প্রথম বাংলা গে প্রাইড

image_73073.gay-rally

by আমান আবদুহু

সমকামিতা নতুন কোন ব্যাধি না। এর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ক্লাশ ফাইভে।

বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আমরা ভোরবেলায় জাহিদ স্যারের বাসায় গিয়ে অংক পড়তাম। আমাদের মধ্যে মাহমুদ ছিলো একটু বেশি সুন্দর। চট্টগ্রামের ভাষায় যাকে বলে লাল-পোয়া। স্যারের বাইরের রুমে প্রাইভেট পড়ানোর টেবিল ইউথ বেঞ্চি ছিলো। একদিন স্যার কি একটা কাজে ভেতরের রুমে গেছেন। উনার কলেজপড়ুয়া শ্যালক মফিজ এসে মাহমুদের পাশে বসলো। আমি তেমন কিছু খেয়াল করিনাই। অংক নিয়ে ঘাম বের হয়ে যাচ্ছে। একটু পড়ে স্যার আসার পর হঠাৎ মাহমুদ বলে উঠলো, স্যার, মফিজ ভাই আমাকে দিয়ে উনার *** ধরাইসে।

আমরা সবাই চমকে উঠলাম। তারপরেই জাহিদ স্যার স্বমুর্তিতে আবির্ভাব হলেন। সে কি মাইর! তখন এক ধরণের বেত নতুন এসেছিলো, বাদামী রংএর বৃত্ত ওয়ালা। আমরা ডাকতাম কেরাত বেত। সেদিন মফিজের সর্বাঙ্গে স্যার তিন চারটা কেরাত বেত ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। লিটারালি মাথার চুল থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত। আর স্যারের বউ পর্দার আড়াল থেকে বারবার ডাকছিলেন আর থামতে অনুরোধ করছিলেন।

নিজে ভিকটিম হলাম ক্লাশ নাইনে উঠে। কিছুদিন ঢাকায় ছিলাম। প্রতিদিন সকালে বাসে করে মীরপুর থেকে ফার্মগেট যেতাম। শুরুর দিকে ভীড় থাকতো না, কাজীপাড়া শেওড়াপাড়া যেতে যেতে বাসের ভেতর দমবন্ধ ভীড় হয়ে যেতো। আমি আইল সিটে বসে আছি। হঠাৎ টের পেলাম কাঁধের নিচে বাহুতে একজনের উত্থিত অঙ্গ চেপে আছে। মনে করলাম ভীড়ের চোটে হইসে। ঝুঁকে সামনের সিটে মাথা রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। তারপর ঐ লোকও একটু সরে এসে আবার। তখন আবার নিজের সিটে হেলান দিয়ে বসলাম। আবার। লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি ক্লিনশেভ ত্যালতেলে চেহারার চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর বয়স্ক এক লোক। উদাসী দৃষ্টিতে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে প্রচন্ড মনযোগের সাথে মানুষজন গাড়িঘোড়া দেখে যাচ্ছে। ভেতরে কি হচ্ছে তার যেন কোন খবর নাই। বললাম, ভাই সরে দাড়ান একটু। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে সরে দাড়ালো।

দুইতিনদিন পরে আবার। হুবহু একই ঘটনা। একই লোক। এবার প্রথমবারেই মেজাজ চড়ে গেলো। বমি আসতেসিলো। সিট ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে পেছনে চলে গেলাম। এর কয়েকদিন পরে দেখি ঐ লোক আবার। তবে এইবার ঠেকায় নাই। আমি যে সিটে বসে আছে, তার কয়েক সিট সামনে দাড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে চোখাচোখি হলো। এর কয়েকদিন পর আমি জানালার পাশে সিট পেয়ে বসে আছি। কেন জানি অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ পায়ের উপর কেউ হাত রাখাতে তাকিয়ে দেখি আমার সেই বন্ধু আমার পাশেই সিট পেয়ে গেছে। এবং আমি তাকানোতে হাত না সরিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, বাবু তোমার নাম কি? মুখে সেই ত্যালতেলে হাসি।

হালার পুত হালা। লম্বায় তখন আমি তার চাইতে এটলিষ্ট একফুট উঁচা। মাত্র শেভ করা শুরু করেছি। জাহাঙ্গীর স্যারের কাছে সপ্তাহে তিনদিন গিয়ে ইচ নি সান সি গো বলে চিৎকার করে গলা ফাটাই। আর আমারে ডাকে বাবু?? ব্যাগের বাইরের পকেটে একটা লার্জ সাইজের স্ন্যাপ-ব্লেড থাকতো তখন। বাংলাদেশে বলে এন্টি কাটার। টাকা পয়সা জমিয়ে কিনেছিলাম, এসডিআই ব্রান্ডের। প্লাস্টিকের না। বাইরের কাভারটাও চকচকে স্টিল বা এলুমুনিয়ামের ছিলো। একটু জং ধরতে শুরু করলেই ব্লেড বদলে ফেলতাম। বের করে ব্লেডটা ঠেলে বের করলাম। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ঐটা যদি গায়ে লাগে তাইলে কেটে দিবো। এখন হাত সরান।

দাড়ানো কয়েকজন তাকিয়ে ছিলো। আর ঐ বেচারা স্প্রিং এর মতো লাফ দিয়ে সিট থেকে উঠে পেছনের দিকে চলে গেলো। আর কোনদিন দেখিনাই তাকে।

এর অনেক বছর পরে অন্য একটা ঘটনার কথা জেনেছিলাম। তেমন কিছু করার ছিলো না। চেষ্টা করেছিলাম প্রতিবিধানের, কিন্তু আমার আওতার বাইরে ছিলো। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখেছি। জানি, এই বিকৃতি বাংলাদেশের সমাজে প্রচুর আছে। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা আত্মীয়দের হাতে নিগৃহীত হয়। তাদের মধ্যে অনেকে বড় হয়ে নিজেরাই নিগ্রহকারীর ভুমিকা নেয়। বাকীদের জীবনে মানসিক ট্রমা থেকে যায়, সারাজীবন কষ্ট দেয়।

আবার সমকামী জুটির মধ্যে সত্যিকার ভালোবাসা বা মানসিক টানও দেখেছি। দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছি। কিন্তু রোগ রোগই। কোন অজানা কারণে একজনের বেডসোর থেকে কেলভিন ক্লাইনের সুগন্ধি আসতে শুরু করলেও বেডসোরের পচন ও ক্ষতির পরিবর্তন হয়ে যাবেনা।

সবাই পুরুষ সমকামীদের দিকে ফোকাস করছেন। আমার ধারণা, বাংলাদেশে নারী সমকামী কম না। বরং বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। তাদের বিষয়টা বাইরে প্রকাশ হয়না। কিছু ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা যে দেখেছি বা জেনেছি, তার অনেকগুলোর ভিত্তিতে এ ধারণা। ছেলে মেয়ে যাই হোক, এরা সবাই মানসিক ভাবে অসুস্থ। এদেরকে জাহিদ স্যারের মতো ধোলাই দিলে কোন লাভ হবে না। ভালো কিছু হবে না। এদের কাউন্সেলিং দরকার, সামাজিক প্রেষণা দরকার সুস্থ জীবনযাপনের জন্য। পিতামাতা এমনকি দরকার হলে শিশু-কিশোরদেরও পর্যাপ্ত মাত্রায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার।

এ সমকামিতা অনেক পুরনো ব্যাধি হলেও, নতুন ব্যাধি হলো এর সামাজিক আত্মপ্রকাশের চেষ্টা। মানুষের ইতিহাসে এমনটা খুব বেশি দেখা যায়নি। আধুনিক যুগেও এটা আগে ছিলো ব্যাক্তিগত বিকৃতি। সামাজিকভাবে অপরাধ ছিলো। সুতরাং অনেক পটেনশিয়ালিটি আর বাস্তবে আসতো না। এখন এর জন্য উৎসাহমূলক পরিবেশ তৈরী হবে আস্তে আস্তে। একদিন আমার ছোট ভাই বা বোন হয়তো ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবে, প্রাউড টু বি এ হোমো!!

