্পনারও বাইরে।

যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি মুখ্য এবং স্পর্শকাতরই হয়ে থাকে তাহলে লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত করাও সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক। সে প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্রে ছেলেদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও মেয়েদের জন্য আলাদা কোন হলের ব্যবস্থা নেই। এটি যেন এমন যে, ছেলেদের জাত যাওয়ার ভয় থাকলেও মেয়েদের জাত-পাতের কোন বালাই নেই! এবং একটি রাষ্ট্রের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় যখন এভাবে লিংগীয় বৈষম্যমূলক এবং পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসারে ভূমিকা রাখে তখন রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন দাবী করে।

রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে পূণর্ভাবনা কেন দরকার তার জন্য সামাজিকীকরণের বিষয়টার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। যেমন, ধর্মবিশ্বাস একটি মানসিক প্রক্রিয়া। ধর্মবিশ্বাসের রূপ যখন মানুষের আচরণে ফুটে উঠে তখনই আমরা কেবল জানতে পারি সে কোন ধর্মজাত। একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের বলয়ে যে মানসিকতা গড়ে উঠে সে মানসিকতার কাছে যখনই অন্য ধর্ম-বিশ্বাস এবং জীবনাচরণ প্রকাশ পায় তখনই তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় এবং সে তখন সে বিশ্বাসের প্রতি এক ধরণের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। এই প্রতিক্রিয়া যখন এক ধর্মের অথবা এক সম্প্রদায়ের সাথে অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে হয় তখন আমরা বলি এটা সাম্প্রদায়িক আচরণ। যেহেতু মানুষ গোত্রপ্রথা থেকে বের হয়ে এসে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে শুরু করেছে তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায় পরিচয়ের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতেই দরকার একটি অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। তা না হলে সমাজে সবল দূর্বলের উপর, সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর উপর নিপীড়ণ চালাবে। তাই একটি স্থীতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্যই দরকার অসাম্প্রদায়িক নাগরিক এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনা।

এই অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনার জন্য প্রথমেই যেটি দরকার সেটি হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে স্বাভাবিক সহাবস্থানের মানসিকতা তৈরি। এই মানসিকতা তৈরি হয় সমাজের বিভিন্নক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সক্রিয়ভাবে নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। আর এই মিথস্ক্রিয়া বাড়লে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এবং জীবনবোধের কাছাকাছি আসতে পারে। এই কাছাকাছি আসা থেকে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। আর এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যে সমাজে বিদ্যমান থাকে সে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা দানা বাঁধতে পারে না। যেকোন সমাজের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাই দায়িত্ব হচ্ছে এমন কাঠামো তৈরি করা যেটি নাগরিকদের মধ্যে এই উদার মানসিকতার সৃষ্টি করবে।

আর এই মিথস্ক্রিয়া যেখানে থাকে না সেখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়কে এলিয়েন ভাবে এবং নিজেদের অজ্ঞতা থেকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতি থেকে এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতা তৈরি হয় যা থেকে বিদ্বেষ বাড়ে যেটি অনিবার্যভাবেই সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড়ঘর ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’দের আলাদা হলের বরাদ্দ নিয়ে ভাবনাগুলোকে মোটা দাগে চারটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিমদের জন্য রয়েছে এক প্রকার হল এবং মুসলিম ভিন্ন অন্য সব ধর্মবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে একটি হল। এখানে মুসলিম বনাম অন্যান্য(সংখ্যালঘু) ধর্মের আড়ালে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ বিভিন্ন ধর্মের স্বতন্ত্র্যতা রক্ষা করা হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভিন্নমতের(ভিন্ন ধর্ম) নূন্যতম অস্তিত্ব না থাকায় তাদের মধ্যে সহাবস্থানের একটি অন্তর্নিহিত চেতনা তৈরি হয় না যেটি তাঁর গণতান্ত্রিক মানসিকতার গঠনকে বাধাগ্রস্ত করে।

তৃতিয়তঃ কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটা রটনা উঠল যে একটি জঙ্গী সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংখ্যালঘু হল’ আক্রমণ করবে। তখন হলটির শিক্ষার্থীগণ নিজেরা এটাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাতভর হলটি পাহারা দেয়। তার মানে হলটির ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়টিই তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি যেটি ১৯৭১ সালেও এই পরিচয়ের কারণেই মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল।

চতুর্থতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি এই হলটি চালিয়ে রাখার সপক্ষে  পর্যাপ্ত যুক্তি থেকেও থাকে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়ার দায়ভার নেবে কে? বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মত এখানেও পুরোপুরি লিঙ্গবৈষম্যকেই স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে।

এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৪৩ বছর বয়স হওয়া স্বত্বেও এই নীতিগত অসামঞ্জস্যটি নিয়ে কেউ শক্তভাবে কথা বলেননি কিংবা বলার সাহস পাননি! এবং এই দুই কারণের কোনটাই কম বিপদজনক নয়। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে থাকা সাম্প্রদায়িকতার এ মালগাড়ীতেই সওয়ার হয়েছে রাষ্ট্র যেটির গতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে অন্তর্দন্দ্ব। রাষ্ট্রটির কি তার এঞ্জিন নিয়ে ভাবতে শুরু করা উচিত নয়?

আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কয়েকটি মূলনীতি প্রসঙ্গে

by মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

একতরফা প্রহসনের নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিনির্মাণে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পুনর্গঠন ও সংহত করা এখন সময়ের দাবী। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে না ওঠায় বাংলাদেশে “নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র” আরো চেপে বসেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম আপাততঃ ক্লান্ত ও অবসন্ন। তাই আন্দোলন সংগ্রামে দেখা দিয়েছে বিরতি।

সেই সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমীক্ষা। উদ্দেশ্য আন্দোলন সংগ্রামের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে যথাশীঘ্র এর পুনর্যাত্রা। ইতোমধ্যে আমরা পর্যালোচনা করতে পারি বাঙালি মুসলমানের কোন কোন মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ একটি শক্তিমান ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

 ইসলাম

প্রথম যে মৌলিক ভাবাদর্শটি নিয়ে এই ডিসকোর্সের সূচনা করা যেতে পারে সেটি হল ইসলাম। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলধারার মৌলিক উপাদান হিসেবে ইসলাম কেন অপরিহার্য? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে খুঁজতে হবে।

বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী প্রান্তিক ও ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি। প্রান্তিক  ও ক্ষয়িষ্ণু বলছি এই কারণে যে এই ভাবাদর্শগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইসলামী আত্মপরিচয়কে গৌণ করে তোলে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ইসলামের ভূমিকাকে সীমিত করে রাখতে চায়। ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন ধর্মাচার পালন ও কেবলমাত্র অল্পকিছু  ধর্মীয় সামাজিক পার্বণ পালনের মধ্যেই এই ইসলাম সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ইসলামের এই খণ্ডিত ভূমিকা ও চর্চাকে সমর্থন করে না।

তাই বাঙালি মুসলমানের মূলধারা বা মধ্যধারার (Centrist and Normatic) রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে যারা ধারণ ও লালন করতে চাইবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশে ইসলামের অধিকতর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে  তুলতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তা, শিল্প-সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও প্রচার-প্রচারণার বিপরীতে বাঙালি মুসলমানের প্রবল মধ্যধারার বাংলাদেশী এবং/অথবা ইসলামী সৃজনশীলতার চর্চা ও প্রচারযজ্ঞ বিনির্মাণ ও লালন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে এই আন্দোলন একটি দীর্ঘমেয়াদী ভাবাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যা শুধুমাত্র ইস্যুভিত্তিক বা এডহক নয় । এটা যেন শুধুমাত্র রিএকটিভ বা প্রতিক্রিয়ামূলক লড়াই না হয়ে যায়। একে হতে হবে প্রোএকটিভ বা স্বতো:প্রণোদিত, ইতিবাচক এবং সৃজনশীল।

