সেনাপতি মেক্সিমাস ও “ঢাকা ইজ দ্য লাইট”

 

ইনতেখাব আলম চৌধুরী
জাতীয় পত্রিকা বলে একটা ধারণা আমাদের মধ্যে চালু আছে। বস্তুত যেসব পত্রিকা ঢাকা থেকে সারা দেশে যায় সেগুলোকেই জাতীয় পত্রিকা ধরা হয়। পত্রিকাগুলোর ফিচার মোটামুটি একইরকম। সাথে থাকবে কিছু সাপ্তাহিক অংশ, যেগুলোর কাজ ফ্যাশন, পড়ালেখা, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষকে নিত্যদিনের জ্ঞান দেয়া। তবে জাতীয় পত্রিকা বলা হলেও এখানে পুরো জাতির খবর খুব একটা আসে না। যা আসে তা হল ঢাকার খবর। সারাদেশের মানুষ ঢাকায় কী হল না হল সেখবর গিলতে থাকে আর নিজেদের এলাকার অবস্থার কথা ভুলতে থাকে। অন্যান্য অঞ্চলেও পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সেগুলো মানুষ পড়েও। কিন্তু জাতীয় পত্রিকাগুলোর দৌরাত্মের দিনে আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোর খবর মানুষের মধ্যে তোলপাড় তুললেও তা দিন শেষে ভাটার দিকেই যায়। 

হালের টিভি চ্যানেলগুলোর অবস্থাও তাই। তবে সেক্ষেত্রে কোনো “জাতীয়” টাইপ ধারণা গড়ে উঠে নাই। তাই দেশীয় চ্যানেলের সংখ্যা প্রচুর হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জাতীয় চ্যানেলের নাম শোনা যায় না। তবে সুবিধার জন্য সেগুলোকে জাতীয় চ্যানেল হিসেবে ধরলাম। আরেকটি বিষয় হল এখন পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক চ্যানেলও গড়ে উঠে নাই। চট্টগ্রামে আগে সন্ধ্যার দিকে ঘন্টাখানেক সময় বিটিভির চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রোগ্রাম প্রচার করা হত, এখন চালু আছে কিনা জানি না। তবে সেটাকে চ্যানেলের পর্যায়ে ধরা যায় না। 

যাই হোক, তারা ঢাকার খবরগুলোকেই প্রচার করে সেটাই আসল কথা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের খবর নিয়ে তাদের বিশেষ পাতা থাকলেও সেগুলোতে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের খবর আটানো দুঃসাধ্য কর্ম। ফলশ্রুতিতে যা হয় তাহল দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের চিন্তাভাবনাও ঐ একটা শহর কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। নিজেদের সমস্যা যতই বড় হোক না কেন ঐ শহরের কাছে তা পাত্তা পায় না। তাই উত্তরবঙ্গের মঙ্গার খবর কয়েকদিন যাবত হেডলাইন হয় না, দক্ষিণাঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের খবর প্রতি বছর পাওয়া গেলেও সেটা জাতীয় সমস্যা না। ফলে এগুলোর স্থায়ী সমাধান নিয়ে চিন্তার দরকার নাই – এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। তার চেয়ে বরং পুরো ঢাকাকে কিভাবে ফ্লাইওভার দিয়ে মুড়ে ফেলা যায়, ঢাকার পার্লামেন্টের ক্ষমতা কিভাবে কে দখলে রাখতে পারে – সে চিন্তাই বেশি দরকারি। 

এর একটা দীর্ঘমেয়াদি খারাপ ফল আছে। Gladiator মুভিটিতে রোমান সম্রাট মার্কা‌স অরেলিয়াস ও তার সেনাপতি মেক্সিমাসের মধ্যে সংলাপের একটি দৃশ্য ছিল। সম্রাট সেনাপতি মেক্সিমাসকে জিজ্ঞাসা করে, “What is Rome?” মেক্সিমাসের উত্তর ছিল, “I’ve seen much of the rest of the world. It is brutal and cruel and dark. Rome is the light.” এরপর সম্রাটের বক্তব্য হল এরূপ, “Yet you have never been there. You have not seen what it has become.” মানে কী? সেনাপতি মেক্সিমাস তখন পর্যন্ত রোম শহরে যায়নি। এরপরও রোম তার কাছে লাইট এবং এই লাইটের রক্ষার জন্য সেনাপতি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছিল এবং আমৃত্যু সম্রাটের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। তৎকালীন সময়ে এমনভাবে শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে রোমের দাসত্ববরণ করতে হত। উল্লেখ করা দীর্ঘমেয়াদি খারাপ ফলটা তাই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এমন অনেক মানুষ আছে যারা ঢাকার বাসিন্দা না হলেও জীবনের একটা অংশ ঢাকায় কাটিয়েছে আর তাতেই তাদের মধ্যে একটা এলিট শ্রেণীর মানসিকতা তৈরী হয় যার ফলে দেশের অন্যান্য অংশে গেলে সেটার প্রতি তুচ্ছভাব পোষণ করতে সেকেন্ড দেরী হয় না। যদিও তাদের আদি বাসস্থানও ঐ একইরূপ। এবং এধরনের মানুষের বর্ধমান হার দিয়ে ভবিষ্যত সুন্দর হওয়া অসম্ভব। তারা খালি ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা করবে কিন্তু বাকি দেশ থেকে যাবে “brutal and cruel and dark”।

এই মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ আমরা, আমাদের সমাজের সিস্টেম নিত্যদিন তৈরী করে চলেছি। তাই ভালো থাকার জন্য ঢাকায় মানুষের স্রোত বাড়তেই থাকে, সেই মানুষগুলোকে ভালো রাখতে গেলে যেসব অবকাঠামো তৈরী করা দরকার তা বলতে গেলে শুধু ঢাকাতেই তৈরী হয়, ঢাকা হয়ে পড়ে বুদ্ধিজীবীদের ভাষায় মানুষের “প্রাণের শহর”। ঢাকা রাজধানী হওয়ার চারশত বছর নিয়ে গবেষণা সেমিনার হয়, উৎসবের আয়োজন হয়। অথচ সমুদ্রতীরবর্তী চট্টগ্রামের হাজার বছর পুরনো বাণিজ্য নিয়ে টু শব্দ হবে না, উত্তরবঙ্গের সুপ্রাচীন বাংলার ইতিহাস অপাংতেয় হয়ে পড়বে, সিলেটের নিজস্ব নাগরী লিপি হারিয়ে গেলেও “শিক্ষিতজনদের” কারো মাথাব্যথা নেই, উল্টো সিলেট, চট্টগ্রাম এসব এলাকার ভাষাকে খেত প্রমাণে সবাই ব্যস্ত। এসবের মূল কারণ এগুলো কেন্দ্র করে তারা ব্যবসা করতে পারে না। তাই শেষকালে সেনাপতি মেক্সিমাসের মত সবার মনে বাজে, “Dhaka is the light”।
 
Written By:
– ইনতেখাব আলম চৌধুরী

 

 

গণজাগরণ মঞ্চের রাজনীতি, সংঘাত ও একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প!

5
রাষ্ট্রের বিচার বিবেচনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে এভাবেই লক্ষাধিক মানুষ প্রথমে গণজাগরণ মঞ্চে যোগ দিয়েছিলো।

রাষ্ট্রের বিচার বিবেচনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে এভাবেই লক্ষাধিক মানুষ প্রথমে গণজাগরণ মঞ্চে যোগ দিয়েছিলো।

যে সাধারণ মানুষের আবেগ ও স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহনে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়েছিলো সেই মানুষদের হয়ে রাজনীতি করার যোগ্যতা যে গণজাগরণ মঞ্চের নেই এবং তারা যে মানুষের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে না, সেটা আমি প্রায় ১১ মাস আগে বলেছিলাম যখন তারা রানা প্লাজায় ‘উদ্ধার অভিযান ফটো সেশন’ করতে এসেছিলো।

রাজনীতি তো মানুষের কথা বলবে। শেয়ার বাজারে পুঁজি হারানো মানুষের কথা বলবে, গার্মেন্টস শ্রমিকের অধিকারের কথা বলবে, পাঁচ বছর পর একদিনের রাজা ভোটারের ভোটের অধিকারের কথা বলবে, বলবে দেশের তেল-গ্যাস-বন্দর লুট হওয়ার কথা, রামপাল, টিপাইমুখ, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা, ধার্মিকের ধর্ম পালনের আর অধার্মিকের ধর্ম না পালন করার অধিকারের কথা।

গণজাগরণ মঞ্চ একটি বিশাল জন সমর্থন নিয়ে এই রাজনীতির কথাগুলো বলে দেশের রাজনীতিকে পাল্টে দিতে পারতো। কিন্তু তা না করে শাহবাগে প্রতিবাদী মানুষের জমায়েতকে এই মঞ্চ স্বৈরাচারী কায়দায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি মাত্র চেতনা নাৎসী দাবীতে আটকে রেখেছিলো দিনের পর দিন। দাবী একটাই, ‘ফাঁসি’! অন্য কোন দাবী মানেই ‘ছাগু’! বাংলা পরীক্ষা দিতে হবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস; অন্য কোন পরীক্ষার দিনক্ষণ জানতে চাওয়ার মানে হচ্ছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, রাজাকারের তালিকায় নাম লেখানো!

নিজেদের চেতনা নাৎসী আদর্শের কারণে মাত্র এক বছরের মধ্যেই গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল এমন শীর্ণ হয়ে গিয়েছে।

নিজেদের চেতনা নাৎসী আদর্শের কারণে মাত্র এক বছরের মধ্যেই গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল এমন শীর্ণ হয়ে গিয়েছে।

এই মঞ্চের আড়ালে টিকফা চুক্তিতে লুট হয়ে গেছে আমাদের ভোক্তা অধিকার, রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চুক্তির মাধ্যমে চুড়ান্ত করা হয়েছে সুন্দরবন ধ্বংশের নীল নকশা। এমন কী তাজরীন আর রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায় বিচারের আর্তনাদকেও টুটি চেপে স্তব্ধ করে রেখেছিলো এই চেতনা নাৎসী মঞ্চ।

এখানেই শেষ নয়। এই গণজাগরণ মঞ্চ থেকেই বিরোধী মিডিয়া বন্ধ করে বিরোধী কন্ঠস্বরকে রূদ্ধ করার এবং বিনা বিচারে হত্যাকে সমর্থন করে একটি চেতনা নাৎসী জনমত তৈরী করে দেয়া হয়েছিলো। কাউকে ‘ছাগু’ প্রমান করতে পারলেই তাকে বিনা বিচারে হত্যা করা বৈধ, বৈধ তার কণ্ঠস্বর চেপে ধরে জেলে পাঠিয়ে দেয়া বা গুম করে দেয়া। এই চেতনা নাৎসী জনমতের কারণেই রাষ্ট্র বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রতিবাদী মিছিলে সরাসরি গুলি করে মানুষ হত্যার ম্যান্ডেট পেয়েছিলো এবং নির্বিচারে প্রতিবাদী মানুষকে হত্যা করা শুরু করেছিলো; যে ধারা এখনো বর্তমান। এই মঞ্চের ফ্যাসিবাদী দাবী রক্ষার্থেই সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ‘আমার দেশ’, ‘দিগন্ত টিভি’, ‘ইসলামী টিভি’সহ অনেক গণমাধ্যম এবং জেলে পাঠানো হয়েছে মাহামুদুর রহমানের মত সম্পাদক ও আদিলুর রহমান শুভ্রর মত মানবাধিকার কর্মীকে।

গত ৪ এপ্রিল ২০১৪, শুক্রবার গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশটির সাথে এভাবেই পুলিশের সংঘাত হয়!

গত ৪ এপ্রিল ২০১৪, শুক্রবার গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশটির সাথে এভাবেই পুলিশের সংঘাত হয়!

জনগণের দাবীকে টুটি চেপে ধরে যে গণজাগরণ মঞ্চ রাষ্ট্রের সমান্তরাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলো, চাইলেই যারা জাতীয় পতাকা উঠানো-নামানোর এবং শপথ করিয়ে মানুষকে হেদায়েত করতে পারতো, তা মাত্র এক বছরের মাথায় এখন আর নেই! এখন তাদেরকে সরকারী দলের অঙ্গ সংগঠনের কর্মী এবং একদা প্রহরী পুলিশের সংঘাতে জড়িয়ে হেনস্তা হতে হচ্ছে!

এই হেনস্তা হবার ঘটনায় বিভিন্ন জন বিভিন্ন অনুমান ও প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। যার মধ্যে একটি অনুমান হচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চ সরকারী দমন নিপীড়নের শিকার হয়ে মানুষের সহানুভূতি অর্জন করতে চাচ্ছে এবং ভারতের ‘আম আদমী পার্টি’র অনুরূপ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাচ্ছে।

গণজাগরণ মঞ্চকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভারত পন্থী মিডিয়াগুলোর যে একটি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা আছে, সেটা ৫ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে প্রকাশিক দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠা দেখলে বোঝা যায়। যে পত্রিকাটি পুলিশের নিয়মিত ট্রিগার হ্যাপী আচরণ বা ক্রস ফায়ারে সরকার বিরোধী রাজনীতিবিদদের হত্যাকাণ্ডের খবর ছাপে না, তারা সামান্য পুলিশি টানা হেঁচড়াকে তিন কলামে প্রায় সিকি পৃষ্ঠা জুড়ে কাভারেজ দিয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল ২০১৪, শনিবার দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় গণজাগরণ মঞ্চের সাথে পুলিশের সংঘাতকে এভাবেই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়!

গত ৫ এপ্রিল ২০১৪, শনিবার দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় গণজাগরণ মঞ্চের সাথে পুলিশের সংঘাতকে এভাবেই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়!

বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিলেও তারা ক্ষমতাসীন দলটির অজনপ্রিয়তায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে খুঁজছে, যারা ভারতের মিত্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পারবে। শুরু থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভারত তাই এখন আম আদমী পার্টির স্টাইলে এদেরকে রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।

লক্ষ্য করুন, গণজাগরণ মঞ্চ কিন্তু আজ পর্যন্ত টিপাইমুখ, রামপাল, সীমান্ত হত্যা, তিস্তাসহ বাংলাদেশের নদীগুলো থেকে ভারতের পানি প্রত্যাহার বিষয়ে টু শব্দটি করে নাই। আর ভারতের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থাকলে মঞ্চের অন্যতম সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসু কী ভাষায় ভারতের কাছে সাহায্য চেয়েছিলো তা মনে করার চেষ্টা করুন।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বরাবরই মানুষকে বোকা বানিয়ে সারপ্রাইজ দিতে পছন্দ করে। ৯১ সালে এরশাদকে জেলে পাঠানোর দাবী করে ৯৬ সালে এরশাদের সাথে জোট করা আর ৯৩ সালে গোলাম আযমকে জেলে পাঠানোর দাবী করে ৯৪ সালে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট করা এর অন্যতম প্রমাণ। সে কারণে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সরকারের এই সংঘাত যদি ভারতের পরিকল্পিত ছকে নতুন গৃহপালিত বিরোধী দল সৃষ্টির জন্য করা হয়ে থাকে তাহলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।

এ কারণেই শিরোনামে লিখেছি গণজাগরণ মঞ্চ ও সরকারের সংঘাতের মধ্যে একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প আছে। আর সেই গল্পটির বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রথম পক্ষ ভারতের ভালোবাসার দাবীদার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পক্ষ আওয়ামী লীগ এবং গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে সংঘাত (পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত)।

অনেকেই কৌতুহলী হয়ে আছেন জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবির, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, ড. আনোয়ার হোসেনরা এখন কোন পক্ষ নেন সেটা দেখতে। উনারা সবাই সেফ সাইডে খেলেন। যদি মিডিয়ার হাইপ তুলে আসলেই গণজাগরণ মঞ্চকে একটি রাজনৈতিক প্লাটফরম হিসেবে গড়ে তোলা যায় তাহলে উনারা মঞ্চের পক্ষ নিয়ে গৃহপালিত বিরোধী দলীয় নেতা বনে যাবেন। যদিও মিডিয়ায় হাইপ তুলে সেলিব্রেটি তৈরী করা গেলেও এখনো পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক নেতা তৈরী করতে পারার দৃষ্টান্ত নেই। সেই ক্ষেত্রে স্যার জাফররা আপাতত নিরপেক্ষ থেকে আকাশের তারা গুনবেন বলেই মনে হচ্ছে।

Accommodating the New Imperial Order: The Dhaka Tribune and the Ruling Culture of Subservience

By Surma

They plunder, they slaughter, and they steal: this they falsely name Empire (Superpower), and where they make a wasteland, they call it peace – Tacitus (56 – 117 AD)

Have you heard the one about the Bangladeshi farmer and the Indian Border Guard?

felani.jpg

Picture of 15 year old Felani killed by Indian Border Guards (BSF) on the 7 January 2011

There was once a Bangladeshi farmer who was ploughing his fields with his cattle near the Indian Border. The Indian border guards (BSF) as part of their live exercises, for the sake of target practice, crossed the border shot the farmer and took his cattle. The BSF re-brand the cattle as Indian cattle and then sell it to an Indian cattle smuggler, who in turn smuggles the cattle into Bangladesh, with the help of the BSF, and sells at a premium. All this time our helpless Bangladeshi farmer is lying in his field bleeding to death.

First the the local Awami League Chairman comes along, see’s the farmer walks over the farmer, crosses the border and has tea with the BSF guards at their station.

Second, a civil society, Sushil type, Nirmul Committee member comes along, see’s the farmer, takes pictures and then crosses the border and writes a report with the BSF guards. In the report the farmer was part of international Islamist terror network, and his cattles were being used to fund that terror network, thus both the farmer and his cattle created an existential threat to the Bangladeshi state and needed to be neutralised.

Third, a correspondent from the Dhaka Tribune arrives and takes an interview of the farmer, noting down all the facts, then writes a sympathetic piece in the paper about the problems faced of being an Indian Border Guard.

The above comical anecdote sadly reflects the state of affairs that is amongst the ruling clique, political and civil in Bangladesh. A culture of submission to an aggressive foreign power, which regularly kills citizens of the country, interferes in domestic politics and is economically exploiting the country’s resources. It is a culture of subservience which permeates the ruling Awami League, to a myopic civil society members, whose indignity is masked by spineless corporate media.  This pro india bias was recently highlighted by former ambassador Sirajul Islam, in the Weekly Holiday. The Dhaka Tribunes role of propaganda as an extension of the state was confirmed when it and its editor Zafar Sobhan received an award by the Better Bangladesh Bangladesh Foundation (BBF) for creating a better image for the country. The other awardees are (post Rana Plaza) Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association for its contribution in the garment sector, the (post internationally criticised elections) Ministry of Foreign Affairs for contribution in the field of international relations, Bangladesh Armed Forces for serving in the United Nations Peace Support Operations and International Committee of the Red Cross (ICRC) for its role during the Liberation War and Foreign Minister AH Mahmood Ali.

Policy of Appeasement – ‘Please Sir, can I have some more!’

muncih 1938.jpgoliver twist.jpg

(l) Neville Chamberlain proclaiming foolishly ‘peace in our times’, after rewarding Nazi aggression at Munich 1938. ( r) Famous scene from Oliver Twist 1968, ‘Please sir can i have some more!’

This culture of subservience reached new heights, with the recent editorial by the Dhaka Tribune by its editor Zafar Sobhan, where he beseeches the Indians to extend the cricketing Indian Premier League into Bangladesh:

“The most obvious way in which to do this would be to let Dhaka bid for a franchise in the next application process and let economics sort it out. With a catchment area that would comprise the entire country in terms of local fan base, or even simply taking Dhaka as the focal metropolis, such a franchise would be a better bet than some that are already in the IPL”

The article and its timing displayed new a new marker for the paper, in its ‘Walter Mitty’, type editorial policy, a new level of a comic detachment from the reality faced by ordinary Bangladeshis. Instead of confronting criticism of the papers Islamophobic and pro India bias, the article just confirmed those accusations and further silenced an ever decreasing number of sympathisers, The reality on the ground, which the paper ignores and is insensitive to, is that one sided elections were held with the open support of the Indian government, with a brutal security crackdown with an alleged assist from the Indian army, all held against the backdrop of an increasing number of Bangladeshi citizens being killed by the Indian security forces at the border.

The content and timing of the piece could be interpreted as a rerun of Munich 1938, where instead of aggression against the sovereignty of a neighbouring country being opposed and resisted, we have a cringe worthy acceptance of the aggression by masking it up and seeking to reward such aggression, in this case unilaterally seeking an IPL franchise.

The ignorance multiplier effect – one import size fits all

The proposal shows an incredible disregard for developing Bangladeshi cricket, which can be throttled by importation of franchise and precious resources being diverted to it. Instead of advocating investment and development of local clubs, the newspaper’s solution, like so many other solutions adopted in current Bangladesh, is to import a ready made manufactured Indian solution. This is in the foolish belief that such a solution, of a single franchise, is for the benefit of development of the game in a country of over 150 million.

A similar dynamic, rather stagmatic, can be observed in every domain of indigenous social-technological development, from water resources engineering, to urban planning and education. The systematic undernourishment of our own talents is no basis for a state with pretensions of autonomy. Realise this, even (y)our foreign development partners are laughing all the way to the bank and up their career ladders

The attitude in the paper seems to be hangover of the Mujib-era one party state of the early 70s, where dogma superseded practical technicalities. Then it was the import of ill fitting Soviet blueprints, now we have the advocacy of ill fitting, counter productive Indian ones, for our politics, culture, economics and now cricket. For too long, the Dhaka Tribune and its ilk, has gotten away with weaving a fairytale of Bangladesh. Until people start complaining – and loudly too – the corporate media agenda will be shaped by supporters of government, pro AL big business and Indian foreign policy. That does not just subvert honest journalism: it undermines our democracy.

famine 1974.jpgdefinition of journalism.jpg

(l) Scene from the famine of 1974, mainly caused by the political and economic ineptitude of the government of the day. ( r) Memo to the Dhaka Tribune and the corporate media of Bangladesh, from a real journalist, George Orwell.

গরুদের জন্য সহীহ ফটোশপ টিউটোরিয়াল

13

আপনার অপদার্থ দানা নেতাটি মদ্যপান করে গাড়ি চালিয়ে আমেরিকাতে ধরা পড়ে জেল খেটেছে? এখন অন্য দলের জনপ্রিয় নেতাকে সেই পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চান? তাহলে নীচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

১/ প্রথমে তুরষ্কের একটি নাইটক্লাবের ছবি জোগাড় করুন;

TR-5

২/ এবার এবার ফটোশপ ব্যবহার করে ছবিটির হরাইজন্টাল মিরর ইমেজ তৈরী করুন;

TR-6

৩/ এরপর যে নেতার চরিত্র হনন করে আপনার মদারু নেতার সমপর্যায়ে আনতে চান সেই নেতার তৃণমূল সমাবেশ থেকে একটি ছবি যোগাড় করুন।

TZ

৪/ এখন নাইট ক্লাবের ছবিটিকে সুবিধামত ক্রপ করুন

TR-2

৫/ নাইট ক্লাবের ছবিতে থাকা কোন দাঁড়ি ওয়ালা লোককে সনাক্ত করুন। এটা খুবই জরুরী স্টেপ, কারণ এর উপর নির্ভর করছে একই ঢিলে ইসলাম ধর্ম এবং জনপ্রিয় নেতাকে হেয় করা। প্রয়োজনে নির্মলেন্দু গুণ বা রবীন্দ্রনাথের ছবি ব্যবহার করুন কিন্তু দাড়ী থাকতে হবে টুপিসহ যোগাড় করতে পারলে তো সোনায় সোহাগা।

৬/ এইবার দাড়িওয়ালা লোকটির মুখ কেটে ফটোশপের মাধ্যমে ঐ জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার মুখ বসান।

TR-4

৭/ এবার এডিট করা ছবিটিকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিন।

TR-7

৮/ আপনার ক্রোমোজমে কুকুরের জিন থাকলে শিরোনাম দিন, “সহীহ হেফাজতি, জামায়াতি কায়দায় জীবন উপভোগ করছেন …..” আর যদি ভারতীয় গরুর জিন থাকে তাহলে শিরোনাম দিন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশঃ লন্ডনের নাইট ক্লাবে …..

গরু হাম্বা হাম্বা করে, ফেসবুকের আনন্দ বাড়ে!

মিডিয়া ও ক্ষমতার বিকার

By রেজাউল করিম রনি

মিডিয়া নিয়া অনেক আগেই লেখা দরকার ছিল। যাক দেরিতে হলেও লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এতো বিষয় কেমনে ধরি? ফলে আমরা অনেকগুলা বিষয় কেবল ইশারায় সেরে নিব।

images
বাংলাদেশের রাজনীতিকে বুঝবার ক্ষেত্রে তথাকথিত মিডিয়া যে ভূমিকা নিয়েছে তা আমাদের ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কথা জোর দিয়ে বলতে হবে যে,  মিডিয়া পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর বাংলাদেশে এই পর্যালোচানার কাজে যে গাফিলতি রয়েছে তা পাহাড় প্রমাণ বললেও কম বলা হবে। অন্যদিকে বিশ্ব জুড়েই সন্ত্রাসের পক্ষে মিডিয়ার ভূমিকা জারি রয়েছে। বিশেষ করে গণতন্ত্র যে ব্যবস্থায় সরাসরি সন্ত্রাসবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রমোট করে, সেখানে মিডিয়া তার অর্থনীতি ও কালচারাল শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে গণবিরোধী হতে বাধ্য। মধ্যে থেকে কৌতুক হল,  এর নাম দেয়া হয়েছে ‘গণমাধ্যম’।

এটা গণমাধ্যম বটে, তবে গণবিনাশী। বাংলাদেশে গণতন্ত্র কথাটাই খোদ নির্যাতকদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর সাথে মধ্যবিত্তের কালচারাল ফ্যাসিজম যুক্ত হয়ে এটা গণহত্যার ভূমিকায় সামিল হয়েছে। তাই আমাদের আর গণতন্ত্রে চলছে না। বলতে হচ্ছে, গণক্ষমতার উত্থানের কথা। কিন্তু এই গণক্ষমতার জন্য যে মতাদর্শিক লড়াইটা জারি থাকা দরকার তা আমরা করতে পারছি না। এর জন্য সস্তা প্রচারপ্রিয় শিক্ষিত নামধারী মাস্টার,  তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও ফুর্তিবাজ প্রজন্ম মূলত দায়ী। এদের বিরুদ্ধে আমরা শুরু থেকেই লড়াকু ভূমিকায় হাজির আছি। এরা আমাদের জামাতের, বিএনপির বা জঙ্গি,  রাজাকার ইত্যাদি বলছেন। এখন বলছেন, হেফাজতের বুদ্ধিজীবি। এগুলা সমস্যা না। বিপদ হল, তারা যে প্রগতি চেতনার আফিমের ঘোরে আমাদের শত্রু জ্ঞান করছেন তার ফলে এরা নিজেরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগুনেই পেট্রোল ঢালছেন। এই দিকগুলা নিয়ে আগেই লিখেছি। এখানে মিডিয়ার পার্টটা নিয়ে কথা হবে।