এখন এই বিকৃতিতে সুন্দর শব্দে এলজিবিটি নাম দিয়ে ডাকা হচ্ছে। ভার্সিটির মেইল আসে, নিচে রংধনু চিহ্ন দিয়ে লেখা থাকে, উই প্রাকটিস ডাইভার্সিটি। চুলের ডাইভার্সিটি। এবং এই শয়তানিকে মানুষের চিন্তায় সহ্য করিয়ে নেয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে এরা সমকামিতার গর্ববোধক মিছিল বা গে প্রাইড প্যারেড বের করে। রাস্তাঘাটে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে ঘুরে বেড়ায়।

এই গর্ববোধক মিছিল শেষপর্যন্ত বাংলাদেশেও শুরু হলো। পয়লা বৈশাখে ঢাকায় প্রগতিশীল মঙ্গলযাত্রার সাথে এইসব সমকামিদের রঙীন শোভাযাত্রা দেখা গেলো। অনেকে বলছেন, একদিন বাংলাদেশে গে প্রাইড প্যারেড হবে। হবে কি? হয়েই তো গেছে। এইটা একটা বিশাল ঐতিহাসিক ঘটনা।

সুতরাং অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন। অভিনন্দন প্রিয় লেখক শফিক রেহমানকেও। তিনি এদেশে ভ্যালেন্টাইনস ডে এনেছেন। কড়া ষ্টিগমা না থাকলে এলজিবিটি রাইটস ও আনতেন বলে অনুমান করি। তিনি এখন যা করবেন তা হলো গে প্রাইড প্যারেডের ইতিহাস, দুনিয়ার কোথায় কোথায় হয় এবং কি হয়, তার সাথে রাজনৈতিক কিছু ঘটনা যেমন মালয়েশিয়াতে আনোয়ার ইব্রাহিমকে সডমির মিথ্যা চার্জে ঘায়েল করার চেষ্টা, এসব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা লেখা লিখবেন।

আরও অভিনন্দন জানাই সমস্ত শাহবাগি প্রগতিশীল চক্রকে। অভিনন্দন নাস্তিকচক্রকে, যারা দীর্ঘদিন থেকে বাংলা অনলাইনস্ফিয়ারে সমকামিতা এমনকি পশুকামিতা বা পারিবারিক অজাচারের পক্ষেও ওকালতি করে যাচ্ছেন। অভিনন্দন বাঙালী সংস্কৃতি বনাম ধর্মকে, যা উদযাপনের সুযোগে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মার্দি গ্রাস প্যারেড হয়ে গেলো। পয়লা বৈশাখের দিনে এই কাজ হওয়াটা একটু কৌতুহল-উদ্দীপক। চারুকলা-টিএসসি-শাহবাগি কেন্দ্রিক প্রগতিশীল, যারা আবহমান বাঙালী সংস্কৃতি নির্ধারণ করেন, তাদের অনুষ্ঠানের সাথে সাথে এই অনুষ্ঠান উদযাপন উড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু না। আজ থেকে পাঁচ-দশ বছর পরে গিয়ে কি তাহলে বাংলা গে প্রাইড শোভাযাত্রা করাটা মঙ্গল শোভাযাত্রা আর পান্তা-ইলিশের মতোই নববর্ষ উদযাপনের আরেকটা অংশ হয়ে দাড়াবে?

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সরকার: এদেশ – ওদেশ

1

শিবলী সোহায়েল

 

মোবাইলটা বেজে উঠতেই রিমি ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভাবল কোন ওভারসিস কল হবে। ফোনটা রিসিভ করেই বুঝল ঠিকই ধরেছে, রাজিতের কল। গাল ভরা হাসি নিয়ে রিমি বলল, কি খবর? অনেক দিন পর?

– হ্যাঁ অনেকদিন পর। আজ এখানে অস্ট্রেলিয়ায় হারমনি ডে মানে সম্প্রীতি দিবস তো তাই সম্প্রীতি বজায় রাখতে সব বন্ধুদের ফোন করে খবরাখবর নিচ্ছি।

– ও তাই? তো তোমাদের এই সম্প্রীতি দিবস টা কি? প্রশ্নটা করেই রিমি ভাবল এবার শুরু হবে রাজিতের তত্ত্ব কথা। শুনতে অবশ্য খারাপ লাগেনা। জানা যায় বেশ কিছু আর নিজের ভাবনাগুলোও শেয়ার করা যায়।

রাজিত সোৎসাহে শুরু করল, প্রেমপ্রীতি ছাড়া যেমন সংসার টেকে না, তেমনি সম্প্রীতি ছাড়াও দেশ টেকে না। অস্ট্রেলিয়া তাই প্রতি বছর ২১ শে মার্চ পালন করে সম্প্রীতি দিবস। আদিবাসীরা ছাড়াও এখানে বসবাস করে পৃথিবীর কোনা-কাঞ্চি থেকে উড়ে আসা, ভেসে আসা হাজার ধর্মের, হাজার বর্ণের, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষেরা। ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই যেন একে অপরকে শ্রদ্ধা করে মিলেমিশে থাকে সেটাই উদ্দেশ্য। এই দিন বাচ্চারা সবাই নিজ নিজ সংস্কৃতি অথবা ধর্মীয় পরিচয় বহন করে এমন পোশাক পড়ে স্কুলে যায় আর একসাথে গান ধরে-

“উই আর ওয়ান বাট উই আর মেনি

এন্ড ফ্রম অল দি ল্যান্ডস অন আর্থ উই কাম

উই শেয়ার এ ড্রিম এন্ড সিং উইথ ওয়ান ভয়েস

আই এম, ইউ আর, উই আর অস্ট্রেলিয়ান…”

আমার সাত বছরের মেয়েটাও যাচ্ছে টুকটুকে লাল শাড়ী পড়ে। তাও আবার কুঁচি দিয়ে না, ঐ যে গ্রামের মেয়েরা যেমন করে পড়েনা সেই রকম। ফুটফুটে লাগছে…

রাজিতের উৎসাহী কণ্ঠে তাল মিলিয়ে রিমি বলল, মজার তো। তোমাদের ওখানে তাহলে তো দেখছি সম্প্রীতিতে ভরপুর। কোন ক্যাচাল, কোন ঝগড়া-লড়াই নেই একদম?

– একেবারে যে নেই তা না। শতভাগ পারফেক্ট বলে কি দুনিয়ায় কিছু আছে? কোথাও কম কোথাও বেশী, এই যা। মানুষের কাজ হচ্ছে এই ক্যাচালগুলোকে কমিয়ে রাখা, ঝামেলাবাজদের দমিয়ে রাখা। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে সরকার।

– সরকারের ভূমিকা? সে আবার কি রকম? আমাদের বাংলাদেশে তো এখন সরকারই ইস্যু তৈরি করছে, বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে এমনকি ঢালিউডের সিনেমার কাহিনীও তৈরি করছে ।রেশমা নাটকের কথা তো নিশ্চয় শুনেছ?

রিমির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একটু তাত্ত্বিক ভঙ্গিতে বলে চলল রাজিত, সমাজে কিছু কিছু মানুষ থাকবেই যাদের কাজ হচ্ছে বিদ্বেষ ছড়ানো আর উস্কানি দেয়া। মিডিয়ার কাজ হচ্ছে এই উস্কানিকে উৎসাহ না দেওয়া। সরকারের কাজ হচ্ছে সতর্কতার সাথে বিষয়টাকে দমিয়ে দেয়া।

– তাঁর মানে কি ওখানেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্যাচাল লেগে যায়? রিমি জিজ্ঞেস করল।

– ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন। কালে ভদ্রে বলতে পার। যেমন ধর প্রায় বছর আটেক আগে ২০০৫ সালে ঘটেছিল একবার। সিডনীর ক্রনুলা নামে এক জায়গায়। দোষটা মূলত ছিল মাইগ্রেটেড মিডিল-ইস্টার্ন কিছু বখাটেদের। ওরা ক্রনুলা সমুদ্র সৈকতে ভলান্টারি লাইফ সেভার মেয়েদের উত্যক্ত করল। ঘটনার শুরু সেখান থেকেই। মেয়েগুলো ছিল ‘অসি’ (Aussie)।

– অসি?

images (2)

– হ্যাঁ ‘অসি’।কয়েক পুরুষ ধরে বসবাসকারী  ইউরোপিয়ানদেরকেই মূলত এরা ‘অসি’ (Aussie)   বলে। এই ঘটনায় ক্ষেপে গিয়ে এলাকার সব  অসিরা মিডিল-ইস্টার্ন  বখাটেদের শায়েস্তা করতে জোট বেধে রাস্তায় নেমে গেল। কিন্তু কিছু সাম্প্রদায়িক চেতনাবাজ অসিরা এই ক্যাচালকে কাজে লাগিয়ে শ্লোগান তুলল, “উই গ্রিউ হিয়ার, ইউ ফ্লিউ হিয়ার”।মানে হচ্ছে, “আমরা এখানে বেড়ে উঠেছি আর তোমরা এখানে উড়ে এসেছ”।স্লোগানটা বেশ নির্দোষ শোনালেও এখানে ধারাল বিদ্বেষের বিষ আছে। এটা এক নিমিষে জাতীকে বিভক্ত করতে পারে মাইগ্রেন্ট এবং নন-মাইগ্রেন্ট এই দুই ভাগে। এখানকার সরকার জানে যে এই চেতনার জোয়ার প্লাবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা দেশে। আর তাই মোটেও দেরি না করে চেতনাবাজ স্লোগান ধারিদের ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করলো দুদিনেই। যদিও শুরুটা হয়েছিল মিডিল-ইস্টার্ন বখাটেদের দোষে কিন্তু কিছু সাম্প্রদায়িক চেতনা ব্যবসায়ীদের কারণে মার খেতে হোল বেচারা অসিদেরকেই। এখানে সরকারের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসা করার মত। ভোট ব্যাঙ্কের পরোয়া না করে সরকার দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব পালন করল।

-তো ঐ মিডিল ইস্টার্ন বখাটেদের কিছু হলো না?