বাঙালি মুসলমানের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে কেন ইসলামকে একটি বড় অবস্থান দিতে হবে? এর উত্তর হল — বঙ্গীয় ইসলামের সমন্বয়বাদী প্রবণতা এবং আধুনিক ও প্রগতিবাদী ইউরোপীয় এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্সের প্রভাবে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ প্রান্তিক ও অবক্ষয়ী হয়ে উঠছে। এর কারণ হল — একদিকে প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে উত্তর-উপনিবেশিক ইসলামী সর্বাত্মকবাদী (Totalitarian) আন্দোলনের প্রভাব; এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সাম্প্রতিক উত্তর-আধুনিক ডিসকোর্সের আঘাতে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ও এর বঙ্গীয় সংস্করণ রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্স দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এর উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমাগত ক্ষয় ও অবশেষে লয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এখন আমরা দেখব কেন ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে বিপরীত স্রোতের প্রভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ তার শক্তিমান অবস্থান হারাচ্ছে। আর কিভাবে সেই শূন্যস্থান পূরণে সর্বাত্মকবাদী ইসলামী সংস্কৃতি ক্রমশঃ অগ্রসর হচ্ছে।

আমরা ইদানীং দেখছি যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি প্রায়শঃই বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ায় তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন কথিত “আবহমান” বাঙালি সংস্কৃতির আচার অনুষ্ঠানে যখন এমন কিছু জীবনাচার ও চর্চাকে উপস্থাপিত করা হয়, যার ভেতরে বি’দাত ও শিরকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লক্ষণ ফুটে ওঠে, তখন বাঙালি মুসলমান তাকে আর আগের মত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না । উদাহরণ হিসেবে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আলোকমালা ও অগ্নিশিখার প্রতি সমর্পণের বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উপাচার, অবনত ভঙ্গিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, মানব আকৃতি সদৃশ ভাস্কর্যে অবনত ভঙ্গিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন, ইত্যাদি। আধুনিক, নাগরিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি মুসলমান দেশীয় সংস্কৃতির এইসব আচার আচরণকে “আবহমান” কাল থেকে প্রচলিত বলে যথেষ্ট বিচার বিবেচনা ছাড়াই অতি উৎসাহের সঙ্গে ধারণ ও লালন করে চলেছে। অথচ বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান এইসব আচার আচরণকে বিচ্যুতি বলে মনে করছে। ফলে বৃহত্তর বাঙালি মুসলমানের বিবর্তনশীল মূল বা মধ্যধারার সংস্কৃতির সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ ও সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নাগরিক শ্রেণী ও গরিষ্ঠ লোকায়ত এবং তৌহিদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা দিচ্ছে বিভক্তি ও মেরুকরণ। রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে দেখা দিচ্ছে ব্যাপক সংঘাত, সংঘর্ষ, নৈরাজ্য ও সহিংসতা। এই বয়ানের সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ও তার বিপরীতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান।

কেন এমনটি ঘটছে? বিগত শতকের ষাট ও সত্তর দশক পর্যন্তও তো আমরা দেখেছি “আবহমান” সমন্বয়বাদী বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির জয় জয়কার। তাহলে ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় কি এমন পরিবর্তন ঘটল যে আমরা একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পালাবদলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

এর উত্তর খুঁজে পাবার জন্য আসুন আমরা বঙ্গের মধ্যযুগের ইতিহাসের একটি পর্বকে পাঠ ও বয়ান করি।

মধ্যযুগের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির মত বীর ও সূর্যসৈনিক এই জনপদে ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির বীজ বপন করেছিলেন। শাহ জালালের মত সূফি সাধক এই সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক অনুসঙ্গের আবাদ করেছেন এই অঞ্চলের উত্তর পূর্বে বসবাসকারী মানব মনের গহীন প্রান্তরে। খান জাহানের মত সূফি সাধক ও বিষ্ময়কর জনপদ-নির্মাতা সেই একই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিকে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলবর্তী বঙ্গীয় বদ্বীপের গহীন অরণ্যে বসবাসকারী সভ্যতা-বঞ্চিত প্রান্তিক মানব মনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যার ভাবাদর্শিক ও সাহিত্যিক রূপায়নে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গের কবি সৈয়দ সুলতান রচনা করেছিলেন “মুসলিম জাতীয় মহাকাব্য” স্বরূপ নবী বংশ । এই মহাকাব্য রচনার মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বৈদিক, বৈষ্ণব, শৈব এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে তুলনামূলক ডিসকোর্সের অবতারণা করে ইসলামী ভাবাদর্শ ও সংস্কৃতিকে বাঙালি মুসলমানের জীবনে গ্রথিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শহীদ তিতুমীর এই ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির সুরক্ষায় স্থানীয় প্রকৃতিজাত উপাদান দিয়ে বাঁশেরকেল্লা গঠন করে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি এই রাজনীতি ও সংস্কৃতির আলোকে বাঙালি মুসলমান কৃষিজীবীদের ইংরেজ ও জমিদার বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হাজী শরীয়তউল্লাহ এবং কারামত আলী এই সংস্কৃতিকেই অবক্ষয় ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার জন্য লৌকিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গের এই দক্ষিণ পূর্ব গাঙ্গেয় বদ্বীপে। এই অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানের লৌকিক জীবন, জীবিকা, জীবনাচার ও জীবনদর্শনে এভাবে গভীরভাবে গ্রথিত হয়ে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে নিজস্ব (Owned), ভূমিজ (Organic), মর্মধারিত (Internalized), আত্মীকৃত (Assimilated) ও অকৃত্রিম।

মধ্যযুগে বা প্রাক-উপনিবেশিক যুগে বঙ্গে সূচিত বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ও সংস্কৃতির এই মিথষ্ক্রিয়া ও রূপান্তর নিয়ে মেলফোর্ড স্পাইরো (Melford Spiro), জে ডি ওয়াই পীল (J D Y Peel), ইগর কপিটফ (Igor Kopitoff) প্রমুখ নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার ওপরে ভিত্তি করে পূর্ব বঙ্গের গহীন গাঙ্গেয় বদ্বীপে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ইসলামীকরণ সম্পর্কে মার্কিন ইতিহাস গবেষক রিচার্ড ঈটন (Richard M Eaton) একটি যুগান্তকারী ও ইতিহাসের গতি নির্ণায়ক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মান্তরের প্রচলিত ধ্রুপদী ডিসকোর্সকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বঙ্গের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া সম্পর্কে একটি তিন-পর্ব বিশিষ্ট প্রক্রিয়া, যা সুদীর্ঘ কাল ধরে ক্রিয়াশীল ও চলিষ্ণু থাকে, সেটি প্রতিপাদন করেছেন তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থে। আসুন আমরা এবারে দেখি যে এই তত্ত্বটি আমাদেরকে কিভাবে বুঝতে সাহায্য করে যে বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলাম বিবর্তিত হয়ে ক্রমাগত একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পরিণতির ফল হল সমন্বয়ী প্রবণতা ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী প্রবণতা ক্রমাগত মুখ্য হয়ে উঠছে।

ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বকে রিচার্ড ঈটন বলেছেন ইনক্লুশন (Inclusion) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত  ধর্ম ও ভাবাদর্শ  পাশাপাশি অবস্থান করে নিজেদের অবিকল অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই পর্বে দেশী ও বিদেশী অনুসঙ্গগুলো পরস্পর কোনোরূপ বিনিময়ে অংশ নেয় না। দ্বিতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন আইডেন্টিফিকেশন (Identification) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ পারস্পরিক বিনিময়ে অংশ নিয়ে একে অপরের ভেতরে সদৃশ অনুসঙ্গগুলোকে চিহ্নিত করে। আর তৃতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ডিসপ্লেসমেন্ট (Displacement) — যখন বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ স্থানীয় ধর্ম ও ভাবাদর্শের অবশেষগুলোকে ক্রমাগত অপসারণ করতে থাকে। এই তত্ত্বটি স্পষ্ট করার জন্য রিচার্ড ঈটনের লেখা গ্রন্থ থেকে এই উদ্ধৃতি ও ডায়াগ্রামটি এখানে উপস্থাপন করছিঃ

The term conversion is perhaps misleading when applied to this process, since it ordinarily connotes a sudden and total transformation in which a prior religious identity is wholly rejected and replaced by a new one. In reality, in Bengal, … … …, the process of Islamization as a social phenomenon proceeded so gradually as to be nearly imperceptible.