. যোগাযোগ, প্রচারযন্ত্র গণমাধ্যম মিথ

আমাদের যোগাযোগ :  ইতিহাসের খোঁজে

যোগাযোগের আদি ইতিহাস নিয়া কথা বললে অনেক কথা বলতে হবে। মানুষ প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের প্রয়োজনে কী তরিকায় যোগাযোগ ব্যাপারটা রপ্ত করেছিল, তার কোনো একরৈখিক ইতিহাস নাই। ইতিহাস বলে আবার একাট্টা কোনো কিছুও নাই। এর নানা অর্থ। বিভিন্ন প্রকরণ। এর মধ্যে যে ধারাটি ইতিহাস বলে হাজির হয়েছে, তা হল ন্যারেটিং হিস্ট্রি। মনে রাখতে হবে, ডিসকার্সিভ ট্রেডিশনই এখকার ইতিহাসকে সম্ভব করে তুলেছে। এবং আধুনিক-উত্তর কালে সব মতাদর্শকেই ডিসকার্সিভ ট্রেডিশন আকারে দেখবার কায়দা তৈয়ার হয়েছে। এবং এই ডিসকার্সিভ বা বয়ানযোগ্যতাই ন্যারেটিং হিস্ট্রিকে সম্ভব করে তুলেছে। ডিসকার্সিভের যুতসই বাংলা করা মুশকিল। ডিসকার্সিভ মানে হলো কোনোকিছুকে রিজনিং করে তোলা। একটা বয়ানকাঠামোর ভেতরে বিষয় বিন্যস্ত করাই হল ডিসকারসিভনেসের বৈশিষ্ট্য। এর আলোকে ইতিহাস বা কোনো ধারণাকে ব্যাখ্যার জন্য নানা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। সাধারণত যারা চলতি ইতিহাসের বয়ানের বাইরে অবস্থান করে তারা কিংবা নতুন করে কোনোকিছু হাজির করার জন্য আধুনিক-উত্তর কালে এই তরিকা প্রয়োগ করা হয়।

আমাদের মতো দেশে ইতিহাস মানে ন্যারেটিং হিস্ট্রি না। কেননা, বাংলার ধারাটা হলো ওরাল ধারা। এন্টি পেটেন্টিক বা কিতাববিরোধী ধারা। উনিশ শতকের বেঙ্গল ইতিহাসের ন্যারেশনটাই বাংলাদেশে হাইব্রিডের মতো চাষ করা হয়েছে। এইটা একদিকে যেমন ইউরোসেন্ট্রিক, অন্যদিকে উপনিবেশের খাসগোলামির ভাষ্যই বহন করে। এই ধারাকে তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশকে এরা কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারেনি। বুঝতে চায়নি। পরে এইটাকে বুঝবার জন্য ‘ওরাল’ ট্রেডিশন বলে ক্যাটাগরি করল। বলাই বাহুল্য,  পুরা ক্যাটাগরি বা বিষয় বিন্যাস পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার আলোকে গড়ে উঠেছে। একইভাবে যোগাযোগ নিয়া আমাদের অধ্যয়নও নিদারুণভাবে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের বিকাশের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে বুঝবার এযাবৎ যে ধরণ জারি হয়েছে আমরা তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই। আমরা কি আমাদের ইতিহাসের ধারার মধ্যে যোগাযোগের পর্যালোচনার কথা চিন্তা করেছি?  আরও গোড়ায় প্রশ্ন করি, আমরা কি আমাদের ইতিহাস নিয়া চিন্তা করি?  নাকি লিনিয়ার হিস্ট্রি বলে যা জারি আছে তাকেই নিজেদের ইতিহাস বলে বা বিশেষ কতগুলা ‘ইভেন্ট’ এর ওপর ভর করে ইতিহাসের কাজটা ফয়সালা করে ফেলেছি? তারপরে ফাঁকা জাতীয়তাবাদের জুলুমবাজি শাসনের শিকার হয়ে চলেছি। ফলে গোড়ার অনেকগুলা কাজ আমাদের সেরে তারপরে এই জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ নিয়া চিন্তা বা পর্যালোচনার অভিমূখ পরিষ্কারের জন্য মেহনত করতে হবে।

আমাদের ‘ওরাল’ ধারার মধ্যে যোগাযোগের প্রাথমিক পর্যায় ছিল গল্প কথক। এই গল্প গদ্য বা পদ্যের বিভাজন রেখা মানতো না। ধারণা করা যায়, গদ্য বা পদ্য বিভাজনটা বর্ণনা ভঙ্গিকে আকর্ষনীয় করতে যেয়েই তৈরি হয়েছে। এই গল্প কথকের ভূমিকা রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরপরে এদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে তথ্য সরবরাহকারী। এদেরকে আপনি আদি গোয়েন্দা বলতে পারেন। এরা রাজার কাছে তথ্য সরবরাহ করতো। আর গল্প কথক জনজমায়েতগুলোতে গল্পের ডালি নিয়ে বসত। এই ছিল এখানকার যোগাযোগ প্রক্রিয়া। এটা গেল আমাদের আদি সমাজিক দিক থেকে যোগাযোগের ধরন। অন্যদিকে এখানকার মানুষের কাছে জীবন ও মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তা ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পশ্চিম থেকে আলাদা। কাজেই পশ্চিমা তরিকার মধ্যে যোগাযোগ বলে যে অধ্যয়ন প্রক্রিয়া জারি হয়েছে তার নিরিখে যোগাযোগ বিদ্যা দিয়া এইখানে কাজ হবে না এটাই স্বাভাবিক।

পশ্চিমে যোগাযোগ অধ্যয়ন বেশ পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। যোগাযোগ ও মিডিয়া অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বাইবেলতুল্য বই মার্শাল ম্যাকলুহানের প্রস্তাবনার নাম,  ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া : এক্সটেনশন অব ম্যান’। মিডিয়াকে পশ্চিমা সমাজ মানুষের ক্রমবিকাশের ধারার আলোকে বুঝতে চাইছে,  বুঝেছে। আমাদের এখানেও কি এই তরিকাই চলবে? হুবহু চলবে না। কিন্তু কিছু বিষয় তো আমরা গ্লোবাল অবস্থায় থাকার কারণে নিতেই পারব। কিন্তু যা নেয়া যাবে না তার বিচার করবার জন্য যে গোড়ার কাজগুলো দরকার তা আামদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায় করেছে বলে খবর পাইনি। যোগাযোগ ও মিডিয়া নিয়ে দুনিয়াব্যাপি চিন্তার যে বিকাশ ঘটেছে তার সাথে আমাদের জানা-শোনার পরিধি খুবই হতাশাজনক। কেননা এই বোঝাবুঝির মধ্যে নিজের জন্য আমরা কোনো পর্যালোচনার সংস্কৃতি তৈয়ার করতে পারিনি। এই বিষয়ে ব্যর্থতার প্রথম দায় নিতে হবে একাডেমিক পরিমণ্ডলে যারা এইগুলা নিয়ে করে-কেটে খান তাদের।

আমাদের ওরাল ধারা এখনও বজায় আছে। অক্ষর বা প্রিন্ট প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তেও বিশাল জনগোষ্ঠি স্বতন্ত্র জীবনযাপন বজায় রেখেছে। আপনি এমন একজন কৃষকও পাবেন না যার সকাল বেলার আরামদায়ক টয়লেটের সাথে পত্রিকার কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু শহরের অনেক লোকের এই সমস্যা দেখবেন। পত্রিকা ছাড়া টয়লেটে সমস্যা হয়। যেসকল লোক এই সব যোগাযোগ প্রক্রিয়ার ধার না ধরেও জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে মিডিয়া কোনো বাই এক্সটেনশন অব ম্যান না। এইটা তার কাছে কোএো বিষয়ই না। কিন্তু আপনি তো গোটা সমাজকে এই সিভিলাইজেশনের মধ্যে আনতে চান। এর বাইরে অন্য কোনো কন্ডিশন আপনার কাছে সিভিলাইজেশনের আওতার বাইরে। কিন্তু আপনার যে যোগাযোগের ধারণা-চর্চা, তার কোনো কিছুরই সে ধার-ধারে না। প্রকৃতি ও মানুষের সাথে তার সম্পর্কের এমন এক ধারা এখানে জারি আছে যার সম্পর্কে আপনি ধারণা করতে পারবেন না। কোনো খবর না দেখেই কৃষক বুঝতে পারে আবহাওয়ার কী অবস্থা হবে। সেই মোতাবেক সে চাষাবাদ করে। খনার জ্ঞানতত্ত্ব তো এই সভ্যতার যুক্তিবাদি জ্ঞান দিয়া আপনি বুঝতে পারবেন না। তখন আপনি তারে বলেন,  ও হইলো সাবল্টার্ন। ও ‘ছোটলোক’। ওর ভাষা নাই। তখন আপনি গায়ত্রী স্পিভাক পড়েন! ‘ক্যান সাবল্টার্ন স্পিক?’।

ছোটলোক কি কথা কইতে পারে? ওর এপিস্টোমলজি/জ্ঞানতত্ত্ব যে আপনার বুঝবার মুরোদ নাই, সেদিকে আপনে মনযোগ দেন না। কারণ আপনার কাছে জীবনের অর্থ যা, ওর কাছে তা না। ফলে কমিউনিকেশন ক্যামনে হবে? যোগাযোগ ক্যামনে সম্ভব?
খুব হাল্কা চালে কথাটা তুললাম। জানি এখনই পরিস্কার হবে না,  তবে প্রশ্নটা  তোলা থাকলো।

ফলে পশ্চিমের সভ্যতার যে ইতিহাস তার আলোকে মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা তার ভিত্তিতে সেই সমাজে যোগাযোগের তর্কটা হাজির হয়েছে। তাদের দেকার্তীয় যে রেনেসাঁবাহিত ইতিহাস ও যোগাযোগ প্রক্রিয়া বুঝবার ধরণ তা আমাদের সমাজে প্রয়োগ করে যোগাযোগ অধ্যয়নের যে প্রচেষ্টা তা দেড় ইঞ্চি মুরগির পেটে তিন ইঞ্চি বাচ্চা জন্ম দেয়ার মতো ভয়াবহতায় নিপতিত করেছে আমাদের। সেটা আমরা পরে আলোচনা করে পরিস্কার করতে পারব আশা করি। আমাদের সমাজের বিকাশ ধারা তো আলাদা। এইটা মার্কসও স্বীকার করেছেন। আপনি যদি ধরেন, বৈদিক যুগ থেকে তো আমরা একটা সিভিলাইজেশনের মধ্যে ছিলাম। ফলে আমরাও বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যেই হাজির ছিলাম শুরু থেকে। অবশ্যই শাসিত ছিলাম। উপনিবেশের ভেতরে ছিলাম। ফলে আজকের সভ্যতা তো কায়মনোবাক্যে কলোনিয়াল (ধরণ পাল্টেছে এই যা)। ফলে আমরাও সেই জ্ঞানকাণ্ডের নিরিখে নিজেদের পাঠ করতে পারব। তাইলে আমি বলব আপনেরে ভূতে পাইছে। এর আগেও এখানে লোকজন ছিল। জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল। মানুষ সম্পর্কে ধারণার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থা গড়ে ওঠার এই জনগোষ্ঠির নিজস্ব ইশারা ছিল। এইটা নানা কারণে নানা সময়ে ব্রেক হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি এদেরকে একটা জনগোষ্ঠী আকারে গড়ে তুলতে চান। বা তা না চাইলেও যদি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চান, তাইলে আপনার এই ডিসকন্টিনিউটির হদিস করতে হবে। আপনার ইতিহাস খাড়া করা লাগবে।

আপনার বয়ান লাগবে। এরপরই যোগাযোগ সম্ভব হবে। নইলে আপনি পশ্চিমা যোগাযোগ বিদ্যায় হাফেজ হয়েও এই জনগোষ্ঠীর কোনো কাজে আসতে পারবেন না। আপনি শ্রেণী মাধ্যমের কাছে ধরা খেয়ে আটকে থাকবেন। এই অতি প্রাথমিক হুঁশটুকু মাথায় রাখা খুব জরুরি। পশ্চিমে মতাদর্শ,  কালচার ও মানুষ সম্পর্কের ধারণার যে এনলাইটেন ক্রিটিক আছে তা গভীর অভিনিবেশ সহকারে পাঠের দরকার আছে। এর সাথে যোগাযোগের ধারণার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসের দিকে মনযোগ ফেরাবার কাজটা অতি প্রাথমিক কাজ আকারেই হাজির হয়েছে।

মিডিয়ার কথা নয়া মিডিয়া :

প্রিন্টিং প্রক্রিয়া শুধু মিডিয়ার সম্ভাবনাই পরিষ্কারভাবে হাজির করেনি, হাজির করেছে জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনাও। আপনার দেশের ক্রিকেট টিম জিতে গেলে লাল টকটকা কালিতে পত্রিকার হেডিং হয় ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব’। এর সাইকোলজিক্যাল  ইমাজিনেশন ও ইমপেক্ট ভয়াবহ। যাহোক প্রিন্টিং টেকনলোজিই হাজির করেছে রাষ্ট্রের আধুনিক পরিগঠনের পসিবিলিটি। প্রিন্ট মিডিয়াম/মাধ্যমকে বলা হয় জাতীয়তাবাদের আর্কাইভ।

গল্প কথকের জায়গায় হাজির হলো সাংবাদিক। এতো দিনে যেহেতু লিবারেল ভেলুজ পশ্চিমা সভ্যতার জোরে চাউর হয়েছে। তাই কিছু নীতি নৈতিকতাও তৈরি হয়ে গেল। লম্বা ফিরিস্তি না দিয়ে কোট করি।

‘নিরপেক্ষভাবে কাজ করার বৈশিষ্ট্য সাংবাকিদেরকে গুপ্তচর,  প্রচারক ও প্রপাগান্ডিস্টদের থেকে পৃথক করেছে। অসহনীয় বা অপ্রিয় সত্য বলতে পারার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে বিনোদনকর্মী থেকে। নিজস্ব বিশ্বাসকে চাপা দিয়ে কোনো ঘটনা বা ইস্যুর বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা সাংবাদিকদের পৃথক করেছে ধর্মবেত্তা বা রাজনীতিকদের থেকে। আর যথার্থতা ও জবাবদিহিতার গুণটি সাংবাদিকদের পৃথক করেছে গল্পকথকদের কাছ থেকে’ [সাংবাদিকতা, দ্বিতীয় পাঠ: আর রাজী]