-অবশ্যই, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

রিমি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, হুম, মনে হচ্ছে বাংলাদেশেও সম্প্রীতি দিবসের আয়োজন করতে হবে, যা শুরু হয়েছে আজকাল। আগে কখনই এর প্রয়োজন হয়নি। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তোমাদের অস্ট্রেলিয়ার চাইতেও ভাল ছিল। তাই দিবস টিবসের কখনো দরকার হয়নি।

– কি বলছ? উপমহাদেশের প্রায় সব কটা দেশেই তো সাম্প্রদায়িক সমস্যা মারাত্মক রকমের। অবাক কণ্ঠে বলল রাজিত।

– তা সত্যি, তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিন্তু যথেষ্ট ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে উল্লেখ করার মত সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা পাবে মাত্র হাতে গোনা ৪ থেকে ৫ টি। এই ধর ১৯৯০ সালের ঘটনা, ২০১২ সালের রামুর ঘটনা, ২০১৩ সালের নভেম্বরে পাবনা ও বরিশালের ঘটনা এবং ২০১৪-র জানুয়ারিতে যশোরের ঘটনা।

– তাই নাকি? রাজিতের কণ্ঠে হালকা অবিশ্বাস।

– রিমি কিছুটা জোর দিয়েই বলল, হ্যাঁ তাই, “List of Ethnic Riots” গুগল করে দেখ, বাংলাদেশে উল্লেখ করার মত মাত্র এই কয়েকটা ঘটনাই ঘটেছে।

রাজিত আবার অবাক কণ্ঠে বলল, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং! দেখতে হবে তো! ১৯৯০ সালের পর বাকি সবগুলো ঘটনাই তো দেখছি একেবারে রিসেন্ট। তবে ৯০ এর ঘটনাটাকে আমি সাম্প্রদায়িক  বলতে পারছিনা। আমি তখন দেশে ছিলাম, নিজে দেখেছি। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এই আন্দোলনের মোড় ঘুরাতে এরশাদই একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাবার চেষ্টা করেছিল। ওটা ছিল মোর পলিটিকাল।

রিমি বলল, হ্যাঁ সবারই তাই মত, ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পরপরই এই ইস্যুটাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল এরশাদ। আর হাঙ্গামা বাধাবার জন্য কিছু উগ্রবাদী তো সবসময়ই থাকে। সেইসময় বাবরী মসজিদ নিয়ে যে সাম্প্রদায়িক জোয়ার উঠেছিল তার ধাক্কা বাংলাদেশ লাগাটা খুব অস্বাভাবিক ছিলোনা। কিন্তু বাংলাদেশ সত্যিই ব্যতিক্রম ছিল।

-আমার এখনও মনে আছে সেসময় আমার বাপ চাচারা অন্যান্য মুসল্লিদেরকে নিয়ে সারারাত বসে ছিলেন নারিন্দার গড়িয়া মঠের সামনে, যাতে কেউ মন্দির আক্রমণ করতে না পারে। কি আজব! সরকার উস্কানি দিচ্ছে আর সাধারণ মানুষ চেষ্টা করছে থামাতে! কৌতুক মেশানো কণ্ঠে বলল রাজিত।

Ramu

-২০১২, ১৩ র ঘটনা গুলো তো আরও আজব যেমন ধর রামুর ঘটনা। হাজার বছর ধরে বৌদ্ধ-মুসলিম সেখানে একসাথে বসবাস করছে, কখনো কিন্তু কিছুই শোনা যায়নি। হঠাৎ  করেই কি ভয়ানক একটা ঘটনা ঘটে গেল ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ মধ্যরাতে। তুমি বলছিলে সরকারের ভূমিকার কথা। ধরে নিচ্ছি ঘটনাটা ঘটে গেছে হঠাৎ  করেই চোখের পলকে সরকারের কোন কিছু করার ছিলোনা। মেনে নিলাম। কিন্তু এটা তো একটা সাধারণ প্রত্যাশা যে এরপর সরকার দোষীদের কে ধরবে, সাজা দেবে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। অবাক হবার মত ঘটনা কি জান, সরকার তদন্ত টদন্ত না করেই দোষ দিলো রোহিঙ্গাদের।তার মানে তারা আরেকটা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উস্কে দিতে চাইলো। অকল্পনীয়। জানিনা আর কোন দেশে এমন উদাহারন পাওয়া যাবে কিনা।

অবাক হয়ে বলল রাজিত, বল কি? কি করে সম্ভব?

– তুমি অনেক বছর ধরে বাইরে আছ তাই অবাক হচ্ছ। এদেশে আজকাল অনেক কিছুই সম্ভব হচ্ছে। বিশ্বাস করবে, যেদিন রাতে এই ঘটনা ঘটলো সেদিন বিকেলে সরকারীদলের লোকজন উস্কানিমূলক মিছিল করছিল রামুতে? আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই তুমি ২৪ অক্টোবর ২০১২ এর ডেইলি স্টার খুলে দেখ। সত্যিই এগুলো বলতে মোটেই ভাল লাগেনা, কি দেশটা ধিরে ধিরে যে কি হয়ে যাচ্ছে! বলতে গিয়ে রিমির গলায় একটুখানি আবেগ আটকে গেল তাই গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ২০১৩ সালের পাবনা সাথিয়ার ঘটনাটা তো শুনেছ?

– হ্যাঁ শুনেছি।

– ৭ ই নভেম্বর ২০১৩-র ডেইলি স্টারের রিপোর্টটা চোখে পড়েছে? হেডিংটা দেখেছ? “Some attackers seen with Tuku”। টুকু কে জান তো? টুকু হচ্ছে তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

– কি বললে? স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী? মানে হোম …

রাজিতকে শেষ করেতে না দিয়েই বলল রিমি, হ্যাঁ, যার দায়িত্ব দেশের সকল মানুষকে নিরাপত্তা দেয়া। সেসময়কার নিউজগুলো পড়লে যে কারো মাথা খারাপ হতে বাধ্য। কোন কোন পত্রিকা লিখেছে “হিন্দুদের ওপর হামলা, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিয়াই তসলিম উদ্দিন খান কে গ্রেফতার” আবার কেউ কেউ লিখেছে, “চাপে পড়ে পরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিয়াই তসলিম উদ্দিন খানকে ছেড়ে দেয়া হয়”।

– বরিশাল আর যশোরের ঘটনাও কি একই রকম? জিজ্ঞেস করল রাজিত।

– বরিশালের ঘটনায় ২১ নভেম্বর ২০১৩ সরকারী সমর্থক পত্রিকা কালের কণ্ঠের রিপোর্টটা দেখ, “বরিশালে মন্দির ও বাড়িতে আগুন দেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা!” আর যশোরের ঘটনাটা ঘটলো ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে, নির্বাচনের পরপরই। বিষয়টি ছিল, পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল ওহাব বনাম একই দলের এমপি রণজিতের বিরোধ। ওহাব তার প্রতিপক্ষ বিজয়ী রণজিতের সাথে পেরে না উঠে হামলা পরিচালনা করে। যেহেতু ওহাব নাম ধারী মুসলমান, বিজয়ী রণজিৎ হিন্দু, তাই সহজেই এটাকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। জানুয়ারি মাসের পেপার পত্রিকা এবং টিভি রিপোর্ট থেকে এই ধারনাই পাওয়া যায়।

– তুমি কি আজকাল বিরোধীদল কর নাকি? শুধু সরকারকেই দোষ দিচ্ছ? সরকার কেন এসব করতে যাবে? একটু খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করল রাজিত।