… … …, one may discern three analytically distinct aspects to the process, each referring to a different relationship between Islamic and Indian superhuman agencies. One of these I’m calling inclusion; a second, identification; and a third, displacement. By inclusion is meant the process by which Islamic superhuman agencies became accepted in local Bengali cosmologies alongside local divinities already embedded therein. By identification is meant the process by which Islamic superhuman agencies ceased merely to coexist alongside Bengali agencies, but actually merged with them, as when the Arabic name Allah was used interchangeably with the Sanskrit Niranjan. And finally, by displacement is meant the process by which the names of Islamic superhuman agencies replaced those of other divinities in local cosmologies. The three terms inclusion, identification, and displacement are of course only heuristic categories, proposed in an attempt to organize and grasp intellectually what was on the ground a very complex and fluid process. (Richard M Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier 1204 – 1760, University of California, Berkeley, 1993)

মধ্যযুগ থেকে সূচিত হয়ে ইসলামের এই বিবর্তন প্রক্রিয়া আজ অবধি ক্রিয়াশীল ও চলমান। ইতিহাসের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী চলমান এই মিথষ্ক্রিয়া বর্তমান সময়ে এর তৃতীয় পর্যায় অতিক্রম করছে।এই পর্যায়ে এসে উনিশ ও বিশ শতকের ইসলামী সংস্কারবাদী (Reformist), পুনরুজ্জীবনবাদী (Revivalist) ও পবিত্রকরণবাদী (Puritanical) বিভিন্ন আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশে এযাবৎ  প্রবল সমন্বয়বাদী (Syncretistic) বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে শুদ্ধতাবাদী (Orthodox) ও কিতাবসম্মত (Scriptural) বা টেক্সটসম্মত (Textual) রূপ পরিগ্রহ করছে। একুশ শতকের সূচনাকে আমরা এই বিবর্তনের একটি টিপিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। কাগজ, স্বাক্ষরতা ও শিক্ষার ব্যাপ্তি, মুদ্রণযন্ত্রের কল্যাণে বই পত্রের ব্যাপক সহজলভ্যতা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আর্থিক উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে বাঙালি মুসলমান প্রবাসী সম্প্রদায়ের উদ্ভব, উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অথবা ভ্রমণ ও পর্যটন উদ্দেশ্যে দেশ বিদেশে গমন; রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ইত্যাদি বাঙালি মুসলমানের গাঙ্গেয় বদ্বীপে গন্ডীবদ্ধ কৃষিনির্ভর জীবনাচারে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই সার্বিক পরিবর্তনের ফলে বাঙালি মুসলমানের ইসলামী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন আজ এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে গতিময় ও সর্বাত্মকবাদী হয়ে একটি বৈশ্বিক মাত্রায় পৌঁছেছে। কাজেই বাঙালি মুসলমান তার বাংলা ভাষা ও ইসলাম ধর্ম দিয়ে গড়া বাংলাদেশী রাজনীতি ও সংস্কৃতি দিয়ে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে যে তুরীয় (Transcendental) উচ্চতায় স্থাপন করবে এতে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

২। গণতন্ত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারাকে শক্তিমান করে গড়ে তোলার জন্য যে মুলনীতিটি অপরিহার্য সেটি হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি পাশ্চাত্য ধারণা। আধুনিক ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ডিসকোর্সের একটি অনুসঙ্গ এই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও পথচলার সূচনা এই অঞ্চলে ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার অনুসঙ্গ হিসেবে। উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হবার পর এই অঞ্চলের জনগণ গণতন্ত্রের আদর্শকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবেও অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল গণতন্ত্রের আকাঙ্খা। কিন্তু লিবারেল গণতন্ত্র বিনির্মাণে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি।

প্রাতিষ্ঠানিক, কার্যকর ও অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। তবে গণতন্ত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমষ্টির আস্থা অটুট রয়েছে। বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে একদিকে যেমন ইসলামের প্রতিফলন দেখতে চায়, তেমনি অন্যদিকে তারা গণতন্ত্রকেও একটি শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায়।

গণতন্ত্র ও ইসলামের মধ্যে কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে বলে তারা মনে করে না। ইসলামের যে প্রান্তিক ডিসকোর্সটি ইসলামী রাষ্ট্র বিনির্মাণে গণতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে, বা গৌণ করে, বা প্রতিবন্ধক বলে মনে করে, বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর অংশ তা সমর্থন করে বলে মনে হয় না। সুতরাং ইসলামী ও গণতান্ত্রিক — উভয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের মেলবন্ধনেই রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার চাবিকাঠি।

গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র হয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের কিছু সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্ঠার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যে অপচেষ্টা বারবার দেখা দিয়েছে তা বর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। নেতৃত্ব নির্বাচনেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও রীতি-নীতি মেনে চলতে হবে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে।

৩। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব গণতন্ত্রের মৌল ধারণার দুটি অনুসঙ্গ। অন্যকথায় গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যেই অনিবার্যভাবে এই দুটি প্রত্যয় উপস্থিত রয়েছে। তবুও এই দুটি রাজনৈতিক প্রত্যয়কে এখানে তৃতীয় মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত দ্বারা তিনদিক থেকে বেষ্টিত, সেহেতু এই দুটি প্রত্যয় বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য রক্ষাকবচ। ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতরে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনাকে সদা প্রবহমান রাখতে হবে।

বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বিভিন্ন মাত্রার অসমতা ও বিরোধ রয়েছে। সেগুলোতে ভারসাম্য ও পারস্পরিক মর্যাদা স্থাপন করার জন্য চীন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নানামাত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করতে হবে। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও ইরান – মুসলিম বিশ্বের এই কয়েকটি প্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিনিময়ের ব্যাপক কর্মসূচি নিয়মিতভাবে আয়োজন ও পালন করতে হবে। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও প্রভাব এভাবে মোকাবেলা করে বাংলাদেশে শক্তিমান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাতে হবে।

৪। ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী

চতুর্থ মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আরো দুটি প্রত্যয় – ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা জরুরী। সমাজে শ্রেণী বৈষম্য আছে ও থাকবে। কিন্তু ইনসাফ কায়েম করতে পারলে এই শ্রেণী বৈষম্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্ভব হবে। সমাজে অন্যায় মেরুকরণ প্রশমিত হবে এবং সংঘাত ও সহিংসতা থেকে সমাজ মুক্ত থাকতে পারবে। সমাজে এই ইনসাফ কায়েম করতে হলে মজলুম শ্রেণীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য ও মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে ব্যাপক জনসমর্থন পেতে হলে কেবলমাত্র উপরিতলের ইস্যু থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মজলুম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে সমাজে ও রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল ও নেতৃত্ব দিতে হবে।

