শান্তি‬ ‪ও একচক্ষু‬ ‪‎হরিন‬

by Imtiaz Mirza

১৯৭১ এর সেপ্টেম্বর মাস । একটি তরুনের বাবাকে পাকিবাহিনী হত্যা করেছে , মুক্তিকামী জনতাকে সরকারী অস্ত্রশস্ত্র বিলিয়ে দেয়ার জন্য ।
তরুনটি চিন্তা করে যুদ্ধে যাবে , পাকিবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিবে , দেশকে মুক্ত করবে অচলাবস্থা থেকে । কল্পনায় সে রাইফেল চালায় , পাকিদের মেরে খতম করে , রাজাকারদের ফুটো করে দেয় ।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সে গুলির শব্দ শুনতে পায়, সচকিত হয়ে সে খেয়াল করে গুলির শব্দ কাছাকাছি কোথাও থেকেই আসছে ।
পাশের ঝোপের মধ্যে সে পালিয়ে যায় , কিছুক্ষন পর টের পায় , উষ্ণ জলধারা তার প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়েছে ।
ভিজে ভিজে গরম অনুভূতি নিয়ে সে অস্ফুটে বলে , যুদ্ধ নয় শান্তি চাই , একটুখানি শান্তি চাই , শান্তি মতো জলত্যাগের অধিকার চাই।
_____
১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাস , ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধ শুরু করেছে , প্যান্ট ভেজানো তরুন যুদ্ধে যায়নি বরং রাজাকার পীরের মুরীদ হয়ে , টুপি লাগিয়ে প্রানে বেচেছে ।
ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধটিকেই তরুনটি আসল যুদ্ধ মনে করে , সে মনে মনে ঠিক করে সে আসল যুদ্ধে যাবে , গেরিলা যুদ্ধের মতো ছিচকে যুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের মতো গ্ল্যামারহীন যোদ্ধা হয়ে তার পোষাবে না । এর মাঝে সে সবাইকে বলে বেরিয়েছে , যুদ্ধ নয় শান্তি চাই , শ্রমিকরা ঘরে ফিরবে তাদের আপন জনের কাছে , তারা যুদ্ধ জানে না , তারা শান্তি চায় ।
মুক্তিযোদ্ধাদের শান্তির কথা বলবা মাত্র তাকে মেরে হাকিয়ে দিয়েছে তাকে , এই উত্তুঙ্গ সময়ে কেউ শান্তির কথা শুনতে চায় না ।

সে মনে মনে শান্তির জন্য যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে শুরু করলে , “মাত্র তের দিনের যুদ্ধে ” পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করে ।

______

প্যান্ট ভেজানো তরুন , ধীরে ধীরে একচক্ষু হরিনে পরিনত হয়েছে । সে সবাইকে গণতন্ত্রহীনতার কথা শিখাতে চেষ্টা করে । সে খুব সুন্দর করে বোঝাবার চেষ্টা করে , যে জগতে মাত্র পাচটা মানুষের পিএইচডি আছে , আর বাকী সবার ক্লাস ফাইভ ফেল করার অভিজ্ঞতা আছে , যেহেতু
ক্লাস ফাইভেই ফেল করেছে , তাই কারো পিএইচডি করতে চাওয়া উচিত না ।

অর্থ্যাৎ বিশ্বের পাচটা দেশে মৌলিক গণতন্ত্র আছে বিধায় , অন্যান্য দেশ গুলোতে নূন্যতম নির্বাচনও থাকা উচিত না ।

কারন আমরা কখনো পিএইচডি করতে পারবো না , কেন আমরা ক্লাস ফাইভের পরীক্ষা আবার দিবো ? আমরা দেশকে উন্নত করতে পারবো না কখনোই এইকারনে আমাদের দেশে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নেই ।

সে সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করে গণতন্ত্র নয় , শান্তিই সবার প্রয়োজন ।
_______

১৯৭১ এ শান্তির দরকার ছিলো , ৬৯ এও ছিলো , ৫২ তে ছিলো , ৯০ তে ছিলো ,
শান্তি দরকার উন্নত জাতি হতে হলে । শান্তির প্রয়োজনীয়তাটা কখনো কম ছিলো না ।

কিন্তু প্যান্ট ভেজানো একচক্ষু হরিনের বক্তব্য মেনে নিলে , লাখ লাখ মানুষ মারার পরো ১৯৭১ এ শান্তির দায়ে , পাকিবাহিনীর ঘেটুপুত্র হয়ে বসে থাকা উচিত ছিলো । আইয়ুব খানের সীমিত গণতন্ত্র অর্থ্যাৎ এলিটদের গণতন্ত্র মেনে চুপ করে বসে থাকা দরকার ছিলো । রাষ্ট্রভাষা উর্দুর মেনে শান্তি মতো বাংলা চর্চার দরকার ছিলো । লম্পট স্বৈরাচারকে দেশ ভর্তি দুর্নীতি করতে দিয়ে
শান্তিকামী জনতার রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা দরকার ছিলো ।

প্রকৃতপক্ষে , যারা প্যান্টভেজানো একচক্ষু , যারা একটা দলকে নিজের ধর্মবিশ্বাসের চেয়ে পবিত্র মনে করে , দলের নেতাকে ধর্মাবতার জ্ঞান করে , তারা কখনো শান্তি আর অশান্তির পার্থক্য বুঝতে চায়নি । তাদের কাছে নিজের দল যেকোন মূল্যে ক্ষমতায় মানেই শান্তি।

প্রকৃতপক্ষে , হরতাল , অবরোধ , জ্বালাও-পোড়াও , গুলি , ক্রসফায়ার , বালুর ট্রাক , বিরোধী দলের মানুষ হত্যার পূর্বেও দেশে শান্তি ছিলো না , থাকতে পারে না । অশান্তি, ঘুনপোকার মতো দেশকে কাটছিলো , মানুষের হৃদয়মগজ খুড়ছিলো। অশান্তি মানুষের স্বাভাবিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো , মানুষের নায্য পাওনা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করছিলো । অশান্তি , অবৈধ সরকার হয়ে
মানুষের টাকা লুটপাট করে উলটো মানুষকে চোখ রাঙ্গানি দিচ্ছিলো । অশান্তি , নূন্যতম নাগরিক অধিকার , মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলো । অশান্তি, বন্দুকে গুলি হয়ে শত শত বিরোধীদলের কর্মীকে হত্যা করেছিলো।
অশান্তি , মানুষকে তার অবেগে দিয়ে ব্লাকমেইল করিয়ে তার যাবতীয় অপকর্মকে শুদ্ধ করে নিচ্ছিলো ।

_______

শান্তি প্রয়োজন , শ্রমিকের , কৃষকের , নাগরিকের , পথশিশুর, অফিস যাত্রীর, গৃহিনীর ।
শান্তি আসবে দূর্নীতির ঘুণপোকা অশান্তি বিদায় নিলে, শান্তি আসবে অবৈধ স্বৈরাচারীর বুলেট স্তব্ধ হলে।

শান্তি আসবে তখনই যখন একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে , যেখানে সবার সমান সুযোগ থাকবে, কেউ নিজের পছন্দ মতো গদি আকড়ে থাকবে না ।

শান্তি আসবে শুধু মাত্র তখনই, যখন প্রতিটা নাগরিক ব্যালট বাক্স দিয়ে তাদের উপর অন্যায়-অত্যাচারের জবাব দিতে পারবে ।

https://www.facebook.com/sunno.aronnok

How to lose the history wars

by Jyoti Rahman

I said in the previous post:

They didn’t think much of him last winter. And since then, sporadic forays in our pathetic history wars have done nothing to improve his standing. They create media buzz, senior Awami League leaders end up looking quite stupid, and BNP rank-and-file feel fired up for a while. But what do they do to alleviate Mr Rahman’s extremely negative image?

Obviously, I don’t approve of the way Tarique Rahman is engaging in the ‘history wars’.  It occurs to me that I should elaborate and clarify.  Hence this post.  I don’t agree with Mr Rahman’s interpretation of history.  More importantly, from a partisan political perspective, I think they cause more harm than good for BNP.  And most frustratingly, a few solid points that BNP could make very usefully are utterly wasted.

Let’s start with the claim made about Sheikh Mujibur Rahman — that he was a Pakistani collaborator who compromised with the Yahya regime because he was after personal power.  I paraphrase, but this is the gist.  And this is about as sensible as the claim that Ziaur Rahman was a Pakistani spy.

Let me refer to GW Chowdhury, Abul Mansur Ahmed, and Moudud Ahmed.  Hardly disciples of the cult of Mujib, any of these men.  And yet, all three write how Mujib might have compromised on the Six Points at any time between the winter of 1968-69 and the summer of 1971, and become Pakistan’s prime minister.  Ayub and Yahya offered him the job in February 1969.  There was a general expectation that the Six Points were Mujib’s ambit claim, and he would compromise after the election.  ZA Bhutto calculated that.  Yahya Khan calculated that.

But Mujib did not.

In fact, by officiating a public ceremony where he led the Awami League legislators-elect to swear an oath on the Quran to never compromise on the Six Points, Mujib left himself little wiggle room to compromise even if he had wanted to.  What Mujib stood for in 1970 elections was abundantly clear, and he did not compromise from that.

Mujib wanted to compromise for personal gain — is Tarique Rahman trying to become the jatiyatabadi Omi Rahman Pial?

Of course, it gets worse.  What does one make of the claim that Mujib traveled on a Pakistani passport in January 1972?  I am sure Shafiq Rehman can conjure a brilliant political satire about the Heathrow immigration officer asking ‘Right, Sheikh eh, since when Pakis had Sheikhs’.  But the joke here is at the expense of anyone who believes Mujib would have needed a passport to pass through Heathrow that January.

And in this comedy, BNP loses a chance to score a sound political point.  No, Mujib wasn’t a Pakistani collaborator.  That’s nonsense.  What’s not nonsense, what’s undeniable, is that he did not prepare for an armed resistance, that he was absent from the war.  Now, it is possible to argue that Mujib did not want to lead a war of national liberation, and he had good reasons for taking the course he did — I have made that argument myself, and I stand by it.

But that’s just my interpretation of events.  And even if I am right, it’s legitimate to say that Mujib got it wrong big time.  Politically, the potent argument here is — the nation trusted Mujib with its future, and Mujib failed the nation in the dark night of 25 March 1971, not because Mujib was a bad guy, not because he was a collaborator, not because he was greedy or coward or anything, but far worse, he made the wrong judgment.

Salahuddin Quader Chowdhury once (in)famously made that point.  Repeatedly made, that would be a killer punch against the haloed Mujib myth.  What Tarique Rahman offers is not worth more than infantile facebook banter.

So, why does he do it?

Perhaps this passage from 2012 would provide some method behind this madness:

A blogger friend sounds a pessimistic note: ‘Our countrymen are maybe more blatant about it than most, but there is no “true” history anywhere in the world. It’s all air-brushed, covered with pancake makeup, and then dipped into rosewater.’ He suggests that these history wars are just a form of dialectic struggle, perhaps a healthy one at that.

That discussion was had at a time when Awami League cabinet ministers all the way to people like Muntassir Mamoon would routinely call Ziaur Rahman a Pakistani spy or sleeper agent.  Here is the full quote:

What will happen when BNP returns to power? Maybe what MM is doing is in anticipation of BNP returning to power. I mean, let’s face it, our countrymen are maybe more blatant about it than most, butthere is notruehistory anywhere in the world. It’s all airbrushed, covered with pancake makeup, andthen dipped into rosewater. Think of these “history wars” as a dialectic struggle, and whatever emerges out of this is what Bangladeshi children, fifty years on, will learn. And they won’t be any worse off for it.