সাধারণত মিডিয়ার কাছে আমরা যে নৈতিকতা আশা করি তা লিবারেল নৈতিকতা। এখন প্রশ্ন করতে হবে। পুঁজিবাদের এক নম্বর পেয়ারা জিনিস হলো লিবারেলিজম। এবং পুঁজি নিজেকে আধুনিককালের ঈশ্বরে পরিণত করেছে। এখন এই ঈশ্বরও এই সব খেলনা নৈতিকতা মানতে যাবে কোন দুঃখে? ফলে আমাদের যেসকল বুদ্ধিজীবী একই সাথে পুঁজিবাদ বিরোধিতার বিপ্লবী ভূমিকাও দেখান, আবার লিবারেল নসিহতও পেশ করেন, তাদেরকে আপনি কিভাবে পাঠ করবেন? এইটা মিডিয়া থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে লিবারেল নসিহত কী জিনিস তা আর বিস্তারিত না বলি। তারা হয়তো বলবেন, ফ্যাসিবাদের কালে এতটুকু লিবারেল আচরণই করুণ মরুতে একবদনা জলের মতো। তাদেরকে বলতে হবে, বাংলাদেশে লিবারেল বাড়াবাড়িই এই ফ্যাসিজম টাইপের অবস্থা তৈরি করেছে। এখানে ঐ অর্থে ফ্যাসিজম নাই যদিও। এইটাকে আমরা বলি, কালচারাল ফ্যাসিজম। যাক সেইটা অন্য তর্ক। লিবারেলিজমই যেখানে খোদ পাপের মধ্যে নিমজ্জিত, তাইলে স্বাধীন মিডিয়ার কথা চিন্তা করা ক্যামনে সম্ভব? এইটা অতি গুরুতর প্রশ্ন।

ঠিক এইখানেই এসে মার্ক্সিস্টদের ভূমিকার কথা বলতে হবে। ফাঁকে বলে নিই মিডিয়া আলোচনায় মার্ক্সিস্ট বুদ্ধিজীবিরা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মেহনত করেছেন। তিনারা যেহেতু এই লিবারেল ফাঁকি বোঝেন, তাই মিডিয়াকে সব আধিপত্য কায়েমের যন্ত্র আকারে হাজির হতে দেখে ঝাপায়া পড়েন। শ্রেণী,  কর্পোরেট,  সংস্কৃতি,  হেজিমনি -নানা বিষয় যুক্ত করে মিডিয়ার তর্কটা হাজির করেন। তারা আমাদের জানান দেন, একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি যে, মিডিয়া হল ‘মাধ্যম’,  মানে প্রচার যন্ত্র। এইটা কোনোভাবেই গণমাধ্যম না। ‘গণ’ নিয়া গণবিতর্ক আছে। সেখানে নানা জনগোষ্ঠীর ‘গণ’ হয়ে হয়ে ওঠার রাজনীতি ও সংস্কৃতির যে পাঠ তা খুব নিষ্ঠার সাথে না করলে ‘গণ’ ব্যাপারটা রেটরিক বা মুখের কথাই থেকে যাবে। ফলে মিডিয়ার সরল বাংলা হল প্রচারযন্ত্র।

আধুনিকতার বা মোটাদাগে বললে গ্রিকো-খ্রিস্টান সিভিলাইজেশনের ক্রিটিক না থাকায় তারা মিডিয়াকে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য তত্ত্ব বাতলাতে থাকে। একের পর এক প্যারাডাইম নিয়া ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। শেষে মনে করে তাইলে ফেসবুক গণমাধ্যম। পরে যখন দেখে দুই দলের সাইবার যুদ্ধ কমিউনালিটি আরও বাড়ায়া তোলে। একদিকে শাহবাগ অন্য দিকে বাঁশের কেল্লা। মাঝে শুরু হয়ে গেল হত্যার রাজনীতি।

ফাঁকে নিউ মিডিয়া নিয়ে একটু বলে নেই। বিজ্ঞানের সাথে টেকনোলজির সম্পর্কটা আবার খতিয়ে দেখা দরকার। পশ্চিমা বিজ্ঞানের ভূমিকাটা ছিল মেসিয়ানিক বা ত্রাণকর্তার। এর সাথে টেকনোলজির যোগটা একটা বিবাদ আকারে দাঁড়াল। বিশেষ করে টেকনোলজি যখন শুধুই ক্ষমতা ও পুঁজির অনুগামী হলো। এই টেকনোলজি সারা দুনিয়ায় বিজ্ঞানের আশির্বাদের মুখোশ নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু এর মুখটা হল ক্ষমতা ও পুঁজির দিকেই। ফলে সে অন্য দেশ ও জনগোষ্ঠির কালচারাল অবস্থানের সংকট তৈয়ার করল। পশ্চিম,  সমাজের অবস্থানের দিকে না তাকিয়ে টেকনোলজির আমোদে মেতে উঠল।[ আশিষ নন্দী: ট্রেডিশন অব টেকনোলজি]

নিউ মিডিয়ার মধ্যে ভাষা একটা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো। কম্পিউটারাইজড নয়া মিডিয়ার মধ্যদিয়ে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ হাজির হয় তা ভাষিক বিদ্রোহের বাইরে অন্য দেউড়ি পার হতে পারে না। চরম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই এর সাফল্য আটকে থাকে। মাঝে মাঝে এর যোগাযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক আন্দোলন টাইপের কোনো কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলেও তা বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের বাইরে যেতে পারে না। একমাত্র আরব বিক্ষোভে আমরা দেখলাম মার্কিন আধিপত্যবাদীরা কিভাবে ফেসবুক/টুইট জেনারেশনকে দিয়ে গৃহপালিত একটা বিপ্লব করিয়ে নিতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এর ফল হলো উল্টা। আলকায়েদা আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে নিলো আরব বিশ্বে। নিউ মিডিয়া বা কম্পিটারাইজড মিডিয়া খুব স্বাভাবিক কারণেই গ্লোবাল পণ্য ব্যবস্থাপনার অনুকূল কালচারই ধারণ করে। এর মৌল চৈতন্যে আছে নব্য উদারনীতিবাদের হাত ধরে যে পুঁজিতান্ত্রিক চরম অবস্থার বিস্তার লাভ করেছে তারই মতাদর্শিক রুপায়ন। এখন নব্য উদারতাবাদ লোক দেখানো যে মানবতাবাদ,  সম্পত্তির অধিকার ও ব্যাক্তি স্বাধীনতার কথা বলে তার পুরা সুবিধা আসলে পুঁজি ব্যবস্থাপনার হাতেই আটকা পড়ে। কারণ পুঁজি একটা গ্লোবাল ফেনোমেনা। এটা জেনেও আমাদের এখানে উদারনীতিবাদের কথা মন্দের ভাল হিসেবে বলা হয়। এবং নাগরিক বোধ ও তারুণ্যকে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু এই নিউ মিডিয়ার ফাঁপরে পড়ে জন্ম হয়েছে নার্সিসাস বা আত্মমগ্ন প্রজন্ম। এরা ফেসবুক বা টুইটের মতো মাধ্যমকে আত্মপ্রচার বা দ্রুত নিজেকে জনপ্রিয় করার জন্য এমন সব কাজ করে বসে, যার জন্য রক্তারক্তি পর্যন্ত ঘটে যায়। পণ্যবাদী উদারনীতিবাদ যেহেতু জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন বাদ দিতে পারে না। ফলে এই কনজ্যুমার জাতীয় চেতনার আন্ডারেই হাজির হয় ফেসবুক/টুইটার/ব্লগ ব্যবহারকারীরা। জনগণের এথিক্যাল ঐক্যের প্রতি কোনো বিবেচনা না রেখে দ্রুত জনপ্রিয় ও নিজেকে নিয়ে বিতর্ক উপভোগ করবার মানসিকতার অসুখে পেয়ে বসে নয়া মিডিয়া ব্যাবহারকারী ভোক্তা প্রজন্মকে। জন্ম হয় ‘থাবা বাবা’র মতো ক্যারেক্টারের। ফলে যারা নিউ মিডিয়া নিয়া আশাবাদী তাদের আশার দৌঁড় শেষ হয় পুঁজির চরম মুনাফার খাতায়।

তাছাড়া টেকনোলজি নিয়া ইনডেপ্থ আলোচনা দরকার আছে। টেকনোলজি ও মানুষের জীবন, সম্পর্ক, যোগাযোগ ইত্যাদির যথেষ্ট পর্যালোচনা আমরা করিনি। সতর্কতার জন্য বলি,  আমার এই লিবারেল সমালোচনা যার লেটেস্ট পশ্চিমা সংস্করণ নিউ লিবারেল বা নয়া উদারনীতিবাদ সমালোচনাকে কেউ যেন বাড়াবাড়ি মনে না করেন। আমাদের জন্য পশ্চিমা সব বিকাশ বা আবিষ্কার হোলসেল মন্দ নয়। কিন্তু এই সব বিষয়কে আমরা যেহেতু যথেষ্ট বুঝবার আগেই ফ্যাসিবাদি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকারে পরিণত হয়েছি, তাই কৌশলগতভাবে লিবারেল অবস্থার কথা অনেকে বলে থাকেন। আমি তার সাথে দ্বিমত করি না। আমি দেখাইলাম যে, এইটার মধ্যে যে সমস্যাটা মূলশাঁস সমেত রয়ে গেছে তার দিকেও নজর রাখাটা জরুরি। তাইলেই আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর জন্য যুতসই তরিকা বা মতাদর্শ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নৈতিক অর্ডার নির্মাণ করতে পারব। এর জন্য নানা মতাদর্শকে বিচার করার উদাম পরিবেশটাকে অবশ্যই আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। আপনি নিজে যদি রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপারে কনভিন্স হন তাইলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই আপনি এই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন। এটাই স্পিরিট। এটাই জীবকে মানুষে উন্নীত করেছে। তখন আপনি এই সব ভোগবাদি ব্যবস্থার ফাঁক গলে নিজের কাজটা জারি রাখতে পারেন। তখন আপনি এই সব উম্মুক্ত মিডিয়াকে বৈপ্লবিক পরির্বতনের হাতিয়ার করে তুলতে পারেন। তার জন্য রাজনৈতিক-নৈতিক স্পিরিটটা থাকা চাই। এই সভ্যতার দাশ হলে ধংসের হাত থেকে রেহাই নাই।

যা হোক, নয়া উদারনীতিবাদ নিউ মিডিয়ার সম্ভাবনা এতো বেশি উৎসাহিত করার পরেও এগুলা গণচরিত্র পায় না। সাংস্কৃতিক,  শিক্ষা ও সর্বোপরি মতাদর্শিক ভিন্নতা প্রকট আকারেই থেকে যায়। তখন মিডিয়া চিন্তকরা অসহায় হয়ে পড়েন। গণমাধ্যম তৈরি হয় একটা মিথে। কোনো মিডিয়া আর গণমাধ্যম হয়া ওঠে না। এরা খালি জনগণের নামে নিজেদের প্রচারই জারি রাখে। প্রচারব্যবসার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু গনমাধ্যমসুলভ আচরণ তারা প্রায়ই করেন। সেটা পলিসিগতভাবে করেন, নীতিগতভাবে নয়। তার পরেও মিডিয়া পাঠে মার্ক্সিস্টদের কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি। মোটাদাগে পশ্চিমে আমরা যে মিডিয়া স্টাডিজ জারি দেখি তার বড় অংশই মার্ক্সিস্ট জ্ঞানকাণ্ডের সিলসিলা ধরে বিকশিত। আমি মার্ক্সিস্ট বলে হোলসেল কোনো ধারার কথা বলছি না। এর মধ্যে নানা ভিন্নতা সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন। এর বাইরেও অনেকে মিডিয়া বিদ্যায় যথেষ্ট কামালিয়াত দেখাইছেন। চমস্কির কথা তো সবাই জানেন।

মার্ক্সীয় ধারার মধ্যে দুইটা ধারা ছিল। বিস্তারিত বলব না। ষাট দশকের দিকে যে ধারাটা গড়ে উঠেছিল তাকে খুব শক্তিশালী ধারা বলা যায়। এরা সনাতনী নানা বিবেচনায় ব্যাপক পরির্বতন আনেন। এবং অবশ্যই এই চিন্তাধারার একক কোনো ঘরানা নাই। আমাদের দেশেও যারা মিডিয়া নিয়া আলোচনা করেন তারাও এই ঘরানার আলোকেই করেন। মোটা দাগে এইটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এতে নানা নয়া ডিসকোর্স হাজির করা হয়। নানা ডাইমেনশন তৈয়ার হয়,  এই যা।

এই ধারা গণমাধ্যমকে উৎপাদন, পুণরুৎপাদন আরও একটু যারা এডভান্স তারা হেজিমনির কথা বলেন। এদের বিশ্লেষণ পলিটিক্যাল ইকোনমির জায়গা থেকে আমাদের খুব কাজে লাগে। এদের মধ্যে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও বহুত্ববাদী ধারার তাত্ত্বিকরা  মনে করেন,  প্রতিনিধিত্ত্বমূলক ব্যবস্থায় মিডিয়ার পেশাজীবিরা প্রভাবশালী সংস্কৃতি ও রীতিনীতি আত্মস্থ করেন ও সেই সমাজের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। কথা অতি খাঁটি সন্দেহ নাই।  তাইলে এদের কাছেই যখন আপনি গণমাধ্যমের নৈতিকতা আশা করবেন, তাইলে ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে যায় না? বাদ দিলাম পুঁজির আলোচনা। মিডিয়া কালচার বলে যে ব্যাপারটা আছে তা তো মিডিয়াকে কোন ভাবেই গণমাধ্যম হয়ে উঠতে দিবে না।

যাহোক,  মার্ক্সিস্টদের মিডিয়া আলোচনার মূল পয়েন্টটা সরাসরি মার্ক্স থেকেই নেয়া। আর আমাদের এখানে বুদ্ধিজীবি মানে মার্ক্সিস্ট। ফেকাহ শাস্ত্র ভাল বুঝলে তারে বুদ্ধিমান তো দূরের কথা,  এইটা যে একটা শিক্ষা তাও স্বীকার করা হয় না। ফলে আমাদের আসলে মার্ক্সিস্ট না হয়ে উপায় নাই। নইলে যে প্রগতিশীলতার ধর্মচ্যুতি ঘটে! আমাদের বিকাশের ক্ষেত্রে এইটা একটা বড় সমস্যা। মার্ক্স বলতেছেন,