এই লেখায় আগামী দিনের বাংলাদেশে মূলধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভাবাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কয়েকটি মূলনীতি উপস্থাপন করা হয়েছে। সবগুলো মূলনীতির বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হয়নি সময় ও স্থান স্বল্পতার কারণে। পাঠকের মনোযোগ ও ধৈর্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে। প্রথম মূলনীতিটিকে অনুপুঙ্খ আলোচনার মাধ্যমে অনেকটা মূর্ত ও খোলাসা করা হয়েছে। প্রথম মূলনীতির শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী পাঠ ও ভাষ্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের যে ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা তাই প্রকৃতপক্ষে এই রচনার মৌলিক অবদান বলে আমাদের বিশ্বাস। অন্যান্য মূলনীতিগুলোকে সংক্ষিপ্তাকারে ও বিমূর্তভাবে এখানে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। এটি সত্য যে এই প্রচলিত প্রত্যয়গুলির এইসময় উপযোগী বয়ান অনেক প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে অবশিষ্ট প্রতিটি প্রত্যয় নিয়ে আলাদাভাবে বিস্তারিত দিকনির্দেশনামূলক লেখার ইচ্ছে আছে। তবে ইতোমধ্যে এই মূর্ত ও বিমূর্ত প্রত্যয়গুলি থেকে মূর্ত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিগঠন করা সম্ভব হতে পারে বলে আমাদের অকুণ্ঠ বিশ্বাস।

জর্জ সেল – এর কোরান

Thomas Jefferson

২০০৭ এর জানুয়ারিতে আমেরিকান কংগ্রেসের প্রথম নির্বাচিত মুসলিম সদস্য কীথ এলিসন (Rep. Keith Ellison, D-Minn) লাইব্রেরী অফ কংগ্রেস থেকে সংগৃহীত কুর’আনের যে কপিটির উপর হাত রেখে কংগ্রেসে শপথ নেন, তার মূল স্বত্বাধিকারী ছিলেন আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, টমাস জেফারসন (Thomas Jefferson). জেফারসন বিবিধ কারণে ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন যা ডেনিস স্পেলবার্গ (Denise A. Spellberg) তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বই ‘Thomas Jefferson’s Qur’an’ এ তুলে ধরেছেন। ১৭৬৫ সালে আইনের ছাত্র থাকা অবস্থায় তরুণ জেফারসন যে কুর’আনটি কেনেন, তা ছিল সরাসরি আরবি থেকে ইংরেজি ভাষায় কুর’আনের প্রথম অনুবাদ। জর্জ সেল নামক একজন তরুণ ইংরেজ ল’ইয়ারের করা এ অনুবাদটি ছিল প্রায় দুইশ বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্যে কুর’আন বিষয়ক গবেষণা ও ধারণার অন্যতম প্রধান উৎস।

প্রেক্ষাপট: ইউরোপীয়দের ইসলাম বিষয়ক আগ্রহ

মধ্যযুগ থেকেই ইউরোপে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় (এ বিষয়ে আমার আগের লেখাতে কিছুটা আলোচনা করেছি)। ইউরোপে যখন ‘অন্ধকার যুগ’ চলছিল, তখন এশিয়া, ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকার বড় অংশ জুড়ে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। আনাতোলিয়া, আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যে সাফাভিদ সাম্রাজ্য, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো সভ্যতাগুলো কেবল প্রবল পরাক্রমশালী হিসেবেই নয়, বরং তাঁদের সঙ্গীত, কবিতা, বাগান, মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্প-সহ পরিশীলিত শিল্প-সংস্কৃতির কারণেও বিশ্বজুড়ে সুবিদিত ছিল। একই সাথে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার সেই সময় আরবি ভাষায় সংরক্ষিত ছিল। শুধু বিজ্ঞান বা দর্শন বা বাণিজ্যই নয়, আরবি সাহিত্যও ইউরোপীয় অনুবাদকদের উৎসাহিত করেছে। ১৭০৪ সালে একজন ফরাসী আরবি থেকে ‘সহস্র রজনীর গল্প’ প্রথম অনুবাদ করেন যা সেই থেকে আজ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের কাছে রোমাঞ্চকর ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।

তবে সব কিছুর উপরে ইসলাম ধর্ম বিষয়ক অনুসন্ধান ও গবেষণা বিবিধ কারণে অনেক ইউরোপীয় পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের আগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে। সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ থেকে আসা স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম কি করে এত দ্রুত সময়ের মধ্যে জানা বিশ্বের এত বড় অংশ জয় করে নিয়েছিল, ইউরোপীয়দের জন্য তা একই সাথে ছিল গভীর বিস্ময়, অনেকটা অস্বস্তিরও কারণ। ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ার (Voltaire) এবং ইংরেজ ইতিহাসবেত্তা এডওয়ার্ড গিবন (Edward Gibbon) একে বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রশ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও, অনেক ইউরোপীয় দার্শনিক এবং মুক্তচিন্তার অধিকারী খ্রিস্টান ইসলামে স্রষ্টার একত্ববাদ সম্পর্কিত মূলনীতি বা মতবাদকে খ্রিস্টধর্মের জটিল ত্রিত্ববাদ (Trinity) অপেক্ষা যুক্তিপূর্ণ মনে করেছেন। এসব বিবিধ কারণে ইউরোপে ইসলাম এবং তার মূল আরবি ভাষার উপরে আগ্রহ তৈরি হয়।

ইংরেজি অনুবাদ

ইউরোপে কুর’আনের প্রথম অনুবাদটি হয় লাতিন ভাষায়। ১১৪৩ সনে ইংরেজ রবার্ট অফ কেটন (Latin: Robertus Ketenensis) কর্তৃক ধর্মীয় মোহান্ত (abbot) পিটার দ্য ভেনারেবল (Peter the Venerable) এর নির্দেশে করা Lex Mahumet pseudoprophete (‘The law of Mahomet the false prophet’) শীর্ষক অনুবাদটি ছিল অতিরঞ্জিত এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অপ্রীতিকর অর্থ বা মন্তব্য সম্বলিত, যার মূল উদ্দেশ্য এর শিরোনামেই প্রতিফলিত। খ্রিস্টান চার্চে বহুল প্রচলিত লাতিন ভাষার এ অনুবাদটি দুঃখজনকভাবে পরবর্তী কয়েকশ বছর ধরে পাশ্চাত্যে কুর’আনের অর্থ এবং সে হিসেবে ইসলামের মর্মার্থ অনুধাবনের একমাত্র উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূল আরবিতে না গিয়ে বরং লাতিন ভাষার এই কাজটিকে এর ভুল বা বিকৃতিসহ পরবর্তীতে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৬৪৯ সালে রাজা প্রথম চার্লস এর চ্যাপলেইন Alexander Ross ফরাসী Sieur du Ryer এর অনুবাদ L’Alcoran de Mahomet কে প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘The Alcoran, Translated out of Arabic into French. By the Sieur du Ryer, Lord of Malezair, and Resident for the French King, at ALEXANDRIA. And Newly Englished, for the satisfaction of all that desire to look into the Turkish Vanities’। শিরোনামের শেষাংশটি লক্ষণীয়।