Additionally, remember, when BNP comes to power, where MM leaves off is where BNP has to start. So the more AL-oriented the history is, the more effort BNP will have to put in to revert just back to the mid-point state, let alone make it pro-BNP.

So, calling Mujib a collaborator is perhaps the dialectic tat for the tit of Zia being a Pakistani spy.

Maybe.  And maybe in the long run this will all be washed out.  But right now, this isn’t doing Tarique Rahman any good.  Maybe if BNP ever came to power, it could start its version of history.  But right now, Tarique should remember what happened to Hasina Wajed in February 1991.

In the lead up to the parliamentary election of that month — the first one held after the fall of the Ershad regime — Mrs Wajed repeatedly launched personal attack on Zia, calling him a murderer and drunkard, including in her nationally televised (this was when there was nothing but the BTV) campaign speech.  Mr Rahman is old enough to remember how aghast the chattering classes were at Mrs Wajed.  This was a time when Zia was fondly remembered by our establishment.

Over the past quarter century, Zia’s image has faded, and Mujib’s has been given a new gloss.  Right now, the establishment reaction to Tarique is similar to the visceral reaction the Awami chief caused in 1991.

Mr Rahman seems to be learning the wrong lesson from Mrs Wajed.

So, what do I suggest?

Let me answer that with reference to why and how I believe BNP must engage in history wars:

BNP needs to win back today’s and tomorrow’s Saifur-Oli-Huda.  Without professionals, entrepreneurs, artists and intellectuals, BNP’s future will be dominated by the likes of Lutfuzzaman Babar. Winning the history wars is essential for avoiding that dark future.

…..

our history of political-social-economic struggles that predates 1971 and continues to our time.  This would not mean ignoring 1971, but to put that seminal year in its proper context.  …. our founding leaders like Fazlul Huq and HS Suhrawardy who came before Sheikh Mujibur Rahman and Ziaur Rahman, putting these men in their proper historical context.

….. we have struggled for a democratic polity, or social justice, from the time of British Raj.  Sometimes these struggles have been violent, at other times we had peaceful ‘ballot revolutions’.  Sometimes the leaders betrayed the trust people put on them.  Sometimes they made mistakes.  But overall, we have been making progress.  And ….. make the case for BNP in the context of that march of history.

That’s BNP’s overall challenge for the history wars.  And I do not suggest Mr Rahman has to fight a solo battle.  But if he must engage in political dog fight about dead presidents, I would suggest leaving Mujib alone, and focusing on restoring Zia.

Arguably, Tarique’s initial foray at the history wars was an attempt at this.  Unfortunately, he seems to have made a hash of it, losing the forest for the trees.

For a long time, BNP has tried to establish Zia as the one who declared independence.  In the process, the argument got to a minutae of who got to the radio station and held the mike first, completely missing the historical significance of Zia’s multiple radio speeches.  What was the significance?  The significance was that a serving major in Pakistani army publicly, in English, severed ties with Pakistan and called for an armed resistance.  The significance was not that it was a declaration of independence.  The significance was that it was a declaration of war.  That significance was completely lost.

Now the claim is that Zia was Bangladesh’s first president.  Well, in his first speech, Zia claimed that he was the head of the provisional government.  In the next version, he dropped that bit.  So, is he or isn’t he the first president?

Well, the founding legal document of the country is the Mujibnagar Proclamation, and that says:

We the elected representatives of the people of Bangladesh, as honour bound by the mandate given to us by the people of Bangladesh whose will is supreme duly constituted ourselves into a Constituent Assembly, and having held mutual consultations, and in order to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice,

Declare and constitute Bangladesh to be sovereign Peoples’ Republic and thereby confirm the declaration of independence already made by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman,

AND

do hereby affirm and resolve that till such time as a Constitution is framed, Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman shall be the President of the Republic and that Syed Nazrul Islam shall be the Vice President of the Republic

So we can have a nice legal argument that tries to make Zia the first president, and in the process lose a very important aspect of Zia’s action — something that is directly relevant in today’s Bangladesh.

Because Tarique said so, it’s now becoming BNP’s holy truth that Zia was the first president.  In the process, the fact that Major Zia swore allegiance and subservience to a democratically elected civilian political leadership is completely lost.  Zia’s bravery is March 1971 is to be lauded.  But for BNP, it’s also important to highlight his political maturity, and dedication to civilian, constitutional rule.  And that is exactly what he displayed on 15 August 1975, when he reminded Major General Shafiullah that the president might be dead, there was still a constitution and a vice president.  Whether in 1971 or 1975, Zia deferred to the civilian leadership and constitutionalism.   The relevance for an eventual post-AL Bangladesh is self-evident.

As it happens, Tarique Rahman was not the first person to claim that Zia is our first president.  In November-December 1987, Dhaka was rocked by a series of hartals that nearly brought down the Ershad regime.  Emergency had to be declared, and most opposition politicians were arrested.  Then, on 15-16 December, posters emerged around the city.  One had Mujib’s wireless message to Chittagong declaring independence, apparently sent before the midnight crackdown.  The other claimed Zia as the first president.

Oh, Ershad stayed in power for three more years.  How much more time is BNP’s history wars giving the current regime?

ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যা, কিছু প্রশ্ন

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে কতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছিলো? সাধারন বাংলাদেশীদের মনে সম্ভবত এই সংখ্যাটি বেশ বড়ো, তবে সেটা ব্যাক্তিভেদে যে কোনো কিছু হতে পারে। অনেকেই মনে করেন এই সংখ্যা শত শত, কিংবা হাজার হাজার। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। কিছু কিছু তথ্য যা সহজে পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে,

১৯৭১ এর ডিসেম্বরে মে: জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডাইরীতে করা ২৫০ টি নামের তালিকা যাদেরকে হত্যার টার্গেট করা হয়েছিলো(1)। বাংলাপেডিয়া’র বুদ্ধিজীবি গনহত্যা পাতায় বলা হয়েছে যে ১৬ই ডিসেম্বরের তিন চারদিন আগ থেকে বুদ্ধিজীবি হত্যার কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৪ই ডিসেম্বর রাতে ২০০ জনেরও বেশী বুদ্ধিজীবিকে তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় (2)।এছাড়া আরো দেখা যায় ১৯৭১ এর ডিসেম্বর ২২ তারিখে আজাদ পত্রিকার একটি সংবাদ যেখানে ভারতের আকাশবাণীকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তা, রুহুল কুদ্দুস, বলেন যে কমপক্ষে ২৮০ জন পেশাজীবি ও বুদ্ধিজীবিকে ডিসেম্বরের ১৪ ও ১৫ তারিখে হত্যা করা হয়েছে ঢাকা, সিলেট, খুলনা ও ব্রাম্মনবাড়িয়ায়(3)।  এই রকম আরো কিছু তথ্যের ভিত্তিতে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে ডিসেম্বরের ১২-১৫ তারিখের মধ্যে ঢাকায় ও সারাদেশে কয়েকশত বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে।

আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া সবচেয়ে কুখ্যাত ঘাতক হলো সেই সময়ে ইসলামী ছাত্র সংঘ নেতা ও আল বদর নেতা চৌধুরী মইন উদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খান।  এদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে অভিযোগ ও মামলা করা হয়ে এবং অভিযুক্তরা পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদন্ড শাস্তি পায়। এই শাস্তিটি তাদের অপরাধ অনুযায়ী কোনক্রমেই অবাক করার মতো কিছু নয়, কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো যে ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া এই দুই অপরাধীর বিরুদ্ধে যখন প্রসিকিউশন চার্জ গঠন করে তখন তাদের কে কেবল মাত্র ঢাকায় ১৮ জন বুদ্ধিজীবি হত্যায় অভিযুক্ত করা হয় (4)। প্রসিকিউশনের রিপোর্ট বলে যে এই ১৮ জন বুদ্ধিজীবির মধ্যে রয়েছেন ৯ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ৬ জন সাংবাদিক ও তিন জন চিকিৎসক।

আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি যে প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বর আসলে শত বুদ্ধিজীবি হত্যার কথা বলা হয়, রাও ফরমান আলীর শত জনের লিস্টের কথা বলা হয়, কিন্তু পত্রিকায় নাম ও ছবি আসে ১৫ থেকে ১৯ জনেরই মাত্র। নামসহ যাদের ছবিটি উপরে দেয়া হয়েছে। আমরা আরো দেখলাম যে কোর্টে মামলার জন্যে যখন সুনির্দিষ্ট তথ্যের দরকার পড়লো তখন প্রসিকিউশন মাত্র ১৮ জনেরই একটা লিস্ট হাজির করলো, যে লিস্টটি খুব সম্ভবত প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বরে পত্রিকার লিস্টটির অনুলিপি মাত্র।

 

এই থেকে আমাদের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে ১৪ ই ডিসেম্বর কতজন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছে? এই ১৮ জন ছাড়া আর কাকে কাকে হত্যা করা হয়েছে? তাদের নাম, ছবি আমরা ১৪ই ডিসেম্বরে কেনো দেখি না? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আজকেই পত্রিকার পাতায় (১৪/১২/১৪)। আজকের New Age পত্রিকায় বলা হয়েছে পুরো ১৯৭১ এ কতো জন বুদ্ধিজীবি হত্যা করা হয়েছে এ সম্পর্কে জাতির কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের কাছে কোনো পূর্নাংগ লিস্ট নেই তবে কিছু সরকারী ও ব্যক্তিগত এস্টিমেশন রয়েছে যার সংখ্যার রেন্জ ২৩২থেকে ১১১১ পর্যন্ত(5)। আজকের The Daily Star এ বলা হয়েছে যে এই বছর ৭ই ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ সরকার পার্লামেন্টে ঘোষনা করেছিলো যে ২০১৪ এর জুন মাসের মধ্যেই ১৯৭১ এ শহীদ সকল বুদ্ধিজীবির একটি পূর্নাংগ তালিকা প্রকাশ করবে (3)। জুন পেরিয়ে এখন ২০১৪শেষ হবার পথে, তবে সেরকম কোনো লিস্ট দেখা যাচ্ছে না।

 

উপরে New Age পত্রিকায় যে ১১১১জনের কথা বলা হয়েছে সেটি সম্ভবত বাংলাপেডিয়ার এস্টিমেট। এই এস্টিমেট অনুযায়ী পুরো ১৯৭১ এ নিহত বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে ২১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবি ও প্রায় ৯৫০ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাতীত বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক রয়েছেন(2)। তবে এটি একটি ব্যাক্তিগত এস্টিমেটই, কোনো নির্ভরযোগ্য তালিকা নয়। আজকের New Age পত্রিকায় স্বয়ং শাহরিয়ার কবিরই বলেছেন যে বুদ্ধিজীবি হত্যার কয়েকটি কেস ছাড়া অধিকাংশ তথ্য ও অভিযোগের উপরে কোনো রিসার্চ করা হয় নি (5)।

 

১৯৭১ এর পরে আরো তেতাল্লিশটি ১৪ই ডিসেম্বর আসলেও আমরা এখনো এই প্র্শ্নের উত্তর দিতে পারি না যে ১২-১৫ ই ডিসেম্বর কতো জন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছে? পরিচিত ১৮ জনের বাইরে আর কাদের হত্যা করা হয়েছে? তাদের নাম ছবি কেনো আমরা দেখি না কোনো ১৪ ই ডিসেম্বরে?

 

আমাদের দেশের লোকের একটু লিস্টের ব্যাপারে এলার্জি আছে এটা মেনে নিয়েও বলা যায় লক্ষ-মিলিয়নের লিস্ট না হোক, হাজার জনের লিস্ট তো করা যেতেই পারে, তাই না?

