একজন অনালোকিত মানুষ

by Shafiqur Rahman for AlaloDulal

http://alalodulal.org/2013/09/03/the-unenlighteneds/

জাফর ইকবালকে নিয়ে তার আদর্শিক প্রতিপক্ষরা নিয়মিত অভিযোগ করে যে তিনি নিরপেক্ষ নন, তার মতামত ও কার্যক্রম অধিকাংশ সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষেই থাকে। আমি মনে করি না এতে আপত্তির কিছু আছে। জাফর ইকবাল একটি বিশেষ চিন্তা বা আদর্শের অনুসারী এবং “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” লেবেল লাগানো এই আদর্শটি কিছুটা হলেও বড়ো দলগুলোর মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগই ধারন করে বলে তার লেখা ও কাজ একদিকে পক্ষপাতী মনে হতেই পারে।

আসলে অনিরেপেক্ষতার সাথে enlightenment এর কোন সংঘাত নেই। পৃথিবী ও সমাজ সম্পর্কে অনেক কিছু জানার পরে একজন মানুষ কোন এক বা একাধিক ধরনের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হবে এটা স্বাভাবিক, কারন কারো কাছেই সকল চিন্তা-চেতনা-আদর্শ একই পর্যায়ের নয়। যে রাজনৈতিক দলটি পছন্দের বেশীর ভাগ আদর্শকে ধারন করবে, সেই দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে এটা স্বাভাবিক। আঠারো, উনিশ, বিশ এই শতকগুলিতে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়াতে যারা enlightenment চিন্তার দিশারী ছিলেন তারাও বেশীর ভাগ সময়ে কোনো না কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতী ছিলেন; প্রায়শই সেটা ছিলো যার যার দেশের রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত বেশী উদারনৈতিক দলটি। সত্যি কথা বলতে গেলে, খালেদা জিয়ার সেই বিখ্যাত কথাটি, “পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হতে পারে না”, একটি সত্য ও যুক্তিযুক্ত কথা। কেবল মাত্র যে কিছু জানে না, সেই নিরপেক্ষ হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো যে একজন নাগরিক যদি নিরপেক্ষ নাই হতে পারেন তবে মুক্ত-গনতান্ত্রিক সমাজ-রাষ্ট্র কেমন করে হবে? এর উত্তর হলো যে, মানুষ মতে যে পক্ষেই থাকুক তাকে তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজে নিরপেক্ষ হতে হবে। একজন জজ আসামীর প্রতি যত তীব্র বিদ্বেষই অনুভব করুন না কেন, কোর্ট পরিচালনা এবং সাজা প্রদান তাকে নির্ধারিত ন্যায্য পদ্ধতিতেই করতে হবে। একজন ইন্টারভিউয়ার একজন পদপ্রার্থীর চেহারা-সুরৎ যত পছন্দ হোক না কেন, অন্য প্রার্থী যদি ইন্টারভিউ-এর সকল মানদন্ডে ন্যায্যভাবে অনেক এগিয়ে থাকে, তবে যোগ্য প্রার্থীকেই নির্বাচন করতে হবে। একজনের মতামত, জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে আরেকজনের যত আপত্তিই থাকুক না কেন, প্রত্যেকের ভোট দেয়া, রাজনীতি করার অধিকার মেনে নিতে হবে (যতক্ষন না অপরাধী প্রমানিত হয়) এই ধরনের পদ্ধতিগত ন্যায্যতার উপরে ভিত্তি করেই আলোকিত সমাজ গড়া সম্ভব হয়। বিংশ শতাব্দীতে enlightenment এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ও প্রভাবশালী দার্শনিক বলা হয় জন রলস (John Rawls) কে। রলস তার বিখ্যাত Theory of Justice এ বলেছেন যে প্রকৃত ন্যায়বিচার সরাসরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, কিন্তু আমরা যদি অর্ন্তনিহিতভাবে ন্যায্যপদ্ধতিতে বিচারসিস্টেম ও আইন বাছাই করি তবে সেখান থেকে আমরা যে বিচার পাবো সেটাকে সমাজ ন্যায্য বলে মেনে নিবে।

