চেতনা-পরাবাস্তবতাঃ তুরস্ক বনাম বাংলাদেশ

2

by: Aman Abduhu

গত রবিবার তুরস্কে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে গেলো। সে নির্বাচনে ছদ্ম-ইসলামপন্থী প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের দল এগিয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া এখন বাংলাদেশেও দেখছি; ইসলামপন্থীরা প্রচুর আনন্দ প্রকাশ করছেন।

এই ইসলামপন্থীদের একটা জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝা দরকার। এটা ঠিক যে কঠিন একটা সেক্যুলার পরিবেশে এরদোগান কিছু কাজ করেছেন, যা বৈশিষ্ট্যবিচারে ইসলামী। যেমন, কোন মেয়ে হিজাব করতে চাইলে পারবে, এটা তিনি অনুমোদন করিয়েছেন শেষপর্যন্ত। পাবলিক প্লেসে এলকোহল নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এসব বিষয় তুরস্কের নির্বাচনে কোন ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর ছিলোনা। ঐদেশের মানুষজন এইসব সস্তা ইসলামী জযবায় উত্তেজিত হয়ে এরদোগানকে ভোট দেয়নি। বরং তুরস্কে গেলে মেয়েদের বেশভুষা এবং আরো কিছু দেখে ইসলামপন্থীদের হার্ট এটাক হয়ে যেতে পারে। এখন অলরেডি ফেসবুকে কানে তালা লেগে যায়। আর বাংলাদেশের দৃশ্যমান অবস্থা তুরস্কের মতো হলে তো ইসলাম-রক্ষক ভাইদের চিৎকারে ফেসবুকে কানের পর্দাই ফেটে যেতো।

তুরস্কের মানুষ বাংলাদেশের মানুষজনের মতো হুজুগে না। তারা আমাদের মতো অর্থহীন ইস্যু আর অতীত নিয়ে এতোটা মেতে থাকে না। বরং ইউরোপ আর এশিয়ার মাঝে থাকার অবস্থানগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করে।

এরদোগান আমার প্রিয় একজন নেতা। বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের মাঝে তাকে অন্যতম সফল একজন নেতা মনে করি। অর্জনের দিক থেকে মাহাথিরের চেয়েও বেশি। কারণ দেশী-বিদেশী এতো বেশি ষড়যন্ত্র আর বিরোধীতার মুখোমুখি মাহাথিরকে হতে হয়নি। তুরস্কের কনটেক্সটও মালয়েশিয়ার চেয়ে ভিন্ন এবং অপেক্ষাকৃত কঠিন ছিলো। এরদোগান লোকটা সবচেয়ে বেশি প্রাগমাটিকও।

তবে ভদ্রলোক সম্প্রতি ডিকটেটরদের মতো কাজকর্ম শুরু করেছেন। সাংবাদিকদেরকে জেলে ভরা, টুুইটার ইউটিউব ব্লক করা, বিশাল বিশাল গণজমায়েতের ছবি দিয়ে পাবলিককে ইমপ্রেস করার চেষ্টা, এসব। যদি শেষপর্যন্ত এসব সামলে নিতে পারেন, হয়তো তিনি আরো বেশি উচ্চতায় পৌছে যেতে পারেন। কারণ আলটিমেটলি তিনি তার দেশের জন্য ক্ষতিকার শাসক না। শেখ হাসিনার মতো নেতিবাচক মানুষ না। কিন্তু এভাবে সামলাতে পারার সম্ভাবনা কম। তারচেয়ে বরং তাঁর অবসর নেয়া উচিত। একে পার্টির হায়ারারকিতে যোগ্য মানুষজন আরো আছে।

এইসব কাজকর্ম করার পরও কেন এরদোগানের দল বিজয় পেলো? তুরস্কের নির্বাচন কি বাংলাদেশের মতো? সোমবারের পঞ্চম দফা উপজেলা নির্বাচনে যেভাবে বাংলাদেশে আওয়ামী মাফিয়া লীগের লোকজন কেন্দ্র দখল করছে? বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিচ্ছে, সিল মেরে বাক্স ভরাচ্ছে।?

না। একে পার্টিকে এসব করে নির্বাচনে জিততে হয়নি। এবং ফাঁপা বেলুনভর্তি জযবার উপর ইসলাম মার্কাটি লাগিয়ে দিয়ে ঐদেশে জেতা যায় না, তা তো আগেই বলেছি। বরং এখনো এরদোগানের বিজয়ের কারণ দুইহাজার এগারো সালের জুনে আলজাযিরায় প্রকাশিত একটা রিপোর্টে বুঝা যায়। “ফ্রম স্ট্রিট সেলার টু গ্লোবাল স্টেটসম্যান”।

এরদোগান প্রথম জীবনে বাড়তি উপার্জনের জন্য তার এলাকা কাশিমপাশার রাস্তায় খাবার বিক্রি করতেন। এটাও একটা চিন্তা করার মতো বিষয়। ঐদেশে মৃত বাবা বা স্বামীর দড়ি ধরে মানুষজন রাজনীতিতে আসার সুযোগ তেমন একটা পায় না। নিজের যোগ্যতা দরকার হয়।

সেই রিপোর্টে এরদোগানের শাসন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইস্তাম্বুলের টেক্সি ড্রাইভার মেরাল বলছিলেন “আমার বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায়। আমার জীবনে প্রথমবারের মতো আমি ইন্সুরেন্স পেয়েছি, আমাদের প্রাইম মিনিস্টারকে ধন্যবাদ এর জন্য। আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে আমার পরিবার কোন সমস্যায় পড়বে না। আমার দশ বছর বয়সী মেয়েটা মিষ্টি বেশি খেয়ে খেয়ে দাঁত নষ্ট করে ফেলেছে। আগে হলে তার চিকিৎসার জন্য আমাকে ফতুর হয়ে যেতে হতো। আর এখন আঠারো বছর বয়সের কম সবার চিকিৎসার খরচ দেয় সরকার।”

এরদোগানের ইয়ং বয়সে তাঁর চুল কেটে দিতো যে সেলুন মালিক, তিনি আলজাযিরার রিপোর্টারকে বলেছিলেন “আমি যখন আটানব্বই সালে হজ্ব করতে সউদী আরব যাই তখন এক মিলিয়ন টার্কিশ লিরার নোটও এক্সচেঞ্জ করার জন্য কেউ নিচ্ছিলো না। আর দুইহাজার দশ সালে যখন আবার গেলাম, একশ লিরার নোট দিয়ে আমি দুইশ পঞ্চাশ রিয়াল পেলাম। ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের একটা ভবিষ্যত আছে এখন।”

মানুষ এ পৃথিবীতে খুব বেশি কিছু চায় না। একটু শান্তিতে বাঁচতে চায়। এরদোগানের মতো নেতারা যখন সে প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেন, তখন মানুষ তাদের ভালোবাসে। অথবা উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন ইনষ্টিটিউশন ও ট্রাডিশনের কারণে নেতারা এর বাইরে যেতে পারেন না। আর আমাদের মতো দেশে? রাজনীতিবিদ নেতারা ব্যস্ত আছে একজন আরেকজনের সাথে নোংরা মারামারি আর রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে খাওয়াতে।

আর তাছাড়া, নেতা তো উঠে আসে মানুষদের মধ্য থেকেই। ঐসব দেশের মানুষেরা ব্যস্ত থাকে কাজ করতে, অবসরে নিজের আনন্দ নিতে। ওদের ফেসবুকে গেলে দেখা যায় হয় নিজেরা বেড়াচ্ছে খাচ্ছে। দেশের বড় কোন সামষ্টিক ইস্যু যেমন নির্বাচন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অর্থনৈতিকভাবে বড় কোন ঘটনা, এসব নিয়ে কালেভাদ্রে মাথা ঘামাচ্ছে।

আর আমাদের দেশে আমরা সবাই তালেবর। সবাই দেশপ্রেমে টুইটুম্বুর স্থবির গর্ভবতী। যেদেশে মানুষ আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ভিক্ষা করে, চিকিৎসা পায় না, বিচার পায় না, সেদেশে এখনো আমরা পরে আছি একাত্তর নিয়ে। সম্ভব হলে বিপ্লব করতে ব্রিটিশ আমলেও চলে যাই পারলে, এমন অবস্থা। এখনো আমরা গিনেজ রেকর্ডের মতো ফালতু একটা প্রতিষ্ঠানের পেছনে পুরো দেশ মিলে দৌড়াচ্ছি। অথবা হিমালয়ে উঠার জন্য ধাক্কাধাক্কি করে যাচ্ছি।

ওদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা পত্রিকায় কলাম লেখে জমির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে, বিদেশের সাথে অর্থনৈতিক ঘাটতি নিয়ে, অন্য দেশের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে, রিফিউজিদের সমস্যা নিয়ে। আর আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা মুজিবকে সম্মান দেয়া হয়নাই, জাতীয় সঙ্গীত সবার সেরা, মুক্তিযুদ্ধ না থাকলে দেশ আগাবে না এইসব নিয়ে আবর্জনা লেখাতে ব্যস্ত।

এমন একটা অতীতমুখী দেশের কোন বর্তমান বা ভবিষ্যত কিভাবে থাকবে? আর কিভাবেই বা এইরকম ঊন-মানুষদের মাঝে এরদোগান, মাহাথির বা জিয়ার মতো স্টেটসম্যান জন্ম নেবে?

জিয়াউর রহমান সাহেবের প্রথম প্রেসিডেন্সি প্রসঙ্গে

3

শাফকাত রাব্বী অনীকঃ

অতীত ও ইতিহাস নির্ভরতা কোন জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথে সহায়ক হতে পারেনা। ইতিহাস ও অতীত নিয়ে মারামারি দেশের একটি দল ও তার সমর্থকরা বেশি করলেও, অপর দল ও তার সমর্থকরাও মাঝে মধ্যে খামাখাই যোগ দেন। এই মুহুর্তে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সব চাইতে হট আলোচনার বিষয় হলো বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন।

বিএনপি সাইডের কথা বার্তা শুনে যা বুঝলাম, জিয়াউর রহমান সাহেবকে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ডিক্লেয়ার করার আগে নাকি বেশ কিছু সংবিধান বিশেষজ্ঞর পরামরর্শ নেয়া হয়েছিল। তারা গ্রিন সিগনাল দেবার পরেই এই ঘোষণা লন্ডন থেকে এসেছে। ঘটনা সত্য হলেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।

প্রথম প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এমন বিশেষজ্ঞ কতজন আছেন যারা আওয়ামী কিংবা বিএনপির সর্বোচ্চ নেতাদের মুখের উপর বস্তুনিষ্ঠ অপিনিয়ন দিতে পারেন? যেমন ধরুন, যদি শেখ হাসিনা দেশের শীর্ষ ১০ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞকে ডেকে বলেন, “দেখুনতো আমার আব্বাকে সংবিধানের আলোকে এক্স-ওয়াই-জেড টাইটেল দেয়া যায় কিনা?” আমার ধারণা এই আবদার শোনা মাত্র বিশেষজ্ঞের দল সমস্বরে বলে উঠবেন, ” অবশ্যই যায়, আলবত যায়, যাবে না কেন? বরং আমরাতো লজ্জিত এটা ভেবে যে এই ব্যাপারটি আপনার মতো আমাদের মাথায় এতো দিন এলো না কেন!! আপনি একজন জিনিয়াস, একে বারে বাবার মতোন”।

উপরের বাস্তবতা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে বেশী প্রযোজ্য হলেও, বিএনপির বিশেষজ্ঞরাও কতটা সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ আছে।

এবার আসা যাক বিশেষজ্ঞ মহলের মূল যুক্তির দিকে। যতদূর বুঝেছি, বিশেষজ্ঞদের যুক্তির তিনটি মূল স্তম্ভ রয়েছে। প্রথমত, জিয়াউর রহমান সাহেব তার প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণায় বলেছিলেন যে তিনি নিজের হাতে কমান্ড তুলে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ১৯৭১ সালের মার্চের ২৬ তারিখ থেকে শুরু করে এপ্রিল এর মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে কিংবা প্রবাসে স্থাপিত কোন সরকার ছিল না। সুতরাং, জিয়া সাহেবের প্রথম ঘোষণা অনুযায়ী তিনিই প্রথম সরকার প্রধান। তৃতীয়ত, যেহুতু সরকার প্রধানই কেবল মাত্র যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন, সেহুতু জিয়া সাহেব উপরের প্রথম ও দ্বিতীয় যুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সরকার প্রধান বা প্রেসিডেন্ট হিসেবেই।

উপরের যুক্তিগুলো নিয়ে যুক্তি খন্ডন করার কাজটি ভালো করতে পারবেন উভয় দলের বিশেষজ্ঞরা। আমি লে-ম্যান হিসেবে যুক্তি খন্ডনে যাবো না। জাতীয়তবাদী ভাবধারা ও দল হিসেবে বিএনপির সমর্থক হিসেবে, আমি তর্কের খাতিরে ধরেও নিতে রাজী আছি যে উপরের যুক্তিগুলো সঠিক। কিন্তু তার পরেও বেশ কিছু কথা বলা উচিত, চুপ না থেকে।

আমার মতে, উপরের প্রতিটি যুক্তিগুলোকে বলা যেতে পারে টেকনিকাল, আইনী কিংবা আমলাতান্ত্রিক। জিয়াউর রহমান সাহেবের যে ইমেজ দেশের হাজারো মানুষের মনে এখনও বেঁচে আছে, তা এই সব আমলাতান্ত্রিক কিংবা টেকনিকাল যুক্তিলব্ধ টাইটেল-ফাইটেল এর ধার ধারার কথা না।

জিয়া সাহেব দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন, নাকি প্রথম ফিল্ড মার্শাল ছিলেন, স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক ছিলেন নাকি দ্বিতীয় ঘোষক ছিলেন সেগুলোও টেকনিকাল আলোচনা। এগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন তারা, যারা ইতিহাসকে “ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পিং ডিসিশন” এর মতো কিছু একটা ভাবেন। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে যারা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছেন, কিংবা জীবিত ছিলেন, তাদের চোখে জিয়াউর রহমান হলেন সেই ব্যাক্তি যার যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, রেডিওতে ভেসে আসা ঘোষণা মানুষ নিজের কানে শুনেছে, চোখে দেখেছে। থার্ড আম্পেয়ারের স্ক্রিনে দেখেনি।

২৬ এ মার্চের গণহত্যার রাতে দেশের তৎকালীন শীর্ষ রাজনৈতিক মহলের সবাই যার যার জান হাঁতে নিয়ে, যে যে দিকে পেরেছেন পালিয়েছিলেন। সেই রাত্রে যেই ইয়াং ছেলেটি পুরা দেশের মানুষের মনের কথা, নিজ দায়িত্বে, শুরুতে নিজের নামে, পরবর্তিতে একজন স্বেচ্ছায় ধরা খাওয়া শীর্ষ নেতার নামে রেডিওতে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই ইয়াং ছেলেটি ছিলেন জিয়াউর রহমান। তাকে কি নামে, কি উপাধিতে ডাকা হবে, তা নিয়ে গ্যালারির দর্শকেরা চিল্লা চিল্লি করতে পারে। তাতে জিয়ার ইমেজ বাড়া কিংবা কমার কথা না।

২৬ শে মার্চে জিয়া সাহেবের কিন্তু একটা ব্যক্তিগত স্টোরীও ছিল। তিনি কোন বিপ্লবী-বিবাগী ছিলেন না। তিনি সংসারী ছিলেন। তার ছোট্ট ছেলে ছিল, তার বউ ছিল। ২৬ সে মার্চের সেই রাতে তিনি যখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, “উই রিভোল্ট” তখন তার নিশ্চয়ই ভয় হয়েছিল যে তার সেই সংসার, তার সেই ছোট্ট ছেলেকে আর কোনদিন না দেখার। আপনি জিয়াকে মহান না ভাবতে পারেন, তার নেতৃত্ব না মানতে পারেন, আশা করি যারা সন্তানের জনক তারা অন্তত দেশের জন্যে বাবা হিসেবে জিয়ার মৃত্যু ভয় জয় করতে পারার বিষয়টিকে সাধুবাদ দেবেন। জিয়া একজন বীরের মতো সেই ভয় জয় করেছিলেন, শত্রুর আঘাতের প্রথম রাত্রেই। তিনি ওয়েট এন্ড সি পলিসিও  নিতে পারতেন। তা না নিয়ে, প্রথম রাত্রেই প্রত্যাঘাতের কাজ শুরু করেছিলেন। একারণে বলতে হবে, জিয়া শুধু মাত্র একজন অসাধারণ সাহসী যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রত্যুৎপন্নমতি যোদ্ধা। এটাই ওনার সব চাইতে বড় পরিচয়। উনি কবে জেনেরাল ছিলেন, কবে মেজর ছিলেন, সেগুলো টাইটেল মাত্র।

বিএনপির যেই বিশেষজ্ঞরা তারেক রহমান বা খালেদা জিয়াকে পরামর্শ দেন, তাদের জন্যে একটা ছোট্ট পরামর্শ। আপনারা যদি জিয়া সাহেবকে শেখ মুজিব সাহেবের সাথে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতাতে নামাতেই চান, তাহলে শুধু একটা বিষয়কে হাই লাইট করুন। সেটি হলো, এই ব্যাক্তিদ্বয়ের একজন ছিলেন আঘাতের রাত্রে স্বেচ্ছায় ধরা খাওয়া, আর একজন ছিলেন  যুদ্ধ শুরু করে দেয়া মানুষ। এই ছোট্ট সিম্পল সত্যটি বেশী করে হাইলাইট করুন। এই কাজে আপনাদের কোন টেকনিকাল বা আমলাতান্ত্রিক যুক্তির প্রয়োজন হবে না। শিশু থেকে শুরু করে সংবিধান বিশেষজ্ঞও এক বাক্যে এই কম্পারিজন বুঝতে পারবেন।

জিয়ার মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, হেড কাউন্টে বাংলাদেশের সব চাইতে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ও একজন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডারের আর নতুন কোন টাইটেল লাগার কথা না, আইন কানুণে যাই থাকুক না কেন।

 

 

ফ্যাসীবাদের প্রেরণা -গুরু’র নতুন বাণী

6

আজকের বাংলাদেশে যে আওয়ামী ফ্যাসীবাদ পূর্নশক্তিতে জাকিয়ে বসেছে তার পিছনে মূল প্রেরণা হিসেবে রয়েছে কোনো বিশাল নেতা অথবা নেত্রী নয়, কোনো খ্যাতনামা রাজনীতির তাত্বিক নয়, রয়েছে একজন স্ব-আখ্যায়িত শিশুসাহিত্যিক। ফ্যাসীবাদের মূল নিয়ামক কিন্তু একজন ভয়ংকর কতৃত্ববাদী একনায়ক, একটি সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক দল কিংবা গনদলনে সিদ্ধহস্ত পুলিশবাহিনী নয়। যেকোনো ফ্যাসীবাদের মূলে থাকে একটি কঠোর ও বিশুদ্ধ আইডিওলজী। পৃথিবীতে অনেক দেশেই নানারকম টিনপট ডিক্টেটরশীপ, একপার্টির রাজত্ব দেখা গেছে গত একশ বছরে কিন্তু প্রকৃত ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সাথে এসব হীরক রাজার দেশগুলির মূল পার্থক্য হলো একটি ফ্যাসিস্ট আইডিওলজী। জনগনের গনতান্ত্রিক অধিকারকে সম্পূর্নভাবে নসাৎ করে এবং সেই সাথে জনগনের একটি বড়ো অংশের নি:শর্ত আনুগত্য বজায় রাখতে কেবল বিশাল পুলিশবাহিনী কিংবা বিদেশী সাহায্য যথেষ্ট নয়, এর জন্যে প্রয়োজন হয় একটি কঠোর ও জনপ্রিয় আইডিওলজীর। বাংলাদেশে ২০১৩-১৪ সালে যে নতুন ফ্যাসীবাদের সূচনা হয়েছে তার মূলের রয়েছে একটি আইডিওলজী, সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বর্তমানে এই আইডিওলজীর মূল প্রেরণা-গুরু হলো মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

575468_10151728328535653_444069226_n

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেমন করে বাংলাদেশে ফ্যাসীবাদের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এটি বোঝার জন্যে প্রেরনা গুরুর সর্বশেষ লেখাটিই খুব ভালো উপকরন হতে পারে। এই লেখায় এই নতুন ফ্যাসীবাদের ভিত্তিগুলি পরিষ্কারভাবেই উঠে এসেছে যারা বুঝতে সক্ষম তাদের জন্যে। “স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর” শীর্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবালের এই লেখাটিতে (http://www.priyo.com/2014/03/28/61144.html) অনেক কথাই রয়েছে, তবে আসল বক্তব্য রয়েছে কয়েকটি লাইনেই।

” শুরুতে বলেছিলাম দেশটাকে এগিয়ে নিতে হলে মূল কিছু বিষয়ে সবার একমত হতে হবে, বঙ্গবন্ধু যে এই দেশের স্থপতি সেটি হচ্ছে এরকম একটি বিষয়। এই দেশটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ করে পাওয়া একটি দেশ। তাই মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন নিয়ে এই দেশটি শুরু করা হয়েছিল সেই স্বপ্নকে ভিত্তি করে তার ওপর পুরো দেশটি দাঁড় করানো হবে, এই সত্যটিও সেরকম একটি বিষয়। আমরা আজকাল খুব ঘন ঘন গণতন্ত্র শব্দটি শুনতে পাই, যখনই কেউ এই শব্দটি উচ্চারণ করেন তখনই কিন্তু তাকে বলতে হবে এই গণতন্ত্রটি দাঁড় করা হবে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপরে।

আমরা মুক্তিযদ্ধের ভিত্তি সরিয়ে একটা গণতন্ত্র তৈরি করব, সেই গণতন্ত্র এই দেশটিকে একটা সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করে ফেলবে, সকল ধর্মের সকল বর্ণের সকল মানুষ সেই দেশে সমান অধিকার নিয়ে থাকতে পারবে না সেটা তো হতে পারে না।

কাজেই ধর্ম ব্যবহার করে রাজনীতি করা গণতান্ত্রিক অধিকার বলে দাবি করা হলেও সেটি কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের সাথে খাপ খায় না।” (2014/03/28/)

এই পুরো লেখাটিতে অনেক কথাবার্তার ভীড়ে মূল পয়েন্ট রয়েছে তিনটি। সেই তিনটি পয়েন্ট আলাদা করে বিশ্লেষন প্রয়োজন এটি বুঝতে যে কেমন করে জাফর ইকবাল আজকে আওয়ামী ফ্যাসীবাদের প্রধান প্রেরনাগুরু হয়ে উঠেছেন।

এই লেখায় তিনি বারবার এটা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবার এই ঐক্যমত্যে আসতে হবে যে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্থপতি। একথা ঠিক যে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে হলে সমাজের সদস্য-নেতৃত্ব সবাইকে নুন্যতম কিছু ভিত্তির উপরে কনসেনসাসে পৌছতে হয়। আগেরকার রাজতন্ত্রিক দেশগুলোতে সেই ভিত্তি ছিলো রাজার সার্বভৌম ক্ষমতা। আধুনিক যুগে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ব্যবস্থায় নানারকম নুন্যতম ঐক্যমত দেখা গেছে। যেমন সবার সমান অধিকার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমতা এরকম আরো কিছু। কিন্তু এই সব কিছুর উপরে আধুনিক রাষ্ট্রে যে ঐক্যমত্যে দেশের সকল নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের একত্রিত হতে হয় সেটি হলো আইন ও সংবিধানের শাসন। দেশের মানুষ ও রাজনীতি আইন ও সংবিধানের বিভিন্ন ধারার বিরোধিতা করতে পারে, সেটি নিয়ে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু যতক্ষন আইন ও সংবিধান বলবৎ রয়েছে সেটি মেনে চলবে এবং তা ভংগ করলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে, এটিই হলো আধুনিক দেশশাসনের মূলভিত্তি।

রাষ্ট্রে কোনো একজন ব্যাক্তি অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা চেষ্টা ফ্যাসীবাদ প্রতিষ্ঠারই অন্যতম পদক্ষেপ। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্থপতি কিংবা জাতির পিতা, এটি কোনো ঐতিহাসিক সত্য নয় এটি একটি ঐতিহাসিক মত। শেখ মুজিব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আর্কিটেকচারাল  ব্লুপ্রিন্ট প্রস্তুত করে সেটি জাতিসংঘ থেকে পাশ করিয়ে আনেন নি কিংবা নিজ ঔরস থেকে কোটি কোটি বাংলাদেশীর জন্ম দিয়ে বার্থ সার্টিফিকেট নেন নি।আমাদের বুঝতে হবে যে জাতির পিতা, মহাবীর, দ্বিগ্ধীজয়ী, বিদ্যাসাগর, বিশ্বকবি এই রকম খেতাবগুলি কোন ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত সনদ নয় বরং ইতিহাসে অনেক মানুষ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে দেয়া টাইটেল মাত্র। এই খেতাবগুলির সারবত্তা নিয়ে যেমন ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে তেমনি এগুলির বিরূদ্ধে মতপ্রচারের পূর্ন অধিকারও রয়েছে। কোন দেশের প্রতিষ্ঠায় কে সবচেয়ে বড়ো, কার অবদান ছাড়া রাষ্ট্র জন্মই নিতো না, এই ধরনের মতামতগুলি কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজের মূল ঐক্যমত্যের ভিত্তি হতে পারে না। এই ধরনের ব্যাক্তিকেন্দ্রিক দাবী তোলাও আজকের দিনে হাস্যকর। আজকের পৃথিবী ব্যাক্তি বা বংশ-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে অনেক আগেই উত্তরিত হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পড়লে অধিকাংশ সুস্থির মতের মানুষই এই সিদ্ধান্ত নেবেন যে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যে মানুষটির একক অবদান সবার চেয়ে বেশী তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। তারা এটাও বলবেন যে তার অবদানের ধারে কাছে কেউ নেই। কিন্তু এই ব্যাপক সমর্থন থাকা স্বত্তেও শেষ পর্যন্ত এটি একটি ঐতিহাসিক মত, ঐতিহাসিক সত্য নয়। অবদান, ভূমিকা, এসবই সাবজেক্টিভ ব্যাপার, অবজেক্টিভ নয়। এই ধরনের ব্যাপক প্রচলিত মত সম্পর্কে দ্বিমত করারও অবকাশ রয়েছে এবং যেকোন সভ্য রাষ্ট্রে সেই দ্বিমত করার সুযোগও অবশ্যই থাকতে হবে।

আমেরিকার রাজনীতির ইতিহাসে এ পর্যন্ত ৪৪ জন প্রেসিডেন্ট এর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এবং কার অবদান সবচেয়ে বেশী এ নিয়ে বিতর্ক, র‍্যাংকিং লিস্ট করা এসব ইতিহাসবিদ এবং জনগন সবারই একটি বহু পুরাতন এবং নিয়মিত অভ্যাস। এই বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো লিস্ট বের হয়। এই সব লিস্টে প্রায় অবধারিতভাবেই যে তিন জনের নাম এক, দুই ও তিন এর মধ্যে থাকে তারা হলো প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন, ষোড়শতম আব্রাহাম লিংকন এবং বত্রিশতম ফ্র‍্যাংকলিন রুজেভেল্ট। এদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশীবার শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন আব্রাহাম লিংকন। ১৯৪৮ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত করা বিশেষজ্ঞদের ১৭ টি বিভিন্ন সার্ভেতে লিংকন শ্রেষ্ঠতম বিবেচিত হয়েছেন ১০ বার, দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম ৫ বার এবং তৃতীয় ২ বার। উইকিপিডিয়াতে এই আর্টিকেলটি বিস্তারিত রয়েছে (http://en.wikipedia.org/wiki/Historical_rankings_of_Presidents_of_the_United_States#Scholar_survey_results)। অর্থাৎ আমেরিকার প্রায় আড়াইশত বছরের ইতিহাসে আব্রাহাম লিংকন যে শ্রেষ্ঠতম নেতা কিংবা শ্রেষ্ঠের খুবই কাছাকাছি, এ বিষয়ে ইতিহাসবিদরা মোটামুটি একমত। শুধু ইতিহাসবিদরাই নন, এমনকি আমেরিকার সাধারন ও জনপ্রিয় ইতিহাসে আব্রাহাম লিংকন মোটামুটি প্রায় অতিমানবীয় অনন্য একজন সাধু-দার্শনিক-নেতা হিসেবেই পরিচিত, তার কাছের অবস্থানেও কেউ নেই।

এই যে মহান আব্রাহাম লিংকন, সেই লিংকনকে আমেরিকার দক্ষিন অংশ-যে দক্ষিনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সিভিল ওয়ারে উত্তরের নেতৃত্বে ছিলেন লিংকন- গত দেড়শত বছর ধরে কি ভাবে দেখা হয়? সোজা ভাষায় বলা যায় যে আমেরিকার দক্ষিনের শ্বেতবর্নের রক্ষনশীলেরা -যারা এখনো দক্ষিনের সবচেয়ে বড়ো এবং প্রভাবশালী অংশ- আব্রাহাম লিংকনকে শয়তানের সাক্ষাৎ অবতার হিসেবে মনে করে। এই মতামত শুধু দক্ষিনের সাধারন নাগরিকেরা নয়, দক্ষিনের রাজনীতিবিদরাও অকপটে প্রকাশ্যে বলতে কোনো দ্বিধা করে না। আমেরিকার রক্ষনশীলেরা এবং অন্যান্য অনেকেই প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন বই-গবেষনা প্রকাশ করে যেখানে তুলে ধরা হয় যে আব্রাহাম লিংকন কিভাবে একটি অনাবশ্যক যুদ্ধের সূত্রপাত করে আমেরিকার জনগনের উপরে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক অধ্যায়কে চাপিয়ে দিয়েছেন। এসব আমার মতামত নয় বরং অনেক আমেরিকান রক্ষনশীলের মত। তারা লিংকনকে ঘৃনা করার পেছনে যুক্তি হিসেবে কি বলে তা বোঝার জন্যে ২০১০ এ প্রকাশিত Abraham Lincoln: The Southern View (http://www.amazon.com/Abraham-Lincoln-The-Southern-View/dp/0982770006) বইটির সারসংক্ষেপের কয়েকটি লাইন তুলে ধরা যেতে পারে।

লেখক Lochlainn Seabrook এই বইটিতে দক্ষিনের চোখে যে লিংকনকে তুলে ধরেছেন সেই লিংকন একজন – “an unscrupulous demagogue and anti-Christian liberal who broke hundreds of laws; ignored and even subverted the Constitution; used money from the Yankee slave trade to fund his war; sanctioned the murder of both Southern blacks (who would not enlist in the Union army) and harmless Southern noncombatants (including women and children); had tens of thousands of innocent Northerners arrested, imprisoned, and sometimes tortured and executed without charge or trial; rigged the 1860 and 1864 elections; confiscated and destroyed private property; censored governmental debate over secession; and more. Throughout all of this, Southern historians estimate that some 3 million Americans, of all races, died in direct consequence of his actions.”

বলাই বাহুল্য লিংকনের শ্রেষ্ঠত্ব অথবা লিংকনের নিকৃষ্টতা, এই সবই ইতিহাসের ফ্যাক্ট নয় এগুলি ইতিহাসের মতামত। আর মতামত নিয়ে বিভাজন থাকতেই পারে।

এখন প্রশ্ন হলো যে আব্রাহাম লিংকন এর নেতৃত্ব ও তার উত্তরাধিকার নিয়ে আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিনের এর তীব্র বিভাজনের জন্যে কি আমেরিকার রাজনীতির ক্রমাগত বিবর্তন ও উন্নয়ন থেমে রয়েছে? কোনো ভাবেই নয়, এই বিভাজনকে নিয়েই আমেরিকার গনতন্ত্র দিনে দিনে আরো বিস্তৃত ও সংহত হয়েছে। সিভিল ওয়ারে বিজয়ের পরে বিজয়ী উত্তর দক্ষিনকে এই আদেশ করে নি যে সবাইকে লিংকনের নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌছতে হবে। প্রতিটি মানুষ ও রাজনৈতিক সংগঠনের রয়েছে নিজস্ব মত ধারন ও প্রচারের অধিকার। কিন্তু সবাইকে দেশের আইন ও সংবিধান মেনে চলতে হবে। আমেরিকার দক্ষিন যুদ্ধে পরাজয়ের পরে মৌলিক নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে প্রদেশের উপরে ফেডারেল ইউনিয়নের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছে, সেটি মন থেকে মেনে নিয়েছে নাকি তার বিরুদ্ধে এখনো প্রচার করছে এটি দেশের সরকারের কোনো বিবেচনার বিষয় নয়, দেশের আইন মেনে চলছে কিনা এটিই সরকারের একমাত্র বিবেচ্য।

শুধু লিংকনই নয়, আজকের আমেরিকায় যদি কেউ বলে যে আমেরিকায় রাজনীতি করতে হলে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা ও প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের শ্রেষ্ঠ ভূমিকা স্বীকার করতে হবে, তবে তাকে মানুষ পাগলের চেয়েও যুক্তিবিহীন বলে মনে করবে। আর সেই দেশে দীর্ঘদিন থেকে, সেই দেশ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ সেজে মুহম্মদ জাফর ইকবাল ফতোয়া দেন যে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে ‘ বঙ্গবন্ধু এই দেশের স্থপতি ‘ এই বিষয়ে সবার একমত হতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি আলোচনায় আমেরিকা-বৃটেন এর তুলনা আনলেই অনেকে হারে রে করে তেড়ে ওঠেন যে এই দেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির সাথে ঐসব দেশের যোজন যোজন পার্থক্য সুতরাং এই ধরনের তুলনার মাধ্যমে কোনো ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা অনর্থক বাতুলতা মাত্র। ঠিক আছে। তাহলে এবার এমন একটি দেশের ইতিহাস-রাজনীতিই দেখা যাক যেটি মাত্র ৬০ বছর আগেও অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আমাদের দেশের অবস্থানের খুব কাছেই ছিলো।

পার্ক চুং হি (Park Chung-hee) একজন জেনারেল যিনি একটি ক্যু এর মাধ্যমে ১৯৬১ সালে দ: কোরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এবং এর পরে প্রায় একনায়কের মতোই ১৮ বছর দ: কোরিয়া শাসন করেন, যে শাসনের অবসান ঘটে ১৯৭৯ সালে আততায়ীর হাতে পার্ক নিহত হবার পরেই। পার্ক চুং হি তার শাসনামলেই আধুনিক কোরিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করেন এবং তাকে একারনেই বিশ্বজুড়ে Father of Korean Economic Miracle বলা হয়। টাইম ম্যাগাজিন তাদের মিলেনিয়াম প্রকাশনায় পার্ক চুং হি কে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ দশজন এশিয়ানদের একজন হিসেবে নির্বাচন করেছিলো। আজ পর্যন্ত দ: কোরিয়ার ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থকেরা পার্ককে তীব্র ভক্তির সাথে স্মরন করে। অনেকটা তার স্মৃতির উপরে ভর করেই পার্কের কন্যা পার্ক গুন হেই (Park Geun-hye) ২০১৩ সালে দ: কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

পার্ক চুং হি যেমন একদিকে দেশের বিপুল অংশের কাছে দেবতুল্য ভক্তির ধারক তেমনি আরেক বৃহৎ অংশের কাছে তীব্র ঘৃনার পাত্র। পার্ক তার শাসনের সময়ে বামপন্থী ও গনতান্ত্রিক রাজনীতি ও কর্মীদের উপরে চরম অত্যাচার ও নিষ্পেষন চালিয়েছেন। দেশের শ্রমিকদের অধিকারকে দলন করে বড়ো কোম্পানীগুলিকে সবরকমের সুবিধা দিয়েছেন। তার সময়ে কোরিয়ার নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার বলতে কিছু ছিলো না। কোরিয়ার জনগনের পার্কের সময় হতে শুরু করে আরো অনেক দিন পর পর্যন্ত একের পর এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করে অবশেষে সেখানে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এরকম আরো অনেক কারনেই দ: কোরিয়ার বিপুল অংশের কাছে পার্ক চুং হি একটি ঘৃন্য নাম।

দ: কোরিয়ার জনগনের মধ্যে তাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রধানতম ব্যাক্তিত্ব নিয়ে যে এই বিশাল দ্বিভাজন, তার কারনে কি তাদের উন্নতি, প্রগতি বাধাগ্রস্থ হয়েছে? ১৯৭০ সালেও যখন দ: কোরিয়া আর উত্তর কোরিয়ার মাথাপিছু আয় একই সমান ছিলো সেখানে আজকে দ: কোরিয়ার মাথাপিছু আয় বাকশালী-ঐক্যমত্যের দেশ উ: কোরিয়ার চেয়ে প্রায় বিশগুন বেশী।

বস্তুত ইতিহাস নিয়ে ঐক্যমত্য ছাড়া এগুনো যাবে না এই ধরনের কথাবার্তার কোন সারবত্তা নেই। তৃতীয় বিশ্বের উপনিবেশ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দেশগুলির ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা করলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে যে যেসব দেশে মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্বল ইতিহাস নেই, যারা ঔপনিবেশিক প্রভুদের সাথে হ্যান্ডশেক করার মাধ্যমে নতুন দেশ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে, তারাই অর্থনীতি ও সমাজে বেশী উন্নতি করেছে। দেশের উন্নতির জন্যে ইতিহাস বা মতবাদ নিয়ে একমত হবার জন্যে যারা বেশী সরব তাদের অন্য কোন এজেন্ডা থাকে। এই এজেন্ডা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হলো দেশে ঘৃনার চাষ করে দ্বিভাজন সৃষ্টি করা। আর আমরা বার বার দেখেছি যে এই ঘৃনার দ্বিভাজন ও কৃত্রিমভাবে মতবাদের ঐক্যমত্যের চেষ্টাই গত কয়েক দশকে একের পর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও গনহত্যার জন্ম দিয়েছে।
এই ইতিহাস নিয়ে ঐক্যমত্যের উপরেই রয়েছে জাফর ইকবালের দ্বিতীয় ও মূল পয়েন্ট, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। জাফর ইকবাল বাংলাদেশে যেই ফ্যাসীবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রাণাতিপাত করে চলেছেন সেই ফ্যাসীবাদের মূল ভিত্তিই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা (বা স্বপ্ন, যে নামেই বলুন জিনিষটি একই)। এই লেখাতে এবং এর আগেও তিনি স্পষ্ট করেছেন যে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের চেয়ে বড়ো কিছুই নেই।

“তাই যারা প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করে এই দেশটা এনে দিয়েছে তার যে স্বপ্ন দেখেছিল সেটাই হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই এই দেশের রাজনীতি হোক, অর্থনীতি হোক, লেখাপড়া হোক, চাষ আবাদ হোক, গানবাজনা হোক, সুখ-দুঃখ মান-অভিমান হোক, কোনো কিছুই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাইরে হতে পারবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রথম মাপকাঠি হচ্ছে ‍মুক্তিযুদ্ধ। যারা এটিকে অস্বীকার করে তাদের এই দেশে রাজনীতি করা দূরে থাকুক, এই দেশের মাটিতে রাখার অধিকার নেই।” (০১/১৭/২০১৪)
http://www.priyo.com/2014/01/17/49312.html

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাইরে এই বাংলাদেশে একটি গাছের পাতাও নড়তে পারবে না এই বিশ্বাস হলো জাফর ইকবাল আর তার লক্ষ লক্ষ ভাবশিষ্যের ইমানের মূল স্তম্ভ।  কিন্তু এখানে শুভংকরের সবচেয়ে বড়ো ফাকি হলো যে এই যে অতীব গুরুত্বপূর্ন মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, সেই স্বপ্নটি আসলে কি তার কোনো কংক্রীট বিবরন এই সব ফ্যাসিস্ট প্রফেটদের কাছে আপনি কখোনই পাবেন না। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে এই দেশের বিভিন্ন মত, বিভিন্ন বিশ্বাসের লক্ষ কোটি যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী আর যুদ্ধ পলাতক মিলে কিভাবে একটিই বিশুদ্ধ আর মৌলিক স্বপ্ন দেখে ফেললো আর সেই স্বপ্নের খাবনামাও সেই সকলের কাছেও তর্কাতীত ছিলো, এই রহস্যের কোন ব্যাখা আপনি পাবেন না। ম্যাজিশিয়ানের ট্রিকের মতো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নও দূর থেকে দেখা আলো আধারির স্টেজ শো, কাছে গিয়ে বিশ্লেষন করলেই সেটা আর স্বপ্ন থাকে না।

বেশী চেপে ধরলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের দিশারীরা অবলম্বন করেন ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতিকে এবং তার ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তাসের ঘর নির্মানের চেষ্টা করেন তারা। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মৌলিক উপাদানেই তৈরী মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নের ভিত্তির উপরেই বাংলাদেশের রাজনীতি দাড় করাতে হবে এটাই শেষ পর্যন্ত দাবী করা হয়। এই দাবীটি যখন স্পষ্টভাবে বলা হয় তখনই এর শুভংকরের ফাকিটিও সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে এখানে বেশী কথা বলার দরকার নেই। জাতীয়তাবাদ নিয়ে এই দেশে এত লক্ষ লক্ষ পাতা আর শতকোটি শব্দ ব্যয় করার পরও জাতীয়তাবাদ নিয়ে সবার মাঝে যে কনফিউশন রয়ে গেছে তার বিন্দুমাত্র লাঘব ঘটে নি। ভৌগলিক, রাজনৈতিক, সাংষ্কৃতিক, নৃতাত্বিক, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের এই নানারূপের গোলোকধাধায় কোন একটি coherent মতবাদ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই দাবী অনায়াসেই করা যায় যে বাংলাদেশে এখন এমন দুইজন শিক্ষিত নাগরিক পাওয়া যাবে না যারা জাতীয়তাবাদ বলতে পুরো একই রকম একটি বিশ্বাস ধারন করেন।