 

[ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবি হত্যা নিয়ে সমর্থিত-অসমর্থিত সকল রকম সংবাদ ও বিশ্লেষনের একটা ভালো সংগ্রহ রয়েছে চৌধরী মইনউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান এর বিচারের রায়ে। দেড়শ পাতার এই রিপোর্টের পিডিএফ কপি রয়েছে এই লিংকে। https://www.dropbox.com/s/3xckpr73pyzap4p/bangladesh_tribunal_chowdhury_mueenuddin_judgment.pdf  ]

 

Reference

(1) http://www.genocidebangladesh.org/?page_id=32

(2) http://www.banglapedia.org/HT/K_0330.htm

(3) http://www.thedailystar.net/cold-killing-design-55227

(4) http://www.dhakatribune.com/bangladesh/2013/oct/31/mueen-ashraf-verdict-sunday

(5) http://newagebd.net/76478/no-complete-list-of-martyred-intellectuals-44-years-on/#sthash.PcYoLBRk.dpbs

দিয়েন বিয়েন ফু হতে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একদল হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রুগী..

By Watchdog BD

সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও দেশটার প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ যেদিন মারা যান সেদিন আমি সোভিয়েত দেশে। সময়টা বোধহয় ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসের কোন একদিন হবে। ১৯৬৪ সালে সেই যে ক্ষমতায় বসেছিলেন নড়াচড়ার নামগন্ধ কোনদিন উচ্চারিত হয়নি। জনগণ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল মহাপরাক্রমশালী সোভিয়েত দেশের প্রধানও কোনদিন মরতে পারেন।

তাই এই নেতার মৃত্যু বড় একটা ধাক্কা হয়ে আঘাত হেনেছিল সোভিয়েত সমাজে। একজন বিদেশী হিসাবে দেশটার ক্ষমতায় কে বসবে আর কে বিদায় নেবে তা একান্তই সে দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসাবে গন্য করেছি। তাই এ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখানোর প্রয়োজন বোধ করিনি। তবে সেমিস্টারের মাঝপথে এ ধরণের রাষ্ট্রীয় মৃত্যু দু’একদিনের জন্য হলেও যে আমাদের জন্য ছুটি নিয়ে আসবে এ ব্যাপারে আশার অন্ত ছিলনা। সময়টা ভয়াবহ শীতের সময়। তাপমাত্রা হিমাংকের নীচে চল্লিশ ডিগ্রির আশপাশে উঠানামা করছে। অতিষ্ঠ ছাত্রজীবনে অতিরিক্ত ছুটি অপ্রত্যাশিত বিশ্রাম ও স্বস্তি নিয়ে আসবে এমন একটা প্রত্যাশায় উন্মুখ থাকতাম ঘোষনার। কিন্তু হায়, দিন গড়িয়ে যায় ঘোষনা আর আসে না। ক্রেমলিনের সামনে রেড স্কয়ারে লাখো মানুষের লাইন, বিদেশ হতে শোক বার্তার মিছিল, পাশাপাশি স্থানীয় ও আর্ন্তজাতিক মিডিয়া তোলপাড় কোনকিছুই আমাদের আন্দোলিত করতে পারেনি। আমরা শুধু প্রহর গুনতাম ছুটি নামক মহেন্দ্র ক্ষণের। শেষপর্যন্ত কাঙ্খিত ছুটির দেখা পেলাম, তবে তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র দু মিনিট। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করতে সপ্তাহ খানেক চলে যায়। তারপর শুরু হয় শেষ বিদায়। যে মুহূর্তে লাশ কবরে নামানো হয় থেমে যায় গোটা দেশ। দু মিনিটের জন্য যে যেখানে ছিল দাঁড়িয়ে যায়। থেমে যায় গাড়ি, ট্রেন, বিমান সহ সব ধরণের যানবাহনের চাকা। কারখানা গুলো হতে দু মিনিটের জন্য বিরামহীন ভাবে বাজাতে থাকে সাইরেন। এভাবেই বিদায় নেন সোভিয়েত লৌহমানব লেনিন, স্তালিন ও ক্রুশেভের উত্তরাধিকারী লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ। ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভুত হন নতুন নায়ক কনসটানটিন উস্তিনভিচ চেরনেন্‌কো।

ছুটি বিহীন এ ধরণের মৃত্যু কিছুটা হলেও হতাশ ও অবাক করেছিল আমাদের। এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে আমাদের বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ বিষয়ের শিক্ষক ছোটখাট একটা লেকচার দিয়ে জানালেন জাতিকে ছুটিতে পাঠিয়ে মৃতকে সন্মান দেখানোর রেওয়াজ দেশটায় চালু নেই। বরং অতিরিক্ত উৎপাদনই হতে পারে নেতার প্রতি যথাযোগ্য সন্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন। তর্ক বিতর্কের দেশ ছিলনা সোভিয়েত সাম্রাজ্য, তাই এ নিয়ে ত্যনা পেঁচানোর সুযোগ ছিল সীমিত। সপ্তাহ না ঘুরতে ব্রেজনেভ পর্ব পিছনে ফেলে জাতি এগিয়ে গেল নতুন উদ্যমে। ১৮ বছর যে মানুষটার মুখের কথায় সাইবেরিয়া হতে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত উঠাবসা করত, ১৮ দিনের মাথায় সে মানুষ ঠাঁই নিল ইতিহাসে। আমরাও ভুলে গেলাম ছুটি না পাওয়ার কষ্ট। তবে এ নিয়ে আমার শিক্ষকের করা মন্তব্যটা কেন জানি মগজে গেথে রইল, এবং সারা জীবনের জন্য। ছুটি, সভা, সেমিনার, বোমা ফাটানো কলম ঝড়, মুখ ফাটানো স্তুতি বন্দনা বাইরে গিয়েও মানুষকে সন্মান, শ্রদ্ধা জানানো যায়, সোভিয়েত দেশে ব্রেজনেভের বিদায় ক্ষণ হয়ত তারই মাইলস্টোন।

প্রতিটা জাতির কিছুনা কিছু ঘটনা থাকে যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় তার বর্তমান ও ভবিষৎ। বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সাল ছিল তেমনি একটা বছর। স্বাধীনতার জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে সংগ্রাম হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে। দখলদার শত্রুকে পরাজিত করে বিজয়ী জাতি মাথা উঁচু করে পৃথিবীর বুকে পা ফেলেছে, ঝাঁপিয়ে পড়ে উন্নতির দৌঁড়ে সামিল হয়েছে। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, মাথার উপর ছাদ এবং স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর লড়াই করতে গিয়ে শত্রু-মিত্রের সমীকরণ নতুন করে কষতে হয়েছে। সভ্যতা এভাবেই এগিয়ে গেছে এবং সামনে হয়ত এভাবেই এগুতে থাকবে হাজার বছর ধরে। আমার বন্ধু নগুয়েন চি থানকে দিয়েন বিয়েন ফু হতে শুরু হওয়া যুদ্ধের দাবানল হতে সরাসরি পাঠানো হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। তাদের জানা ছিল যুদ্ধ চিরস্থায়ী নয় এবং স্বাধীনতার আসল ফসল ভোগ করতে প্রয়োজন হয়ে যোগ্য মানুষের। কেবল গোটা পরিবারই নয়, নগুয়েনের নিজের শরীরের অনেকাংশ পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিল মার্কিন নাপাম বোমার আঘাতে। এতগুলো বছর পর সে নগুয়েনের নাতিকে আসতে হচ্ছে মার্কিন মুলুকে। পোষাক শিল্পের বাজারের সন্ধানে ঘুরতে হচ্ছে ম্যানহাটনের ৫নং স্ট্রীটে। জানিনা নগুয়েনের শরীর হতে নাপাম বোমার ক্ষত গুলো ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে কিনা। হয়ত ক্ষত নিয়েই ওদের ঘুরতে হচ্ছে, এবং এমন একটা দেশে যে দেশের বি-৫২ বোমারু বিমানের কার্পেটিং বোমায় জ্বলে, পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছিল ভিয়েতনামের জনপদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ৭১ সালে শেষ হয়নি। যুদ্ধ চলছে এবং চলতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। আমরা যারা যুদ্ধকে কাছ হতে দেখেছি, যুদ্ধের ভাল-মন্দের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী হয়েছি তাদের কথা ও কাজে যতটা না যুদ্ধের প্রভাব তার চাইতে হাজার গুন প্রভাবে টইটম্বুর জাতির নতুন প্রজন্ম। অনেকটা হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মত মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনার বায়বীয় বেলুনে ভেসে বেড়াচ্ছে এ প্রজন্ম। নতুন এ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানেই পাকি ও রাজাকার ’পুন্দানী’, যুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তি নিয়ে রাজনীতির মাঠ তথা সোস্যাল মিডিয়ায় লাখ লাখ কর্মঘণ্টা ব্যায়। অথচ চেতনার অপর পীঠে এ দেশে রাজত্ব করছে ভয়াবহ দুর্নীতি, হত্যা, গুম সহ লুটের সুনামী। স্ববিরোধী এসব দেশপ্রেম জাতির অসুস্থতারই বহিঃপ্রকাশ।

স্বাধীনতা তথা দেশপ্রেম কেবল জামাত, পাকিস্তান, রাজাকার অধ্যায় নিয়ে তোলপাড় আর যুদ্ধাপরাধী বিচার দাবির মধ্যেই সীমিত থাকার কথা নয়, এর বাইরেও জাতির কিছু চাওয়া পাওয়া আছে। এসব চাওয়া পাওয়া চেতনার বেলুন হতে মাটির ধরণীতে নামিয়ে আনার জন্যই আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। চাপাবাজি ও ফাঁকা স্টেটাসের বাইরে গিয়েও মুক্তিযুদ্ধকে সন্মান করা যায়। একটা সুস্থ, সবল, ঐক্যবদ্ধ জাতি ও স্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর নিশ্চয়তার সমাজ হতে পারে এর মাইলস্টোন।

বিচারাধীন মামলার গনযোগাযোগ সম্পর্কিত প্যারাডক্সঃ কামারুজ্জামান প্রসঙ্গে

1

By Ariful Hossain Tuhin

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট, মামলা চলাকালীন সময়ে, কোর্টরুমে ভিডিও ক্যামেরা নিষিদ্ধ করেছে অনেকদিন আগেই। এই নিয়মের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জাস্টিস স্কালিয়া বলেন [১]

For every ten people who sat through our proceedings, gavel to gavel, there would be 10,000 who would see nothing but a 30-second take-out from one of the proceedings

প্রতিটি মামলার বিবরণ যেহেতু সকলের জন্য উন্মুক্ত, এমনকি যেকোন নাগরিক মামলা চলাকালীন সময়ে উপস্থিত থাকতে পারেন, সেহেতু সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা, ক্যামেরা নিষিদ্ধের পেছনে যে চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে সেটি অবশ্যই গোপনীয়তা নয়। বিচারপতিরা ভাবছেন কেউ যদি আউট অফ কনটেক্সট ছোট একটি ভিডিও দেখেন তাহলে সুপ্রীম কোর্টের বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে ভুল ধারনা তৈরী হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

যেকোন মামলা একটি জটিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বোধ্য প্রক্রীয়া। মামলা বোঝার জন্যে তাই শ্রম এবং একাগ্রতা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচারপতিরা তাই কোর্টরুমে কাগজ কলম ছাড়া আর কোন কিছুই এলাউ করেন না। কাগজ কলম নিয়ে মনোযোগ দিয়ে মামলা শোনা ছাড়া রিপোর্টারদের তাই আর কোন কিছু করার নেই।
সুতরাং একটি বিচারাধীন মামলা একটি জটিল প্রক্রীয়া। একে খুব সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, ভুলব্যাখ্যা কিংবা আউট অফ কনটেক্সট উদ্ধৃতি দিয়ে।