– না আমি মোটেই সরকারকে দোষ দিতে চাচ্ছি না। আমি বলছি সরকারের ভূমিকার কথা। ঘটনা যাই হোক, দোষী যেই হোক সেটা খুঁজে বের করা তো সরকারের দায়িত্ব নাকি? কখনও কি শুনেছ সরকার এর ওর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে চুপচাপ বসে থাকে? এই যে সেদিন মালয়েশিয়ান প্লেনটা হারিয়ে গেলো। মালয়েশিয়ান সরকার কি টেররিস্টদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বসে আছে? ওদের ট্রান্সপোর্ট মিনিস্টারের তো এখন রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ওরা চীন, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল, সন্ধানী দল সবাই কে সাথে নিয়ে খোজা খুজি করছে হারিয়ে যাওয়া প্লেনটা।শুধু তাই না হারিয়ে যাওয়া যাত্রীদের পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা, সাহায্য দিতে নিয়োগ করেছে ৭০০ জন সেবক- সেবিকা ।তারা রাত দিন ২৪ ঘণ্টা এই পরিবারগুলোর দেখ-ভাল করছে। আর আমরা? সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর মন্ত্রীরা এর-ওর উপর দোষ চাপিয়ে, নড়া চড়া তত্ত্ব দিয়ে, বিদেশী সাহায্যে কে নাকচ করে দিয়ে একটা যা তা অবস্থা। কথা হচ্ছে সমস্যা একটা হতেই পারে কিন্তু তারপর আমরা কি করছি। যে দায়িত্ব দিয়ে মানুষ সরকারকে বসিয়েছে সে দায়িত্ব সরকার পালন করছে কিনা? অবিশ্বাস্য হচ্ছে উপরের ঘটনাগুলোর একটি ক্ষেত্রেও সরকার তা করেনি। তাই প্রশ্ন উঠেছে সরকারের ভূমিকা নিয়ে। তাছাড়া তুমি যদি লক্ষ্য কর দেখবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার কোন না কোন একটা ইস্যুকে ধামা চাপা দিয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোকে সামনে এনে।

-মানে?

-মানে হচ্ছে ঠিক ১৯৯০ সালে এরশাদ যা করতে চেয়েছিল এখনও সম্ভবত তাই হচ্ছে।এটা মোটেও নতুন কিছু নয়। কিছুদিন আগে মিশরের সামরিক জান্তা সংখ্যালঘু খৃষ্টান-চার্চে আক্রমণ করিয়ে বিরোধীদের দোষারোপ করল। আরে বাবা আন্দোলন যখন দানা বেধে উঠেছে, বিরোধীরা কোন আক্কেলে কপ্টিক চার্চ আক্রমণ করে আন্দোলনকে ভণ্ডুল করবে? একটু খেয়াল করে দেখ, বাংলাদেশে ২০১৩–র নভেম্বরে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন তুঙ্গে তখনই কিন্তু ঘটল পাবনা আর বরিশালের ঘটনা। আর নির্বাচনের পর যখন একতরফা কারচুপির নির্বাচন নিয়ে সরকার দেশে বিদেশে প্রবল সমালোচনার মুখে তখন ঘটলো যশোরের ঘটনাটা। ব্যাপারগুলো কি একেবারেই কাকতালীয়? শুধু আমিই না হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন গুলোও সরকারের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি সরকারী মানবাধিকার কমিশনও এই একই কথা বলে কিঞ্চিৎ দৌড়ের উপর আছে।

রিমির রাশভারী যুক্তিগুলো শুনে রাজিত একটু গম্ভীর স্বরে বলল, অবিশ্বাস্য বটেই, কোন কোন সরকার অনেক সহনশীল জনগণকে নিয়েও সম্প্রীতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে আর কোন কোন সরকার অসংখ্য চরমপন্থিদের নিয়েও সম্প্রীতি ধরে রেখেছে শুধুমাত্র আইন, সুশাসন, সুবিচার ও সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। যেমন ধর দক্ষিণ আফ্রিকা অথবা ধর আমাদের কাছের দেশ মালয়েশিয়া অথবা সিঙ্গাপুরের কথা। মাত্র ৩০/৪০ বছর আগেও ওদের সাম্প্রদায়িক সমস্যা কতটাই না  গভীর ছিল। অথচ সরকারের সঠিক ভূমিকার ফলে সব কিছুকে পিছনে ফেল ওরা কতটা এগিয়ে গেছে, এগিয়ে যাচ্ছে।

– সেটাই। যাক অনেকদিন পর অনেক কথা হোল। দেশের সম্পর্কে অনেক ভালো ভাল কথা বলতে ইচ্ছে করে, ভাবতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কি করার আজকাল শুধু সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষই নয় রাজনৈতিক বিদ্বেষের বিষ ছড়ানো হচ্ছে আরও বেশী।

– সেদিন প্রথম আলোতে সৈয়দ আবুল মকসুদ এর একটা লিখা পড়লাম। খুব ভাল লাগলো। লিখাটা উনি শেষ করেছেন এভাবে, সেদিন মুক্তিযুদ্ধ হয়েই ছিল একটি সংহত, সম্প্রীতি-পূর্ণ ও আত্মমর্যাদা শীল জাতি গঠনের জন্য, যেখানে থাকবে না হিংসা, ঘৃণা ও বৈষম্যের কোনো স্থান।এই পরিস্থিতিতে এসে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরাও যখন একটি সংহত, সম্প্রীতি-পূর্ণ ও আত্মমর্যাদা শীল জাতির কথা বলছে, তোমার আমার মত দেশের সাধারণ মানুষও যেহেতু সম্প্রীতি-পূর্ণ সমাজের প্রয়োজন বুঝতে পারছে, সরকারকেও বুঝতে হবে আজ অথবা কাল।

রিমি এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, দোয়া করো যেন তাড়াতাড়ি বোঝে, মেঘনায় আর কোন লাশ ভাসা দেখতে চাই না।

 

রাজিত এবার একটু মজা করেই বলল, এক কাজ করো তোমরাও অস্ট্রেলিয়ার মত একটা সম্প্রীতি দিবস পালন কর। যেদিন বিভিন্ন ধর্ম, দল ও আদর্শের সবাই একসাথে জড়ো হবে। কেউ ধুতি পড়ে, কেউ টুপি পড়ে, কারো গলায় হোলী ক্রস, কারো গায়ে মুজিব কোট, কারো হাতে তারবীরের ছবি, কারো হাতে তারপিরের ছবি। সবাই একসাথে মিলে, হাতেহাত ধরে দাঁড়িয়ে লাখ কণ্ঠে সম্প্রীতি সঙ্গীত গাইবে, বিশ্ব রেকর্ড গড়তে নয়, সম্প্রীতি গড়তে-

 Flag Old

নানা ধর্মের, নানা মতের তবু আমরা মানুষ এক

এই মাটিতেই আমরা সবাই জন্মেছি এক ঝাঁক,

আমরা একই স্বপ্ন দেখি ধরি একই গলায় গান

আমি, তুমি, আমরা সবাই বাংলার সন্তান।।

গিনেজ বাংলাদেশ

by: Aman Abduhu

গিনেজ রেকর্ডের সাথে পরিচয় ছোটবেলায়, না বুঝতে শেখার বয়স থেকেই শুরু।

ইত্তেফাকের ভেতরের পাতায় এ ধরনের কাজকর্মের ছবি থাকতো। সম্ভবত গিনেজ বা রিপলিস বিলিভ ইট অর নট। মাঝে মাঝে রহস্যপত্রিকা, বিচিত্রা, রিডার্স ডাইজেষ্ট বা ঢাকা ডাইজেষ্টেও দেখতাম। অদ্ভুত সব ঘটনা আর সাথে চমৎকার হাতে আঁকা ছবি। অমুক দেশে একজন চুল দিয়ে ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে, তমুক দেশে আরেকজন পানির উপর ঘুমাচ্ছে, পিপড়ারা মিলে সাতফুট উঁচু পিপড়া-বাড়ি বানিয়েছে। এ ধরণের মজার মজার ছবিগুলো দেখে ভাবতাম পৃথিবী কতইনা আজব একটা জায়গা!