কোন পদ্ধতি ন্যায্য কি না এটা কিভাবে নিশ্চিৎ করা যাবে? রলস এখানেই এনেছেন Veil of Ignorance বা চোখে অজ্ঞতার পট্টি বাধার চিরায়ত ধারনাটি। আমি যখন জানি না যে আমার বাছাই করা আইন বা পদ্ধতি আমার উপরে প্রয়োগ হবে, নাকি আমার প্রিয়তম জনের উপরে, নাকি আমার সবচেয়ে ঘৃনিত শত্রুর উপরে; সেই অজ্ঞতা থেকেই আমি যে আইন বাছাই করবো সেটিই হবে ন্যায্য। রলস তার ন্যায়বিচারের দর্শন গঠনে সাহায্য নিয়েছেন enlightenment এর সবচেয়ে বড়ো চিন্তাবিদ, ১৮ শতকের জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট এর সার্বজনীনতার (Universalizability) মানদন্ড থেকে। কোন বিচার পদ্ধতি যখন পৃথিবীর সবার জন্যে, একই রকম পরিস্থিতিতে একই রকম ফলাফল দেয় তখনই তাকে ন্যায়বিচারের সার্বজনীন মানদন্ডে উত্তীর্ন বলা যায়। কান্ট আবার তার সার্বজনীনতার দর্শন নির্মান করেছেন সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসা ন্যায়নীতির গোল্ডেন রুল থেকে, যে রুল বলে যে আমি অন্যের প্রতি সেই আচরনই করবো যে আচরন আমি অন্যের কাছ থেকে আশা করি। এই গোল্ডেন রুলই পৃথিবীর প্রতিটি বৃহৎ সমাজ বা ধর্মের নৈতিক সিস্টেমের মূল ভিত্তি।

নিরপেক্ষতা, ন্যায্যতা, সার্বজনীনতা, গোল্ডেন রুল, এইসব নিয়ে এখানে কথা বাড়ানোর উদ্দ্যেশ্য কি? এইসব প্রসংগ আনার একটাই উদ্দ্যেশ্য সেটা হলো মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর যাই হোন একজন আলোকিত মানুষ নন সেটি তুলে ধরা। জাফর ইকবাল কখনো নিজেকে আলোকিত মানুষ দাবী করেন নি। তবে তিনি বিভিন্ন সভা-প্রতিযোগীতায় দেশের কিশোর-তরুন-যুবকদের অজস্রবার উপদেশ দিয়েছেন কিভাবে আলোকিত মানুষ হওয়া যায় সে বিষয়ে। এতে মনে হতেই পারে যে তিনি আলোকিত মানুষ বলতে কি বুঝায় এটা ভালোভাবেই জানেন এবং আলোকিত মানুষ হওয়া একটি শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য হিসেবে মনে করেন।

সচেতন কেউ কেউ হয়তো অনেক আগে থেকেই খেয়াল করেছেন enlightenment values এর সাথে জাফর ইকবালের চিন্তাধারার অসামন্জস্যতা তবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে সেটি পরিষ্কার হতে শুরু হয়েছে ঘটনাবহুল এই বছরেই। এবছরেই একের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি স্পষ্ট করেছেন সার্বজনীনতার প্রতি তার অনীহা। জাফর ইকবাল এবছর প্রথম বড়ো বিতর্কের মধ্যে জড়ান জুন মাসের শেষে। তার “সাধাসিধে কথা” ব্লগে তিনি একটি ক্ষুদ্ধ নোট লেখেন হেফাজত, আমার দেশের মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার ও আটক এবং এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৫ জন সম্পাদকের যৌথ বিবৃতি, এসব নিয়ে। নোটটিতে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন পনেরোজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে, কেনো তারা মাহমুদুর রহমানের মতো একজন রাজাকার-তোষকের পক্ষে দাড়িয়েছে? তার নিজের ভাষায়,