যেসকল দেশে জুরি ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, সেখানে অনেক মনোযোগ দেয়া হয় যাতে জুরিরা কোর্টে উপস্থাপিত তথ্য প্রমাণাদির বাইরে কোন তথ্য দ্বারা প্রভাবিত না হন। তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয় যাতে তারা নিজেরা এই ব্যাপারে স্বতপ্রনোদিত ভাবে কোন রিসার্চ না করে, পত্রিকা বা ইন্টারনেটে মামলা সংক্রান্ত খবর না দেখে, ইত্যাদি। কিন্তু সবসময়, বাস্তব সমস্যার জন্যেই এই ব্যবস্থা কাজ করে না।
দেখা যায় জুরিরা তাদের মামলা নিয়ে ইন্টারনেটে রিসার্চ করছেন।[২] এর ফলশ্রুতিতে অনেকসময় জুরিদের উপর কোর্ট বহির্ভূত প্রভাব পরে।
গনসংযোগ ক্যাম্পেইন(পি আর ক্যাম্পেইন) সাধারনত অভিযুক্ত আইনজীবির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। কারন জনগনের মতামতের একটি পরোক্ষ প্রভাব বিচার প্রক্রীয়ায় থেকেই যায়। অন্যদিকে সরকারী প্রসিকিউটরদের কখোনো পি আর ক্যাম্পেইন চালাতে দেখা যায় না। পৃথিবীর সকল সরকারী কর্মচারীদের একটি সাধারন প্রবণতা হচ্ছে নিজেদের কাজের কোন “মার্কেটিং” না করা।

সরকারী কর্মচারীদের যে পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়, তা “মার্কেটিং” এর জন্যে উপযোগী নয়। এছাড়াও সরকারী কর্মচারীদের আসলে “মার্কেটিং” এর কোন ইনসেন্টিভ নেই। তাদের পেশাগত সাফল্য নিজেদের কাজের মার্কেটিং এর উপর নির্ভর করে না। একারনে অনেক বিখ্যাত মামলায় দেখা যায় অভিযুক্ত পক্ষ হতে একপাক্ষিক প্রচারণা চলছে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি সত্য। প্রধানত অভিযুক্ত এবং তার সহমর্মীরাই একপাক্ষিকভাবে বিভিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারী পক্ষ থেকে পালটা প্রচারণার কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সমর্থক যারা, অনেক সময়েই তারা মামলার টেকনিক্যাল ডিটেইলগুলো বেশী চিন্তিত নন। অবশ্যই এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু যদি অভিযুক্তদের প্রচারণার
পরিধি বিচার করা হয় তাহলে আসলেই এ পর্যন্ত পালটা প্রচারণা অথবা বিভ্রান্তির অবসান করার জন্যে তেমন কিছুই করা হয়নি।

পত্রিকায় নিয়মিত মামলার প্রসিডিংস প্রকাশিত হয়। সেগুলোতে নজর রাখলে বেশ কিছু বিষয় চোখে পরে। যেমন প্রসিকিউটরদের আশ্চর্যরকম অদক্ষতা। নিয়মিতভাবে দেখা যায় সম্মানিত বিচারকরা , প্রসিকিউটরদের ভর্তসনা করছেন তাদের বিভিন্ন “ট্রিভিয়াল” ভুলের জন্যে। এত গুরুত্বপূর্ণ মামলা অবহেলায় চলছে এমনটা বললে অতিরঞ্জিত হবে কিনা সেটি নিয়ে নিশ্চিত হবার সুযোগ কমেই ক্রমে আসছে।

সুতরাং তদন্তকারী সংস্থা/প্রসিকিউটরদের বিভিন্ন দক্ষতার অভাব এর সাথে অভিযুক্তদের বিরামহীন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মিলে অনেক মানুষের মনেই বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে। এই প্রশ্নসমূহ অভিযুক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক দল/মিত্রদের দাবীর লেজিটিমেসি তৈরী হবার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করছে।

উদাহরন হিসেবে কামারুজ্জামানের রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকার পর, দোষীর পক্ষে যেসকল প্রচারণা চালানো হয়েছে সেগুলো অনেকের মনে সন্দেহ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। দোষীদের প্রচারনার প্রধান কৌশল ছিল বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন anecdot উল্লেখ করে মামলাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়া।

এটি অত্যন্ত পুরোনো প্রক্রীয়া। প্রথমে দেখা যাক দোষী পক্ষের কিছু অভিযোগের নমুনা। আপিল বিভাগে চুড়ান্ত রায় প্রকাশের পরপরই কামারুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে সোহাগপুর ঘটনার সাথে কামারুজ্জামানের কোন সম্পৃক্ততা নেই এই দাবী করে তার ছেলে হাসান ইকবাল বলেন[৩]

‘এই মামলার মুল সাক্ষীর তালিকায় ৪৬ জনের নাম ছিলো। তাদের মধ্যে ১০ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর নতুন করে তিনজন মহিলাকে অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে প্রসিকিউশন আদালতে উপস্থাপন করেন। ওই সাক্ষীরাও তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে গণহত্যার সময় আমার বাবা উপস্থিত ছিলেন এমন দাবি করেননি।’

মোটামুটি নির্দোষ দেখতে এই দাবীটির মাঝে বেশ কয়েকটি প্যাচ আছে। প্যাচগুলো একটি একটি করে আলোচনা করা যাক। প্রথমত সোহাগপুরের ঘটনার জন্যে রাষ্ট্রপক্ষ ঠিক কি ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে এনেছিল তা দেখা যাক।

 

রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির(ট্রাইবুনালের রায়) ২৯১ অনুচ্ছেদ থেকে আমরা জানি [৪]

 

Muhammad Kamaruzzaman has been charged for
participating, substantially facilitating and contributing to the commission of
offences of ‘murder as crime against humanity’ or in the alternative for
‘complicity to commit such crime’

চার্জের প্রধান গুরুত্ব ছিল “সহোযগিতার”। এই ব্যাপারটি ডিফেন্স কাউন্সিলও তাদের যুক্তিতে উল্লেখ করেছে [৫]

the accused has been
indicted for providing ‘advices’to his accomplices in launching the attack and
it does not describe that the accused accompanied the principal perpetrators

কামারুজ্জামানের সহযোগিতা প্রধানত প্রমান হয় ততকালীন সময়ের আলবদর সদস্য এবং আলবদর ক্যাম্পের গার্ড মনোয়ার মুন্সির সাক্ষ্যে [৬]

Md.
Monwar Hossain Khan @ Mohan Munshi (63), a member of Al-Badar was
attached to the camp set up at Suren Saha’s house as a guard as directed by the
accused Muhammad Kamaruzzaman and in this way he worked at the camp
for the period of 4-5 months and not exceeding 07 months. It has also been
proved that accused Muhammad Kamaruzzaman used to attend meetings on
the first floor of the Al-Badar camp and he [P.W.2] and his ‘sir’
Kamaruzzaman [accused] had fled together from the camp two days before
Sherpur was liberated. As regards the event of Sohagpur massacre P.W.2 does
not claim to have witnessed the event

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে মনোয়ার মুন্সীর কিন্তু দাবী করেনি সোহাগপুরেরে গনহত্যা প্রতক্ষ্য করার। এখন প্রশ্ন এসে যায় কেন এই সাক্ষীর গুরুত্ব বেশী, তা বোঝার আগে এই সাক্ষীর ব্যাপারে ডিফেন্স কাউন্সিল কি বলেছে একবার দেখা যাক। [৭]

the learned defence counsel has submitted that
the event of Sohagpur massacre is not disputed. But the witnesses who have
deposed in support of the charge implicating the accused are not credible.
P.W.1 and P.W.2 are hearsay witnesses

সুতরাং ডিফেন্সের প্রধান যুক্তি ছিল, মনোয়ার মুন্সি(PW2) ঘটনা (সোহাগপুরের গনহত্যা) নিজে দেখেনি(hearsay witness). মনোয়ার মুন্সির সাক্ষ্য সম্পর্কে দুই নম্বর চার্জের ক্ষেত্রে ডিফেন্স কাউন্সিলের যুক্তি ছিল [৮]

He has submitted
that P.W.3 cannot be relied upon as he stated inconsistent date of the event.
Statement made by P.W.2 and P.W.14 on some particulars is inconsistent. Due
to such inconsistencies it is immaterial to see whether the statement made by
them could be impeached by the defence through cross-examination.
Inconsistencies between statements of two witnesses by itself renders them
unreliable and tutored.

 

ডিফেন্স কাউন্সিল ঐ আলবদর ক্যাম্পে কামারুজ্জামানের উপস্থিতি ছিল না সেটি কি প্রমান করতে পেরেছে? সংবাদ সম্মেলনে বারবার হাসান ইকবাল সাহেব বিভিন্ন বই/প্রবন্ধের উল্লেখ করছিলেন যার মধ্যে কামারুজ্জামানের নাম নেই। নাম থাকা আর না থাকা সমান গুরুত্বের অধিকারী নয়। একটি গবেষণামূলক বইয়ে যদি একজনের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য প্রমান উপস্থাপন করা হয় তাহলে তার অপরাধের “প্লজিবিলিটি” তৈরী হয়। কিন্তু কারও নাম উল্লেখিত না থাকা মানে এই না সে অপরাধ করেনি। কারন এটাও হতে পারে সে অপরাধ করেছে, কিন্তু “ডকুমেন্টেড” হয়নি। এই ক্ষেত্রে কামারুজ্জামানের পক্ষে এমন কোন শক্ত এলিবাই কি ডিফেন্স কাউন্সিল দাড়া করাতে পেরেছে যার ফলে প্রমান হয় কামারুজ্জামান ঐ টাইম ফ্রেইমে ঐ আল বদর ক্যাম্পে অবস্থান অসম্ভব ছিল? আমার মনে হয় না পেরেছে। তাদের প্রধান কৌশল ছিল প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের রিলায়েবিলিটি নষ্ট করা। যেমন একজন সাক্ষীর রিলায়েবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারন হিসেবে ডিফেন্স কাউন্সিল উল্লেখ করেছে,[৯]

The learned defence counsel next argued on charge no.2. He has submitted
that P.W.3 cannot be relied upon as he stated inconsistent date of the event

সমস্যা হচ্ছে আমার জীবনে খুব বড় ঘটনার তারিখ জিজ্ঞেস করলেও আমি ভুলভাল বলতে পারি। ডিফেন্স যেটি পারত তা হচ্ছে, ঐ সাক্ষীর, ঐ ঘটনা প্রত্যক্ষ দেখার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রমান উপস্থাপন করতে পারত। সেটি ডিফেন্স কাউন্সিল কি পেরেছে?