আর আজকে আমার দেশ, বাংলাদেশটাই হয়ে গিয়েছে পৃথিবীর আজবতম দেশ। যেদেশে নাগরিকরা খেতে পায় না চিকিৎসা পায় না শিক্ষা পায় না, সে দেশে আজ রেকর্ড বানানোর জন্য শতকোটি টাকা লুটোপুটি খায়। এই দেশে মানুষ স্বাভাবিক অধিকারগুলো পায় না। প্রতিদিন নারীরা ধর্ষিত হয় শুধুমাত্র বাকি জীবনটুকু ভয়ংকর আতংক নিয়ে বুকফাটা কান্না চেপে রাখার জন্য। প্রকাশ্য দিনের বেলায় সবার সামনেই মানুষ খুন হয় বিচারহীন, অথবা রাতের বেলায় গুম হয়ে যায় হারিয়ে যায় চিরদিনের জন্য। আর সেদেশের মানুষ দরদ দিয়ে গান গায়, আমার সোনার বাংলা! আশ্চর্য সব ছবির সাথে বলার মতো বাংলাদেশের গিনেজ রেকর্ড কি পতাকা বা গানে? আমার তো মনে হয় আসল গিনেজ রেকর্ড এগুলোই।

ছবি দেখার বয়স পেরিয়ে একটু বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখলাম, তখন থেকে দেখে আসছি বিভিন্ন ধরণের ব্যাতিক্রমী মানুষেরা গিনেজ রেকর্ড করে। মাঝে মাঝে অনেক মানুষ মিলেও রেকর্ড করে। এসব ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠান, অর্গানাইজেশন বা কোম্পানী এইসব কাজকর্ম স্পন্সর করে। তাদের নামও রেকর্ডের সাথে যোগ হয়।

কিন্তু কোন দেশ?? পুরো একটা দেশ মিলে গিনেজ রেকর্ডের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের হালকা স্বীকৃতি পাওয়ার মতো কাজের পেছনে দৌড়াতে থাকে! আমার দুর্বল স্মৃতিতে এমন ঘটনা আর মনে পড়ে না। মনে করতাম, দেশ বা রাষ্ট্র আরো অনেক উঁচু পর্যায়ের বিষয়। ধারণা ভুল ছিলো।

এখন দেখি বাংলাদেশ দৌড়াচ্ছে। বাংলাদেশের পতাকা রেকর্ড হলো। দেখে বাংলাদেশের সৎ ভাই পাকিস্তানের হিংসা হলো। তারাও দৌড়ালো। পৃথিবীতে এমন অদ্ভুত দেশ কি আর তৃতীয় কোনটা আছে? এসব দেখে বিবমিষা হয়েছিলো আমার। গাড়ির পেছনে একটা লাল সবুজ কাগজের পতাকা লাগিয়ে রেখেছিলাম। যেদিন পতাকা রেকর্ডের ছবিটা প্রথম দেখলাম, ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে কার ওয়াশে গিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেলেছি। প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলো, ঘৃণা লাগছিলো। তারপর বাসায় ফিরে দেখি পড়ার টেবিলের উপর টেবিল ল্যাম্পে আরেকটা পতাকা লাগানো; কাপড়ের ব্যান্ডানা। অনেক ভাবলাম এটাও নোংরা করে বিনে ফেলে দেই। কিন্তু পারিনি। লাল বৃত্তটার দিকে তাকিয়ে এখন লিখছি। এতো বদমায়েশির পরও ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মাটি আর লাল সবুজের পতাকা অনেক কষ্ট দেয়।

তবে স্বীকার করতে হয়, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান এ দুটো দেশ হলো অনন্য। কোন তুলনা নেই। দেশের বাইরে গেলে থার্ড আই ভিউতে দেখা যায়, এ দুই দেশের মানুষেরা কেমন। আমরা বাংলাদেশীরা এভারেজে যতটা খারাপ, পাকিস্তানীরাও ইন জেনারেল ততটা বদমাইশ। সত্যিকার অর্থে ব্যর্থ দুইটা দেশ। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বানানো অতীত ছাড়া এ দুই দেশেরই গর্ব করার মত তেমন কোন অর্জন নেই। পাকিস্তানীদের নিউক্লিয়ার পাওয়ার আছে অবশ্য, কিন্তু তা আসলে জলা জমির উপর দাঁড় করিয়ে রাখা রিয়েল এষ্টেট কোম্পানীর সাইনবোর্ডগুলোর মতো। ভেতরে ফাঁপা, ঠনঠন। এই ধরণের অর্থহীন এবং ফাঁপা কাজে তাদের কাউন্টারপার্ট বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য একটু কম। তাই তাদের দৌড় হলো পিলখানায় প্রতিবেশী বন্ধুদের হাতে নিজের ব্লাড ব্রাদার্সদের ব্লাডশেড ঠিক মতো সম্পন্ন হওয়া তত্ত্বাবধান করা। এবং অবৈধ সরকারের খুঁটি হিসেবে দাড়িয়ে থাকা। সুতরাং বাংলাদেশকে সেই সব গর্বের সাইনবোর্ড টাঙানোর জন্য গিনেজের দ্বারস্থ হতে হয়, যেখানে লাখো কণ্ঠে কিছু বোধবুদ্ধিহীন চিৎকার শোনা যায় শুধু “আমার সোনার বাংলা ……………..”।

আসলে, ভালোই হয়েছে। ভিনদেশে অজপাড়াগাঁয়ের কেউ যদি জানতে চায়, বাংলাদেশ টা কোথায়? গর্ব করে উত্তর দিতে পারবো, গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায়।

‘সেকুলার রাষ্ট্রে’র বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক আবাসিক হল কেন?

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ধর্মগুরু তৈরির প্রকল্প নিয়ে শুরু হলেও ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের রেনেসাঁসের  সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সাধারণ্যের, বিশেষত উচ্চবিত্তের কাতারে নামতে থাকে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার সূচিকাগার ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আদিতে ধর্মযাজকদের শিক্ষার কলেজ ছিল। ব্রিটিশেরও পূর্বে  ‘হোলি রোমান সাম্রাজ্যে’ ১০৮৮ সালে যাজক বানানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়। তার পূর্বে আফ্রিকার মিশরে ৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ইসলামী ধর্মচর্চার কেন্দ্র। আর  প্রাচীণ ভারতের নালন্দায় খ্রিস্টপূর্ব ১০ শতকে (সম্ভবত) প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশিলাও ছিল বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষুদের জ্ঞানচর্চার বিহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সাধারণ্যের কাতারে নামার সাথে সাথে এবং ‘এনলাইটেনমেন্টে’র প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শনও বিবর্তিত হয়ে এক বিশ্ববোধের চেতনায় উন্নীত হয়। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা তাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার এক অনিবার্য অংশ।

HJH1

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেভাবে বড় গলায় নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বাতিঘর হিসেবে দাবী করে থাকেন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূতিকাগার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিহিত করে থাকেন সেখানে ভাবতে অবাক লাগে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক (অপ)সংস্কৃতির চর্চা হয়ে থাকে। পৃথিবীর মূলধারার কোন বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বাংলাদেশের গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মুসলিম বনাম অন্যান্য সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভেদসহ আলাদা আবাসিক হলের কোন নজির নেই। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশের মত অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে এ সাম্প্রদায়িকতার চর্চা হতে পারে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠণের ব্যার্থতার দায় এ বিশ্ববিদ্যালয় এড়াতে পারে কিনা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের দায় নিয়ে। যেহেতু লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করে ফেলেছিল এবং এই ভাগ করার বিরুদ্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক জমিদার ও প্রভাবশালী হিন্দুরা তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯১১ সালে  এটিকে ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল তাই ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কে সন্তুষ্ট করতেই ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এক বাংলায় দুইটি আর্থ-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অখন্ড বাংলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাটিও খুব সহজ ছিল না। আমাদের কবিগুরুও সে দেয়ালের পিলার ছিলেন বলে অনেক কুৎসা আছে। সে যাই হোক, অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন যাত্রা শুরু করল তখন এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উত্থান ঠেকানো এড়ানো না গেলেও তখনকার সামাজিক জাত-বর্ণ প্রথার প্রেক্ষাপটে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে এর যাত্রা শুরু করতে পারেনি। এর অন্যতম নিদর্শন মুসলিম এবং অমুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আলাদা আবাসিক হলের প্রবর্তন। ব্রিটিশ উপনিবেশের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’নীতির আলোকে সাম্রাজ্য পরিচালনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন তৈরির এ দ্বৈতনীতিও স্বাভাবিকভাবেই উপনিবেশের স্বার্থেই দরকার ছিল!