“আমার দেশের সম্পাদক মহোদয়কে অত্যন্ত সঙ্গত কারনে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং এই দেশের পনেরটি গুরুত্বপূর্ন পত্রিকার ততোধিক গুরুত্বপূর্ন সম্পাদক প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে তার পাশে এসে দাড়িয়েছিলেন। ———-“আমার দেশ” এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের তীব্র সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ প্রচারনার কারনে এই দেশে অনেক প্রাণ ঝড়ে গেছে, তিনি নিজের হাতে কোনো খুন হয়তো করেননি কিন্তু তার কারনে মানুষের প্রাণ বিপন্ন হয়েছে”।

জাফর ইকবালের এই নোটটি যে কোন enlightenment অনুসারীর মনে অনেকগুলি এলার্ম বেল বাজাতে বাধ্য। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও বিনা বিচারে দীর্ঘদিনের রিমান্ড, বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি বন্ধ, এগুলো যে কারনে করা হয়েছে সেটা যে ‘অত্যন্ত সঙ্গত কারন’, এটি কে নির্ধারন করেছে? মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সরকার বাহাদুর, গনজাগরন মঞ্চ নাকি তরুন প্রজন্ম? কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা, কার কথা প্রকাশের জন্যে প্রাণক্ষয় হচ্ছে, এটি নির্ধারনের মহান দায়িত্ব কি দেশের জনগন জাফর ইকবালের উপরে ন্যস্ত করেছে? তিনিই একাধারে judge, jury, executioner? দেশের বিচার বিভাগের দায়িত্ব কি কেবল পুলিশের রিমান্ডকে বৈধতা দেয়া?

মাহমুদুর রহমান তার প্রকাশিত সংবাদপত্রে কি মিথ্যা বলেছেন আর কি সত্য বলেছেন সেটার আলোচনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল কথা সংবাদপত্রে সত্য-মিথ্যা, অপপ্রচার নির্ধারনে যে কোন গনতান্ত্রিক দেশে একটি আইনগত পদ্ধতি রয়েছে যেখানে বিচার বিভাগ দুই পক্ষের বক্তব্য গ্রহন করে সিদ্ধান্ত দেয়। রাজার স্বেচ্ছাচার (Arbitrary rule) থেকে দেশের জনগনকে রক্ষা করা ছিলো enlightenment এর জন্মের অন্যতম কারন। আইনের ন্যায্য ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি (Due Process of Law) হলো enlightened সমাজের প্রধানতম স্তম্ভের একটি। Due Process of Law বলে যে সকল আইনগত প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও উন্মুক্ত হবে এবং সকল অভিযুক্তকেই আত্মপক্ষ সমর্থেনর সুযোগ দেয়া হবে তার স্বাধীনতা হরনকারী যেকোন শাস্তি দেয়ার আগে। বিরুদ্ধমত দমনে সরকারের ক্ষমতার যথেচ্ছাচারী ব্যবহারের প্রতিবাদ করলেই সরকার সমর্থক কেউ কেউ আপত্তি করেন যে তাহলে কি সরকার অন্যায় দেখেও চুপ থাকবে? অন্যায় করা কি একটি অধিকার? এই আপত্তিকারীরা এইটুকু বুঝতে চান না যে আগে অন্যায় হয়েছে এটা নিশ্চিৎ করতে হবে এবং অন্যায় নির্ধারনের দ্বায়িত্ব সরকারের নয়, বিচার বিভাগের, Due Process এর মাধ্যমে।

জাফর ইকবাল এটা অনুধাবন করতে অক্ষম হয়েছেন যে পনের জন সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের প্রতি কোন বিশেষ অনুরাগের কারনে নয়, Due Process of Law এর কারনেই সরকারের Arbitrary গ্রেফতার, রিমান্ড, পত্রিকা বন্ধের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে। জাফর ইকবাল এটাও জানেন না যে এই Due Process of Law কেবল মাহমুদুর রহমান নয়, পনের জন সম্পাদক, জাফর ইকবাল নিজে সহ যারাই পত্রিকার জগৎ এর সাথে যুক্ত, তাদেরকে সরকারের স্বেচ্ছাচার থেকে রক্ষা করার একমাত্র প্রতিরোধের বাঁধ। আর কোন বাঁধ কতটা শক্ত এটা পরীক্ষা হয় মাহমুদুর রহমানের মতো যারা সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে দাড়ান তাদের পরিনতির উপরেই। আর পত্রিকার সম্পাদকেরা যে আরেকজন সম্পাদকের উপরে সরকারের আচরনের উপরে বিশেষ নজর রাখবেন এই সাধারন উপলদ্ধিটিও তিনি করেন নি। বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রসংগ নিজের লেখায় অসংখ্যবার আনা সত্বেও তিনি বোঝেন না যে স্বগোত্রীয়কে অন্যায় থেকে রক্ষা করার চেষ্টা একটি স্বাভাবিক প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।