হাসান ইকবাল খুব জোর দিয়েছেন, সোহাগপুরে তার বাবার অনুপস্থিতিকে। যেহেতু কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গনহত্যার “সহোযোগিতা”র অভিযোগ আনা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড সংগঠনের সময় তার উপস্থিতি কতটুকু জরুরী? যুক্তরাষ্ট্রের স্টিফেন র‍্যাপের বিবৃতিটি অনেক জোরে শোরে বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে/প্রচার হয়েছে। বাশেরকেল্লায় সম্ভবত একাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে খবরটি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্টিভেন র‍্যাপের বিবৃতিটিতে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে।

ডেভিড বার্গম্যানের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, [৯]

He stated that international law required in such aiding and abetting offences, that the Jamaat leader, knew that the [Al Badr] group was committing atrocities, that he provided assistance to the group with that knowledge. It was not necessary that he attend, but that the assistance that he provided needed to be substantial and in fact something that caused the atrocities committed

সুতরাং হাসান ইকবালের প্রধান দাবীটি, কামারুজ্জামান সোহাগপুরে উপস্থিত ছিলেন না, অপ্রয়োজনীয় হয়ে পরে। যেহেতু সোহাগপুরের গনহত্যার পরিকল্পনা আল বদর ক্যাম্পে হয়, (ডিফেন্স এর কোন বিরোধীতা করেনি), সেহেতু কামারুজ্জামানের এই চার্জ থেকে বাচার জন্যে একমাত্র এস্কেইপ হচ্ছে , তিনি সেখানে কোনভাবেই উপস্থিত ছিলেন না, এই ধরনের কোন প্রমান দাখিল করা।

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল বহির্বিশ্বে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। এর অন্যতম কারন অবশ্যই দোষী এবং অভিযুক্ত পক্ষের প্রচারণা। কিন্তু আমার মনে হয়না অভিযুক্ত পক্ষের প্রচারণা এককভাবে দায়ী। নিজেদের বিভিন্ন লিমিটেশন গুলোকে স্বীকার করেই বলতে হয়, অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে প্রাণদণ্ড। বর্তমান পৃথিবী প্রাণদণ্ডের ব্যাপারে অনেক সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, হয় প্রাণদণ্ড আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করেছে, অথবা প্রাণদণ্ডদানে বিরত আছে।[১০] এই কারনেই বহির্বিশ্বে এই বিচার নিয়ে ঋণাত্নক মনোভাব তৈরী হচ্ছে। এই সমস্যাটি নুরেমবার্গ কিংবা আইখম্যানের বিচারের সময় ছিল না।

 

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় অনেক দোষীকে কখনই দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে না কারন তাদের প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ দেশ , প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের ফেরত দেয় না। বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী চৌধুরী মাইনউদ্দিন কিংবা আশরাফুজ্জামানকেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না তাদের প্রাণদণ্ড হয়েছে বলেই।

 

প্রাণদণ্ডের একটি “ইমোশোনাল এপিল” আছে। ৭১ সালের গনহত্যা/ধর্ষণ ইত্যাদি আমাদের সমষ্টিক স্মৃতিতে একটি দগদগে ঘা। এই ঘায়ের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও প্রলেপ দিতে পারে প্রাণদণ্ড। প্রাণদণ্ড প্রতিশোধমূলক শাস্তি। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর অনেকেই প্রতিশোধ প্রবনতাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাতারে ফেলতে চান না। রাষ্ট্রকে প্রতিশোধ প্রবণতার উর্ধে দেখতে চান। সেই কারনেই প্রাণদণ্ড ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে পৃথিবী জুড়ে।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, জামাত এবং অন্যান্য রাজাকার/আলবদর ইত্যাদির যেসকল অপরাধ করেছে তার প্রায় সমান গুরুত্বের দাবী রাখে এইসকল অপরাধের পেছনে যে মতাদর্শ কাজ করেছে। যেই ফ্যাসিবাদ প্রভাবিত রাজনৈতিক “থিওক্র্যাসি”তে জামাত এবং অন্যান্যরা আস্থা রাখত তা কোনক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিজের দেশের মানুষের উপর নেমে আসা এই মর্মান্তিক ধ্বংস, হত্যা, ধর্ষণের সময়ে যারা ঠাণ্ডা মাথায় পশ্চিম পাকিস্থানের পক্ষ নিতে পেরেছে, তাদের অপরাধের অংশীদারত্ব গ্রহন করেছে, তাদের সাইকোলজি অনেক ভয়ংকর এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকারক। সুতরাং তাদের অপরাধের শাস্তির সাথে সাথে তাদেরকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মতাদর্শিকভাবে ধ্বংস করে দেয়া আমাদের জন্যে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্যে প্রয়োজন ছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যমত্য।

আবারো বলছি বিভিন্ন রাজনৈতিক কারন এবং নেগেটিভ প্রচারণার মাঝেও আমার মনে হয়, আমরা যদি প্রাণদণ্ড অপশনটি টেবিল থেকে সরিয়ে নিতাম, তাহলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্যমতে পৌছানো আমাদের জন্যে অনেক বেশী সহজ হত। কিছু বৃদ্ধ রাজাকারকে ফাসিতে ঝুলিয়ে যে তাতক্ষণিক আনন্দ পাওয়া যাবে, তার চেয়ে জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাসের সাথে শেষবারের মত বোঝাপড়া করা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা আন্তর্জাতিক ভাবে অনেক সমর্থন পেয়েছি। এর অন্যতম কারন ছিল, ন্যায় এবং ন্যায্যতা আমাদের পক্ষে ছিল।

ন্যায় এবং ন্যায্যতার দাবী এখন পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে প্রাণদণ্ড ঢেকে ফেলছে বলেই আমার মনে হয়। এ প্রসঙ্গে অকালে চলে যাওয়া অধ্যাপক জালাল আলমগীরের বছর কয়েক আগে বলা কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করছি[১১]

 

We should recognise honestly that after decades of complexities, secret deals, and depraved politics, justice, though necessary and urgent, will be limited.
Such limited justice can be morally justified only by a long-term commitment to truth.
To prioritise truth, we must de-prioritise capital punishment. In 1941, years before the Nuremberg trials, Winston Churchill planned summary executions for fifty top Nazis at war’s end. He considered this punishment a political decision, not a legal matter. But Harry Truman, the American president, wanted a tribunal. Josef Stalin cast the deciding vote. As the human rights scholar Geoffrey Robertson explained, Stalin “loved show trials as long as everyone was shot in the end.”
And so a severely flawed tribunal was held at Nuremberg. It punished crimes against humanity by using inhuman standards: twelve Nazis were hanged first and then burnt in the ovens of Dachau, one of the German concentration camps.
Nuremberg’s moment of success was not in the verdict but in the courtroom, when the Nazis were shown reels of the horrors that they had created. Some of them wept and sat stunned, as they came to grips with the truth. The punishment from exposing openly and publicly what they had done to humanity was far more compelling than what Churchill’s planned executions might have produced. It is from this public record that the world’s aversion to genocide began and Nazism, as an ideology, received its death penalty. South African apartheid also received its capital punishment through the Truth Commissions pioneered by Nelson Mandela and Bishop Desmond Tutu

 

First Published in  http://aftnix.wordpress.com/

সুত্রঃ

[১]http://www.economist.com/blogs/democracyinamerica/2014/03/cameras-supreme-court

[২]http://news.bbc.co.uk/2/hi/8519995.stm

[৩]http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/339310.html

[৪]Article 291  of the verdict , accessed at : http://www.ict-bd.org/ict2/ICT2%20judgment/MKZ.pdf

[৫]Article 81, ibid

[৬]Article 255, ibid

[৭]Article 267, ibid

[৮]Article 80, ibid

[৯]http://newagebd.net/65600/us-calls-for-halt-to-kamaruzzaman-execution/#sthash.MRsTjDaj.AM96NvMP.dpbs

[১০]http://www.amnestyusa.org/our-work/issues/death-penalty

[১১]http://archive.thedailystar.net/forum/2010/june/truth.htm

মুক্তিযুদ্ধ ও গেসু-সাদু উপাখ্যান..

by Watchdog BD

ডঃ পিয়াস করিমক নিয়ে অবৈধ সরকারের ততোধিক অবৈধ আইনমন্ত্রী জনাব আনিসুল হক স্মৃতিচারণমূলক একটা লেখা লিখেছেন। স্বভাবতই পছন্দ হয়নি আওয়ামী প্রোপাগান্ডা মেশিনারিজের। এ আর খন্দকারের মত এই মন্ত্রীকেও রাজাকার উপাধি দেওয়া এখন সময়ে ব্যাপার। নিয়মিত গঞ্জিকা সেবক একদল তরুণ যাদের সাথে এ দেশের জন্মের কোন সম্পর্ক নেই তারা মুক্তিযুদ্ধের নবম ফ্রন্ট খুলে সার্টিফিকেট দিচ্ছে। আর এসব সার্টিফিকেট যোগান দিচ্ছে গঞ্জিকা যোগানোর খরচাপাতি। ড্রাসাসক্ত যুবা তরুণের দল আজকাল মা-বাবাকেও খুন করছে ড্রাগ মানির জন্য। নবম ফ্রন্টের এসব জেনারেলদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ খুবই শক্তিশালী একটা ড্রাগ, যার ব্যবহার শরীর, মন ও মস্তিষ্ককে নেশা ছড়িয়ে দেয় অনেকটা পাগলা ঘোড়ার কায়দায়। বিশেষত্ব হচ্ছে এই ড্রাগ কেবল নেশাখোরদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনা বরং তার আমেজ গ্রাস করে নেয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একদল কিশোর, তরুণ ও যুবকদের। ইবোলা কায়দায় এই ড্রাগ দেশপ্রেম নামক সিফিলিস রোগের জন্ম দেয় যার জরায়ুতে জন্ম নেয় নতুন এক ভাইরাস, আওয়ামী জারজতন্ত্র। জনাব আনিসুলে হকের লেখাটা হঠাৎ করেই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল ৭১ সালে। স্কুল পড়ুয়া তরুণ হলেও সমাজ, সংসারের অনেক জটিল সমীকরণ বুঝে নিয়েছি ইতিমধ্যে। স্মৃতিচারণ এক ধরণের ছোঁয়াচে রোগ। এ মুহূর্তে আমিও আক্রান্ত এ রোগে। তাই পাঠকদের কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিয়ে যেতে চাই আগুন ঝরা ৭১’এর দিন গুলোতে। চলুন…

ঘটনা ১:

