জনাব তারেক রহমান কে খোলা চিঠি! 

1

 

by
ফয়েজ তৈয়্যব
জনাব রহমান,
সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে বসে কিছু কিংবা অনেক কথা বলছেন। আজ মানুষ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের (!) মুখে শুধুমাত্র এমন কিছু শুনতে চায় যা তাঁদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। তা না করে পুরানো ইতিহাস নিয়ে এইসব কি বলছেন আপনি? কেন বলছেন? জিয়া কে পচাতে শেখ হাসিনার নেয়া অনুরূপ পথে হেঁটে মুজিব কে পচিয়ে আপনি কি পাবেন?
জীবন যেখানে দায়ের ভারে নূজ্য সেখানে অতীতের কাসুন্দি ঘাটা আজ বড়ই বেমানান, বড়ই হতাশার, বড়ই গ্লানির। বুঝে নিন, এই সব সত্য বা মিথ্যা সেটা নিয়ে জীবন যন্ত্রনায় পিষ্ট মানুষ ভাবিত নয়। এইসব কাদা ছোঁড়াছুড়ি দেখতে আর শুনতে নাগরিক ত্যাক্ত বিরক্ত, কারন তাঁর জীবন আজ সামাজিক সম্মান, দারিদ্র আর নিরাপত্তার কাছে বড়ই অরক্ষিত।
৪২ টি বছর পার হবার পর মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে শিখতে শুরু করেছে তাঁদের সাবেক ও বর্তমান সকল নেতাই তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তন না করে নিজের ভাগ্যই পরিবর্তন করেছে। নাগরিক তাঁর নেতাদের প্রতারক, চোর, লূন্ঠন কারী, উদ্ধত আর অসভ্য ভাবতে শুরু করেছে। এই বোধ আপনাদের মধ্যে যত দ্রুত আসে ততই সার্বিক মঙ্গল। ব্যক্তি আপনার, আপনার দলের এবং এই অভাগা দেশের। সুতরাং এইসব অর্থহীন আলোচনা (সত্য বা মিথ্যা) আজ প্রাসঙ্গিক।
বরং এইসব বাদ দিয়ে নাগরিক স্বার্থের কথা বলুন, নাগরিক আশা করে তা বুঝার বয়স আপনার হয়েছে। সেই সাথে নাগরিক এটাও কামনা করে নাগরিক স্বার্থ ভিত্তিক রাজনীতি করার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আপনার মধ্যে এখনই আসা উচিত।
দেশের তরুন প্রজন্ম আপনার প্যারালাল প্রশাসন, নিয়মতান্ত্রিকতার উপর অনিয়মের দায় দেখেছে। সেইসব কলঙ্ক থেকে কিভাবে বের হবেন তা নিয়ে নিজে ভাবুন, আপনার ফোলয়ার দের ভাবতে দিন, নাগরিকের কাছে সৎ কমিটমেন্ট দিন, সেই কমিটমেন্ট যে সৎ সেটার প্রমান রাখুন।
ক্ষমতায় আসলে ভঙ্গুর এই সমাজ ব্যবস্থায় কিভাবে নাগরিক এর নিরাপত্তা দিবেন, সামাজিক নিরাপত্তা দিবেন, আর্থিক নিরাপত্তা দিবেন তা নিয়ে ভাবেন, আমাদের কে সেটা জানান।
মানুষের জীবন মান উন্নয়নে আপনার প্ল্যান আছে কি? থাকলে সেসব কি? সেসবের চ্যালেঞ্জ কি? সেই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার উপায় কি সেই ভাবনা নাগরিককে জানান।
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি রোধ করে কিভাবে অভ্যন্তরীণ ইনভেস্টর দের উৎসাহিত করবেন সেসব নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। নিজেরা, দল কিভাবে এই ভন্ডামী আর অনাচার থেকে বের হয়ে নাগরিক কে আর্থিক নিরাপত্তা দিবে সেটা নিয়ে ভাবেন, সেইসব নাগরিক কে জানান।
হাজার হাজার তরুন চাঁদাবাজির ভয়ে, ঘুষ আর হয়রানির ভয়ে কোম্পানী খুলতে পারছেন না, আইডিয়াকে প্রোডাকশনে নিয়ে যেতে পারছেন না, সেসব নিয়ে ভাবেন না বোধ করি, দয়া করে ভাবুন। আপনারা যে ভাবছেন, অন্তত সেটা নাগরিককে জানান।
পরিবর্তিত জলবায়ু/আবহাওয়ার এই সময়ে কৃষি আর কৃষকের ফলনের নিরাপত্তার বিধান কিভাবে ঘটবে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা কিভাবে আসবে, কৃষি অবকাঠমোর বিকাশ কিভাবে হবে তা নিয়ে ভাবুন দল, দেশ আর দেশের গন্ডির বাইরে। নাগরিক এইসব জানতে চায় কান পেতে।