এরপরেই আসে মুক্তিযু্দ্ধের স্বপ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট Achilles Heel সমাজতন্ত্রের কথা। লক্ষ্যনীয় যে এই সমাজতন্ত্র মানে পরবর্তীতে আরোপ করা সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক মুক্তি,  সোশ্যাল ডেমোক্র‍্যাসী এই ধরনের নির্দোষ, নিরীহ শ্লোগান নয়। ১৯৭২ এর সমাজতন্ত্র মানে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা। সেই সংবিধানেই স্পষ্ট বলা আছে,

“১০/ মানুষের উপর মানুষের শোষন হইতে মুক্ত ন্যায়নুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশিত করিবার উদ্দ্যেশ্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।”

এই সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আরো বিশদ বলা হয়েছে ১৩ অনুচ্ছেদে।

Somaj

সমাজতন্ত্র নিয়ে বিশদ আলোচনা করাও এই লেখার উদ্দ্যেশ্য নয়। শুধু একটি কথাই বলা যেতে পারে যে আজকের বাংলাদেশে কতোজন লোক মনে করে যে এই দেশের অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্র গুলি, যেমন শিল্প, গার্মেন্টস এই সবের জাতীয়করন করা প্রয়োজন? কারা মনে করে দেশের জন্যে দরকার আরো অনেক ‘দোয়েল ল্যাপটপ’ প্রজেক্ট? কয়জন মনে করে যে সমবায়ের ভিত্তিতে কৃষিকে পরিচালনা করতে হবে? কারা বিশ্বাস করে যে সারা দুনিয়ায় কালেক্টিভ অর্থনীতি ফেল মারার পরে এই বাংলাদেশেই সমাজতন্ত্র তার সমুজ্বল ভবিষৎ নির্মানের সূচনা করবে? সমাজতন্ত্র যদি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন হয়ে থাকে তবে সেই স্বপ্ন এইদেশে অনেক আগেই টুটে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের নামে যেই মতবাদটির যাবতীয় তর্ক-বিতর্কের মূলে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা একটি আধুনিক, গনতান্ত্রিক, যুক্তিসম্মত আদর্শ। যে কোন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যাক্তিই এর বিরোধিতা করতে দ্বিধা করবে। ১৯৭২ এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝানো হয়েছে,

dhormo

এখানে (ক), (খ) এবং (ঘ) অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই বললেই চলে। এমনকি যারা ধর্মীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন তারাও এই নীতিগুলির সরাসরি বিরোধিতা করবেন না বরং সমর্থনই করবেন। মূল বিতর্ক (গ) অনুচ্ছেদ নিয়ে। পৃথিবীর কোনো গনতান্ত্রিক দেশে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে রাজনীতি করার অধিকার খর্ব করা হয় নি। প্রতিটি গনতান্ত্রিক দেশে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে রাজনীতির অধিকার রয়েছে কারন এটি রাজনীতি করার মৌলিক অধিকার প্রশ্নেই অংগাগীভাবে জড়িত। কিন্তু এই বাংলাদেশেই, এই মূর্খ ফ্যাসীবাদীরা, এক অনন্য হবুচন্দ্র মার্কা রাজত্ব কায়েমের জন্যে এই ফ্যাসীবাদী মতকে দেশের উপরে চাপিয়ে দেবার জন্যে বদ্ধপরিকর।

ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে এই ক্ষুদ্র, এলিটিস্ট গোষ্ঠী যে ফ্যাসীবাদী মতকে দেশের উপরে চাপিয়ে দিতে চান তার সাথে বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কোন আত্মিক সংযোগ নেই। এটা ১৯৭১ এ ছিলো না, ১৯৭২ এও ছিলো না, আজকে আরো নেই। এই প্রসংগে আবুল মনসুর আহমেদ এর সেই ক্ল্যাসিক লেখা “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” এর লেখা স্মর্তব্য,

অথচ প্রকৃত অবস্থাটা এই যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাংগে নাই “দ্বিজাতিতত্ত্ব”ও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর-প্রস্তাব মত দুই পাকিস্তান হইয়াছে। ভারত সরকার লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নে আমাদের সাহায্য করিয়াছেন। তারা আমাদের কৃতজ্ঞতার পাত্র। দুই রাষ্ট্রের নামই পাকিস্তান হয় নাই, তাতেও বিভ্রান্তির কারণ নাই। লাহোর প্রস্তাবে “পাকিস্তান” শব্দটার উল্লেখ নাই, শুধু ‘মুসলিম-মেজরিটি রাষ্ট্রের’ উল্লেখ আছে। তার মানে রাষ্ট্র-নাম পরে জনগণের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়ার কথা। পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্র-নাম রাখিয়াছে “পাকিস্তান”। আমরা পূরবীরা রাখিয়াছি “বাংলাদেশ”। এতে বিভ্রান্তির কোনও কারণ নাই।

—         ইংরেজ আমলের আগের চারশ বছরের বাংলার মুসলমানের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। সেখানেও তাদের রুপ বাংগালী রুপ। সে রুপেই তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সৃষ্টি করিয়াছে। সেই রুপেই বাংলার স্বাধীনতার জন্য দিল্লীর মুসলিম সম্রাটের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছে। সেই রুপেই বাংলার বার ভূঁইয়া স্বাধীন বাংলা যুক্তরাষ্ট্র গঠণ করিয়াছিলেন। এই যুগ বাংলার মুসলমানদের রাষ্ট্রিক, ভাষিক, কৃষ্টিক ও সামরিক মণীষা ও বীরত্বের যুগ। সে যুগের সাধনা মুসলিম নেতৃত্বে হইলেও সেটা ছিল ছিল উদার অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু-বৌদ্ধরাও ছিল তাতে অংশীদার। এ যুগকে পরাধীন বাংলার রুপ দিবার উদ্দেশ্যে “হাজার বছর পরে আজ বাংলা স্বাধীন হইয়াছে” বলিয়া যতই গান গাওয়া ও স্লোগান দেওয়া হউক, তাতে বাংলাদেশের জনগণকে ভুলান যাইবে না। আর্য্য জাতির ভারত দখলকে বিদেশী শাসন বলা চলিবে না, তাদের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, রাজপুত, কায়স্থকে বিদেশী বলা যাইবে না, শুধু শেখ-সৈয়দ-মোগল-পাঠানদেরই বিদেশী বলিতে হইবে, এহেন প্রচারের দালালরা পাঞ্জাবী দালালদের চেযে বেশী সফল হইবে না। এটা আজ রাষ্ট্র-বিজ্ঞানের সর্বজন-স্বীকৃত সত্য যে, কৃষ্টিক স্বকীয়তাই রাষ্ট্রীয় জাতীয় স্বকীয়তার বুনিয়াদ। কাজেই নয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের কৃষ্টিক স্বকীয়তার স্বীকৃতি উপমহাদেশের তিন জাতি-রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা-ভিত্তিক স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হইবে॥”

– আবুল মনসুর আহমদ / আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর ॥ [খোশরোজ কিতাব মহল – ডিসেম্বর, ১৯৯৯ । পৃ: ৬৩২-৬৩৮]

আসলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের নামে জাফর ইকবাল এবং তার শিষ্যদের সকল আহাজারির মূলেই রয়েছে একটি জিনিষ, সেটি হলো গনতন্ত্র। তারা ভালোভাবেই জানে যে তারা যে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন দেখেন সেই স্বপ্ন বাংলার জনগন ১৯৭১ এ দেখেনি আজও দেখে না। এই কারনেই গনতন্ত্রকে তাদের এতো ভয়। একারনেই নানারকম ছলছুতো, শর্ত দিয়ে গনতন্ত্রকে পর্দার আড়ালে ফেলতে তাদের এতো প্রচেষ্টা। জাফর ইকবাল যে গোষ্ঠীর প্রেরণাগুরু, মন্ত্রী-এশিয়াটিক ডিরেক্টর আসাদ্দুজ্জান নূর যেই গোষ্ঠীর যোগানদার, শামীম ওসমান-তাহের গং যে গোষ্ঠীর সিপাহসালার এবং শাহবাগীরা যেই গোষ্ঠীর ফুট সোলজার, সেই গোষ্ঠীর একটিই লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে আওয়ামী ধর্মের একছত্র রাজত্ব কায়েম করা।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে তারা দেশের জনগনকে সরাসরি বাধ্যতামূলক প্রেসক্রিপশনও দিয়ে রেখেছেন। প্রথমেই আপনাকে শেখ মুজিবের নবুয়ত স্বীকার করতে হবে। এরপরে আওয়ামী আদর্শগুলিতে ইমান আনতে হবে। তারপরে সকল আওয়ামী বিরোধীকে ঘৃনাভরে বর্জন করতে হবে। এই প্রেসক্রিপশন মেনে নেয়ার পরেই আপনি যত ইচ্ছা রাজনীতি করতে পারেন। এর আগে রাজনীতি-গনতন্ত্র এসব কোনকিছুই বিবেচনা করা যাবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সময়ে সবচেয়ে বড়ো বাস্তবতা যে দেশের ভাগ্য জনগনের হাতে নেই। একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বার্ষিক ১৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থনীতির একটি আস্ত রাষ্ট্রকে কুক্ষীগত করে ফেলেছে। এই বাস্তবতা হতে চোখ ফিরিয়ে, জনগনের অক্ষমতাকে ভুলিয়ে দিতে ফ্যাসীবাদের প্রেরনাগুরু গনতন্ত্রকে তুচ্ছ করে একের পর এক ঐশীবাণী দিয়েই যাবেন প্রতিটি মাসে একের পর এক উপলক্ষকে আশ্রয় করে। আর সেই বাণী সোৎসাহে প্রচার করতে থাকবে চেতনায় বুদ হয়ে থাকা বাংলাদেশী হিটলার ইয়ুথ (Hitlerjugend)। স্টেডিয়ামে পতাকা নিষেধাজ্ঞা, বৃহত্তম পতাকা, লক্ষকন্ঠে জাতীয় সংগীত, এইসব Fascist Mass Spectacle এই প্রোগ্রামেরই অংশ।

18w91xufbk7ayjpg

পরিশেষে পুনরায় আবার মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বা চেতনা নিয়ে অতুলনীয় আবুল মনসুর আহমেদ এর ই আরেকটি বক্তব্য।

 “… জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার মহান আদর্শই আমাদের বীর জনগণকে মুক্তি-সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। তথ্য হিসাবে কথাটা ঠিক না। আওয়ামী লীগের ছয়-দফা বা সর্বদলীয় ছাত্র একশন কমিটির এগার-দফার দাবিতেই আমাদের মুক্তি-সংগ্রাম শুরু হয়। এইসব দফার কোনটিতেই ঐ সব আদর্শের উল্লেখ ছিল না। ঐ দুইটি ‘দফা’ ছাড়া আওয়ামী লীগের একটি মেনিফেস্টো ছিল। তাতেও ওসব আদর্শের উল্লেখ নাই।

বরঞ্চ ঐ মেনিফেস্টোতে ‘ব্যাংক-ইনশিওরেন্স, পাট ব্যবসা ও ভারি শিল্পকে’ জাতীয়করণের দাবি ছিল। ঐ ‘দফা’ মেনিফেস্টো লইয়াই আওয়ামী লীগ ৭০ সালের নির্বাচন লড়িয়াছিল এবং জিতিয়াছিল। এরপর মুক্তি সংগ্রামের আগে বা সময়ে জনগণ, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের পক্ষ হইতে আর কোনও ‘দফা’ বা মেনিফেস্টো বাহির করার দরকার বা অবসর ছিল না। আমাদের সংবিধান রচয়িতারা নিজেরা ঐ মহান আদর্শকে সংবিধানযুক্ত করিযাছিলেন। তাই জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঐ ভুল তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।

রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের মতাদর্শকে জনগণের মত বা ইচ্ছা বলিয়া চালাইয়াছেন বহু বার বহু দেশে। সবসময়েই যে তার খারাপ হইয়াছে, তাও নয়। আবার সব সময়ে তা ভালও হয় নাই। পাকিস্তানের সংবিধানের বেলায় ‘ইসলাম’ ও বাংলাদেশের সংবিধানের বেলায় ‘সমাজতন্ত্র, জাতীয়তা ও ধর্ম-নিরপেক্ষতা’ও তেমনি অনাবশ্যকভাবে উল্লিখিত হইয়া আমাদের অনিষ্ট করিয়াছে। আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বহু জটিলতার সৃষ্টি করিয়াছে। এসব জটিলতার গিরো খুলিতে আমাদের রাষ্ট্র-নায়কদের অনেক বেগ পাইতে হইবে॥”

– আবুল মনসুর আহমদ / আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর ॥ [খোশরোজ কিতাব মহল – ডিসেম্বর, ১৯৯৯ । পৃ: ৬২০-৬২১]

[আবুল মনসুর আহমেদ এর book excerpts are courtesy of FB blogger Kai Kaus   https://www.facebook.com/kay.kavus?fref=ts    ]

 

 

 

 

বাঙালীয়ানা যাচাই ফিল্টার

2

 by: Aman Abduhu

দেশপ্রেম দিয়ে গিনেজ রেকর্ড করার বালখিল্যতা নিয়ে লিখেছিলাম। আমার বক্তব্য ছিলো, কোন ব্যাতিক্রমী মানুষ বা প্রতিষ্ঠান সাধারণত এইসব রেকর্ড করে পরিচিতি বাড়ায়। কিন্তু কোন রাষ্ট্র এর পেছনে দৌড়াচ্ছে, পুরো দেশের মানুষ মিলে বানর নাচ নেচে যাচ্ছে, এমনটা অভূতপূর্ব।

ফেসবুকের সে লেখাতে একজন দেশপ্রেমিক বাঙালী এসে আলগোছে মন্তব্য করেছেন “আপনি বাংলায় স্ট্যাটাস দিয়েছেন। বাঙ্গালী বলে মনে হয়। আসলে কি তাই?”

এমনিতে মনে হয় প্রশ্নটা খুবই নীরিহ। নরম সুরে কোমলভাবে উত্থাপন করা ভয়ংকর এ প্রশ্নটা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন মাতৃজঠরে থেকে সম্প্রতি ভুমিষ্ঠ হওয়া বাঙালী-চেতনাধর্মের ফ্যাসিবাদী দাঁতালো চেহারা আবারও বের হয়ে এসেছে। ঐ ধর্মাবলম্বী ভদ্রলোকটি আমাকে হাতের নাগালে পাচ্ছেন না বলে অন্তর্জালে চমৎকার এ নিরীহদর্শন প্রশ্নটি করেছেন। সামনে পেলে এবং তার ক্ষমতা থাকলে প্রশ্নের ধরণ হতো অন্যরকম।

1964867_233278453532679_896769875_n

আমি নিজে সাধারণ একজন নাগরিক, এবং হাজার হাজার ফেসবুকারের একজন। কিন্তু যখন কোন উল্লেখযোগ্য মানুষ এসে সে চেতনায় আঘাত করে বসেন, এ প্রশ্নটা আর হালকা কোন প্রশ্ন হয়ে থাকেনা। তখন ফ্যাসিজম তার আসল চেহারা দেখায়। তখন গুম হয়ে যেতে হয়, গালিগালাজ ও অপমানের তোপের মুখে পড়তে হয়, অথবা মাহমুদুর রহমানের মতো জেলখানায় পঁচতে হয়। এমনকি মিনা ফারাহ’র মতো নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। কারণ ফ্যাসিজম কখনো ইনক্লুসিভ হয়না। ঐ পথে হাটা এদের এ বাঙালী ধর্মও হয়নি। কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করলে তাকে সমাজচ্যুত করা এ ধর্মের বৈশিষ্ট্য। এবং ভদ্রলোক তার সহফেসবুকার আমাকে সমাজচ্যুত করার সে তাড়না থেকেই তার নিরীহদর্শন প্রশ্নটি করে বসেছেন।

বড় কথা হলো, প্রশ্নটি দেখে আমি দু’জন মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেছি। হিটলার এবং মুসোলিনী। এ দুই ফ্যাসিষ্ট ডিক্টেটর ইতিহাসে এমন সব কাজ করে গেছেন, শেখ হাসিনার মতো নব্য ফ্যাসিষ্ট ও তার শাহবাগি অনুসারীদের কাজের বিশ্লেষণ করতে গেলে উদাহরণ খুঁজে পেতে সমস্যা হয়না। বুঝতে কষ্ট হয়না।

বাঙালীয়ানা থাকা না থাকার প্রশ্ন উত্থাপনে মনে পড়লো দুইটা আইনের কথা; দুটাই ছিলো জাতীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট অধিকার থাকা না থাকা সংক্রান্ত। ১৯৩৫ সালে জার্মানিতে হিটলার বাস্তবায়ন করেন ন্যুরেমবার্গ রেইস ল, এবং ১৯৩৮ সালে ইটালিতে তার শিষ্য মুসোলিনি বাস্তবায়ন করেন মেনিফেস্টো অভ রেইস। এ দুই আইনের মূলকথা ছিলো, খাটি আর্য/আরিয়ান জাত ছাড়া অন্য কেউ জার্মানি এবং ইটালির পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক না। এবং ইহুদিরা কোন নাগরিকই না।

আলেক্সান্ডার ডি গ্রান্ড তার ‘জুইশ ইন ইটালি আন্ডার ফ্যাসিস্ট এন্ড নাজি রুল’ বইয়ে ইটালির ঘটনাগুলো বিস্তারিত লিখেছেন। আমাদের জাফর ইকবালের মতো তাদেরও সেসময় তাত্ত্বিক পন্ডিতেরও অভাব ছিলো না। এইসব জ্ঞানীগুণীরা তখনও শিশুর মতো সরল মন নিয়ে সাদাসিধে ভাবে ফ্যাসিজমের সেবা করে গিয়েছেন, বিভেদ-বৃক্ষের গোড়াতে আপনমনে পানির সেচ দিয়ে গেছেন।

ড. গুইডো লন্ড্রা নামে এক এনথ্রোপলজিস্ট বিজ্ঞানী গবেষণা করে তখন এক বৈজ্ঞানিক নীতিমালা প্রণয়ন করেন। ইটালির সে চেতনা ফিল্টারের নাম ছিলো ‘মেনিফেষ্টো অভ রেইসাল সায়েন্টিস্টস’, খাঁটি আর্যরা সে ফিল্টারের ভেতরে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে নাগরিক হয়ে বের হতো। আর রক্তে সমস্যা থাকলে অথবা চেতনায় ঘাটতি থাকলে ফিল্টারে আটকে যেতো। ফ্যাসিজমের বিরোধীতা করা মানুষরা আর ইহুদিরা আটকে যেতো, তাদের খাঁটি ইটালিয়ানত্ব এবং খাঁটি জার্মানত্ব বাতিল করা হতো। তারপর তাদেরকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে, শ্রমিক বানিয়ে, নির্যাতন করে, এবং হত্যা করে চেতনার বাস্তবায়ন করা হতো।

ফ্যাসিজম এমনই। যুগে যুগে ঘুরে ফিরে আসে। এসে এসে জাতীয়তা এবং আত্মপরিচয়ে কত আনা খাদ আছে তা যাচাই করতে মহাব্যস্ত হয়ে পড়ে। চেতনা ধর্মে অন্ধ এই মানুষগুলো এতো বেশি স্পর্ধা পেয়ে যায় যে, তারা দেশের সর্বোচ্চ স্থান থেকে শুরু করে বাসায় বাসায় ঢুকে যেখানে সেখানে তাদের চেতনার এসিড টেষ্ট শুরু করে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের সামনে দাড়িয়ে তাদের ছোট ছোট পিচকালো চেতনা প্রদর্শন করে। আবার পথ চলতে সামনে কাউকে পেলে জিজ্ঞাসা করে বসে, আপনি কি বাঙালী?

এরা বুঝতে অক্ষম, সাময়িক সময়ের জন্য শক্তির জোরে এইসব বাঙালী চেতনা ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা যায়, লাখো কণ্ঠে অর্থহীন রেকর্ড করে রাষ্ট্রকাঠামোর সম্মান ও মর্যাদাকে খেলো করা যায়, কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদের স্থান হয় ইতিহাসের ভাগাড়ে। ঘৃণিত হতে হয়।

আমাদের সামনে দুইটা পথ আছে। এইসব ছোট ছোট পিচকালো চেতনাধারীদের সাথে তর্ক করে সময় কাটাতে পারি। কোন লাভ হবে না। এদের চ্যাতনা অন্ধত্ব কাটবে না, কিন্তু ঝগড়াঝাটি করে গালিগালাজ দিয়ে কিছুটা হয়তো দমানো হবে। অন্য আরেকটা পথ হলো হিটলার ও মুসোলিনীর মতো ফ্যাসিষ্টদের সাথে শেখ হাসিনা ও তার শাহবাগি চ্যাতনাজীবি অনুসারীদের মিল ও অমিল, এবং কখনো বরং বাড়াবাড়ির বিষয়গুলো, খুঁজে বের করে ইতিহাসের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারি।

আমার মনে হচ্ছে প্রথম কাজটা পুরোপুরি বাদ দেয়া না গেলেও, দ্বিতীয় কাজটা অনেক বেশি দরকারী।

৫০ কোটি টাকার জাতীয় সঙ্গীতের বিশ্ব রেকর্ড এবং সুরেন্দ্র কারবারি পাড়ার ১.৫ লক্ষ টাকার স্কুলের ছাদ- আমি ব্যবহৃত হতে অস্বীকার করি।

March 25, 2014 at 8:59pm


আজকে সকাল ১০টা থেকে ৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে(সুত্রঃ সংস্কৃতি মন্ত্রী)  , মন্ত্রী এমপিদের  সরকারের সাথে ব্যবসা করার আইন ভঙ্গ করে, প্রতিটা ব্যাঙ্ক এবং বেশ কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের  সাথে বাধ্যতামূলক চাঁদাবাজি করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের এক সাথে  জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার বিশ্ব রেকর্ড।
একটা মর্মস্পর্শী ছবি 
কে জানে, এমন একটা রেকর্ড  প্রতিদিন  আমরা ভাঙছি কিনা, স্কুল ঘর না থাকায় পৃথিবীতে সর্বোচ্চ সংখ্যক ছাত্র ছাত্রী প্রতিদিন খোলা মাঠে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার এবং পাঠ দান নেয়ার । কিন্তু, এঁর মধ্যেই  ফেসবুকে, তন্দ্রা চাকমার স্ট্যাটাস অনেকেই দেখেছেন, খাগড়াছড়ির সদর উপজেলায়  সুরেন্দ্র কারবারি পাড়ার মহাসেনের আঘাতে ভেঙ্গে যাওয়া স্কুলের টিন-শেড ঠিক করে দেয়ার জন্যে  ১.৫ লক্ষ  টাকা জোগাড় করতে।
পেছন থেকে তোলা, একটা ভাঙ্গা স্কুল ঘরের সামনে চার লাইনে দাড়িয়ে শপথ নিতে থাকা এই অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এই  ছবিটা দেখলেই বোঝা যায়, এই রাষ্ট্র-যন্ত্র কি ভাবে তার  জনগণের বেসিক চাহিদা পূরণ করতে পদে পদে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
এক বছর আগে হয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের ভেঙ্গে যাওয়া স্কুলঘর ঠিক করতে যেই রাষ্ট্র ব্যর্থ , সেই রাষ্ট্রের কোন অধিকার নাই ৫০ কোটি টাকা খরচ করে, জাতীয় সঙ্গীতের বিশ্ব রেকর্ড করার।
কিন্তু, সেই গুলো করছে আওয়ামী  লিগের সরকার ।কেন  করছে ? কারণ, এই দলের জনগণের কাছে কোন দায়বদ্ধতা নাই। এই দল জানে, তারা মানুষের ভোট জিতে ক্ষমতায় আসে নাই। তারা জানে, তারা ক্ষমতায় আসছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে দেশকে দুইটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন রকম গুটি-বাজি করে এবং  ইন্ডিয়ার স্বার্থ রক্ষা করার মাধ্যমে। ফলে তাদের সমস্ত চিন্তা চেতনায় এই দুইটি ধারা প্রবাহিত  হয়।
এই জন্যে আমরা দেখেছি, সমালোচনার মুখেও তারা  ৫০ কোটি টাকা খরচ করে, এই অর্থহীন অনুষ্ঠানটা করে যাচ্ছে। কারো  কথায়  কান দিচ্ছেনা।   এই গুলো  ক্লাসিক  স্বৈরচারী আচরণ। বড় বড় মূর্তি বানানো, বড় বড় অনুষ্ঠান করা  ।  স্বৈরাচার নিজেই তার গড়া এই ফানুসে উড়ে বেরায়। তার ধারনা থাকে,  মানুষের জীবনে শান্তি সুখের নহর বয়ে যাচ্ছে। এই জন্যে স্বৈরাচার নিয়ম করে, আচ্ছা জনগণের যেহেতু অনেক টাকা, সেহেতু আমরা সব রাস্তায় টোল বসিয়ে দেই। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেই।
এই অনুষ্ঠান আরও অনেক গুলো সম্পূরক প্রশ্নের জন্ম দেয় ।  
তা হলো  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই ভাবে কোন অনুষ্ঠানের জন্যে বাধ্যতামূলক চাঁদাবাজি করা আইন সম্মত কিনা? এ কোন রাষ্ট্র সৃষ্টি করলাম আমরা যার সরকার এই ধরনের ভ্যানিটি প্রজেক্টের জন্যে নিজেই চাঁদাবাজি করে?  এই টাকার একাউন্টেবিলিটি কে নিশ্চিত করছে? এই টাকাটা অডিটেবেল কিনা? সরকার যাদের কাছ থেকে এই  টাকা নিয়েছে, তারা এই অনুদানের কি পে-ব্যাক নিবে ?
এই টাকা সরকারী নিয়ম মেনে খরচ হয়েছে কিনা। এবং এই অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি-মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুরের প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিকের তত্ত্বাবধানে হওয়াতে মন্ত্রী এমপিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সরকারের সাথে ব্যবসা না করার যে নিয়ম  তার প্রকাশ্য বাত্যয় হলো, দুদক তার তদন্ত করবে কিনা? এই রাষ্ট্র কি, এতো নাঙ্গা হয়ে গ্যেছে যে, এই ধরনের দুর্নীতি করতে আজ রাখ ঢাক ও করতে হয় না?
এই প্রশ্ন  গুলোকে উপেক্ষা করে 
আজকে যখন সমালোচনার  ঝড় ওঠে, ইসলামি ব্যাঙ্কের কাছ থেকে টাকা নেয়া  মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বরখেলাপ কিনা  তখন বোঝা যায়, সরকার  চাইছে  নবীনদেরকে এবং প্রতিবাদীদেরকে দেশপ্রেমের  একটা  ধোঁয়াটে অন্ধকারে বুঁদ করে রাখা যাতে, আজকের প্রজন্ম , তার চোখের সামনে লুটপাট দেখেও সঠিক প্রশ্ন করতে ব্যর্থ হয়। যাতে সে সুশাসন না চায়, প্রকাশ্য দুর্নীতি  দেখলেও বিভাজিত রাজনীতিতে নিজের অবস্থানের কারণে চুপ থাকে, প্রতিবাদী না হয়।
যাতে সে দেখতে ব্যর্থ হয়, সুরেন্দ্র কারবারি  পাড়ার বাচ্চাদের সরকারী স্কুলের ঘর মাত্র ১.৫ লক্ষ টাকার জন্যে , নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয় যে সরকার সেই সরকারের  ৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার লুটপাটের মহোচ্ছবের কোন অধিকার নাই। এই উৎসব বার বার মনে করিয়ে দেয়,  সেমুয়েল জনসনের বিখ্যাত উক্তি, patriotism is the last refuge of a scoundrel ।  বদমাইশের  শেষ আশ্রয় হচ্ছে দেশ প্রেম।
এই প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে , দেশ  কিন্তু  মা। মাকে নিয়ে ব্যবসা করতে হয়না।
 এবং যারা করে, তারা কোন একটা ধান্দার জন্যে করে।  এই প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ, সেই ধান্ধাবাজদের সৃষ্ট ধোয়ার থেকে সত্যকে দেখতে পাওয়া এবং   সঠিক প্রশ্নটা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার দায়, এই চেতনা ব্যবসায়ীদের হাতে  ব্যবহৃত না হওয়া।
আজকে  আমাদেরকে তাই এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর চাইতে হবে। এই চাদাবাজি আইনসম্মত কিনা ? এর একাউন্টিবিলিটি কে দেখবে ? এবং  মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক আইন ভঙ্গ করে  কিভাবে এই  কাজ পায় ?
যাদের সামর্থ্য  আছে, তারা সুরেন্দ্র কারবারি  পাড়ার মহাসেনের আঘাতে ভেঙ্গে যাওয়া সরকারী স্কুলের পরিচালক দয়ানন্দ দাদার সাথে যোগাযোগ করবেন ০১৮২৮৮৬১৩০৩  নাম্বারে। এই স্কুলটি ঠিক করতে ১.৫ লক্ষ টাকা লাগবে। সরকার যদি না করে, আমরাই পারবো এই স্কুল ঠিক করে দিতে। এইটাই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা।
আই রিফিউজ টু বি ইউজড, আমি ব্যবহৃত হতে অস্বীকার করি ।  এবং এই ৫০ কোটি টাকার প্রতিটা পয়সার হিসেব চাই। সবাইকে ২৬শে মার্চের শুভেচ্ছা।

আমি একটা সুসংবাদ দেই, আমার ফেসবুক বন্ধু জাপান প্রবাসী দিদার কচি Didar Kochiভাই জানিয়েছেন, তন্দ্রাদির স্ট্যাটাস পড়ার পরে,তিনি এবং তার বন্ধুরা ইতিমধ্যেই ৮০০ ডলার কমিট করেছেন এবং ইতি মধ্যেই Tandra Chakma তন্দ্রা দিকে জানিয়েছেন, আগামি সপ্তাহের মধ্যে দের লক্ষ টাকা সুরেন্দ্র কারবারি পাড়ার মহাসেনের আঘাতে ভেঙ্গে যাওয়া সরকারী স্কুলের ফান্ডে দিবেন।

ধন্যবাদ কচি ভাই এবং আপনার বন্ধুদেরকে। এক টিকেটে দুই ছবি দেখার মত চেতনা ব্যবসা আর টাকা লুটপাট করা নতুন মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ীদের যুগে , আপনারাই দেখিয়ে দিচ্ছেন, দেশপ্রেম কি জিনিষ ।

৫০ কোটি টাকার সাথে তুলনা করলে, দেড় লক্ষ টাকা হয়তো কিছুই নাই, কিন্তু , মিথ্যার মধ্যে সত্যকে বেছে নেয়ার ইচ্ছাটাই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা।

 

সূত্র ঃ
তন্দ্রা চাকমার ফেসবুক স্ট্যাটাস।
https://www.facebook.com/photo.php?fbid=10152321709877152&set=a.310807447151.183524.719932151&type=1&stream_ref=10
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন। প্রায় তিন লাখ লোক একসঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য ৫০ কোটি টাকা খরচ হবে।
http://bangla.bdnews24.com/ bangladesh/article759318.bdnews

 

 

Accommodating the New Imperial Order: The Dhaka Tribune and the Ruling Culture of Subservience

By Surma

They plunder, they slaughter, and they steal: this they falsely name Empire (Superpower), and where they make a wasteland, they call it peace – Tacitus (56 – 117 AD)

Have you heard the one about the Bangladeshi farmer and the Indian Border Guard?

felani.jpg

Picture of 15 year old Felani killed by Indian Border Guards (BSF) on the 7 January 2011

There was once a Bangladeshi farmer who was ploughing his fields with his cattle near the Indian Border. The Indian border guards (BSF) as part of their live exercises, for the sake of target practice, crossed the border shot the farmer and took his cattle. The BSF re-brand the cattle as Indian cattle and then sell it to an Indian cattle smuggler, who in turn smuggles the cattle into Bangladesh, with the help of the BSF, and sells at a premium. All this time our helpless Bangladeshi farmer is lying in his field bleeding to death.

First the the local Awami League Chairman comes along, see’s the farmer walks over the farmer, crosses the border and has tea with the BSF guards at their station.

Second, a civil society, Sushil type, Nirmul Committee member comes along, see’s the farmer, takes pictures and then crosses the border and writes a report with the BSF guards. In the report the farmer was part of international Islamist terror network, and his cattles were being used to fund that terror network, thus both the farmer and his cattle created an existential threat to the Bangladeshi state and needed to be neutralised.

Third, a correspondent from the Dhaka Tribune arrives and takes an interview of the farmer, noting down all the facts, then writes a sympathetic piece in the paper about the problems faced of being an Indian Border Guard.

The above comical anecdote sadly reflects the state of affairs that is amongst the ruling clique, political and civil in Bangladesh. A culture of submission to an aggressive foreign power, which regularly kills citizens of the country, interferes in domestic politics and is economically exploiting the country’s resources. It is a culture of subservience which permeates the ruling Awami League, to a myopic civil society members, whose indignity is masked by spineless corporate media.  This pro india bias was recently highlighted by former ambassador Sirajul Islam, in the Weekly Holiday. The Dhaka Tribunes role of propaganda as an extension of the state was confirmed when it and its editor Zafar Sobhan received an award by the Better Bangladesh Bangladesh Foundation (BBF) for creating a better image for the country. The other awardees are (post Rana Plaza) Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association for its contribution in the garment sector, the (post internationally criticised elections) Ministry of Foreign Affairs for contribution in the field of international relations, Bangladesh Armed Forces for serving in the United Nations Peace Support Operations and International Committee of the Red Cross (ICRC) for its role during the Liberation War and Foreign Minister AH Mahmood Ali.

Policy of Appeasement – ‘Please Sir, can I have some more!’

muncih 1938.jpgoliver twist.jpg

(l) Neville Chamberlain proclaiming foolishly ‘peace in our times’, after rewarding Nazi aggression at Munich 1938. ( r) Famous scene from Oliver Twist 1968, ‘Please sir can i have some more!’

This culture of subservience reached new heights, with the recent editorial by the Dhaka Tribune by its editor Zafar Sobhan, where he beseeches the Indians to extend the cricketing Indian Premier League into Bangladesh:

“The most obvious way in which to do this would be to let Dhaka bid for a franchise in the next application process and let economics sort it out. With a catchment area that would comprise the entire country in terms of local fan base, or even simply taking Dhaka as the focal metropolis, such a franchise would be a better bet than some that are already in the IPL”

The article and its timing displayed new a new marker for the paper, in its ‘Walter Mitty’, type editorial policy, a new level of a comic detachment from the reality faced by ordinary Bangladeshis. Instead of confronting criticism of the papers Islamophobic and pro India bias, the article just confirmed those accusations and further silenced an ever decreasing number of sympathisers, The reality on the ground, which the paper ignores and is insensitive to, is that one sided elections were held with the open support of the Indian government, with a brutal security crackdown with an alleged assist from the Indian army, all held against the backdrop of an increasing number of Bangladeshi citizens being killed by the Indian security forces at the border.

The content and timing of the piece could be interpreted as a rerun of Munich 1938, where instead of aggression against the sovereignty of a neighbouring country being opposed and resisted, we have a cringe worthy acceptance of the aggression by masking it up and seeking to reward such aggression, in this case unilaterally seeking an IPL franchise.

The ignorance multiplier effect – one import size fits all

The proposal shows an incredible disregard for developing Bangladeshi cricket, which can be throttled by importation of franchise and precious resources being diverted to it. Instead of advocating investment and development of local clubs, the newspaper’s solution, like so many other solutions adopted in current Bangladesh, is to import a ready made manufactured Indian solution. This is in the foolish belief that such a solution, of a single franchise, is for the benefit of development of the game in a country of over 150 million.

A similar dynamic, rather stagmatic, can be observed in every domain of indigenous social-technological development, from water resources engineering, to urban planning and education. The systematic undernourishment of our own talents is no basis for a state with pretensions of autonomy. Realise this, even (y)our foreign development partners are laughing all the way to the bank and up their career ladders

The attitude in the paper seems to be hangover of the Mujib-era one party state of the early 70s, where dogma superseded practical technicalities. Then it was the import of ill fitting Soviet blueprints, now we have the advocacy of ill fitting, counter productive Indian ones, for our politics, culture, economics and now cricket. For too long, the Dhaka Tribune and its ilk, has gotten away with weaving a fairytale of Bangladesh. Until people start complaining – and loudly too – the corporate media agenda will be shaped by supporters of government, pro AL big business and Indian foreign policy. That does not just subvert honest journalism: it undermines our democracy.

famine 1974.jpgdefinition of journalism.jpg

(l) Scene from the famine of 1974, mainly caused by the political and economic ineptitude of the government of the day. ( r) Memo to the Dhaka Tribune and the corporate media of Bangladesh, from a real journalist, George Orwell.

‘সেকুলার রাষ্ট্রে’র বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক আবাসিক হল কেন?

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ধর্মগুরু তৈরির প্রকল্প নিয়ে শুরু হলেও ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের রেনেসাঁসের  সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সাধারণ্যের, বিশেষত উচ্চবিত্তের কাতারে নামতে থাকে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার সূচিকাগার ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আদিতে ধর্মযাজকদের শিক্ষার কলেজ ছিল। ব্রিটিশেরও পূর্বে  ‘হোলি রোমান সাম্রাজ্যে’ ১০৮৮ সালে যাজক বানানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়। তার পূর্বে আফ্রিকার মিশরে ৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ইসলামী ধর্মচর্চার কেন্দ্র। আর  প্রাচীণ ভারতের নালন্দায় খ্রিস্টপূর্ব ১০ শতকে (সম্ভবত) প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশিলাও ছিল বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষুদের জ্ঞানচর্চার বিহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সাধারণ্যের কাতারে নামার সাথে সাথে এবং ‘এনলাইটেনমেন্টে’র প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শনও বিবর্তিত হয়ে এক বিশ্ববোধের চেতনায় উন্নীত হয়। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা তাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার এক অনিবার্য অংশ।

HJH1

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেভাবে বড় গলায় নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বাতিঘর হিসেবে দাবী করে থাকেন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূতিকাগার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিহিত করে থাকেন সেখানে ভাবতে অবাক লাগে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক (অপ)সংস্কৃতির চর্চা হয়ে থাকে। পৃথিবীর মূলধারার কোন বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বাংলাদেশের গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মুসলিম বনাম অন্যান্য সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভেদসহ আলাদা আবাসিক হলের কোন নজির নেই। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশের মত অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে এ সাম্প্রদায়িকতার চর্চা হতে পারে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠণের ব্যার্থতার দায় এ বিশ্ববিদ্যালয় এড়াতে পারে কিনা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের দায় নিয়ে। যেহেতু লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করে ফেলেছিল এবং এই ভাগ করার বিরুদ্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক জমিদার ও প্রভাবশালী হিন্দুরা তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯১১ সালে  এটিকে ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল তাই ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কে সন্তুষ্ট করতেই ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এক বাংলায় দুইটি আর্থ-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অখন্ড বাংলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাটিও খুব সহজ ছিল না। আমাদের কবিগুরুও সে দেয়ালের পিলার ছিলেন বলে অনেক কুৎসা আছে। সে যাই হোক, অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন যাত্রা শুরু করল তখন এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উত্থান ঠেকানো এড়ানো না গেলেও তখনকার সামাজিক জাত-বর্ণ প্রথার প্রেক্ষাপটে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে এর যাত্রা শুরু করতে পারেনি। এর অন্যতম নিদর্শন মুসলিম এবং অমুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আলাদা আবাসিক হলের প্রবর্তন। ব্রিটিশ উপনিবেশের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’নীতির আলোকে সাম্রাজ্য পরিচালনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন তৈরির এ দ্বৈতনীতিও স্বাভাবিকভাবেই উপনিবেশের স্বার্থেই দরকার ছিল!

আর পরবর্তীতে পাকিস্তান যেহেতু একটি ধর্মরাষ্ট্ররূপে কিংবা মুসলমানদের রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি করে রাখা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্মরাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সে বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে এই ধরণের জঘন্য সাম্প্রদায়িক একটা ব্যবস্থা কীভাবে প্রশ্নাতীতভাবে টিকে আছে সেটা এক মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই বলে থাকেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং এর সফল বাস্তবায়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই নেতৃত্ব দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্তও বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। এটা সত্য যে রাজনৈতিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারের কেন্দ্রেই অবস্থান করছে। কিন্তু এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক গড়ণ কীভাবে হচ্ছে তার খবর কি সচরাচর রাখা হয়? শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যখন তার শিক্ষার্থীদের পৃথক পৃথক গোয়ালঘরে ঢুকানো হয় তখন কি তা বিশ্ববিদ্যালয়টির মৌলিক আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে বসে না? শুধু কি তাই, মোটা দাগে এটি কি রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষকতাই করছে না?