এপ্রিলের শুরুতে আকাশ পথে শুরু হল তাদের আনাগোনা। স্থলপথ ছিল ইপিআরদের দখলে। সকাল ১০টা হবে হয়ত। বাজার বন্দরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে কেবল। বাজ পাখির মত ছুটে এলো দুটো ফাইটার। বিকট শব্দে শুরু হল বোমা বর্ষণ। আমরা তখন ২০ মাইল দুরে দাদাবাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ে। দুদিন আগে একদল বিহারীকে নদীর হাঁটু জলে নামিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করার পর অনেক আন্দাজ করেছিল ওরা আসবে। পেশায় চামার, মুচি ও নাপিত এসব নিরপরাধ বিহারীদের হত্যা করে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতারা কি ম্যাসেজ দিতে চেয়েছিল তা বুঝা গিয়েছিল একদিন পরে। একে এক ১০টা ব্যাংক লুট করে সীমান্তের ওপারে পালিয়ে যায় ওরা। সাথে নিয়ে যায় বস্তা ভর্তি টাকা। যুদ্ধের নয় মাস তাদের কারও মুখ দেখা যায়নি ক্ষতবিক্ষত শহর-গঞ্জের জনপদে। শোনা যায় কোলকাতার বেহালায় বাইজী সহ বাসা ভাড়া করে বাদশাহ আওরাঙ্গেজেবের জীবন কাটিয়েছে অনেকে। সপরিবারে পলাতক আমরা। এর কিছুদিন পর গোলন্দাজ বাহিনীর গোলার আঘাতে উড়ে যায় আমাদের বাড়ির কিয়দংশ। মে মাসের শুরুতে পাকি বাহিনীর পদভারে প্রকম্পিত হয়ে যায় আমাদের শহর। বাড়ি ফাঁকা হলেও বাড়ির একজনকে পলাতক বানানো যায়নি। সে আমাদের কাজের ছেলে গিয়াস উদ্দিন। ১৬ বছর বয়সী সদা চঞ্চল এই যুবক কাজের লোক হলেও পরিবারের স্থায়ী সদস্য ভাবতেই অভ্যস্ত ছিলাম আমরা। তার হাতেই গচ্ছিত ছিল বাড়ির দায়িত্ব। আগস্টের মাঝামাঝি এক সময় নদীর গা ঘেঁষে অনেকটা গেরিলা কায়দায় হাজির হই ফেলে আসা বাড়িতে। উদ্দেশ্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে যাওয়া। বাড়িতে পা রেখে হতবাক। লুটের চিহ্ন¡ চারদিক। মূল্যবান সবকিছুই খোয়া গেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে প্রায়। শুয়ে আছি প্রিয় বিছানাটায়। সদর দরজা তালা দেয়া। শুয়ে শুয়ে লক্ষ্য করলাম মূল দরজার কড়া নড়ে উঠছে। উপরে দিকে তাকাতে আত্মা শুকিয়ে গেল, রাইফেলের লম্বা বেয়নেট। পালানোর সবকটা রাস্তা ছিল বন্ধ। ধীরে ধীরে খুলে গেল ফটকের তালা। কেউ একজন ৩০৩ রাইফেল নিয়ে প্রবেশ করলো বাড়িতে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম এ আমাদের গিয়াস উদ্দিন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আলাপ করলাম তার সাথে। জানা গেল বাড়ি লুটের সাথে সেও জড়িত। তবে মূল উদ্যোক্তা স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার ও মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জনাব আক্কাস আলী দেওয়ান। তার প্ররোচনায়ই নাকি সে রাজাকার বাহিনীতে নাম লিখিয়েছে। আসল কাজ চুরি ডাকাতি এবং ইতিমধ্যে বেশকিছু টাকাকড়ি জমাতে সমর্থ হয়েছে সে। ইচ্ছা যুদ্ধ শেষে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে একজোড়া হালের গরু কিনে তা ভাড়া খাটানো। দুপা ঝাপটে ধরে রইলো অনেকক্ষণ এবং অনুনয় করে জানালো গ্রামে গিয়ে কাউকে যেন না জানাই তার বর্তমান পরিচয়। সুযোগ পেলেই নাকি ফিরে যাবে লোকালয়ে এবং সাথে নিয়ে যাবে তার ৩০৩ রাইফেল ও প্রিন্সিপালের কল্লা।

১৬ই ডিসেম্বরের আগেই সে ফিরে গিয়েছিল। প্রিন্সিপালের কল্লা আর নিতে পারেনি তবে রাইফেল নিতে ভুল করেনি। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বরের পর ব্যাংক লুটেরা একদল আওয়ামী জেনারেল গিয়াস উদ্দিনকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখে চৌরাস্তার মুখে।

ঘটনা ২:

স্থান দাদাবাড়ি। শহর হতে পালিয়ে আমাদের মত আরও অনেক পরিবার লুকিয়ে আছে। গ্রামটায় আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া লাগতে তখনো একশ বছর বাকি। বাকি দুনিয়ার সাথে রাস্তাঘাটের সম্পর্ক নেই। কাছের রাস্তা হতে হেঁটে যেতে হয় প্রায় দশ মাইল। এমন একটা গ্রামে পাকি বাহিনীর আগমনের আশংকা ছিল খুবই কম। জুন মাসের মাঝামাঝি সময় তার উদয়। হাতে সেমি অটোমেটিক রাইফেল। পায়ে জলপাই রংয়ের কেডস। গ্রামের বেকার যুবক সাইদুল হোসেন সাদু এখন মুক্তিযোদ্ধা। কবে এবং কোথায় ট্রেনিং নিয়েছে তার কোন সদুত্তর তার কাছে ছিলনা। অবশ্য এ নিয়ে প্রশ্ন করার মতও কেউ ছিলনা। যুদ্ধের শুরুতে গ্রামের মুরুব্বিদের প্রায় সবাই ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক। এ নিয়ে মসজিদে মসজিদে দোয়াও করানো হত। বিশেষ করে জুমা নামাজের পর। এ ধরণের সমর্থনের কিছু ঐতিহাসিক কারণও ছিল। অবিভক্ত ভারতে এ এলাকায় হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিল মুসলিম প্রজারা। জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে হেটে গেলে জুতা হাতে নেয়া ছিল বাধ্যতামূলক। তা করতে ব্যর্থ হলে নেমে আসতো নির্মম অত্যাচার। কৃষি ও তাঁত ব্যবসার সাথে জড়িত জনগণকে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করা হত। মুসলমানদের শিক্ষা নিয়ে জমিদার তথা স্থানীয় হিন্দু বাসিন্দাদের মাঝে ঠাট্টা তামাশার অন্ত ছিলনা। অপমান হতে মুক্তি পেতে স্থানীয় অনেকেই সক্রিয় অংশ নেয় পাকিস্তান আন্দোলনে। তবে বর্ষার শুরুতে গঞ্জের বাজারে পাকিস্তানিদের গানবোটের আগমন বদলে দেয় অবস্থা। গ্রামের জনগণ শক্ত অবস্থান নেয় পাকিদের ঘৃণ্য তৎপরতার বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সাদুর সাথে যোগ দেয় আরও কজন। সবার হাতে অস্ত্র। সকাল বিকাল গ্রামের এ মাথা হতে ও মাথা মার্চ করে বেড়ায়। তবে রাত হলেই বদলে যায় তাদের চেহারা। গৃহস্থের দুয়ারে হানা দেয়। হাঁস, মুরগী, ছাগল সহ যা পায় তা ধরে নিয়ে আসে। প্রতি রাতে চলে তাদের বনভোজন। কদিন না যেতে তাদের চাহিদার আঙ্গিনা পা রাখে গ্রামের সোমত্ত মেয়েদের দিকে। পাকিস্তান সমর্থক হওয়ার কারণে মা-বাবাকে হত্যা করার ভয় দেখিয়ে তাদের ভোগের পণ্য বানানো শুরু করে। যেদিন গঞ্জের বাজারে পাকিস্তানীরা হানা দেয় সেদিন সাদু ও তার দলবলকে একশ মাইলের কাছাকাছি কোথাও দেখা যায়নি।

যুদ্ধ শেষে সাদু ও তার বাহিনী জমিদার বাড়ি দখল সহ শত শত বিঘা ধানী জমি দখল করে কায়েম করেছিল অনাচার ও অবিচারের রাজত্ব। সাদু আজ বেচে নেই, কিন্তু তার কাজের ধারাবাহিকতায় আজও এলাকা চষে বেড়াচ্ছে একদল হায়েনা। ওরা খুন করছে, মা-বোনদের ঘর হতে উঠিয়ে নিচ্ছে, জমি দখল নিচ্ছে এবং গর্বভরে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক হিসাবে।

সব রাজাকারই যেমন খুনি রাজাকার ছিলনা তেমনি সব মুক্তিযোদ্ধাই স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেনি। সবাইকে এক কাতারের ফেলে দেশকে বিভক্ত করে মুক্তিযুদ্ধকে বানানো হয়েছে গঞ্জিকা সেবনের উপকরণ। মৃত পিয়াস করিম উপাখ্যানও এ অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ডেভিড বার্গম্যান, আদালত অবমাননা এবং তিরিশ লাখ

লরেন্স লিফশুলজ

একজন মানুষ ও একটি বিচারের ইতিহাস: ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে মামলা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও তার সহকর্মীরা আগামী ১৩ অক্টোবর একটি একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক বিতর্কের উপর সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছেন। ইতিহাসের এই প্রশ্নটি কেন এবং কিভাবে আদালত অবমাননার ধারায় বিচারের আওতায় আসলো সেটি এক দুর্ভাগ্যজনক কাহিনী।

 

আইসিটি-২ এর বিচারকরা আইনের সাথে লতায়-পাতায় জড়িত এমন একটি বিষয়ে ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছেন অবস্থাদৃষ্টে যেটি হয়তো তারা নিজেরাও প্রশংসাযোগ্য কাজ বলে মনে করেন না।     মামলারটির বিবাদী দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশে বসবাসকারী বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। একটি বিশেষ মামলায় ট্রাইবুনালের দেয়া ঐতিহাসিক রেফারেন্স নিয়ে বার্গম্যানের অনুসন্ধানী কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে।

 

মামলাটি অবশ্য ট্রাইবুনাল স্বতপ্রনোদিতভাবে করেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ট্রাইবুনালের দেয়া রেফারেন্সকে অসম্মান করা হয়েছে উল্লেখ করে আবুল কালাম আজাদ নামে হাইকোর্টের একজন আইনজীবী তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পিটিশন আকারে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন।    আজাদ সাহেবের পিটিশন শুনানী শেষে ট্রাইবুনাল ডেভিড বার্গম্যানকে ‘কেন আদালত অবমাননাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হবে না?’ মর্মে কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করেন।

 

কিছু মানুষ আছে যারা ব্যক্তি বা গোষ্টি স্বার্থের প্রয়োজনে জাতীয়তাবাদকে কলঙ্কিত করতে দ্বিধা করে না; এই মামলার বাদী আবুল কালাম আজাদ তেমনই একজন লোক। অবশ্য স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ একটি শাখের করাতের মত বিষয় হবার কারণে এটিকে সহজেই খারাপ কাজেও ব্যবহার করা যায়।    ঔপনিবেশিক শাসন বা বিদেশী আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাবার জন্য সংগ্রামরত একটি নিপীড়িত জাতির জন্য জাতীয়তাবাদ অবশ্যই শক্তিশালী এবং প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু ভিন্ন পরিস্থিতিতে এটা কখনো কখনো ধর্মান্ধতা ও সংকীর্ণ মতাদর্শগত অন্ধবিশ্বাসের জন্ম দেবার মত উর্বর ক্ষেত্রও হতে পারে।

 

উদাহরণ হিসেবে ১৯৯০ দশকের শুরুতে বসনিয়ায় সার্ব জাতীয়তাবাদীদের গণহত্যার কথা বলা যেতে পারে। বসনিয়ার মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সে সময় সার্বরা যে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান চালিয়েছিলো তা সেখানকার বসনিয় মুসলিম এবং ক্রোয়াট ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের সাথে তাদের হাজার বছর ধরে টিকে থাকা শান্তিপূর্ণ আন্ত:সম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ছিলো।  কারাদজিক, ম্লাদিক, মিলোসেভিচরা ছিলো জাতীয়তাবাদ নামের শাখের করাতের উল্টো ধারের অংশ। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার সেব্রেনিৎসায় ৮হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যার অভিযোগে এখন হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কারাদজিক ও ম্লাদিকসহ বসনীয় সার্ব নেতাদের বিচার চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ছিলো ইউরোপের মাটিতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় একক গণহত্যাযজ্ঞ।

 

স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদের এক অনন্য উদাহরণ। পাকিস্তানের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ন ও অহিংস আন্দোলন করে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে অনুন্নত আঞ্চলিক বৈষম্যের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবার জন্য এই সংগ্রাম আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সাহসী উদাহরণ।  কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক একনায়কতন্ত্র সেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে না নিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার পথ বেছে নেয়। ফলে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মুক্তিযুদ্ধ।

 

এই ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কী সম্পর্ক? দেখা যাচ্ছে সম্পর্ক ও তাৎপর্য রয়েছে বিপুল পরিমানেই।