আর পরবর্তীতে পাকিস্তান যেহেতু একটি ধর্মরাষ্ট্ররূপে কিংবা মুসলমানদের রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি করে রাখা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্মরাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সে বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে এই ধরণের জঘন্য সাম্প্রদায়িক একটা ব্যবস্থা কীভাবে প্রশ্নাতীতভাবে টিকে আছে সেটা এক মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই বলে থাকেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং এর সফল বাস্তবায়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই নেতৃত্ব দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্তও বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। এটা সত্য যে রাজনৈতিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারের কেন্দ্রেই অবস্থান করছে। কিন্তু এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক গড়ণ কীভাবে হচ্ছে তার খবর কি সচরাচর রাখা হয়? শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যখন তার শিক্ষার্থীদের পৃথক পৃথক গোয়ালঘরে ঢুকানো হয় তখন কি তা বিশ্ববিদ্যালয়টির মৌলিক আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে বসে না? শুধু কি তাই, মোটা দাগে এটি কি রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষকতাই করছে না?

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬ টি। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে রাখা হয়। এমনকি আমরা যদি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই সেখানেও দেখতে পাব বিশ্ববিদ্যালয়টির নামের সাথেই একটা সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের সম্পৃক্ততা থাকার পরেও সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা আবাসনের কোন ব্যবস্থা নেই।

পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও ধর্মীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা বাসস্থানের কোন ব্যবস্থা নেই। ইন্ডিয়ার যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথেই ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়া আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া, বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

উত্তর প্রদেশে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৫ সালে উত্তর ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমেদের হাত ধরে। মজার ব্যাপার হল বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন একজন হিন্দু রাজা রাজা জয় কিসান দাস।  বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে অধ্যায়ন করছেন প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। ১৯ টি আবাসিক হলের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে হিন্দু-মুসলিম সব বিখ্যাত ব্যক্তির নামেই আবাসিক হল থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন হলকে চিহ্নিত করা নেই। দিল্লীর জামিয়া মিল্লাহ ইসলামিয়া এখন ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করছে। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আলি এবং মাওলানা শওকত আলির নেতৃত্বে  মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ভাইস চ্যাঞ্চেলর ছিলেন ড.জাকির হোসেন। ৫০ শতাংশ আসন মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন ১৭ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী।  বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন আবাসন বৈষম্য নেই। বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এশিয়ার  অন্যতম বৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৬ সালে। দুইটি ক্যাম্পাসে বিস্তৃত বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়তন ১৬ বর্গকিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০ হাজার শিক্ষার্থী ছড়িয়ে আছে এর ৬০ টি আবাসিক হোস্টেলে। নামে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসনে ধর্মীয় পরিচয়ের কোন ভূমিকাই নেই।

ইন্ডিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদা আবাসনের নজির নেই। আর অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তো এটা কল্পনারও বাইরে।

যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি মুখ্য এবং স্পর্শকাতরই হয়ে থাকে তাহলে লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত করাও সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক। সে প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্রে ছেলেদের জন্য আলাদা হলের ব্যবস্থা থাকলেও মেয়েদের জন্য আলাদা কোন হলের ব্যবস্থা নেই। এটি যেন এমন যে, ছেলেদের জাত যাওয়ার ভয় থাকলেও মেয়েদের জাত-পাতের কোন বালাই নেই! এবং একটি রাষ্ট্রের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় যখন এভাবে লিংগীয় বৈষম্যমূলক এবং পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসারে ভূমিকা রাখে তখন রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন দাবী করে।

রাষ্ট্রযন্ত্রটির আদর্শ নিয়ে পূণর্ভাবনা কেন দরকার তার জন্য সামাজিকীকরণের বিষয়টার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। যেমন, ধর্মবিশ্বাস একটি মানসিক প্রক্রিয়া। ধর্মবিশ্বাসের রূপ যখন মানুষের আচরণে ফুটে উঠে তখনই আমরা কেবল জানতে পারি সে কোন ধর্মজাত। একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের বলয়ে যে মানসিকতা গড়ে উঠে সে মানসিকতার কাছে যখনই অন্য ধর্ম-বিশ্বাস এবং জীবনাচরণ প্রকাশ পায় তখনই তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় এবং সে তখন সে বিশ্বাসের প্রতি এক ধরণের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। এই প্রতিক্রিয়া যখন এক ধর্মের অথবা এক সম্প্রদায়ের সাথে অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে হয় তখন আমরা বলি এটা সাম্প্রদায়িক আচরণ। যেহেতু মানুষ গোত্রপ্রথা থেকে বের হয়ে এসে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে শুরু করেছে তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায় পরিচয়ের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতেই দরকার একটি অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। তা না হলে সমাজে সবল দূর্বলের উপর, সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর উপর নিপীড়ণ চালাবে। তাই একটি স্থীতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্যই দরকার অসাম্প্রদায়িক নাগরিক এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনা।

এই অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনার জন্য প্রথমেই যেটি দরকার সেটি হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে স্বাভাবিক সহাবস্থানের মানসিকতা তৈরি। এই মানসিকতা তৈরি হয় সমাজের বিভিন্নক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সক্রিয়ভাবে নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। আর এই মিথস্ক্রিয়া বাড়লে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এবং জীবনবোধের কাছাকাছি আসতে পারে। এই কাছাকাছি আসা থেকে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। আর এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যে সমাজে বিদ্যমান থাকে সে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা দানা বাঁধতে পারে না। যেকোন সমাজের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাই দায়িত্ব হচ্ছে এমন কাঠামো তৈরি করা যেটি নাগরিকদের মধ্যে এই উদার মানসিকতার সৃষ্টি করবে।

আর এই মিথস্ক্রিয়া যেখানে থাকে না সেখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়কে এলিয়েন ভাবে এবং নিজেদের অজ্ঞতা থেকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতি থেকে এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতা তৈরি হয় যা থেকে বিদ্বেষ বাড়ে যেটি অনিবার্যভাবেই সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড়ঘর ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’দের আলাদা হলের বরাদ্দ নিয়ে ভাবনাগুলোকে মোটা দাগে চারটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিমদের জন্য রয়েছে এক প্রকার হল এবং মুসলিম ভিন্ন অন্য সব ধর্মবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে একটি হল। এখানে মুসলিম বনাম অন্যান্য(সংখ্যালঘু) ধর্মের আড়ালে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ বিভিন্ন ধর্মের স্বতন্ত্র্যতা রক্ষা করা হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভিন্নমতের(ভিন্ন ধর্ম) নূন্যতম অস্তিত্ব না থাকায় তাদের মধ্যে সহাবস্থানের একটি অন্তর্নিহিত চেতনা তৈরি হয় না যেটি তাঁর গণতান্ত্রিক মানসিকতার গঠনকে বাধাগ্রস্ত করে।

তৃতিয়তঃ কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটা রটনা উঠল যে একটি জঙ্গী সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সংখ্যালঘু হল’ আক্রমণ করবে। তখন হলটির শিক্ষার্থীগণ নিজেরা এটাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাতভর হলটি পাহারা দেয়। তার মানে হলটির ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়টিই তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি যেটি ১৯৭১ সালেও এই পরিচয়ের কারণেই মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল।

চতুর্থতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি এই হলটি চালিয়ে রাখার সপক্ষে  পর্যাপ্ত যুক্তি থেকেও থাকে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়ার দায়ভার নেবে কে? বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মত এখানেও পুরোপুরি লিঙ্গবৈষম্যকেই স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে।

এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৪৩ বছর বয়স হওয়া স্বত্বেও এই নীতিগত অসামঞ্জস্যটি নিয়ে কেউ শক্তভাবে কথা বলেননি কিংবা বলার সাহস পাননি! এবং এই দুই কারণের কোনটাই কম বিপদজনক নয়। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে থাকা সাম্প্রদায়িকতার এ মালগাড়ীতেই সওয়ার হয়েছে রাষ্ট্র যেটির গতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে অন্তর্দন্দ্ব। রাষ্ট্রটির কি তার এঞ্জিন নিয়ে ভাবতে শুরু করা উচিত নয়?