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬ টি। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে রাখা হয়। এমনকি আমরা যদি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই সেখানেও দেখতে পাব বিশ্ববিদ্যালয়টির নামের সাথেই একটা সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের সম্পৃক্ততা থাকার পরেও সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা আবাসনের কোন ব্যবস্থা নেই।

পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও ধর্মীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা বাসস্থানের কোন ব্যবস্থা নেই। ইন্ডিয়ার যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথেই ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়া আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া, বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

উত্তর প্রদেশে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৫ সালে উত্তর ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমেদের হাত ধরে। মজার ব্যাপার হল বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন একজন হিন্দু রাজা রাজা জয় কিসান দাস।  বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে অধ্যায়ন করছেন প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। ১৯ টি আবাসিক হলের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে হিন্দু-মুসলিম সব বিখ্যাত ব্যক্তির নামেই আবাসিক হল থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন হলকে চিহ্নিত করা নেই। দিল্লীর জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া এখন ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করছে। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আলি এবং মাওলানা শওকত আলির নেতৃত্বে  মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ভাইস চ্যাঞ্চেলর ছিলেন ড.জাকির হোসেন। ৫০ শতাংশ আসন মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন ১৭ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী।  বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন আবাসন বৈষম্য নেই। বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এশিয়ার  অন্যতম বৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৬ সালে। দুইটি ক্যাম্পাসে বিস্তৃত বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়তন ১৬ বর্গকিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০ হাজার শিক্ষার্থী ছড়িয়ে আছে এর ৬০ টি আবাসিক হোস্টেলে। নামে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসনে ধর্মীয় পরিচয়ের কোন ভূমিকাই নেই।

ইন্ডিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা আবাসনের নজির নেই। আর অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তো এটা কল্পনারও বাইরে।

যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি মুখ্য এবং স্পর্শকাতরই হয়ে থাকে তাহলে লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত করাও সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক। সে প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্রে ছেলেদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও মেয়েদের জন্য আলাদা কোন হলের ব্যবস্থা নেই। এটি যেন এমন যে, ছেলেদের জাত যাওয়ার ভয় থাকলেও মেয়েদের জাত-পাতের কোন বালাই নেই! এবং একটি রাষ্ট্রের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় যখন এভাবে লিংগীয় বৈষম্যমূলক এবং পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসারে ভূমিকা রাখে তখন রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন দাবী করে।

রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে পূণর্ভাবনা কেন দরকার তার জন্য সামাজিকীকরণের বিষয়টার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। যেমন, ধর্মবিশ্বাস একটি মানসিক প্রক্রিয়া। ধর্মবিশ্বাসের রূপ যখন মানুষের আচরণে ফুটে উঠে তখনই আমরা কেবল জানতে পারি সে কোন ধর্মজাত। একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের বলয়ে যে মানসিকতা গড়ে উঠে সে মানসিকতার কাছে যখনই অন্য ধর্ম-বিশ্বাস এবং জীবনাচরণ প্রকাশ পায় তখনই তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় এবং সে তখন সে বিশ্বাসের প্রতি এক ধরণের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। এই প্রতিক্রিয়া যখন এক ধর্মের অথবা এক সম্প্রদায়ের সাথে অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে হয় তখন আমরা বলি এটা সাম্প্রদায়িক আচরণ। যেহেতু মানুষ গোত্রপ্রথা থেকে বের হয়ে এসে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে শুরু করেছে তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায় পরিচয়ের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতেই দরকার একটি অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। তা না হলে সমাজে সবল দূর্বলের উপর, সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর উপর নিপীড়ণ চালাবে। তাই একটি স্থীতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্যই দরকার অসাম্প্রদায়িক নাগরিক এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনা।

এই অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনার জন্য প্রথমেই যেটি দরকার সেটি হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে স্বাভাবিক সহাবস্থানের মানসিকতা তৈরি। এই মানসিকতা তৈরি হয় সমাজের বিভিন্নক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সক্রিয়ভাবে নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। আর এই মিথস্ক্রিয়া বাড়লে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এবং জীবনবোধের কাছাকাছি আসতে পারে। এই কাছাকাছি আসা থেকে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। আর এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যে সমাজে বিদ্যমান থাকে সে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা দানা বাঁধতে পারে না। যেকোন সমাজের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাই দায়িত্ব হচ্ছে এমন কাঠামো তৈরি করা যেটি নাগরিকদের মধ্যে এই উদার মানসিকতার সৃষ্টি করবে।

আর এই মিথস্ক্রিয়া যেখানে থাকে না সেখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়কে এলিয়েন ভাবে এবং নিজেদের অজ্ঞতা থেকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতি থেকে এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতা তৈরি হয় যা থেকে বিদ্বেষ বাড়ে যেটি অনিবার্যভাবেই সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড়ঘর ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’দের আলাদা হলের বরাদ্দ নিয়ে ভাবনাগুলোকে মোটা দাগে চারটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিমদের জন্য রয়েছে এক প্রকার হল এবং মুসলিম ভিন্ন অন্য সব ধর্মবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে একটি হল। এখানে মুসলিম বনাম অন্যান্য(সংখ্যালঘু) ধর্মের আড়ালে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ বিভিন্ন ধর্মের স্বতন্ত্র্যতা রক্ষা করা হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভিন্নমতের(ভিন্ন ধর্ম) নূন্যতম অস্তিত্ব না থাকায় তাদের মধ্যে সহাবস্থানের একটি অন্তর্নিহিত চেতনা তৈরি হয় না যেটি তাঁর গণতান্ত্রিক মানসিকতার গঠনকে বাধাগ্রস্ত করে।

তৃতিয়তঃ কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটা রটনা উঠল যে একটি জঙ্গী সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংখ্যালঘু হল’ আক্রমণ করবে। তখন হলটির শিক্ষার্থীগণ নিজেরা এটাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাতভর হলটি পাহারা দেয়। তার মানে হলটির ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়টিই তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি যেটি ১৯৭১ সালেও এই পরিচয়ের কারণেই মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল।

চতুর্থতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি এই হলটি চালিয়ে রাখার সপক্ষে  পর্যাপ্ত যুক্তি থেকেও থাকে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়ার দায়ভার নেবে কে? বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মত এখানেও পুরোপুরি লিঙ্গবৈষম্যকেই স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে।

এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৪৩ বছর বয়স হওয়া স্বত্বেও এই নীতিগত অসামঞ্জস্যটি নিয়ে কেউ শক্তভাবে কথা বলেননি কিংবা বলার সাহস পাননি! এবং এই দুই কারণের কোনটাই কম বিপদজনক নয়। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে থাকা সাম্প্রদায়িকতার এ মালগাড়ীতেই সওয়ার হয়েছে রাষ্ট্র যেটির গতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে অন্তর্দন্দ্ব। রাষ্ট্রটির কি তার এঞ্জিন নিয়ে ভাবতে শুরু করা উচিত নয়?

সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদ : স্বৈরতন্ত্রের কবলে বংলাদেশ

-রেজাউল করিম রনি

 

‘A revolution is not a dinner party, or writing an essay, or painting a picture, or doing embroidery; it cannot be so refined, so leisurely and gentle, so temperate, kind, courteous, restrained and magnanimous. A revolution is an insurrection, an act of violence by which one class overthrows another.’ [ Mao Tes-Tung; selected work Vol.1p.28]

 

বাংলাদেশের এখনকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝবার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলা আলোচনা করা দরকার তা আমরা এখনও ঠিক করে ওঠতে পারিনি। অথবা বলা যায়, যে তরিকায় রাজনীতির আলোচনা উঠলে, নিদেনপক্ষে শিক্ষিত পরিমণ্ডলে রাজনীতির তর্কটা একচক্ষু এলিট মার্কা খুপরির জগৎ থেকে মুখ তুলে বিকশিত হবার সুযোগ পেতো তা আমরা শুরু করতে পারিনি। এর দায় তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের। এর মূলে আছে গণবিরোধী বুদ্ধিজীবীতাকে মূলধারা হিসেবে হাজির করার খামতি। বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে পরাধীন করে রাখার জন্য বুদ্ধিজীবীরাই যথেষ্ট।

images (1)

আনন্দের কথা হল, সাধারণ জনসমাজে এইসব বিকট বিকট বুদ্ধিজীবীদের দুই পয়সারও দাম নাই। তাদের প্রভাব মিডিয়া পরিমণ্ডল নেতা-নেত্রীর গোপন বৈঠক বা পর্দা বা বেপর্দার টেবিল টকেই সীমাবদ্ধ। যাহোক, আজ আমরা কয়েকটি পয়েন্টে এই মুহূর্তের রাজনৈতিক চরিত্র বুঝবার চেষ্টা করবো। বলাই বহুল্য আমাদের এখানে যে তরিকায় চলমান রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করা হয় তার ধার আমরা ধারি না। দুই দলের শত্রুতাকে আমরা বাংলাদেশের রাজনীতির মূল সমস্যা মনে করি না। তথাপি এইসব দলদারির রাজনীতি আমরা বিচার করি। করব। কিন্তু তাঁর অভিমুখটা হবে নয়া বাংলাদেশের উদ্বোধনকে তাতিয়ে দেয়া।

আর এটা করতে গেলে ক্ষমতার রাজনীতির গণবিচ্ছিন্ন চরিত্রটা পরিস্কারভাবে বুঝতে হবে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্যটা হবে গণক্ষমতার নতুন সামাজিক-নৈতিক একই সাথে রাজনৈতিক স্বত্তাটা বিকশিত করা। এটাই বাংলাদেশে এখনকার কাজ। আর এটাই তথাকথিতমূল ধারার বুদ্ধিজীঈতা বা সুশীল ধারা বিশ্রিভাবে এড়িয়ে কাগুজে আলাপে পর্দা ফাটিয়ে ফেলে। তারা সুভদ্র আলোচনার শ্রোতে ভয়ের সংস্কৃতিকে সামাজিকীকরণ করে চলেছে নিত্যদিন। সেই দিকে সতর্ক থেকে আজকে আমরা কয়েকটি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করব।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের আত্মপরিচয়ের সঙ্কট :

শুরুতেই আনন্দের কথা জানাইতে চাই। শেখ হাসিনা সরকার খানিকটা কৌশলে বাকিটা জবরদস্তি করে ক্ষমতা আকড়ে ধরে থাকাতে বাঙালি জাতীয়বাদি রাজনীতি ঐতিহাসিক সঙ্কটে পড়েছে। একে তো এর আত্মপরিচয়ের ঐতিহাসিক মীমাংসা করা হয়নি। তার উপর ফাঁসির দড়ির ওপর ভর করে সাংবিধানিক  ফ্যাসিবাদ কায়েমের কারণে এতো দিন যে সব বুদ্ধিজীবীরা চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে যে কোনো বিরোধীতাকে জামায়াত-বিএনপির ষড়যন্ত্র ঠাওরেছেন তাদের মুখে জুতার কালি পড়েছে। তাদের আর কোনো সামাজিক বৈধতা নাই। গলাবাজির সব রাস্তা হাসিনা বন্ধ করে দিয়েছেন। শাহবাগ কে র্নিলজ্জভাবে মুক্তিযুদ্ধের মিথের ওপর দাঁড়করানোর জন্য যে সব বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী জেহাদে শরিক হয়ে ছিলেন সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদের আমল হাজির হওয়ায় তাদের সব রকম নাগরিক ভূমিকার নিকাশ হয়ে গেছে। এই গুণ্ডাবাজির পরিণতিতে আজ বাংলাদেশ নিয়মান্ত্রিক এক স্বৈর-অবস্থায় নিপতিত হয়েছে।

যা হোক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে যে সব গণবিচ্ছিন্ন চাটুকার তথাকথিত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী নামধারী প্রতিবন্ধীরা গলাবাজি করেছেন তারা এখন চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন। কোনো কথা বলার নৈতিক বৈধতা হারিয়ে তারা এখন নিজেদের আদর্শে কি ত্রুটি আছে তা খুঁজে দেখতে মনযোগী হয়েছেন। এটা কম কৌতুকের জন্ম দেয় না। আমি নজির হিসেবে প্রথম আলোর থিং-ট্যাঙ্ক প্রকাশনা ‘প্রতিচিন্তার’ সর্ব শেষ সংখ্যার (প্রতিচিন্তা, জানুয়ারী-মার্চ ২০১৪ সংখ্যা) প্রথম লেখাটার দিকে পাঠকের নজর ফেরাতে বলব।

‘বাঙালি জাতয়িতাবাদ চার দশক পর’- শিরোনামের  এক লেখায় বদরুল আলম খান লিখেছেন,
‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল স্রোতে ৪২ বছর আগে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব সভায় স্থান করে দিয়েছিল। আজ সে দেশ একটি সংঘাতময় দেশ হিসেবে পরিচিত। মধ্যবিত্ত জীবনের সীমানায় যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্য দেশের এই পরিচয় এক অদ্ভুত বিড়ম্বনার জন্ম দিচ্ছে। তারা দেখছে কীভাবে সংঘাতে ঋজুতা রাজনীতিকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। দুই বৃহৎ রাজনৈতিক জোট দেশের বিধাতা হলেও তাদের মধ্যে সহযোগিতা বা সমঝোতা নেই। তারা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে নিয়োজিত।’

তিনি এই লেখায় অনেক চমকপ্রদ বিষয়ের অবতারনা করেছেন। যদিও তার চিন্তার এনলাইটমেন্ট সীমাবদ্ধতার কারণে এইটা দিয়ে বেশিদূর আগানো যাবে না। কিন্তু এমন সব বিষয়কে আমলে নিয়েছেন যা সত্যিই অমাদের জন্য সুখবর। তিনি জানাচ্ছেন,
‘বাঙালির প্রধান দুই আত্মপরিচয়, ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত করা হয়েছে। ৪২ বছর পার হলেও ওই দুই পরিচয় কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। দুই পরিচয়ের দ্বন্দ্ব সে কারণে এখানে তীব্র ও রক্তাক্ত।’

এই এতোটুকু বোধ যে সুশীলদের মধ্যে জেগেছে তার জন্য শুকরিয়া আদায় না করে উপায় নাই। আমরা শুরু থেকে শাহবাগ, ফাঁসির রাজনীতি ও কর্পোরেট জাতীয়তাবাদের উপনিবেশী সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ে আসছি। একই সাথে বলে আসছি বাংলাদেশে ইসলামের একটা পর্যালোচনা লাগবে। নিদেন পক্ষে ইসলাম ও রাজনীতির প্রশ্নে তথাকথিত প্রগতীশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরির্বতন না হলে রক্তপাত এড়ানো যাবে না। আওয়ামী লীগ মানেই গুণ্ডা বা ধর্মদ্রোহী এই মনোভাব সমাজে কেন প্রবলতরো হচ্ছে তাও খতিয়ে দেখতে চেয়েছি। অন্য দিকে বিএনপি কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা মতাদর্শ না হাজির করেও কি করে ক্ষমতার রাজনীতির প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠল তারও হদিস করতে চেয়েছি। পাশাপাশি জামায়াত ও অন্য ইসলামী ধারাগুলোর বিচার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে একটা মতাদর্শিক সংগ্রামকে বেগবান করার কথাও শুরু থেকে বলে আসছি। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টা। আমাদের রাজাকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী হিসেবে হেয় করা হয়েছে। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে। ফলে এখন কৌতুক অনুভব না করে পারছি না। আওয়ামী লীগ যখন তার উপনিবেশী সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জোড়ে ক্ষমতায় বসে গেল তখন চেতনার আফিম খোরদের আর আপসোসের সীমা রইল না। এতোদিনে যে জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে সেই হুশ নাই। এখন আল-কায়েদা ও মার্কিন অনন্তযুদ্ধের ছঁকে পরে গেছে বাংলাদেশ। আর তা গৃহযুদ্ধের প্রবল প্রতাপ নাগরিক জীবন কে ভীত করে তুলছে। বিরোধীদল নিধনের ক্রসফায়ার গল্পও চালু হয়েছে। সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিতা স্বমূলে তার বৈধতা বা পাবলিক লেজিটিমেসি হারিয়েছে। তথাকথিত নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এমন এক সঙ্কটে পড়েছে যে এর রাজনৈতিক সম্ভানা ঐতিহাসিকভাবে বিনাশ হওয়ার দ্বার প্রান্তে চলে গেছে। এখন গণক্ষমতার উত্থানের অপেক্ষা জনমনে ফিরে এসেছে প্রবলভাবে। এইটা একদিক থেকে স্বাস্থ্যকর বলতে হবে। যা হোক আমরা এই লেখায় বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের ধরন ও নয়া স্বৈরতন্ত্রের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করব।

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ : 

ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। দেশে বিদেশে ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনার ঐতিহ্যেও ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বাঁক বদল ঘটে গেছে। ফ্যাসিবাদ, বলাই বাহুল্য পশ্চিমা রাজনৈতিক তাত্ত্বিকতার  আলোচনায় অতি জোড়ালোভাবে হাজির রয়েছে। আমাদের দেশে এই বিষয় নিয়ে চিন্তাশীল অধ্যায়ন এখনও শৈশব অবস্থা পার করেছে বলা যাবে না। ফ্যাসিবাদ এখানে রেটরিক বা কথার কথা বা গালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর তাত্ত্বিক বা নিদেন পক্ষে একাডেমিক আলোচনার বেহাল দশা লজ্জাজনক।

বাংলাদেশে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার এক নম্বর সমস্যা হল অতি পণ্ডিতি। আর লোক দেখানো বিদ্যার গড়িমা। ফলে এখানকার লেখক বুদ্ধিজীবীরা অতি মাত্রায় জাজমেন্টাল। কোনো কিছু খতিয়ে দেখার ধৈর্য্য এদের ধাতে নাই। আগেই ভাল মন্দ নির্ধারণ করে দিয়ে নিজে ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা সাজার হীন চেষ্টা করে বসেন। আর রাষ্ট্র ও রাজনীতি চিন্তা এখনও  বিদ্যাসাগর বা রবী ঠাকুরের আছড় কাটাইয়ে ওঠতে পারে নাই। যা হোক আমরা ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে পাব না। মানে দার্শনিক দিক থেকে বিষয়টি যতটা অবিনিবেশ দাবি করে তা এখানে করব না। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের ধরণ বুঝবার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক আলোচনার মধ্যেই সীমিত থাকব।

প্রথম কথা হলো ক্লাসিক অর্থে ফ্যাসিবাদ বলে যা বুঝায় বাংলাদেশে তা নাই। সম্ভব না। তাই প্রশ্ন করতে হবে এতো ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ শুনি কেন? এইখানে ফ্যাসিবাদের ধরণটা হল উপনিবেশী চিন্তা ও রুচি নির্ভরতা। এর রুট বাংলাদেশের মাটিতে না। এটা উনিশ শতকের কলকাতার যে রেনেসা এবং এর ভেতর দিয়ে যে হিন্দু যা মূলত ব্রাক্ষ্মণ্যবাদি জাগরণ আকারে হাজির হয়েছে তার বয়ানের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আত্মপরিচয়ই এখনও পরিস্কার হয়নি ফলে এর দ্বারা ফ্যাসিজম কায়েমের কোন সম্ভাবনা নাই।  কিন্তু এর অদ্ভুত রকম শাসনতান্ত্রিক বিকার ঘটেছে। এটা এই রাষ্ট্রের শুরুর আমল থেকেই ঘটেছে। সর্বশেষ তথাকথিত পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। এটা কে আমি ফ্যাসিবাদ বলি সাংস্কৃতিক অর্থে। এটার নাম দিয়েছি কালচারাল-ফ্যাসিজম।

মনে রাখতে হবে ফ্যাসিবাদ আলোচানার বিষয়ে পরিণত হয়েছে দুইটা বিশ্ব যুদ্ধের পরে। দুইটা বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্যেই ক্লাসিকাল ফ্যাসিবাদের আলোচনার ভিত্তিভূমি তৈয়ার হয়েছে। যার সাথে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো মিল নাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম একটা রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়েছে কিন্তু এই যুদ্ধ এক দিকে যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধ অন্য দিকে বিপুল সাধারণ মানুষ সময়টাকে চিহ্নত করে গণ্ডগোলের সাল বলে। এই কথাটা বিশেষভাবে বললাম জাতীয় চেতনার কমিউনাল চরিত্রকে সহজে বুঝবার জন্য। অন্যদিকে ক্ল্যাসিকাল ফ্যাসিজমে যেটা খুব জরুরি তা হলো এমন একটা টোটালেটিরিয়ান বা সমগ্রতাবাদি আচরণ যার নিরিখে অন্যকে আলাদা করা, শত্রু জ্ঞান করার তীব্র আচরণ হাজির থাকে। এই অপরকে বিনাশ করার জন্য শুধু সাংগঠনিক শক্তি থাকলেই তাকে ফ্যাসিবাদ মনে করার কোন কারণ নাই। এর মতাদর্শিক জোড়টাই আসল কথা। আমাদের মনে রাখতে হবে। মতাদর্শও অস্ত্র। খুব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। সেই দিক থেকে বাংলাদেশ তো দূরের কথা বাংলাদেশ যার সাস্কৃতিক উপনিবেশ সেই ভারতেও ফ্যাসিবাদি শক্তি আকারে হাজির হবার কোন শর্ত নাই। ভারতের সমাজে মুসলমানকে বাহিরের শক্তি এবং এনিমি আকারে দেখা হয়। এর পরেও তার টোটালিটি নিয়ে সে দাঁড়াতে পারে নাই। তাকে বিশ্ব পুঁজির সাথে তালমিলিয়ে চলতে হয়। ফলে ভারতে সমাজের ভেতরে যেটা রয়েগেছে সেটা হলো কমিউনালিটি। এই কমিউনালিটির ভয়াবহতাকেই লোকে বলে  সাম্প্রদায়িকতা। আমি বলি এটা পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স। কারণ এই সব কমিউনিটি কখনও মতের ভিন্নতার জন্য রক্তা-রক্তি করেছে এমন নজির নাই। প্রতিটি ভায়োলেন্সের সাথেই ক্ষমতার রাজনীতির সম্পর্ক আছে। এটা বাংলাদেশের দিকে তাকালে আরও ভাল বুঝা যাবে। সমাজের মধ্যে মত-ভিন্নতা আছে কিন্তু এই ভিন্নতার কারণে রক্তরক্তি হয় না। মানে সমাজের মৌল প্রবণতাকেই সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। কেন না নানা কারণে কমিউনিটি  টু কমিউনিটি– চিন্তা, আদর্শ বা আচরণের ভিন্নতা হতে পারে। এর আলোকে কোন কমিউনিটি যদি সংগঠিত হয় এবং রাজনীতিতে হাজির হয় তাইলে এটাকে খুব স্বাভাবিকই বলতে হবে। আর এতে এক কমিউনিটি অন্য কমিউনিটিকে শত্রু মনে করে বলপ্রয়োগে নামলে তাকে হোলসেল সাম্প্রদায়িকতা বলা যাবে না। এটা রাজনীতির স্বাপেক্ষে যখন হয় তখন আর এটা সাম্প্রদায়িকতা থাকে না। এটা তখন হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক বলপ্রয়োগ। এক গোষ্ঠী আর এক গোষ্ঠীর ওপর এই বলপ্রয়োগ করে। এটা পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স। যা হোক এটা নিয়ে আরেক লেখায় আলাপ করেছি।

bangladesh-fascist
বাংলা ভাষায় ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা অনেক দিনের। এই বিষয়ে প্রথম প্রকাশিত বই হলো, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ফ্যাসিজম’। ১৯৩৪ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের মার্কসবাদি আন্দোলনের পথিকৃতদের একজন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা দিশারি তুল্য। নাৎসিবাদের ঝোড়ো উত্থানের সময় তিনি ছিলেন জার্মানিতে। তিনি নাৎসি মতাদর্শ ও সাহিত্য ভালভাবে পড়েছেন তা তার লেখায় স্পষ্ট বুঝা যায়। তার বইটি পড়লে অবাকই হতে হয়। তিনি মার্কসবাদি ছিলেন ফলে মার্কসবাদের আলোকে সেই সময়ে তিনি ফ্যাসিবাদকে যে তরিকায় দেখেছেন আজকের এইদেশের মাকর্সবাদিরা এর চেয়ে খুব বেশি আগাইছে এমনটি মনে হয় না। এমন কি আমাদের তুখোর বুদ্ধিজীবীরাও তাকে ছাড়াতে পারেননি। কিন্তু ফ্যাসিবাদের তর্কটা আর সেই জায়গায় থেমে নেই। এর  এতো বিস্তৃতি ঘটেছে যে আমদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা সেই তুলনায় খুব পশ্চাৎপদই রয়ে গেছেন। অন্য মার্কসবাদিদের মতো তিনিও মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের দ্বারা জাতীয়তাবাদি আন্দোলনের অভিমূখ ঘুরিয়ে দিয়ে ন্যাশনালিজম ভায়া হয়ে যে বিকট ক্ষমতার উত্থান হয় সেই ফ্যাসিজমের থাবাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে। এবং বুর্জোয়াদের কে ফ্যাসিজমের জন্য দায়ী মনে করতেন। বুর্জোয়ারা ফ্যাসিজমের পক্ষে থাকে এটা কম বেশি বিভিন্ন সমাজে দেখা গেছে।

কিন্তু খোদ মার্কসবাদে ফ্যাসিজম নিয়ে আলোচনার অন্য খামতি আছে। লেলিন ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ লিখছেন কিন্তু ফ্যাসিজম নিয়ে তিনি কোনো আলাপে গেলেন না। এটা হতে পারে সেই সময়ে এই ইস্যু হাজির করা সম্ভব হয়নি। মার্কসবাদের ঘরে এই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন কাউটস্কি।যদিও আমরা তাকে হোল সেল এনারকিস্ট বলে তার চিন্তার প্রতি কখনও মনযোগী হয়নি। এটা আমাদের মার্কসবাদিদের দৈন্যতাকে আরও প্রকট করেছে। ফ্যাসিজমের আলোচনায় এদের আর কোনো পটেনশিয়াল ভূমিকা নাই। এরা নিজেরা ভিষণ রবীন্দ্র-প্রবণ হয়ে সরা-সরি ফ্যাসিবাদের খাদেমে পরিণত হয়েছে। যে কারণে সৌমেন্দ্রনাথ থেকে আলোচনা শুরু করেছি তা বলে নিই। সৌমেন্দ্রনাথ যেমন মার্কসবাদের ভেতর থেকে ফ্যাসিজমকে দেখেছেন, বিরোধীতা করেছেন এমন দেখা-দেখি ও বিরোধীতা আজও জারি আছে। অন্য দিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময় যে ভূমিকা নিয়েছেন তা আজ আরও ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। এরা রবীন্দ্রনাথের ঘারে চড়ে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সৈনিক হয়েছে বাংলাদেশে। এর অরিজিন খোদ রবীন্দ্রনাথে হাজির আছে।

নাৎসিবাদের পক্ষে সাফাই গাইবার কারণে রবীন্দ্রনাথকে মাকর্সবাদিরা কম হেনস্থা করেননি। এটা আজও জারি আছে। আমি এটা মার্কসবাদিদের মতো করে দেখতে চাই না। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্র চিন্তার সাথে যদি আমরা বুঝা-পড়ার চেষ্টা করি তাইলে দেখব এটা খুব স্বাভাবিক প্রবণতাই। দিপেশ চক্রবর্তী তার ন্যাশন এন্ড ইমাজিনেশন প্রবন্ধে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তিনি রবীন্দ্র ন্যাশনালিজমের ফিলেনথ্রপিক আদর্শকে ক্রিটিক করে একে প্রবলেমেটিক বলে সাবস্ত করেছেন। কাব্য, চিন্তা, কল্পনা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গের দুর্দান্ত বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্র চিন্তায় রাবীন্দ্রিক দৈন্য দশা উদাম করে দেখিয়েছেন। আমি সে দিকে যাব না। বাংলাদেশের মানুষ চিন্তায় অতি মাত্রায় সাহিত্যগ্রস্ত হওয়ার ফলে এখানে ফ্যাসিজম একটা কালচারাল লড়াইয়ে রুপ নিয়েছে সহজেই। সাংস্কৃতিক প্রশ্নে রক্তা-রক্তির ঘটনা ঘটছে। কোনো নতুন রাজনীতি জন্ম নিচ্ছে না বাট রক্ত ঝরছে নানা ছলে।

সৌমেন্দ্রনাথ ১ নভেস্বর ১৯৩৩ সালে প্যারিস থেকে রবীন্দ্রনাথ কে লিখছেন, ‘তুমি নাৎসিবাদের সমর্থনের দ্বারা ইয়োরোপের ইন্টেলেকচুয়াল কেন্দ্রে তোমার বিরুদ্ধে যে তীব্রতা জাগিয়ে তুলেছ সেই সম্বন্ধে তোমাকে জানিয়ে দেওয়ার জন্যই এই চিঠি লেখা।…..

তোমার বিরুদ্ধে যে-আক্রমণ গজিয়ে ওঠেছে তার প্রধান পয়েন্টগুলি হচ্ছে, তুমি যদি না বদলে থাক, তা হলে তুমি জার্মান ফ্যাসিজম যা আজ নাৎসিবাদের নাম নিয়েছে তার সমর্থন কোন মতেই করতে পার না।…..

তোমার উক্তির তীব্র প্রতিবাদ তো হবেই, শুধু তাই নয় তোমার নামের সঙ্গে এই অপবাদ চিরকালের মতো জড়িয়ে থাকবে….। [ ঠাকুর-ফ্যাসিবাদ, পৃষ্ঠা ৯৫, মনফকিরা প্রকাশনী,কলকাতা]

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা ফলে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এই চিঠির বক্তব্যের সাথে একমত হবেন না। রবীন্দ্রপ্রবণ ভক্তকূলও এর প্রতিবাদ করবেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমি যা বলতে চাইছি তা বাদ-প্রতিবাদের ধার আর ধারবে না। এই রবীন্দ্র চেতনার আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সম্পর্ক তার সাথে সোনার বাংলার মিথ ও ভাষার আধিপত্যবাদি অনুরাগ আজ সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। এই জাহেলি জুলুম বাজের ‘কাল’কে বৈধতা দেবার জন্য সাংবিধানিক যুক্তিও তৈয়ার করেছে। এই কালচারাল ফ্যাসিবাদ ক্ষমতার স্বাদ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার জন্য যে আমলের সূচনা করেছে এরই নতুন নাম হলো সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদ। এর  সাথে বিশ্ব পুঁজি, জাতীয় চেতনা, বিজ্ঞাপনী ভোগ সংস্কৃতি, মধ্যবিত্ত চৈতন্যের গণবিচ্ছিন্নতা, ৭১ এর মিথ, পরিকল্পিতভাবে ঘৃণার সংষ্কৃতি তৈরি -এই সবের সম্পর্ক অতি জটিল রুপ নিয়ে জড়িয়ে আছে। এই সবের সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটা এতো জটিল আকারে জাড়িয়ে আছে যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা যে ভালবাসব তার সুযোগ আর পাচ্ছি কই। রবীন্দ্রনাথের নামে আজ রক্ত ঝরে।  রবীন্দ্রনাথ কি করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ফ্যাসিবাদি সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হলো তা খতিয়ে দেখা অতি জরুরি কাজ আকারেই হাজির হয়েছে। আমি নিজে রবীন্দ্র ভক্ত মানুষ। কবি হবার কারণে রবীন্দ্রনাথের সাথে এক ধরনের সম্পর্কও ফিল করি। তথাপি রক্তঝরানো রবীন্দ্রনাথকে এখন সাফ-সুতোরো না করলে আর উপায় নাই। যা হোক রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদের সমর্থক ছিলেন এটা প্রমাণ করা আমার প্রকল্প না। আমি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের রুট খুজতেছি। এর অপজিটে অনেকে বলবেন তাইলে তো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বলে একটা ব্যাপার আছে। এটা চিনপন্থি মার্কসবাদিদের পপুলার থিসিস। আমি বলব এরা ফ্যাসিজমের তর্ক করার তরিকায়ই জানে না। ধর্মের সাথে ফ্যাসিজমের তর্ক এক করে করা যাবে না। তবে ধর্মের কোনো কোনো ইন্টার পিটেশনকে ফ্যাসিবাদি কাজে ব্যবহার করার নজির বেশ পুরানা। কিন্তু খোদ ধর্ম ফ্যাসিবাদের আছড়ে নাই। কারণ ধর্মের সাথে ডিভাইনিটির যে যোগ তা ফ্যাসিবাদের সাথে যায় না। ফ্যাসিবাদ  ইহলৌকিক সঙ্কল্পের মধ্যে জন্ম নেয়। আমরা যদি ফ্যাসিবাদের দার্শনিক ইতিহাস খেয়াল করি তাইলে বিষয়টি পরিস্কার দেখতে পাব। তখন মার্কসবাদিদের খামতিও চোখে পড়বে।

প্রথমে আমার যদি দেখি মার্কসবাদিরা ফ্যাসিজমকে কিভাবে বুঝেছে তাইলে পুরো ব্যাপারটি সহজেই ধরে ফেলতে পারব। স্বীকার করতে হবে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক আলোচনায় মার্কসবাদিদের অবদান অসামান্য। কিন্তু কর্পোরেট ক্যাপিটালিজমের মধ্যে এসে তারা দেখলো এতো দিন তারা যা বলে এসেছে তা তো আর কাজ করছে না। তারা যে টোটালিটিরিয়ান এপ্রোচের কথা বলেছে তা তো সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজি নিজ বৈশিষ্ট্যগুণেই ধারণ করে। তাইলে ফ্যাসিজমের তর্কটা যেভাবে তারা জাতীয় আন্দোলনের সাথে শ্রমিক শ্রেণিকে হাজির করার মধ্য দিয় উৎরে যেতে চেয়েছেন তা তো ফেইল করেছে। খোদ রাশিয়াতে শ্রমিক বিপ্লবের পরে উত্থান ঘটেছে ভয়াবহ সমাজতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের। তখন পোস্টমর্ডান এরেনার অনেক তাত্ত্বিক সাইকোলজির আলোচনা করে মার্কসবাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের আলোচনার পদ্ধতিগত খামতি দূর করার চেষ্টা করেছেন। এতে মেথডলজিক্যাল মাত্রা যোগ হয়েছে সন্দেহ নাই কিন্তু ফ্যাসিজমকে মার্কসবাদ দিয়ে মোকাবেলা করা যাবে এই বিশ্বাস বা নজির কায়েম হয় নাই।

বিশেষ করে বলতে হবে, রাষ্ট্রে এবং জাতীয়তাবাদের ধারণার সাথে ফ্যাসিবাদকে যেভাবে একসাথে আলোচনা করা হয় তা এখন ইরিলিভেন্ট। কারণ রাষ্ট্র এখন আর ষাটদশকের রাষ্ট্র ধারণায় আটকে নাই। টেকনোলজি আর কর্পোরেট গ্লোবাল ওয়াল্ড অর্ডার এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে হিটলার বা মুসুলিনি টাইপের ফ্যাসিজমের দিন শেষ। স্টেট মেশিনারির ভূমিকাটা অতি ফাংশনাল। এর ইডিওলজিক্যাল স্টেন্থ বা বল আর বাস্তব কারণেই এতো জোড়ালো হবে না। সে যতো মহান জাতীয়তাবাদই হোক। কনজিওমার কালচারাল সোসাইটিরর সাথে আধুনিকতার যোগ এর সাথে বিজ্ঞাপনী স্বদেশ প্রেম মিলে বড়জোর একটা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজম তৈরি হতে পারে। যেটা বাংলাদেশে হয়েছে। কিন্তু এর ভবিষৎ অতি করুণ পরিণতিতেই শেষ হবে। কারণ নতুন রাজনৈতিক চৈতন্য দাঁড়ানোর সাথে সাথে এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য ধসে যাবে। সেটা যদি বুর্জোয়াও হয় তাও এই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজম দাঁড়াতে পারবে না। কোন কারণ নাই। এখন মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,  তথাকথিত প্রজন্ম দেখে আমরা যদি ভড়কে যাই তাইলে খুব হাস্যকর হবে ব্যাপারটা। শাহবাগ গোটা বাংলাদেশ না।

এই ধরনের ফ্যাসিজম লিবারিলজমকে উৎসাহিত করে। গণতন্ত্রের কথা বলে, উন্নয়নের কথা বলে। এর আসল গোমরটা হলো,    “Fascism steals from the proletariat its secret: organisation. … Liberalism is all ideology with no organisation; fascism is all organisation with no ideology.” (Bordiga)

শ্রমিকরা দ্রুতই লিবারাল জাতীয়তাবাদি আদর্শের দিকে ফিরে আসে, তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে অবস্থা গড়ে ওঠে তাকে লিবারাল বলা হলেও, এই লিবারাল শক্তি যখন ক্ষমতার ধারক-বাহক হয়ে ওঠে তখন আর তার কোনো আদর্শ থাকে না। সাংগঠনই তার এক মাত্র ভরসা। সেই দিক থেকে কোনো রজনৈতিক দল যদি মনে করে যে দেশে একমাত্র তারাই থাকবে আর কারো থাকার দরকার নাই তাইলে তাকে ফ্যাসিস্ট বলা হয়। এই প্রবণতায় বাংলাদেশ জন্মের সময়ই আওয়ামী লীগ আক্রান্ত হয়েছিল। পরে এর করুণ অবসান আমরা দেখেছি। এখনকার বাস্তবতায় কোনভাবেই আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নাই। সেই মতাদর্শিক শক্তি যেমন নাই। লোটপাটের রাজনীতির কারণে সাংগঠনিক কাঠামো দিয়েও ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখা যাবে না। ভারসা পুলিশ-র্যা ব-সেনা। যা এখন চলছে। সারাদেশের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের নেতারা গণ প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন। পুলিশের রাইফেলের নলের ওপর ক্ষমতা টিকে আছে। এটা অতি মামুলি সরকারের নমুনা। একটা সাধারণ জনপ্রতিরোধই এটা ধসিয়ে দিতে পারে। ফলে ফ্যাসিজম বলতে যে অতি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর সার্বিকীকরণ বুঝায় তার কোনো বৈশিষ্ট্যই এখানে হাজির নাই।

সবচেয়ে বড় কথা হলো ফ্যাসিজমের জন্য ‘অপর’ বা মোরল এনিমি লাগে। এটা বাংলাদেশে সম্ভব না। অন্তত আওয়ামী লীগ কোনো মোরাল এজেন্সি আকারে হাজির হতে পারবে না। এই ক্ষেত্রে তার একমাত্র ভরসা ৭১ এর চেতনার সাথে ডিজিটালইজড কালচারের উল্লম্ফনকে উন্নয়ন বলে চালু করা। এটা করাও হয়েছে। কিন্তু এই ধারাটা সাবস্ত্য হয়েছে নাস্তিক্যবাদি ধারা বলে। ব্লগ বা কম্পিউটার টেকনোলজির ধারক-বাহকরা যে চৈতন্য নিয়েই হাজির হোক না কেন জনসমাজে এরা ধর্মদ্রোহীর সিল খেয়ে গেছে। শাহবাগ এই অবস্থার তৈয়ার করেছে। ফলে বিজ্ঞাপনী স্বদেশ প্রেম ও চেতনার ঢোল দিয়ে ক্ষমতার বৈধতা পাওয়া যাবে না। জনসম্মতি এই চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন শক্তির অপেক্ষায় আছে। আবুল মনসুর আহমদ অনেক আগে যেটা বলেছেন তা খুব খাঁটি কথা। তিনি আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিচালনার ভার এমন সব অতি-প্রগতিবাদি লোকের হাতে পড়িতেছে যারা ইসলামী রাষ্ট্র আর মুসলিম রাষ্ট্রের পার্থক্য বুঝেন না বা বুঝিতে চাহেন না।’

এই সমাজের বহুত্ববাদি ধারা এতো পাশাপাশি থাকে যে এই সমাজে কমিউনাল আচরণই রুটেট হয় নাই। যে কারণে ব্রাক্ষ্মণ্যবাদ এখানে সুবিধা করতে পারেনি। ফলে ঐতিহাসিক বাংলাদেশের দিক তাকালে আমরা দেখব এখানে ক্লাসিক অর্থে ফ্যাসিবাদ সম্ভব না। হতে পারে না।কতিপয় ফেটিশ মিডেলক্লাস ভোগবাদি আধুনিক চেতনার সাথে কর্পোরেট জাতীয়তাবাদির চেতনার আলোকে যে সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করেছে তাকে অকাট্য সত্য আকারে ধরে নেবার কোনো মানে হয় না।

মার্কসবাদিরাও যে এই সাংস্কৃতিক বিভাজন এর রাজনীতি বুঝেন না এমন নয়। তারা বার বারই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলে আসছেন। কথা হলো আধুনিকতার কোনো পর্যালোচনা না করে কি করে আপনি মার্কসবাদ দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লব করবেন? মার্কসের অরিয়েন্টাল প্রবলেম তো আর অজানা নয়। ধর্ম ও রাষ্ট্র প্রশ্নে মার্কসের চিন্তার খামতিগুলো তো আপনাকে আগায় নিতে পারবে না। এই দিকগুলা নিয়া এখনও যথেষ্ট আলাপ হচ্ছে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কথাটা অনেক বেশি মিসইউজ করা হয়। খুব বেশি রেটিরিক্যাল ব্যবহার হয়েছে কথাটার।
‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ বইতে ফরহাদ মজহার যে আলোচনা করেছেন আর ১৯৩৪ সালে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে আলোচনা করেছেন তার তরিকা বা পদ্ধতি প্রায় একই। আমরা এই দুই আলোচনার গুরুত্ব স্বীকার করে বিষয়টিকে আর বিষদভাবে বুঝার চেষ্টা করছি।

ফরহাদ মজহার বলছেন, ফ্যাসিবাদ শ্রমিক শ্রেণির গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে। তিনি মনে করেন ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সঙ্কটও বটে। ফ্যাসিবাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদি উগ্রতা অনিবার্য বলে তিনি মনে করেন। তিনি মার্কসিস্ট জায়গা থেকে বেশ জোরালো আলোচনা করে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের আছড় ব্যাখ্যা করেছেন। এই ব্যাখার সাথে অনেকে দ্বিমত করতে পারেন। আমি এই ব্যাখ্যার রেটরিক্যাল পয়েন্টের সাথে একমত আছি। কিন্তু এসেনশিয়াল আর্গুমেন্টে আমি অন্য জায়গা থেকে তর্ক তুলব।

রাষ্ট্র,গণতন্ত্র আর ফ্যাসিবাদের সম্পর্ক নিয়া পুরোনো ধাচের আলোচনায় আর কোনো ফায়দা হবে বলে মনে হয় না। গণতন্ত্রের শাসনতান্ত্রিক ফাঁকি এখন সুবিদিত। কেউ আর গণতন্ত্রকে আদর্শ ধরে রাষ্ট্রের আলোচনা করেন না। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৪ সালেই বলেছেন, ‘ফ্যাসিস্টদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করায়ত্তকরণকে বিপ্লব বলে অভিহিত করলে থিওরেটিক্যাল নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেওয়া ছাড়া কিছুই হবে না। শ্রমিক-বিপ্লবকে বিধ্বস্ত করে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা বজায় রাখাই ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এবং আজও আছে।’ [ঠাকুর, ফ্যাসিজম পৃষ্ঠা ২০]