 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত যুদ্ধাপরাধের বিচার যেভাবে এগিয়েছে তাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্প্রদায় ‘ক্রান্তিকালীন বিচারব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘঠিত হবার কয়েক মাসের মধ্যেই একটি সমাজে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এমনটা বোঝানোর জন্য ‘ক্রান্তিকালীন বিচারব্যবস্থা’ একটি কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক শব্দ। কারণ এর দ্বারা এটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে যারা সেই সময় ভয়ানক অপরাধগুলো করেছিলো তদেরকে বিচারের আওতায় আনার জন্য কার্যকর চেষ্টা করা হয়েছিলো।

 

কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান সেই প্রচেষ্টাকে বাঁধাগ্রস্থ করে। শেখ মুজিব হত্যার পরের সরকার এবং জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত সহযোগীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিরাপদে থেকেছে। কেউ কেউ সরকারী উচ্চ পদেও আসীন হয়েছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলেও এটা কোন দৈব ঘটনা ছিলো না। দেশের এই অবস্থাটি তৈরীর জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়েছিলো।

 

১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রায় ৪০ বছর যাবৎ নিরবিচ্ছিন্যভাবে কাজ করতে হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। নি:সন্দেহে এটা একটা মহান তাত্পর্যপূর্ন পদক্ষেপ।

 

ট্রাইব্যুনালের যে সকল বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরী হয়েছে সেসব বিশদ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের উপযুক্ত স্থান বা সময় নয় এটা নয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের লজ্জাজনক সহযোগিতায় কিভাবে পাকিস্তান জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি ট্রাবুনাল গঠনে বাঁধার সৃষ্টি করেছিলো সেসব বিশ্লেষণের সময়ও এটা নয়। সেগুলো নিয়ে আমি পরে কখনো লিখবো।

 

এখন যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন, সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ডেভিড বার্গম্যানকে আদালত অবমাননার দায়ে বিচার করছে। সেই ডেভিড বার্গম্যান, যে কিনা অসাধারণ রিপোর্টিং এর মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন কিভাবে ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীরা দায়মুক্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে বসবাস করছে। ১৯৯৫ সালে ইংল্যান্ডের চ্যানেল ফোর এ প্রচারিত যে ‘দি ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ নামের গবেষণামূলক তথ্যচিত্রটি ৭১ এর যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি আবারো আলোচনায় এনেছিলো ডেভিড বার্গম্যান ছিলেন তার গবেষণা ও প্রযোজনা টিমের মূল সদস্য।  এই তথ্যচিত্রটির মাধ্যমে দেখানো হয়েছিলো কিভাবে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় সদস্যরা ১৯৭১ সালে একাধিক গনহত্যা করার পরও কোনরূপ গ্রেফতারের ভয়-ভীতি ছাড়াই বৃটেনে বসবাস করছিলো। তথ্যচিত্রটিতে তুলে আনা প্রমাণগুলো ছিলো মর্মস্পর্শী।

 

বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগটি ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের সময় দেয়া আদেশের একটি বাক্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। ঐ আদেশে বলা হয়েছিলো যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লক্ষ লোক নিহত হয়েছে।

 

বার্গম্যান তাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা গুলো সম্পর্ক বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এবং সেগুলোর উপর নানা মন্তব্য করেছেন।

 

আদালতের কার্যক্রম, যুদ্ধপরাধের ব্যপকত্ব এবং যুদ্ধের বর্তমানকালীন তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা ও মতামত দেয়ার প্রসংগেই, ১৯৭১ সালে সত্যিকার অর্থেই কতজন মানুষ নিহত হয়েছিলেন সেই বিতর্কিত বিষয়টি তুলে আনেন বার্গম্যান। এটি অবশ্যই একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়। তবে এই বিষয়টি কোনভাবেই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ কোন অংশ নয়। সাঈদীর বিরুদ্ধে দাখিলকৃত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।

 

এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণে যেতে চাইলে আমি হয়তো একদম ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট নির্বাচন করতাম, তবে ডেভিড বার্গম্যান সাঈদীর মামলার রায়ের পর্যালোচনার মধ্যে থেকেই বিষয়টিকে সামনে এনেছেন। ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর বার্গম্যান যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ঐতিহাসিক বিতর্কটি নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করেন। লেখায় তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর জাত চিনিয়েছেন। বার্গম্যানের দক্ষতায় তাঁর লেখায় এই পুরো বিতর্কের প্রায় সকল অংশ সম্পূর্ণরূপে ফুঁটে উঠেছে। লেখাটি নিশ্চিতভাবেই অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ এবং চিন্তার খোরাক যোগায়।

 

আবুল কালাম আজাদ, যিনি বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছেন, তাঁর মতে ত্রিশলক্ষ শহীদের এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন এখতিয়ার কারও নেই। জনাব আজাদের সংকীর্ণ ‘জাতীয়তাবাদ’ এর মাপকাঠিতে যিনি এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন তিনি অবশ্যই ‘জাতির শত্রু’, ‘দেশের শত্রু’ এবং ‘ট্রাইব্যুনালের শত্রু’।

 

এখানে আমরা অতি দুরূহ একটা বিষয়ের অবতারণা করছি। একটি ঐতিহাসিক বিতর্কের কোন অংশের ‘ঐতিহাসিক শুদ্ধতা’ নিরূপণ কি ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

 

এই বিষয়ে আরেকটু বলতে হয়। ১৯৭৪ সালে আমি ছিলাম ফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ-এর বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিবেদক। বাংলাদেশে আমার সাংবাদিকতা জীবনে আমি একজন ইন্টারেস্টিং মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিলাম।

 

যেহেতু তিনি আমার প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের খবরের উৎস হিসেবে কাজ করেছিলেন তাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি তাঁর নাম উল্লেখ করতে পারছি না। আমি জানি না তাঁর সাথে কিভাবে যোগাযোগ করা যায় কিংবা তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা।

 

আমার প্রতিবেদনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সংবাদের উৎস হিসেবে কাজ করা ছাড়াও এই লোকটি আমাকে তাঁর কাজ সম্পর্কে আরও চমৎকার সব তথ্য দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে ফিরে যাই। তিনি তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি গবেষকদলের সাথে কাজ করছিলেন যাদের উপর দায়িত্ব ছিল মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে পুরো দেশে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের ফলে যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির একটি খতিয়ান দাঁড় করানো।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানের অন্যতম প্রচেষ্টা ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের হাতে ঠিক কতজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁরা আরও জানার চেষ্টা করছিলেন কতজন মানুষ শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পথে কিংবা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানোর পর মারা গিয়েছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিল শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠ।

 

মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের দ্বারা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করেই অনুসন্ধান কাজ চালানো হয়েছিলো যেখানে গ্রামে গ্রামে গিয়ে পরিবারগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হতো যুদ্ধকালে সেই গ্রামগুলোতে ঠিক কতজন মানুষ, কিভাবে মারা গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তারা পুরো দেশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দাঁড় করাচ্ছিলেন। আমার সাথে তার পরিচয়ের সময় পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেলায় তাঁদের জরিপ কাজ সমাপ্ত করেছিলো।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আমার সেই তথ্যদাতা আমাকে জানিয়েছিলেন, তাঁদের হিসাব অনুসারে যুদ্ধকালে নিহত মানুষের মোট সংখ্যা ২,৫০,০০০। আমার যতদূর মনে পড়ে এই সংখ্যা শরণার্থী শিবির কিংবা উন্মত্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর থেকে  পালানোর সময় মৃত্যুবারণকারীদের বাদ দিয়েই হিসাব করা হয়েছিলো।

 

সশস্ত্র যুদ্ধে আড়াই লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু অবশ্যই একটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক ঘটনা। যাই হোক, আমার সেই তথ্যদাতা আমাকে জানান যে এই অনুসন্ধানকাজ আকস্মিকভাবে বন্ধ ঘোষনা করা হয়। কারণ হিসেবে জানা যায় যে এই জরিপের ফলাফল নিশ্চিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধে এবং শরণার্থী শিবিরে মৃত্যুবরণকারীদের সঠিক সংখ্যা তুলে আনতো যা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশলক্ষ মানুষের মারা যাওয়ার প্রচলিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

এর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা ত্যাগ করে নয়াদিল্লীতে ফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ-এর দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধির পদে যোগদান করায় আমি এই সংখ্যা কোনদিন প্রকাশ করতে পারিনি। সব সময় আমার একটি ইচ্ছা ছিল এই বিষয়ে কিছু লেখার কিন্তু ভারতে জরুরী অবস্থা জারি এবং আরও কিছু ঘটনা এই বিষয়টিকে সেই অল্প কয়েকটি প্রতিবেদনের একটিতে পরিণত করে যেগুলো নিয়ে আমি লিখতে চাইলেও আর লিখতে পারিনি।

 

ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আনীত আদালত অবমাননার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমার উল্লিখিত এই ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। কারণ ১৯৭৪ সালে সরকারের পরিচালিত অনুসন্ধানই ত্রিশলক্ষ শহীদের এই সংখ্যার যথার্থতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই সংখ্যাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অপরাধে একজন সাংবাদিকের বিচার করছে।

 

নিশ্চিতভাবেই এই সংখ্যা নিয়ে একটা মারাত্মক বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। যদি বিচারপতি হাসান এবং তাঁর সঙ্গীরা বার্গম্যানকে দোষী সাব্যস্ত করেন, তাহলে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা ডঃ এম এ হাসানসহ অন্যান্য গবেষক এমন কী আমাকেও আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে, কারণ মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ হয়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর একটাই, যার উত্তর এখন ট্রাইব্যুনালকেই দিতে হবে।

 

গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একটি যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রকৃত ভূমিকা অবশ্যই এমন হবার কথা নয়। সম্ভবত, এমন রুলিং এর তুলনা কেবলমাত্র উনিশ’শ ত্রিশের দশকের স্ট্যালিনীয় কোর্টগুলোর সাথেই করা যায় যেখানে বুখারিনের মত মানুষও অত্যাচারিত হয়ে আদর্শিক ত্রুটি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিলেন। আবুল কালাম আজাদের মত মানুষদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঐতিহাসিক ‘সত্যের’ রক্ষকের ভূমিকাও পালন করতে হবে, তা সেই সত্য যত বিতর্কিতই হোক না কেন।

 

ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক দায়িত্ব হচ্ছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে সকল ফ্যানাটিক সমর্থকেরা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং নৃশংস যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা; যে দায়মুক্তির চাদরে তাঁরা দিনের পর দিন বাংলাদেশ ও পৃথিবীর যাবতীয় আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বেঁচে আছেন তার অবসান ঘটানো। ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সহস্রাধিক ভুক্তভোগীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর এক বিশাল দায়িত্ব আজ ট্রাইব্যুনালগুলোর উপর অর্পণ করা হয়েছে।

 

আমার দৃষ্টিতে কেউই জানেন না কোনটি সত্য, কিংবা কারও কাছেই প্রকৃত সংখ্যাটি কত তার কোন কোন খতিয়ান নেই। আমার মতে, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১৯৭৪ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক চালানো জরিপটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত পাওয়া ২,৫০,০০০ সংখ্যার চেয়ে নিশ্চিতভাবেই বেশি।

 

২০১১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত বিভাগের পক্ষ থেকে আমাকে আমার বসনিয়ার অভিজ্ঞতা জানানোর জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

 

আমি রাবিয়া আলীর সাথে একটি বই লেখা এবং সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলাম যার নাম ছিল “Why Bosnia? Writings on the Balkan War”। আমি বসনিয়ার পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি আর সারায়েভোসহ অন্যান্য শহরের এমন বহু উদ্যান কিংবা খেলার মাঠের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছি যেগুলো মানুষের কবরে ছেয়ে গিয়েছিলো, যেখানে বেসামরিক মানুষদেরকে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের মধ্যে তড়িঘড়ি করে কবর দেয়া হয়েছিলো।