আগামীর বাংলাদেশে অবকাঠমো উন্নয়ন কিভাবে হবে তার সততা ভিত্তিক রোডম্যাপ বানান। সড়ক রেল নৌ বিমান ব্যবস্থা, পন্য পরিবহন ব্যবস্থা, নগর পরিবহন ব্যবস্থা, জ্বালানী উতপাদন এবং ব্যবস্থা কি ভাবে জনকল্যাণ এর প্রযুক্তি নির্ভর হয় সেইসব মহৎ কাজ নিয়ে রাইট এক্সপার্ট দের সাথে বসেন। সেইসব ভাবনা নাগরিককে জানান। একটা অসৎ এবং দায়সারা নির্বাচনী ইশতেহার এর গল্প ভুলে মানুষকে সত্যিকারের পরিকল্পনার সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দিন।
দুর্নীতির অভিযোগ মুক্ত হয়ে কিভাবে বিদেশী বিনিয়োগ আর সহজ শর্তে অবকাঠামো ফান্ডিং (ঋন) আনবেন সেটা নিয়ে এক্সপার্ট দের সাথে যুক্তি পরামর্শ করুন। রোডম্যাপ বানান। নাগরিককে কিভাবে বৈদেশিক ঋন এর বোঝা থেকে মুক্তি দিবেন সেতা নিয়ে ভাবেন। নাগরিককে তা জানান।
প্রতিবেশীর সাথে আর্থিক লাভের ভিত্তিতে কিভাবে কৌশলগত সম্পর্ক করবেন তা নিয়ে দেশী বিদেশী এক্সপার্ট দের সাথে কাজ করুন। নাগরিককে তা সৎ ভাবে জানান।
দুর্বিনীত দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রভাবে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠান গুলোতে ঘুষ, অনিয়ম আর দুর্নীতি কে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে কলঙ্কের দায়, তা একটা উল্লেখযোগ্য সময় দেশ শাসনকারী হিসেবে আপনার দলের রয়েছে সেটা মেনে নিন, সেখান থেকে বেরিয়ে কিভাবে মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে নিবেদিত একটি সরকার কাঠামো বানানো যায় সেসব নিয়ে ভাবেন, সেই ভাবনা ছড়িয়ে দিন দেশের আনাচে কানাচে এমন কায়দায় যাতে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে।
মানুষ বুঝতে শিখেছে, দেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ ই নিয়ম। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শিষ্টাচার এবং নিয়মতন্ত্রের চর্চা নেই। দলের কোন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। রাজনীতি মানেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বলপ্রয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ ক্ষমতার প্রয়োগ।
মানুষ বুঝতে শুরু করেছে সকল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী দফতরে কেন্দ্রীভূত। সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এর স্তর সমুহ্‌, আদালত এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভুমিকা নিতান্তই সাংবিধানিক, কার্যত আজ্ঞাবাহী। নাগরিক বুঝতে শুরু করেছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বৃত্তায়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছে। সেই রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চূরমার হয়ে গেসে তাঁর স্বপ্ন এবং সম্ভাবনা।
নাগরিক চায় আপনি আপনারা এইসব স্বীকার করুন, এইসবের দায় নিন। এইসব অসভ্যতা থেকে দেশকে বের করে আনার শপথ নিন, পরিকল্পনা করুন এবং তা নাগরিক কে জানান ওয়াদা করে।
নাগরিক অনেক কিছু জানতে চায়, শুনতে চায়। নাগরিক যা শুনতে চায়, তা ই শুধু বলেন, নাগরিক এর ব্যক্ত অব্যক্ত ভাব বুঝে নিন।অপ্রয়োজনীয় যা, তা বর্জন করুন। পিতার পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পরিচয় তৈরি করুন।
যদি না পারেন, দয়া করে যোগ্যকে পথ করে দিয়ে আপনি/আপনারা বাংলাদেশকে মুক্তি দিন।
নিবেদনে,
বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক।

 

 

খালেদা কি চাইলেই তারেক কিংবা জামাতকে ছাড়তে পারবেন?