ফলে মার্কসবাদের রাষ্ট্র সম্পর্কে যেমন অমীংসা রয়ে গেছে তেমনি ফ্যাসিজমকে দেখবার ধরনেও গলদ রয়েগেছে। তারা মনে করেন জাতীয়তাবাদি আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির গণতান্ত্রিক ক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিজম ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু এই অবস্থার স্বপক্ষে এখন আর কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বিখ্যাত চিন্তক, দার্শনিক আলী শরিয়তী বিষয়টি বেশ ভাল ভাবেই ধরতে পেরেছেন। শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বকে তিনি ফ্যাসিজমের সাথে মিলিয়ে পাঠ করেন। তিনি মনে করেন,‘মার্কসবাদ ও ফ্যাসিবাদ উভয়ে শ্রমিকশ্রেণের দিকে না ঝুকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অন্বেষণ করেছে। তাই মধ্যবিত্ত বুর্জোয়ারাই এটির অনুগামী হয়েছে ব্যাপকহারে।’
[ ম্যান মার্কসিজম এন্ড ইসলাম-আলী  শারিয়াতী]

এখন লেলিন বলছেন শ্রমিক শ্রেণি বাইডেফিনেশন পেটি-বুর্জোয়া। তাইলে এরে দিয়া ফ্যাসিবাদ ঠেকানো তো দূরের কথা উল্টাটাই হয়। এরা জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে যে তাড়না থেকে ঝাপিয়ে পড়েন, পরে তার বাসনাই তাকে ফ্যাসিবাদে শরিক করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরর্বতী সময়ে রক্ষী বাহিনী সাংবিধানীক জুলুমবাজি শুরু করলে নগদ সুবিধার লোভে অনেক মানুষ এতে শরিক হয়েছিল।

আমারা দেখলাম মার্কসবাদ এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেনি। আমাদের এখানেও ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে আলোচনা খুব বেশি আর আগায়নি। এখানকার অবস্থা আরও ভয়াবহ। মুজিবের হাতে মাওবাদিদের নিধন শুরু হয়েছিল এটা বিএনপিও কনটিনিও করেছে, ক্রসফায়ার করে কমিউনিস্ট খতম করেছে। আর অন্য বামগুলা কম বেশি সরকারি বামে পরিণত হয়েছে। যারা বাইরে আছে তারা মুখে বলে দুনিয়ার মজদুর কিন্তু চর্চা করে এলিট সংস্কৃতি। তাদের সাহিত্য থেকে শুরু করে জীবন যাপনে গণবিচ্ছিন্নতার খুপড়ি কালের অভিশাপের মতো আঁটা।  জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম তা গণতন্ত্রের নামে বা সমাজতন্ত্রের নামে যে ভাবেই চালু হোক না কেন তার ফ্যাসিবাদি একটা রোল কয়েক দিনের মধ্যেই চাড়া দিয়ে ওঠে। এটা পৃথিবীর নানা দেশের ইতিহাসের দিকে বা শাসনতান্ত্রিক খামতির দিকে তাকালে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারব। এর সাথে সাম্রাজ্যবাদ, গণতন্ত্র,  ওয়ার অন টেরর ও কর্পোরেট জাতীয়তাবাদের মিশেলের কারণে ফ্যাসিবাদের তর্কটা ক্লাসিকাল বা কেসেলে ধারার মধ্যে রেখে দিলে এখন আর কিছুই বোঝা যাবে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাসনা ও সিভিল সমাজের বিকৃত খায়েসের কারণে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদই সাংস্কৃতিক মূলধারা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মিডিয়া ও সংস্কৃতি নিয়ে আগের আলোচনা যারা খেয়াল করেছেন তারা বিষয়টি এতো দিনে পরিস্কারভাবে ধরে ফেলেছেন বলেই তা আর লিখছি না। এবার আমরা সংক্ষেপে ফ্যাসিবাদের গোড়ার আলোচনার দিকে ফিরব।

ফ্যাসিবাদের আলোচনা কতগুলো ফ্যাশন্যাবল স্টুপিডিটির জন্ম দিয়েছে। এই স্টুপিডিটির আবার দুইটা দিক আছে। এক. তাত্বিক উৎস নিয়া বিভ্রান্তি(মনে করা হয় মহান জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিক নিৎসে এইটার জনক) দুই. ঐতিহাসিক বিকাশধারা হিসেবে এবং আদর্শগত দিক থেকেও ইতালি এবং জার্মানিকে সব সবময় নজির আকারে পাঠ করা হয়।

ফ্যাসিবাদের আসল আদল খুঁজতে হবে মানুষের আচরণগত ও নিজের সম্পর্কে নিজের ধারণার মধ্যে। বা আমরা অন্যের সাথে কি ভাবে সম্পর্ক করি তার ধারণা ও ধরণের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের হদিস করতে হবে। পরে এর সাথে নানা কিছুর যোগ আমরা খতিয়ে দেখতে পারব। সেটা প্রাসঙ্গিকও বটে।

পশ্চিমে রেনেসা বিপ্লবের কালে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের পরম বিকাশের কালে ফ্যাসিবাদের সম্ভাবনা প্রথম যার হাতে বুনিয়াদি ভিত্তি লাভ করে তার নাম, ডেভিড হিউম। তার ১৭৩৯ সালে প্রকাশিত ‘মানবের প্রকৃতি’ বইটির উপ শিরোনাম ছিল নৈতিক বিষয়ে যুক্তির পরীক্ষামূলক পদ্ধতির সূচনার চেষ্টা। হিউম কে মনে করা হয় বুদ্ধিবাদি চিন্তক। কিন্তু তার বুদ্ধিবাদ এরিস্টটলীয় নয়। তিনি বেকন পন্থি। তিনি বিজ্ঞানকে ধর্মতত্ত্বের মতো ভ্রমাত্মক মনে করতেন। দেকার্ত যে যুক্তির জগৎ হাজির করেছেন তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দর্শনের নতুন দরজা খুলে দেন হিউম। তিনি যুক্তির জগৎকে হোলসেল মেনে নেননি। তিনি মনে করেন, আমাদের কর্মের নিয়ামক যুক্তি নয় আবেগ এবং আবেগের অনুবর্তী হওয়াই যুক্তির একমাত্র কাজ। তার বইয়ের শুরুতেই তিনি আবেগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি ‘প্যাশন’ শব্দটিও ব্যবহার করেছেন। তিনি আবেগ অর্থেই এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন।  হিউম রাষ্ট্র ধারণার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে প্রায় সুপার পাওয়ার টাইপের কোনো শক্তি এবং সব রকম কর্তৃত্ব কায়েমের হাতিয়ার মনে করতেন। সেই দিক থেকে তার চিন্তার মধ্যে ফ্যাসিবাদের উপাদান খুঁজে পেয়েছেন পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসবিদরা। কিন্তু তার চিন্তার গুরুত্ব এতই যে কান্ট বলেছেন, হিউম তাকে র্নিবিচারবাদি তন্দ্রা থেকে জাগিয়ে দিয়েছেন।

হিউমের মধ্যে যে উম্মদগ্রস্ততা ছিল তা পরবর্তী সময়ে ফিরে এসেছে। হিউমের দর্শনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাজির হন কান্ট। তিনি বিশুদ্ধ যুক্তি খোঁজ করলেন। কান্টের অনুসারী বিখ্যাত ফিশতে দর্শন থেকে রাজনীতিতে এসে শুরু করলেন ‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’। এই বাদ-বিবাদের মূলে যে জিনিসটি নিয়ে এতো জল ঘোলা হলো তার নাম হলো যুক্তি। যুক্তি দিয়ে পরম সত্যে পৌঁছানোর দার্শনিক এক দুর্দান্ত লড়াই চলেছে পুরো সময়টা জুড়ে। পশ্চিমা দার্শনিকরা মনে করেন এই বাদ-বিবাদে যুক্তি যতই পিছে হটেছে ততই ফ্যাসিবাদের সম্ভাবনা বেড়েছে দার্শনিক ভাবে। এই দার্শনিক তর্কের মধ্যে যুক্তি বিরোধী শিবির যখন মুক্তি নয় ক্ষমতার প্রশ্নে নিজেদের চিন্তার অভিমুখকে তাতিয়ে তুলল তখনই ফ্যাসিবাদের বিকাশ সম্ভব হয়ে উঠল। এমনটাই মনে করেন পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসবিদরা। আধিপত্য করার বাসনা থেকে জড়িত হয়ে পড়েন রাজনীতির সঙ্গে। এই তালিকাতে আছেন, ফিশতে, কার্লাইল, মাৎসিনি, নিৎসে। এদের মধ্যে নিৎসে হলেন সবচেয়ে শক্তিশালী দার্শনিক। তার মতে মানবতা হলো একটি পরীক্ষামূলক বস্তু। তার প্রস্তাব হলো, পর্যাপ্ত মহৎ শক্তি অর্জন করা। ঢালাওভাবে যে ভাবে নিৎসে কে ফ্যাসিবাদের জনক মনে করা হয় তা ঠিক না। তিনি দার্শনিক হিসেবে অতিগুরুত্বপূর্ণ জেনিওলজি ধারণার পয়দা করেছেন। ইতিহাস ও ভবিষৎ কে নির্মাণের পদ্ধতিগত চিন্তার জন্য তিনি আজও যথেষ্ট গুরুত্ব দাবি করেন। অনেকে মনে করেন তিনি যেহেতু ইচ্ছা, অনুভূতি এবং সুখের চেয়ে ক্ষমতার আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন তাই তিনি ফ্যাসিবাদের প্রস্তাব করেছেন। এতো সরল হিসাবে দেখলে আমারা কিছুই ধরতে পারব না। আমি সাধারণ একটা লাইনআপ দেখালাম। এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দরকার আছে।

৯০ এর দশকের পরে ফ্যাসিবাদের আলোচনায় ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরির্বতন এসেছে। এখন ফ্যাসিবাদ কে শুধুমাত্র আর ইডিওলজির মামলা আকারে দেখা হয় না। এখন বরং মাস-মুভমেন্ট ও এর সাথে আদর্শের সম্পর্কের মধ্যে ফ্যাসিজমের আলোচনা করা হয়। এই বিষয়ে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনা শুরু করেছেন ডেভি রেনটন। আদর্শ এবং মাসমুভমেন্ট কি ভাবে ফাংশন করে সেই দিক থেকে ফ্যাসিজমকে বুঝার প্রস্তাব করেছেন রেনটন। তিনি মনে করেন, Fascism should not be understood primarily as an ideology,  but as a specific form of reactionary mass movement.

সব মুভমেন্টকে বিচার না করেও আপাদত খালি শাহবাগকে বিচার করলেই এখনকার ফ্যাসিবাদের চরিত্র উদাম হবে। ছোট্টো একটা উদাহরণ দেই, রবীন্দ্রনাথের ন্যাশন কি ভাবে পরে মাতৃতান্ত্রিক ফ্যাসিজমের হাতিয়ার হলো তা দেখতে পারা ইন্টারেস্টিং কাজ হতে পারে।
দিপেশ চক্রবর্তী যেমন বলেন, The prosaic and the poetic thus came to share a division of labor in Tagore’s writing…
The golden bangla of nationalist sentiments.  [ Nation  and Imagination]

পরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন আন্দোলনে এই সোনার বাংলা মিথ হাজির হলো। দেশকে মা, পবিত্র ভূমি, স্বর্গ হিসেবে উপস্থাপনার যে রেওয়াজ জারি ছিল তার হাত ধরে আমরা শাহবাগে দেখলাম মাতৃতান্ত্রিক ফ্যাসিজমের দূর্বল মহড়া। জাহানারা ইমাম কে দেখলাম জাতির মা হতে। তরুণরা সব রুমি হতে গড়ে তুলল ‘রুমি স্কয়ার্ড’-এই সব ঘটনা আমরা সেকেলে ফ্যাসিবাদের ধারণা দিয়ে ব্যাখা করতে পারব না। এর জন্য বিজ্ঞাপনী স্বদেশ প্রেমের সাথে উপনিবেশী ভোগবাদি সংস্কৃতির যে হেজিমনি বা আধিপত্য গড়ে ওঠেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে তার হদিস করতে হবে। এই রুমিরা ভিষণ রকম রবীন্দ্রপ্রবণ। তাদের অস্তিত্বের মর্মমূলে রবীন্দ্র চেতনা সব সময় জেগেই থাকে। এরা ঘুমায় না!  রবীন্দ্র নেশন তো পরাজিত হয়েছে দিল্লির কাছে। বেঁচে আছে এর কালচারাল আক্রোস। যা বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক উপনিবেশ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এর সাথে কর্পোরেট দেশ প্রেম, মূলধারা, মিডিয়া, ৭১ ও ভাষা মিলে এটা এখন কালচারাল ফ্যাসিবাদের রুপ নিয়েছে বাংলাদেশে। যেহেতু রাষ্ট্র গঠনের বুনিয়াদি কাজ এই বাঙালি চেতনা করতে পারেনি ফলে এর সম্ভাবনাও দিন দিন দূর্বল হচ্ছে। মিডিয়া ও সিলি-সিভিল সমাজের ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী এর প্রাণভোমরা হয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর চেতনার বিপরীতে ক্ষমতার রাজনীতিতে মেতে আছে। ফলে এটার সব রকম ফ্যাসিবাদি ন্যাশন থাকা সত্ত্বেও এটা কালচারাল ফ্যাসিবাদের বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারছে না।

বিশেষ করে মনে রাখতে হবে ষাটের দশকের পরে পশ্চিমে ফ্যাসিবাদের আলোচনটা একটা পরিণত রুপ নিয়েছে। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্য ও ইরোপের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদের সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে। অন্য দিকে দুইটা বিশ্বযুদ্ধের নগদ অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিম আর কোনো শিক্ষা না নিলেও  পশ্চিমা সমাজে ফ্যাসিবাদ নিয়ে আর কোনো মোহ ধরে রাখা যায়নি। ফ্যাসিবাদ যখন বলে মহত্বের আর কোনো বৈশিষ্ট্য নাই, যুদ্ধে সফল হওয়া ছাড়া। এই যুদ্ধে সাম্যবাদি শক্তি ফ্যাসিবাদকে রুখতে পারেনি। মার্কসবাদিরা ভুলে যান যে যুদ্ধের নিজস্ব মনস্তত্ব আছে। ফলে গণতন্ত্রকে আকড়ে ধরে পশ্চিমা সমাজ নতুন বিশ্বব্যাবস্থার প্রজেক্টে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর হয়ে হাজির হলো। কারণ ফ্যাসিবাদের পক্ষে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না। যাই হোক খুব সংক্ষেপে আমরা ফ্যাসিবাদের একটা পরিচিতিমূলক আলাপ সারলাম। এর আলোকে বাংলাদেশের এখনকার সমস্যাকে মোকাবেলা করার শিক্ষাই হবে কাজের কাজ।

download (1)

স্বৈরতন্ত্রের কবলে বাংলাদেশ :

ফ্যাসিবাদের বয়ানে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র একাকার হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য ছাড়া ফ্যাসিবাদ সম্ভব না। বাংলাদেশে যার কোনো ছিটেফোঁটাও নাই। তাই আমাদের অবস্থাকে ফ্যাসিবাদ না বলে শাসতান্ত্রিক বিকার বলাই ভাল। এই বিকার নানা বয়ানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ তৈরির চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এই চেষ্টার সফল ব্যবহার সম্ভাবনা জিরোপারসেন্ট। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষা, চেতনা ও আদর্শ বলে যা চিনে, বুঝে তা ১৯ শতকের উপনিবেশি কলকাতার বাবু সংস্কৃতিজাত। এর সাথে বাংলাদেশের কোন যোগ নাই। ফলে এই মধ্যবিত্তপনা দিয়া ফ্যাসিবাদ হবে না। এর দৌড় কালচারাল এলিটিজম পর্যন্তই। ফাঁকে পুলিশ ও ভারতের এবং মার্কিন রাজনীতির ছকে থেকে ক্ষমতার লিজিংটা ধরে রাখা। এটা সামন্য গণউত্থানেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

এখন মনে হচ্ছে, জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম নিয়ে মিথিক্যাল গৌরব গাঁথা এই ফ্যাসিবাদকে নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা জারি রাখতে সাহয্য করে। আজকে জনগণের ইচ্ছার তোয়াক্কা না করে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় টিকে আছে তখন আর ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না শাহবাগ কি দরকারী ভূমিকা পালন করেছে। সমাজের মৌলিক দুইটা চেতনার মধ্যে বিভাজন তৈরির করতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফাঁসির দড়ি আকারে হাজির করেছে তথাকথিত প্রজন্মের কাছে। এদের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন, প্রশাসন, আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার ভয়াবহ গাফিলতি কোনো ইস্যু হয় নাই। এই যে বিভাজনের রাজনীতি এর আবার স্পষ্ট শ্রেণি ও ধর্মীয় চরিত্র আছে। এর সাথে যোগ আছে মার্কিন ও ভারতের নিজ নিজ স্বর্থবাদি রাজনীতি। ফলে এখন বাংলাদেশের সঙ্কট আর ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। এই দিক থেকে দেখলে আমরা অধিকার হরণের রাজনীতির তাৎপর্য মূল শাসসহ ধরতে পারব। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর আফগানিস্তান নিয়ে যে ভূমিকা বাংলাদেশ নিয়ে এই ভূমিকায় হাজির হতে চায় ভারত। এই রাজনীতি ক্রমশ পরিস্কার হয়ে ওঠছে। জামায়াতকে দিয়ে ইসলামোফোবিক প্রপাগান্ডা তৈরি করে এটা কে জঙ্গি আকারে দাঁড় করিয়ে ধর্মযুদ্ধের নকশার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশকে। এই লেখা যখন লিখছি তখন দুইটা ঘটনা আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এক. জেএমবির সদস্যদের ফিল্মি কায়দায় দাঁড় করে পুলিশের ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। দুই. সশস্ত্র গোষ্ঠীর তালিকায় তালেবানের পরে শিবির । প্রথম আলো খবর করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংগঠন আইএইচএসের টেররিজম এন্ড ইনসারজেন্সি এটাক ইনডেক্স এই জরিপ করেছে। এর পরেও রাজনীতি বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা না। কি ভাবে গণহত্যা হয়ে দেশ ধর্মযুদ্ধের আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠছে তা দিন দিন পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। ফ্যাসিবাদের অনিবার্য যুদ্ধটা ধর্মযুদ্ধ আকারে হাজির হচ্ছে বাংলাদেশে। যে কোনো লেবেলের ফ্যাসিবাদ যুদ্ধ ছাড়া টিকতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা যে যুদ্ধের আউট লাইন দেখছি তা তো আর ইনটারনাল যুদ্ধ থাকছে না। তালেবান-আলকায়দা-জামায়াত-হেফাজত কে একাকার করে ট্রিট করার যে রাজনীতি তা আমাদের কে ফ্যাসিবাদের নিপুণ প্রহারায় ধর্মযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই ছক বুঝে জামায়াত এখনও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের লাইনে আছে। সরাসরি প্রতিরোধ যুদ্ধে নামেনি। যদিও দেশে একপ্রকার গৃহযুদ্ধের অবস্থা বিরাজ করছে। পরিক্ষামূলক ভাবে কিছু জামায়াত-শিবির এর লোকজনকে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়েছে। যেহেতু সমাজ সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ ও ৭১ এর মিথে বিভক্ত ফলে এই ক্রসফায়ার নিয়া মানবাধিকারের জায়গা থেকেও কোন আপত্তি উঠেনি। ফলে, এই গৃহযুদ্ধে ইসলামকে এনিমি বানানোর ফলে এটা দ্রুতই ধর্মযুদ্ধের রুপ নিবে এতে কোন সন্দেহ নাই। এর সাথে আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব মিল রেখে পাঠ করলে এই দিকটি বুঝতে পারা খুব কঠিন কিছু না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদি রুপান্তর শুরু হয়েছে জন্মের সময় থেকে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবেই উপনিবেশি উত্তরাধিকার ধরে রেখেছে। এখন আমাদের সংবিধানের ব্রিটিশি কাঠামো অটুট আছে। দলীয় চাকরবাকর মিলে একটা সংবিধান লিখে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিলো স্বাধীনতার পরে। যার কলিজার মধ্যে ব্রিটিশ ও পাকিস্তনী শাসন কাঠামোর মূল শাস রয়েছে। পরে এই সাংবিধানিক উপনিবেশিকতা জন্ম দিয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র। দেশে এখন কায়েম হয়েছে সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদ। এই সংবিধান এখন হয়ে ওঠেছে জবরদস্তিমূলক শাসনের কাগুজে ছল।

সংবিধান নিয়ে ৭২ সালেই আপত্তি জানিয়েছেন মওলানা ভাসানী। আবুল মনসুর আহমেদ সংবিধান প্রশয়ণের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হয়ে ছিলেন। তিনি ইত্তেফাকে বড় প্রবন্ধ লিখে হুঁশিয়ার করেছিলেন। তিনি লিখেন, রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের মতাদর্শকে জনগণের মত ও ইচ্ছা বলিয়া চালাইয়াছেন বহুবার বহু দেশে। সব সময়ই যে তা খারাপ হইছে তাও নয়। আবার সব সময়ে তা ভালও হয় নাই। পাকিস্তানের সংবিধানের বেলায় ‘ইসলাম’ ও বাংলাদেশের সংবিধানের বেলায় ‘সমাজতন্ত্র’ জাতীয়তা ও ধর্ম-নিরপেক্ষতাও তেমনি অনাবশ্যক ভাবে উল্লেখিত হইয়া আমাদের অনিষ্ট করিয়াছে। আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বহু জটিলতার সৃষ্টি করিয়াছে। [ সংবিধানের বিধানিক ত্রুটি,‘ আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ পৃষ্ঠা ৪৭৯]

ভাষানীর পত্রিকা ‘হক কথা’ এই সাংবিধানিক বিকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ভাবে লড়াই চালিয়েছে। এবং অবাক করা ব্যাপার হলো বাংলাদেশে প্রত্যেক সরকারই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই স্বৈরতন্ত্র কায়েম করার সুযোগ নিয়েছে। সংবিধানকে নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করেই স্বৈরতন্ত্র কায়েম করা হয়। এখন সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদের কবলে নতুন যে স্বৈরতন্ত্র দেখছি তার হিসেবে যেহেতু আন্তর্জাতিক স্বার্থ সরা-সরি জড়িত ফলে এর হিসাবটাও আর আগের মতো হবে না। এটা ইসলামকে এনিমি করার মধ্য দিয়ে ধর্মযুদ্ধের মার্কিন ছঁকে খেলছে। এর পরিণতি যে ভয়াবহ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বৈরতন্ত্র তো সাংবিধানিকভাবে সবসময়ই ছিল। লিবারাল বুদ্ধিজীবীরা সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়া অনেক দিন থেকে কথা বলে আসছেন। তাদের সাবধান বাণী ব্যার্থ করে দিয়ে এই সরকারের আমলে এসে স্বৈরতন্ত্রের উল্লম্ফণ ঘটেছে বলা যায়। বিরোধীতার কোনো কিছুই সরকারের আর ধাতে সইছে না। সংবিধানকে এমন এক ত্যানায় পরিণত করেছে এটা দিয়া আর ময়লা-অবর্জনাও পরিস্কার করার জো নাই। রাজনীতিতে বিরোধীতার শর্ত হাজির থাকবেই। এটা জানা কথা। কিন্তু হাসিনা সরকার কোনো বিরোধীতাই মেনে নিবেন না। তার শাসন কাল কে তিনি কাগুজে সংবিধান দিয়ে ইচ্ছামত বাড়িয়ে নিবেন। বিরুদ্ধ মত কে গুলি করে দমন করবেন! কোনো প্রতিবন্ধকতাই তিনি আমলে নিবেন না হিসাবই আর তিনি ধর্তব্য মনে করছেন না। এই অবস্থাকে বাংলায় বলে, ‘ধরা কে শরা জ্ঞান করা’।

আর এই কাজে তিনি যা করছেন ইংরেজিতে তাকে বলে, ‘পলিটিক্যাল ইউজ অব দা পাস্ট’। ৭১ এর মতো একটা ইভেন্টকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেন। ফলে স্বাধীনতার ঐতিহাসিকতা এখন কৌতুকে পরিণত হয়েছে।

এই অবস্থায় কোনো নাগরিকেরই অধিকার রক্ষা হতে পারে না। তা হচ্ছেও না। চেতনার নামে মধ্যবিত্ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসই উস্কে দিয়েছেন। চেতনার রাজনীতির উল্টা পিঠে আবির্ভাব ঘটেছে হেফাজতে ইসলামের। সেই সব ঘটনা কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু সরকার হেফাজতকে দমনের যে নজীরবিহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী লাইন নিয়েছে তা খোদ লীগের নেতাদেরই বিপদে ফেলে দিয়েছে। এমপিরা নিজ এলাকায় নিগৃহীত হচ্ছেন। ভোটের হিসেবে নেমে এসেছে কালবৈশাখী।

দুর্বল হোক সবল হোক যে কোনো ফ্যাসিবাদের জন্য যুদ্ধ হলো অনিবার্য। যুদ্ধ ছাড়া ফ্যাসিবাদ টিকতে পারে না। ফলে দেশে তো চোরা গৃহযুদ্ধ চলছে এক প্রকারে। এর সাথে দিন দিন যে ভাবে জামায়াতকে ও হেফাজতের মতো নাগরিক আন্দোলনকে একাকার করে শত্রুর কাতারে ঠেলে দেয়া হয়েছে তার পরিণতিতে ধর্মযুদ্ধের মেঘ পাকিয়ে উঠছে। এর সাথে মার্কিন ইন্টারভেনশন ও ভারতের স্বার্থও এসে জুটেছে একতালে। এই অবস্থায় নিদেন পক্ষে দেশে ভয়ের সংস্কৃতি চালু না করলে ফ্যাসিবাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল। লেডি হিটলার তাই সঠিক সময়ে সঠিক কাজটিই করেছেন বলতে হবে। আর ঠিক এই ফাঁকেই হাসিনা গং বাজাবেন জঙ্গিবাদের পুরানা কেসেট। অনন্ত যুদ্ধের প্রোজেক্টে হাসিনা নিজেকে আইরন লেডি প্রমাণ করার জন্য এই সকল রেফারেন্স পয়েন্ট ক্রিয়েট করছেন। ইউনূস এবং মার্কিন আপত্তির প্রতি সরকারের থোরাই কেয়ার ভাবের রাজনৈতিক পাঠ এখানেই নিহিত। এর প্রমাণ হিসেবে আপনারা মনে করে দেখতে পারেন, হাসিনা যখন নিজ দেশে নাগরিকদের গুলি করে মারছেন। তখন হোয়াইট হাউস জঙ্গি দমনে হাসিনার প্রসংশা করে তা আবার হল্লা করে প্রচার করেছে। এই ধারাবাহিকতায় রাজনীতির মাঠে হাসিনা সরকার টিকে যাবে কি না তা আগাম বলার কিছু নাই।

রাজনীতির সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়ানোর রাস্তা যেহেতু সরকার খোলা রাখে নাই। কোনো দাবির প্রতিই তার সায় নাই। সন্ত্রাসের বয়ান উৎপাটনে কাজে লাগনো হচ্ছে, মিডিয়া, চেতনা, ধর্ম, ডিজিটাল বয়ান, বিলবোর্ড ইত্যাদি নানা কৌশল।

জনগণের অধিকার হরণ করে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না। এই অধিকার হরণের রাজনীতির পরেও যদি জনগণের হুস না হয় তাইলে ফ্যাসিবাদের কবলে বাংলাদেশের রাজনীতি আটকা পড়বে। অদ্ভুত এক স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে কতিপয় লোকের লোটের রাজ্য।

এই অবস্থার জন্য আমরা নিজেরা কি প্রস্তুত হয়েই বসে আছি? আমার কেন এখনও নিজেদের মৌলিক তর্কগুলা হাজির করতে পারছি না। কেন আজও সব কিছু ধোয়াসা। পার্থ চট্রোপাধ্যায় যেমন বলেন, ভারতবর্ষের ইতিহাসে, তার নানা পরির্বতন, বিরোধ, নতুন ধর্মের প্রবর্তন, শাস্ত্রীয় ধর্ম আর লোকধর্মের নানা সংমিশ্রণের মধ্যে উচ্চ-নিচের পারস্পরিক ক্ষমতার বিরোধ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এই ইতিহাস আমরা অনুসন্ধান করে দেখিনি। ফলে ভারতীয় সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্বের চরিত্র এখনও আমাদের কাছে অস্পষ্ট[জাত-জাতি-জাতিয়তা: ইতিহাসের উত্তরধিকার]

কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাপারটা এতো অস্পষ্ট না। গণতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে এখানে গণবিরোধী ধারা হিসেবে নিজেকে হাজির করেছে ফটকা কথা-বার্তা দিয়ে। বামরা হয়েছে হাস্যকর জীব। ৭১ চেতনা হয়েছে গণহত্যাকারী। শহুরে বা মধ্যবিত্ত সমাজ আধুনিকতার এমন এক আফিমের ঘোরে মত্ত যে এর দ্বারা কোনো রাজনীতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। এমন পরিসস্থিতিতে আমাদের ইতিহাসের নতুন ইভেন্টের দরকার পড়বে। আর ইসলামের সাথে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে আন্দোলনের যে অবহেলিত ইতিহাস এই জনগোষ্ঠী আজও লালন করে তার প্রত্যাবর্তন দেখতে পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিতুমীর দুদ্দ শাহ ঘুমায় নাই এই শ্লোগান শুনা গেলে অবাক হবার কিছু নাই। ফলে ফ্যাসিবাদি কালচারাল মধ্যবিত্ত শক্তির বিরুদ্ধে যে শক্তি রাজনৈতিক হিম্মত নিয়ে আগাবে। যে নৈতিক এজেন্সি আকারে হাজির হবে। যে ইনসাফ প্রশ্নে আপোষহীন হবে আগামী বাংলাদেশর ইতিহাস হবে তাদের বিচরণ ক্ষেত্র। সে ইসলাম বা বৌদ্ধ যে চেতনারই হোক তা ধর্তব্য নয়। অন্যদিকে ইসলামের যে গ্লোবাল লড়াই জারি আছে তার আছড়ও বাংলাদেশে পড়বে। পড়াটাই স্বাভাবিক। ফলে আমাদের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও নৈতিক ঐক্য  ছাড়া আমরা আগামী দিনের লড়াইয়ে টিকতে পারবে না। এই দিকগুলো খেয়ালে রেখে আমাদের আগামী দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করাই এখন জরুরি কাজ। মজলুমের ঐক্যবদ্ধ লড়াই জালেমের জমানার অবসান ঘটাতে পারে। অন্যায় বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটাই ন্যায় যুদ্ধ। পাল্টা বলপ্রয়োগের বৈধতাও এভাবে তৈয়ার হয়। এর মধ্য দিয়ে সমাজে কায়েম হয় নতুন ন্যায়। এটা ডিনার পার্টি বা প্রবন্ধ লেখার মতো কাজ না। ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য পাল্টা ক্ষমতা তৈরি করার মামলা। এর জন্য প্রথম প্রয়োজন মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক লড়াইকে সংগঠিত করা। ফ্যাসিবাদের সমস্ত দুর্গ ধসিয়ে দেয়া।  আর এই লড়াইয়ে ইসলাম অবশ্যই মজলুমের পক্ষে।

‘জালেম ও শোষক যে কোনো ধর্মের, যে কোনো বর্ণের, যে কোনো দেশের বা সমাজের হউক না কেন তাহারা আল্লাহর শত্রু, সমাজের দুশমন। ইহা সর্বদাই শোষিত ভাই-বোনেরা মনে রাখিবেন। অন্তঃকরণ হইতে সর্বপ্রকার ভয়ভীতি দূর করিয়া জালেম ও শোষকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে জেহাদ করিতে না পারিলে শোষিত মজলুম মানুষের দুঃখ দুর্দশা কিছুতেই দূর হইবে না এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনও সম্ভব হইবে না’ [মওলানা ভাসানী ‘হক কথা’ প্রথম বর্ষ ২৬ তম সংখ্যা, ১৯৭২ সাল ২৫ আগস্ট]

 images (2)

আমাদের জনগণের লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে হাজির করতে হবে নতুন ন্যায়। ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে আমরা নিজেদের রাষ্ট্র দাঁড় করাতে না পারলে খুনের রাজত্বে লাশ পাশে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। লাশ…আমার আপনার আপনজনের লাশ। নিজেও লাশ হয়ে যেতে পারেন যে কোনো সময়। আপনার লাশ হওয়ার জন্য আদলতই যথেষ্ট। আছে পুলিশ লীগ, দলীয় ক্যাডার। মৃত্যু ফাঁদে আটকে পড়ছে বাংলাদেশ।

এই অবস্থায় নাগরিক অধিকার হরণের যেকোনো রাজনীতিকে সরাসরি প্রতিহত করা ছাড়া মানুষের মানবিক সম্মান রক্ষা হতে পারে না। প্রতিরোধের সংস্কৃতি আমাদের আছে। ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আমাদের প্রতিরোধের পথে ফিরতে হবে। মানবিক মর্যাদা রক্ষার লাড়াই সবচেয়ে পবিত্র লড়াই। অধিকার হরণ করলে মানুষের মান থাকে না। নি:সন্দেহে বাংলাদেশ এখন লড়াইয়ের দ্বারপ্রান্তে অপেক্ষা করছে। মানুষ বেরিয়ে আসবে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। কোনো দলের না কোনো গোষ্ঠীর না বাংলদেশের মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই। এই লড়াইয়ে বাংলাদেশই জিতবে কোনো ফ্যাদিবাদি স্বৈরতান্ত্রিক অপশক্তি নয়।

রেজাউল করিম রনি
কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মুক্তিযুদ্ধঃ জাতীয়তাবাদী আর সেকিউলার আধিপত্যের সাতকাহনে যেখানে ইতিহাস কারখানায় প্রান্তজনরা বিতাড়িত

খন্দকার রাক্বীব

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিনির্মাণে যে জাতীয়তাবাদী আর সেকিউলার ঢোপ গিলানো হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরী। কেননা, ইতিহাসের লক্ষণ হচ্ছে পরিপ্রেক্ষিতের বিচার। যার শুরু বর্তমান উত্থাপিত প্রশ্নের মীমাংসার সূত্র ধরেই। বর্তমান থেকে অতীতে যাওয়া তখনই, যখন অতীত সম্পর্ক অতীত পরিপ্রেক্ষিত – বর্তমান সম্পর্ক বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতকে ব্যাখ্যা করে। যা নির্মাণ করে ধারাবাহিকতা আর নির্দেশ করে ভবিষ্যতের। তাই বলা চলে, ইতিহাস হলো পরিপ্রেক্ষিতায়ন। কিন্তু পরিপ্রেক্ষিতায়নে ইতিহাসের চেতনা ক্ষমতানিরপেক্ষ বিষয় নয়। কারণ যুগে যুগে ইতিহাসের নির্মাতারা ছিল আধিপত্যবাদী। আধিপত্যবাদীদের তৈয়ার করা ইতিহাস ক্ষমতাধর এলিট শ্রেণীদের ভাবাদর্শিক বৈধতা-ই উৎপাদন করে। প্রান্তিক আর মজলুম মানুষদের অস্তিত্ব, তার চেতনা আর প্রতিরোধ সব-ই মুছে যায় বিদ্ব্যত সমাজের বয়ানে।

images

ইতিহাস চর্চায় এইভাবে আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক সাব-অল্টার্নদের আড়াল করার অপচেষ্টাকে প্রথম নতুন উসুল তথা তত্ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করান রণজিৎ গুহ। ভারতবর্ষের ইতিহাস চর্চা করতে গিয়ে তিনি দেখেন এখানকার ইতিহাস বিনির্মাণকালে নিম্নবর্গদের কিভাবে আড়াল করা হয়েছে। ‘on some aspects of the historiography of colonial india’ এবং ‘elemaentary aspects of peasant insurgency in colonial india’ নামক দু’টি গবেষণাকর্মে তিনি দেখান- ভারতবর্ষে আধুনিক ইতিহাসচর্চার শুরু হয় ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন থেকে নয়, বরং ইংরেজ শাসন ব্যবস্থা থেকে। রনজিতের অভিমত, ইংরেজরা পাশ্চাত্য শিক্ষার আদলে আমাদের দিক্ষিত করতে ইতিহাস বিদ্যার আমদানি ঘটায়নি, ভারতবর্ষের ইতিহাস ইংরেজ শাসনের হাতিয়ার হয়েছে আরও আগে। যখন ইংরেজরা দেওয়ানি লাভ করে তখন তারা তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে এখানকার স্থানীয় ভূ-স্বামী আর রাজকর্মচারীদের নিজেদের অনুগত করে ফেলে। ১৮শতকের ব্রিটিশ সমাজের আদর্শ অনুযায়ী, ইংরেজরা বুঝেছিল এখানকার স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠী আর ভূস্বামীদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হলেই রাজস্ব আদায় ও প্রশাসন সমস্যা মিটে যায়। যার ফলে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াদের স্বার্থ ও সুবিধা একই সঙ্গে স্বীকৃতি পায় ঔপোনিবেশিক রাষ্ট্রনীতিতে ও ঔপোনিবেশিক ইতিহাসবিদ্যায়। ফলত ‘ঔপোনিবেশিক উচ্চবর্গ’ আর ‘বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী’দের হাত ধরেই রচিত হয় ভারতবর্ষের ইতিহাস। রণজিতের বক্তব্য “এই ইতিহাস বিদ্যার জন্ম ইংরেজ রাজশক্তির ঔরসে এবং ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই তা ঔপোনিবেশিক শাসনকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠে। যারা এই ধারায় প্রথম ইতিহাস লিখেন তারা সরকারের কর্মচারি কিংবা সরকারের মদদপুষ্ট। তারা যে ইতিহাস লিখেন, তার উদ্দেশ্য হয় সরকারি শাসন ব্যবস্থাকে সিদ্ধ করা কিংবা বেসরকারি রচনা হলেও তার সাহায্যে ব্রিটিশ প্রভুশক্তি ও প্রভু সংস্কৃতিকে আরও জোরদার করা”। আর এদেরই তৈয়ার করা ইতিহাসে এখানকার দরিদ্র কৃষক, মজলুম সিপাহি আর প্রান্তিক মুসলমানদের খুব হীনভাবে আড়াল করা হয়। তাদের আবেগ, অনুভুতি আর প্রতিরোধের ইতিহাস চাপা পড়ে আধিপত্যবাদিদের ক্ষমতার নীচে।

 

রণজিৎ গুহের এই বয়ানটি উসুল আকারে হাজির করলেই আমরা দেখব, কিভাবে জাতীয়তাবাদী আর সেকিউলার আধিপত্যের সাতকাহনে ইতিহাস কারখানায় প্রান্তজনরা বিতাড়িত হয়েছে। জাতীয়বাদী আর সেকিউলার ঢোপ গিলিয়ে মুন্তাসির মামুন আর শাহরিয়াররা এদেশের মুক্তিযুদ্ধ চর্চার এজেন্ট বনে গেছে, যাদের বয়ানে এখানকার প্রান্তিক মুসলিমরা থাকে অবহেলিত। হাজার হাজার গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক আর উলেমারা অংশগ্রহণ করে এই যুদ্ধে। কিন্তু জামায়াত ইসলামিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই প্রতিরোধ সংগ্রামকে আজ একেবারেই লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডায়েরি’ কিংবা সংকলিত ‘একাত্তরের চিঠি’গুলো পড়লেই বুঝা যায়, মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে ইসলামের সাম্য আর জালিমের বিরুদ্ধে জেহাদের ডাকে শামিল হয়েছিল। আধিপত্যবাদি সেকিউলার গোষ্ঠী মহান মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের এই সাম্য আর ইনসাফের বয়ানকে আড়াল করে মৌলবাদি ইসলামের জুজু দেখিয়ে রাষ্ট্রকে ডি-ইসলামাইজেশন করছে।

 

অনুপস্থিত রেখেছে নারীদের লড়াকু প্রতিরোধকে। মুক্তিযোদ্ধার বদলে ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দ দিয়ে আড়াল করা হয়েছে বাঙালি নারীদের প্রতিরোধের ইতিহাসকে। ধর্ষিত নারীদের যুদ্ধ শিশুর কথা বলার সাথে সাথেই এই রাষ্ট্রের জাতির জনক কর্তৃক বলা হল ‘এই সব দূষিত রক্তকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দাও (আমি বীরঙ্গনা বলছি, নীলিমা ইব্রাহিম)।

তথাকথিত জাতীয়তাবাদী বয়ানে রাষ্ট্রকে মাতৃভূমি বানিয়ে রাষ্ট্র আর নারীকে সমান্তরালে নিয়ে আসে। নারীর ইজ্জত মানেই রাষ্ট্রের ইজ্জত! নারী যখন ধর্ষিত হয়, রাষ্ট্রের নাকি তখন ইজ্জতে কালিমা লাগে। এই কালিমা দূর করতে রাষ্ট্র এই ধর্ষিত নারীকে আর জাতীয়তাবাদী সমাজে মেনে নিতে চায়না! বিচিত্র বয়ান আসে তখন।

 

‘মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস’ বয়ানের মাধ্যমে আড়াল করা হয় আদিবাসি সাঁওতাল, গারো আর পাহাড়িদের প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস। চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে চাকমা আর মং রাজার নেতৃত্বে যেভাবে মারমারা যুদ্ধে নেমেছিল, তা আজ ইতিহাসে একরকম উপেক্ষিত। মাঝে মাঝে সামন্তবাদী প্রভুগোষ্ঠী ত্রিদিভ রায়দের উসুল হিসেবে ধরে রাষ্ট্র আদিবাসীদের এই সংগ্রামের বয়ান অন্যদিকে প্রবাহিত করে। সামন্তপ্রভুদের দোষে পুরো নিরীহ জাতিগোষ্ঠীদের রাষ্ট্র ঔপোনিবেশিক কায়দায় উপজাতি বানায়া রাখতে চায়। মানে তাদের কোন জাত নাই…!!