প্রায় একশ বছর পর ১৭৩৪ সালে জর্জ সেল (George Sale 1697-1736) নামক জনৈক ইংরেজ আইনজীবী ও ওরিয়েন্টালিস্ট মূল আরবি থেকে সরাসরি ইংরেজি ভাষায় কুর’আন অনুবাদ করেন। কাজটির শিরোনাম ছিল ‘Koran, commonly called the Alcoran of Mohammed, tr. into English immediately from the original Arabic; with explanatory notes, taken from the most approved commentators. To which is prefixed a preliminary discourse’. বলা হয়, সেল তাঁর অবসর সময়ে আরবি ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং কোনও মুসলিম দেশে তিনি ভ্রমণ করেননি, যদিও অনেকে বলে থাকেন তিনি ২৫ বছর আরবে ছিলেন। সেল নিজেই তা অস্বীকার করে লিখেছেন, “I am but too sensible of the disadvantages, one who is neither a native, nor ever was in the country must lie under, in playing the critic in so difficult a language as the Arabick.” Society for the Promotion of Christian Knowledge in London এর পৃষ্ঠপোষকতায় সিরিয়ান খ্রিস্টানদের জন্য নিউ টেস্টামেন্ট-এর একটি আরবি অনুবাদ তৈরির উদ্দেশ্যে জর্জ সেল আরবি ভাষা শিখেছিলেন বলে ধারণা।

কুর’আন অনুবাদের কারণ হিসেবে জর্জ সেল লেখেন,

“If the religious and civil Institutions of foreign nations are worth our knowledge, those of Mohammed, the lawgiver of Arabians, and founder of an empire which in less than a century spread itself over a greater part of the world than the Romans were ever masters of, must need to be so.”

An Ottoman Qur’an manuscript

অনুবাদ কাজে সেল ১৬৯৮ সালে কাউন্টার-রিফর্মেশন রোমে প্রকাশিত Louis Maracci এর করা লাতিন অনুবাদের সাহায্য নেন। এছাড়াও লন্ডনের ডাচ চার্চে সংরক্ষিত কুর’আনের একটি হস্তলিখিত কপিও তিনি সংগ্রহ করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে তৈরি এই manuscript টি ১৬৩৩ সালে একজন ডাচ বণিক লন্ডন চার্চকে দান করেন। চার্চের লাইব্রেরিতে পড়ে থাকা কুর’আনের এই হস্তলিখিত কপিটি প্রায় একশ বছর পর সেল তাঁর অনুবাদ কাজে ব্যবহার করেন। কুর’আনের হস্তলিখিত কপিটি ঠিক কি কারণে সংগ্রহ করা হয়েছিল বা লন্ডনে আনা হয়েছিল, তা জানা যায় না। তবে, ইসলামের ধর্মগ্রন্থকে সে সময়ে আরবি ভাষার একটি কালেক্টেবল হিসেবে ধরা হতো এবং পড়তে না পারলেও অনেকে তা কেবল মূল্যবান বস্তু হিসেবে সংগ্রহ করতেন। সেল সরাসরি না বললেও ধারণা করা হয় যে তিনি কুর’আনের এই বিশেষ কপিটিকেই তাঁর অনুবাদ কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইস্তাম্বুলের কুর’আনটিতে কিছু শব্দের যে বিশেষ রূপ এবং মেইনস্ট্রীম অটোমান সাম্রাজ্যে সুপ্রচলিত কমেন্টারি দেখা যায়, সেল এর অনুবাদ এবং নোট এ তার রেশ পাওয়া যায়।

জর্জ সেল এর পূর্বে ১৬৪৯ সালে ফরাসী থেকে ইংরেজিতে যে অনুবাদটি করা হয়, তাতে মূল অনুবাদের ভুলের বাইরেও নতুন কিছু ভুল যোগ হয় বলে সেল মন্তব্য করেন। সে তুলনায় সেল এর অনুবাদটি ছিল লক্ষণীয়ভাবে পাঠযোগ্য, পরিশীলিত, এবং তুলনামূলকভাবে শুদ্ধ। কুর’আনের ভাষার সৌন্দর্য এবং তাঁর অনুবাদের সীমাবদ্ধতা বিনম্রভাবে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, ‘it must not be supposed the translation comes up to the dignity of the original’. এর পরেও তাঁর অনুবাদ কুর’আনের যে কোনও আধুনিক অনুবাদের সাথে তুলনীয়, যেমন আয়াতুল কুরসীর প্রথমাংশের অনুবাদ –

“GOD! there is no GOD but he; the living, the self-subsisting: neither slumber nor sleep seizeth him; to him belongeth whatsoever is in heaven, and on earth.”

একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐশ্বর্য

George Sale

জর্জ সেল এর অনুবাদটি কেবল একটি উচ্চমানের সাহিত্য কর্মই নয়, একইসাথে তা পাশ্চাত্যে ইসলাম বিষয়ক জ্ঞানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটি সুদীর্ঘ ভূমিকায় তিনি ইসলামের ইতিহাস, তাত্ত্বিক, ও ধর্মীয় বহু বিষয়ের ধারণা উল্লেখ করেন। তাঁর অনুবাদ কাজটির আগে যেকোনো ইংরেজি ভাষীর কাছে ইসলাম সম্পর্কিত তথ্যের একমাত্র উৎস ছিল লাতিন ভাষায়। সেল এর অনুবাদ ইসলাম বা কুর’আন সম্পর্কে পূর্বাপর কুসংস্কার বা উদ্দেশ্যপূর্ণ মিথ্যাচারের লাগাম টেনে ধরে। যেমন, মুহাম্মদ(সা:) এর জীবনী বর্ণনায় তিনি মধ্যযুগ থেকে চলে আসা কাল্পনিক ও বিতর্কিত গালগল্পের আশ্রয় নেন নি। বরং তিনি লেখেন,

“Mohammed was richly furnished with personal endowments, beautiful in person, of a subtle wit, agreeable behaviour, shewing liberality to the poor, courtesy to everone, fortitude against his enemies, and, above all a high reverence for the name of God.”

জর্জ সেল এমন একটি সময়ে অনুবাদ কাজটি করেন যখন ইউরোপে নতুন করে আরবি শেখা এবং ইসলামকে জানার একটি চল শুরু হয়েছিল। সে হিসেবে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের কাজ থেকে উপকৃত হয়েছেন। আবার, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যোগ করেছেন। তুলনামূলকভাবে সঠিক ধ্যান-ধারণা এবং একটি বিজাতীয় ধর্মকে জানার ও বোঝার আন্তরিক অভিপ্রায়ের সমন্বয়ে জর্জ সেল এর ‘Koran’ একটি সুদূরপ্রসারী এবং অসাধারণ কাজ যা বিংশ শতকের প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত কুর’আনের স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি অনুবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। কেবল সেল এর সমসাময়িকরাই নয়, বরং পরবর্তী প্রায় দুইশ বছর ধরে ব্রিটেন ও আমেরিকায় প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে কুর’আন ও ইসলাম বিষয়ক ধ্যান-ধারণার উৎস হিসেবে তা পরিগণিত হয়। বিশদ নোট সম্বলিত হবার কারণে আজও ইতিহাসবেত্তারা জর্জ সেল এর ‘কোরান’ ব্যবহার করেন। ঐতিহাসিক Michael Cook এর ভাষ্যে, “an old translation which has worn very well.”