‘যে শ্রেণী বস্তুগত উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে,  সেই শ্রেণী একই কারণে মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে,  এই কারণেই সাধারণত যাদের মনোজাগতিক উৎপাদনের ওপর দখল নাই,  তাদের ধ্যান-ধারণা শাসক শ্র্যেণীর ধ্যান-ধারণার অধীন হয়ে থাকে।’   [মার্কস ও এঙ্গেলস: জার্মান ইডিওলজি]

এইটা মার্ক্সের অল্প বয়সের লেখা। দেখেন এইখানে একটা দ্বান্দিক ফ্যালাসি আছে। যে বস্তুগত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে সেই মনোজগতের ওপর প্রভাব রাখে। আবার যে শ্রেণীর মনোজগতের ওপর দখল নাই, তারা উৎপাদনের মালিক বা শাসক শ্রেণীর অধীন থাকে।

তার মানে মার্ক্স বলতেছেন, দুইটাই লাগবে। ধরে নিতেছেন বা প্রায়রিটিতে রাখছেন, বস্তুর ওপর দখলই চৈতন্য বা মনোজগতের ওপর দখল কায়েমে ভূমিকা নেবে। ফলে বস্তু-নিরপেক্ষ ডিভাইন পসিবিলিটিও যে মানুষের মনোজগতকে প্রভাবিত করতে পারে, শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে পারে সেই আলাপ মার্ক্সে নাই। ফলে এই নিখিল বস্তুময় বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করা ও পরির্বতনের কাজে মার্ক্স অনেক দূর এগিয়েও মূক হয়ে গেছেন। নতুন সিভিলাইজেশনের পসিবিলিটি দিন দিন মার্কসিজমের জন্য কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছে। যখন ডিভাইনটি রাজনৈতিক রুপে হাজির হয় তখন মার্ক্স কাজ করতে পারেন না। অন্য দিকে ইউরোসেন্ট্র্রিক আধুনিকতার সমস্যা মার্ক্সিজম (মার্ক্স না) শেষ পর্যন্ত ওরিয়েন্টালিস্টই করে রেখেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা বুঝবার ক্ষেত্রে মার্ক্সের চিন্তা ভিন্ন উপায় নাই। তথাপি এর নির্মোহ ক্রিটিক তো করতেই হবে।

ফলে গোড়ার গদলগুলা না মিটিয়ে মার্ক্সিজমের টেবলেট দিয়ে আমাদের অসুখ সারানোর চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছে। এই দেশের বামপন্থিরা হয়েছে সবচেয়ে জনবিচ্ছিন্ন। এইটা হল সাংস্কৃতিক উৎপাদনের গোড়ার সমস্যাটা না বুঝার কারণে। এইটা মিডিয়ার দিকে তাকালে বুঝবেন। এই দেশের সবচেয়ে বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হল বামপন্থিদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। সে সারাক্ষণ চর্চা করে ক্ষমতাশীল শ্রেণীর সংস্কৃতি আর শ্লোগান দেয় ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

গণমাধ্যম মিথ :

এই কালচারাইজেশন অব পলিটিক্সে মিডিয়া কিভাবে রাজনীতিকে খেয়ে ফেলে তার নজির হল বাংলাদেশের বামপন্থা। মিডিয়াকে গণমাধ্যম মনে করার যে মিথ তা বাড়ানোর জন্য কিছু রিপোর্টিং করে মিডিয়া বা এই সব প্রচার যন্ত্র টিকে থাকে। গণতন্ত্র যেমন ভোটের নামে টিকে থাকে। আর শোষনের দাঁতে শান দেয়। মিডিয়াও তেমনি গণমাধ্যম ও নিরপেক্ষতার মিথ জারি রেখে মিডিয়ার ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে যেন কোনো বিপ্লবী শক্তির উদয় না ঘটে তার এক মধুর খেলা জারি রাখে। এর জন্য গড়ে তোলে কিছু সিভিল বুদ্ধিজীবি। এইটাকে ‘হমি কে’ ভাবা বলছেন সিলি সিভিলিটি। এই সিলি সিভিলরা মিডিয়ায় ইস্যুভিত্তিক আলাপে ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন ইস্যুর টেনশন মিনিমাইজ করাই হল এদের কাজ। এরা তাই জন্মগতভাবেই গণবিরোধী। আর সাংবাদিক ভাইরা এতো স্মার্ট হওয়ার পরেও যা ধরতে পারেন না তা হল,

‘মিডিয়ায় যে এলিট-আধিপত্য গড়ে ওঠে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের এমনভাবে কোনঠাসা করে দেয়া হয়,  আর তা এতো স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে,  মিডিয়ার সাংবাদিকেরা (যারা প্রায়শ পূর্ণ সংহতি ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করেন) কতগুলো পেশাগত সংবাদমূল্যের ভিত্তিতে ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ কাজ করেন বলে নিজেদের বোঝাতে সক্ষম হন। কিন্তু বাধাগুলা এতটা শক্তিশালী,  এমন মৌলিকভাবে সিস্টেমের মধ্য থেকে গড়ে-ওঠা যে, সংবাদ-পছন্দের বিকল্প ভিত্তির কথা কল্পনা করাও কঠিন।’ [হারমেন ও চমস্কি: সেলিম রেজা নিউটনের অনুবাদ: মিডিয়া পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তক; বাংলা একাডেমী]

মিডিয়া পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহান ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া’ বইয়ে মিডিয়ার নানা খুটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম অধ্যয়েই তিনি বলছেন, ‘মিডিয়াম ইজ দ্যা মেসেজ’। এইখানে আমি একাডেমিক কোন আলোচনা করব না। মাধ্যমই সংবাদ। কথাটা বুঝলে অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে যাব। আমরা সাধরণত মনে করি মিডিয়া হবে সত্য প্রকাশের হাতিয়ার। ন্যায় আর বিবেকের পরাকাষ্ঠা হবে মিডিয়া। নির্মম হলেও সত্য নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মিডিয়া বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নাই। মিডিয়াম নিজেই একটা চরিত্র ধারণ করে বসে। তার পরে সে তাঁর চরিত্রের বাজারজাত করে। কালচারাইজ করে তার চরিত্রকে। এটা বাজারের স্বার্থে না করে রাজনীতি সংষ্কৃতি ও অন্য নানা কারণে করতে পারে। ফলে মিডিয়াকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাববার আর কোন সুযোগ নাই। ঘটনা সংবাদ হতে যে কারণে পৃথক ঠিক একই কারণে প্রচারযন্ত্র সার্বজনীন সত্য থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য। মিডিয়ার কাছে ডিজিটাল মিথটা সত্য বা মিথ্যাও নয় কিন্তু মিডিয়া এইটা এসেনসিয়ালাইজ করে এটার ভ্যালু কে সে এমন ভাবে হাজির করে, সমাজে নয়া কালচারাল মেরুকরণ তৈয়ার হয়।

কাজেই এরা একটা প্রপাগান্ডা মেশিনারির চাকুরে কিন্তু নিজেদের মনে করেন জাতির বিবেক। এইটা গোটা মিডিয়া বিদ্যার দিক থেকে বলা হল। বাংলাদেশে ব্যাপারটা কি রকম। বাংলাদেশে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ ব্যাপারটা কিভাবে হাজির আছে তার আলোচনা না করে মিডিয়াকে বোঝা যাবে না। বাংলাদেশে তথাকথিত সেকুলার আধুনিক যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য জারি রয়েছে। আর আওয়ামী জবরদস্তির যে রাজনীতি তা এই সাংস্কৃতিক আদর্শের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। ফলে খুব সহজেই মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার এর একটা যোগসূত্র তৈয়ার হয়েছে। সমাজের এই দিকটি বিশদ ভাবে না বুঝলে আমরা এখনকার মিডিয়া কিভাবে গোলামির গুন্ডায় পরিণত হলো তা ধরতে পারব না।

আমাদের প্রতিটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বহুপক্ষীয় ব্যাবসার স্বার্থে জড়িত। সাধারণত বড় বড় ব্যাবসায়ীর কাছে মিডিয়া হল অন্য ব্যাবসা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারে কিছুটা নিজের ব্যাবসার অনুকূলে রাখতে একটা মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার চাঁদা সেভ করে দিতে পারে। সরকারও সহজেই এদের বাধ্য করে ফেলতে পারে নগ্ন প্রপাগান্ডায় নেমে যেতে। আর বাড়াবাড়ি করলে সহজেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এর জন্য কিছু আইন রেডিমেট তৈয়ার করে রাখা আছে। আমাদের প্রতিটি সম্পাদক বা মিডিয়াকর্তা আসলে মালিক পক্ষের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করে। ফলে খুব সহজেই সাংবাদিকতা এখানে পরিণত হয় কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি নির্মাণ ও কতিপয় মানুষের ভাবমূর্তি বিনাশের একটা উলঙ্গ খেলায়। এর মধ্যে যাদেরকে আপনারা মনে করেন ‘মানসম্পন্ন’ মিডিয়া। এরা বাংলাদেশে দাতা সংস্থাদের গোলাম ছাড়া আর কিছুই না। এরা মূলত ডেভলপমেন্ট ডেমক্রেসি বা ভিক্ষার গণতন্ত্র পয়দার আতুড় ঘরের ভূমিকা পালন করে। এটা করতে যায়া তারা যে কালচারাল রাজনীতি প্রমোট করে তার কর্পোরেট জাতীয়তাবাদী চেহারার সাথে আপনারা পরিচিত। এর আবেগী প্রপাগান্ডা ফ্যাসিবাদি সংস্কৃতির দোসর। তাঁর চরিত্র হলো উপনিবেশী সংস্কৃতির কিন্তু দায়িত্ব হলো পশ্চিমা দাতা সংস্থার বা কতিপয় এম্বাসির বক্তব্যকে সাংবাদিকতার মোড়কে হাজির করা। এটা ডিজিটাল, প্রযুক্তি, প্রগতি, চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদির এমন এক মনমাতানো প্রচারণা ও আবেগঘন কন্ঠস্বর নিয়ে হাজির হয় মধ্যবিত্ত এর সাথে দ্রুত নিজের নাড়ির যোগ ঘটিয়ে ফেলে ‘জাতে’ উঠে যায়। যে মধ্যবিত্ত বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের গণহত্যাকে রাজনৈতিক বিজয় মনে করে।  কিছু শিশুতোষ লোক হাজির হয় বুদ্ধিজীবি হিসেবে। কিছু লেখক, চলচ্চিত্র কর্মী, অভিনয় তারকা, শিল্পীকে এরা শামিল করে নিজেদের প্রপাগান্ডা মেশিনে। এইটা হয়ে ওঠে মেইনইস্ট্রিম। অন্য মিডিয়াগুলাও এর ব্যাবসায়িক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে গণমাধ্যমের শক্তি ঠাওরে এই দিকেই যাত্রা শুরু করে।

আধুনিকতার মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে মিডিয়া তারই মুরুব্বি হিসেবে নিজেরে হাজির করে। সে ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে চলতি মতাদর্শের নিয়মতান্ত্রিক মত-দ্বিমতের ভিতরে থেকে অভিভাবকের মতো আচরণ করে। ফলে রাজনৈতিক পসিবিলিটি বলে যেটা বিরাজ করে তা সবসময়ই মিডিয়া পরিমন্ডলের বাইরে থাকে। যখন কোন কমিউনিটি হাজির হয় (হেফাজতের আগমনে সময় আমরা যা দেখেছি) তখন প্রচারযন্ত্র কেবল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাদেরকে কেন্দ্র করে সমাজে যে উত্তেজক অবস্থার সৃষ্টি হয় মিডিয়া তখন তার চরিত্রের সীমাব্ধতা সত্ত্বেও নিরপেক্ষতার ভনিতা করে। এইটা সংবাদ ব্যাবসার মধ্যে থাকলে করতে হয়। কিন্তু পারসেপশনের বেলায় প্রচার যন্ত্রের গোমরটা ফাঁস হয়ে যায়। মিডিয়ার পারসেপশন আর জনসমাজের পারসেপশনের মধ্যে যে ফারাক তা অতিগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতা প্রায়ই শিক্ষিত বা বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিত্তকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক বিকাশ হয় খুব নিম্নশ্রেণীর।

অন্যদিকে এর বাইরেও যে বিশাল জনগোষ্ঠী তাঁরা আধুনিকতার এই যোগাযোগ জালের বাইরেও নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম। এর কারণ হল মতাদর্শিক বিকাশ প্রচার যন্ত্রের প্রপাগান্ডা দিয়া প্রভাবিত করা যায় না। ফলে সমাজের বিভাজন সামাজিক স্তরে থেকেই যায়। খেয়াল করে দেখুন, কাভারিং শাহবাগ আর কাভারিং হেফাজতের মধ্যে মিডিয়ার ভূমিকাটা কি ছিল। শাহবাগের কাভারেজে মিডিয়া যে মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে মনে হয়েছে এটা যেন ঠিক তাঁদের নিজেদের যুদ্ধ। অন্য দিকে হেফাজত কাভারিং বুঝতে হলে এতো কথার দরকার নাই। এডওয়ার্ড সাইদ কাভারিং ইসলাম নিয়ে যে পারসেপশন দিয়েছেন তা দিয়েই বুঝা যাবে। ইসলামকে পশ্চিমের মতো আমাদের মিডিয়াও একটা ওরিয়েন্টাল ব্যাপার মনে করে। ফলে মেইনস্ট্রিম প্রপাগান্ডা মেশিনারি সাংস্কৃতিক ভাবে, মতাদর্শিক ভাবে এন্টি ইসলামী। হেফাজতকে কোন ভাবেই তাঁরা নাগরিক আন্দোলনের মর্যাদা দিতে পারে না। এই কমিউনিটি মিডিয়ার কাছে ‘অপর’ হিসেবে ধরা দেয়। তাঁর কাছে নাগরিক আন্দোলন হলো এনজিও বুদ্ধিজীবিতা। ফলে ধর্মযুদ্ধের কালে মিডিয়ার ভূমিকা কি হবে তা আর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