 

আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধের বয়ান রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্ন নয়, ঔপোনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক শাসনের স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙ্গে একটি স্বাধীন রিপাবলিক গঠনের সোচ্চার উচ্চারণ। রুশোর ভাষায় যেটা একটা সামাজিক চুক্তি, এবং যে সামাজিক চুক্তির ভিত্তি হচ্ছে জনগণের সাধারণ ইচ্ছা। স্বাধীন রিপাবলিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনগণের এই সাধারণ ইচ্ছাটি সংজ্ঞায়িত হয় কেমন করে?   বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একেবারে গোড়ার গলদটাই হচ্ছে সাধারণের ইচ্ছা ব্যতিরেকে বিশেষের ইচ্ছায় রাজনৈতিক সংস্থা গঠন। আধিপত্যবাদী সেকুলাররাই এই রাষ্ট্রের সাধারণ ইচ্ছাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। একটি গণবিপ্লবের পর সমাজে ক্রিয়াশীল গণ সংগঠনগুলোকে বাদ দিয়েই রচিত হয়েছে জনগণের সামাজিক চুক্তির দলিল।, বাংলাদেশের সংবিধান। গন্তন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতিয়তাবাদের লেবেলে এঁটে কেমন করে স্বৈরতন্ত্রী সংবিধান রচনা করা যায়, তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশের সংবিধান। যেখানে বাঙালি মৌলবাদীরা নিজেদের বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠি বলেনা, কিন্তু অপরকে ঠিক-ই বলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। চেপে যেতে চায়, প্রান্তিকদের বয়ান।

raquib_bdf@yahoo.com

 

 

পাকিস্তান ও ভারত নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে

ধরা যাক পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে খেলা হচ্ছে ঢাকা স্টেডিয়ামে। খেলা দেখতে এসেছে হিনা রাব্বানী – বসে আছেন ভিআইপি বক্সে। দর্শকদের উত্তেজিত অংশের একজন গালের মধ্যে লিখে নিলেন: “ভইরা দিমু হিনা”। সেটা দেখানো হোলো টিভিতে। পরের দিন অনলাইনে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে? একটু সততার সাথে কল্পনা করুন।

– চরম মামা চরম
– সিরাম হইছে বস
– আমারটাও সাথে নিয়েন কইলাম
– আস্তে দিয়েন বস, পিছনে আছি

যিনি ভরে দিতে চান তাকে বীরের সম্ভাষণ দেয়া হবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে (এটাও এক অদ্ভুত প্রবণতা আমাদের, ভার্চুয়াল আর রিয়ালের মাঝে কোনো পর্দা দেখি না আর)। এবার একটু অন্যভাবে কল্পনা করুন। যে মেয়েটি “ম্যারি মি আফ্রিদি” লিখেছিলো সে কি “ভইরা দিমু হিনা”রই নারী সংস্করণ নয়? দুটোর মাঝে কি খুব পার্থক্য আছে? দুজনই বিপরীত লিঙ্গের একজন বিখ্যাত পাকিস্তানীকে কামনা করেন। কিন্তু মেয়েটাকে দেখা হয় অবক্ষয়ের নিম্নতম নিদর্শন হিসাবে আর ছেলেটাকে দেখা হবে বীর হিসাবে (তবে একটু ফাজিল টাইপ)।

ম্যারি মি আফ্রিদি নিয়ে ফেসবুকে যে সমালোচনার গণজোয়ার তার অন্তর্নিহিত কারণটি হোলো সেক্সিস্ট। ট্রাইবাল মানুষেরা বিভিন্ন সময়ে অন্য গোত্র দ্বারা নিজের গোত্রের মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়াকে জীনপুলের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখেছে (ম্যারি মি আফ্রিদি’র প্রতিক্রিয়া) কিন্তু একই সাথে অন্য গোত্রের মেয়েকে উঠিয়ে আনাকে দেখেছে শিরোপা হিসেবে (ভইরা দিমু হিনা’র প্রতিক্রিয়া)।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে আমি প্রথম অনুধাবন করি যে পাকিস্তান ও ভারত দুটো দেশ সম্বন্ধে আমাদের যে বক্তব্য তার প্রায় আগাগোড়াই ভণ্ডামিতে ভরা এবং যেহেতু সমাজে এ প্রসঙ্গে একটা হাশ হাশ প্রচলিত (কেননা সবাই এ প্রসঙ্গে কতোটা পলিটিকালি কারেক্ট বক্তব্য দেয়া যায় তারই প্র্যাকটিস করেন, সত্যের কিংবা নিজের মনের ধার ধারেন না), সেহেতু ক্রমাগতই দুটো দেশ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা অসুস্থ থেকে অসুস্থতর হচ্ছে। আমি এ নিয়ে কিছু বলতে চাই।

Image

আমার প্রথম অবজারভেশন হোলো সংজ্ঞার সমস্যা। পাকিস্তান বলতে দেশপ্রেমিক পাকিস্তানের সরকার বোঝায় না ভূগোল বোঝায়, না রাজনীতি বোঝায়, না সংস্কৃতি বোঝায়, না কি ঐ দেশের প্রতিটি ব্যক্তিকে বোঝায় এ সম্বন্ধে তার পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। উদাহরণ দেয়া যাক। মশিউল আলমের একটা গল্প বেরিয়েছিলো কয়েক বছর আগে “পাকিস্তান” নামে। এই গল্পে লেখক নিজেই বলছেন যে, “আই হেইট পাকিস্তান! আই হেইট অল অফ ইউ, পাকিস্তানিস!” এবং বলেছিলেন এক পাকিস্তানীকেই। ভালো কথা। আপনি সকল পাকিস্তানীকে ঘৃণা করেন কায়মনোবাক্যে – এর মধ্যে কোনো যদি কিন্তু নাই।

কিছুদিন পরের কথাও লেখক আমাদের জানান এই গল্পে। ইমতিয়াজ নামের যে তরুণকে এই কথাটা লেখক শুনিয়েছিলেন তার বোনকে দেখেই তিনি তার প্রেমে পড়ে গেলেন। তখন কিন্তু তিনি ভুলে গেলেন যে ইমতিয়াজের অনিন্দ্য সুন্দরী বোন ফারহানা কিন্তু বাঙালি নন, পাকিস্তানীই। সম্ভবত মশিউল আলমের মনে পাকিস্তান নামের যে ধারণা, তার মধ্যে মেয়েরা অনুপস্থিত – অন্তত ফারহানাকে যে পাকিস্তানের ঘেরাটোপে আটকে রাখা যাবে না সেটা নিশ্চিত। পাকিস্তানী মাত্রই ঘৃণিত, শুধু সুন্দরী মেয়েরা দুধভাত।

মনে করবেন না এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যারা বাংলাদেশে থাকেন তারা যেহেতু ব্যক্তিগত জীবনে ভারতীয় ও পাকিস্তানীদের খুব একটা দেখেন না সেহেতু তাদের পক্ষে ধারণা করা কঠিন যে দেশপ্রেমিক জনগণ যখন আসলেই ভারতীয় ও পাকিস্তানীদের সামনাসামনি হন তখন কী করেন। আই হেইট অল অফ ইউ, পাকিস্তানিস, ইন্ডিয়ানস মুখে বলা খুব সহজ। যারা ঘৃণা-বিদ্যায় এতো পারদর্শী তারা পাকিস্তানিস কিংবা ইন্ডিয়ানস দের ভিড়ে আসলে কী করেন সেটা না দেখলে তাদের কনভিকশানের দৌড় কতোদূর এটা বোঝা মুশকিল।

সৌভাগ্যক্রমে আমি এই তামাশা অনেক দেখেছি – অনেক। সাম্প্রতিকতম একটা উদাহরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশের এক চরম পাকিস্তান বিদ্বেষী ও আওয়ামী মনোভাব সম্পন্ন পরিবারের মেয়ের কথা। আমাদের এক বন্ধুর বন্ধু। অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন বহু বছর – বাংলাদেশে খুব ভালো পরিবার বলে কী একটা জিনিস আছে না – ওটা মেয়েটির আছে। কিছুদিন আগে হুট করে দেখি যে এই মেয়ের নতুন বয়ফ্রেন্ড পাকিস্তানী – আবার তার সাথে কথাও বলে উর্দুতে (যদিও এই মেয়ে খুব ভালো ইংরেজি জানে)। মেয়েটার ভাষ্যে এই ছেলেটা শুধুই পাঠান – এন্ড য়ু নো পাঠানস আর নট রিয়ালি লাইক পাঞ্জাবিজ।

দেখুন আমার দৃষ্টিকোণে খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয় – আপনি হিন্দু, পাকিস্তানি, আরব যে কারো প্রেমে পড়তেই পারেন (তবে এরশাদ এরশাদ খেলায় একটু অরুচি আছে) – কিন্তু আপনি তো আগে একটা শর্ত নিজেই বসিয়েছিলেন যে আই হেইট অল অফ ইউ, পাকিস্তানিস – এটা তো আমার কথা না। তাহলে কেন একটা পাকিস্তানীর সাথেও বা প্রেম।

এর বিপরীত নক্সাটা এতোই সহজলভ্য যে আলাদা করে কিছুই বলার নেই। দেশটারে ইন্ডিয়া ফাকায় দিচ্ছে, মালুগুলারে সাইজ করা দরকার, পোন্দে মাতরম – বলেন জাতীয়তাবাদী। যে ঘরে টিভি সেখানেই রয়েছে আয়াতুল কুরসীর ক্যালিগ্রাফি কিন্তু মুন্নী বদনাম হলে তিনি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না। কোনো এক অদ্ভুত কারণে তার নীচের তলার অভিষেকের বাবা-মা যার চোদ্দ গুষ্ঠীর কায়কায়বার এই দেশে, – তারা ইন্ডিয়াকে রেপ্রেজেন্ট করে কিন্তু মুন্নী ইন্ডিয়াকে রেপ্রেজেন্ট করে না কারণ মুন্নী তাকে আরাম দেয়। আরামদায়ীর কোনো ধর্ম ও জাতীয়তা হতে নেই।

বাংলাদেশে অবস্থা দাড়িয়েছে এমন যে পাকিস্তান ও ভারত সম্বন্ধে আপনার আসল মনোভাব কি সেটা ভুলেও উচ্চারণ করা যাবে না কারণ যদি ব্যালান্সিং এক্টে আপনি সামান্য ভুল করেন তাহলে আপনি হয় হবেন ছাগু কিংবা রাজাকার না হয় হবেন দালাল কিংবা চেতনাবাজ। ক্রিকেটের সময় আসলে ঘৃণার পারা আরেকটু উপরে উঠে – তখন আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি পাকিস্তান ও ইন্ডিয়া উভয়কেই পাক্কা সমান ভাবে ঘৃণা করেন এবং শুধু বাংলাদেশের সাথেই আপনার ঘনপ্রেম।

এই বিচিত্র প্রবণতা কেন গড়ে ওঠে বাংলাদেশে – অনেক ভেবেছি এই নিয়ে এবং পেয়েছি অনেক কারণ; কিন্তু সর্বপ্রথম কারণ হোলো এইটি: আমি নিশ্চিত হয়ে বলছি – মনের কোনো এক কোণে আমরা নিজেদের পাকিস্তানী কিংবা ভারতীয়দের সমকক্ষ বলে মনে করতে পারি না। মনে করি যে আমি ওদের চেয়ে ইনফিরিওর।

এই ইনফিরিওরিটির কারণে আপনার একটা ক্রোধ সৃষ্টি হয় আর এই ক্রোধের পলিটিকালি কারেক্ট এক্সপ্রেশন হোলো “আই হেইট অল অফ ইউ, পাকিস্তানিস” কিংবা “পোন্দে মাতরম” – নিজ নিজ পরিমণ্ডলে। (দয়া করে ভাববেন না যে ইন্ডিয়ানদের চেয়ে নিজেকে ইনফিরিওর মনে করে সে পাকিস্তানিদের তুলনায় নিজেকে খুব সুপিরিওর মনে করবে। এই যে না জেনে, না বুঝে শুধুমাত্র জাতীয়তা কিংবা চেহারা-সুরত দেখে কারো থেকে নিজেকে ইনফিরিওর কিংবা সুপিরিওর মনে করা – এটা একটা মূর্খতাজনিত রোগ। যে একবার ইন্ডিয়ানদের তুলনায় নিজেকে ইনফিরিওরয়র মনে করেছে সে খুব সম্ভবত শাদাদের চাইতেও নিজেকে ছোটো মনে করে)।

যে মানুষ নির্বিচারে ঘৃণা করতে সক্ষম, অর্থাৎ ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা, ইতিহাস কোনো কিছুর ভিত্তিতে আরেকটা মানুষকে না জেনেই তাকে ঘৃণা করে সে সুনিশ্চিতভাবে অক্ষম মানুষ। ঘৃণা একটি খুবই মূল্যবান অনুভূতি। কাজের মানুষ এটা অকাতরে বিলোয় না – সেটা করে গর্দভরা।

আপনি যদি কোনো একটা জাতিকে যে কারণেই হোক ঘৃণা করবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তাহলে আপনি নিজেকে একটা শর্তের মধ্যে আবিষ্কার করেন। শর্তটা কী বোঝানো মুশকিল – চেষ্টা করি। ইমতিয়াজ পাকিস্তানি। আপনার মনের মধ্যে ইমতিয়াজের যে অস্তিত্ব সেটা “অস্তিত্ব” হিসেবে কেবল তখনই কোয়ালিফাই করবে যখন আপনি তাকে ঘৃণা করবেন। ফলে ইমতিয়াজের অস্তিত্বকে একটা ঘৃণা-নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কল্পনা করাও মুশকিল। এর পরেই আপনি নিজেকে বোঝাতে সক্ষম হবেন যে এই যে আপনি ইমতিয়াজকে ঘৃণা করছেন – এর মাধ্যমে যে একটা বিষয়কে “পবিত্র” মানেন (এই ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা) সেই পবিত্রতাকে গৌরবমণ্ডিত করছেন। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পবিত্র ও শুদ্ধতর হয়ে উঠবে আপনার কাজ দিয়ে না, মনের ঘৃণা দিয়ে।

এই পর্যায়টি খুব বিপজ্জনক একটা পর্যায়। কেননা এই সময়ে দেশপ্রেমিক নিজের প্রতি তীব্র একটা ভালোবাসা বোধ করে। এই ভালোবাসা হোলো মহত্তর একটা পবিত্রতার মাঝে নিজেকে শামিল করতে পারার তুষ্টি-জনিত গর্ববোধ। অক্ষম আবিষ্কার করে যে সে আর কোনোভাবেই তুচ্ছ নেই। বেভারলি হিলসে Chopard এর দোকানের সামনে দাড়ালেই যেমন মনে হয় এই বুঝি প্রীটি ওমেনের জুলিয়া রবার্টস বেরিয়ে আসবে এবং সব কিছু সিনেমা হয়ে যাবে।

বিপজ্জনক বলছি এজন্যে যে একজন বামন মানুষ এই ঘৃণার মৌতাত একবার খুঁজে পেলে তার পক্ষে এমন দ্বিতীয় কোনো মৌতাত খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন যা ঘৃণার মৌতাতকে টেক্কা দেবে। সে বারে বারেই ঘৃণার মাঝেই তার চৈতন্যের সারবত্তা খুঁজে পাবে। আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি – খুঁজে দেখুন – যে পাকিস্তানী কিংবা ভারতীয়দের ঘৃণা করে ইতিহাসের জন্য পাইকারী হারে, সে আপনার নিজের দেশেও বিরাট একটা জনগোষ্ঠীকে ঘৃণা করছে কোনো না কোনো কারণে। মনে রাখবেন, এই পর্যায়ে “ঘৃণা” আর কোনো স্টেট অফ মাইন্ড না, একটা লাইফ স্টাইল – তাকে ঘৃণা করতেই হয়। একটা অতি সাধারণ কথা কোনোদিনও তাকে বোঝানো সম্ভব হবে না যে এই যে ভাই আপনি একটা মানুষকে পাকিস্তানী বলেই ঘৃণা করা শুরু করে দিলেন এর মধ্যে দিয়ে কি তাকে অতিরিক্ত পাত্তা দিচ্ছেন না? পাকিস্তানীরা তো মানুষের জাত না বলে আপনার ধারণা, তাহলে তাকে আপনি এতো পাত্তা দিচ্ছেন কেন?

হুবুহু একই জিনিস আমি দেখি শাহবাগীরা যাদের ছাগু বলে প্রমত্ত হয় – তাদের মাঝেও। ইন্ডিয়ার প্রতি ঘৃণা বলতে তারা যে অনেক সময়েই হিন্দুদের ঘৃণা করা বোঝান – এই অনুভূতি টুকুও লোপ পায়। তারা ভুলে যান ছোটবেলায় যে কিছু বড় মানুষ আমাদের যে শিখিয়েছিলেন লাল পিপড়া হোলো হিন্দু পিপড়া – সেটা মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা ছিলো। গম্ভীর মুখে বলেন, “ভাই এর দরকার আছে”।

এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

আমার জানা নেই কিন্তু আমি কী করি তা বলতে পারি। আপনিও বলুন, আমি শিখতে চাই।

বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে আমি পাকিস্তানী ও ভারতীয় – উভয় দেশের মানুষকেই মোটের ওপর ভালোবাসি – মানে অন্তত তাদের ঘৃণা করি না। আজকের প্রজন্মের বহু পাকিস্তানী যাদের ৭১ এর জন্য লজ্জিত হতে দেখেছি – তাদের আমি আগের প্রজন্মের পাপের উত্তরসুরী মনে করি না। ঠিক তেমনি তিস্তার পানির ভাগ পাচ্ছি না বা ফালানিকে মেরে ফেলা হয়েছে দেখে পুরা ভারতকে ঘৃণা করতে হবে এই চিন্তা ভাবনার মানুষও আমি নই। পাকিপ্রেম, মালুপ্রেম এবং বাঙ্গুপ্রেম – তিনটাই আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল। ফুল হাতে না আসলেও আমি কাওকে অবিশ্বাস করি না এবং ল্যাটকামিও করি না। দেখুন; খুব কম মানুষের সাথে বিশ্বাস করতে হয় – এমন পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে ফেলি – বাঙ্গুপ্রেম, মালুপ্রেম এবং পাকিপ্রেম বজায় রাখা আমার জন্য খুব মুশকিল কিছু না।

কেন?

কারণ আমার চোখে পুরা ভারতবর্ষ হোলো কংগ্রেগেশান অফ আ ভেরী লার্জ ক্রাউড অফ ইডিয়েটস। সত্যিকারভাবে অর্থে এমন কোনো পার্থক্য আমার চোখে পড়ে না যা থেকে মনে হবে যে চিটায়ঙ্গারা গুজরাটি কিংবা পাঠানদের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা। একই আমাদের বেদনা, একই আমাদের খাসলত। একই রকম আমাদের নীচতা এবং একই রকম আমাদের গন্তব্য। শুধু কেউ বলেন আল্লাহ ভরসা, কেউ বলেন দুগ্গা দুগ্গা আর কেউ বা বলেন জয় বাংলা। অনেকেই দুই বঙ্গের মাঝেও বিশাল তফাৎ দেখতে পান, আমি পাই না। আমার চোখে ভারতীয় সরকার আর ভারতের মানুষ দুটো এক জিনিস না। কিন্তু ভারতের সাধারণ মানুষ আর আমাদের সাধারণ মানুষের মাঝে খুব বেশি পার্থক্য আমি দেখতে পাই না। ঠিক তেমনি ভাবে ৭১ এ যেমন, আজো তেমন পাকিস্তানের সরকার বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে নি যেটা পেরেছে সেখানকার সাধারণ মানুষ।

বাকী থাকে রাষ্ট্রের কথা। দেখুন ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র একটা আজগুবী ধারণা – সে হিসাবে পাকিস্তান একটা সাম্প্রদায়িক ধারণা – সন্দেহ নাই। কিন্তু রাষ্ট্র মাত্রই সাম্প্রদায়িক ধারণা। রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতেই হবে – এটাই রাষ্ট্রের গন্তব্য। state is an imperfect solution for fighting idiots wo don’t have the necessary means or will to anhilate the others entirely. এতো বিপুল সংখ্যক গর্দভকে জায়গা করে দিতে হলে একটা পলিটিকাল সিস্টেমকে সাম্প্রদায়িক হতেই হবে। এই কথাটা অস্ট্রেলিয়ার জন্য যেমন সত্য তেমনি সত্য বাংলাদেশের জন্যেও। এবং এই সাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ না করলে আপনি কোনোভাবেই পলিটিকাল সিস্টেমের অংশীদার হতে পারবেন না।

কাওকে ঘৃণা না করে সবাইকে ভালবাসার ওয়াজ কি একটু বেশীই ক্যাথলিকসুলভ সুকোমল হয়ে গেলো?

হয় তো, কিন্তু এটাই আমি – আমি উপেক্ষায় বিশ্বাসী, ঘৃণায় না। সততার সাথে এতোটুকু বলতে পারি: কোনো পাকিস্তানী কিংবা ইন্ডিয়ান – এক মুহুর্তের জন্যেও আমার মনে হয় না – যে আমি পারবো না – এবসলিউটলি নেভার। এর একটাই কারণ: আমি কাওকে ঘৃণার মালা দিয়ে সম্ভ্রমের উচু চেয়ারে বসাই না। যে মানুষ একবার ঘৃণার ব্যবসা শুরু করবে সে কোনোদিনও সততার সাথে বলতে পারবে না – আই ডোন্ট গিভ আ ফাক। অনেকেই কথাটা বলেন রেগে গিয়ে – আমি বলি মন থেকে।

পুনশ্চ: অন্ধ দেশপ্রেম এবং জাতি বিদ্বেষ যে খুব বেশীদূর এগোয় না – এর একটা কারণ আছে। গর্দভদের নিজেদের মধ্যেকার যে প্রীতি সেটা ঘন হতে পারে খুব – কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয় না কখনোই।

Fruits of her labour ​​

2

– By Seema Amin

The hair strands of time, were they highlighted, would strike a striking look in 2009.

A few vermilion slashes down the back of the head (for a mutiny-cum-massacre), some gray-tinted purples (inaugural stones in buildings) and ….an almost imperceptible greenish-blue for the Indian Ocean Island of Mauritius; the Mauritian incident, that is, buried in the general darkness of that year…

The Mumbai bombs gregariously exploded in 2008; one of the recovered traces of the ‘terrorists’ was a forged passport purportedly belonging to a Mauritian. The slight of build, coral-bejeweled State of Mauritius alleged that it was the passport of a Bangladeshi migrant labourer with footprints leading to the EPZs, where migrant labour, composed largely of women from China and Bangladesh, constitutes the majority of workers. One hungry (or should we say ‘weak’) state accused another. ..

beasts-of-the-southern-wild-movie-photo-13

Ramola Ramtohul, in ‘The influence of state patriarchy and sexual politics on contract labour migration policy in Mauritius,’ (2010) notes that were it not for then Foreign Minister Dipu Moni’s pleading with the state, the latter’s decision to deport all Bangladeshi male workers from its Export Processing Zones (EPZs) would have been official policy following the 2008 Mumbai blast; she argues that the state’s patriarchal stance in deporting men, rather than women, reveals not only that such potential threats work to further weaken the power of migrant labour in the EPZs but that the unwritten codes of the new international strategy of labour demasculinizes male migrant labourers as part of the processes of feminization in global commodity chains. The attempt to establish oneself as a legitimate citizen, through marriage, and possibly having terrorist links, is termed an illegitimate attempt at ‘regaining masculinity’, where the very qualities of submissiveness, invisibility, informality and vulnerability constitute the (gendered) preference for ‘nimble hands.’ In Bangladesh, these ‘low-skilled’ young women almost never move from ‘operator’ to ‘helper’, much the less, supervisor—reserved for men.

The tale of Bangladeshi men in Mauritius has a few unlikely things to say about intersection of what can be called eroding paternalism and global feminization. The EPZs are constituted of a feminized work force where neither the state nor the suppliers or buyers provide the paternalistic values of protection, i.e. given in more traditional gender structures or in feudal paternalistic relations. Initially, a preference was given to female workers in the textile EPZs(as the industry grew through the MFA–Multi-Fibre-Agreement–and European duty-free access, much like Bangladesh earlier); a decade later, as globalization and the end of the MFA accelerated the race to the bottom, they imported higher numbers of male and female workers from China and India. Ramtohul describes the ‘demasculinization’ of the men as an effect of the high level of state and employer control over the migrant workers, including the the threat of deportation in the case of trade unionism, rendering them (as) powerless (as women are meant to be). Even as the threat of deportation is dangled over men based on ‘illegitimate’ activities, Ramtohul shows how the ‘illegal’ activities of female migrant labour, prostitution, is completely ignored: “The sex trade appears to be treated as a private issue over which officials prefer to remain quiet, as long as it does not hinder the performance of the workers at work. This suits both the employers and the state.” Thus ‘feminization’ seems to constitute a zone of infra-darkness, women accelerate the race to not just the ‘bottom’ in terms of wages; they take us into a more controlled, shrouded realm. To exercise agency becomes ‘masculine’ and thus the rules of ‘legitimacy’ are gendered.

The need for more and more vulnerable workers and the conditions of hard work where overtime is the rule rather than the exception have led to a highly feminized workforce in Bangladesh as well. The threat of deportation does not exist here, but one of the justifications for not taking away GSP or destroying the industry for its famous statistics does include the hidden threat of laid-off workers descending into the ‘blacker’ market, i.e. prostitution. Unlike the Maurituan girls who made some extra cash, the girls rarely choose another job outside the garments trade (it is, first of all, all-consuming); they live or die with it; and we all know what kind of death has merged with the atrocity of survival….

The garments industry in Bangladesh, composed of largely rural migrants, is often cited as a more empowering, if low-skilled, over-worked alternative to other ‘feminine’ alternatives, simply for the independence that free-wage labour provides. We don’t have to quote Marx on free wage labour to sense the irony in such a process of empowerment where feminization–with its corollaries of unprotesting and thus exhilaratingly cheap labour based on informal contracts with unwritten rights–and globalization are the twin processes that even allow such ‘empowerment’ to unfold.

But the atmosphere in the ‘90s was eerily hopeful. In 2001 Naila Kabeer quoted the Director of the Labour Department of Bangladesh saying, “I believe that the ‘culture of compliance’ is far ahead in the garment manufacturing sector and changes in the RMG sector are dramatic compared to other sectors.” Discussing ‘Resources, Rights and the Politics of Accountability,’ she echoes the sentiments from a national workshop: “The women workers in the Bangladesh garment industry have had more public attention to their rights than any group of workers in the entire history of the country.”

The atrocity of exhibition? 2009. One hungry (or should we say ‘weak’) state accused another. ..

Forgeries…identity.

‘Shob kichu bhua.’ Sumaya.

She is hungry, but she can’t eat. She eats, but the tumor blocking her nose, bloating and bursting through her eyes, takes a shot at grinding her down its root canal first. Dark there, unreal, like some impossible Rana Plaza.

And she tells me, ‘Waking up darkness, going to sleep darkness… everything looks the same. Kotha bolte khub iche kore…’ Yes, the ability to bear monotony– that was her ‘skill’, the monotony that now is the fruit of her labour. PG Hospital. Have a Look. It’s the Elephant Man. (And I can promise you, you would wish you were blind).

There has been no health research on how the garments industry has gradually, over time, eroded the strength and immunity of teenagers who began their gender-empowered career young, at fourteen perhaps like Sumaya, who is too thin, too weak, to support an operation to alleviate even an hour’s itch from the tumor bursting through her skin that cannot hold the stretched, dangling eye (indescribable, without morphine).

Even if the PM and all the foreign and domestic funds in the world were channeled somehow, magically, to her, she has already been so ‘feminized’, so ‘nimble,’ such an exemplary example of push-pull and supply and demand, that the process begun could never be reversed; damage done; poshai hojom, kaj kothom. But let’s get back to patriarchy, all that intangible subversion of dignity; how does it work when capital becomes the mid-wife, between the Man and the fruit.

Shob bhua. Two graves for one person. Can’t Match DNA.

It’s International Woman’s Day soon and hundreds– or should I say –billions of women’s rights’ NGOs and activists affiliated with OBR (One Billion Rising) or not will, umm…. RISE.

Sumaya will try to sleep.

Naomi Klein wrote in ‘Patriarchy gets Funky’ (2001) on how the culture industries made identity politics and diversity a mantra of global capital. She quotes cultural critic Richard Goldstein, “This revolution…turned out to be the savior of late capitalism.”

Pedagogy of the Oppressed. A handful of definitions. Sumaya, were you a student of mine, I would have asked you to teach me:

Patriarchy/Peri-ousia– Ousia in ancient Greek refers to one’s being or essence. Peri-ousia is that which surrounds one’s essential being and thus defines “who” one “is.” Patriarchy can be seen as a system of male domination in which men dominate women through the control of female sexuality or a system which developed along with the development of private property and state power. Or, it can be seen as both system and discourse.

Discourse— a regulated set of statements which combine with others in predictable ways. Foucault says: ‘We must conceive of discourse as a violence which we do to things, or in any case as a practice which we impose upon them; and it is in this practice that the events of discourse find the principle of their regularity.”

Then I would have told her, run after these words, kill them if you can. Burn them alive. In your body, the body arrested. In the body, the body bearing. In the body, the body unbearable.

She does not know how hysterical we get over Rights, she wants to eat ice cream and see again. She has decided my hands are softer than Shobuj’s; I don’t tell her no, mine are not nimble hands; don’t scold Shobuj, he loves you as though you were the last thing he would ever see with both eyes still able to shut and open.

Was it like a root canal, Rana Plaza? Well, what’s fire like anyway? Metaphors and similes were lost to Saydia when she tried to relay her experiences to me. Now that Sumaya has become an installation carved into her own skull, such literary devices seem unnecessary. Yes, the poets keep poetically describing the sky. And what exactly does your sky look like, Bangladesh? Looks like Boi Mela, February. Mela? Kothai Mela, Sumaya is almost excited, an excitement that wants to ‘see’ vicariously what else submerges us while she floats in the slow sure nausea of a malignant ‘pregnancy’ ‘without a due date.

Yeah, Boi Mela. You know, fun and games, books. Saris and panjabis. Very poetic poetry, poetically recited through reciting voices in recorded tapes, broken record invoking the beauty of our mother tongue… Well the language laboring between us in PG seems to be of another world; beyond Bangla. It’s all very otherworldly down there, in PG, cave-like; she yearns to speak but our tongues are gone.

There were men diseased who looked like lepers in New Market when I was a child. They’re not quite there anymore. I had hoped that along with ‘progressive’, ‘empowering,’ birth control and the garments industry they would have disappeared too, vodoo. Now I see that you Sumaya are the laboratory of the new leprosies. You’ve been kept in the dark, all winter they prepared for the celebrations of our liberated language, but you remained locked in ‘discourse’: ‘ultra poor,’ ‘ultra vulnerable,’ ‘slave-like conditions.’

Freed slave Sojourner Truth famously said, Ain’t I Woman? In the 1851 Womens Rights Convention in Ohio:

“And a’n’t I a woman? Look at me! Look at me! Look at my arm! I have ploughed, and planted, and gathered into barns, and no man could head me! And a’n’t I a woman? I have borne thirteen chilern, and seen ’em mos’ all sold off to slavery, and when I cried out with my mother’s grief, none but Jesus heard me! And a’n’t I a woman?”

Sojourner, how would you compensate that indomitable arm? They’ve been trying to work out some formula for the compensation of an arm or leg, head… Slavery must have easily measured up the pieces of your body, your teeth…It’s just so hyped, the hyperbole of ‘slavery=garments industry or slavery= women’s oppression.’ There is no heroism in Sojourner’s voice when she cries out ‘none but Jesus heard me!’ The echo there resounds because a deaf world is no world worthy of man or woman. Glorifying the strength of women is as equally patriarchal as denigrating their fortitude.

Given the immeasurable cause and effect of her affliction, it is difficult to conceive ‘compensation’ for Sumaya. But she seems to know everything about what Alice Walker connotes as strength when she advises: ‘Be Nobody’s Darling.’ Sumaya ain’t anyone’s darling.

Visitors to Sumaya like me whisper some recent news:

Hey you know Delwar’s in jail.

Good. His wife too…

Yes, she was culpable too, no? (Though the practice of marrying to avoid culpability is not unknown here).

Yeah. You know, ‘The Law.’ We made it bend a little towards the scales of justice. Justice, does that word have a ring, Sumaya?

Sumaya?

There is nothing I know or want in this world to beautify the horror you live,

I only want it to end.

গরুদের জন্য সহীহ ফটোশপ টিউটোরিয়াল

13

আপনার অপদার্থ দানা নেতাটি মদ্যপান করে গাড়ি চালিয়ে আমেরিকাতে ধরা পড়ে জেল খেটেছে? এখন অন্য দলের জনপ্রিয় নেতাকে সেই পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চান? তাহলে নীচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

১/ প্রথমে তুরষ্কের একটি নাইটক্লাবের ছবি জোগাড় করুন;

TR-5

২/ এবার এবার ফটোশপ ব্যবহার করে ছবিটির হরাইজন্টাল মিরর ইমেজ তৈরী করুন;

TR-6

৩/ এরপর যে নেতার চরিত্র হনন করে আপনার মদারু নেতার সমপর্যায়ে আনতে চান সেই নেতার তৃণমূল সমাবেশ থেকে একটি ছবি যোগাড় করুন।

TZ

৪/ এখন নাইট ক্লাবের ছবিটিকে সুবিধামত ক্রপ করুন

TR-2

৫/ নাইট ক্লাবের ছবিতে থাকা কোন দাঁড়ি ওয়ালা লোককে সনাক্ত করুন। এটা খুবই জরুরী স্টেপ, কারণ এর উপর নির্ভর করছে একই ঢিলে ইসলাম ধর্ম এবং জনপ্রিয় নেতাকে হেয় করা। প্রয়োজনে নির্মলেন্দু গুণ বা রবীন্দ্রনাথের ছবি ব্যবহার করুন কিন্তু দাড়ী থাকতে হবে টুপিসহ যোগাড় করতে পারলে তো সোনায় সোহাগা।

৬/ এইবার দাড়িওয়ালা লোকটির মুখ কেটে ফটোশপের মাধ্যমে ঐ জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার মুখ বসান।

TR-4

৭/ এবার এডিট করা ছবিটিকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিন।

TR-7

৮/ আপনার ক্রোমোজমে কুকুরের জিন থাকলে শিরোনাম দিন, “সহীহ হেফাজতি, জামায়াতি কায়দায় জীবন উপভোগ করছেন …..” আর যদি ভারতীয় গরুর জিন থাকে তাহলে শিরোনাম দিন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশঃ লন্ডনের নাইট ক্লাবে …..

গরু হাম্বা হাম্বা করে, ফেসবুকের আনন্দ বাড়ে!

মিডিয়া ও ক্ষমতার বিকার

By রেজাউল করিম রনি

মিডিয়া নিয়া অনেক আগেই লেখা দরকার ছিল। যাক দেরিতে হলেও লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এতো বিষয় কেমনে ধরি? ফলে আমরা অনেকগুলা বিষয় কেবল ইশারায় সেরে নিব।

images
বাংলাদেশের রাজনীতিকে বুঝবার ক্ষেত্রে তথাকথিত মিডিয়া যে ভূমিকা নিয়েছে তা আমাদের ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কথা জোর দিয়ে বলতে হবে যে,  মিডিয়া পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর বাংলাদেশে এই পর্যালোচানার কাজে যে গাফিলতি রয়েছে তা পাহাড় প্রমাণ বললেও কম বলা হবে। অন্যদিকে বিশ্ব জুড়েই সন্ত্রাসের পক্ষে মিডিয়ার ভূমিকা জারি রয়েছে। বিশেষ করে গণতন্ত্র যে ব্যবস্থায় সরাসরি সন্ত্রাসবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রমোট করে, সেখানে মিডিয়া তার অর্থনীতি ও কালচারাল শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে গণবিরোধী হতে বাধ্য। মধ্যে থেকে কৌতুক হল,  এর নাম দেয়া হয়েছে ‘গণমাধ্যম’।

এটা গণমাধ্যম বটে, তবে গণবিনাশী। বাংলাদেশে গণতন্ত্র কথাটাই খোদ নির্যাতকদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর সাথে মধ্যবিত্তের কালচারাল ফ্যাসিজম যুক্ত হয়ে এটা গণহত্যার ভূমিকায় সামিল হয়েছে। তাই আমাদের আর গণতন্ত্রে চলছে না। বলতে হচ্ছে, গণক্ষমতার উত্থানের কথা। কিন্তু এই গণক্ষমতার জন্য যে মতাদর্শিক লড়াইটা জারি থাকা দরকার তা আমরা করতে পারছি না। এর জন্য সস্তা প্রচারপ্রিয় শিক্ষিত নামধারী মাস্টার,  তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও ফুর্তিবাজ প্রজন্ম মূলত দায়ী। এদের বিরুদ্ধে আমরা শুরু থেকেই লড়াকু ভূমিকায় হাজির আছি। এরা আমাদের জামাতের, বিএনপির বা জঙ্গি,  রাজাকার ইত্যাদি বলছেন। এখন বলছেন, হেফাজতের বুদ্ধিজীবি। এগুলা সমস্যা না। বিপদ হল, তারা যে প্রগতি চেতনার আফিমের ঘোরে আমাদের শত্রু জ্ঞান করছেন তার ফলে এরা নিজেরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগুনেই পেট্রোল ঢালছেন। এই দিকগুলা নিয়ে আগেই লিখেছি। এখানে মিডিয়ার পার্টটা নিয়ে কথা হবে।

. যোগাযোগ, প্রচারযন্ত্র গণমাধ্যম মিথ

আমাদের যোগাযোগ :  ইতিহাসের খোঁজে

যোগাযোগের আদি ইতিহাস নিয়া কথা বললে অনেক কথা বলতে হবে। মানুষ প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের প্রয়োজনে কী তরিকায় যোগাযোগ ব্যাপারটা রপ্ত করেছিল, তার কোনো একরৈখিক ইতিহাস নাই। ইতিহাস বলে আবার একাট্টা কোনো কিছুও নাই। এর নানা অর্থ। বিভিন্ন প্রকরণ। এর মধ্যে যে ধারাটি ইতিহাস বলে হাজির হয়েছে, তা হল ন্যারেটিং হিস্ট্রি। মনে রাখতে হবে, ডিসকার্সিভ ট্রেডিশনই এখকার ইতিহাসকে সম্ভব করে তুলেছে। এবং আধুনিক-উত্তর কালে সব মতাদর্শকেই ডিসকার্সিভ ট্রেডিশন আকারে দেখবার কায়দা তৈয়ার হয়েছে। এবং এই ডিসকার্সিভ বা বয়ানযোগ্যতাই ন্যারেটিং হিস্ট্রিকে সম্ভব করে তুলেছে। ডিসকার্সিভের যুতসই বাংলা করা মুশকিল। ডিসকার্সিভ মানে হলো কোনোকিছুকে রিজনিং করে তোলা। একটা বয়ানকাঠামোর ভেতরে বিষয় বিন্যস্ত করাই হল ডিসকারসিভনেসের বৈশিষ্ট্য। এর আলোকে ইতিহাস বা কোনো ধারণাকে ব্যাখ্যার জন্য নানা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। সাধারণত যারা চলতি ইতিহাসের বয়ানের বাইরে অবস্থান করে তারা কিংবা নতুন করে কোনোকিছু হাজির করার জন্য আধুনিক-উত্তর কালে এই তরিকা প্রয়োগ করা হয়।

আমাদের মতো দেশে ইতিহাস মানে ন্যারেটিং হিস্ট্রি না। কেননা, বাংলার ধারাটা হলো ওরাল ধারা। এন্টি পেটেন্টিক বা কিতাববিরোধী ধারা। উনিশ শতকের বেঙ্গল ইতিহাসের ন্যারেশনটাই বাংলাদেশে হাইব্রিডের মতো চাষ করা হয়েছে। এইটা একদিকে যেমন ইউরোসেন্ট্রিক, অন্যদিকে উপনিবেশের খাসগোলামির ভাষ্যই বহন করে। এই ধারাকে তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশকে এরা কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারেনি। বুঝতে চায়নি। পরে এইটাকে বুঝবার জন্য ‘ওরাল’ ট্রেডিশন বলে ক্যাটাগরি করল। বলাই বাহুল্য,  পুরা ক্যাটাগরি বা বিষয় বিন্যাস পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার আলোকে গড়ে উঠেছে। একইভাবে যোগাযোগ নিয়া আমাদের অধ্যয়নও নিদারুণভাবে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের বিকাশের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে বুঝবার এযাবৎ যে ধরণ জারি হয়েছে আমরা তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই। আমরা কি আমাদের ইতিহাসের ধারার মধ্যে যোগাযোগের পর্যালোচনার কথা চিন্তা করেছি?  আরও গোড়ায় প্রশ্ন করি, আমরা কি আমাদের ইতিহাস নিয়া চিন্তা করি?  নাকি লিনিয়ার হিস্ট্রি বলে যা জারি আছে তাকেই নিজেদের ইতিহাস বলে বা বিশেষ কতগুলা ‘ইভেন্ট’ এর ওপর ভর করে ইতিহাসের কাজটা ফয়সালা করে ফেলেছি? তারপরে ফাঁকা জাতীয়তাবাদের জুলুমবাজি শাসনের শিকার হয়ে চলেছি। ফলে গোড়ার অনেকগুলা কাজ আমাদের সেরে তারপরে এই জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ নিয়া চিন্তা বা পর্যালোচনার অভিমূখ পরিষ্কারের জন্য মেহনত করতে হবে।

আমাদের ‘ওরাল’ ধারার মধ্যে যোগাযোগের প্রাথমিক পর্যায় ছিল গল্প কথক। এই গল্প গদ্য বা পদ্যের বিভাজন রেখা মানতো না। ধারণা করা যায়, গদ্য বা পদ্য বিভাজনটা বর্ণনা ভঙ্গিকে আকর্ষনীয় করতে যেয়েই তৈরি হয়েছে। এই গল্প কথকের ভূমিকা রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরপরে এদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে তথ্য সরবরাহকারী। এদেরকে আপনি আদি গোয়েন্দা বলতে পারেন। এরা রাজার কাছে তথ্য সরবরাহ করতো। আর গল্প কথক জনজমায়েতগুলোতে গল্পের ডালি নিয়ে বসত। এই ছিল এখানকার যোগাযোগ প্রক্রিয়া। এটা গেল আমাদের আদি সমাজিক দিক থেকে যোগাযোগের ধরন। অন্যদিকে এখানকার মানুষের কাছে জীবন ও মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তা ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পশ্চিম থেকে আলাদা। কাজেই পশ্চিমা তরিকার মধ্যে যোগাযোগ বলে যে অধ্যয়ন প্রক্রিয়া জারি হয়েছে তার নিরিখে যোগাযোগ বিদ্যা দিয়া এইখানে কাজ হবে না এটাই স্বাভাবিক।