জাফর ইকবালের সকল বিতর্কিত কথার মূলেই রয়েছে তার এই মনোভাব, ” স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের এরকম একজন মানুষের জন্যে এই দেশের পনেরোজন সম্পাদক বিবৃতি দিতে পারেন সেই আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না’ জাফর ইকবাল আইন ও শাসনের সার্বজনীনতায় বিশ্বাস করেন না। তিনি মনে করেন না যে রাজাকার এবং রাজাকরের সমর্থকেরা Due Process এর অধিকার রয়েছে। তার চোখে এরা accused হবার সাথে সাথেই convicted। জাফর ইকবাল এটি ভাবেন না যে, এক সরকার যেমন মনে করতে পারে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা কথা বলে মানুষকে খেপিয়ে তোলা সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তেমনি আরেক সরকার মনে করতে পারে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ধর্মানুভুতি, জাতীয়তাবাদী অনুভুতিতে সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে আঘাত করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জাফর ইকবাল এটি ভাবেন না যে মাহমুদুর রহমানকে Due Process বন্চিত করাকে সমর্থন করে তিনি ভবিষৎ এ তার সহক্রুসেডার মিডিয়া ব্যাক্তিত্বদেরকেই সরকারী স্বৈরাচারের সামনে নিরস্ত্র করে ফেলছেন। মাহমুদুর রহমান এর প্রতি সরকারের আচরন ঠিক সেই কারনেই অসমর্থনীয় যে কারনে শাহরিয়ার কবিরের প্রতি বিএনপি সরকারের আচরন অসমর্থনযোগ্য।

সংবাদ মাধ্যমের উপরে মিথ্যাচারের অপবাদ দেয়া কি এতই কঠিন? কোথায় কোন মিডিয়া আছে যারা দাবী করতে পারে যে তাদের প্রকাশিত যে তাদের প্রকাশিত প্রতিটি তথ্য, প্রতিটি লাইন ১০০% সত্য? জাফর ইকবাল কি কয়েক বছর জেল শাস্তির বাজী রেখে বলতে পারবেন যে এ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে তার লেখা প্রতিটি লাইন খাদবিহীনভাবে সত্য? সংবাদ মাধ্যমের মিথ্যে বলার অধিকার নেই এটা অবশ্যই ঠিক কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের অনিচ্ছাকৃত ভুল করার অধিকার রয়েছে। কোনটি অনিচ্ছাকৃত ভুল আর কোনটি উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত ও বিদ্বেষপরায়ন মিথ্যা এটি নির্ধারনের জন্যে Due Process আছে, যা হতে হবে সার্বজনীন। রাজাকার-বান্ধব আর চেতনার সৈনিকদের জন্যে আলাদা আলাদা নয়।