 

বইটির লেখকদের মধ্যে আমার বেশ কিছু বন্ধুও ছিল যারা বসনিয়ার গণহত্যার বিচারে গঠিত যুদ্ধাপরাধ আদালতের সাথে কাজ করেছিলেন। বসনিয়ায় যুদ্ধ শেষে প্রতিটি গণকবর চিহ্নিত করে পুনরায় খনন করা হয়েছিলো।

 

যাদের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিলো তাঁদের প্রত্যেকের ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়েছিলো। তারপর তাঁদের সেই দেহাবশেষ যথাযোগ্য সম্মানের সাথে ততদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছিলো যতদিন পর্যন্ত না তাঁদের পরিবারের কোন জীবিত সদস্য সেই মৃতদেহ শনাক্ত করে পূনরায় দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এমনটা সেব্রেনিৎসাসহ পুরো বসনিয়াতেই করা হয়েছিলো।

 

প্রশিক্ষিত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে এমন বিরাট একটি কাজ করা অনেক ব্যয়বহুল হলেও জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বসনিয়া সরকার সেই খরচ বহন করেছিলো। পুরো কাজটা সম্পন্য করতে কয়েক বছর লাগলেও এটি ছিলো গণহত্যা পরবর্তী সময়ে একটি সমাজের নৈতিক দায়বদ্ধতা। এভাবে বসনিয়রা ঐ যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা কত হতে পারে সেই সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছিলো। কিন্তু কেউই জানে না প্রকৃত সংখ্যাটা ঠিক কত। কারণ এইসব ক্ষেত্রে প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ অসম্ভব।

 

২০১১ সালে আমি যখন আমি বাংলাদেশে ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত বিভাগের মুখোমুখি হই তখন আমাকে জানানো হয়েছিলো যে, পুরো দেশে দুই শতাধিক গণকবরের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন এবং তখনও খুঁজছেন।

 

ডেভিড বার্গম্যান এই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার লেখায় ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফইন্ডিং কমিটি’র আহবায়ক ড. এম এ হাসানকে উদ্ধৃত করেছেন। উল্লেখ্য যে, এরশাদ সরকারের পতনের পর ড. এম এ হাসান একটি গবেষক দল গঠন করে তাদের নিয়ে শহীদের সঠিক সংখ্যা ও তথ্য নির্নয় করতে পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন, গ্রামে গ্রামে গিয়েছেন।

 

ড. হাসান বার্গম্যানকে বলেছেন যে, তার ধারণামতে ৩০ লক্ষ একটি অতিরঞ্জিত সংখ্যা এবং সঠিক সংখ্যাটি সম্ভবত ১২ লক্ষের কাছাকাছি হবে। তিনি বার্গ্যানকে বলেছেন, “আমরা ৯৪৮টি বধ্যভূমি বা গণকবরের সন্ধান পেয়েছি। আমাদের গবেষণা অনুসারে প্রতি একটি গণকবরের বিপরীতে আরও চারটি গণকবর রয়েছে যার উপর পরবর্তীকালে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে কিংবা যার হদিস পাওয়া যায় না।এই হিসেবে মোট গণকবরের সংখ্যা ৫০০০ বলে ধরে নেয়া যায়”।

 

ডঃ হাসান অনুমান করেন যদি প্রতিটি কবরে ১০০টি করে লাশ থাকে তবে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫,০০,০০০ যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই ১৯৭৪ সালের অনুসন্ধানের ফলাফলেরও দ্বিগুণ। অবশ্য, ডঃ হাসানের এই অনুমান মোট মৃতের সংখ্যার ৩০ শতাংশের মত, কারণ তিনি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার থেকে অনুমান করেছেন যে মোট নিহতের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষকে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিলো আর বাকীদের দেহ নদী-নালায় বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেয়ায় তা পচে গলে নষ্ট হয়ে গেছে।

 

এভাবে ডঃ হাসান, যিনি সম্ভবত এই বিষয়ে দীর্ঘসময় গবেষণাকারী একমাত্র বাংলাদেশী, অনুমান করেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ১২ লক্ষের মত হবে। অবশ্য, এই সংখ্যায় তাঁদের যোগ করা হয়নি যারা শরণার্থী শিবিরে কিংবা শিবিরে যাওয়ার পথেই মৃতুবরণ করেছিলেন।

 

সত্যি কথা বলতে কেউই জানেন না সঠিক সংখ্যাটা ঠিক কত হতে পারে, এমনকি অনুমানও করতে পারেন না। ডঃ হাসানের অনুমানই সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছে। অবশ্য সংখ্যাটি যতই হোক না কেন নিশ্চিতভাবেই তা বেশ বড়। এই সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে সহস্রাধিক পরিবারের দুঃখ ও বেদনা যারা তাঁদের আপনজনকে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন।

 

এই জটিল, দুরূহ আর আবেগময় অবস্থায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-২) এমন একটি বিষয়ে রুলিং দিতে যাচ্ছেন যেখানে তাঁদের নিজেদের কাছেই কোন সঠিক উত্তর নেই।

 

আমাদের চিন্তাধারা কেমন হবে তা বলে দেয়ার জন্যে কোন আবুল কালাম আজাদ কিংবা কোন আদালতের প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে, তিনি নিজেই চারদশক ধরে চলে আসা এই বিতর্কে কোন অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশপ্রেমের ছদ্মবেশে মূর্খতা কি কাউকে জ্ঞানের পথে চালিত করতে পারে?

 

এখন কেউ শুধু এতটুকুই আশা করতে পারেন যে ট্রাইব্যুনাল যথেষ্ট বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে যে এটি কোনভাবেই তাঁদের বিচার কার্যের আওতায় পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র আর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার এক লড়াই। মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূর্খতা, ঔদ্ধত্য আর সামরিক শাসকদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক গণযুদ্ধ।

 

অতীতের মত এখনও বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই এখন বোধোদয় জরুরী হয়ে পড়েছে।

 

আমার মতে, একটি বিজ্ঞ আদালত, অবশ্যই চিন্তা করবেন ফ্র্যাসোঁয়া-ম্যারি অ্যারোয়ে, যাকে আমরা ভলতেয়ার নামে চিনি, তিনি ভিন্নমত নিয়ে কি বলে গিয়েছিলেন। ভলতেয়ার ছিলেন ফরাসী বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ অষ্টদশ শতাব্দীর একজন দার্শনিক এবং লেখক। তিনি বলে গিয়েছেন, “তুমি যা বল তাঁর সাথে আমার দ্বিমত থাকতে পারে, তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি তোমার সেই কথাটি বলার অধিকার রক্ষায় লড়াই করে যাবো”।

 

* * *

 

২০১১ সালের ২৩ মে, বিবিসির বাংলা বিভাগের উপ-প্রধান সিরাজুর রহমান ব্রিটিশ পত্রিকা দ্যা গার্ডিয়ানে একটি চিঠি পাঠান। তিনি ইয়ান জ্যাকের লেখা একটি প্রবন্ধ যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিলো, তার উপর নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। জনাব রহমান একটি ইতিহাস তুলে ধরেন সেখানে। তিনি লেখেন,

“১৯৭২ সালের জানুয়ারীর ৮ তারিখে, আমিই ছিলাম প্রথম বাংলাদেশী যিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করি। তাঁকে হিথ্রো থেকে লন্ডনের ক্ল্যারিজেসে আনা হয়… এবং আমি প্রায় সাথে সাথে সেখানে পৌঁছাই… তিনি যখন আমার কাছ থেকে জানতে পারেন যে তার অবর্তমানেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছে, তখন তিনি বিষ্মিত হন। দৃশ্যত তিনি লন্ডনে এসেছিলেন এই ধারণা নিয়ে যে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানিদের যেই স্বায়ত্বশাসনের জন্যে লড়াই করছিলেন পাকিস্তানিরা তা মেনে নিয়েছে।”

 

“সেইদিন আমি এবং অন্যরা তাঁকে যুদ্ধের একটি বিবরণ দেই। আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম যে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কোন সঠিক হিসাব জানা যায়নি, তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে আমাদের অনুমান, কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছেন। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম যখন তিনি ডেভিড ফ্রস্টকে বললেন ত্রিশ লক্ষ মানুষকে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছে। আমি জানি না কি কারণে তিনি এই সংখ্যাটি বলেছিলেন, হয়তো তিনি মিলিয়ন শব্দটির ভুল অনুবাদ করেছিলেন কিংবা তাঁর অস্থিরচিত্ত এর জন্যে দায়ী হয়ে থাকতে পারে। তবে আজও অনেক বাংলাদেশী বিশ্বাস করেন সংখ্যাটি আসলেই অতিরঞ্জিত।”

 

শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক ভালো গুণ ছিল। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে ভারত থেকে ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধীনে ফেলোশিপ শেষ করার পর ঢাকা সফরকালে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। আমরা দুইঘন্টা ধরে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে বসে কথা বলেছিলাম। তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ আমার আবারও হয়েছিল যখন আমি বাংলাদেশে কর্মসূত্রে ফিরে আসি। ১৯৭৫ সালের পর থেকে আমি বহুবছর তাঁর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে কাজ করে গেছি।

 

জীবনে কোন ভুল করেননি এমন কোন মানুষকে আমি খুঁজে পাইনি। তেমনি শেখ মুজিবও ভুল করেছিলেন। আমি বিশ্বাস করি তিনি ফ্রস্টের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভুল বকেছিলেন। বহু আগেই বিষয়টির সুরাহা হওয়া উচিৎ ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই সংখ্যাটি কিছু অন্ধবিশ্বাসী মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

 

প্রকৃতপক্ষে ডঃ হাসানের গবেষণার আলোকে দেখলে সিরাজুর রহমানের অনুমান সঠিক হয়, কিন্তু সিরাজুর রহমান বুদ্ধিমত্তার সাথে আরও বলেছিলেন যে এখনও “কোন সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি”। আগামী বছরগুলোতে আরও গবেষণা এবং বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়েই জানা যাবে স্বাধীনতার জন্যে বাংলাদেশীদের আত্মত্যাগের মাত্রার বিশালতা।

 

এই লেখাটি আমি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থার ওয়েব সাইটে প্রকাশ করছি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী এটি প্রকাশের অধিকার আমার আছে।

 

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এটি আমি বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যম থেকে প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ কয়েকমাস আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা বিষয়টিকে ‘বিচারাধীন’ হিসেবে তাদের কর্তৃত্বাধীন বলে ঘোষনা করেছেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে সকল ধরণের আলাপ আলোচনা নিষিদ্ধ করেছেন। হয়তো এই কারণে আমার বাংলাদেশী সহকর্মীরা এটিকে তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করতে পারবেন না।

 

যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি যে, এখানে প্রাসঙ্গিক তথ্য আছে এবং এগুলো গণমাধ্যমে প্রচার করে জনগণ ও আদালতকে তা জানার সুযোগ করে দেয়া উচিত। ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কর্তৃক সমীক্ষার বিষয়টি প্রথমবারের মত এখানে প্রকাশ করা হলো। আমার উদ্দেশ্য কোর্টের আদেশের প্রতি স্পর্ধা দেখানো নয়, বরং বিষয়টি জানানো।

 

৯ অক্টোবর, ২০১৪

স্টোনি ক্রিক, সিটি, ইউএসএ।

ইমেইল: OpenDoor.Lifschultz@gmail.com

Translated from Original English by Nuraldeen