2

শাফকাত রাব্বী অনীকঃ

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির দুর্গম পথের একজন যাত্রী। ওনার দুই হাতে দু’টা ওভার সাইজ ব্যাগেজ আছে। ব্যাগেজ গুলো অনেক ভারী। একটার নাম তারেক রহমান। আর একটার নাম জামাত-ই-ইসলাম।  এই ব্যাগেজ সঙ্গে করেই খালেদা জিয়া হেঁটে চলেছেন। ফিজিক্স  এর সুত্র অনুযায়ী, ভারী লাগেজ গুলো সরিয়ে দিলে, ওনার হাঁটতে আরাম হবার কথা। কিন্তু নিজের বিবেচনা অনুযায়ী এই ব্যাগেজ গুলো হাতে নিয়েই খালেদা হাঁটছেন।

অনেকেই খালেদাকে বিগত বছরগুলোতে বলেছেন এই ব্যাগেজ গুলোর কোন না কোনটা হাত থেকে সরানোর জন্যে।  পৃথিবীর যে কোন বস্তুর মতো, এই ব্যাগেজ গুলোরও উপকারিতা ও অপকারিতা উভয়ই নিশ্চয়ই আছে। সেই আলোচনায় না যেয়ে, ধরে নেয়া যাক যে এই ব্যাগেজ গুলো সরিয়ে দিতে খালেদা জিয়া রাজী হবেন। এখন দেখা যাক সরানোর প্রক্রিয়াটা কি হবে?

প্রথমেই আসা যাক তারেক রহমান প্রসঙ্গে। উনি গত অনেক বছর সপরিবারে লন্ডনে আছেন। উনি  বিএনপির নীতিনির্ধারণ করার মতো কোন কাজ করেন কি না সেটা বিএনপির ভিতরের মানুষ ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু বাইরের মিডিয়া, সাধারণ সমর্থক, ও সমালোচকরা অনেকে এখনও ভাবেন যে তারেক রহমান বিএনপিতে অনেক ক্ষমতাবান। এক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে যে  যতদিন খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন থাকবেন, তারেক রহমান সম্পর্কে এই পাবলিক পারসেপশোন সরানো যাবে না।  মা ও তার বড় ছেলের সম্পর্ক ঘোষণা দিয়ে অন্তত পাবলিকের মনে দুর্বল করা যায় না ।

আরও একধাপ বাড়িয়ে বলা যেতে পারে যে, ব্যাক্তি তারেকের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত, যতদিন তার মা চেয়ারপারসন থাকবেন, ততদিন কেউ না কেউ বলতেই থাকবেন তারেক রহমান পিছনে থেকে কল-কাঠি নাড়ছেন। তারেক রহমানের জন্যে একেবারে মরে যাওয়া ছাড়া এই পারসেপশোন থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক কঠিন।

বাংলাদেশের বড় দুটো দল থেকেই পরিবারতন্ত্র একেবারে শেষ হয়ে যাবার সম্ভাবনা এখনও অনেক কম। সেক্ষেত্রে, যদি খালেদার অবর্তমানে তার পুত্রবধু জোবাইদা রহমান হাল ধরেন (সোনিয়া গান্ধী স্টাইলে), তাহলেও দেখা যাবে যে তারেক রহমানকে নিয়ে একই কথাই হচ্ছে। তারেক তখন সমালোচিত হবেন আসিফ জারদারি (প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর স্বামী) হিসেবে।