কাজে কাজেই বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জন্য একনম্বর কৃতিত্ব হল মিডিয়া বা এইসব প্রচারযন্ত্রের। এখন এগুলোকে সহজেই বাগে এনে ক্ষমতার রাজনীতির যে গণবিচ্ছিন্নতা তা আড়াল করে জবরদস্তির শাসন টিকিয়ে রাখাটা খুবই সহজ কাজ। ফলে মিডিয়ার সহযোগে এই ক্ষমতার বিকার হয়ে উঠবে পাগলা কুত্তার মতো।

. ক্ষমতার বিকার :

ÔThe representative nineteenth century discourse of liberal individualism loses its power of speech and its politics of individual choice when it is confronted with an aporia. In a figure of repetition, there emerges the uncanny double of democracy itself: `to govern one country under responsibility to the people of another ….is despotism. [Bhabha: Sly civility, p: 137 The Location of Culture]
এতক্ষণের আলোচনা আমাদের অনেক ভাবনার খোরাক জোগাল। এইবার আমরা ক্ষমতা প্রশ্নটি বোঝার চেষ্টা করব। মিডিয়া তাত্ত্বিদের অগ্রসর অংশ মনে করেন। হেজিমনি তৈরি করতে মিডিয়া শাসক শ্রেণীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। হেজিমনি নিয়া দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান তাত্ত্বিক গ্রামসির লাই ধরেই এই সব আলোচনা হয়ে থাকে। গ্রামসির সাথে দ্বিমতের লোকের অভাব নাই। তথাপি হেজিমনির কথাটা একটা লেবেলে সত্য বলে কম বেশি সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু হেজিমনি বললেই সব ব্যাপার পরিষ্কার বুঝা যায় না। কারণ গ্রামসি শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন না। এই আধিপত্য কোথায় অবস্থান করে? রাষ্ট্রে না সিভিল সমাজে ? কারণ গ্রামসি পুরানা ক্লাসের জায়গা থেকে ব্যাপারটাকে দেখেছেন। যা এখন কর্পোরেট জমানায় গ্লোবাল ফেনোমেনা আকারে পুঁজির চরম অবস্থার মধ্যে ক্লাসের আলোচনাও আগের জায়গায় নাই। তবে গ্রামসি উত্তর চিন্তকরা মনে করেন এই হেজিমনি বা আধিপত্য অবস্থান করে সিভিল সমাজেই।

মোট কথা গ্রামসির লেখায় আধিপত্য ধারণার আমদানি হলেও এটা নিয়ে বিস্তারিত কোন আলোচনা গ্রামসিতে নাই। ফলে পরবর্তী সময়ে এই ধারায় নানা বিষয়ের আলোচনা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। সাবল্টার্ন বিদ্যার ধারাও গড়ে উঠেছে এই পথ ধরেই। এটা নিয়ে এখানে কথা বলব না। ক্ষমতা প্রসঙ্গেই সীমিত থাকব।

‘ক্ষমতার বিকার’ কথাটা অনেক সময় রেটরিক অর্থে ব্যাবহার করা হয়। কথাটা নিয়ে অনেক অস্বচ্ছতাও আছে। যেখানে রাজনীতি কথাটা ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া কোন অর্থই তৈয়ার করে না সেখানে ক্ষমতার বিকার কথাটা যে অস্বচ্ছতা তৈয়ার করে তা আগেই পরিষ্কার করা জরুরি।

ক্ষমতার দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য -এই দুই রুপই আছে। সব ক্ষমতাকে আমরা দৃশ্যমান ভাবে বিরাজ করতে দেখি না। যেমন জ্ঞান যে ক্ষমতা, এইটা আমরা কি সব সময় দৃশ্যমান ভাবে দেখি? না দেখি না। মার্ক্সের পরে এই জ্ঞানের একটা ব্যাবহারিক বা বলা যায় চর্চার জায়গা পরিষ্কার হয়েছে। ফলে জ্ঞানের ভূমিকায় একটা চর্চা বা প্রাকসিসমূলক ব্যাপার হাজির হয়েছে। এর সাথে সাথে আমরা ক্ষমতার বিকার কথাটা কিভাবে বুঝব তাইলে? মুশকিল কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

ক্ষমতার সর্বব্যাপী বিস্তারের দিশাটা সহজে বুঝা যায়। এই সর্বত্রবিচারী ক্ষমতার সাথে শাসনপদ্ধতির যে যোগ তার নিরিখে ক্ষমতার বিকার কথাটা ভাল ভাবে বুঝা সম্ভব হবে মনে হয়। এর সাথে জীবন যাপন, অর্থব্যবস্থা, সংষ্কৃতি, উৎপাদন ও ইতিহাসের আলোচনাও চলতে পারে। ফলে ক্ষমতার বিকার কথাটা একটা নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে আলোচনা করা হয়। তারপরেও শুধুমাত্র তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিচ্যুতির মধ্যে ক্ষমতার বিকার আবিষ্কার করার পপুলার ফ্যাশন সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। খোদ ক্ষমতা কি জিনিস তার আলোচনা বহু বিস্তৃত। কিন্তু বিকারটা আমরা নানা কিছুর সাপেক্ষে দ্রুতই ধরে ফেলতে পারি। রাষ্ট্র, আইন, আদালত এমনকি ইতিহাসের বয়ানের মধ্যেও এই বিকার বিরাজ করতে পারে। এইটা খুইজা পাওয়া খুব কঠিন কিছু না। কিন্তু ক্ষমতা কি কারণে ক্ষমতা? -এই আলোচনা অনেক পরিসর দাবি করে। এইটা অন্যখানে হবে।

ক্ষমতার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মিশেল ফুকো। ফুকো আমাদের দেখান ক্ষমতা কিভাবে সর্বত্রগামী হয়। পাগলা গারদ থেকে যৌন বিধান সবজায়গায় ক্ষমতা কিভাবে হাজির থাকে। খুব মাইক্রো লেভেলে ফুকো এগুলা নিয়ে কথা বলেন। আধুনিক-উত্তর কালে ক্ষমতা কেবল আর রাষ্ট্র বা কতিপয় শ্রেণীর আধিপত্য ধারনার মধ্যে সীমাব্ধ নয়। ক্ষমতা সামাজিক, ব্যাক্তিগত এমনকি দৈনন্দিন নানা খুটিনাটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। পরিবার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এই  সবের ভেতর দিয়েও ক্ষমতা জনগনের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। ফুকোর কথাটা হচ্ছে আধুনিক ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা বা সার্বভোমত্বেও সনাতনী ছকে চলে না। তা চলে অনুসাশন বা ডিসিপ্লিনের ছকে। ফুকো মজার একটি শব্দ হাজির করেছেন। তিনি বলছেন ‘গভর্নমেন্টালিটি’। আমি এতো কথা বলছি এইখানটায় আসার জন্যই। এই গর্ভমেন্টালিটির সাথে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ফ্যাসিজমের শিকারে পরিণত হওয়ার বিষয়টি মিলিয়ে নিতে চাই।

এই অনুশাসন প্রীতি বা গভর্নমেন্টালিটিই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রকে সম্ভব করে তুলেছে। আমরা আর খুঁজতে যাই না আদৌ ক্ষমতায় কেউ আছে কি না? আমরা বুঝতে পারি না ক্ষমতা কোথায়? স্বার্বভৌম ক্ষমতা খুব মূর্ত বিষয়। কিন্তু গভর্নমেন্টালিটি আর কোন মূর্ত বিষয়ের ধার ধারে না। সে এতোই নিয়মের দাসে পরিণত হয় যে ক্ষমতায় কে আছে সে ভুলে যায়। ভারতীয় বাহিনী নামল না বাংলাদেশের র‌্যাব গুলি করে মারল তাতে কিছু আসে যায় না। সে নিয়মের গোলামে পরিণত হয়। এই নিয়মই গণজম আকারে হাজির হয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেয় আধুনিকতার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধে। আমাদের এখানে ব্যাপারটা পশ্চিমের মতো করে ঘটে না। আমাদের শাসন কাঠোমো পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত উপনিবেশী। শুরুতে হমি কে. ভাবা থেকে একটা কোট করেছি।

ইম্পায়ার এর সাথে ন্যাশনের সম্পর্কটা বোঝা দরকার। আমাদের মতো দেশ যে কারণে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে না তার হদিস করাটা অতি জরুরী।  আমাদের এখানে থাকে রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট। এর কিছু পোষ্য সিভিল ক্যাডার থাকে। এরা করে কি, এই পরগাছা সরকারের স্বাধীনতাকে পরিগঠন করে ইম্পায়ারের নীতির আলোকে। ফলে এই সব সরকার যত বেশি জাতীয় চেতনার কথা বলে ততই গণবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই অবস্থাকে বলা যায় কলোনিয়ালিস্ট গভর্নমেন্টালিটি। আর এটাই আমাদের মাঝে গেড়ে বসেছে। হমি কে. ভাবা বলছেন,

‘উনিশ শতকের প্রতিনিধিত্বকারী (উপনিবেশী) লিবারেল ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রবাদী বয়ান যখন চিন্তার সংঙ্কটে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই এটা তার রাজনৈতিক ভাষ্যের যোগ্যতা হারায় এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের রাজনৈতিকতাকেও বিনাশ করে। তখন সে ভৌতিক গণতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি করে। খোদগণতন্ত্রই যখন রহস্যময়, তখন একটি দেশ শাসিত হয় অন্য আর একটি দেশের স্বার্থের আলোকে। গণতন্ত্রের পোশাকে আসে স্বৈরতন্ত্র।’

ভয়াবহ ব্যাপার হলো এই কলোনিয়াল মেন্টালিটির সামজীকিকরণ করা হয় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের নামে। আর এর প্রধান হাতিয়ার হলো মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র। এই সামাজীকিকরণই ফ্যাসিজমকে সম্ভব করে তোলে। এই ফ্যাসিজম ইম্পায়ারের সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নিজ দেশে শুরু করে দেয় ধর্মযুদ্ধ। বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ওয়ার অন টেররের প্রকল্পের পথে। ফলে ক্ষমতার বিকার এর সাথে মিডিয়া বা প্রচার যন্ত্রের সম্পর্কটা বুঝতে পারা খুব কাজের কাজ হবে বলে মনে করি। এই প্রসঙ্গে ফিরে লেখা শেষ করব।

বুদ্ধিজীবীতা মিডিয়ার ভূমিকা :

মিডিয়ার বর্তমান ভূমিকাটা নিয়া জনমনে ক্ষোভ আছে। সেটা অন্যায় কিছু না। কিন্তু সমাজের বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হল মিডিয়া কেন এই ভূমিকায় উপনীত হল। বাংলাদেশের মিডিয়ার চরিত্র এমন কেন? মিডিয়া কিভাবে বাধ্য হলো এই অবস্থায় হাজির হতে তা খুলে খুলে দেখিয়ে দেয়া। কিভাবে তার প্রজেক্টের মধ্যেই গণবিরোধিতা হাজির থাকে তা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখানো। এই কাজও নিদারুণ ভাবে অনুপস্থিত। মিডিয়া যে লাইনে সংবাদ প্রচার করে তার সাথে আমাদের এই মূহুর্তেও সঙ্কটের ফারাকটা আকাশ আর পাতাল। কথাটা খুলে বলি।

অনেক মানুষের জন্য অবস্থাটা এ রকম যে, কোন ইস্যু মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত সেটা আর ইস্যুই মনে করছে না। আমরা দেখছি মিডিয়া মিথ্যা বলছে তার পরেও আমরা সেই খবরই পড়ছি। এর মধ্যেই রাজনীতির কর্তব্য কর্ম খুঁজছি। চমস্কি যেমন বলেন, যেসব দেশে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট আমলাতন্ত্র থাকে সেই সব দেশে মিডিয়া আধিপত্যশীল এলিটদের হয়ে কাজ করে। মানে মিডিয়া প্রচারযন্ত্র হিসেবে উলঙ্গ প্রতিযোগিতায় নামে। বিনোদন ও কিছু ব্যালেন্সিং রিপোর্ট করে গণমাধ্যম মিথটাও জারি রাখে। যাতে জনগনের সাথে প্রতারণাটা ধারাবাহিক ভাবে করা যায় এবং লসপ্রজেক্ট না হয়। পাবলিক মুখ ফিরিয়ে নিলে তো আমছালা সবই যাবে। ফলে প্রচারযন্ত্র গুলা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারের দায়িত্ব পালন করে। আর সত্য প্রচারের ধুয়া তুলে ব্যবসা করে যায়। মিডিয়া হল প্রতারণামূলক সত্যের ব্যাবসা। এখানে গণতন্ত্রের সাথে মিডিয়ার মিল শতভাগ।

এই সত্যের ব্যবসায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সঙ এর মতো। কিছু প্রচারযন্ত্র নির্দিষ্ট কিছু লোকদের জাতির বিবেক হিসেবে হাজির করে। এই বিবেক আবার দুই পক্ষের একটা আওয়ামী বিবেক আর একটা বিএনপি বিবেক। এই দুই দলের মধ্যে আবার ঝগড়াও লাগে। সেটা আবার মিডিয়া ব্যাপক কাভারেজ দেয়। সরকার সব মিডিয়া নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। যেগুলা দখলে মানে অনুগত্যের বাইরে চলে গেল সেগুলা সব বন্ধ করে দেয়া হলো। বিরোধী দলের লোক জন চিৎকার করে বললেন, সরকার গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করছে।

সরকার আসলে যা করছে তা হলো নিজেদের প্রচার যন্ত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আইন, সংবিধান শুধু নয় ইতিহাস, চেতনা সব আপনি নিজের স্বার্থ আর দেশের স্বার্থকে একাকার করে সাজালেন। সেখানে কিছু বিরোধী মিডিয়া রাখার তো আর দরকার নাই। ছদ্মবেশী গণতন্ত্রের মোড়কটা খুলে ফেললে এখন আর সমস্যা নেই। উপরের আলোচনা থেকে দেখছি মিডিয়া কালচার আর আওয়ামী কালচার কতো গভীর ঐক্যের মধ্যে বিরাজ করে। বিএনপি তো উপরে উপরে মিডিয়া করেছে। নিজেদের জন্য দরকারি সাংবাদিকও তৈরি করেছে। কিন্তু মিডিয়া কালচারটা আওয়ামীই রয়ে গেছে। এটা এখন ন্যাশনাল কালচার! ফলে এখন মিডিয়ার দ্বারা ফ্যাসিবাদের বয়ানটা পাকাপোক্ত করা সবচেয়ে মামুলি কাজ। সাংবাদিকরা কাগুজে বাঘের মতো কিছুদিন তড়পাবে পরে চাকুরি ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, সব মিলে মানিয়ে নেবে।