অধুনা কুর’আনের বহু অনুবাদ হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজিতে কেবল একটি, উনবিংশ শতকে দুইটি, বিংশ শতাব্দীতে এসে অন্তত ১৬টি অনুবাদ পাওয়া যায়। এর পরেও একজন গড়পড়তা পাশ্চাত্যবাসী ইসলাম সম্পর্কে খুব কমই ধারণা রাখেন, যদিও অভিবাসন, বাণিজ্য, বা পর্যটনের কারণে এখন অহরহই মুসলিম-অমুসলিমের দেখাসাক্ষাৎ হয়। এয়ার ট্র্যাভেল, স্যাটেলাইট টিভি, বা ইন্টারনেটের এই যুগেও পৃথিবীর বিভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠীর মানুষদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও সহানুভূতি গড়ে ওঠেনি।

হয়তো জর্জ সেল এবং অসংখ্য প্রতিকূলতার মাঝে করা তাঁর অনুবাদ কাজটি সবার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। অসংখ্য ভুল ধারণা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য কয়েকশ বছর ধরে ইসলাম ও তার সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করছে। ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির অনুবাদ কাজ সামগ্রিকভাবে ইসলামের ধর্মীয়, সাহিত্যিক, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের স্বাদ আস্বাদন করার প্রচেষ্টারই অংশ।

[এই লেখাটি মূলত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত Alexander Bevilacqua এর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধের ভাবানুবাদ এবং সম্প্রসারণ। বোঝার সুবিধার্থে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং মন্তব্য এতে যোগ করা হয়েছে। মূল লেখাটির লিঙ্ক এখানে।]

http://shankhachilerdana.wordpress.com/

প্রেক্ষিত হিজাবঃ এ কেস স্টাডি ফর দ্য গ্রোথ অব লিবারেল ফ্যনাটিসিজম

1

by Jahid Islam

বাংলাদেশের একটা শ্রেণী নিজেরদেরকে লিবারেল দাবি করে। বাস্তবে এরা ফ্যানাটিক। শুধু ফ্যানাটিক বললে কম বলা হবে। ফ্যনাটিসিজমের ১০ এর স্কেলে এদের স্কোর ৯.৯। এমাজান জঙ্গলের ‘মানুষ আকৃতির’ যেসব প্রাণী অন্য মানুষের মাংস খায় কেবল তারাই এ স্কেলে এদের চেয়ে উপরে আছে।

গড আছে নাকি নাই এটা কিন্তু নতুন কোন বিতর্ক না। এ বিতর্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো। যারা এ তর্ক করেন আমার কাছে তাদেরকে খারাপ লাগে না। তাদের অনেকেই নিজেদের যুক্তি এবং আন্ডারস্ট্যান্ডিং ব্যবহার করে কনভিন্সড হতে চান। এতে দোষের কিছু নাই। বাস্তবে এটাই আদর্শ পদ্ধতি হওয়া উচিত। যারা গডে বিশ্বাস করেন না কিন্তু রেশনালি চিন্তা করার চেষ্টা করেন এবং সে থেকে তাদের এ কনভিকশন আমি তাদেরকে রেসপেক্টও করি। এদের বেশিরভাগই নিজে গড বিশ্বাস করেন না, কিন্ত অন্যের বিশ্বাস এবং আচরণকে শ্রদ্ধা করেন। ‘গড’ বিশ্বাস করেন এমন কারও সাথে আলোচনা বা তর্ক হলে তারা নিজেদের যুক্তি দিয়ে তাদের বিশ্বাসের পেছনে কারণকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন। সমাজের ভিন্ন মতের মানুষের সাথে কোএগজিসটেন্স এ বিশ্বাস করেন। এরা আসলেই লিবারেলিজমে (প্লুরালিজম) বিশ্বাস করেন।

7bbae7bd7f30fc7e74a47780ac8bce0d

আমি যে ফ্যনাটিকদের কথা বলছি তারা অন্যের জীবন থেকে ‘গড ডিলিউশন’ দূর করতে গিয়ে নিজেরাই একটা ধর্মের জন্ম দিয়েছেন। যে ধর্মের প্রধান ডকট্রিন হল সবার জীবন থেকে গডের ধারনা দূর করা এবং সেটা যে কোন মূল্যে। প্রয়োজন হলে জোর করে। বলাই বাহুল্য, আমাদের দেশে তাদের প্রধান টার্গেট হল ইসলাম। বাস্তবে সমাজে যারা বিভিন্ন ধর্মে ধার্মিক হিসেবে পরিচিত এ শ্রেণী এর চেয়েও অনেক ডেডিকেটেডলি তাদের এ “গডলেস ডিলিউশন” ধর্ম পালন করেন। তারা হিজাব পরা বা পরানোকে খুব একটা পজিটিভলি দেখেন না। মনে করেন যে, হিজাব পরলে নারীদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়। এখানে আন্ডারলায়িং এসাম্পশান হল একটা বিরাট অংশকে জোর করে হিজাব পরানো হয়। যারা স্বেচ্ছায় হিজাব পরে তারাও আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর লোক এবং হিজাব পরাই তাদের ইন্টেল্যাকচুয়াল ইনফেরিওরিটির প্রমাণ। তারা কেউ কেউ প্রচার করে বেড়ান যে, আরবের ১৪০০ বছর আগের গরম ‘লু হাওয়া’ থেকে বাঁচার জন্য মহিলারা হিজাব পরত। তাদের এ এসাম্পশান এবং আর্গুমেন্ট ঐতিহাসিক এবং তত্ত্বগত দিক থেকে ভুল। ইতিহাস এবং ধর্ম বিষয়ে সামান্য জ্ঞান থাকলেই এ যুক্তির অসাড়তা বোঝা যায়।

যেহেতু তারা মনে করেন যে অনেককেই জোর করে হিজাব পরানো হয় বা তারা নিজেরা কেবল হিজাব না পরার কারণেই হিজাব ব্যবহারকারীদের চেয়ে ইন্টেল্যাকচুয়ালি সুপিরিয়র, অতএব তাদের অধিকার আছে জোর করে সবার মাথা থেকে হিজাব খুলার।
জোর করে হিজাব পরানোর ঘটনা যে অল্প কিছু ঘটতে পারে সেটা মানছি। এ শ্রেণী কিন্তু তাদেরকে bullying করে না। তাদের ফিল্ড অফ ইন্টারেস্ট হল স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষিত শ্রেণীর মেয়েরা যাদের প্রায় সবাই স্বেচ্ছায়,কনশাসলি হিজাব পরে এবং এটাকে ধর্মীয় অনুশাসন মনে করে। জোর করে কাউকে হিজাব পরানো যদি ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়, জোর করে হিজাব খোলানো বা bullying যে সেটারই মিরর ইমেজ এ বাস্তবতা তাদের স্থূল মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আরও মজার ব্যপার হল, এদের কেউ কেউ টিভি টকশোতে এসে ইসলামকে এ দেশে মাইনরিটির ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে। অথচ এ দেশের বেশির ভাগ লোক যে মুসলিম এ ফ্যাক্ট ক্লাস ৪ এর একটা বাচ্চাও জানে। দেখলে মনে হয় যেন কোন একটা ধর্ম মাইনরিটির ধর্ম হলে সে ধর্মের উপর মেজরিটির রিলিজিয়াস ডকট্রিন চাপিয়ে দেয়া বিশেষ পুণ্যের কাজ। মাইনরিটি হিসেবে মনে করার এ কাজটা যদি আসলেই তারা তাদের কনভিকশন থেকে করে থাকেন সে ক্ষেত্রে অবশ্য এদেরকে মানসিক রোগী হিসেবে ট্রিট করতে হবে।