সীমান্তের এপার ওপার – পর্ব ২

 by WatchDog

ব্ল্যাক-মেইলিং’এর এমন মুখোরচক গল্পের সাথে একেবারে যে পরিচয় ছিলনা তা নয়, কিন্তূ তা সীমাবদ্ব ছিল কেবল খবরের কাগজে। কিন্তূ এ ধরনের অভিজ্ঞতা সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে আমার নিজের সামনে হাজির হবে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। একদিকে অফিসে আমার সততা, অন্যদিকে দু’টো বাসা পর ভালবাসার মানুষটার কথা মনে হতেই মনে হল আমি ঘামছি। ভারি বৃষ্টির কারণে অনেকেই আফিসে আসতে পারেনি সেদিন, আর যার কথা ভেবে বেশী চিন্তিত হচ্ছিলাম সে ছিল রাজশাহীতে, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ভর্তি পর্ব সমাধানে ব্যস্ত। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বুকে সাহষ নিয়ে মুখোমুখি হলাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক জারজ সন্তানদের। এবং এটা ছিল এ ধরনের অনেক মুখোমুখির শুরু মাত্র।

আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল রাজ্যের বিস্ময়। এক; রিং লীডার যার নেত্রীত্ত্বে স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারের ছত্রছায়ায় এ লাভজনক ব্যবসা প্রসার লাভ করছিল, সম্পর্কে সে আমার মামা, মার আপন খালাত ভাই। বহু বছর মামাবাড়ি যাওয়া হয়নি বলে এমন আজরাইল উত্থানের সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি আমার। মামা এ জন্যে হাজার আফসোস করতে লাগলেন। সাংগ পাংগদের বের করে দুপা জড়িয়ে রাজ্যের মাফ চাওয়া শুরু করল আমার মামা। কথা দিতে হল আমার জেলা শহরের কাউকে এ ঘটনার কথা জানতে দেবনা। আগামী নির্বচনে বিএনপির আশীর্বাদ নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা তার। সব ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে আমার গল্পে। তা ছাড়া আমাদের পারিবারিক প্রত্যাঘাত সামলাবার মত কোমরের জোড় আমার মামুর যে ছিলনা তা বলাই বাহুল্য।

দুই; গল্পের নায়িকার প্রসংগ আসতেই জানতে পারলাম চমকপ্রদ এক কাহিনী। বাংলাদেশের রাজপুটিন আজিজ মোহম্মদ ভাইয়ের সুন্দরী নেটওয়ার্কের সে ছিল পোষ্য সদস্য, ব্যবসার অন্যতম অংশীদার ছিল তার মা। কালের চক্রে এই টিভি সুন্দরীর সাথে ভিন্ন পরিস্থিতীতে দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল তার মার সাথে। সে কাহিনী লিখতে গেলে বিশাল এক উপন্যাসের সূত্রপাত হয়ে যাবে, যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং এর সূবিধাভোগীদের নিয়ে স্ল্যাম ডগ মিলিওনিয়ারের মত মহাকাব্যিক এক ছায়াছবি বানানো যাবে হয়ত। তুলে রাখা যাক এ কাহিনী অন্য এক সময়ের জন্যে। এ ফাকে বলে রাখা ভাল, এ ঘটনার পর অফিসে চাঁদাবাজি ভোজাবাজির মত মিলিয়ে যায়।

মন এমনিতেই তিতিয়ে ছিল ঢাকা শহরের প্রতি, মডেল কন্যার ঘটনাটা সিদ্বান্তটা এগিয়ে আনতে সাহায্য করল। আমি ঢাকা ছেড়ে নিজ শহরে চলে যাচ্ছি। কোটি মানুষের ঢাকা শহর আমার মত নগন্য একজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাবে তার কোন সম্ভাবনাই ছিলনা, বাস্তবেও হল তাই। চোরের মত পালিয়ে গেলাম এ শহর ছেড়ে। ক’টা মাস আগেও জীবন ছিল মস্কো, লন্ডন, বার্লিন এবং ইউরোপের বিভিন্ন জমকালো শহর ভিত্তিক, অথচ ঢাকায়ও আমার জায়গা হলনা আজ। যাওয়ার আগে এক বন্ধুর পরামর্শে হাজার দশেক টাকা খরচ করে স্কীল মাইগ্রেশনের জন্য গুলসানস্থ অষ্ট্রেলিয়ান দূতাবাসে একটা দরখাস্ত জমা দিয়ে গেলাম।

যে বাড়িতে আমার জন্ম, যেখানে আমি বড় হয়েছি, বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যে মেঘনা নদীর কুল ঘিরে বেড়ে উঠেছে আমার শৈশব, কৈশোর, সে মাটিতে আমি ফিরে গেলাম। মাঝ খানে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, নদীতে গড়িয়ে গেছে অনেক পানি। দু’টা মাস শুধু ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম; ইউরোপের ক্লান্তি, ঢাকা শহরের ক্লান্তি সব ধুয়ে মুছে কোন এক সুন্দর ঝলমল সকালে হাজির হলাম পারিবারিক শিল্প-প্রতিষ্ঠানে। এখানে আমাকে কাটাতে হবে পরবর্তী বেশ ক’টা বছর, মুখোমুখি হতে হবে রাজনীতির কদার্য এবং কুৎসিত চেহারার সাথে। আমরা যারা বাংলাদেশের রাজনীতিকে নেত্রী এবং দল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভেবে মূল্যয়ন করতে অভ্যস্ত, তাদের জন্যে আমার পরবর্তী লেখাগুলো হতে পারে চক্ষু উন্মোচনের শুরু হিসাবে।

চলবে..

Posted Wed, 04/22/2009 – 00:35

সীমান্তের এপার ওপার – পর্ব ১

by Watchdog Bd

সময়টা ’৯৫ সাল, অষ্ট্রেলিয়াতে সবেমাত্র মাইগ্রেট করেছি। সিডনির কেনসিংটনে ২ রুমের একটা ফ্লাটে আরও দু বাঙালীর সাথে শেয়ার করছি। ১১ বছরের ইউরোপীয় জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিলাম মা, মাটি আর মানুষের টানে। প্রথম চাকরী, প্রথম প্রেম, প্রথম ভালবাসা, প্রথম বিরহ, এমন অনেক কিছুই ছিল প্রথম, যার মাঝে মিশে গিয়ে কখন যে মাছে-ভাতের বাঙালী বনে গিয়েছিলা বুঝতেও পারিনি। আমি না বুঝলে কি হবে, আমাকে বুঝিয়ে দেয়ার মানুষের কিন্তূ অভাব হলনা। রাজনীতির পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত একটা দেশে সূস্থ হয়ে বেচে থাকতে চাই ঈশ্বরের বিশেষ আশীর্বাদ, সে আশীর্বাদ পাওয়ার যোগ্যতা আমার কোন কালেই ছিলনা, কারণ ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব নিয়েই আমি ছিলাম দ্বিধান্নিত। রোজার ঈদ সামনে, চারদিকে মহা আয়োজন। বরেন্দ্র গভীর নলকুপ বিদ্যুতায়ন প্রকল্প নিয়ে নওগা জেলার হাওর-বাওর চষে বেড়াচ্ছি। ৭/৮ জন সহকারী প্রকৌশলী সহ একটা টিম নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি গাধার মত। ঈদের সময়, সবার বেতন চাই, ভাতা চাই, বোনাস চাই, চারদিকে শুধু চাই আর খাই খাই ভাব। কাজের পারিশ্রমিক আদায়ের লক্ষ্যে রাজশাহী বিদ্যুৎ অফিসে বিল জমা দিতেই আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল অন্য এক জন্মভূমি। চাঁদপুরের অধীর সাহা নির্বাহী প্রকৌশলী, খুলনার আবু বকর সহকারী প্রকৌশলী, রহিম সাহেব প্রধান প্রকৌশলী, ইত্যাদি ইত্যাদি, সবাই আমাকে ডেকে পাঠাল আপন কুঠুরীতে, ব্যক্ত করল নিজ নিজ চাহিদা। শুভ্র দাড়িওয়ালা দুই হাতে ১১ আংগুলের আবু বকরকে সৃষ্টিকর্তা বোধহয় অতিরিক্ত একটা আংগুল দিয়েছিলেন পাপের টাকা গোনার জন্যে। সেই আঙ্গুল দিয়েই গুনলেন টাকাগুলো এবং তা ছিল শেষ তারাবির ওজু অবস্থায়। মসজিদে ওজুরত প্রকৌশলীর ঘুষ গ্রহন, এ দৃশ্যটা আমাকে সাড়া জীবন তাড়িয়ে বেড়াবে ঈশ্বরের নৈকট্য হতে।