পশ্চিমে যোগাযোগ অধ্যয়ন বেশ পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। যোগাযোগ ও মিডিয়া অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বাইবেলতুল্য বই মার্শাল ম্যাকলুহানের প্রস্তাবনার নাম,  ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া : এক্সটেনশন অব ম্যান’। মিডিয়াকে পশ্চিমা সমাজ মানুষের ক্রমবিকাশের ধারার আলোকে বুঝতে চাইছে,  বুঝেছে। আমাদের এখানেও কি এই তরিকাই চলবে? হুবহু চলবে না। কিন্তু কিছু বিষয় তো আমরা গ্লোবাল অবস্থায় থাকার কারণে নিতেই পারব। কিন্তু যা নেয়া যাবে না তার বিচার করবার জন্য যে গোড়ার কাজগুলো দরকার তা আামদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায় করেছে বলে খবর পাইনি। যোগাযোগ ও মিডিয়া নিয়ে দুনিয়াব্যাপি চিন্তার যে বিকাশ ঘটেছে তার সাথে আমাদের জানা-শোনার পরিধি খুবই হতাশাজনক। কেননা এই বোঝাবুঝির মধ্যে নিজের জন্য আমরা কোনো পর্যালোচনার সংস্কৃতি তৈয়ার করতে পারিনি। এই বিষয়ে ব্যর্থতার প্রথম দায় নিতে হবে একাডেমিক পরিমণ্ডলে যারা এইগুলা নিয়ে করে-কেটে খান তাদের।

আমাদের ওরাল ধারা এখনও বজায় আছে। অক্ষর বা প্রিন্ট প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তেও বিশাল জনগোষ্ঠি স্বতন্ত্র জীবনযাপন বজায় রেখেছে। আপনি এমন একজন কৃষকও পাবেন না যার সকাল বেলার আরামদায়ক টয়লেটের সাথে পত্রিকার কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু শহরের অনেক লোকের এই সমস্যা দেখবেন। পত্রিকা ছাড়া টয়লেটে সমস্যা হয়। যেসকল লোক এই সব যোগাযোগ প্রক্রিয়ার ধার না ধরেও জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে মিডিয়া কোনো বাই এক্সটেনশন অব ম্যান না। এইটা তার কাছে কোএো বিষয়ই না। কিন্তু আপনি তো গোটা সমাজকে এই সিভিলাইজেশনের মধ্যে আনতে চান। এর বাইরে অন্য কোনো কন্ডিশন আপনার কাছে সিভিলাইজেশনের আওতার বাইরে। কিন্তু আপনার যে যোগাযোগের ধারণা-চর্চা, তার কোনো কিছুরই সে ধার-ধারে না। প্রকৃতি ও মানুষের সাথে তার সম্পর্কের এমন এক ধারা এখানে জারি আছে যার সম্পর্কে আপনি ধারণা করতে পারবেন না। কোনো খবর না দেখেই কৃষক বুঝতে পারে আবহাওয়ার কী অবস্থা হবে। সেই মোতাবেক সে চাষাবাদ করে। খনার জ্ঞানতত্ত্ব তো এই সভ্যতার যুক্তিবাদি জ্ঞান দিয়া আপনি বুঝতে পারবেন না। তখন আপনি তারে বলেন,  ও হইলো সাবল্টার্ন। ও ‘ছোটলোক’। ওর ভাষা নাই। তখন আপনি গায়ত্রী স্পিভাক পড়েন! ‘ক্যান সাবল্টার্ন স্পিক?’।

ছোটলোক কি কথা কইতে পারে? ওর এপিস্টোমলজি/জ্ঞানতত্ত্ব যে আপনার বুঝবার মুরোদ নাই, সেদিকে আপনে মনযোগ দেন না। কারণ আপনার কাছে জীবনের অর্থ যা, ওর কাছে তা না। ফলে কমিউনিকেশন ক্যামনে হবে? যোগাযোগ ক্যামনে সম্ভব?
খুব হাল্কা চালে কথাটা তুললাম। জানি এখনই পরিস্কার হবে না,  তবে প্রশ্নটা  তোলা থাকলো।

ফলে পশ্চিমের সভ্যতার যে ইতিহাস তার আলোকে মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তার ভিত্তিতে সেই সমাজে যোগাযোগের তর্কটা হাজির হয়েছে। তাদের দেকার্তীয় যে রেনেসাঁবাহিত ইতিহাস ও যোগাযোগ প্রক্রিয়া বুঝবার ধরণ তা আমাদের সমাজে প্রয়োগ করে যোগাযোগ অধ্যয়নের যে প্রচেষ্টা তা দেড় ইঞ্চি মুরগির পেটে তিন ইঞ্চি বাচ্চা জন্ম দেয়ার মতো ভয়াবহতায় নিপতিত করেছে আমাদের। সেটা আমরা পরে আলোচনা করে পরিস্কার করতে পারব আশা করি। আমাদের সমাজের বিকাশ ধারা তো আলাদা। এইটা মার্কসও স্বীকার করেছেন। আপনি যদি ধরেন, বৈদিক যুগ থেকে তো আমরা একটা সিভিলাইজেশনের মধ্যে ছিলাম। ফলে আমরাও বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যেই হাজির ছিলাম শুরু থেকে। অবশ্যই শাসিত ছিলাম। উপনিবেশের ভেতরে ছিলাম। ফলে আজকের সভ্যতা তো কায়মনোবাক্যে কলোনিয়াল (ধরণ পাল্টেছে এই যা)। ফলে আমরাও সেই জ্ঞানকাণ্ডের নিরিখে নিজেদের পাঠ করতে পারব। তাইলে আমি বলব আপনেরে ভূতে পাইছে। এর আগেও এখানে লোকজন ছিল। জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল। মানুষ সম্পর্কে ধারণার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থা গড়ে ওঠার এই জনগোষ্ঠির নিজস্ব ইশারা ছিল। এইটা নানা কারণে নানা সময়ে ব্রেক হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি এদেরকে একটা জনগোষ্ঠী আকারে গড়ে তুলতে চান। বা তা না চাইলেও যদি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চান, তাইলে আপনার এই ডিসকন্টিনিউটির হদিস করতে হবে। আপনার ইতিহাস খাড়া করা লাগবে।

আপনার বয়ান লাগবে। এরপরই যোগাযোগ সম্ভব হবে। নইলে আপনি পশ্চিমা যোগাযোগ বিদ্যায় হাফেজ হয়েও এই জনগোষ্ঠীর কোনো কাজে আসতে পারবেন না। আপনি শ্রেণী মাধ্যমের কাছে ধরা খেয়ে আটকে থাকবেন। এই অতি প্রাথমিক হুঁশটুকু মাথায় রাখা খুব জরুরি। পশ্চিমে মতাদর্শ,  কালচার ও মানুষ সম্পর্কের ধারণার যে এনলাইটেন ক্রিটিক আছে তা গভীর অভিনিবেশ সহকারে পাঠের দরকার আছে। এর সাথে যোগাযোগের ধারণার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসের দিকে মনযোগ ফেরাবার কাজটা অতি প্রাথমিক কাজ আকারেই হাজির হয়েছে।

মিডিয়ার কথা নয়া মিডিয়া :

প্রিন্টিং প্রক্রিয়া শুধু মিডিয়ার সম্ভাবনাই পরিষ্কারভাবে হাজির করেনি, হাজির করেছে জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনাও। আপনার দেশের ক্রিকেট টিম জিতে গেলে লাল টকটকা কালিতে পত্রিকার হেডিং হয় ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব’। এর সাইকোলজিক্যাল  ইমাজিনেশন ও ইমপেক্ট ভয়াবহ। যাহোক প্রিন্টিং টেকনলোজিই হাজির করেছে রাষ্ট্রের আধুনিক পরিগঠনের পসিবিলিটি। প্রিন্ট মিডিয়াম/মাধ্যমকে বলা হয় জাতীয়তাবাদের আর্কাইভ।

গল্প কথকের জায়গায় হাজির হলো সাংবাদিক। এতো দিনে যেহেতু লিবারেল ভেলুজ পশ্চিমা সভ্যতার জোরে চাউর হয়েছে। তাই কিছু নীতি নৈতিকতাও তৈরি হয়ে গেল। লম্বা ফিরিস্তি না দিয়ে কোট করি।

‘নিরপেক্ষভাবে কাজ করার বৈশিষ্ট্য সাংবাকিদেরকে গুপ্তচর,  প্রচারক ও প্রপাগান্ডিস্টদের থেকে পৃথক করেছে। অসহনীয় বা অপ্রিয় সত্য বলতে পারার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে বিনোদনকর্মী থেকে। নিজস্ব বিশ্বাসকে চাপা দিয়ে কোনো ঘটনা বা ইস্যুর বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে ধর্মবেত্তা বা রাজনীতিকদের থেকে। আর যথার্থতা ও জবাবদিহিতার গুণটি সাংবাদিকদের পৃথক করেছে গল্পকথকদের কাছ থেকে’ [সাংবাদিকতা, দ্বিতীয় পাঠ: আর রাজী]

সাধারণত মিডিয়ার কাছে আমরা যে নৈতিকতা আশা করি তা লিবারেল নৈতিকতা। এখন প্রশ্ন করতে হবে। পুঁজিবাদের এক নম্বর পেয়ারা জিনিস হলো লিবারেলিজম। এবং পুঁজি নিজেকে আধুনিককালের ঈশ্বরে পরিণত করেছে। এখন এই ঈশ্বরও এই সব খেলনা নৈতিকতা মানতে যাবে কোন দুঃখে? ফলে আমাদের যেসকল বুদ্ধিজীবী একই সাথে পুঁজিবাদ বিরোধিতার বিপ্লবী ভূমিকাও দেখান, আবার লিবারেল নসিহতও পেশ করেন, তাদেরকে আপনি কিভাবে পাঠ করবেন? এইটা মিডিয়া থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে লিবারেল নসিহত কী জিনিস তা আর বিস্তারিত না বলি। তারা হয়তো বলবেন, ফ্যাসিবাদের কালে এতটুকু লিবারেল আচরণই করুণ মরুতে একবদনা জলের মতো। তাদেরকে বলতে হবে, বাংলাদেশে লিবারেল বাড়াবাড়িই এই ফ্যাসিজম টাইপের অবস্থা তৈরি করেছে। এখানে ঐ অর্থে ফ্যাসিজম নাই যদিও। এইটাকে আমরা বলি, কালচারাল ফ্যাসিজম। যাক সেইটা অন্য তর্ক। লিবারেলিজমই যেখানে খোদ পাপের মধ্যে নিমজ্জিত, তাইলে স্বাধীন মিডিয়ার কথা চিন্তা করা ক্যামনে সম্ভব? এইটা অতি গুরুতর প্রশ্ন।

ঠিক এইখানেই এসে মার্ক্সিস্টদের ভূমিকার কথা বলতে হবে। ফাঁকে বলে নিই মিডিয়া আলোচনায় মার্ক্সিস্ট বুদ্ধিজীবিরা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মেহনত করেছেন। তিনারা যেহেতু এই লিবারেল ফাঁকি বোঝেন, তাই মিডিয়াকে সব আধিপত্য কায়েমের যন্ত্র আকারে হাজির হতে দেখে ঝাপায়া পড়েন। শ্রেণী,  কর্পোরেট,  সংস্কৃতি,  হেজিমনি -নানা বিষয় যুক্ত করে মিডিয়ার তর্কটা হাজির করেন। তারা আমাদের জানান দেন, একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি যে, মিডিয়া হল ‘মাধ্যম’,  মানে প্রচার যন্ত্র। এইটা কোনোভাবেই গণমাধ্যম না। ‘গণ’ নিয়া গণবিতর্ক আছে। সেখানে নানা জনগোষ্ঠীর ‘গণ’ হয়ে হয়ে ওঠার রাজনীতি ও সংস্কৃতির যে পাঠ তা খুব নিষ্ঠার সাথে না করলে ‘গণ’ ব্যাপারটা রেটরিক বা মুখের কথাই থেকে যাবে। ফলে মিডিয়ার সরল বাংলা হল প্রচারযন্ত্র।

আধুনিকতার বা মোটাদাগে বললে গ্রিকো-খ্রিস্টান সিভিলাইজেশনের ক্রিটিক না থাকায় তারা মিডিয়াকে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য তত্ত্ব বাতলাতে থাকে। একের পর এক প্যারাডাইম নিয়া ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। শেষে মনে করে তাইলে ফেসবুক গণমাধ্যম। পরে যখন দেখে দুই দলের সাইবার যুদ্ধ কমিউনালিটি আরও বাড়ায়া তোলে। একদিকে শাহবাগ অন্য দিকে বাঁশের কেল্লা। মাঝে শুরু হয়ে গেল হত্যার রাজনীতি।

ফাঁকে নিউ মিডিয়া নিয়ে একটু বলে নেই। বিজ্ঞানের সাথে টেকনোলজির সম্পর্কটা আবার খতিয়ে দেখা দরকার। পশ্চিমা বিজ্ঞানের ভূমিকাটা ছিল মেসিয়ানিক বা ত্রাণকর্তার। এর সাথে টেকনোলজির যোগটা একটা বিবাদ আকারে দাঁড়াল। বিশেষ করে টেকনোলজি যখন শুধুই ক্ষমতা ও পুঁজির অনুগামী হলো। এই টেকনোলজি সারা দুনিয়ায় বিজ্ঞানের আশির্বাদের মুখোশ নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু এর মুখটা হল ক্ষমতা ও পুঁজির দিকেই। ফলে সে অন্য দেশ ও জনগোষ্ঠির কালচারাল অবস্থানের সংকট তৈয়ার করল। পশ্চিম,  সমাজের অবস্থানের দিকে না তাকিয়ে টেকনোলজির আমোদে মেতে উঠল।[ আশিষ নন্দী: ট্রেডিশন অব টেকনোলজি]

নিউ মিডিয়ার মধ্যে ভাষা একটা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো। কম্পিউটারাইজড নয়া মিডিয়ার মধ্যদিয়ে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ হাজির হয় তা ভাষিক বিদ্রোহের বাইরে অন্য দেউড়ি পার হতে পারে না। চরম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই এর সাফল্য আটকে থাকে। মাঝে মাঝে এর যোগাযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক আন্দোলন টাইপের কোনো কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলেও তা বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের বাইরে যেতে পারে না। একমাত্র আরব বিক্ষোভে আমরা দেখলাম মার্কিন আধিপত্যবাদীরা কিভাবে ফেসবুক/টুইট জেনারেশনকে দিয়ে গৃহপালিত একটা বিপ্লব করিয়ে নিতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এর ফল হলো উল্টা। আলকায়েদা আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে নিলো আরব বিশ্বে। নিউ মিডিয়া বা কম্পিটারাইজড মিডিয়া খুব স্বাভাবিক কারণেই গ্লোবাল পণ্য ব্যবস্থাপনার অনুকূল কালচারই ধারণ করে। এর মৌল চৈতন্যে আছে নব্য উদারনীতিবাদের হাত ধরে যে পুঁজিতান্ত্রিক চরম অবস্থার বিস্তার লাভ করেছে তারই মতাদর্শিক রুপায়ন। এখন নব্য উদারতাবাদ লোক দেখানো যে মানবতাবাদ,  সম্পত্তির অধিকার ও ব্যাক্তি স্বাধীনতার কথা বলে তার পুরা সুবিধা আসলে পুঁজি ব্যবস্থাপনার হাতেই আটকা পড়ে। কারণ পুঁজি একটা গ্লোবাল ফেনোমেনা। এটা জেনেও আমাদের এখানে উদারনীতিবাদের কথা মন্দের ভাল হিসেবে বলা হয়। এবং নাগরিক বোধ ও তারুণ্যকে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু এই নিউ মিডিয়ার ফাঁপরে পড়ে জন্ম হয়েছে নার্সিসাস বা আত্মমগ্ন প্রজন্ম। এরা ফেসবুক বা টুইটের মতো মাধ্যমকে আত্মপ্রচার বা দ্রুত নিজেকে জনপ্রিয় করার জন্য এমন সব কাজ করে বসে, যার জন্য রক্তারক্তি পর্যন্ত ঘটে যায়। পণ্যবাদী উদারনীতিবাদ যেহেতু জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন বাদ দিতে পারে না। ফলে এই কনজ্যুমার জাতীয় চেতনার আন্ডারেই হাজির হয় ফেসবুক/টুইটার/ব্লগ ব্যবহারকারীরা। জনগণের এথিক্যাল ঐক্যের প্রতি কোনো বিবেচনা না রেখে দ্রুত জনপ্রিয় ও নিজেকে নিয়ে বিতর্ক উপভোগ করবার মানসিকতার অসুখে পেয়ে বসে নয়া মিডিয়া ব্যাবহারকারী ভোক্তা প্রজন্মকে। জন্ম হয় ‘থাবা বাবা’র মতো ক্যারেক্টারের। ফলে যারা নিউ মিডিয়া নিয়া আশাবাদী তাদের আশার দৌঁড় শেষ হয় পুঁজির চরম মুনাফার খাতায়।

তাছাড়া টেকনোলজি নিয়া ইনডেপ্থ আলোচনা দরকার আছে। টেকনোলজি ও মানুষের জীবন, সম্পর্ক, যোগাযোগ ইত্যাদির যথেষ্ট পর্যালোচনা আমরা করিনি। সতর্কতার জন্য বলি,  আমার এই লিবারেল সমালোচনা যার লেটেস্ট পশ্চিমা সংস্করণ নিউ লিবারেল বা নয়া উদারনীতিবাদ সমালোচনাকে কেউ যেন বাড়াবাড়ি মনে না করেন। আমাদের জন্য পশ্চিমা সব বিকাশ বা আবিষ্কার হোলসেল মন্দ নয়। কিন্তু এই সব বিষয়কে আমরা যেহেতু যথেষ্ট বুঝবার আগেই ফ্যাসিবাদি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকারে পরিণত হয়েছি, তাই কৌশলগতভাবে লিবারেল অবস্থার কথা অনেকে বলে থাকেন। আমি তার সাথে দ্বিমত করি না। আমি দেখাইলাম যে, এইটার মধ্যে যে সমস্যাটা মূলশাঁস সমেত রয়ে গেছে তার দিকেও নজর রাখাটা জরুরি। তাইলেই আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর জন্য যুতসই তরিকা বা মতাদর্শ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নৈতিক অর্ডার নির্মাণ করতে পারব। এর জন্য নানা মতাদর্শকে বিচার করার উদাম পরিবেশটাকে অবশ্যই আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। আপনি নিজে যদি রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপারে কনভিন্স হন তাইলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই আপনি এই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন। এটাই স্পিরিট। এটাই জীবকে মানুষে উন্নীত করেছে। তখন আপনি এই সব ভোগবাদি ব্যবস্থার ফাঁক গলে নিজের কাজটা জারি রাখতে পারেন। তখন আপনি এই সব উম্মুক্ত মিডিয়াকে বৈপ্লবিক পরির্বতনের হাতিয়ার করে তুলতে পারেন। তার জন্য রাজনৈতিক-নৈতিক স্পিরিটটা থাকা চাই। এই সভ্যতার দাশ হলে ধংসের হাত থেকে রেহাই নাই।

যা হোক, নয়া উদারনীতিবাদ নিউ মিডিয়ার সম্ভাবনা এতো বেশি উৎসাহিত করার পরেও এগুলা গণচরিত্র পায় না। সাংস্কৃতিক,  শিক্ষা ও সর্বোপরি মতাদর্শিক ভিন্নতা প্রকট আকারেই থেকে যায়। তখন মিডিয়া চিন্তকরা অসহায় হয়ে পড়েন। গণমাধ্যম তৈরি হয় একটা মিথে। কোনো মিডিয়া আর গণমাধ্যম হয়া ওঠে না। এরা খালি জনগণের নামে নিজেদের প্রচারই জারি রাখে। প্রচারব্যবসার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু গনমাধ্যমসুলভ আচরণ তারা প্রায়ই করেন। সেটা পলিসিগতভাবে করেন, নীতিগতভাবে নয়। তার পরেও মিডিয়া পাঠে মার্ক্সিস্টদের কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি। মোটাদাগে পশ্চিমে আমরা যে মিডিয়া স্টাডিজ জারি দেখি তার বড় অংশই মার্ক্সিস্ট জ্ঞানকাণ্ডের সিলসিলা ধরে বিকশিত। আমি মার্ক্সিস্ট বলে হোলসেল কোনো ধারার কথা বলছি না। এর মধ্যে নানা ভিন্নতা সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন। এর বাইরেও অনেকে মিডিয়া বিদ্যায় যথেষ্ট কামালিয়াত দেখাইছেন। চমস্কির কথা তো সবাই জানেন।

মার্ক্সীয় ধারার মধ্যে দুইটা ধারা ছিল। বিস্তারিত বলব না। ষাট দশকের দিকে যে ধারাটা গড়ে উঠেছিল তাকে খুব শক্তিশালী ধারা বলা যায়। এরা সনাতনী নানা বিবেচনায় ব্যাপক পরির্বতন আনেন। এবং অবশ্যই এই চিন্তাধারার একক কোনো ঘরানা নাই। আমাদের দেশেও যারা মিডিয়া নিয়া আলোচনা করেন তারাও এই ঘরানার আলোকেই করেন। মোটা দাগে এইটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এতে নানা নয়া ডিসকোর্স হাজির করা হয়। নানা ডাইমেনশন তৈয়ার হয়,  এই যা।

এই ধারা গণমাধ্যমকে উৎপাদন, পুণরুৎপাদন আরও একটু যারা এডভান্স তারা হেজিমনির কথা বলেন। এদের বিশ্লেষণ পলিটিক্যাল ইকোনমির জায়গা থেকে আমাদের খুব কাজে লাগে। এদের মধ্যে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও বহুত্ববাদী ধারার তাত্ত্বিকরা  মনে করেন,  প্রতিনিধিত্ত্বমূলক ব্যবস্থায় মিডিয়ার পেশাজীবিরা প্রভাবশালী সংস্কৃতি ও রীতিনীতি আত্মস্থ করেন ও সেই সমাজের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। কথা অতি খাঁটি সন্দেহ নাই।  তাইলে এদের কাছেই যখন আপনি গণমাধ্যমের নৈতিকতা আশা করবেন, তাইলে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে যায় না? বাদ দিলাম পুঁজির আলোচনা। মিডিয়া কালচার বলে যে ব্যাপারটা আছে তা তো মিডিয়াকে কোন ভাবেই গণমাধ্যম হয়ে উঠতে দিবে না।

যাহোক,  মার্ক্সিস্টদের মিডিয়া আলোচনার মূল পয়েন্টটা সরাসরি মার্ক্স থেকেই নেয়া। আর আমাদের এখানে বুদ্ধিজীবি মানে মার্ক্সিস্ট। ফেকাহ শাস্ত্র ভাল বুঝলে তারে বুদ্ধিমান তো দূরের কথা,  এইটা যে একটা শিক্ষা তাও স্বীকার করা হয় না। ফলে আমাদের আসলে মার্ক্সিস্ট না হয়ে উপায় নাই। নইলে যে প্রগতিশীলতার ধর্মচ্যুতি ঘটে! আমাদের বিকাশের ক্ষেত্রে এইটা একটা বড় সমস্যা। মার্ক্স বলতেছেন,

‘যে শ্রেণী বস্তুগত উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে,  সেই শ্রেণী একই কারণে মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে,  এই কারণেই সাধারণত যাদের মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপর দখল নাই,  তাদের ধ্যান-ধারণা শাসক শ্র্যেণীর ধ্যান-ধারণার অধীন হয়ে থাকে।’   [মার্কস ও এঙ্গেলস: জার্মান ইডিওলজি]

এইটা মার্ক্সের অল্প বয়সের লেখা। দেখেন এইখানে একটা দ্বান্দিক ফ্যালাসি আছে। যে বস্তুগত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে সেই মনোজগতের ওপর প্রভাব রাখে। আবার যে শ্রেণীর মনোজগতের ওপর দখল নাই, তারা উৎপাদনের মালিক বা শাসক শ্রেণীর অধীন থাকে।

তার মানে মার্ক্স বলতেছেন, দুইটাই লাগবে। ধরে নিতেছেন বা প্রায়রিটিতে রাখছেন, বস্তুর ওপর দখলই চৈতন্য বা মনোজগতের ওপর দখল কায়েমে ভূমিকা নেবে। ফলে বস্তু-নিরপেক্ষ ডিভাইন পসিবিলিটিও যে মানুষের মনোজগতকে প্রভাবিত করতে পারে, শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে পারে সেই আলাপ মার্ক্সে নাই। ফলে এই নিখিল বস্তুময় বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করা ও পরির্বতনের কাজে মার্ক্স অনেক দূর এগিয়েও মূক হয়ে গেছেন। নতুন সিভিলাইজেশনের পসিবিলিটি দিন দিন মার্কসিজমের জন্য কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছে। যখন ডিভাইনটি রাজনৈতিক রুপে হাজির হয় তখন মার্ক্স কাজ করতে পারেন না। অন্য দিকে ইউরোসেন্ট্র্রিক আধুনিকতার সমস্যা মার্ক্সিজম (মার্ক্স না) শেষ পর্যন্ত ওরিয়েন্টালিস্টই করে রেখেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা বুঝবার ক্ষেত্রে মার্ক্সের চিন্তা ভিন্ন উপায় নাই। তথাপি এর নির্মোহ ক্রিটিক তো করতেই হবে।

ফলে গোড়ার গদলগুলা না মিটিয়ে মার্ক্সিজমের টেবলেট দিয়ে আমাদের অসুখ সারানোর চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছে। এই দেশের বামপন্থিরা হয়েছে সবচেয়ে জনবিচ্ছিন্ন। এইটা হল সাংস্কৃতিক উৎপাদনের গোড়ার সমস্যাটা না বুঝার কারণে। এইটা মিডিয়ার দিকে তাকালে বুঝবেন। এই দেশের সবচেয়ে বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হল বামপন্থিদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। সে সারাক্ষণ চর্চা করে ক্ষমতাশীল শ্রেণীর সংস্কৃতি আর শ্লোগান দেয় ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

গণমাধ্যম মিথ :

এই কালচারাইজেশন অব পলিটিক্সে মিডিয়া কিভাবে রাজনীতিকে খেয়ে ফেলে তার নজির হল বাংলাদেশের বামপন্থা। মিডিয়াকে গণমাধ্যম মনে করার যে মিথ তা বাড়ানোর জন্য কিছু রিপোর্টিং করে মিডিয়া বা এই সব প্রচার যন্ত্র টিকে থাকে। গণতন্ত্র যেমন ভোটের নামে টিকে থাকে। আর শোষনের দাঁতে শান দেয়। মিডিয়াও তেমনি গণমাধ্যম ও নিরপেক্ষতার মিথ জারি রেখে মিডিয়ার ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে যেন কোনো বিপ্লবী শক্তির উদয় না ঘটে তার এক মধুর খেলা জারি রাখে। এর জন্য গড়ে তোলে কিছু সিভিল বুদ্ধিজীবি। এইটাকে ‘হমি কে’ ভাবা বলছেন সিলি সিভিলিটি। এই সিলি সিভিলরা মিডিয়ায় ইস্যুভিত্তিক আলাপে ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন ইস্যুর টেনশন মিনিমাইজ করাই হল এদের কাজ। এরা তাই জন্মগতভাবেই গণবিরোধী। আর সাংবাদিক ভাইরা এতো স্মার্ট হওয়ার পরেও যা ধরতে পারেন না তা হল,

‘মিডিয়ায় যে এলিট-আধিপত্য গড়ে ওঠে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের এমনভাবে কোনঠাসা করে দেয়া হয়,  আর তা এতো স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে,  মিডিয়ার সাংবাদিকেরা (যারা প্রায়শ পূর্ণ সংহতি ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করেন) কতগুলো পেশাগত সংবাদমূল্যের ভিত্তিতে ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ কাজ করেন বলে নিজেদের বোঝাতে সক্ষম হন। কিন্তু বাধাগুলা এতটা শক্তিশালী,  এমন মৌলিকভাবে সিস্টেমের মধ্য থেকে গড়ে-ওঠা যে, সংবাদ-পছন্দের বিকল্প ভিত্তির কথা কল্পনা করাও কঠিন।’ [হারমেন ও চমস্কি: সেলিম রেজা নিউটনের অনুবাদ: মিডিয়া পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তক; বাংলা একাডেমী]

মিডিয়া পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহান ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া’ বইয়ে মিডিয়ার নানা খুটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম অধ্যয়েই তিনি বলছেন, ‘মিডিয়াম ইজ দ্যা মেসেজ’। এইখানে আমি একাডেমিক কোন আলোচনা করব না। মাধ্যমই সংবাদ। কথাটা বুঝলে অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে যাব। আমরা সাধরণত মনে করি মিডিয়া হবে সত্য প্রকাশের হাতিয়ার। ন্যায় আর বিবেকের পরাকাষ্ঠা হবে মিডিয়া। নির্মম হলেও সত্য নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মিডিয়া বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নাই। মিডিয়াম নিজেই একটা চরিত্র ধারণ করে বসে। তার পরে সে তাঁর চরিত্রের বাজারজাত করে। কালচারাইজ করে তার চরিত্রকে। এটা বাজারের স্বার্থে না করে রাজনীতি সংষ্কৃতি ও অন্য নানা কারণে করতে পারে। ফলে মিডিয়াকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাববার আর কোন সুযোগ নাই। ঘটনা সংবাদ হতে যে কারণে পৃথক ঠিক একই কারণে প্রচারযন্ত্র সার্বজনীন সত্য থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য। মিডিয়ার কাছে ডিজিটাল মিথটা সত্য বা মিথ্যাও নয় কিন্তু মিডিয়া এইটা এসেনসিয়ালাইজ করে এটার ভ্যালু কে সে এমন ভাবে হাজির করে, সমাজে নয়া কালচারাল মেরুকরণ তৈয়ার হয়।

কাজেই এরা একটা প্রপাগান্ডা মেশিনারির চাকুরে কিন্তু নিজেদের মনে করেন জাতির বিবেক। এইটা গোটা মিডিয়া বিদ্যার দিক থেকে বলা হল। বাংলাদেশে ব্যাপারটা কি রকম। বাংলাদেশে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ ব্যাপারটা কিভাবে হাজির আছে তার আলোচনা না করে মিডিয়াকে বোঝা যাবে না। বাংলাদেশে তথাকথিত সেকুলার আধুনিক যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য জারি রয়েছে। আর আওয়ামী জবরদস্তির যে রাজনীতি তা এই সাংস্কৃতিক আদর্শের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। ফলে খুব সহজেই মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার এর একটা যোগসূত্র তৈয়ার হয়েছে। সমাজের এই দিকটি বিশদ ভাবে না বুঝলে আমরা এখনকার মিডিয়া কিভাবে গোলামির গুন্ডায় পরিণত হলো তা ধরতে পারব না।

আমাদের প্রতিটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বহুপক্ষীয় ব্যাবসার স্বার্থে জড়িত। সাধারণত বড় বড় ব্যাবসায়ীর কাছে মিডিয়া হল অন্য ব্যাবসা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারে কিছুটা নিজের ব্যাবসার অনুকূলে রাখতে একটা মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার চাঁদা সেভ করে দিতে পারে। সরকারও সহজেই এদের বাধ্য করে ফেলতে পারে নগ্ন প্রপাগান্ডায় নেমে যেতে। আর বাড়াবাড়ি করলে সহজেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এর জন্য কিছু আইন রেডিমেট তৈয়ার করে রাখা আছে। আমাদের প্রতিটি সম্পাদক বা মিডিয়াকর্তা আসলে মালিক পক্ষের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করে। ফলে খুব সহজেই সাংবাদিকতা এখানে পরিণত হয় কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি নির্মাণ ও কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি বিনাশের একটা উলঙ্গ খেলায়। এর মধ্যে যাদেরকে আপনারা মনে করেন ‘মানসম্পন্ন’ মিডিয়া। এরা বাংলাদেশে দাতা সংস্থাদের গোলাম ছাড়া আর কিছুই না। এরা মূলত ডেভলপমেন্ট ডেমক্রেসি বা ভিক্ষার গণতন্ত্র পয়দার আতুড় ঘরের ভূমিকা পালন করে। এটা করতে যায়া তারা যে কালচারাল রাজনীতি প্রমোট করে তার কর্পোরেট জাতীয়তাবাদী চেহারার সাথে আপনারা পরিচিত। এর আবেগী প্রপাগান্ডা ফ্যাসিবাদি সংস্কৃতির দোসর। তাঁর চরিত্র হলো উপনিবেশী সংস্কৃতির কিন্তু দায়িত্ব হলো পশ্চিমা দাতা সংস্থার বা কতিপয় এম্বাসির বক্তব্যকে সাংবাদিকতার মোড়কে হাজির করা। এটা ডিজিটাল, প্রযুক্তি, প্রগতি, চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদির এমন এক মনমাতানো প্রচারণা ও আবেগঘন কন্ঠস্বর নিয়ে হাজির হয় মধ্যবিত্ত এর সাথে দ্রুত নিজের নাড়ির যোগ ঘটিয়ে ফেলে ‘জাতে’ উঠে যায়। যে মধ্যবিত্ত বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের গণহত্যাকে রাজনৈতিক বিজয় মনে করে।  কিছু শিশুতোষ লোক হাজির হয় বুদ্ধিজীবি হিসেবে। কিছু লেখক, চলচ্চিত্র কর্মী, অভিনয় তারকা, শিল্পীকে এরা শামিল করে নিজেদের প্রপাগান্ডা মেশিনে। এইটা হয়ে ওঠে মেইনইস্ট্রিম। অন্য মিডিয়াগুলাও এর ব্যাবসায়িক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে গণমাধ্যমের শক্তি ঠাওরে এই দিকেই যাত্রা শুরু করে।

আধুনিকতার মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে মিডিয়া তারই মুরুব্বি হিসেবে নিজেরে হাজির করে। সে ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে চলতি মতাদর্শের নিয়মতান্ত্রিক মত-দ্বিমতের ভিতরে থেকে অভিভাবকের মতো আচরণ করে। ফলে রাজনৈতিক পসিবিলিটি বলে যেটা বিরাজ করে তা সবসময়ই মিডিয়া পরিমন্ডলের বাইরে থাকে। যখন কোন কমিউনিটি হাজির হয় (হেফাজতের আগমনে সময় আমরা যা দেখেছি) তখন প্রচারযন্ত্র কেবল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাদেরকে কেন্দ্র করে সমাজে যে উত্তেজক অবস্থার সৃষ্টি হয় মিডিয়া তখন তার চরিত্রের সীমাব্ধতা সত্ত্বেও নিরপেক্ষতার ভনিতা করে। এইটা সংবাদ ব্যাবসার মধ্যে থাকলে করতে হয়। কিন্তু পারসেপশনের বেলায় প্রচার যন্ত্রের গোমরটা ফাঁস হয়ে যায়। মিডিয়ার পারসেপশন আর জনসমাজের পারসেপশনের মধ্যে যে ফারাক তা অতিগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতা প্রায়ই শিক্ষিত বা বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিত্তকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক বিকাশ হয় খুব নিম্নশ্রেণীর।

অন্যদিকে এর বাইরেও যে বিশাল জনগোষ্ঠী তাঁরা আধুনিকতার এই যোগাযোগ জালের বাইরেও নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম। এর কারণ হল মতাদর্শিক বিকাশ প্রচার যন্ত্রের প্রপাগান্ডা দিয়া প্রভাবিত করা যায় না। ফলে সমাজের বিভাজন সামাজিক স্তরে থেকেই যায়। খেয়াল করে দেখুন, কাভারিং শাহবাগ আর কাভারিং হেফাজতের মধ্যে মিডিয়ার ভূমিকাটা কি ছিল। শাহবাগের কাভারেজে মিডিয়া যে মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে মনে হয়েছে এটা যেন ঠিক তাঁদের নিজেদের যুদ্ধ। অন্য দিকে হেফাজত কাভারিং বুঝতে হলে এতো কথার দরকার নাই। এডওয়ার্ড সাইদ কাভারিং ইসলাম নিয়ে যে পারসেপশন দিয়েছেন তা দিয়েই বুঝা যাবে। ইসলামকে পশ্চিমের মতো আমাদের মিডিয়াও একটা ওরিয়েন্টাল ব্যাপার মনে করে। ফলে মেইনস্ট্রিম প্রপাগান্ডা মেশিনারি সাংস্কৃতিক ভাবে, মতাদর্শিক ভাবে এন্টি ইসলামী। হেফাজতকে কোন ভাবেই তাঁরা নাগরিক আন্দোলনের মর্যাদা দিতে পারে না। এই কমিউনিটি মিডিয়ার কাছে ‘অপর’ হিসেবে ধরা দেয়। তাঁর কাছে নাগরিক আন্দোলন হলো এনজিও বুদ্ধিজীবিতা। ফলে ধর্মযুদ্ধের কালে মিডিয়ার ভূমিকা কি হবে তা আর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

কাজে কাজেই বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জন্য একনম্বর কৃতিত্ব হল মিডিয়া বা এইসব প্রচারযন্ত্রের। এখন এগুলোকে সহজেই বাগে এনে ক্ষমতার রাজনীতির যে গণবিচ্ছিন্নতা তা আড়াল করে জবরদস্তির শাসন টিকিয়ে রাখাটা খুবই সহজ কাজ। ফলে মিডিয়ার সহযোগে এই ক্ষমতার বিকার হয়ে উঠবে পাগলা কুত্তার মতো।

. ক্ষমতার বিকার :

ÔThe representative nineteenth century discourse of liberal individualism loses its power of speech and its politics of individual choice when it is confronted with an aporia. In a figure of repetition, there emerges the uncanny double of democracy itself: `to govern one country under responsibility to the people of another ….is despotism. [Bhabha: Sly civility, p: 137 The Location of Culture]
এতক্ষণের আলোচনা আমাদের অনেক ভাবনার খোরাক জোগাল। এইবার আমরা ক্ষমতা প্রশ্নটি বোঝার চেষ্টা করব। মিডিয়া তাত্ত্বিদের অগ্রসর অংশ মনে করেন। হেজিমনি তৈরি করতে মিডিয়া শাসক শ্রেণীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। হেজিমনি নিয়া দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান তাত্ত্বিক গ্রামসির লাই ধরেই এই সব আলোচনা হয়ে থাকে। গ্রামসির সাথে দ্বিমতের লোকের অভাব নাই। তথাপি হেজিমনির কথাটা একটা লেবেলে সত্য বলে কম বেশি সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু হেজিমনি বললেই সব ব্যাপার পরিষ্কার বুঝা যায় না। কারণ গ্রামসি শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন না। এই আধিপত্য কোথায় অবস্থান করে? রাষ্ট্রে না সিভিল সমাজে ? কারণ গ্রামসি পুরানা ক্লাসের জায়গা থেকে ব্যাপারটাকে দেখেছেন। যা এখন কর্পোরেট জমানায় গ্লোবাল ফেনোমেনা আকারে পুঁজির চরম অবস্থার মধ্যে ক্লাসের আলোচনাও আগের জায়গায় নাই। তবে গ্রামসি উত্তর চিন্তকরা মনে করেন এই হেজিমনি বা আধিপত্য অবস্থান করে সিভিল সমাজেই।

মোট কথা গ্রামসির লেখায় আধিপত্য ধারণার আমদানি হলেও এটা নিয়ে বিস্তারিত কোন আলোচনা গ্রামসিতে নাই। ফলে পরবর্তী সময়ে এই ধারায় নানা বিষয়ের আলোচনা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। সাবল্টার্ন বিদ্যার ধারাও গড়ে উঠেছে এই পথ ধরেই। এটা নিয়ে এখানে কথা বলব না। ক্ষমতা প্রসঙ্গেই সীমিত থাকব।

‘ক্ষমতার বিকার’ কথাটা অনেক সময় রেটরিক অর্থে ব্যাবহার করা হয়। কথাটা নিয়ে অনেক অস্বচ্ছতাও আছে। যেখানে রাজনীতি কথাটা ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া কোন অর্থই তৈয়ার করে না সেখানে ক্ষমতার বিকার কথাটা যে অস্বচ্ছতা তৈয়ার করে তা আগেই পরিষ্কার করা জরুরি।

ক্ষমতার দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য -এই দুই রুপই আছে। সব ক্ষমতাকে আমরা দৃশ্যমান ভাবে বিরাজ করতে দেখি না। যেমন জ্ঞান যে ক্ষমতা, এইটা আমরা কি সব সময় দৃশ্যমান ভাবে দেখি? না দেখি না। মার্ক্সের পরে এই জ্ঞানের একটা ব্যাবহারিক বা বলা যায় চর্চার জায়গা পরিষ্কার হয়েছে। ফলে জ্ঞানের ভূমিকায় একটা চর্চা বা প্রাকসিসমূলক ব্যাপার হাজির হয়েছে। এর সাথে সাথে আমরা ক্ষমতার বিকার কথাটা কিভাবে বুঝব তাইলে? মুশকিল কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

ক্ষমতার সর্বব্যাপী বিস্তারের দিশাটা সহজে বুঝা যায়। এই সর্বত্রবিচারী ক্ষমতার সাথে শাসনপদ্ধতির যে যোগ তার নিরিখে ক্ষমতার বিকার কথাটা ভাল ভাবে বুঝা সম্ভব হবে মনে হয়। এর সাথে জীবন যাপন, অর্থব্যবস্থা, সংষ্কৃতি, উৎপাদন ও ইতিহাসের আলোচনাও চলতে পারে। ফলে ক্ষমতার বিকার কথাটা একটা নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে আলোচনা করা হয়। তারপরেও শুধুমাত্র তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিচ্যুতির মধ্যে ক্ষমতার বিকার আবিষ্কার করার পপুলার ফ্যাশন সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। খোদ ক্ষমতা কি জিনিস তার আলোচনা বহু বিস্তৃত। কিন্তু বিকারটা আমরা নানা কিছুর সাপেক্ষে দ্রুতই ধরে ফেলতে পারি। রাষ্ট্র, আইন, আদালত এমনকি ইতিহাসের বয়ানের মধ্যেও এই বিকার বিরাজ করতে পারে। এইটা খুইজা পাওয়া খুব কঠিন কিছু না। কিন্তু ক্ষমতা কি কারণে ক্ষমতা? -এই আলোচনা অনেক পরিসর দাবি করে। এইটা অন্যখানে হবে।