এদের আরেকটি প্রধান ট্রেড মার্ক হল কিছু দিন পর পর তারা ‘বাঙ্গালী না মুসলমান’ এ অর্থহীন বিতর্ক উসকে দেয়। ভাবটা এমন যে কেবল তাদের কাছেই এর একটি অবজেক্টিভ উত্তর আছে। এ মিনিংলেস বিতর্ক চাঙ্গা করাকেই তারা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির সবচেয়ে বড় উৎকর্ষতা মনে করে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এটা অবশ্য জীবিকা। সে ক্ষেত্রে এটা বোধগম্য। প্রকৃতপক্ষে, অল্প কিছু Schizophrenia আক্রান্ত লোক যারা মাথায় বড় লাল টিপ দেয়া, স্লিভলেস ব্লাউজ পড়া এবং শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারাকেই বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার অন্যতম প্যারামিটার হিসেবে মনে করেন এবং আসমানি গ্রন্থের বয়ানের মত বিশ্বাস সহকারে ’৭১ টিভি’ দেখেন তারা ছাড়া এ শ্রেণীর কার্যকলাপ অন্যদের কাছে মনে হয় অর্থহীন ফ্যনাটিসিজম। এ শ্রেণীর সুডো লিবারেলদের প্রগলভতা অল্প সময়ের সাময়িক উন্মাদনার জন্ম দেয় মাত্র। আদতে এরা লিবারেল আদর্শ প্রতিষ্ঠা ত দূরের কথা, লিবারেলিজম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে।

যে কোন আদর্শের অনুসারিদের মনের খায়েশ থাকতেই পারে যে তাদের অনুসৃত আদর্শ বিজয়ী হবে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের আদর্শ প্রচারের জন্য তাদের প্রথম কাজ হবে তারা যে সমাজে এ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে সমাজের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করা এবং পটেনশিয়াল ফলোয়ারদের মন-মগজ ও রুচির বাস্তবতা অনুধাবন করা। এরপর নিজেদের মডেলকে সে সমাজের বাস্তবতা অনুসারে এডজাস্ট করা। এছাড়া অন্য কিছু করে যারা কেবলি নিজেদের কনভিকশন অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায় (সেটা তাদের কাছে যত শুদ্ধই হোক) তারা সে আদর্শ সম্পর্কে একটা পাবলিক ফোবিয়া তৈরি করে মাত্র। এতে সে আদর্শের ক্ষতি ছাড়া উপকার হয় না। সম্ভবত, বাংলাদেশের এ ‘সুডো লিবারেল’ ফ্যনাটিক শ্রেণী দেশের সমাজ বাস্তবতা জানেন কিন্ত, মানতে চান না। তারা ভিন্ন মতের মানুষকে ইনক্লুশানে না বরং নিত্য নতুন কারণ দেখিয়ে এক্সক্লুশানের মাধ্যমে নিজেরদের এক্সক্লুসিভনেস প্রমাণ করতে চান। যারা নিজেদেরকে লিবারেলিজমের অনুসারি মনে করেন এবং নিজেদের আদর্শ ( liberty and equality, civil rights, freedom of the press, freedom of religion) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা রাখেন তাদের উচিত হবে এগিয়ে এসে এ ফ্যনাটিক শ্রেণীর আদর্শিক এবং মানসিক সু চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

বাঙালি মধ্যবিত্তের মন ও মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ

1

by Alauddin Mohammad

 

বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জের নিম্নবিত্ত মুসলমানরা এখনো ১০০ টাকা আয় করলে পরম ভক্তিভরে ১০ টাকা রেখে দেয় এলাকার মসজিদ ও মাদ্রাসায় দানের জন্য। অনেক অঞ্চলে নতুন ফসল ঘরে তোলার আগেই স্থানীয় মাদ্রাসায় চলে যায় একটা অংশ। আর এভাবেই টিকে আছে দেশের মোট শিক্ষার্থীর প্রতি ৩ জনের ১ জনের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অংশ। আর এই মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেদের দৃষ্টিভঙ্গি আবার খুব একটা সুবিধার নয়।

Madrassa

তাদের অনেকেরই এই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর শুভ্র জোব্বায় ভীষণ ভয়। আর ’৭১ এর একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দোহাই দিয়ে তাঁদের গল্প-উপন্যাস-সিনেমায় মাদ্রাসা শিক্ষিত মোল্লা-মুন্সীদের খলনায়ক বানানোর চিরস্থায়ী প্রকল্প তো চলছেই। ইদানিংকালে আবার যুক্ত হয়েছে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁদের ঠেকানোর জিহাদ। এ অবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নীরব থাকাটাও একটা নাগরিক ব্যাধি।

 

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ কোন মাত্রায় আছে কিংবা আদৌতেই আছে কিনা এখানে সে তর্কে যাব না। তবে বর্তমান সরকারের কর্মপরিধির একটা বিরাট অংশজুড়ে যে রয়েছে ‘জঙ্গিবাদের উত্থান’ ঠেকানো এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের মূলেও যে রয়েছে এই জঙ্গিবাদ ফ্যাক্টর সেটা নিয়ে অবশ্য তর্কের অবকাশ নেই। বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইসলামী জঙ্গিবাদকেই বুঝিয়ে থাকেন। এই ইসলামী জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামী শিক্ষার রয়েছে এক শক্তিশালী সম্পর্ক।

 

উপমহাদেশের মুসলমানদের শিক্ষার সূচিকাগার মাদ্রাসা শিক্ষা এভাবেই জড়িয়ে যায় জঙ্গিবাদের আমলনামায়। মাদ্রাসা শিক্ষা বললেই আমাদের মাথায় ইসলামী শিক্ষার একটা চিত্র ভেসে উঠলেও এই মাদ্রাসা শিক্ষাও কিন্তু একমুখী নয়। শিশুশিক্ষণ মক্তবের বাইরে বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের মাদ্রাসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রথম প্রকারে আছে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত আলীয়া মাদ্রাসা এবং দ্বিতীয় প্রকারে আছে ওয়াহাবী দর্শনের মাদ্রাসা যেটি কওমী নামেই বেশি পরিচিত।

 

ঐতিহাসিকভাবেই এই দুই ধরনের মাদ্রাসা আলাদা আঙ্গিকে গড়া। ব্রিটিশ ভারতে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ সালে প্রথম আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। গোঁড়া থেকেই এই মাদ্রাসার সাথে রয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক। অন্যদিকে কওমী মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা ওয়াহাবী দর্শনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। উপমহাদেশে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের শুরুটাই হয়েছে ওয়াহাবীদের দ্বারা যারা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেওবন্দ দারুল ওলুম মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসার পথিকৃৎ হল শহীদ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর আদর্শ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কংগ্রেসের প্রথম সারির মুসলিম নেতারা দেওবন্দ মাদ্রাসার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং মাদ্রাসার স্কলারগণ শায়খুল হাদিস হোসাইন আহমদ মাদানির নেতৃত্বে পাকিস্তান ধারণার সক্রিয় বিরোধিতাও করেন।

deoband

মাদ্রাসাটি আজো দেওবন্দ অঞ্চলের মুসলিমদের অনুদান বিশেষত এলাকাবাসীর ফসলের একটা অংশের দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোও দেওবন্দের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সরকারবহির্ভূত খাতের সাহায্যেই টিকে আছে।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২০১১ সালের তথ্যমতে, আলিয়া মাদ্রাসার মোট সংখ্যা ৭০০০ এবং তাহমিমা আনামের গার্ডিয়ানে প্রদত্ত তথ্যমতে, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কলা এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকদের শতকরা ৩২ শতাংশই এই আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষালাভ করেছেন।

 

অন্যদিকে দেশে কওমী মাদ্রাসা রয়েছে প্রায় ৬৫০০টি এবং এর মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষের মতো। এই সংখ্যা তাহমিমা আনামসহ বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় পাঠ করছেন ভয়ার্তভাবে! কারণ এই মাদ্রাসা শিক্ষিতরা সমাজের যে তলানি থেকে উঠে আসছেন তাদের বিশ্বাস করা যায় না। যেকোনো সময় এরা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে! অথচ এই তলানিতে যে তলে তলে একটা নূন্যতম শিক্ষার ছোঁয়া পৌঁছে গিয়েছে সেদিকে তাঁহাদের নজর পড়বে না।

 