1796695_10203414187734864_514804841_n

পত্নীতলা, বদলগাছি, মহাদেবপুর এবং ধামুইরহাটের ধানচাষীদের সাথে অন্যরকম একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এক বছরে, তাদের অনেকের আতিথেয়তা আবু বকরদের মত অসৎ মানুষদের কলুষতার নীচে চাপা পড়তে দেয়নি। আমার মুখ হতে শোনা বিদ্যুৎ আগমনী বার্তা তাদের কাছে ছিল রূপকথার কল্প-কাহিনীর মত। পৃথিবীর উত্তর দক্ষিন মেরুর অনেক প্রান্ত চষে বেড়িয়েছি, হরেক রকম মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, কিন্তূ নওগা জেলার সীমান্ত এলাকার ঐ মানুসগুলোর কথা আমার এই কাচা কলম দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। বরং তাদের কথা, এবং সে এলাকার মানুষ গুলোর বেচে থাকার লড়াইয়ের কথা জন্মভূমির ভাল কোন কিছুর প্রতীক হিসাবে তুলে রাখব হূদয়ের খুব গভীরে। ঈদ শেষে প্রমোশন পেয়ে প্রকল্প প্রকৌশলী হতে প্রকল্প পরিচালক হয়ে মুক্তি পাই অবৈধ লেনদেনের এই অস্বাস্থ্যকর চক্র হতে, কিন্তূ পাশাপাশি মিস করতে শুরু করি খুব কাছ হতে জন্মভূমিকে দেখার র্নিভেজাল সূযোগকে।

বেশীদিন টিকতে পারিনি ঢাকা শহরে, মোহম্মদপুরের ছোট অফিসটায় রাজনীতি নামের গুন্ডাদলের নিয়মিত পদধূলি জীবন অতিষ্ঠ করে তুলে। সকালে চাঁদা, বিকেলে চাদা, রাতে চাঁদা, বিএনপির চাদা, আওয়ামী চাদা, ওয়াজ মাহফিল, ব্যডমিন্টন টুর্নামেন্ট, একুশে ফেব্রুয়ারী, রাস্তায় নিহত পথচারী সৎকারের চাঁদা, চাঁদার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে গিয়ে একটা সময় এল যখন জীবন যুদ্বের এ পর্ব পূনঃমূল্যায়ন করতে বাধ্য হলাম। অনেক আগে বাংলাদেশ বিমানের একটা কমার্শিয়াল দেখতে খুব ভাল লাগত, ‘ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী‘। হঠাৎ করে আমার পৃথিবীও কেমন যেন ছোট মনে হল, শ্বাষ নিতেও কষ্ট হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে আমার অফিসে কোন এক সুন্দর সকালে হাজির হয় খোলা তরবারির মত ধারালো অনিত্য সুন্দরী এক টিভি মডেল, তার ফোন করা দরকার। এভাবেই শুরু, তারপর তাকে প্রায়ই দেখা যেত আমাদের অফিসে, না না ছুতায়, হরেক রকম বাহানায়।

দিনটা ভূলে যাওয়ার মত ছিলানা, অঝোর বর্ষনে কাঁদছিল ঢাকা শহর। শ্রাবনের বর্ষনে ভরা এমন একটা দিনের কথা ইউরোপে বাস করতে গিয়ে কত শতবার যে কল্পনা করেছি তার হিসাব নেই। গভীর তন্ময়ে মোহগ্রস্থ হয়ে গিলছিলাম বৃষ্টির বিরামহীন কান্না। দলবেধে তারা এল, বয়স ১৮ হতে ৩০/ হাতে হরেক রকম অস্ত্র; ছুরি, রামদা, নানচাকু, পিস্তল। বাসা হতে পালিয়েছে টিভি কন্যা, যাওয়ার সময় বান্ধবীদের বলে গেছে মোহম্মদপুর অফিসের ঐ প্রকৌশলীর সাথে জীবন গড়তে পা বাড়াচ্ছে অচেনা পথে।

চলবে…

Posted Sun, 04/19/2009 – 15:51 by WatchDog

উপাধি আর প্রশংসা – by Ayman Rahat

 

র বেলায় পাওয়ার সাথে চাওয়া সমান্তরালে বাড়ে। যতই পায় ততই চায়। যোগ্যতার বেশি কিছু পেলেও সাদরে স্বাগতম। মুখে যতই ‘আমি এর যোগ্য না বা মানুষের জন্য করি’ জাতীয় কথা বলুক না কেন উপাধি আর প্রশংসা না নেয়ার ভান করেও যত পায় তত নেয়। ঠিক অনেকটা হাসি দিয়ে ‘কি দরকার ছিল’ টাইপের। বিখ্যাত মানুষদের হঠকারিতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় এক্ষেত্রে।

আমরা জানি নোবেল দেওয়া হয় ছয় বিষয়ে। কিন্তু এটা একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার। আলফ্রেদ নোবেল ১৮৯৫ সালে তার উইলে যে নির্দেশনা দিয়ে যান তাতে অর্থনীতি উল্লেখ ছিল না। তাতে অন্য পাঁচটি বিষয় ছিল। এবং এই পাঁচটি বিষয়ে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা কারা বিজয়ী নির্বাচন করবেন তার নীতিমালা নোবেল নিজেই দিয়ে যান। ১৯০১ সাল থেকে শুরু হয় ঐ পাঁচ বিষয়ে নোবেল দেওয়া। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ৩০০ বছর পূর্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশনকে একটি বিরাট অঙ্কের অর্থ দান করে যা নতুন একটি বিষয়ে পুরষ্কার দেয়ায় ব্যবহৃত হবে। বিষয় ঠিক হল অর্থনীতি। কিন্তু জটিলতা দেখা দিল নোবেলের করা ১৮৯৫ সালের উইলে। নোবেল পুরষ্কার নামে ঐ পাঁচটি ব্যতীত অন্য নতুন কোন বিষয়ে পুরষ্কার দেয়া উইল পরিপন্থী। তারপর সিদ্ধান্ত হল নোবেল নামে নয় তবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কারের সমমানের পুরষ্কার হিসেবে এটি ভূষিত হবে। আর এর নাম দেয়া হয় The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel. পুরস্কারটি দেয়া হয় আলফ্রেদ নোবেলের স্মরণে। খেয়াল করে দেখবেন ইন মেমরি অব আলফ্রেদ নোবেল যার মানে এটা নোবেল পুরষ্কার নয়। অন্য পাঁচটির বেলায় সরাসরি নোবেল প্রাইয লেখা থাকে।

কিন্তু বিশ্ব মিডিয়া বা কর্তৃপক্ষ এটাকে মুখে মুখে সবসময় নোবেল পুরষ্কার বলে থাকেন। অবশ্য যখন অর্থনীতিতে পুরষ্কার দেয়া হয়ে থাকে তখন নোবেল প্রাইয উল্লেখ করা হয়না। অন্য পাঁচটিতে যেমন উল্লেখা করা হয়। দলিল কখনই এটাকে নোবেল পুরষ্কার বলে না। ১৯৬৯ সাল থেকে এযাবৎ কতো জনই না অর্থনীতিতে এই পুরষ্কার পেলেন কিন্তু এটা নোবেল পুরষ্কার নয় জেনেও নিজেদের টাইটেলে নিজেকে নোবেল লরিয়েট উল্লেখ করে থাকেন। আপনি অমর্ত্য সেন কিংবা পল স্যামুয়েলসনের বই হাতে নিলে দেখবেন নিজেদের নোবেল লরিয়েট দাবী করে এটা ওটা লেখা। এত বিখ্যাত মানুষ হয়েও কিন্তু তারা এই হঠকারিতা বেছে নিয়েছেন। সবই ঐ প্রথম বাক্যে সীমাবদ্ধ। উপাধি আর প্রশংসার বেলায় পাওয়ার সাথে চাওয়া সমান্তরালে বাড়ে।

 

জাফর ষাঁড় কিন্তু জানেন তিনি ড্রোন আবিষ্কারক নন। তিনি একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় তার কাছে Discovery, Invention আর Replica ‘র অর্থ খুবই পরিষ্কার।  তবুও ঐ প্রশংসার বেলায় যা পায় তাই নেয়। মিডিয়া আর কিছু চেতনাধারি তুষাররা তাকে ড্রোন আবিষ্কারক বলে সম্বোধন করায় তার বরং আরও ভাল লেগেছে। তাই এরকম একটা মিথ্যা উপাধি নিয়েও মনে মনে নৃত্য করেছেন। সব বিখ্যাত মানুষেরই এই বদ গুণটা আছে বলা যায়। জাফর ষাঁড়ের বেলায় সেটার ব্রেক ঘটুক সেটা আমিও প্রত্যাশা করিনা। কিন্তু সমস্যা হল তার মত একজন চেতনা সাপ্লাইয়ারের পক্ষে এরকম হঠকারিতা মানায় না। মানতে পারিনা। তার চেতনায়ই তো আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।