ক্ষমতার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মিশেল ফুকো। ফুকো আমাদের দেখান ক্ষমতা কিভাবে সর্বত্রগামী হয়। পাগলা গারদ থেকে যৌন বিধান সবজায়গায় ক্ষমতা কিভাবে হাজির থাকে। খুব মাইক্রো লেভেলে ফুকো এগুলা নিয়ে কথা বলেন। আধুনিক-উত্তর কালে ক্ষমতা কেবল আর রাষ্ট্র বা কতিপয় শ্রেণীর আধিপত্য ধারনার মধ্যে সীমাব্ধ নয়। ক্ষমতা সামাজিক, ব্যাক্তিগত এমনকি দৈনন্দিন নানা খুটিনাটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। পরিবার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এই  সবের ভেতর দিয়েও ক্ষমতা জনগনের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। ফুকোর কথাটা হচ্ছে আধুনিক ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা বা সার্বভোমত্বেও সনাতনী ছকে চলে না। তা চলে অনুসাশন বা ডিসিপ্লিনের ছকে। ফুকো মজার একটি শব্দ হাজির করেছেন। তিনি বলছেন ‘গভর্নমেন্টালিটি’। আমি এতো কথা বলছি এইখানটায় আসার জন্যই। এই গর্ভমেন্টালিটির সাথে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ফ্যাসিজমের শিকারে পরিণত হওয়ার বিষয়টি মিলিয়ে নিতে চাই।

এই অনুশাসন প্রীতি বা গভর্নমেন্টালিটিই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রকে সম্ভব করে তুলেছে। আমরা আর খুঁজতে যাই না আদৌ ক্ষমতায় কেউ আছে কি না? আমরা বুঝতে পারি না ক্ষমতা কোথায়? স্বার্বভৌম ক্ষমতা খুব মূর্ত বিষয়। কিন্তু গভর্নমেন্টালিটি আর কোন মূর্ত বিষয়ের ধার ধারে না। সে এতোই নিয়মের দাসে পরিণত হয় যে ক্ষমতায় কে আছে সে ভুলে যায়। ভারতীয় বাহিনী নামল না বাংলাদেশের র‌্যাব গুলি করে মারল তাতে কিছু আসে যায় না। সে নিয়মের গোলামে পরিণত হয়। এই নিয়মই গণজম আকারে হাজির হয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেয় আধুনিকতার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধে। আমাদের এখানে ব্যাপারটা পশ্চিমের মতো করে ঘটে না। আমাদের শাসন কাঠোমো পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত উপনিবেশী। শুরুতে হমি কে. ভাবা থেকে একটা কোট করেছি।

ইম্পায়ার এর সাথে ন্যাশনের সম্পর্কটা বোঝা দরকার। আমাদের মতো দেশ যে কারণে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে না তার হদিস করাটা অতি জরুরী।  আমাদের এখানে থাকে রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট। এর কিছু পোষ্য সিভিল ক্যাডার থাকে। এরা করে কি, এই পরগাছা সরকারের স্বাধীনতাকে পরিগঠন করে ইম্পায়ারের নীতির আলোকে। ফলে এই সব সরকার যত বেশি জাতীয় চেতনার কথা বলে ততই গণবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই অবস্থাকে বলা যায় কলোনিয়ালিস্ট গভর্নমেন্টালিটি। আর এটাই আমাদের মাঝে গেড়ে বসেছে। হমি কে. ভাবা বলছেন,

‘উনিশ শতকের প্রতিনিধিত্বকারী (উপনিবেশী) লিবারেল ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রবাদী বয়ান যখন চিন্তার সংঙ্কটে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই এটা তার রাজনৈতিক ভাষ্যের যোগ্যতা হারায় এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের রাজনৈতিকতাকেও বিনাশ করে। তখন সে ভৌতিক গণতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি করে। খোদগণতন্ত্রই যখন রহস্যময়, তখন একটি দেশ শাসিত হয় অন্য আর একটি দেশের স্বার্থের আলোকে। গণতন্ত্রের পোশাকে আসে স্বৈরতন্ত্র।’

ভয়াবহ ব্যাপার হলো এই কলোনিয়াল মেন্টালিটির সামজীকিকরণ করা হয় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের নামে। আর এর প্রধান হাতিয়ার হলো মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র। এই সামাজীকিকরণই ফ্যাসিজমকে সম্ভব করে তোলে। এই ফ্যাসিজম ইম্পায়ারের সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নিজ দেশে শুরু করে দেয় ধর্মযুদ্ধ। বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ওয়ার অন টেররের প্রকল্পের পথে। ফলে ক্ষমতার বিকার এর সাথে মিডিয়া বা প্রচার যন্ত্রের সম্পর্কটা বুঝতে পারা খুব কাজের কাজ হবে বলে মনে করি। এই প্রসঙ্গে ফিরে লেখা শেষ করব।

বুদ্ধিজীবীতা মিডিয়ার ভূমিকা :

মিডিয়ার বর্তমান ভূমিকাটা নিয়া জনমনে ক্ষোভ আছে। সেটা অন্যায় কিছু না। কিন্তু সমাজের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হল মিডিয়া কেন এই ভূমিকায় উপনীত হল। বাংলাদেশের মিডিয়ার চরিত্র এমন কেন? মিডিয়া কিভাবে বাধ্য হলো এই অবস্থায় হাজির হতে তা খুলে খুলে দেখিয়ে দেয়া। কিভাবে তার প্রজেক্টের মধ্যেই গণবিরোধিতা হাজির থাকে তা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখানো। এই কাজও নিদারুণ ভাবে অনুপস্থিত। মিডিয়া যে লাইনে সংবাদ প্রচার করে তার সাথে আমাদের এই মূহুর্তেও সঙ্কটের ফারাকটা আকাশ আর পাতাল। কথাটা খুলে বলি।

অনেক মানুষের জন্য অবস্থাটা এ রকম যে, কোন ইস্যু মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত সেটা আর ইস্যুই মনে করছে না। আমরা দেখছি মিডিয়া মিথ্যা বলছে তার পরেও আমরা সেই খবরই পড়ছি। এর মধ্যেই রাজনীতির কর্তব্য কর্ম খুঁজছি। চমস্কি যেমন বলেন, যেসব দেশে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট আমলাতন্ত্র থাকে সেই সব দেশে মিডিয়া আধিপত্যশীল এলিটদের হয়ে কাজ করে। মানে মিডিয়া প্রচারযন্ত্র হিসেবে উলঙ্গ প্রতিযোগিতায় নামে। বিনোদন ও কিছু ব্যালেন্সিং রিপোর্ট করে গণমাধ্যম মিথটাও জারি রাখে। যাতে জনগনের সাথে প্রতারণাটা ধারাবাহিক ভাবে করা যায় এবং লসপ্রজেক্ট না হয়। পাবলিক মুখ ফিরিয়ে নিলে তো আমছালা সবই যাবে। ফলে প্রচারযন্ত্র গুলা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারের দায়িত্ব পালন করে। আর সত্য প্রচারের ধুয়া তুলে ব্যবসা করে যায়। মিডিয়া হল প্রতারণামূলক সত্যের ব্যাবসা। এখানে গণতন্ত্রের সাথে মিডিয়ার মিল শতভাগ।

এই সত্যের ব্যবসায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সঙ এর মতো। কিছু প্রচারযন্ত্র নির্দিষ্ট কিছু লোকদের জাতির বিবেক হিসেবে হাজির করে। এই বিবেক আবার দুই পক্ষের একটা আওয়ামী বিবেক আর একটা বিএনপি বিবেক। এই দুই দলের মধ্যে আবার ঝগড়াও লাগে। সেটা আবার মিডিয়া ব্যাপক কাভারেজ দেয়। সরকার সব মিডিয়া নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। যেগুলা দখলে মানে অনুগত্যের বাইরে চলে গেল সেগুলা সব বন্ধ করে দেয়া হলো। বিরোধী দলের লোক জন চিৎকার করে বললেন, সরকার গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করছে।

সরকার আসলে যা করছে তা হলো নিজেদের প্রচার যন্ত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আইন, সংবিধান শুধু নয় ইতিহাস, চেতনা সব আপনি নিজের স্বার্থ আর দেশের স্বার্থকে একাকার করে সাজালেন। সেখানে কিছু বিরোধী মিডিয়া রাখার তো আর দরকার নাই। ছদ্মবেশী গণতন্ত্রের মোড়কটা খুলে ফেললে এখন আর সমস্যা নেই। উপরের আলোচনা থেকে দেখছি মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার কতো গভীর ঐক্যের মধ্যে বিরাজ করে। বিএনপি তো উপরে উপরে মিডিয়া করেছে। নিজেদের জন্য দরকারি সাংবাদিকও তৈরি করেছে। কিন্তু মিডিয়া কালচারটা আওয়ামীই রয়ে গেছে। এটা এখন ন্যাশনাল কালচার! ফলে এখন মিডিয়ার দ্বারা ফ্যাসিবাদের বয়ানটা পাকাপোক্ত করা সবচেয়ে মামুলি কাজ। সাংবাদিকরা কাগুজে বাঘের মতো কিছুদিন তড়পাবে পরে চাকুরি ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, সব মিলে মানিয়ে নেবে।

একজন বললেন, গণমাধ্যমে তো বোমা মারা উচিৎ! কারণ কী? কারণ, আপনারা বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধের সময় প্রতিবাদ করেননি। সরকার পক্ষের বুদ্ধিজীবী বললেন, যিনি বোমা মারার কথা বলেছেন তিনি পাগলও নন শিশুও নন। এই বক্তব্যকে তিনি বিপদজনক মনে করে সরকারকে ডাক দেন ব্যবস্থা নিতে।

মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতার সাথে বিশাল জনগোষ্ঠী যখন কোনো মিল খুজে পায় না এবং সে জনগোষ্ঠী যদি আন্দোলনের মাঠে থাকে তাইলে মিডিয়াকে তারা নিরপেক্ষ বলে মাফ করে দেয় না। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার ঘটনা তখন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি-জামাত কি সেই গণশক্তি? উত্তর হলো না। এরা কি গণস্বার্থের শাসন কায়েম করতে আন্দোলন করছে? দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন গণমাধ্যমে বোমা মারা উচিৎ তখন একটা মুশকিল তৈয়ার হয়। প্রথম কথা হল কে কাকে বোমা মারছে? গণমাধ্যম তো গণশর্ত পূরণ করে নাই। আমাদের দেশের দুই দলের রাজনৈতিক এজেন্ডার মধ্যে প্রচার যন্ত্রের স্বাধীনতার তর্কটা তো শুরুই হয় নাই। তাইলে বোমার কথা কেমনে বলব? সরকার তার বিরুদ্ধের মিডিয়া বন্ধ করে দিছে। সব মিডিয়ায় বিটিভির চরিত্র আছর করে বসেছে। এই অবস্থা তো নতুন কিছু না।

বিএনপি কী করেছে? তাদের দলীয় লোকদের মিডিয়া মোগল বানিয়ে দিয়েছে। প্রচারের রাজনীতির একচ্ছত্র দখলদারি যে কোনো কাজে আসে না তা কোনো দলই আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য নিদেনপক্ষে মিডিয়ার জন্য একটা নীতিগত জায়গা আমদের লাগবে। প্রচারযন্ত্রের আওয়ামী ভূমিকা আর বিএনপি ভূমিকার মধ্যে কোন ফারাক নাই। আমাদের তর্ক তুলতে হবে মিডিয়াকে কেমনে সম্ভব করে তোলায় যায় সেই দিকগুলা নিয়া। বাংলাদেশ গণমাধ্যমের সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে। প্রচারযন্ত্রের সন্ত্রাস গণমাধ্যমের সম্ভাবনাকে মিথে পরিণত করেছে। আমার দেশ যেমন একটা প্রচারযন্ত্র একাত্তর টিভি বা জনকন্ঠও প্রচারযন্ত্র। এখন আপনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে একজন দাঁড়ালেন আমার দেশের ছায়াতলে অন্যজন্য ৭১ এর পতাকাতলে! আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা গণমাধ্যম মিথের শিকার হয়ে গণবিরোধী রাজনৈতিক দলের মেরুকরণে পড়ে গেছেন।

বাংলাদেশে বিদ্যমান দলগুলো গণতন্ত্রের রহস্যময়তার জন্য টিকে আছে। কিন্তু জনগণের কাছে গণতন্ত্র, জাতীয় চেতনা এগুলার আবেদন ফুরিয়েছে। মিডিয়ার সংবাদও আর মানুষকে প্রভাবিত করে না। তবুও খবর দেখা অভ্যাস বসত জারি থাকবে। নতুন নতুন বিতর্ক ও মোড় উপভোগ করবে মানুষ। বিরোধী প্রচারযন্ত্র সবই বন্ধ করা হয়েছে। দেরিতে হলেও ইনকিলাব বন্ধ করা হয়েছে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক সৌজন্যতাও আর থাকছে না। দ্বিদলীয় প্রচারণার পরিবর্তে একদলীয় প্রচারণাই ন্যায় আকারে জারি করা হলো। সমাজে এর প্রতিক্রিয়া এতো ক্ষুদ্র হয়েছে যে নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্রের ফাঁপা রুপটি মধ্যবিত্ত আর লুকাতে পারলো না। ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন, ঐতিহাসিক নির্বাচন এই সবই মিডিয়ার অবদানে সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনকার ক্ষমতার বিকারটা বহন করছে মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র।

গণমাধ্যম গণক্ষমতা :

লেখা শেষ করি, ক্ষমতার বিকার কথাটা বুঝলে ক্ষমতার আকার বা পাল্টা ক্ষমতাও বুঝতে পারব। উদাহরণ দিয়ে বলি, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক নির্বাচন হয়েছে। শুধু মিডিয়াতে এই নির্বাচনের প্রপাগান্ডা জারি ছিল। পাবলিক (আ. লীগের বাইরে) রেসপন্স করে নাই। কিন্তু ২৪ জানুয়ারি প্রথম আলো ‘গণতন্ত্র কোন খেলা নয়’ নামে হাসান ফেরদৌসের একটা সম্পদকীয় নিবন্ধ ছেপেছে।

এতে বলা হচ্ছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে নাকি গণতন্ত্র রক্ষা হয়েছে। বলা হয়েছে, শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার কৃতিত্ব সরকারকে দিতে হবে। বোঝেন অবস্থা! এই হল ভোটবাদি গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকার। মিডিয়া এটা পোক্ত করছে। এখন পাল্টা গণক্ষমতার কথা তো আমরা বলি সেটা কোন জায়গা থেকে বলি?

আমরা বলি, গণক্ষমতা হলো সেই ক্ষমতা যা বাংলাদেশের জনগনের নৈতিক মূল্যবোধের ভেতর থেকে উঠে আসবে। এবং এই নৈতিক এজেন্সিই ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সে যেই নৈতিকতার কারণে ‘গণ’ সেই ন্যায়কে ক্ষমতা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্যেও ধরে রাখবে। বলাই বাহুল্য, এটাই বিপ্লবী রাজনীতির কর্তব্য। এখন এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের নামে না ইসলামের নামে হবে সেটা আগাম বলার কিছু নাই। যে নামেই হোক গণক্ষমতাকে নৈতিক এজেন্ট আকারেই হাজির হতে হবে। কাজেই পাবলিক এথিকস কে ধারণ করে ক্ষমতা যখন ইনসাফের প্রতীক আকারে দাঁড়াবে তখনই তা গণক্ষমতা হয়ে উঠবে। এভাবেই আমরা রুখে দিতে পারি ক্ষমতার বিকার।

আর গণক্ষমতার উত্থান ছাড়া গণমাধ্যম কথাটা মিথ ছাড়া আর কিছু না। প্রথম আলো যেমন এই ফ্যাসিবাদি জুলুমবাজি ক্ষমতার বিকারকে গণতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার মহান অর্জন বলে সাফাই গাইছে। তেমনি মুষ্টিমেয় কিছু লোকের স্বার্থের দিক থেকে পরিচালিত প্রচার যন্ত্রকে গণমাধ্যম বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার বিকারকে রক্ষা করছে এই সব প্রচারযন্ত্র। কাজেই গণক্ষমতার কাজ হলো পাবলিক মোরালিটিকে মাথায় রেখে পাল্টা ন্যায় বা ইনসাফ ভিত্তিক ক্ষমতা তৈয়ার করে ক্ষমতার বিকারকে বিনাশ করা ও গণমাধ্যমের সম্ভাবনার পথকে পরিষ্কার করা।

মনে রাখতে হবে, সরকার যখন নিজেকে মিথ্যা প্রচারণার প্রতিযোগিতায় সামিল করবে, তখনই সে বিপদগ্রস্ত হবে। শাসক যখন মনে করে সে বিরোধী প্রচারণা বন্ধ করে নিজেদের পক্ষে বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য যে কোন ধরণের প্রচারণা চালাতে পারে। তখন বেপরোয়া অবস্থার সৃষ্টি হয়।

আনন্দের কথা হলো, এই প্রচারণা কোনো দিনও বিপ্লবী কোনো সংঘ বা মতাদর্শকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। ফলে এই সব ‘ফসকা গেরো’ আমরা দ্রুত খুলে ফেলতে পারব, যদি মিডিয়ামুগ্ধতা বা প্রচারমুগ্ধতা কাটিয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রামে নিজেদের শামিল করতে পারি। এই কাজগুলো দ্রুত করতে পারলেই দেখব মিডিয়া নিজেই দিন দিন ক্ষমতার বিকারকে এতো প্রকট ভাবে মানুষের সামনে হাজির করছে যে, মানুষের আলস্য ভেঙ্গে যাচ্ছে। একতরফা প্রচারসন্ত্রাস ধৈর্য্যের বাধটা আলগা করে দেয়। এভাবেই ফ্যাসিবাদ ও ক্ষমতার বিকার নিজের ধ্বংস তরান্বিত করে গণক্ষমতার সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রয়োজন আকারে হাজির হতে বাধ্য করে।

(প্রকাশিতব্য বই ‘গণহত্যার রজনীতি : ধর্মযুদ্ধে প্রবেশ’থেকে)

রেজাউল করিম রনি
কবি ও রাজনৈতিক চিন্তক

জিয়া কবরে ফুল চান নাকি অন্য কিছু?

Zia কারাগার থেকে বের হয়ে বিএনপি নেতারা প্রথমে ছুটে যান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে। ইদানীংকালে টেলিভিশনে বিএনপি নেতাদের জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিতে বেশি বেশি দেখা যাচ্ছে। এর অবশ্য একটা ব্যাখ্যা হলো- আওয়ামী লীগ দ্বারা বিএনপি নেতাদের গ্রেফতারের হার নজিরবিহীনভাবে বেড়ে যাওয়ার সুবাদে জামিনে মুক্তির সংখ্যাও বেড়েছে। আর সেকারণে জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। ঘটনার সংখ্যা বাড়লেও টেলিভিশনের ক্যামেরায় দৃশ্যটি কমবেশি একই রকম দেখা যায়। যিনি বা যারা মুক্তি পেয়েছেন তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা দলবেধে মরহুম জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতে যান। ফুল দেন। তারপর ক্যামেরার সামনে কথা বলেন। সমসাময়িক কোন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন।

প্রশ্ন হলো ৭৫ উত্তরকালে রাজনীতি যখন টালমাটাল, দেশের সেই ক্রান্তিলগ্নে হালধারণকারী একদার রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান কবর থেকে কিভাবে জীবিত নেতাদের সহায়তা করবেন? কারণ জিয়াউর রহমানের আদর্শকে তারা সঠিকভাবে ধারণ করেন কিনা সেটা যথেষ্ট অস্পষ্ট। তাদের চাল চলন, কথা বার্তা, নেতৃত্ব কোন কিছুতেই জিয়াউর রহমানের কাজের ধারাবাহিকতা তেমনভাবে সুস্পষ্ট নয়। দলীয়ভাবে বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করা ছাড়া এখন নতুন কিছু উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের যুগান্তকরী অসমাপ্ত পদক্ষেপ খাল কাটা কর্মসূচি কিংবা উন্নয়ন চিন্তার ধারাবাহিকতা জিয়া উত্তর বিএনপিতে তেমনভাবে দেখা যায় না। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব জিয়ার রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে লেখাপড়াটা পর্যন্ত করেন না বলেই প্রতীয়মান হয়। জিয়াকে নিয়ে বরং লেখাপড়াটা বেশি করে আওয়ামী লীগ। যেকারণে বিএনপিকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে সেটা তারা প্রতিনিয়ত গবেষণা করে ঠিক করে নিতে পারছে। এছাড়াও অন্তত আওয়ামী লীগের একজন জাদরেল নেতা জিয়ার দূরদর্শী খাল কাটা কর্মসূচি নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করেছে বলে শোনা যায়। নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন যে, সেটা জিয়াউর রহমানকে ভালোবেসে নয় বরং নিজের আখের গোছাতেই সে জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি বেছে নিয়েছিল।

উল্টোদিকে, আজকে নদী তীরবর্তী শহরগুলোতে বসবাসকারী আওয়ামী লীগের নেতারা যেভাবে নদী ভরাট করে দখল করছে সেটা নিয়ে বিএনপির কোন গবেষণাধর্মী রাজনৈতিক পদক্ষেপ দেখা যায় না। দেশের নদীকে সচল করতে এবং মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে জিয়াউর রহমান যে খালকাটা কর্মসূচি চালু করেছিলেন তার ধারাবাহিকতায় বিএনপি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং পরবর্তীকালে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল। তারা সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি।

নদী বাংলাদেশের প্রাণ। বিশ্বের কোন দেশে নদীকে মরতে দেয়া হয় না। ইংল্যান্ডে এখনো শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান খালগুলোকে সচল করার জন্য কাজ চলে। আর আমাদের ঢাকা মহানগরীর খালগুলোকে দখল আর ভরাট করে আমরা একটি নোংরা আবর্জনাময় শহর তৈরি করছি। যারা জিয়ার কবরে ফুল দিতে যান তারা এর কি জবাব দেবেন? ক্ষমতায় তো তারাও ছিলেন। ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে না পারা এবং বর্ষার পানি ধরে রাখার জন্য তারা নদ-নদী খাল বিলকে কেন উপযুক্ত করে গড়ে তোলেননি সেই জবাব কি দেবেন? ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড মোকাবেলায় খালগুলো হতে পারত একটি বড় সহায়ক শক্তি। দেশের মানুষের চলাচল এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নদীপথ যে ভূমিকা নিতে পারত সে ব্যাপারে জিয়ার কবরে ফুল দেয়া মানুষগুলো কি কিছু করেছেন, যেটা জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন?

বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান কখনো শেখ মুজিবকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অস্বীকার করেননি। শেখ মুজিবও জিয়াকে পছন্দ করতেন। সেক্টর কমান্ডার জলিলকে বীর উত্তম খেতাব থেকে বঞ্চিত করলেও জিয়াকে করেননি। আর জিয়া শেখ মুজিবের পক্ষে সবসময়ই লড়াই করেছেন। সেটা ১৯৭১ সালে। এমনকি ১৯৭৬ সালেও। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্বৃত্তি দিয়েই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি শেখ মুজিবুরের ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের ধারাবাহিকতায় দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করেছিলেন। বলা যায় অকাল মৃত্যুর শিকার শেখ মুজিবুরে যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন জিয়া। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাজনীতিকদের সীমাহীন দুর্নীতি ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় শেখ মুজিব রাজনীতিকদের ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি তৎকালীন নেতাদের চোর বলতেন। শেখ মুজিব রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিতে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ায় খুবই রুষ্ট ছিলেন, সেটা তার সেসময়কার বক্তৃতাগুলো শুনলেই জানা যায়। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতার দায়িত্ব নেয়ার পর তার সততা ও নেতৃত্ব দিয়ে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠনে ব্রতী হওয়ার পথে সকলকে তারই মতো সৎ ও নিষ্ঠাবান হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি রাজনীতিতে সেই ধারা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন যেখানে নেতা শুধুমাত্র অন্যকে সৎ হতে বলবে না বরং নিজেও সকল সময় সততার চর্চা করবে। তিনি আশা করেছিলেন শেখ মুজিব যাদের ‍উপর রুষ্ট ছিলেন সেইসব দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ সোজা পথে আসবে। যেকারণে তিনি শেখ মুজিবের ডাকে সাড়া না দেয়া দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দি পলিটিশিয়ানস’; স্বাধীনতার পরপরই সীমাহীন দুর্নীতি চর্চাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া রাজনীতিকদের শুদ্ধ পথে আনার আগেই তাকে চলে যেতে হয়েছে।

ব্যক্তিগত সততা ও নিষ্ঠা এবং দেশের প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য দেখাতে পারলেও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের দুর্নীতিমুক্ত করতে পারেননি। বরং তিনি তার পূর্বসূরি নেতা শেখ মুজিবের মতোই আততায়ীদের হাতে নিহত হলেন। শেখ মুজিব যে কম্বল চোরদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেই কম্বল চোরদের জন্য রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করার আগেই এবং সর্বোপরি একদল দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ তৈরির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারা তৈরির আগেই তাকে মেরে দেয় সেই সব দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা। তার গড়া বিএনপিতে সেই নেতৃত্ব আর পাওয়া যায়নি যিনি ও যারা তাদের সর্বোচ্চ দেশপ্রেম দিয়ে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বাধ্য করবেন সৎ ও সুন্দরের পথে আসার জন্য।

সেকারণেই প্রশ্ন হলো- কবরবাসী জিয়া কি ফুল চান নাকি অন্য কিছু? শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কবরে ফুল দেয়াটা একটা গৌণ কাজমাত্র। ফুল পেয়ে মৃত মানুষ খুশি হন কিনা আজতক জানা যায়নি। কখনো জানা যাবেও না। তবে কমনসেন্স থেকে বোঝা যায় যে, কবরে ফুলের চেয়ে মৃত আত্মা বেশি তৃপ্তি পেতে পারেন যদি দেখেন যে, তার আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে।

রনির কেস ষ্টাডিঃ এক স্বঘোষিত লেখকের দলীয় মিথ্যাচার

3

– আমান আবদুহু

 

গোলাম মাওলা রনি নামের সুপরিচিত রাজনীতিবিদ ভদ্রলোকটি একটা স্ট্যাটাস লিখেছেন। তিনবার পড়লাম। এবং পড়ে শেষপর্যন্ত অনেক হাসলাম। এ আনন্দদানের জন্য বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আওয়ামী নেতাটিকে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই।

গ্রামে একশ্রেণীর মাওলানারা সারারাত ওয়াজ করেন, ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন ধরণের গল্পকাহিনী শোনান। একসময় মানুষ ঘুমে ঢুলতে থাকে, তবুও তাদের বিরক্তি আসে না। বছরের একটা রাতে আধোঘুমে আধোজাগরণে এইসব বিস্তারিত কিচ্ছাকাহিনী শুনতে তাদের ভালো লাগে। সংবৎসরের নিরুত্তাপ জীবনের মাঝে ফসল তোলার ক্লান্তি শেষে এক রাতের আনন্দটা মূল্যবান। আকাশের উপরে মাটির নিচে নানা রঙের ঘটনা নিয়ে রঙীন আলাপের আনন্দ, এ আমেজটা শহুরে আমাদের অনেকের পক্ষে বুঝে উঠা একটু কঠিন। তবে সব বাংলাদেশীদের সামষ্টিক মানসিকতায় বিনোদনের প্রতি কাঙালীপনার এ দিকটা রনি খুব ভালো করেই বুঝে নিয়েছেন।

সালমান এফ রহমানের সাথে নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট মারামারিকে ন্যায় বনাম অন্যায় যুদ্ধের রুপকথা বানিয়ে তিনি বাংলাদেশীদের মুগ্ধ করেছেন। কাদের মোল্লা প্রসঙ্গে জেলখানা, উস্তাভাজি ও চিরকুটের হৃদয়গ্রাহী বয়ান দিয়ে ইসলামপ্রিয় জনতার হৃদয়ের মণিকোঠাতে ঠাঁই গেড়েছেন তিনি। সুর করে দরুদ মিলাদ পড়ান, লেখায় আল্লাহ রাসুল ইসলাম কোরআন হাদিসের বন্যা বয়ে যায়, গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের কথাও বলেন। মাঝে মাঝে নিজ দল আওয়ামী লীগের টুকটাক অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের আপোষহীন নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা বলেন।

ভন্ডামী বাটপারি মিথ্যাচার এগুলো আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আমরা এসব মেনেও নিয়েছি অনন্যোপায় হয়ে। তবে এসবের বাইরে রনিকে শেষপর্যন্ত বিশেষ আরেকটা ক্রেডিট না দিলে অন্যায় হবে। একেকজন নেতার ভক্তরা হয় একেক গোষ্ঠীর। কিন্তু ডাইভার্স টাইপের মানুষ অথবা বিভিন্ন দলের অনুসারীদের মাঝে অনুরক্ততা পায় খুব কম সংখ্যক নেতা। রনির ভক্তরা ডাইভার্স। জামায়াত শিবির এমনকি বিএনপিরও অনেক লোকজনের কথা শুনলে মাঝে মাঝে আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় রনি লোকটা আসলে প্রায় হেদায়েতের পথে চলে এসেছে। এই যে, আরেকটু বাকি আছে। হয়ে যাবে। মারহাবা মারহাবা।

ইসলামের ঝান্ডাবাহী এ আওয়ামী সিপাহসালারের লেখাটার শিরোনাম “সরকারের বিরোধীতা – কেনো করবেন! কখন করবেন!”। তার আজকের এ লেখাটার একবাক্যে সারমর্ম হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধীতা করা ঠিক না। লেখার

কেন আওয়ামী সরকারের বিরোধীতা করা উচিত না? রনির ভাষ্যে এর কারণ হলো, শেষবিচারে আওয়ামী লীগ সরকার হিসেবে দারুণ সফল। যেসব ইস্যুতে সাধারণ মানুষ আওয়ামী বিরোধীতা করছে, ওগুলো আসলে যুক্তির ধোপে টেকেনা। তার কথা হলো, আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভালো। বড় বড় সন্ত্রাসী গডফাদারদের দাপট আর নেই এখন। এখন আর কেউ রাস্তাঘাটে ছিনতাই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসের শিকার হয়না। আরেকটা বড় কারণ হলো হাতেগোণা বারো তেরো জন আওয়ামী নেতা ছাড়া আর কোন মন্ত্রী এমপি বা নেতা আসলে দুর্নীতির সাথে জড়িত না। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিও দুর্নীতিমুক্ত। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে এখন “ইউরোপ-আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়া-কানাডার তুলনায় ভালো” করে যাচ্ছে গত পাঁচ বছর ধরে।

রনির বিশাল স্ট্যাটাসের সারকথা হলো উপরে লেখা প্যারাগ্রাফটি। এই কথা পাবলিককে বুঝাতে গিয়ে তিনি সারারাত ধরে অনেক মজা দিয়ে ওয়াজ করেছেন। প্রথমে শুরু করেছেন বেশ আত্ববিশ্বাসের সাথে। দক্ষ যুক্তিবাদী ও বাগ্মী একজন মানুষ তিনি। তার সাথে যারা এ প্রসঙ্গে তর্ক করতে আসে তারা একপর্যায়ে এবড়োথেবড়ো  হয়ে যায় তার যুক্তির ঘুর্নিঝড়ের সামনে পরে গিয়ে, এবং তারপর তারা নিরুপায় হয়ে আসমানী গজবের প্রত্যাশায় বিহবল চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এ বিষয়টির একটি দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। পাঠক মজা পায়, তারপর রনির ম্যাসেজ গ্রহণ করে। জাতি বুঝতে পারে তারা এতোদিন কি ভুলের মাঝে ডুবে ছিলো! সত্যিইতো!! আওয়ামী লীগের বিরোধীতা কি কোন সুস্থ মানুষ করতে পারে?

জাতি যখন অনুশোচনায় ভুগে, তখন রনি আবার মাহফিল জমানো মাওলানার মতো নিয়ে আসেন বিভিন্ন স্বাদের রস টসটসে মশলা কাহিনী। ভারতে এমপিরা মারামারি করে একজন আরেকজনের নাকের বদনা (নাকের বদনা কি জিনিস এইটা আমি অবশ্য বুঝতে পারিনি কয়েকবার চিন্তার চেষ্টা করেও) ফাটিয়ে দেয়। মরিচের গুড়া ছিটায়। আর বাংলাদেশের এমপিরা কতো ভালো, মাসুম বাচ্চার মতো। তারা সংসদে বসে শান্তিতে ঘুমায়, তবু বাংলাদেশীরা এতো অকৃতজ্ঞ কেন?

রনির মনে অনেক আক্ষেপ বাংলাদেশের মানুষ পুলিশকে কেন খারাপ বলে, তা নিয়ে। অথচ অন্যদেশের সাথে তুলনা করলে তারাও মাসুম বাচ্চা, জনগণের একনিষ্ঠ সেবক। এখানে রনি গুয়ানটানামো কারাগারের কথা বলেন, বুঝান যে আমেরিকা খুব খারাপ। এবং রনির শেষ কার্ডটা হলো ট্রাম্পকার্ড। রাতের শেষপ্রহরে যখন সবাই চরম ঢুলতে থাকে তখন হুজুর শুরু করেন মেয়েদের নিয়ে কথাবার্তা। কামলীলা। লোকজন লুল সামলাতে সামলাতে আবার সচকিত হয়। রনি এখানে এসে ভারতীয় ডিপ্লোম্যাট দেবযানির একটা মনোরম বর্ণনা তুলে ধরেছেন। উজ্জল শ্যাম বর্ণের ছিপছিপে মেধাবী কর্মকর্তা, “যুবতী ও তরুণীর মাঝামাঝি বয়স”। আমেরিকান পুলিশ তাকে তুচ্ছ এক সাংসারিক কারণে থানায় নিয়ে (বাকীটা রনির ভাষাতে) ….

“উলঙ্গ করে ফেললো। সম্পূর্ন বিবস্ত্র। তারা বললো দেবযানীর কাছে মাদক আছে। এই ওছিলায় পুরুষ পুলিশ গুলো দেবযানীর শরীরের স্পর্শকাতর যায়গায় হাত ঢুকিয়ে দেলো। মহিলা পুলিশরা খিল খিলিয়ে হাসতে লাগলো। দেবযানী সংজ্ঞা হারালেন। তার সারা শরীর কুকুর দিয়ে পরীক্ষা করা হলো এর পর তাকে পাঠানো হলো থানা হাজতে। দেবযানীর যখন সংজ্ঞা ফিরে এলো তখন গভীর রাত। সে দেখতে পেল অনেকগুলো বেশ্যার সংগে তাকে রাখা হয়েছে। বেশ্যাগুলো দেবযানীকে কাতুকুতু দিয়ে তার বিশেষ বিশেষ স্থানে আঘাত করতে করতে বললো হায় খোদা! তুমি এতো কুৎসিৎ- এমন পুরুষও কি দুনিয়ায় আছে যে কিনা তোমার মতো বেশ্যার সঙ্গে রমন করতে চায়!”

চমৎকার। মাহফিলে জনগণ উত্থিত হয়েছে। এ উত্থানের ফাকে রনি বুঝিয়ে দিলেন, দেখেন তো ভাই চিন্তা করে আমেরিকান পুলিশ কত খারাপ?? বাংলাদেশের পুলিশের নামে এরকম কিছু শুনছেন?? সুতরাং বাংলাদেশী পুলিশের হাতে নিশ্চিন্তমনে আপনার স্ত্রী-কন্যাকে পাহারায় দায়িত্ব নিয়ে এবার বাতাস খেতে বেরিয়ে পড়ুন। আওয়ামীলীগের প্রাক্তণ সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির আজকের লেখার এই হলো অবস্থা। এখন আপনি একজন বিবেকবান মানুষ, পাঠক। সুতরাং আওয়ামীলীগ সরকারকে খারাপ বলতে পারেন না আপনি। সমর্থন দিন, জয়ধ্বনি করুন। জয়বাংলা বলে আগে বাড়ুন।

এ পর্যন্ত যা লিখেছি তা হলো রনির লেখার রিভিউ। লেখাটা তিনবার পড়েছি। প্রথমবার পড়ে হতবাক হয়ে গিয়েছি, একজন সুস্থ-মস্তিস্কের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এতোটা নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার সাথে নির্বিকার মিথ্যাচার কিভাবে করে যেতে পারে, সে কথা ভেবে। ধাক্কাটা সামলাতে দ্বিতীয়বার পড়লাম, তার প্রতিটা পয়েন্টের বিপক্ষে পাল্টা যুক্তি ও প্রমাণ কি হতে পারে তা একটু ভাবার জন্য। রিভিউ লিখতে গিয়ে এ পর্যন্ত যে বিশাল লেখা হয়ে হলো, রিফিউটেশন বা বিপক্ষের যুক্তি লিখতে লেখতে হবে এরচেয়ে বড় আরেকটা লেখা। এবং তৃতীয়বার পড়লাম বিশুদ্ধ বিনোদন নেয়ার জন্য।

নাহ, এতোকিছুর পরও আমাদের তাদের নেতারা একবিন্দু বদলায়নি। মিথ্যাচার এবং অনৈতিকতা পুরোদমে রাজত্ব করে যাচ্ছে বাংলাদেশে। এ দুইহাজার চৌদ্দ সালের ফেব্রুয়ারীতে এসেও।

তার এ লেখার বিস্তারিত রিফিউটেশন সম্ভবত আমার লেখা হয়ে উঠবে না। কারণ কাজটা অনর্থক। এধরণের নৈতিকতাবিহীন দ্বিমুখী মানুষদের বিপক্ষে দাড়িয়ে লাভ নেই। সংক্ষেপে শুধু নিজেকে স্মরণ করাই, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক আচরণ এখন ফোকলা হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ফাঁপা অর্থনীতির ফলাফল ইতোমধ্যে দেশের মানুষ বুঝতে শুরু করেছে। রনির লেখা অক্ষর আর শব্দ মিলিয়ে পড়তে অনেক ভালো লাগে। কিন্তু যে আলু চাষীর রক্ত আর ঘামে উৎপাদিত ফসল রাস্তায় ফেলে দিয়ে শুয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই, সে হাড়ে হাড়ে অনুভব করে দেশ কি আর অর্থনীতি কি!