একজন বললেন, গণমাধ্যমে তো বোমা মারা উচিৎ! কারণ কী? কারণ, আপনারা বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধের সময় প্রতিবাদ করেননি। সরকার পক্ষের বুদ্ধিজীবী বললেন, যিনি বোমা মারার কথা বলেছেন তিনি পাগলও নন শিশুও নন। এই বক্তব্যকে তিনি বিপদজনক মনে করে সরকারকে ডাক দেন ব্যবস্থা নিতে।

মিডিয়ার হাজির করা বাস্তবতার সাথে বিশাল জনগোষ্ঠী যখন কোনো মিল খুজে পায় না এবং সে জনগোষ্ঠী যদি আন্দোলনের মাঠে থাকে তাইলে মিডিয়াকে তারা নিরপেক্ষ বলে মাফ করে দেয় না। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার ঘটনা তখন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি-জামাত কি সেই গণশক্তি? উত্তর হলো না। এরা কি গণস্বার্থের শাসন কায়েম করতে আন্দোলন করছে? দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন গণমাধ্যমে বোমা মারা উচিৎ তখন একটা মুশকিল তৈয়ার হয়। প্রথম কথা হল কে কাকে বোমা মারছে? গণমাধ্যম তো গণশর্ত পূরণ করে নাই। আমাদের দেশের দুই দলের রাজনৈতিক এজেন্ডার মধ্যে প্রচার যন্ত্রের স্বাধীনতার তর্কটা তো শুরুই হয় নাই। তাইলে বোমার কথা কেমনে বলব? সরকার তার বিরুদ্ধের মিডিয়া বন্ধ করে দিছে। সব মিডিয়ায় বিটিভির চরিত্র আছর করে বসেছে। এই অবস্থা তো নতুন কিছু না।

বিএনপি কী করেছে? তাদের দলীয় লোকদের মিডিয়া মোগল বানিয়ে দিয়েছে। প্রচারের রাজনীতির একচ্ছত্র দখলদারি যে কোনো কাজে আসে না তা কোনো দলই আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য নিদেনপক্ষে মিডিয়ার জন্য একটা নীতিগত জায়গা আমদের লাগবে। প্রচারযন্ত্রের আওয়ামী ভূমিকা আর বিএনপি ভূমিকার মধ্যে কোন ফারাক নাই। আমাদের তর্ক তুলতে হবে মিডিয়াকে কেমনে সম্ভব করে তোলায় যায় সেই দিকগুলা নিয়া। বাংলাদেশ গণমাধ্যমের সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে। প্রচারযন্ত্রের সন্ত্রাস গণমাধ্যমের সম্ভাবনাকে মিথে পরিণত করেছে। আমার দেশ যেমন একটা প্রচারযন্ত্র একাত্তর টিভি বা জনকন্ঠও প্রচারযন্ত্র। এখন আপনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে একজন দাঁড়ালেন আমার দেশের ছায়াতলে অন্যজন্য ৭১ এর পতাকাতলে! আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা গণমাধ্যম মিথের শিকার হয়ে গণবিরোধী রাজনৈতিক দলের মেরুকরণে পড়ে গেছেন।

বাংলাদেশে বিদ্যমান দলগুলো গণতন্ত্রের রহস্যময়তার জন্য টিকে আছে। কিন্তু জনগণের কাছে গণতন্ত্র, জাতীয় চেতনা এগুলার আবেদন ফুরিয়েছে। মিডিয়ার সংবাদও আর মানুষকে প্রভাবিত করে না। তবুও খবর দেখা অভ্যাস বসত জারি থাকবে। নতুন নতুন বিতর্ক ও মোড় উপভোগ করবে মানুষ। বিরোধী প্রচারযন্ত্র সবই বন্ধ করা হয়েছে। দেরিতে হলেও ইনকিলাব বন্ধ করা হয়েছে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক সৌজন্যতাও আর থাকছে না। দ্বিদলীয় প্রচারণার পরিবর্তে একদলীয় প্রচারণাই ন্যায় আকারে জারি করা হলো। সমাজে এর প্রতিক্রিয়া এতো ক্ষুদ্র হয়েছে যে নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্রের ফাঁপা রুপটি মধ্যবিত্ত আর লুকাতে পারলো না। ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন, ঐতিহাসিক নির্বাচন এই সবই মিডিয়ার অবদানে সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনকার ক্ষমতার বিকারটা বহন করছে মিডিয়া বা প্রচারযন্ত্র।

গণমাধ্যম গণক্ষমতা :

লেখা শেষ করি, ক্ষমতার বিকার কথাটা বুঝলে ক্ষমতার আকার বা পাল্টা ক্ষমতাও বুঝতে পারব। উদাহরণ দিয়ে বলি, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক নির্বাচন হয়েছে। শুধু মিডিয়াতে এই নির্বাচনের প্রপাগান্ডা জারি ছিল। পাবলিক (আ. লীগের বাইরে) রেসপন্স করে নাই। কিন্তু ২৪ জানুয়ারি প্রথম আলো ‘গণতন্ত্র কোন খেলা নয়’ নামে হাসান ফেরদৌসের একটা সম্পদকীয় নিবন্ধ ছেপেছে।

এতে বলা হচ্ছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে নাকি গণতন্ত্র রক্ষা হয়েছে। বলা হয়েছে, শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার কৃতিত্ব সরকারকে দিতে হবে। বোঝেন অবস্থা! এই হল ভোটবাদি গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকার। মিডিয়া এটা পোক্ত করছে। এখন পাল্টা গণক্ষমতার কথা তো আমরা বলি সেটা কোন জায়গা থেকে বলি?

আমরা বলি, গণক্ষমতা হলো সেই ক্ষমতা যা বাংলাদেশের জনগনের নৈতিক মূল্যবোধের ভেতর থেকে উঠে আসবে। এবং এই নৈতিক এজেন্সিই ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সে যেই নৈতিকতার কারণে ‘গণ’ সেই ন্যায়কে ক্ষমতা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্যেও ধরে রাখবে। বলাই বাহুল্য, এটাই বিপ্লবী রাজনীতির কর্তব্য। এখন এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের নামে না ইসলামের নামে হবে সেটা আগাম বলার কিছু নাই। যে নামেই হোক গণক্ষমতাকে নৈতিক এজেন্ট আকারেই হাজির হতে হবে। কাজেই পাবলিক এথিকস কে ধারণ করে ক্ষমতা যখন ইনসাফের প্রতীক আকারে দাঁড়াবে তখনই তা গণক্ষমতা হয়ে উঠবে। এভাবেই আমরা রুখে দিতে পারি ক্ষমতার বিকার।

আর গণক্ষমতার উত্থান ছাড়া গণমাধ্যম কথাটা মিথ ছাড়া আর কিছু না। প্রথম আলো যেমন এই ফ্যাসিবাদি জুলুমবাজি ক্ষমতার বিকারকে গণতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার মহান অর্জন বলে সাফাই গাইছে। তেমনি মুষ্টিমেয় কিছু লোকের স্বার্থের দিক থেকে পরিচালিত প্রচার যন্ত্রকে গণমাধ্যম বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার বিকারকে রক্ষা করছে এই সব প্রচারযন্ত্র। কাজেই গণক্ষমতার কাজ হলো পাবলিক মোরালিটিকে মাথায় রেখে পাল্টা ন্যায় বা ইনসাফ ভিত্তিক ক্ষমতা তৈয়ার করে ক্ষমতার বিকারকে বিনাশ করা ও গণমাধ্যমের সম্ভাবনার পথকে পরিষ্কার করা।

মনে রাখতে হবে, সরকার যখন নিজেকে মিথ্যা প্রচারণার প্রতিযোগিতায় সামিল করবে, তখনই সে বিপদগ্রস্ত হবে। শাসক যখন মনে করে সে বিরোধী প্রচারণা বন্ধ করে নিজেদের পক্ষে বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য যে কোন ধরণের প্রচারণা চালাতে পারে। তখন বেপরোয়া অবস্থার সৃষ্টি হয়।

আনন্দের কথা হলো, এই প্রচারণা কোনো দিনও বিপ্লবী কোনো সংঘ বা মতাদর্শকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। ফলে এই সব ‘ফসকা গেরো’ আমরা দ্রুত খুলে ফেলতে পারব, যদি মিডিয়ামুগ্ধতা বা প্রচারমুগ্ধতা কাটিয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রামে নিজেদের শামিল করতে পারি। এই কাজগুলো দ্রুত করতে পারলেই দেখব মিডিয়া নিজেই দিন দিন ক্ষমতার বিকারকে এতো প্রকট ভাবে মানুষের সামনে হাজির করছে যে, মানুষের আলস্য ভেঙ্গে যাচ্ছে। একতরফা প্রচারসন্ত্রাস ধৈর্য্যের বাধটা আলগা করে দেয়। এভাবেই ফ্যাসিবাদ ও ক্ষমতার বিকার নিজের ধ্বংস তরান্বিত করে গণক্ষমতার সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রয়োজন আকারে হাজির হতে বাধ্য করে।

(প্রকাশিতব্য বই ‘গণহত্যার রজনীতি : ধর্মযুদ্ধে প্রবেশ’থেকে)

রেজাউল করিম রনি
কবি ও রাজনৈতিক চিন্তক

Erasing 25th february and Transcom ( Bangladesh) Limited’s new brand : Manzur

Have you seen todays ( February 25 2014) issue of Prothom Alo? If not let’s see it here –

Prothom Alo 25 february

Do you see where BDR Massacre is in the first page? Helpful Hint: You may need a magnifying glass.

Now let’s see with Prothom Alo’s first page on 15th August.
I am not comparing 15th August with 25th February. I am just trying to see how this newspapers commemorates a national day of mourning –

Prothom Alo 15 August

Or, if 15th August is a matter of different league – lets see how this newspaper treats 14th December- another day of gruesome killings of professionals –

Prothom Alo 14 December

A picture is worth a thousand words. Let the readers make their own conclusions. Looking at this discriminatory news treatment, if a reader concludes that — Prothom-Alo, in collaboration with the Government, is actively trying to erase 25th February from our memory, no one can find any wrong in their assertion.

But this is the same outlet which is at the front line of force-feeding the nation with the memories of 1971 and justice of the killers of 1971. And when comes BDR massacre of 25th February, their double standard is unbelievable.

——————————–

You will see suddenly both these Transcom limited owned newspapers’ front pages get filled with news items trying to glorify sacked Major General Abul Manzur and cries for justice for Manzur. It is very puzzling to see that suddenly these two media are making so much effort to glorify Manzur. What is the agenda? A friends tells me, very succinctly, “…All this smokes and mirrors about trying to prove manzur’s innocence, but no mention of the fact that manzur made a radio speech where he took responsibility for the ‘revolution’ that brought down the ‘tyrant’ and ‘un-islamic’ zia.  It’s like trying to say “faruq-rashid didn’t kill mujib, it was all a conspiracy by someone else”.

And here is another double standard – while 5 year old killing of nearly 50 army officers  get 1 column inch news treatment, killing of one army officer 39 years ago gets half front page treatment for four days in a row.

And while prothom-Alo and spurned leftist polpot revolutionary Lawrence Lifschultz are so vocal about killing of Manzur and justice for Manzur, they are equally silent about the killing of another more decorated war hero, Maj general Khaled Mosharraf. Mindblowing hypocrisy of Transcom’s Media business – but why?

টেলিভিশনের সাম্প্রতিক টক শো গুলোতে উপস্থাপিত বিভিন্ন চিন্তাধারা বা ডিসকোর্স

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

images

গত প্রায় এক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো গুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র উত্থানের সময় থেকে এর শুরু। আর গত ৫ জানুয়ারীর সংসদ নির্বাচনের পটভূমিতে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক আন্দোলন চলেছে তার বিভিন্ন রকমের বয়ানের মধ্য দিয়ে এই টক শো গুলো দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে সম্প্রতি ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সামাজিক মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তারের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে।

সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স বা চিন্তাধারাগুলো এই টক শো গুলোতে নানা ভাবে উঠে এসেছে। সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয়

আইন-কানুনের বিভিন্নমুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও ভাষ্যে এই টক শো গুলো মুখর হয়ে উঠেছে। সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন চিন্তা-প্রণালী বা ডিসকোর্সের প্রতিফলন ঘটিয়ে নানান তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই টক শো গুলো।

টক অব দ্য টাউন এই টক শো গুলো এভাবে আমাদের জনমানসের চেতন ও অবচেতনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কাজেই আমরা এই টক শো গুলোকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখতে পারি না। এগুলো কীভাবে আমাদের সামষ্টিক মনঃস্তত্ত্বে এর নানাবিধ ছায়া-প্রচ্ছায়া ফেলছে তার একটি অনুসন্ধান আমাদের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

প্রথম পর্যায়ে আমরা এই টক শো গুলোতে উপস্থাপিত ডিসকোর্স বা চিন্তাধারা গুলোকে আমাদের বোঝার সুবিধার্থে বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় শ্রেণীবিন্যাস করতে পারি। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি শাখা প্রশাখার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ উন্মোচন করতে পারি। তৃতীয় পর্যায়ে শাখা প্রশাখা গুলোর পারস্পরিক মিল ও অমিল গুলো তুলনা করতে পারি। চতুর্থ পর্যায়ে শাখা প্রশাখা গুলোকে বিভিন্ন মানদন্ডে মূল্যায়ন ও বিচার করে কোনগুলো বেশি যৌক্তিক, সঙ্গতিপূর্ন এবং কল্যাণকর তা নির্ধারণ করতে পারি।