জাফর ইকবাল সার্বজনীনতায় বিশ্বাস করেন না।তার নিজের ক্রুসেডে, ‘with us or against us’ ই তার কাছে ন্যায়বিচারের নির্নায়ক। তার নিজের পক্ষে থাকলে সরকারের স্বৈরাচারে তার কোনো আপত্তি নেই। অধিকার নামের এনজিও এবং তার পরিচালক আদিলুর রহমানের উপরে সরকারের আচরনের প্রতি জাফর ইকবালের সোৎসাহী সমর্থনে এটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কোর্টে মামলা করার আগেই পরিচালককে গ্রেফতার এবং প্রতিষ্ঠানের সকল কম্পিউটার জব্দ করাকে সমর্থন করে যে তিনি সামনের দিনে জনকন্ঠের মতো পত্রিকা আর একাত্তুর টিভির মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে সহজেই বিপন্ন করার পথ খুলে দিচ্ছেন, এটা কি তিনি বুঝছেন কি না জানি না। ভবিষৎএ এনজিওদের মাধ্যমে সরকারের উপরে নজরদারীর উপরে এই ধরনের গ্রেফতার কি প্রভাব ফেলবে এটাও তার বিবেচ্য নয়। ক্রুসেডাররা যেমন সামনে জেরুজালেম দখল করার লক্ষ্যেই মগ্ন ছিলো, ক্রুসেডের যাত্রাপথে চারিদিকে গনহত্যা আর লুটপাট করে যে তারা ক্রুসেডের ভবিষৎকেই বিপন্ন করে ফেলছে সেটি যেমন তাদের খেয়াল ছিলো না, তেমনি জাফর ইকবালও তার নিজের ক্রুসেডে মগ্ন, consequences be damned।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা যেমন মনে করে যে ধর্মরাজ্য কায়েমের রাস্তায় দুতিনটি মিথ্যা, দুয়েকটি অন্যায় করায় পাপ হয় না তেমনি জাফর ইকবালও মনে করেন যে তার ক্রুসেড সফল হওয়ার জন্যে কিছু অন্যায় মেনে নিতে হবে।তার কাছে Due Process না মেনে আদিলুর রহমানকে গ্রেফতার ও অন্তরীন রাখা একটি ক্ষুদ্র অন্যায় যা হেফাজতের সমাবেশে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচারের মতো বৃহৎ অন্যায়কে ঠেকাতে অবশ্যাম্ভী প্রতিক্রিয়া। একজন খাঁটি মৌলবাদীর মতোই তিনি মনে করছেন অধিকার ও আদিলুর রহমানকে due process থেকে বন্চিত করার বিরুদ্ধে চারিদিক থেকে যারা প্রতিবাদ করেছে তারা সবাই মিথ্যার সমর্থক ও তার আদর্শের শত্রু।

আগেই বলেছি যে বুদ্ধিজীবিদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব কোন সমস্যার কিছু নয়। পৃথিবীজুড়ে যারা enlightenment এর অনুসারী, তারা কোনো না কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রকাশ্যেই সমর্থন দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি অধিকতর liberal পার্টির প্রতি। কিন্তু এই সমর্থন কোন পার্টির পরিচয় কিংবা ইতিহাসকে ঘিরে নয়। এই সমর্থন তারা করেন কিছু Deep Principles থেকে। এই Deep Principles গুলি উদ্ভুত হয় মুক্তিযুদ্ধ, declaration of independence, constitution, bill of rights, কিংবা glorious revolution এর মতো কোন ইতিহাসের নির্দিষ্ট ঘটনা বা জাতীয় ট্র‍্যাডিশন থেকে নয়। এই Deep Principles গুলি উদ্ভুত কয়েকশ বছরের enlightenment থেকে। Enlightenment থেকে উদ্ভুত Deep Principles গুলির মধ্যে প্রধানতম মানুষের স্বাধীনতা (Liberty), অধিকার (Democracy) এবং যুক্তি (Reason)।

সারা পৃথিবীতেই Enlightenment এর অনুসারীদের বিশ্বস্ততা এই Deep Principles গুলির প্রতিই, কোন দল বা দলিল এর প্রতি নয়। নিজের সমর্থিত রাজনৈতিক দল যখন এই Principles গুলির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন Enlightenment এর অনুসারীরা সরাসরি নিজ দলের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেন। অন্যদিকে আজকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অবস্থান এই Deep Principles গুলির বিরুদ্ধে। তিনি জনতার নিজ বিবেচনায় তথ্য গ্রহন ও প্রচারের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। তিনি ঘোষনা করেন যে যারা গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা করে তারা দেশোদ্রোহী। তিনি যেসব পত্রিকা গনজাগরন মন্চ নিয়ে দেশের জনমতের জরীপ করে তাদেরকে সরাসরি দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দেন। জনমতের প্রতি তার কোন আস্থা নেই। নিজের মতের প্রতি আস্থা ১০০%।