এদেশের নব্বই শতাংশ রাজনীতিবিদ অসচ্চরিত্র এবং দুর্নীতিগ্রস্থ। সব এমপি আর মন্ত্রীরা অবৈধ টাকা ও সম্পদে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে। বাংলাদেশের পুলিশ হলো লাইসেন্সধারী খুনী সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ এবং ধর্ষক, অলরাউন্ডার। এরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যথেচ্ছ ভাংচুর করে, মানুষকে গ্রেফতারের নামে কিডন্যাপ করে মুক্তিপণ আদায় করে এবং ইচ্ছামতো গুলি করে হত্যা করে। মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেলের লোকজনও বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের এ আনন্দ পায় না, যা বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা পায়।

কিন্তু তবু আওয়ামী সরকার টিকে আছে কেন? কারণটা সরল। জনগণের বিরুদ্ধে একটা অন্যায় স্বৈরাচার ব্যাবস্থাকে টিকে থাকতে হলে কয়েকটা কোর ইনষ্টিটিউশনের সহায়তা দরকার হয়। বাংলাদেশে মিডিয়া, জুডিশিয়ারী, সিভিল সার্ভিস এবং মিলিটারি, চারটা সেক্টরই আওয়ামী লীগকে কৃতদাস কাফ্রী খোঁজার মতো পরিপূর্ণ সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

এখন গোলাম মাওলা রনি যদি শুধু সারারাত না, বরং রাতের পর রাতও তার রসালো ওয়াজ করে যেতে পারেন। এবং এই সেবার বিবরণ তার নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে সাবমিট করে দলীয় অবস্থান পূণরুদ্ধারের একটা শক্তিশালী চেষ্টাও করতে পারেন বটে। কিন্তু পাবলিককে আর বুঝানো যাবে বলে বিশ্বাস করিনা। শেষরাতের ঘুমে ঢুলুঢুলু মানুষেরা উত্থানের মজাটা নেবে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ এখন জানে আওয়ামীলীগ কতটা সফল অথবা ব্যর্থ। প্রত্যেকটা মানুষ বুঝে যে, একসময় সন্ত্রাস ছিলো গডফাদার বা এলাকার গুন্ডাদের হাতে, আর এখন সে সন্ত্রাস সর্বব্যাপী হয়েছে পুরো দেশে, প্রতিটা এলাকায়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাফিয়া অর্গানাইজেশন আওয়ামী লীগের প্রত্যেক সক্রিয় নেতাকর্মীই এখন সন্ত্রাসী। মানুষকে এসব বুঝানোর জন্য শেয়ার বাজার, হলমার্ক, পদ্মা সেতু, সুরঞ্জিত কেলেংকারী, আবুল হোসেন, সজীব ওয়াদের জয়ের কমিশন ও দোয়েল ব্যাবসা, হেফাজত গণহত্যা, ক্রসফায়ার নাটক, পুলিশের চাঁদাবাজি খুন ধর্ষণ, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যৌথবাহিনীর নিপীড়ন, দেশের বিচার ব্যাবস্থা ধ্বংস, সাগর-রুনি, বিশ্বজিৎ, রানা প্লাজা এমন হাজার হাজার ঘটনা নাম ধরে ধরে মনে করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। মানুষ এতো বোকা না। সারারাত ওয়াজ শুনে বাকি জীবন কেউ স্বপ্ন দেখে কাটায় না, বরং সময় হলে হালের বলদের কান ধরে টানতে টানতে তারাই আবার জমিতে গিয়ে নামে।

সুতরাং রনির লেখাটার রিফিউটেশন বা বিপক্ষ জবাবের আসলে দরকার নাই। এটা ভালো একটা বিনোদন হয়েছে। রনির আওয়ামী ল্যাঞ্জাটি একইসাথে উত্তমরুপে উন্মোচিত হয়েছে।

তবে শুরুর কথাটা শেষে আবারও বলতে হয়। বাঙালী বিনোদনের জন্য বড়ই কাঙাল। বাঙালী সব বুঝে, কিন্তু তবুও ঐসব মিথ্যাবাদী গল্পকার হুজুরদের পেছনে দৌড়ায়। আমরা আবেগী, স্মৃতিশক্তিও খুব ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং রনি ঠিকঠাকমতো চাল দিলে আশা করি অন্যদিকের মার্কেট আবারও ধরতে পারবেন। তারপর সম্ভবত আবারও ফাকে ফাকে এরকম দালালীসুলভ মিথ্যাচারী লেখা ছাড়বেন। সেই লেখার জন্য রিভিউ করবো না। বরং রনির লেখাগুলো কিভাবে ক্লাসিকাল ফ্যালাসি দিয়ে ভর্তি; ফলস এনালজি/ ইনকনসিসটেন্সি/ এড-হোমিনেম এবং ষ্ট্রম্যান আর্গুমেন্টের মতো অর্থহীন কথাবার্তা ছাড়া তার লেখায় অন্য কিছু নেই, ইচ্ছা হলে সেদিন তা নিয়ে লিখবো। আরেকটা কথাও পরিস্কার করা উচিত। এ লেখাতে আমি এড-হোমিনেম এবং ষ্ট্রম্যান আর্গুমেন্ট ব্যাবহার করেছি। ইচ্ছা করেই করেছি। কারণ মিথ্যুককে আমি সম্মান করিনা। সে এবার কাদের মোল্লাকে নিজ কাঁধে তুলে শহীদ বানাক অথবা রাসুল সা. এর নামে দরুদ টানতে গিয়ে গলা ভেঙে ফেলুক, মিথ্যুক শেষপর্যন্ত মিথ্যুকই।

ভ্যালারে রনি! এই দেশে বেঁচে থাক চিরকাল।

images (1)

 

আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কয়েকটি মূলনীতি প্রসঙ্গে

by মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

একতরফা প্রহসনের নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিনির্মাণে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পুনর্গঠন ও সংহত করা এখন সময়ের দাবী। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে না ওঠায় বাংলাদেশে “নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র” আরো চেপে বসেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম আপাততঃ ক্লান্ত ও অবসন্ন। তাই আন্দোলন সংগ্রামে দেখা দিয়েছে বিরতি।

সেই সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমীক্ষা। উদ্দেশ্য আন্দোলন সংগ্রামের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে যথাশীঘ্র এর পুনর্যাত্রা। ইতোমধ্যে আমরা পর্যালোচনা করতে পারি বাঙালি মুসলমানের কোন কোন মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ একটি শক্তিমান ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

 ইসলাম

প্রথম যে মৌলিক ভাবাদর্শটি নিয়ে এই ডিসকোর্সের সূচনা করা যেতে পারে সেটি হল ইসলাম। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলধারার মৌলিক উপাদান হিসেবে ইসলাম কেন অপরিহার্য? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে খুঁজতে হবে।

বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী প্রান্তিক ও ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি। প্রান্তিক  ও ক্ষয়িষ্ণু বলছি এই কারণে যে এই ভাবাদর্শগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইসলামী আত্মপরিচয়কে গৌণ করে তোলে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ইসলামের ভূমিকাকে সীমিত করে রাখতে চায়। ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন ধর্মাচার পালন ও কেবলমাত্র অল্পকিছু  ধর্মীয় সামাজিক পার্বণ পালনের মধ্যেই এই ইসলাম সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ইসলামের এই খণ্ডিত ভূমিকা ও চর্চাকে সমর্থন করে না।

তাই বাঙালি মুসলমানের মূলধারা বা মধ্যধারার (Centrist and Normatic) রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে যারা ধারণ ও লালন করতে চাইবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশে ইসলামের অধিকতর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে  তুলতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তা, শিল্প-সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও প্রচার-প্রচারণার বিপরীতে বাঙালি মুসলমানের প্রবল মধ্যধারার বাংলাদেশী এবং/অথবা ইসলামী সৃজনশীলতার চর্চা ও প্রচারযজ্ঞ বিনির্মাণ ও লালন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে এই আন্দোলন একটি দীর্ঘমেয়াদী ভাবাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যা শুধুমাত্র ইস্যুভিত্তিক বা এডহক নয় । এটা যেন শুধুমাত্র রিএকটিভ বা প্রতিক্রিয়ামূলক লড়াই না হয়ে যায়। একে হতে হবে প্রোএকটিভ বা স্বতো:প্রণোদিত, ইতিবাচক এবং সৃজনশীল।

বাঙালি মুসলমানের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে কেন ইসলামকে একটি বড় অবস্থান দিতে হবে? এর উত্তর হল — বঙ্গীয় ইসলামের সমন্বয়বাদী প্রবণতা এবং আধুনিক ও প্রগতিবাদী ইউরোপীয় এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্সের প্রভাবে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ প্রান্তিক ও অবক্ষয়ী হয়ে উঠছে। এর কারণ হল — একদিকে প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে উত্তর-উপনিবেশিক ইসলামী সর্বাত্মকবাদী (Totalitarian) আন্দোলনের প্রভাব; এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সাম্প্রতিক উত্তর-আধুনিক ডিসকোর্সের আঘাতে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ও এর বঙ্গীয় সংস্করণ রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্স দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এর উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমাগত ক্ষয় ও অবশেষে লয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এখন আমরা দেখব কেন ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে বিপরীত স্রোতের প্রভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমশঃ তার শক্তিমান অবস্থান হারাচ্ছে। আর কিভাবে সেই শূন্যস্থান পূরণে সর্বাত্মকবাদী ইসলামী সংস্কৃতি ক্রমশঃ অগ্রসর হচ্ছে।

আমরা ইদানীং দেখছি যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি প্রায়শঃই বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ায় তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন কথিত “আবহমান” বাঙালি সংস্কৃতির আচার অনুষ্ঠানে যখন এমন কিছু জীবনাচার ও চর্চাকে উপস্থাপিত করা হয়, যার ভেতরে বি’দাত ও শিরকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লক্ষণ ফুটে ওঠে, তখন বাঙালি মুসলমান তাকে আর আগের মত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না । উদাহরণ হিসেবে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আলোকমালা ও অগ্নিশিখার প্রতি সমর্পণের বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উপাচার, অবনত ভঙ্গিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, মানব আকৃতি সদৃশ ভাস্কর্যে অবনত ভঙ্গিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন, ইত্যাদি। আধুনিক, নাগরিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি মুসলমান দেশীয় সংস্কৃতির এইসব আচার আচরণকে “আবহমান” কাল থেকে প্রচলিত বলে যথেষ্ট বিচার বিবেচনা ছাড়াই অতি উৎসাহের সঙ্গে ধারণ ও লালন করে চলেছে। অথচ বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান এইসব আচার আচরণকে বিচ্যুতি বলে মনে করছে। ফলে বৃহত্তর বাঙালি মুসলমানের বিবর্তনশীল মূল বা মধ্যধারার সংস্কৃতির সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ ও সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নাগরিক শ্রেণী ও গরিষ্ঠ লোকায়ত এবং তৌহিদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা দিচ্ছে বিভক্তি ও মেরুকরণ। রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে দেখা দিচ্ছে ব্যাপক সংঘাত, সংঘর্ষ, নৈরাজ্য ও সহিংসতা। এই বয়ানের সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ও তার বিপরীতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান।

কেন এমনটি ঘটছে? বিগত শতকের ষাট ও সত্তর দশক পর্যন্তও তো আমরা দেখেছি “আবহমান” সমন্বয়বাদী বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির জয় জয়কার। তাহলে ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় কি এমন পরিবর্তন ঘটল যে আমরা একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পালাবদলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

এর উত্তর খুঁজে পাবার জন্য আসুন আমরা বঙ্গের মধ্যযুগের ইতিহাসের একটি পর্বকে পাঠ ও বয়ান করি।

মধ্যযুগের সূচনায় বখতিয়ার খিলজির মত বীর ও সূর্যসৈনিক এই জনপদে ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির বীজ বপন করেছিলেন। শাহ জালালের মত সূফি সাধক এই সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক অনুসঙ্গের আবাদ করেছেন এই অঞ্চলের উত্তর পূর্বে বসবাসকারী মানব মনের গহীন প্রান্তরে। খান জাহানের মত সূফি সাধক ও বিষ্ময়কর জনপদ-নির্মাতা সেই একই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিকে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলবর্তী বঙ্গীয় বদ্বীপের গহীন অরণ্যে বসবাসকারী সভ্যতা-বঞ্চিত প্রান্তিক মানব মনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যার ভাবাদর্শিক ও সাহিত্যিক রূপায়নে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গের কবি সৈয়দ সুলতান রচনা করেছিলেন “মুসলিম জাতীয় মহাকাব্য” স্বরূপ নবী বংশ । এই মহাকাব্য রচনার মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বৈদিক, বৈষ্ণব, শৈব এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে তুলনামূলক ডিসকোর্সের অবতারণা করে ইসলামী ভাবাদর্শ ও সংস্কৃতিকে বাঙালি মুসলমানের জীবনে গ্রথিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শহীদ তিতুমীর এই ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির সুরক্ষায় স্থানীয় প্রকৃতিজাত উপাদান দিয়ে বাঁশেরকেল্লা গঠন করে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি এই রাজনীতি ও সংস্কৃতির আলোকে বাঙালি মুসলমান কৃষিজীবীদের ইংরেজ ও জমিদার বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হাজী শরীয়তউল্লাহ এবং কারামত আলী এই সংস্কৃতিকেই অবক্ষয় ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার জন্য লৌকিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গের এই দক্ষিণ পূর্ব গাঙ্গেয় বদ্বীপে। এই অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানের লৌকিক জীবন, জীবিকা, জীবনাচার ও জীবনদর্শনে এভাবে গভীরভাবে গ্রথিত হয়ে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে নিজস্ব (Owned), ভূমিজ (Organic), মর্মধারিত (Internalized), আত্মীকৃত (Assimilated) ও অকৃত্রিম।

মধ্যযুগে বা প্রাক-উপনিবেশিক যুগে বঙ্গে সূচিত বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ও সংস্কৃতির এই মিথষ্ক্রিয়া ও রূপান্তর নিয়ে মেলফোর্ড স্পাইরো (Melford Spiro), জে ডি ওয়াই পীল (J D Y Peel), ইগর কপিটফ (Igor Kopitoff) প্রমুখ নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার ওপরে ভিত্তি করে পূর্ব বঙ্গের গহীন গাঙ্গেয় বদ্বীপে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ইসলামীকরণ সম্পর্কে মার্কিন ইতিহাস গবেষক রিচার্ড ঈটন (Richard M Eaton) একটি যুগান্তকারী ও ইতিহাসের গতি নির্ণায়ক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মান্তরের প্রচলিত ধ্রুপদী ডিসকোর্সকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বঙ্গের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া সম্পর্কে একটি তিন-পর্ব বিশিষ্ট প্রক্রিয়া, যা সুদীর্ঘ কাল ধরে ক্রিয়াশীল ও চলিষ্ণু থাকে, সেটি প্রতিপাদন করেছেন তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থে। আসুন আমরা এবারে দেখি যে এই তত্ত্বটি আমাদেরকে কিভাবে বুঝতে সাহায্য করে যে বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলাম বিবর্তিত হয়ে ক্রমাগত একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পরিণতির ফল হল সমন্বয়ী প্রবণতা ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী প্রবণতা ক্রমাগত মুখ্য হয়ে উঠছে।

ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বকে রিচার্ড ঈটন বলেছেন ইনক্লুশন (Inclusion) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত  ধর্ম ও ভাবাদর্শ  পাশাপাশি অবস্থান করে নিজেদের অবিকল অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই পর্বে দেশী ও বিদেশী অনুসঙ্গগুলো পরস্পর কোনোরূপ বিনিময়ে অংশ নেয় না। দ্বিতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন আইডেন্টিফিকেশন (Identification) — যখন স্থানীয় ও বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ পারস্পরিক বিনিময়ে অংশ নিয়ে একে অপরের ভেতরে সদৃশ অনুসঙ্গগুলোকে চিহ্নিত করে। আর তৃতীয় পর্বটিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ডিসপ্লেসমেন্ট (Displacement) — যখন বহিরাগত ধর্ম ও ভাবাদর্শ স্থানীয় ধর্ম ও ভাবাদর্শের অবশেষগুলোকে ক্রমাগত অপসারণ করতে থাকে। এই তত্ত্বটি স্পষ্ট করার জন্য রিচার্ড ঈটনের লেখা গ্রন্থ থেকে এই উদ্ধৃতি ও ডায়াগ্রামটি এখানে উপস্থাপন করছিঃ

The term conversion is perhaps misleading when applied to this process, since it ordinarily connotes a sudden and total transformation in which a prior religious identity is wholly rejected and replaced by a new one. In reality, in Bengal, … … …, the process of Islamization as a social phenomenon proceeded so gradually as to be nearly imperceptible.

… … …, one may discern three analytically distinct aspects to the process, each referring to a different relationship between Islamic and Indian superhuman agencies. One of these I’m calling inclusion; a second, identification; and a third, displacement. By inclusion is meant the process by which Islamic superhuman agencies became accepted in local Bengali cosmologies alongside local divinities already embedded therein. By identification is meant the process by which Islamic superhuman agencies ceased merely to coexist alongside Bengali agencies, but actually merged with them, as when the Arabic name Allah was used interchangeably with the Sanskrit Niranjan. And finally, by displacement is meant the process by which the names of Islamic superhuman agencies replaced those of other divinities in local cosmologies. The three terms inclusion, identification, and displacement are of course only heuristic categories, proposed in an attempt to organize and grasp intellectually what was on the ground a very complex and fluid process. (Richard M Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier 1204 – 1760, University of California, Berkeley, 1993)

মধ্যযুগ থেকে সূচিত হয়ে ইসলামের এই বিবর্তন প্রক্রিয়া আজ অবধি ক্রিয়াশীল ও চলমান। ইতিহাসের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী চলমান এই মিথষ্ক্রিয়া বর্তমান সময়ে এর তৃতীয় পর্যায় অতিক্রম করছে।এই পর্যায়ে এসে উনিশ ও বিশ শতকের ইসলামী সংস্কারবাদী (Reformist), পুনরুজ্জীবনবাদী (Revivalist) ও পবিত্রকরণবাদী (Puritanical) বিভিন্ন আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশে এযাবৎ  প্রবল সমন্বয়বাদী (Syncretistic) বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে শুদ্ধতাবাদী (Orthodox) ও কিতাবসম্মত (Scriptural) বা টেক্সটসম্মত (Textual) রূপ পরিগ্রহ করছে। একুশ শতকের সূচনাকে আমরা এই বিবর্তনের একটি টিপিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। কাগজ, স্বাক্ষরতা ও শিক্ষার ব্যাপ্তি, মুদ্রণযন্ত্রের কল্যাণে বই পত্রের ব্যাপক সহজলভ্যতা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আর্থিক উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে বাঙালি মুসলমান প্রবাসী সম্প্রদায়ের উদ্ভব, উচ্চ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অথবা ভ্রমণ ও পর্যটন উদ্দেশ্যে দেশ বিদেশে গমন; রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ইত্যাদি বাঙালি মুসলমানের গাঙ্গেয় বদ্বীপে গন্ডীবদ্ধ কৃষিনির্ভর জীবনাচারে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই সার্বিক পরিবর্তনের ফলে বাঙালি মুসলমানের ইসলামী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন আজ এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে গতিময় ও সর্বাত্মকবাদী হয়ে একটি বৈশ্বিক মাত্রায় পৌঁছেছে। কাজেই বাঙালি মুসলমান তার বাংলা ভাষা ও ইসলাম ধর্ম দিয়ে গড়া বাংলাদেশী রাজনীতি ও সংস্কৃতি দিয়ে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে যে তুরীয় (Transcendental) উচ্চতায় স্থাপন করবে এতে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

২। গণতন্ত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধারাকে শক্তিমান করে গড়ে তোলার জন্য যে মুলনীতিটি অপরিহার্য সেটি হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি পাশ্চাত্য ধারণা। আধুনিক ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট ডিসকোর্সের একটি অনুসঙ্গ এই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও পথচলার সূচনা এই অঞ্চলে ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার অনুসঙ্গ হিসেবে। উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হবার পর এই অঞ্চলের জনগণ গণতন্ত্রের আদর্শকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবেও অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল গণতন্ত্রের আকাঙ্খা। কিন্তু লিবারেল গণতন্ত্র বিনির্মাণে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি।

প্রাতিষ্ঠানিক, কার্যকর ও অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। তবে গণতন্ত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমষ্টির আস্থা অটুট রয়েছে। বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে একদিকে যেমন ইসলামের প্রতিফলন দেখতে চায়, তেমনি অন্যদিকে তারা গণতন্ত্রকেও একটি শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায়।

গণতন্ত্র ও ইসলামের মধ্যে কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে বলে তারা মনে করে না। ইসলামের যে প্রান্তিক ডিসকোর্সটি ইসলামী রাষ্ট্র বিনির্মাণে গণতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে, বা গৌণ করে, বা প্রতিবন্ধক বলে মনে করে, বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর অংশ তা সমর্থন করে বলে মনে হয় না। সুতরাং ইসলামী ও গণতান্ত্রিক — উভয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের মেলবন্ধনেই রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার চাবিকাঠি।

গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র হয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের কিছু সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্ঠার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যে অপচেষ্টা বারবার দেখা দিয়েছে তা বর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। নেতৃত্ব নির্বাচনেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও রীতি-নীতি মেনে চলতে হবে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে।

৩। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব গণতন্ত্রের মৌল ধারণার দুটি অনুসঙ্গ। অন্যকথায় গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যেই অনিবার্যভাবে এই দুটি প্রত্যয় উপস্থিত রয়েছে। তবুও এই দুটি রাজনৈতিক প্রত্যয়কে এখানে তৃতীয় মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত দ্বারা তিনদিক থেকে বেষ্টিত, সেহেতু এই দুটি প্রত্যয় বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য রক্ষাকবচ। ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতরে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনাকে সদা প্রবহমান রাখতে হবে।

বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বিভিন্ন মাত্রার অসমতা ও বিরোধ রয়েছে। সেগুলোতে ভারসাম্য ও পারস্পরিক মর্যাদা স্থাপন করার জন্য চীন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নানামাত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করতে হবে। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও ইরান – মুসলিম বিশ্বের এই কয়েকটি প্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিনিময়ের ব্যাপক কর্মসূচি নিয়মিতভাবে আয়োজন ও পালন করতে হবে। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও প্রভাব এভাবে মোকাবেলা করে বাংলাদেশে শক্তিমান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাতে হবে।

৪। ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী

চতুর্থ মূলনীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আরো দুটি প্রত্যয় – ইনসাফ ও মজলুমের মৈত্রী। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা জরুরী। সমাজে শ্রেণী বৈষম্য আছে ও থাকবে। কিন্তু ইনসাফ কায়েম করতে পারলে এই শ্রেণী বৈষম্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্ভব হবে। সমাজে অন্যায় মেরুকরণ প্রশমিত হবে এবং সংঘাত ও সহিংসতা থেকে সমাজ মুক্ত থাকতে পারবে। সমাজে এই ইনসাফ কায়েম করতে হলে মজলুম শ্রেণীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য ও মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে ব্যাপক জনসমর্থন পেতে হলে কেবলমাত্র উপরিতলের ইস্যু থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মজলুম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে সমাজে ও রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল ও নেতৃত্ব দিতে হবে।

এই লেখায় আগামী দিনের বাংলাদেশে মূলধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভাবাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কয়েকটি মূলনীতি উপস্থাপন করা হয়েছে। সবগুলো মূলনীতির বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হয়নি সময় ও স্থান স্বল্পতার কারণে। পাঠকের মনোযোগ ও ধৈর্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হয়েছে। প্রথম মূলনীতিটিকে অনুপুঙ্খ আলোচনার মাধ্যমে অনেকটা মূর্ত ও খোলাসা করা হয়েছে। প্রথম মূলনীতির শুদ্ধতাবাদী ও সর্বাত্মকবাদী পাঠ ও ভাষ্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের যে ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা তাই প্রকৃতপক্ষে এই রচনার মৌলিক অবদান বলে আমাদের বিশ্বাস। অন্যান্য মূলনীতিগুলোকে সংক্ষিপ্তাকারে ও বিমূর্তভাবে এখানে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। এটি সত্য যে এই প্রচলিত প্রত্যয়গুলির এইসময় উপযোগী বয়ান অনেক প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে অবশিষ্ট প্রতিটি প্রত্যয় নিয়ে আলাদাভাবে বিস্তারিত দিকনির্দেশনামূলক লেখার ইচ্ছে আছে। তবে ইতোমধ্যে এই মূর্ত ও বিমূর্ত প্রত্যয়গুলি থেকে মূর্ত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিগঠন করা সম্ভব হতে পারে বলে আমাদের অকুণ্ঠ বিশ্বাস।

Erasing 25th february and Transcom ( Bangladesh) Limited’s new brand : Manzur

Have you seen todays ( February 25 2014) issue of Prothom Alo? If not let’s see it here –

Prothom Alo 25 february

Do you see where BDR Massacre is in the first page? Helpful Hint: You may need a magnifying glass.

Now let’s see with Prothom Alo’s first page on 15th August.
I am not comparing 15th August with 25th February. I am just trying to see how this newspapers commemorates a national day of mourning –

Prothom Alo 15 August

Or, if 15th August is a matter of different league – lets see how this newspaper treats 14th December- another day of gruesome killings of professionals –

Prothom Alo 14 December

A picture is worth a thousand words. Let the readers make their own conclusions. Looking at this discriminatory news treatment, if a reader concludes that — Prothom-Alo, in collaboration with the Government, is actively trying to erase 25th February from our memory, no one can find any wrong in their assertion.

But this is the same outlet which is at the front line of force-feeding the nation with the memories of 1971 and justice of the killers of 1971. And when comes BDR massacre of 25th February, their double standard is unbelievable.

——————————–

You will see suddenly both these Transcom limited owned newspapers’ front pages get filled with news items trying to glorify sacked Major General Abul Manzur and cries for justice for Manzur. It is very puzzling to see that suddenly these two media are making so much effort to glorify Manzur. What is the agenda? A friends tells me, very succinctly, “…All this smokes and mirrors about trying to prove manzur’s innocence, but no mention of the fact that manzur made a radio speech where he took responsibility for the ‘revolution’ that brought down the ‘tyrant’ and ‘un-islamic’ zia.  It’s like trying to say “faruq-rashid didn’t kill mujib, it was all a conspiracy by someone else”.

And here is another double standard – while 5 year old killing of nearly 50 army officers  get 1 column inch news treatment, killing of one army officer 39 years ago gets half front page treatment for four days in a row.

And while prothom-Alo and spurned leftist polpot revolutionary Lawrence Lifschultz are so vocal about killing of Manzur and justice for Manzur, they are equally silent about the killing of another more decorated war hero, Maj general Khaled Mosharraf. Mindblowing hypocrisy of Transcom’s Media business – but why?

I want to believe

(First published in the Daily Star on 8 March 2009.  I still want to believe, though it is becoming ever-so-hard).

bdr

On that day, no soul shall be wronged; and you shall not be rewarded aught but that which you did. (The Quran, 36: 54).

Surah Yasin is usually recited in Muslim households when someone passes away. The above-quoted ayaat from the surah has been in my mind lately. I want to believe those words, not just in the promised day of reckoning, but here and now, in this People’s Republic of ours.

Continue Reading

প্রেক্ষিত হিজাবঃ এ কেস স্টাডি ফর দ্য গ্রোথ অব লিবারেল ফ্যনাটিসিজম

1

by Jahid Islam

বাংলাদেশের একটা শ্রেণী নিজেরদেরকে লিবারেল দাবি করে। বাস্তবে এরা ফ্যানাটিক। শুধু ফ্যানাটিক বললে কম বলা হবে। ফ্যনাটিসিজমের ১০ এর স্কেলে এদের স্কোর ৯.৯। এমাজান জঙ্গলের ‘মানুষ আকৃতির’ যেসব প্রাণী অন্য মানুষের মাংস খায় কেবল তারাই এ স্কেলে এদের চেয়ে উপরে আছে।

গড আছে নাকি নাই এটা কিন্তু নতুন কোন বিতর্ক না। এ বিতর্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো। যারা এ তর্ক করেন আমার কাছে তাদেরকে খারাপ লাগে না। তাদের অনেকেই নিজেদের যুক্তি এবং আন্ডারস্ট্যান্ডিং ব্যবহার করে কনভিন্সড হতে চান। এতে দোষের কিছু নাই। বাস্তবে এটাই আদর্শ পদ্ধতি হওয়া উচিত। যারা গডে বিশ্বাস করেন না কিন্তু রেশনালি চিন্তা করার চেষ্টা করেন এবং সে থেকে তাদের এ কনভিকশন আমি তাদেরকে রেসপেক্টও করি। এদের বেশিরভাগই নিজে গড বিশ্বাস করেন না, কিন্ত অন্যের বিশ্বাস এবং আচরণকে শ্রদ্ধা করেন। ‘গড’ বিশ্বাস করেন এমন কারও সাথে আলোচনা বা তর্ক হলে তারা নিজেদের যুক্তি দিয়ে তাদের বিশ্বাসের পেছনে কারণকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন। সমাজের ভিন্ন মতের মানুষের সাথে কোএগজিসটেন্স এ বিশ্বাস করেন। এরা আসলেই লিবারেলিজমে (প্লুরালিজম) বিশ্বাস করেন।

7bbae7bd7f30fc7e74a47780ac8bce0d

আমি যে ফ্যনাটিকদের কথা বলছি তারা অন্যের জীবন থেকে ‘গড ডিলিউশন’ দূর করতে গিয়ে নিজেরাই একটা ধর্মের জন্ম দিয়েছেন। যে ধর্মের প্রধান ডকট্রিন হল সবার জীবন থেকে গডের ধারনা দূর করা এবং সেটা যে কোন মূল্যে। প্রয়োজন হলে জোর করে। বলাই বাহুল্য, আমাদের দেশে তাদের প্রধান টার্গেট হল ইসলাম। বাস্তবে সমাজে যারা বিভিন্ন ধর্মে ধার্মিক হিসেবে পরিচিত এ শ্রেণী এর চেয়েও অনেক ডেডিকেটেডলি তাদের এ “গডলেস ডিলিউশন” ধর্ম পালন করেন। তারা হিজাব পরা বা পরানোকে খুব একটা পজিটিভলি দেখেন না। মনে করেন যে, হিজাব পরলে নারীদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়। এখানে আন্ডারলায়িং এসাম্পশান হল একটা বিরাট অংশকে জোর করে হিজাব পরানো হয়। যারা স্বেচ্ছায় হিজাব পরে তারাও আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর লোক এবং হিজাব পরাই তাদের ইন্টেল্যাকচুয়াল ইনফেরিওরিটির প্রমাণ। তারা কেউ কেউ প্রচার করে বেড়ান যে, আরবের ১৪০০ বছর আগের গরম ‘লু হাওয়া’ থেকে বাঁচার জন্য মহিলারা হিজাব পরত। তাদের এ এসাম্পশান এবং আর্গুমেন্ট ঐতিহাসিক এবং তত্ত্বগত দিক থেকে ভুল। ইতিহাস এবং ধর্ম বিষয়ে সামান্য জ্ঞান থাকলেই এ যুক্তির অসাড়তা বোঝা যায়।

যেহেতু তারা মনে করেন যে অনেককেই জোর করে হিজাব পরানো হয় বা তারা নিজেরা কেবল হিজাব না পরার কারণেই হিজাব ব্যবহারকারীদের চেয়ে ইন্টেল্যাকচুয়ালি সুপিরিয়র, অতএব তাদের অধিকার আছে জোর করে সবার মাথা থেকে হিজাব খুলার।
জোর করে হিজাব পরানোর ঘটনা যে অল্প কিছু ঘটতে পারে সেটা মানছি। এ শ্রেণী কিন্তু তাদেরকে bullying করে না। তাদের ফিল্ড অফ ইন্টারেস্ট হল স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষিত শ্রেণীর মেয়েরা যাদের প্রায় সবাই স্বেচ্ছায়,কনশাসলি হিজাব পরে এবং এটাকে ধর্মীয় অনুশাসন মনে করে। জোর করে কাউকে হিজাব পরানো যদি ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়, জোর করে হিজাব খোলানো বা bullying যে সেটারই মিরর ইমেজ এ বাস্তবতা তাদের স্থূল মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। আরও মজার ব্যপার হল, এদের কেউ কেউ টিভি টকশোতে এসে ইসলামকে এ দেশে মাইনরিটির ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে। অথচ এ দেশের বেশির ভাগ লোক যে মুসলিম এ ফ্যাক্ট ক্লাস ৪ এর একটা বাচ্চাও জানে। দেখলে মনে হয় যেন কোন একটা ধর্ম মাইনরিটির ধর্ম হলে সে ধর্মের উপর মেজরিটির রিলিজিয়াস ডকট্রিন চাপিয়ে দেয়া বিশেষ পুণ্যের কাজ। মাইনরিটি হিসেবে মনে করার এ কাজটা যদি আসলেই তারা তাদের কনভিকশন থেকে করে থাকেন সে ক্ষেত্রে অবশ্য এদেরকে মানসিক রোগী হিসেবে ট্রিট করতে হবে।

এদের আরেকটি প্রধান ট্রেড মার্ক হল কিছু দিন পর পর তারা ‘বাঙ্গালী না মুসলমান’ এ অর্থহীন বিতর্ক উসকে দেয়। ভাবটা এমন যে কেবল তাদের কাছেই এর একটি অবজেক্টিভ উত্তর আছে। এ মিনিংলেস বিতর্ক চাঙ্গা করাকেই তারা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির সবচেয়ে বড় উৎকর্ষতা মনে করে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এটা অবশ্য জীবিকা। সে ক্ষেত্রে এটা বোধগম্য। প্রকৃতপক্ষে, অল্প কিছু Schizophrenia আক্রান্ত লোক যারা মাথায় বড় লাল টিপ দেয়া, স্লিভলেস ব্লাউজ পড়া এবং শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারাকেই বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার অন্যতম প্যারামিটার হিসেবে মনে করেন এবং আসমানি গ্রন্থের বয়ানের মত বিশ্বাস সহকারে ’৭১ টিভি’ দেখেন তারা ছাড়া এ শ্রেণীর কার্যকলাপ অন্যদের কাছে মনে হয় অর্থহীন ফ্যনাটিসিজম। এ শ্রেণীর সুডো লিবারেলদের প্রগলভতা অল্প সময়ের সাময়িক উন্মাদনার জন্ম দেয় মাত্র। আদতে এরা লিবারেল আদর্শ প্রতিষ্ঠা ত দূরের কথা, লিবারেলিজম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে।

যে কোন আদর্শের অনুসারিদের মনের খায়েশ থাকতেই পারে যে তাদের অনুসৃত আদর্শ বিজয়ী হবে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের আদর্শ প্রচারের জন্য তাদের প্রথম কাজ হবে তারা যে সমাজে এ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে সমাজের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করা এবং পটেনশিয়াল ফলোয়ারদের মন-মগজ ও রুচির বাস্তবতা অনুধাবন করা। এরপর নিজেদের মডেলকে সে সমাজের বাস্তবতা অনুসারে এডজাস্ট করা। এছাড়া অন্য কিছু করে যারা কেবলি নিজেদের কনভিকশন অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায় (সেটা তাদের কাছে যত শুদ্ধই হোক) তারা সে আদর্শ সম্পর্কে একটা পাবলিক ফোবিয়া তৈরি করে মাত্র। এতে সে আদর্শের ক্ষতি ছাড়া উপকার হয় না। সম্ভবত, বাংলাদেশের এ ‘সুডো লিবারেল’ ফ্যনাটিক শ্রেণী দেশের সমাজ বাস্তবতা জানেন কিন্ত, মানতে চান না। তারা ভিন্ন মতের মানুষকে ইনক্লুশানে না বরং নিত্য নতুন কারণ দেখিয়ে এক্সক্লুশানের মাধ্যমে নিজেরদের এক্সক্লুসিভনেস প্রমাণ করতে চান। যারা নিজেদেরকে লিবারেলিজমের অনুসারি মনে করেন এবং নিজেদের আদর্শ ( liberty and equality, civil rights, freedom of the press, freedom of religion) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা রাখেন তাদের উচিত হবে এগিয়ে এসে এ ফ্যনাটিক শ্রেণীর আদর্শিক এবং মানসিক সু চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

আদর্শিক রাজনীতি ও বাস্তবতা

by Jahid Islam

দেশের একজন সাহসী চিন্তাবিদ ছিলেন আহমদ ছফা। তাঁর চিন্তায় স্বচ্ছতা ছিল। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন, লিখতেন। এতে কে খুশি হল, কে বেজার হল সেটার প্রতি খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করতেন বলে মনে হয় না। তাঁর লেখা একটা চমৎকার প্রবন্ধ হল, “বাঙ্গালী মুসলমানের মন”। এখানে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন- “বাঙ্গালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসাভাবে অনেক কিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙ্গালি মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না।”

এ প্রবন্ধের শেষ প্যারায় লিখেছেন-“বাঙ্গালি মুসলমানের মন যে এখনো আদিম অবস্থায়, তা বাঙ্গালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তার মনের ওপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে,সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু’ বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবেনা, কিন্তু বাঙ্গালী মুসলমানের মনের ধরন-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়াও যেতে পারে।”
এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সোল এজেন্ডা মুক্তিযুদ্ধ ও সেকুলারিজম। তারা নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে মনেপ্রাণে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রগতির কথা বলে শিক্ষিত মিডেল ক্লাসের কাছে আবেদন রাখতে চায়। সেকুলারিজম এবং আঞ্চলিক জঙ্গিবাদের উথানের ভয় দেখিয়ে বাইরেরর দুনিয়ার সমর্থন আদায় করতে চায়। শাহবাগে হাজার লোকের সমাগম দেখে তারা ভাবে এবার জোয়ার এসেছে, আর ঠেকায় কে ! এই বারের চোটে রাজীব হায়দার (থাবা বাবা) কেও শহীদ ঘোষণা করে দেয় শেখ হাসিনা। শাহরিয়ার কবিররা ভাবেন- “কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও যেহেতু বাহাত্তরের সংবিধানের কাছাকাছি কিছু একটা এখন আছে যাতে মূলনিতী হিসেবে ‘কম্যুনিজম’ এর কথা উল্লেখ আছে, সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম বাদ পড়েছে,শাহবাগে হাজার হাজার মানুষ এসেছে, এবারে অন্তত ধর্ম নামের আফিমের হাত থেকে মুক্তি মিলবে।”

বাস্তবতা হল এরকম যে, বাঙ্গালী মুসলমান শাহবাগে জড় হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে যদি শবে বরাত হয় (শবে বরাত পালন সহিহ কিনা সেটা অন্য তর্ক) সে তার পুরোনো পাঞ্জাবীতে শান দিয়ে, টুপি মাথায় দিয়ে হাজির। নফল ইবাদতের মাধ্যমে ভাগ্য বদলের জন্য দোয়া করে সারারাত। হয়ত পরের দিন থেকেই আবার নামাজ পড়ে না। কিন্ত আওয়ামী লীগের উগ্র সেকুলারিজমে সে বিশ্বাস করে না। নবীজিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে শুনে শাহবাগ থেকে সে হাত গুটিয়ে নেয়। সংবিধানে আল্লাহর নাম নিয়ে কাটা ছেঁড়াও তার বিশেষ পছন্দ না। কম্যুনিজম এবং উগ্র সেকুলারিজমের প্রধান মুফতি শাহরিয়ার কবির ও মুনতাসির মামুন শবে বরাতের রাতে নামাজকে আদিখ্যেতা মনে করে। মনে মনে বলে, “ শালার বাঙ্গালী। আবার মসজিদে যাও না ! এত্ত বুঝাই তাও কাম হয় না !”।

 

আবার আল্লামা শফির ডাকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় এসেছে অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে। সাধারণ পথচারীরাও প্রিয় নবীজিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে শুনে এতে শামিল হয়েছে। ইসলামপন্থীরা ভাবে এবার বাংলাদেশ ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া কেবলই সময়ের ব্যাপার। তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা হল, যেই বাঙ্গালী নিয়ে আল্লামা শফি বা জামায়াতে ইসলামি, দেশে ইসলামি শাসনের স্বপ্ন দ্যাখেন/দ্যাখে সেই বাঙ্গালী মাজারে যায়। পীরের মুরিদ হয়, মৃত ব্যক্তির কবরে সিজদা করে, গলায় তাবিজ দেয়, মিলাদ পড়ে। এছাড়াও আরও অনেক রকম শিরক করে, বিদআতি কাজ কর্ম করে।

files

আবার এটাও ঠিক যে, সে ইসলামকে ভালবাসে। শুক্রবারের জুম্মার খুতবায় হুজুরের ওয়াজ “ভাইয়েরা আমার, ইসলাম-ই একমাত্র মুক্তির পথ”, শুনে সে মাথা নাড়ায় এরপর ঘরে এসে আরাম করে বসে শুক্রবারের সিনেমা দেখে। সে যে ইসলামকে ভালবাসে, সেটা সে প্রকাশ করে মসজিদের হুজুরকে দাওয়াত দিয়ে ঘরে এনে খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে। সকালে সে তার ছেলে মেয়েকে আরবী পড়তে মক্তবে পাঠায়। শহর হলে হুজুর বাসায় এসে পড়ায়। ছেলে মেয়েরা কোরআন পড়া শিখে, নামাজের নিয়ম কানুন শিখে । সে মনে করে ব্যস-এই ত ইসলাম, আর কি ?

সে পলিটিক্যাল ইসলামে কনভিন্সড না।  মসজিদের হুজুরকে সে নামাজের মিম্বরে কিংবা ওয়াজের জায়গায় চিন্তা করতে পারে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী/এমপির সিটে না। তার কাছে রাজনীতি একটা খারাপ জায়গা। হুজুরের সেখানে কি কাজ ? জামায়াতের নেতাদের ক্ষেত্রে, যে কোন মূল্যে তাদের ফাঁসি হোক এটা সে চায় না (এটা আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীর কথা না, সাধারণ মানুষের কথা)। তবে ৭১ এ তারা ছিল দেশ বিরোধী এটাই সে বিশ্বাস করে । তাই তাদেরকেও ভোট দিতে সে খুব একটা উৎসাহি না, অন্তত জামায়েতের ব্যানারে না। সেকুলারিজম, কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামি শাসন এগুলো সব ইন্টেল্যকচুয়াল কনভিকশন। সে এত কিছু বোঝে না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি দেশের অন্তত ৫০ ভাগ লোক দেশে কয়টি সেক্টরে যুদ্ধ হয়েছে, বা স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস কবে বলতে পারবে না। ৮০ ভাগ বা তার চেয়েও বেশি লোক সহিহ উচ্চারণে কোরআন পড়তে পারে না।

সে যে ৫ বছর পর পর সুইং ভোট দিয়ে সরকারের পতন ঘটায় এটা এ জন্য না যে, ৫ বছর পর একদিন আচমকা ঘুম থেকে উঠার পর তার মাথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের খায়েশ জাগে । অথবা দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে । অথবা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ থেকে আর নামাজ ক্বাযা নয়। এবার থেকে পুরোপুরি সে ইসলামি পথই অনুসরণ করবে। সে এটা করে দুই দলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে। তার এত কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় নাই। সে ছোটে পেটের তাগিদে। এরপর যতটুকু পারে ধর্ম কর্ম করে। মূলত তার নামাজ জুম্মার নামাজ, ঈদের নামাজ আর জানাজার নামাজে সীমাবদ্ধ। আর ইসলামি জ্ঞানের একমাত্র সম্বল হল শুক্রবারের ওয়াজ।

সেকুলারিজম বা ন্যশনালিজম বা পলিটিক্যাল ইসলাম আবার কি ! এত হ্যাভিওয়েট ডেফিন্যাশন সে জানবে কোথা থেকে ? এটা হল পিউর বাস্তবতা। কোন সুগার কোটিং নাই। আপনি সেকুলারিজম, কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামি শাসন যাই কায়েম করতে চান এটা ভাল মত বুঝে এরপর শুরু করতে হবে। এটাই কাজ শুরুর প্রথম ধাপ।এরপর সে অনুযায়ী মডেল বানাতে হবে। এখানে ভারত বা ফ্রান্সের সেকুলারিজম, ব্রিটিশ ন্যশনালিজম অথবা মিশর কিংবা তুরস্কের ইসলামি মডেল চলবে না। চীন রাশিয়ার প্রেতাত্মা ত আগেই দূর হয়েছে। এদেশে স্রেফ একটাই চলবে, সেটা হল –“বাংলাদেশি মডেল”। এতে অন্যান্য মডেলের কনসেপ্ট থাকতে পারে, তবে সবশেষে হতে হবে একেবারে কাস্টমাইজ করা দেশী জিনিস । “কমরেড” বা “ইয়া আখি” টাইপ পরিভাষা এখানে চলবে না। অন্তত শুরুতে  না। পরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝে যে যত রিয়েলিস্টিক মডেল বানাতে পারে তার মডেল তত ভাল কাজ করবে। প্রথমে প্র্যাকটিক্যাল কেস থেকে শুরু করে এরপর এটাকে আস্তে আস্তে ক্যালিব্রেট করতে হবে আইডিয়াল মডেলের দিকে।