টক শো গুলোর এই চিন্তাধারা গুলোকে প্রথমে আমরা মোটা দাগে দু’টি শাখায় ভাগ করতে পারি। এটা আমরা করতে পারি কেবলমাত্র এগুলোকে বোঝার সুবিধার জন্য। মনে রাখতে হবে যে এই শ্রেণীবিভাগ যেন কোনোভাবে অতিসরলীকরণ হয়ে না যায়। কারণ অতিসরলীকরণ বিষয়ের বহুত্ব ও জটিলতাকে অনেক ক্ষেত্রে তরল করে পানসে করে ফেলে। তো সেই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থেকে টক শো গুলোর চিন্তাধারা গুলোকে আমরা মোটা দাগে আওয়ামী-লীগ-সরকার-সমর্থক ও আওয়ামী-লীগ-সরকার-বিরোধী – এই দু’ভাগে ভাগ করে দেখতে পারি।

আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থক ডিসকোর্স বা চিন্তাধারা – এই শাখা ডিসকোর্সটির দু’টি প্রশাখা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি।

  • প্রথম প্রশাখা ডিসকোর্সটি অনেকটা এরকম – বাংলাদেশকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র আলোকে বিনির্মাণ করতে হবে। এজন্য ১৯৭২ এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। ১৯৭১ সালে জামায়াত যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল; গণহত্যা, মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতা করেছিল; সেহেতু এদের বিচার এই মুহূর্তে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে এটাই প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এই পর্যায়ে গৌণ হয়ে গেছে।

হাসানুল হক ইনু, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, মোহাম্মদ আরাফাত থেকে শুরু করে আবেদ খান, শ্যামল দত্ত, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল প্রমুখ এই ডিসকোর্সের ধারক ও বাহক। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র এই বয়ানকারীরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ’ শক্তির দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখান। এমনকি পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধে পরিণত হতে পারে বলে প্রায়ই তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। আসলে একথা বলে তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশেষ করে জামায়াতকে ‘নির্মূল’ করতে চান। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ বিএনপির সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতায় এঁরা বিশ্বাসী নন। সংলাপের পূর্বশর্ত হিসেবে এঁরা বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতায় এঁরা আসলে ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকতে চান। তাই এঁরা আসলে চরমপন্থী ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী’ বা ফ্যাসিবাদী।

  • আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থক ডিসকোর্সের দ্বিতীয় প্রশাখাটি হল এরকম – ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’য় বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। এ কারণে ১৯৭২ এর সংবিধানে ফেরত যেতে হবে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে কোনো আপোষ হবে না। জামায়াতের বিচার, শাস্তি ও নিষিদ্ধকরণে সোচ্চার ও আপোষহীন থাকতে হবে। তবে গণতন্ত্রের স্বার্থে সুষ্ঠ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নে কোনোরকম পূর্বশর্ত ছাড়াই সংলাপ ও সমঝোতা করা যেতে পারে। আর এখানেই এই নরমপন্থী বা মধ্যপন্থী ডিসকোর্সটি প্রথম চরমপন্থী ডিসকোর্স থেকে আলাদা। ড. আকবর আলী খান, সুলতানা কামাল, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ এই চিন্তা প্রশাখার প্রবল প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

যারা বাংলাদেশের ‘সুশীল সমাজে’র নেতৃস্থানীয় মুখপাত্র – যেমন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, মাহফুজ আনাম প্রমুখেরাও মূলত এই দ্বিতীয় নরমপন্থী বা মধ্যপন্থী চিন্তা প্রশাখার অনুসারী। যদিও তাঁরা নিজেদেরকে একধরণের উন্নাসিক ‘নিরপেক্ষতা’র আবরণে আবৃত রাখতে পছন্দ করেন।

আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ডিসকোর্স বা চিন্তাধারা – এই শাখা ডিসকোর্সটির তিনটি প্রশাখা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হল।

  • আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ডিসকোর্স বা চিন্তাধারার দ্বিতীয় প্রশাখাটি লক্ষ করা যায় ড. পিয়াস করিম, ড. আসিফ নজরুল, সাদেক খান, মাহফুজউল্লাহ প্রপ্রথম প্রশাখা ডিসকোর্সটি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র প্রচলিত বয়ানকে অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বলে বিবেচনা করে থাকে। যেমন ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ – এই দু’টি জাতীয় মূলনীতি সম্পর্কে এই ডিসকোর্সের রয়েছে দার্শনিক ও আদর্শিক মতভেদ। এই জাতীয় মূলনীতি দুটিকে প্রতিস্থাপন করার জন্য এঁদের রয়েছে নিজস্ব উচ্চায়ত ও শ্রেয়তর চেতনা।

এঁরা বলে থাকেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মধ্যযুগের ধর্মান্তরের ইতিহাস, সেইসঙ্গে এদেশের ভৌগোলিক সীমানা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাকে নগণ্য করে যে অসম্পূর্ণ ও একপাক্ষিক বাঙালি জাতীয়তার চেতনা উপস্থাপন করেছে তা সর্বজনগ্রাহ্য ‘জাতীয়’ চেতনা হতে পারেনি। এঁরা মনে করেন যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয় চেতনা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে এঁরা মনে করেন যে দীর্ঘ ধর্মান্তরকরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইসলাম এই জনপদে এসেছে ও এখানে এর মূল প্রোথিত করেছে। সেই ইসলামের জাতি ও রাষ্ট্র গঠনমূলক চেতনা ধারণ করলে তা সর্বগ্রাহী হয়ে অসাম্প্রদায়িক ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চেতনায় পরিণতি পেতে পারে।

এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধারণা একটি ফিরিঙ্গি ধারণা বলে এঁরা মনে করেন। জাতীয় মনঃস্তত্ত্বে উপনিবেশ যুগের যেসব অবশেষ চেতন ও অবচেতনে রয়ে গেছে তার একটি হল এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’।

মুসলিম ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা এই জনপদে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে ধর্মের নৈতিক ও আদর্শিক ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক হওয়ায় এখানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ একটি বৈরী মতাদর্শ।

আধুনিক ইউরোপে চার্চ ও রাষ্ট্রকে আলাদা করতে হয়েছিল চার্চের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাবার জন্যে। এছাড়া খ্রিস্টান ধর্মে সিজারের জগত ও ক্ষমতাকে ঈশ্বরের জগত ও ক্ষমতা থেকে যিশু নিজেই আলাদা করে দিয়েছিলেন। ফলে খ্রিষ্টধর্ম প্রধান ইউরোপে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র জন্য একটি সহায়ক ও উপযোগী পরিবেশ বিরাজমান ছিল। অন্যদিকে মুসলিম ঐতিহ্যে ইসলামের ভূমিকা প্রথম থেকেই সর্বব্যাপী ও অখন্ডনীয়। এই কারণে ইসলামকে ইউরোপের আদলে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রেখে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হলে তা জাতীয় চেতনায় সর্বনাশা শূন্যতার সৃষ্টি করে। জাতি ও রাষ্ট্রের নৈতিক পতন ও স্খলন ডেকে আনে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের নৈতিক উৎকর্ষের উৎস ও প্রেরণা হিসেবে ইসলাম ধর্মের সর্বোচ্চ অবস্থান ও ভূমিকা মুসলিম ঐতিহ্যে স্বর্ণালী অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি অনন্য সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় চেতনায় ইসলামের সেই একই গৌরবজনক ভূমিকা আবারো সম্ভব ও অতীব কাম্য। এছাড়া ইসলাম অন্তর্নিহিতভাবে অসাম্প্রদায়িক হওয়ায় অন্যান্য ধর্ম ও জাতিসত্ত্বার অনুসারীদের অধিকার এখানে সমমর্যাদায় স্বীকৃত।

এসব বিবেচনায় ১৯৭২ এর সংবিধান মূল্যায়নে এই চিন্তাধারা একে গণ-আকাঙ্খা পরিপন্থী বলে মনে করে থাকে। চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার এই চিন্তাধারা বা ডিসকোর্সের প্রধান প্রবক্তা হয়ে উঠেছেন। টেলিভিশন টক শো গুলোতে এই ডিসকোর্সটিই প্রধান প্রতিষ্ঠান বিরোধী ও বিপ্লবী ডিসকোর্স। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষমতা ও চেতনা কাঠামোকে আমূল রূপান্তরে বিশ্বাসী এই বিপ্লবী ডিসকোর্সটিকে টেলিভিশন টক শো প্রথম পর্যায়ে কিছুটা সহ্য করলেও বর্তমানে তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ। কেননা এই চিন্তাধারায় জামায়াতের যুদ্ধবিরোধীতার সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ বিচার যেমন প্রত্যাশিত, তেমনি বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইসলামপন্থী রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক ভূমিকা ও গুরুত্ব-ও যথাযথভাবে স্বীকৃত।

বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি সমাবেশের পটভূমিতে এই ডিসকোর্স বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে অনেক বেশী কার্যকর ও ফলপ্রসু হতে পারে বলে উপস্থাপিত হয়। ড. শাহীদুজ্জামান-ও ইদানীং এই ডিসকোর্সের একজন শক্তিমান মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। তিনিও ইসলামপন্থী দল ও মত নিয়ে কোনো শুচিবাই পোষন করেন না। বাস্তবতার নিরিখে ইসলামপন্থীদের অবস্থান ও ভূমিকাকে বিবেচনা ও মূল্যায়নে তিনি মুক্তমনা ও উদার।

  • আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ডিসকোর্স বা চিন্তাধারার দ্বিতীয় প্রশাখাটি লক্ষ করা যায় ড. পিয়াস করিম, ড. আসিফ নজরুল, সাদেক খান, মাহফুজউল্লাহ প্রমুখের বিশ্লেষণ ও বয়ানে। ফরহাদ মজহারের চিন্তাধারার অনেক উপাদান এঁদের মধ্যে দেখা গেলেও, এঁরা উদার গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ও ভূমিকায় অনেক বেশী আস্থাবান। নিয়মতান্ত্রিক, সাংবিধানিক আইনী কাঠামোর মধ্যেই এঁরা ভবিষ্যত বাংলাদেশকে প্রধানত দেখতে চান। তাই এঁদেরকে শেষ বিচারে সংস্কারপন্থী বা মধ্যপন্থী বলা যায়। বিপ্লবী বা আমূল পরিবর্তনপন্থী এঁরা নন। সেই বিচারে এঁরা হয়তোবা মূলধারার মুখপাত্র। তাই এঁরা বৃহত্তর সমাজে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য ও সহনীয়। এবং এই কারণে উপরোক্ত বিপ্লবী ডিসকোর্সের চাইতে এঁদের নরমপন্থী বা মধ্যপন্থী ডিসকোর্স টেলিভিশন টক শো গুলোতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী স্থান পায়।

  • এবার আলোচনা করবো এই ধারার তৃতীয় প্রশাখাটি নিয়ে। এই প্রশাখার ধারক ও বাহক নূরুল কবির টেলিভিশন টক শো-র একজন অনন্য তারকা হয়ে উঠেছেন। তাঁকে উপরে উল্লেখিত কোনো শাখা প্রশাখাতেই সম্পূর্ণভাবে বিরাজ করতে দেখা যায় না। তিনি এবং আনু মুহাম্মদ হয়তোবা এখনো ক্লাসিকাল কমিউনিস্ট। তবে এঁরা সিপিবি বা বাসদ মার্কা বামপন্থী, যেমন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বা খালেকুজ্জামান ভূইয়া-দের চেয়ে অনেকাংশে ভিন্ন প্রকৃতির। সেলিম বা ভূইয়া-রা শেষ পর্যন্ত জামায়াত বিরোধীতার জোশে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে যান। জামায়াত বিরোধীতায় নূরুল কবির ও আনু মুহাম্মদ-ও সোচ্চার ও আপোষহীন। তবে এটা করতে গিয়ে তাঁরা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মিশে যান না। এখানেই তাঁরা অন্য সবার চাইতে আলাদা। এছাড়া নূরুল কবির ‘সুশীল সমাজ’ ও সেনা-সমর্থিত এক এগারো সরকারের-ও ঘোর সমালোচক ছিলেন। আর আনু মুহাম্মদ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তাঁর চিন্তা ও মতাদর্শের প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। এই দিক দিয়ে তাঁর চিন্তা ও কাজের মধ্যে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। তবে নূরুল কবিরের সর্বব্যাপী সমালোচনা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সর্বদা স্পষ্ট নয়। তাঁর সর্বব্যাপী প্রতিষ্ঠান বিরোধী সমালোচনার পাশাপাশি তিনি যদি তাঁর ইতিবাচক চিন্তার রূপরেখাটি উপস্থাপন করেন তাহলে তাঁর ভক্তেরা আরও ভালো করে তাঁকে বুঝতে ও অনুসরণ করতে পারবে।

টেলিভিশনের টক শো গুলোতে যেসব ডিসকোর্স সম্প্রতি আমরা লক্ষ করছি সেগুলোর শ্রেণীবিন্যাস ও অনুধাবনে এই প্রাথমিক প্রচেষ্টাটি নিবেদিত হল। এটি সম্পূর্ণভাবে করা গেছে, বা সকল চিন্তাধারা বা ডিসকোর্স গুলোকে এখানে চিহ্নিত করা গেছে – সেই দাবী নিশ্চয়ই করা ঠিক হবে না। তবে এই পদ্ধতিগত শ্রেণীকরণ ও মূল্যায়নের ধারাটি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। আরো অনেকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। কারণ আমাদের জনমানস ও সামষ্টিক মনঃস্তত্ত্ব গঠনে ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সামাজিক মিডিয়ার এই ডিসকোর্স গুলোর রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ও অপরিসীম ভূমিকা।


লেখক পরিচিতিঃ মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত। ঢাকার ইংরেজী মাধ্যম স্কুল স্কলাসটিকায় কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তাঁর ইংরেজী ভাষায় রচিত ‘ডিসকভারিং বাংলাদেশ’ নামক একটি বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়ক গ্রন্থমালা বিভিন্ন ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে প্রচলিত। তিনি সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতির একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক।

ই-মেইলঃ manwar.shamsi@gmail.com