আজকে, এই মুহুর্তে, দেশের যে কোন স্বাভাবিক বিবেচনার নাগরিক স্বীকার করবে যে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। একটি সুষ্ঠ নির্বাচনেই পরিষ্কার হবে বিচার, মঞ্চ, দূর্নীতি, উন্নতি, হরতাল, হেফাজত এই সবকিছু নিয়ে জনগনের রায় কি। আজকে এটাও সবার কাছে পরিষ্কার যে যারাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিরোধীতা করছে তাদের একমাত্র উদ্দ্যেশ্য আওয়ামী লীগের পরাজয় ঠেকানো। বাংলাদেশে একজন পাগলও বিশ্বাস করে না যে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার জনমতের সুষ্ঠু প্রতিফলন চায়।

জাফর ইকবাল তার কথায় ও কাজে এটা পরিষ্কার করেছেন যে তিনি চান যে কোনভাবেই যেনো ‘বিএনপি-জামাত-হেফাজত’ ক্ষমতায় না আসে, জনগন চাইলেও না। তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র অনুসারী কিন্তু গনতন্ত্রের নয়। এই contradiction টি তার সাধাসিধে মনে দাগ কাটে না।

বিংশ শতাব্দীতে enlightenment এর আরেক দিকপাল কার্ল পপার তার বিখ্যাত “The Open Society and Its Enemies” বইটিতে, যেসব বুদ্ধিজীবি মনে করে যে তারা জনগনের চাইতে কোন উচ্চতর চেতনার অধিকারী এবং যারা জনগনের নিজস্ব বিবেচনাকে আস্থায় না এনে নিজেদের উচ্চতর চেতনাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে জনগনের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়, সেইসব বুদ্ধিজীবিকে সরাসরি মুক্তসমাজের শত্রু বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তাদেরকে চিহ্নিত করেছেন এইভাবে যে ” Those who wish to make the State an object of worship believe that officers of the state should be concerned with the morality of the citizens, and that they should use their power not so much for the protection of the citizens’ freedom as for the control of their moral life.” ।

সবার শেষে অবশ্য বলতে হয় যে আমার এই পুরো লেখাটির আসলেই কোন প্রয়োজন ছিলো না। জাফর ইকবাল কখনোই নিজেকে আলোকিত মানুষ দাবী করেন নি। বরং তিনি স্পষ্ট করেছেন যে enlightenment এর বিরুদ্ধেই তার অবস্থান। তার নিজেই বলেছেন যে “ঠিক কি কারন জানিনা জ্ঞানী গুনী বিচক্ষন যুক্তিবাদী নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবি থেকে কমবয়সী আবেগপ্রবন যুক্তিহীন কিন্তু তীব্রভাবে দেশপ্রেমিক তরুনদের আমি বেশী বিশ্বাস করি, তাদের উপর আমি অনেক বেশী ভরসা করি”।

জাফর ইকবাল যুক্তিতে বিশ্বাস করেন না তিনি আস্থা রাখেন যুক্তিহীন আবেগ এর উপরে। Age of Enlightenment এর আরেক নাম হলো Age of Reason। যুক্তির ব্যবহারই আলাদা করেছে Enlightenment কে আগের সকল সময় ও সমাজ থেকে। একজন আবেগজীবি হিসেবে জাফর ইকবাল enlightenment এ আস্থাহীন হতেই পারেন। একারনেই তার উচিৎ হবে কিশোর-তরুনদের আর ‘আলোকিত মানুষ’ হবার উপদেশ না দিয়ে বেড়ানো। আলোকিত মানুষদের চিন্তাভাবনা তার ভালো না লাগতেও পারে।

Reference of Zafar Iqbal writings and speeches

http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=a400eeec73d0973422ffc8e51d338a5b&nttl=05072013208578

 

http://opinion.bdnews24.com/bangla/2013/08/15/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%A7%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0/

 

https://www.facebook.com/notes/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%A5%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%B0-%E0%A6%87%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B2/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%B0-%E0%A6%87%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B2/555631911170349

 

One thought on “একজন অনালোকিত মানুষ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s