অর্থাৎ, মা , বউ, কিংবা পরিবারের অন্য কোন  সদস্য যেই বিএনপির প্রধান হোক না কেন, তারেক রহমান জীবিত থেকে কোনদিন প্রমান করতে পারবেন না যে তিনি পিছনে থেকে কল কাঠি নাড়ছেন না।  এটা ওনার জীবনের একটা বাস্তবতা। তারেক রহমানকে সরাতে হলে, হয় তাকে মরে যেতে হবে, কিংবা তার পুরো পরিবারকে বিএনপি থেকে সরে যেতে হবে। এর মাঝামাঝি কিছু নেই। উনি বিএনপি থেকে সত্যিকার অর্থেই ৪ হাজার মাইল দূরে থাকলেও, মানুষ বলতেই থাকবে উনিই বিএনপি চালান।

এরবার আসা  যাক জামাত প্রসঙ্গে। ইদানীং শোনা যায় যে কে-বা-কাহারা খালেদা জিয়াকে জামাত ছাড়তে বলেছেন। এধরনের কথা এই মুহূর্তে উনাকে  কেউ  বলছেন কিনা জানি না। কিন্তু একটি প্রতাপশালী দেশ একসময় খালেদা জিয়াকে জামাত ছাড়তে বলেছিল বলে শুনেছি। কিন্তু সে অবস্থান থেকে প্রতাপশালী দেশটি আপাতত সরে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।

তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হোক যে খালেদা জামাত পরিত্যাগের কথা জানিয়ে আসলেই প্রকাশ্য একটা ঘোষণা দেবেন।  এখন দেখা যাক ঘোষণা দেবার পরে, কিভাবে জামাত ত্যাগ করার ব্যাপারটি বাস্তবায়ন করা হবে।

জামাত ভবিষ্যতে ইলেকশন করতে পারবে না। কেননা ওদের রেজিষ্ট্রেশন নেই। এছাড়া ভবিষ্যতে  জামাতের উপর আরও নানা ধরণের আইনি ঝামেলাও আসতে পারে। জামাতের সমর্থন ৫% থেকে ১০% বলে ধারণা করা হয়। একারণে ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৮০ লক্ষ থেকে দেড় কোটি  জামাত সমর্থক আছে বলে ধারণা করা যেতে পারে।

জামাতের রেজিষ্ট্রেশন যদি  না থাকে, ইলেকশন করার উপায় না থাকে, সরকারের অশেষ করুনায় যদি এতগুলো মানুষকে গণহত্যা করে মেরে না ফেলা হয়, কিংবা তাদের ভোটাধিকার কেড়ে না নেয়া হয়, তাহলে এই মানুষরা কাউকে না কাউকে ভোট দিবেন। এই মানুষগুলো কারও না কারও রাজনীতিক সভায় যোগ দিবেন। কারও না কারও ডাকা হরতালে পিকেটিং করবেন।

বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ যদি অটুট থাকে এবং জামাতের রেজিস্ট্রেশন যদি না থাকে, তাহলে জামাতের সমর্থকরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন কোন জোটকে সমর্থন দেবার সম্ভাবনা বেশি, যতদিন তারা নতুন কোন পার্টি না বানাচ্ছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে, যেটা খুব কম মানুষ করছেন। সরকার নিজে জামাতকে নিষিদ্ধ না করে, কেন খালেদা জিয়াকে জামাত ছাড়তে বলছেন? সরকার নিষিদ্ধ করে দিলে তো আর খালেদা জিয়ার জামাত ছাড়া না ছাড়ার ব্যাপার থাকে না !!

খালেদার দু’হাতের দুটো ব্যাগেজ নিয়ে কথা বলে শুরু করেছিলাম।  সেই ব্যাগেজ গুলো ছাড়া উচিত কি উচিত না সেটা আজকের আলাপ ছিল না। আজকের আলাপ হলো, তারেক কিংবা জামাতকে ছেড়ে দেবার মতো কোন ফুল-প্রুফ উপায় খালেদার আছে কিনা।

দুই ব্যাগেজ যদি কনক্রিট কোন উপায়ে সরিয়ে দেবার উপায় না থাকে, তাহলে এই প্রস্তাবের চটকদারী মুল্য থাকলেও, বাস্তবিক কোন মুল্য থাকার কথা না।  দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বলতে হচ্ছে যে, চটকদারী বিষয়েই মানুষের আগ্রহ সবচাইতে বেশি।