মসজিদে মাদ্রাসা শিক্ষিত মৌলভীদের পেছনে নামাজ আদায় আর বাবার জানাজার জন্য মহল্লার সবচেয়ে বুজুর্গ মাওলানাটির খোঁজ করা হলেও সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি কোন শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টি নেই। মাদ্রাসা শিক্ষিত দাঁড়ি-টুপিওয়ালাদের কথা মাথায় আসলেই একটা অবজ্ঞার ভঙ্গি ফুটে উঠে তাদের মানস-চরিত্রে। তারা মাদ্রাসাশিক্ষিতদের দেখতেও চান সিনেমা-নাটকে রাজাকার-দেশদ্রোহী কিংবা দুষ্ট চরিত্রের অবয়ব হিসেবে। অথচ প্রকৃত বিচারে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষিতদের সামাজিক অপরাধে সংশ্লিষ্টতার হার সিকি ভাগও নয়। ইদানিংকালে এই মাদ্রাসা শিক্ষিতদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা মধ্যবিত্তের অবজ্ঞা ও উন্নাসিক মনোভাবকে আরো উস্কে দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের কল্পিত প্রতিপক্ষ হিসেবেই দাঁড় করিয়েছে।

 

এ অবস্থায় আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতদের কাছ থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিও একটি রাজনৈতিক দাবি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এর অংশ হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ এই মাদ্রাসার সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।

 

মাদ্রাসা শিক্ষার কিছু কিছু দিক হয়তো বর্তমান বাস্তবতায় সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনেকখানি সত্য। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাটা মূলত ধর্মশিক্ষা কিংবা পরকালীন বিশ্বাসকেন্দ্রিক জীবন চেতনা থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বহুদূরে অবস্থিত। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা টিকেই আছে এক দ্বৈত চেতনার সম্মিলন হিসেবে। এ কথা বলা হয়তো অন্যায় হবে না যে, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ইহলৌকিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ইহলৌকিকতা স্বীকারপূর্বক পরলৌকিক মুক্তির আলোকে প্রতিষ্ঠিত।

 

মাদ্রাসা শিক্ষার এই ইহলৌকিক জায়গাটা নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের পুনর্বিবেচনা সময়ের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতরা যখন নিজেদের একটা ঊর্ধ্বতন স্থানে ভেবে নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের দাবি তোলেন তখন মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ তাদের দাবিকে লেজ কাটা বানরের পরামর্শতুল্যই ভেবে থাকেন। আর এভাবে তারা হয়ে উঠেন একে অপরের প্রতিপক্ষ।

 

এই মুখোমুখি অবস্থানের পরোক্ষ ফল হচ্ছে গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রান্তিকীকরণ। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়ে থাকে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যারা যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ তার জন্যই অবধারিত হওয়ার কথা। কার্যত সে রকম একটা ব্যবস্থাই ঐতিহাসিকভাবে চলে এসেছে। সে ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গই জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছেন। ঢাকার দুই প্রান্ত যাত্রাবাড়ী এবং টঙ্গীকেন্দ্রীক উন্নতমানের আলীয়া ও ক্যাডেট মাদ্রাসার উত্থান মাদ্রাসা ছাত্রদের এ সুযোগকে আরো প্রসারিত করেছে। সে সুবাদে গত দুই দশক ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদ্রাসা ছাত্রদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে এই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের সহাবস্থান দিয়েছে আধুনিক শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের এক সমন্বয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় আসতে শুরু করে গুণগত পরিবর্তন যেখানে একই শ্রেণীকক্ষে ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের চিন্তার সংশ্লেষণ বাড়তে থাকে। এক কথায় মাদ্রাসা শিক্ষিতদের আধুনিক শিক্ষায় স্বাগতম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ওয়ালারা এ পরিবর্তনকে যেন মেনে নিতে পারলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকগণ এক এক করে প্রথম পছন্দের বিভাগগুলোকে মাদ্রাসা ছাত্রদের জন্য অবাঞ্চিত ঘোষণা শুরু করলেন। যে নীতিনির্ধারকেরা মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার ও আধুনিকীকরণে সদা ব্যতিব্যস্ত তাঁরাই মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবাঞ্চিত করলেন। রাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এ দ্বৈত ভূমিকা যেকোন বিচারেই অবৈধ এবং এটি শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে গভীরতর করেছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রান্তিকীকরণ মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণের প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতদের বহু বছর ধরে চলে আসা দাদাগিরিকে ভণ্ডামির পৈতা পরিয়ে দিয়েছে। এমনকি সরকারি ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাতে ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ব্রতচারী কিংবা মানবতাবাদী শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে উচ্চকণ্ঠদের প্রতি মাদ্রাসা শিক্ষকদের অনাস্থা, ঘৃণা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। সে প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসা শিক্ষা কীরূপে আধুনিক হবে ও কতটুকু আধুনিক হওয়া দরকার তার অনুধাবন ও দাবি মাদ্রাসা শিক্ষিতদের মধ্য থেকেই আসতে হবে। অন্যদিকে সংস্কারের দাবিদারদের এটাও মাথায় রাখতে হবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা ‘আধুনিকতা’কে যেভাবে ইহলৌকিকতা অর্থে গ্রহণ করে থাকেন মাদ্রাসা শিক্ষার মূলনীতির সাথে এর কোন তফাৎ আছে কিনা।

 

একদল অসভ্য বর্বর শ্রেণীকে সভ্য করতে হবে এই রকম ‘হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন’ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে তাকানো বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও নীতিনির্ধারকদের এক ধরনের মানসিক হীনমন্যতা। মাদ্রাসা শিক্ষার সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্বীকারপূর্বকই কেবল এই ব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা কালোপযোগীকরণ নিয়ে কথা বলা যায় এবং সেটা আসতে হবে মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকেই। সে পরিবেশ কীভাবে তৈরি করা যায় সেটা নিয়েই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাবনা-চিন্তা করা উচিত।

 

সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিকগণ বাংলাদেশের প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী হওয়ার অবস্থাকে ভয়ানক বলে দাবি করছেন। পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই ভয়ানক কিনা এটা বলা মুশকিল। তবে এ তথ্যকে আমরা একটু অন্যভাবে পাঠ করতে পারি। যেহেতু বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাদ্রাসার চেয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা অধিক সে হিসাবে প্রতি ছয় জন শিক্ষিতের একজন ব্যক্তি অনুদানের মাদ্রাসার উদ্যোগে ন্যূনতম শিক্ষার আলো লাভ করছে। আর সে বিচারে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সামাজিকভাবে মানুষ হিসেবে তুলে ধরায় ও শিক্ষার বিস্তারে এই মাদ্রাসাগুলোর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে যে কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেন্দ্রে উঠে আসার সংগ্রাম।

 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত নীতিনির্ধারকগণ যদি এইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দিতে সক্ষম হন কেবল তখনই তারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাস আশ্রিত শিক্ষাব্যবস্থাটির নৈর্বক্তিক মূল্যায়নে সক্ষম হবেন। আর এ কাজটি করতে পারলে মাদ্রাসা শিক্ষিত এবং মাদ্রাসা শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্য দিকটির প্রতি আকৃষ্ট করা যাবে। তাতে দুইটি ভিন্ন ধারায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে।

 

তখন হয়তো একটি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকেও অধিকতর বিজ্ঞানমুখী এবং আধুনিক করে গড়ে তোলা যাবে। এটা না করে জঙ্গিবাদের ধোঁয়া তুলে স্বল্পকালীন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য যেভাবে একটি প্রান্তিক শ্রেণিকে নির্মূলের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে তা আখেরে রাষ্ট্রের ভিতকেই নাড়িয়ে তুলতে পারে।